Knowledge Base Article

ইসলামে যুদ্ধবন্দি নারী বা দাসী ধর্ষণের বৈধতা প্রসঙ্গে: দাসীর সম্মতি কি জরুরি?

প্রকাশিত: আগস্ট 22, 2025 · লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন · 96 মিনিট পড়া

সারসংক্ষেপ

ইসলামি শরিয়তে দাসী সহবাসের বিধান স্বাধীন সম্মতি, ব্যক্তিস্বাধীনতা বা নারীর দেহগত অধিকারের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না; এটি প্রতিষ্ঠিত ছিল মালিকানা, যুদ্ধবন্দিত্ব এবং প্রভুর যৌন অধিকারের ধারণার ওপর। কোরআন, হাদিস ও ফিকহি গ্রন্থগুলোতে সদ্য পরিবার হারানো যুদ্ধবন্দিনী নারীকে দাসী বানানো, আগের বিবাহিত সম্পর্ক অকার্যকর হয়ে যাওয়া, ইস্তিবরার পর মালিকের জন্য তার সঙ্গে সহবাস বৈধ হওয়া, দাসী কেনাবেচা করা এবং দাসীর ওপর মালিকের যৌন অধিকার, এসব বিধান সুস্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। এই কাঠামোর ভেতরে দাসী স্বাধীন ব্যক্তি নয়; সে মালিকানাধীন নারী, যার দেহের ওপর মালিকের আইনগত অধিকার স্বীকৃত।

এই প্রবন্ধে দেখানো হয়েছে, ইসলামের প্রাথমিক যুগের যুদ্ধবন্দিনী নারীদের ক্ষেত্রে মূল আইনগত প্রশ্ন ছিল তারা কার মালিকানায় এসেছে, তাদের ইস্তিবরা হয়েছে কি না, পূর্ববিবাহ বাতিল হয়েছে কি না, গর্ভধারণের সম্ভাবনা আছে কি না, এবং তাদের বিক্রয়মূল্য বা মুক্তিপণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে কি না। কিন্তু তারা কিছুক্ষণ পূর্বে তাদেরই গোত্রের পুরুষদের হত্যা করা নতুন মালিকের সঙ্গে যৌনসম্পর্কে স্বাধীনভাবে সম্মতি দিয়েছে কি না, এই প্রশ্নটি সহবাসের বৈধতার শর্ত হিসেবে সামনে আসে না। আওতাস, বনু মুস্তালিক ও খায়বারের ঘটনাগুলোতে বন্দিনী নারীদের ভাগ করা, বেছে নেওয়া, স্থানান্তর করা এবং যৌনভাবে ব্যবহার করার বাস্তবতা স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি গ্রন্থগুলোতে দাসীর যৌন প্রত্যাখ্যানকে কোনো আইনগত স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। বরং মালিকের যৌন আহ্বানে সাড়া দেওয়া দাসীর অবশ্য কর্তব্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, যদি না মাসিক বা গুরুতর অসুস্থতা কারণ হয়ে থাকে। আর অস্বীকার করাকে নিষিদ্ধ, পাপ, অভিশাপযোগ্য বা মালিকের অধিকার প্রতিরোধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ দাসীর “না” মালিকের যৌন অধিকার বাতিলকারী স্বাধীন আইনগত ভেটো ছিল না। মালিকানা যেখানে যৌনাধিকারের উৎস, সেখানে স্বাধীন সম্মতির ধারণা বাস্তব অর্থেই ভেঙে পড়ে।

তাই ইসলামে দাসী সহবাসকে আধুনিক মানদণ্ডে যুদ্ধবন্দী ধর্ষণের ইসলামিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ বললে মোটেও বাড়িয়ে বলা হবে না। সদ্য পরিবারের সদস্যদের হারানো, নিজের গোত্রকে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হতে দেখা, আত্মীয়দের লাশের ওপর দিয়ে তাদের বন্দিত্ব, সেইসব যুদ্ধবন্দিনী নারীকে দাসী বানিয়ে মালিকানার ভিত্তিতে তার সঙ্গে সহবাসের অনুমতি দেওয়া আধুনিক মানবিক মানদণ্ডে যৌনদাসত্বেরই রূপ। দাসপ্রথা, যুদ্ধলব্ধ নারী, মালিকানাধীন দেহ এবং যৌন অধিকার—এই পুরো ব্যবস্থাই স্বাধীনতা ও সম্মতির বিপরীত। ধর্মীয় বৈধতা এই অমানবিক বাস্তবতাকে ঢেকে রাখতে পারে না।


ভূমিকা

মানব সভ্যতার ইতিহাসে দাসপ্রথা এক অন্ধকারতম অধ্যায়। প্রাচীন গ্রিস, রোম, ভারত, চীন কিংবা আরব— প্রায় প্রতিটি সভ্যতাই কোনো না কোনোভাবে দাসপ্রথা চর্চা করেছে। ইসলামের উদ্ভবও এমন এক সময়ে, যখন আরব সমাজে দাস ও দাসী ছিল সাধারণ বাস্তবতা। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ইসলাম কি দাসপ্রথা বিলোপ করেছে, নাকি বিদ্যমান দাসপ্রথাকে ধর্মীয় বৈধতা দিয়ে শরিয়তি আইন হিসেবে কেয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষণ করেছে? নবী নিজে কি দাসদাসী রেখেছেন, কেনাবেচা করেছেন, অর্থাৎ নবী নিজেই একজন দাসও ব্যবসায়ী ছিলেন কিনা। বিশেষত যুদ্ধবন্দী নারীকে দাসী বা উপপত্নী হিসেবে গ্রহণ করা এবং তাদের সম্মতি ছাড়াই যৌনসম্পর্ক স্থাপনের অনুমোদন ইসলামি আইন ও ফিকহে সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত। এই প্রবন্ধে আমরা কোরআন, হাদিস, ফিকহশাস্ত্র এবং আধুনিক মানবাধিকারের আলোকে এই বিষয়টি বিশ্লেষণ করব। উল্লেখ্য, ইসলামের শরীয়াহ অনুযায়ী, মুহাম্মদের প্রতিষ্ঠিত বিধান কেয়ামত পর্যন্ত কার্যকর ও অপরিবর্তনীয় বলে গণ্য। এমনকি, ইসলামী বিশ্বাস অনুসারে এই বিধান বর্তমান আমলেও একইভাবে প্রয়োগযোগ্য। তাই এই আলোচনাটি আধুনিক মানদণ্ডে পুরনো কোন বিধানকে মূল্যায়ন নয়, বরঞ্চ ইসলামী বিশ্বাসের নিজস্ব কাঠামো ও ফিকহি যুক্তি বর্তমানেও যারা প্রয়োগ করতে চায় তাদের বিশ্বাসের ভিত্তির ওপর লিখিত।

পরবর্তী দীর্ঘ আলোচনায় যাওয়ার আগে নিচের টেবিলে এই প্রবন্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিলগুলো একসঙ্গে সাজানো হলো। এখানে যুদ্ধবন্দিনী নারীদের সঙ্গে সহবাসের হাদিস, দাসীর যৌন প্রত্যাখ্যান সম্পর্কে ক্লাসিক্যাল ফিকহি বিধান, আযলের ক্ষেত্রে তার অনুমতির অপ্রয়োজনীয়তা, মালিকের যৌন অধিকার, জোরপূর্বক সহবাস এবং দাসীর শরীরের ওপর সম্পত্তিগত অধিকারের প্রশ্ন—সবকিছুর মূল উৎস এক নজরে দেখা যাবে। ফলে পুরো প্রবন্ধের কেন্দ্রীয় দাবিটি শুরুতেই পরিষ্কার হয়: ইসলামি দাসপ্রথায় যৌন বৈধতার ভিত্তি ছিল দাসীর স্বাধীন ও প্রত্যাহারযোগ্য সম্মতি নয়, বরং মালিকানা, শরিয়তস্বীকৃত যৌন অধিকার এবং সেই অধিকারের অধীন দাসীর বাধ্যতামূলক আনুগত্য।

দলিল / উৎসমূল বক্তব্যসম্মতির প্রশ্নে তাৎপর্যরেফারেন্স
সহিহ মুসলিম — আওতাসের যুদ্ধবন্দিনীবিবাহিত মুশরিক নারীরা যুদ্ধবন্দী হওয়ার পর ইস্তিবরা শেষে মুসলিম মালিকদের জন্য সহবাসযোগ্য হয়ে যায়পূর্বস্বামী জীবিত থাকলেও বন্দিত্ব ও মালিকানা যৌন বৈধতার ভিত্তি; নারীর সম্মতি শর্ত হিসেবে উল্লেখ নেইসহিহ মুসলিম 3477
সহিহ বুখারি — বনু মুস্তালিকমুসলিমরা বন্দিনী নারীদের সঙ্গে সহবাস করতে চেয়েছিল এবং গর্ভধারণ ঠেকাতে আযলের বিষয়ে মুহাম্মদকে জিজ্ঞেস করেছিলপ্রশ্ন ছিল গর্ভধারণ ও ভবিষ্যৎ মুক্তিপণ/বিক্রয়মূল্য নিয়ে; বন্দিনী নারীর সম্মতি নিয়ে নয়সহিহ বুখারি 7409
মুয়াত্তা মালিক — পিতার দাসী পুত্রের জন্য নিষিদ্ধপিতা পুত্রকে দাসী দান করলেও নিজের পূর্ব-সহবাস বা যৌন-ইচ্ছার কারণে পুত্রকে তার কাছে যেতে নিষেধ করেনআলোচনার কেন্দ্র দাসীর ইচ্ছা নয়; পুরুষদের পারিবারিক যৌন-অধিকার ও নিষিদ্ধতার সীমামুওয়াত্তা মালিক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ১১৩৪
আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া — মুয়াবিয়ার সামনে নগ্ন দাসীদাসীকে বিবস্ত্র অবস্থায় মুয়াবিয়ার সামনে আনা হয়; তিনি তাকে ইয়াযীদের কাছে পাঠাতে চান, পরে শরিয়তি নিষেধের কারণে অন্যকে দান করেনদাসীর সম্মতি নয়; পুরুষ-মালিকদের কামনা, হালাল-হারাম হিসাব ও হস্তান্তর সিদ্ধান্তই মুখ্যইবনে কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড ৮, পৃ. ২৬৬
রওজাতুত তালেবীন — ইমাম নববীস্ত্রী ও দাসীর জন্য মালিক/স্বামীর বৈধ যৌন আহ্বান প্রত্যাখ্যান করা কঠোরভাবে হারামদাসীর “না” স্বাধীন আইনগত ভেটো নয়Shamela
আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যাহদাসীর কর্তব্য মালিককে নিজের দেহ যৌন উপভোগের জন্য সমর্পণ করা; বিরত থাকা হারাম, কারণ এটি মালিকের অধিকারযৌন দাবিকে স্পষ্টভাবে মালিকের অধিকার হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছেShamela
আল-মুহাল্লা — ইবন হাজমমালিক যখন সহবাসের জন্য ডাকবে, দাসীর জন্য বাধা না দেওয়া ফরজ; বৈধ কারণ ছাড়া অস্বীকার করলে সে অভিশপ্তযৌন প্রত্যাখ্যানকে ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছেIslamweb
IslamQA, Fatwa 33597দাসী মালিকের যৌন চাহিদা বৈধ কারণ ছাড়া প্রত্যাখ্যান করতে পারে না; অস্বীকার করলে সে গুনাহগার এবং মালিক তাকে শাস্তি দিতে পারেঅস্বীকৃতির সঙ্গে ধর্মীয় অপরাধ ও শাস্তির ক্ষমতা যুক্তIslamQA 33597
আল-শাবাকা আল-ইসলামিয়্যা“সে অস্বীকার করলে মালিক তাকে সহবাসে বাধ্য করতে পারে; এতে নিন্দনীয় কিছু নেই, কারণ সে নিজের অধিকার আদায় করছে।”সরাসরি অস্বীকৃতি → إجبارها عليه, অর্থাৎ জোরপূর্বক সহবাসের অনুমোদনসংরক্ষিত ফতোয়া
আল-তামহীদ — ইবন আবদুল বারসাহাবারা দাসীদের অনুমতি বা পরামর্শ নেননি; দাসীদের মতামত ছাড়াই আযল বৈধاستئمار (অনুমতি), مشاورة (পরামর্শ), رأي (মতামত)—সবই অপ্রয়োজনীয়Islamweb
আল-মুগনি — ইবন কুদামামালিক দাসীর অনুমতি ছাড়া আযল করতে পারে; কারণ “সহবাস ও সন্তানে তার কোনো অধিকার নেই”স্বাধীন স্ত্রীর অনুমতি প্রয়োজন, কিন্তু দাসীর নয়—আইনগত পার্থক্যটি সরাসরি consent-এর অধিকারেIslamweb
আল-মুদাওয়ানা — মালিকি ফিকহমালিক নিজের মুকাতাবা দাসীকে يغتصبها—জোরপূর্বক সহবাস করলেও তার ওপর যিনার হদ নেই; আর্থিক হিসাব করা হয় দাসীর মূল্যহ্রাসের ভিত্তিতেজোরপূর্বক যৌনসম্পর্কের ঘটনাতেও দাসীর স্বায়ত্তশাসনের বদলে মালিকানা ও সম্পত্তিগত মূল্য কেন্দ্রেIslamweb
শারহ মুনতাহা আল-ইরাদাত — আল-বুহুতিদাসী অন্য পুরুষের সঙ্গে স্বেচ্ছায় যৌনসম্পর্কে রাজি হলেও ক্ষতিপূরণের অধিকার বাতিল হয় না, কারণ সেটি “মালিকের অধিকার”দাসীর নিজের সম্মতিও তার শরীরের ওপর মালিকের সম্পত্তিগত অধিকার বাতিল করতে পারে নাIslamweb
আশরাফুল হিদায়া — আযলস্বাধীন স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া আযল করা যাবে না; নিজের দাসীর ক্ষেত্রে অনুমতি প্রয়োজন নেই, কারণ সহবাসে দাসীর নিজস্ব অধিকার নেইস্বাধীন নারী ও দাসীর যৌন/প্রজননগত agency-র স্পষ্ট আইনগত পার্থক্যআশরাফুল হিদায়া, ৯ম খণ্ড, পৃ. ৬২৫
আশরাফুল হিদায়া — ইস্তিবরাইস্তিবরার “প্রকৃত কারণ” হলো নতুন মালিকের সহবাসের ইচ্ছা; সহবাসের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয় মালিকানা ও দখলের মাধ্যমেযৌন অধিকারের আইনগত উৎস হিসেবে নারীর সম্মতি নয়, মালিকানা ও possession-কে চিহ্নিত করা হয়েছেআশরাফুল হিদায়া, ৯ম খণ্ড, পৃ. ৬২৯
Kecia Ali, “Concubinage and Consent”প্রাক-আধুনিক সুন্নি ফিকহে নিজের দাসীর সঙ্গে সহবাসের আগে তার consent নেওয়াকে সাধারণ আইনগত শর্ত হিসেবে পাওয়া যায় নাআধুনিক একাডেমিক গবেষণাও classical fiqh-এর ownership-based sexual framework শনাক্ত করেছেKecia Ali, IJMES, 49(1), 2017, pp. 148–152

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও আধুনিক যুদ্ধনীতি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা যুদ্ধাপরাধ রোধ ও মানবাধিকার রক্ষায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সনদ ও আইনের প্রবর্তন করেছে। ১৯৪৮ সালে গৃহীত জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র (Universal Declaration of Human Rights) স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে “কেউ দাসত্ব বা ক্রীতদাসত্বের শিকার হবে না; সব ধরনের দাস প্রথা ও দাস ব্যবসা নিষিদ্ধ” (UDHR, অনুচ্ছেদ ৪)। এছাড়াও, যুদ্ধাবস্থায় বেসামরিক ব্যক্তি ও বন্দীদের সুরক্ষা দিতে ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশনসমূহ গৃহীত হয়, যা যুদ্ধরত পক্ষগুলোকে আবশ্যিকভাবে মানবিক আচরণ পালনের জন্য বাধ্য করে। উদাহরণস্বরূপ, যুদ্ধবন্দীদের নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ, দাসত্বে নিযুক্ত করা প্রভৃতি গুরুতর যুদ্ধাপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) ও বিভিন্ন যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ ধরনের অপরাধের জন্য দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করার ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় সংঘটিত গণহত্যা, ধর্ষণ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য দেশীয় International Crimes Tribunal গঠন করা হয়েছে। আধুনিক সেক্যুলার রাষ্ট্রব্যবস্থা এসব চুক্তি ও আইনের মাধ্যমে যুদ্ধকালে ন্যূনতম মানবিক মানদণ্ড রক্ষা করার চেষ্টা করে এবং এর ব্যত্যয় ঘটালে সেটিকে অপরাধ হিসেবে দেখে। সুতরাং আজকের দুনিয়ায় যুদ্ধবন্দীদের হত্যা, নির্যাতন বা যৌনদাসত্বে পরিণত করা সার্বজনীনভাবে নিন্দিত ও নিষিদ্ধ একটি কাজ।


দাসপ্রথা ও যুদ্ধবন্দী নারীর যৌন অধিকার

কোরআনে বহুবার “ملک اليمين” (মালাকাত আইমানুকুম / তোমাদের ডান হাত যা অধিকার করে) শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করা হয়েছে, যা যুদ্ধবন্দী নারী কিংবা বাজার থেকে কিনে আনা দাসীদের বোঝাতে ব্যবহৃত। এই বিষয়ে অন্য একটি লেখায় খুব বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে, আগ্রহী পাঠক সেই লেখাটি পড়ে দেখতে পারেন [1]। এখানে স্ত্রী (যার সাথে চুক্তি ও সম্মতি বিদ্যমান) এবং দাসী (সরাসরি যার ক্ষেত্রে কোন চুক্তি বা তার সম্মতি নেই) একই সঙ্গে বৈধ যৌনসঙ্গী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কোরআনে সূরা আন-নাহলের ৭৫ নম্বর আয়াতে [2] দাসকে এমন একজনের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, যে “কোনো কিছুতেই ক্ষমতাহীন।” এই দৃষ্টিভঙ্গিই ইসলামি ফিকহের ভিত্তি তৈরি করে— দাস বা দাসী নিজস্ব ইচ্ছা ও সম্মতি থেকে বঞ্চিত, তার শরীর-শ্রম-যৌনতা সবকিছুই প্রভুর অধিকার।

আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেনঃ অন্যের মালিকানাভুক্ত এক দাস যে কোন কিছু করারই ক্ষমতা রাখে না। আর এক লোক যাকে আমি আমার পক্ষ হতে উত্তম জীবিকা দান করেছি আর তাত্থেকে সে গোপনে প্রকাশ্যে দান করে, (এ) দু’জন কি সমান? সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্য, কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না।
— Taisirul Quran
আল্লাহ উপমা দিচ্ছেন অপরের অধিকারভুক্ত এক দাসের, যে কোন কিছুর উপর শক্তি রাখেনা। এবং অপর এক ব্যক্তি যাকে তিনি নিজ হতে উত্তম রিয্ক দান করেছেন এবং সে তা হতে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে; তারা কি উভয়ে একে অপরের সমান? সকল প্রশংসা আল্লাহরই প্রাপ্য; অথচ তাদের অধিকাংশ এটা জানেনা।
— Sheikh Mujibur Rahman
আল্লাহ উপমা পেশ করেছেন; একজন অধিনস্ত দাস যে কোন কিছুর উপর ক্ষমতা রাখে না। আর একজন যাকে আমি আমার পক্ষ থেকে উত্তম রিযক দিয়েছি, অতঃপর সে তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে। তারা কি সমান হতে পারে? সমস্ত প্রশংসা আল্লা্হর। বরং তাদের অধিকাংশই জানে না।
— Rawai Al-bayan
আল্লাহ্‌ উপমা দিচ্ছেন [১] অন্যের অধিকারভুক্ত এক দাসের, যে কোনো কিছুর উপর শক্তি রাখে না এবং এমন এক ব্যক্তির যাকে আমরা আমার পক্ষ থেকে উত্তম রিযক দান করেছি এবং সে তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে; তারা কি একে অন্যের সমান [২]? সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্‌রই প্রাপ্য [৩]; বরং তাদের অধিকাংশই জানে না [৪]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria


ধর্ষণের সংজ্ঞা বদলে অপরাধ মুছে ফেলার কৌশল

ইসলামি বক্তাদের সবচেয়ে বড় কৌশল হলো ধর্ষণের সংজ্ঞাকেই এমনভাবে বদলে দেওয়া, যাতে দাসীর ওপর মালিকের যৌন অধিকার আগেই অভিযোগের বাইরে চলে যায়। তারা ধর্ষণকে সংজ্ঞায়িত করে “জোরপূর্বক অবৈধ যৌন সঙ্গম” হিসেবে। এরপর বলে, স্ত্রী বা বৈধ দাসীর সঙ্গে সহবাস যেহেতু শরিয়তে অবৈধ নয়, তাই সেটি ধর্ষণ নয়। এটি যুক্তি নয়, এটি সংজ্ঞাগত প্রতারণা। কারণ বিতর্কের মূল প্রশ্নই হলো, কোনো নারীকে যুদ্ধবন্দী করে, বাজারে বিক্রয়যোগ্য সম্পত্তিতে পরিণত করে, তার ওপর মালিকের যৌন অধিকার প্রতিষ্ঠা করলেই কি তার সম্মতি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়? ইসলাম প্রচারকগণ এই প্রশ্নের উত্তর দেয় না; বরং “শরিয়তে বৈধ” বলে সমস্যাটিকেই মুছে দিতে চায়।

এই যুক্তি গ্রহণ করলে পৃথিবীর প্রতিটি দাসপ্রথাই নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারবে। দাসমালিক বলবে, “আমার আইনে দাসকে কাজ করানো বৈধ, তাই এটি forced labour নয়।” বর্ণবাদী আইন বলবে, “আমার আইনে বৈষম্য বৈধ, তাই এটি discrimination নয়।” ঠিক একইভাবে ইসলামি ফিকহ বলছে, “মালিকানাধীন দাসীর সঙ্গে সহবাস বৈধ, তাই এটি ধর্ষণ নয়।” কিন্তু আধুনিক নৈতিক ও আইনি বিচার এমন বৃত্তাকার সংজ্ঞা মানে না। কোনো কাজ অপরাধ কি না তা বিচার করতে হবে ভুক্তভোগীর স্বাধীনতা, সম্মতি, দেহগত স্বায়ত্তশাসন এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের ভিত্তিতে; অপরাধীর নিজস্ব ধর্মীয় আইনের বৈধতার ভিত্তিতে নয়।

সম্মতি বলতে শুধু কোনো নারীর চুপ থাকা, ভয়ে প্রতিবাদ না করা, অথবা সামাজিক-আইনি চাপের কারণে বাধ্য হয়ে মেনে নেওয়াকে বোঝায় না। প্রকৃত সম্মতি মানে হলো স্বাধীন, সচেতন, চাপমুক্ত এবং প্রত্যাহারযোগ্য সম্মতি। অর্থাৎ একজন নারী যে কোনো মুহূর্তে “না” বলতে পারবে, এবং সেই “না” বলার কারণে তার ওপর ধর্মীয় অভিশাপ, সামাজিক অপমান, শাস্তি, প্রভুর অধিকার ভঙ্গের অভিযোগ, ভরণপোষণ বন্ধ, প্রহার, বিক্রি, বন্দিত্ব বা অন্য কোনো ক্ষতি নেমে আসবে না। যেখানে “না” বলার স্বাধীনতা নেই, সেখানে “হ্যাঁ” বলাটিও প্রকৃত সম্মতি নয়; সেটি কেবল ক্ষমতাবান ব্যক্তির ইচ্ছার সামনে দুর্বল মানুষের আত্মসমর্পণ।

এই কারণেই দাসী সহবাসের ক্ষেত্রে সম্মতির প্রশ্নটি শুধু “সে মুখে রাজি হয়েছিল কি না” নয়; আসল প্রশ্ন হলো, সে স্বাধীনভাবে অস্বীকার করতে পারত কি না। যদি একজন নারী মালিকানাধীন দাসী হয়, তার শরীরকে প্রভুর যৌন অধিকারের অংশ ধরা হয়, তার অস্বীকৃতিকে হারাম, পাপ, অভিশাপযোগ্য বা প্রভুর অধিকার প্রতিরোধ বলা হয়, তাহলে সেখানে সম্মতির কোনো বাস্তব অস্তিত্ব থাকে না। দাসীর “না” যদি মালিকের যৌন অধিকার বাতিল করতে না পারে, তাহলে সেই ব্যবস্থাকে সম্মতিমূলক বলা প্রতারণা।


যুদ্ধবন্দিনী কাফের নারীদের ভোগের সমসাময়িক ইসলামি জাস্টিফিকেশন

এই বিধানকে বর্তমান যুগের কিছু ইসলামি বক্তা কীভাবে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করেন, তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ শায়েখ মুখলেস বিন আরশাদ মাদানির এই বক্তব্য। তিনি কাফের নারীদের কুফরিকে তাদের ওপর এ ধরনের আচরণ প্রয়োগের শাস্তিমূলক যুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করছেন। উনি খুব পরিষ্কার করেই বলছেন, কাফের নারীদের কুফরির কারণেই শাস্তি হিসেবে এগুলো তাদের ওপর প্রযোজ্য হবে,


হাদিস ও ফিকহশাস্ত্রে দাসীর যৌন কর্তব্য

ইসলামের শরীয়তে খুব স্পষ্টভাবেই মালিক বা প্রভুর যৌন চাহিদা মেটানো দাসীদের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এই বিষয়ক দলিল প্রমাণগুলো এক এক করে আসবে, শুরুতেই বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় এই ভিডিওটি দেখলে। ভিডিওটিতে বর্তমান যুগের অন্যতম মুহাদ্দিস এবং আলেম শাইখ মুস্তফা আল আদাওয়িকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, সহবাসের ক্ষেত্রে নিজ দাসীকে বাধ্য করা জায়েজ কিনা। অত্যন্ত বিরক্তি সহকারে এই আলেম উত্তর দিয়েছিলেন, দাসদাসীর আবার সম্মতি কী? তারা তো দাসদাসী! ভিডিওটিতে এই আলেমের বিরক্তির সুর খুব স্পষ্ট, যা থেকে বোঝা যায় এরকম প্রশ্ন তার কাছে নিতান্তই অহেতুক এবং নিম্নমানের! আসুন ভিডিওটি দেখি,


নিচে এই সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ দলিল প্রমাণ এক এক করে উল্লিখিত হচ্ছে।


পিতার দাসী, পুত্রের দাসী: দাসীর ইচ্ছা অনুপস্থিত

দাসীর শরীরকে ইসলামি আইনি ভাষায় কীভাবে দেখা হতো, মুওয়াত্তা মালিকের একটি রেওয়ায়েত তা অত্যন্ত নগ্নভাবে দেখিয়ে দেয়। এখানে আলোচনার বিষয় দাসী নিজে কী চায়, সে কার সঙ্গে থাকতে চায়, বা তার যৌন সম্মতি আছে কি না—এসব কিছুই নয়। আলোচনার বিষয় হলো, কোনো পুরুষ নিজের পুত্রকে দাসী দান করলে সেই পুত্র দাসীটির সঙ্গে সহবাস করতে পারবে কি না, যদি পিতা আগে তাকে যৌনভাবে ব্যবহার করে থাকে বা ব্যবহার করার ইচ্ছা করে থাকে। অর্থাৎ দাসী এখানে স্বাধীন ব্যক্তি নয়; পুরুষদের মধ্যে যৌন-অধিকার-সম্পর্কিত মালিকানাধীন বস্তু।

উমর ইবন খাত্তাব নিজের পুত্রকে একটি দাসী দান করেন, কিন্তু বলে দেন—তাকে স্পর্শ করো না, কারণ আমি তার পর্দা উন্মোচন করেছি, অর্থাৎ তার সঙ্গে সহবাস করেছি। আরেক বর্ণনায় সালিম ইবন আবদুল্লাহ নিজের পুত্রকে একটি দাসী দান করে বলেন—তার কাছে যেও না, কারণ আমি তাকে চেয়েছিলাম, যদিও তার সঙ্গে সহবাসে অগ্রসর হইনি। এই ভাষাতেই পুরো ব্যবস্থার চরিত্র প্রকাশ পায়। দাসীর নিজের ইচ্ছা কোনো প্রশ্ন নয়; প্রশ্ন হলো পিতার পূর্ববর্তী যৌন ব্যবহার বা যৌন-ইচ্ছা পুত্রের যৌন অধিকারকে সীমিত করবে কি না।

মুয়াত্তা মালিক (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
হাদিস: ১১৩৪
২৮. বিবাহ সম্পর্কিত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ১৫. পিতার দাসীর সহিত সহবাস নিষিদ্ধ হওয়া
রেওয়ায়ত ৩৬. মালিক (রহঃ) বলেনঃ তাহার নিকট রেওয়ায়ত পৌঁছিয়াছে যে, উমর ইবন খাত্তাব (রাঃ) তাহার পুত্রকে একটি দাসী দান করিলেন। এবং বলিয়া দিলেন, তুমি ইহাকে স্পর্শ (সহবাস) করিও না। কারণ আমি উহার পর্দা উন্মোচন করিয়াছি (অর্থাৎ সহবাস করিয়াছি)।
আবদুর রহমান ইবন মুজাববার (রহঃ) বলেনঃ সালিম ইবন আবদুল্লাহ্ (রহঃ) তাহার এক পুত্রকে একটি দাসী দান করিলেন এবং তিনি পুত্রকে বলিয়া দিলেন, তুমি ইহার নিকট গমন (সহবাস) করিও না, কারণ আমি উহার সাথে সংগত হওয়ার ইচ্ছা করিয়াছি। সুতরাং আমি তোমাকে উহার সহিত মিলিত হওয়ার অনুমতি দিতে পারি না।
হাদিসের মানঃ তাহকীক অপেক্ষমাণ
বর্ণনাকারীঃ মালিক ইবনু আনাস (রহঃ)

بَاب النَّهْيِ عَنْ أَنْ يُصِيبَ الرَّجُلُ أَمَةً كَانَتْ لِأَبِيهِ
حَدَّثَنِي يَحْيَى عَنْ مَالِك أَنَّهُ بَلَغَهُ أَنَّ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ وَهَبَ لِابْنِهِ جَارِيَةً فَقَالَ لَا تَمَسَّهَا فَإِنِّي قَدْ كَشَفْتُهَا
وَحَدَّثَنِي عَنْ مَالِك عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ الْمُجَبَّرِ أَنَّهُ قَالَ وَهَبَ سَالِمُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ لِابْنِهِ جَارِيَةً فَقَالَ لَا تَقْرَبْهَا فَإِنِّي قَدْ أَرَدْتُهَا فَلَمْ أَنْشَطْ إِلَيْهَا

এই রেওয়ায়েতের ভাষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। لَا تَمَسَّهَا—“তাকে স্পর্শ করো না”, فَإِنِّي قَدْ كَشَفْتُهَا—“কারণ আমি তার পর্দা উন্মোচন করেছি”, এবং لَا تَقْرَبْهَا—“তার কাছে যেয়ো না”—এসব ভাষা দাসীর ব্যক্তিগত সম্মতির ভাষা নয়; এগুলো পুরুষ-মালিকদের পারিবারিক যৌন-নিষেধের ভাষা। একজন পিতা নিজের পুত্রকে দাসী দান করছেন, আবার সেই দাসীর সঙ্গে সহবাসের অধিকার সীমিত করছেন নিজের পূর্ববর্তী যৌন ব্যবহার বা যৌন ইচ্ছার ভিত্তিতে। দাসী নিজে কাকে চায়, কাকে চায় না, তার সঙ্গে কার সহবাসে সম্মতি আছে—এই প্রশ্ন একবারও ওঠে না।

এখানেই ইসলামি দাসী-ব্যবস্থার আসল নৈতিক নগ্নতা ধরা পড়ে। দাসীর শরীর নিয়ে সিদ্ধান্ত হচ্ছে পিতা ও পুত্রের মধ্যে; দাসী নিজে সেই সিদ্ধান্তের পক্ষ নয়, বরং সিদ্ধান্তের বস্তু। পিতা চাইলে দাসী পুত্রকে দান করতে পারেন; আবার নিজের পূর্ববর্তী সহবাস বা সহবাসের ইচ্ছার কারণে পুত্রকে বলতে পারেন, “তার কাছে যেয়ো না।” অর্থাৎ প্রশ্নটি দাসীর সম্মতি নয়, প্রশ্নটি পুরুষ-মালিকদের যৌন-অধিকার ও নিষিদ্ধতার সীমা। যে ব্যবস্থায় নারী নিজেই মালিকানাধীন বস্তু, সেখানে “সম্মতি ছিল” বলা সরাসরি প্রতারণা।

এই রেওয়ায়েতকে নবীর হাদিস হিসেবে নয়, বরং প্রাথমিক ইসলামি আইন-সংস্কৃতির একটি সহায়ক দলিল এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের সময়কালের একটি চিত্র হিসেবে পড়তে হবে। এই দিক থেকে এর প্রাসঙ্গিকতা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি দেখায়, দাসীকে নিয়ে ফিকহি আলোচনার ভাষায় স্বাধীন সম্মতি, দেহগত স্বায়ত্তশাসন বা প্রত্যাখ্যানের অধিকার অনুপস্থিত; সেখানে আছে মালিকানা, সহবাসের অধিকার, পূর্ব-সহবাসজনিত নিষেধ এবং পুরুষদের পারস্পরিক সীমা নির্ধারণ। ফিকহি ভাষায় দাসীকে স্বাধীন ব্যক্তি হিসেবে নয়, পুরুষের যৌন ব্যবহারের আইনগত ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

বিষয়রেওয়ায়েতে যা দেখা যায়সম্মতির প্রশ্নে তাৎপর্য
দাসী দানপিতা পুত্রকে দাসী দান করছেনদাসী নিজে সম্পর্কের পক্ষ নয়; সে হস্তান্তরযোগ্য সম্পত্তি
পূর্ব-সহবাসউমর বলেন, “আমি তার পর্দা উন্মোচন করেছি”পুরুষের পূর্ববর্তী যৌন ব্যবহার পুত্রের যৌন অধিকার সীমিত করছে
যৌন ইচ্ছাসালিম বলেন, “আমি তাকে চেয়েছিলাম”দাসীর ওপর পুরুষের যৌন-ইচ্ছাই আইনি সীমা তৈরির বিষয়
দাসীর অবস্থানসে কার সঙ্গে থাকতে চায়, তা জিজ্ঞাসিত নয়স্বাধীন সম্মতি বা প্রত্যাখ্যান এখানে অপ্রাসঙ্গিক

মুয়াবিয়ার সামনে নগ্ন দাসী: সম্মতির নিদর্শন?

