Tafsir
তাফসীর ইবনে কাসীর: মুহাম্মাদ
এই সূরার আয়াতভিত্তিক বাংলা তাফসীর পড়ুন।
আয়াত ১
১-৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন:যারা নিজেরাও আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে এবং অন্যদেরকেও আল্লাহর পথ হতে নিবৃত্ত করেছে, আল্লাহ তা'আলা তাদের আমল নষ্ট করে দিয়েছেন এবং তাদের পুণ্যকর্ম বৃথা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদের কৃতকর্মগুলো বিবেচনা করবো, অতঃপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করবো।” (২৫:২৩)মহান আল্লাহ বলেনঃ যারা ঈমান এনেছে আন্তরিকতার সাথে এবং দেহ দ্বারা শরীয়ত মুতাবেক আমল করেছে অর্থাৎ বাহির ও ভিতর উভয়কেই আল্লাহর দিকে ঝুঁকিয়ে দিয়েছে এবং আল্লাহর ঐ অহীকেও মেনে নিয়েছে যা কর্তমানে বিদ্যমান শেষ নবী (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছে।
যা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তা'আলার নিকট হতেই আগত এবং যা নিঃসন্দেহে সত্য। আল্লাহ তাআলা তাদের মন্দ কর্মগুলো ক্ষমা করবেন এবং তাদের অবস্থা ভাল করবেন। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, নবী (সঃ)-এর নবী হওয়ার পর তার উপর এবং কুরআন কারীমের উপরও ঈমান আনা অবশ্য কর্তব্য।হাদীসে এসেছে যে, যে হাঁচি দাতার ((আরবী) বলে) জবাব দেয়া হয়েছে। সে যেন জবাবদাতার জন্যে বলেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ তোমাদেরকে হিদায়াত দান করুন এবং তোমাদের অবস্থা ভাল করুন!” এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ কাফিরদের আমল নষ্ট করে দেয়া এবং মুমিনদের মন্দ কর্মগুলো ক্ষমা করা ও তাদের অবস্থা ভাল করার কারণ এই যে, যারা কুফরী করে তারা তো সত্যকে ছেড়ে মিথ্যার অনুসরণ করে, পক্ষান্তরে যারা ঈমান আনে তারা তাদের প্রতিপালক প্রেরিত সত্যের অনুসরণ করে।
এভাবেই আল্লাহ মানুষের জন্যে তাদের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন অর্থাৎ তিনি তাদের পরিণাম বর্ণনা করেন। মহান আল্লাহই এসব ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল জানেন।
আয়াত ২
47:1
আয়াত ৩
47:1
আয়াত ৪
৪-৯ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা মুমিনদেরকে যুদ্ধের নির্দেশাবলী জানিয়ে দিচ্ছেন। তিনি তাদেরকে বলছেন:যখন তোমরা কাফিরদের সাথে যুদ্ধে মুকাবিলা করবে এবং হাতাহাতি লড়াই শুরু হয়ে যাবে তখন তোমরা তাদের গর্দান উড়িয়ে দিবে এবং তরবারী চালনা করে তাদের মস্তক দেহ হতে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে। অতঃপর যখন দেখবে যে, শক্ররা পরাজিত হয়ে গেছে এবং তাদের বহু সংখ্যক লোক নিহত হয়েছে তখন তোমরা অবশিষ্টদেরকে শক্তভাবে বন্দী করে ফেলবে। অতঃপর যখন যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে তখন তোমাদেরকে দু’টি জিনিসের কোন একটি গ্রহণ করার অধিকার দেয়া হয়েছে। হয় তোমরা অনুগ্রহ করে বিনা মুক্তিপণে তাদেরকে ছেড়ে দিবে, অথবা মুক্তিপণ আদায় করে ছেড়ে দিবে।বাহ্যতঃ জানা যাচ্ছে যে, বদরের যুদ্ধের পর এ আয়াতটি নাযিল হয়।
কেননা, বদরের যুদ্ধে শত্রুদের অধিকাংশকে বন্দী করে তাদের নিকট হতে মুক্তিপণ আদায় করা এবং তাদের খুব সংখ্যককে হত্যা করার কারণে মুসলমানদের তিরস্কার ও নিন্দে করা হয়েছিল। এ সময় আল্লাহ তা'আলা বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “দেশে ব্যাপকভাবে শত্রুকে পরাভূত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোন নবীর জন্যে সংগত নয়। তোমরা কামনা কর পার্থিব সম্পদ এবং আল্লাহ চান পরকালের কল্যাণ; আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আল্লাহর পূর্ব বিধান না থাকলে তোমরা যা গ্রহণ করেছো তজ্জন্য তোমাদের উপর মহাশাস্তি আপতিত হতো।”(৮:৬৭-৬৮)।কোন কোন বিদ্বান ব্যক্তির উক্তি এই যে, বন্দী শত্রুদেরকে অনুগ্রহ করে ছেড়ে দেয়া অথবা মুক্তিপণ আদায় করে ছেড়ে দেয়ার অধিকার রহিত হয়ে গেছে।
নিম্নের আয়াতটি হলো এটা রহিতকারীঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন মর্যাদা সম্পন্ন মাসগুলো অতিক্রান্ত হয়ে যাবে তখন তোমরা মুশরিকদেরকে যেখানেই পাও হত্যা কর।”(৯:৫) কিন্তু অধিকাংশ বিদ্বানের উক্তি এই যে, এটা রহিত হয়নি। কেউ কেউ তো এখন বলেন যে, নেতার এ দু’টোর মধ্যে যে কোন একটি গ্রহণ করার স্বাধীনতা রয়েছে। অর্থাৎ তিনি ইচ্ছা করলে এ বন্দীদেরকে অনুগ্রহ করে বিনা মুক্তিপণেই ছেড়ে দিতে পারেন এবং ইচ্ছা করলে মুক্তিপণ আদায় করে ছাড়তে পারেন। কিন্তু অন্য কেউ বলেন যে, তাদেরকে হত্যা করে দেয়ার অধিকারও নেতার রয়েছে। এর দলীল এই যে, বদরের বন্দীদের মধ্যে নযর ইবনে হারিস এবং উকবা ইবনে আবি মুঈতকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হত্যা করিয়েছিলেন।
আর এটাও এর দলীল যে, হযরত সুমামা ইবনে উসাল (রাঃ) যখন বন্দী অবস্থায় ছিলেন তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন:“হে সুমামা (রাঃ)! তোমার এখন বক্তব্য কি আছে?” উত্তরে তিনি বলেছিলেন:“যদি আপনি আমাকে হত্যা করেন তবে একজন খুনীকেই হত্যা করবেন। আর যদি আমার প্রতি অনুগ্রহ করে আমাকে ছেড়ে দেন তবে একজন কৃতজ্ঞের উপরই অনুগ্রহ করবেন। যদি আপনি সম্পদের বিনিময়ে আমাকে মুক্তি দেন তবে যা চাইবেন তাই পাবেন।” ইমাম শাফেয়ী (রঃ) চতুর্থ। আর একটি অধিকারের কথা বলেছেন এবং তা হলো তাকে গোলাম বানিয়ে নেয়া। এই মাসআলাকে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করার জায়গা হলো ফুরূঈ’ মাসআলার কিতাবগুলো।
আর আমরাও আল্লাহর ফযল ও করমে কিতাবুল আহকামে এর দলীলগুলো বর্ণনা করেছি।মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহর উক্তিঃ ‘যে পর্যন্ত না যুদ্ধ ওর অস্ত্র নামিয়ে ফেলে। অর্থাৎ হযরত মুজাহিদ (রঃ)-এর উক্তিমতে যে পর্যন্ত না হযরত ঈসা (আঃ) অবতীর্ণ হন। সম্ভবতঃ হযরত মুজাহিদ (রঃ)-এর দৃষ্টি নিম্নের হাদীসের উপর রয়েছেঃ “আমার উম্মত সদা সত্যের সাথে জয়যুক্ত থাকবে, শেষ পর্যন্ত তাদের শেষ লোকটি দাজ্জালের সঙ্গে যুদ্ধ করবে।”হযরত সালমা ইবনে নুফায়েল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে আরয করেনঃ “আমি ঘোড়া ছেড়ে দিয়েছি, অস্ত্র-শস্ত্র রেখে দিয়েছি এবং যুদ্ধ ওর অস্ত্র-শস্ত্র নামিয়ে ফেলেছে।
যুদ্ধ আর নেই।” তখন নবী (সঃ) তাকে বললেনঃ “এখন যুদ্ধ এসে গেছে। আমার উম্মতের একটি দল সদা লোকদের উপর জয়যুক্ত থাকবে। যাদের অন্তরকে আল্লাহ তা'আলা বক্র করে দিবেন তাদের বিরুদ্ধে ঐ দলটি যুদ্ধ করবে এবং তাদের হতে আল্লাহ তাদেরকে জীবিকা দান করবেন, শেষ পর্যন্ত আল্লাহর আদেশ এসে যাবে এবং তারা ঐ অবস্থাতেই থাকবে। মুমিনদের বাসভূমি সিরিয়ায়। ঘোড়ার কেশরে কিয়ামত পর্যন্ত কল্যাণ দান করা হয়েছে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম নাসাঈও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)এ হাদীসটি ইমাম বাগাভী (রঃ) ও ইমাম হাফিয আবূ ইয়ালা মুসিলীও (রঃ) আনয়ন করেছেন।
যারা এটাকে মানসূখ বা রহিত বলেন না, এ হাদীস তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা করবে। এটা যেন শরীয়তের হুকুম হিসেবেই থাকবে যতদিন যুদ্ধ বাকী থাকবে। এ আয়াতটি নিম্নের আয়াতের অনুরূপঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাকো যতদিন পর্যন্ত হাঙ্গামা বাকী থাকে এবং দ্বীন সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর জন্যে না হয়।”(৮:৩৯) হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যুদ্ধের অস্ত্র রেখে দেয়ার অর্থ হলো শিরক বাকী না থাকা। আর কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা মুশরিকদের শিরক হতে তাওবা করা বুঝানো হয়েছে। একথাও বলা হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হলোঃ যে পর্যন্ত না তারা নিজেদের চেষ্টা-যত্ন আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় করে।এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদেরকে শাস্তি দিতে পারতেন।
