Knowledge Base Article

মসজিদে বাচ্চা পেটাতো উমর

প্রকাশিত: মে 10, 2024 · লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন · 12 মিনিট পড়া

সারসংক্ষেপ

শিশুরা স্বভাবগতভাবেই কৌতূহলী, চঞ্চল এবং খেলাপ্রবণ। তারা প্রাপ্তবয়স্কদের মতো দীর্ঘ সময় নীরব থাকা, কঠোর আনুষ্ঠানিক নিয়ম বুঝে চলা কিংবা কোনো স্থানের ধর্মীয় পবিত্রতা সম্পর্কে একই ধরনের বিমূর্ত ধারণা ধারণ করার ক্ষমতা নিয়ে জন্মায় না। আধুনিক বিকাশবিজ্ঞান বরং দেখায়, খেলাধুলা, অনুসন্ধান, নড়াচড়া, সামাজিক মিথস্ক্রিয়া এবং পরিবেশ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়েই শিশুর মস্তিষ্ক, সামাজিক দক্ষতা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বিকশিত হয়। অথচ তাফসীরে ইবনে কাসীরের বাংলা সংস্করণে উদ্ধৃত একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, উমর ইবনুল খাত্তাব মসজিদে কোনো শিশুকে খেলতে দেখলে লাঠি দিয়ে প্রহার করতেন এবং পরে তাকে বের করে দিতেন। এখানে সমস্যাটি শুধু বহু শতাব্দী আগের একজন মানুষের রূঢ় আচরণ নয়। সমস্যা আরও গভীর, কারণ এই মানুষটিকে ইসলামি সংস্কৃতিতে ন্যায়পরায়ণ শাসক ও অনুসরণীয় আদর্শ হিসেবে মহিমান্বিত করা হয়, অথচ শিশুদের প্রতি তার নামে প্রচারিত এমন আচরণও ধর্মীয় সাহিত্যে প্রায় সমালোচনাহীনভাবে স্থান পায়। আধুনিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের আলোকে শিশুকে তার স্বাভাবিক বিকাশগত আচরণের জন্য আঘাত করা কোনো মহৎ শৃঙ্খলা নয়; এটি শক্তিশালী প্রাপ্তবয়স্কের হাতে দুর্বল শিশুর ওপর শারীরিক বলপ্রয়োগ। ধর্মীয় চরিত্রের প্রতি শ্রদ্ধা এই সহজ নৈতিক সত্যকে বদলে দিতে পারে না।


ভূমিকা

একটি শিশুকে বিচার করার সময় প্রথম যে সত্যটি মনে রাখা প্রয়োজন তা হলো, শিশু কোনো ক্ষুদ্রাকৃতির প্রাপ্তবয়স্ক নয়। তার মস্তিষ্ক, আত্মনিয়ন্ত্রণ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা এবং সামাজিক নিয়ম বোঝার সামর্থ্য ধীরে ধীরে বিকশিত হয়। একটি শিশু মসজিদ, মন্দির, গির্জা, স্কুল কিংবা কোনো আনুষ্ঠানিক স্থানে গিয়ে নড়াচড়া করবে, কথা বলবে, কিছু নিয়ে খেলবে বা কৌতূহলী আচরণ করবে, এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। সমস্যা শিশুর মধ্যে নয়; সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন প্রাপ্তবয়স্করা নিজেদের তৈরি কঠোর সামাজিক বা ধর্মীয় নিয়ম শিশুর ওপর চাপিয়ে দিয়ে সেই বয়সের স্বাভাবিক আচরণকেই অপরাধ হিসেবে গণ্য করে এবং তা দমনের জন্য ভয়, অপমান বা শারীরিক আঘাত ব্যবহার করে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে উমর ইবনুল খাত্তাব সম্পর্কে তাফসীরে ইবনে কাসীরে উদ্ধৃত একটি বর্ণনা বিশেষভাবে সমালোচনার দাবি রাখে। সেখানে বলা হয়েছে, মসজিদে শিশুদের স্বভাবগত খেলাধুলার কারণে তাদের উপস্থিতি অনাকাঙ্ক্ষিত বিবেচনা করা হতো এবং উমর কোনো শিশুকে মসজিদে খেলতে দেখলে তাকে লাঠি দিয়ে প্রহার করতেন। ঘটনাটিকে সপ্তম শতাব্দীর সামাজিক প্রেক্ষাপট বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ অবশ্যই আছে, কিন্তু একই সঙ্গে উমরকে যখন বর্তমান যুগেও আদর্শ শাসক, নৈতিকতার মডেল ও অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে হাজির করা হয়, তখন তার নামে প্রচারিত আচরণগুলোও আধুনিক নৈতিক ও বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডে বিচারযোগ্য হয়ে ওঠে। কোনো কাজ পুরোনো বলে সমালোচনার ঊর্ধ্বে যায় না, আর কোনো ব্যক্তি ধর্মীয়ভাবে সম্মানিত বলে তার হাতে শিশুকে মারধর নৈতিক আচরণে পরিণত হয় না।