মুয়াত্তা মালিকের রেওয়ায়েতে আমরা দেখলাম, দাসীকে পিতা পুত্রকে দান করছেন, আবার নিজের পূর্ববর্তী সহবাস বা সহবাসের ইচ্ছার কারণে পুত্রের যৌন-অধিকার সীমিত করছেন। একই মানসিকতার আরও নগ্ন রূপ দেখা যায় আমীর মুয়াবিয়ার একটি ঐতিহাসিক বর্ণনায়। এখানে দাসীর শরীরকে শুধু মালিকানাধীন যৌন-সম্পত্তি হিসেবে দেখা হয়নি; তাকে নগ্ন করে দরবারে উপস্থাপন করা হয়েছে, তার বিশেষ অঙ্গের দিকে দণ্ড দিয়ে ইঙ্গিত করা হয়েছে, এবং তাকে পুত্র ইয়াযীদের কাছে পাঠানো যাবে কি না—সেই সিদ্ধান্তও পুরুষদের মধ্যে আলোচিত হয়েছে। দাসী নিজে কী চায়, তার লজ্জা, সম্মতি, অস্বীকৃতি বা দেহগত অধিকার—এসব কিছুই আলোচনার বিষয় নয়।

ইবনে কাসীরের আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-তে ইবনে আসাকিরের সূত্রে মুয়াবিয়ার আযাদকৃত গোলাম খাদীজের জীবনী প্রসঙ্গে এই ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। বর্ণনায় বলা হয়, মুয়াবিয়া একটি সুন্দরী ও ফর্সা দাসী ক্রয় করেন। এরপর দাসীটিকে বিবস্ত্র অবস্থায় তাঁর সামনে আনা হয়। তাঁর হাতে একটি দণ্ড ছিল, এবং তিনি সেই দণ্ড দিয়ে দাসীর বিশেষ অঙ্গের দিকে নির্দেশ করে বলেন, “এই সম্ভোগ অঙ্গ যদি আমার হতো!” এরপর তিনি দাসীটিকে তাঁর পুত্র ইয়াযীদের কাছে পাঠাতে চান। কিন্তু পরে একজন তাঁকে সতর্ক করেন যে, যেহেতু তিনি দাসীটির নগ্ন দেহ ও বিশেষ অঙ্গ কামভাব নিয়ে দেখেছেন, তাই সে ইয়াযীদের জন্য আর হালাল থাকবে না। তখন মুয়াবিয়া সিদ্ধান্ত বদলে দাসীটিকে অন্য এক আযাদকৃত গোলামকে দান করেন। [3] [4]

ইবনে আসাকির হযরত মু’আবিয়ায় আযাদকৃত গোলাম খোঁজা খাদীজের জীবনী আলোচনা প্রসঙ্গে তার উদ্ধৃতিতে উল্লেখ করেছেন,
“একবার মুয়াবিয়া একটি সুন্দরী ও ফর্সা বাঁদী ক্রয় করলেন। এরপর আমি তাকে বিবস্ত্র অবস্থায় তার সামনে পেশ করলাম। এ সময় তার হাতে একটি দণ্ড ছিল। তিনি তা দ্বারা তার বিশেষ অঙ্গের প্রতি নির্দেশ করে বলেন, এই সম্ভোগ অঙ্গ যদি আমার হতো! তুমি তাকে ইয়াযীদ বিন মুয়াবিয়ার কাছে নিয়ে যাও।
… রাবী যখন তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করলেন, তখন তিনি তাকে বলেন, এই বাঁদীকে বিবস্ত্র অবস্থায় আমার সামনে আনা হয়েছে এবং আমি তার বিশেষ বিশেষ অঙ্গ দেখেছি, এখন আমি তাকে ইয়াযীদের কাছে পাঠাতে চাই। তিনি বললেন, না, আমীরুল মুমিনীন! আপনি তা করবেন না। কেননা, সে তার জন্য আর হালাল হবে না। তিনি বলেন, তুমি অতি উত্তম রায় প্রদান করেছ।
রাবী বলেন, এরপর তিনি হযরত ফাতিমা (রা)-এর আযাদকৃত গোলাম আবদুল্লাহ বিন মাসআদা আল-ফাযারীকে বাঁদীটি দান করেন। আর সে ছিল কৃষ্ণাঙ্গ, তাই তিনি তাকে বলেন, এর মাধ্যমে তোমার সন্তানাদিকে ফর্সা করে নাও। এ ঘটনা হযরত মুয়াবিয়ার ধর্মীয় বিচক্ষণতা ও অনুসন্ধিৎসার পরিচায়ক। যেহেতু তিনি কামভাবের সাথে বাঁদীটির দিকে তাকিয়ে ছিলেন। কিন্তু তার ব্যাপারে নিজেকে দুর্বল গণ্য করেন এবং তাকে গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকেন; তাই তিনি নিম্নের আয়াতের কারণে বাঁদীটি তার পুত্র ইয়াযীদকে দান করা থেকে বিরত থেকেছেন।”

সম্মতি
সম্মতি 1

এই বর্ণনাটির ভয়াবহতা শুধু নগ্নতা বা কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যে নয়; এর আসল ভয়াবহতা হলো, দাসীটির পুরো অস্তিত্ব পুরুষদের যৌন-আইনি হিসাবের বস্তুতে পরিণত হয়েছে। তাকে কেনা হচ্ছে, নগ্ন করে দেখা হচ্ছে, তার অঙ্গ নিয়ে মন্তব্য করা হচ্ছে, পুত্রের কাছে পাঠানোর কথা হচ্ছে, আবার শরিয়তি নিষেধের কারণে অন্য পুরুষকে দান করা হচ্ছে। কিন্তু কোথাও প্রশ্ন নেই—দাসীটি নিজে কী চায়? সে কাকে গ্রহণ করতে চায়? তাকে নগ্ন করে পেশ করার অনুমতি সে দিয়েছে কি না? তার লজ্জা, অপমান বা দেহগত স্বাধীনতার কোনো মূল্য আছে কি না?

আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, ইবনে কাসীর এই ঘটনাকে মুয়াবিয়ার “ধর্মীয় বিচক্ষণতা” হিসেবেও উপস্থাপন করেছেন, কারণ তিনি কামভাব নিয়ে দাসীর নগ্ন দেহ দেখলেও শেষ পর্যন্ত শরিয়তের বিধান মেনে তাকে নিজের পুত্রের কাছে পাঠাননি। অর্থাৎ নৈতিক সমস্যাটি ছিল না—একজন দাসীকে নগ্ন করে দরবারে আনা হয়েছে, দণ্ড দিয়ে তার যৌনাঙ্গের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, তাকে সম্ভোগের বস্তু হিসেবে আলোচনা করা হয়েছে। নৈতিক বা আইনি সমস্যা হিসেবে দেখা হয়েছে শুধু এই প্রশ্নকে: পিতা যাকে কামভাব নিয়ে দেখেছে, সে পুত্রের জন্য হালাল থাকবে কি না। এই এক জায়গাতেই পুরো দাসী-ব্যবস্থার নৈতিক দেউলিয়াপনা ধরা পড়ে।

ঘটনাবর্ণনায় যা দেখা যায়সম্মতির প্রশ্নে তাৎপর্য
দাসী ক্রয়মুয়াবিয়া সুন্দরী ও ফর্সা দাসী ক্রয় করেনদাসীকে বাজারযোগ্য সম্পত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে
নগ্ন উপস্থাপনদাসীকে বিবস্ত্র অবস্থায় সামনে আনা হয়তার লজ্জা বা অনুমতির কোনো প্রশ্ন নেই
অঙ্গ নির্দেশদণ্ড দিয়ে তার বিশেষ অঙ্গের দিকে ইঙ্গিত করা হয়নারী-দেহকে প্রকাশ্য যৌন পর্যবেক্ষণের বস্তু করা হয়েছে
পুত্রের কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্তমুয়াবিয়া তাকে ইয়াযীদের কাছে পাঠাতে চানদাসী নিজে নয়, পুরুষ মালিকেরা তার যৌন ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছেন
শরিয়তি নিষেধপিতা কামভাব নিয়ে দেখলে পুত্রের জন্য হালাল নয়সমস্যা দাসীর সম্মতি নয়; সমস্যা পুরুষদের পারিবারিক যৌন-নিষেধ
অন্য পুরুষকে দানশেষে দাসীটিকে অন্য আযাদকৃত গোলামকে দান করা হয়দাসী হস্তান্তরযোগ্য যৌন-সম্পত্তি হিসেবেই থাকে

এই ঘটনাকে মুয়াত্তা মালিকের রেওয়ায়েতের পাশে রাখলে একটি ধারাবাহিক চিত্র দাঁড়ায়। একদিকে পিতা পুত্রকে দাসী দান করে বলছেন, “তার কাছে যেয়ো না, কারণ আমি তাকে ব্যবহার করেছি বা চাইছিলাম।” অন্যদিকে মুয়াবিয়ার দরবারে দাসীকে নগ্ন করে দেখা হচ্ছে, পুত্রের জন্য পাঠানোর কথা হচ্ছে, পরে শরিয়তি নিষেধের কারণে অন্য পুরুষকে দেওয়া হচ্ছে। দুই ক্ষেত্রেই দাসী মানুষের মর্যাদা নিয়ে উপস্থিত নয়; সে পুরুষের মালিকানা, কামনা, নিষেধ, হস্তান্তর ও বংশবিস্তারের হিসাবের বস্তু। এই ব্যবস্থাকে “সম্মতিমূলক সম্পর্ক” বলা ইতিহাসের পাঠ নয়; এটি ইসলামি দাসপ্রথার কদর্য বাস্তবতা ঢাকার নির্লজ্জ এপোলোজেটিক মিথ্যাচার।


রওজাতুত তালেবীন (Rawdat at-Taalibeen)- দাসী সংক্রান্ত বিধান

ইসলামি আইনশাস্ত্র বা ফিকহ্-এর ইতিহাসে ‘রওজাতুত তালেবীন ওয়া উমদাতুল মুফতীন’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আকর গ্রন্থ। এটি শাফি’ঈ মাযহাবের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে গণ্য। কিতাবটি রচনা করেছেন জগদ্বিখ্যাত ইসলামিক মুহাদ্দিস ও ফকিহ ইমাম মুহিউদ্দিন আবু জাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবনে শরাফ আন-নববী (র.) (মৃত্যু: ৬৭৬ হিজরি)। তিনি অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে এই গ্রন্থে ইবাদত, মুয়ামালাত (লেনদেন) এবং পারিবারিক আইনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়গুলো আলোচনা করেছেন। বিশেষ করে ফতোয়া প্রদানের ক্ষেত্রে এই গ্রন্থটিকে শাফি’ঈ ঘরানায় চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়।


মূল আরবি পাঠ (নির্বাচিত অংশ) – এই অংশে দাসী ও সংশ্লিষ্ট মাসআলা সংক্রান্ত মূল ইবারত নিচে দেওয়া হলো, [5]

ويحرم على الزوجة والأمة تحريما غليظا أن تمتنع إذا طلبها للاستمتاع الجائز
It is strongly forbidden for a wife or slave concubine to refuse when her husband or master seeks permissible sexual intimacy from her.
— Rawdat at-Taalibeen

বাংলা অনুবাদঃ “…এবং স্ত্রী বা দাসীর জন্য (মালিক বা স্বামীর) বৈধ উপভোগের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে নিজেকে বিরত রাখা কঠোরভাবে হারাম।

অনুবাদের সারসংক্ষেপঃ উপরিউক্ত অংশে ইমাম নববী দাসী সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি দিক স্পষ্ট করেছেন: ইসলামী শরিয়তে, একজন দাসী যখন নির্দিষ্ট মালিকের অধীনে থাকতেন, তখন মালিকের বৈধ শারীরিক চাহিদায় সাড়া দেওয়া তার জন্য বাধ্যতামূলক। শরিয়ত অনুযায়ী বিনা কারণে এতে বাধা দেওয়াকে বড় গুনাহ বা ‘হারাম’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এই শরীয়া বিধান থেকে বোঝা যায় যে, ইসলামি আইনে দাসী ও মালিকানা সম্পর্কের ক্ষেত্রে মালিকের ইচ্ছাকেই আইন হিসেবে অনুসরণ করা হতো, দাসীর সম্মতির কোন প্রয়োজনই ছিল না।

আসুন সরাসরি বই থেকে দেখে নেয়া যাক,

সম্মতি 3

আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যাহ (Al-Mawsoo’ah al-Fiqhiyyah)

আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যাহ (Al-Mawsoo’ah al-Fiqhiyyah) বা Encyclopedia of Islamic Jurisprudence ইসলামি আইনশাস্ত্র বা ফিকহ্-এর ইতিহাসে এক অনন্য ও বিশাল কর্মযজ্ঞ। এটি কোনো একক ব্যক্তির লেখা গ্রন্থ নয়, বরং একটি রাষ্ট্রীয় তদারকিতে সংকলিত আধুনিক যুগের সবচেয়ে বড় ফিকহ্ বিশ্বকোষ। এটি কুয়েতের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের (Ministry of Awqaf and Islamic Affairs, Kuwait) অধীনে একটি বিশেষজ্ঞ আলেম প্যানেলের মাধ্যমে সম্পাদিত হয়েছে। Mawsoo’ah al-Fiqhiyyah-তে বলা হয়েছে [6]

كَضَرْبِ أُمَيَّتِكَ (١) وَقَوْلِهِ: لاَ يَجْلِدُ أَحَدُكُمُ امْرَأَتَهُ جَلْدَ الْعَبْدِ ثُمَّ يُجَامِعُهَا فِي آخِرِ الْيَوْمِ (٢) . وَلِلسَّيِّدِ أَنْ يُقَيِّدَ عَبْدَهُ إِذَا خَافَ عَلَيْهِ الإِْبَاقَ (٣) .
١٩ – سَابِعًا: لِلسَّيِّدِ حَقُّ وَطْءِ مَمْلُوكَتِهِ مَا لَمْ يَمْنَعْ مِنْ ذَلِكَ مَانِعٌ شَرْعِيٌّ، كَأَنْ تَكُونَ حَائِضًا أَوْ نُفَسَاءَ أَوْ مُزَوَّجَةً، أَوْ كَافِرَةً غَيْرَ كِتَابِيَّةٍ، أَوْ تَكُونَ مُرْتَدَّةً أَوْ غَيْرَ ذَلِكَ، أَوْ فِيهَا شِرْكٌ لِغَيْرِهِ، فَإِذَا وُطِئَتْ تَكُونُ سَرِيَّةً، إِلاَّ أَنَّهَا إِنْ كَانَتْ مُزَوَّجَةً ثُمَّ مُلِكَتْ بِالسَّبْيِ جَازَ لِمَالِكِهَا فَسْخُ نِكَاحِهَا ثُمَّ وَطْؤُهَا بَعْدَ الاِسْتِبْرَاءِ. وَلِلاِسْتِمْتَاعِ بِالإِْمَاءِ أَحْكَامٌ وَضَوَابِطُ شَرْعِيَّةٌ تُنْظَرُ فِي مَوْضِعِهَا مِمَّا يَلِي. وَفِي مُصْطَلَحِ: (تَسَرِّي) . وَيَجِبُ عَلَى الْمَمْلُوكَةِ أَنْ تُمَكِّنَ سَيِّدَهَا مِنْ نَفْسِهَا لِلاِسْتِمْتَاعِ، وَيَحْرُمُ عَلَيْهَا الاِمْتِنَاعُ مِنْ ذَلِكَ لأَِنَّهُ مَنْعُ حَقٍّ، مَا لَمْ تَكُنْ مُحَرَّمَةً عَلَيْهِ، أَوْ

১৯। মালিকের অধিকার আছে তার মালিকানাধীন দাসীকে (যাকে বন্দি বা ক্রয় করে আনা হয়েছে) ভোগ করার, যদি এর মাঝে কোনো শরয়ী (ধর্মীয় আইনসম্মত) বাধা না থাকে। যেমনঃ
– যদি সে ঋতুমতী হয়,
– সন্তান জন্মের পর প্রসূতি অবস্থায় থাকে,
– সে যদি বিবাহিতা হয়,
– যদি সে অমুসলিম হয় এবং কিতাবি (ইহুদি/খ্রিস্টান) না হয়,
– যদি সে ইসলাম ছেড়ে মুরতাদ হয়ে যায়,
– অথবা তার মালিকানায় অন্য কারও অংশীদারত্ব থাকে।
এইসব ক্ষেত্রে সহবাস বৈধ নয়।
তবে, যদি সে বিবাহিতা থাকে এবং যুদ্ধবন্দি হয়ে মালিকানায় আসে, তাহলে মালিকের অধিকার আছে তার আগের বিয়ে ভেঙে দেওয়ার (নিকাহ ফাসখ) পর, ইস্তিবরার (অর্থাৎ তার গর্ভে সন্তান আছে কিনা যাচাই করার জন্য এক মাসিককাল অপেক্ষা করা) পর তাকে ভোগ করার।
‘তাসাররি’ (تَسَرِّي) পরিভাষাঃ দাসীদের সাথে ভোগ-সুখ (সহবাস) গ্রহণ করার বিষয়টি ইসলামে একটি নির্দিষ্ট শরয়ী বিধান ও নিয়মাবলীর অধীনে স্থির করা হয়েছে। এটি “তাসাররি” নামে পরিচিত।
দাসীর কর্তব্য
দাসীর জন্য এটি আবশ্যক ও অবশ্য কর্তব্য যে, সে তার মালিককে নিজের দেহ-উপভোগ করতে দেবে। তার জন্য এটি থেকে বিরত থাকা নিষিদ্ধ, কারণ এটি মালিকের অধিকার বলে ধরা হয়েছে। তবে, যদি সে এমন অবস্থায় থাকে যেখানে মালিকের জন্য হারাম (নিষিদ্ধ)—যেমন ঋতুমতী, প্রসূতি, বা অন্য কোনো শরয়ী কারণ—তাহলে সে বাধা দিতে পারবে।

সম্মতি 5

অর্থাৎ, দাসীর সম্মতির কোনো মূল্য নেই; তার কর্তব্য হলো তার মালিককে খুশি রাখা, সন্তুষ্ট রাখা এবং যখনই তার মালিক চাইবে শরীয়া সম্মত কোন কারণ (যেমন মারাত্মক অসুস্থতা) না থাকলে তাকে যৌনসুখ প্রদান করা।


আল-মুহাল্লা বিল-আসার (Al-Muhalla bi’l-Aathaar)

আল-মুহাল্লা বিল-আসার হলো ইমাম ইবনে হাজম আল-আন্দালুসি (র.) রচিত ফিকহ্ শাস্ত্রের একটি কিংবদন্তি গ্রন্থ। এটি জাহিরি মাজহাবের প্রধান নির্ভরযোগ্য আকর। এই গ্রন্থে ইমাম ইবনে হাজম কুরআন ও সুন্নাহর সরাসরি পাঠের ওপর ভিত্তি করে ইসলামি আইনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং যুক্তি বা অনুমানের (কিয়াস) পরিবর্তে দলিলকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তুলনামূলক আইনশাস্ত্র বা ‘ইখতিলাফুল ফুকাহা’ (আলেমদের মতভেদ) বোঝার জন্য এই গ্রন্থটিকে ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই গ্রন্থে দাসী ও স্ত্রীর সম্মতি (Consent) এবং তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে,

[مَسْأَلَةٌ فَرْضُ الْأَمَةِ وَالْحُرَّةِ أَنْ لَا يَمْنَعَا السَّيِّدَ وَالزَّوْجَ الْجِمَاعَ مَتَى دَعَاهُمَا]
অনুবাদ: স্বাধীন স্ত্রী এবং দাসী উভয়ের জন্য ফরজ (আবশ্যক) হলো তারা যেন স্বামী বা মালিককে সহবাসে বাধা না দেয় যখনই তিনি তাদের আহ্বান করেন।
“…مَسْأَلَةٌ: وَفَرْضُ الْأَمَةِ وَالْحُرَّةِ أَنْ لَا يَمْنَعَا السَّيِّدَ وَالزَّوْجَ الْجِمَاعَ مَتَى دَعَاهُمَا، مَا لَمْ تَكُنْ الْمَدْعُوَّةُ حَائِضًا، أَوْ مَرِيضَةً تَتَأَذَّى بِالْجِمَاعِ، أَوْ صَائِمَةَ فَرْضٍ، فَإِنْ امْتَنَعَتْ لِغَيْرِ عُذْرٍ، فَهِيَ مَلْعُونَةٌ…”
অনুবাদ: “দাসীর ওপর এবং স্বাধীন স্ত্রীর ওপর এটি আবশ্যকীয় কর্তব্য যে, মালিক বা স্বামী যখনই তাদের মেলামেশার জন্য ডাকবেন, তারা যেন বাধা না দেয়— যতক্ষণ না সেই নারী ঋতুবতী হয়, অথবা এমন অসুস্থ হয় যে সহবাসে অনেক কষ্ট হবে, কিংবা ফরজ রোজা পালনকারী হয়। যদি কোনো ওজর (উপযুক্ত কারণ) ছাড়া সে বিরত থাকে, তবে সে অভিশপ্ত।”
“…عَنْ النَّبِيِّ – صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ – قَالَ: «إذَا بَاتَتْ الْمَرْأَةُ مُهَاجِرَةً إلَى زَوْجِهَا أَوْ فِرَاشِ زَوْجِهَا لَعَنَتْهَا الْمَلَائِكَةُ حَتَّى تَرْجِعَ»…”
অনুবাদ: “…নবীজি (সা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: যদি কোনো নারী তার স্বামীর বিছানা ত্যাগ করে (বিমুখ হয়ে) রাত কাটায়, তবে ফিরে না আসা পর্যন্ত ফেরেশতারা তাকে অভিশাপ দিতে থাকে।”
“…قَالَ رَسُولُ اللَّهِ – صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ -: «إذَا دَعَا الرَّجُلُ زَوْجَتَهُ لِحَاجَتِهِ فَلْتَأْتِهِ وَإِنْ كَانَتْ عَلَى التَّنُّورِ»…”
অনুবাদ: “…রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: যখন কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে নিজ প্রয়োজনে (শারীরিক চাহিদা মেটাতে) ডাকে, সে যেন অবশ্যই আসে— এমনকি সে যদি চুলার (রান্নার) কাজেও ব্যস্ত থাকে।”

আসুন এই গ্রন্থ থেকে দেখে নেয়া যাক, [7]

সম্মতি 7

সালিহ আল মুনাজ্জিদ (islamqa.info)

ইসলামের আরেকটি সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য ফতোয়া ওয়েবসাইট Islamqa-এর একটি ফতোয়া Fatwa No. 33597- এ বলা হয়েছে [8]

إجبار الزوج زوجته على الجماع
السؤال: 33597
هل يجوز للرجل أن يُجبر زوجته أو أمته على الجماع إذا رفضت ؟.
الجواب
الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله، وبعد:
ليس للمرأة أن تمنع نفسها من زوجها ، بل يجب عليها أن تلبي طلبه كلما دعاها ما لم يضرها أو يشغلها عن واجب .
روى البخاري (3237) ومسلم (1436) عن أبي هريرة رضي الله عنه قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : ( إذا دعا الرجل امرأته إلى فراشه فأبت فبات غضبان عليها لعنتها الملائكة حتى تصبح ) .
فإن امتنعت من غير عذر كانت عاصية ناشزا ، تسقط نفقتها وكسوتها .
وعلى الزوج أن يعظها ويخوفها من عقاب الله ، ويهجرها في المضجع ، وله أن يضربها ضرباً غير مُبَرِّح، قال الله تعالى :
( وَاللاتِي تَخَافُونَ نُشُوزَهُنَّ فَعِظُوهُنَّ وَاهْجُرُوهُنَّ فِي الْمَضَاجِعِ وَاضْرِبُوهُنَّ فَإِنْ أَطَعْنَكُمْ فَلا تَبْغُوا عَلَيْهِنَّ سَبِيلًا إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيًّا كَبِيرًا ) النساء/34 .
وسئل شيخ الإسلام ابن تيمية رحمه الله عما يجب على الزوج إذا منعته من نفسها إذا طلبها ؟ فأجاب : ( لا يحل لها النشوز عنه ، ولا تمنع نفسها منه ، بل إذا امتنعت منه وأصرت على ذلك فله أن يضربها ضربا غير مبرح ، ولا تستحق نفقة ولا قسما ) مجموع الفتاوى 32/279 .
وسئل عن رجل له زوجة وهي ناشز تمنعه نفسها فهل تسقط نفقتها وكسوتها وما يجب عليها ؟
فأجاب : ( تسقط نفقتها وكسوتها إذا لم تمكنه من نفسها ، وله أن يضربها إذا أصرت على النشوز . ولا يحل لها أن تمتنع من ذلك إذا طالبها به ، بل هي عاصية لله ورسوله ، وفي الصحيح : ” إذا طلب الرجل المرأة إلى فراشه فأبت عليه كان الذي في السماء ساخطا عليها حتى تصبح ” )
انتهى من مجوع الفتاوى 32/278 ، والحديث رواه مسلم (1736) .
فينبغي وعظ الزوجة أولا ، وتحذيرها من النشوز وغضب الله عليها ولعنة الملائكة لها ، فإن لم تستجب هجرها الزوج في الفراش ، فإن لم تستجب ضربها ضربا غير مبرح ، فإن لم ينفع معها ذلك ، منع عنها النفقة والكسوة ، وله أن يطلقها أو يخالعها لتفتدي منه بمالها .
وكذلك الأمة ليس لها أن تمتنع من تلبية رغبة سيدها إلا من عذر ، فإن فعلت كانت عاصية ، وله أن يؤدبها بما يراه مناسباً وأذن الشرع به .
والله أعلم .

