Knowledge Base Article

ইসলামে পানি বিক্রি করা সম্পূর্ণ হারাম

প্রকাশিত: জানুয়ারি 17, 2025 · লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন · 3 মিনিট পড়া

ভূমিকা

বর্তমান বিশ্বে পানি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়েছে, যার কারণে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বোতলজাত বা প্রক্রিয়াজাত পানি বাজারজাত করছে। এমনকি প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ দেশ, যেমন সৌদি আরবেও, পানির বাণিজ্যিকীকরণ লক্ষ্য করা যায়—যা মূলত পানির স্বল্পতা, পরিশোধন ব্যয় এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে ইসলামে নবীর পরিষ্কার নির্দেশনা অনুযায়ী, পানির মতো প্রাকৃতিক সম্পদের বেচাকেনা সম্পর্কে কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞার উল্লেখ রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে একটি প্রশ্ন উঠে আসে: যদি এমন নিষেধাজ্ঞা বিদ্যমান থাকে, তাহলে আধুনিক সমাজে এর ব্যতিক্রম কেন দেখা যায়? এই বিষয়টি ব্যাখ্যার জন্য ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, শরীয়াহর ব্যাখ্যা এবং সমসাময়িক প্রয়োজনীয়তার মধ্যে সমন্বয় বিশ্লেষণ করা জরুরি।


ইসলামে পানির বিক্রয় সম্পূর্ণ হারাম বা নিষিদ্ধ

আজকাল অনেক কোম্পানিই পানি বিক্রি করে। শুধু যে কোম্পানিগুলোই পানি বিক্রি করে তাই নয়, পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্র জনগণকে পাণি সাপ্লাই দেয়, বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ করে। পৃথিবীর প্রতিটি সভ্য দেশে জনগণকে পানির বিল দিতে হয়। এমনকি, সৌদি আরবেও পানি বিক্রি করা হয়। কিন্তু পানি বিক্রি করা নবী নিষিদ্ধ করে গেছেন। যা নবী নিষিদ্ধ করে গেছেন, তা বর্তমান সময়ে উনারা কেন করেন, তা জানা যায় না।

সুনান আত তিরমিজী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৪/ ক্রয় বিক্রয়
পরিচ্ছেদঃ অতিরিক্ত পানি বিক্রি করা।
১২৭৪. কুতায়বা (রহঃ) …… ইয়াস ইবনু আবদ আল-মুযানী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পানি বিক্রয় করা নিষেধ করেছেন। – ইবনু মাজাহ ২৪৭৬, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ১২৭১ [আল মাদানী প্রকাশনী]
এই বিষয়ে জাবির, বুহায়সা তৎপিতার বরাতে, আবূ হুরায়রা, আয়েশা, আনাস ও আবদুল্লাহ্ ইবনু আমর রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকেও হাদীস বর্ণিত আছে। ইমাম আবূ ঈসা (রহঃ) বলেন, ইয়াস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসটি হাসান-সাহীহ। অধিকাংশ আলিম- এর অভিমত এই হাদীস অনুসারে। তারা পানি বিক্রি করা নাজায়িয বলেছেন। এ হলো ইবনু মুবারক, শাফিঈ, আহমাদ ও ইসহাক (রহঃ)-এর অভিমত। হাসান বাসরী (রহঃ) সহ কতক আলিম পানি বিক্রির অনুমতি দিয়েছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)


আপনি কী পানির বিল প্রদান করেন?

উপরোক্ত হাদিসের আলোকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে—আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় পানির যে সরবরাহ ব্যবস্থা বিদ্যমান, তার মূল্য পরিশোধ করে তা ব্যবহার করা হালালা নাকি হারাম? বর্তমান বিশ্বের প্রায় প্রতিটি উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে পানি সরবরাহ একটি রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এই ব্যবস্থায় পানিকে সংগ্রহ, পরিশোধন, সংরক্ষণ এবং ভোক্তার নিকট পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিশাল অবকাঠামো, প্রযুক্তি এবং জনবল ব্যবহৃত হয়। এর বিনিময়ে নাগরিকদের নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হয়, যা সাধারণভাবে ‘পানির বিল’ হিসেবে পরিচিত।

এই বাস্তবতাকে যদি হাদিসে বর্ণিত নিষেধাজ্ঞার সাথে সরাসরি তুলনা করা হয়, তাহলে এটি আপাতদৃষ্টিতে একটি দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে—কারণ এখানে পানির বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ করা হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন দেখা দেয়, এই ধরনের লেনদেন কি সরাসরি পানির মূল্য হিসেবে গণ্য হবে, নাকি এটি মূলত পানি সরবরাহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সেবা, অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনার খরচের প্রতিদান? এই পার্থক্যটি নির্ণয় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর উপর নির্ভর করে বিষয়টি শরীয়াহসম্মত নাকি নিষিদ্ধ—সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হতে পারে।


উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, পানি বিক্রয় সংক্রান্ত ইসলামি নিষেধাজ্ঞাটি একটি প্রাক-আধুনিক ও গোত্রভিত্তিক সমাজের জন্য প্রযোজ্য হলেও বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এটি সম্পূর্ণ অচল। আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনা এবং জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে পানির বাণিজ্যিকীকরণ এবং বিনিময় মূল্য নির্ধারণ অপরিহার্য। ধর্মীয় বিধান এবং সমসাময়িক বাস্তবতার এই সংঘাত প্রমাণ করে যে, জীবনব্যবস্থা হিসেবে ধর্মতাত্ত্বিক নিয়মগুলো স্থির বা ধ্রুব হলেও বিজ্ঞানের অগ্রগতি এবং অর্থনৈতিক বিবর্তন সেগুলোকে প্রতিনিয়ত অপ্রাসঙ্গিক করে তুলছে। যদি পানি বিক্রি করা নবী কর্তৃক নিষিদ্ধই হয়ে থাকে, তবে বর্তমান মুসলিম বিশ্বের এই ব্যবস্থার সাথে আপস করা মূলত ধর্মীয় বিধানের একটি নীরব পরাজয়।

Leave a comment

Your email will not be published.