Knowledge Base Article

সকালে ৭টি আজওয়া খেজুর খেলে বিষক্রিয়া হয় না?

প্রকাশিত: এপ্রিল 25, 2024 · লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন · 18 মিনিট পড়া

ভূমিকা

ইসলামি ঐতিহ্যে বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদানের মাধ্যমে রোগ নিরাময় বা ‘তিব্বে নববী’-র ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত একটি দাবি হলো—সকালে নির্দিষ্ট সংখ্যক খেজুর খেলে তা সারাদিনের জন্য বিষক্রিয়া এবং জাদুর হাত থেকে সুরক্ষা দেয়। ইসলামি আকীদা অনুযায়ী নবীর প্রতিটি কথা অভ্রান্ত ও ধ্রুব সত্য হিসেবে গৃহীত হলেও, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং সাধারণ যুক্তির নিরিখে এই দাবিটি অত্যন্ত দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ। পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ একটি ফলকে বিষের অবাস্তব প্রতিষেধক হিসেবে উপস্থাপন করা কেবল একটি ছদ্মবৈজ্ঞানিক দাবিই নয়, বরং এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি চরম হুমকিস্বরূপ।


হাদিস সম্পর্কে ইসলামিক আকীদা

ইসলামি ধর্মতত্ত্ব বা আকীদার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো মুহাম্মদ-এর প্রতিটি কথা ও কাজকে পরম সত্য হিসেবে গ্রহণ করা। বিশুদ্ধ ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, নবীর মুখ নিঃসৃত প্রতিটি শব্দই ঐশী তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এবং তা ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে। এই বিশ্বাসের মূল ভিত্তি হলো—নবী মুহাম্মদ ব্যক্তিগত আবেগ, রাগ বা খুশির বশবর্তী হয়ে এমন কিছু বলেন না যা অসত্য। ফলে, কোনো সহিহ হাদিসে যদি কোনো বাস্তব জীবনের বা বৈজ্ঞানিক বা মহাজাগতিক দাবি করা হয়, তবে একজন একনিষ্ঠ মুসলিমের কাছে সেটি পর্যবেক্ষণযোগ্য বিজ্ঞানের চেয়েও অধিকতর সত্য হিসেবে বিবেচিত হয় [1]

সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৯/ শিক্ষা-বিদ্যা, (জ্ঞান-বিজ্ঞান)
পরিচ্ছেদঃ ৪১৭. ইলম লিপিবদ্ধ করা সম্পর্কে।
৩৬০৭. মুসাদ্দাদ (রহঃ) ….. আবদুল্লাহ ইবন আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি যা কিছু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট হতে শ্রবণ করতাম, তা লিখে রাখতাম। আমি ইচ্ছা করতাম যে, আমি এর সবই সংরক্ষণ করি। কিন্তু কুরাইশরা আমাকে এরূপ করতে নিষেধ করে এবং বলেঃ তুমি যা কিছু শোন তার সবই লিখে রাখ, অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন মানুষ, তিনি তো কোন সময় রাগান্বিত অবস্থায় কথাবার্তা বলেন এবং খুশীর অবস্থায়ও বলেন। একথা শুনে আমি লেখা বন্ধ করি এবং বিষয়টি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অবহিত করি। তখন তিনি তার আংগুল দিয়ে নিজের মুখের প্রতি ইাশারা করে বলেনঃ তুমি লিখতে থাক, ঐ যাতের কসম, যাঁর হাতে আমার জীবন, যা কিছু এ মুখ হতে বের হয়, তা সবই সত্য।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রাঃ)


ধর্মীয় প্রেক্ষাপট ও হাদিসের বর্ণনা

ইসলামি ধর্মতত্ত্বে এই দাবির ভিত্তি হলো বেশ কিছু ‘সহিহ’ বা বিশুদ্ধ হাদিস। যেখানে অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীনভাবে আজওয়া খেজুরের বিষ প্রতিরোধক ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে। [2] [3] [4]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৭৬/ চিকিৎসা
পরিচ্ছেদঃ ৭৬/৫২. আজ্ওয়া খেজুর দিয়ে যাদুর চিকিৎসা প্রসঙ্গে।
৫৭৬৯. সা’দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ যে ব্যক্তি সকালবেলায় সাতটি আজ্ওয়া মাদ্বীনায় উৎপন্ন উৎকৃষ্ট খুরমা) খেজুর খাবে, সে দিন কোন বিষ বা যাদু তার কোন ক্ষতি করবে না। [৫৪৪৫] (আধুনিক প্রকাশনী- ৫৩৪৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫২৪৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সা’দ বিন আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ)

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৭০/ খাওয়া সংক্রান্ত
পরিচ্ছেদঃ ৭০/৪৩. আজওয়া খেজুর প্রসঙ্গে।
৫৪৪৫. সা’দ তাঁর পিতা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি প্রত্যেকদিন সকালবেলায় সাতটি আজওয়া উৎকৃষ্ট খেজুর খাবে, সেদিন কোন বিষ ও যাদু তার ক্ষতি করবে না। [৫৭৬৮, ৫৭৬৯, ৫৭৭৯] (আধুনিক প্রকাশনী- ৫০৪২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৯৩৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সা’দ বিন আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ)

