Knowledge Base Article

ইসলামী বিশ্বাস মতে কবরের চিৎকার সকল প্রাণীরা শুনতে পায়

প্রকাশিত: এপ্রিল 27, 2024 · লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন · 9 মিনিট পড়া

ভূমিকাঃ ধর্মীয় মিথ বনাম বস্তুগত বাস্তবতা

মানব সভ্যতার ইতিহাসে মৃত্যুপরবর্তী জীবন এবং কবরের শাস্তি বা ‘আযাবুল কবর’ একটি বহুল আলোচিত ধর্মতাত্ত্বিক ধারণা। বিশেষ করে ইসলামি বিশ্বাস ও হাদিসশাস্ত্র অনুযায়ী, পাপিষ্ঠ ব্যক্তিদের মৃত্যুর পর কবরে যে ভয়াবহ শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়, তার আর্তনাদ বা চিৎকার মানুষ ও জিন ব্যতীত পৃথিবীর অন্য সকল প্রাণী শুনতে সক্ষম। এই দাবিটি কেবল একটি বিমূর্ত আধ্যাত্মিক বিশ্বাসে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি প্রত্যক্ষ ভৌত দাবি (Physical Claim)। কারণ, ‘শোনা’ বা শ্রবণক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার জন্য শব্দ তরঙ্গের (Sound Wave) উপস্থিতি এবং সেই তরঙ্গের একটি নির্দিষ্ট কম্পাঙ্ক বা ফ্রিকোয়েন্সি থাকা বাধ্যতামূলক।

ঐতিহাসিকভাবে, প্রাক-আধুনিক যুগের মানুষ পশুদের আকস্মিক আচরণ বা চমকে ওঠাকে ব্যাখ্যা করতে না পেরে এমন অতিপ্রাকৃত গল্পের অবতারণা করত। কিন্তু বর্তমানের উন্নত প্রযুক্তি ও শব্দবিজ্ঞানের (Acoustics) যুগে দাঁড়িয়ে এই দাবিটি একটি বড় ধরনের বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। যদি কোনো শব্দ তরঙ্গ পশুর শ্রবণেন্দ্রিয় শনাক্ত করতে পারে, তবে তা অবশ্যই আধুনিক সংবেদনশীল যন্ত্রপাতির মাধ্যমে রেকর্ড করা সম্ভব হওয়া উচিত। এই প্রবন্ধে আমরা আলোচনা করব কেন কবরের অভ্যন্তরে মৃতদেহের চিৎকার বা কোনো যান্ত্রিক কম্পন তৈরির দাবিটি আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান এবং শব্দ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির আলোকে একটি ভিত্তিহীন কুসংস্কার বা রূপকথা হিসেবে প্রতীয়মান হয়।


