ইসলামের জুডিও খ্রিস্টান এবং পৌত্তলিক ভিত্তি
ভূমিকা
ইসলামের ধর্মীয় জীবন আরবের পূর্ববর্তী সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে ওঠেনি। কাবা, তীর্থযাত্রা, পবিত্র মাস, উপবাস, কোরবানি, বিশেষ পাথরের মর্যাদা এবং ইব্রাহিমকেন্দ্রিক বংশপরিচয়ের সঙ্গে ইসলামপূর্ব আরবের সম্পর্ক ছিল প্রত্যক্ষ। ইহুদি ও খ্রিস্টানদের ধর্মগ্রন্থের চরিত্র, সৃষ্টিকাহিনি, নবীদের বিবরণ এবং শেষবিচারের ধারণাও ইসলামের পরিচিত জগতে উপস্থিত ছিল। মুহাম্মদ যে সমাজে জন্মেছিলেন, সেখানে এসব ধর্মের অনুসারী, বিভিন্ন উপাসনাপদ্ধতির অনুশীলনকারী এবং প্রচলিত দেবতাদের প্রত্যাখ্যানকারী একেশ্বরবাদীরা বাস করতেন। ফলে ইসলামের উৎপত্তির একটি বাস্তব ইতিহাস আছে: পুরোনো ধর্মীয় উপাদান গ্রহণ, কিছু উপাদান বর্জন, কিছু আচার নতুন ব্যাখ্যায় বহাল রাখা এবং একটি নতুন কর্তৃত্বের অধীনে সেগুলো সংগঠিত করা। প্রতিটি প্রথাকে সম্পূর্ণ নতুন ঐশী উদ্ভাবন হিসেবে হাজির করলে সেই ইতিহাস চাপা পড়ে যায়। পরিচিত রীতিকে নতুন ধর্মীয় পরিচয়ে বাধ্যতামূলক করার মধ্যেই ইসলামের গঠনের একটি বড় সূত্র নিহিত।
ইসলামি ব্যাখ্যায় পূর্ববর্তী আরবদের অনেক আচারকে ইব্রাহিমের ধর্মের অবশিষ্টাংশ বলা হয়। এই ব্যাখ্যা আচারগুলোর ইসলামপূর্ব অস্তিত্ব স্বীকার করে এবং তার উৎপত্তিকে আরও প্রাচীন এক নবীর সঙ্গে যুক্ত করে। কিন্তু কোনো প্রথাকে ইব্রাহিমের নামে সম্বোধন করা এবং তার জন্য সমসাময়িক ঐতিহাসিক সাক্ষ্য থাকা দুটি পৃথক বিষয়। কাবা প্রদক্ষিণ ও হাজরে আসওয়াদ চুম্বনের মতো আচার মুহাম্মদের আগেও পরিচিত ছিল; ইসলামে সেগুলো ধর্মীয় পুরস্কার ও বাধ্যবাধকতার নতুন কাঠামো পেয়েছে। কালো পাথরকে স্পর্শ বা চুম্বনের সঙ্গে পাপমোচন জুড়ে দেওয়া এবং শেষবিচারে তার সাক্ষ্য দেওয়ার বিশ্বাস একটি বস্তুতে অলৌকিক মর্যাদা আরোপ করে। পাথরকে সরাসরি স্রষ্টা ঘোষণা না করেও তাকে মানুষের পরকালীন ভাগ্যের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব। এখানেই জড়বস্তুর ধর্মীয় ক্ষমতা নিয়ে ইসলামের ভেতরের দাবিগুলোকে তার মূর্তিপূজাবিরোধী ভাষণের পাশে বসিয়ে বিচার করার প্রয়োজন তৈরি হয়।
অন্য ধর্মের পাথর, প্রতিমা কিংবা পবিত্র বস্তুকে ঘিরে আচারকে কুসংস্কার বলার সময় সাধারণত প্রশ্ন তোলা হয়: প্রাণহীন বস্তু মানুষের পাপ, ভাগ্য বা পরকাল নিয়ন্ত্রণ করবে কীভাবে? একই প্রশ্ন হাজরে আসওয়াদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। একটি পাথরের সঙ্গে অতিপ্রাকৃত সাক্ষ্য ও পাপমোচনের সম্পর্ক স্থাপন করলে শুধু ধর্মীয় নাম