সুনান আত তিরমিজী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩১/ চিকিৎসা
পরিচ্ছেদঃ মাসরুম ও আজওয়া খেজুর।
২০৭২. আবূ উবায়দা ইবন আবূ সাফার ও মাহমূদ ইবন গায়লান (রহঃ) …. আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আজওয়া হলো জান্নাতী খেজুর। এতে আছে বিষের প্রতিষেধক, মাসরুম হলো মান্‌নের অন্তর্ভুক্ত। এর পানি হলো চক্ষু রোগের প্রতিষেধক।
হাসান সহীহ, তাহকিক মিশকাত ছানী ৪২৩৫, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ২০৬৬ [আল মাদানী প্রকাশনী]
(আবু ঈসা বলেন) এই বিষয়ে সাঈ ইবন যায়দ, আবূ সাঈদ ও জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহ থেকেও হাদীস বর্ণিত আছে। হাদীসটি এই সূত্রে হাসান-গারীব। সাঈদ ইবন আমির (রহঃ) -এর সূত্র ছাড়া মুহাম্মদ ইবন আমরের রিওয়ায়াত হিসাবে এটি সম্পর্কে আমাদের কিছু জানা নেই।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

খেজুর

আসুন এই হাদিসের ইংরেজি অনুবাদ দেখে নেয়া যাক, [5]

muslim:2047b – Abū Bakr b. Abū Shaybah > Abū Usāmah > Hāshim b. Hāshim > ʿĀmir b. Saʿd b. Abū Waqqāṣ > Saʿd
He who ate seven ‘ajwa’ dates in the morning, poison and magic will not harm him on that day.
– Sound (Muslim)

bukhari:5445 – Jumʿah b. ʿAbdullāh > Marwān > Hāshim b. Hāshim > ʿĀmir b. Saʿd from his father
Messenger of Allah ﷺ said, “He who eats seven ‘Ajwa dates every morning, will not be affected by poison or magic on the day he eats them.”
– Sound (Bukhārī)

bukhari:5779 – Muḥammad > Aḥmad b. Bashīr Abū Bakr > Hāshim b. Hāshim > ʿĀmir b. Saʿd from my father
I heard Messenger of Allah ﷺ saying, “Whoever takes seven ‘Ajwa dates in the morning will not be effected by magic or poison on that day.”
– Sound (Bukhārī)

bukhari:5768 – ʿAlī > Marwān > Hāshim > ʿĀmir b. Saʿd from his father
The Prophet ﷺ said, “If somebody takes some ʿAjwa dates every morning, he will not be affected by poison or magic on that day till night.” (Another narrator said seven dates).
– Sound (Bukhārī)

bukhari:5769 – Isḥāq b. Manṣūr > Abū Usāmah > Hāshim b. Hāshim > ʿĀmir b. Saʿd > Saʿd
I heard Messenger of Allah ﷺ saying, “If someone takes seven ʿajwah dates in the morning, neither magic nor poison will hurt him that day.”
– Agreed Upon (Luʿluʿ wa-al-Marjān)

খেজুর 1

আলেমদের বিপদজনক বক্তব্য

আসুন এই সম্পর্কিত একটি ভিডিও দেখে নিই,

এবারে আসুন আহমদুল্লাহর মুখ থেকে এই আজওয়া খেজুর কী এবং কোথায় পাওয়া যায় জেনে নেয়া যাক,


বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণঃ খেজুর বনাম বিষাক্ত রসায়ন

খেজুর একটি অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর ফল। এতে ফ্রুক্টোজ, গ্লুকোজ, ফাইবার এবং প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম রয়েছে। এটি তাৎক্ষণিক শক্তি জোগাতে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সহায়ক হতে পারে। আজওয়ার বিভিন্ন জৈবসক্রিয় উপাদানের antioxidant প্রভাব থাকতে পারে; কিন্তু আজওয়া খেজুরকে বিষক্রিয়ার কার্যকর প্রতিষেধক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার কোনো নির্ভরযোগ্য ক্লিনিক্যাল এভিডেন্স নেই।

🔬

কোষীয় স্তরে বিষের প্রভাব: মারাত্মক বিষ যেমন পটাশিয়াম সায়ানাইড (KCN) মানবদেহের রক্তে মিশে যাওয়ার সাথে সাথে কোষের মাইটোকন্ড্রিয়াল এনজাইম (Cytochrome c oxidase) কে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। এতে কোষগুলো অক্সিজেন উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে না; ফলে কোষীয় শক্তি উৎপাদন দ্রুত বন্ধ হয়ে জীবনহানিকর বিষক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। পাকস্থলীতে কয়েকটি খেজুরের উপস্থিতি এই জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়া থামানোর কোনো জৈবিক ক্ষমতা রাখে না।

🧪

প্রতিষেধকের অভাব: চিকিৎসাবিজ্ঞানে কিছু নির্দিষ্ট বিষের জন্য নির্দিষ্ট প্রতিষেধক রয়েছে, আবার বহু বিষের ক্ষেত্রেই কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিডোট নেই এবং সহায়ক চিকিৎসাই প্রধান ভরসা। একটি সাধারণ ফলের শর্করা বা ফাইবার কীভাবে বিশ্বের সকল প্রকার বিষের (যেমন: সাপের বিষ, রাসায়নিক বিষ বা আর্সেনিক) বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেবে, তার কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। যদি এটি সত্য হতো, তবে আধুনিক বিষবিদ্যা (Toxicology) ও হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ওষুধের বদলে খেজুর বিতরণ করা হতো।


বিষবিজ্ঞান (Toxicology) অনুযায়ী বিষক্রিয়ার প্রকৃতি

আধুনিক বিষবিজ্ঞান বা টক্সিকোলজি অনুযায়ী বিষক্রিয়া একটি সুস্পষ্ট জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাজ করে। বিভিন্ন বিষ মানবদেহের ভিন্ন ভিন্ন জৈবিক ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে। উদাহরণস্বরূপ, পটাশিয়াম সায়ানাইড কোষের মাইটোকন্ড্রিয়ায় অবস্থিত সাইটোক্রোম সি অক্সিডেজ এনজাইমকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়, ফলে কোষের শক্তি উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায় এবং দ্রুত মৃত্যু ঘটতে পারে [6]. আর্সেনিক কোষের এনজাইম সিস্টেমের সাথে বিক্রিয়া করে কোষীয় বিপাক প্রক্রিয়া ব্যাহত করে, আর বোটুলিনাম টক্সিন স্নায়ুতন্ত্রকে অবরুদ্ধ করে পক্ষাঘাত সৃষ্টি করে [7].