প্রশ্ন নং: 33597
প্রশ্ন:
কোনো পুরুষ কি তার স্ত্রী বা দাসীকে জোর করে সহবাসে বাধ্য করতে পারবে, যদি সে অস্বীকার করে?
উত্তর
আল্লাহর প্রশংসা এবং রাসূল ﷺ-এর প্রতি দরূদ ও সালাম:
নারীর জন্য বৈধ নয় যে, সে নিজেকে স্বামী থেকে বিরত রাখবে। বরং তার উচিত স্বামীর আহ্বানে সাড়া দেওয়া, যখনই স্বামী তাকে আহ্বান করে, যদি না এমন কোনো ক্ষতি বা অজুহাত থাকে যা তাকে বৈধভাবে বিরত রাখে।
সহীহ বুখারী (হাদিস 3237) ও সহীহ মুসলিমে (হাদিস 1436) আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“যখন কোনো পুরুষ তার স্ত্রীকে শয্যায় আহ্বান করে, আর সে অস্বীকার করে, তখন স্বামী রাগ করে রাত কাটালে ফেরেশতারা তাকে (স্ত্রীকে) সকাল পর্যন্ত লানত করতে থাকে।”
সুতরাং, যদি কোনো নারী অকারণে অস্বীকৃতি জানায়, তবে তাকে অবাধ্য গণ্য করা হবে, এবং এর ফলে তার ভরণপোষণ ও পোশাকের অধিকার নষ্ট হয়ে যাবে।
স্বামীর কর্তব্য হলো, তাকে (স্ত্রীকে) আল্লাহর ভয় দেখানো ও উপদেশ দেওয়া; যদি না শোনে, তবে তাকে শয্যা থেকে পৃথক করা; আর তাতেও কাজ না হলে হালকা প্রহার করা—কিন্তু এমন প্রহার নয় যা আঘাত বা ক্ষত সৃষ্টি করে। আল্লাহ বলেন:
“আর যেসব নারীর অবাধ্যতার আশঙ্কা কর, তাদের উপদেশ দাও, তাদের শয্যা ত্যাগ কর, এবং প্রহার কর; তারপর যদি তারা অনুগত হয়, তবে তাদের বিরুদ্ধে অন্য কোনো পথ অবলম্বন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বোচ্চ, মহান।” (সূরা নিসা ৪:৩৪)
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.) বলেছেন:
স্ত্রীর জন্য বৈধ নয় যে, সে নিজেকে স্বামী থেকে বিরত রাখবে। বরং যখন স্বামী আহ্বান করবে, তখনই তার সাড়া দেওয়া ওয়াজিব, যদি না শরীয়তসম্মত কোনো কারণ থাকে যা তাকে বিরত রাখে। (মাজমূআ ফাতাওয়া ৩২/২৭৯)

প্রশ্ন:
যদি কোনো পুরুষ তার স্ত্রীর ভরণপোষণ ও পোশাক দেয়, অথচ স্ত্রী তাকে (সহবাসে) নিজেকে দিতে অস্বীকৃতি জানায়—এক্ষেত্রে কী হবে?
উত্তর:
সে (স্ত্রী) যদি বৈধ অজুহাত ছাড়াই স্বামীকে নিজেকে না দেয়, তবে তার ভরণপোষণ ও পোশাকের অধিকার বাতিল হয়ে যাবে। আর তাকে প্রহার করা বৈধ হবে, তবে এমনভাবে নয় যে এতে গুরুতর ক্ষতি হয়।
তবে শরীয়তসম্মত কোনো অজুহাত থাকলে স্ত্রীকে গোনাহগার বা অবাধ্য গণ্য করা হবে না।
উপসংহার
স্ত্রীর জন্য স্বামীর আহ্বান অকারণে প্রত্যাখ্যান করা বৈধ নয়।
অকারণে অস্বীকার করলে ফেরেশতাদের লানতের শিকার হবে, এবং তার ভরণপোষণ ও পোশাকের অধিকার নষ্ট হবে।
স্বামীকে প্রথমে উপদেশ দিতে হবে, তারপর শয্যা আলাদা করতে হবে, এবং প্রয়োজনে হালকা প্রহার করতে পারবে।

শরীয়তসম্মত কারণ থাকলে স্ত্রী অস্বীকৃতি জানাতে পারবে, এবং সেক্ষেত্রে দায় স্বামীর ওপর বর্তাবে।
ইবনে তাইমিয়ার মাজমু’আ ফাতাওয়া থেকে উদ্ধৃতি শেষ হলো (৩২/২৭৮)। আর হাদিসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে (১৭৩৬)।
অতএব, প্রথমে স্বামীর উচিত স্ত্রীকে উপদেশ দেওয়া, তাকে অবাধ্যতার (নুশূজ) ভয় দেখানো, আল্লাহর শাস্তির ভয় দেখানো, ফেরেশতাদের লানতের কথা স্মরণ করানো। যদি স্ত্রী তারপরও সাড়া না দেয়, তবে স্বামী শয্যা ত্যাগ করে তার থেকে দূরে থাকবে। যদি তবুও সে সাড়া না দেয়, তবে তাকে এমনভাবে প্রহার করতে পারবে, যা গুরুতর বা ক্ষতসৃষ্টিকারী নয়। যদি তবুও কোনো উপকার না হয়, তবে স্বামী তার ভরণপোষণ ও পোশাক বন্ধ করে দিতে পারে, এমনকি চাইলে তাকে তালাক দিতে পারে অথবা অর্থের বিনিময়ে খুলার মাধ্যমে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে।
একইভাবে, দাসীর ক্ষেত্রেও—তার জন্য বৈধ নয় যে, সে কোনো অজুহাত ছাড়া মালিকের যৌন চাহিদা পূরণ থেকে বিরত থাকবে। যদি বিরত থাকে, তবে সে গুনাহগার হবে। আর মালিকের অধিকার আছে তাকে শাস্তি দেওয়ার এবং যেভাবে উপযুক্ত মনে করে, শরীয়তের অনুমোদিত সীমার মধ্যে তার ওপর ব্যবস্থা নেওয়ার।
আল্লাহই সর্বাধিক জানেন।


Islamweb-এ সংরক্ষিত আল-মুহাল্লার পাঠ: স্ত্রী ও দাসীর যৌন অস্বীকৃতি

আরেকটি অত্যন্ত বিখ্যাত ফতোয়া ওয়েবসাইট Islamweb-এ প্রকাশিত ইবনে হাজমের গুরুত্বপূর্ণ ফিকহগ্রন্থ আল-মুহাল্লার বক্তব্যতেও একই কথা পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে: [9]

معلومات الكتاب
المحلى بالآثار
ابن حزم الأندلسي – علي بن أحمد بن سعيد بن حزم
إظهار / إخفاء التشكيل بحث في الكتاب
1883 – مسألة : وفرض الأمة والحرة أن لا يمنعا السيد والزوج الجماع متى دعاهما ، ما لم تكن المدعوة حائضا ، أو مريضة تتأذى بالجماع ، أو صائمة فرض ، فإن امتنعت لغير عذر ، فهي ملعونة . روينا من طريق مسلم نا ابن أبي عمر نا مروان – هو ابن معاوية الفزاري – عن يزيد بن كيسان عن أبي حازم عن أبي هريرة قال : قال رسول الله صلى الله عليه وآله وسلم { والذي نفسي بيده ما من رجل يدعو امرأته إلى فراشها فتأبى عليه إلا كان الذي في السماء ساخطا عليها حتى يرضى عنها } .
نا حمام نا عباس بن أصبغ نا محمد بن عبد الملك بن أيمن نا بكر بن حماد نا مسدد نا يحيى – هو ابن سعيد القطان – نا شعبة عن قتادة عن زرارة بن أوفى عن أبي هريرة رضي الله عنه عن النبي صلى الله عليه وآله وسلم قال : { إذا باتت المرأة مهاجرة إلى زوجها أو فراش زوجها لعنتها الملائكة حتى ترجع } .
ومن طريق أحمد بن شعيب نا هناد بن السري عن ملازم بن عمرو نا عبد الله بن بدر عن قيس بن طلق عن أبيه طلق بن علي قال : سمعت رسول الله صلى الله عليه وآله وسلم يقول : { إذا دعا الرجل زوجته لحاجته فلتأته وإن كانت على التنور } .

এবারে আসুন আল-মুহাল্লার মাসআলাটির বাংলা অনুবাদ দেখি,

আল-মুহাল্লার মাসআলা নম্বর ১৮৮৩
দাসী এবং স্ত্রী — উভয়ের জন্যই স্বামী বা মালিক যখন যৌন সম্পর্কের জন্য আহ্বান জানায়, তখন তা মেনে নেওয়া আবশ্যক।
দাসী বা স্বাধীন স্ত্রী ঋতুমতী, সহবাসে কষ্ট হয় এমন অসুস্থ কিংবা ফরজ রোজাদার না হলে মালিক বা স্বামীর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করতে পারবে না; বৈধ অজুহাত ছাড়া অস্বীকার করলে তাকে অভিশপ্ত বলা হয়েছে।
এটি মুসলিমের সূত্রে ইবনে আবী উমর, মারওয়ান ইবনে মুয়াবিয়া আল-ফাজারি, ইয়াজিদ ইবনে কাইসান ও আবূ হাজিমের মাধ্যমে আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ—কোনো পুরুষ তার স্ত্রীকে শয্যায় ডাকলে এবং সে অস্বীকার করলে, আকাশের অধিপতি তার ওপর অসন্তুষ্ট থাকেন, যতক্ষণ না স্বামী তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়।”
(সহীহ হাদিস: বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত)
অন্য সনদেও আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে একই বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে।
আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেছেন:
“যদি কোনো নারী রাত কাটায় এভাবে যে তার স্বামী তার শয্যা থেকে তাকে ডাকছে অথচ সে সাড়া দেয়নি, তাহলে ফেরেশতারা তাকে সকাল পর্যন্ত অভিশাপ দিতে থাকে।”
অন্য সূত্রে কায়েস ইবনে তালক তাঁর পিতা তালক ইবনে আলী থেকে বর্ণনা করেছেন; তালক ইবনে আলী বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি:
“যখন কোনো পুরুষ তার স্ত্রীকে নিজের প্রয়োজনে ডাকে, তখন সে যেন তার কাছে আসে—এমনকি সে চুলার কাজেও ব্যস্ত থাকলেও।”
সারসংক্ষেপঃ
স্ত্রী বা দাসী উভয়ের জন্য স্বামী/মালিকের যৌন আহ্বান প্রত্যাখ্যান করা বৈধ নয়, যদি না কোনো বৈধ শরয়ী অজুহাত থাকে।
অকারণে অস্বীকার করলে ফেরেশতাদের লানত ও আল্লাহর ক্রোধের শিকার হতে হবে।
এই হাদিসগুলোকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করে ফিকহবিদরা স্ত্রীর ওপর স্বামীর যৌন অধিকারের বাধ্যতামূলকতা প্রতিষ্ঠা করেছেন।

সম্মতি 9
সম্মতি 11

এখান থেকে স্পষ্ট হয় যে ইসলামি শরিয়াহ যুদ্ধবন্দী নারীর সম্মতি অস্বীকার করে এবং যৌন সম্পর্ককে প্রভুর আইনগত অধিকার হিসেবে ঘোষণা করে। এই বিষয়ে আধুনিক একাডেমিক গবেষণাও একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। Boston University-র ধর্ম ও ইসলামি আইনবিশেষজ্ঞ Kecia Ali তাঁর Cambridge University Press-এর International Journal of Middle East Studies-এ প্রকাশিত “Concubinage and Consent” গবেষণায় সরাসরি প্রশ্নটি পরীক্ষা করেছেন—প্রাথমিক যুগের মুসলিম ফকিহদের মতে একজন মালিকের নিজের দাসীর সঙ্গে যৌনসম্পর্ক বৈধ হওয়ার জন্য দাসীর সম্মতি নেওয়া কি আবশ্যক ছিল? আলী ৮ম থেকে ১০ম শতকের মালিকি, হানাফি, শাফিঈ ও হাম্বলি ফিকহি গ্রন্থ পর্যালোচনা করে জানান, মালিককে নিজের দাসীর যৌনসম্মতি নিতে হবে—এমন কোনো বিধান তিনি এসব মাযহাবের গ্রন্থে খুঁজে পাননি; তাঁর ভাষায়, এই প্রশ্নের উত্তর স্পষ্টতই “না” বলেই প্রতীয়মান হয়। বরং ফকিহগণ দাসীর অনুমতি ছাড়াই তাকে বিয়ে দেওয়ার অধিকার মালিককে দিয়েছেন এবং মালিক নিজের দাসীর সঙ্গে আযল করার ক্ষেত্রেও তার অনুমতিকে প্রয়োজনীয় মনে করেননি। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, classical fiqh-এর আইনগত কাঠামোয় নিজের দাসীর সঙ্গে অনিচ্ছাকৃত বা জবরদস্তিমূলক যৌনসম্পর্ককে মালিকের জন্য যিনা হিসেবে গণ্য করার ভিত্তিও ছিল না, কারণ মালিকানাই তার যৌন অধিকারের আইনগত উৎস হিসেবে বিবেচিত হতো। আলীর বিশ্লেষণে তাই প্রাক-আধুনিক ইসলামি ফিকহে যৌনসম্পর্কের ক্ষেত্রে নারীর স্বাধীন সম্মতির চেয়ে সেই যৌনসম্পর্ক শরিয়তে বৈধ না অবৈধ—এই প্রশ্নটিই ছিল মুখ্য। [10]


আযলের ক্ষেত্রেও দাসীর অনুমতির প্রয়োজন নেই

দাসীর যৌন সম্মতির প্রশ্নে হানাফি ফিকহের আরেকটি বিধান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। স্বাধীন স্ত্রী এবং মালিকানাধীন দাসীর মধ্যে পার্থক্য করতে গিয়ে আশরাফুল হিদায়া-তে সরাসরি বলা হয়েছে, স্ত্রীকে না জানিয়ে বা তার অনুমতি ছাড়া আযল করা যাবে না; কিন্তু নিজের দাসীর ক্ষেত্রে মালিক তার অনুমতি ছাড়াই আযল করতে পারে। আরও স্পষ্ট ভাষায় এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে—সহবাস স্বাধীন স্ত্রীর অধিকার, কিন্তু দাসীর সহবাসে এমন কোনো অধিকার নেই; ফলে দাসীর ক্ষেত্রে মালিক নিজেই এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। [11]

قَالَ: وَيَعْزِلُ عَنْ أَمَتِهِ بِغَيْرِ إِذْنِهَا، وَلَا يَعْزِلُ عَنْ زَوْجَتِهِ إِلَّا بِإِذْنِهَا ... وَلِأَنَّ الْوَطْءَ حَقُّ الْحُرَّةِ قَضَاءً لِلشَّهْوَةِ وَتَحْصِيلًا لِلْوَلَدِ ... وَلَا حَقَّ لِلْأَمَةِ فِي الْوَطْءِ، فَلِهَذَا لَا يُنْقَصُ حَقُّ الْحُرَّةِ بِغَيْرِ إِذْنِهَا، وَيَسْتَبِدُّ بِهِ الْمَوْلَى
অনুবাদ: ইমাম কুদুরী বলেন, মালিক নিজের দাসীর সঙ্গে সহবাসের সময় তার অনুমতি ছাড়াই আযল করতে পারবে; কিন্তু স্ত্রীর ক্ষেত্রে তার অনুমতি ছাড়া আযল করতে পারবে না। কারণ যৌন চাহিদা পূরণ এবং সন্তানলাভের দিক থেকে সহবাস স্বাধীন স্ত্রীর অধিকার। পক্ষান্তরে, সহবাসে দাসীর এমন কোনো অধিকার নেই। তাই স্বাধীন স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া তার অধিকার খর্ব করা যাবে না; কিন্তু দাসীর ক্ষেত্রে মালিক এ বিষয়ে এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

আশরাফুল হিদায়া, ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬২৫

এই বিধানটি সম্মতির প্রশ্নে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ফিকহ এখানে স্বাধীন স্ত্রী ও দাসীর মধ্যে পার্থক্য করছে ঠিক অনুমতির অধিকার দিয়েই। স্বাধীন স্ত্রীর একটি স্বীকৃত যৌন ও প্রজননগত অধিকার আছে, তাই তার অনুমতি প্রয়োজন; নিজের দাসীর ক্ষেত্রে সেই অধিকারই স্বীকৃত নয়, ফলে মালিক তার শরীরের প্রজননগত পরিণতি নিয়েও এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। অর্থাৎ দাসীর “আমি সন্তান চাই”, “আমি আযল চাই না”—এই সিদ্ধান্তও মালিককে আইনগতভাবে বাধ্য করে না। এর সঙ্গে যখন আগের বিধানগুলো পাশাপাশি রাখা হয়—দাসীর জন্য মালিকের যৌন আহ্বানে সাড়া দেওয়া আবশ্যক এবং অস্বীকার করা হারাম—তখন স্বাধীন যৌন সম্মতির অনুপস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।


দাসী অস্বীকার করলে জোরপূর্বক সহবাস: আল-শাবাকা আল-ইসলামিয়্যার ফতোয়া

দাসীর সম্মতি ইসলামি যৌন-দাসত্বের বৈধতার শর্ত ছিল কি না—এই প্রশ্নে ঘুরিয়ে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই, কারণ সমসাময়িক ইসলামি ফতোয়া প্রতিষ্ঠান আল-শাবাকা আল-ইসলামিয়্যা (Islamweb/Islamic Network)-এর একটি ফতোয়ায় প্রশ্নটিই সরাসরি করা হয়েছিল। প্রশ্নকারী জানতে চান, কোনো যুদ্ধবন্দিনী দাসী যদি তার মালিকের সঙ্গে যৌনসম্পর্ক করতে অস্বীকার করে, তাহলে মালিক কি তাকে প্রহার বা অন্য কোনো উপায়ে বাধ্য করতে পারবে? ফতোয়ার উত্তরেও দাসীর সম্মতিকে কোনো স্বাধীন অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি; বরং মালিকের যৌন দাবিকেই আইনগত অধিকার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফতোয়াটি ২৯ ডিসেম্বর ২০০৯ তারিখে আল-শাবাকা আল-ইসলামিয়্যা কর্তৃক প্রকাশিত এবং বর্তমানে আর্কাইভ আল-ইসলাম-এ সংরক্ষিত।

এই ফতোয়ার কাঠামোটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে পরিস্থিতি এমন নয় যে দাসী নীরব, তার মতামত জানা যায়নি, অথবা সম্মতির প্রশ্নটি উৎসে অনুল্লেখিত। বরং দাসী স্পষ্টভাবে যৌনসম্পর্ক প্রত্যাখ্যান করছে—তারপরও ফতোয়ার সিদ্ধান্ত হলো, মালিক তাকে সেই যৌনসম্পর্কে বাধ্য করতে পারে। কারণ হিসেবে দাসীর ইচ্ছা, দেহগত স্বাধীনতা বা যৌন স্বায়ত্তশাসনের কোনো মূল্য দেওয়া হয়নি; কারণ বলা হয়েছে, মালিক তার নিজের “অধিকার” আদায় করছে। অর্থাৎ এই ফিকহি কাঠামোয় দাসীর “না” কোনো কার্যকর ভেটো নয়; মালিকের মালিকানাভিত্তিক যৌন অধিকার তার প্রত্যাখ্যানের ওপর প্রাধান্য পায়। [12]

আরবি মূল:
أما إذا أراد سيدها الجماع وامتنعت عنه فإن له إجبارها عليه وليس ذلك بمستقبح لأنه يستوفي حقه
বাংলা অনুবাদ:
“কিন্তু তার মালিক যদি তার সঙ্গে সহবাস করতে চায় এবং সে তা প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে মালিক তাকে এতে বাধ্য করতে পারে; এটিকে নিন্দনীয় গণ্য করা হয় না, কারণ সে তার অধিকার আদায় করছে।”

এই বক্তব্যে সম্মতির প্রশ্নটি আর অনুমাননির্ভর থাকে না। দাসী যৌনসম্পর্কে অস্বীকার করেছে, অথচ তার সেই অস্বীকৃতি মালিকের যৌন অধিকার বাতিল করছে না; উল্টো তাকে বাধ্য করাকেই বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। আরও ভয়াবহ হলো এর নৈতিক ভাষা—জোরপূর্বক যৌনসম্পর্ককে শুধু অনুমোদন করেই থামা হয়নি, বরং বলা হয়েছে এটি “নিন্দনীয় নয়”, কারণ মালিক তার “অধিকার” আদায় করছে। অর্থাৎ যে ব্যবস্থায় একজন মালিকানাধীন নারী স্পষ্টভাবে “না” বলার পরও তার মালিক তাকে যৌনসম্পর্কে বাধ্য করতে পারে, সেখানে সম্মতি কোনো স্বাধীন নৈতিক বা আইনগত শর্ত নয়। আধুনিক consent-based সংজ্ঞায় এটি সরাসরি সম্মতিহীন যৌনসম্পর্ক; ইসলামি যৌন-দাসত্বের ফিকহি কাঠামোয় সেই একই ঘটনাকে মালিকের অধিকার প্রয়োগ হিসেবে বৈধতা দেওয়া হয়েছে।


আযলেও দাসীর মতামতের কোনো মূল্য নেই: ইবন আবদুল বার

দাসীর যৌনজীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার নিজের মতামতের অবস্থান কী ছিল, তা ইবন আবদুল বারের আল-তামহীদ গ্রন্থে আযল বা coitus interruptus-এর আলোচনা অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে দেখিয়ে দেয়। এখানে প্রশ্নটি কেবল গর্ভধারণ প্রতিরোধের একটি পদ্ধতির বৈধতা নিয়ে নয়; প্রশ্নটি হলো, দাসীর শরীরের সঙ্গে সম্পর্কিত এমন সিদ্ধান্তে তার অনুমতি বা মতামতের আদৌ কোনো আইনগত মূল্য ছিল কি না। ইবন আবদুল বার স্পষ্টভাবে বলেন, মালিক তার দাসীর সঙ্গে আযল করতে চাইলে দাসীর অনুমতি প্রয়োজন নেই। সাহাবারা আযলের বৈধতা জানতে মুহাম্মদের কাছে প্রশ্ন করেছিলেন, কিন্তু দাসীদের অনুমতি নেওয়া বা তাদের সঙ্গে পরামর্শ করার প্রয়োজন মনে করেননি—এটিকেই তিনি বিধানটির পক্ষে দলিল হিসেবে ব্যবহার করেন।

তার যুক্তি এখানেই শেষ নয়। তিনি আরও বলেন, যেহেতু মালিক চাইলে দাসীকে সম্পূর্ণরূপে সহবাস থেকেই বঞ্চিত করতে পারে, তাই সহবাসের সময় আযল করার অধিকার তার আরও স্বাভাবিকভাবেই রয়েছে। এরপর তিনি এই অবস্থানকে ইজমা, কিয়াস এবং ফিকহি নীতির সমর্থনপ্রাপ্ত বলে উপস্থাপন করেন এবং বলেন, বিভিন্ন অঞ্চলের ফকিহদের মধ্যে এ বিষয়ে কোনো মতভেদ নেই। একই আলোচনায় তিনি স্বাধীন নারীর ক্ষেত্রে ঠিক বিপরীত বিধান উল্লেখ করেন: স্বাধীন স্ত্রীর সঙ্গে তার অনুমতি ছাড়া আযল করা যাবে না, কারণ সহবাস তারও অধিকার। অর্থাৎ একই যৌন সিদ্ধান্তে স্বাধীন নারীর মতামতকে আইনগত অধিকার হিসেবে স্বীকার করা হলেও দাসীর মতামতকে সেই মর্যাদা দেওয়া হয়নি [13]

আরবি মূল:
لَمْ يُضِيفُوا إِلَى ذَلِكَ اسْتِئْمَارَ الْإِمَاءِ، وَلَا مُشَاوَرَتَهُنَّ، فَدَلَّ ذَلِكَ عَلَى جَوَازِ الْعَزْلِ عَنْهُنَّ دُونَ رَأْيِهِنَّ.
বাংলা অনুবাদ:
“তারা এর সঙ্গে দাসীদের অনুমতি নেওয়া বা তাদের সঙ্গে পরামর্শ করার বিষয়টি যুক্ত করেনি। ফলে এটি প্রমাণ করে যে তাদের মতামত ছাড়াই তাদের সঙ্গে আযল করা বৈধ।”

এই বক্তব্যের ভাষা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ: استئمار الإماء অর্থ দাসীদের অনুমতি বা সম্মতি চাওয়া, مشاورتهن অর্থ তাদের সঙ্গে পরামর্শ করা, আর دون رأيهن অর্থ তাদের মতামত ছাড়াই। অর্থাৎ এখানে দাসীর মতামতের অনুপস্থিতি কোনো অনুল্লেখিত বিষয় নয়; ইবন আবদুল বার সেটিকেই বিধান প্রমাণের যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করছেন। আরও স্পষ্টভাবে, পরবর্তী বাক্যে তিনি যুক্তি দেন যে মালিক যেহেতু দাসীকে সহবাস থেকেই সম্পূর্ণ বঞ্চিত করতে পারে, তাই আযলের ক্ষেত্রেও তার মতামতের প্রয়োজন নেই। এই ফিকহি কাঠামোয় দাসী যৌনসম্পর্কের স্বাধীন পক্ষ নয়; তার দেহ ও প্রজননসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে চূড়ান্ত কর্তৃত্ব মালিকের। স্বাধীন স্ত্রীর জন্য যে অনুমতির অধিকার স্বীকৃত, দাসীর ক্ষেত্রে সেই একই অধিকার অস্বীকার করা হয়েছে।


দাসীর সহবাস ও সন্তানের ওপর কোনো অধিকার নেই: ইবন কুদামা

ইসলামি দাসপ্রথায় একজন দাসীর যৌন ও প্রজননসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে তার নিজের অধিকার কতটুকু ছিল, ইবন কুদামার বিখ্যাত হাম্বলি ফিকহগ্রন্থ আল-মুগনি-তে তার অত্যন্ত স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়। দাসীর সঙ্গে আযল করার জন্য তার অনুমতি প্রয়োজন কি না—এই প্রশ্নে ইবন কুদামা বলেন, মালিক তার দাসীর অনুমতি ছাড়াই আযল করতে পারে। তিনি শুধু হাম্বলি মত হিসেবে বিষয়টি উল্লেখ করেননি; আহমদের পাশাপাশি মালিক, আবু হানিফা ও শাফেয়ির মত হিসেবেও একই অবস্থান নথিবদ্ধ করেছেন। অর্থাৎ চার সুন্নি মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতাদের নাম ধরেই এখানে দাসীর অনুমতিকে অপ্রয়োজনীয় বলা হচ্ছে।

এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো এই বিধানের পেছনে ইবন কুদামার দেওয়া কারণ। তিনি বলেন, দাসীর সহবাসে কোনো অধিকার নেই এবং সন্তানের ক্ষেত্রেও কোনো অধিকার নেই। এই কারণেই সে মালিককে আযল করতে বাধা দেওয়ার অধিকারও রাখে না। একই আলোচনায় স্বাধীন স্ত্রীর ক্ষেত্রে তিনি বিপরীত বিধান দেন—স্বাধীন স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া আযল করা যাবে না। ফলে পার্থক্যটি কোনো অস্পষ্ট সামাজিক রীতির নয়; ফিকহি বিধানেই স্বাধীন নারী ও মালিকানাধীন নারীর যৌন ও প্রজননগত অধিকারকে ভিন্নভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে [14]

আরবি মূল:
وَيَجُوزُ الْعَزْلُ عَنْ أَمَتِهِ بِغَيْرِ إذْنِهَا نَصَّ عَلَيْهِ أَحْمَدُ، وَهُوَ قَوْلُ مَالِكٍ وَأَبِي حَنِيفَةَ وَالشَّافِعِيِّ؛ وَذَلِكَ لِأَنَّهُ لَا حَقَّ لَهَا فِي الْوَطْءِ، وَلَا فِي الْوَلَدِ.
বাংলা অনুবাদ:
“মালিক তার দাসীর অনুমতি ছাড়াই তার সঙ্গে আযল করতে পারে। আহমদ এ কথা স্পষ্টভাবে বলেছেন; এটি মালিক, আবু হানিফা ও শাফেয়িরও মত। কারণ দাসীর সহবাসের ওপর কোনো অধিকার নেই এবং সন্তানের ওপরও কোনো অধিকার নেই।”

এই বক্তব্যটি ইসলামি যৌন-দাসত্বের আইনি কাঠামোকে অত্যন্ত নগ্নভাবে প্রকাশ করে। এখানে দাসীর অনুমতি অপ্রয়োজনীয় হওয়ার কারণ হিসেবে কোনো পরিস্থিতিগত ব্যতিক্রম দেখানো হয়নি; বরং তার অধিকারই অস্বীকার করা হয়েছে—“তার সহবাসে কোনো অধিকার নেই, সন্তানের ক্ষেত্রেও কোনো অধিকার নেই।” আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো স্বাধীন স্ত্রীর ক্ষেত্রে একই গ্রন্থে অনুমতিকে প্রয়োজনীয় বলা হয়েছে। অর্থাৎ ফিকহ স্বীকার করছে যে যৌন ও প্রজননসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে অনুমতি একটি বাস্তব অধিকার হতে পারে, কিন্তু দাসী হওয়ার কারণে সেই অধিকার তার কাছ থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এমন ব্যবস্থায় দাসীর শরীরের ওপর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা তার নিজের নয়; মালিকের যৌন ও প্রজননগত স্বার্থই আইনগতভাবে প্রাধান্য পায়।


মুকাতাবা দাসীকে জোরপূর্বক সহবাস: মালিকের ওপর হদ নেই

মালিকি মাযহাবের অন্যতম প্রধান ও প্রাচীন ফিকহগ্রন্থ আল-মুদাওয়ানা আল-কুবরা-তে এমন একটি প্রশ্ন সরাসরি আলোচিত হয়েছে, যেখানে একজন মালিক তার মুকাতাবা দাসীর সঙ্গে জোরপূর্বক যৌনসম্পর্ক করে। মুকাতাবা হলো সেই দাসী, যার সঙ্গে নির্দিষ্ট অর্থ পরিশোধের বিনিময়ে মুক্তির চুক্তি করা হয়েছে। অর্থাৎ সে সাধারণ দাসত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার একটি আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্যে প্রবেশ করেছে। তা সত্ত্বেও মালিক যদি তাকে জোর করে যৌনসম্পর্কে বাধ্য করে, সেই ঘটনাকে কীভাবে বিচার করা হবে—আল-মুদাওয়ানা এই প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় দিয়েছে। প্রশ্নটির শিরোনামই হলো “في الرجل يطأ مكاتبته طوعا أو غصبا”—“কোনো ব্যক্তি তার মুকাতাবা দাসীর সঙ্গে তার সম্মতিতে অথবা জোরপূর্বক সহবাস করলে।”

ইবনুল কাসিমের বর্ণনায় মালিকের কাছে সরাসরি জানতে চাওয়া হয়: কোনো ব্যক্তি তার মুকাতাবা দাসীর সঙ্গে সহবাস করে—يغتصبها অর্থাৎ তাকে জোরপূর্বক যৌনভাবে অধিকার করে, অথবা সে স্বেচ্ছায় সাড়া দেয়—তাহলে তার ওপর কি যিনার হদ কার্যকর হবে? মালিকের উত্তর, “তার ওপর হদ নেই”। এরপর জিজ্ঞাসা করা হয়, জোরপূর্বক সহবাসের কারণে তাকে কি দাসীর সমপরিমাণ মোহর দিতে হবে, নাকি তার বাজারমূল্য যতটা কমেছে সেটি দিতে হবে? উত্তরে বলা হয়, জোর করার কারণে তার মূল্য যতটা কমেছে সেই ক্ষতিই দিতে হবে; দাসীর জন্য কোনো মোহর নেই। অর্থাৎ এখানে জোরপূর্বক যৌনসম্পর্কের পরিণতিও দাসীর যৌন স্বায়ত্তশাসনের লঙ্ঘনকে কেন্দ্র করে নির্ধারিত হয়নি; হিসাব করা হয়েছে তার আর্থিক মূল্যহ্রাসের ভিত্তিতে। [15]

আরবি মূল:
في الرجل يطأ مكاتبته طوعا أو غصبا
قلت: أرأيت الرجل يطأ مكاتبته – يغتصبها أو تطاوعه – أيكون عليه الحد في قول مالك أم لا؟
قال: قال مالك: لا حد عليه، وينكل إذا كان ممن لا يعذر بالجهالة.
قلت: أفيكون عليه ما نقصها من ثمنها إن غصبها نفسها أو صداق مثلها في قول مالك؟
قال: أرى أن عليه ما نقصها إذا اغتصبها. وقال لي مالك: ولا أرى لها في ذلك صداقا. قال ابن القاسم: ولم أسأله عن الاغتصاب وإنما سألته عن الرجل يطأ مكاتبته فقال: لا صداق لها.
বাংলা অনুবাদ:
“কোনো ব্যক্তি তার মুকাতাবা দাসীর সঙ্গে তার সম্মতিতে অথবা জোরপূর্বক সহবাস করলে।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম: কোনো ব্যক্তি যদি তার মুকাতাবা দাসীর সঙ্গে সহবাস করে—তাকে জোরপূর্বক যৌনভাবে অধিকার করে অথবা সে স্বেচ্ছায় তার সঙ্গে সহবাস করে—মালিকের মতে তার ওপর কি হদ কার্যকর হবে?
তিনি বললেন: মালিক বলেছেন, “তার ওপর হদ নেই; তবে সে যদি এমন ব্যক্তি হয় যার অজ্ঞতা গ্রহণযোগ্য নয়, তাহলে তাকে শাস্তি দেওয়া হবে।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম: মালিকের মতে, সে যদি দাসীটিকে জোরপূর্বক যৌনভাবে অধিকার করে, তাহলে তার মূল্য যতটা কমেছে তা কি তাকে দিতে হবে, নাকি তার সমপরিমাণ মোহর দিতে হবে?
তিনি বললেন: “আমার মতে, তাকে জোরপূর্বক যৌনভাবে অধিকার করলে তার মূল্য যতটা কমেছে তা দিতে হবে।” মালিক আমাকে বলেছেন: “আমি এর জন্য তার কোনো মোহর প্রাপ্য বলে মনে করি না।” ইবনুল কাসিম বলেন: আমি তাকে জোরপূর্বক সহবাসের বিষয়ে জিজ্ঞেস করিনি; আমি শুধু কোনো ব্যক্তি তার মুকাতাবা দাসীর সঙ্গে সহবাস করলে কী হবে তা জিজ্ঞেস করেছিলাম, এবং তিনি বলেছিলেন: “তার জন্য কোনো মোহর নেই।”

এই উদ্ধৃতিটির ভয়াবহতা শুধু “لا حد عليه”—“তার ওপর হদ নেই” বাক্যটিতে সীমাবদ্ধ নয়। গ্রন্থটি ঘটনাটিকে নিজেই اغتصبها / غصبها نفسها—জোরপূর্বক যৌনভাবে অধিকার করা—এই ভাষায় বর্ণনা করছে। তারপরও এর আর্থিক পরিণতি নির্ণয় করা হচ্ছে দাসীর শরীরের ওপর সংঘটিত যৌন সহিংসতার জন্য ব্যক্তিগত ক্ষতিপূরণ হিসেবে নয়, বরং “ما نقصها من ثمنها”—তার বাজারমূল্য যতটা কমে গেছে—তার ভিত্তিতে; একই সঙ্গে তার জন্য মোহরও অস্বীকার করা হচ্ছে। হদ না থাকলেও একটি discretionary শাস্তির কথা বলা হয়েছে, কিন্তু ফিকহি কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে দাসীর সম্মতি বা তার যৌন অধিকার নেই। এমনকি মুক্তির চুক্তিতে প্রবেশ করা একজন মুকাতাবা নারীকে তার মালিক জোরপূর্বক যৌনভাবে অধিকার করার ক্ষেত্রেও তার শরীরের ক্ষতিকে বাজারমূল্যের ক্ষতি হিসেবে হিসাব করা হচ্ছে। এটি দাসীকে স্বাধীন যৌন ব্যক্তি হিসেবে নয়, মালিকানাধীন অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করার ফিকহি কাঠামোকে অত্যন্ত নগ্নভাবে প্রকাশ করে।