বদলের কারণে সেই বিশ্বাস যুক্তিসংগত হয়ে যায় না। শয়তানের প্রতীকে পাথর নিক্ষেপের ক্ষেত্রেও অলৌকিক সত্তার সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট স্থান ও বস্তুগত ক্রিয়াকে যুক্ত করা হয়েছে। উপাসনা, অনুকরণ এবং প্রতীকী আচারের শব্দগত পার্থক্যের আড়ালে যে বাস্তব আচরণটি ঘটে, তার ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা রয়ে যায়। কাবা থেকে দেবমূর্তি সরানো হয়েছে, কিন্তু কাবাকেন্দ্রিক তীর্থ, বিশেষ পাথর, পরিক্রমা এবং স্থানবিশেষে ধর্মীয় ক্রিয়া নতুন বিধানের অধীনে বহাল থেকেছে। এই গ্রহণ ও পুনর্গঠনের দলিল ইসলামি সাহিত্যেই সংরক্ষিত আছে।
ধর্মীয় ঐতিহ্যের সংমিশ্রণ বুঝতে মানুষের সাক্ষাৎ, মৌখিক শ্রবণ, পারিবারিক পরিবেশ, বাণিজ্যিক যোগাযোগ এবং আচারগত উত্তরাধিকার একসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তি নিজে একটি ধর্মগ্রন্থ পড়তে না পারলেও তার গল্প, উপদেশ বা বিশ্বাস অন্যের মুখে শুনতে পারেন। কোনো নতুন ধর্ম পুরোনো মন্দির দখল করে তার আচারকে নতুন দেবতাতত্ত্বে ব্যাখ্যা করতে পারে। আবার একই সমাজে প্রচলিত একটি গল্প একাধিক সম্প্রদায় নিজ নিজ ভাষায় পুনর্গঠন করতে পারে। প্রত্যক্ষ গ্রহণের দলিল, একই আচারের পূর্ববর্তী অস্তিত্ব এবং কাহিনির সাদৃশ্য—এগুলো আলাদা ধরনের সাক্ষ্য। কোরআন, হাদিস ও সীরাতে পাওয়া এই সাক্ষ্যগুলো মিলিয়ে ইসলামের নিজস্বতার দাবির একটি নির্দিষ্ট পরীক্ষা সম্ভব: কোনটি নতুন ঘোষণা, কোনটি পূর্বপরিচিত উপাদানের রূপান্তর, আর কোনটির অতিপ্রাকৃত উৎসের দাবি কেবল বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
শিবলিঙ্গ বা অন্য কোনো ধর্মের পবিত্র পাথরকে কেন্দ্র করে আচার পালনের সমালোচনায় জড়বস্তুর অক্ষমতার যুক্তি প্রায়ই ব্যবহার করা হয়। কিন্তু একই যুক্তি নিজের ধর্মীয় পাথরের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করলে বিশেষ ছাড় দাবি করা হয়। নিজের পাথরের জন্য আলাদা নামে অলৌকিক মর্যাদা নির্ধারণ এবং অন্যের পাথরের মর্যাদাকে কুসংস্কার বলা দ্বৈত মানদণ্ড। ধর্মীয় কর্তৃত্বের পরিচয় বদলালেও একটি বস্তুর পক্ষে পরকালে কথা বলা, মানুষের পাপ ঝরানো কিংবা বিশেষ আচারের বিনিময়ে অলৌকিক সুবিধা দেওয়ার দাবি প্রমাণের প্রশ্ন থেকে মুক্ত হয় না। একইভাবে শয়তানকে প্রতীকীভাবে পাথর মারার সঙ্গে অদৃশ্য সত্তার বিরুদ্ধে বাস্তব কোনো কার্যকারণ সম্পর্ক দেখানো হয়নি। এই আচারগুলোর ধর্মীয় বৈধতার ঘোষণা আছে; তাদের উৎস ও কার্যকারিতার স্বতন্ত্র প্রশ্নও আছে।
পৌত্তলিকতা অর্থ কী?