তাফসীরে ইবনে কাসীরের বর্ণনা: খেলাধুলার জন্য শিশুকে লাঠিপেটা

তাফসীরে ইবনে কাসীরের ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রকাশিত বাংলা অনুবাদের অষ্টম খণ্ডে মসজিদের আচরণবিধি আলোচনা করতে গিয়ে শিশুদের প্রসঙ্গে যে বক্তব্যটি উদ্ধৃত হয়েছে, সেখানে সরাসরি বলা হয়েছে যে শিশুরা তাদের “স্বভাবগত কারণে” খেলাধুলা করে এবং উমর মসজিদে এমন শিশু দেখলে লাঠি দিয়ে প্রহার করতেন। অর্থাৎ একই অনুচ্ছেদের মধ্যেই শিশুর আচরণকে স্বভাবগত বলে স্বীকার করা হচ্ছে, আবার সেই স্বাভাবিক আচরণের জন্য শারীরিক শাস্তিকেও স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। [1]

“মসজিদ এই জন্যই নির্মাণ করা হয় নাই বরং উহাতে কেবল আল্লাহ্ যিকির ও সালাত পড়িবার উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হইয়াছে”। ইহার পর উহার উপরে এক ঢোল পানি ঢালিয়া দেওয়ার জন্য তিনি হুকুম করিলেন। দ্বিতীয় হাদীসে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বাচ্চাদিগকে মসজিদে আনিতে নিষেধ করিয়াছেন। কারণ, তাহারা মসজিদে আসিয়া তাহাদের স্বভাবগত কারণে খেলাধুলা শুরু করে। যাহা মসজিদে শোভনীয় নহে। হযরত উমর (রা) মসজিদে কোন বাচ্চাকে খেলিতে দেখিলে উহাকে হাল্কা লাঠি দিয়া প্রহার করিতেন এবং উহার পরে কাহাকে মসজিদে দেখিলে তাহাকে বাহির করিয়া দিতেন। পাগলকেও মসজিদে আনিতে নিষেধ করা হইয়াছে। কারণ সে জ্ঞান শূন্য। অতএব সে মসজিদে যে কোন দুর্ঘটনা ঘটাইত পারে। যেহেতু মানুষ তাহাদের সহিত উপহাস করে উহাতে মসজিদের মর্যাদা ক্ষুন্ন হয়। মসজিদে বিচারকার্য পরিচালনা করাও উচিৎ নহে। এই কারণে বহু উলামায়ে কিরাম অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন যে, হাকিম ও বিচারক মসজিদে বিচারানুষ্ঠান করিবে না। বিচারের জন্য ভিন্ন কোন স্থান নির্ধারিণ করিবে। কারণ বিচার কার্যের সময় একদিকে যেমন ঝগড়া হইয়া থাকে অপরদিকে এমন কথাবার্তা ও হইয়া থাকে যাহা মসজিদে শোভনীয় নহে।”