হাদিসের বিবরণঃ সকল প্রাণী মৃতদের আর্তনাদ শোনে

সহি হাদিসে বর্ণিত আছে, মানব ও জীন ছাড়া যারা কবরের নিকট থাকে সকলেই নাকি মৃত মানুষদের চিৎকার শুনতে পায় [1] [2] [3] [4]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
২৩/ জানাযা
পরিচ্ছেদঃ ২৩/৮৬. ক্ববরের ‘আযাব সম্পর্কে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে।
১৩৭৪. আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বান্দাকে যখন তার কবরে রাখা হয় এবং তার সাথীরা এতটুকু মাত্র দূরে যায় যে, সে তখনও তাদের জুতার আওয়াজ শুনতে পায়। [1] এ সময় দু’জন ফেরেশ্তা তার নিকট এসে তাকে বসান এবং তাঁরা বলেন, এ ব্যক্তি অর্থাৎ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে তুমি কী বলতে? তখন মু’মিন ব্যক্তি বলবে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি আল্লাহ্‌র বান্দা এবং তাঁর রাসূল। তখন তাঁকে বলা হবে, জাহান্নামে তোমার অবস্থান স্থলটির দিকে নযর কর, আল্লাহ্ তোমাকে তার বদলে জান্নাতের একটি অবস্থান স্থল দান করেছেন। তখন সে দু’টি স্থলের দিকেই দৃষ্টি করে দেখবে। কাতাদাহ (রহ.) বলেন, আমাদের নিকট বর্ণনা করা হয়েছে যে, সে ব্যক্তির জন্য তাঁর কবর প্রশস্ত করে দেয়া হবে। অতঃপর তিনি (কাতাদাহ) পুনরায় আনাস (রাঃ)-এর হাদীসের বর্ণনায় ফিরে আসেন। তিনি [(আনাস) (রাঃ)] বলেন, আর মুনাফিক বা কাফির ব্যক্তিকেও প্রশ্ন করা হবে তুমি এ ব্যক্তি (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে কী বলতে? সে উত্তরে বলবে, আমি জানি না। লোকেরা যা বলত আমি তা-ই বললাম। তখন তাকে বলা হবে, তুমি না নিজে জেনেছ, না তিলাওয়াত করে শিখেছ। আর তাকে লোহার মুগুর দ্বারা এমনভাবে আঘাত করা হবে, যার ফলে সে এমন বিকট চিৎকার করে উঠবে যে, দু’ জাতি (মানুষ ও জ্বিন) ছাড়া তার আশপাশের সকলেই তা শুনতে পাবে। (১৩৩৮) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১২৮৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১২৯১)
[1] হাদীসটি গোরস্থানে জুতা পরে যাওয়ার প্রমাণ বহন করে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৩৫/ সুন্নাহ
পরিচ্ছেদঃ ২৭. কবরের জিজ্ঞাসাবাদ এবং শাস্তি প্রসঙ্গে
৪৭৫২। আব্দুল ওয়াহাব (রাঃ) সূত্রে অনুরূপ হাদীস বর্ণিত। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, যখন কোনো লোককে কবরে রেখে তার সঙ্গীরা এতটুকু দূরে চলে যায় যেখান থেকে সে তাদের জুতার শব্দ শুনতে পায় তখন তার নিকট দু’ জন ফিরিশতা এসে বলে … অতঃপর প্রথমোক্ত হাদীসের অনুরূপ। তবে এতে কাফিরেরর সঙ্গে মুনাফিকের কথা রয়েছে এবং বলা হয়েছেঃ আর কাফির ও মুনাফিককে প্রশ্ন করা হবে।তিনি বলবেন, মানব ও জীন ছাড়া যারা কবরের নিকট থাকে সকলেই চিৎকার শুনতে পায়।[1]
সহীহ।
[1]. এর পূর্বেরটি দেখুন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১: ঈমান (বিশ্বাস)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ – কবরের ‘আযাব
১২৬-[২] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বান্দাকে যখন কবরে রেখে তার সঙ্গীগণ (আত্মীয়-স্বজন, পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব) সেখান থেকে চলে আসে, আর তখনও সে তাদের জুতার শব্দ শুনতে পায়। তার নিকট (কবরে) দু’জন মালাক (ফেরেশতা) পৌঁছেন এবং তাকে বসিয়ে প্রশ্ন করেন, তুমি দুনিয়াতে এই ব্যক্তির (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর) ব্যাপারে কী জান? এ প্রশ্নের উত্তরে মু’মিন বান্দা বলে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিঃসন্দেহে আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রসূল। তখন তাকে বলা হয়, ঐ দেখে নাও, তোমার ঠিকানা জাহান্নাম কিরূপ (জঘন্য) ছিল। তারপর আল্লাহ তা’আলা তোমার সে ঠিকানা (জাহান্নামকে) জান্নাতের সাথে পরিবর্তন করে দিয়েছেন। তখন সে বান্দা দু’টি ঠিকানা (জান্নাত-জাহান্নাম) একই সঙ্গে থাকবে। কিন্তু মুনাফিক্ব ও কাফিরকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, দুনিয়াতে এ ব্যক্তি (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সম্পর্কে তুমি কী ধারণা পোষণ করতে? তখন সে উত্তর দেয়, আমি বলতে পারি না (প্রকৃত সত্য কী ছিল)। মানুষ যা বলতো আমিও তাই বলতাম। তখন তাঁকে বলা হয়, তুমি বিবেক-বুদ্ধি দিয়েও বুঝতে চেষ্টা করনি এবং (আল্লাহর কুরআন) পড়েও জানতে চেষ্টা করনি। এ কথা বলে তাকে লোহার হাতুড়ি দিয়ে কঠিনভাবে মারতে থাকে, এতে সে তখন উচ্চস্বরে চিৎকার করতে থাকে। এ চীৎকারের শব্দ (পৃথিবীর) জিন আর মানুষ ছাড়া নিকটস্থ সকলেই শুনতে পায়। (মুত্তাফাকুন ’আলায়হি, শব্দসমূহ বুখারীর)[1]
1] সহীহ : বুখারী ১৩৭৪, মুসলিম ২৮৭০, নাসায়ী ২০৫১, আহমাদ ১২২৭১, সহীহ ইবনু হিব্বান ৩১২০, সহীহ আল জামি‘ ১৬৭৫, সহীহ আত্ তারগীব ৩৫৫৫।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