অর্থাৎ তিনি ইচ্ছা করলে নিজের নিকট হতে আযাব পাঠিয়েই তাদেরকে ধ্বংস করে দিতে পারতেন, কিন্তু তিনি চান তোমাদের একজনকে অপরের দ্বারা পরীক্ষা করতে। এ জন্যেই তিনি জিহাদের আহকাম জারী করেছেন। সূরায়ে আলে-ইমরান এবং সূরায়ে বারাআতের মধ্যেও এ বিষয়ের বর্ণনা রয়েছে। সূরায়ে আলে-ইমরানে আছেঃ (আরবী) অথাৎ “তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, যখন আল্লাহ তোমাদের মধ্যে কে জিহাদ করেছে এবং কে ধৈর্যশীল তা এখনো জানেন। ?”(৩:১৪২) সূরায়ে বারাআতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা তাদের সাথে সংগ্রাম করবে। তোমাদের হস্তে আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি দিবেন, তাদেরকে লাঞ্ছিত করবেন, তাদের বিরুদ্ধে তোমাদেরকে বিজয়ী করবেন ও মুমিনদের চিত্ত প্রশান্ত করবেন।
আর তাদের অন্তরের ক্ষোভ দূর করবেন। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তার প্রতি ক্ষমাপরায়ণ হন, আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।”(৯:১৪)।যেহেতু এটাও ছিল যে, জিহাদে মুমিনও শহীদ হয় সেই হেতু আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তিনি কখনো তাদের কর্ম বিনষ্ট হতে দেন না। বরং তাদেরকে তিনি খুব বেশী বেশী করে পুণ্য দান করেন। কেউ কেউ তো কিয়ামত পর্যন্ত পুণ্য লাভ করতে থাকে।হযরত কায়েস আল জুযামী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “শহীদকে ছয়টি ইনআ’ম দেয়া হয়। (এক) তার রক্তের প্রথম ফোটা মাটিতে পড়া মাত্রই তার সমস্ত গুনাহ মাফ হয়ে যায়।
(দুই) তাকে তার জান্নাতের স্থান দেখানো হয়। (তিন) সুন্দরী, বড় বড় চক্ষু বিশিষ্টা হুরদের সঙ্গে তার বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়। (চার) সে ভীতি-বিহ্বলতা হতে নিরাপত্তা লাভ করে। (পাঁচ) তাকে কবরের শাস্তি হতে বাচিয়ে নেয়া হয়। (ছয়) তাকে ঈমানের অলংকার দ্বারা ভূষিত করা হয়।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)অন্য একটি হাদীসে আছে যে, তার মাথার উপর সম্মানের মুকুট পরানো হবে যাতে মণি-মুক্তা বসানো থাকবে, যার একটি ইয়াকূত ও মুক্তা সারা দুনিয়া এবং ওর সমুদয় জিনিস হতে মূল্যবান হবে। সে বাহাত্তরটি আয়ত নয়না হ্র লাভ করবে। আর সে তার বংশের সত্তরজন লোকের জন্যে সুপারিশ করার অনুমতি লাভ করবে এবং তার সুপারিশ কবূল করা হবে।' (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) ও ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আৰূ কাতাদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঋণ ছাড়া শহীদের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।” (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)শহীদদের মর্যাদা সম্বলিত আরো বহু হাদীস রয়েছে।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ তিনি তাদেরকে সৎ পথে পরিচালিত করেন।
অর্থাৎ তিনি তাদেরকে জান্নাতের পথে পরিচালিত করে থাকেন। যেমন আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম সম্পাদন করেছে, তাদের ঈমানের কারণে তাদের প্রতিপালক তাদেরকে জান্নাতের পথে পরিচালিত করবেন, যেগুলো হবে সুখময় এবং যেগুলোর পাদদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত হবে।” (১০:৯)অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ আল্লাহ তাদের অবস্থা ভাল ও সুন্দর করবেন। তিনি তাদেরকে দাখিল করবেন জানাতে যার কথা তিনি তাদেরকে জানিয়েছিলেন। অর্থাৎ জান্নাতবাসী প্রত্যেকটি লোক নিজের ঘর ও জায়গা এমনভাবে চিনতে পারবে যেমনভাবে দুনিয়ায় নিজের বাড়ী ও জায়গা চিনতো।
কাউকেও জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন হবে না। তাদের মনে হবে যে, পূর্ব হতেই যেন তারা সেখানে অবস্থান করছে।মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে যে, দুনিয়ায় মানুষের সাথে তার আমলের যে রক্ষক ফেরেশতা রয়েছেন তিনিই তার আগে আগে চলবেন। যখন ঐ জান্নাতবাসী তার জায়গায় পৌঁছে যাবে তখন সে নিজেই চিনে নিয়ে বলবেঃ “এটাই আমার জায়গা।” অতঃপর যখন সে নিজের জায়গায় চলাফেরা করতে শুরু করবে এবং এদিক ওদিক ঘুরতে থাকবে তখন ঐ রক্ষক ফেরেশতা সেখান হতে সরে পড়বেন এবং সে তখন নিজের ভোগ্যবস্তু উপভোগে মগ্ন হয়ে পড়বে। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন মুমিনরা জাহান্নাম হতে মুক্তি পেয়ে যাবে তখন তাদেরকে জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝে অবস্থিত এক সেতুর উপর আটক করা হবে এবং দুনিয়ায় তারা একে অপরের উপর যে যুলুম করেছিল তার প্রতিশোধ নিয়ে নেয়া হবে।
অতঃপর যখন তারা সম্পূর্ণরূপে পাক সাফ হয়ে যাবে তখন তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হবে। আল্লাহর শপথ! যেমন তোমাদের প্রত্যেকেই তার এই পার্থিব ঘরের পথ চিনতে পারে তার চেয়ে বেশী তারা জান্নাতে তাদের ঘর ও স্থান চিনতে পারবে।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) তাঁর সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে মুমিনরা! যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর, তবে আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের অবস্থান দৃঢ় করবেন। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্যই আল্লাহ ঐ ব্যক্তিকে সাহায্য করবেন যে তাঁকে সাহায্য করবে।”(২২:৪০) কেননা, যেমন আমল হয় তেমনই প্রতিদান দেয়া হয়।
আর আল্লাহ এরূপ লোকের অবস্থানও দৃঢ় করে থাকেন। যেমন হাদীসে এসেছেঃ “যে ব্যক্তি কোন সম্রাটের কাছে কোন ব্যক্তির এমন কোন প্রয়োজনের কথা পৌঁছিয়ে দেয় যা ঐ ব্যক্তি নিজে পৌঁছাতে সক্ষম নয়, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন পুলসিরাতের উপর ঐ ব্যক্তির পদদ্বয়কে দৃঢ় করবেন।”এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ যারা কুফরী করেছে তাদের জন্যে রয়েছে দুর্ভোগ। অর্থাৎ মুমিনদের বিপরীত অবস্থা হবে কাফিরদের। সেখানে তাদের পদস্খলন ঘটবে। হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দীনার, দিরহাম ও কাপড়ের দাসেরা ধ্বংস হয়ে গেছে। সে যদি রুগ্ন হয়ে পড়ে তবে আল্লাহ যেন তাকে রোগমুক্ত না করেন।”আল্লাহ তাআলা তাদের আমল ব্যর্থ করে দিবেন।
কেননা, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তা তারা অপছন্দ করে। না তারা এর সম্মান করে, না এটা মানার তাদের ইচ্ছা আছে। সুতরাং আল্লাহ তাদের কর্ম নিষ্ফল করে দিবেন।
আয়াত ৫
47:4
আয়াত ৬
47:4
আয়াত ৭
47:4
আয়াত ৮
47:4
আয়াত ৯
47:4
আয়াত ১০
১০-১৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যারা আল্লাহর শরীক স্থাপন করে এবং তাঁর রাসল (সঃ)-কে অবিশ্বাস করে তারা কি ভূ-পৃষ্ঠে ভ্রমণ করেনি? করলে তারা জানতে পারতো এবং স্বচক্ষে দেখে নিতো যে, তাদের পূর্বে যারা তাদের মত ছিল তাদের পরিণাম হয়েছিল খুবই মারাত্মক। তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়ে তাদের নাম ও নিশানা মিটিয়ে দেয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে শুধু মুসলমান ও মুমিনরাই পরিত্রাণ পেয়েছিল। কাফিরদের জন্যে এরূপই শাস্তি এসে থাকে।মহান আল্লাহর উক্তিঃ ‘এটা এই জন্যে যে, আল্লাহ মুমিনদের অভিভাবক এবং কাফিরদের কোন অভিভাবক নেই। এ জন্যেই উহুদের যুদ্ধের দিন মুশরিকদের সরদার আবু সুফিয়ান সাখর ইবনে হারব যখন গর্বভরে নবী (সঃ) ও তাঁর দু’জন খলীফা (রাঃ) সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলো, কিন্তু কোন উত্তর পায়নি তখন বলেছিলোঃ “এরা সবাই ধ্বংস হয়ে গেছে।” তখন হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) জবাব দিলেনঃ “হে আল্লাহর শত্রু!