বাচ্চা

এই বক্তব্যের ভাষাগত কাঠামোটিই লক্ষণীয়। শিশুর খেলাধুলাকে এখানে ইচ্ছাকৃত অবাধ্যতা বলা হয়নি; বরং “তাহাদের স্বভাবগত কারণে” তারা খেলাধুলা করে বলে স্বীকার করা হয়েছে। তারপরও সমাধান হিসেবে এসেছে লাঠি। আধুনিক শিশু বিকাশ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান থেকে দেখলে এটি বিশেষভাবে সমস্যাজনক। কারণ যে আচরণ শিশুর বয়স ও বিকাশের স্বাভাবিক ফল, সেটিকে আঘাতের মাধ্যমে বন্ধ করার অর্থ শিশুকে এমন একটি ক্ষমতা প্রদর্শন করতে বাধ্য করা যা তার মস্তিষ্ক এখনো পুরোপুরি অর্জনই করেনি। শিশু কেন প্রাপ্তবয়স্কের মতো আচরণ করছে না, এই অভিযোগের মধ্যে আসলে শিশুর ব্যর্থতার চেয়ে প্রাপ্তবয়স্কের অজ্ঞতাই বেশি প্রকাশ পায়।

খেলাধুলা কোনো তুচ্ছ বিনোদন নয়, শিশুর বিকাশের মৌলিক প্রক্রিয়া

আধুনিক বিকাশবিজ্ঞানে খেলাকে শিশুর সময় নষ্ট করা বা নিছক দুষ্টুমি হিসেবে দেখা হয় না। American Academy of Pediatrics-এর Pediatrics জার্নালে প্রকাশিত একটি গুরুত্বপূর্ণ clinical report-এ Michael Yogman ও সহকর্মীরা দেখিয়েছেন যে বয়সোপযোগী খেলা শিশুর সামাজিক ও আবেগগত দক্ষতা, ভাষা, জ্ঞানীয় ক্ষমতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং executive functioning বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। খেলার সময় শিশু নিয়ম আবিষ্কার করে, অন্য মানুষের প্রতিক্রিয়া বোঝে, সমস্যা সমাধানের কৌশল শেখে, নিজের শরীরের সীমা পরীক্ষা করে এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণ অনুশীলন করে। অর্থাৎ যে চঞ্চলতা ও অনুসন্ধিৎসাকে অনেক কর্তৃত্ববাদী প্রাপ্তবয়স্ক “বেয়াদবি” বা “অশৃঙ্খলা” মনে করেন, তার বড় অংশই আসলে স্বাভাবিক neurodevelopment-এর প্রকাশ। [2]

এখানেই উমরের নামে বর্ণিত আচরণের মৌলিক অসঙ্গতি স্পষ্ট হয়। একটি ধর্মীয় স্থানের নীরবতা রক্ষার প্রয়োজন থাকতে পারে, শিশুকে উপযুক্ত আচরণ শেখানোর প্রয়োজনও থাকতে পারে; কিন্তু সেখান থেকে শিশুকে লাঠি দিয়ে মারার কোনো যৌক্তিক প্রয়োজন তৈরি হয় না। একটি সভ্য শৃঙ্খলা-পদ্ধতি শিশুর বয়স বুঝে তাকে শেখায়, পরিবেশ পরিবর্তন করে, দায়িত্বশীল প্রাপ্তবয়স্কের তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করে কিংবা প্রয়োজন হলে শান্তভাবে স্থান থেকে সরিয়ে নেয়। লাঠি ব্যবহার শেখানোর পদ্ধতি নয়; এটি ক্ষমতা প্রয়োগের সবচেয়ে আদিম শর্টকাটগুলোর একটি। প্রাপ্তবয়স্ক যখন ব্যাখ্যা, ধৈর্য ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার বদলে আঘাত ব্যবহার করে, তখন সে শিশুকে নৈতিকতার চেয়ে একটি সরল রাজনৈতিক শিক্ষা বেশি কার্যকরভাবে দেয়: যার হাতে শক্তি আছে, তার নির্দেশ অমান্য করলে সে তোমাকে ব্যথা দিতে পারে।

