ইয়াজুজ মাজুজ | ইসলামী রূপকথার রাক্ষস খোক্কস
সারসংক্ষেপ
ইয়াজুজ-মাজুজ ইসলামী পরকালতত্ত্ব ও মহাজাগতিক ভূগোলের অন্যতম বিস্ময়কর কাহিনি। কোরআনের বর্ণনায় একটি বিপজ্জনক জনগোষ্ঠীকে দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে লোহা ও গলিত ধাতু দিয়ে নির্মিত এক বিরাট প্রতিবন্ধকের পেছনে আবদ্ধ করে রাখেন জুলকারনাইন। তারা সেই প্রাচীর অতিক্রম বা ভেদ করতে পারে না; কিন্তু পৃথিবীর শেষ সময় ঘনিয়ে এলে আল্লাহ সেটি ধ্বংস করে দেবেন এবং ইয়াজুজ-মাজুজ চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে। হাদিসে এই সংক্ষিপ্ত কাহিনি আরও বিস্তৃত হয়েছে: তাদের বিপুল সংখ্যাধিক্য, মুহাম্মদের জীবদ্দশাতেই প্রাচীরে ছিদ্র সৃষ্টি হওয়া, শেষযুগে তাদের মুক্তি, বিপুল পরিমাণ পানি পান করে ফেলা, আকাশের দিকে তীর নিক্ষেপ, ঈসা ও তাঁর অনুসারীদের অবরুদ্ধ করা এবং শেষে বিশেষ ধরনের কীটের আক্রমণে তাদের গণমৃত্যুর বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়।
এই কাহিনির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি সম্পূর্ণ অদৃশ্য স্বর্গ বা পরকালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কোরআনের ঘটনাস্থল পৃথিবীতে; দুইটি পর্বত আছে, একটি জনগোষ্ঠী আছে, লোহা ও গলিত ধাতু দিয়ে নির্মিত একটি বাস্তব প্রতিবন্ধক আছে এবং তার অন্য পাশে মানুষেরই একটি বিপুল গোষ্ঠী আবদ্ধ রয়েছে। হাদিসেও সেই প্রাচীরকে মুহাম্মদের সময় বিদ্যমান বাস্তব বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে ইয়াজুজ-মাজুজের কাহিনি এমন একটি ধর্মীয় দাবি যার অন্তত একটি বড় অংশ পৃথিবীর ভূগোল, প্রত্নতত্ত্ব, জনসংখ্যাবিজ্ঞান এবং আধুনিক পর্যবেক্ষণের সঙ্গে তুলনা করা সম্ভব।
কাহিনিটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এর ইতিহাস। গোগ ও মাগোগ ইসলামের আবির্ভাবের সঙ্গে প্রথম সৃষ্টি হয়নি। বহু শতাব্দী আগে ইহুদি ধর্মীয় সাহিত্যে গোগ ও মাগোগ ভয়ংকর শত্রুজাতি ও শেষযুগের ধ্বংসের সঙ্গে যুক্ত ছিল; পরবর্তী ইহুদি-খ্রিস্টীয় ঐতিহ্যে তারা ক্রমে পরকালীন আক্রমণকারী জাতিতে পরিণত হয়। অন্যদিকে আলেকজান্ডারকে উত্তরাঞ্চলের ভয়ংকর জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে একটি বিশাল গেট বা প্রতিবন্ধক নির্মাতা হিসেবে উপস্থাপন করার কিংবদন্তিও প্রাচীন যুগের অন্তিম পর্ব (Late Antiquity)-র বহু আগে থেকে বিকশিত হচ্ছিল। পরবর্তী সিরীয় আলেকজান্ডার-কাহিনিতে এই দুই প্রবাহ একত্রিত হয়: দুই পাহাড়ের মাঝখানে আলেকজান্ডার, লোহা ও ধাতুর বিশাল গেট, তার পেছনে গোগ-মাগোগ এবং শেষযুগে সেই গেট ভেঙে তাদের বেরিয়ে আসা। কোরআনের জুলকারনাইন-কাহিনি এই পূর্ববর্তী ও সমসাময়িক নিকটপ্রাচ্য শেষযুগীয় আখ্যানের ঐতিহ্য (apocalyptic narrative tradition)এর সঙ্গে অসাধারণ কাঠামোগত সাদৃশ্য বহন করে।
এই প্রবন্ধে তাই শুধু “স্যাটেলাইটে ইয়াজুজ-মাজুজকে দেখা যায় না” ধরনের সরল আপত্তিতে থামা হবে না। বিশ্লেষণ করা হবে কোরআন ও হাদিস আসলে কী দাবি করছে; গোগ-মাগোগ ধারণার ইসলাম-পূর্ব ইতিহাস কী; জুলকারনাইনের কাহিনির সঙ্গে আলেকজান্ডার কিংবদন্তির সম্পর্ক কতটা গভীর; প্রাচীর সম্পর্কে প্রাচীন মুসলিম ব্যাখ্যাকারীরা কী বিশ্বাস করতেন; বিশাল একটি আবদ্ধ মানবগোষ্ঠী পৃথিবীতে থাকলে তার জনসংখ্যাগত, খাদ্য, পানি, ভূমি, বর্জ্য ও পরিবেশগত চিহ্ন কী হওয়ার কথা; এবং কেন আধুনিক পৃথিবীর ভৌগোলিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক জ্ঞান এই ধর্মীয় ভূগোলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ভূমিকা
মানব ইতিহাসে অজানা সীমান্তের ওপারে ভয়ংকর জাতির কল্পনা অত্যন্ত পুরনো। পরিচিত সভ্যতার বাইরে পাহাড়, মরুভূমি বা দূর উত্তরের অজানা অঞ্চলে এমন বর্বর জনগোষ্ঠী বাস করে যারা একদিন সভ্য জগতে নেমে এসে ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে—এই ধারণা বহু প্রাচীন ধর্মীয় ও পৌরাণিক কাহিনিতে পাওয়া যায়। পৃথিবীর ভূগোল যত কম জানা ছিল, এই ধরনের কল্পনার জন্য তত বেশি অজানা স্থান ছিল। দূরের কোনো পর্বতমালা বা দুর্গম গিরিপথের ওপারে কী আছে তা অধিকাংশ মানুষ কখনো দেখতে পারত না; সেই অজানা ভূগোল খুব সহজেই দৈত্য, বর্বর জাতি, অভিশপ্ত জনগোষ্ঠী বা শেষযুগের শত্রুদের আবাসস্থলে পরিণত হতে পারত।
ইয়াজুজ-মাজুজ সেই বৃহত্তর পুরাণ-নির্মাণের একটি ইসলামী রূপ। এর সবচেয়ে পুরনো পরিচিত স্তর পাওয়া যায় হিব্রু বাইবেলের গোগ ও মাগোগ ঐতিহ্যে। সেখানে গোগ একটি ভয়ংকর উত্তরাঞ্চলীয় শত্রুর সঙ্গে যুক্ত; পরবর্তী ধর্মীয় সাহিত্যে গোগ-মাগোগ ক্রমে শেষযুগের বিশাল শত্রুবাহিনীর প্রতীকে পরিণত হয়। এর সঙ্গে আরেকটি স্বতন্ত্র কিংবদন্তি যুক্ত হয়েছিল—বিশ্বজয়ী আলেকজান্ডার পৃথিবীর দূর সীমান্তে গিয়ে অসভ্য বা বিপজ্জনক উত্তরাঞ্চলীয় জাতিগোষ্ঠীকে একটি বিরাট গেটের পেছনে আবদ্ধ করেছিলেন। কয়েক শতাব্দীর ধর্মীয় ও লোকসাহিত্যিক বিকাশে Alexander, northern barbarian peoples, Gog-Magog, mountains, iron gate এবং apocalypse একই কাহিনির উপাদানে পরিণত হয়।
কোরআনের সূরা কাহফে এই পরিচিত উপাদানগুলো আবার একটি অত্যন্ত ঘন কাঠামোয় পাওয়া যায়। একজন রহস্যময় বিশ্বভ্রমণকারী শাসক—জুলকারনাইন—এক পর্যায়ে দুই পর্বতের মধ্যবর্তী অঞ্চলে পৌঁছান। সেখানকার মানুষ তাঁকে জানায় যে ইয়াজুজ-মাজুজ পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। জুলকারনাইন তখন দুই পর্বতের ফাঁক লোহার খণ্ড দিয়ে পূর্ণ করেন, সেগুলো উত্তপ্ত করেন এবং তার ওপর গলিত ধাতু ঢেলে এমন একটি বাধা নির্মাণ করেন যা ইয়াজুজ-মাজুজ অতিক্রম বা ভেদ করতে পারে না। কিন্তু এই বাধা স্থায়ী নয়; ঈশ্বরনির্ধারিত শেষ সময়ে তা ধ্বংস হবে এবং বন্দী জনগোষ্ঠী মুক্ত হয়ে বেরিয়ে আসবে। অর্থাৎ এটি শুধু কোনো প্রাচীন যুদ্ধের কাহিনি নয়—ভূগোল, প্রকৌশল এবং apocalypse-কে একই আখ্যানের মধ্যে যুক্ত করা হয়েছে।
হাদিস এই কাহিনিকে আরও আক্ষরিক ও নাটকীয় করে তোলে। প্রাচীরটি মুহাম্মদের সময়ও পৃথিবীতে অক্ষত আছে; তাতে একটি ছোট ছিদ্র খোলা হয়েছে বলে মুহাম্মদ আতঙ্ক প্রকাশ করছেন; কোনো ব্যক্তি সেটি দেখে এসেছে বলে বর্ণিত হচ্ছে; ইয়াজুজ-মাজুজের সংখ্যা বিপুল বলে উপস্থাপিত হচ্ছে; এবং শেষযুগে তারা এমন সংখ্যায় বের হবে যে হ্রদের পানি পর্যন্ত পান করে শেষ করে ফেলবে। এরপর তারা পৃথিবী জয় করার দাবি করে আকাশের দিকেও তীর নিক্ষেপ করবে। এই বিবরণগুলো কাহিনিটিকে প্রতীকী “অশুভ শক্তি” থেকে সরিয়ে বাস্তব জনগোষ্ঠী, বাস্তব প্রতিবন্ধক এবং বাস্তব পৃথিবীতে সংঘটিত ভবিষ্যৎ ঘটনার ভাষায় নিয়ে আসে।
এখানে আধুনিক জ্ঞানের সঙ্গে সংঘর্ষ শুধু “Google Earth-এ দেয়াল দেখা যায় না” এতটুকু নয়। কয়েক লক্ষ বা কয়েক কোটি মানুষও কোনো অঞ্চলে বাস করলে তাদের বসতি, কৃষি, পানি ব্যবহার, খাদ্য উৎপাদন, পশুপালন, জ্বালানি, রাস্তা, বর্জ্য, বন উজাড়, ভূ-ব্যবহারের পরিবর্তন এবং প্রত্নতাত্ত্বিক অবশেষ সৃষ্টি হয়। আর ইসলামী বর্ণনায় ইয়াজুজ-মাজুজকে যে বিপুল সংখ্যার জনগোষ্ঠী হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে, তাদের সম্পূর্ণ সভ্যতা একটি পাহাড়ি প্রতিবন্ধকের পেছনে হাজার বছরের বেশি সময় অদৃশ্য থাকা শুধু মানচিত্রগত সমস্যা নয়; এটি জনসংখ্যাবিজ্ঞান, ecology, resource consumption এবং archaeology-র সঙ্গেও সরাসরি সংঘর্ষ তৈরি করে।
এর পাশাপাশি ঐতিহাসিক প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোরআনের জুলকারনাইনকে ঠিক কোন ঐতিহাসিক ব্যক্তির সঙ্গে শনাক্ত করা হবে তা নিয়ে মুসলিম ব্যাখ্যাকারী ও আধুনিক গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কিন্তু চরিত্রটির পরিচয় যাই হোক, কাহিনির মূল মোটিফগুলোর ইতিহাস অনুসরণ করা সম্ভব। গোগ-মাগোগ ইসলাম-পূর্ব; আলেকজান্ডারের উত্তরাঞ্চলীয় গেট ইসলাম-পূর্ব; ভয়ংকর জাতিকে পর্বতের পেছনে আবদ্ধ করা ইসলাম-পূর্ব; এবং সেই গেট শেষযুগে খুলে গিয়ে গোগ-মাগোগের আক্রমণ ঘটবে—এই apocalyptic narrative-ও কোরআনের আবির্ভাবের আশপাশের Late Antique নিকটপ্রাচ্যেই সুপরিচিত ছিল। ফলে প্রশ্নটি শুধু “জুলকারনাইন আলেকজান্ডার ছিলেন কি না” নয়; আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কোরআনের কাহিনিটি যে narrative world-এর মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে, সেই জগতটি কোরআনের আগে থেকেই কতটা নির্মিত ছিল।
এই প্রবন্ধে তাই ইয়াজুজ-মাজুজকে তিনটি স্তরে পরীক্ষা করা হবে। প্রথমত, textual level—কোরআন, সহিহ হাদিস ও তাফসির আসলে কী বলছে। দ্বিতীয়ত, historical level—গোগ-মাগোগ ও আলেকজান্ডারের প্রাচীরের কাহিনি কীভাবে ইসলাম-পূর্ব ইহুদি, খ্রিস্টীয়, গ্রিক ও সিরীয় ঐতিহ্যে বিকশিত হয়েছিল। তৃতীয়ত, empirical level—পৃথিবীতে আজও একটি বিশাল জনগোষ্ঠী ও তাদের আবদ্ধকারী লোহা-তামার প্রাচীর বাস্তবে থাকলে তার কী ধরনের পর্যবেক্ষণযোগ্য প্রমাণ থাকার কথা। এই তিন স্তর একত্রে বিচার করলে ইয়াজুজ-মাজুজকে অদৃশ্য বাস্তব জনগোষ্ঠী হিসেবে কল্পনা করার চেয়ে প্রাচীন apocalyptic mythology-র ধারাবাহিক বিকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা অনেক বেশি সংহত হয়ে ওঠে।
গোগ-মাগোগ: ইসলামের আগের ইতিহাস
ইয়াজুজ-মাজুজকে ইসলামের নিজস্ব বা প্রথমবারের মতো উপস্থাপিত কোনো ধারণা মনে করার সুযোগ নেই। নাম ও কাহিনির ইতিহাস অনুসরণ করলে দেখা যায়, ইসলামের বহু শতাব্দী আগেই ইহুদি ধর্মীয় সাহিত্যে গোগ ও মাগোগ উপস্থিত ছিল এবং সময়ের সঙ্গে তাদের ভূমিকা পরিবর্তিত হয়ে শেষযুগের ভয়ংকর শত্রুজাতির রূপ নেয়। কোরআনের ইয়াজুজ-মাজুজ সেই দীর্ঘতর নিকটপ্রাচ্য ধর্মীয় ঐতিহ্যের পরবর্তী রূপ।
এর প্রাচীনতম স্তরে হিব্রু বাইবেলের জেনেসিস-এ মাগোগকে নূহের পুত্র ইয়াফেথের বংশধরদের একজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে এখনো কোনো মহাপ্রলয়, বিশাল প্রাচীর বা শেষযুগের আক্রমণ নেই; “মাগোগ” মূলত জাতি ও বংশের ধর্মীয় ভূগোলের অংশ। [1]
পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি ঘটে ইজেকিয়েল ৩৮–৩৯ অধ্যায়ে। সেখানে গোগ হলো “মাগোগের দেশ”-এর এক শক্তিশালী নেতা, যার সঙ্গে মেশেক ও তুবালের নাম যুক্ত। সে দূর উত্তরাঞ্চল থেকে বিরাট সেনাবাহিনী নিয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নেমে আসবে; পারস্য, কুশ, পুত, গোমের এবং তোগারমাহসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠী তার সঙ্গে থাকবে। কাহিনির শেষে ঈশ্বর নিজেই এই বিশাল বাহিনী ধ্বংস করবেন। অর্থাৎ মাগোগ এখানে আর শুধু বংশতালিকার নাম নয়; এর সঙ্গে উত্তর দিক থেকে আগত ভয়ংকর বহিরাগত আক্রমণ এবং ঈশ্বরনির্ধারিত ধ্বংসের ধারণা যুক্ত হয়ে গেছে। [2]
প্রথম শতাব্দীর ইহুদি ঐতিহাসিক ফ্ল্যাভিয়াস জোসেফাস এই ঐতিহ্যকে আরও নির্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করেন। তাঁর Antiquities of the Jews-এ তিনি মাগোগের বংশধরদের সেই জনগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করেন যাদের গ্রিকরা স্কিথিয়ান নামে জানত। [3] প্রাচীন গ্রিক-রোমান জগতে “স্কিথিয়ান” নামটি প্রায়ই উত্তর ও উত্তর-পূর্বের দূরবর্তী, যাযাবর ও ভয়ংকর জনগোষ্ঠীর বিস্তৃত পরিচয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ফলে গোগ-মাগোগের সঙ্গে “সভ্য জগতের উত্তরের ভয়ংকর জাতি” ধারণাটি আরও দৃঢ় হয়।
খ্রিস্টীয় Revelation বা প্রকাশিত বাক্যে এসে এই ধারণা সম্পূর্ণ শেষযুগীয় রূপ লাভ করে। সেখানে বলা হয়, শেষ সময়ে শয়তান মুক্ত হবে এবং পৃথিবীর চার প্রান্তের জাতিগুলোকে—গোগ ও মাগোগ—যুদ্ধের জন্য একত্র করবে; তাদের সংখ্যা হবে সমুদ্রের বালুর মতো বিপুল। তারা ঈশ্বরের জনগণকে ঘিরে ফেলবে এবং শেষে আকাশ থেকে আগুন নেমে তাদের ধ্বংস করবে। [4]
| উৎস | গোগ-মাগোগের রূপ | কাহিনিতে নতুন সংযোজন |
|---|---|---|
| জেনেসিস | মাগোগ—ইয়াফেথের বংশধর | বংশতালিকা ও জনগোষ্ঠীর পরিচয় |
| ইজেকিয়েল | মাগোগের দেশের গোগ ও বিরাট বাহিনী | দূর উত্তর, বিশাল আক্রমণ, ঈশ্বরের হাতে ধ্বংস |
| জোসেফাস | মাগোগীয়দের স্কিথিয়ানদের সঙ্গে চিহ্নিতকরণ | উত্তরাঞ্চলীয় “বর্বর” জনগোষ্ঠীর ভৌগোলিক পরিচয় |
| প্রকাশিত বাক্য | শেষযুগের গোগ-মাগোগ | অসংখ্য বাহিনী, শেষ সময়ে মুক্তি, বিশ্বব্যাপী আক্রমণ |
| পরবর্তী আলেকজান্ডার-কাহিনি | গোগ-মাগোগকে প্রাচীরের পেছনে আবদ্ধ জাতি | আলেকজান্ডার, দুই পাহাড়, ধাতব প্রাচীর, শেষযুগে মুক্তি |
| ইসলামী ঐতিহ্য | ইয়াজুজ-মাজুজ | জুলকারনাইনের লোহা-ধাতুর প্রাচীর, কিয়ামতের আগে মুক্তি |
এই ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামী কাহিনির মৌলিক ভয়—এক বিপুল ও ভয়ংকর জনগোষ্ঠী শেষযুগে মুক্ত হয়ে সভ্য জগতের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে—কোরআনের কয়েক শতাব্দী আগেই খ্রিস্টীয় শেষযুগীয় সাহিত্যে সুস্পষ্টভাবে উপস্থিত ছিল। এমনকি তাদের সংখ্যা অকল্পনীয়ভাবে বিপুল হওয়ার ধারণাটিও প্রকাশিত বাক্যে পাওয়া যায়, যেখানে গোগ-মাগোগকে “সমুদ্রের বালুর মতো” অসংখ্য বলা হয়েছে। ইসলামী হাদিসে পরে একই ধারণা আরও সংখ্যাগত রূপ পায়—প্রতি হাজারে নয়শ নিরানব্বই ইয়াজুজ-মাজুজের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বর্ণনা আসে।
তবে এই পর্যায় পর্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এখনো অনুপস্থিত ছিল: আলেকজান্ডার নির্মিত ধাতব প্রাচীর। ইজেকিয়েল ও প্রকাশিত বাক্যের গোগ-মাগোগকে জুলকারনাইনের মতো কোনো বিশ্বজয়ী রাজা দুই পাহাড়ের মাঝখানে লোহা ও গলিত ধাতুর দেয়াল দিয়ে আটকে রাখেননি। এই দুই পৃথক ধারার—একদিকে গোগ-মাগোগের শেষযুগীয় ভয়, অন্যদিকে আলেকজান্ডারের উত্তরাঞ্চলীয় গেট—মিলন ঘটে পরবর্তী আলেকজান্ডার-কিংবদন্তিতে। কোরআনের কাহিনির সঙ্গে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কটি সেখানেই।
আলেকজান্ডারের গেট থেকে জুলকারনাইনের প্রাচীর
ঐতিহাসিক আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের মেসিডোনীয় সম্রাট। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে ঘিরে ইতিহাসের সঙ্গে কল্পকাহিনি মিশিয়ে বিশাল সাহিত্যিক ঐতিহ্য তৈরি হয়। তিনি পৃথিবীর শেষপ্রান্তে যান, অদ্ভুত জাতির মুখোমুখি হন, অমরত্বের জল খোঁজেন, রহস্যময় অঞ্চল ভ্রমণ করেন—এ ধরনের অসংখ্য কাহিনি বিভিন্ন ভাষায় ছড়িয়ে পড়ে। এই সাহিত্যিক আলেকজান্ডার আর ঐতিহাসিক আলেকজান্ডার এক চরিত্র নয়; শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নতুন ধর্মীয় ও পৌরাণিক উপাদান তাঁর নামে যুক্ত হয়েছে।
আলেকজান্ডারের সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের একটি শক্ত গেটের সম্পর্কও ইসলামের আগের। প্রথম শতাব্দীর জোসেফাস আলানদের আক্রমণের বিবরণ দিতে গিয়ে একটি গিরিপথের কথা বলেন, যেটি আলেকজান্ডার লোহার গেট দিয়ে বন্ধ করেছিলেন। [5] একই জোসেফাস আবার মাগোগীয়দের স্কিথিয়ান বলে শনাক্ত করেন। অর্থাৎ খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীতেই দুটি প্রয়োজনীয় উপাদান আলাদাভাবে বিদ্যমান ছিল: মাগোগকে স্কিথীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে শনাক্তকরণ এবং আলেকজান্ডারকে উত্তরাঞ্চলের লোহার গেট নির্মাতা হিসেবে উপস্থাপন।
