বাংলায় আর্য-ব্রাহ্মণ্যের আগমন ও প্রভাবের ইতিহাস – পর্ব ২
এই সিরিজটি নীহাররঞ্জন রায় এর “বাঙ্গালীর ইতিহাস – আদি পর্ব” গ্রন্থটির বিভিন্ন অংশকে নিজের মত করে সাজিয়ে সেই গ্রন্থটিকেই প্রাথমিক সূত্র ধরে লেখা হয়েছে। এই লেখার ভেতরেই প্রাসঙ্গিক সূত্রগুলো দেয়া হয়েছে। যারা সেই গ্রন্থটি কাভার-টু-কাভার পাঠ করেছেন, তাদের এই সিরিজটি অনুস্মরণ করার প্রয়োজন নেই।
স্কুলে পড়ার সময় হিন্দুধর্ম শিক্ষার বইগুলোতে যা যা পড়তাম সেগুলো মূলত ছিল বৈদিক ও পৌরাণিক ধারারই ধর্মভিত্তিক। কিন্তু আমাদের সমাজে হিন্দু ছেলেমেয়েরা ছোটবেলা থেকে যে ধর্মীয় সংস্কৃতিতে বড় হয় তার খুব কমই হিন্দুধর্ম শিক্ষার গ্রন্থগুলোতে থাকত। আমার বাসায় ধর্মকর্মের কিছুই ছিল না, কিন্তু আশেপাশে হিন্দু ধর্মীয় যে আচার অনুষ্ঠান দেখতাম তার প্রায় কিছুই হিন্দুধর্ম শিক্ষার বইতে ছিল না। তখনও বুঝতাম না যে বাংলার ধর্মীয় সংস্কৃতির সাথে সেই বইতে বর্ণিত সংস্কৃতির একটা বড় ব্যবধান আছে। স্বভাবতই এগুলো পড়ার সময় ছাত্রছাত্রীরা একরকম এলিয়েনেটেড বা বিচ্ছিন্ন বোধ করত, কারণ সমাজে যা দেখা যাচ্ছে আর বইতে যা পড়া হচ্ছে তার মধ্যে ব্যবধান প্রচুর। তবে যারা এই ধর্ম শিক্ষা বইটির পাঠক্রম তৈরি করেছিলেন তাদেরই বা কী করার ছিল? সমাজে যে ধর্মীয় সংস্কৃতির বিষয়গুলো তারা বারবার দেখতো সেগুলোর অনেক কিছুর সাথেই তো নীতি নৈতিকতার সম্পর্ক নেই। এই ধর্মীয় আচারগুলো যে সময়কাল থেকে মূলত এসেছে সেই সময় তো নৈতিক ঈশ্বরের ধারণা আসে নি। ধর্মানুষ্ঠানগুলো ছিল মূলত ডক্ট্রিনাল রিচুয়াল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান তৈরি হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু নৈতিক ঈশ্বরের ধারণা তখনও ভালভাবে আসে নি। হ্যাঁ, প্রাক-আর্য বা আর্যপূর্ব যুগেরই ধর্মীয় সংস্কৃতির কথা বলছি। পরবর্তীতে আসা আর্য-ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির প্রভাবেও যেগুলো এখনও পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। বৈদিক ধ্যান ধারণাগুলোর সাথে এগুলোর বিচ্ছিন্নতা তো থাকবেই। বৈষ্ণবাদি ধারার নৈতিক ঈশ্বরের থেকেও বিচ্ছিন্নতা থাকবে। এসব কারণেও হয়তো এসব ধর্মাচার হিন্দুধর্ম শিক্ষায় স্থান পায়নি। প্রজনন এর সাথে সম্পর্কিত ধর্মাচারগুলো নৃতত্ত্বের গ্রন্থে স্থান পেতে পারে, কিন্তু ধর্মশিক্ষা গ্রন্থে কক্ষনো নয়!!!