“হালকা লাঠি” বললেই আঘাত নিরীহ হয়ে যায় না

ধর্মীয় সহিংসতার বর্ণনায় একটি পরিচিত ভাষাগত কৌশল হলো আঘাতের আগে “হালকা” শব্দ বসিয়ে তাকে নৈতিকভাবে নিরীহ করে তোলা। কিন্তু আধুনিক child-health literature-এ corporal punishment-এর মূল সংজ্ঞাই হলো শাস্তির উদ্দেশ্যে শারীরিক বল প্রয়োগ করে কোনো মাত্রার ব্যথা বা অস্বস্তি সৃষ্টি করা। অর্থাৎ “হালকা করে মারা” শারীরিক শাস্তির বিপরীত কিছু নয়; সেটিও শারীরিক শাস্তি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও corporal punishment-কে এমন শাস্তি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে যেখানে শারীরিক শক্তি ব্যবহার করে কোনো মাত্রার ব্যথা বা অস্বস্তি সৃষ্টি করা হয়, তা যত সামান্যই বলা হোক না কেন। তাই “হাড় ভাঙেনি”, “রক্ত বের হয়নি”, “হালকা লাঠি ছিল” জাতীয় যুক্তি মূল নৈতিক প্রশ্নটির উত্তর নয়। প্রশ্ন হলো, একজন শক্তিশালী প্রাপ্তবয়স্ক কি নিজের ধর্মীয় বা প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য একটি শিশুর শরীরে ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করার অধিকার রাখে? আধুনিক শিশু অধিকার ও জনস্বাস্থ্যবিজ্ঞানের উত্তর পরিষ্কারভাবে নেতিবাচক। [3]

২০১৬ সালে Elizabeth Gershoff ও Andrew Grogan-Kaylor পাঁচ দশকের গবেষণা নিয়ে যে বড় মেটা-অ্যানালাইসিস প্রকাশ করেন, সেখানে ৭৫টি গবেষণার ১১১টি effect size এবং মোট ১৬০,৯২৭ শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণাটি ইচ্ছাকৃতভাবে গুরুতর physical abuse থেকে spanking-কে আলাদা করে পরীক্ষা করেছিল, ফলে “গবেষণায় তো ভয়াবহ নির্যাতনও ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে” ধরনের আপত্তির সুযোগও কমে যায়। ফলাফল ছিল অত্যন্ত অস্বস্তিকর: spanking শিশুদের জন্য প্রত্যাশিত ইতিবাচক ফলের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল না; বরং aggression, antisocial behaviour, mental-health difficulties, parent-child relationship-এর অবনতি এবং পরবর্তী জীবনে শারীরিক শাস্তির প্রতি ইতিবাচক মনোভাবসহ একাধিক ক্ষতিকর ফলাফলের সঙ্গে সম্পর্ক পাওয়া যায়। [4]

আরও শক্তিশালী প্রমাণ আসে ২০২১ সালে The Lancet-এ প্রকাশিত Anja Heilmann ও সহকর্মীদের পর্যালোচনা থেকে। তারা ৬৯টি prospective longitudinal study বিশ্লেষণ করেন, অর্থাৎ শুধু একই সময়ে শাস্তি ও সমস্যার মধ্যে সম্পর্ক দেখেননি; সময়ের সঙ্গে শিশুদের অনুসরণ করা গবেষণাগুলোকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাদের পর্যালোচনায় শারীরিক শাস্তি ধারাবাহিকভাবে পরবর্তী আচরণগত সমস্যার বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে, কোনো ইতিবাচক দীর্ঘমেয়াদি ফলের প্রমাণ দেয়নি, এবং কিছু গবেষণায় dose-response সম্পর্কও দেখা গেছে, অর্থাৎ শাস্তির মাত্রা বা পুনরাবৃত্তি বাড়লে ক্ষতিকর ফলের ঝুঁকিও বেড়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, quasi-experimental গবেষণাতেও শারীরিক শাস্তির পরে আচরণের উন্নতির বদলে অবনতির দিকেই ফল গেছে। [5]