এই ধরনের বিষক্রিয়া প্রতিরোধের জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে নির্দিষ্ট অ্যান্টিডোট বা প্রতিষেধক ব্যবহৃত হয়, যেমন সায়ানাইড বিষক্রিয়ার ক্ষেত্রে হাইড্রোক্সোকোবালামিন বা সোডিয়াম থায়োসালফেট। কিন্তু খেজুরের মধ্যে এমন কোনো রাসায়নিক উপাদান নেই যা এই ধরনের বিষকে নিষ্ক্রিয় করতে পারে। খেজুর একটি পুষ্টিকর খাদ্য হলেও, তার উপাদানসমূহ বিষক্রিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর অ্যান্টিডোট হিসেবে কাজ করে—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে পাওয়া যায় না। সুতরাং সাতটি খেজুর খেলে বিষক্রিয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব—এই দাবি টক্সিকোলজির মৌলিক নীতির সাথেই সাংঘর্ষিক।


হাদিসকে সত্য প্রমাণের উদ্দেশ্যনির্ভর গবেষণা: বিজ্ঞানের নামে নিশ্চিতকরণ পক্ষপাত

আজওয়া খেজুরের এই অবৈজ্ঞানিক দাবিকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে একটি বিশেষ ধরনের গবেষণা প্রায়ই সামনে আনা হয়। এসব গবেষণায় ইঁদুর বা খরগোশের শরীরে নির্দিষ্ট রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে অঙ্গের ক্ষতি সৃষ্টি করে পরে আজওয়া খেজুরের নির্যাস প্রয়োগ করা হয়েছে এবং কিছু জৈব-রাসায়নিক সূচকের উন্নতিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন মুহাম্মদের “সাতটি আজওয়া খেলে বিষ ক্ষতি করবে না” বক্তব্যের বৈজ্ঞানিক সত্যতা পাওয়া গেছে। কিন্তু গবেষণাগুলো ভালোভাবে পড়লেই দেখা যায়, হাদিসে যে দাবিটি করা হয়েছে, তার পরীক্ষা এসব গবেষণায় আদৌ করা হয়নি। বরং একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বহুগুণ দুর্বল দাবি পরীক্ষা করে তার ফলাফলকে ধর্মীয় বক্তব্যটির পাশে বসানো হয়েছে।

এই প্রবণতার সবচেয়ে নগ্ন উদাহরণ ২০১৪ সালে প্রকাশিত “Ajwa Dates as a Protective Agent Against Liver Toxicity in Rat” গবেষণাটি। গবেষণাটির প্রধান লেখক Bassem Y. Sheikh-এর পরিচয়ই ছিল সৌদি আরবের Taibah University-র Al-Moalim MA Bin Ladin (MABL) Chair for Scientific Miracles of Prophetic Medicine-এর পরিচালক। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, গবেষণাপত্রটির স্বীকৃতি অংশে লেখকেরা নিজেরাই জানিয়েছেন যে গবেষণার আর্থিক সহায়তা এসেছে সেই MABL Chair for Scientific Miracles of Prophetic Medicine থেকে—Grant No. SMPM1434/A0106[8]

নামটি আরেকবার পড়া দরকার—“Scientific Miracles of Prophetic Medicine”, অর্থাৎ “নববী চিকিৎসার বৈজ্ঞানিক অলৌকিকতা”। এটি কোনো নিরপেক্ষ টক্সিকোলজি গবেষণাগার নয় যার গবেষকেরা দৈবক্রমে আজওয়া খেজুরের একটি অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য আবিষ্কার করেছেন। বরং গবেষণা অর্থায়নকারী চেয়ারটির ঘোষিত গবেষণাক্ষেত্রই ছিল “নববী চিকিৎসা” এবং তার “বৈজ্ঞানিক অলৌকিকতা” অনুসন্ধান। একই গবেষণা-পরিমণ্ডলের আরেকটি গবেষণায় লেখকেরা আরও খোলাখুলিভাবে জানিয়েছেন যে কাজটি ছিল তাদের “research on Prophetic medicine”-এর অংশ এবং সেই গবেষণাটিও একই MABL Chair অর্থায়ন করেছিল। [9]

এখানে সমস্যাটি শুধু অর্থ কোথা থেকে এসেছে, তা নয়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গবেষণায় অর্থ দিলেই গবেষণার ফল স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিথ্যা হয়ে যায় না। সমস্যাটি আরও মৌলিক: বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের স্বাভাবিক দিকটাই এখানে উল্টে যাওয়ার প্রবল ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞানে প্রথমে কোনো দাবিকে সত্য ধরে নিয়ে তারপর তার সমর্থনে ফলাফল খোঁজা হয় না; এমন পরীক্ষা নির্মাণ করতে হয় যেখানে দাবিটি মিথ্যা হলে সেটিও ধরা পড়তে পারে। কিন্তু “নববী চিকিৎসার বৈজ্ঞানিক অলৌকিকতা” অনুসন্ধানের ঘোষিত কর্মসূচিতে ধর্মীয় বক্তব্যটি আগেই বিশেষ মর্যাদা পেয়ে বসে আছে। তখন গবেষণার প্রশ্ন আর কেবল “আজওয়ার কী জৈবিক প্রভাব আছে?” থাকে না; তার সঙ্গে জুড়ে যায় “নবীর বক্তব্যের বৈজ্ঞানিক সত্যতা কোথায় পাওয়া যায়?”—এবং এখানেই confirmation bias বা পূর্ববিশ্বাস-নিশ্চিতকরণ পক্ষপাতের দরজা পুরোপুরি খুলে যায়।