কবরে


আলেম-ওলামাদের বক্তব্য

আসুন মুফতি ইব্রাহিমের দুইটি ওয়াজ শুনে নিই,

এবারে আসুন মামুনুল হকের মুখ থেকেও শুনি,


শব্দ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির আধুনিক সক্ষমতা ও বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা

শব্দ মূলত পদার্থের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত একটি যান্ত্রিক তরঙ্গ, যা নির্দিষ্ট কম্পাঙ্ক বা ফ্রিকোয়েন্সি এবং তীব্রতা (Amplitude) দ্বারা সংজ্ঞায়িত। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এখন এমন এক শিখরে পৌঁছেছে যেখানে মহাবিশ্বের ক্ষুদ্রতম এবং দূরবর্তী কম্পনও আমাদের অগোচরে থাকা প্রায় অসম্ভব।

📡
অতি-সংবেদনশীল কম্পন শনাক্তকরণ
আধুনিক প্রযুক্তির অন্যতম বিস্ময় হলো লেজার ইন্টারফেরোমিটার গ্র্যাভিটেশনাল-ওয়েভ অবজারভেটরি (LIGO)। এটি মহাকাশের কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূর থেকে আসা অত্যন্ত ক্ষীণ মহাকর্ষীয় তরঙ্গও শনাক্ত করতে সক্ষম, যার কম্পন একটি পরমাণুর নিউক্লিয়াসের চেয়েও ক্ষুদ্রতর [5]। যদি কবরের ভেতরে কোনো মৃতদেহের চিৎকার বা যান্ত্রিক তরঙ্গ সত্যিই উৎপন্ন হতো, তবে সেই কম্পন মাটির স্তর ভেদ করে ভূপৃষ্ঠে আসা এবং আধুনিক সিসমিক বা শব্দ সেন্সরে ধরা পড়া ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র।
🔊
ইনফ্রাসাউন্ড ও আল্ট্রাসাউন্ড ডিটেকশন
মানুষের শ্রবণসীমা ২০ হার্জ থেকে ২০ কিলোহার্জের মধ্যে সীমাবদ্ধ হলেও, আধুনিক ডিটেক্টরগুলো ২০ হার্জের নিচের (Infrasound) এবং ২০ কিলোহার্জের উপরের (Ultrasound) শব্দ নিখুঁতভাবে রেকর্ড করতে পারে। বিজ্ঞানীরা ইনফ্রাসাউন্ড ব্যবহার করে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বা তিমির যোগাযোগ পর্যবেক্ষণ করেন এবং আল্ট্রাসাউন্ড ব্যবহার করে বাদুড়ের গতিবিধি বা এমনকি গাছপালার অতি সূক্ষ্ম কম্পনও রেকর্ড করেছেন।
🎛️
সিগন্যাল প্রসেসিং ও রূপান্তর
যদি মৃতদের আর্তনাদ মানুষের শ্রবণসীমার বাইরের কোনো তরঙ্গ দৈর্ঘ্যে (Wavelength) প্রকাশিত হতো, তবে ডিজিটাল সিগন্যাল প্রসেসিং এবং ফিল্টার ব্যবহার করে তা সহজেই মানুষের শোনার উপযোগী কম্পাঙ্কে রূপান্তর করা সম্ভব হতো।