পরবর্তী সিরিয়াক খ্রিস্টীয় আলেকজান্ডার-কিংবদন্তিতে এই দুই উপাদান সরাসরি একত্রিত হয়। নেশানা দা-আলেকসান্দ্রোস নামে পরিচিত সিরিয়াক আলেকজান্ডার-কাহিনিতে আলেকজান্ডারকে শুধু বিজেতা নয়, ঈশ্বরের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কাজ করা ধার্মিক রাজা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তিনি পৃথিবীর দূর প্রান্তে ভ্রমণ করেন এবং দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী পথ বন্ধ করতে লোহা ও ব্রোঞ্জের বিশাল গেট নির্মাণ করেন। সেই গেটের পেছনে আবদ্ধ করা হয় গোগ-মাগোগসহ ভয়ংকর উত্তরাঞ্চলীয় জাতিগুলোকে; শেষযুগে তারা এই সীমাবদ্ধতা ভেঙে বেরিয়ে আসবে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস থেকে প্রকাশিত টমাসো তেসেইর সাম্প্রতিক গবেষণার কেন্দ্রীয় বিষয়ই হলো এই “আলেকজান্ডারের গেট” এবং গোগ-মাগোগ ঐতিহ্যের বিকাশ। [6]
কাহিনিটির তারিখ নিয়ে গবেষণায় বিতর্ক আছে। দীর্ঘদিন একটি শক্তিশালী গবেষকধারা এর বর্তমান সিরিয়াক রূপকে বাইজেন্টাইন সম্রাট হেরাক্লিয়াসের সময়, অর্থাৎ সপ্তম শতকের প্রথমার্ধে স্থাপন করেছে। কিন্তু তেসেই তাঁর ২০২৩ সালের বিশদ পাঠসমালোচনায় যুক্তি দিয়েছেন যে এর একটি পুরনো মূলরূপ সম্রাট জাস্টিনিয়ানের রাজত্বকালেই—ষষ্ঠ শতকে—রচিত হয়েছিল; ৬২৬–৬২৯ সালের ঘটনাসংক্রান্ত অংশটি পরে সংযোজিত। [7] [8]
তারিখের এই বিতর্ক কোরআনের সঙ্গে সম্পর্কটিকে দুর্বল করার বদলে কাহিনিটির ঐতিহাসিক পরিবেশকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। কারণ গোগ-মাগোগ, আলেকজান্ডারের লোহার গেট এবং উত্তরাঞ্চলের আবদ্ধ জাতির পৃথক উপাদান আরও পুরনো; আর ষষ্ঠ-সপ্তম শতকের সিরিয়াক ধর্মীয় পরিবেশে এগুলো ইতোমধ্যেই একটি পূর্ণাঙ্গ শেষযুগীয় আলেকজান্ডার-কাহিনিতে একত্রিত হয়েছিল। কোরআনের সূরা কাহফও একই সাংস্কৃতিক অঞ্চলের প্রাচীন যুগের অন্তিম পর্বে (Late Antiquity) আবির্ভূত।
এখানে শুধু “আলেকজান্ডার একটি দেয়াল বানিয়েছিলেন” ধরনের সাধারণ সাদৃশ্য নেই। কোরআন এবং সিরিয়াক আলেকজান্ডার-কাহিনির বহু নির্দিষ্ট উপাদান পাশাপাশি রাখলে ঘনিষ্ঠ কাঠামোটি আরও পরিষ্কার হয়।
| কাহিনির উপাদান | সিরিয়াক আলেকজান্ডার-কাহিনি | কোরআনের জুলকারনাইন |
|---|---|---|
| বিশ্বজয়ী শাসক | আলেকজান্ডার | জুলকারনাইন |
| শিংয়ের প্রতীক | আলেকজান্ডারের সঙ্গে প্রাচীন শিংযুক্ত প্রতীক ও সিরিয়াক কাহিনিতে শিংয়ের ধর্মীয় ব্যাখ্যা | “জুলকারনাইন”—আক্ষরিক অর্থ “দুই শিংওয়ালা” |
| পৃথিবীর দূর প্রান্তে যাত্রা | সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয়ের দিকের দূর অঞ্চল ভ্রমণ | প্রথমে সূর্যাস্তের স্থান, পরে সূর্যোদয়ের স্থান |
| তৃতীয় যাত্রা | উত্তর দিকের পর্বতপথে যাত্রা | দুই প্রতিবন্ধক/পাহাড়ের মধ্যবর্তী অঞ্চলে আগমন |
| ভয়ংকর জাতি | গোগ-মাগোগসহ উত্তরাঞ্চলীয় জনগোষ্ঠী | ইয়াজুজ-মাজুজ |
| দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী পথ | পর্বতপথ বন্ধ করা হয় | দুই পাহাড়ের মাঝের ফাঁক বন্ধ করা হয় |
| নির্মাণসামগ্রী | লোহা ও ব্রোঞ্জ/ধাতু | লোহার খণ্ড ও গলিত কিতর/তামা |
| প্রাচীরের উদ্দেশ্য | ভয়ংকর জাতিকে সভ্য অঞ্চল থেকে আবদ্ধ রাখা | ইয়াজুজ-মাজুজকে মানুষের কাছ থেকে আটকে রাখা |
| শেষযুগ | নির্ধারিত সময়ে গেট খুলবে এবং আবদ্ধ জাতি বের হবে | আল্লাহর প্রতিশ্রুত সময় এলে প্রাচীর ধ্বংস হবে এবং ইয়াজুজ-মাজুজ বের হবে |
বার্লিন-ব্রান্ডেনবুর্গ বিজ্ঞান একাডেমির Corpus Coranicum প্রকল্পও সূরা কাহফের সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলোর সঙ্গে সিরিয়াক আলেকজান্ডার-কাহিনিকে সরাসরি তুলনামূলক পাঠ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। সেখানে আলেকজান্ডারের পশ্চিম ও পূর্ব প্রান্তের যাত্রা শেষে উত্তর দিকে পর্বতপথে যাওয়া এবং সেখানে গোগ-মাগোগের বিরুদ্ধে গেট নির্মাণের কাহিনিকে কোরআনের ১৮:৮৩–৯৮ ধারার গুরুত্বপূর্ণ পূর্বপাঠ হিসেবে আলোচনা করা হয়েছে। [9]
শিংয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আলেকজান্ডারকে শিংসহ উপস্থাপনের ঐতিহ্য তাঁর জীবনের পর থেকেই মুদ্রা ও গ্রিক-মিশরীয় রাজকীয় প্রতীকে দেখা যায়, বিশেষত জিউস-আমুনের শিংয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কারণে। সিরিয়াক আলেকজান্ডার-কাহিনিতে এই শিংয়ের পুরনো প্রতীককে খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বের মধ্যে নতুন অর্থ দেওয়া হয়। তেসেই দেখিয়েছেন, এই শিং-প্রতীক এবং কোরআনের রহস্যময় উপাধি জুলকারনাইন—“দুই শিংওয়ালা”-এর তুলনা আলেকজান্ডার-পরিচয়ের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। [10]
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো কাহিনির ঘটনাক্রম। আলেকজান্ডার-কাহিনিতে দূর পশ্চিমের অঞ্চল, তারপর সূর্যোদয়ের দিক, তারপর উত্তরাঞ্চলের পর্বতপথ ও গোগ-মাগোগের গেট—এই ধারাবাহিকতা পাওয়া যায়। কোরআনেও জুলকারনাইনের যাত্রা একই বৃহত্তর কাঠামোয় সাজানো: পশ্চিম, পূর্ব, তারপর দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী এলাকা এবং ইয়াজুজ-মাজুজের বিরুদ্ধে ধাতব প্রাচীর। কোরআন-গবেষক কেভিন ভ্যান ব্লাডেল এই ঘনিষ্ঠতাকে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে কোরআনের সংক্ষিপ্ত জুলকারনাইন-কাহিনির প্রায় প্রতিটি প্রধান উপাদানের আরও বিস্তারিত সমান্তরাল সিরিয়াক আলেকজান্ডার ঐতিহ্যে পাওয়া যায়। [11]
এই ঐতিহাসিক পটভূমির কারণে জুলকারনাইনকে শুধু “কোনো অজ্ঞাত ন্যায়বান রাজা” হিসেবে বিচ্ছিন্ন করে পড়লে কাহিনির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হারিয়ে যায়। গোগ-মাগোগের শেষযুগীয় ঐতিহ্য আগে থেকেই ছিল; আলেকজান্ডারের লোহার গেটের ঐতিহ্য আগে থেকেই ছিল; শিংযুক্ত আলেকজান্ডারের প্রতীক আগে থেকেই ছিল; পৃথিবীর পশ্চিম-পূর্ব সীমান্তে আলেকজান্ডারের ভ্রমণের গল্প আগে থেকেই ছিল; এবং প্রাচীন যুগের অন্তিম পর্বের সিরিয়াক সাহিত্যে এগুলো একটি ধর্মীয় আলেকজান্ডার-কাহিনিতে একত্রিত হয়েছিল। কোরআনের জুলকারনাইন-কাহিনি এই আগে থেকেই বিকশিত কাহিনি-জগতের মধ্যেই অবস্থান করছে।
ইয়াজুজ-মাজুজ কী বা কারা?
ইসলামী উৎস অনুসারে ইয়াজুজ-মাজুজ কোনো জিন, দৈত্য বা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রজাতির প্রাণী নয়; তারা আদমসন্তান—অর্থাৎ মানুষ। প্রচলিত সুন্নি ব্যাখ্যায় তাদের দুটি বিশাল মানবগোষ্ঠী হিসেবে ধরা হয়, যারা জুলকারনাইনের সময়েও পৃথিবীতে ছিল এবং এখনো একটি বাস্তব প্রতিবন্ধকের পেছনে আবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। ইসলামওয়েবও সরাসরি লিখেছে যে তারা আদমের বংশধর, অন্য মানুষের মতো খায়, পান করে, বিবাহ করে, সন্তান জন্ম দেয় এবং মারা যায়; বর্তমানেও তারা জুলকারনাইনের নির্মিত প্রাচীরের পেছনে রয়েছে। [12] ইসলামQA-ও একইভাবে প্রাচীরটিকে রূপক নয়, লোহা ও গলিত তামায় নির্মিত বাস্তব ভৌত প্রতিবন্ধক এবং ইয়াজুজ-মাজুজকে বর্তমানে জীবিত বিশাল মানবগোষ্ঠী হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। [13]
পরবর্তী তাফসিরি সাহিত্যে তাদের সংখ্যাধিক্যকে আরও বিস্ময়কর মাত্রায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আদ-দুররুল মানসূর-এ এমন বর্ণনা সংরক্ষিত আছে যে ইয়াজুজ-মাজুজ আদমসন্তানের নয় ভাগ এবং অবশিষ্ট মানবজাতি মাত্র এক ভাগ; কোথাও বলা হয়েছে তাদের একজন এক হাজার বা তার বেশি সন্তান রেখে মৃত্যুবরণ করে; আবার কোথাও ইয়াজুজ ও মাজুজকে বহু শত উপগোষ্ঠীতে বিভক্ত করা হয়েছে। একই সংকলনে তাদের নারী, সন্তান এবং বংশবিস্তার সম্পর্কেও বিস্তারিত কাহিনি পাওয়া যায়। [14]
সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমের বিখ্যাত কিয়ামতের বর্ণনাতেও তাদের বিপুল সংখ্যাধিক্য অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। সেখানে প্রতি হাজারে নয়শ নিরানব্বই জাহান্নামির কথা শুনে সাহাবীরা আতঙ্কিত হলে মুহাম্মদ তাদের সান্ত্বনা দিয়ে ইয়াজুজ-মাজুজের বিপুল সংখ্যার কথা বলেন। এই হাদিস থেকে বর্তমান পৃথিবীতে ইয়াজুজ-মাজুজের সঠিক সংখ্যা মানুষের ৯৯৯ গুণ—এমন সরল গাণিতিক হিসাব বের করা যায় না; কিন্তু হাদিসটির উদ্দেশ্য পরিষ্কার: ইয়াজুজ-মাজুজকে সাধারণ মানবজাতির তুলনায় বিপুল সংখ্যাধিক্যসম্পন্ন জনগোষ্ঠী হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। পরবর্তী তাফসিরি বর্ণনাগুলো সেই ধারণাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইসলামী কাহিনিতে ইয়াজুজ-মাজুজ কোনো বিলুপ্ত প্রাচীন জাতি নয়। কোরআনের কাহিনিতে তারা জুলকারনাইনের সময় জীবিত; প্রাচীর তাদের চলাচল বন্ধ করে; শেষ সময়ে সেই প্রাচীর ধ্বংস হলে তারা আবার বেরিয়ে আসবে। সহিহ হাদিসে মুহাম্মদ তাঁর নিজের সময়েই প্রাচীরে একটি ছোট ছিদ্র খোলার কথা বলেছেন। ফলে প্রচলিত আক্ষরিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী জুলকারনাইনের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত একই মানবগোষ্ঠীর ধারাবাহিক জনসংখ্যা পৃথিবীর কোনো অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে টিকে আছে।
হাদিসের শেষযুগীয় বর্ণনায় তাদের আচরণও কোনো প্রতীকী “অশুভ শক্তি”র মতো নয়; একটি বিশাল মানববাহিনীর মতো। তারা পাহাড়ি অঞ্চল থেকে নেমে আসবে, তাবারিয়া হ্রদের পানি পান করবে, পৃথিবীর মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, ঈসা ও তাঁর অনুসারীদের অবরুদ্ধ করবে, আকাশের দিকে তীর নিক্ষেপ করবে এবং শেষে বিশেষ এক রোগ বা কীটের আক্রমণে একই সময়ে মারা যাবে। অর্থাৎ খাদ্য, পানি, চলাচল, অস্ত্র, যুদ্ধ, মৃত্যু—সবকিছুতেই তাদের বস্তুগত মানবগোষ্ঠী হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়েছে।
এই কারণেই ইয়াজুজ-মাজুজের দাবিটি অন্য অনেক অতিপ্রাকৃত ইসলামী দাবির তুলনায় বেশি পরীক্ষাযোগ্য। ফেরেশতা বা জিনকে এমন অদৃশ্য সত্তা বলা যায় যাদের কোনো পরিচিত জীববৈজ্ঞানিক চিহ্ন থাকার কথা নয়; কিন্তু ইয়াজুজ-মাজুজ সম্পর্কে সেই পথটি খোলা নেই। ইসলামী উৎস তাদের মানুষ বলছে, তারা পৃথিবীতে বাস করে, বংশবিস্তার করে, খাবার ও পানি প্রয়োজন হয় এবং একসময় বাস্তব পৃথিবীর জনগোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ করবে। ফলে তাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন সরাসরি পৃথিবীর ভূগোল, মানব জনসংখ্যা এবং বস্তুগত প্রমাণের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
ইয়াজুজ-মাজুজ কোথায় থাকে?
এই প্রশ্নেই কাহিনিটির সবচেয়ে বড় ভৌগোলিক সমস্যা সামনে আসে। কোরআন ইয়াজুজ-মাজুজের সুনির্দিষ্ট স্থাননাম দেয় না। শুধু বলা হয়, জুলকারনাইন তাঁর তৃতীয় যাত্রায় দুই পর্বত বা দুই প্রতিবন্ধকের মধ্যবর্তী স্থানে পৌঁছান এবং সেখানে এমন একটি জাতির সাক্ষাৎ পান যারা তাঁর ভাষা প্রায় বুঝতে পারত না। তাদের অনুরোধে তিনি দুই পাহাড়ের মাঝের ফাঁক লোহা ও গলিত ধাতু দিয়ে বন্ধ করে ইয়াজুজ-মাজুজকে অন্য পাশে আটকে দেন। অর্থাৎ কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী স্থানটি পৃথিবীর কোনো বাস্তব পার্বত্য অঞ্চল।
কিন্তু সেই বাস্তব স্থানটি কোথায়—এই প্রশ্নে ইসলামী ঐতিহ্য কোনো নির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারেনি। বিভিন্ন যুগে প্রাচীরকে ককেশাস, জর্জিয়া, আজারবাইজান-আর্মেনিয়ার আশপাশ, মধ্য এশিয়া, চীনের ওপারের অঞ্চল অথবা পৃথিবীর সুদূর উত্তরাঞ্চলে স্থাপন করার চেষ্টা হয়েছে। ইসলামওয়েব এই মতগুলো উল্লেখ করে শেষে স্বীকার করেছে: প্রাচীরটির সঠিক অবস্থান জানা যায় না। [15]
আরেকটি ইসলামওয়েব ফতোয়ায় বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, ইয়াজুজ-মাজুজ বর্তমানে পৃথিবীর এমন একটি অঞ্চলে রয়েছে যা মানুষের দৃষ্টি থেকে গোপন এবং যার সঠিক অবস্থান অজানা। একই ফতোয়া আবার স্পষ্টভাবে বলছে তারা মানুষ এবং প্রাচীরের পেছনেই অবস্থান করছে। [16] অর্থাৎ আধুনিক আক্ষরিক ব্যাখ্যায় সমস্যাটির সমাধান হয়েছে অবস্থান শনাক্ত করে নয়, বরং পৃথিবীর মধ্যেই একটি অজানা ও অদৃশ্য অঞ্চল ধরে নিয়ে।
এখানেই প্রাচীন ভূগোল এবং আধুনিক ভূগোলের পার্থক্য মৌলিক। সপ্তম শতকে পৃথিবীর বিপুল অঞ্চল আরব, সিরীয় কিংবা ভূমধ্যসাগরীয় মানুষের কাছে কার্যত অজানা ছিল। মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল, দুর্গম পর্বতমালা, সাইবেরিয়া, আফ্রিকার অভ্যন্তর বা পূর্ব এশিয়া সম্পর্কে প্রত্যক্ষ তথ্য অত্যন্ত সীমিত ছিল। ফলে “দুই পাহাড়ের ওপারে একটি অজানা জাতি আটকে আছে”—এ ধরনের কাহিনির জন্য বাস্তব পৃথিবীতে অসংখ্য সম্ভাব্য অজানা অঞ্চল ছিল। আলেকজান্ডারের গেট ও গোগ-মাগোগের আগের কিংবদন্তিগুলোও এই অজানা উত্তরাঞ্চলীয় ভূগোলকেই ব্যবহার করেছিল।
আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। পৃথিবীর স্থলভাগ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নিয়মিত পর্যবেক্ষিত হয়; পর্বতমালা, উপত্যকা, বন, হ্রদ, হিমবাহ, মরুভূমি, জনবসতি, কৃষিজমি এবং সড়কব্যবস্থা মানচিত্রায়িত। শুধু দৃশ্যমান ছবি নয়—ভূমির উচ্চতা, উদ্ভিদ আচ্ছাদন, তাপমাত্রা, রাতের আলো, ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন এবং বহু ধরনের পরিবেশগত তথ্য দূর অনুধাবন প্রযুক্তির মাধ্যমে মাপা হয়। একটি বিশাল মানবগোষ্ঠীকে তাই শুধু “চোখে না পড়া” দিয়ে অদৃশ্য রাখা যায় না।
মানুষ যেখানে দীর্ঘকাল বসবাস করে সেখানে শুধু মানুষকেই দেখতে হয় না; তাদের পরিবেশগত পদচিহ্ন দেখা যায়। খাদ্যের জন্য কৃষি বা পশুপালন, পানির ব্যবহার, জ্বালানি সংগ্রহ, বসতি, বর্জ্য, পথঘাট, বনভূমির পরিবর্তন এবং বহু প্রজন্মের মৃতদেহ ও বস্তুগত অবশেষ তৈরি হয়। কয়েক হাজার মানুষও শতাব্দীব্যাপী বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করলে প্রত্নতাত্ত্বিক চিহ্ন রেখে যায়। ইয়াজুজ-মাজুজকে যদি ইসলামী বর্ণনার মতো বিপুল মানবগোষ্ঠী ধরা হয়, সেই চিহ্নের পরিমাণ আরও বিশাল হওয়ার কথা।
এর সঙ্গে প্রাচীরের সমস্যাও যুক্ত। কোরআনের প্রতিবন্ধক কোনো অদৃশ্য জাদুকরী রেখা নয়; লোহার খণ্ড জড়ো করে উত্তপ্ত করা এবং তার ওপর গলিত ধাতু ঢালার নির্মাণবিবরণ দেওয়া হয়েছে। ইসলামQA-ও এই কারণেই স্পষ্টভাবে বলেছে, এটি রূপক বা কল্পিত প্রতিবন্ধক নয়, বাস্তব ভৌত প্রাচীর। [17] এমন একটি বিশাল ধাতব স্থাপনা দুই পর্বতের মধ্যবর্তী গিরিপথ বন্ধ করে হাজার বছরের বেশি সময় টিকে থাকলে সেটিও একটি প্রত্নতাত্ত্বিক ও ভূগোলগত বস্তু।
ফলে বর্তমান আক্ষরিক বিশ্বাসটি একসঙ্গে তিনটি জিনিস দাবি করে: একটি অজানা পার্বত্য অঞ্চল, সেখানে হাজার বছরের বেশি সময় ধরে বিচ্ছিন্ন বিশাল মানবগোষ্ঠী, এবং তাদের আটকে রাখা লোহা-ধাতুর বিরাট প্রাচীর। অথচ স্থানটির কোনো নির্ভরযোগ্য স্থানাঙ্ক নেই, প্রাচীরটির কোনো যাচাইযোগ্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নেই এবং আবদ্ধ জনগোষ্ঠীর কোনো স্বাধীন জনসংখ্যাগত বা পরিবেশগত চিহ্নও শনাক্ত হয়নি। প্রাচীন পৃথিবীর অজানা ভূগোলে যে কাহিনি সহজে স্থান পেতে পারত, আধুনিকভাবে মানচিত্রায়িত পৃথিবীতে সেটিই ক্রমে একটি অদৃশ্য ভূখণ্ডের অনুমানে পরিণত হয়েছে।
আর এখানেই পুরনো গোগ-মাগোগ ও আলেকজান্ডারের গেটের ইতিহাসটি আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় লেখকেরা ভয়ংকর জাতিগুলোকে পৃথিবীর অজানা উত্তরাঞ্চলে স্থাপন করেছিলেন, কারণ তাদের কাছে সেই অঞ্চল সত্যিই অজানা ছিল। ভূগোলের সেই শূন্যস্থান এখন আর নেই; কিন্তু কাহিনি রয়ে গেছে। ফলে ইয়াজুজ-মাজুজের “অজানা অবস্থান” কোনো নতুন ভৌগোলিক তথ্য নয়—এটি একটি পুরনো অজানা ভূগোলের জায়গায় আধুনিক যুগে আরেকটি অদৃশ্য স্থান ধরে রাখার চেষ্টা।
জুলকারনাইন কে?