আর ২০১৪ সালের পরীক্ষাটি মুহাম্মদের বক্তব্যের পরীক্ষা ছিল—এমন দাবি করা সরাসরি ভুল। গবেষকেরা ইঁদুরের শরীরে carbon tetrachloride (CCl₄) প্রয়োগ করে যকৃতের ক্ষতি সৃষ্টি করেন এবং আজওয়া খেজুরের নির্যাস সেই ক্ষতির কিছু biochemical ও histological marker কমাতে পারে কি না তা পরীক্ষা করেন। [10] অর্থাৎ গবেষণার প্রশ্ন ছিল মোটামুটি: একটি antioxidant-সমৃদ্ধ উদ্ভিজ্জ নির্যাস CCl₄-সৃষ্ট oxidative liver injury কিছুটা কমাতে পারে কি না।

কিন্তু হাদিসের দাবি কী?

সকালে সাতটি আজওয়া খেলে সেদিন বিষ তার ক্ষতি করতে পারবে না

এই দুই বক্তব্যকে একই দাবি মনে করার কোনো বৈজ্ঞানিক সুযোগ নেই। একদিকে রয়েছে একটি নির্দিষ্ট রাসায়নিক দিয়ে প্রাণীর যকৃতে সৃষ্ট oxidative damage-এর কয়েকটি সূচক; অন্যদিকে রয়েছে মানুষের জন্য সারাদিনব্যাপী “poison will not harm him” ধরনের সাধারণ এবং কার্যত সীমাহীন দাবি। প্রথমটির কিছু ইতিবাচক ফল পাওয়া দ্বিতীয়টিকে প্রমাণ করে না। এটা হাদিসের পরীক্ষা নয়; হাদিসের জায়গায় একটি সুবিধাজনক surrogate claim বসিয়ে সেই দুর্বল দাবিটিকে পরীক্ষা করা।

বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে ২০১৮ সালের “Ameliorative Influence of Ajwa Dates on Ochratoxin A-Induced Testis Toxicity” গবেষণায়। এখানে ইঁদুরের শরীরে ochratoxin A প্রয়োগ করে অণ্ডকোষের ক্ষতি সৃষ্টি করা হয়। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো, গবেষক নিজেই Methods অংশে লিখেছেন যে ব্যবহৃত আজওয়ার dose ছিল “equivalent to Prophet Mohammed recommendation”—অর্থাৎ মুহাম্মদের সাতটি খেজুর খাওয়ার বক্তব্যের সমতুল্য হিসাব করে পরীক্ষার dose নির্ধারণ করা হয়েছিল। [11]

অর্থাৎ ধর্মীয় বর্ণনা এখানে কোনো ভূমিকার অলংকারমাত্র নয়—হাদিস পরীক্ষার নকশার মধ্যেই ঢুকে পড়েছে। “সাতটি” সংখ্যা কোনো dose-response experiment থেকে আবিষ্কৃত হয়নি; আগে থেকেই ধর্মীয় গ্রন্থে সাতটি ছিল, তাই সেই সংখ্যাকে প্রাণী-গবেষণায় রূপান্তর করা হয়েছে। বিজ্ঞানের ভাষায় এই পদ্ধতি নিজে অবৈধ নয়—কোনো ঐতিহাসিক দাবিকে অবশ্যই পরীক্ষার hypothesis হিসেবে নেওয়া যায়। কিন্তু তাহলে পরবর্তী কাজ হওয়া উচিত ছিল সেই দাবিটিকেই কঠোরভাবে falsify করার চেষ্টা করা। এখানে তা হয়নি।

আরও হাস্যকর হলো, এই গবেষণা থেকেও “সাতটি আজওয়া খেলে বিষ ক্ষতি করবে না” প্রমাণিত হয়নি। গবেষণাটি দেখেছে একটি নির্দিষ্ট mycotoxin-এ ইঁদুরের testicular tissue damage-এর কিছু পরিবর্তন। মানুষকে সকালে সাতটি সম্পূর্ণ আজওয়া খাওয়ানো হয়নি, মানুষের ওপর বিষ প্রয়োগ করা হয়নি, সারাদিন বিষ প্রতিরোধ হয় কি না দেখা হয়নি, এবং বিভিন্ন ধরনের বিষের বিরুদ্ধেও কোনো পরীক্ষা হয়নি। ফলে গবেষণাটি সফল হলেও হাদিসের দাবির বিশাল অংশ সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় পরীক্ষার বাইরেই থেকে যায়। [12]

২০১৯ সালের আরেকটি গবেষণায় এই ধর্মীয় framing আরও পরিষ্কার। Journal of Taibah University Medical Sciences-এ প্রকাশিত “Protective effects of Ajwa date extract against tissue damage induced by acute diclofenac toxicity” গবেষণার abstract-এই আজওয়া খেজুরকে বলা হয়েছে “a Prophetic medicinal remedy”। গবেষণায় ইঁদুরকে অত্যধিক মাত্রার diclofenac দিয়ে liver ও lung tissue damage সৃষ্টি করা হয় এবং চার ঘণ্টা পরে Ajwa Date Extract প্রয়োগ করা হয়। [13]

আর Discussion অংশে গবেষকেরা সেই বিখ্যাত হাদিসটিও হাজির করেছেন—সকালে সাতটি আজওয়া খেলে “poison or magic” ক্ষতি করবে না। এরপর তারা আজওয়াকে অন্য খেজুরের তুলনায় শ্রেষ্ঠ বলে আলোচনা করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত acute diclofenac toxicity-এর চিকিৎসায় Ajwa Date Extract ব্যবহারের সুপারিশ পর্যন্ত করেছেন। [14]