যেহেতু বিশ্বের হাজার হাজার কবরস্থানে বা তার আশেপাশে বসানো ভূতাত্ত্বিক বা শব্দসংক্রান্ত কোনো গবেষণায় আজ পর্যন্ত এমন কোনো ‘চিৎকার’ বা ‘আর্তনাদ’ রেকর্ড করা যায়নি, সেহেতু এটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে এমন কোনো শব্দ তরঙ্গ প্রকৃতপক্ষে তৈরি হয় না। বিজ্ঞানের এই নিখুঁত ডিটেকশন ক্ষমতার সামনে কবরের আজাবের চিৎকার কেবল একটি ভিত্তিহীন ধর্মীয় গালগল্প বা কুসংস্কার হিসেবেই টিকে থাকে।


প্রাণীদের শ্রবণসীমা বনাম যান্ত্রিক রেকর্ডিংঃ একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ

ইসলামি ধর্মতত্ত্বের একটি প্রধান যুক্তি হলো, মানুষ শুনতে না পেলেও কুকুর, শিয়াল বা অন্যান্য গবাদি পশু কবরের আজাব বা মৃতব্যক্তির চিৎকার শুনতে পায়। এই দাবিটিকে যখন আমরা জীববিজ্ঞানের (Biology) দাঁড়িপাল্লায় পরিমাপ করি, তখন এর অসারতা স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। প্রাণীদের শ্রবণশক্তি মূলত তাদের কানের গঠন এবং মস্তিষ্কের স্নায়বিক বিন্যাসের ওপর নির্ভরশীল, যা কোনো আধ্যাত্মিক বা অতিপ্রাকৃত বিষয় নয়।

🦮
শ্রবণসীমার ব্যাপ্তি
মানুষ সাধারণত ২০ হার্জ (Hz) থেকে ২০ কিলোহার্জ (kHz) পর্যন্ত শব্দ শুনতে পায়। এর বিপরীতে, কুকুর এবং শিয়ালের শ্রবণসীমা অনেক বেশি প্রশস্ত। কুকুর ৬৫ Hz থেকে ৪৫ kHz এবং শিয়াল ৪০ Hz থেকে ৬০ kHz পর্যন্ত কম্পাঙ্কের শব্দ শনাক্ত করতে সক্ষম [6] [7]। অর্থাৎ, তারা মানুষের শ্রবণসীমার বাইরের উচ্চ কম্পাঙ্কের (Ultrasound) শব্দ শুনতে পায়।
🎙️
যৌক্তিক অসংগতি
যদি কুকুর বা শিয়াল কবরের চিৎকার শুনতে পায়, তবে পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র অনুযায়ী সেই শব্দটি অবশ্যই ৬৫ Hz থেকে ৬০ kHz সীমার মধ্যে কোনো একটি কম্পাঙ্কে অবস্থান করছে। বর্তমানের সাধারণ সস্তা মানের ডিজিটাল রেকর্ডার বা মাইক্রোফোনগুলোও ১০০ kHz পর্যন্ত শব্দ রেকর্ড করতে সক্ষম। সুতরাং, কুকুর যদি সেই শব্দ শুনতে পায়, তবে আমাদের কাছে থাকা প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই শব্দ তরঙ্গ রেকর্ড করা এবং গ্রাফিক্যাল অ্যানালাইসিসের মাধ্যমে তার অস্তিত্ব প্রমাণ করা অত্যন্ত সহজ কাজ ছিল।
🧬
বিবর্তনীয় ব্যাখ্যা
কুকুর বা শিয়ালের শ্রবণশক্তি উন্নত হওয়ার কারণ হলো তাদের শিকার ধরার প্রয়োজন বা আত্মরক্ষা, কোনো অতীন্দ্রিয় জগত দর্শনের জন্য নয়। অনেক সময় মাটির নিচে ছোট ইঁদুর বা পোকা-মাকড়ের নড়াচড়ার শব্দ শুনে পশুরা কান খাড়া করে বা চমকে ওঠে। আদিম যুগের মানুষ পশুদের এই আচরণ দেখে ভুলবশত সেটিকে কবরের শাস্তির সাথে যুক্ত করেছিল।