তুমি মিথ্যা বললে। যাদের বেঁচে থাকা তোমার দেহে কাঁটার মত বিধছে তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা তোমার জন্যে বাঁচিয়ে রেখেছেন।” আবু সুফিয়ান (রাঃ) তখন বললোঃ “জেনে রেখো যে, এটা বদরের প্রতিশোধের দিন। আর যুদ্ধ তো বালতির মত (কখনো এই হাতে এবং কখনো ঐ হাতে)। তোমরা তোমাদের নিহতদের মধ্যে কতকগুলোকে নাক, কান ইত্যাদি কর্তিত অবস্থায় পাবে। আমি এরূপ করার হুকুম জারী করিনি, তবে এতে আমি অসন্তুষ্ট নই।” অতঃপর সে গর্ববোধক কবিতা পাঠ করতে শুরু করে। সে বলেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের হুবুল' দেবতা সমুন্নত হোক।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে (রাঃ) বলেনঃ “তোমরা উত্তর দিচ্ছ না কেন?” তারা তখন বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)!
আমরা কি বলবো?” তিনি জবাবে বললেনঃ “তোমরা বল, (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ অতি উচ্চ ও মহাসম্মানিত।” আবু সুফিয়ান (রাঃ) আবার বললঃ (আরবী) এই অর্থাৎ “আমাদের উম্ (দেবতা) রয়েছে এবং তোমাদের উ নেই।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ফরমান অনুযায়ী সাহাবীগণ (রাঃ)-এর জবাবে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ আমাদের অভিভাবক এবং তোমাদের কোন অভিভাবকনেই।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ খবর দিচ্ছেন যে, যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তারা কিয়ামতের দিন জান্নাতে প্রবেশ করবে যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। পক্ষান্তরে যারা কুফরী করে ও ভোগ-বিলাসে মগ্ন থাকে তাদের জীবনের উদ্দেশ্য শুধু পানাহার ও পেট পূরণ করা।
তারা জন্তু-জানোয়ারের মত উদরপূর্তি করে। অর্থাৎ জন্তু-জানোয়ার যেমন মুখের সামনে যা পায় তা-ই খায়, অনুরূপভাবে এ লোকগুলোও হারাম হালালের কোন ধার ধারে না। পেট পূর্ণ হলেই হলো। তাদের জীবনের উদ্দেশ্য শুধু এটাই। তাদের নিবাস হলো জাহান্নাম। সহীহ হাদীসে এসেছে যে, মু'মিন খায় একটি পাকস্থলীতে এবং কাফির খায় সাতটি পাকস্থলীতে। তাই তাদের কুফরীর প্রতিফল হিসেবে তাদের বাসস্থান হবে জাহান্নাম।এরপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ মক্কার কাফিরদেরকে ধমকের সূরে বলছেন যে, তারা তাঁর নবী (সঃ)-কে তাঁর যে জনপদ হতে বিতাড়িত করেছে তা অপেক্ষা অতি শক্তিশালী কত জনপদ ছিল, ওগুলোর অধিবাসীদেরকে আল্লাহ তাআলা ধ্বংস করে দিয়েছিলেন।
কেননা, এদের মত তারাও তাঁর নবীদেরকে (আঃ) অবিশ্বাস করেছিল এবং তাঁর আদেশ নিষেধের বিরুদ্ধাচরণ করেছিল। সুতরাং এরা যে আল্লাহর প্রিয় রাসূল (সঃ)-কে অবিশ্বাস করছে এবং তাঁকে বিভিন্ন প্রকারের কষ্ট দিচ্ছে, এদের পরিণাম কি হতে পারে? এই নবী (সঃ) তো সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী! এটা স্বীকার করে নেয়া যেতে পারে যে, এই বিশ্বশান্তির দূত (সঃ)-এর কল্যাণময় অস্তিত্বের কারণে পার্থিব শাস্তি হয় তো এদের উপর আসবে না, কি পারলৌকিক ভীষণ শাস্তি হতে এরা কোনক্রমেই রক্ষা পেতে পারে না।যখন মক্কাবাসী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তাঁর প্রিয় জন্মভূমি হতে বিতাড়িত করে এবং তিনি গুহায় এসে আত্মগোপন করেন, ঐ সময় তিনি মক্কার দিকে মুখ করে বলেনঃ “হে মক্কা!
তুমি সমস্ত শহর হতে আল্লাহ তা'আলার নিকট অত্যধিক প্রিয় এবং অনুরূপভাবে আমার নিকটও তুমি সমস্ত শহর হতে অত্যন্ত প্রিয়। যদি মুশরিকরা আমাকে তোমার মধ্য হতে বের করে না দিতো তবে আমি কখনো তোমার মধ্য হতে বের হতাম না। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) সুতরাং যারা সীমালংঘনকারী, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় সীমালংঘনকারী হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে আল্লাহর সীমালংঘন করে, অথবা নিজের হন্তা ছাড়া অন্যকে হত্যা করে কিংবা অজ্ঞতা যুগের গোঁড়ামির উপর থেকে হত্যাকার্য চালিয়ে যায়। অতঃপর আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-এর উপর ... (আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ করেন।
আয়াত ১১
47:10
আয়াত ১২
47:10
আয়াত ১৩
47:10
আয়াত ১৪
১৪-১৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর দ্বীনে বিশ্বাসের সোপান পর্যন্ত পৌঁছে যাবে, যে অন্তর্চক্ষু লাভ করেছে, যার মধ্যে বিশুদ্ধ প্রকৃতির সাথে সাথে হিদায়াত ও ইলমও রয়েছে সেই ব্যক্তি কি ঐ ব্যক্তির সমান যে দুষ্কর্মকে সৎকর্ম মনে করে নিয়েছে এবং নিজের কু-প্রবৃত্তির পিছনে পড়ে রয়েছে? এই দুই ব্যক্তি কখনো সমান হতে পারে না। আল্লাহ পাকের এ উক্তিটি তার নিম্নের উক্তিগুলোর মতইঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ)! তোমার উপর তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে যা অবতীর্ণ হয়েছে এটাকে যে সত্য বলে জানে সে কি অন্ধের মত?”(১৩:১৯) অর্থাৎ সে ও অন্ধ কখনো সমান হতে পারে না।
আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “জাহান্নামের অধিবাসী ও জান্নাতের অধিবাসী সমান নয়। জান্নাতবাসীরাই সফলকাম।”(৫৯:২০) এরপর মহান আল্লাহ জান্নাতের গুণাবলী বর্ণনা করছেন যে, তাতে পানির প্রস্রবণ রয়েছে, যা কখনো নষ্ট হয় না এবং তাতে কোন পরিবর্তনও আসে না। এ পানি কখনো পচে দুর্গন্ধময় হয় না। এটা অত্যন্ত নির্মল পানি। মুক্তার মত স্বচ্ছ ও পরিষ্কার। এতে কোন খড়কুটা পড়ে না।হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, জান্নাতী নদীগুলো মেশক বা মৃগনাভির পাহাড় হতে প্রবাহিত হয়। জান্নাতে পানি ছাড়া দুধের নহরও রয়েছে, যার স্বাদ কখনো পরিবর্তন হয় না। খুবই সাদা ও খুবই মিষ্ট।
অত্যন্ত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। একটি মারফু হাদীসে আছে যে, এটা জন্তুর স্তনের দুধ নয়, বরং কুদরতী দুধ। আর তাতে রয়েছে সুস্বাদু সুরার নহর। এটা পানে মনে তৃপ্তি আসে এবং মস্তিষ্ক ঠাণ্ডা হয়। এ সুরা দুর্গন্ধময়ও নয় এবং তিক্তও নয়। এটা দেখতেও খারাপ নয়। বরং দেখতে অত্যন্ত সুন্দর। এটা পানেও সুস্বাদু এবং অতি সুগন্ধময়। এটা পানে জ্ঞানও লোপ পাবে না এবং মস্তিষ্ক বিকৃতও হবে না। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাতে ক্ষতিকর কিছুই থাকবে না এবং তাতে তারা মাতালও হবে ।”(৩৭:৪৭) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই সুরা পানে তাদের শিরঃপীড়া হবে না, তারা জ্ঞান হারাও হবে।” (৫৬:১৯) আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “শুভ্র উজ্জ্বল যা হবে পানকারীদের জন্যে সুস্বাদু।”(৩৭:৪৬) মার’ হাদীসে এসেছে যে, ঐ সুরা মানুষের হাতের নিংড়ানো নির্যাস নয়, বরং ওটা আল্লাহর হুকুমে তৈরী।