লাঠি শিশুকে নৈতিকতা শেখায় না, ভয় শেখায়

শারীরিক শাস্তির সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তিগুলোর একটি হলো তাৎক্ষণিক আনুগত্যকে শিক্ষা বলে ধরে নেওয়া। কাউকে আঘাত করলে সে মুহূর্তের জন্য কোনো আচরণ বন্ধ করতে পারে। বন্দুক দেখিয়েও মানুষকে থামানো যায়। কিন্তু আচরণ থামানো এবং নৈতিক শিক্ষা একই বিষয় নয়। একটি শিশু কেন নির্দিষ্ট আচরণ করা উচিত নয়, অন্য মানুষের প্রয়োজন কী, কোনো সামাজিক নিয়ম কেন রয়েছে এবং নিজের আচরণ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, এসব শেখার জন্য ব্যাখ্যা, পুনরাবৃত্তি, অনুশীলন, modelling এবং বয়সোপযোগী boundary দরকার। লাঠি এই জটিল শেখার প্রক্রিয়ার জায়গায় একটি সহজ association তৈরি করে: কর্তৃত্বশালী মানুষ উপস্থিত থাকলে অবাধ্যতার ফল ব্যথা। ফলে শিশুটি নিয়মটির যৌক্তিকতা বোঝার বদলে শাস্তিদাতাকে ভয় করতে শেখে।

American Academy of Pediatrics তাই শারীরিক শাস্তির পরিবর্তে positive reinforcement, স্পষ্ট সীমারেখা, আচরণের যৌক্তিক পরিণতি এবং বয়সোপযোগী discipline ব্যবহারের সুপারিশ করে। তাদের policy statement-এ শারীরিক শাস্তিকে নেতিবাচক behavioural, cognitive, psychosocial এবং emotional outcomes-এর বাড়তি ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। [6]

এমনকি স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণাও বিষয়টিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। ২০২১ সালে Child Development-এ প্রকাশিত একটি neuroimaging study-তে Jorge Cuartas ও সহকর্মীরা দেখেন, যেসব শিশু spanking-এর অভিজ্ঞতা জানিয়েছিল তারা fearful facial cues দেখার সময় মস্তিষ্কের threat-processing সংশ্লিষ্ট কয়েকটি অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে বেশি neural activation প্রদর্শন করেছে। গবেষকরা সতর্কতার সঙ্গে বলেছেন, এই ফলাফল থেকে এককভাবে সরাসরি কারণ প্রমাণ করা যায় না; কিন্তু pattern-টি অধিক গুরুতর maltreatment-এর ক্ষেত্রে দেখা altered threat processing-এর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। অর্থাৎ “একটু মারলে কিছু হয় না” কথাটি বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি মূলত প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা একটি সাংস্কৃতিক অনুমান। [7]