তথ্যপ্রযুক্তি ও জীববিজ্ঞানের এই মেলবন্ধন প্রমাণ করে যে, কুকুর বা শিয়ালের ‘শোনা’ যদি সত্য হতো, তবে তা ল্যাবরেটরিতে প্রমাণ করা সম্ভব হতো। যেহেতু আজ পর্যন্ত কোনো বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় পশুদের উপস্থিতিতে কবরের কোনো শব্দ তরঙ্গ ধরা পড়েনি, সেহেতু এটি নিশ্চিত যে পশুদের এই তথাকথিত শ্রবণ ক্ষমতা কেবল একটি ধর্মীয় কল্পনাপ্রসূত মিথ।


মৃতদেহের শরীরতাত্ত্বিক গঠন ও শব্দ উৎপাদনের বৈজ্ঞানিক অসম্ভবতা

শব্দ উৎপন্ন হওয়া কোনো অলৌকিক বিষয় নয়; এটি একটি বিশুদ্ধ যান্ত্রিক প্রক্রিয়া। মানুষের কণ্ঠস্বর বা চিৎকার তৈরি হতে হলে তিনটি প্রধান উপাদানের সমন্বয় প্রয়োজন: একটি শক্তির উৎস (ফুসফুস থেকে নির্গত বায়ু), একটি কম্পনকারী মাধ্যম (স্বরযন্ত্র বা Vocal Cords), এবং সেই কম্পনকে শব্দে রূপান্তর করার জন্য মস্তিষ্কের স্নায়বিক সংকেত। মৃত্যুর পরবর্তী শারীরিক অবস্থায় এই তিনটির কোনোটিই কার্যকর থাকে না।

🧠
মস্তিষ্কের মৃত্যু ও স্নায়বিক স্তব্ধতা
চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, মৃত্যুর সাথে সাথে মস্তিষ্কের ইলেকট্রিক্যাল অ্যাক্টিভিটি এবং সিন্যাপটিক সংকেত আদান-প্রদান সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় [8]। চিৎকার করা একটি অত্যন্ত জটিল পেশি সঞ্চালন প্রক্রিয়া, যা মস্তিষ্কের নির্দেশ ছাড়া অসম্ভব। মৃতদেহের মস্তিষ্ক যেহেতু মৃত, তাই সেখান থেকে কোনো চিৎকার বা কষ্টের অনুভূতি প্রকাশের সংকেত পেশিতে পৌঁছানো জৈবিকভাবে অসম্ভব।
🫁
শ্বাস-প্রশ্বাস ও বায়ুপ্রবাহের অনুপস্থিতি
শব্দ তৈরির জন্য ফুসফুস থেকে বাতাসের একটি নিয়ন্ত্রিত প্রবাহ প্রয়োজন যা স্বরযন্ত্রের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় কম্পন সৃষ্টি করে। মৃত ব্যক্তির ফুসফুস অচল থাকে এবং রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেখানে কোনো বায়ুচাপ থাকে না। বাতাস ছাড়া মৃতদেহের পক্ষে কোনো শব্দ তরঙ্গ তৈরি করা পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অসম্ভব।
🦴
কণ্ঠস্বর ও যান্ত্রিক শক্তির অভাব
মৃত্যুর পর শরীরের কোষগুলো অক্সিজেন হারায় এবং দ্রুত পচন প্রক্রিয়া শুরু হয়। পেশিগুলো শিথিল হয়ে পড়ে অথবা ‘রিগর মর্টিস’ (Rigor mortis) প্রক্রিয়ায় শক্ত হয়ে যায়। এই অবস্থায় স্বরযন্ত্র বা অন্য কোনো অঙ্গের মাধ্যমে সুসংগত চিৎকার বা উচ্চমাত্রার শব্দ তরঙ্গ তৈরি হওয়া কেবল অবাস্তবই নয়, বরং হাস্যকর।

ধর্মীয় বিশ্বাসে দাবি করা হয় যে, মৃতদেহকে ফিরিশতারা আঘাত করে এবং তখন সে চিৎকার করে। কিন্তু আঘাতের ফলে শব্দ তৈরি হতে হলেও সেখানে একটি সজীব ও কার্যকরী কণ্ঠযন্ত্রের প্রয়োজন। যেহেতু মৃতদেহ একটি প্রাণহীন জৈব বস্তু মাত্র, তাই সেখানে কোনো কণ্ঠস্বর উৎপন্ন হওয়ার উৎসই অবশিষ্ট থাকে না। অতএব, মৃতদেহের চিৎকার করার এই ধারণাটি আধুনিক শরীরতত্ত্ব ও জীববিজ্ঞানের সম্পূর্ণ পরিপন্থী একটি উদ্ভট কল্পনা।