কোরআন জুলকারনাইনের প্রকৃত নাম বলে না। “জুলকারনাইন” একটি উপাধি, যার আক্ষরিক অর্থ “দুই শিংওয়ালা”। এই অস্পষ্টতার কারণেই ইসলামী ব্যাখ্যার ইতিহাসে তাঁর পরিচয় নিয়ে একাধিক মত তৈরি হয়েছে। তাঁকে কখনো আলেকজান্ডার, কখনো প্রাচীন ইয়েমেনি বা হিময়ারি রাজা, কখনো কোরেশ এবং কখনো সম্পূর্ণ অজ্ঞাত এক ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এমনকি আধুনিক ইসলামি ব্যাখ্যাতেও ঐকমত্য নেই। ইসলামQA সরাসরি মেসিডোনীয় আলেকজান্ডারকে প্রত্যাখ্যান করে জুলকারনাইনকে ইবরাহিমের যুগের এক একেশ্বরবাদী শাসক বলে উপস্থাপন করেছে; আবার অন্য আধুনিক মুসলিম ব্যাখ্যায় কোরেশকে অধিক সম্ভাব্য বলা হয়। [18]
কিন্তু ঐতিহাসিক-সাহিত্যিক প্রশ্নটি আলাদা। এখানে প্রশ্ন হলো না—খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের বাস্তব আলেকজান্ডার কোরআনে বর্ণিত সব কাজ সত্যিই করেছিলেন কি না। প্রশ্ন হলো—কোরআনের জুলকারনাইন-কাহিনির চরিত্র ও ঘটনাবিন্যাস কোন পূর্ববর্তী সাহিত্যিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ। এই জায়গায় আলেকজান্ডার-সংযোগ অত্যন্ত শক্তিশালী। কারণ ইসলামের বহু আগে থেকেই বাস্তব আলেকজান্ডারকে কেন্দ্র করে এমন এক কিংবদন্তির চরিত্র গড়ে উঠেছিল, যিনি পৃথিবীর দূর প্রান্তে যান, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সীমান্তে পৌঁছান, ভয়ংকর জনগোষ্ঠীর মুখোমুখি হন এবং পর্বতের মাঝখানে গেট নির্মাণ করেন। প্রাচীন যুগের অন্তিম পর্বের সিরিয়াক আলেকজান্ডার-কাহিনিতে এই কিংবদন্তির আলেকজান্ডার এক ধর্মীয়, ঈশ্বরনির্ভর শাসকে রূপান্তরিত হন। [19]
এখানে আলেকজান্ডারের বহুঈশ্বরবাদী ঐতিহাসিক পরিচয়কে সামনে এনে কোরআনিক চরিত্রের সঙ্গে অমিল দেখানো সাহিত্যিক সম্পর্কের বিরুদ্ধে শক্ত আপত্তি নয়। কিংবদন্তি যখন এক সংস্কৃতি থেকে অন্য সংস্কৃতিতে যায়, চরিত্রের ধর্মীয় পরিচয়ও বদলে যায়। ঐতিহাসিক আলেকজান্ডার গ্রিক-মেসিডোনীয় ধর্মীয় পরিবেশের মানুষ ছিলেন; কিন্তু পরবর্তী ইহুদি, খ্রিস্টীয় ও সিরিয়াক সাহিত্যে তাঁকে এমনভাবে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে যাতে তিনি ঈশ্বরের পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারী বিশ্বজয়ী রাজা হয়ে ওঠেন। কোরআনের জুলকারনাইনও একইভাবে ক্ষমতা ঈশ্বরপ্রদত্ত বলে ঘোষণা করেন এবং নিজের নির্মিত প্রাচীরকে “আমার রবের রহমত” বলেন। Corpus Coranicum এই ঈশ্বরনির্ভর রাজকীয় চরিত্র এবং শেষযুগে প্রাচীর ধ্বংসের প্রত্যাশাকে সিরিয়াক আলেকজান্ডার-কাহিনির সঙ্গে সরাসরি তুলনা করেছে। [20]
“দুই শিংওয়ালা” উপাধিটিও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর তৈরি মুদ্রায় তাঁকে মিশরীয়-গ্রিক দেবতা আমুনের ভেড়ার শিংসহ উপস্থাপন করা হয়েছিল। ফলে “দুই শিংওয়ালা বিশ্বজয়ী রাজা” ধারণাটি আলেকজান্ডার-ঐতিহ্যে কোরআনের বহু আগে থেকেই দৃশ্যমান ছিল। পরবর্তী সিরিয়াক আলেকজান্ডার-কাহিনিতেও শিংকে ঈশ্বরপ্রদত্ত বিশ্বজয়ের চিহ্ন হিসেবে ধর্মীয় অর্থ দেওয়া হয়। আধুনিক গবেষণায় এই শিং-মোটিফকে জুলকারনাইনের উপাধির সঙ্গে তুলনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়। [21]
প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় মুসলিম ব্যাখ্যাতেও আলেকজান্ডার-পরিচয় অপরিচিত ছিল না। তাবারি-সহ বহু তাফসিরি ধারায় জুলকারনাইনকে আলেকজান্ডারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে; অন্যদিকে ভিন্ন পরিচয়ের কথাও সংরক্ষিত হয়েছে। আধুনিক যুগে কোরেশ-তত্ত্ব জনপ্রিয় হওয়ার প্রধান কারণ হলো কোরআনিক চরিত্রকে ন্যায়পরায়ণ একেশ্বরবাদী রাজা হিসেবে ঐতিহাসিক কারও সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা। কিন্তু কোরেশকে ঘিরে ইসলাম-পূর্ব কোনো সমান্তরাল কাহিনিতে পশ্চিম ও পূর্ব প্রান্তের ভ্রমণ + দুই পাহাড় + গোগ-মাগোগ + লোহা-ধাতুর প্রাচীর + শেষযুগে প্রাচীর ভাঙা—এই সম্পূর্ণ মোটিফসমষ্টি পাওয়া যায় না। আলেকজান্ডার-কিংবদন্তিতে এই সমাবেশ পাওয়া যায়।
সুতরাং “জুলকারনাইন ঐতিহাসিকভাবে আলেকজান্ডারই ছিলেন”—এভাবে বিষয়টি ধরার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো: কোরআনিক জুলকারনাইনের সাহিত্যিক চরিত্রটি আলেকজান্ডার-কিংবদন্তির জগতের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বাস্তব আলেকজান্ডারের জীবনী নয়, বরং শতাব্দীব্যাপী বিবর্তিত পৌরাণিক আলেকজান্ডারই এখানে তুলনার বিষয়। এই পার্থক্যটি ধরলে চরিত্রটির একেশ্বরবাদী রূপ, দুই শিং, পৃথিবীর প্রান্তভ্রমণ এবং গোগ-মাগোগের বিরুদ্ধে প্রাচীর—সব উপাদান একই ঐতিহাসিক ধারার মধ্যে বোধগম্য হয়।
ইয়াজুজ-মাজুজের প্রাচীর
কোরআনের প্রাচীরটি কাহিনির সবচেয়ে বস্তুগত উপাদানগুলোর একটি। জুলকারনাইন দুই পাহাড়ের মাঝের ফাঁক লোহার খণ্ড দিয়ে পূরণ করেন, সেগুলোকে আগুনের মতো উত্তপ্ত করেন এবং তার ওপর গলিত কিতর ঢেলে দেন। ফলে এমন প্রতিবন্ধক তৈরি হয় যার ওপর ইয়াজুজ-মাজুজ উঠতে পারে না এবং যাতে ছিদ্রও করতে পারে না। এটি কোনো সাধারণ নৈতিক বা আধ্যাত্মিক “বাধা”র ভাষা নয়; নির্মাণসামগ্রী, উত্তাপন এবং পাহাড়ের মাঝের স্থানসহ একটি বাস্তব প্রকৌশল কাঠামোর বর্ণনা। [22]
“অবশেষে যখন তিনি দুই পর্বত প্রাচীরের মধ্যস্থলে পৌঁছলেন, তখন তিনি সেখানে এক জাতিকে পেলেন, যারা তাঁর কথা একেবারেই বুঝতে পারছিল না। তারা বলল, হে যুল-কারনাইন, ইয়াজুজ ও মাজুজ দেশে অশান্তি সৃষ্টি করছে। আপনি বললে আমরা আপনার জন্য কিছু কর ধার্য করব এ শর্তে যে, আপনি আমাদের ও তাদের মধ্যে একটি প্রচীর নির্মাণ করে দিবেন। তিনি বললেন, আমার রব আমাকে যে সামর্থ্য দিয়েছেন, তাই যথেষ্ট। অতএব, তোমরা আমাকে শ্রম দিয়ে সাহায্য কর। আমি তোমাদের ও তাদের মাঝে একটি সুদৃঢ় প্রাচীর নির্মাণ করে দিব। তোমরা আমাকে লোহার পাত এনে দাও। অবশেষে যখন পাহাড়ের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থান পূর্ণ হয়ে গেল, তখন তিনি বললেন, তোমরা হাঁপরে ফুঁক দিতে থাক। অবশেষে যখন তা আগুনে পরিণত হলো, তখন তিনি বললেন, তোমরা গলিত তামা নিয়ে আস। আমি তা এর উপর ঢেলে দেই। অতঃপর ইয়াজুজ ও মাজুজের দল তার উপরে আরোহণ করতে পারল না এবং তা ভেদ করতেও সক্ষম হলো না। -কারনাইন বললেন, এটা আমার রবের অনুগ্রহ। যখন আমার রবর প্রতিশ্রুত সময় আসবে, তখন তিনি একে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবেন এবং আমার রবের প্রতিশ্রুতি সত্য।”
সহিহ বুখারির বর্ণনা এই ভৌত ব্যাখ্যাকে আরও শক্ত করে। সেখানে একজন ব্যক্তি মুহাম্মদকে বলেন যে তিনি প্রাচীরটি দেখেছেন এবং সেটিকে কারুকার্যখচিত চাদরের মতো বর্ণনা করেন; মুহাম্মদ তাঁর দেখা সঠিক বলে অনুমোদন করেন। অর্থাৎ এই বর্ণনার জগতে প্রাচীর কোনো হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন রূপক নয়; সপ্তম শতকে পৃথিবীর কোথাও দাঁড়িয়ে থাকা এবং মানুষের পক্ষে গিয়ে দেখা সম্ভব এমন বস্তু।
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫০/ আম্বিয়া কিরাম (আঃ)
পরিচ্ছেদঃ ২০০৬. ইয়াজুজ ও মাজুজের ঘটনা। মহান আল্লাহর বাণীঃ নিশ্চয়ই ইয়াজুজ মাজুজ পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টিকারী (১৮ঃ ৯৪)
২০০৭. মহান আল্লাহর বাণীঃ (হে নবী) তারা আপনাকে যুল কারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে।
আয়াতে سَبَبًا অর্থ চলাচলের পথ ও রাস্তা। তোমরা আমার কাছে লোহার টুকরা নিয়ে আস (১৮ঃ ৮৩-৯৬) এখানে زُبَر শব্দটি বহুবচন। একবচনে زُبْرَةٌ অর্থ টুকরা। অবশেষে মাঝের ফাঁকা জায়গা পূর্ণ হয়ে যখন লোহার স্তুপ দু’পর্বতের সমান হল। (১৮ঃ ৯৬) তখন তিনি লোকদের বললেন, এখন তাতে ফুঁক দিতে থাক। এ আয়াতে الصَّدَفَيْنِ শব্দের অর্থ ইবন আব্বাস (রাঃ) এর বর্ণনা অনুযায়ী দু’টি পর্বতকে বুঝানো হয়েছে। আর السُّدَّيْنِ এর অর্থ দু’টি পাহাড়। خَرْجًا অর্থ পারিশ্রমিক। যুল কারনাইন বললঃ তোমরা হাঁফরে ফুঁক দিতে থাক। যখন তা আগুনের ন্যায় উত্তপ্ত হল, তখ তিনি বললেন, তোমরা গলিত তামা নিয়ে আস। আমি তা এর উপর ঢেলে দেই। (১৮ঃ ৯৬) قِطْرا অর্থ সীসা। আবার লৌহ গলিত পদার্থকেও বলা হয়। এবং তামাকেও বলা হয়। আর ইবন আব্বাস (রাঃ) এর অর্থ তাম্রগলিত পদার্থ বলেছেন। (আল্লাহর বাণীঃ) এরপর তারা (ইয়াজুজ মাজুজ) এ প্রাচীর অতিক্রম করতে পারল না। (১৮ঃ ৯৭) অর্থাৎ তারা এর উপরে চড়তে সক্ষম হল না। اسْتَطَاعَ শব্দটি طعت له থেকে باب اسْتَفْعَل আনা হয়েছে। একে أسط ও يَسْطِيعُ যবরসহ পড়া হয়ে থাকে। আর কেহ কেহ একে أَسْطَاعَ يَسْطِيعُ রূপে পড়েন। (আল্লাহর বাণীঃ) তারা তা ছিদ্রও করতে পারল না। তিনি বললেন, এটা আমার রবের অনুগ্রহ। যখন আমার রবের প্রতিশ্রুতি পূরণ হবে তখন তিনি এটাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিবেন। (১৮ঃ ৯৮-৯৮) دكاء অর্থ মাটির সাথে মিশিয়ে দিবেন। نَاقَةٌ دَكَّاءُ বলে যে উটের কুঁজ নেই। الدَّكْدَاكُ مِنَ الأَرْضِ যমীনের সেই সমতল উপরিভাগকে বলা হয় যা শুকিয়ে যায় এবং উচু নিচু না থাকে। (আল্লাহর বাণীঃ) আর আমার রবের প্রতিশ্রুতি সত্য, সে দিন আমি তাদেরকে ছেড়ে দিব, এ অবস্থায় যে, একদল অপর দলের উপর তরঙ্গের ন্যায় পতিত হবে। (১৮ঃ৯৯) (আল্লাহর বাণীঃ) এমন কি যখন ইয়াজুজ মাজুজকে মুক্তি দেওয়া হবে এবং তারা প্রতি উচ্চ ভুমি থেকে ছুটে আসবে (২১ঃ ৯৬) কাতাদা (রহঃ) বলেন, حَدَبٍ অর্থ টিলা। এক সাহাবী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, আমি প্রাচীরটিকে কারুকার্য খচিত চাদরের মত দেখেছি। নবী (সাঃ) বললেন, তুমি তা ঠিকই দেখেছ।
মধ্যযুগীয় মুসলিম ভূগোলেও প্রাচীরটি বাস্তব স্থাপনা হিসেবেই অনুসন্ধান করা হয়েছিল। সবচেয়ে বিখ্যাত কাহিনি আব্বাসীয় খলিফা আল-ওয়াসিকের আমলের। ইবন খুরদাধবিহের কিতাব আল-মাসালিক ওয়াল-মামালিক-এ সাল্লাম আল-তারজুমানের নামে একটি বিস্তারিত ভ্রমণবৃত্তান্ত সংরক্ষিত আছে। কাহিনি অনুযায়ী, ওয়াসিক স্বপ্নে দেখেছিলেন জুলকারনাইনের প্রাচীর খুলে গেছে; আতঙ্কিত হয়ে তিনি বহু ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন সাল্লামকে প্রাচীর পরীক্ষা করতে পাঠান। সাল্লাম দীর্ঘ ভ্রমণের পর একটি বিশাল লোহা-ধাতুর গেট দেখেছেন বলে জানান এবং প্রায় আড়াই বছর পরে ফিরে আসেন। পরবর্তী মুসলিম ভূগোলবিদ ও ইতিহাসকারেরা এই বিবরণ উদ্ধৃত করেছেন। [23] [24] –
এই অভিযানের কাহিনিটি প্রাচীরের অস্তিত্বের আধুনিক ঐতিহাসিক প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। আমাদের কাছে প্রাচীরের কোনো সমসাময়িক মানচিত্র, শিলালিপি, নির্মাণাবশেষ, ধাতব নমুনা বা প্রত্নতাত্ত্বিক শনাক্তকরণ নেই যা সাল্লামের বর্ণিত স্থাপনাকে কোরআনের জুলকারনাইনের প্রাচীর বলে প্রতিষ্ঠা করে। মূল তথ্যটি এসেছে মধ্যযুগীয় ভ্রমণবৃত্তান্ত থেকে এবং পরবর্তী লেখকেরা সেই বর্ণনাই পুনরাবৃত্তি করেছেন। বরং আধুনিক গবেষণায় সাল্লামের বিবরণকে মধ্যযুগীয় ইসলামি ভূগোল, সাম্রাজ্যিক সীমান্ত এবং শেষযুগীয় কল্পনার পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝার গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়।
প্রাচীরটির সম্ভাব্য অবস্থান নিয়েও ইসলামী ভূগোল স্থির ছিল না। কোনো কোনো লেখক ককেশাসের দারবন্দ-এর দুর্গপ্রাচীরকে জুলকারনাইনের প্রাচীরের সঙ্গে যুক্ত করেছেন; অন্যরা মধ্য এশিয়ার আরও পূর্বাঞ্চলে খুঁজেছেন; ইবন বতুতা চীনের দিকে ইয়াজুজ-মাজুজের প্রাচীরের অবস্থান কল্পনা করেছিলেন। এই পরিবর্তনশীল অবস্থান নিজেই দেখায় যে কোনো স্বীকৃত স্থাপনা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে “এইটিই সেই প্রাচীর” হিসেবে সংরক্ষিত ছিল না। অজানা ভূগোলের সীমানা পূর্বদিকে সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইয়াজুজ-মাজুজের প্রাচীরও মানচিত্রে সরে গেছে।
ককেশাসে অবশ্য বাস্তব প্রাচীন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। দারবন্দের বিশাল প্রাচীর এবং ইরানের উত্তরাঞ্চলের গ্রেট ওয়াল অব গোরগান উত্তর দিকের আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য নির্মিত বাস্তব সামরিক কাঠামো। এই ধরনের দুর্গ ও গিরিপথই প্রাচীন “আলেকজান্ডারের গেট” কিংবদন্তির ভৌগোলিক ভিত্তি তৈরি করতে সাহায্য করেছে। কিন্তু প্রত্নতত্ত্বে এগুলো পরিচিত মানবনির্মিত সামরিক ব্যবস্থা; কোরআনে বর্ণিত দুই পাহাড়ের মাঝের লোহা ও গলিত তামার মহাপ্রাচীর হিসেবে কোনোটিই প্রতিষ্ঠিত নয়।
এখানে আলেকজান্ডার-কিংবদন্তির সঙ্গে সম্পর্কটি আবার সামনে আসে। প্রথম শতাব্দীর জোসেফাসই উত্তরাঞ্চলের একটি গিরিপথকে আলেকজান্ডারের লোহার গেটের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। পরবর্তী সিরিয়াক কাহিনিতে সেই গেটের পেছনে গোগ-মাগোগকে আবদ্ধ করা হয়। Corpus Coranicum-এর তুলনামূলক পাঠে দেখানো হয়েছে, সিরিয়াক কাহিনিতে উত্তর মেসোপটেমিয়া, আর্মেনিয়া ও ককেশাসের অনেক নির্দিষ্ট স্থাননাম থাকলেও কোরআন সেই ভূগোল বাদ দিয়ে শুধু “দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী” স্থান রেখে দেয়। [25]
ফলে প্রাচীরটির ইতিহাসে একটি আকর্ষণীয় পরিবর্তন দেখা যায়। প্রথমে বাস্তব ককেশাসীয় গিরিপথ ও সামরিক গেট; তারপর আলেকজান্ডারের কিংবদন্তির গেট; এরপর সেই গেটের পেছনে গোগ-মাগোগ; কোরআনে জুলকারনাইনের লোহা-ধাতুর প্রাচীর; মধ্যযুগে মুসলিম অভিযাত্রীদের সেই প্রাচীর খুঁজে বেড়ানো; এবং আধুনিক যুগে পৃথিবীর মানচিত্র পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর প্রাচীরটির অবস্থান “অজানা” বলে ধরে রাখা। কাহিনি টিকে আছে, কিন্তু প্রতিটি যুগে তার ভৌগোলিক আশ্রয় বদলেছে।
এই জায়গায় সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি অত্যন্ত সরল: যদি সাল্লাম আল-তারজুমান সত্যিই সেই প্রাচীরে পৌঁছে থাকেন, যদি মধ্যযুগীয় মানুষ সত্যিই সেটির দরজা, তালা, বুরুজ ও ধাতব নির্মাণ দেখে থাকে, তাহলে আজ সেই বিশাল স্থাপনাটি কোথায়? যে পথ দিয়ে একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি দল সেখানে পৌঁছাতে পেরেছিল, সেই অঞ্চল আধুনিক মানচিত্র, প্রত্নতত্ত্ব ও ভূ-সমীক্ষায় সম্পূর্ণ অদৃশ্য থাকার কথা নয়। আর যদি দারবন্দ, গোরগান বা অন্য কোনো পরিচিত প্রাচীরকে দেখানো হয়, তাহলে নির্মাণকাল, উপাদান ও প্রত্নতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে দেখাতে হবে সেটিই কোরআনের বর্ণিত লোহা ও গলিত ধাতুর প্রতিবন্ধক। এখন পর্যন্ত এমন শনাক্তকরণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
কোরআনে ইয়াজুজ-মাজুজ
কোরআনে ইয়াজুজ-মাজুজের কাহিনি মূলত দুই জায়গায় এসেছে। সূরা কাহফে তাদের অতীত ও বর্তমান অবস্থা বর্ণিত: তারা পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করত, জুলকারনাইন তাদের এবং অন্য জনগোষ্ঠীর মাঝখানে শক্ত প্রতিবন্ধক নির্মাণ করেন, তারা সেটি অতিক্রম বা ছিদ্র করতে পারেনি, এবং এক নির্ধারিত সময়ে আল্লাহ সেটিকে ভেঙে দেবেন। সূরা আম্বিয়ায় কাহিনিটির ভবিষ্যৎ পরিণতি এসেছে: ইয়াজুজ-মাজুজ মুক্ত হবে এবং প্রতিটি উঁচু স্থান থেকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। অর্থাৎ কোরআনের নিজস্ব কাঠামোতেই একই জনগোষ্ঠীর আবদ্ধ হওয়া → দীর্ঘকাল আটকে থাকা → শেষযুগে মুক্তি—এই ধারাবাহিকতা রয়েছে।
সূরা আম্বিয়ার ভাষায় ঘটনাটি সরাসরি কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ের সঙ্গে যুক্ত। ইয়াজুজ-মাজুজকে “মুক্ত করে দেওয়া” হবে এবং তারা দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে; পরের আয়াতেই “সত্য প্রতিশ্রুতি” নিকটবর্তী হওয়ার কথা বলা হয়েছে। [26]
‘যে পর্যন্ত না ইয়াজুজ ও মাজুজকে বন্ধন মুক্ত করে দেয়া হবে এবং তারা প্রত্যেক উচ্চভুমি থেকে দ্রুত ছুটে আসবে। আমোঘ প্রতিশ্রুত সময় নিকটবর্তী হলে কাফেরদের চক্ষু উচ্চে স্থির হয়ে যাবে; হায় আমাদের দূর্ভাগ্য, আমরা এ বিষয়ে বেখবর ছিলাম; বরং আমরা গোনাহগরই ছিলাম।
এই আয়াতের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ইয়াজুজ-মাজুজকে কোনো বিমূর্ত পাপ, বিশৃঙ্খলা বা রাজনৈতিক শক্তির প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করা হয়নি। তাদের জন্য বহুবচন ক্রিয়া ব্যবহৃত হয়েছে, তারা “প্রতিটি উচ্চভূমি থেকে দ্রুত নেমে আসবে”—অর্থাৎ চলমান জনগোষ্ঠীর ভাষা। প্রাচীন তাফসিরকাররাও এটিকে বাস্তব মানবগোষ্ঠী হিসেবেই বুঝেছেন। যাজ্জাজের মা‘আনিল কুরআন-এ তাদের “আল্লাহর সৃষ্টির দুটি জাতি” বলা হয়েছে এবং এমন বর্ণনাও উল্লেখ করা হয়েছে যে মানবজাতির দশ ভাগের নয় ভাগই তারা। [27]
সূরা কাহফে এই জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পৃথিবীর একটি নির্দিষ্ট প্রকৌশল কাঠামোর সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে স্থানীয় জনগণ জুলকারনাইনকে জানায় যে ইয়াজুজ-মাজুজ “পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করছে”; এরপর লোহার খণ্ড, উত্তাপ এবং গলিত ধাতু ব্যবহার করে তাদের আটকে দেওয়া হয়। কোরআনের ভাষায় তারা প্রাচীরটির ওপর উঠতে পারেনি এবং সেটিতে ছিদ্রও করতে পারেনি। [28]
“অবশেষে যখন তিনি দুই পর্বত প্রাচীরের মধ্যস্থলে পৌঁছলেন, তখন তিনি সেখানে এক জাতিকে পেলেন, যারা তাঁর কথা একেবারেই বুঝতে পারছিল না। তারা বলল, হে যুল-কারনাইন, ইয়াজুজ ও মাজুজ দেশে অশান্তি সৃষ্টি করছে। আপনি বললে আমরা আপনার জন্য কিছু কর ধার্য করব এ শর্তে যে, আপনি আমাদের ও তাদের মধ্যে একটি প্রচীর নির্মাণ করে দিবেন। তিনি বললেন, আমার রব আমাকে যে সামর্থ্য দিয়েছেন, তাই যথেষ্ট। অতএব, তোমরা আমাকে শ্রম দিয়ে সাহায্য কর। আমি তোমাদের ও তাদের মাঝে একটি সুদৃঢ় প্রাচীর নির্মাণ করে দিব। তোমরা আমাকে লোহার পাত এনে দাও। অবশেষে যখন পাহাড়ের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থান পূর্ণ হয়ে গেল, তখন তিনি বললেন, তোমরা হাঁপরে ফুঁক দিতে থাক। অবশেষে যখন তা আগুনে পরিণত হলো, তখন তিনি বললেন, তোমরা গলিত তামা নিয়ে আস। আমি তা এর উপর ঢেলে দেই। অতঃপর ইয়াজুজ ও মাজুজের দল তার উপরে আরোহণ করতে পারল না এবং তা ভেদ করতেও সক্ষম হলো না। -কারনাইন বললেন, এটা আমার রবের অনুগ্রহ। যখন আমার রবর প্রতিশ্রুত সময় আসবে, তখন তিনি একে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবেন এবং আমার রবের প্রতিশ্রুতি সত্য।” ( সূরা কাহাফ, আয়াত: ৯৩-৯৮ )
কুরতুবির তাফসিরে “দুই প্রতিবন্ধক” বা দুই পাহাড়কে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের দিকের পর্বত বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। [29] অর্থাৎ ধ্রুপদি ব্যাখ্যায় ঘটনাটিকে কোনো অদৃশ্য জগতের ঘটনা হিসেবে বোঝা হয়নি; পৃথিবীর পরিচিত উত্তরাঞ্চলীয় ভূগোলের মধ্যেই স্থান দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
কোরআনের নিজস্ব বর্ণনায় কয়েকটি বিষয় আবার একেবারেই নেই। সেখানে ইয়াজুজ-মাজুজ প্রতিদিন দেয়াল খোঁড়ে—এ কথা নেই; একজন এক হাজার সন্তান রেখে মারা যায়—এ কথা নেই; তারা তাবারিয়া হ্রদের পানি শেষ করে দেবে—এ কথা নেই; আকাশে তীর ছুড়বে—এ কথা নেই; বিশেষ কীট তাদের হত্যা করবে—এ কথাও নেই। এই সমস্ত বিস্তারিত পরবর্তী হাদিস, তাফসির ও শেষযুগীয় সাহিত্যে যুক্ত হয়েছে। ফলে কোরআনের সংক্ষিপ্ত কাহিনি এবং পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ ইয়াজুজ-মাজুজ পুরাণকে একই স্তরের তথ্য হিসেবে পড়া ঠিক নয়; পরবর্তী ঐতিহ্যে কাহিনিটি ক্রমে অনেক বেশি বিস্তারিত ও নাটকীয় হয়েছে।
তবে কোরআনের সংক্ষিপ্ত রূপটিও একটি শক্ত ভৌগোলিক দাবি বহন করে। দুই পাহাড় আছে, তাদের মাঝখানে একটি পথ আছে, সেখানে একটি জনগোষ্ঠী বাস করে, তাদের বিপরীতে আরেকটি জনগোষ্ঠী রয়েছে, এবং তাদের আলাদা রাখতে লোহা ও গলিত ধাতুর বিশাল প্রতিবন্ধক নির্মিত হয়েছে। আল্লাহর নির্ধারিত সময় না আসা পর্যন্ত সেই প্রতিবন্ধক কার্যকর থাকবে। ফলে কাহিনিটির সবচেয়ে মৌলিক সমস্যা পরবর্তী দুর্বল লোককাহিনি বাদ দিলেও থেকে যায়: পৃথিবীতে এমন একটি আবদ্ধ মানবগোষ্ঠী এবং তাদের আটকে রাখা ধাতব প্রাচীরের অস্তিত্বের স্বাধীন প্রমাণ কোথায়?