উমরকে আদর্শ বানালে তার লাঠিকেও প্রশ্ন করতে হবে

কেউ বলতে পারেন, সপ্তম শতাব্দীতে corporal punishment ছিল সাধারণ ব্যাপার, তাই উমরের আচরণকে সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে। ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে প্রেক্ষাপট অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই যুক্তি দিয়ে আধুনিক যুগে উমরকে নৈতিক আদর্শ হিসেবে প্রচার করা এবং একই সঙ্গে তার আচরণকে ঐতিহাসিকতার আড়ালে সমালোচনার বাইরে রাখা যায় না। যদি তিনি কেবল অতীতের একজন রাজনৈতিক শাসক হন, তাহলে তার ভালো-মন্দ কাজ অন্য ঐতিহাসিক শাসকদের মতোই সমালোচিত হবে। আর যদি দাবি করা হয় তার জীবন বর্তমান মুসলিমদের জন্য বিশেষভাবে অনুকরণীয় নৈতিক আদর্শ, তাহলে সেই দাবির সঙ্গেই তার আচরণের কঠোর নৈতিক পরীক্ষা অবধারিতভাবে আসে। একই ব্যক্তিকে প্রয়োজনমতো “সর্বকালের আদর্শ” এবং সমালোচনার সময় “সপ্তম শতাব্দীর মানুষ” বানানো একটি সুবিধাবাদী দ্বৈত মানদণ্ড।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ক্ষমতাবান ব্যক্তির হাতে লাঠি এখানে নিছক ব্যক্তিগত রাগের প্রতীক নয়; এটি কর্তৃত্বের প্রতীক। উমরের ‘দুররা’ বা লাঠির ব্যবহার নিয়ে ইসলামি ঐতিহাসিক সাহিত্যে অসংখ্য বর্ণনা পাওয়া যায় এবং পরবর্তী জনপ্রিয় ধর্মীয় সংস্কৃতিতে তার কঠোরতাকে প্রায়ই ন্যায়বিচার ও প্রশাসনিক দৃঢ়তার অংশ হিসেবে রোমান্টিক করা হয়েছে। কিন্তু একজন শাসকের দৃঢ়তা আর দুর্বল মানুষের শরীরে আঘাত করার ক্ষমতা একই গুণ নয়। বিশেষ করে শিশুর ক্ষেত্রে ক্ষমতার ভারসাম্য এতটাই অসম যে “শৃঙ্খলা” শব্দটি সহজেই সহিংসতাকে আড়াল করতে পারে। একটি শিশু পাল্টা আঘাত করতে পারে না, রাজনৈতিক প্রতিবাদ করতে পারে না, নিজের অধিকার নিয়ে আইনি লড়াই করতে পারে না। এই অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাকে ব্যথা দেওয়া ন্যায়বিচারের প্রকাশ নয়, বরং ক্ষমতার সবচেয়ে সস্তা প্রয়োগ।

ইসলামি বর্ণনার মধ্যেই শিশু ও মসজিদ নিয়ে ভিন্ন চিত্র

আরও অস্বস্তিকর বিষয় হলো, ইসলামি উৎসগুলোর মধ্যেই শিশুদের মসজিদে উপস্থিতি সম্পর্কে এমন বর্ণনা রয়েছে যা শিশু দেখলেই কঠোরভাবে তাড়িয়ে দেওয়া বা মারধরের ধারণার সঙ্গে সহজে মেলে না। সহিহ বুখারির একটি বর্ণনায় মুহাম্মদ নামাজের সময় একটি শিশুর কান্না শুনে নামাজ সংক্ষিপ্ত করার কথা বলেছেন, যাতে শিশুটির মা কষ্ট না পান। আরেক বর্ণনায় তাকে নিজের নাতনি উমামাকে কাঁধে নিয়ে নামাজ আদায় করতে দেখা যায়; দাঁড়ানোর সময় তাকে তুলে নিতেন এবং সিজদার সময় নামিয়ে রাখতেন। [8]

এই বর্ণনাগুলো অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করে: শিশু মসজিদে থাকবে, কাঁদবে, নড়াচড়া করবে, এমন বাস্তবতা ইসলামি ঐতিহ্যের কাছেও অজানা ছিল না। ফলে মসজিদের পবিত্রতা রক্ষার জন্য খেলতে থাকা শিশুকে লাঠি দিয়ে মারাই যেন একমাত্র স্বাভাবিক বা অনিবার্য ধর্মীয় প্রতিক্রিয়া, এমন দাবি টেকে না। একই ঐতিহ্যের মধ্যেই শিশুর উপস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার উদাহরণ রয়েছে। সে তুলনায় শিশুর স্বভাবগত চঞ্চলতার জবাব লাঠি দিয়ে দেওয়া আরও স্পষ্টভাবে একটি কর্তৃত্ববাদী disciplinary choice হিসেবে ধরা পড়ে।