যাই হোক, প্রাচীন বাঙ্গালীর ধর্মকর্মগত জীবনের সুস্পষ্ট চিত্র তৈরি করা কঠিন। এমনিতে মানুষের ব্যবহারিক জীবনের চেয়ে ধর্মকর্মগত জীবনের অনুসন্ধান করা জটিল, তার উপরে বর্ণ, শ্রেণী ও কোমবিন্যস্ত সমাজে এই জীবন আরও জটিল হয়ে ওঠে। বর্ণ, শ্রেণী ও কোম (বা জাতিগোষ্ঠী) ভেদে ধর্মকর্ম ভাবনা ও সংস্কৃতি ভিন্ন হয়ে থাকে। বিভিন্ন সময়ে একই বিশ্বাস ও একই আচার বা পূজা ভিন্ন ভিন্ন হয়, তা পরিবর্তন হয়। এমনকি একই সময়েও একই বিশ্বাস ও একই আচার বা পূজায়ও সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন হতে পারে। এছাড়া নতুন কোন বিশ্বাস বা সংস্কার বা পূজানুষথান ইত্যাদি সমাজে হুট করেই বিস্তার লাভ করতে পারেনা, এগুলোর পেছনে বহুদিনের ধ্যানধারণা, অভ্যাস ও সংস্কার লুকিয়ে থাকে, আর সমাজের ভেতর ও বাইরে নানান গোষ্ঠী, নানান স্তর ও নানান কোমের ভক্তি-বিশ্বাস-পূজাচার ইত্যাদির মধ্যকার সম্পর্কেরও একটি লম্বা ইতিহাস আত্মগোপন করে থাকে। সময়ের প্রবাহের সাথে সাথে সেই ধর্মবিশ্বাসগুলো সমাজের সমাজ-ভাবনা, সামাজিক চেতনানুযায়ী, সামাজিক শ্রেণী ও স্তর অনুযায়ী নতুন রূপ লাভ করে, বর্তমানেও তাই হয়েছে। কোন শ্রেণীগত বা কোমগত ধর্মবিশ্বাস ও আচার-সংস্কারও একান্তভাবে সেই শ্রেণী বা কোমের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে থাকে না। অন্যান্য শ্রেণী, কোম, স্তর ও উপস্তরের সাথে যোগাযোগের ফলে সেই যোগাযোগের শক্তি ও পরিমাণ অনুযায়ী এক শ্রেণী, কোম, স্তরের ধ্যানধারণা, বিশ্বাস, অনুষ্ঠান ইত্যাদি অন্যগুলোতে প্রবাহিত হয়। সংঘাত সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে বারবার নতুন নতুন ধ্যান-ধারণা, ভক্তি-বিশ্বাস, অনুষ্ঠান-উপচার ইত্যাদি সৃষ্টি হতে থাকে। রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, ব্যাবহারিকদিক থেকে এগিয়ে থাকা শ্রেণী ও গোষ্ঠীগুলো বা ধর্মকর্মগত জীবন অধিকতর সক্রিয় এমন শ্রেণী ও কোমগুলো দ্রুত অন্যদের ধর্মকর্মগত জীবনকে প্রভাবিত করে ও নিজেরাও অন্যদের ধর্মকর্মগত জীবন দ্বারা প্রভাবিত হয়। অনেক সময় এই দুই দিক থেকে প্রভাবই সমান গতিতে চলে ও ঘটতে থাকে সমন্বয়।
ভারতবর্ষে ধর্মগুলো নিয়ে নৃতাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক জ্ঞান যত বেশি গভীর হয়েছে তত জানা গেছে যে আজ যাকে হিন্দুধর্ম বা আর্যব্রাহ্মণ্য ধর্ম বা সনাতন ধর্ম বলা হয় তা আসলে একদিকে আর্য ও অন্যদিকে প্রাক-আর্য বা অনার্য ধর্মকর্মের সমন্বিত রূপ মাত্র। একেবারে বনবাসী হিংস্র প্রিমিটিভ মানুষের