তাফসিরে কাহিনির বিস্তার ও দ্বন্দ্ব
ইয়াজুজ-মাজুজ সম্পর্কে পরবর্তী ইসলামী কাহিনি কীভাবে বিস্তৃত হয়েছে, তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ ইবনে কাসীরের তাফসির। সেখানে কোরআনের কয়েকটি আয়াতের ব্যাখ্যার সঙ্গে মানববংশ, তুর্কি জাতি, অস্বাভাবিক জনসংখ্যা, প্রতিদিন প্রাচীর খোঁড়া, আকাশে তীর নিক্ষেপ, বিশাল সন্তানসংখ্যা এবং খলিফা ওয়াসিকের প্রাচীর-অনুসন্ধান—বহু আলাদা বর্ণনা একত্রিত হয়েছে। একই সঙ্গে ইবনে কাসীর নিজেই এর কয়েকটিকে দুর্বল, মুনকার কিংবা আহলে কিতাবের অনির্ভরযোগ্য কাহিনি বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
প্রথমেই ইবনে কাসীর ইয়াজুজ-মাজুজকে মানুষেরই একটি বিশেষ গোষ্ঠী বলে উপস্থাপন করেন। বুখারি-মুসলিমের প্রতি হাজারে নয়শ নিরানব্বইয়ের হাদিস উদ্ধৃত করে তাদের সংখ্যাধিক্য ব্যাখ্যা করেন; এরপর নূহের পুত্র ইয়াফিসের বংশধর এবং তুর্কিদের আত্মীয় হিসেবে চিহ্নিত করার মতও আনেন। একই জায়গায় আদমের বীর্য থেকে, হাওয়া ছাড়া, তাদের জন্মের একটি অদ্ভুত কাহিনি উল্লেখ করে তিনি পরিষ্কার বলেন—এর পক্ষে “আকলী কিংবা নকলী কোনো যুক্তি-প্রমাণ নেই” এবং আহলে কিতাবের এ ধরনের বর্ণনায় বিশ্বাস করা যায় না। আসুন এবারে দেখি প্রখ্যাত তাফসিরকারক ইবনে কাসীরের তাফসীরে এই সম্পর্কে কী বলা রয়েছে [30] –
৯৪. উাহারা বলিল হে যুলকারনাইন! ইয়াজুজ-মাজুজ পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করিতেছে; আমরা কি তোমাকে কর দিব এই শর্তে যে তুমি আমাদিগের ও উহাদিগের মধ্যে এক প্রাচীর গড়িয়া দিবে?
৯৫. সে বলিল, আমার প্রতিপালক আমাকে যে ক্ষমতা দিয়াছেন, তাহাই উৎকৃষ্ট; সুতরাং তোমরা আমাকে শ্রম দ্বারা সাহায্য কর। আমি তোমাদিগের ও উহাদিগের মধ্যস্থলে এক মযবুত প্রাচীর গড়িয়া দিব।
৯৬. তোমরা আমার নিকট লৌহ পিন্ডসমূহ আনয়ন কর অতঃপর মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থান পূর্ণ হইয়া যখন লৌহস্তূপ দুই পর্বতের সমান হইল। তখন সে বলিল, তোমরা হাঁপরে দম দিতে থাক। যখন উহা অগ্নিবৎ উত্তপ্ত হইল তখন সে বলিল তোমরা গলিত তাম্র আনয়ন কর, আমি উহা ঢালিয়া দেই উহার উপর।
তাফসীর: আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, যুলকারনাইন সূর্যোদয়ের স্থান ভ্রমণ
শেষ করিয়া অন্য এক পথ ধরিয়া চলিতে লাগিলেন এবং অবশেষে প্রাচীরের ন্যায় দুইটি পাহাড়ের নিকট পৌছিলেন। দুই পাহাড়ের মাঝে একটি গিরীপথ ছিল এই গিরীপথের মাধ্যমেই ইয়াজুজ মাজুজ তুরকিস্তানে প্রবেশ করিত। তাহারা সেখানে নানা প্রকার অশান্তি সৃষ্টি করিত। ক্ষেত খামার জীবজন্তু ও ধ্বংস করিত এবং মানুষকে হত্যা করিত। বুখারী ও মুসলিম শরীফের রেওয়ায়েত দ্বারা প্রমাণিত তাহারা মানুষেরই একটি বিশেষ গোষ্ঠী। ইরশাদ হইয়াছে, কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তা’আলা বলিবেন, হে আদম! তিনি বলিবেন, হে আমার প্রতিপালক, আমি হাযির। আমি উপস্থিত। তখন আল্লাহ তা’আলা বলিবেন, দোযখের অংশ আপনি পৃথক করিয়া রাখুন। তিনি বলিবেন, দোযখের অংশ কি পরিমাণ? তিনি বলিলেন প্রত্যেক হাজারে নয়শত নিরানব্বই তো দোযখে প্রবেশ করিবে এবং একজন বেহেশতে। এই সময় আতঙ্কগ্রস্ত শিশু বৃদ্ধ হইবে এবং গর্ভবর্তী নারীর গর্ভপাত ঘটিবে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা) বলিলেন তোমাদের মধ্যে দুই সম্প্রদায় আছে তাহারা যেই দিকে থাকিবে তাহাদের সংখ্যাই হইবে অধিক। অর্থাৎ ইয়াজুজ ও মাজুজ।
আল্লামা নব্বী (র) মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থে বর্ণনা করিয়াছেন। হযরত আদম (আ) এ ধাতু হইতে দুই এক ফোটা ধাতু মাটিতে মিশ্রিত হইয়াছিল উহা দ্বারাই ইয়াজুজ মাজুজ সৃষ্টি হইয়াছে। এই বর্ণনানুসারে বুঝা যায় যে, ইয়াজুজ মাজুজ হযরত আদম (আ) এর ধাতু হইতে তো সৃষ্টি হইয়াছে কিন্তু হযরত হাওয়া (আ)-এর গর্ভে জন্ম গ্রহণ করে নাই। এই বর্ণনাটির পক্ষে আকলী কিংবা নকলী কোন যুক্তি প্রমাণ নাই। কোন কোন আহলে কিতাব এই প্রসঙ্গে যাহা কিছু বর্ণনা করিয়া থাকে উহার উপর বিশ্বাস করা যায় না।
ইমাম আহমদ (রা) হযরত সামুরা (রা) হইতে বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করিয়াছেন হযরত নূহ (আ)-এর তিন পুত্র ছিল। আরব জনক, দাম, সুদান
জনক, হাম এবং তুর্কজনক ইয়াফিস। কোন কোন উলমায়ে কিরামের বক্তব্য হইল, ইয়াজুজ মাজুজ গোষ্ঠী হইল তুর্ক জনক ইয়াফিসের বংশধর। তুরকিস্তানের অধিবাসীদিগকে তুর্ক-বলিয়া এই কারণে নাম করণ করা হইয়াছে যেহেতু তাহারা প্রাচীরের ঐ পারের সম্প্রদায়কে বর্জন করিয়া এই পারে চলিয়া আসিয়াছে। বস্তুতঃ তাহারা ঐ ইয়াজুজ মাজুজের আত্মীয়স্বজন। কিন্তু ইয়াজুজ মাজুজ গোষ্ঠী হইল দুষ্ট ও অশান্তি সৃষ্টিকারী এই ক্ষেত্রে ইবনে জরীর (র) ওহব ইবনে মুনাব্বাহ (রা) হইতে একটি দীর্ঘ রেওয়ায়েত বর্ণনা করেন। রেওয়ায়েতটির মধ্যে যুকারনাইনের ভ্রমণ কাহিনী প্রাচীর নির্মাণ ও তাঁহার পর্যটন কালের বিভিন্ন ঘটনা বর্ণিত হইয়াছে। কিন্তু দীর্ঘ এই রেওয়ায়েতটি আশ্চর্যজনক ও বিস্ময়কর বটে কিন্তু উহা বিশুদ্ধ নহে। ইবনে আবূ হাতিম (র) তাহার পিতা হইতেও অনেক আশ্চর্যজনক হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন কিন্তু উহা সনদও সহীহ নহে।
قوله وَجَدَ مِن دُونَهُمَا قَوْمًا لَا يَكَادُونَ يَفْقَهُونَ قُولاً
দুইটির নিকটবর্তী এলাকায় এমন একটি সম্প্রদায়কে দেখিতে পাইলেন যাহারা পৃথিবীর অন্যান্য জাতি হইবে দূরে ছিল এবং তাহাদের ভাষা ছিল আজমী এই কারণে তাহারা যুলকারনাইনের ভাষা বুঝিতে সক্ষম হইতেছিল না। قَالُوا يُإِذَا الْقَرْنَيْنِ إِنَّ يَاجُرُج OR وَمَا جُوجَ مُفْسِدُونَ فِي الارْضُ فَهَلْ نَجْعَلُ لَكَ خَرَجًا
যুলকারনাইন! ইয়াজুজ মাজুজ দেশে অশান্তি ও গোলযোগ সৃষ্টি করিতেছে অতএব প্রাচীর নির্মাণের জন্য কি আপনার জন্য আমরা খাজনা ধার্য করিয়া দিব। ইবনে জুরাইজ (র) আতা (র) এর মাধ্যমে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) হইতে خرجًا অর্থ أَجْرًا عَظِيمًا বর্ণনা করিয়াছেন। অর্থাৎ যুলকারনাইন যদি একটি প্রাচীর নির্মাণ করিয়া দেন তবে তাহারা তাঁহাকে অনেক বিনিময় দান করিবে। ইহার জবাবে যুলকারনাইন সরলতার সহিত তাহাদের হীতকাংখার উদ্দেশ্যে বলিলেনمَا مَكْنِّي فِيهِ رَبِّى خَيْرٌ অর্থাৎ আল্লাহ তা’আলা আমাকে যে সাম্রাজ্য ও ধন-সম্পদ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত করিয়াছেন উহাই আমার পক্ষে উত্তম। যেমন হযরত সুলায়মান (আ) أَتُمِتُونَنِي بِمَا آتَانِيَ اللهُ خَيْرٌ فَمَا أَتَاكُمُ দ্বারা সাহায্য করিতে চাহিতেছে? অথচ, আল্লাহ তা’আলা আমাকে যাহা দান করিয়াছেন উহা তোমাদের মাল অপেক্ষা উত্তম। যুলকারনাইনও অনুরূপ কথাই বলিলেন, তোমরা যেই মাল আমার জন্য ব্যয় করিবে উহা অপেক্ষা আমার মাল উত্তম। তোমাদের মালের আমার প্রয়োজন নাই বরং তোমরা শ্রম ও প্রাচীর নির্মাণের সরঞ্জাম জোগাড় করিয়া দিয়া এই কাজে আমার সাযাহ্য কর। أجْعَلُ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ رَدْمًا اتُونِي


এই অংশটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইসলামী তাফসিরের ভেতরেই আমরা কাহিনি-বৃদ্ধির প্রক্রিয়া দেখতে পাই। মূল কোরআনে শুধু ইয়াজুজ-মাজুজ নামের দুটি জনগোষ্ঠী; পরে তাদের নূহের বংশতালিকায় বসানো হয়েছে, তুর্কিদের সঙ্গে আত্মীয়তা তৈরি করা হয়েছে, আবার আরও অদ্ভুত জন্মকাহিনিও প্রচারিত হয়েছে। ইবনে কাসীর কিছু কাহিনি গ্রহণ করেছেন, কিছু প্রত্যাখ্যান করেছেন। অর্থাৎ পরবর্তী বিস্তারিতগুলো কোনো একক সুসংহত প্রত্যক্ষদর্শী তথ্যভাণ্ডার নয়; বিভিন্ন উৎস, লোককথা ও বর্ণনার স্তর একসঙ্গে তাফসিরে জমা হয়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ দ্বন্দ্ব দেখা যায় প্রাচীর খোঁড়ার কাহিনিতে। কোরআন ১৮:৯৭ সম্পর্কে ইবনে কাসীর সরাসরি বলেন: আয়াতটি প্রমাণ করে ইয়াজুজ-মাজুজ প্রাচীরটিতে “ছিদ্র করতে পারেনি, এমনকি এর কোনো অংশেও নয়।” [31] কিন্তু এরপরই তিনি আবু হুরায়রার নামে এমন একটি বর্ণনা আনেন যেখানে ইয়াজুজ-মাজুজ প্রতিদিন প্রাচীর খুঁড়তে খুঁড়তে প্রায় সূর্যের আলো দেখার পর্যায়ে পৌঁছে যায়; রাতে ফিরে গেলে প্রাচীর আবার আগের অবস্থায় হয়ে যায়। শেষ দিনে “ইনশাআল্লাহ” বলায় পরদিন এসে তারা আগের খোঁড়া অবস্থাই পাবে এবং বেরিয়ে আসবে [32]
(۹۷) فَمَا اسْطَاعُوا أَنْ يَظْهَرُوهُ وَمَا اسْتَطَاعُوا لَهُ نَقُبًا.
(۹۸) قَالَ هُذَا رَحْمَةً مِّنْ رَّبِّي فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ رَبِّي جَعَلَهُ دَكَّاءُ ، وَكَانَ وَعْدُ رَبِّي حَقَّاهُ
(۱۹) وَتَرَكْنَا بَعْضَهُمْ يَوْمَئِذٍ يَمُوجُ فِي بَعْضٍ وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَجَمَعْتُهُمْ جمعاة
৯৭. ইহার পর তাহারা উহা অতিক্রম করিতে পারিল না বা ভেদ করিতেও পারিল না। উহাতে ছিদ্র করিতেও পারিল না।
৯৮. সে বলিল, ইহা আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ। যখন আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হইবে তখন তিনি উহাকে চূর্ণ বিচূর্ণ করিয়া দিবেন এবং আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি সত্য।
৯৯. সেই দিন আমি উহাদিগকে ছাড়িয়া দিব এই অবস্থায় যে একদল আর একদলের উপর তরঙ্গের ন্যায় পতিত হইবে এবং শিংগায় ফুৎকার দেওয়া হইবে। অতঃপর আমি উহাদিগের সকলকেই একত্র করিব।
তাফসীর: উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহ তা’আলা ইয়াজুজ মাজুজ সম্পর্কে ইরশাদ করিয়াছেন যে, তাহারা যুলকারনাইনের নির্মিত প্রাচীরের উপরে আরোহণ করিতেও সক্ষম হয় নাই এবং উহাকে ছিদ্র করিয়া উহা ভেদ করিতেও সক্ষম হয় নাই। ইরশাদ 18 R فَمَا اسْطَاعُوا أَن يَظْهَرُوهُ وَمَا اسْتَطَاعُوا لَهُ نَقُبًا RC আরোহণ করিতেও সক্ষম হয় নাই আর উহাতে ছিদ্রও করিত পারে নাই।
আয়াতটি এই কথারই প্রমাণ যে ইয়াজুজ মাজুজ প্রাচীরে একটুও ছিদ্র করিতে
সমর্থ হয় নাই। তবে ইমাম আহমদ (র) বলেন, রওহ্ (র)…. হযরত আবু হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত যে রাসূলুল্লাহ (সা) বর্ণনা করেন, ইয়াজুজ মাজুজ প্রত্যহ প্রাচীরটিকে ছিদ্র করিতে চেষ্টা করে এমন কি তাহারা উহা ছিদ্র করিয়া সূর্যের কিরণ দেখিবার কাছাকাছি হয় তখন তাহাদের নেতা তাহাদিগকে বলেন, তোমরা ফিরিয়া যাও, আগামীকল্য আমরা উহা ভেদ করিয়া যাইব। পুনঃরায় তাহারা উহা ছিদ্র করিতে আসিলে প্রাচীরটিকে পূর্বাপেক্ষা অধিক মযবুত পায়। অবশেষে তাহাদের সময় যখন শেষ হইয়া যাইবে এবং আল্লাহ তা’আলা তাহাদিগকে বাহির করিতে ইচ্ছা করিবেন তখন তাহারা একদিন ছিদ্র করিতে করিতে সূর্যের আলো দেখিবার উপক্রম হইবে তখন তাহাদের নেতা বলিবে তোমরা ফিরিয়া যাও, ইনশাআল্লাহ আগামী কল্য উহা ছিদ্র
করিয়া ফেলিব। পরদিন আসিয়া তাহারা দেখিবে প্রাচীরটি তেমনি রহিয়াছে যেমন তারা রাখিয়া গিয়াছিল। অতঃপর তাহারা উহা ছিদ্র করিয়া বাহির হইয়া পড়িবে। তাহারা সমস্ত নদ-নদীর পানি পান করিয়া শেষ করিবে এবং মানুষ তাহাদের ভয়ে কিল্লায় আশ্রয় গ্রহণ করিবে। তাহারা আসমানের দিকে তীর নিক্ষেপ করিবে এবং এমনি অবস্থায় উহা প্রত্যাবর্তন করিবে যেন উহা রক্ত মিশ্রিত রহিয়াছে। তখন তাহারা বলিবে আমরা পৃথিবীকে জয় করিয়া আসমানও বিজয় করিয়াছি। অতঃপর তাহাদের ঘাড়ে ফোঁড়া বাহির হইবে এবং সকলেই মৃত্যু বরণ করিবে। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন, আল্লাহর কসম, যাহার হাতে মুহাম্মদ (সা) এর প্রাণ পৃথিবীর জীব-জন্তু উহা ভক্ষণ করিবে এবং খুব হৃষ্ট পুষ্ট হইবে এবং আল্লাহর খুব শোকর করিবে।
ইমাম আহমদ (র)…. কাতাদাহ (র) হইতে হাদীসটি বর্ণনা করিয়াছেন। ইমাম ইবনে মাজাহ (র)…. কাতাদাহ হইতে অনুরূপ বর্ণনা করিয়াছেন। ইমাম তিরমিযী (র)…. কাতাদাহ (র) হইতে হাদীসটি বর্ণনা করিয়া বলেন, হাদীসটি গরীব। এইসূত্র ব্যতিত অন্য কোন সূত্রে ইহা বর্ণিত নহে। হাদীসের সনদটি বিশুদ্ধ অবশ্য উহার মতন মুনকার। কারণ, আয়াত দ্বারা প্রকাশ, ইয়াজুজ মাজুজ না তো প্রচীরের উপর আরোহণ করিতে সক্ষম হইবে এবং প্রাচীরটি অত্যধিক মযবুত দৃঢ় হইবার কারণে উহাতে ছিদ্র করিতেও সক্ষম হইবে না। কিন্তু কা’ব আহবার হইতে বর্ণিত, ইয়াজুজ মাজুজ প্রাচীরের নিকট আসিয়া উহাতে ছিদ্র করিবার চেষ্টা করিত থাকে এমন কি উহাতে ছিদ্র হইতে অতি সামান্য পরিমাণ অবশিষ্ট থাকে। অতঃপর তাহারা বলেন চল ফিরিয়া যাই আগামী কল্য আসিয়া ভেদ করিয়া ফেলিব। কিন্তু দ্বিতীয় দিন আসিয়া তাহারা দেখে যে, উহা পূর্বের মত হইয়া আছে। অতঃপর তাহারা পুনরায় আবার ছিদ্র করিতে থাকে এবং অতি সামান্য পরিমাণ অবশিষ্ট থাকিতে তাহারা ঠিক সেই কথা বলে যাহা প্রথম দিন বলিয়াছিল। অতঃপর তাহারা পর দিন আসিয়াও দেখে যে উহা পূর্বের ন্যায় মযবুত হইয়া আছে। এইভাবে ছিদ্র করিতে করিতে শেষ দিন তাহারা বলিবে আগামী কাল ইনশাআল্লাহ উহা ছিদ্র করিয়া ফেলিব। পরদিন তাহারা আসিয়া দেখিবে প্রাচীরটি যেমন রাখিয়া গিয়াছিল তেমনি রহিয়াছে। অতএব সেইদিন তাহারা উহা ছিদ্র করিয়া বাহির হইয়া আসিবে।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) সম্ভবত কা’ব আহবার হইতেই উদ্ধৃত রেওয়ায়েতটি শ্রবণ করিয়াছেন এবং পরে তিনি অন্যের নিকট বর্ণনা করিয়াছেন। পরবর্তী কালে কোন রাবী উহাকে মারফু হাদীস ধারণা করিয়া রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করিয়াছেন বলিয়াছেন উল্লেখ করিয়াছেন لهُ اَعْلَمُ। প্রকাশ থাকে যে, হযরত আবূ হুরায়রা (র) অনেক সময়, কা’ব আহবারের নিকট বসিতেন এবং তাহার নিকট হইতে অনেক কথা শ্রবণ করিতেন।
উপরে আমরা যেই বিষয়টি উল্লেখ করিয়াছি সে ইয়াজুজ মাজুজ না তো প্রাচীরের উপর আরোহণ করিতে সক্ষম হইয়াছে আর না উহাতে ছিদ্র করিতে পারিয়াছে। এবং উপরোল্লেখিত রেওয়ায়েতটির মারফু হওয়ারও বিষয়টি সঠিক নহে। ইহার সমর্থনে ইমাম আহমদ (র) বলেন, সুফিয়ান (র)…. উম্মুল মু’মিনীন হযরত যায়নাব বিনতে জাহাশ (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার নবী করীম (সা) নিদ্রা হইতে জাগ্রত হইলেন, তখন তাহার মুখমন্ডল লাল ছিল এবং তিনি এই কথা বলিতেছিলেন, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ সমাগত বিপদের জন্য সমস্ত আরববাসীদের জন্য অকল্যাণ আসন্ন। আজ ইয়াজুজ মাজুজের প্রাচীর এত খানী খুলিয়া গিয়াছে। এই বলিয়া তিনি একটি চক্র বানাইলেন। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, আমাদের মধ্যে ভাল ও সৎলোকের উপস্থিতিতেও কি আমরা ধ্বংস ইয়া যাইব। তিনি বলিলেন হাঁ, যখন অসৎ ও খবীস লোকের আধিক্য হইবে। হাদীসটি বিশুদ্ধ। ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম (র) উভয়ই ইমাম যুহরী (র) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসটি বর্ণনা করিয়াছেন। কিন্তু ইমাম বুখারী (র)-এর সনদে হাবীবাহ এর উল্লেখ নাই। অবশ্য ইমাম মুসলিম (রা) এর সনদে তাঁহার উল্লেখ রহিয়াছে। হাদীসটির সনদে আরো এমন কি বৈচিত্র রহিয়াছে যাহা সাধারণত সনদে খুব কম-ই থাকে যেমন, ইমাম যুহরী উরওয়াহ হইতে হাদীসটি বর্ণনা করিয়াছেন, অথচ উভয়ই তাবেয়ী সনদের মধ্যে চার জন সাহাবী মহিলা রহিয়াছেন যাহারা পর্যায়ক্রমে একজন অপরজন হইতে বর্ণনা করিয়াছেন। চার জনের দুইজন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পালক কন্যা এবং অপর দুইজন তাঁহার বিবি।
হযরত আবূ হুরায়রা (র) হইতেও অনুরূপ হাদীস বর্ণিত হইয়াছে। বায্যার বলেন, মুহম্মদ ইবনে মারযুক (র)…. হযরত আবূ হুরায়রা (র) হইতে বর্ণনা করেন যে নবী করীম (সা) বলেন, فُتَحَ الْيَوْمَ مِنْ رَدُمَ يَاجُوجٌ وَمَاجُوجَ مِثْل هذا আজ ইয়াজুজ