বাংলাদেশে শিশু প্রহার: ঐতিহ্যগত “শৃঙ্খলা”র ভয়াবহ বাস্তবতা

এই আলোচনা শুধু সপ্তম শতাব্দীর কোনো ঘটনা নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক নয়। দক্ষিণ এশিয়া এবং বিশেষ করে বাংলাদেশে শিশুকে মেরে “মানুষ করা”, “শিক্ষা দেওয়া”, “আদব শেখানো” বা “শৃঙ্খলায় রাখা”র ধারণা এখনো ভয়াবহভাবে শক্তিশালী। ২০১৯ সালের Bangladesh Multiple Indicator Cluster Survey-এর তথ্য ব্যবহার করে ২০২৫ সালে PLOS ONE-এ প্রকাশিত একটি nationally representative গবেষণায় ৭০,০২৭ শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে গবেষণার আগের এক মাসে প্রায় ৮৮.৮৪ শতাংশ শিশু কোনো না কোনো violent discipline-এর অভিজ্ঞতার মধ্যে ছিল, ৬৪.৫৯ শতাংশ physical punishment-এর শিকার হয়েছিল এবং ৮৬.৩৩ শতাংশ psychological aggression-এর অভিজ্ঞতা জানিয়েছিল। এই পরিসংখ্যান দেখায়, শিশুর ওপর সহিংসতাকে “শাসন” হিসেবে গ্রহণ করার সংস্কৃতি কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম নয়; এটি আমাদের সামাজিক বাস্তবতার গভীরে বসে আছে। [9]

একই গবেষণায় উদ্ধৃত বাংলাদেশের পূর্ববর্তী জরিপে দেখা গেছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ স্কুলে শারীরিক শাস্তিকে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার সুবিধাজনক বা কার্যকর পদ্ধতি বলে মনে করত। এই মানসিকতার সঙ্গে মাদ্রাসা, স্কুল, পরিবার এবং অন্যান্য কর্তৃত্বমূলক প্রতিষ্ঠানে শিশু মারধরের বাস্তবতাকে আলাদা করে দেখা কঠিন। এর অর্থ এই নয় যে উমরের একটি বর্ণনাই বাংলাদেশের মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতনের একমাত্র ঐতিহাসিক কারণ। বাস্তব সামাজিক আচরণের কারণ অনেক। কিন্তু ধর্মীয়ভাবে মহিমান্বিত ব্যক্তিত্বদের লাঠি হাতে শাস্তি দেওয়ার গল্প যখন শ্রদ্ধার সঙ্গে শেখানো হয় এবং সেই আচরণের নৈতিক সমালোচনা করা হয় না, তখন “মারধর করেও ভালো মানুষ হওয়া যায়” বা “শৃঙ্খলার জন্য আঘাত গ্রহণযোগ্য” এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। একটি সংস্কৃতি যাদের আদর্শ বানায়, তাদের আচরণ থেকেই সেই সংস্কৃতি ক্ষমতা, শাস্তি ও নৈতিকতার ভাষা নির্মাণ করে।

এই কারণেই মাদ্রাসায় কোনো শিক্ষক শিশুকে বেত দিয়ে মারলে ঘটনাটিকে শুধু “একজন খারাপ হুজুরের ব্যক্তিগত অপরাধ” বলে শেষ করা যথেষ্ট নয়। প্রশ্ন করতে হবে, শিশুকে আঘাত করে শিক্ষা দেওয়ার ধারণাটিই এত স্বাভাবিক হলো কীভাবে? কেন বেত, লাঠি, কান ধরে দাঁড় করানো, অপমান বা ভয় দেখানো বহু মানুষের কাছে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার বৈধ উপকরণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে? ধর্ম একমাত্র কারণ নয়, কিন্তু ধর্মীয় কর্তৃত্ববাদী ঐতিহ্যকে এই সংস্কৃতি থেকে দায়মুক্ত করারও কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। বিশেষত যখন ঐতিহ্যের ভেতরেই সম্মানিত ব্যক্তিদের হাতে এমন শাস্তিমূলক সহিংসতার বর্ণনা সংরক্ষিত এবং প্রচারিত হয়েছে, তখন সেই বর্ণনাগুলোর নৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলা সম্পূর্ণ বৈধ এবং প্রয়োজনীয়।