গোষ্ঠী থেকে শুরু করে কত যে শ্রেণী, স্তর, অঞ্চলের মানুষের ধর্মকর্ম এই চলমান আর্য-ব্রাহ্মণ্য স্রোতে এসে মিশে গেছে তার ইয়ত্তা নেই। আবার এই আর্য-ব্রাহ্মণ্য স্রোতপ্রবাহে মূল বা যথার্থ আর্য ধর্মকর্মের প্রভাবও কমই। কালে কালে অনেক বিচিত্র সংস্কৃতি এক সাথে মিশে এই ধর্মকর্মের স্রোতধারা তৈরি করেছে। এই সমন্বয় সম্পূর্ণভাবে অচেতন বা আপনাআপনি ছিল না, অনেকের সচেতন অবদানও ছিল। সচেতন সক্রিয়তায় সমন্বয়ের এই কাজটি করেছিলেন আর্য-ব্রাহ্মণ্য ও বৌদ্ধরা, আবার মজার বিষয় হল এরা সমন্বয় যেমন করেছেন, অনেক ক্ষেত্রে বিরোধ বা সংঘাতও করেছেন। কিন্তু প্রাথমিক বিরোধের পর স্বীকৃতি যখন অনিবার্য হয়ে উঠেছিল তখন তারা আর সমন্বয়ের গতি প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণের নায়কত্ব তারা আর অস্বীকার করতে পারেনি। সমন্বয় বা সিনথেসিস যেন প্রকৃতিরও নিয়ম। ইসলামকেও বাংলায় কিছুটা কাল সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল, পরবর্তীতে এটি ভিন্ন দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।
যাই হোক, অন্যদিকে প্রাক-আর্য বা অনার্য আদিবাসীগণ যে বিনা বাধায় বা বিনা বিরোধে আরয বৌদ্ধ বা ব্রাহ্মণ্য ধর্মকর্মের আদর্শ বা অনুষ্ঠানগুলোকে গ্রহণ করেছিলেন বা চলমান প্রবাহে নিজেদের ধারা মিশিয়েছিলেন তাও নয়। মানুষের জৈব প্রকৃতিই হচ্ছে নিজের বিশ্বাস ও সংস্কারকে আঁকড়ে ধরে রাখা, চলমান আর্যপ্রবাহে স্বীকৃতি লাভের পরও অনেক বিশ্বাস, সংস্কার, আচারানুষ্ঠান এই জৈব প্রকৃতির কারণেই নিজেদের বাঁচিয়ে রেখেছিল। কালে কালে এগুলোর কিছু কিছু চলমান প্রবাহে স্বীকৃতি লাভ করে মূলধারায় মিশে গেছে, নাহলে অবিকৃত বা বিবর্তিত হয়ে আছে। আর্য-অনার্যের এই সমন্বয় আজও চলে, আর্য-ব্রাহ্মণ্য ধর্মকর্ম আজও লোকায়ত অনার্য ধর্মকর্মের অনেক আচারানুষ্ঠান, দেবদেবী ধীরে ধীরে নিজের কুক্ষিগত অরছে, কোথায় তাদের চেহাড়ার পরিবর্তন করে করছে, কোথাও অবিকৃত রূপেই করছে। বাংলায় পঞ্চম থেকে অষ্টম শতকে আর্যধর্মের প্রবাহ প্রবলতর হবার সময় থেকেই সমন্বয় ক্রিয়া চলতে আরম্ভ করে।
বাংলার ইতিহাসের আদিপর্বে এই সমন্বয়ের সাক্ষ্য খুব বেশি নেই, কিন্তু তখনকার দিনে এই সমন্বয়টাই ছিল অনেক বড় সত্য। বস্তুত, বাঙ্গালির ধর্মকর্মের গোড়াকার ইতিহাস হচ্ছে রাঢ়-পুণ্ড্র-বঙ্গ ইত্যাদি জনপদগুলোর অসংখ্য জন ও কোমের, এক কথায় বাংলার আদিঈদেরই পূজা, আচার, অনুষ্ঠান, ভয়, বিশ্বাস, সংস্কার ইত্যাদির ইতিহাস। শুধু বাংলা নয়, ভারতবর্ষের সকল অঞ্চলের ধর্মকর্মের