মাজুজ এর প্রাচীরে এতটুক ছিদ্র হইয়াছে এই কথা বলিয়া তিনি আঙ্গুল দ্বারা একটি হলকা বানাইয়া দেখাইলেন। ইমাম বুখারী ও মুসলিম (রা) ওহব কর্তৃক বর্ণিত قوله قَالَ هَذَا رَحْمَةٌ مِنْ رَبِّي যখন প্রাচীর নির্মাণ করিয়া অবসর হইলেন তখন তিনি বলিলেন, ইহা প্রতিপালকের পক্ষ হইতে মানুষের জন্য অনুগ্রহ। তিনি ইয়াজুজ মাজুজের গোলযোগ ও ফিতনা হইতে মানুষকে রক্ষা করিবার জন্য এই প্রাচীর নির্মাণ করিবার তাওফীক দান করিয়াছেন। جَاءَ وَعُدُ رَبِّي جَعَلَهُ دَكَّاءَ ত্রি যখন আল্লাহর প্রতিশ্রুত নির্দিষ্ট সময় সমাগত হইবে তখন ইহাকে বিলুপ্ত করিয়া যর্মীনের সহিত মিলাইয়া দিবেন। আরবের লোকেরা বলিয়া থাকে তত্র এমন উষ্ট্র যাহার চুটি তাহার পিঠের সমন্বয় হইয়া গিয়াছে। অন্যত্র ইরশাদ হইয়াছে فَلَمَّا تَجُلَّى رَبَّهُ جَعَلُهُ رَكًا অর্থাৎ আল্লাহ তা’আলা যখন হযরত
মূসা (আ) এর সম্মুখে স্বীয় নূরের প্রকাশ ঘটাইলেন তখন পাহাড় চূর্ণ-বিচূর্ণ হইয়া
মাটির সহিত মিশিয়া গেল وَكَانَ وَعُدُ رَبِّى حَقًّا এবং আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি অবশ্যই পালিত হইবে। হযরত ইকরিমা (র) এর অর্থ করিয়াছেন طريف অতএব আয়াতের অর্থ হইবে আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুত নির্দিষ্ট সময় যখন
সমার্গত হইবে, তখন তিনি ইয়াজুজ মাজুজের বাহির হইবার পথ করিয়া দিবেন। এবং তাঁহার ওয়াদা সত্য, উহা অব্যই পালিত হইবে।
قوله وتَرَكْنَا بَعُضَهُمْ يَومَئِذٍ يَمُوجُ فِي بَعْضٍ
যাইবে এবং ইয়াজুজ মাজুজ বাহির হইবে এবং লোকালয়ে প্রবেশ করিয়া ফিৎনা ফাসাদ সৃষ্টি করিবে সেই দিন তাহাদিগকে দলে দলে তরঙ্গের ন্যায় ছাড়িয়া দিব।
আল্লামা সুদ্দী (র) আলোচ্য আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেন, ইয়াজুজ মাজুজের আবির্ভাব হইবে দাজ্জালের পরে কিয়ামত সংঘটিত হইবার পূর্বে
حَتَّى إِذَا فُتِحَتْ يَاجُوجُ وَمَاجُوجُ وَهُمْ مِنْ كُلِّ حَدَبٍ يَنْسِلُونَ وَاقْتَرَبَ الْوَعْدُ
الحق
এই আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে ইহার বিস্তারিত বিবরণ বর্ণিত হইবে। আলোচ্য
আয়াতেও প্রথম বলা হইয়াছে যে, ইয়াজুজ মাজুজকে তরঙ্গ মালার ন্যায় দলে দলে ছাড়িয়া দিব ثُمَّ نُفِخَ فِي الصور তাহার পর শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হইবে অর্থাৎ কিয়ামত কায়েম হইবেفَجَمَعَنَاهُم جَمَعً অতঃপর তাহাদিগকে আমি একত্রিত وَتَرَكْنَا بَعْضَهُمْ يَومَئِذٍ يَمُوجُ فِي بَعض 1 fa | G তাফসীর প্রসঙ্গে বলেন, কিয়ামত দিবসে সকল মানব দানব একত্রিত হইয়া যাইবে। ইবনে জরীর (র)….বনী ফাযারা গোত্রের জনৈক শায়খ হইতে وَتَرَكْنَا بَعْضَهُمُ يُومَئِذٍ يَمُوجُ فِي بَعْضٍ এর তাফসীর প্রসঙ্গে বর্ণনা করিয়াছেন, কিয়ামত দিবসে সমস্ত মানুষ ও জ্বিন একে অপরের সহিত মিলিত হইয়া যাইবে। তখন ইবলীস বলিবে আচ্ছা, আমি যাই, দেখি ঘটনা কি ঘটিয়াছে, তখন পূর্ব দিকে রওনা হইবে সেই দিকে গিয়া সে দেখিবে ফিরিস্তারা পথ বন্ধ করিয়া দিয়াছে অতঃপর পশ্চিম দিকে রওনা হইবে সেই দিকেও দেখিবে ফিরিস্তারা পথ বন্ধ করিয়া রাখিয়াছে। তখন ইবলীস বলিবে হায়। পলাইবার যে কোন পথই নাই। অতঃপর সে ডাইনে ও বামে যতদূর সম্ভব যাইবে সেই দিকেও সে দেখিবে, ফিরিস্তারা যমীন ঘেরাও করিয়া রাখিয়াছে। এমন সময় হঠাৎ সে অতিসরু একটা পথ তাহার সম্মুখে দেখিতে পাইবে এবং সে তাহার সকল অনুসারীদিগকে লইয়া সেই পথ ধরিয়া চলিতে আরম্ভ করিবে। হঠাৎ তাহারা আগুন দেখিতে পাইব। তখন আল্লাহ তা’আলা একজন দোযখের প্রহরীকে উপস্থিত করিবেন তিনি তাহাকে বলিবেন, হে ইবলীস। তোমার প্রতিপালকের নিকট কি তোমার এক বিশেষ মর্যাদা ছিল না? তুমি কি বেহেশতে ছিলে না? তখন সে বলিবে? এখন
ধমক দেওয়ার সময় নহে। এখন যদি আল্লাহর কোন ইবাদত করিবার সুযোগ থাকে তবে তাই বলুন, আমি এমনই ইবাদত করিব যে, তাহার মাখলূখের মধ্যে কেহ তদ্রূপ ইবাদত করে নাই। তখন তিনি বলিবেন, হাঁ আল্লাহর পক্ষ হইতে একটি নির্দেশ হইয়াছে। সে জিজ্ঞাসা করিবে, কি নির্দেশ হইয়াছে? তিনি বলিবেন, তাহার নির্দেশ হইল, তুমি জাহান্নামে প্রবেশ কর। তখন সে হাঁ করিয়া থাকিবে। উক্ত ফিরিস্তা তখন তাহার ডানার সাহায্যে ইবলীস ও তাহার অনুসারীদিগকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করিবেন। তখন জাহান্নাম এমন ভীষণ গর্জন করিয়া উঠিবে যে সকল ফিরিস্তা ও আম্বিয়ায়ে কিরাম আল্লাহর সম্মুখে ভীত সন্ত্রস্ত হইয়া বড়ই নম্রতা সহকারে হাঁটু গাড়িয়া বসিবে। ইবনে আবূ হাতিম (র) ইয়াকূব কুম্মী হইতে অনুরূপ বর্ণনা করিয়াছেন। আল্লামা ইবনে জরীর (র) ইয়াকূব, হারূন, আলতারা আনতারা হযরত ইবনে আব্বাস (রা) হইতেও হাদীসটি বর্ণনা করিয়াছেন।
আল্লামা তারানী (র) বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আব্বাস ইস্পাহানী (র) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (র) হইতে বর্ণনা করেন যে নবী করী (সা) ইয়াজুজ ও মাজুজ আদম সন্তানের অন্তর্ভুক্ত যদি তাহাদিগকে ছাড়িয়া দেওয়া হয় তবে মানুষের উপর অশান্তি সৃষ্টি করিবে। তাহাদের একজন মৃত্যুবরণ করিলে হাজার হাজার শিষ্য রাখিয়া যায়। বরং আরো অধিক। এবং তাহাদের পর আরো তিনটি দল হইবে, তাবীল, তায়েস, ও মুনসাক হাদীসটি গরীব বরং মুনকার ও দুর্বল। ইমাম নাসায়ী (র) শু’বা কর্তৃক বর্ণিত হাদীসটি, নুমান ইবনে সালেম (র)…. আউস ইবনে আবূ আওস (র) হইতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বর্ণনা করেন, ইয়াজুজ মাজুজের স্ত্রী আছে তাহারা সহবাস করিয়া থাকে। তাহাদের একজন মৃত্যুবরণ করিলে হাজার হাজার বরং ততধিক রাখিয়া যায়।
قوله وَنُفِخَ فِي الصُّورِ এবং শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হইবে। হাদীস শরীফে বর্ণিত যে একটি শিঙ্গা হইবে যাহাতে হযরত ইসরাঈল (আ) ফুৎকার দিবেন। যেমন পূর্বে এই বিষয়ে দীর্ঘ হাদীস বর্ণিত হইয়াছে। এবং এই বিষয়ে বর্ণিত হাদীসের সংখ্যাও অনেক। আতীয়্যাহ (র) হযরত ইবনে আব্বাস ও হযরত আবূ সায়ীদ হইতে বর্ণনা করেন হযরত নবী করীম (সা) বর্ণনা করেন, আমি কিভাবে আরাম ও শান্তি ভোগ করিতে পারি অথচ, শিঙ্গার অধিকারী ফিরিস্তা শিঙ্গা মুখে করিয়া মাথা ঝুকাইয়া অধীর অপেক্ষায় আছেন, কখন তাহাকে শিঙ্গা ফুৎকার করিবার জন্য নির্দেশ দেওয়া হইবে। সাহাবায়ে কিরাম (র) জিজ্ঞাসা করিলেন, এই পরিস্থিতিতে আমরা কি বলিব? তিনি বলিলেন, – حَسُبُنَا اللهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلِ عَلَى اللَّهِ تَوَكَّلْنَا জন্য যথেষ্ট এবং উত্তম কার্য বিধায়ক। আল্লাহর উপরই আমরা ভরসা রাখি। قوله فَجَمَعْنَاهُمْ جَمْعًا قُلْ إِنَّ الْأَوَّلِينَ وَالْآخِرِينَ المَجْمُوعُونَ إِلى مِيقَاتِ يَوْمٍ مَعْلُوم | আপনি ঘোষণা করুন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলকে একটি নির্দিষ্ট দিনে অবশ্যই





ইবনে কাসীর নিজেই এই বর্ণনার সমস্যাটি শনাক্ত করেছেন। বর্তমান উদ্ধৃতিতেই তিনি বলেন, এর সনদ বিশুদ্ধ বলা হলেও মতন মুনকার, কারণ কোরআনের আয়াত বলছে তারা প্রাচীরের ওপর উঠতে এবং তাতে ছিদ্র করতে সক্ষম হয়নি। আরও লক্ষণীয়, একই দৈনিক-খোঁড়ার গল্প কা‘ব আহবারের কাছেও বর্ণিত ছিল। ইবনে কাসীর সম্ভাবনা প্রকাশ করেন যে আবু হুরায়রা কা‘ব আহবারের কাছ থেকে এটি শুনেছিলেন এবং পরবর্তী কোনো বর্ণনাকারী সেটিকে ভুল করে মুহাম্মদের বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এটি ইসলামী তাফসিরের ভেতর থেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ—কীভাবে ইসরাইলি বা পূর্ববর্তী ধর্মীয় লোককাহিনি নবীর নামে মারফু বর্ণনায় রূপ নিতে পারে বলে একজন প্রধান মুসলিম তাফসিরকার নিজেই সন্দেহ প্রকাশ করছেন।
এই বিষয়টি আরও বিস্তৃতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইয়াজুজ-মাজুজের কাহিনির ঐতিহাসিক শিকড়ই ইহুদি-খ্রিস্টীয় গোগ-মাগোগ ও আলেকজান্ডার ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। সেই প্রেক্ষাপটে কা‘ব আহবারের মতো ইহুদি ঐতিহ্যজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে বিস্তারিত শেষযুগীয় কাহিনি আবু হুরায়রার বর্ণনায় প্রবেশ করতে পারে—ইবনে কাসীরের নিজের এই সন্দেহ কাহিনির স্তরবিন্যাস বোঝার জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
একই তাফসিরে ইয়াজুজ-মাজুজের একজন মানুষ এক হাজার বা তার বেশি সন্তান রেখে মারা যায়—এ ধরনের বর্ণনাও এসেছে। কিন্তু ইবনে কাসীর সরাসরি সেই হাদিসকে “গরীব, বরং মুনকার ও দুর্বল” বলেছেন। ইসলামওয়েবে সংরক্ষিত তাঁর তাফসিরেও এই রায় হুবহু পাওয়া যায়। [33]
অন্যদিকে আদ-দুররুল মানসূর-এর মতো বৃহৎ তাফসির-সংকলনে ইয়াজুজ-মাজুজ নিয়ে আরও বিচিত্র বর্ণনা রয়েছে: তারা পঁচিশটি জাতি; কেউ এক বিঘত, কেউ দুই বিঘত, কেউ তিন বিঘত উচ্চতার; কেউ এক হাজার সন্তান রেখে মারা যায়; আবার কোথাও ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রতিটিকে চারশ জাতির সমষ্টি বলা হয়েছে। [34] এই বৈচিত্র্যই দেখায়, কোরআনের সংক্ষিপ্ত দুই নামকে কেন্দ্র করে পরবর্তী কল্পনা কত দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে।
আরেক স্তরে এসেছে ওয়াসিকের অভিযানের গল্প। ইবনে কাসীর এমন একটি বিবরণ সংরক্ষণ করেন যেখানে খলিফার প্রতিনিধি দীর্ঘ ভ্রমণের পর লোহা-তামার বিশাল প্রাচীর, বিরাট দরজা, তালা ও বুরুজ দেখেছেন বলে দাবি করেন [24]
زُبَرَ الْحَدِيدِ আমি তোমাদের ও তাহাদের মাঝে সুদৃঢ় প্রাচীর নির্মাণ করিয়া দিব। তোমরা আমাকে লোহার পাত আনিয়া দাও। زبر শব্দটি زبوۀ এর বহুবচন অর্থ, লোহার পাত। হযরত ইবনে আব্বাস, মুজাহিদ ও কাতাদাহ (র) এই অর্থ বর্ণনা করিয়াছেন। লোহার এই টুকরা ইটের মত হয় এবং দামেস্কের এক কিনতার পরিমাণ কিংবা উহা অপেক্ষা কিছু বেশী।
حَتَّى إِذَا سَاوِي بَيْنَ الصَّدَفِينَ যুলকারনাইন লোহার ইটকে একের উপর এক রাখিয়া যখন দৈর্ঘ প্রন্থে দুই পাহাড়ের মাথা সমান করিলেন (দৈর্ঘ প্রস্থ সম্পর্কে উলামায়ে কিরাম একাধিক মত প্রকাশ করিয়াছেন) তখন তিনি বলিলেনانْفَخُو তোমরা চতুর্দিক হইতে ফুঁকাইতে থাক এমন কি উহা যেন সম্পূর্ণ আগুনে পরিণত হয়। যখন লোহার প্রাচীর আগুনের অংগারে পরিণত হইল তখন তিনি বলিলেন اتونی أَفْرِغْ عَلَيْهِ قَطْراً তোমরা গলিত তামা লইয়া আস আমি চতুর্দিক হইতে উহার উপর ঢালিয়া দিব। ইবনে আব্বাস (র) মুজাহিদ ও কাতাদাহ (র) বলেন অর্থ তামা। কেহ কেহ বলেন, গলিত তামواسسْلُنَا لَهُ عَيْنَ الْقَطْرِ ا আর “তাহার জন্য গলিত তামার ঝর্ণা প্রবাহিত করিলাম” আয়াতটি দ্বিতীয় মতের সমর্থন করে। গলিত তামা ঢালিয়া দেওয়ার পর যখন উহা ঠাণ্ডা হইয়া গেল তখন উহা সুদৃঢ় প্রাচীরে পরিণত হইল এবং সজ্জিত চাদরের ন্যায় মনে হইতে লাগিল।
ইবনে জরীর (র) বলেন, বিশ্ব ইবনে ইয়াযীদ…. কাতাদা হইতে বর্ণিত যে, এক
ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলিল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি ইয়াজুজ মাজুজের প্রাচীর দেখিয়াছি। রাসূলুল্লাহ (সা) বলিলেন, বলতো উহা কেমন? সে বলিল, নকশা করা চাদরের ন্যায়। উহাতে লাল কালো নকশা রহিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলিলেন, ঠিক দেখিয়াছ হাদীসটি মুরসাল পদ্ধতিতে বর্ণিত।
একবার খলীফা ওয়াসিক তার রাজত্বকালে বহু সাজ-সরঞ্জাম দিয়া একটি সেনাবাহিনীসহ তাহার মন্ত্রী পরিষদের কয়েকজনকে প্রাচীরের খবর লইতে প্রেরণ করিলেন যেন তাহারা প্রত্যাবর্তন করিয়া তাহার নিকট উহার সঠিক তত্ত্ব জানাইতে পারে। তাহারা রওয়ানা হইলেন এবং শহরের পর শহর দেশের পর দেশ অতিক্রম করিয়া প্রাচীরের নিকট পৌছলেন। এবং লোহা তামা দ্বারা নির্মিত প্রাচীরটি দেখিতে পাইলেন। তাহারা বর্ণনা করিয়াছে যে তাহারা প্রাচীরের একটি মস্ত বড় দরজা এবং উহাতে বিরাট একটি তালা ঝুলিতে দেখিয়াছে। প্রাচীরে ব্যবহৃত ইটের অবশিষ্ট ইট একটি বুরুজের মধ্যে রহিয়াছে। তথায় পাহারার জন্য একটি চৌকিও আছে। প্রাচীরটি অতিশয় উঁচু। কোন উপায়েই উহার উপর আরোহণ করা সম্ভব নহে। আর সেই সকল পাহাড়ে আরোহণ করাও সম্ভব নহে যাহা প্রাচীরের উভয় পার্শ্বে দূর দূরান্ত পর্যন্ত অবস্থিত। ইহা ছাড়া তারা আরো বহু আশ্চার্যজনক দৃশ্য দেখিতে পাইলেন। এই দৃশ্য দেখিয়া তাহারা দুই বৎসর পর দেশে প্রত্যাবর্তন করেন।

এইসব বর্ণনা পাশাপাশি রাখলে একটি পরিষ্কার স্তরবিন্যাস দেখা যায়। কোরআনে রয়েছে দুই জনগোষ্ঠী, একটি ধাতব প্রতিবন্ধক এবং শেষযুগে তার ধ্বংস। তাফসিরে এসে যোগ হয়েছে তাদের বংশপরিচয়, তুর্কি জাতির সঙ্গে সম্পর্ক, শরীরের আকার, সন্তানসংখ্যা, প্রতিদিনের খোঁড়াখুঁড়ি, আকাশে তীর নিক্ষেপ এবং প্রাচীর দেখতে যাওয়ার অভিযান। আবার একই তাফসিরকার এই সংযোজনগুলোর কয়েকটিকে অবিশ্বাস্য, দুর্বল বা কা‘ব আহবারের মতো পূর্ববর্তী ধর্মীয় উৎস থেকে আসা বলে সন্দেহ করছেন। ফলে পরবর্তী বিস্তারিতকে “কোরআনের ইয়াজুজ-মাজুজ সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য” হিসেবে একত্রে উপস্থাপন করলে ইসলামী উৎসগুলোর নিজেদের বাছাই ও দ্বন্দ্বই আড়াল হয়ে যায়।
এই দিক থেকে ইয়াজুজ-মাজুজের কাহিনি সিদরাতুল মুনতাহার মতোই একটি পরিচিত ধর্মীয় বিবর্তন দেখায়: প্রথমে সংক্ষিপ্ত পবিত্র পাঠ, তারপর অমীমাংসিত প্রশ্ন—তারা কার বংশধর, দেখতে কেমন, কতজন, কীভাবে বেঁচে আছে, প্রাচীর কীভাবে ভাঙবে—এবং পরবর্তী প্রজন্মে সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে ক্রমাগত নতুন বর্ণনা। বিস্তারিত যত বেড়েছে, পারস্পরিক বিরোধ এবং বর্ণনার মান নিয়ে তত বেশি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
হাদিসে ইয়াজুজ-মাজুজ
কোরআনের তুলনায় হাদিসে ইয়াজুজ-মাজুজের কাহিনি অনেক বেশি নাটকীয় ও বিস্তারিত। এখানে শুধু শেষযুগে তাদের মুক্ত হওয়ার কথা নেই; মুহাম্মদের জীবদ্দশাতেই প্রাচীরের একটি অংশ খুলে যাওয়ার সংবাদ, তাদের বিপুল সংখ্যাধিক্য, তাবারিয়া হ্রদের পানি পান করে ফেলা, পৃথিবীর মানুষকে পরাজিত করার পর আকাশের দিকে তীর নিক্ষেপ, ঈসা ও তাঁর অনুসারীদের অবরুদ্ধ করা, এবং শেষে একটি বিশেষ কীটের আক্রমণে তাদের সমগ্র বাহিনীর একসঙ্গে মৃত্যুর বর্ণনা পাওয়া যায়। অর্থাৎ হাদিসি স্তরে ইয়াজুজ-মাজুজ একটি সংক্ষিপ্ত কোরআনিক জনগোষ্ঠী থেকে পূর্ণাঙ্গ শেষযুগীয় মহাবিপর্যয়ের কেন্দ্রীয় চরিত্রে পরিণত হয়েছে।
সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম ও তিরমিজির একাধিক বর্ণনায় যায়নাব বিনতে জাহাশের সূত্রে বলা হয়েছে, মুহাম্মদ একবার ঘুম থেকে জেগে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন অবস্থায় ঘোষণা করেন যে আরবদের ওপর বিপদ ঘনিয়ে এসেছে এবং ইয়াজুজ-মাজুজের প্রাচীরে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ফাঁক খুলে গেছে। বুখারির আরেক বর্ণনায় সরাসরি বলা হয়েছে, “আল্লাহ ইয়াজুজ-মাজুজের প্রাচীর এতটুকু খুলে দিয়েছেন”। [35] [36] [37] [38] [39] [40] –
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৮১/ ফিতনা
পরিচ্ছেদঃ ৩০০৪. ইয়াজূজ ও মা’জূজ