এখানে বৈজ্ঞানিক দাবির লাফটি বিশাল। ইঁদুরের histology-তে কিছু tissue damage কম পাওয়া থেকে মানুষের acute diclofenac poisoning-এর “treatment” সুপারিশ করা clinical evidence নয়। কোনো মানব clinical trial নেই, therapeutic dose প্রতিষ্ঠিত নয়, standard treatment-এর সঙ্গে তুলনা নেই, mortality বা clinically meaningful outcome-এর প্রমাণ নেই। উপরন্তু, পরীক্ষায় আজওয়া দেওয়া হয়েছিল diclofenac দেওয়ার চার ঘণ্টা পরে—অর্থাৎ এটি মুহাম্মদের “আগে সাতটি খেলে সারাদিন বিষ ক্ষতি করবে না” দাবির পরীক্ষাও নয়। তা সত্ত্বেও গবেষণাপত্রের আলোচনায় হাদিসটি টেনে আনা হয়েছে। এই ধরনের উপস্থাপনাকে হাদিসের বৈজ্ঞানিক সত্যতার প্রমাণ বলা হলে সেটি গবেষণার ফলাফলকে ভয়াবহভাবে অতিরঞ্জিত করা ছাড়া আর কিছু নয়। গবেষণাটির লেখকেরা অবশ্য জানিয়েছেন যে এই নির্দিষ্ট গবেষণাটি কোনো উৎস থেকে আর্থিক সহায়তা পায়নি। [15]

এই পুরো গবেষণা-ধারার মৌলিক কৌশলটি তাই পরিষ্কার:

হাদিসের আসল দাবি:
সকালে সাতটি আজওয়া → সারাদিন বিষ ক্ষতি করবে না।

গবেষণায় পরীক্ষা করা হচ্ছে:
আজওয়ার concentrated extract → ইঁদুর/খরগোশ → একটি নির্দিষ্ট toxic chemical → একটি নির্দিষ্ট অঙ্গ → oxidative damage-এর কয়েকটি marker কিছুটা কমে কি না।

তারপর দ্বিতীয়টির ফলাফলকে প্রথমটির পক্ষে “বৈজ্ঞানিক প্রমাণ” হিসেবে হাজির করা হচ্ছে।

এটি একই hypothesis নয়। এটি claim substitution—দাবি বদলে ফেলার কৌশল।

ধরা যাক, আগামীকাল শত শত উচ্চমানের গবেষণায় সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলো যে আজওয়া খেজুরের polyphenol, flavonoid বা অন্যান্য antioxidant উপাদান CCl₄, diclofenac কিংবা ochratoxin-সৃষ্ট oxidative injury কিছুটা কমায়। তাতেও হাদিসটির অলৌকিক দাবি এক বিন্দুও প্রমাণিত হবে না। কারণ antioxidant activity এবং antidote activity একই জিনিস নয়। Vitamin C, berries, grapes, green tea, বহু ফল ও উদ্ভিদেই antioxidant compound থাকে। তাই বলে এগুলো খেয়ে মানুষ সায়ানাইড, আর্সেনিক, সাপের বিষ, botulinum toxin বা অন্য যেকোনো বিষের বিরুদ্ধে সারাদিন অক্ষত থাকে না।

সত্যিকার অর্থে হাদিসটির বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করতে চাইলে গবেষণার প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল এমন:

সকালে সাতটি আজওয়া খাওয়া মানুষের ক্ষেত্রে clinically significant poison exposure-এর ক্ষতি কি নির্ভরযোগ্যভাবে প্রতিরোধ করে?

এবং যদি “বিষ” বলতে কেবল বিশেষ কোনো বিষ বোঝানো হয়, তাহলে সেটিও আগে থেকে স্পষ্ট করতে হবে। এরপর নির্ধারণ করতে হবে কোন toxin, কোন dose, কোন pharmacological mechanism, কতক্ষণ protection থাকে, dose-response relationship কী, সাতটির বদলে ছয় বা আটটি হলে কী ঘটে, অন্য জাতের খেজুরের তুলনায় আজওয়া সত্যিই আলাদা কি না, এবং conventional antidote-এর তুলনায় এর কার্যকারিতা কতটুকু। আজ পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ নেই যা হাদিসের এই বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করে।

বরং একটি বিশেষ তুলনামূলক গবেষণাই ধর্মীয় বিশেষত্বের দাবির জন্য বিব্রতকর ফল দিয়েছে। Ajwah, Safawy এবং Sukkari—তিন জাতের খেজুরের neuropharmacological ও analgesic প্রভাব তুলনা করে গবেষকেরা দেখেছেন, তিনটিতেই কিছু কার্যকারিতা ছিল; Ajwah তুলনামূলকভাবে কিছু ক্ষেত্রে শক্তিশালী হলেও positive control drug-এর তুলনায় প্রভাব ছিল দুর্বল। গবেষকেরা নিজেরাই বলেছেন এটি তাদের Prophetic medicine research-এর অংশ এবং গবেষণাটি MABL Chair for Scientific Miracles of Prophetic Medicine অর্থায়ন করেছিল। [16] অর্থাৎ ধর্মীয় মর্যাদাপ্রাপ্ত ফলকে গবেষণার লক্ষ্য বানিয়েও প্রকৃতি শেষ পর্যন্ত কোনো অলৌকিক সীমারেখা মেনে চলে না; পাওয়া যায় সাধারণ phytochemistry এবং মাত্রাগত জৈবিক প্রভাব।