ওটা সুস্বাদু ও সুদৃশ্য। আর জান্নাতে আছে পরিশোধিত মধুর নহর, যা সুগন্ধময় ও অতি সুস্বাদু। মারফু হাদীসে এসেছে যে, এটা মধুমক্ষিকার পেট হতে বহির্ভূত নয়।হযরত হাকীম ইবনে মুআবিয়া (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, তাঁর পিতা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “জান্নাতে দুধ, পানি, মধু ও সুরার সমুদ্র রয়েছে। এগুলো হতে এসবের নহর ও ঝরণা প্রবাহিত হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে কায়েস (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এই নহরগুলো জান্নাতে আদন হতে বের হয়, 'তারপর একটি হাউযে আসে এবং সেখান হতে অন্যান্য নহরগুলোর মাধ্যমে সমস্ত জান্নাতে যায়।”সহীহ হাদীসে রয়েছেঃ “তোমরা আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা করলে ফিরদাউস জান্নাতের জন্যে প্রার্থনা করো।
এটা সর্বাপেক্ষা উত্তম ও সর্বোচ্চ জান্নাত। ওটা হতেই জান্নাতের নহরগুলো প্রবাহিত হয়ে থাকে এবং ওর উপর রহমানের (আল্লাহর) আরশ রয়েছে।”হযরত লাকীত ইবনে আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি প্রতিনিধি হিসেবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! জান্নাতে কি রয়েছে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “জান্নাতে আছে পরিষ্কার ও পরিশোধিত মধুর নহর, শিরঃপীড়া হবে না ও জ্ঞান লোপ পাবে না এমন সুরার নহর, অপরিবর্তনীয় স্বাদ বিশিষ্ট দুধের নহর, নির্মল পানির নহর, বিবিধ ফলমূল এবং পবিত্র সহধর্মিণী।” হযরত লাকীত ইবনে আমির পুনরায় জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)!
সেখানে আমাদের জন্যে কি সতী স্ত্রীরা রয়েছে?” জবাবে তিনি বলেনঃ “সৎ পুরুষরা সতী নারী লাভ করবে। দুনিয়ার উপভোগের মত সেখানে তারা তাদেরকে উপভোগ করবে, তবে সেখানে ছেলে মেয়ে জন্মগ্রহণ করবে না।” (এ হাদীসটি হাফিয আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) বলেনঃ “তোমরা হয়তো ধারণা করছো যে, জান্নাতের নহরগুলো পৃথিবীর নহরের মত খননকৃত যমীনে বা গর্তে প্রবাহিত হচ্ছে, কিন্তু তা নয়। আল্লাহর কসম! ওগুলো পরিষ্কার সমতল ভূমির উপর প্রবাহিত হচ্ছে। ওগুলোর ধারে ধারে মণি-মুক্তার তাবু রয়েছে এবং ওর মাটি হলো খাটি মৃগনাভি।" (এটা আবু বকর আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আবিদ দুনিয়া (রঃ) বর্ণনা করেছেন।
আবু বকর ইবনে মিরদুওয়াইও (রঃ) এটা মার রূপে বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ বলেনঃ সেখানে তাদের জন্যে থাকবে বিবিধ ফলমূল। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ অর্থাৎ “সেখানে তারা শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে সর্বপ্রকারের ফলের জন্যে ফরমায়েশ করবে।”(৪৪:৫৫) অন্য একটি আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “উভয় উদ্যানে (জান্নাতে) রয়েছে প্রত্যেক ফল দুই প্রকার।” (৫৫:৫২) এসব নিয়ামতের সাথে সাথে এটা কত বড় নিয়ামত যে, তাদের প্রতিপালক তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তিনি তাদের জন্যে তার ক্ষমাকে বৈধ করেছেন। এখন তাদের কোন ভয় ও চিন্তার কারণ নেই। জান্নাতের এই ধুমধাম ও নিয়ামতরাশির বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা জাহান্নামীদের অবস্থা বর্ণনা করছেন যে, তাদেরকে জাহান্নামে ফুটন্ত পানি পান করতে দেয়া হবে।
পানি তাদের পেটের মধ্যে যাওয়া মাত্রই তাদের নাড়িভূড়ি ছিন্ন-বিছিন্ন করে দিবে। আল্লাহ আমাদেরকে রক্ষা করুন! এই জাহান্নামীরা এবং ঐ জান্নাতীরা কি কখনো সমান হতে পারে? কখনো নয়। কোথায় জান্নাতী আর কোথায় জাহান্নামী! কোথায় নিয়ামত এবং কোথায় যহমত!
আয়াত ১৫
47:14
আয়াত ১৬
১৬-১৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদের মেধাহীনতা, অজ্ঞতা এবং নির্বুদ্ধিতার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তারা মজলিসে বসে আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর কালাম শ্রবণ করা সত্ত্বেও তারা কিছুই বুঝে না। মজলিস শেষে জ্ঞানী সাহাবীদেরকে (রাঃ) তারা জিজ্ঞেস করেঃ “এই মাত্র তিনি কি বললেন?” মহান আল্লাহ বলেন যে, এরা হচ্ছে ওরাই যাদের অন্তর আল্লাহ মোহর করে দিয়েছেন। এরা নিজেদের কু-প্রবৃত্তির পিছনে পড়ে রয়েছে। এদের সঠিক বোধশক্তি এবং সৎ উদ্দেশ্যই নেই।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যারা সৎপথ অবলম্বন করে আল্লাহ তাদের সৎপথে চলার শক্তি বৃদ্ধি করেন এবং তাদেরকে আল্লাহভীরু হবার তাওফীক দান করেন।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ কিয়ামতের লক্ষণ তো এসেই পড়েছে।
অর্থাৎ কিয়ামত যে নিকটবর্তী হয়ে গেছে এর বহু লক্ষণ প্রকাশিত হয়েছে। যেমন অন্য জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা প্রথম ভয় প্রদর্শকদের মধ্য হতে একজন ভয় প্রদর্শক এবং নিকটবর্তী হওয়ার ব্যাপারটি নিকটবর্তী হয়েছে।”(৫৩:৫৬) আর এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “কিয়ামত আসন্ন, চন্দ্র বিদীর্ণ হয়েছে।”(৫৪:১) আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহর আদেশ আসবেই, সুতরাং ওটা ত্বরান্বিত করতে চেয়ো না।” (১৬:১) অন্য এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ মানুষের হিসাব নিকাশের সময় আসন্ন, কিন্তু তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে।”(২১:১) সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দুনিয়ায় রাসূলরূপে আগমন হচ্ছে কিয়ামতের নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি নিদর্শন।
কেননা, তিনি রাসূলদেরকে সমাপ্তকারী। আল্লাহ তা'আলা তার দ্বারা দ্বীনকে পূর্ণ করেছেন এবং স্বীয় মাখলুকের উপর স্বীয় হুজ্জত পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) কিয়ামতের শর্তগুলো এবং নিদর্শনগুলো এমনভাবে বর্ণনা করে দিয়েছেন যে, তার পূর্বে কোন নবী এতো স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেননি। যেমন স্ব-স্ব স্থানে এগুলো বর্ণিত হয়েছে।হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আগমন কিয়ামতের শর্তসমূহের অন্তর্ভুক্ত। এ জন্যেই নবী (সঃ)-এর নাম হাদীসে এরূপ এসেছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তিনি তাওবার নবী, (আরবী) অর্থাৎ লোকদেরকে তাঁর পায়ের উপর একত্রিত করা হবে, (আরবী) অর্থাৎ তার পরে আর কোন নবী আসবেন না।হযরত সাহল ইবনে সা'দ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় মধ্যমা অঙ্গুলি এবং ওর পার্শ্বের অঙ্গুলির প্রতি ইশারা করে বলেনঃ “আমি এবং কিয়ামত এই অঙ্গুলিদ্বয়ের মত (অর্থাৎ এরূপ কাছাকাছি)।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ কিয়ামত এসে পড়লে তারা উপদেশ গ্রহণ করবে কেমন করে!