বাংলা ‘পৌত্তলিক’ শব্দের সম্পর্ক পুত্তলি বা প্রতিমার সঙ্গে; অভিধানে এর অর্থ প্রতিমাপূজক। ইংরেজি ‘pagan’ এসেছে লাতিন ‘paganus’ থেকে, যার পুরোনো অর্থের মধ্যে গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দা এবং অসামরিক ব্যক্তি ছিল। পরবর্তী খ্রিস্টান ব্যবহারে শব্দটি ধর্মীয় বহিরাগতদের পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। দুটি ভাষার শব্দ প্রায়ই অনুবাদে পাশাপাশি ব্যবহৃত হয়, কিন্তু তাদের ব্যুৎপত্তি এক নয়। ধর্মীয় পরিচয় বোঝাতে ব্যবহৃত একটি শব্দের আদি অর্থ থেকে আজকের সব গ্রামবাসীর বিশ্বাস নির্ধারণ করা যায় না। শব্দের ইতিহাসের সঙ্গে ধর্মাচারের ইতিহাসও পৃথকভাবে পরীক্ষা করতে হয়। [1] [2]
প্রতিমাপূজার ক্ষেত্রে একটি দৃশ্যমান বস্তুকে দেবতা, দেবতার প্রতিনিধি কিংবা অতিপ্রাকৃত সাহায্যের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা হয়। একটি পাথর, কাঠের প্রতিমা বা পবিত্র স্তম্ভকে ঘিরে মানত, পাপমোচন, পরকালের পুরস্কার কিংবা অদৃশ্য শক্তির প্রভাব প্রত্যাশিত হতে পারে। এই প্রত্যাশাই ধর্মীয় অর্থ তৈরি করে। রবীন্দ্রনাথের ভাস্কর্যে ফুল দেওয়া বা কোনো রাজনীতিকের কুশপুত্তলিকা পোড়ানোতে মানুষের প্রতীক ব্যবহার আছে; অলৌকিক ক্ষমতায় বিশ্বাসের প্রশ্নটি নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট কাজের সঙ্গে কী দাবি যুক্ত হয়েছে তার ওপর। ধর্মীয় সমালোচনার আসল বিষয় বস্তুটি পাথর না কাঠ, সেটি নয়; মানুষের ভাগ্যে বস্তুটির অতিপ্রাকৃত ভূমিকা আরোপ করা হয়েছে কি না, সেটি। এই নির্দিষ্ট মানদণ্ডে কালো পাথরের সাক্ষ্য, স্পর্শে পাপমোচন কিংবা স্থানবিশেষে আচারের জন্য অলৌকিক পুরস্কারের দাবিগুলো কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়ে।
প্রাক্ইসলামি আরবদের সব উপাসনাও একরকম ছিল না। কারও কাছে দেবমূর্তি ছিল বিশেষ দেবতার প্রতীক, কারও ধর্মীয় ব্যাখ্যায় তা সর্বোচ্চ সত্তার কাছে সুপারিশের মাধ্যম। কোরআন নিজেই প্রতিপক্ষের মুখে বলেছে, তারা ওই উপাস্যদের কাছে যায় আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য। তাই পৌত্তলিকতার সঙ্গে ইসলামের তুলনায় প্রশ্ন শুধু “কে কাকে স্রষ্টা বলেছে” পর্যন্ত সীমিত থাকে না; মধ্যস্থতা, সুপারিশ, পবিত্র বস্তুর মর্যাদা এবং ধর্মীয় আচারের কার্যকারিতাও বিচার্য হয়। [3]
أَلَا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ ۚ وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِن دُونِهِ أَوْلِيَاءَ مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَىٰ إِنَّ اللَّهَ يَحْكُمُ بَيْنَهُمْ فِي مَا هُمْ فِيهِ يَخْتَلِفُونَ ۗ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ كَاذِبٌ كَفَّارٌ
বাংলা অনুবাদ:
জেনে রাখো, একনিষ্ঠ ধর্ম আল্লাহরই। যারা তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য অভিভাবক গ্রহণ করে, তারা বলে: আমরা তাদের উপাসনা করি কেবল এ জন্য যে তারা আমাদের আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে। তারা যে বিষয়ে মতভেদ করে, আল্লাহ তাদের মধ্যে তার বিচার করবেন। যে মিথ্যাবাদী ও অকৃতজ্ঞ, আল্লাহ তাকে পথ দেখান না।
ইসলামে শহরের মানুষ আর গ্রামের মানুষ