আরও বিস্তৃতভাবে দেখলে, সৌদি আরবে আজওয়া নিয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণা অর্থায়নের নজিরও রয়েছে। ২০১৬ সালে PLOS ONE-এ প্রকাশিত Ajwa extract-এর breast-cancer cell গবেষণাটি King Abdulaziz City for Science and Technology (KACST)-এর postgraduate grant AT-34-237 দিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল। গবেষণাটি in-vitro cancer-cell study—বিষ প্রতিরোধের হাদিসের পরীক্ষা নয়—তাই এটিকে হাদিস প্রমাণের গবেষণা বলা যাবে না। কিন্তু এটি দেখায় যে সৌদি প্রতিষ্ঠানগুলো আজওয়ার সম্ভাব্য ঔষধি বৈশিষ্ট্য নিয়ে সরাসরি গবেষণা অর্থায়ন করেছে। [17]

তাই এখানে সমালোচনাটি “মুসলিম গবেষক গবেষণা করেছেন, অতএব গবেষণা বাতিল”—এত সস্তা নয়। বরং বিপরীতভাবে, গবেষণার ফলাফল যতটুকু প্রমাণ করে ততটুকু সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করেও ধর্মীয় দাবিটি প্রত্যাখ্যান করা যায়। আজওয়ায় antioxidant থাকতে পারে, নির্দিষ্ট experimental toxicity model-এ tissue injury কমাতেও পারে, ভবিষ্যতে তার কোনো pharmacologically useful compound আবিষ্কৃতও হতে পারে। এর কোনোটিই প্রমাণ করে না যে মুহাম্মদ অলৌকিকভাবে জানতেন সকালে সাতটি আজওয়া খেলে সেদিন কোনো বিষ ক্ষতি করতে পারবে না।

বরং এসব গবেষণার একটি অংশ থেকে যা স্পষ্টভাবে দেখা যায় তা হলো—ধর্মীয় বক্তব্য আগে থেকেই গবেষণার বিষয় নির্বাচন করছে, কখনো এমনকি “সাতটি খেজুর”-এর ধর্মীয় সংখ্যাও experimental dose নির্ধারণে প্রবেশ করছে, আর একটি সৌদি গবেষণা চেয়ার প্রকাশ্যেই নিজের কাজের নাম দিয়েছে “Scientific Miracles of Prophetic Medicine”। এরপর ইঁদুরের oxidative stress marker-এর সীমিত পরিবর্তনকে হাদিসের অসীম দাবির পাশে বসিয়ে দিলে সেটি বিজ্ঞান হয়ে যায় না।

বিজ্ঞান কোনো ধর্মগ্রন্থের বক্তব্যকে সত্য প্রমাণ করার যন্ত্র নয়। বিজ্ঞান এমন পদ্ধতি যেখানে প্রিয়তম বিশ্বাসটিকেও ভুল প্রমাণিত হওয়ার পূর্ণ সুযোগ দিতে হয়। যে অনুসন্ধানের শুরুতেই লক্ষ্য নির্ধারিত—“নববী চিকিৎসার বৈজ্ঞানিক অলৌকিকতা” খুঁজতে হবে—সেখানে পাওয়া ইতিবাচক ফলকে দ্বিগুণ সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। আর আজওয়া-বিষের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্যটি হলো: এত গবেষণা, এত ইঁদুর, এত extract, এত biochemical marker এবং এত ধর্মীয় উৎসাহের পরও কেউ এখনো হাদিসে বলা আসল দাবিটি প্রমাণ করতে পারেনি—সকালে সাতটি আজওয়া খেলে মানুষ সেদিন বিষের ক্ষতি থেকে রক্ষা পায়।


নববী চিকিৎসা (Prophetic Medicine) ও বৈজ্ঞানিক চিকিৎসার পার্থক্য

ইসলামী ঐতিহ্যে “তিব্বে নববী” বা নববী চিকিৎসা নামে পরিচিত যেই ধারণা রয়েছে, যেখানে নবী মুহাম্মদের বিভিন্ন খাদ্যাভ্যাস, ভেষজ ব্যবহার বা চিকিৎসা সংক্রান্ত পরামর্শকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু ইতিহাসবিদ ও চিকিৎসা ইতিহাসের গবেষকরা দেখিয়েছেন যে এই ধারণাটি মূলত মধ্যযুগীয় ইসলামী সমাজে গড়ে ওঠা একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যা তৎকালীন আরব, পারস্য ও গ্রিক চিকিৎসা জ্ঞানের মিশ্রণে তৈরি হয়েছিল [18]। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এর সম্পূর্ণ বিপরীত একটি পদ্ধতি অনুসরণ করে। এখানে কোনো চিকিৎসা পদ্ধতি বা ওষুধ গ্রহণযোগ্য হতে হলে তা পরীক্ষাগার গবেষণা, প্রাণী পরীক্ষণ, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এবং পরিসংখ্যানগত যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসাবিজ্ঞান (Evidence-based medicine) এমন কোনো দাবিকে গ্রহণ করে না যা পরীক্ষাযোগ্য নয় বা পুনরাবৃত্ত পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়নি [19].