বেলাতেই এটা সত্য। এটা সর্বজনস্বীকৃত যে, আর্য-ব্রাহ্মণ্য বা বৌদ্ধ, জৈন ইত্যাদি সম্প্রদায়ের ধর্মকর্ম, শ্রাদ্ধ, বিবাহ, জন্ম, মৃত্যু প্রভৃতি সংক্রান্ত বিশ্বাস, সংস্কার ও আচারানুষ্ঠান, নানা দেবদেবীর রূপ ও কল্পনা, আহার-বিহারে ছোঁয়াছুঁয়ি অনেক কিছুই আমরা নিয়ে সেই আদিবাসীদের কাছ থেকেই। বিশেষ করে হিন্দুর জন্মান্তরবাদ, পরলোক সম্পর্কে ধারণা, প্রেততত্ত্ব, পিতৃতর্পণ, পিণ্ডদান, শ্রাদ্ধাদি সংক্রান্ত অনেক অনুষ্ঠান , আভ্যুদয়িক ইত্যাদির সবই এই আদিবাসীদেরই দান।
বাংলার আদিবাসীরা অন্যান্য আদিবাসীদের মতই বিশেষ বৃক্ষ, পাথর, পাহাড়, ফল, ফুল, পশু, পাখি, বিশেষ বিশেষ স্থান ইত্যাদির উপর দেবত্ব আরোপ করে পূজা করত। এখনও বাংলার আদিবাসীগুলো যেমন খাসিয়া, মুণ্ডা, সাঁওতাল, রাজবংশী, বুনো, শবর ইত্যাদি নৃগোষ্ঠীর লোকেরা তাই করে থাকে। বাংলায় হিন্দু ব্রাহ্মণ্য সমাজের মেয়েদের মধ্যে বিশেষত পাড়াগাঁয়ে গাছপূজা অনেক বেশি মাত্রায় প্রচলিত। বিশেষ করে তুলসী গাছ, সেওড়া গাছ ও বট গাছের পূজা বেশি দেখা যায়। অনেক হিন্দু বাড়িতেই তুলসী গাছ দেখা যায়, আর নিয়মিত সেগুলোকে পূজা করা হয়। অনেক পূজায় ও ব্রতোৎসবে গাছের একটা ডাল এনে পুঁতে দেয়া হয়, আর ব্রাহ্মণ্যধর্মস্বীকৃত দেবদেবীর সাথে সেই গাছটিরও পূজা হয়। এছাড়া হিন্দুদের প্রায় সব পূজাতেই যে আমপাতা দেয়া ঘটের প্রয়োজন হয়, বেলপাতার প্রয়োজন হয়, কলা-বৌ এর পূজা হয়, অনেক ব্রতে যে ধানের ছড়ার প্রয়োজন হয়, এগুলোও সেই আদিবাসীদের ধর্মকর্মানুষ্ঠানের এবং বিশ্বাস ও ধারণার স্মৃতি বহন করে। একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যায়, এইসব ধারণা, বিশ্বাস ও অনুষ্ঠান আদিম কৃষি ও গ্রামীণ সমাজের গাছ-পাথর পূজা, প্রজনন শক্তির পূজা, পশুপাখির পূজা ইত্যাদির স্মৃতি বহন করে। বিশেষ বিশেষ ফলমূল সম্পর্কে আমাদের সমাজে যেসব বিধিনিষেধ প্রচলিত, যেসব ফলমূল যেমন আক, চাল-কুমড়া, কলা ইত্যাদি হিন্দুদের পূজার্চনায় উৎসর্গ করা হয়, বাঙ্গালির মধ্যে যে নবান্ন উৎসব বা আনুষঙ্গিক অনুষ্ঠান প্রচলিত, হিন্দু ঘরের মেয়েরা যে ব্রত পালন করে থাকে সেগুলোর সাথেও বাংলার আদিমতম জন ও কোমদের ধর্মবিশ্বাস ও আচারানুষ্ঠান জড়িয়ে আছে।