উপসংহারঃ অন্ধবিশ্বাস বনাম বৈজ্ঞানিক অগ্রযাত্রা

পরিশেষে বলা যায়, কবরের আজাব বা মৃতদেহের চিৎকার এবং তা প্রাণীদের দ্বারা শুনতে পাওয়ার দাবিটি একটি প্রাক-বৈজ্ঞানিক যুগের আদিম বিশ্বাস। তৎকালীন সময়ে মানুষের কাছে শব্দবিজ্ঞান, শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া বা আধুনিক শব্দ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির কোনো জ্ঞান ছিল না। ফলে পশুদের স্বাভাবিক আচরণ বা মাটির নিচের প্রাকৃতিক শব্দকে তারা অতিপ্রাকৃত শাস্তির সাথে গুলিয়ে ফেলত। আধুনিক বিজ্ঞানের প্রেক্ষাপটে এই দাবিটি সম্পূর্ণ অসার প্রমাণিত হয় কারণঃ

📡
প্রাযুক্তিক অক্ষমতা
যদি কোনো শব্দ তরঙ্গ পশুর কান শনাক্ত করতে পারে, তবে তা আধুনিক সেন্সর ও মাইক্রোফোনে ধরা পড়া অনিবার্য। বর্তমানের LIGO-র মতো অতি-সংবেদনশীল প্রযুক্তির যুগে এমন কোনো কম্পন অলক্ষিত থাকা অসম্ভব।
🫀
শারীরবৃত্তীয় বাধা
মৃত্যুর পর মস্তিষ্ক ও ফুসফুসের কার্যকারিতা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কণ্ঠস্বর বা চিৎকার তৈরির কোনো যান্ত্রিক উৎস অবশিষ্ট থাকে না [8]
⚖️
যৌক্তিক অসঙ্গতি
কুকুর বা শিয়ালের উন্নত শ্রবণসীমা একটি বিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্য, কোনো আধ্যাত্মিক অ্যান্টেনা নয়। তাদের শোনার রেঞ্জটি (Range) বিজ্ঞানের পরিচিত কম্পাঙ্কের মধ্যেই পড়ে, যা সহজেই রেকর্ডযোগ্য।

ধর্মীয় বিশ্বাসের আড়ালে প্রচারিত এই ধরনের ধারণাগুলো কেবল মানুষের মনে অযৌক্তিক ভীতি সঞ্চার করে এবং স্বাধীন ও বৈজ্ঞানিক চিন্তাশক্তিকে বাধাগ্রস্ত করে। কবরের শাস্তির এই চিৎকার মূলত প্রাচীন লোকগাথা ও হাদিসশাস্ত্রের অন্তর্ভুক্ত একটি রূপকথা মাত্র। সত্য এবং বাস্তবতাকে বুঝতে হলে আমাদের কেবল বিশ্বাসের ওপর নির্ভর না করে প্রমাণ, যুক্তি এবং বিজ্ঞানের কষ্টিপাথরে প্রতিটি দাবিকে যাচাই করা প্রয়োজন। একটি প্রগতিশীল ও যৌক্তিক সমাজ গঠনে এ ধরনের অন্ধকারাচ্ছন্ন কুসংস্কারগুলো বর্জন করা সময়ের দাবি।


তথ্যসূত্রঃ
  1. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ১৩৭৪ ↩︎
  2. সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিসঃ ৪৭৫২ ↩︎
  3. মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ১২৬ ↩︎
  4. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৩ ↩︎
  5. The Advanced LIGO Detectors in the Era of First Discoveries, 2016 ↩︎
  6. Hearing range, Wikipedia ↩︎
  7. Hearing Frequency Ranges, ResearchGate ↩︎
  8. Brain death, PubMed 1 2

10 thoughts on

  1. শোনা যায় বিভিন্ন কবরস্থানে কবরের ভিতরে শিয়াল প্রবেশ করে এবং মৃতের গোসত খায়
    যদি আজাবের চিৎকার হয় তবে শেয়ালের সাহসের প্রসংশা করতেই হয়।