এই প্রেক্ষাপটে সাতটি খেজুর খাওয়ার মাধ্যমে বিষক্রিয়া প্রতিরোধের দাবি একটি ধর্মীয় ঐতিহ্য বা বিশ্বাস হিসেবে থাকতে পারে, কিন্তু বৈজ্ঞানিক চিকিৎসার মানদণ্ডে তা কোনো পরীক্ষিত বা গ্রহণযোগ্য চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হয় না।


খাইবারের বিষপ্রয়োগের ঘটনা ও একটি ঐতিহাসিক সংশয়

ইসলামী ঐতিহাসিক সূত্রে একটি সুপরিচিত ঘটনা রয়েছে যেখানে খাইবার অভিযানের সময় এক ইহুদি নারী নবী মুহাম্মদকে বিষমিশ্রিত মাংস খেতে দেন। বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি সেই খাবারের স্বাদ গ্রহণ করার পর বিষক্রিয়ার প্রভাব অনুভব করেন এবং পরবর্তীতে বহু বছর পরে মৃত্যুর সময়ও সেই বিষের প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছিলেন [20]

এই ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ যৌক্তিক প্রশ্ন উত্থাপন করে। যদি সত্যিই সকালে সাতটি খেজুর খাওয়ার মাধ্যমে বিষক্রিয়া থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায়, তবে এমন বিষপ্রয়োগে তার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা নয়, যেহেতু তিনি বিষের প্রতিষেধক সম্পর্কে জানেন। তিনি তার চিকিৎসার অনেক ধরণের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন বলে হাদিসগুলো থেকে জানা যায়। এই পরিস্থিতিতে অন্তত দুইটি সম্ভাবনা সামনে আসে। প্রথমত, হাদিসটিতে যে দাবিটি করা হয়েছে তা বাস্তব জগতের জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে অজ্ঞতা থেকে উদ্ভূত একটি অতিরঞ্জিত ধারণা। দ্বিতীয়ত, এই ধরনের বর্ণনা পরবর্তীকালে নবীকে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে উপস্থাপনের উদ্দেশ্যে ধর্মীয় ঐতিহ্যের ভেতরে প্রচারিত হয়ে থাকতে পারে, যার ঐতিহাসিক নির্ভরযোগ্যতা প্রশ্নসাপেক্ষ।

ধর্মীয় ঐতিহ্যের ইতিহাসে এই ধরনের অসঙ্গতি অস্বাভাবিক নয়। বহু ক্ষেত্রেই দেখা যায়, পরবর্তী প্রজন্মের বিশ্বাস, ভক্তি বা অলৌকিকতার ধারণা বাস্তব ঐতিহাসিক ঘটনাকে নতুন ব্যাখ্যা বা অতিরঞ্জনের মাধ্যমে পুনর্গঠন করে। ফলে ঐতিহাসিক ঘটনা এবং পরবর্তী ধর্মীয় বর্ণনার মধ্যে একটি সুস্পষ্ট অসামঞ্জস্য তৈরি হয়।


লজিক্যাল চ্যালেঞ্জঃ বিশ্বাস বনাম বাস্তবতা

একটি কৌতুহলোদ্দীপক পর্যবেক্ষণ হলো, যে সমস্ত মুসলিম ধর্মীয় বক্তা বা অনুসারীরা এই হাদিসকে ধ্রুব সত্য বলে প্রচার করেন, তাদের কাউকেই আজ পর্যন্ত সাতটি খেজুর খেয়ে জনসমক্ষে বিষ পান করার সাহস দেখাতে দেখা যায়নি। যদি আসলেই এই হাদিসগুলো সত্য হতো, তাহলে তো প্রায় প্রতিদিনই মুসলিমরা বিভিন্ন বিতর্কে, ওয়াজে, সভা সেমিনারে এই ঘটনা দেখিয়ে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিতো। সেক্ষেত্রে তো আসলে আক্রমণাত্মক জিহাদ কিংবা জোরপুর্বক ইসইলাম গ্রহণে বাধ্য করারও প্রয়োজন ফুরিয়ে যেতো। সারা পৃথিবীতেই বিনা বাধায় ইসলামের হুকুমত প্রতিষ্ঠা পেয়ে যেতো।

🧠

সংজ্ঞাতাত্ত্বিক বিরোধ (Cognitive Dissonance): মুখে তারা হাদিসকে সত্য বললেও, তাদের অবচেতন মন এবং যুক্তি জানে যে জীবন ও মৃত্যুর এই খেলায় খেজুর কোনো সুরক্ষা দেবে না। পটাশিয়াম সায়ানাইডের মতো প্রাণঘাতী বিষের সামনে তারা কখনোই নিজেদের ‘নবীর বাণীর’ সত্যতা যাচাই করতে রাজি হবেন না।

⚖️

যুক্তির হার: যদি কোনো বিশ্বাসী মনে করেন যে এটি কেবল ‘আজওয়া’ খেজুরের ক্ষেত্রেই কার্যকর, তবে প্রশ্ন জাগে—অন্যান্য প্রজাতির খেজুরের পুষ্টিগুণ প্রায় সমান হওয়া সত্ত্বেও কেন কেবল একটি নির্দিষ্ট প্রকারের খেজুরের ওপর এমন অতিপ্রাকৃত গুণের আরোপ করা হলো? এটি মূলত একটি ধর্মীয় মিথকে বিজ্ঞানের মোড়কে পরিবেশন করার ব্যর্থ চেষ্টা মাত্র।


“বিলুপ্ত খেজুর” তত্ত্বঃ একটি আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিক জালিয়াতি

যখন আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করে দিচ্ছে যে বর্তমানের কোনো খেজুরই বিষক্রিয়া ঠেকাতে সক্ষম নয়, তখন অনেক ইসলামিক অ্যাপোলোজিস্ট ‘মুভিং দ্য গোলপোস্ট’ (Moving the Goalposts) নামক কুযুক্তির আশ্রয় নেন। তাদের দাবি—মুহাম্মদ যে ‘আজওয়া’ খেজুরের কথা বলেছিলেন, সেটি ছিল বিশেষ এক বিরল জাতের খেজুর যা এখন পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং সেই বিলুপ্ত খেজুরেই নাকি বিষরোধী অলৌকিক গুণ ছিল। কিন্তু এই দাবিটি মূলত একটি বুদ্ধিবৃত্তিক জালিয়াতি এবং প্রমাণের অভাব ঢাকার অপচেষ্টা মাত্র।