বাঙ্গালী হিন্দুদের অনেক আচারানুষথানে, ধর্ম, সমাজ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আজও ধান, ধানের গুচ্ছ, ধানদুর্বার আশীর্বাদ, কলা, হলুদ, সুপারি, পান, নারিকেল, সিঁদুর, কলাগাছ, ,ঘট, ঘটের উপর আঁকা প্রতীক চিহ্ন, নানা রকমের আলপনা, গোবর, কড়ি ইত্যাদি অনেকখানি স্থান জুড়ে রয়েছে। হিন্দুদের এই দৈনন্দিন জীবনের ব্যাপারগুলো ও অনুষ্ঠানগুলোর সাথে সম্পর্কিত এই শৈল্পিক দিকগুলোও আদিবাসী সংস্কার ও সংস্কৃতির সাথে জড়িত। বাংলায়, বিশেষ করে পূর্ববাংলায় হিন্দুদের বিয়ের অনুষ্ঠানে পানখিলি, গায়ে হলুদ, গুটিখেলা, ধান ও কড়ির স্ত্রী আচার, খৈ ছড়ানো, লক্ষ্মীর ঝাঁপি স্থাপনা, দধিমঙ্গল ইত্যাদি সমস্তই আদিবাসীদের দান বলে অনুমান করা হয়। বস্তুত হিন্দু বিয়ের সম্প্রদান, যজ্ঞ ও মন্ত্রের অংশ ছাড়া বাদবাকি সবটাই অবৈদিক, অস্মার্ত ও অব্রাহ্মণ্য। অন্যান্য অনেক ব্যাপারেও তাই। পূজার্চনার মধ্যে ঘটলক্ষ্মীর পূজা, ষষ্ঠীপূজা, মনসাপূজা, লিঙ্গ-যোনী পূজা, শ্মশান-শিব ও ভৈরবের পূজা, শ্মশান-কালী পূজা ইত্যাদির প্রায় সব বা অধিকাংশই মূলত এইসব আদিবাসীদের ধর্মকর্মানুষ্ঠান থেকেই গ্রহণ করা হয়েছে কিছুটা রূপান্তর ও ভাবান্তর ঘটিয়ে। এইসব আচারানুষ্ঠানের প্রত্যেকটির সুবিস্তৃত বিশ্লেষণ ও এদের পূর্ণাঙ্গ রহস্যের উদঘাটন এই সময়ে এসে আর সম্ভব নয়, তবে দুচারটি আচার অনুষ্ঠানের জীবনেতিহাস জানা সম্ভব হয়েছে, যেমন চড়ক পূজা, হোলী, ষষ্ঠীপূজা, চণ্ডী-দুর্গা-কালী প্রভৃতি মাতৃকাতন্ত্রের পূজা, মনসাপূজা, পৌষপার্বণ, নবান্ন উৎসব ইত্যাদি। আগেই বলা হয়েছে যে একটু লক্ষ্য করলেই বোঝা যায় এইসব আচার অনুষ্ঠানের অনেকগুলোই মূলত গ্রামীণ কৃষিজীবী সমাজের প্রধানতম ও আদিমতম ভয়-বিষ্ময়-বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত।
আজকের দিনে বা আদি ও মধ্যযুগে ভদ্র ও উচ্চস্তরের হিন্দু বাঙ্গালিদের মধ্যে যে ধর্মানুষ্ঠানের প্রচলন দেখা যায় ও যাকে আমরা বাঙ্গালি হিন্দুদের ধর্মকর্ম ও জীবনের বিশিষ্টতম ও প্রধান রূপ বলে জানা হয়, অর্থাৎ ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, সূর্য, গণেশ, বিভিন্ন দেবী, অসংখ্য বৌদ্ধ, জৈন, শৈব ও তান্ত্রিক বিচিত্র দেবদেবী নিয়ে যে ধর্মকর্ম দেখা যায় তা একান্তই আর্য-ব্রাহ্মণ্য-বৌদ্ধ-জৈন-তান্ত্রিক ধর্মকর্মের চন্দনানুলেপন মাত্র ও তা সংস্কৃতির গভীরতা ও ব্যাপকতার দিক থেকে একান্তই মুষ্ঠিমেয় লোকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। যে ধর্মকর্মময় সাংস্কৃতিক জীবন বাঙ্গালির জীবনের গভীরে বিস্তৃত, যে জীবন নগরের সীমা অতিক্রম করে গ্রামের কুটিরের কোণে, চাষীর মাঠে, গৃহস্তের আঙিনায়, ফসলের ক্ষেতে, গ্রাম্য সমাজের চণ্ডীমণ্ডপে, বারোয়ারী তলায়, নদীর পাড়ে বটের ছায়ায় আর্য-ব্রাহ্মণ্য-বৌদ্ধ-জৈন-তান্ত্রিক ধর্মকর্মের সাধনা ও অনুষ্ঠানের নিচে চাপা পড়ে আছে। চাপা পড়ার ফলে এগুলো কোথাও একেবারে মরে গেছে, কোথাও কেবল নিষ্প্রাণ কঙ্কাল বিদ্যমান, কোথাও আবার কেবল আত্মগোপণ করেই বেঁচে আছে।