৬৬৫০। আবুল ইয়ামান ও ইসমাঈল (রহঃ) … যায়নাব বিনত জাহাশ (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, একদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদ্বিগ্ন অবস্থায় এরূপ বলতে বলতে আমার গৃহে প্রবেশ করলেন যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নাই। আক্ষেপ আরবের জন্য মন্দ থেকে যা অতি নিকটবর্তী। বৃদ্ধাঙ্গুল ও তৎসংলগ্ন আঙ্গুল গোলাকৃতি করে তার দিকে ইঙ্গিত করে বললেনঃ আজ ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রাচীর এ পরিমাণ উন্মোচিত হয়েছে। যায়নাব বিনত জাহাশ (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমাদের মাঝে সৎ লোকেরা বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও কি আমরা ধ্বংস হয়ে যাব? উত্তরে তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। যদি পাপাচার বেড়ে যায়।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ যায়নাব বিনতে জাহাশ (রাঃ)
সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৩১/ কলহ ও বিপর্যয়
পরিচ্ছেদঃ ২৩. ইয়াজুজ ও মাজুজের আত্মপ্রকাশ
২১৮৭। যাইনাব বিনতু জাহশ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, কোন একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুম হতে জাগ্রত হলেন, তখন তার মুখমণ্ডল রক্তিমবর্ণ ধারণ করেছিল। তিনি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলতে লাগলেন। তা তিনবার বলার পর তিনি বললেনঃ ঘনিয়ে আসা দুর্যোগে আরবদের দুর্ভাগ্য। আজ ইয়াজুজ-মাজুজের প্রাচীর এতটুকু পরিমাণ ফাক হয়ে গেছে। এই বলে তিনি তর্জনী ও বৃদ্ধাঙ্গুলের সাহায্যে দশ সংখ্যার বৃত্ত করে ইঙ্গিত করেন। যাইনাব (রাঃ) বলেন, আমি প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। আমাদের মধ্যে সৎ লোক থাকাবস্থায়ও কি আমরা হবো? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, যখন পাপাচারের বিস্তার ঘটবে।
সহীহ, ইবনু মা-জাহ (৩৯৫৩), বুখারী, মুসলিম।
আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। এ হাদীসটিকে সুফিয়ান (রাহঃ) উত্তম বলে মন্তব্য করেছেন। হুমাইদী, আলী ইবনুল মাদীনী এবং আরোও অনেকে সুফইয়ান ইবনু উয়াইনাহ হতে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। হুমাইদী বলেন, সুফিয়ান ইবনু উয়াইনা বলেছেন, আমি এ হাদীসের সনদে চারজন মহিলার নাম যুহরীর নিকট হতে মুখস্থ করেছি। যাইনাব বিনতু আবূ সালামা ও হাবীব দুজনই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পত্নীকন্যা (তাদের পূর্ব স্বামীর ঔরসজাত) ছিলেন। উম্মু হাবীবা ও যাইনাব বিনতি জাহশ (রাঃ) হতে বর্ণনা করা হয়েছে। তারা দুজন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রী ছিলেন।
এ হাদীসটি যুহরীর সূত্রে মামার আরোও অনেকে বর্ণনা করেছেন কিন্তু তারা সনদে হাবীবার কথা উল্লেখ করেননি। এই হাদীসটি ইবনু উয়াইনার কোন কোন শিষ্য ইবনু উয়াইনার সূত্রে বর্ণনা করেছেন কিন্তু তারা সনদে উম্মু হাবীবা (রাঃ)-এর নাম উল্লেখ করেননি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ যায়নাব বিনতে জাহাশ (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৫/ ফিতনা সমূহ ও কিয়ামতের নিদর্শনাবলী
পরিচ্ছেদঃ ১. ফিতনা ও দুর্যোগসমূহ সন্নিকট হওয়া এবং ইয়াজুজ মাজুজের প্রাচীর খুলে দেয়া প্রসঙ্গে
৬৯৭১। আমর নাকিদ (রহঃ) … যায়নাব বিনত জাহাশ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ (একদিন) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুম থেকে জাগ্রত হলেন। এ সময়ে তিনি বললেনঃ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ নিকট ভবিষ্যতে সংঘটিত দুর্যোগে আরবরা ধংস হয়ে যাবে। আজ ইয়াজুজ-মাজুজের প্রাচীর এতটুকু পরিমাণ খুলে দেয়া হয়েছে। এ সময় সুফিয়ান (রহঃ) এর হাত দ্বারা দশের চক্র বানালেন। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের মধ্যে পুণ্যবান লোক থাকা সত্ত্বেও কি আমরা ধবংস হয়ে যাব? জবাবে তিনি বললেন, হ্যাঁ, যখন পাপাচার বেশী হবে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ যায়নাব বিনতে জাহাশ (রাঃ)
আল-লুলু ওয়াল মারজান
৫২/ ফিতনা এবং তার অশুভ আলামতসমূহ
পরিচ্ছেদঃ ৫২/১. ফিতনা নিকটবর্তী হওয়া এবং ইয়াজুজ মাজুজের (দেয়াল) খুলে যাওয়া।
১৮৩০. আবু হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রাচীরে আল্লাহ এ পরিমাণ ছিদ্র করে দিয়েছেন। এই বলে, তিনি তাঁর হাতে নব্বই সংখ্যার আকৃতির মত করে দেখালেন।
সহীহুল বুখারী, পৰ্ব ৬০: নাবীগণের (আঃ) হাদীসসমূহ, অধ্যায় ৭, হাঃ ৩৩৪৭; মুসলিম, পর্ব ৫২: ফিতনা এবং তার অশুভ আলামতসমূহ, অধ্যায় ১, হাঃ ২৮৮১
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫০/ আম্বিয়া কিরাম (আঃ)
পরিচ্ছেদঃ ২০০৬. ইয়াজুজ ও মাজুজের ঘটনা। মহান আল্লাহর বাণীঃ নিশ্চয়ই ইয়াজুজ মাজুজ পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টিকারী (১৮ঃ ৯৪)
২০০৭. মহান আল্লাহর বাণীঃ (হে নবী) তারা আপনাকে যুল কারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে।
আয়াতে سَبَبًا অর্থ চলাচলের পথ ও রাস্তা। তোমরা আমার কাছে লোহার টুকরা নিয়ে আস (১৮ঃ ৮৩-৯৬) এখানে زُبَر শব্দটি বহুবচন। একবচনে زُبْرَةٌ অর্থ টুকরা। অবশেষে মাঝের ফাঁকা জায়গা পূর্ণ হয়ে যখন লোহার স্তুপ দু’পর্বতের সমান হল। (১৮ঃ ৯৬) তখন তিনি লোকদের বললেন, এখন তাতে ফুঁক দিতে থাক। এ আয়াতে الصَّدَفَيْنِ শব্দের অর্থ ইবন আব্বাস (রাঃ) এর বর্ণনা অনুযায়ী দু’টি পর্বতকে বুঝানো হয়েছে। আর السُّدَّيْنِ এর অর্থ দু’টি পাহাড়। خَرْجًا অর্থ পারিশ্রমিক। যুল কারনাইন বললঃ তোমরা হাঁফরে ফুঁক দিতে থাক। যখন তা আগুনের ন্যায় উত্তপ্ত হল, তখ তিনি বললেন, তোমরা গলিত তামা নিয়ে আস। আমি তা এর উপর ঢেলে দেই। (১৮ঃ ৯৬) قِطْرا অর্থ সীসা। আবার লৌহ গলিত পদার্থকেও বলা হয়। এবং তামাকেও বলা হয়। আর ইবন আব্বাস (রাঃ) এর অর্থ তাম্রগলিত পদার্থ বলেছেন। (আল্লাহর বাণীঃ) এরপর তারা (ইয়াজুজ মাজুজ) এ প্রাচীর অতিক্রম করতে পারল না। (১৮ঃ ৯৭) অর্থাৎ তারা এর উপরে চড়তে সক্ষম হল না। اسْتَطَاعَ শব্দটি طعت له থেকে باب اسْتَفْعَل আনা হয়েছে। একে أسط ও يَسْطِيعُ যবরসহ পড়া হয়ে থাকে। আর কেহ কেহ একে أَسْطَاعَ يَسْطِيعُ রূপে পড়েন। (আল্লাহর বাণীঃ) তারা তা ছিদ্রও করতে পারল না। তিনি বললেন, এটা আমার রবের অনুগ্রহ। যখন আমার রবের প্রতিশ্রুতি পূরণ হবে তখন তিনি এটাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিবেন। (১৮ঃ ৯৮-৯৮) دكاء অর্থ মাটির সাথে মিশিয়ে দিবেন। نَاقَةٌ دَكَّاءُ বলে যে উটের কুঁজ নেই। الدَّكْدَاكُ مِنَ الأَرْضِ যমীনের সেই সমতল উপরিভাগকে বলা হয় যা শুকিয়ে যায় এবং উচু নিচু না থাকে। (আল্লাহর বাণীঃ) আর আমার রবের প্রতিশ্রুতি সত্য, সে দিন আমি তাদেরকে ছেড়ে দিব, এ অবস্থায় যে, একদল অপর দলের উপর তরঙ্গের ন্যায় পতিত হবে। (১৮ঃ৯৯) (আল্লাহর বাণীঃ) এমন কি যখন ইয়াজুজ মাজুজকে মুক্তি দেওয়া হবে এবং তারা প্রতি উচ্চ ভুমি থেকে ছুটে আসবে (২১ঃ ৯৬) কাতাদা (রহঃ) বলেন, حَدَبٍ অর্থ টিলা। এক সাহাবী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, আমি প্রাচীরটিকে কারুকার্য খচিত চাদরের মত দেখেছি। নবী (সাঃ) বললেন, তুমি তা ঠিকই দেখেছ।
৩১০৯। ইয়াহইয়া ইবনু বুকায়র (রহঃ) … যায়নাব বিনতে জাহাশ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, একদা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায় তাঁর কাছে আসলেন এবং বলতে লাগলেন, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ। আরবের লোকদের জন্য সেই অনিষ্ঠের কারণে ধ্বংস অনিবার্য যা নিকটবর্তী হয়েছে। আজ ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রাচীর এ পরিমাণ খুলে (ছিদ্র হয়ে) গেছে। এ কথার বলার সময় তিনি তাঁর বৃদ্ধাংগুলির অগ্রভাগকে তাঁর সাথের শাহাদাতের আংগুলির অগ্রভাগের সাথে মিলিয়ে গোলাকৃতি করে ছিদ্রের পরিমাণ দেখান। যায়নাব বিনতে জাহাশ (রাঃ) বলেন, তখন আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের মধ্যে নেক ও পুণ্যবান লোকজন বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও কি আমরা ধ্বংস হয়ে যাব? তিনি বললেন, হাঁ যখন পাপাচার অধিক মাত্রায় বেড়ে যাবে। (তখন অল্প সংখ্যক নেক লোকের বিদ্যমানেই মানুষের ধ্বংস নেমে আসবে।)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ যায়নাব বিনতে জাহাশ (রাঃ)
এই বর্ণনাগুলোর ক্ষেত্রে “মুহাম্মদ দুঃস্বপ্ন দেখে ইয়াজুজ-মাজুজের কথা বলতেন”—এভাবে বলা প্রয়োজন নেই। সহিহ বর্ণনায় যা পাওয়া যায় তা আরও নির্দিষ্ট: তিনি ঘুম থেকে জেগে বা উদ্বিগ্ন অবস্থায় প্রাচীরের একটি অংশ খুলে যাওয়ার কথা বলেছেন এবং সেটিকে আরবদের জন্য আসন্ন অকল্যাণের লক্ষণ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। ফলে দাবি নিজেই যথেষ্ট শক্তিশালী—সপ্তম শতকে পৃথিবীর কোথাও একটি বাস্তব প্রাচীর ছিল এবং সেই প্রাচীরের অবস্থায় সেদিন একটি বাস্তব পরিবর্তন ঘটেছে বলে মুহাম্মদ ঘোষণা করছেন।
এরপর হাদিসে আসে ইয়াজুজ-মাজুজের বিপুল সংখ্যার ধারণা। বুখারি ও মুসলিমের কিয়ামতের বর্ণনায় আদমকে প্রতি হাজারে নয়শ নিরানব্বই জাহান্নামি বের করতে বলা হলে সাহাবীরা আতঙ্কিত হন। মুহাম্মদ তখন বলেন, তাদের মধ্য থেকে একজন এবং ইয়াজুজ-মাজুজ থেকে এক হাজার—এভাবে তাদের আশ্বস্ত করেন। [41] [42] [43]
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
৬০/৭ আম্বিয়া কিরাম (‘আঃ)
পরিচ্ছেদঃ ৬০/৭. ইয়াজুজ ও মাজুজের ঘটনা
৩৩৪৮. আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মহান আল্লাহ ডাকবেন, হে আদাম (আঃ)! তখন তিনি জবাব দিবেন, আমি হাযির, আমি সৌভাগ্যবান এবং সকল কল্যাণ আপনার হতেই। তখন আল্লাহ বলবেন, জাহান্নামীদেরকে বের করে দাও। আদাম (আঃ) বলবেন, জাহান্নামী কারা? আল্লাহ বলবেন, প্রতি হাজারে নয়শত নিরানববই জন। এ সময় ছোটরা বুড়ো হয়ে যাবে। প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করে ফেলবে। মানুষকে দেখবে নেশাগ্রস্তের মত যদিও তারা নেশাগ্রস্ত নয়। বস্তুতঃ আল্লাহর শাস্তি কঠিন- (হাজ্জঃ ২)। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে সেই একজন কে? তিনি বললেন, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর। কেননা তোমাদের মধ্য হতে একজন আর এক হাজারের অবশিষ্ট ইয়াজুজ-মাজুজ হবে। অতঃপর তিনি বললেন, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম। আমি আশা করি, তোমরা সমস্ত জান্নাতবাসীর এক তৃতীয়াংশ হবে। (আবূ সা‘ঈদ (রাঃ) বলেন) আমরা এ সংবাদ শুনে আবার আল্লাহু আকবার বলে তাকবীর দিলাম। তিনি আবার বললেন, আমি আশা করি তোমরা সমস্ত জান্নাতীদের অর্ধেক হবে। এ কথা শুনে আমরা আবারও আল্লাহু আকবার বলে তাকবীর দিলাম। তিনি বললেন, তোমরা তো অন্যান্য মানুষের তুলনায় এমন, যেমন সাদা ষাঁড়ের দেহে কয়েকটি কাল পশম অথবা কালো ষাঁড়ের শরীরে কয়েকটি সাদা পশম। (৪৭৪১, ৬৫৩০, ৭৪৮৩) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩১০০, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩১০৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১/ কিতাবুল ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ৮৮. জান্নাতিদের অর্ধেক হবে এই উম্মাত
৪২৫। উসমান ইবনু আবূ শায়বা-আবাসী (রহঃ) … আবূ সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মহামহিম আল্লাহ (কিয়ামত দিবসে) আহবান করবেন, হে আদম! তিনি উত্তরে বলবেন, আমি আপনার সামনে হাজির, আপনার কাছে শুভ কামনা করি এবং সকল মঙ্গল আপনারই হাতে। মহান আল্লাহ বলবেনঃ জাহান্নামী দলকে বের কর। আদম (আলাইহিস সালাম) জিজ্ঞেস করবেনঃ জাহান্নামী দল কতজনের? মহান আল্লাহ বলবেনঃ প্রতি হাজার থেকে নয়শ নিরানব্বই। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ এই-ই সেই মুহর্ত, যখন বালক হয়ে যাবে বৃদ্ধ, সকল গর্ভবতী তাদের গর্ভপাত করে ফেলবে আর মানুষকে দেখবে মাতাল সদৃশ, যদিও তারা নেশাগ্রস্ত নয়, বস্তুত আল্লাহর আযাব বড়ই কঠিন।
রাবী বলেন, কথাগুলো সাহাবাগণের কঠিন মনে হল। তাঁরা বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আম্যদের মধ্যে কে সেই ব্যাক্তি? বললেনঃ আনন্দিত হও। ইয়াজুজ ও মাজুজের সংখ্যা এক হাজার হলে তোমাদের সংখ্যা হবে একজন।” তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ কসম সে সত্তার, যার হাতে আমার প্রাণ! অবশ্যই আমি আশা রাখি যে, তোমরা জান্নাতীদের এক চতুর্থাংশ হবে। সাহাবী বলেন, আমরা আল্লাহর প্রশংসা করলাম এবং ‘আল্লাহু আকবার’- ধ্বনি দিলাম।
তারপর আবার বললেন, শপথ সে সত্তার, যার হাতে আমার প্রান! অবশ্যই আমি আশা রাখি, জান্নাতীদের মধ্যে তোমরা তাদের এক তৃতীয়াংশ হবে। সাহাবী বলেন, আমরা বললাম, আলহামদু-লিল্লাহ- এবং আল্লাহু আকবার, ধ্বনি দিলাম। তারপর আবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ কসম সে সত্তার, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! আমি আশা রাখি যে, তোমরা জান্নাতীদের অর্ধেক হবে এবং তোমরা অন্যান্য উম্মাতের মধ্যে কালো ষাড়ের গায়ে একটি সাদা পশমের মত অথবা গাধার পায়ের চিহ্নের মত।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ)
এই হাদিসকে বর্তমান পৃথিবীর জনসংখ্যার ওপর সরাসরি ৯৯৯ দিয়ে গুণ করে ইয়াজুজ-মাজুজের সঠিক সংখ্যা বের করার সূত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। হাদিসটি কিয়ামতের জাহান্নামি বাছাইয়ের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে। কিন্তু এর অর্থগত উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ নেই: ইয়াজুজ-মাজুজকে এমন বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে যে সাধারণ মানুষের তুলনায় তাদের সংখ্যা কল্পনাতীতভাবে বেশি। পরবর্তী তাফসিরে হাজার সন্তান, শত শত উপগোষ্ঠী এবং মানবজাতির অধিকাংশই ইয়াজুজ-মাজুজ—এ ধরনের বর্ণনা সেই একই সংখ্যাধিক্যের ধারণাকে আরও প্রসারিত করেছে।
সবচেয়ে বিস্তারিত শেষযুগীয় কাহিনি পাওয়া যায় নাওয়াস ইবন সামআনের সহিহ মুসলিমের দীর্ঘ হাদিসে। সেখানে দাজ্জালের মৃত্যুর পর আল্লাহ ঈসাকে জানান যে তিনি এমন একদল বান্দাকে বের করেছেন যাদের বিরুদ্ধে কারও যুদ্ধ করার ক্ষমতা নেই। ইয়াজুজ-মাজুজ প্রতিটি উঁচু স্থান থেকে নেমে আসবে; তাদের প্রথম দল তাবারিয়া হ্রদের পানি পান করে ফেলবে এবং শেষ দল এসে বলবে, এখানে একসময় পানি ছিল। এরপর তারা ঈসা ও তাঁর অনুসারীদের অবরুদ্ধ করবে। [44] [45]
সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৩১/ কলহ ও বিপর্যয়
পরিচ্ছেদঃ ৫৯. দাজ্জালের অনাচার
২২৪০। আন-নাওয়াস ইবনু সামআন আল-কিলাবী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন এক সকালে দাজ্জাল প্রসঙ্গে আলোচনা করেন। তিনি এর ভয়াবহতা ও নিকৃষ্টতা তুলে ধরেন। এমনকি আমাদের ধারণা সৃষ্টি হলো যে, সে হয়তো খেজুর বাগানের ওপাশেই বিদ্যমান।
বর্ণনাকারী বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট হতে চলে গেলাম, তারপর আবার আমরা তার নিকট ফিরে এলাম। তিনি আমাদের মধ্যে দাজ্জালের ভীতির চিহ্ন দেখে প্রশ্ন করেনঃ তোমাদের কি হয়েছে? আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। আপনি সকালে দাজ্জাল প্রসঙ্গে আলোচনা করেছেন এবং এর ভয়াবহতা ও নিকৃষ্টতা এমন ভাষায় উত্থাপন করেছেন যে, আমাদের ধারণা হচ্ছিল যে, হয়তো সে খেজুর বাগানের পাশেই উপস্থিত আছে।
তিনি বললেনঃ তোমাদের ক্ষেত্রে দাজ্জাল ছাড়াও আমার আরো কিছুর আশংকা রয়েছে। যদি সে আমার জীবদ্দশাতেই তোমাদের মাঝে আসে তাহলে আমিই তোমাদের পক্ষে তার প্রতিপক্ষ হবো। আর সে যদি আমার অবর্তমানে আবির্ভূত হয়, তাহলে তোমরাই তার প্রতিপক্ষ হবে। আর আল্লাহ্ তা’আলাই প্রত্যেক মুসলমানের জন্য আমার পরিবর্তে সহায় হবেন।