ইসলামি উৎসে বসতি ও জীবনযাপনের ধরন বিচারিক মর্যাদার পার্থক্য তৈরির ভিত্তি হয়েছে। আবু দাউদের হাদিসে বলা হয়েছে, কোনো বেদুইনের সাক্ষ্য স্থায়ী জনপদের বাসিন্দার বিরুদ্ধে গ্রহণযোগ্য নয়। আরবি ‘বেদুইন’ বলতে মরুচারী জীবনযাপনের মানুষ বোঝানো হয়েছে এবং ‘সাহিবু কারইয়া’ বলতে বসতির অধিবাসী; বাংলা অনুবাদে ব্যবহৃত “গ্রামবাসী” ও “শহরবাসী” এই পার্থক্য পুরোপুরি প্রকাশ করে না। হাদিসটির বক্তব্য সাক্ষী হিসেবে একটি শ্রেণিকে অগ্রিম অগ্রহণযোগ্য করা। কার সাক্ষ্যে কী ত্রুটি আছে, তা আলাদাভাবে প্রমাণ করার আগে তার জীবনযাপনের পরিচয়কে বিচারিক প্রতিবন্ধকতা বানানো হয়েছে। সাক্ষ্যের সত্যতা যাচাইয়ের বদলে সামাজিক পরিচয়কে এই মর্যাদা দেওয়া বৈষম্যমূলক। [4] [5]
সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৮/ বিচার
পরিচ্ছেদঃ ৪০১. শহরবাসীদের উপর গ্রামবাসীদের সাক্ষ্যদান।
৩৫৬৩. আহমদ ইবন সাঈদ (রহঃ) ….. আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এরূপ বর্ণনা করতে শোনেন যে, শহরবাসীদের উপর গ্রামবাসীদের সাক্ষ্য দেওয়া বৈধ নয়।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
আরবি মূল বাক্যটি সংক্ষিপ্ত এবং সরাসরি সাক্ষ্য গ্রহণের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে। [6]
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «لَا تَجُوزُ شَهَادَةُ بَدَوِيٍّ عَلَى صَاحِبِ قَرْيَةٍ».
বাংলা অনুবাদ:
আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, তিনি আল্লাহর রাসুলকে বলতে শুনেছেন: কোনো বেদুইনের সাক্ষ্য জনপদের বাসিন্দার বিরুদ্ধে গ্রহণযোগ্য নয়।
এই বিধান সমাজের কেন্দ্রে থাকা বসতিবাসী এবং প্রান্তে থাকা মরুচারীর মধ্যে ক্ষমতার পার্থক্য প্রকাশ করে। একজন মানুষের বক্তব্য প্রত্যক্ষ জ্ঞান, সামঞ্জস্য ও সত্যবাদিতার ভিত্তিতে যাচাই করার বদলে তার সামাজিক শ্রেণিকে সন্দেহের কারণ বানানো হলে বিচার ব্যক্তির ওপর থেকে সরে শ্রেণির ওপর দাঁড়ায়। পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীরা এর প্রয়োগ নিয়ে মতভেদ করেছেন: কেউ নির্দিষ্ট লেনদেনে সন্দেহের প্রশ্ন তুলেছেন, কেউ সাক্ষীর পরিচিত সততার ভিত্তিতে গ্রহণের কথা বলেছেন। মূল পাঠের সাধারণ নিষেধ এবং তার পরবর্তী সংকোচন থেকেই বোঝা যায়, একটি ছোট ধর্মীয় বাক্য মানুষের বিচার পাওয়ার অধিকারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এই বৈষম্যের সমালোচনা সামাজিক ও বিচারিক ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত; লাতিন শব্দের সঙ্গে আরবি বিধানের কোনো কাল্পনিক ভাষাগত বংশসূত্রের প্রয়োজন পড়ে না। [7]
মরু আরব এবং জমজম কুপের গুরুত্ব
মরু অঞ্চলে পানি, আশ্রয় ও নিরাপদ যাতায়াতের গুরুত্ব ছিল জীবনমৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত। গোত্রের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, রক্তের প্রতিশোধ এবং বাণিজ্যিক যাতায়াতের মধ্যে একটি নিরাপদ কেন্দ্র মানুষের জন্য বিশেষ সুবিধা তৈরি করত। মক্কার হারাম বা সংরক্ষিত এলাকার পরিচয়ে এই নিরাপত্তার বিষয়টি সরাসরি উপস্থিত। কোরআনের ভাষ্যেও আশপাশে মানুষ আক্রান্ত ও অপহৃত হওয়ার বিপরীতে মক্কাকে নিরাপদ হারাম বলা হয়েছে। অর্থাৎ ইসলামের আবির্ভাবের সময়েই পরিচিত একটি সামাজিক সুবিধাকে নতুন ধর্মীয় ভাষণে আল্লাহর অনুগ্রহ হিসেবে হাজির করা হয়েছে। পানির উৎস ও উপাসনাস্থলের কাছাকাছি এমন নিরাপদ এলাকা তীর্থযাত্রী, স্থানীয় পরিবার ও ব্যবসায়ীদের সমাগম সহজ করত। নিরাপত্তার সঙ্গে ধর্মীয় মর্যাদা যুক্ত হলে তার রক্ষণাবেক্ষণকারী গোষ্ঠীও সামাজিক প্রভাব অর্জন করত।