দাসীর সম্মতিতেও মালিকের অধিকার বাতিল হয় না

দাসীর যৌনতার ওপর তার নিজের সিদ্ধান্তের চেয়ে মালিকের সম্পত্তিগত অধিকার কতটা শক্তিশালী ছিল, হাম্বলি ফিকহগ্রন্থ শারহ মুনতাহা আল-ইরাদাত-এর একটি বিধান তা অত্যন্ত নগ্নভাবে দেখায়। এখানে আলোচনা হচ্ছে এমন একজন ব্যক্তিকে নিয়ে, যে অন্য কারও মালিকানাধীন দাসীর সঙ্গে অবৈধভাবে সহবাস করেছে। গ্রন্থটি প্রথমেই বলে, লোকটি জেনেশুনে এমন কাজ করলে তার ওপর যিনার হদ প্রযোজ্য, কারণ ওই দাসী তার স্ত্রীও নয়, তার মিলক আল-ইয়ামিনও নয়। কিন্তু এরপর ক্ষতিপূরণের প্রশ্নে এমন একটি পার্থক্য করা হয়েছে, যা দাসীর যৌন সম্মতির আইনগত অবস্থান বুঝতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: দাসী নিজে সেই যৌনসম্পর্কে স্বেচ্ছায় রাজি হলেও অপরাধীকে তার সমপরিমাণ মোহর দিতে হবে, কারণ সেই আর্থিক অধিকার দাসীর নয়, তার মালিকের

গ্রন্থটি এখানেই থেমে যায়নি। দাসীর সম্মতি কেন মালিকের সেই অধিকার বাতিল করতে পারে না, তার উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে—এটি এমন, যেন দাসী কাউকে নিজের হাত কেটে দেওয়ার অনুমতি দেয়; তার অনুমতিতে মালিকের ক্ষতিপূরণের অধিকার বিলুপ্ত হয় না। এরপর স্বাধীন নারীর সঙ্গে সরাসরি পার্থক্য করা হয়েছে: স্বাধীন নারীর ক্ষেত্রে মোহর তার নিজের অধিকার, তাই সে স্বেচ্ছায় যৌনসম্পর্কে অংশ নিলে সেই দাবি বাতিল হতে পারে; কিন্তু দাসীর ক্ষেত্রে তা হয় না, কারণ আর্থিক অধিকারটি তার মালিকের। অর্থাৎ একজন দাসী নিজের যৌনসম্পর্কে সম্মতি দিলেও ফিকহ তার সেই সিদ্ধান্তকে নিজের শরীরের ওপর পূর্ণ আইনগত কর্তৃত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি; তার শরীরের যৌন ব্যবহারের সঙ্গে মালিকের পৃথক সম্পত্তিগত অধিকার জুড়ে দেওয়া হয়েছে [16]

আরবি মূল:
وَيَجِبُ بِوَطْءٍ مَهْرُ مِثْلِهَا بِكْرًا كَانَتْ أَوْ ثَيِّبًا، وَلَوْ كَانَتْ الْأَمَةُ مُطَاوِعَةً؛ لِأَنَّهُ حَقٌّ لِلسَّيِّدِ فَلَا يَسْقُطُ بِمُطَاوَعَتِهَا، كَإِذْنِهَا فِي قَطْعِ يَدِهَا، وَكَاسْتِخْدَامِهَا. وَحَدِيثُ «النَّهْيِ عَنْ مَهْرِ الْبَغِيِّ» مَحْمُولٌ عَلَى الْحُرَّةِ؛ لِأَنَّهُ حَقُّهَا، فَيَسْقُطُ بِمُطَاوَعَتِهَا، بِخِلَافِ مَهْرِ الْأَمَةِ.
বাংলা অনুবাদ:
“তার সঙ্গে সহবাসের কারণে তার সমপরিমাণ মোহর দেওয়া আবশ্যক—সে কুমারী হোক বা অকুমারী—এমনকি দাসীটি স্বেচ্ছায় সম্মত হলেও। কারণ এটি মালিকের অধিকার, ফলে দাসীর স্বেচ্ছায় সম্মত হওয়ার কারণে সেই অধিকার বাতিল হয় না; যেমন সে নিজের হাত কেটে দেওয়ার অনুমতি দিলেও [মালিকের অধিকার বাতিল হয় না]। ‘ব্যভিচারিণীর উপার্জন নিষিদ্ধ’ সংক্রান্ত হাদিসটি স্বাধীন নারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে ধরা হবে; কারণ সেটি তার নিজের অধিকার, তাই তার স্বেচ্ছায় সম্মতিতে তা বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু দাসীর মোহরের বিষয়টি এর বিপরীত।”

এই বিধানটি দাসপ্রথার যৌন মালিকানার প্রকৃতি বোঝার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে দাসী স্বেচ্ছায় সম্মতি দিয়েছে—তারপরও সেই সম্মতিকে তার নিজের শরীর ও যৌনতার ওপর পূর্ণ আইনগত কর্তৃত্ব হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে না। বরং তার সম্মতিতে যে অধিকার বিলুপ্ত হতে পারত, সেটিও বিলুপ্ত হচ্ছে না, কারণ ফিকহের ভাষায় সেটি “حق للسيد”—মালিকের অধিকার। সবচেয়ে নির্মম তুলনাটি হলো নিজের হাত কেটে দেওয়ার অনুমতির সঙ্গে তার যৌন সম্মতির তুলনা: উভয় ক্ষেত্রেই দাসীর ব্যক্তিগত অনুমতি মালিকের সম্পত্তিগত দাবিকে অতিক্রম করতে পারে না। স্বাধীন নারী নিজের যৌনসম্পর্কের ফলে সৃষ্ট আর্থিক অধিকার ত্যাগ করতে পারে, কিন্তু দাসী পারে না—কারণ তার ক্ষেত্রে সেই অধিকার তার নিজের নয়। ফলে এই ফিকহি কাঠামোয় দাসীর যৌনতা কেবল তার ব্যক্তিগত বিষয় ছিল না; তার শরীর, যৌন ব্যবহার এবং তার ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক দাবির ওপর মালিকের স্বতন্ত্র আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত ছিল।


হাদিসে জরুরি প্রশ্নটি অনুপস্থিত: বন্দী নারীর সম্মতি

সহিহ হাদিসগুলোর সবচেয়ে নির্মম দিক হলো, সেখানে বন্দী নারীদের সম্মতি প্রশ্ন হিসেবেও ওঠে না। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, মুসলিমরা আওতাস এবং বানু মুস্তালিক, এই দুইটি পৃথক অভিযানে আরব নারীদের বন্দী করেছিল; দীর্ঘদিন স্ত্রীদের থেকে দূরে থাকার কারণে তারা বন্দী নারীদের কামনা করছিল, কিন্তু একই সঙ্গে তাদের মুক্তিপণ বা বিক্রয়মূল্যও চাইছিল। তাই প্রশ্ন উঠেছিল—সেইসব নারীর স্বামীরা জীবিত এবং বন্দী থাকা সত্ত্বেও তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে সহবাস বৈধ হবে কি না; কিন্তু কোথাও প্রশ্ন ওঠেনি, বন্দী নারীরা এতে সম্মত কি না। আলোচনার কেন্দ্র ছিল মালিকানা, ইদ্দত/ইস্তিবরা এবং সহবাসের বৈধতা—নারীর সম্মতি নয়। আরও বিবেচ্য ছিল সহবাসের সময় আযল করা যাবে কি না, যাতে তারা গর্ভবতী না হয় এবং বিক্রয়/মুক্তিপণের মূল্য নষ্ট না হয়! এখানে নৈতিক প্রশ্ন ছিল না, “বন্দী নারী রাজি কি না?” প্রশ্ন ছিল, “গর্ভ এড়ানো যাবে কি না?” অর্থাৎ নারীর শরীরকে একসঙ্গে যৌন-ব্যবহারের বস্তু এবং বাজারমূল্যসম্পন্ন সম্পদ হিসেবে দেখা হয়েছে। [17] [18] [19]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৮/ দুধপান
পরিচ্ছেদঃ ১. ইসতিবরার পর যুদ্ধ বন্দিনীর সাথে সঙ্গম করা জায়েয এবং তার স্বামী বর্তমান থাকলে সে বিবাহ বাতিল
৩৪৭৭। উবায়দুল্লাহ ইবনু উমর ইবনু মায়সারা কাওয়ারীরী (রহঃ) … আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুনায়নের যুদ্ধের সময় আওতাসের দিকেএকটি বাহিনী পাঠান। তারা শত্রুদলের মুখোমুখী হয় এবং তাদের সাথে যুদ্ধ করে জয়লাভ করে এবং তাদের অনেক কয়েদী তাদের হস্তগত হয়। এদের মধ্য থেকে দাসীদের সাথে সহবাস করা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কয়েকজন সাহাবী যেন নাজায়িয মনে করলেন, তাদের মুশরিক স্বামী বর্তমান থাকার কারণে। আল্লাহ তায়ালা এ আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ “এবং নারীর মধ্যে তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসী ব্যতীত সকল সধবা তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ” অর্থাৎ তারা তোমাদের জন্য হালাল, যখন তারা তাদের ইদ্দত পূর্ন করে নিবে।
[গর্ভবতী হলে প্রসব, অন্যথায় এক ঋতু অতিবাহিত হওয়াকেই ইসতিবরার বলে।]
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ)

সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৬/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ১৩৯. বন্দী স্ত্রীলোকের সাথে সহবাস করা।
২১৫২. উবায়দুল্লাহ্ ইবন উমার ইবন মায়সার …… আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুনায়নের যুদ্ধের সময় আওতাস্ নামক স্থানে একটি সৈন্যদল প্রেরণ করেন। তারা তাদের শত্রুদের সাথে মুকাবিলা করে তাদেরকে হত্যা করে এবং তাদের উপর বিজয়ী হয়। আর এই সময় তারা কয়েদী হিসাবে (হাওয়াযেন গোত্রের) কিছু মহিলাকে বন্দী করে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কিছু সাহাবী তাদের সাথে অনধিকারভাবে সহবাস করা গুনাহ মনে করে, কেননা তাদের মুশরিক স্বামীরা তখন বন্দী ছিল। তখন আল্লাহ্ তা’আলা এই আত নাযিল করেনঃ (অর্থ) যে সমস্ত স্ত্রীলোকদের স্বামী আছে তারা তোমাদের জন্য হারাম। তবে যারা তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসী অর্থাৎ যেসব মহিলা যুদ্ধবন্দী হিসাবে তোমাদের আয়ত্বে আসবে তারা ইদ্দত (হায়েযের) পূর্ণ করার পর তোমাদের জন্য হালাল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ)

সম্মতি 14

বন্দিনী নারীগণ যেন দ্রুত গর্ভবতী না হয়ে যায়, সেই দিকে মুহাম্মদের জিহাদী সৈন্যদের ছিল খুব সজাগ দৃষ্টি। নিচের হাদিসটি পড়ুন [20]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৯৭/ তাওহীদ
পরিচ্ছদঃ ৯৭/১৮. আল্লাহর বাণীঃ তিনিই আল্লাহ্ সৃষ্টিকর্তা, উদ্ভাবনকর্তা, আকৃতিদাতা। (সূরাহ আল-হাশর ৫৯/২৪)
৭৪০৯. আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বানী মুসতালিক যুদ্ধ বিষয়ে বর্ণনা করেন যে, মুসলিমগণ যুদ্ধে কতকগুলো বন্দিনী লাভ করলেন। এরপর তাঁরা এদেরকে ভোগ করতে চাইলেন। আবার তারা যেন গর্ভবতী হয়ে না পড়ে সে ইচ্ছাও তারা করছিলেন। তাই তারা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আযল বিষয়ে জিজ্ঞেস করলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এতে তোমাদের কোন লাভ নেই। কারণ আল্লাহ্ ক্বিয়ামাত পর্যন্ত যত জীবন সৃষ্টি করবেন, তা সবই লিখে রেখেছেন। মুজাহিদ (রহ.) কাযআ (রহ.)-এর মাধ্যমে আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যত জীবন সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, আল্লাহ্ তা‘আলা অবশ্যই তা সৃষ্টি করবেনই। (২২২৯) (আধুনিক প্রকাশনী- ৬৯৯৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৯০৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

হাদিসটি সরাসরি বই থেকেও দেখে নিই [21]

সম্মতি 16
সম্মতি 18

এবারে আসুন, সহজ নসরুল বারী গ্রন্থে থেকে এই সম্পর্কিত হাদিসের ব্যাখ্যা পড়ে নিই [22]

অর্থাৎ আমরা যদি বাঁদীর সাথে আযল না করি, তাহলে বাঁদী উম্মে ওয়ালাদ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অথচ আমাদের মালের প্রতি মহব্বত আছে। আমরা তাকে বিক্রি করে তার মূল্য দ্বারা উপকৃত হতে চাই। কিন্তু উম্মে ওয়ালাদ হয়ে গেলে তাকে বিক্রয় করতে পারব না। এজন্য আমরা বাঁদীর সাথে আযল করতে চাই। যাতে বাঁদীর গর্ভ সঞ্চার না হয়। সুতরাং এ বিষয়ে আপনি কী বলেন?

সম্মতি 20
সম্মতি 22

সহিহ বুখারি ও মুসলিমের বর্ণনায় একই কাঠামো দেখা যায়। মুসলিম যোদ্ধারা বন্দিনী নারীদের কামনা করছিল এবং একই সঙ্গে তাদের বিনিময়ে মুক্তিপণ পেতে চাইছিল; তাই গর্ভধারণ এড়াতে আযলের প্রশ্ন ওঠে। আর উদ্ধৃত নসরুল বারীর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, বন্দিনী গর্ভবতী হয়ে উম্মে ওয়ালাদ হয়ে গেলে তাকে আর বিক্রি করা যাবে না—ফলে তার বিক্রয়মূল্য থেকে উপকৃত হওয়ার সুযোগ নষ্ট হবে। এরপর প্রশ্ন আসে আযল নিয়ে [23]। এই ভাষা কোনো “সম্মতিপূর্ণ সম্পর্কের” ভাষা নয়; এটি যুদ্ধলব্ধ নারী-দেহের ওপর যৌন অধিকার, গর্ভনিয়ন্ত্রণ এবং বাজারমূল্য রক্ষার ভাষা। এপোলোজিস্টরা যদি এখানে সম্মতি খুঁজে পায়, সেটি হাদিসের পাঠ থেকে নয়; সেটি আধুনিক লজ্জা ঢাকতে পরে বসানো কল্পিত নৈতিকতা থেকে।


বন্দিনী নারীদের বাছাই ও বণ্টন: খায়বারে সাফিয়্যার ঘটনা

যুদ্ধবন্দী নারীর সম্মতি ইসলামি ব্যবস্থায় কতটা অপ্রাসঙ্গিক ছিল, খায়বারের বন্দিনী নারীদের বণ্টনের ঘটনা তার একটি নির্মম ও প্রত্যক্ষ উদাহরণ। খায়বার দখলের পর নারী ও শিশুদের বন্দী করা হয় এবং বন্দীদের একত্র করা হয়। এরপর মুহাম্মদের সাহাবী দিহয়া আল-কালবী বন্দিনীদের মধ্য থেকে একজন দাসী চেয়ে বললে মুহাম্মদ তাকে নিজের পছন্দমতো একজনকে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেন। দিহয়া বন্দিনী নারীদের মধ্য থেকে সাফিয়্যা বিনত হুয়াইকে নির্বাচন করেন। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে ঘটনাটি স্পষ্ট ভাষায় সংরক্ষিত হয়েছে—বন্দীদের একত্র করা হয়েছিল, দিহয়া একজন দাসী চেয়েছিলেন এবং তাকে বলা হয়েছিল, “যাও, একজন দাসী নিয়ে নাও।” [24]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৭/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ১৪. দাসী আযাদ করে তাকে বিবাহ করা ফযীলত
৩৩৬৬। যুহায়র ইবনু হারব (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বারের যুদ্ধে যান। বর্ণনাকারী বলেন আমরা খায়বারের কাছে অন্ধকার থাকতেই ফজরের সালাত আদায় করলাম। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং আবূ তালহা (রাঃ) সাওয়ার হলেন। আমি ছিলাম আবূ তালহা (রাঃ) এর রাদীফ (তাঁর বাহনে তার পশ্চাতে উপবিষ্ট) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বারের গলি দিয়ে রওনা দিলেন। এ সময় আমার হাটু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর উরুদেশ স্পর্শ করছিল এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উরু থেকে লুঙ্গী সরে যাচ্ছিল। আর আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উকর শুভ্রতা দেখছিলাম। যখন তিনি বসতীতে প্রবেশ করলেন তখন বললেন, আল্লাহু আকবার, খায়বার ধ্বংস হোক। বস্তুত আমরা যখন কোন সম্প্রদায়ের অঙ্গিনায় অবতরণ করি তখন সতর্ককৃতদের প্রভাত হয় কত মন্দা’ একথা তিনি তিনবার বলেন।
বর্ণনাকারী বলেন ঐ সময় লোকজন তাদের কাজে বের হচ্ছিল। তারা বলতে লাগলো, আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদ। বর্ণনাকারী আবদুল আযীয বলেন, আমাদের কোন কোন উস্তাদ বলেছেন, পুরা বাহিনী। বর্ণনাকারী বলেন, আমরা খায়বার জয় করলাম, এবং বন্দীদের একত্রিত করা হল। তখন দিহয়া (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! কায়েদীদের মধ্যে থেকে আমাকে একজন দাসী প্রদান করুন। তিনি বললেনঃ যাও একজন দাসী নিয়ে নাও। তিনি সাফিয়্যা বিনত হুয়াই কে নিয়ে নিলেন। তখন এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, ইয়া নবী আল্লাহ! আপনি বনু কুরায়যা ও বনু নযীরের সর্দার হুযাইনের কন্যা সাফিয়্যাকে দিহয়াকে দিয়ে দিয়েছেন? ইনি একমাত্র আপনারই উপযুক্ত হতে পারে। তিনি বললেন, তাকে সাফিয়্যাসহ ডাক।
তারপর দিহয়া (রাঃ) সাফিয়্যাসহ উপস্থিত হলেন। যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন, তখন তিনি দিহয়া (রাঃ) কে বললেন, তুমি সাফিয়্যা ব্যতীত কয়েদীদের মধ্য থেকে অন্য কোন দাসী নিয়ে নাও। বর্ণনাকারী বলেন তিনি সাফিয়্যাকে আযাদ করলেন এবং তাঁকে বিবাহ করলেন।
আনাসকে লক্ষ্য করে সাবিত (রাঃ) বললেন, হে আবূ হামযা! তিনি তাঁকে কী মাহর দিলেন? তিনি বললেন, তিনি তাঁর সত্তাকে মুক্তি দান করেন এবং এর বিনিময়ে তাঁকে বিবাহ করেন।
তারপর তিনি যখন (ফেরার) পথে ছিলেন তখন উম্মু সুলায়ম (রাঃ) সাফিয়্যা (রাঃ) কে তাঁর জন্য প্রস্তুত করেন এবং রাতে তার কাছে পাঠিয়ে দেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সঙ্গে বাসর উদযাপনের পর ভোর হলে তিনি ঘোষণা করলেন, যার নিকট যা কিছু আছে তা নিয়ে যেন উপস্থিত হয়। আর তিনি চামড়ার বড় দস্তরখান বিছালেন। বর্ণনাকারী বলেন, একথা শুনে কেউ পানীয়, কেউ খেজুর ও কেউ ঘি নিয়ে হাযির হল। তারপর এসব মিলিয়ে তারা হায়স তৈরী করেন। আর তাই ছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওলীমা।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

এরপর একজন ব্যক্তি মুহাম্মদকে জানান যে, সাফিয়্যা বনু কুরাইযা ও বনু নাজিরের নেতৃস্থানীয় পরিবারের নারী এবং তিনি কেবল মুহাম্মদের জন্যই উপযুক্ত। মুহাম্মদ তখন দিহয়াকে সাফিয়্যাসহ ডেকে পাঠান। সাফিয়্যাকে দেখার পর তিনি দিহয়াকে বলেন, বন্দিনীদের মধ্য থেকে তাকে বাদ দিয়ে অন্য একজন দাসী নিয়ে নিতে। অর্থাৎ প্রথমে দিহয়া বন্দিনী নারীদের মধ্য থেকে সাফিয়্যাকে নির্বাচন করেন, পরে মুহাম্মদ সেই নির্বাচন বাতিল করে তাকে নিজের জন্য রেখে দেন এবং দিহয়াকে অন্য নারী বেছে নিতে বলেন। পুরো লেনদেনটি সংঘটিত হয়েছে বিজয়ী পুরুষদের মধ্যে; সাফিয়্যা কিংবা অন্য কোনো বন্দিনী নারী কাকে মালিক হিসেবে গ্রহণ করতে চান—এই প্রশ্ন একবারও ওঠেনি।

আবু দাউদের আরেকটি সহিহ বর্ণনায় ঘটনাটির সম্পত্তিগত চরিত্র আরও স্পষ্ট। সেখানে বলা হয়েছে, দিহয়ার ভাগে একজন সুন্দরী দাসী পড়েছিল এবং মুহাম্মদ তাকে সাতজন দাসের বিনিময়ে দিহয়ার কাছ থেকে গ্রহণ করেন। এরপর তাকে উম্মু সুলাইমের কাছে পাঠানো হয়, যেন তিনি সাফিয়্যাকে প্রস্তুত করেন। অর্থাৎ একজন বন্দিনী নারীকে সাতজন অন্য দাসের বিনিময়ে হস্তান্তরযোগ্য সম্পদ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে [25]

সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৪/ কর, খাজনা, অনুদান ও প্রশাসনিক দায়িত্ব সম্পর্কে
পরিচ্ছেদঃ ১৬২. খায়বরের যমীনের হুকুম সম্পর্কে।
২৯৯৯. দাঊদ ইবন মু’আয (রহঃ) …… আনাস ইবন মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বরের উপর যুদ্ধ পরিচালনা করেন। আমরা যুদ্ধ করে তা জয় করি। অবশেষে বন্দীদের একত্রিত করা হয় (যাতে মুসলিমদের মাঝে তা সহজে বন্টন করা যায়)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

পরবর্তীতে মুহাম্মদ সাফিয়্যাকে বিবাহ করেছিলেন, কিন্তু এই পরবর্তী ঘটনা তার আগের বন্দিত্ব ও বণ্টনের বাস্তবতাকে মুছে দেয় না। সাফিয়্যা প্রথমে স্বাধীন নারী থেকে যুদ্ধবন্দিনী হন; এরপর দিহয়ার ভাগে পড়েন; তারপর মুহাম্মদের সিদ্ধান্তে দিহয়ার মালিকানা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়; বিনিময়ে দিহয়াকে অন্য দাস নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় সাফিয়্যার সম্মতি মালিকানা নির্ধারণের কোনো শর্ত ছিল না। তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করেছিল বিজয়ী পুরুষদের পছন্দ, সামাজিক মর্যাদার হিসাব এবং সম্পত্তি বণ্টনের সিদ্ধান্ত।

এই ঘটনা তাই শুধু একজন নির্দিষ্ট নারীর বিবাহের কাহিনি নয়; এটি যুদ্ধবন্দী নারীদের বণ্টনব্যবস্থার একটি প্রত্যক্ষ দলিল। একজন সাহাবী বন্দিনীদের সারি থেকে যাকে ইচ্ছা বেছে নিতে পারতেন; মুহাম্মদ আবার সেই নির্বাচিত নারীকে নিজের জন্য নিয়ে তাকে অন্য নারী দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে পারতেন। গরু, উট কিংবা অন্য গনিমতের সম্পদের মতোই নারীদের একত্র করা, নির্বাচন করা এবং একজন পুরুষের ভাগ থেকে অন্য পুরুষের ভাগে স্থানান্তর করা হয়েছে। যে ব্যবস্থায় নারী নিজেই বণ্টনের বস্তু, সেখানে তার স্বাধীন সম্মতির দাবি করা ইতিহাসের পাঠ নয়; পরে বানানো এপোলোজেটিক কল্পনা।


বনু মুস্তালিক গোত্রের নারীদের ভবিষ্যৎ কী হয়েছিল?

বনু মুস্তালিক অভিযানে বন্দী হওয়া নারীদের পরিণতি কী হয়েছিল, সেটি হাদিসগুলোর বিবরণে খুবই পরিষ্কার হয়ে যায়। ইসলামি উৎসগুলো সব বন্দিনীর নাম ধরে তাদের শেষ জীবনকাহিনি জানায় না, কিন্তু তাদের ওপর তাৎক্ষণিকভাবে কী ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানায়। তারা স্বাধীন মানুষ হিসেবে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার হারিয়েছিলেন; বিজয়ী মুসলিম যোদ্ধাদের মালিকানাধীন যুদ্ধসম্পদে পরিণত হয়েছিলেন। তাদের কারও সঙ্গে সহবাস করা হয়েছে, একই সঙ্গে আযলের মাধ্যমে তাদের গর্ভধারণ ঠেকিয়ে মুক্তিপণ পাওয়ার অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

বায়হাকীর মা‘রিফাতুস সুনানি ওয়াল-আসার গ্রন্থে “যুদ্ধভূমি থেকে বের হওয়ার আগেই মালিকানার ভিত্তিতে বন্দিনী নারীদের সঙ্গে সহবাস” শিরোনামের অধীনে ইমাম আওযাঈর বক্তব্য সংরক্ষিত হয়েছে। তিনি বন্দিনী নারীর সঙ্গে সহবাসকে সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে হালাল ঘোষণা করে বনু মুস্তালিক অভিযানে মুসলিমদের আচরণকে এর প্রমাণ হিসেবে পেশ করেছেন [26], [27]

51 – وطء السبايا بالملك قبل الخروج من دار الحرب
18306 – أخبرنا أبو عبد الله، وأبو سعيد قالا: حدثنا أبو العباس، أخبرنا الربيع، أخبرنا الشافعي قال: قال الأوزاعي : “له أن يطأها وهذا حلال من الله عز وجل بأن المسلمين وطؤوا مع رسول الله صلى الله عليه وسلم ما أصابوا من السبايا في غزوة بني المصطلق قبل أن يقفلوا”.
৫১. শত্রুভূমি থেকে বের হওয়ার আগেই মালিকানার ভিত্তিতে যুদ্ধবন্দিনী নারীদের সঙ্গে সহবাস
১৮৩০৬. আবু আবদুল্লাহ ও আবু সাঈদ আমাদের অবহিত করেছেন। তাঁরা বলেন: আবুল আব্বাস আমাদের বর্ণনা করেছেন; রাবী আমাদের অবহিত করেছেন; শাফিঈ আমাদের অবহিত করে বলেন, আওযাঈ বলেছেন:
“তার জন্য সেই বন্দিনী নারীর সঙ্গে সহবাস করা বৈধ। এটি মহান ও পরাক্রমশালী আল্লাহর পক্ষ থেকে হালাল। কারণ মুসলিমরা রাসূলুল্লাহর সঙ্গে বনু মুস্তালিক অভিযানে যেসব নারীকে যুদ্ধবন্দী হিসেবে লাভ করেছিল, প্রত্যাবর্তনের আগেই তাদের সঙ্গে সহবাস করেছিল।”

মূল আরবি
أَخْبَرَنَا أَبُو عَبْدِ اللَّهِ، وَأَبُو سَعِيدٍ قَالَا: حَدَّثَنَا أَبُو الْعَبَّاسِ، أَخْبَرَنَا الرَّبِيعُ، أَخْبَرَنَا الشَّافِعِيُّ قَالَ: قَالَ الْأَوْزَاعِيُّ: «لَهُ أَنْ يَطَأَهَا وَهَذَا حَلَالٌ مِنَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ بِأَنَّ الْمُسْلِمِينَ وَطَئُوا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا أَصَابُوا مِنَ السَّبَايَا فِي غَزْوَةِ بَنِي الْمُصْطَلِقِ قَبْلَ أَنْ يَقْفُلُوا»
বাংলা অনুবাদ
আল-আওযাঈ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: “তার জন্য তাকে ভোগ করা বৈধ। আর এটা মহান আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে হালাল। কারণ, মুসলিমগণ তাদের সাথে থাকা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে বানুল মুসতালিক যুদ্ধে প্রাপ্ত বন্দিনীদেরকে প্রত্যাবর্তন করার পূর্বেই ভোগ করেছিলেন।”

উল্লেখ্য, এটি নবীর মুখনিঃসৃত কোনো হাদিস নয়; এটি আওযাঈর ফিকহি সিদ্ধান্ত। কিন্তু সেই কারণে দলিলটির গুরুত্ব কমে না। বরং এটি দেখায়, প্রাচীন ও প্রভাবশালী একজন ইসলামি ফকিহ বনু মুস্তালিকের বন্দিনী নারীদের সঙ্গে সহবাসের ঘটনাকে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক নজির হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং সেই নজিরের ভিত্তিতে কাজটিকে “আল্লাহর পক্ষ থেকে হালাল” ঘোষণা করেছেন। একই পরিচ্ছেদের পরবর্তী বর্ণনায় শাফিঈ বলেন, রাসূলুল্লাহর সাহাবিরা ইস্তিবরা সম্পন্ন হওয়ার পর শত্রুভূমিতেই বন্দিনী নারীদের সঙ্গে সহবাস করেছিলেন [28]। এখানে বৈধতার ভিত্তি নারীটির সম্মতি নয়, কোনো বিবাহ নয়, এমনকি মুসলিম ভূখণ্ডে ফিরে আসাও নয়; বন্দিত্বের মাধ্যমে মালিকানা প্রতিষ্ঠা এবং ইস্তিবরা সম্পন্ন হওয়াকেই যথেষ্ট বলে গণ্য করা হয়েছে। মুসলিম ভূখণ্ডে ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষাও আবশ্যক মনে করা হয়নি।

এর পরের প্রামাণ্য হাদিসে বন্দিনী নারীদের শরীর ও ভবিষ্যৎ নিয়ে মুসলিম যোদ্ধাদের পরিকল্পনা আরও প্রকাশ্য হয়ে ওঠে। বায়হাকী একে সরাসরি “প্রতিষ্ঠিত হাদিস” বলে উল্লেখ করেছেন এবং সহিহ বুখারীতেও বর্ণিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন [29] [30]

মূল আরবি
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مُحَيْرِيزٍ قَالَ: دَخَلْتُ الْمَسْجِدَ فَرَأَيْتُ أَبَا سَعِيدٍ الْخُدْرِيَّ، فَجَلَسْتُ إِلَيْهِ فَسَأَلْتُهُ عَنِ الْعَزْلِ، فَقَالَ أَبُو سَعِيدٍ: خَرَجْنَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي غَزْوَةِ بَنِي الْمُصْطَلِقِ فَأَصَبْنَا سَبَايَا مِنْ سَبَايَا الْعَرَبِ، فَاشْتَهَيْنَا النِّسَاءَ وَاشْتَدَّتْ عَلَيْنَا الْعُزُوبَةُ وَأَحْبَبْنَا الْفِدَاءَ، فَأَرَدْنَا أَنْ نَعْزِلَ، ثُمَّ قُلْنَا: نَعْزِلُ وَرَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَيْنَ أَظْهُرِنَا قَبْلَ أَنْ نَسْأَلَهُ عَنْ ذَلِكَ، فَسَأَلْنَاهُ عَنْ ذَلِكَ فَقَالَ: «مَا عَلَيْكُمْ أَنْ لَا تَفْعَلُوا ذَلِكَ، مَا مِنْ نَسَمَةٍ كَائِنَةٍ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ إِلَّا وَهِيَ كَائِنَةٌ»
বাংলা অনুবাদ: আবু সাঈদ আল-খুদরী বলেন: “আমরা রাসূলুল্লাহর সঙ্গে বনু মুস্তালিক অভিযানে বের হয়েছিলাম এবং আরবদের মধ্য থেকে কিছু নারীকে বন্দী করেছিলাম। আমরা সেই নারীদের কামনা করছিলাম, স্ত্রীহীনতা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছিল এবং আমরা তাদের বিনিময়ে মুক্তিপণও পেতে চাচ্ছিলাম। তাই আমরা আযল করতে চাইলাম। এরপর বললাম, রাসূলুল্লাহ আমাদের মাঝে উপস্থিত থাকা অবস্থায় তাঁকে জিজ্ঞাসা না করে আমরা কি আযল করব? আমরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন: ‘তোমরা আযল না করলেও তোমাদের কোনো অসুবিধা নেই; কিয়ামত পর্যন্ত যে প্রাণের অস্তিত্ব নির্ধারিত আছে, তা অবশ্যই অস্তিত্ব লাভ করবে।’”