সে (দাজ্জাল) হবে কুঞ্চিত (কোকড়া) চুলবিশিষ্ট, স্থির দৃষ্টিসম্পন্ন যুবক, সে হবে আবদুল উযযা ইবনু কাতানের অনুরূপ। তোমাদের মধ্যে কেউ যদি তার দেখা পায় তাহলে যেন সে সূরা কাহফ-এর প্রাথমিক আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে। তিনি বললেনঃ সে সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যবর্তী কোন এলাকা হতে আত্মপ্রকাশ করবে। তারপর সে ডানে-বামে ফিতনা ফ্যাসাদ ও বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়াবে। হে আল্লাহর বান্দাহগণ! তোমরা দৃঢ়তার সাথে অবস্থান করবে।
আমরা প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। সে কত দিন দুনিয়াতে থাকবে? তিনি বললেনঃ চল্লিশ দিন। এর একদিন হবে একবছরের সমান, একদিন হবে একমাসের সমান এবং একদিন হবে একসপ্তাহের সমান, আর অবশিষ্ট দিনগুলো হবে তোমাদের বর্তমান দিনের মতো।
বর্ণনাকারী বলেন, আমরা প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। আপনার কি ধারণা, যে দিনটি একবছরের সমান হবে, তাতে একদিনের নামায আদায় করলেই আমাদের জন্য যথেষ্ট হবে? তিনি বললেনঃ না, বরং তোমরা সেদিনের সঠিক অনুমান করে নেবে (এবং সে অনুযায়ী নামায আদায় করবে)।
আমরা আবার প্রশ্ন করলাম, দুনিয়াতে তার চলার গতি কত দ্রুত হবে? তিনি বললেনঃ তার চলার গতি হবে বায়ুচালিত মেঘের অনুরূপ; তারপর সে কোন জাতির নিকট গিয়ে তাদেরকে নিজের দলের দিকে আহবান জানাবে, কিন্তু তারা তাকে মিথ্যাবাদী আখ্যায়িত করবে এবং তার দাবি প্রত্যাখ্যান করবে। সে তখন তাদের নিকট হতে ফিরে আসবে এবং তাদের ধন-সম্পদও তার পিছনে পিছনে চলে আসবে। তারা পরদিন সকালে নিজেদেরকে নিঃস্ব অবস্থায় পাবে।
তারপর সে অন্য জাতির নিকট গিয়ে আহবান করবে। তারা তার আহবানে সাড়া দিবে এবং তাকে সত্য বলে মেনে নিবে। সে তখন আকাশকে বৃষ্টি বর্ষনের জন্য আদেশ করবে এবং সে অনুযায়ী আকাশ বৃষ্টি বর্ষন করবে। তারপর সে যামীনকে ফসল উৎপাদনের জন্য নির্দেশ দিবে এবং সে মুতাবিক যামীন ফসল উৎপাদন করবে। তারপর বিকেলে তাদের পশুপালগুলো পূর্বের চেয়ে উচু কুঁজবিশিষ্ট, মাংসবহুল নিতম্ববিশিষ্ট ও দুগ্ধপুষ্ট স্তনবিশিষ্ট হবে। তারপর সে নির্জন পতিত ভূমিতে গিয়ে বলবে, তোর ভিতরের খনিজভাণ্ডার বের করে দে। তারপর সে সেখান হতে ফিরে আসবে এবং সেখানকার ধনভাণ্ডার তার অনুসরণ করবে যেভাবে মৌমাছিরা রাণী মৌমাছির অনুসরণ করে।
তারপর সে পূর্ণযৌবন এক তরুণ যুবককে তার দিকে আহবান করবে। সে তলোয়ারের আঘাতে তাকে দুই টুকরা করে ফেলবে। তারপর সে তাকে ডাক দিবে, অমনি সে হাস্যোজ্জ্বল চেহারা নিয়ে সামনে এসে দাড়াবে।
হলুদ রংয়ের দুটি কাপড় পরিহিত অবস্থায় দুজন ফিরিশতার ডানায় ভর করে ঈসা ইবনু মারইয়াম (আঃ) অবতরণ করবেন। তিনি তার মাথা নীচু করলে ফোটায় ফোটায় এবং উচু করলেও মনিমুক্তার ন্যায় (ঘাম) পড়তে থাকবে। তার নিঃশ্বাস যে ব্যক্তিকেই স্পর্শ করবে সে মারা যাবে; আর তার শ্বাসবায়ু দৃষ্টির শেষ সীমা পর্যন্ত পৌছবে। তারপর তিনি দাজ্জালকে খোঁজ করবেন এবং তাকে ‘লুদ্দ’-এর নগরদ্বারপ্রান্তে পেয়ে হত্যা করবেন।
তিনি বলেনঃ আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছা মতো এভাবে তিনি অতিবাহিত করবেন। তারপর আল্লাহ তা’আলা তার নিকট ওয়াহী প্রেরণ করবেনঃ “আমার বান্দাহদেরকে তুর পাহাড়ে সরিয়ে নাও। কেননা, আমি এমন একদল বান্দাহ অবতীর্ণ করছি যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ক্ষমতা কারো নেই”।
তিনি বলেন, তারপর আল্লাহ ইয়াজুজ-মাজুজের দল পাঠাবেন। আল্লাহ তা’আলার বাণী অনুযায়ী তাদের অবস্থা হলো, “তারা প্রত্যেক উচ্চভূমি হতে ছুটে আসবে” (সূরাঃ আম্বিয়া-৯৬)। তিনি বলেন, তাদের প্রথম দলটি (সিরিয়ার) তাবারিয়া উপসাগর অতিক্রমকালে এর সমস্ত পানি পান করে শেষ করে ফেলবে। এদের শেষ দলটি এ স্থান দিয়ে অতিক্রমকালে বলবে, নিশ্চয়ই এই জলাশয়ে কোন সময় পানি ছিল। তারপর বাইতুল মাকদিসের পাহাড়ে পৌছার পর তাদের অভিযান সমাপ্ত হবে।
তারা পরস্পর বলবে, আমরা তো দুনিয়ায় বসবাসকারীদের ধ্বংস করেছি, এবার চল আকাশে বসবাসকারীদের ধ্বংস করি। তারা এই বলে আকাশের দিকে তাদের তীর নিক্ষেপ করবে। আল্লাহ তা’আলা তাদের তীরসমূহ রক্তে রঞ্জিত করে ফিরত দিবেন। তারপর ঈসা ইবনু মারইয়াম (আঃ) ও তার সাথীরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়বেন। তারা (খাদ্যাভাবে) এমন এক কঠিন পরিস্থিতিতে পতিত হবেন যে, তখন তাদের জন্য একটা গরুর মাথা তোমাদের এ যুগের একশত দীনারের চাইতে বেশি উত্তম মনে হবে।
তিনি বলেন, তারপর ঈসা (আঃ) ও তার সাথীরা আল্লাহ্ তা’আলার দিকে রুজু হয়ে দু’আ করবেন। আল্লাহ তা’আলা তখন তাদের (ইয়াজুজ-মাজুজ বাহিনীর) ঘাড়ে মহামারীরূপে নাগাফ নামক কীটের উৎপত্তি করবেন। তারপর তারা এমনভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে যেন একটি প্রাণের মৃত্যু হয়েছে
তখন ঈসা (আঃ) তার সাথীদের নিয়ে (পাহাড় হতে) নেমে আসবেন। সেখানে তিনি এমন এক বিঘত পরিমাণ জায়গাও পাবেন না, যেখানে সেগুলোর পচা দুৰ্গন্ধময় রক্ত-মাংস ছড়িয়ে না থাকবে। তারপর তিনি সাথীদের নিয়ে আল্লাহ তা’আলার নিকট দু’আ করবেন। আল্লাহ তা’আলা তখন উটের ঘাড়ের ন্যায় লম্বা ঘাড়বিশিষ্ট এক প্রকার পাখি প্রেরণ করবেন। সেই পাখি ওদের লাশগুলো তুলে নিয়ে গভীর গর্তে নিক্ষেপ করবে। এদের পরিত্যক্ত তীর, ধনুক ও তূণীরগুলো মুসলমানগণ সাতবছর পর্যন্ত জ্বালানী হিসাবে ব্যবহার করবে।
তারপর আল্লাহ তা’আলা এমন বৃষ্টি বর্ষণ করবেন যা সমস্ত ঘর-বাড়ী, স্থলভাগ ও কঠিন মাটির স্তরে গিয়ে পৌছবে এবং সমস্ত পৃথিবী ধুয়েমুছে আয়নার মতো ঝকঝকে হয়ে উঠবে। তারপর যামীনকে বলা হবে, তোর ফল ও ফসলসমূহ বের করে দে এবং বারকাত ও কল্যাণ ফিরিয়ে দে। তখন এরূপ পরিস্থিতি হবে যে, একদল লোকের জন্য একটি ডালিম পর্যাপ্ত হবে এবং একদল লোক এর খোসার ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করতে পারবে।
দুধেও এরূপ বারকাত হবে যে, বিরাট একটি দলের জন্য একটি উটনীর দুধ, একটি গোত্রের জন্য একটি গাভীর দুধ এবং একটি ছোট দলের জন্য একটি ছাগলের দুধই যথেষ্ট হবে। এমতাবস্থায় কিছুদিন অতিক্রান্ত হওয়ার পর হঠাৎ আল্লাহ তা’আলা এমন এক বাতাস প্রেরণ করবেন যা সকল ঈমানদারের আত্মা ছিনিয়ে নেবে এবং অবশিষ্ট থাকবে শুধুমাত্র দুশ্চরিত্রের লোক যারা গাধার মতো প্রকাশ্যে নারী সম্ভোগে লিপ্ত হবে। তারপর তাদের উপর কিয়ামত সংঘটিত হবে।
সহীহ, সহীহাহ (৪৮১), তাখরাজ ফাযায়েলুশশাম (২৫), মুসলিম।
আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ গারীব। আমরা এ হাদীসটি শুধুমাত্র আবদুর রাহমান ইবনু ইয়াযীদ ইবনু জাবিরের সূত্রেই জেনেছি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ নাও্ওয়াস ইবনু সাম্‘আন (রাঃ)
একই বর্ণনার আরেক অংশে ইয়াজুজ-মাজুজ পৃথিবীর মানুষের ওপর বিজয়ের পর বলে, “আমরা পৃথিবীর অধিবাসীদের হত্যা করেছি, এবার আকাশের অধিবাসীদের হত্যা করি।” তারা আকাশের দিকে তীর নিক্ষেপ করে এবং আল্লাহ সেই তীর রক্তমাখা অবস্থায় ফিরিয়ে দেন। এরপর আল্লাহ তাদের ঘাড়ে নাগাফ নামের কীট সৃষ্টি করেন; সমগ্র জনগোষ্ঠী একই সঙ্গে মারা যায়। তাদের মৃতদেহ ও দুর্গন্ধে পৃথিবীর ভূমি ভরে যায়, তারপর বিশাল পাখি এসে লাশ বহন করে নিয়ে যায় এবং বৃষ্টি পৃথিবী ধুয়ে পরিষ্কার করে। একই কাহিনি ইবনে কাসীরের আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-তেও সংরক্ষিত। [46]
হাদিসি কাহিনিটি তাই একটি পূর্ণ চক্র তৈরি করে: প্রাচীরের পেছনে বিপুল জনগোষ্ঠী → মুহাম্মদের সময়ে প্রাচীর খুলতে শুরু → শেষযুগে সম্পূর্ণ মুক্তি → হ্রদের পানি নিঃশেষ → মানবজাতির বিরুদ্ধে বিজয় → আকাশের বিরুদ্ধে যুদ্ধের চেষ্টা → অলৌকিক রোগে একই সময়ে গণমৃত্যু → পাখির মাধ্যমে মৃতদেহ অপসারণ → মহাবৃষ্টিতে পৃথিবী পরিষ্কার। এই প্রতিটি স্তরই প্রাচীন শেষযুগীয় সাহিত্যের পরিচিত বৈশিষ্ট্য বহন করে—অসংখ্য শত্রু, বিশ্বব্যাপী ধ্বংস, ঈশ্বরের সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং শেষে পৃথিবীর পুনরুদ্ধার।
আর এখানেই ইসলাম-পূর্ব গোগ-মাগোগ ঐতিহ্যের সঙ্গে ধারাবাহিকতা আরও স্পষ্ট। প্রকাশিত বাক্যেও গোগ-মাগোগ শেষযুগে অসংখ্য বাহিনী নিয়ে ঈশ্বরের জনগণকে ঘিরে ফেলে এবং শেষ পর্যন্ত ঈশ্বরের সরাসরি হস্তক্ষেপে ধ্বংস হয়। ইসলামী কাহিনিতে স্থান, চরিত্র ও ধ্বংসের পদ্ধতি বদলেছে—এখানে ঈসা, তাবারিয়া হ্রদ, তুর পাহাড়, কীট ও পাখি যুক্ত হয়েছে—কিন্তু মূল শেষযুগীয় কাঠামো একই: বিপুল গোগ-মাগোগের মুক্তি, বিশ্বাসীদের অবরোধ এবং মানবীয় শক্তিতে নয়, ঈশ্বরীয় হস্তক্ষেপে তাদের সম্পূর্ণ ধ্বংস।
বিপুল জনগোষ্ঠীর বস্তুগত সমস্যা
ইয়াজুজ-মাজুজকে বাস্তব মানবগোষ্ঠী হিসেবে গ্রহণ করলে সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু তাদের “খুঁজে না পাওয়া” নয়। মানুষ কোনো শূন্যস্থানে অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারে না। একটি জনসংখ্যা যত বড়, তার খাদ্য, পানি, ভূমি, জ্বালানি, বাসস্থান এবং বর্জ্যের পরিমাণও তত বড়। তাই একটি বিপুল মানবগোষ্ঠী হাজার বছরের বেশি সময় কোনো পার্বত্য অঞ্চলের পেছনে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করলে সেই জনগোষ্ঠীকে সরাসরি দেখা না গেলেও তার বস্তুগত ও পরিবেশগত পদচিহ্ন লুকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে ওঠে।
প্রথম সমস্যা খাদ্য। মানুষের বিপুল জনসংখ্যা ধরে রাখতে বড় আকারের খাদ্য উৎপাদন প্রয়োজন। কৃষি হলে প্রয়োজন চাষযোগ্য জমি, পানি, মাটির ব্যবস্থাপনা ও মৌসুমি উৎপাদন; পশুপালন হলে প্রয়োজন আরও বিস্তৃত চারণভূমি ও খাদ্য। শিকার ও সংগ্রহের ওপর নির্ভর করে খুব বড় জনসংখ্যা দীর্ঘকাল টিকিয়ে রাখা যায় না। ফলে ইয়াজুজ-মাজুজ যদি ইসলামী উৎসের মতো বিপুল মানবগোষ্ঠী হয়, তবে তাদের আবদ্ধ অঞ্চলের ভেতরে বিশাল খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থা থাকার কথা। সেই ব্যবস্থার ভূমি-ব্যবহার, উদ্ভিদ আচ্ছাদন এবং পরিবেশগত প্রভাব দূর অনুধাবনেও দৃশ্যমান হওয়ার কথা।
দ্বিতীয় সমস্যা পানি। বর্তমান হাদিসি কাহিনিতে তাদের তৃষ্ণার মাত্রা বোঝাতে এমন চিত্র দেওয়া হয়েছে যে তাদের প্রথম দল তাবারিয়া হ্রদের পানি পান করে এবং শেষ দল এসে দেখে পানি নেই। এই বর্ণনার সাহিত্যিক উদ্দেশ্য তাদের বিপুল সংখ্যাকে নাটকীয়ভাবে প্রকাশ করা। কিন্তু একই জনগোষ্ঠী যদি বর্তমানে প্রাচীরের পেছনে জীবিত থাকে, তবে তারা আজও প্রতিদিন পানি পান করছে। লক্ষ-কোটি মানুষের জনসংখ্যা হলে নদী, হ্রদ, ভূগর্ভস্থ পানি বা বিশাল জলব্যবস্থা ছাড়া তাদের বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। সেই পানি কোথা থেকে আসছে এবং কোথায় যাচ্ছে—এটিও একটি ভূগোলগত প্রশ্ন।
তৃতীয় সমস্যা বর্জ্য ও মৃতদেহ। কয়েক শতক নয়, জুলকারনাইনের কথিত যুগ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বহু প্রজন্ম জন্মেছে ও মারা গেছে—এমনটাই আক্ষরিক বিশ্বাস দাবি করে। মানুষের দেহ, অস্থি, সমাধি, বাসস্থান, সরঞ্জাম, রান্নার অবশেষ, মৃৎপাত্র, ধাতব বস্তু এবং অন্যান্য বর্জ্য প্রত্নতাত্ত্বিক স্তর তৈরি করে। পৃথিবীতে তুলনামূলকভাবে ক্ষুদ্র প্রাচীন বসতিও হাজার বছর পরে প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে শনাক্ত করা যায়। অথচ এখানে দাবি করা হচ্ছে এক বিপুল মানবসভ্যতা দীর্ঘকাল পৃথিবীর কোনো অঞ্চলে অবস্থান করছে, কিন্তু তার স্বাধীন প্রত্নতাত্ত্বিক পরিচয় নেই।
চতুর্থ সমস্যা জনসংখ্যার বিস্তার। একটি সম্পূর্ণ আবদ্ধ জনসংখ্যা হাজার বছরের বেশি সময় বংশবিস্তার করলে দুটি সম্ভাবনা থাকে: জনসংখ্যা দ্রুত বাড়বে, অথবা খাদ্য, রোগ, মৃত্যু ও সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে একটি নির্দিষ্ট ধারণক্ষমতার কাছাকাছি স্থিত হবে। প্রথম ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ভূখণ্ড ও সম্পদ ক্রমাগত বাড়বে; দ্বিতীয় ক্ষেত্রে বিপুল মৃত্যু এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পরিবেশগত প্রক্রিয়া প্রয়োজন হবে। উভয় ক্ষেত্রেই একটি বিশাল বিচ্ছিন্ন মানবসমাজের অস্তিত্বের জৈবিক ও পরিবেশগত চিহ্ন থাকার কথা।
এখানে “আল্লাহ তাদের বিশেষভাবে রক্ষা করছেন” বললে সমস্যাটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থেকে সরিয়ে অলৌকিক দাবিতে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন খাদ্য কোথা থেকে আসে, পানি কীভাবে পাওয়া যায়, জনসংখ্যা কীভাবে টিকে থাকে, স্যাটেলাইটে কেন দেখা যায় না, প্রত্নতাত্ত্বিক চিহ্ন কোথায়—প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর একই হয়ে যায়: অদৃশ্য ঈশ্বরীয় ব্যবস্থা। এই পদ্ধতিতে কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণের প্রয়োজন থাকে না, কারণ প্রত্যেক অনুপস্থিত প্রমাণকেই নতুন অলৌকিক অনুমান দিয়ে পূরণ করা যায়।
তাবারিয়া হ্রদের কাহিনিও একই সমস্যার একটি নাটকীয় উদাহরণ। সহিহ মুসলিমে বলা হয়েছে তাদের প্রথম দল হ্রদের পানি পান করে শেষ করবে এবং শেষ দল এসে বলবে, এখানে একসময় পানি ছিল। এই বর্ণনা সত্য হলে ইয়াজুজ-মাজুজের মুক্তি একটি অসাধারণ জলবিদ্যাগত ঘটনা সৃষ্টি করবে—একটি বড় স্বাদুপানির হ্রদ দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যাবে। কিন্তু এটি ভবিষ্যতের কাহিনি বলে বর্তমানে পরীক্ষা করা যায় না। বর্তমানের পরীক্ষাযোগ্য প্রশ্নটি আরও মৌলিক: যে বিপুল জনসংখ্যাকে ভবিষ্যতে এমন পানিপিপাসু হিসেবে দেখানো হয়েছে, তারা এখন কোথায় এবং বর্তমানে তাদের দৈনন্দিন জলব্যবস্থা কী?
একইভাবে আকাশের দিকে তীর নিক্ষেপ করে রক্তমাখা তীর ফেরত পাওয়ার বর্ণনা একটি স্পষ্ট পৌরাণিক মহাবিশ্বের ধারণা বহন করে। আকাশকে এখানে এমন একটি বসবাসযোগ্য ঊর্ধ্বজগৎ হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে যেখানে “আকাশবাসী”দের বিরুদ্ধে ভূমি থেকে তীর ছুড়ে যুদ্ধ করা যায়, এবং ঈশ্বর সেই তীর রক্তমাখা করে ফিরিয়ে দিয়ে আক্রমণকারীদের বিজয়ের ভ্রান্ত ধারণা দেন। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের মহাকাশের সঙ্গে এই দৃশ্যের কোনো ভৌত সামঞ্জস্য নেই; এটি প্রাচীন স্তরবিন্যস্ত আকাশ-ধারণার ভাষার সঙ্গে অনেক বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এরপর একই সময়ে সমগ্র ইয়াজুজ-মাজুজের ঘাড়ে কীট সৃষ্টি হয়ে তাদের মৃত্যু, মৃতদেহে পৃথিবী ভরে যাওয়া, বিশাল পাখির মাধ্যমে লাশ সরিয়ে নেওয়া এবং অলৌকিক বৃষ্টিতে পৃথিবী ধুয়ে ফেলা—এই ধারাটি কাহিনিটিকে আরও স্পষ্টভাবে শেষযুগীয় পুরাণের পর্যায়ে নিয়ে যায়। এখানে কোনো সাধারণ মহামারি বা স্বাভাবিক যুদ্ধের বিবরণ নেই; ঈশ্বরীয় নির্দেশে একটি গোটা জাতির একযোগে মৃত্যু এবং তারপর পৃথিবীর অলৌকিক পরিশোধন বর্ণিত হয়েছে।
ফলে ইয়াজুজ-মাজুজের আক্ষরিক ব্যাখ্যার জন্য শুধু একটি অদেখা জনগোষ্ঠী মেনে নিলেই হয় না। একই সঙ্গে মানতে হয় অজানা বিশাল ভূখণ্ড, অদৃশ্য খাদ্যব্যবস্থা, অদৃশ্য জলব্যবস্থা, শনাক্তহীন বহু প্রজন্মের বসতি ও মৃতদেহ, শনাক্তহীন লোহা-ধাতুর প্রাচীর এবং ভবিষ্যতে এমন একটি বাহিনী যারা একটি বড় হ্রদের পানি শেষ করবে ও আকাশের বিরুদ্ধে তীর ছুড়বে। অন্যদিকে ইতিহাসে গোগ-মাগোগের পুরনো শেষযুগীয় কাহিনি, আলেকজান্ডারের গেট এবং পরবর্তী সিরিয়াক ও ইসলামী কাহিনির ধারাবাহিক বিকাশ এই সমস্ত বৈশিষ্ট্যকে কোনো অদৃশ্য সভ্যতা অনুমান না করেই ব্যাখ্যা করতে পারে।
কোন ব্যাখ্যাটি বেশি যুক্তিসঙ্গত?