এখনও বাংলার অনেক ক্ষেত্রেই মাঠে লাঙ্গল চালাবার প্রথম দিনে, বীজ ছড়াবার, শালিধান বুনবার, ফসল কাটবার বা ঘরে গোলায় তুলবার আগে নানা প্রকারের আচার অনুষ্ঠান প্রচলিত। এগুলোর অনেকগুলোতেই বিভিন্ন শৈল্পিক বিষয় দেখা যায়, কিন্তু কোনটাতেই ব্রাহ্মণ পুরোহিতের প্রয়োজন হয়না। নবান্ন উৎসব বা নতুন গাছের বা নতুন ঋতুর প্রথম ফল ও ফসলকে কেন্দ্র করে যেসব পূজানুষ্ঠান দেখা যায় হিন্দুদের মধ্যে সেগুলোর বৈশিষ্ট্যও একইরকম। শুধু কৃষিই নয়, শিল্পজীবনেও এগুলো দেখা যায়। বিশেষ বিশেষ দিনে কামারের হাঁপর, কুমোরের চাক, তাঁতীর তাঁত, চাষীর লাঙ্গল, ছুতোর-রাজমিস্ত্রীর কারুযন্ত্র ইত্যাদিকে আশ্রয় করে একরকম ধর্মকর্মানুষ্ঠান আজও দেখা যায়। তারই কিছুটা আর্যীকৃত সংস্কৃতরূপ দেখা যায় বিশ্বকর্মা পূজায়। কিন্তু এইরকমের পূজাতেও ব্রাহ্মণ পুরোহিতের প্রয়োজন হয়না। উৎপাদন যন্ত্রের এই পূজাচারের সাথে আদিবাসীদের প্রজনন শক্তির পূজাচারের সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ। আগামী পর্বগুলোতে যেসব প্রাক-আর্য বা আর্যপূর্বে ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো এখনও হিন্দুসমাজে প্রচলিত সেগুলো নিয়ে আলোচনা করা হবে।
(চলবে)
About This Article
Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis
Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics
This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.
Its purpose is not theological neutrality or artificial both-sides balance, but evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.
Neutrality here means methodological fairness: accurate use of sources, logical rigor, evidentiary discipline, and factual consistency. It does not mean moral indifference or equal treatment between harmful doctrines and their criticism.
Strong criticism should not be mistaken for bias if it is supported by evidence and sound reasoning.
This article should be evaluated through source quality, evidentiary strength, logical rigor, factual consistency, and fairness in representing opposing claims—not through theological sensitivity, apologetic expectations, or demand for rhetorical softness.