মূল আরবি
قَالَ أَحْمَدُ: رُوِّينَا فِي الْحَدِيثِ الثَّابِتِ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مُحَيْرِيزٍ قَالَ: دَخَلْتُ الْمَسْجِدَ فَرَأَيْتُ أَبَا سَعِيدٍ الْخُدْرِيَّ، فَجَلَسْتُ إِلَيْهِ فَسَأَلْتُهُ عَنِ الْعَزْلِ، فَقَالَ أَبُو سَعِيدٍ: خَرَجْنَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي غَزْوَةِ بَنِي الْمُصْطَلِقِ فَأَصَبْنَا سَبَايَا مِنْ سَبَايَا الْعَرَبِ، فَاشْتَهَيْنَا النِّسَاءَ وَاشْتَدَّتْ عَلَيْنَا الْعُزُوبَةُ وَأَحْبَبْنَا الْفِدَاءَ، فَأَرَدْنَا أَنْ نَعْزِلَ، ثُمَّ قُلْنَا: نَعْزِلُ وَرَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَيْنَ أَظْهُرِنَا قَبْلَ أَنْ نَسْأَلَهُ عَنْ ذَلِكَ، فَسَأَلْنَاهُ عَنْ ذَلِكَ فَقَالَ: « مَا عَلَيْكُمْ أَنْ لَا تَفْعَلُوا ذَلِكَ، مَا مِنْ نَسَمَةٍ كَائِنَةٍ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ إِلَّا وَهِيَ كَائِنَةٌ» أَخْبَرَنَاهُ أَبُو عَبْدِ اللَّهِ الْحَافِظُ، أَخْبَرَنَا أَبُو الْحَسَنِ بْنُ عَبْدُوسٍ، حَدَّثَنَا عُثْمَانُ بْنُ سَعِيدٍ، حَدَّثَنَا الْقَعْنَبِيُّ فِيمَا قَرَأَ عَلَى مَالِكٍ، عَنْ رَبِيعَةَ بْنِ أَبِي عَبْدِ الرَّحْمَنِ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ يَحْيَى بْنِ حَبَّانَ، عَنِ ابْنِ مُحَيْرِيزٍ، فَذَكَرَهُ رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ فِي الصَّحِيحِ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ يُوسُفَ، عَنْ مَالِكٍ
التَّفْرِيقُ بَيْنَ ذَوِي الْمَحَارِمِ
বাংলা অনুবাদ
আবু সাঈদ আল-খুদরি (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে বনী মুসতালিক যুদ্ধে বের হলাম। আমরা কিছু আরব যুদ্ধবন্দী লাভ করলাম। আমরা মহিলাদের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠলাম এবং অবিবাহিত জীবন আমাদের জন্য কঠিন হয়ে গেলো, আর আমরা মুক্তিপণ (তাদের বিক্রি করে অর্থ লাভ) পছন্দ করলাম। তাই আমরা ’আযল’ (সহবাসে বীর্যপাত বাইরে করা) করতে চাইলাম। এরপর আমরা বললাম: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের মাঝে উপস্থিত থাকতে তাঁকে জিজ্ঞাসা না করে কি আমরা আযল করবো? অতঃপর আমরা এ বিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম। তখন তিনি বললেন: “তোমরা যদি তা না-ও করো, তবে তাতে তোমাদের কোনো ক্ষতি নেই। কিয়ামত পর্যন্ত যত প্রাণ সৃষ্টি হবে বলে নির্ধারিত আছে, তার সবটাই সৃষ্টি হবে।”

এই বর্ণনায় বন্দিনী নারীদের ভবিষ্যৎ তিনটি শব্দেই ধরা পড়ে: যৌন ব্যবহার, গর্ভনিয়ন্ত্রণ এবং মুক্তিপণ। মুসলিম যোদ্ধারা একই নারীদের সঙ্গে সহবাস করতে চাইছিল এবং তাদের গর্ভবতী না করে মুক্তিপণের অর্থও পেতে চাইছিল। অর্থাৎ একজন বন্দিনীকে একই সঙ্গে পুরুষের যৌন চাহিদা পূরণের শরীর এবং অর্থমূল্যসম্পন্ন সম্পত্তি হিসেবে দেখা হয়েছিল। মুহাম্মদের কাছে প্রশ্ন করা হয়েছিল আযল করা যাবে কি না; কোনো বন্দিনী নারী সহবাসে রাজি কি না, তাদের বিনাশর্তে মুক্তি দেওয়া হবে কি না কিংবা তাদের জীবনের কী হবে—এসবের একটিও প্রশ্ন করা হয়নি। মুহাম্মদের উত্তরেও নারীদের সম্মতি বা স্বাধীনতার প্রসঙ্গ নেই; উত্তরটি সীমাবদ্ধ ছিল আযল ও পূর্বনির্ধারিত জন্মসংক্রান্ত ধর্মীয় বক্তব্যে।

সব বন্দিনী শেষ পর্যন্ত মুক্তিপণে ছাড়া পেয়েছিলেন, বিক্রি হয়েছিলেন, কাউকে দাসী হিসেবে রাখা হয়েছিল, নাকি পরবর্তী সময়ে কেউ মুক্তি পেয়েছিলেন, প্রতিটি নারীর আলাদা পরিণতি এই দুই বর্ণনায় সংরক্ষিত নেই। কিন্তু এ কারণে মূল সত্য বদলে যায় না। বন্দী হওয়ার পর তাদের অন্তত একটি অংশের সঙ্গে মুসলিমরা ফিরে আসার আগেই সহবাস করেছিল; অন্যদিকে তাদের মুক্তিপণযোগ্য অর্থসম্পদ হিসেবেও ধরে রাখা হয়েছিল। তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করেছিল বিজয়ী পুরুষের কামনা, মালিকানা ও আর্থিক স্বার্থ—নারীদের নিজের ইচ্ছা নয়। এটিই যৌনদাসত্বের বাস্তব কাঠামো। একে “সম্মতিপূর্ণ সম্পর্ক” বা “সম্মানজনক পুনর্বাসন” বলা ইতিহাস নয়; সরাসরি মিথ্যাচার।


বিবাহিত বন্দী নারী: স্বামীর অধিকার বাতিল, মালিকের যৌন অধিকার বহাল

কোরআন ৪:২৪ এবং আওতাসের হাদিস ইসলামি যৌনদাসত্বের সবচেয়ে উন্মুক্ত দলিলগুলোর একটি। সাধারণভাবে বিবাহিত নারী নিষিদ্ধ বলা হলেও একই আয়াতে ব্যতিক্রম করা হয়েছে—“তোমাদের ডান হাত যা অধিকার করেছে”। এই ব্যতিক্রমের বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায় আওতাসের বন্দী নারীদের ঘটনায়। তারা বিবাহিত ছিল; তাদের স্বামী ছিল; সাহাবাদের আপত্তিও ছিল মূলত এই কারণে যে তাদের স্বামী জীবিত এবং একইসাথে বন্দী। কিন্তু সমাধান হিসেবে নারীদের সম্মতি নেওয়ার কথা বলা হয়নি, তাদের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়নি, তাদের বিবাহের মর্যাদা রক্ষার কথা বলা হয়নি। বরং বন্দিত্ব ও মালিকানা তাদের পূর্ববর্তী বিবাহকে অকার্যকর করে দেয়, এবং ইদ্দত শেষে তারা বিজয়ী পুরুষদের জন্য বৈধ হয়ে যায়। এমনকি, ইসলামি বিধানে মালিকানাধীন দাসী বিবাহিত হলে মালিক যেকোন সময়ে সেই বিবাহ বাতিল করে দিয়ে সেই দাসীর সাথে যৌন সম্পর্ক করার অধিকারও রাখে [31]

ইমাম শাফিঈর বক্তব্যে এই বিধানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে। বন্দিনী নারীর স্বামী একই সঙ্গে বন্দী হয়েছে কি না, আগে বা পরে বন্দী হয়েছে কি না, কিংবা আদৌ বন্দী হয়নি—এসবের কোনোটিই বন্দিনী নারীর ওপর নতুন মালিকের যৌন অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে গণ্য হয়নি। বায়হাকীর মা‘রিফাতুস সুনানি ওয়াল-আসার গ্রন্থে শাফিঈ বলেছেন [32] [33] ,

মূল আরবি
قَالَ الشَّافِعِيُّ: وَقَدْ سَبَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رِجَالًا مِنْ هَوَازِنَ، فَمَا عَلِمْنَاهُ سَأَلَ عَنْ أَزْوَاجِ الْمَسْبِيَّاتِ أَسُبُوا مَعَهُنَّ أَوْ قَبْلَهُنَّ أَوْ بَعْدَهُنَّ أَوْ لَمْ يُسْبُوا، وَلَوْ كَانَ فِي أَزْوَاجِهِنَّ مَعْنًى لَسَأَلَ عَنْهُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ
বাংলা অনুবাদ: ইমাম শাফিঈ বলেছেন: “রাসূলুল্লাহ হাওয়াজিন গোত্রের পুরুষদেরও বন্দী করেছিলেন। কিন্তু আমাদের জানা মতে, তিনি বন্দিনী নারীদের স্বামীদের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেননি—তাদের স্বামীরা তাদের সঙ্গে বন্দী হয়েছিল, তাদের আগে বা পরে বন্দী হয়েছিল, নাকি আদৌ বন্দী হয়নি। যদি তাদের স্বামীদের অবস্থার কোনো আইনি গুরুত্ব থাকত, তবে আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি অবশ্যই সে বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতেন।”

মূল আরবি
قَالَ الشَّافِعِيُّ: وَقَدْ سَبَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رِجَالًا مِنْ هَوَازِنَ، فَمَا -[313]- عَلِمْنَاهُ سَأَلَ عَنْ أَزْوَاجِ الْمَسْبِيَّاتِ أَسُبُوا مَعَهُنَّ أَوْ قَبْلَهُنَّ أَوْ بَعْدَهُنَّ أَوْ لَمْ يُسْبُوا، وَلَوْ كَانَ فِي أَزْوَاجِهِنَّ مَعْنًى لَسَأَلَ عَنْهُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ
বাংলা অনুবাদ
শাফিঈ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাওয়াজিন গোত্রের পুরুষদের বন্দী করেছিলেন। কিন্তু আমরা জানি না যে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বন্দী নারীদের স্বামীদের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন কিনা—যে তাদের স্বামীদের তাদের সাথে, তাদের আগে, তাদের পরে বন্দী করা হয়েছিল, নাকি তাদের বন্দীই করা হয়নি। যদি তাদের স্বামীদের (অবস্থার) কোনো বিশেষ গুরুত্ব থাকত, তবে আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি অবশ্যই সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেন।

শাফিঈর যুক্তির অর্থ অত্যন্ত পরিষ্কার। যুদ্ধবন্দী হওয়ার আগে নারীটি কার স্ত্রী ছিল কিংবা তার স্বামী তখনো স্বাধীন, জীবিত অথবা বন্দী ছিল কি না, এসবকে তার বিবাহ রক্ষার ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়নি। বন্দিত্ব ও মালিকানার উদ্ভবই পূর্ববর্তী দাম্পত্য সম্পর্ককে অকার্যকর করার জন্য যথেষ্ট বলে বিবেচিত হয়েছে। এখানে স্বামীর অধিকার বাতিল হয়েছে সামরিক পরাজয়ের কারণে, আর নারীর নিজের সম্মতি কোনো পর্যায়েই আইনি প্রশ্ন হিসেবে উপস্থিত হয়নি। বিজয়ী পুরুষের মালিকানাই নতুন যৌন অধিকারের ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এখানে নৈতিক কাঠামোটি অত্যন্ত পরিষ্কার: নারীর নিজের ইচ্ছা নয়, স্বামীর সঙ্গে তার পূর্ববর্তী বা পরবর্তী সম্পর্ক নয়, বরং সামরিক বিজয় ও মালিকানা যৌন বৈধতার ভিত্তি। এটাই যৌনদাসত্বের মূল যুক্তি। একজন নারী আগে কার স্ত্রী ছিলেন, তিনি নিজে কী চান, তিনি যুদ্ধের পক্ষভুক্ত ছিলেন কি না—এসব গৌণ; প্রধান বিষয় হলো তিনি এখন কার “ডান হাতের অধিকারভুক্ত”। এর চেয়ে নগ্ন মালিকানাভিত্তিক যৌননীতি আর কী হতে পারে?


নাবালিকা দাসী ও ইস্তিবরা: যৌন লালসার আইনি ভিত্তি

ইসলামি ফিকহ অনুসারে, কোনো দাসী ক্রয়ের পর তার সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের আগে ‘ইস্তিবরা’ (জরায়ু গর্ভমুক্ত কি না তা নিশ্চিত করা) করা বাধ্যতামূলক। অত্যন্ত আশ্চর্যজনকভাবে, এই বিধান নাবালিকা বা অপ্রাপ্তবয়স্ক বালিকাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, যাদের এখনো ঋতুস্রাব (হায়েয) শুরু হয়নি বা বয়ঃসন্ধি আসেনি।


ইস্তিবরার “প্রকৃত কারণ”: নতুন মালিকের সহবাসের ইচ্ছা

ইস্তিবরার উদ্দেশ্য সম্পর্কে অনুমান করারও প্রয়োজন নেই। হানাফি ফিকহের গ্রন্থ আশরাফুল হিদায়া-তেই সরাসরি বলা হয়েছে, ইস্তিবরা ক্রেতার ওপর ওয়াজিব হওয়ার “প্রকৃত কারণ” হলো দাসীর সঙ্গে সহবাসের ইচ্ছা। আরও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সেই সহবাসের ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় মালিকানা ও দখলের মাধ্যমে। অর্থাৎ ফিকহি কাঠামোটিই যৌন অধিকারের উৎস হিসেবে নারীর সম্মতিকে নয়, মালিকানা ও দখলকে চিহ্নিত করছে। [34]

وَيَجِبُ عَلَى الْمُشْتَرِي لَا عَلَى الْبَائِعِ لِأَنَّ الْعِلَّةَ الْحَقِيقِيَّةَ إِرَادَةُ الْوَطْءِ، وَالْمُشْتَرِي هُوَ الَّذِي يُرِيدُهُ دُونَ الْبَائِعِ ... وَهُوَ التَّمَكُّنُ مِنَ الْوَطْءِ، وَالتَّمَكُّنُ إِنَّمَا يَثْبُتُ بِالْمِلْكِ وَالْيَدِ

অনুবাদ: ইস্তিবরা ক্রেতার ওপর ওয়াজিব, বিক্রেতার ওপর নয়। কারণ এর প্রকৃত কারণ হলো সহবাসের ইচ্ছা, আর ক্রেতাই তা করতে চায়, বিক্রেতা নয়। কিন্তু ইচ্ছা একটি অন্তর্নিহিত বিষয়; তাই বিধানকে তার প্রকাশ্য নির্দেশকের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। সেই নির্দেশক হলো সহবাসে সক্ষমতা বা কর্তৃত্ব; আর এই কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় মালিকানা ও দখলের মাধ্যমে

আশরাফুল হিদায়া, ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬২৯

এই বক্তব্যটির গুরুত্ব অসাধারণ। এখানে সহবাসের অধিকার জন্ম নিচ্ছে নারীটির স্বাধীন “হ্যাঁ” থেকে নয়; জন্ম নিচ্ছে মালিকানা ও দখল থেকে। ক্রয়, দান, অসিয়ত, মিরাসসহ যে পথেই নতুন মালিকানা সৃষ্টি হোক, সেই মালিকানাই সম্ভাব্য সহবাসের আইনগত ভিত্তি এবং সেই কারণেই ইস্তিবরার বিধান কার্যকর হয়। যৌনসম্পর্কের এই আইনি কাঠামোতে নারীটি কী চান, তার অনুমতি আছে কি না, তা কারণ হিসেবে উল্লেখই করা হয়নি।


পূর্বে সহবাস না-করা কুমারী দাসীর ক্ষেত্রেও ইস্তিবরা

একই আলোচনার পরবর্তী অংশে আরও বলা হয়েছে, ক্রয়কৃত দাসী কুমারী এবং তার সঙ্গে পূর্বে কখনো সহবাস না হয়ে থাকলেও হানাফি মতে ইস্তিবরার বিধান প্রযোজ্য হবে। এখানে বিধানটি বাস্তবে আগের সহবাস হয়েছিল কি না তার ওপর দাঁড়িয়ে নেই; নতুন মালিকানা ও দখল প্রতিষ্ঠিত হওয়াকেই বিধানের কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। [35]

وَكَذَا إِذَا كَانَتِ الْمُشْتَرَاةُ بِكْرًا لَمْ تُوطَأْ
অনুবাদ: অনুরূপভাবে, ক্রয়কৃত দাসী যদি কুমারী হয় এবং তার সঙ্গে পূর্বে সহবাস না হয়ে থাকে, তবুও [ইস্তিবরার বিধান প্রযোজ্য হবে]। এর কারণ হলো, ইস্তিবরার বিধানের কারণ হিসেবে নতুন মালিকানা ও দখলকে ধরা হয়েছে; যেখানে সেই কারণ পাওয়া যাবে, সেখানেই বিধান কার্যকর হবে।

আশরাফুল হিদায়া, ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৩১

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে পরিষ্কার রাখা জরুরি: এই মাসআলাটি নিজে “সহবাসে অযোগ্য নাবালিকা” সম্পর্কে নয়; মূল আরবি بِكْرًا لَمْ تُوطَأْ-এর অর্থ হলো “কুমারী, যার সঙ্গে পূর্বে সহবাস হয়নি”। কিন্তু এর তাৎপর্য অন্য জায়গায়—ফিকহ ইস্তিবরার বিধানকে নারীটির বাস্তব পূর্ব-যৌন ইতিহাসের ওপর নয়, নতুন মালিকানা থেকে সৃষ্ট সম্ভাব্য যৌন অধিকারের ওপর নির্মাণ করছে। এরপর দারেমীর বর্ণনাগুলোতে আমরা আরও এক ধাপ এগিয়ে এমন অপ্রাপ্তবয়স্ক দাসীর ইস্তিবরার বিধান দেখি, যার ঋতুস্রাবও শুরু হয়নি।

সুনান আদ-দারেমীর সহিহ বর্ণনা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি এমন দাসী কিনে নেয় যে এখনো ঋতুপ্রাপ্ত হয়নি, তাহলে তার জরায়ু নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করতে হয় [36]। ইমাম যুহরীর মতে এই সময় তিন মাস, আবার কারো মতে এক মাস [37]। এখানে মৌলিক প্রশ্ন উঠে, যে শিশু শারীরিকভাবে অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং যৌনক্রিয়ার জন্য সম্পূর্ণ অযোগ্য, তার জন্য কেন এই ইস্তিবরার নিয়ম? এখানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ঋতুস্রাব শুরু হয়নি এবং গর্ভধারণের বয়সও হয়নি, এমন দাসীকেও ফকিহরা ইস্তিবরার যৌন-মালিকানাভিত্তিক বিধানের বাইরে রাখেননি। এই বিধান নাবালিকা দাসীর সাথে যৌন সম্পর্ককে আইনিভাবে বৈধ করে তোলার জন্যই প্রণীত। যদি নাবালিকার সাথে যৌনক্রিয়া নিষিদ্ধ হতো, তাহলে এই অপেক্ষার বিধানের কোনো প্রয়োজনই পড়ত না। হাদিসটির বিবরণ লক্ষ্য করুন, বলা হচ্ছে, এই নাবালিকা দাসীটি ক্রয়ের পরে ঠিক কতদিন সহবাস থেকে বিরত থাকতে হবে? উত্তরে বলা হচ্ছে, তিন মাস বা পঁয়তাল্লিশ দিন বা একমাস। অর্থাৎ এরপরে সহবাস করলে ইসলামি আইনে আর কোনো বাধা নেই। কোথাও বলা হচ্ছে না যে, “প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করো, এরপর তাকে মুক্ত করো, মুক্ত অবস্থায় ভয়ভীতিহীন অবস্থায় তার স্বাধীন ও স্বেচ্ছায় দেয়া সম্মতি নাও, এরপরে সম্মতির ভিত্তিতে সহবাস করতে পারো।”

ফলে এই বিধান থেকে স্পষ্ট হয় যে, ইসলামি শরিয়তে নাবালিকা দাসীদের সাথে যৌনকর্ম সম্পূর্ণ হালাল বলে গণ্য। যুদ্ধবন্দী হিসেবে প্রাপ্ত বা বাজার থেকে কেনা ছোট বালিকাদের সাথে মুসলিম পুরুষরা ‘হালাল’ উপায়েই যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতে পারতেন। এর চেয়ে নির্মম ও নির্লজ্জ বিধান আর কী হতে পারে তা কল্পনাতীত। এটি শিশুকামীদের জন্য একটি আইনি সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে, যাতে তারা এই বিধানের আড়ালে তাদের প্রবৃত্তি চরিতার্থ করতে পারে। এই অমানবিক নিয়মের শিকার হয়ে অসংখ্য নাবালিকা মেয়ে দীর্ঘদিন ধরে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে, এটি চিন্তা করলেই গভীর কষ্ট হয়। আসুন হাদিসগুলো দেখি [38] [39] [40]

সুনান আদ-দারেমী (হাদিসবিডি)
১. পবিত্রতা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ১২০. দাসীর ইসতিবরা’আ’
১২১২. আওযাঈ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি যুহরী রাহি. কে জিজ্ঞাসা করলাম যে, একটি লোক একটি দাসী ক্রয় করলো যে এখনো হায়েযে উপনীত হয়নি আর গর্ভধারণের মতো (বয়সও তার) হয়নি। এমতাবস্থায় সেই লোকটি কতদিন তার থেকে সম্পর্কহীন থাকবে? তিনি বললেনঃ তিন মাস।[1]
[1] তাহকিকঃ এর সনদ সহীহ।
তাখরীজঃ এটি ৯৫৬ (অনূবাদে ৯৫১) নং এ গত হয়েছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আওযায়ী (রহঃ)

সুনান আদ-দারেমী (হাদিসবিডি)
১. পবিত্রতা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ১২০. দাসীর ইসতিবরা’আ’
১২১৩. এবং ইয়াহইয়া ইবনু আবী কাছীর বলেন, পঁয়তাল্লিশ দিন।[1]
[1] তাহকিকঃ এর সনদ সহীহ।
তাখরীজঃ এটি ৯৫৭ (অনূবাদে ৯৫২) নং এ গত হয়েছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ ইয়াহইয়া ইবনু আবী কাসীর (রহঃ)

সুনান আদ-দারেমী (হাদিসবিডি)
১. পবিত্রতা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ১২০. দাসীর ইসতিবরা’আ’
১২১৪. ইয়াহইয়া ইবনু বাশার হতে বর্ণিত, ইকরিমাহ বলেন, এক মাস।[1]আব্দুল্লাহ কে জিজ্ঞেস করা হলো: এতদুভয়ের মধ্যে আপনার মত কোনটি? তিনি বললেন: তিনমাসই অধিকতর শক্তিশালী মত। আর একমাস যথেষ্ট।
[1] তাহকিক: রাবীগণ নির্ভরযোগ্য।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)


দাসত্বের চেয়ে মৃত্যু: বনু কুরাইযার এক নারীর পরিণতি

ইসলামে যুদ্ধবন্দী নারীদের সাথে ঘটা বর্বরতার আলোচনায় একটি কেইস স্টাডি খুব গুরুত্বপূর্ণ। ঘটনাটি বানু কুরাইজা আক্রমণের সময়ের। মদিনার বাজারে যখন শত শত মানুষের শিরশ্ছেদ চলছিল এবং বাতাসে রক্তের গন্ধ ভারী হয়ে উঠেছিল, সেই বীভৎস পরিস্থিতির মাঝে এক অদ্ভূত ও হৃদয়বিদারক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছিলেন আয়েশা। বনু কুরাইজা গোত্রের এক নারী, যার নাম সম্ভবত আকাল বা বুনানা ছিল, তিনি সেই চরম মুহূর্তেও এক অদ্ভুত অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছিলেন।

আয়েশার বর্ণনা অনুযায়ী, যখন একের পর এক পুরুষকে হত্যার জন্য ডেকে নেওয়া হচ্ছিল, তখন বনু কুরাইজার এই নারী আয়েশার পাশে বসে গল্প করছিলেন এবং হাসছিলেন। অথচ তিনি জানতেন যে তার গোত্রের সব পুরুষকে হত্যা করা হচ্ছে এবং তার নিজের মৃত্যুও সন্নিকটে। যখন তার নাম ধরে ডাকা হলো, তিনি বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে হাসতে হাসতেই জল্লাদের দিকে এগিয়ে যান। আয়েশা বিষ্মিত হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তোমার কী হয়েছে? তুমি হাসছ কেন, অথচ তুমি জানো তোমাকে এখন হত্যা করা হবে?” জবাবে সেই নারী কেবল হাসতে হাসতেই মৃত্যুর দিকে পা বাড়িয়েছিলেন।

মানবিক ও মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কোনো সাধারণ হাসি ছিল না। নিজের চোখের সামনে স্বামী, সন্তান এবং আত্মীয়-স্বজনদের এমন পাইকারি হত্যাকাণ্ড দেখে একজন মানুষের স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি লোপ পাওয়া বা ‘ট্রমা’র কারণে উন্মাদ হয়ে যাওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক। তার সেই অট্টহাসি ছিল মূলত এক চরম ঘৃণা এবং তীব্র মানসিক যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ। তিনি হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন যে, বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুতেই এই দুঃসহ বেদনা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। আয়েশা পরবর্তীতে বলেছিলেন যে, সেই নারীর সেই অট্টহাসি তিনি সারাজীবনেও ভুলতে পারেননি। যুদ্ধের ময়দানে তরবারির চেয়েও একজন স্বজনহারা নারীর এই আর্তহাসি ইতিহাসের পাতায় এক গভীর ক্ষত হয়ে টিকে আছে। [41] [42]

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৯/ জিহাদ
পরিচ্ছেদঃ ১২১. নারী হত্যা সম্পর্কে
২৬৭১। ‘আয়িশাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, বনী কুরাইযার কোনো মহিলাকে হত্যা করা হয়নি। তবে এক মহিলাকে হত্যা করা হয়। সে আমার পাশে বসে কথা বলছিল এবং অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছিলো। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাজারে তাদের পুরুষদেরকে হত্যা করছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি তার নাম ধরে ডেকে বললো, অমুক মহিলাটি কোথায়? সে বললো, আমি। আমি (‘আয়িশাহ) বললাম, তোমরা কি হলো, (ডাকছো কেন)? সে বললো, আমি যা ঘটিয়েছি সেজন্য (সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অশ্লীল ভাষায় গালি দিয়েছিলো)। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, তাকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হলো। আমি ঘটনাটি আজও ভুলতে পারিনি। আমি তার আচরণে অবাক হয়েছিলাম যে, তাকে হত্যা করা হবে একথা জেনেও সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছিলো।(1)
(1). হাসান।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)

সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৯/ জিহাদ
পরিচ্ছেদঃ ১৫. মহিলাদের হত্যা সম্পর্কে।
২৬৬২. ‘আবদুল্লাহ্ ইবন মুহাম্মদ নুফায়লী (রহঃ) ….. আয়িশাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, বনূ কুরাইযার মহিলাদের থেকে কোন মহিলাকে হত্যা করা হয়নি, কিন্তু একজন মহিলাকে (হত্যা করা হয়), যে আমার পাশে বসে কথা বলছিল এবং অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছিল। এ সময় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের পুরুষদের এক বাজারে হত্যা করেছিলেন। তখন জনৈক আহবানকারী সে মহিলার নাম ধরে ডাকে যে, অমুক মহিলা কোথায়? তখন সে বলে, এই তো আমি। আমি (আয়িশা) তাকে জিজ্ঞাসা করিঃ তোমার ব্যাপার কি? তখন সে বলেঃ আমি একটা ঘটনা ঘটিয়েছি, (অর্থাৎ সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গালি দেয়)। আয়িশাহ (রাঃ) বলেনঃ তখন সে (আহবানকারী) তাকে নিয়ে যায় এবং তার শিরচ্ছেদ করে। তিনি বলেনঃ আমি সেই ঘটনাটি এখনো ভুলতে পারিনি। কেননা তার আচরণে তাজ্জবের ব্যাপার এই ছিল যে, সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছিল, অথচ সে জানত যে, তাকে হত্যা করা হবে।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)

এই নারীটি সম্পর্কে আরও একটি হৃদয়বিদারক বিবরণ পাওয়া যায়। এই কিছুদিন আগেও এই নারীর প্রেমময় স্বামী ছিল, সংসার ছিল। তাদের এই দাম্পত্য সম্পর্কের গভীরতা ফুটে ওঠে অবরোধের শেষ দিনগুলোতে। যখন বনু কুরাইজা গোত্রকে ২৫ দিন ধরে অবরোধ এবং দুর্গের পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে, তখন এই দম্পতির সামনে দুটি পথ খোলা ছিল, হয় চিরদিনের জন্য দাসত্বের শৃঙ্খল এবং বিচ্ছিন্নতা, নয়তো মৃত্যু। স্বামী জানতেন, বনু কুরাইজার পুরুষদের হত্যা করা হলেও নারীদের দাসী হিসেবে বণ্টন করা হবে। প্রিয়তমা স্ত্রীকে অন্যের যৌনদাসী হিসেবে দেখা তাঁর কাছে মৃত্যুর চেয়েও যন্ত্রণাদায়ক ছিল। তাই এক চরম মরিয়া সিদ্ধান্তে তিনি স্ত্রীকে বলেছিলেন, “মুহাম্মদ তোমাকে হত্যা করবেন না, করবে যৌনদাসী। কিন্তু তুমি কারো দাসী হয়ে থাকবে—এই কল্পনাও আমার জন্য অসহনীয়।” স্বামীর এই আকুতি থেকেই বানানা এক অমানবিক পথ বেছে নেন। তিনি দুর্গের ওপর থেকে আটা পেষার যাঁতা গড়িয়ে দিয়ে একজন মুসলিম সৈন্যকে হত্যা করেন। এটি কোনো সাধারণ আক্রমণ ছিল না; এটি ছিল মূলত নিজের ‘মৃত্যুদণ্ড’ নিশ্চিত করার এক আর্তচিৎকার। তিনি জানতেন, হত্যার অপরাধে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে এবং এর মাধ্যমেই তিনি নবী মুহাম্মদের অনুসারীদের চিরকালীন যৌনদাসী হওয়ার হাত থেকে মুক্তি পেয়ে তাঁর স্বামীর সাথে পরকালের পথে পাড়ি দিতে পারবেন।