  2. শোনা যায় বিভিন্ন কবরস্থানে কবরের ভিতরে শিয়াল প্রবেশ করে এবং মৃতের গোসত খায়
    যদি আজাবের চিৎকার হয় তবে শেয়ালের সাহসের প্রসংশা করতেই হয়।না,আমি আজকেই মন্তব্য করলাম।

  3. আপনার পুরো যুক্তি দাঁড়ানো এই ধারণার ওপর যে এটা physical sound—এটার কোনো প্রমাণ নেই, তাই আপনার প্রশ্নই ভুল।
    কারণ:
    কুকুর = biological perception
    যন্ত্র = human-designed limitation
    দুইটা এক না।
    ১.আপনি আগে প্রমাণ করুন-কবরের আজাব physical sound
    না হলে কেন শুনি না প্রশ্নটাই invalid।
    ২. তুমি আগে প্রমাণ করো—যন্ত্র সব ধরনের অস্তিত্ব ধরতে পারে।
    কারণ:
    মানুষ আগে রেডিও ওয়েভ জানত না।
    ডার্ক ম্যাটার এখনো detect করা যায় না পুরোপুরি।
    অনেক কিছু indirect ভাবে বোঝা হয়।
    তাই “ধরা যায় না = নেই”
    এটা নিজেই অবৈজ্ঞানিক দাবি।
    #মৃত দেহ শব্দ তৈরি করতে পারে না।
    এটা ঠিক — মৃত দেহ নিজে শব্দ তৈরি করতে পারে না।
    কিন্তু
    কে বলেছে কবরের আজাব “দেহের তৈরি শব্দ”?
    ইসলাম বলে এটা বারযাখের (অদৃশ্য স্তর) বিষয়।
    এটা physical vocal cord দিয়ে হওয়া sound — এমন কথা কোথাও নেই।
    তাই এই যুক্তি = irrelevant (বিষয়ের বাইরে)
    #বাতাস নেই, তাই শব্দ হবে না
    এটা শুধুই physical sound-এর জন্য প্রযোজ্য।
    কিন্তু:
    সবকিছুই air vibration না।
    মহাকাশে তো শব্দ চলে না—তবুও data detect করা হয়।
    তাই এখানে আবার একই ভুল:
    “সবকিছু = বাতাসে চলা শব্দ” — এটা ভুল generalization।

    1. পাগলামী কাকে বলে আসিফকে না দেখলে বুঝতাম না। তবে তোমার জায়গায় তুমি ঠিক আছো আসিফ। তোমার যন্ত্রপাতি দিয়ে তুমি শব্দ শুনার চেষ্টা করো😀 আমি বলিনি তুমি ভুল লিখছো, তোমার জ্ঞানীই এই পর্যন্ত।

    2. Physical Sound প্রমাণ হয় যে শুনে তার সাপেক্ষে, যেমন; গরু, ছাগল, কুকুর। তাদের দেহের সাথে যে শক্তি যুক্ত তা মূলত দেহের পদার্থের সাথে যুক্ত, যা দেহের সাথে interaction based ক্রিয়া করে।

      তুমি যদি দেহের মাধ্যমে অথবা দেহের সাথে interaction এ দেহকে প্রভাবিত করে, এমন কোনো শক্তির (অপ্রমাণিত আত্না) মাধ্যমে শ্রবন নিশ্চিত করতে চাও, এটার Physical interaction এর প্রমাণ ও প্রমাণের অবস্থার উপাদান একমাত্র বিদ্যমান।

      দেহের সাথে interaction ব্যতিত দেহকে প্রভাবিত করা তুমি পর্যবেহ্মন ও পরীহ্মা দিয়ে অস্বীকার করতে পারবে না। অন্ধভাবাদর্শ বিঙ্গান চিন্তা আটকায়।

      যা Sound কে বাস্তবতায় একমাত্র Physical sound হিসেবে প্রমাণ করে।

      তুমার (a মুমিন) এই দাবি মিথ্যা; “আপনার পুরো যুক্তি দাঁড়ানো এই ধারণার ওপর যে এটা physical sound—এটার কোনো প্রমাণ নেই, তাই আপনার প্রশ্নই ভুল।”

      কুকুর এর Biological perception কি Human made যন্ত্র দ্বারা ধরা যায় না? আবিষ্কার হয়নি?