একটি তীর্থকেন্দ্র মানুষকে শুধু প্রার্থনার সুযোগ দেয় না; সেখানে বিভিন্ন গোষ্ঠীর দেখা হয়, খাদ্য ও পানির প্রয়োজন তৈরি হয়, পণ্য কেনাবেচা হয় এবং অতিথিদের সেবা দেওয়ার কর্তৃত্ব গড়ে ওঠে। উপাসনাস্থলের পবিত্রতা সেই কেন্দ্রের নিরাপত্তার পক্ষে কাজ করতে পারে। একই সঙ্গে পবিত্র স্থানকে নিয়ন্ত্রণকারী পরিবারের হাতে প্রবেশাধিকার, সেবার ব্যবস্থা ও সম্মানের বড় অংশ কেন্দ্রীভূত হয়। গোত্রসমাজের ভেতরে এমন প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক ফল স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক গুরুত্ব লাভ করে। জমজমকে কেন্দ্র করে পানি বিতরণ এবং কাবাকে কেন্দ্র করে তীর্থ আয়োজনের বিবরণে ধর্ম ও সামাজিক ক্ষমতার এই সম্পর্ক দৃশ্যমান। নিরাপত্তা, পবিত্রতা, জনসমাগম ও পারিবারিক কর্তৃত্ব পরস্পরকে শক্তিশালী করেছে।
কোরআনের সূরা কুরাইশে শীত ও গ্রীষ্মের যাত্রার পাশাপাশি ক্ষুধা থেকে খাদ্যপ্রাপ্তি এবং ভয় থেকে নিরাপত্তার কথা বলা হয়েছে। যে ঘরকে কেন্দ্র করে এই গোষ্ঠীর ধর্মীয় পরিচয় গড়ে উঠেছে, সেই ঘরের প্রভুর উপাসনার নির্দেশও একই বক্তব্যে এসেছে। ধর্মীয় আনুগত্য এখানে জীবিকার সুবিধা ও নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কাবার সামাজিক গুরুত্ব বোঝার জন্য এই স্বীকৃতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মক্কার বাণিজ্যের পরিমাণ কত ছিল বা তার আন্তর্জাতিক বিস্তার কত দূর পর্যন্ত ছিল, সে বিষয়ে বড় দাবি ছাড়াই স্থানীয় তীর্থকেন্দ্রের অর্থনৈতিক ভূমিকা ব্যাখ্যা করা যায়: দর্শনার্থী আসে, তাদের খাওয়ানো ও পানি দেওয়ার দায়িত্ব তৈরি হয়, সেই দায়িত্ব বিশেষ মর্যাদা এনে দেয় এবং মর্যাদা গোত্রীয় নেতৃত্বকে শক্তিশালী করে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও কর্তৃত্ব বোঝার এই সূত্র সরাসরি সংশ্লিষ্ট উৎসগুলোর সঙ্গে মেলে।
সীরাতে মুহাম্মদের দাদা আবদুল মুত্তালিবের জমজম খননের বিবরণ পাওয়া যায়। কাহিনিতে কূপটি পূর্বপরিচিত ও চাপা পড়ে যাওয়া একটি উৎস হিসেবে এসেছে; তাঁর ভূমিকা তার পুনরুদ্ধার। কূপ পাওয়ার পরে কুরাইশের অন্য গোষ্ঠীও অংশ দাবি করে এবং পানি বিতরণের অধিকার নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। এই বিরোধ ধর্মীয় পবিত্রতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ ও উত্তরাধিকারের প্রশ্নকে একত্রে প্রকাশ করে। হজযাত্রীদের পানি দেওয়ার দায়িত্ব যে পরিবার বহন করত, তাদের মর্যাদা সেই সেবার মাধ্যমেই বাড়ত। কূপ উদ্ধার, তার ওপর অধিকার দাবি এবং পানি সরবরাহের কর্তৃত্ব নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই কাহিনির প্রধান ঘটনা। পবিত্র স্থানের সেবার সঙ্গে পরিবারের স্বার্থ ও সামাজিক ক্ষমতা এখানে সরাসরি যুক্ত। [8] [9]




মক্কার নিরাপত্তা ইসলামপূর্ব উপাসকদের জীবনের বাস্তব সুবিধা ছিল—কোরআনের এই বক্তব্য সেই সুবিধাকে ইসলামের প্রতিষ্ঠার আগেই স্থাপন করে। [10]
أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّا جَعَلْنَا حَرَمًا آمِنًا وَيُتَخَطَّفُ النَّاسُ مِنْ حَوْلِهِمْ ۚ أَفَبِالْبَاطِلِ يُؤْمِنُونَ وَبِنِعْمَةِ اللَّهِ يَكْفُرُونَ
বাংলা অনুবাদ:
তারা কি দেখেনি যে আমরা একটি নিরাপদ হারাম করেছি, অথচ তাদের চারপাশ থেকে মানুষকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়? তবে কি তারা অসত্যে বিশ্বাস করে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করে?