আয়েশার বর্ণনায় আমরা বানানার শেষ মুহূর্তগুলোর যে চিত্র পাই, তা মানসিকভাবে বিদীর্ণ করার মতো। মৃত্যুর পরোয়ানা মাথায় নিয়ে তিনি আয়েশার কাছে বসে হাসছিলেন, কৌতুক করছিলেন। প্রিয়তম স্বামী ও স্বজনদের হত্যার মিছিলে পাঠিয়ে নিজে দাসী হওয়ার গ্লানি থেকে বাঁচার জন্য তিনি যে পথ বেছে নিয়েছিলেন, তা আধুনিক সমাজতত্ত্বে ‘প্রটেস্ট সুইসাইড’ বা প্রতিবাদী আত্মাহুতির একটি রূপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। আয়েশা নিজেই এই নারীর অদ্ভূত আনন্দ-উচ্ছলতা দেখে সারাজীবনের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন। বনু কুরাইজার গণহত্যার ইতিহাসে বানানা হয়ে আছেন সেই নারী, যিনি দাসত্বের অবমাননার চেয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করাকেই শ্রেয় মনে করেছিলেন। [43]

সেদিন বনী কুরায়জার রমণীদের মধ্যে হত্যা করা হয়েছিলো কেবল বানানা নাম্নী এক রমণীকে। সে ছিলো বনী নাজির সম্প্রদায়ের মেয়ে। কিন্তু তার বিয়ে হয়েছিলো বনী কুরায়জার এক যুবকের সাথে। তাদের দাম্পত্যপ্রণয় ছিলো অত্যন্ত গভীর। তখন অবরোধের শেষ পর্যায়। তাদের সকলেই বুঝলো, এবার আর তাদের নিস্তার নেই। বানানা তার স্বামীকে বললো, তোমাকে তো এবার আমার কাছ থেকে পৃথক করে ফেলা হবে। তাই যদি হয় তবে আমার আর বেঁচে থেকে কাজ কী? যুবক বললো, মোহাম্মদ জয়ী হলে তোমাকে হত্যা করবে না। করবে চিরদাসী। কারণ তার ধর্মে নারী হত্যার বিধান নেই। কিন্তু তুমি কারো দাসী হয়ে থাকবে, সে কল্পনাও আমার জন্য অসহনীয়। তার চেয়ে তুমি এক কাজ করো। ওই আটা পেশার যাঁতার চাকতিটি এখান থেকে নিচে গড়িয়ে দাও। যদি ওই চাকতির আঘাতে কোনো মুসলমান সৈনিক নিহত হয়, তবে সেই অপরাধে তোমাকে দেওয়া হবে মৃত্যুদণ্ড। আমি চাই তোমাকে মৃত্যুদণ্ডই দেওয়া হোক। বানানা তার স্বামীর কথামতো যাঁতার চাকতিটি দুর্গের একটি ফোকর দিয়ে নিচে গড়িয়ে দিলো। বাইরে তখন মধ্যাহ্নের প্রখর উত্তাপ। ওই সময় মুসলিম সৈন্যদের অনেকে দুর্গের দেয়ালের ছায়ায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলো। চাকতি সোজা গড়িয়ে পড়লো সেরকম বিশ্রামরত এক সৈনিকের মাথায়। ফলে অল্পক্ষণের মধ্যে শাহাদত বরণ করলেন তিনি।
ওরওয়ার বর্ণনায় এসেছে, জননী আয়েশা বলেছেন, যখন বনী কুরায়জার পুরুষদেরকে হত্যা করা হয়, তখন বানানা ছিলো আমার কাছে। প্রায় সারাক্ষণ হাস্য-কৌতুকে মেতে থাকা ছিলো তার স্বভাব। ওদিকে তাদের পুরুষদেরকে হত্যা করা হচ্ছিলো, আর সে মাঝে মাঝেই কৌতুক করে বলছিলো, কী মজা! আজ বনী কুরায়জার পুরুষদেরকে বধ করা হচ্ছে। কিছুক্ষণ পর বাইরে থেকে আওয়াজ এলো, বানানা কোথায়? সে সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলো, এই যে আমি এখানে । আমি বললাম, হতভাগিনী! লোকটি তোমার কে? সে বললো, আমাকে ডাকা হচ্ছে হত্যা করার জন্য। আমি বললাম, কী কারণে? সে বললো, নিশ্চয় কোনো অপরাধ করেছি। জননী আয়েশা আরো বলেছেন, যার উপরে মৃত্যুর পরওয়ানা ঝুলছে, তার এরকম আনন্দ-উচ্ছলতা করার কথা আমি জীবনে শুনিনি। তার কথা আমার আজও মনে পড়ে যায় ।

সম্মতি 26

আলেমদের মতামত: ইসলামে স্ত্রী বা দাসী সহবাস করতে বাধ্য

আধুনিক সভ্য সমাজে নারীরা পুরুষের মতোই সমান অধিকার ভোগ করেন। তারা শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নেতৃত্ব এবং সমাজসেবার ক্ষেত্রে পুরুষের সমানভাবে অংশগ্রহণ করছেন। আধুনিক সমাজে এরকম ঘটনা অসংখ্য, যেখানে স্বামী তার স্ত্রীর ইচ্ছা ও অনুমতি ছাড়াই তার সাথে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্কে করে বা স্ত্রীকে তা করতে বাধ্য করে। আধুনিক সভ্য সমাজে এটি ধর্ষণ হিসেবে গণ্য, যদিও ইসলামিক দেশগুলোতে স্বামীকে এই ধর্ষণের বৈধতা দেয়া হয়। ইসলাম ধর্ম অনুসারে, স্বামীর চাহিবা মাত্রই তার সাথে স্ত্রী যৌন কাজ করতে বাধ্য, এরকম আইন আরোপ করে। যা বৈবাহিক ধর্ষণের মত মারাত্মক এবং ভয়াবহ ঘটনার জন্য দেয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আসুন হেফাজতে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হারুন ইজহারের বক্তব্য শুনে নিই,


এবারে আসুন স্ত্রী এবং দাসীর সাথে তার স্বামী বা মালিক জোর জবরদস্তি করতে পারবে কিনা, সেটি জেনে নেয়া যাক,


এবারে আসুন আরও কয়েকজন ইসলামি আলেমের বক্তব্য শুনি। নিচের ভিডিওগুলোতে স্ত্রী যৌনসম্পর্কে অনিচ্ছুক হলে তার অস্বীকৃতির শরয়ি অবস্থান, স্বামীর যৌন অধিকার এবং স্ত্রীকে বাধ্য করা বা শাস্তি দেওয়ার প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এসব বক্তব্যে সাধারণত বলা হচ্ছে, শরিয়তসম্মত ওজর—যেমন গুরুতর অসুস্থতা, শারীরিক অক্ষমতা, ঋতুস্রাব বা সহবাসে প্রকৃত ক্ষতির আশঙ্কা—না থাকলে স্বামীর যৌন আহ্বান প্রত্যাখ্যান করা স্ত্রীর জন্য বৈধ নয়; কিছু আলোচনায় অস্বীকৃতির ক্ষেত্রে ইসলামি শরীয়ত মোতাবেক ফতোয়ায়ে কাযী খান এর সূত্র ধরে প্রহারসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে।

এই বক্তব্যগুলো বর্তমান আলোচনায় বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ এখানে আলোচ্য বিষয় শুধু দাসীর অবস্থান নয়, বরং ইসলামি যৌন-অধিকার কাঠামোয় নারীর স্বাধীনভাবে “না” বলার অধিকার কতটা স্বীকৃত। যদি একজন স্বাধীন স্ত্রীকেও বৈধ ওজর ছাড়া স্বামীর যৌন আহ্বান প্রত্যাখ্যান করার পূর্ণ অধিকার না দেওয়া হয়, তাহলে মালিকানাধীন দাসীর ক্ষেত্রে স্বাধীন ও প্রত্যাহারযোগ্য যৌন সম্মতি ছিল—এমন দাবি আরও কঠিন হয়ে পড়ে। দাসীর আইনগত ও সামাজিক অবস্থান স্বাধীন স্ত্রীর তুলনায় আরও অধীনস্থ ছিল এবং তার ওপর মালিকের মালিকানাগত কর্তৃত্বও বিদ্যমান ছিল। আসুন পাকিস্তানের প্রখ্যাত মুফতি তারিক মাসুদের বক্তব্য শুনি,


এবারে আসুন বাংলাদেশের একটি ইসলামিক প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠানে প্রশ্নের উত্তর শুনি,


এবারে আসুন একজন মুফতি কীভাবে ফতোয়ায়ে কাযী খান গ্রন্থ থেকে স্ত্রী প্রহারের চারটি ক্ষেত্র বিস্তারিত ব্যাখ্যা করছেন,


এবারে আসুন এই বিষয়ে মুমিনদের সাথে হওয়া একটি বিতর্ক দেখে নেয়া যাক ০৭:০৮ মিনিট থেকে দেখুন,


এবারে আসুন আরও কিছু প্রাসঙ্গিক ভিডিও দেখে নিই,





আদেশ অমান্য করলে দাস প্রহার: “না” বলার স্বাধীনতা কোথায়?

ইসলামি দাসপ্রথার ক্ষমতার কাঠামো বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিল পাওয়া যায় ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের ফিকহি মতামতে। আবু দাউদ আল-সিজিস্তানী সংকলিত মাসায়িল আল-ইমাম আহমদ গ্রন্থে ইমাম আহমদকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, একজন দাস বা দাসীকে কোন কোন বিষয়ে শাসন বা শাস্তি দেওয়া যাবে। উত্তরে তিনি বলেন, দাসদাসীদেরকে তার নামাজ, অন্যান্য ফরজ দায়িত্ব এবং তার সামর্থ্যের মধ্যে অর্পিত কাজের ব্যাপারে শাসন করা যাবে [44]

سَمِعْتُ أَحْمَدَ، سُئِلَ عَنِ الْمَمْلُوكِ: فِيمَ يُؤَدَّبُ؟ قَالَ: فِي صَلَاتِهِ، وَفِي فَرَائِضِهِ، وَإِذَا حُمِّلَ مَا يُطِيقُ
আবু দাউদ বলেন: আমি আহমদকে শুনেছি—তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, “দাসকে কোন কোন বিষয়ে শাসন করা যাবে?” তিনি বললেন, “তার নামাজের ব্যাপারে, তার ফরজ দায়িত্বসমূহের ব্যাপারে এবং যখন তার ওপর তার সামর্থ্যের মধ্যে কোনো কাজ অর্পণ করা হয়।”

পরবর্তী হাম্বলি ফকিহ আল-বুহূতী কাশশাফ আল-কিনা‘ গ্রন্থে এই বিধানের অর্থ আরও স্পষ্ট করে দিয়েছেন। সেখানে বলা হয়েছে, “وَيُؤَدِّبُهُ السَّيِّدُ عَلَى مَا إِذَا كَلَّفَهُ مَا يُطِيقُ فَامْتَنَعَ مِنْ امْتِثَالِهِ”—অর্থাৎ, মালিক দাসকে তার সামর্থ্যের মধ্যে কোনো কাজের নির্দেশ দিলে এবং দাস সেই নির্দেশ পালন করতে অস্বীকার করলে মালিক তাকে শাসন করতে পারে। একই আলোচনায় আরও সরাসরি বলা হয়েছে, “وَلِلسَّيِّدِ تَأْدِيبُهُمْ … بِاللَّوْمِ وَالضَّرْبِ”—মালিকের তার দাসদের তিরস্কার ও প্রহারের মাধ্যমে শাসন করার অধিকার রয়েছে [45]

IslamWeb-এর “দাসের মালিকের প্রতি আনুগত্যের সীমা এবং তাকে প্রহার করার বৈধতা” বিষয়ক ফতোয়াতেও একই ফিকহি কাঠামো সরাসরি পুনরাবৃত্ত হয়েছে। সেখানে ইবনে কুদামার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, দাস বা দাসী অপরাধ করলে মালিক তাকে তিরস্কার ও হালকা প্রহারের মাধ্যমে শাসন করতে পারে; এরপর ইবন মুফলিহের মাধ্যমে ইমাম আহমদের মত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যে দাসকে তার ফরজ দায়িত্ব এবং সামর্থ্যের মধ্যে অর্পিত কাজের ব্যাপারে শাসন করা যাবে [46]

এই দলিলটির তাৎপর্য শুধু এটুকু নয় যে ইসলামি ফিকহে দাসকে প্রহার বৈধ ছিল [47]। আরও মৌলিক বাস্তবতা হলো—দাসের ওপর মালিকের আদেশ কার্যকর করার পেছনে শারীরিক শাস্তির আইনগত ক্ষমতা দাঁড়িয়ে ছিল। মালিক তার সামর্থ্যের মধ্যে কোনো কাজের নির্দেশ দেবে, দাসদাসী সেই নির্দেশ অমান্য করবে, আর সেই অমান্যতার কারণে মালিক তাকে প্রহারসহ শাসন করতে পারবে—এটি স্বাধীন দুই মানুষের সম্পর্ক নয়; এটি আদেশদাতা মালিক এবং বাধ্যগত মালিকানাধীন মানুষের সম্পর্ক।

এই ক্ষমতার কাঠামোটি দাসীর সম্মতির প্রশ্নেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃত সম্মতির সবচেয়ে মৌলিক শর্ত হলো নিরাপদে “না” বলার অধিকার। অথচ যে ব্যবস্থায় একজন নারী মালিকানাধীন দাসী, মালিকের বৈধ আদেশ অমান্য করলে তাকে শারীরিকভাবে শাসন করার ক্ষমতা মালিকের রয়েছে, তাকে বিক্রি করা যায়, তার শ্রম ও চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং একই ফিকহি ব্যবস্থায় তার ওপর মালিকের যৌন অধিকারও স্বীকৃত—সেখানে তার সম্মতি সত্যিকার অর্থে অর্থহীন। যার “না” বলার পরিণতিতে মালিকানাভিত্তিক শাস্তির বৈধ ক্ষমতা সক্রিয় হতে পারে, তার “হ্যাঁ”কে ক্ষমতার সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন স্বাধীন সম্মতি হিসেবে কল্পনা করা যায় না।

এখানে যৌনতার নির্দিষ্ট বিধান ছাড়াও আরও গভীর একটি সত্য প্রকাশিত হয়: ইসলামি দাসপ্রথায় দাস বা দাসী নিজের ইচ্ছার নিয়ন্ত্রক ছিল না। মালিক ছিল আদেশদাতা, দাস ছিল আনুগত্যে বাধ্য; আর আনুগত্য কার্যকর করার স্বীকৃত উপায়গুলোর একটি ছিল শারীরিক প্রহার। এই বিষয়ে অন্য আরেকটি প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। আগ্রহী পাঠক প্রবন্ধটি দেখুন [48]


সম্মতির অনুপস্থিতি ও যৌন শোষণ

আধুনিক সভ্য পৃথিবীতে ধর্ষণ হলো, কোনো ব্যক্তির সম্মতি ছাড়া তার সাথে যৌন সম্পর্ক। ইসলামি আইনে যুদ্ধবন্দী নারী বা দাসীর ক্ষেত্রে এটাই অনুমোদিত হয়েছে। তাদের জন্য সম্মতি অপ্রাসঙ্গিক, কারণ তারা প্রভুর মালিকানাধীন বস্তু।

স্বাধীন নারীর ক্ষেত্রে বিবাহ একটি চুক্তি (contract), যেখানে সম্মতির সামান্য কিছু ভূমিকা থাকে, যদি না স্ত্রী অপ্রাপ্তবয়স্ক হয়। প্রাপ্তবয়স্ক নারীর ক্ষেত্রে বিবাহের পুর্বে তার কাছ থেকে সম্মতি গ্রহণের কথা ইসলামে বলা আছে, তবে নিয়মিত যৌন সম্পর্কের বেলায় সেই সম্মতির কোন প্রয়োজন ইসলামে নেই। কিন্তু দাসীর ক্ষেত্রে কোনো চুক্তি বা ইচ্ছার প্রয়োজন নেই, এটি নিছক মালিকানার অধিকার। এই ভয়ঙ্কর বিধান যুদ্ধবন্দী নারীদের ক্ষেত্রে তাদের মানবাধিকারকে চরম ভাবে লঙ্ঘিত করে, পুরো মানবতাকেই অসম্মান করে

দাসীদের প্রতি যৌন অধিকার ইসলাম কেবল অনুমোদনই করেনি, বরং এটিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষণ করেছে। ইসলামী আইন দাসপ্রথা বিলোপ না করে বরং দাসপ্রথার ওপর নতুন ধর্মীয় বৈধতা আরোপ করেছে। যুদ্ধবন্দী নারীকে পুরুষের ভোগ্যবস্তু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।


কেস স্টাডি: একই দাসীর সঙ্গে একাধিক মালিকের সহবাস

ইসলামী দাসপ্রথায় নারী দাসীদের যৌনজীবনের বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রে আলী ইবন আবি তালিবের কাছে বিচার হিসেবে আসা একটি ঘটনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই ঘটনাটিকে সরাসরি “ধর্ষণের প্রত্যক্ষ প্রমাণ” হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক হবে না, কারণ সংশ্লিষ্ট বর্ণনাগুলোতে নারীটির সম্মতি, অসম্মতি, প্রতিরোধ কিংবা বলপ্রয়োগের কোনো প্রত্যক্ষ বিবরণ নেই। কিন্তু ঘটনাটি দাসপ্রথার অধীনে নারীদেহ, যৌন-অধিকার, মালিকানা, গর্ভধারণ ও পিতৃত্ব কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল—তার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক কেস স্টাডি।

ঘটনাটি বিভিন্ন হাদিসগ্রন্থে একাধিক সনদ ও সামান্য পাঠভেদে সংরক্ষিত হয়েছে। মূল কাঠামো প্রায় একই: ইয়েমেনে তিন ব্যক্তি একই নারীর সঙ্গে একই তুহর বা একই ঋতুস্রাব-মুক্ত সময়ে সহবাস করে। নারীটি পরে সন্তান প্রসব করলে তিনজনই শিশুটিকে নিজের সন্তান বলে দাবি করে এবং বিরোধটি আলী ইবন আবি তালিবের কাছে যায়। আলী প্রথমে প্রত্যেককে অন্যের অনুকূলে সন্তানের দাবি ছেড়ে দিতে বলেন। কেউ রাজি না হলে তিনি তাদের বলেন, “তোমরা পরস্পর বিবাদমান অংশীদার”أنتم شركاء متشاكسون—এবং তিনজনের মধ্যে লটারি করেন। যার নামে লট ওঠে, শিশুটিকে তার সঙ্গে যুক্ত করা হয় এবং তাকে অন্য দুইজনের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ মূল্য/দিয়াত প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। কয়েকটি রেওয়ায়েতে বলা হয়েছে, ঘটনাটি মুহাম্মদের কাছে জানানো হলে তিনি এমনভাবে হাসেন যে তাঁর মাড়ির দাঁত দেখা যায়; অন্য একটি পাঠে তিনি আলীর সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বলেন, “আমি আলী যা বলেছেন তা ছাড়া অন্য কিছু জানি না”; আর বায়হাকীর একটি রেওয়ায়েতে তাঁর বক্তব্য এসেছে—“তুমি সঠিক করেছ” অথবা “তুমি উত্তম করেছ।”

এখানে “একই তুহর” কথাটির অর্থ একই মুহূর্ত, একই রাত বা একই প্রহর নয়। في طهر واحد বলতে বোঝানো হচ্ছে নারীর দুই ঋতুস্রাবের মধ্যবর্তী একই পবিত্রতার সময়কাল। ফলে তিন ব্যক্তির সহবাস এত কাছাকাছি সময়ে ঘটেছিল যে সন্তানটির জৈবিক পিতা কে—তৎকালীন উপায়ে তা নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। নাসাঈর একটি বর্ণনায় বিষয়টি সরাসরি বলা হয়েছে: ثلاثة نفر اشتركوا في طهر—“তিন ব্যক্তি একই তুহরে অংশীদার হয়েছিল।”


একই ঘটনার হাদিস ও আছারসমূহ

গ্রন্থ ও রেফারেন্সবর্ণনার গুরুত্বপূর্ণ অংশঅবস্থা/বিশেষত্ব
সুনান আবু দাউদ ২২৬৯তিন ব্যক্তি একই তুহরে এক নারীর সঙ্গে সহবাস; সন্তান নিয়ে বিরোধ; আলীর লটারি; দুই-তৃতীয়াংশ দিয়াত; মুহাম্মদের হাসিসংশয়ে সহিহ হিসেবে প্রদর্শিত
সুনান আন-নাসাঈ ৩৪৮৯وقعوا على امرأة في طهر واحد—একই তুহরে একই নারীর সঙ্গে তিনজনের সহবাস; লটারির মাধ্যমে পিতৃত্ব নির্ধারণসহিহ
সুনান আন-নাসাঈ ৩৪৯০একই ঘটনার আরেক সনদ; তিন ব্যক্তি সন্তানের ব্যাপারে বিবাদ করেসহিহ
সুনান আন-নাসাঈ ৩৪৯১আলীর বক্তব্য: أنتم شركاء متشاكسون; লটারি, সন্তান ও দুই-তৃতীয়াংশ দিয়াত; মুহাম্মদের হাসিসহিহ
সুনান আন-নাসাঈ ৩৪৯২ইয়েমেনে তিন ব্যক্তির বিরোধপূর্ণ শিশুকে আলীর কাছে আনার সংক্ষিপ্ত রেওয়ায়েতসংশয়ে “নির্ণীত নয়”; একই ঘটনার variant
সুনান আন-নাসাঈ ৩৪৯৩ثلاثة نفر اشتركوا في طهر—তিন ব্যক্তি একই তুহরে অংশীদার; যায়দ ইবন আরকাম ও মারফূ‘ অংশ নেইনাসাঈ বলেন এই রূপটিই সঠিক; সংশয়ে সহিহ
মুসনাদ আহমদ ১৯৩৪২একই নারীর সঙ্গে একই তুহরে তিনজনের সহবাস; আলীর লটারি; নবীর বক্তব্য—আলীর সিদ্ধান্ত ছাড়া অন্য কিছু জানা নেইশু‘আইব আরনাউত: সনদে اضطراب-এর কারণে দুর্বল
মুসনাদ আহমদ ১৯৩৪৪একই বিরোধ, লটারি ও দুই-তৃতীয়াংশ দিয়াত; মুহাম্মদের হাসির বর্ণনাশু‘আইব আরনাউত: সনদ দুর্বল
মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাক ১৩৪৭৩فأتي بامرأة وطئها ثلاثة في طهر واحد—এক নারীকে একই তুহরে তিন ব্যক্তি সহবাস করেছিল; লটারি ও দিয়াতঘটনাটির খুব স্পষ্ট পাঠ
মুসনাদ ইবন আবি শায়বাহ ৫১৯তিনজন একই তুহরে একই নারীর সঙ্গে সহবাস; প্রত্যেকেই সন্তান দাবি করে; আলী তাদের “বিবাদমান অংশীদার” বলেনশেষে মুহাম্মদের হাসির বর্ণনা
বায়হাকী ২০৩৪৬তিনজনের সন্তানের দাবি; আলীর লটারি ও দুই-তৃতীয়াংশ দিয়াতনবীর বক্তব্য: “তুমি সঠিক করেছ”/“তুমি উত্তম করেছ”
বায়হাকী ২০৩৪৭وقعوا على امرأة في طهر واحد; পূর্ণ ঘটনা ও মুহাম্মদের হাসিআবু দাউদের রেওয়ায়েতও এখানে উদ্ধৃত
বায়হাকী ২০৩৪৮ثلاثة نفر اشتركوا في طهر—তিন ব্যক্তি একই তুহরে অংশীদার; সন্তান কার জানা যায়নি; লটারিসংক্ষিপ্ত মাওকুফ/আছারধর্মী পাঠ
বায়হাকী ২০৩৪৯শাফিঈ বলেন, নবী থেকে এটি তাঁর কাছে প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি তা গ্রহণ করতেনমারফূ‘ অংশের প্রামাণ্যতা নিয়ে সতর্কতা
বায়হাকী ২০৩৫০বায়হাকী/আহমদের আলোচনাসনদ ও নবী পর্যন্ত রাফ‘ হওয়া নিয়ে মতভেদ স্বীকার করা হয়েছে

এই রেওয়ায়েতগুলোর সনদগত মান এক নয়। বিশেষত মুহাম্মদের হাসি বা সরাসরি অনুমোদনের অংশটি সব সনদে সমান শক্তিশালী নয়। নাসাঈ নিজেই একটি non-marfu‘ পাঠ—যেখানে শুধু তিন ব্যক্তির একই তুহরে যৌনসম্পর্ক এবং আলীর ফয়সালার ঘটনা রয়েছে—সেটিকে সঠিক পাঠ বলে মন্তব্য করেন। অর্থাৎ সমালোচনামূলক আলোচনায় দুটি বিষয় আলাদা রাখা জরুরি: ঘটনাটির মূল ঐতিহাসিক nucleus এবং মুহাম্মদের কাছে পৌঁছানো ও তাঁর প্রতিক্রিয়ার অতিরিক্ত অংশ


নারীটি দাসী ছিল কি?

রেওয়ায়েতগুলোর বহু পাঠে امرأة—“এক নারী”—শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে শুধু এই পাঠগুলো দেখে নারীটি স্বাধীন নারী না দাসী, তা নির্ধারণ করা যায় না। কিন্তু একই ঘটনার অন্য প্রাচীন transmission-এ তাঁকে সরাসরি جارية لهم—“তাদের দাসী” বলা হয়েছে। মুসনাদ আল-হুমাইদীর পাঠে তিন ব্যক্তি وقعوا على جارية لهم في طهر واحد—“তাদের দাসীর সঙ্গে একই তুহরে সহবাস করেছিল”; এরপর সন্তান জন্মানো এবং আলীর লটারির একই ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। সেখানে ক্ষতিপূরণকেও সরাসরি ثلثي قيمة الجارية—দাসীটির মূল্যের দুই-তৃতীয়াংশ—বলা হয়েছে। এই পাঠটি দেখায় যে “দিয়াত” বা “দুই-তৃতীয়াংশ মূল্য” কেন তিন পুরুষের পারস্পরিক মালিকানা-স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

পরবর্তী হাদিস-ব্যাখ্যাতেও ঘটনাটি একটি যৌথ মালিকানাধীন দাসী (أمة يملكها ثلاثة) নিয়ে ঘটেছে বলে সরাসরি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অর্থাৎ তিনজন একই দাসীর মালিক ছিল এবং তারা একই তুহরে তার সঙ্গে সহবাস করেছিল। ব্যাখ্যাকারী একই সঙ্গে এটিও বলেছেন যে যৌথ মালিকানার কারণে প্রত্যেক অংশীদারের এভাবে তার সঙ্গে সহবাস করা শরিয়তসম্মত ছিল না। কাজেই এই ঘটনাকে “ইসলামে একই দাসীর সঙ্গে তিন মালিকের সহবাস বৈধ ছিল”—এমন দাবির প্রমাণ বানানো ভুল হবে। কিন্তু এমন ঘটনা বাস্তবে ঘটত এবং তার ফলে পিতৃত্ব ও মালিকানা নিয়ে আইনি বিরোধ সৃষ্টি হতো—এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

এটি যে কোনো বিচ্ছিন্ন বা অকল্পনীয় সমস্যা ছিল না, তার আরও শক্ত প্রমাণ মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাকের একই অধ্যায়ের পার্শ্ববর্তী ফিকহি আছারগুলো। সেখানে সরাসরি আলোচনা আছে এমন দাসী সম্পর্কে যার মালিকানায় একাধিক পুরুষ শরিক এবং তাদের একজন তার সঙ্গে সহবাস করেছে। এক রেওয়ায়েতে যুহরী এমন ক্ষেত্রে একশ বেত্রাঘাত এবং অংশীদারের আর্থিক অংশ পরিশোধের কথা বলেন। পরের রেওয়ায়েতে দুই পুরুষের যৌথ মালিকানাধীন দাসী তাদের একজনের দ্বারা গর্ভবতী হলে দাসী ও সন্তানের মূল্য কীভাবে হিসাব হবে তা আলোচনা করা হয়েছে। আরেক বর্ণনায় ইবন উমরকে জিজ্ঞেস করা হয় এমন পুরুষ সম্পর্কে, যে তার ও অন্য অংশীদারদের যৌথ মালিকানাধীন দাসীর সঙ্গে সহবাস করেছে। অর্থাৎ “শরিকানাধীন দাসীর সঙ্গে মালিকের যৌনসম্পর্ক” ছিল এমন একটি বাস্তব আইনি সমস্যা, যার জন্য মুসলিম ফকিহদের পৃথক বিধান আলোচনা করতে হয়েছে। মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাক ১৩৪৬১–১৩৪৬৩


এই ঘটনাটি দাসীর অবস্থান সম্পর্কে কী দেখায়?