অর্থাৎ কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাওয়ার পর উপদেশ ও শিক্ষাগ্রহণ বৃথা। যেমন আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন মানুষ উপদেশ গ্রহণ করবে, কিন্তু তখন তার জন্যে উপদেশ গ্রহণের সময় কোথায়?” (৮৯:২৩) অর্থাৎ এই দিনের উপদেশ গ্রহণে কোনই লাভ নেই। আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা ঐ সময় বলবেঃ আমরা এই কুরআনের উপর ঈমান আনলাম, কিন্তু এই দূরবর্তী স্থান হতে এই ক্ষমতা লাভ কি করে হতে পারে?” (৩৪:৫২) অর্থাৎ ঐ সময় তাদের ঈমান আনয়ন লাভজনক নয়।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি জেনে রেখো যে, আল্লাহ তাআলাই সত্য মা’রূদ।
তিনি ছাড়া কোনই মাবুদ নেই। একথা দ্বারা আল্লাহ তা'আলা প্রকৃতপক্ষে স্বীয় একত্ববাদের সংবাদ দিয়েছেন। এর অর্থ এটা নয় যে, আল্লাহ পাক স্বীয় নবী (সঃ)-কে এটা জানার নির্দেশ দিচ্ছেন। এ জন্যেই এর উপর সংযোগ স্থাপন করে বলেনঃ “তুমি তোমার ও মুমিন নর-নারীদের ত্রুটির জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর।' সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমার পাপ, আমার অজ্ঞতা, আমার কাজে আমার সীমালংঘন বা বাড়াবাড়ি, প্রত্যেক ঐ জিনিস যা আপনি আমার চেয়ে বেশী জানেন, এগুলো আপনি ক্ষমা করে দিন! হে আল্লাহ! আপনি আমার অনিচ্ছাকৃত পাপ, ইচ্ছাকৃত পাপ, আমার দোষ-ত্রুটি এবং আমার কামনা-বাসনা ক্ষমা করে দিন!
এগুলো সবই আমার মধ্যে রয়েছে।”সহীহ হাদীসে আরো রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামায শেষে বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমি যেসব গুনাহ পূর্বে করেছি, পরে করেছি, গোপনে করেছি, প্রকাশ্যে করেছি, যা কিছু বাড়াবাড়ি করেছি এবং যা আপনি আমার চেয়ে বেশী জানেন, সবই মাফ করে দিন! আপনিই আমার মা’রূদ, আপনি ছাড়া কোন মা'বুদ নেই।” অন্য সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আমি আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রত্যহ সত্তর বারেরও বেশী তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকি।”হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সারভাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি (একদা) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করি এবং তার সাথে তার খাদ্য হতে ভক্ষণ করি।
তারপর আমি বলিঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন! তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তোমাকেও মাফ করুন।” আমি বললামঃ আমি কি আপনার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবো? তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা, এবং তোমার নিজের জন্যেও করবে।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করলেন। তারপর আমি তার ডান ও বাম স্কন্ধের প্রতি লক্ষ্য করলাম, তখন দেখি যে, একটা জায়গা একটু উঁচু হয়ে রয়েছে, যেন ওটা তিল বা আঁচিল।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ)-এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা (আরবী) পাঠকে নিজেদের জন্যে অবধারিত করে নাও এবং এ দু'টিকে খুব বেশী বেশী পাঠ করো।
কেননা ইবলীস বলেঃ “আমি জনগণকে পাপের দ্বারা ধ্বংস করেছি এবং তারা আমাকে এ দু'টি কালেমা দ্বারা ধ্বংস করেছে। আমি যখন এটা দেখলাম তখন তাদেরকে কু-প্রবৃত্তির পিছনে লাগিয়ে দিলাম। সুতরাং তারা তখন মনে করে যে, তারা হিদায়াতের উপর রয়েছে।” (এ হাদীসটি আবূ ইয়ালা (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য একটি আসারে আছে যে, শয়তান বলেঃ “হে আল্লাহ! আপনার সম্মান ও মর্যাদার শপথ! যতক্ষণ পর্যন্ত কারো দেহে তার আত্মা থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমি তাকে বিভ্রান্ত করতে থাকবো।” তখন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আমিও আমার ইযযত ও জালালের শপথ করে বলছি যে, যতক্ষণ পর্যন্ত সে আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমি তাকে ক্ষমা করতে থকিবো।” ফযীলত সম্বলিত আরো বহু হাদীস রয়েছে।আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “আল্লাহ তোমাদের গতিবিধি এবং অবস্থান সম্বন্ধে সম্যক অবগত আছেন।
যেমন অন্য আয়াতে আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ তিনিই যিনি রাত্রে তোমাদের মৃত্যু ঘটিয়ে দেন এবং দিনে তোমরা যা কিছু কর তা তিনি জানেন।”(৬:৬০) অন্য এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ভূ-পৃষ্ঠে বিচরণকারী সবারই জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহরই; তিনি ওদের স্থায়ী ও অস্থায়ী অবস্থিতি সম্বন্ধে অবহিত; সুস্পষ্ট কিতাবে সবকিছুই আছে।”(১১:৬) ইবনে জুরায়েজ (রঃ)-এর উক্তি এটাই এবং ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা দুনিয়ার গতিবিধি এবং আখিরাতের অবস্থানকে বুঝানো হয়েছে।সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলো আল্লাহ তা'আলা দুনিয়ায় তোমাদের গতিবিধি এবং কবরে তোমাদের অবস্থান সম্বন্ধে সম্যক অবগত আছেন।
তবে প্রথম উক্তিটিই বেশী উত্তম ও প্রকাশমান। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
আয়াত ১৭
47:16
আয়াত ১৮
47:16
আয়াত ১৯
47:16
আয়াত ২০
২০-২৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা মুমিনদের সম্বন্ধে খবর দিচ্ছেন যে, তারা তো জিহাদের হুকুমের আশা-আকাঙ্ক্ষা করে, কিন্তু যখন তিনি জিহাদ ফরয করে দেন ও ওর হুকুম জারী করে দেন তখন অধিকাংশ লোকই পিছনে সরে পড়ে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি কি তাদেরকে দেখোনি যাদেরকে বলা হয়েছিল- তোমরা তোমাদের হস্ত সংবরণ কর, নামায কায়েম কর এবং যাকাত দাও? অতঃপর যখন তাদেরকে যুদ্ধের বিধান দেয়া হলো তখন তাদের একদল মানুষকে ভয় করছিল আল্লাহকে ভয় করার মত অথবা তদপেক্ষা অধিক, এবং বলতে লাগলোঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্যে যুদ্ধের বিধান কেন দিলেন?
আমাদের কিছুদিনের জন্যে অবকাশ দেন না? বলঃ পার্থিব ভোগ সামান্য এবং যে আল্লাহভীরু তার জন্যে পরকালই উত্তম। তোমাদের প্রতি সামান্য পরিমাণও যুলুম করা হবে না।”(৪:৭৭)মহামহিমান্বিত আল্লাহ এখানেও বলেনঃ মুমিনরা তো জিহাদের হুকুম সম্বলিত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করে, কিন্তু মুনাফিকরা যখন এই আয়াতগুলো শুনে তখন তারা মৃত্যুভয়ে বিহ্বল মানুষের মত তাকাতে থাকে। তাদের পরিণাম হবে অত্যন্ত শোচনীয়। এরপর তাদেরকে যোদ্ধা ও বীরপুরুষ হবার উৎসাহ প্রদান করতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেনঃ তাদের জন্যে এটাই খুব ভাল হতো যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর কথা শুনতো, মানতো ও প্রয়োজনের সময় আন্তরিকতার সাথে যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হতো!
অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে সম্ভবতঃ তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে। অর্থাৎ অজ্ঞতার যুগে তোমাদের যে অবস্থা ছিল ঐ অবস্থাই তোমাদের ফিরে আসবে। তাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আল্লাহ এদেরকেই করেন অভিশপ্ত, আর করেন বধির ও দৃষ্টিশক্তিহীন। এর দ্বারা ভূ-পৃষ্ঠে বিপর্যয় সৃষ্টি ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করতে বিশেষভাবে নিষেধ করা হয়েছে এবং ভূ-পৃষ্ঠে শান্তি স্থাপন করার ও আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখার হিদায়াত করেছেন। আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখার অর্থ হলো আত্মীয়-স্বজনের সাথে সদ্ব্যবহার করা এবং তাদের আর্থিক সংকটের সময় তাদের উপকার করা।
এ ব্যাপারে বহু সহীহ ও হাসান হাদীস বর্ণিত আছে।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা তাঁর সমস্ত মাখলুক সৃষ্টি করলেন, অতঃপর যখন তা হতে ফারেগ হলেন তখন আত্মীয়তা উঠে দাঁড়ালো এবং রহমানের (আল্লাহ তা'আলার) কোমর ধরে নিলো (অর্থাৎ আবদারের সুরে ফরিয়াদ করলো)। তখন আল্লাহ বললেনঃ “থামো, কি চাও, বল?” আত্মীয়তা আরয করলোঃ “এই স্থান তার, যে আপনার কাছে আত্মীয়তার সম্পর্কচ্ছেদ হতে রেহাই প্রার্থনাকারী (অর্থাৎ আমি আপনার সামনে দাঁড়িয়ে আপনারই মাধ্যমে সেই কাজ হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, কেউ আমার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে এবং আত্মীয়তার পবিত্রতা বহাল রাখবে না)।
আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “তুমি কি এই কথায় সম্মত আছ যে, যে ব্যক্তি তোমাকে বহাল এবং সমুন্নত রাখবে তার সাথে আমিও সদাচরণ করবো। আর যে তোমাকে ছিন্ন করবে, আমি তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবো?” আত্মীয়তা আরয করলোঃ “হ্যা, আমি সম্মত আছি।” আল্লাহ বললেনঃ “তাহলে তোমার সাথে আমার এ ওয়াদাই রইলো। এ হাদীসটি বর্ণনা করার পর হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “তোমরা যদি চাও তবে ....' (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ কর।" (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সহীহ মুসলিমেও এটা বর্ণিত আছে) অন্য সনদে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বয়ং বলেছিলেনঃ “তোমরা ইচ্ছা করলে (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ কর।” হযরত আবূ বাকরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কোন পাপই এতোটা যোগ্য নয় যে, পাপীকে আল্লাহ তা'আলা খুব শীঘ্র এই দুনিয়াতেই প্রতিফল দিবেন এবং আখিরাতে তার জন্যে শাস্তি জমা করে রাখবেন।
তবে হ্যা, এরূপ দু'টি পাপ রয়েছেঃ (এক) সমসাময়িক নেতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা এবং (দুই) আত্মীয়তার বন্ধনকে ছিন্ন করা।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) ও ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে চায় যে, তার মৃত্যু বিলম্বে হোক এবং জীবিকায় প্রাচুর্য হোক সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখে। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আমর ইবনে শুআয়েব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেছেন যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)!
আমার কতক আত্মীয়-স্বজন রয়েছে, আমি তাদের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখি কিন্তু তারা আমার সাথে তা ছিন্ন করে, আমি তাদের (অপরাধ) ক্ষমা করি কিন্তু তারা আমার প্রতি যুলুম করে, আমি তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করি কিন্তু তারা আমার সাথে দুর্ব্যবহার করে, এমতাবস্থায় আমি কি তাদের হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করবো?" তিনি জবাবে বললেনঃ “না, এরূপ করলে তোমাদের সকলকেই ছেড়ে দেয়া হবে। তুমি বরং তাদের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখবে। আর জেনে রেখো যে, তুমি যতদিন এরূপ করতে থাকবে ততদিন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে সদা-সর্বদা তোমার সাথে সহায়তাকারী থাকবে।" (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আত্মীয়তা আল্লাহ তাআলার আরশের সাথে ঝুলন্ত ৩ আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী নয় যার সাথে তা রক্ষা করা হয়েছে (অর্থাৎ এতে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার বিনিময়ে শুধু তা রক্ষা করা হয়েছে)।
বরং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী হলো ঐ ব্যক্তি, যার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা হয়েছে, আর সে সেই সম্পর্ককে যোজনা করে আত্মীয়তার বন্ধন বহাল রেখেছে।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আত্মীয়তাকে রাখা হবে এমন অবস্থায় যে, ওর হরিণের উরুর মত উরু হবে। ওটা হবে অত্যন্ত পরিষ্কার ও তীক্ষ্ণ বাকশক্তি সম্পন্ন। সুতরাং যে ওকে ছিন্ন করেছে তাকেও ছিন্ন করা (অর্থাৎ আল্লাহর রহমত তার থেকে ছিন্ন করা) হবে এবং যে ওকে যুক্ত রেখেছে তার সাথে আল্লাহর রহমত যুক্ত রাখা হবে।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহর নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি অনুগ্রহকারীদের প্রতি রহমান (আল্লাহ) অনুগ্রহ বর্ষণ করেন।
সুতরাং তোমরা যমীনের অধিবাসীদের প্রতি অনুগ্রহ কর, তাহলে আকাশের মালিক তোমাদের উপর অনুগ্রহ বর্ষণ করবেন। রাহেম' (আত্মীয়তা) শব্দটি (আল্লাহ তা'আলার গুণবাচক) নাম রহমান’ হতে নির্গত। যে ব্যক্তি ওকে যোজনা করে আল্লাহ তার সাথে নিজের রহমত যোজনা করেন, আর যে ওকে ছিন্ন করে তিনি তার হতে নিজের সম্পর্ক ছিন্ন করেন।” (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। জামে তিরমিযীতেও এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ফারিয (রাঃ) হতে বর্ণিত, তাঁর পিতা তার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ)-এর রোগাক্রান্ত অবস্থায় তার নিকট গমন করেন।
তখন হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) তাকে বলেন, আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন যে, মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আমি আল্লাহ, আমি রহমান। আমি রাহেম (আত্মীয়তাকে) সৃষ্টি করেছি এবং রাহেম নামটি আমি আমার রহমান নাম হতে নির্গত করেছি। সুতরাং যে ব্যক্তি আত্মীয়তাকে যোজিত করবে (অর্থাৎ আত্মীয়তার সম্পর্ক বহাল রাখবে) আমি তাকে আমার রহমতের সাথে যোজিত করবো। আর যে ব্যক্তি আত্মীয়তাকে ছিন্ন করবে, আমিও তাকে আমার রহমত হতে বিচ্ছিন্ন করবো।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন।
এ ব্যাপারে আরো বহু হাদীস রয়েছে)হযরত সুলাইমান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “রূহসমূহ শরীরে প্রবেশ করার পূর্বে অর্থাৎ আদিকালে একদল পতাকাধারী সৈন্যের মত ছিল। অতঃপর রূহসমূহকে শরীরের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে বিক্ষিপ্ত করা হয়েছে। সুতরাং যেই রূহসমূহ শরীরে প্রবেশ করানোর পূর্বে পরস্পরের পরিচিত ছিল এখনো তারা পরস্পরের পরিচিত এবং একে অপরের সাথে বন্ধুরে বন্ধনে আবদ্ধ। আর যেই রূহসমূহ ঐ সময় পরস্পর অপরিচিত ছিল তারা এখনো পরস্পরে মতানৈক্য।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন মুখের দাবী বৃদ্ধি পাবে ও আমল কমে যাবে, মৌখিক মিল থাকবে ও অন্তরে শত্রুতা থাকবে এবং আত্মীয়-স্বজনের সাথে দুর্ব্যবহার করা হবে তখন এরূপ লোকের উপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হবে এবং তাদের কর্ণ বধির ও চক্ষু অন্ধ করে দেয়া হবে।
এ সম্পর্কে আরো বহু হাদীস রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
আয়াত ২১
47:20
আয়াত ২২
47:20
আয়াত ২৩
47:20
আয়াত ২৪
২৪-২৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পাক কালামের প্রতি চিন্তা-গবেষণা করার ও তা অনুধাবন করার হিদায়াত করছেন এবং তা হতে বেপরোয়া ভাব দেখাতে ও মুখ ফিরিয়ে নিতে নিষেধ করছেন। তাই তিনি বলেনঃ তবে কি তারা কুরআন সম্বন্ধে অভিনিবেশ সহকারের চিন্তা-গবেষণা করে না? না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ? অর্থাৎ তারা পাক কালাম সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা করবে কি করে? তাদের অন্তর তো তালাবদ্ধ রয়েছে! তাই কোন কালাম তাদের অন্তরে ক্রিয়াশীল হয় না। অন্তরে কালাম পৌঁছলে তো তা ক্রিয়াশীল হবে? অন্তরে তা পৌঁছার পথই তো বন্ধ রয়েছে।হযরত হিশাম ইবনে উরওয়া (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ...