ইবনে আসিরের বর্ণনায় জমজম উদ্ধারের পর অধিকার নিয়ে কুরাইশের সঙ্গে আবদুল মুত্তালিবের সংঘাত স্পষ্ট। সংশ্লিষ্ট সম্পূর্ণ কথোপকথনে ধর্মীয় বংশপরিচয়কে সম্পদের যৌথ অধিকারের পক্ষে ব্যবহার করা হয়েছে। [11]
فلما بدا له الطوي كبر، فعرفت قريش أنه قد أدرك حاجته، فقاموا إليه فقالوا: بئر أبينا إسماعيل، وإن لنا فيها حقا فأشركنا معك. قال: ما أنا بفاعل، هذا أمر خصصت به دونكم، قالوا: فإنا غير تاركيك حتى نخاصمك فيها، قال: فاجعلوا بيني وبينكم من شئتم. قالوا: كاهنة بني سعد بن هذيم، وكانت بمشارف الشام.
বাংলা অনুবাদ:
কূপের বাঁধানো অংশ প্রকাশ পেলে তিনি তাকবির দিলেন। কুরাইশ বুঝল, তিনি তাঁর কাঙ্ক্ষিত বস্তু পেয়েছেন। তারা তাঁর কাছে এসে বলল: এটি আমাদের পিতা ইসমাইলের কূপ; এতে আমাদেরও অধিকার আছে। তাই তোমার সঙ্গে আমাদের অংশীদার করো। তিনি বললেন: আমি তা করব না; এ বিষয়ে আমাকে তোমাদের থেকে পৃথকভাবে বিশেষ অধিকার দেওয়া হয়েছে। তারা বলল: আমরা তোমাকে ছেড়ে দেব না, এ নিয়ে তোমার সঙ্গে বিচারবিরোধ করব। তিনি বললেন: তোমরা যাকে চাও, তাকে আমার ও তোমাদের মধ্যে বিচারক নির্ধারণ করো। তারা বলল: বনু সাদ ইবনে হুযাইমের নারী গণককে; তিনি ছিলেন সিরিয়ার সীমান্ত অঞ্চলে।
একই কাহিনিতে অলৌকিক স্বপ্ন, কূপের ওপর বিশেষ অধিকার এবং গণকের কাছে বিরোধ মীমাংসার উদ্যোগ একসঙ্গে আছে। এই উপাদানগুলো মক্কার ধর্মীয় জীবনের ভেতরেই পানি ও কর্তৃত্বের সম্পর্ক দেখায়। আবদুল মুত্তালিবের বিশেষ অধিকার দাবি অন্য গোষ্ঠীর অংশীদারত্বের দাবির মুখোমুখি হয়েছে। পরবর্তী ইসলামি নেতৃত্বও কাবা ও জমজমের ঐতিহাসিক মর্যাদা ব্যবহার করেছে। প্রতিষ্ঠানটি বহাল রেখে তার মালিকানা, ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও প্রবেশের বিধান পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে কাবা ও জমজমের ইতিহাসে সবচেয়ে দৃশ্যমান বিষয় হলো পুরোনো পবিত্র কেন্দ্রকে ঘিরে কর্তৃত্বের ধারাবাহিকতা এবং তার রাজনৈতিক পুনর্গঠন।
ইসলামের সূতিকাগার পৌত্তলিক কাবা