ইয়াজুজ-মাজুজের কাহিনি ব্যাখ্যা করতে শেষ পর্যন্ত আমাদের সামনে মূলত দুটি মডেল থাকে। প্রথম মডেল অনুযায়ী কোরআন ও হাদিসের বর্ণনা আক্ষরিক অর্থেই সত্য: পৃথিবীর কোথাও বিপুলসংখ্যক মানুষ হাজার বছরের বেশি সময় ধরে একটি লোহা ও গলিত ধাতুর প্রাচীরের পেছনে আবদ্ধ আছে; তাদের অবস্থান আজও অজানা; তাদের বিশাল জনসংখ্যার খাদ্য, পানি, বসতি, বর্জ্য, কৃষি ও মৃতদেহের কোনো শনাক্তযোগ্য চিহ্ন নেই; আধুনিক মানচিত্র ও পর্যবেক্ষণেও তাদের অঞ্চল ধরা পড়ে না; কিন্তু শেষযুগে প্রাচীর ভেঙে তারা বেরিয়ে এসে তাবারিয়া হ্রদের পানি শেষ করবে, পৃথিবীর মানুষকে পরাজিত করবে এবং আকাশের দিকে তীর নিক্ষেপ করবে। এই ব্যাখ্যাটি সত্য ধরে রাখতে একটির পর একটি অদৃশ্য ব্যবস্থা অনুমান করতে হয়।
দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি ঐতিহাসিক। এতে দেখা যায়, ইসলামের বহু শতাব্দী আগে থেকেই গোগ-মাগোগ ছিল উত্তরাঞ্চল থেকে আগত ভয়ংকর শেষযুগীয় শত্রুর পরিচিত ধর্মীয় মোটিফ। আলেকজান্ডারের উত্তরাঞ্চলীয় লোহার গেটের কিংবদন্তিও ইসলাম-পূর্ব। পরবর্তী সিরিয়াক সাহিত্যে আলেকজান্ডার, দুই পাহাড়, ধাতব গেট, গোগ-মাগোগ এবং শেষযুগে তাদের মুক্তি একই কাহিনিতে যুক্ত হয়েছিল। কোরআনে একই মোটিফসমষ্টি জুলকারনাইনের কাহিনিতে উপস্থিত হয়; এরপর হাদিস ও তাফসিরে সেই সংক্ষিপ্ত কাহিনির সঙ্গে বিপুল সংখ্যা, প্রতিদিন প্রাচীর খোঁড়া, তাবারিয়া হ্রদ, আকাশে তীর, কীটের আক্রমণ এবং অন্যান্য বিস্তারিত যুক্ত হয়েছে। এই মডেলটির জন্য পৃথিবীতে কোনো অজানা বিশাল সভ্যতা অনুমান করতে হয় না; ধর্মীয় কাহিনির পরিচিত ঐতিহাসিক বিকাশই যথেষ্ট।
দুটি মডেলের প্রমাণের দায় এক নয়। পৃথিবীতে বাস্তব ইয়াজুজ-মাজুজ আছে—এটি একটি অস্তিত্বগত দাবি। সেই দাবির পক্ষে ধর্মীয় গ্রন্থের বাইরে স্বাধীন প্রমাণ প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে যে দলিলগুলো দেখানো হয় সেগুলো আবার সেই একই ধর্মীয় ঐতিহ্যের ভেতরের: কোরআন বলছে, হাদিস বলছে, তাফসির বলছে, মধ্যযুগীয় মুসলিম ভ্রমণকাহিনি বলছে। এগুলো ইসলামী বিশ্বাস ও কাহিনির ইতিহাসের প্রমাণ; প্রাচীরের পেছনে বর্তমানে একটি বিশাল মানবগোষ্ঠীর স্বাধীন অস্তিত্বের প্রমাণ নয়।
বরং স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য জায়গাগুলোতেই কাহিনিটি সমস্যায় পড়ে। কোরআনের প্রাচীর একটি বস্তুগত স্থাপনা—লোহা, উত্তাপ, গলিত ধাতু এবং দুই পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে নির্মিত। হাদিসে মুহাম্মদের সময়েই সেটিতে ছিদ্র সৃষ্টি হওয়ার কথা বলা হয়েছে। মধ্যযুগীয় মুসলিম সূত্রে আবার মানুষ সেখানে গিয়ে দরজা, তালা ও বুরুজ দেখে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে। অথচ আজ এই বহুল আলোচিত স্থাপনার কোনো নিশ্চিত অবস্থান নেই। ইসলামি ব্যাখ্যাতেই শেষ পর্যন্ত বলা হচ্ছে—আল্লাহই জানেন এটি কোথায়। যত বেশি পৃথিবীর মানচিত্র সম্পূর্ণ হয়েছে, ততই প্রাচীরটি নির্দিষ্ট ভূগোল থেকে সরে গিয়ে “অজানা স্থানে” আশ্রয় নিয়েছে।
একই সমস্যা ইয়াজুজ-মাজুজের জনসংখ্যার ক্ষেত্রেও। তাদের সংখ্যা এত বেশি যে হাদিসে সাধারণ মানুষের তুলনায় তাদের বিপুল সংখ্যাধিক্য দিয়ে সাহাবীদের সান্ত্বনা দেওয়া হয়েছে। আবার শেষযুগে তাদের এমন বিপুল বাহিনী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে যে একটি বড় হ্রদের পানি পর্যন্ত শেষ হয়ে যাবে। অথচ বর্তমানে তাদের খাদ্য, পানি, বসতি, কৃষি, পরিবেশগত পদচিহ্ন বা বহু প্রজন্মের প্রত্নতাত্ত্বিক অবশেষ কিছুই শনাক্ত হয়নি। এই অনুপস্থিতির প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরে যদি বলা হয় আল্লাহ অলৌকিকভাবে সবকিছু গোপন রেখেছেন, তাহলে দাবিটি আর প্রমাণনির্ভর থাকে না; যেকোনো অনুপস্থিত প্রমাণকেই নতুন অলৌকিক অনুমান দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়।
এই ধরনের ব্যাখ্যা নিজেকে ভুল প্রমাণের সম্ভাবনা থেকে রক্ষা করে। প্রাচীর পাওয়া যাচ্ছে না—অজানা স্থানে। জনগোষ্ঠী দেখা যাচ্ছে না—গোপন রাখা হয়েছে। খাদ্যের চিহ্ন নেই—আল্লাহ ব্যবস্থা করছেন। পানি ব্যবহারের প্রমাণ নেই—অলৌকিকভাবে সরবরাহ হচ্ছে। প্রত্নতাত্ত্বিক অবশেষ নেই—আল্লাহ চাইলে তা গোপন রাখতে পারেন। ফলে পর্যবেক্ষণ যাই হোক, বিশ্বাসটি অপরিবর্তিত থাকে। এই পদ্ধতিতে কোনো দাবিকে বাতিল করা সম্ভব নয়; কিন্তু একই কারণে সেই দাবিকে প্রমাণিতও বলা যায় না।
ঐতিহাসিক ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি উল্টো। সেটি একই সঙ্গে একাধিক তথ্য ব্যাখ্যা করে: কেন গোগ-মাগোগের নাম ইসলামের আগেই পাওয়া যায়; কেন তাদের উত্তরাঞ্চলের ভয়ংকর জাতি হিসেবে কল্পনা করা হয়েছিল; কেন আলেকজান্ডারের সঙ্গে একটি লোহার গেটের কাহিনি গড়ে উঠেছিল; কেন পরবর্তী সিরিয়াক কাহিনিতে সেই গেটের পেছনে গোগ-মাগোগকে রাখা হয়; কেন কোরআনে জুলকারনাইন একই ধরনের ধাতব প্রাচীর তৈরি করেন; এবং কেন পরবর্তী হাদিস-তাফসিরে কাহিনিটি আরও বিস্তারিত ও অলৌকিক হয়ে ওঠে। একটি ধারাবাহিক সাহিত্যিক ও ধর্মীয় ইতিহাস দিয়েই পুরো ঘটনাটির বিকাশ বোঝা যায়।
তাই প্রমাণের বিচারে সবচেয়ে সাশ্রয়ী ব্যাখ্যা হলো—ইয়াজুজ-মাজুজ কোনো অদৃশ্য বর্তমান মানবসভ্যতার প্রতিবেদন নয়; এটি বহু শতাব্দীর গোগ-মাগোগ, উত্তরাঞ্চলীয় বর্বর জাতি, আলেকজান্ডারের গেট এবং শেষযুগীয় ধ্বংসকাহিনির ইসলামী পুনর্গঠন। কোরআন সেই পুরনো কাহিনির একটি নতুন ধর্মতাত্ত্বিক রূপ দিয়েছে, আর হাদিস ও তাফসির পরবর্তী সময়ে তার চারপাশে আরও বিস্তৃত কাহিনি নির্মাণ করেছে।
উপসংহার
ইয়াজুজ-মাজুজের কাহিনি বিচ্ছিন্নভাবে পড়লে এটি ইসলামের নিজস্ব এক রহস্যময় ভবিষ্যদ্বাণী বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এর ইতিহাস অনুসরণ করলে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। মাগোগ প্রথমে প্রাচীন হিব্রু বংশতালিকায় উপস্থিত হয়; ইজেকিয়েলে গোগ ও মাগোগের সঙ্গে উত্তর দিক থেকে আসা ভয়ংকর আক্রমণের ধারণা যুক্ত হয়; প্রকাশিত বাক্যে তারা শেষযুগের অসংখ্য শত্রুবাহিনীতে পরিণত হয়। অন্যদিকে আলেকজান্ডারকে ঘিরে গড়ে ওঠে দূর পৃথিবী ভ্রমণ ও উত্তরাঞ্চলের লোহার গেট নির্মাণের কিংবদন্তি। পরবর্তী ধর্মীয় সাহিত্যে এই দুই ধারার মিলন ঘটে—গোগ-মাগোগকে আলেকজান্ডারের প্রাচীরের পেছনে আবদ্ধ করা হয় এবং শেষযুগে তাদের মুক্ত হওয়ার কাহিনি তৈরি হয়।
কোরআনের জুলকারনাইন-কাহিনি সেই পরিচিত কাহিনি-জগতের মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্বভ্রমণকারী শাসক, পশ্চিম ও পূর্বের দূর অঞ্চল, দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী পথ, ইয়াজুজ-মাজুজ, লোহা ও গলিত ধাতুর প্রতিবন্ধক এবং শেষযুগে সেই প্রতিবন্ধকের ধ্বংস—এই ঘন মোটিফসমষ্টি ইসলামের আগে থেকেই বিকাশমান ছিল। জুলকারনাইনকে ঐতিহাসিক আলেকজান্ডারের সঙ্গে সরাসরি এক করে ফেলাই মূল বিষয় নয়; মূল বিষয় হলো তাঁর কাহিনির সাহিত্যিক কাঠামো আলেকজান্ডার-কিংবদন্তির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
হাদিস ও তাফসিরে এসে কাহিনিটি আরও বিস্তৃত হয়েছে। মুহাম্মদের সময়ে প্রাচীরে ছিদ্র, প্রতি হাজারে ইয়াজুজ-মাজুজের বিপুল সংখ্যাধিক্য, প্রতিদিন প্রাচীর খোঁড়ার কাহিনি, একজনের হাজার সন্তান, তাবারিয়া হ্রদের পানি শেষ করা, আকাশে তীর নিক্ষেপ, কীটের আক্রমণে একই সঙ্গে মৃত্যু এবং বিশাল পাখির মাধ্যমে মৃতদেহ অপসারণ—একের পর এক নতুন উপাদান যুক্ত হয়েছে। আবার ইসলামী তাফসিরের মধ্যেই কিছু বর্ণনাকে দুর্বল, মুনকার বা পূর্ববর্তী ধর্মীয় উৎস থেকে আসা বলে সন্দেহ করা হয়েছে। অর্থাৎ কাহিনিটি যত বিস্তারিত হয়েছে, তার ভেতরের স্তর ও দ্বন্দ্বও তত স্পষ্ট হয়েছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এই কাহিনি সম্পূর্ণ অতিপ্রাকৃত জগতের দাবি নয়। ইয়াজুজ-মাজুজ মানুষ; তারা পৃথিবীতে থাকে; তাদের আটকে রাখা হয়েছে বাস্তব পাহাড়ের মাঝে বাস্তব ধাতব প্রাচীর দিয়ে; এবং সেই প্রাচীর মানুষ গিয়ে দেখেছে বলেও ইসলামী উৎসে দাবি করা হয়েছে। ফলে এর অন্তত একটি বড় অংশ যাচাইযোগ্য ভূগোল ও বস্তুগত বাস্তবতার দাবি। অথচ আধুনিক পৃথিবীতে সেই প্রাচীরের কোনো নিশ্চিত অবস্থান নেই, সেই বিপুল জনগোষ্ঠীর কোনো স্বাধীন চিহ্ন নেই এবং তাদের দীর্ঘস্থায়ী বসতির কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক বা পরিবেশগত প্রমাণ নেই।
প্রাচীন মানুষের কাছে পৃথিবীর দূর উত্তর, দুর্গম পর্বতমালা ও অজানা গিরিপথ ছিল রহস্যের অঞ্চল। সেখানে ভয়ংকর জাতি, দানব বা শেষযুগের শত্রুকে স্থান দেওয়া সহজ ছিল, কারণ সেই ভূগোল সম্পর্কে যাচাই করার সুযোগ সীমিত ছিল। আধুনিক ভূগোল সেই অজানা স্থানগুলো একে একে উন্মুক্ত করেছে। কিন্তু ইয়াজুজ-মাজুজের কাহিনি বিলুপ্ত হয়নি; বরং তাদের অবস্থান ক্রমে আরও অনির্দিষ্ট ও অদৃশ্য হয়ে গেছে।
প্রমাণের মানদণ্ড একই রাখলে সিদ্ধান্তটি জটিল নয়। কোনো প্রাচীন গ্রন্থে গোগ-মাগোগের বর্ণনা পাওয়া তাদের বাস্তব অস্তিত্ব প্রমাণ করে না; মধ্যযুগীয় আলেকজান্ডার-কাহিনিতে প্রাচীরের বর্ণনা পাওয়া সেই প্রাচীরকে ঐতিহাসিক সত্য বানায় না; একইভাবে কোরআন ও হাদিসে ইয়াজুজ-মাজুজের বিস্তারিত বিবরণ থাকাও পৃথিবীতে বর্তমানে তাদের অস্তিত্বের স্বাধীন প্রমাণ নয়। ধর্মীয় গ্রন্থগুলো সেই বিশ্বাস ও কাহিনির ইতিহাসের দলিল; পৃথিবীর বাস্তব জনগোষ্ঠী ও স্থাপনা প্রমাণ করতে হলে প্রয়োজন ধর্মীয় পাঠের বাইরে স্বাধীন প্রমাণ।
ইয়াজুজ-মাজুজের ক্ষেত্রে সেই স্বাধীন প্রমাণ নেই। বিপরীতে কাহিনিটির প্রধান উপাদানগুলোর ইসলাম-পূর্ব ইতিহাস আছে, তাদের পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সাহিত্যিক ইতিহাস আছে, কোরআনে নতুন ধর্মতাত্ত্বিক বিন্যাস আছে এবং পরবর্তী হাদিস-তাফসিরে আরও বিস্তারের ইতিহাস আছে। ফলে বর্তমান পৃথিবীর কোনো গোপন মানবজাতির অস্তিত্ব অনুমান করার চেয়ে ইয়াজুজ-মাজুজকে প্রাচীন গোগ-মাগোগ ও আলেকজান্ডার-কিংবদন্তির ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠা একটি ইসলামী শেষযুগীয় পুরাণ হিসেবে বোঝাই উপলব্ধ তথ্যকে সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করে।
তথ্যসূত্রঃ
- Genesis 10:2—ইয়াফেথের বংশধর হিসেবে মাগোগ ↩︎
- Ezekiel 38–39—গোগ, মাগোগ ও উত্তরাঞ্চলের বিশাল আক্রমণকারী বাহিনী ↩︎
- Josephus, Antiquities 1.6.1—মাগোগ ও স্কিথিয়ানদের সম্পর্ক ↩︎
- Revelation 20:7–9—শেষযুগে গোগ-মাগোগের মুক্তি ও বিপুল আক্রমণ ↩︎
- Josephus, Jewish War 7.7.4—আলেকজান্ডার কর্তৃক লোহার গেটে বন্ধ করা গিরিপথ ↩︎
- Tommaso Tesei, The Syriac Legend of Alexander’s Gate, Oxford University Press ↩︎
- Tesei—সিরিয়াক আলেকজান্ডার-কাহিনির তারিখ নিয়ে গবেষণার বিতর্ক ↩︎
- Tesei—ষষ্ঠ শতকের মূলরূপ ও পরবর্তী সপ্তম শতকের সংযোজনের বিশ্লেষণ ↩︎
- Corpus Coranicum—সূরা কাহফ ১৮:৯২ এবং সিরিয়াক আলেকজান্ডার-কাহিনি ↩︎
- Tesei—আলেকজান্ডারের শিং, ধর্মীয় পুনর্ব্যাখ্যা ও জুলকারনাইন ↩︎
- Kevin van Bladel, “The Alexander Legend in the Qur’an 18:83–102” ↩︎
- IslamWeb—ইয়াজুজ-মাজুজ আদমসন্তান এবং বর্তমানে প্রাচীরের পেছনে অবস্থান করছে ↩︎
- IslamQA—ইয়াজুজ-মাজুজ বর্তমানে জীবিত এবং প্রাচীরটি বাস্তব ভৌত প্রাচীর ↩︎
- তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর, খণ্ড ৫—ইয়াজুজ-মাজুজের মানবীয় পরিচয়, বিপুল সংখ্যা ও বংশবিস্তার ↩︎
- IslamWeb—জুলকারনাইনের প্রাচীরের সঠিক অবস্থান অজানা; ককেশাস, চীন ও উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন মত ↩︎
- IslamWeb—ইয়াজুজ-মাজুজ পৃথিবীর মানুষের দৃষ্টি থেকে গোপন অজানা অঞ্চলে অবস্থান করছে ↩︎
- IslamQA—জুলকারনাইনের প্রাচীর রূপক নয়; লোহা ও গলিত তামায় নির্মিত বাস্তব প্রতিবন্ধক ↩︎
- IslamQA—জুলকারনাইনকে আলেকজান্ডার হিসেবে প্রত্যাখ্যান এবং ইসলামী পরিচয়ের বিকল্প ব্যাখ্যা ↩︎
- Corpus Coranicum—কোরআনের জুলকারনাইন ও সিরিয়াক আলেকজান্ডার-কাহিনির সমান্তরাল ↩︎
- Corpus Coranicum—ঈশ্বরপ্রদত্ত ক্ষমতা, আলেকজান্ডার ও জুলকারনাইনের শেষযুগীয় প্রাচীর ↩︎
- Tommaso Tesei, The Syriac Legend of Alexander’s Gate—আলেকজান্ডারের শিং ও ধর্মীয় কিংবদন্তির বিকাশ ↩︎
- সূরা কাহফ ১৮:৯৩–৯৮ ↩︎
- Oxford, Journal of Islamic Studies—সাল্লাম আল-তারজুমানের অভিযানের মধ্যযুগীয় বিবরণ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫০৩ 1 2
- Corpus Coranicum—সিরিয়াক আলেকজান্ডার-কাহিনির ককেশাসীয় ভূগোল এবং কোরআনের অনির্দিষ্ট দুই পাহাড় ↩︎
- সূরা আম্বিয়া: ৯৬–৯৭ ↩︎
- মা‘আনিল কুরআন লিয-যাজ্জাজ—সূরা আম্বিয়া ২১:৯৬, ইয়াজুজ-মাজুজ দুটি জনগোষ্ঠী ↩︎
- সূরা কাহফ: ৯৩–৯৮ ↩︎
- তাফসীর আল-কুরতুবী, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ৫১–৫৫—দুই পাহাড়, ইয়াজুজ-মাজুজ ও প্রাচীর ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫০১-৫০২ ↩︎
- তাফসীর ইবনে কাসীর—সূরা কাহফ ১৮:৯৭, ইয়াজুজ-মাজুজ প্রাচীরে কোনো ছিদ্র করতে পারেনি ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫০৪-৫০৮ ↩︎
- তাফসীর ইবনে কাসীর—এক হাজার সন্তানসংক্রান্ত বর্ণনাকে গরীব, মুনকার ও দুর্বল বলা হয়েছে ↩︎
- তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর, খণ্ড ৫—ইয়াজুজ-মাজুজের সংখ্যা, আকার ও বংশবিস্তার সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা ↩︎
- সহিহ বুখারি—ইয়াজুজ-মাজুজের প্রাচীরের অংশ খুলে যাওয়ার বর্ণনা ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বর- ৬৬৫০ ↩︎
- সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিস নম্বর- ২১৮৭ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বর- ৬৯৭১ ↩︎
- আল-লুলু ওয়াল মারজান, হাদিস নম্বর- ১৮৩০ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বর- ৩১০৯ ↩︎
- সহিহ বুখারি—প্রতি হাজারে নয়শ নিরানব্বই এবং ইয়াজুজ-মাজুজের সংখ্যাধিক্য ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিস নম্বর- ৩৩৪৮ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বর- ৪২৫ ↩︎
- সহিহ মুসলিম—ইয়াজুজ-মাজুজ, তাবারিয়া হ্রদ, ঈসার অবরোধ ও তাদের ধ্বংস ↩︎
- সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিস নম্বর- ২২৪০ ↩︎
- আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া—নাওয়াস ইবন সামআনের ইয়াজুজ-মাজুজের শেষযুগীয় বর্ণনা ↩︎
About This Article
Genre: Islamic Eschatology Critique, Gog and Magog Analysis, Dhul-Qarnayn Review, Alexander-Legend Study, Quran-Hadith Geography Critique, and Apocalyptic Mythology Analysis
Epistemic Position: Secular Humanism, Historical Criticism, Source Criticism, Comparative-Religion Method, Archaeological Skepticism, Scientific Geography, and Anti-Apologetic Reasoning
This article examines Yajuj and Majuj as an Islamic apocalyptic narrative involving Dhul-Qarnayn, a metal barrier between two mountains, a hidden human population, and their release before the end of the world.
The central argument is that the Yajuj-Majuj story is better understood as an Islamic continuation and reconfiguration of older Gog-Magog traditions and Alexander's Gate legends, rather than as evidence for a real hidden nation and a still-existing iron-and-copper wall somewhere on Earth.
The article also discusses Gog and Magog in Genesis, Ezekiel, Josephus, Revelation, the Syriac Alexander Legend, Alexander's northern gate, Dhul-Qarnayn, the two-horned motif, Quran 18:83–98, Quran 21:96, the wall of iron and molten metal, medieval Muslim attempts to locate the barrier, IslamWeb and IslamQA's literal interpretations, hadith reports about the wall being breached in Muhammad's lifetime, Yajuj-Majuj's huge population, digging the wall, drinking the Lake of Tiberias dry, shooting arrows into the sky, the worm-like plague that kills them, and the geographical, demographic, ecological, and archaeological problems with treating them as a real hidden human population.
This article should be evaluated through Quranic context, hadith criticism, tafsir history, Late Antique apocalyptic literature, Alexander romance studies, historical geography, archaeology, population ecology, and standards of independent evidence—not through devotional immunity, end-times fear, literalist special pleading, hidden-location excuses, selective weak-report dismissal, or the demand that a premodern apocalyptic myth be treated as verified world geography.




ইয়াজুজ মাজুজ
বা গোগ -মাগোগ – এই টির ইসলামী ধ্যানধারনার আদ্যোপান্ত এবং সকল রেফারেন্স একসাথে তুলে ধরার জন্য আসিফকে বিশেষ ভাবে সাধুবাদ জানাচ্ছি।
এক যুগের বেশি সময় আগের কথা যখন কেরআনে নানান অসংগতি মস্তিষ্ক তোলপাড় করে তুলছিলে সেই সময় শুরুর দিকে আমি এই ইয়াজ মাজুজ নিয়ে অনেক ঘাটাঘাটি করেছিলাম সংগত কারণেই এই লেখাটি আমাকে অতীত স্মরণ করিয়ে দিলো ।
এরাবিয়ান নাইটসের গল্পে আমরা যেমন কল্পনার যত লাড্ডু বানানো যায় তা সব বানাতে দেখি, যা মনে চায় তাই গাঁজাখুড়ি তৈরী করতে দেখি তা থেকে বোধদয় হয় ঐ এলাকায় মানে প্রাচীন সুমেরীয়, পারসিয়ান , ইসরাইল এলাকায় রূপকথা তৈরীর বেশ ভালো মান ছিলো।
ইয়াজ মাজুজ সেই সব রূরকথারই একটি খুব জনপ্রিয় বা লোক মুখে প্রচলিত কাহিনীই হয়ে থাকবে।
এত পরিচিত কাহিনী হয়তো যে ওল্ড টেস্টামেন্ট এবং কোরআন কেউই এটাকে এড়াচে পারে নি, বরং চমকপ্রদ রংচং দিছে।
আমার সবচেয়ে মজা লাগে দেয়াল ভাঙতে যখন একটু বাকী থাকে তারা পরের দিনের জন্য রেখে চলে যায়
আর সরালে আবার দেয়ালের সীসা ভরে যায় — শিশুতোষ রাক্ষস ক্ষোক্কসের রূপকথা হিসেবে অতুলনীয় ।
কিন্তু এই মাল মানুষ বাস্তব বলে বিশ্বাস করে কেনো খুব অবাক হই।
ধন্যবাদ।
মধ্যযুগের লোকজন কোরআনকে তাদের মত করে ব্যাখ্যা করেছে। আপনাদের মত নাস্তিকের মাথায় এটা ঢুকবে না। মধ্যযুগে মানুষের জ্ঞান ছিল অনেক কম। সহি হাদিস বলে যে ছয়টি হাদিস গ্রন্থের কথা বলা হয় সেগুলো মানুষের লেখা। বাংলাদেশের হুজুররা যেমন পাগল ছাগল নাস্তিকরাও তেমন পাগল পাগল ছাগল। কালার হাট বাজার এই বাংলাদেশ। কোন আবিষ্কার নেই কিন্তু বিজ্ঞানীর অভাব নেই। নাস্তিকরা বলতেই পারবে না ডারউইনের বইটির নাম কী? অথচ ডারউইনবাদী হয়েছেন। ডারউইনের একটা পশমের যোগ্যতা আপনাদের আছে ? আর ওদিকে কাজী ইব্রাহিম উনি নিউটনের ওস্তাদ।
প্রাচীরটির বর্ণনার সাথে গেম ওফ থ্রোন্সের দ্যা গ্র্যাট ওয়াল অফ নর্থ এর মিল আছে!
Julker-nine was “Cyrus the Great” or “Alexander the Great”?
The story of julker-nine was narrated in the Quran because 3 questions were asked to test Muhammad. It is the answer to one of those.
বেশিরভাগ ঐতিহাসিক এবং ভাষাতত্ত্ববিদের মতে, উনি হচ্ছেন সম্রাট আলেকজান্ডার। তবে বর্তমানের কয়েকজন স্কলার Cyrus the Great বলেও দাবী করেছে। তথ্যগুলো মেলালে আলেকজান্ডারের সাথেই বেশি মিল পাওয়া যায়।
Arabian and Israeli people or separately ask Muhammod (sallahu alyhe wa sallam) …..about 3 questions (2 questions in Sura khahaf and 1 in Sura boni Israel)….then we get 3 answers from Quran…..so yajoj majoj is not fun….specially when Israeli or Arab ask questions…thank you.
ছোট্ট একটা বিষয় বুজলেই সব বুজবা, শ্রীলঙ্কায় যে বিশাল আকারের পায়ের ছাপ পাওয়া গেছে পাহাড়ের ওপর, ওই সাইজের মানুষ কি আজ ও পাওয়া গেছে কি? তোমার বিজ্ঞান কি স্যাটেলাইট দিয়ে প্রমাণ করতে পেরেছে ছাপ টা কোথা থেকে এলো? আর প্রমাণ করতে পেরেছে কি ওই পায়ের ছাপ কিসের?বুদ্ধিমানদের জন্য ইশারাই যথেষ্ঠ। ওই পায়ের ছাপ কি তোমার রূপকথার গল্পঃ থেকে এসেছে?
মধ্যযুগের লোকজন কোরআনকে তাদের মত করে ব্যাখ্যা করেছে। আপনাদের মত নাস্তিকের মাথায় এটা ঢুকবে না। মধ্যযুগে মানুষের জ্ঞান ছিল অনেক কম। সহি হাদিস বলে যে ছয়টি হাদিস গ্রন্থের কথা বলা হয় সেগুলো মানুষের লেখা। বাংলাদেশের হুজুররা যেমন পাগল ছাগল নাস্তিকরাও তেমন পাগল পাগল ছাগল। কালার হাট বাজার এই বাংলাদেশ। কোন আবিষ্কার নেই কিন্তু বিজ্ঞানীর অভাব নেই। নাস্তিকরা বলতেই পারবে না ডারউইনের বইটির নাম কী? অথচ ডারউইনবাদী হয়েছেন। ডারউইনের একটা পশমের যোগ্যতা আপনাদের আছে ? আর ওদিকে কাজী ইব্রাহিম উনি নিউটনের ওস্তাদ।