(আরবী)-এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন, তখন ইয়ামনের একজন যুবক বলে ওঠেনঃ “বরং তাদের অন্তরের উপর তো তালা রয়েছে, যে পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা তা খুলে না দেন বা দূর না করেন (সেই পর্যন্ত তাদের অন্তরে আল্লাহর কালাম প্রবেশ করতে পারে না)।” হযরত উমার (রাঃ)-এর অন্তরে যুবকের একথাটি রেখাপাত করে। অতঃপর যখন তিনি খলীফা নির্বাচিত হন তখন হতে ঐ যুবকের নিকট হতে তিনি সাহায্য গ্রহণ করতেন। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আল্লাহ পাক বলেনঃ “যারা নিজেদের নিকট সৎপথ ব্যক্ত হবার পর তা পরিত্যাগ করে, প্রকৃতপক্ষে শয়তান তাদের নিকৃষ্ট কাজ তাদেরকে শোভনীয় রূপে প্রদর্শন করে এবং তাদেরকে মিথ্যা আশা দেয়।
তারা শয়তান কর্তৃক প্রতারিত হয়েছে। এটা হলো মুনাফিকদের অবস্থা। তাদের অন্তরে যা রয়েছে তার বিপরীত তারা বাইরে প্রকাশ করে থাকে। কাফিরদের সাথে মিলেজুলে থাকার উদ্দেশ্যে এবং তাদেরকে নিজের করে নেয়ার লক্ষ্যে অন্তরে তাদের সাথে বাতিলের আনুকূল্য করে তাদেরকে বলেঃ “তোমরা ব্যতিব্যস্ত হয়ো না, আমরা কোন কোন বিষয়ে তোমাদের আনুগত্য করবো।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আল্লাহ তাদের গোপন অভিসন্ধি সম্বন্ধে পূর্ণ ওয়াফিহাল।” অর্থাৎ এই মুনাফিকরা যে গোপনে কাফির ও মুশরিকদের সাথে হাত মিলাচ্ছে, তারা যেন এটা মনে না করে যে, তাদের এই অভিসন্ধি আল্লাহ তাআলার কাছে গোপন থাকছে।
তিনি তো মানুষের ভিতর ও বাইরের কথা সমানভাবেই জানেন। চুপে চুপে অতি গোপনে কথা বললেও তিনি তা শুনে থাকেন। তাঁর জ্ঞানের কোন শেষ নেই।এরপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ “ফেরেশতারা যখন তাদের মুখমণ্ডলে ও পৃষ্ঠদেশে আঘাত করতে করতে প্রাণ হরণ করবে, তখন তাদের দশা কেমন হবে!” যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি তুমি দেখতে, যখন কাফিরদের প্রাণ হরণ করার সময় ফেরেশতারা তাদের মুখমণ্ডলে ও পৃষ্ঠদেশে আঘাত ও প্রহার করবে!”(৮:৫০) আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি তুমি দেখতে, যখন যালিমরা মৃত্যু যাতনায় থাকবে এবং ফেরেশতারা তাদের হস্তগুলো (তাদেরকে মারার জন্যে) প্রসারিত করবে এবং বলবে- বের কর স্বীয় আত্মা।
আজ তোমাদেরকে দেয়া হবে অবমাননাকর শাস্তি, কারণ তোমরা আল্লাহর উপর অন্যায় কথা বলতে এবং তার নিদর্শনাবলী হতে গর্বভরে মুখ ফিরিয়ে নিতে ।”(৬:৯৩) এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা এখানে (আরবী) বলেনঃ “এটা এই জন্যে যে, যা আল্লাহর অসন্তোষ জন্মায় তারা তার অনুসরণ করে এবং তাঁর সন্তুষ্টি লাভের প্রয়াসকে অপ্রিয় গণ্য করে। তিনি এদের কর্ম নিষ্ফল করে দেন।”
আয়াত ২৫
47:24
আয়াত ২৬
47:24
আয়াত ২৭
47:24
আয়াত ২৮
47:24
আয়াত ২৯
২৯-৩১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা বলেনঃ মুনাফিকদের ধারণা এই যে, আল্লাহ পাক তাদের অভিসন্ধি, ষড়যন্ত্র এবং প্রতারণার কথা মুসলমানদের নিকট প্রকাশ করবেন না। কিন্তু তাদের ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। আল্লাহ তাআলা তাদের ষড়যন্ত্র ও প্রতারণা এমনভাবে প্রকাশ করবেন যে, প্রত্যেক জ্ঞানী ব্যক্তি ওগুলো জানতে পারবে এবং তাদের অভ্যন্তরীণ দুক্রিয়া হতে তারা বেঁচে থাকবে। তাদের বহু কিছু অবস্থার কথা সূরায়ে বারাআতে বর্ণিত হয়েছে এবং সেখানে তাদের কপটতাপূর্ণ বহু অভ্যাসের উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি এই সূরার অপর নাম ফাযেহা' বা অপমানকারী রেখে দেয়া হয়েছে।
অর্থাৎ এটা হলো মুনাফিকদেরকে অপমানকারী সূরা ।(আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দের বহুবচন। (আরবী) বলা হয় হিংসা ও শক্রতাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি ইচ্ছা করলে তোমাকে (নবী সঃ-কে) তাদের (মুনাফিকদের) পরিচয় দিতাম। তখন তুমি খোলাখুলিভাবে তাদেরকে জেনে নিতে। কিন্তু আমি এরূপ করিনি। সমস্ত মুনাফিকের পরিচয় আমি প্রদান করিনি, যাতে মাখলুকের উপর তাদের পর্দা পড়ে থাকে। মানুষের কাছে যেন তাদের দোষ ঢাকা থাকে। প্রত্যেকের নিকট যেন তারা লাঞ্ছিত রূপে ধরা না পড়ে। ইসলামী বিষয়গুলো বাহ্যিকতার উপরই বিচার্য। আভ্যন্তরীণ বিষয়ের হিসাব রয়েছে মহান আল্লাহর কাছে।
তিনি প্রকাশ্য ও গোপনীয় সবকিছুই জানেন। তবে মুনাফিকদেরকে তাদের কথা বলার ধরন দেখে চেনা যাবে।আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি মনের মধ্যে কোন কিছু গোপন রাখে, আল্লাহ তা'আলা তার মুখমণ্ডলে ও কথায় তা প্রকাশ করে দেন। অর্থাৎ তার চেহারায় ও কথাবার্তায় তা প্রকাশ পেয়ে যায়।” হাদীসে এসেছেঃ “যে ব্যক্তি কোন রহস্য গোপন রাখে, আল্লাহ তা'আলা তা প্রকাশ করে দেন, ভাল হলে ভাল এবং মন্দ হলে মন্দ।” মানুষের কাজে, কথায় ও বিশ্বাসে যে কপটতা প্রকাশ পায় তা আমরা সহীহ বুখারীর শরাহর প্রারম্ভে পূর্ণভাবে বর্ণনা করেছি। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন।
হাদীসে মুনাফিকদের একটি দলকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। হযরত উকবা ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের মধ্যে ভাষণ দান করেন। আল্লাহ তাআলার হামদ ও সানার পর তিনি বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে কতক লোক মুনাফিক রয়েছে। আমি যাদের নাম নিবো তারা যেন দাঁড়িয়ে যায়।” অতঃপর তিনি বলেনঃ “হে অমুক ব্যক্তি! তুমি দাঁড়াও, হে অমুক লোক! তুমি দাঁড়িয়ে যাও।” শেষ পর্যন্ত তিনি ছত্রিশটি লোকের নাম নিলেন। তারপর বললেনঃ “তোমাদের মধ্যে অথবা তোমাদের মধ্য হতে কতক মুনাফিক রয়েছে, সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর।” এরপরে এই লোকদের মধ্যে একজনের সামনে দিয়ে হযরত উমার (রাঃ) গমন করেন।
ঐ সময় লোকটি কাপড় দিয়ে তার মুখ ঢেকে রেখেছিল। হযরত উমার (রাঃ) লোকটিকে খুব ভালরূপে চিনতেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ব্যাপার কি?” উত্তরে সে উপরোক্ত হাদীসটি বর্ণনা করলো। তখন হযরত উমার (রাঃ) তাকে বললেনঃ “সারা দিন তোমার জন্যে দুর্ভোগ (অর্থাৎ তুমি ধ্বংস হও)।" (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ আমি হুকুম আহকাম দিয়ে বাধা-বিঘ্ন সৃষ্টি করে তোমাদেরকে পূর্ণরূপে পরীক্ষা করবো এবং এভাবে জেনে নিবো যে, তোমাদের মধ্যে আল্লাহর পথে জিহাদকারী কারা এবং ধৈর্যশীল কারা? আমি তোমাদের অবস্থা পরীক্ষা করতে চাই।সমস্ত মুসলমান তো এটা জানে যে, অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা আল্লাহ প্রত্যেক জিনিস এবং প্রত্যেক মানুষ ও তার আমল প্রকাশিত হবার পূর্বেই ওগুলো সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল।
তাহলে এখানে তিনি জেনে নিবেন’ এর ভাবার্থ হলোঃ তিনি তা দুনিয়ার সামনে খুলে দিবেন এবং ঐ অবস্থা দেখবেন ও দেখাবেন। এজন্যেই হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এরূপ স্থলে -এর অর্থ করতেন অর্থাৎ যাতে আমি দেখে নিই।