মক্কার কাবা মুহাম্মদের জন্মের অনেক আগে থেকেই উপাসনার কেন্দ্র ছিল। ইসলামি উৎসে এর চারপাশে অসংখ্য দেবমূর্তি, ভেতরে ইব্রাহিম ও মরিয়মের ছবি এবং কুরাইশের ধর্মীয় কর্তৃত্বের বিবরণ আছে। বিভিন্ন আরব গোত্রের উপাস্য এবং আব্রাহামিক চরিত্র একই পবিত্র স্থানের সঙ্গে যুক্ত ছিল। হুবাল সেখানে গুরুত্বপূর্ণ দেবতা হিসেবে পূজিত হতো; লাত, উজ্জা ও মানাতের নিজস্ব উপাসনাকেন্দ্রও ছিল। এই তিন দেবীকে কোরআনের বিতর্কে আল্লাহর কন্যা হিসেবে কল্পনা করার প্রসঙ্গ এসেছে। কাবা তাই বহু উপাস্যের মর্যাদা বহনকারী একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ছিল, যার সেবা, তীর্থ ও মর্যাদা কুরাইশের সামাজিক অবস্থানকে শক্তিশালী করেছিল। এখানে উপাস্যের বহুত্ব ছিল এবং সেই বহুত্বের ওপর নির্দিষ্ট গোত্রের কর্তৃত্বও ছিল। পরবর্তী ইসলামি ব্যবস্থা একই ঘরকে সর্বজনীন মুসলিম কিবলা বানিয়ে তার পূর্ববর্তী উপাসকদের ধর্মীয় অধিকার বিলোপ করে।
ইবনে ইসহাকের সীরাতে বিরোধের সূচনা সম্পর্কে নির্দিষ্ট বক্তব্য আছে: মুহাম্মদ প্রকাশ্যে ধর্মপ্রচার শুরু করার পরে প্রথমে তাঁর গোত্র তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেনি; তাদের দেবতাদের নিন্দা করার পরে শত্রুতা তীব্র হয়। সীরাতের এই বিবরণে বিরোধের কেন্দ্র দেবতাদের মর্যাদা, পূর্বপুরুষের ধর্ম এবং নতুন প্রচারের আক্রমণাত্মক অবস্থান। কাবার গুরুত্বের সঙ্গে গোষ্ঠীগুলোর আত্মপরিচয় ও সামাজিক মর্যাদা যুক্ত ছিল বলে তাদের উপাস্য প্রত্যাখ্যানের প্রশ্নও ক্ষমতার প্রশ্নে পরিণত হয়। নতুন ধর্মের প্রতিষ্ঠা শেষ পর্যন্ত শুধু অতিরিক্ত একটি উপাসনাপথের আগমন হয়ে থাকেনি। মক্কা জয়ের পরে দেবমূর্তি ধ্বংস, পুরোনো উপাসকদের তীর্থে অংশগ্রহণ বন্ধ এবং একটি মাত্র ধর্মীয় পরিচয়ে কাবার পুনর্গঠন ঘটেছে। এই পরিণতি ধর্মীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার রাজনৈতিক ব্যাপ্তি স্পষ্ট করে। সংশ্লিষ্ট বিবরণ রয়েছে ধর্ম অবমাননা, সাম্প্রদায়িকতা ও মূর্তি ভাঙার আলোচনাতেও। [12]
বুখারির বর্ণনায় মক্কা জয়ের দিন কাবার চারপাশে ৩৬০টি উপাস্য থাকার এবং মুহাম্মদের সেগুলোতে আঘাত করার কথা এসেছে। [13]
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: دَخَلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَكَّةَ يَوْمَ الْفَتْحِ وَحَوْلَ الْبَيْتِ سِتُّونَ وَثَلَاثُمِائَةِ نُصُبٍ، فَجَعَلَ يَطْعُنُهَا بِعُودٍ فِي يَدِهِ وَيَقُولُ: «جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ، جَاءَ الْحَقُّ، وَمَا يُبْدِئُ الْبَاطِلُ وَمَا يُعِيدُ».