উপসংহার

একটি শিশুর স্বাভাবিক চঞ্চলতা কোনো নৈতিক অপরাধ নয়। মসজিদের মতো কোনো স্থানে নির্দিষ্ট আচরণের প্রয়োজন থাকলে সেই নিয়ম শেখানোর দায়িত্ব প্রাপ্তবয়স্কের, আর সেই দায়িত্ব পালনের জন্য শিশুকে আঘাত করার প্রয়োজন নেই। আধুনিক সমাজে আমরা জানি, ভয় দেখিয়ে সাময়িক আনুগত্য আদায় করা যায়, কিন্তু সুস্থ নৈতিকতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মানসিক বিকাশ গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন নিরাপত্তা, ব্যাখ্যা, ধৈর্য এবং বয়সোপযোগী সীমারেখা। লাঠি এসবের বিকল্প নয়।

তাফসীরে ইবনে কাসীরে উদ্ধৃত উমরের আচরণকে তাই ধর্মীয় শ্রদ্ধার চশমা খুলে সরাসরি বিচার করা প্রয়োজন। একটি শিশুকে খেলতে দেখে লাঠি দিয়ে আঘাত করা আজকের জ্ঞানে অমানবিক ও অগ্রহণযোগ্য আচরণ। উমর করেছেন বলে সেটি ন্যায়বিচার হয়ে যায় না, সাহাবির নামের পাশে সম্মানসূচক শব্দ বসালে আঘাতের ব্যথা কমে না, আর “হালকা” বিশেষণ যোগ করলেই শারীরিক সহিংসতা শিক্ষায় পরিণত হয় না। কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিকে সত্যিকার অর্থে বিচার করতে হলে তাকে বিশেষ নৈতিক ছাড় দেওয়া বন্ধ করতে হবে। যে মানদণ্ডে আজকের একজন শিক্ষককে শিশুকে লাঠি দিয়ে মারার জন্য নিন্দা করা হবে, একই মৌলিক নৈতিক মানদণ্ড অতীতের ধর্মীয় নায়কের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়া উচিত। অন্যথায় আমরা নৈতিকতার বিচার করছি না; আমরা কেবল ব্যক্তির পরিচয় দেখে সহিংসতার নাম বদলে দিচ্ছি।


তথ্যসূত্রঃ
  1. তাফসীরে ইবনে কাসীর, অষ্টম খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পৃষ্ঠা ১২৫ ↩︎
  2. Yogman M, Garner A, Hutchinson J, et al. The Power of Play: A Pediatric Role in Enhancing Development in Young Children. Pediatrics. 2018;142(3):e20182058. doi:10.1542/peds.2018-2058 ↩︎
  3. World Health Organization, Corporal Punishment of Children: The Public Health Impact, 2025; UN Committee on the Rights of the Child, General Comment No. 8, 2006 ↩︎
  4. Gershoff ET, Grogan-Kaylor A. Spanking and Child Outcomes: Old Controversies and New Meta-Analyses. Journal of Family Psychology. 2016;30(4):453–469. doi:10.1037/fam0000191 ↩︎
  5. Heilmann A, Mehay A, Watt RG, et al. Physical Punishment and Child Outcomes: A Narrative Review of Prospective Studies. The Lancet. 2021;398(10297):355–364. doi:10.1016/S0140-6736(21)00582-1 ↩︎
  6. Sege RD, Siegel BS. Effective Discipline to Raise Healthy Children. Pediatrics. 2018;142(6):e20183112. doi:10.1542/peds.2018-3112 ↩︎
  7. Cuartas J, Weissman DG, Sheridan MA, Lengua LJ, McLaughlin KA. Corporal Punishment and Elevated Neural Response to Threat in Children. Child Development. 2021;92(3):821–832. doi:10.1111/cdev.13565 ↩︎
  8. Sahih al-Bukhari 707, 710; Sahih al-Bukhari 5996; Sahih Muslim 543a–c ↩︎
  9. Mim RR, Masud MS. Prevalence and Determinants of Violent Disciplinary Practices for Children in Bangladesh: Evidence from a Nationally Representative Survey. PLOS ONE. 2025;20(8):e0329017. doi:10.1371/journal.pone.0329017 ↩︎

Leave a comment

Your email will not be published.