আয়াত ৩০
47:29
আয়াত ৩১
47:29
আয়াত ৩২
৩২-৩৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, যারা কুফরী করে, মানুষকে আল্লাহর পথ হতে নিবৃত্ত করে এবং নিজেদের নিকট পথের দিশা ব্যক্ত হবার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিরোধিতা করে, তারা আল্লাহ তাআলার কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। তারা নিজেদেরই ক্ষতি সাধন করছে। কাল কিয়ামতের দিন তারা হবে শূন্যহস্ত, একটিও পুণ্য তাদের কাছে থাকবে না। যেমন পুণ্য পাপকে সরিয়ে দেয়, অনুরূপভাবে তাদের পাপকর্ম পুণ্যকর্মগুলোকে বিনষ্ট করে দিবে।ইমাম আহমাদ ইবনে নসর আল মারূযী (রঃ) কিতাবুস সলাত’ এর মধ্যে বর্ণনা করেছেনঃ সাহাবীদের (রাঃ) ধারণা ছিল যে, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এর সাথে কোন গুনাহ ক্ষতিকারক নয় যেমন শিরকের সাথে কোন পুণ্য উপকারী।
নয়। তখন (আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। এতে সাহাবীগণ (রাঃ) ভীত হয়ে পড়েন যে, না জানি হয় তো পাপকর্ম পুণ্যকর্মকে বিনষ্ট করে ফেলবে। অন্য সনদে বর্ণিত আছেঃ সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ)-এর ধারণা ছিল যে, প্রত্যেক পুণ্যকর্ম নিশ্চিতরূপে গৃহীত হয়ে থাকে। অবশেষে যখন (আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ হয় তখন তারা বলেনঃ “আমাদের পূণ্যকর্ম বিনষ্টকারী হচ্ছে গুনাহ কবীরা ও পাপকর্ম।” তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী) (৪:১১৬)-এই আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। সাহাবীগণ তখন এ ব্যাপারে কোন কথা বলা হতে বিরত থাকেন এবং যারা কবীরা গুনাহতে লিপ্ত থাকে তাদের সম্পর্কে তাদের ভয় থাকতো।
আর যারা এর থেকে বেঁচে থাকেন তাঁদের ব্যাপারে তাঁরা ছিলেন আশাবাদী।এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তার ঈমানদার বান্দাদেরকে তাঁর এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্যের নির্দেশ দিচ্ছেন যা তাদের জন্যে দুনিয়া ও আখিরাতের সৌভাগ্যের জিনিস। অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ যারা কুফরী করে ও আল্লাহর পথ হতে মানুষকে নিবৃত্ত করে, তারপর কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহ তাদেরকে কিছুতেই ক্ষমা করবেন না। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করলে তিনি এ পাপ কখনো ক্ষমা করবেন না এবং এ পাপ ছাড়া অন্য পাপে লিপ্ত ব্যক্তিদের তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন।”(৪:১১৬)।
অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “তোমরা তোমাদের শত্রুদের মুকাবিলায় হীনবল হয়ো না ও কাপুরুষতা প্রদর্শন করো না এবং তাদের কাছে সন্ধির প্রস্তাব করো না। তোমরা তো প্রবল। আল্লাহ তোমাদের সঙ্গে আছেন। তিনি তোমাদের কর্মফল কখনো ক্ষুন্ন করবেন না।” তবে হ্যা, কাফিররা যখন শক্তিতে, সংখ্যায় ও অস্ত্রে-শস্ত্রে প্রবল হবে তখন যদি মুসলমানদের নেতা সন্ধি করার মধ্যেই কল্যাণ বুঝতে পারেন তবে এমতাবস্থায় কাফিরদের নিকট সন্ধির প্রস্তাব উত্থাপন করা জায়েয। যেমন হুদায়বিয়াতে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) করেছিলেন। যখন মুশরিকরা সাহাবীবর্গসহ তাকে মক্কায় প্রবেশে বাধা দেয় তখন তিনি তাদের সাথে দশ বছর পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধ রাখার ও সন্ধি প্রতিষ্ঠিত রাখার চুক্তি করেন।
এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ মুমিনদেরকে বড় সুসংবাদ শুনাচ্ছেনঃ আল্লাহ তোমাদের সঙ্গে রয়েছেন, সুতরাং সাহায্য ও বিজয় তোমাদেরই জন্যে। তোমরা এটা বিশ্বাস রাখো যে, তোমাদের ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতম পুণ্যকর্মও বিনষ্ট করা হবে , বরং ওর পূর্ণ প্রতিদান তোমাদেরকে প্রদান করা হবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
আয়াত ৩৩
47:32
আয়াত ৩৪
47:32
আয়াত ৩৫
47:32
আয়াত ৩৬
৩৬-৩৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা দুনিয়ার তুচ্ছতা, হীনতা ও স্বল্পতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন যে, পার্থিব জীবন ক্রীড়া-কৌতুক ও খেল-তামাশা ছাড়া কিছুই নয়, তবে যে কাজ আল্লাহর জন্যে করা হয় তা-ই শুধু বাকী থাকে। আল্লাহ তা'আলা যে বান্দার মোটেই মুখাপেক্ষী নন তার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেনঃ তোমাদের ভাল কর্মের সুফল তোমরাই লাভ করবে, তিনি তোমাদের ধন-মালের প্রত্যাশী নন। তিনি তোমাদের উপর যাকাত ফরয করেছেন এই কারণে যে, যাতে ওর মাধ্যমে গরীব-দুঃখীরা লালিত-পালিত হতে পারে। আর এর মাধ্যমে তোমরাও যাতে পরকালের পুণ্য সঞ্চয় করতে পার।
এরপর মহান আল্লাহ মানুষের কার্পণ্য এবং কার্পণ্যের পর অন্তরের হিংসা প্রকাশিত হওয়ার অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ ধন-সম্পদ বের করার ব্যাপারে এটা তো হয়েই থাকে যে, ওটা মানুষের নিকট খুবই প্রিয় হয় এবং তা বের করতে তার কাছে খুবই কঠিন ঠেকে।অতঃপর কৃপণদের কার্পণ্যের কুফল বর্ণনা করা হচ্ছে যে, আল্লাহর পথে ধন-সম্পদ খরচ করা হতে বিরত থাকলে প্রকৃতপক্ষে নিজেরই ক্ষতি সাধন করা হয়। কেননা, যারা আল্লাহর পথে ব্যয় করতে কার্পণ্য করে, এই কৃপণতার শাস্তি তাদেরকেই ভোগ করতে হবে। আর দান-খয়রাতের ফযীলত এবং ওর পুরস্কার হতেও তারা বঞ্চিত থাকবে। আল্লাহ তা'আলা সম্পূর্ণরূপে অভাবমুক্ত এবং মানুষ অভাবগ্রস্ত আর তারা তাঁর চরম মুখাপেক্ষী।
অভাবমুক্ত ও অমুখাপেক্ষী হওয়া আল্লাহ তা'আলার অপরিহার্য গুণ এবং অভাবগ্রস্ত ও মুখাপেক্ষী হওয়া মাখলুক বা সৃষ্টজীবের অপরিহার্য গুণ। ঐ গুণ আল্লাহ তা'আলা হতে কখনো পৃথক হবে না এবং এই গুণ মাখলূক হতে কখনো পৃথক হবে না।মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ তোমরা যদি শরীয়ত মেনে চলতে অস্বীকার কর তবে আল্লাহ তা'আলা তোমাদের স্থলে অন্য জাতিকে আনয়ন করবেন, যারা তোমাদের মত (অবাধ্য) হবে না। তারা শরীয়তকে পূর্ণভাবে মেনে চলবে। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা (আরবী) -এই আয়াতটি পাঠ করেন, তখন সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)!
যাদেরকে আমাদের স্থলবর্তী করা হতো তারা কোন জাতি হতো?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সালমান ফারেসীর (রাঃ) স্কন্ধে হস্ত রেখে বলেনঃ “এ ব্যক্তি এবং এর কওম। দ্বীন যদি সুরাইয়ার (সপ্তর্ষিমণ্ডলস্থ নক্ষত্রের) নিকটেও থাকতো তবুও পারস্যের লোকেরা ওটা নিয়ে আসতো।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) ও ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন খালিদ যনজী নামক এর একজন বর্ণনাকারীর ব্যাপারে কোন কোন ইমাম কিছু সমালোচনা করেছেন)
আয়াত ৩৭
47:36
আয়াত ৩৮
47:36