এই দাবির অসারতা নিচের পয়েন্টগুলো থেকে স্পষ্ট হয়:

🌴

ঐতিহাসিক ও বোটানিক্যাল ধারাবাহিকতা: মদিনার আজওয়া খেজুর (Phoenix dactylifera L. cv. Ajwa) একটি সুনির্দিষ্ট এবং সুপরিচিত জাত, যা শত শত বছর ধরে একই ভৌগোলিক অঞ্চলে চাষ হয়ে আসছে। উদ্ভিদবিজ্ঞানে এমন কোনো প্রমাণ নেই যে, মাত্র ১৪০০ বছরের ব্যবধানে একটি ফল তার মৌলিক জৈব-রাসায়নিক গঠন (Biochemical composition) পরিবর্তন করে সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু হয়ে গেছে কিংবা তার কোনো ‘সুপার-অ্যান্টিটক্সিন’ গুণ হারিয়ে গেছে।

📜

সংরক্ষণের দাবি বনাম বিলুপ্তির অজুহাত: ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী কুরআন ও সুন্নাহ কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য পথপ্রদর্শক। যদি নবীর বাতলে দেওয়া একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ‘অলৌকিক প্রতিষেধক’ পৃথিবী থেকে হারিয়েই গিয়ে থাকে, তবে সেই হাদিসটি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সম্পূর্ণ অর্থহীন এবং অকেজো হয়ে পড়ে। এটি ইসলামি ‘হেফাজত’ বা সংরক্ষণের ধারণার সাথেও সরাসরি সাংঘর্ষিক।

🎭

জালিয়াতির নমুনা: অ্যাপোলোজিস্টরা যখনই কোনো বৈজ্ঞানিক ভুল ধরা খান, তখনই তারা দাবির সংজ্ঞা বদলে দেন (Post-hoc justification)। যদি আজওয়া খেজুর বিষ ঠেকাতে না পারে, তবে তারা বলেন ‘সেই আজওয়া বিলুপ্ত হয়েছে’। যদি সত্যি এমন কোনো ‘সুপার-খেজুর’ থাকতো যা পটাশিয়াম সায়ানাইডের (KCN) মতো বিষকে রুখে দিতে পারে, তবে তার রাসায়নিক গঠন হতো অবিশ্বাস্য রকমের জটিল এবং কোনো না কোনোভাবে তার ঐতিহাসিক বা প্রত্নতাত্ত্বিক চিহ্ন পাওয়া যেত।


উপসংহারঃ অলৌকিকতা থেকে যুক্তির পথে

সাতটি খেজুর খেয়ে বিষক্রিয়া থেকে মুক্ত থাকা যাবে—এমন প্রচার করা কেবল বৈজ্ঞানিক সত্যের অপলাপই নয়, বরং এটি মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিকে চরমভাবে অবমাননা করা। এই ধরনের কুসংস্কার প্রচার করা জনস্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে; কারণ কোনো বিপন্ন মানুষ বৈজ্ঞানিক চিকিৎসার বদলে খেজুরের মতো অকার্যকর উপায়ের ওপর নির্ভর করে প্রাণ হারাতে পারে।

ধর্মীয় গ্রন্থ বা বাণীর প্রতি অন্ধ আনুগত্য যখন পর্যবেক্ষণযোগ্য বিজ্ঞান ও যুক্তির সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তখন যুক্তিকেই অগ্রাধিকার দেওয়া প্রগতিশীল সমাজের লক্ষণ। খেজুরকে কেবল একটি পুষ্টিকর ফল হিসেবে গ্রহণ করাই যুক্তিসঙ্গত, বিষের অলৌকিক রক্ষাকবচ হিসেবে নয়। অন্ধবিশ্বাস মানুষকে কুসংস্কারে আচ্ছন্ন রাখে, আর বিজ্ঞান ও যুক্তি মানুষকে দেয় মুক্তির পথ।


তথ্যসূত্রঃ
  1. সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৬০৭ ↩︎
  2. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৫৪৪৫ ↩︎
  3. সুনান আত তিরমিজী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২০৭২ ↩︎
  4. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫৪ ↩︎
  5. Sahih-al-bukhari, English, Vol-7 ↩︎
  6. Agency for Toxic Substances and Disease Registry, Cyanide Toxicity ↩︎
  7. Casarett & Doull’s Toxicology: The Basic Science of Poisons ↩︎
  8. Sheikh et al., Ajwa Dates as a Protective Agent Against Liver Toxicity in Rat, European Scientific Journal, 2014 ↩︎
  9. Sheikh et al., Comparative study of neuropharmacological, analgesic properties and phenolic profile of Ajwah, Safawy and Sukkari cultivars of date palm, 2016 ↩︎
  10. মূল গবেষণাপত্র ↩︎
  11. Abdu, Ameliorative Influence of Ajwa Dates on Ochratoxin A-Induced Testis Toxicity, Journal of Microscopy and Ultrastructure, 2018 ↩︎
  12. পূর্ণ গবেষণাপত্র ↩︎
  13. Aljuhani et al., Protective effects of Ajwa date extract against tissue damage induced by acute diclofenac toxicity, 2019 ↩︎
  14. একই গবেষণার পূর্ণপাঠ ↩︎
  15. Source of funding—Aljuhani et al., 2019 ↩︎
  16. Sheikh et al., 2016 ↩︎
  17. Khan et al., Ajwa Date Extract Inhibits Human Breast Adenocarcinoma (MCF7) Cells In Vitro, PLOS ONE, 2016 ↩︎
  18. Manfred Ullmann, Islamic Medicine ↩︎
  19. David Sackett, Evidence-Based Medicine ↩︎
  20. নবী মুহাম্মদের করুণ মৃত্যু ↩︎

Leave a comment

Your email will not be published.