এই কেসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, বর্ণনাগুলোর সমস্ত আইনি মনোযোগ আবর্তিত হয়েছে পুরুষদের দাবি, শিশুর পিতৃত্ব এবং মালিকদের আর্থিক অধিকারের চারপাশে। কে সন্তান পাবে, কে নিজের দাবি ছেড়ে দেবে, কার নামে লট উঠবে, অন্য দুই পুরুষ কত ক্ষতিপূরণ পাবে—এসব প্রশ্ন বিস্তারিতভাবে এসেছে। অথচ যে নারী তিনজন পুরুষের সঙ্গে একই ঋতুচক্রে যৌনসম্পর্কের মধ্যে দিয়ে গর্ভবতী হয়েছেন, তাঁর বক্তব্য কী, তিনি কার সঙ্গে সহবাস করতে চেয়েছিলেন, আদৌ কাউকে প্রত্যাখ্যান করার বাস্তব ক্ষমতা তাঁর ছিল কি না—এসব বিষয়ে বর্ণনাগুলো সম্পূর্ণ নীরব।

এই নীরবতা থেকেই এককভাবে “তাঁকে ধর্ষণ করা হয়েছিল” প্রমাণ করা যায় না। কিন্তু দাসীর অবস্থান বিশ্লেষণে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে নারীটি আইনি বিরোধের সক্রিয় পক্ষ নন; তিনি মূলত সেই ব্যক্তি যার গর্ভে সন্তান জন্মেছে এবং যার যৌন ব্যবহারের ফলে তিন পুরুষের মধ্যে পিতৃত্ব ও সম্পত্তিগত স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়েছে। বিরোধের নিষ্পত্তিতেও তাঁর পছন্দ নয়, লটারিই নির্ধারণ করছে শিশুটি কোন পুরুষের সঙ্গে যুক্ত হবে।

আরও লক্ষণীয়, হুমাইদীর جارية لهم পাঠে আর্থিক ক্ষতিপূরণটি নারীটির প্রতি নয়; একজন পুরুষকে অন্য দুই মালিককে দাসীটির মূল্যের দুই-তৃতীয়াংশ দিতে হচ্ছে। পরবর্তী ব্যাখ্যায় এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, সন্তান যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, দাসীটি তার উম্মে ওয়ালাদ হয়ে যাওয়ায় অন্য অংশীদাররা তার ওপর নিজেদের মালিকানাগত অংশ হারাচ্ছে; তাই তাদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। অর্থাৎ বিচারিক কাঠামোর কেন্দ্রে রয়েছে দাসীটির ব্যক্তিগত যৌন-স্বায়ত্তশাসন নয়, বরং তাঁর ওপর মালিকানার অংশ এবং সেই মালিকানার আর্থিক মূল্য।

এই কেস স্টাডির গুরুত্ব এখানেই। এটি প্রমাণ করে না যে প্রত্যেক দাসীকে প্রত্যেকবার জোর করে সহবাস করানো হতো; তেমন দাবি করার প্রয়োজনও নেই। বরং এটি দেখায় এমন একটি সামাজিক ও আইনি ব্যবস্থা, যেখানে একজন দাসী একই সময়ে একাধিক পুরুষের মালিকানাধীন সম্পদ হতে পারতেন; তাঁর সঙ্গে যৌনসম্পর্কের ফলে মালিকদের মধ্যে সম্পত্তি ও পিতৃত্বের জটিলতা সৃষ্টি হতে পারত; এবং সেই বিরোধ সমাধানের জন্য ফিকহে লটারি, দিয়াত, দাসীর মূল্য ও মালিকানার অংশ নিয়ে আলোচনা হতো।

আধুনিক যৌন-সম্মতির ধারণার সঙ্গে এই ব্যবস্থার মৌলিক সংঘাত এখানেই। যৌন সম্মতির ন্যূনতম শর্ত হলো একজন ব্যক্তির বাস্তব ও কার্যকর “না” বলার অধিকার। যে মানুষ নিজেই অন্য মানুষের সম্পত্তি, যাকে কেনাবেচা করা যায় এবং যার শরীরের ওপর মালিকের আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত—তার ক্ষেত্রে ক্ষমতার সম্পর্কটি শুরু থেকেই অসম। উপরের ঘটনাটি সেই বৃহত্তর কাঠামোর একটি বিরলভাবে স্পষ্ট জানালা: এখানে তিনজন পুরুষের যৌনসম্পর্ক, তাদের পিতৃত্বের দাবি, তাদের পারস্পরিক ক্ষতিপূরণ এবং শিশুর বণ্টন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা সংরক্ষিত হয়েছে; কিন্তু নারীটির যৌন ইচ্ছা বা সম্মতি সম্পর্কে একটি বাক্যও সংরক্ষিত হয়নি।

সুতরাং এই ঘটনাকে “তিন ব্যক্তি একটি দাসীকে ধর্ষণ করেছিল”—এই সরল বাক্যে নামিয়ে আনা ঐতিহাসিকভাবে অতিরঞ্জিত হবে। অধিক নির্ভুল বক্তব্য হলো: প্রাথমিক ইসলামী উৎসে এমন একটি ঘটনা সংরক্ষিত হয়েছে যেখানে তিন ব্যক্তি একই দাসীর সঙ্গে একই ঋতুচক্রে সহবাস করে, তিনি গর্ভবতী হন, এবং পরে সন্তানের পিতৃত্ব ও দাসীটির আর্থিক মূল্য নিয়ে পুরুষদের মধ্যে বিচারিক বিরোধ সৃষ্টি হয়। ঘটনাটির সমস্ত আইনি ভাষ্য পুরুষদের অধিকার ও মালিকানাকে কেন্দ্র করে; দাসীটির সম্মতি বা যৌন প্রত্যাখ্যানের অধিকার সেখানে কোনো বিচার্য বিষয় হিসেবেই উপস্থিত নয়। ইসলামী দাসপ্রথায় যৌন সম্মতির কাঠামোগত সমস্যাটি বোঝার জন্য এই কারণেই ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কেস স্টাডি।


যৌথ মালিকানা: একই দাসীর সঙ্গে পিতা-পুত্র-দাদার সহবাস

উপরের ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন বা কল্পিত পরিস্থিতি ছিল—এমন মনে করারও কারণ নেই। পরবর্তী ইসলামী ফিকহের গ্রন্থগুলোতে একই দাসীর সঙ্গে একাধিক মালিক, এমনকি একই পরিবারের পিতা, পুত্র ও দাদার যৌনসম্পর্কের ফলে সন্তানের পিতৃত্ব কার ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে—সেই প্রশ্ন নিয়েও বিস্তারিত মাসআলা পাওয়া যায়।

এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ ফাতাওয়া-ই-আলমগীরী বা আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা। এটি মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের নির্দেশে শায়খ নিজামুদ্দিন আল-বুরহানপুরীর নেতৃত্বে একদল হানাফি আলেমের সংকলিত সুবৃহৎ হানাফি ফিকহগ্রন্থ। গ্রন্থটির কিতাবুদ-দা‘ওয়া, “বংশপরিচয় দাবির অধ্যায়”-এ আলাদাভাবে “পুত্রের দাসীর সন্তানের ওপর পিতার দাবি” এবং “যৌথ মালিকানাধীন দাসীর সন্তানের দাবি” নিয়ে পৃথক পরিচ্ছেদ রয়েছে।

বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রকাশিত বাংলা সংস্করণে এ বিষয়ে কয়েকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মাসআলা রয়েছে। যেমন, [49]

৩৪. মাসআলা: বাঁদী যদি কোন ব্যক্তি ও তার ছেলে এবং তার দাদার শরীকানাধীন হয়
এবং সে একটি সন্তান প্রসব করে। আর তাদের প্রত্যেকেই উক্ত সন্তানের দাবীদার হয় তাহলে দাদার দাবী উত্তম হবে (যহীবিয়‍্যা)। যদি পুত্র এবং পিতার শরীকানাধীন হয় এবং তারা দু’জনে একই সাথে সন্তানের দাবী করে তাহলে এক্ষেত্রে সূক্ষ্ম কিয়াস অনুযায়ী পিতার দাবী উত্তম হবে। সে বাঁদীর অর্ধেক মূল্য এবং অর্ধেক মোহরের জন্য দায়বদ্ধ হবে। পুত্র শুধু অর্ধেক মোহরের যামিন হবে। অতএব তারা দু’জনে আপোষ ভাগাভাগি করে নিবে (সিরাজুল ওয়াহ্হাজ)।

সম্মতি 28

আরবি ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা-তেও এর সমান্তরাল মাসআলা পাওয়া যায়। সেখানে এমন একটি দাসীর কথা বলা হয়েছে, যে একজন ব্যক্তি, তার পুত্র এবং তার দাদার যৌথ মালিকানাধীন; সন্তান জন্মের পর তিনজনই সন্তানের দাবি করলে দাদার দাবিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিধান আলোচনা করা হয়েছে। একই পরিচ্ছেদে পিতা-পুত্রের যৌথ মালিকানাধীন দাসী সন্তান প্রসব করলে উভয়ের দাবি, দাসীর মূল্যের অংশ এবং عقر বা যৌনসম্পর্ক-সংক্রান্ত আর্থিক দায় নিয়েও বিস্তারিত বিধান রয়েছে।

আরও একটি মাসআলা, [50]

২১. মাসআলা: কেউ যদি নিজ পিতা কর্তৃক সহবাসকৃত বাঁদীকে উম্মে ওয়ালাদ বানায় তাহলে সন্তানের নসব তার থেকেই সাব্যস্ত হবে (কিন্‌য়াহ)।
পিতা যদি নিজ পুত্রের বাঁদীর সাথে যৌন সংগম করে, তারপর বাঁদী একটি সন্তান প্রসব করল এবং পিতা সে সন্তানের দাবী করল, তাহলে সন্তানের নসব তার থেকেই সাব্যস্ত হবে। এবং উক্ত বাঁদী তার উম্মে ওয়ালাদ হয়ে যাবে। পুত্র তাকে সত্যায়িত করুক বা মিথ্যা প্রতিপন্ন করুক এবং পিতা সন্দেহবশত যৌন সঙ্গম ঘটার দাবী করুক বা চাই না করুক তাতে কোন পার্থক্য হবে না (সিরাজুল ওয়াহ্হাজ)।

সম্মতি 30

আরবি মূল গ্রন্থে বিষয়টি আরও স্পষ্ট ভাষায় পাওয়া যায়। “পুত্রের দাসীর সন্তানের ওপর পিতার দাবি” শীর্ষক পরিচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির দাসীর সঙ্গে সেই ব্যক্তির পিতা সহবাস করার পর সন্তান জন্মালে নির্দিষ্ট অবস্থায় পিতার পিতৃত্বের দাবি স্বীকৃত হতে পারে। এমনকি একটি মাসআলায় পিতা নিজেই বলেন—

وقعت على جارية ابني وأنا أعلم أنها علي حرام

অর্থাৎ, “আমি আমার পুত্রের দাসীর সঙ্গে সহবাস করেছি এবং আমি জানতাম যে সে আমার জন্য হারাম।”

এর পরেও গ্রন্থটি বলে:

تصح دعوته ويثبت نسب الولد

অর্থাৎ, “তার [সন্তানের] দাবি বৈধ হবে এবং সন্তানের বংশপরিচয় তার থেকেই প্রতিষ্ঠিত হবে।”

এই মাসআলাগুলোর প্রত্যেকটি যৌনসম্পর্ককে বৈধ ঘোষণা করছে, এমন দাবি করা হচ্ছে না। বরং যৌথ মালিকানা বা পুত্রের দাসীর সঙ্গে পিতার যৌনসম্পর্ক শরিয়তের নিজস্ব বিধান অনুসারেও নিষিদ্ধ বা আর্থিক দায়সৃষ্টিকারী হতে পারে। উপরের আরবি পাঠেই পিতা স্বীকার করছেন যে তিনি জানতেন দাসীটি তাঁর জন্য হারাম।

কিন্তু আমাদের আলোচনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি অন্য জায়গায়। হানাফি ফিকহকে একই দাসীর সঙ্গে পিতা, পুত্র, দাদা কিংবা একাধিক শরিক-মালিকের যৌনসম্পর্কের ফলে গর্ভধারণ ও পিতৃত্বের বিরোধ কীভাবে নিষ্পত্তি করতে হবে—তার জন্য বিস্তারিত আইন তৈরি করতে হয়েছে। এটি নিছক একটি বিমূর্ত যৌন-কল্পনা নয়; বরং এতটাই স্বীকৃত আইনি সমস্যা যে ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা-র “বংশপরিচয়ের দাবি” অধ্যায়ে আলাদাভাবে “পুত্রের দাসীর সন্তান” এবং “যৌথ মালিকানাধীন দাসীর সন্তান” নিয়ে পৃথক পরিচ্ছেদ রাখা হয়েছে।

বিশেষভাবে লক্ষণীয় হলো, এসব মাসআলার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন আবারও দাসীটির সম্মতি নয়। প্রশ্ন হচ্ছে—সন্তান কার বলে গণ্য হবে, কার পিতৃত্বের দাবি অগ্রাধিকার পাবে, দাসী কার উম্মে ওয়ালাদ হবে, তার মূল্যের কত অংশ কাকে দিতে হবে এবং কোন পুরুষ কত মোহর/উকর বা আর্থিক দায় বহন করবে। অর্থাৎ সেই একই সম্পত্তি-পিতৃত্বকেন্দ্রিক আইনি কাঠামো এখানে আরও পরিণত আকারে দেখা যায়, যা আমরা আলী ইবন আবি তালিবের কাছে তিন ব্যক্তির পিতৃত্ব-বিরোধের ঘটনাতেও দেখেছি।

এই কারণে প্রাথমিক হাদিসের ঘটনাটি এবং বহু শতাব্দী পরের ফাতাওয়া-ই-আলমগীরী পাশাপাশি পড়লে একটি দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতা পরিষ্কার হয়ে ওঠে: দাসী একই সঙ্গে একাধিক পুরুষের মালিকানাধীন হতে পারতেন; একাধিক পুরুষ তার সঙ্গে যৌনসম্পর্ক স্থাপন করতে পারত; এমনকি একই পরিবারের বিভিন্ন প্রজন্মের পুরুষের সঙ্গেও একই দাসীর যৌনসম্পর্ক ঘটা ইসলামি সমাজে স্বাভাবিক ছিল; এবং এর ফলে গর্ভধারণ হলে ইসলামী আইন প্রধানত পিতৃত্ব, মালিকানা ও আর্থিক অধিকারের প্রশ্ন নিষ্পত্তির জন্য বিধান তৈরি করেছে। দাসীটির নিজের যৌন ইচ্ছা বা সম্মতি এই বিচারিক সমীকরণের কোথাও কেন্দ্রীয় উপাদান ছিল না।


মা-মেয়ে ও দুই বোন: যৌনসঙ্গী নির্বাচনের ফিকহি বিধান

উপরের মাসআলাগুলোতে আমরা দেখলাম, একই দাসী একাধিক পুরুষের যৌথ মালিকানাধীন হতে পারতেন। একই দাসীর সঙ্গে একাধিক শরিক মালিকের সহবাস, তার গর্ভধারণ, সন্তানের পিতৃত্ব, দাসীর মূল্য এবং অংশীদারদের আর্থিক পাওনা—এসব নিয়েই ফিকহে বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে। আশ্চর্যজনকভাবে সেই আলোচনার কেন্দ্রে দাসীটির নিজের যৌন ইচ্ছা বা সম্মতি নেই; কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে মালিকানা, পুরুষের দাবি এবং তার আর্থিক ও বংশগত পরিণতি

একই মালিকানাভিত্তিক যৌন কাঠামো আরও নগ্নভাবে প্রকাশিত হয়েছে সেইসব মাসআলায়, যেখানে একজন পুরুষ একইসঙ্গে মা ও মেয়ে, অথবা দুই বোনকে দাসী হিসেবে মালিকানায় রাখে। এসব বিধান পড়লে একটি বিষয় এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই—ফকিহদের প্রশ্ন নারীটি রাজি কি না, সেটি নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, মালিক কাকে সহবাস করবেন; একজনকে সহবাস করলে অন্যজন কতদিন হারাম হবে; এবং একজনকে কীভাবে নিজের যৌন অধিকারের বাইরে সরালে অন্যজন আবার তার জন্য বৈধ হয়ে যাবে।

শাফিঈ ফিকহের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ আল-তাহযীব ফি ফিকহ আল-শাফিঈ-তে মা ও মেয়ের বিষয়ে সরাসরি বলা হয়েছে— [51]

فلو اشترى أمةً وابنتها، فوطيء إحداهما - حُرمت الأخرى على التأبيد

অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তি যদি একজন দাসী ও তার মেয়েকে ক্রয় করে এবং তাদের একজনের সঙ্গে সহবাস করে, তাহলে অন্যজন তার জন্য চিরস্থায়ীভাবে হারাম হয়ে যাবে। একই মাসআলায় আরও বলা হয়েছে, দুই বোন কিংবা কোনো নারী ও তার ফুফু বা খালা একই ব্যক্তির মালিকানায় থাকলে একজনের সঙ্গে সহবাসের পর অন্যজনের সঙ্গে সহবাস করা যাবে না, যতক্ষণ না প্রথমজনকে বিক্রি, দান, মুক্ত, বিবাহ, মুকাতাব বা অন্য কোনো কার্যকর পদ্ধতিতে নিজের জন্য হারাম করা হয়। প্রথমজনকে এভাবে নিজের যৌন অধিকারের বাইরে সরিয়ে দিলে দ্বিতীয়জনের সঙ্গে সহবাস বৈধ হয়ে যায়। [51]

এখানে একটু থেমে প্রশ্নটি করা জরুরি—মা কী চান? মেয়ে কী চান? তাদের মধ্যে কে এই মালিকের সঙ্গে সহবাস করতে রাজি? ফিকহি মাসআলার ভাষায় এসব প্রশ্নের কোনো অস্তিত্বই নেই। বিধান নির্ধারিত হচ্ছে মালিকের কাজের ভিত্তিতে: সে কাকে সহবাস করল। একজনকে সহবাস করার সঙ্গে সঙ্গে অন্যজনের শরিয়তি অবস্থান বদলে যাচ্ছে। অর্থাৎ এই বিধানের নির্ধারক নারীর ইচ্ছা নয়; নির্ধারক হচ্ছে মালিকের সহবাস এবং তার মালিকানাগত অধিকার

দুই বোনের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পষ্ট। ইমাম নববীর রওজাতুত তালেবীন-এ বলা হয়েছে, যে দুই নারীকে একসঙ্গে বিবাহ করা নিষিদ্ধ, তাদের দুজনকে একইসঙ্গে দাসী হিসেবে মালিকানায় রাখা যেতে পারে; কিন্তু দুজনের সঙ্গে একই সময়ে সহবাস করা যাবে না। দুই বোনকে ক্রয় করলে মালিকের জন্য বিধান হচ্ছে— [52]

وله وطء أيتهما شاء

অর্থাৎ, “দুজনের মধ্যে যাকে সে ইচ্ছা, তার সঙ্গে সহবাস করতে পারবে।”

এই চারটি আরবি শব্দ—أيتهما شاء—পুরো ব্যবস্থাটির চরিত্র প্রকাশ করে দেয়: “যাকে সে ইচ্ছা।” এখানে ইচ্ছাকারী কে? মালিক। বিধানটি এমন নয় যে, “দুই বোনের মধ্যে যে নারী সম্মতি দেবে, তার সঙ্গে সহবাস করা যাবে”; এমনও নয় যে, “যাকে মালিক চাইবে এবং যে নারীও তাকে চাইবে।” ফিকহি ভাষা সরাসরি বলছে—মালিক যাকে ইচ্ছা। নারীটির নিজের “আমি চাই” বা “আমি চাই না” এই মাসআলার বৈধতা নির্ধারণে কোনো শর্ত হিসেবে উপস্থিতই নেই।

এরপর নববী বলেন, মালিক একজন বোনের সঙ্গে সহবাস করলে অন্য বোন তার জন্য হারাম হয়ে যাবে। কিন্তু এই নিষেধ মা-মেয়ের মতো চিরস্থায়ী নয়। প্রথম বোনকে মালিক নিজের যৌন অধিকারের বাইরে সরিয়ে দিলে দ্বিতীয় বোন আবার তার জন্য বৈধ হতে পারে। কীভাবে সরাবে? তাকে বিক্রি করে, দান করে, মুক্ত করে, অন্য পুরুষের সঙ্গে বিবাহ দিয়ে কিংবা মুকাতাব করে। অর্থাৎ একজন নারীকে নিজের অধিকারের আওতা থেকে সরিয়ে দিয়ে তার বোনের শরীরের ওপর যৌন অধিকার কার্যকর করার পথ খুলে যায়। [52]

নববীর ভাষা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, প্রথম বোনকে এমনভাবে নিজের জন্য হারাম করতে হবে যাতে মালিকানা বা যৌন অধিকারের ভিত্তিটিই পরিবর্তিত হয়। শুধু সাময়িক কোনো প্রতিবন্ধকতা যথেষ্ট নয়। এরপর প্রথম বোন আবার মালিকানায় ফিরে এলে এবং প্রয়োজনীয় ইস্তিবরা সম্পন্ন হলে, যদি দ্বিতীয়জনের সঙ্গে ইতোমধ্যে সহবাস না হয়ে থাকে, মালিক আবারও وطء أيتهما شاء“দুজনের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তার সঙ্গে সহবাস” করতে পারে। [52]


হানাফি ফিকহেও একই যৌন-মালিকানার কাঠামো

এটি শুধু শাফিঈ ফিকহের কোনো বিচ্ছিন্ন বিধান নয়। হানাফি ফিকহের আশরাফুল হিদায়া-তেও দুই সহোদরা দাসীর ক্ষেত্রে একই মালিকানাভিত্তিক যৌন কাঠামো বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির মালিকানায় দুই সহোদরা দাসী থাকলে এবং সে উভয়কে কামভাবসহ চুম্বন করলে, এরপর সে তাদের কারও সঙ্গে সহবাস করতে পারবে না—যতক্ষণ না একজনের ওপর নিজের যৌন অধিকার শেষ করে তাকে অন্যের মালিকানায় দেয়, অন্যের সঙ্গে বিবাহ দেয় অথবা মুক্ত করে দেয়। [53]

قَالَ: وَمَنْ لَهُ أَمَتَانِ أُخْتَانِ فَقَبَّلَهُمَا بِشَهْوَةٍ، فَإِنَّهُ لَا يُجَامِعُ وَاحِدَةً مِنْهُمَا وَلَا يُقَبِّلُهَا وَلَا يَمَسُّهَا بِشَهْوَةٍ وَلَا يَنْظُرُ إِلَى فَرْجِهَا بِشَهْوَةٍ حَتَّى يُمَلِّكَ فَرْجَ الْأُخْرَى غَيْرَهُ بِمِلْكٍ أَوْ نِكَاحٍ أَوْ يُعْتِقَهَا
অনুবাদ: ইমাম মুহাম্মদ বলেন, যার মালিকানায় দুই সহোদরা দাসী রয়েছে, সে যদি উভয়কে কামভাবসহ চুম্বন করে, তাহলে তাদের কারও সঙ্গে সহবাস করতে, কামভাবসহ চুম্বন বা স্পর্শ করতে কিংবা কামভাবসহ যৌনাঙ্গের দিকে তাকাতে পারবে না—যতক্ষণ না একজনের ওপর নিজের যৌন অধিকার অন্য ব্যক্তির কাছে মালিকানা বা বিবাহের মাধ্যমে স্থানান্তর করে, অথবা তাকে মুক্ত করে দেয়।

আশরাফুল হিদায়া, ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৪৬

গ্রন্থটি এরপর এই বিধানের মূলনীতিও স্পষ্ট করে দেয়: একই মালিকের অধীনে দুই সহোদরা দাসী থাকা নিষিদ্ধ নয়; নিষেধ হচ্ছে তাদের দুজনকে একই সময়ে যৌন ভোগের আওতায় আনা। একজনকে মালিকানা, বিবাহ বা মুক্তির মাধ্যমে নিজের যৌন অধিকারের বাইরে সরিয়ে দিলেই অপর বোনের সঙ্গে যৌনসম্পর্কের বাধা দূর হয়।

পরবর্তী পৃষ্ঠার বাংলা ব্যাখ্যায় বিষয়টি আরও খোলামেলা ভাষায় বলা হয়েছে। সেখানে ব্যাখ্যা করা হয়, মালিক যদি দুই বোনের একজনকে কামভাবসহ চুম্বন করে, তাহলে সেই বোনের সঙ্গে সহবাসসহ অন্যান্য যৌন ঘনিষ্ঠতা বৈধ থাকে, আর অপর বোন তার জন্য হারাম হয়ে যায়। আবার একজনকে অন্যের মালিকানায় দেওয়া, অন্যের সঙ্গে বিবাহ দেওয়া অথবা মুক্ত করে দিলে অপর বোনের সঙ্গে যৌনসম্পর্কের পথ খুলে যায়। [54]

প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা: যদি কারও অধীনে দুই পরস্পর সহোদর বোন দাসী হিসেবে থাকে এবং মালিক তাদের একজনকে কামভাবসহ চুম্বন করে, তাহলে সেই বোনের সঙ্গে সহবাসসহ অন্যান্য যৌন ঘনিষ্ঠতা বৈধ থাকবে; কিন্তু অপর বোন তার জন্য হারাম হয়ে যাবে। আবার একজন বোনের ওপর নিজের যৌন অধিকার অন্যের কাছে মালিকানা বা বিবাহের মাধ্যমে হস্তান্তর করলে, অথবা তাকে মুক্ত করে দিলে, অপর বোনের সঙ্গে যৌনসম্পর্ক বৈধ হবে।

আশরাফুল হিদায়া, ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৪৭

এই হানাফি বিধান নববীর শাফিঈ বক্তব্যের সঙ্গে পাশাপাশি রাখলে সমস্যাটি আরও প্রকট হয়। দুই ভিন্ন ফিকহি ধারায় আলোচনার ভাষা একই অক্ষের চারপাশে ঘুরছে—মালিক কোন নারীকে যৌনভাবে ব্যবহার করছেন, একজনের ওপর তার যৌন অধিকার কখন শেষ হচ্ছে, এবং সেই অধিকার শেষ হলে কখন অন্য বোনটি তার জন্য বৈধ হচ্ছে। কিন্তু দুই বোনের কেউ মালিককে যৌনসঙ্গী হিসেবে চান কি না, তাদের “না” আছে কি না, কিংবা তাদের স্বাধীন সম্মতি নেওয়া হয়েছে কি না—এই প্রশ্নটি বৈধতা নির্ধারণের শর্ত হিসেবে কোথাও উপস্থিত নেই।

এখানে ফিকহের সম্পত্তি-ভিত্তিক ভাষাটিও লক্ষণীয়। মূল আরবিতে ব্যবহৃত হয়েছে يُمَلِّكَ فَرْجَ الْأُخْرَى غَيْرَهُ—অর্থাৎ একজন বোনের যৌনাঙ্গের ওপর অধিকার অন্যের হাতে দেওয়া। ভাষাটি যতই অস্বস্তিকর হোক, এটাই ফিকহি পাঠের ভাষা। নারীর স্বাধীন দেহগত অধিকারের ভাষা নয়; বরং কার হাতে তার যৌনাঙ্গের আইনগত অধিকার থাকবে, তার হিসাব।

মা-মেয়ের ক্ষেত্রে বিধানটি আরও কঠোর। নববীও বলেন, কোনো ব্যক্তি যদি একইসঙ্গে একজন মা ও তার মেয়ের মালিক হয় এবং তাদের একজনের সঙ্গে সহবাস করে, তাহলে অন্যজন চিরতরে তার জন্য হারাম হয়ে যাবে। [55]

অর্থাৎ এই মাসআলাগুলোর যৌন বিধানকে সংক্ষেপে সাজালে চিত্রটি দাঁড়ায়—

দুই বোনই মালিকের সম্পত্তি → মালিক “যাকে ইচ্ছা” তাকে সহবাস করবেন → সেই সহবাসের কারণে অন্য বোন সাময়িকভাবে হারাম → প্রথম বোনকে বিক্রি, দান, মুক্ত বা বিবাহ দিয়ে নিজের অধিকারের বাইরে সরানো → দ্বিতীয় বোনের সঙ্গে সহবাস বৈধ।

আর মা-মেয়ের ক্ষেত্রে—

মা ও মেয়ে উভয়ই মালিকানায় → মালিক একজনকে সহবাস করলেন → অন্যজন তার জন্য চিরস্থায়ীভাবে হারাম। [51]

এই ধারাবাহিকতার দিকে তাকালে একটি বিষয় প্রকট হয়ে ওঠে: নারীর শরীরের ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার কার্যকর পক্ষ হচ্ছে মালিক। ফিকহ হিসাব করছে—কোন নারী বর্তমানে তার জন্য হালাল, কোন নারী হারাম, একজনকে কোন লেনদেন বা ব্যবস্থার মাধ্যমে সরালে অন্যজন হালাল হবে, এবং কার সঙ্গে সহবাস করলে কোন আত্মীয় নারী তার জন্য নিষিদ্ধ হবে। কিন্তু এই দীর্ঘ ও সূক্ষ্ম আইনগত হিসাবের কোথাও “দাসী নারীটি এতে সম্মত কি না”—এই প্রশ্নকে সহবাসের বৈধতার শর্ত করা হয়নি।

এখানে একটি সম্ভাব্য আপত্তিও আগেই পরিষ্কার করা দরকার। এই মাসআলাগুলো থেকে আমরা এই দাবি করছি না যে প্রতিটি সহবাসই অবশ্যই শারীরিক জবরদস্তির মাধ্যমে ঘটেছিল। সেই দাবি এই আলোচনার জন্য অপ্রয়োজনীয়। প্রশ্নটি হচ্ছে আরও মৌলিক—সহবাসের শরিয়তি বৈধতা নির্ধারণে দাসীর স্বাধীন সম্মতি কোথায়? এই মাসআলাগুলোর ভাষায় তার কোনো সন্ধান নেই। বরং যা বারবার পাওয়া যাচ্ছে তা হলো মালিকের ইচ্ছা, মালিকানা, যৌন অধিকার এবং সেই অধিকারের সীমা

আর এই মাসআলাগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে পড়ারও সুযোগ নেই। এই প্রবন্ধে আমরা আগেই প্রতিষ্ঠিত ফিকহি বিধান দেখেছি যে, শরিয়তসম্মত ওজর ছাড়া মালিকের বৈধ যৌন আহ্বান প্রত্যাখ্যান করা দাসীর জন্য নিষিদ্ধ এবং নিজেকে মালিকের যৌন উপভোগের জন্য সমর্পণ করা তার কর্তব্য। সেই বিধানের পাশে যখন আবার বলা হয়, দুই দাসী-বোনের মধ্যে মালিক أيتهما شاء“যাকে ইচ্ছা” তাকে সহবাস করতে পারে, তখন সম্মতির প্রশ্নে ফিকহি কাঠামোটির চরিত্র অস্পষ্ট থাকে না।

অর্থাৎ একদিকে দাসীর “আমি চাই না” শরিয়তস্বীকৃত স্বাধীন যৌন প্রত্যাখ্যান নয়; অন্যদিকে মালিকের ক্ষেত্রে বিধানের ভাষাই হচ্ছে “যাকে সে ইচ্ছা”। এর চেয়ে মালিক ও দাসীর যৌন ক্ষমতার অসমতা আর কত স্পষ্ট ভাষায় লেখা প্রয়োজন?