      তুমার (a মুমিন) দাবি: “ডার্ক ম্যাটার এখনো detect করা যায় না পুরোপুরি।”

      ডার্ক ম্যাটার এখানে অপ্রাসঙ্গিক, অন্ধবিশ্বাস এর পহ্মে নিজেকে সান্ত্বনা।

      এখানে, কুকুর ( Physical Dog) এর hearing abality and বাস্তব Process নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গ। Detected .

      তুমার (a মুমিন) যুক্তি; “কে বলেছে কবরের আজাব “দেহের তৈরি শব্দ”?
      ইসলাম বলে এটা বারযাখের (অদৃশ্য স্তর) বিষয়।”

      বাস্তবতায় যা বাস্তব, সবই 4 field এর সাথে কোনো না কোনো ভাবে interact করে, আর বারযাখ এর প্রমাণ না থাকায় তুমি মিথ্যাচার এনেছ সত্য ডাকতে।

      তুমার দাবি; “মহাকাশে তো শব্দ চলে না—তবুও data detect করা হয়।”

      কবর থেকে কি কুকুর এর কানে গতি ছাড়া শব্দ আসে? শব্দ কি দূরত্ব অতিক্রম করে গতি ছাড়া?

  4. Some false claim of Mumin in this post comment: Decoded

    Physical Sound প্রমাণ হয় যে শুনে তার সাপেক্ষে, যেমন; গরু, ছাগল, কুকুর। তাদের দেহের সাথে যে শক্তি যুক্ত তা মূলত দেহের পদার্থের সাথে যুক্ত, যা দেহের সাথে interaction based ক্রিয়া করে।

    তুমি যদি দেহের মাধ্যমে অথবা দেহের সাথে interaction এ দেহকে প্রভাবিত করে, এমন কোনো শক্তির (অপ্রমাণিত আত্না) মাধ্যমে শ্রবন নিশ্চিত করতে চাও, এটার Physical interaction এর প্রমাণ ও প্রমাণের অবস্থার উপাদান একমাত্র বিদ্যমান।

    দেহের সাথে interaction ব্যতিত দেহকে প্রভাবিত করা তুমি পর্যবেহ্মন ও পরীহ্মা দিয়ে অস্বীকার করতে পারবে না। অন্ধভাবাদর্শ বিঙ্গান চিন্তা আটকায়।

    যা Sound কে বাস্তবতায় একমাত্র Physical sound হিসেবে প্রমাণ করে।

    তুমার (a মুমিন) এই দাবি মিথ্যা; “আপনার পুরো যুক্তি দাঁড়ানো এই ধারণার ওপর যে এটা physical sound—এটার কোনো প্রমাণ নেই, তাই আপনার প্রশ্নই ভুল।”

    কুকুর এর Biological perception কি Human made যন্ত্র দ্বারা ধরা যায় না? আবিষ্কার হয়নি?

    তুমার (a মুমিন) দাবি: “ডার্ক ম্যাটার এখনো detect করা যায় না পুরোপুরি।”

    ডার্ক ম্যাটার এখানে অপ্রাসঙ্গিক, অন্ধবিশ্বাস এর পহ্মে নিজেকে সান্ত্বনা।

    এখানে, কুকুর ( Physical Dog) এর hearing abality and বাস্তব Process নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গ। Detected .

    তুমার (a মুমিন) যুক্তি; “কে বলেছে কবরের আজাব “দেহের তৈরি শব্দ”?
    ইসলাম বলে এটা বারযাখের (অদৃশ্য স্তর) বিষয়।”

    বাস্তবতায় যা বাস্তব, সবই 4 field এর সাথে কোনো না কোনো ভাবে interact করে, আর বারযাখ এর প্রমাণ না থাকায় তুমি মিথ্যাচার এনেছ সত্য ডাকতে।

    তুমার দাবি; “মহাকাশে তো শব্দ চলে না—তবুও data detect করা হয়।”

    কবর থেকে কি কুকুর এর কানে গতি ছাড়া শব্দ আসে? শব্দ কি দূরত্ব অতিক্রম করে গতি ছাড়া?

Leave a comment

Your email will not be published.