আগের যৌথ মালিকানার মাসআলাগুলোর সঙ্গে এই বিধানগুলো পাশাপাশি রাখলে বিষয়টি আরও নগ্ন হয়ে ওঠে। একদিকে একজন দাসী দুই বা তিন পুরুষের যৌথ মালিকানায় থেকে একাধিক মালিকের সঙ্গে সহবাসের পর সন্তান জন্ম দিলে ফিকহ পিতৃত্ব, মালিকানা, দাসীর মূল্য এবং অংশীদারদের আর্থিক অধিকার হিসাব করছে। অন্যদিকে একজন পুরুষের মালিকানায় দুই বোন বা মা-মেয়ে থাকলে ফিকহ হিসাব করছে—কাকে সহবাস করা যাবে, কাকে সাময়িক বা স্থায়ীভাবে বাদ দিতে হবে এবং একজনকে সরালে কখন অন্যজনের সঙ্গে সহবাস বৈধ হবে।

দুই ক্ষেত্রেই কেন্দ্রবিন্দু একই: মালিকের যৌন অধিকার এবং মালিকানাধীন নারীর শরীর সেই অধিকারের আওতায় কখন হালাল বা হারাম। নারীটির স্বাধীন যৌন সিদ্ধান্ত এখানে নিয়ামক নয়।

সম্মতি (consent) বলতে যদি বোঝায় একজন মানুষ নিজের শরীর সম্পর্কে স্বাধীনভাবে, ভয় বা বাধ্যবাধকতা ছাড়া, কার্যকরভাবে “হ্যাঁ” বা “না” বলতে পারবেন এবং তার “না” বললেই যৌনসম্পর্কের অধিকার শেষ হয়ে যাবে—তাহলে এই ফিকহি কাঠামোর সঙ্গে সেই ধারণার মৌলিক সংঘাত অস্বীকার করার কোনো যুক্তিসঙ্গত উপায় নেই। এখানে নারীর “আমি কাকে চাই” নয়, বিধানের কার্যকর ভাষা হচ্ছে মালিকের “আমি কাকে চাই”


আধুনিক মুসলিম সমাজ ও শরিয়তের স্থবিরতা

আজকের অধিকাংশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে দাসপ্রথা আইনত নিষিদ্ধ এবং সাধারণ মুসলমানরা দাস বা দাসী রাখেন না। এটা মূলত বৈশ্বিক চাপ ও মানবাধিকার মূল্যবোধের প্রভাবেই সম্ভব হয়েছে – ইসলামী নৈতিকতা থেকে নয় [1]। অপ্রিয় সত্য হলো, কোরআন-হাদিসে দাসপ্রথাকে বিলুপ্ত করার আদেশ নেই; শুধু কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে দাসদের সাথে সদ্ব্যবহার, মুসলিম দাস মুক্তির সওয়াবের ইত্যাদি উল্লেখ আছে। ঔপনিবেশিক যুগে পাশ্চাত্যের দেশগুলো দাসপ্রথা বিলুপ্ত ঘোষণা করার পর মুসলিমবিশ্বও ধীরে ধীরে তা অনুসরণ করেছে, কিন্তু তাত্ত্বিকভাবে ইসলামী বিধান গ্রন্থে দাসপ্রথার বৈধতা রয়ে গেছে। ইসলামী স্কলারগণ সাধারণত এ নিয়ে অস্বস্তিকর অবস্থানে থাকেন। অনেকে বলেন “ইসলাম দাসপ্রথা ধীরে ধীরে উঠিয়ে দিয়েছে” – কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে এই তথ্য আসলে সত্য নয়। নবী মৃত্যুর বহু শতাব্দী পর পর্যন্ত মুসলিম সমাজে দাসত্ব বিদ্যমান ছিল এবং ক্রীতদাস ও হারেম প্রথা চালু ছিল। আসলে, আজকের মুসলিমরা দাস না রাখার নীতি মেনে চলছেন মূলত আধুনিক রাষ্ট্রের আইন ও আন্তর্জাতিক চাপের কারণে, ধর্মীয় কারণে নয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, ইসলামের বিধানকে মুসলিমগণ বিশ্বাস করেন কিয়ামত পর্যন্ত অপরিবর্তনীয়। মূলধারার আলেমদের মত অনুযায়ী কোরআন ও সহীহ হাদিসের দ্বারা প্রমাণিত যে কোনো শরিয়তি আইন চিরকাল বহাল থাকবে – “ইসলামের যেসব বিধান কোরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট বক্তব্য দ্বারা প্রমাণিত, সেগুলো কিয়ামত পর্যন্ত পরিবর্তন হবে না”। অর্থাৎ মানুষের তৈরি আইনে পরিবর্তন আসতে পারে, কিন্তু আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত আইন অপরিবর্তনীয় ও সর্বকালের জন্য প্রযোজ্য। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে গেলে, যুদ্ধবন্দীদের দাস বানানোর যে অনুমতি ইসলাম প্রাথমিক যুগে দিয়েছে, তা এখন আন্তর্জাতিক আইনে নিষিদ্ধ হওয়ার পরও শরিয়তের দৃষ্টিতে তা নৈতিকভাবে ভুল বা খারাপ হয়ে যায়নি। শুধুমাত্র বর্তমান বাস্তবতায় ইসলামী দেশগুলো জাতিসংঘ চার্টার ও অন্যান্য আইনের অধীন বলে তারা দাসপ্রথাকে বিলুপ্ত করেছে; কিন্তু কাল আবারো যদি ইসলামী খিলাফত কায়েম হয়, আবার এ প্রথা চালু করা “শরিয়তসম্মত” বলেই বিবেচিত হবে। উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, আইএস যখন সিরিয়া-ইরাকে খিলাফতের দাবিতে এলাকা দখল করে, তখন তারা আন্তর্জাতিক আইনে বেআইনি হলেও কোরআনের বর্ণনার আলোকে ইয়াজিদি ও শিয়া নারী বন্দীদের দাসী বানিয়ে যৌনদাসত্বে বাধ্য করেছে, শিশুদের বাজারে বিক্রি করেছে। তাদের তত্ত্ব ছিল: “রাসুলের সুন্নাত পুনর্জীবিত” করা।

মূলধারার মুসলিমরা আইএসের এই কাজ দেখে স্তম্ভিত ও ক্ষুব্ধ হলেও কোরআন-হাদিসে যুদ্ধবন্দী নারীকে দাসী বানানোর মূল বৈধতা বাতিল করে—এমন কোনো সুস্পষ্ট দলিল তারা দেখাতে পারেননি। বরং মানবিক ও আধুনিক মূল্যবোধ থেকেই একে অগ্রহণযোগ্য বলেছেন। ঠিক একইভাবে, ইসলামের অন্য অনেক অনুশাসন (যেমন বহুবিবাহ, শিশু বিবাহ, বিধর্মীদের প্রতি বৈষম্যমূলক জিজিয়া কর ইত্যাদি) আজ বহু মুসলিম দেশেও আইনগতভাবে নিষিদ্ধ হলেও ধর্মীয়ভাবে সেগুলোর বৈধতা অটুট রয়েছে। এই দ্বৈত বাস্তবতা মুসলিম চিন্তাবিদদের এক বড় নৈতিক সংকটে ফেলেছে: চিরন্তন ধর্মীয় আইন বনাম পরিবর্তনশীল মানবিক মূল্যবোধ। অনেকেই প্রকাশ্যে এ বিতর্ক করতে চান না, কিন্তু বাস্তবতা হলো – যুগ পাল্টানোর সাথে সাথে মানুষ নৈতিকতার মানদণ্ড পরিবর্তন করেছে, অথচ ধর্মীয় গ্রন্থের বিধান অপরিবর্তনীয় রয়ে গেছে।


মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা ও নৈতিক প্রশ্ন

উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে একটি মৌলিক মানবিক প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে: ন্যায়-অন্যায় বা নৈতিকতার মানদণ্ড কি দল বা ধর্মভেদে আলাদা হতে পারে? যুদ্ধক্ষেত্রে “আমাদের পক্ষ” কোনো কাজ করলে সেটি ন্যায়সঙ্গত, অথচ শত্রুপক্ষ একই কাজ করলে তা অন্যায়—এমন দ্বিমুখী অবস্থান যুক্তিসঙ্গত নয়।

ইসলামী ফিকহে অমুসলিম নারীদের বন্দী করা, দাসী বানানো ও যৌনসঙ্গী হিসেবে ব্যবহার বৈধ বলা হয়েছে। কিন্তু যদি উল্টোটা ঘটে?—অর্থাৎ কোনো অমুসলিম বাহিনী মুসলিম নারীদের বন্দী করে একই আচরণ করে, তখন কি কোনো মুসলমান এটিকে ন্যায় ও নৈতিক বলবে? ইতিহাসের নিরপেক্ষ দলিল বলছে: বাস্তবে যখন মুসলিম নারীরা এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছে, তখন মুসলিম সমাজ একে ভয়াবহ অন্যায় ও লজ্জাজনক অপরাধ হিসেবেই দেখেছে।

ইতিহাসে অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে যেখানে উভয় পক্ষই অপর পক্ষের নারীকে বন্দী করেছে এবং যৌন দাসত্ব চাপিয়ে দিয়েছে। যেমন—


ঐতিহাসিক উদাহরণসমূহ

এই সম্পর্কে কিছু ঘটনা বর্ণনা করা হচ্ছে, মূল প্রসঙ্গের সাথে খুব প্রাসঙ্গিক না হওয়ায় সেগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হচ্ছে না। নিচের টেবিলটি দেখুন,

সময়কাল / ঘটনাবিজেতা পক্ষপরাজিত পক্ষনারী বন্দী/দাসত্বের বিবরণ
৭১১ খ্রিস্টাব্দ, সিন্ধু বিজয়আরব সেনারা (উমাইয়া খিলাফত)হিন্দু রাজ্যসমূহহাজার হাজার হিন্দু নারী বন্দী হয়ে দাসী রূপে আরব ভূমিতে প্রেরিত।
মোঘল আমল (১৬-১৭ শতক)মুসলিম সুলতান ও সম্রাটগণহিন্দু রাজপরিবারপরাজিত হিন্দু রাজকুমারীরা বিজেতা সুলতানদের হারেমে অন্তর্ভুক্ত।
ক্রুসেড যুদ্ধ (১১-১৩ শতক)ইউরোপীয় খ্রিস্টান ক্রুসেডাররামুসলিম জনগোষ্ঠীমুসলিম নারী ও শিশুদের বন্দী করে ইউরোপে বিক্রি করা হয়েছিল।
আন্দালুস পতন (১৪৯২)খ্রিস্টান ক্যাথলিক রাজা-রানীআন্দালুসের মুসলিমরামুসলিম নারী-পুরুষ দাস বাজারে বিক্রি; অসংখ্য নারী যৌন দাসত্বে বাধ্য।

দেখা যাচ্ছে, ইতিহাসের প্রতিটি উদাহরণে বিজেতা পক্ষ তাদের কর্মকাণ্ডকে বৈধ বা “ধর্মযুদ্ধের গনিমত” বলেছে, অথচ ভুক্তভোগী পক্ষ একে যৌন সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন বলেই দেখেছে। পক্ষপাতদুষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি তাই ন্যায়কে দ্বিমুখী রূপে উপস্থাপন করেছে। কিন্তু ন্যায়নীতির প্রকৃত স্বরূপ সর্বজনীন। নৈতিকতার গোল্ডেন রুলে বলা হয়,

“নিজের সাথে যে ব্যবহার পছন্দ নয়, অন্যের সাথে তা কোরো না।”

ধর্ম যাই হোক না কেন, যদি আপনার মা-বোন বা কন্যা যুদ্ধবন্দী হয়ে শত্রুপক্ষের হারেমে দিন কাটাতেন—আপনি কখনোই সেটিকে ন্যায় বা নৈতিক বলতেন না। তাহলে অন্যের মা-বোনের ক্ষেত্রেও সেটি ন্যায় হতে পারে না। এই সত্যটাই মানবিকতার আসল পরীক্ষা। সভ্যতার অগ্রগতি আমাদের শিখিয়েছে যে মানবাধিকারের মূল্যবোধ সর্বজনীন, “আমাদের দল” বা “তাদের দল” ভেদে নয়। সেই কারণে আজ কোনো রাষ্ট্র প্রকাশ্যে যুদ্ধবন্দীদের ধর্ষণ বা দাসত্ব সমর্থন করে না; যারা করে তারা বিশ্বসভ্যতার চোখে অচ্ছুত হয়ে যায়।

অতএব, ধর্মীয় অনুমতি কোনো অনৈতিক কাজকে ন্যায়সঙ্গত করে তোলে না। যা নিজের পরিবারের নারীর ক্ষেত্রে অন্যায়, অন্যের পরিবারের ক্ষেত্রেও সেটাই অন্যায়।


এপোলোজিস্টদের দাবি: ফিকহী বিধান ও নৈতিক পরামর্শ মিলিয়ে ফেলা

দাসীর সম্মতি নিয়ে আধুনিক ইসলামি প্রতিরক্ষামূলক লেখাগুলোতে কয়েক ধরনের যুক্তি বারবার দেখা যায়। যেমন দাসীদের প্রতি সদাচরণের হাদিস, অতিরিক্ত মারপিট না করা কিংবা প্রহার করলে কাফফারা হিসেবে মুক্ত করতে উৎসাহ দেয়া ইত্যাদির হাদিস। আবার অনেক সময় অন্যের দাসীকে ধর্ষণের শাস্তি সামনে নিয়ে এসে ইসলামে নিজ দাসীদের ধর্ষণ করাকে অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করার চেষ্টাও দেখা যায়। আবার অনেক সময় আল-হালিমীর একটি নৈতিক পরামর্শ, “হক” শব্দের তুলনা কিংবা আযলের বিধানকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু কোনো আলেমের নৈতিক সদুপদেশ, উত্তম আচরণের পরামর্শ বা ইহসানের আলোচনা এবং কোনো বিষয়ের ফিকহী হুকুম এক জিনিস নয়। ফিকহী প্রশ্নটি হলো: দাসী যৌনসম্পর্ক প্রত্যাখ্যান করলে তার “না” কি মালিকের যৌন অধিকার বাতিল করে? সেই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করতে হবে যেসব উৎস সরাসরি ওয়াজিব, হারাম, অধিকার, অনুমতি, অস্বীকৃতি ও বাধ্য করার বিধান আলোচনা করছে, সেগুলো দিয়ে—সাধারণ সদাচরণের উপদেশ দিয়ে নয়।

প্রচলিত আপত্তিঅতি সংক্ষিপ্ত জবাব
আল-হালিমী বলেছেন, দাসী মালিকের সঙ্গে শোয়া বা সহবাস অপছন্দ করলে তার অনুমতি নেওয়া উচিত। অতএব সম্মতি বা consent বাধ্যতামূলক।আল-হালিমীর বক্তব্যটি কোনো কিতাবুন নিকাহ, তাসাররি বা দাসীর সহবাসের বৈধতার আইনগতভাবে ফিকহী মাসআলা নয়; এটি তাঁর আল-মিনহাজ ফি শু‘আব আল-ঈমান-এর “باب في الإحسان إلى المماليك”—দাসদের প্রতি ইহসান/সদাচরণ অধ্যায়ের অংশ। একই আলোচনায় তিনি বাধ্যতামূলক বিষয়কে عزائم বলে আলাদা করার পর ثم أن الأولى به“এরপর তার জন্য উত্তম হলো”—ভাষায় উত্তম আচরণের আলোচনা করেন। তাই এই বক্তব্য একজন আলেমের ইহসানমূলক নৈতিক পরামর্শ, দাসীর সম্মতি বা consent-কে সহবাসের সর্বজনীন শরিয়তি validity-condition ঘোষণা করা কোনো মাযহাবি ফিকহী বিধান নয়। [56]
ইসলাম দাসদের ভালো ব্যবহার ও অযথা প্রহার নিষিদ্ধ করেছে; তাই দাসীকে জোর করে সহবাস করানো সম্ভব নয়।সাধারণভাবে নির্যাতন না করা থেকে নির্দিষ্ট যৌন অস্বীকৃতির অধিকার প্রমাণ হয় না। বরং সরাসরি ফিকহে দাসীর মালিকের যৌন আহ্বান প্রত্যাখ্যানকে হারাম বলা হয়েছে এবং মালিকের বৈধ নির্দেশ অমান্যের ক্ষেত্রে শাসন/প্রহারের ক্ষমতাও স্বীকৃত হয়েছে। সাধারণ “সদাচরণ করো” নীতি কোনো নির্দিষ্ট ফিকহী অধিকার বাতিল করে না। [57]। যদিও ইসলামে দাসীদের প্রহার করা কোন হারাম কাজ নয় [48]
অন্যের দাসীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করলে হদ বা শাস্তি আছে; অতএব ইসলামে দাসী ধর্ষণ নিষিদ্ধ।এটি অন্য ব্যক্তির দাসীর ঘটনা। সেখানে অপরাধীর সমস্যা হলো নারীটি তার স্ত্রী বা তার মালিকানাধীন দাসী নয়। এটি দাসীর autonomous consent-এর অধিকার প্রমাণ করে না; বরং যৌন বৈধতার সঙ্গে মালিকানার সীমা যুক্ত থাকার প্রমাণ। নিজের মুকাতাবা দাসীর সঙ্গে يغتصبها/জোরপূর্বক সহবাসের আলোচনায় আল-মুদাওয়ানা-তে মালিকের ওপর হদ না থাকার বিধান পাওয়া যায়। [58]
আযলে দাসীর অনুমতি লাগে না—এ থেকে সহবাসেও অনুমতি লাগে না, তা প্রমাণ হয় না।আযলের দলিল একা ব্যবহার করলে এই আপত্তি সঠিক। কিন্তু এই প্রবন্ধের যুক্তি আযলের ওপর একা দাঁড়িয়ে নেই। ইবন কুদামা আযলের অনুমতি অপ্রয়োজনীয় হওয়ার কারণই বলেছেন—لا حق لها في الوطء، ولا في الولدসহবাস ও সন্তানে দাসীর কোনো অধিকার নেই। ইবন আবদুল বার আবার দাসীর অনুমতি, পরামর্শ ও মতামত ছাড়াই আযলের বৈধতা বলেছেন। এগুলো যখন দাসীর যৌন অস্বীকৃতি হারাম এবং অস্বীকারের পর বাধ্য করার সরাসরি বিধানের সঙ্গে পড়া হয়, তখন আইনগত কাঠামোটি স্পষ্ট হয়। [59], [60]
ইবন হাজার জোরপূর্বক বিবাহ এবং দাসীকে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন।জোরপূর্বক বিবাহ এবং দাসীকে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা আলাদা মাসআলা। এগুলো থেকে নিজের মালিকানাধীন দাসী মালিকের যৌন আহ্বান প্রত্যাখ্যান করলে তার অস্বীকৃতি মালিকের ملك اليمين-ভিত্তিক যৌন অধিকার বাতিল করবে—এমন বিধান পাওয়া যায় না। এক মাসআলার নিষেধাজ্ঞাকে আরেক ভিন্ন মাসআলায় স্থানান্তর করা যায় না।
ইসলাম কোনো “জুলুম” অনুমোদন করে না; তাই জোরপূর্বক সহবাসও অনুমোদিত হতে পারে না।এখানে যুক্তিটি চক্রাকার কুযুক্তি। প্রথমে নির্ধারণ করতে হবে সংশ্লিষ্ট ফিকহে কোন কাজকে জুলুম বলা হচ্ছে। যদি দাসীর অস্বীকৃতির পর তাকে সহবাসে বাধ্য করাকেই ليس ذلك بمستقبح لأنه يستوفي حقه“নিন্দনীয় নয়, কারণ সে নিজের অধিকার আদায় করছে”—বলা হয়, তাহলে শুধু “জুলুম হারাম” বললে সমস্যাটির কোনো উত্তর হয় না।
ফিকহে ‘ধর্ষণ’ বলতে জবরদস্তিমূলক যিনা বোঝানো হয়; নিজের বৈধ দাসীর সঙ্গে সহবাস যিনা নয়, তাই ধর্ষণও নয়।এটি classical criminal-law terminology ব্যাখ্যা করে, consent-এর প্রশ্নের উত্তর দেয় না। যদি সংজ্ঞাতেই “বৈধ স্ত্রী বা নিজের দাসী নয়” শর্ত বসানো হয়, তাহলে মালিকের জোরপূর্বক সহবাসকে শুরুতেই ‘ধর্ষণ’ category-এর বাইরে রেখে পরে “এটি ধর্ষণ নয়” বলা সংজ্ঞাগত বৃত্ত তৈরি করে। প্রকৃত প্রশ্ন হলো—নারীটি “না” বললে সেই “না” আইনগতভাবে যৌনসম্পর্ক বন্ধ করে কি না।
আধুনিক consent-এর ধারণা দিয়ে সপ্তম শতাব্দী বিচার করা presentismকোনো ঐতিহাসিক ব্যবস্থা তখন প্রচলিত ছিল কি না এবং সেটি নৈতিক ছিল কি না—দুটি ভিন্ন প্রশ্ন। এই প্রবন্ধ ইতিহাসের মানুষ আধুনিক পরিভাষা ব্যবহার করেছিল কি না তা দাবি করছে না; পরীক্ষা করছে সেই ব্যবস্থায় একজন নারীর স্বাধীন ও প্রত্যাহারযোগ্য “না” কার্যকর ছিল কি না এবং সেই ব্যবস্থা আধুনিক মানবিক নীতিতে কী দাঁড়ায়। একইসাথে, ইসলামি শরিয়তের বিধান কেয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষের জন্য নিখুঁত ও অপরিবর্তনীয় ঐশ্বরিক বিধান দাবিটির সাথে এই যুক্তি যৌক্তিক দ্বন্দ্ব তৈরি করে।

একজন আলেম বলতে পারেন, মালিকের উচিত দাসীর মন খুশি রাখা, তার অপছন্দ বিবেচনা করা বা তাকে বিক্রি করে দেওয়া—এটি ইহসান, আদব বা উত্তম আচরণের পরামর্শ হতে পারে। কিন্তু ফিকহী বিধান জানতে হলে দেখতে হবে, দাসী অস্বীকার করলে আইনগত ফল কী। সেখানে আমরা পাই: অস্বীকার কঠোরভাবে হারাম, মালিককে নিজেকে যৌন উপভোগের সুযোগ দেওয়া ওয়াজিব, সহবাসে দাসীর নিজস্ব অধিকার নেই, আযলে তার অনুমতি প্রয়োজন নেই, এমনকি সরাসরি অস্বীকারের ক্ষেত্রে তাকে শারীরিক বল প্রয়োগের মাধ্যমেও বাধ্য করা যেতে পারে। কাজেই কোনো বিচ্ছিন্ন সদুপদেশকে এসব সরাসরি ফিকহী বিধানের সমমানের দলিল বানিয়ে “ইসলামে দাসীর স্বাধীন consent বাধ্যতামূলক ছিল” দাবি করা উৎসের প্রকৃতি ও আইনি ওজন—দুটোকেই গুলিয়ে ফেলা।


উপসংহার

ইসলামি গ্রন্থগুলোতে কিছু আলেমের সদুপদেশমূলক বক্তব্য পাওয়া যায়, যেখানে দাসীর অনাগ্রহ বা অপছন্দকে বিবেচনায় নিতে পরামর্শ দিতে বলা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী মত। কিন্তু এ ধরনের বক্তব্যকে দাসীর স্বাধীন যৌনসম্মতির বাধ্যতামূলক শরিয়তি শর্ত হিসেবে দেখানো যায় না। কারণ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি বিধানে দাসীর অকারণ যৌন প্রত্যাখ্যানকে বৈধ ও চূড়ান্ত অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। বরং মালিকের যৌন আহ্বানে সাড়া দেওয়া তার কর্তব্য, আর অস্বীকার করাকে নিষিদ্ধ, পাপ বা শাস্তিযোগ্য অবাধ্যতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যেখানে ইসলামে স্ত্রীকেই স্বামীর যৌন চাহিদা মেটাতে বাধ্য থাকতে বলা হয়েছে, সেখানে মালিকানাধীন দাসীর সম্মতির বিষয়টিই আসলে অবান্তর। দাসীর অনুমতি ছাড়া মালিক সহবাস করলে সেটি ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হবে, মালিকের ওপর নির্দিষ্ট শাস্তি হবে, কিংবা দাসীর “না” মালিকের যৌন অধিকার বাতিল করে দেবে, এমন কোনো প্রতিষ্ঠিত মাযহাবি বিধান বা শক্তিশালী ফিকহি ঐকমত্য ইসলামে নেই। অতএব স্বাধীন, প্রত্যাহারযোগ্য সম্মতি মালিকের সহবাসের সাধারণ আইনগত পূর্বশর্ত ছিল, ইসলামিস্টদের এই আধুনিক দাবি প্রমাণিত হয় না।

অতীতে কোনো বর্বর ব্যবস্থা স্বাভাবিক ছিল বলেই সেটি নৈতিক হয়ে যায় না। দাসপ্রথা, যুদ্ধলুণ্ঠন, বন্দিনী নারীকে যৌনদাসী বানানো—এসব প্রাচীন সমাজে প্রচলিত ছিল, কিন্তু আধুনিক মানবিক ন্যায়বোধ এগুলোকে প্রত্যাখ্যান করেছে। মানবসভ্যতার অগ্রগতি এখানেই যে, মানুষ একসময় স্বীকৃত অমানবিক প্রথাকেও পরে অন্যায় হিসেবে চিহ্নিত করতে শিখেছে। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন কোনো ধর্মীয় আইন নিজেকে চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয় দাবি করে সেই পুরনো বর্বরতাকেই নৈতিকতার নামে রক্ষা করতে চায়। ইসলামসহ বহু ধর্মীয় আইনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্রাচীন যুদ্ধ, দাসত্ব ও পিতৃতান্ত্রিক সমাজের প্রেক্ষাপটে গঠিত। আজ সেই বিধানগুলোকে মানবাধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সম্মতির নীতির সামনে দাঁড় করালে সেগুলোর অমানবিকতা স্পষ্ট হয়ে যায়। তাই মুসলিম সমাজের উচিত সৎভাবে স্বীকার করা যে যুদ্ধবন্দীদের দাসত্ব এবং দাসীর ওপর মালিকের যৌন অধিকার—এসব ঐতিহাসিক ইসলামি বিধান আধুনিক মানবিক মানদণ্ডে অগ্রহণযোগ্য। ধর্মীয় বৈধতা কোনো অমানবিক কাজকে নৈতিক করে না; ন্যায়-অন্যায় বিচারে মানবিক যুক্তি, স্বাধীনতা ও সম্মতিকেই প্রাধান্য দিতে হবে।


তথ্যসূত্রঃ
  1. ইসলামে অমানবিক দাসপ্রথা 1 2
  2. কোরআন 16:75 ↩︎
  3. খলিফা মুয়াবিয়ার দরবারে নগ্ন দাসী নিয়ে আসা হতো সম্ভোগের জন্য ↩︎
  4. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনে কাসীর, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ২৬৬ ↩︎
  5. ويحرم على الزوجة والأمة تحريما غليظا أن تمتنع إذا طلبها للاستمتاع الجائز ↩︎
  6. Mawsoo’ah al-Fiqhiyyah, Vol. 23, p. 23 ↩︎
  7.  مسألة فرض الأمة والحرة أن لا يمنعا السيد والزوج الجماع متى دعاهما ↩︎
  8. Islamqa, Fatwa No. 33597 ↩︎
  9. مسألة فرض الأمة والحرة أن لا يمنعا السيد والزوج الجماع متى دعاهما ↩︎
  10. Kecia Ali, “Concubinage and Consent,” International Journal of Middle East Studies, Vol. 49, Issue 1, Cambridge University Press, 2017, pp. 148–152 ↩︎
  11. আশরাফুল হিদায়া, ইসলামিয়া কুতুবখানা, ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬২৫ ↩︎
  12. আল-শাবাকা আল-ইসলামিয়্যা — السبي يقطع نكاح المرأة المسبية, 29-12-2009 ↩︎
  13. ইবন আবদুল বার, আল-তামহীদ লিমা ফিল-মুওয়াত্তা মিনাল-মা‘আনি ওয়াল-আসানিদ, খণ্ড ৩, পৃ. ১৪৭–১৪৮ — Islamweb ↩︎
  14. ইবন কুদামা, আল-মুগনি, খণ্ড ৭, পৃ. ২২৭, “দাসীর অনুমতি ছাড়া আযল” — Islamweb ↩︎
  15. মালিক ইবন আনাস, আল-মুদাওয়ানা, খণ্ড ৪, পৃ. ৪৮১, “في الرجل يطأ مكاتبته طوعا أو غصبا” — Islamweb ↩︎
  16. আল-বুহুতি, শারহ মুনতাহা আল-ইরাদাত (দাকায়িক উলি আন-নুহা), খণ্ড ২, পৃ. ৩১০ — Islamweb ↩︎
  17. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৪৭৭ ↩︎
  18. সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২১৫২ ↩︎
  19. সূনান আবু দাউদ, তাহকিকঃ আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী, আল্লামা আলবানী একাডেমী, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১৫-২১৬, হাদিসঃ ২১৫৫ ↩︎
  20. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিসঃ ৭৪০৯ ↩︎
  21. বুখারী শরীফ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, দশম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৪৯, হাদিসঃ ৬৯০৫ ↩︎
  22. সহজ নসরুল বারী, শরহে সহীহ বুখারী, ১১ তম খণ্ড, আরবি-বাংলা, সহজ তরজমা ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, হযরত মাওলানা মুহাম্মদ উসমান গনী, আল কাউসার প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৫০৭, ৫০৮ ↩︎
  23. ইসলামে দাসীদের সাথে সম্মতিহীন আযল(আজল) ও তার কারণ বিশ্লেষণ ↩︎
  24. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৩৬৬ ↩︎
  25. সুনান আবূ দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২৯৯৯ ↩︎
  26. মা‘রিফাতুস সুনানি ওয়াল-আসার, বর্ণনা ১৮৩০৬ ↩︎
  27. মা‘রিফাতুস সুনানি ওয়াল-আসার লিল বায়হাকী, হাদিস ১৮৩০৬ ↩︎
  28. মা‘রিফাতুস সুনানি ওয়াল-আসার, বর্ণনা ১৮৩০৭ ↩︎
  29. মা‘রিফাতুস সুনানি ওয়াল-আসার, হাদিস ১৮৩১১ ↩︎
  30. মা‘রিফাতুস সুনানি ওয়াল-আসার লিল বায়হাকী, হাদিস ১৮৩১১ ↩︎
  31. বিবাহিত দাসীর বিবাহ বাতিল করে ভোগ করার ভয়াবহ ইসলামিক বিধান ↩︎
  32. মা‘রিফাতুস সুনানি ওয়াল-আসার, বর্ণনা ১৮৩০৪ ↩︎
  33. মা‘রিফাতুস সুনানি ওয়াল-আসার লিল বায়হাকী, হাদিস ১৮৩০৪ ↩︎
  34. আশরাফুল হিদায়া, ইসলামিয়া কুতুবখানা, ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬২৯ ↩︎
  35. আশরাফুল হিদায়া, ইসলামিয়া কুতুবখানা, ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৩১ ↩︎
  36. সুনান আদ-দারেমী, হাদিসবিডি, হাদিসঃ ১২১২ ↩︎
  37. সুনান আদ-দারেমী, হাদিসবিডি, হাদিসঃ ১২১৪ ↩︎
  38. সুনান আদ-দারেমী (হাদিসবিডি), হাদিসঃ ১২১২ ↩︎
  39. সুনান আদ-দারেমী (হাদিসবিডি), হাদিসঃ ১২১৩ ↩︎
  40. সুনান আদ-দারেমী (হাদিসবিডি), হাদিসঃ ১২১৪ ↩︎
  41. সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিসঃ ২৬৭১ ↩︎
  42. সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২৬৬২ ↩︎
  43. তাফসীরে মাযহারী, নবম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৬৪ ↩︎
  44. আবু দাউদ আল-সিজিস্তানী, মাসায়িল আল-ইমাম আহমদ, রিওয়ায়াত আবি দাউদ আল-সিজিস্তানী, মাসআলা ১৮৩০, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৭৮; ইবন মুফলিহ, আল-ফুরু‘ ↩︎
  45. আল-বুহূতী, কাশশাফ আল-কিনা‘ আন মাতন আল-ইকনা‘, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৪৯১–৪৯২; IslamWeb Library ↩︎
  46. IslamWeb, Fatwa no. 137527, حدود طاعة العبد لسيده ومدى جواز ضربه ↩︎
  47. ↩︎
  48. ইসলামে কি আসলেই দাসদাসীকে প্রহার করা হারাম? 1 2
  49. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫০ ↩︎
  50. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪৩ ↩︎
  51. আল-তাহযীব ফি ফিকহ আল-শাফিঈ, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৬২ 1 2 3
  52. রওজাতুত তালেবীন, কিতাবুন নিকাহ, দুই বোনকে একত্র করার বিধান 1 2 3
  53. আশরাফুল হিদায়া, ইসলামিয়া কুতুবখানা, ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৪৬ ↩︎
  54. আশরাফুল হিদায়া, ইসলামিয়া কুতুবখানা, ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৪৭ ↩︎
  55. রওজাতুত তালেবীন, কিতাবুন নিকাহ ↩︎
  56. আল-হালিমী, আল-মিনহাজ ফি শু‘আব আল-ঈমান, “باب في الإحسان إلى المماليك” ↩︎
  57. রওজাতুত তালেবীন ↩︎
  58. আল-মুদাওয়ানা — মুকাতাবা দাসীর সঙ্গে স্বেচ্ছায় বা জোরপূর্বক সহবাস ↩︎
  59. ইবন কুদামা, আল-মুগনি ↩︎
  60. ইবন আবদুল বার, আল-তামহীদ ↩︎

About This Article

Genre: Human-Rights-Based, Legal, Hadith-Based, Fiqh-Based, and Ethical Critical Analysis of Islamic Slavery, Concubinage, War Captives, and Sexual Consent

Epistemic Position: Secular Humanism, Consent-Based Sexual Ethics, Human Rights Law, Anti-Slavery Ethics, War-Crimes Analysis, Fiqh Critique, Hadith Criticism, and Source-Internal Critique of Islamic Sexual Slavery

This article examines Islamic slavery and the legal treatment of female captives, especially the doctrine of milk al-yamin and the claim that a male owner has sexual access to his female slave or war captive.

Its scope includes the Quranic language of “what the right hand possesses,” hadith reports on captive women from Awtas and Banu Mustaliq, coitus interruptus to preserve slave-market value, married captive women, the cancellation of prior marriages through captivity, classical fiqh texts such as Rawdat al-Talibin, Al-Mawsoo'ah al-Fiqhiyyah, Al-Muhalla, IslamQA, Islamweb, marital sexual coercion, and the modern legal meaning of consent, slavery, rape, and war crimes.

The article follows Shongshoy's tradition of sharp, evidence-based, non-apologetic criticism. It does not accept the apologetic trick of defining rape as only “illegal forced sex” and then declaring slave-concubine sex non-rape because Sharia made it legal. That is not moral reasoning; it is circular legal laundering.

The central argument is that consent cannot exist where a woman is captured in war, stripped of freedom, separated from her family or husband, turned into property, and placed under the sexual authority of the victorious owner. Ownership destroys consent. Calling that ownership “lawful” does not remove the coercion; it exposes the law itself as the problem.

The article also exposes the brutal commercial logic inside the hadith material: captive women are discussed in terms of sexual access, pregnancy avoidance, sale value, ransom, and ownership—not as autonomous human beings whose consent matters. This is not a minor historical embarrassment; it is the core structure of sexual slavery.

The discussion rejects the modern apologetic claim that Islam abolished slavery or protected captive women in any morally meaningful sense. A system that permits owning human beings, dissolving their marriages by conquest, compelling sexual availability, and treating refusal as disobedience does not abolish slavery; it regulates and legitimizes it.

This article should be evaluated through source accuracy, hadith and fiqh evidence, consent theory, bodily autonomy, anti-slavery ethics, international human-rights standards, war-crimes principles, and victim-centered reasoning—not through religious sensitivity, inherited reverence, euphemistic translation, Sharia-based circular definitions, apologetic damage control, or the demand that sexual slavery be renamed as lawful intimacy.

One thought on

Leave a comment

Your email will not be published.