বাংলা অনুবাদ:
আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত: মক্কা জয়ের দিন নবী মক্কায় প্রবেশ করেন। তখন ঘরটির চারপাশে ৩৬০টি উপাস্য ছিল। তিনি হাতের লাঠি দিয়ে সেগুলোতে আঘাত করতে থাকেন এবং বলেন: সত্য এসেছে এবং অসত্য বিলুপ্ত হয়েছে। সত্য এসেছে; অসত্য নতুন কিছু শুরু করতে পারে না এবং ফিরিয়েও আনতে পারে না।
সীরাতের বক্তব্যে প্রকাশ্য সংঘাতের আগে ও পরে কী ঘটেছে, সেই ক্রমও স্পষ্টভাবে দেওয়া আছে। [14]
قال ابن إسحاق: فلما بادى رسول الله صلى الله عليه وسلم قومه بالإسلام وصدع به كما أمره الله، لم يبعد منه قومه، ولم يردوا عليه — فيما بلغني — حتى ذكر آلهتهم وعابها؛ فلما فعل ذلك أعظموه وناكروه، وأجمعوا خلافه وعداوته، إلا من عصم الله تعالى منهم بالإسلام، وهم قليل مستخفون، وحدب على رسول الله صلى الله عليه وسلم عمه أبو طالب، ومنعه وقام دونه، ومضى رسول الله صلى الله عليه وسلم على أمر الله، مظهرا لأمره، لا يرده عنه شيء.
বাংলা অনুবাদ:
ইবনে ইসহাক বলেন: রাসুল যখন তাঁর গোত্রের সামনে ইসলাম প্রকাশ করলেন এবং আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে তা ঘোষণা করলেন, তখন আমার কাছে পৌঁছানো বিবরণ অনুযায়ী তাঁর গোত্র প্রথমে তাঁর থেকে দূরে সরে যায়নি এবং তাঁকে প্রত্যাখ্যানও করেনি—যতক্ষণ না তিনি তাদের দেবতাদের উল্লেখ করে নিন্দা করেন। তিনি তা করার পরে তারা বিষয়টিকে গুরুতর মনে করে, তাঁকে প্রত্যাখ্যান করে এবং তাঁর বিরোধিতা ও শত্রুতায় একমত হয়। এর ব্যতিক্রম ছিল অল্প কয়েকজন, যারা ইসলাম গ্রহণ করে আত্মগোপনে ছিল। তাঁর চাচা আবু তালিব তাঁকে স্নেহভরে রক্ষা করেন এবং তাঁর প্রতিরক্ষায় দাঁড়ান। রাসুল তাঁর ধর্মীয় ঘোষণা অব্যাহত রাখেন; কোনো কিছু তাঁকে তা থেকে নিবৃত্ত করতে পারেনি।
কাবাকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত পুরোনো কাঠামোর ভেতর থেকেই নতুন ধর্ম তার প্রধান প্রতীক ও পবিত্র ভূগোল পেয়েছে। স্থাপনাটি ভেঙে অন্য কোনো স্থানে নতুন কেন্দ্র নির্মাণের বদলে একই ঘরকে একচ্ছত্রভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। ঘরটির দিকে মুখ করা, তার চারপাশে ঘোরা এবং নির্দিষ্ট পাথরের মর্যাদা বহাল থেকেছে; বদলেছে এসব আচারের অনুমোদিত ব্যাখ্যা ও অংশগ্রহণকারীর পরিচয়। সূরা তাওবার ২৮ নম্বর আয়াতে মুশরিকদের মসজিদুল হারামের কাছে আসা নিষিদ্ধ করার সঙ্গে দরিদ্র হয়ে পড়ার আশঙ্কাও উল্লেখিত। ধর্মীয় বর্জনের অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া এই আয়াতেই প্রকাশ পেয়েছে। পুরোনো তীর্থযাত্রীদের নিষেধ করলে জীবিকায় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়—কারণ ধর্মীয় কেন্দ্রটি আগে থেকেই মানুষের যাতায়াত ও সম্পদের প্রবাহের কেন্দ্র ছিল। [15]
একটি নতুন ধর্মের প্রয়োজনীয়তা
ইসলামের আবির্ভাবের আগের কয়েক শতকে আরবের চারপাশে বড় সাম্রাজ্য, ধর্মীয় সম্প্রদায় ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক সক্রিয় ছিল। পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট রোমুলাস অগাস্টুলাস ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে ক্ষমতাচ্যুত হন; ৪১০ সালে রোম নগরীর লুণ্ঠন ছিল তারও আগের ঘটনা। পূর্ব রোমান বা বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য তখনও বহাল ছিল এবং পরবর্তী সময়ে সাসানীয় পারস্যের সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধে জড়ায়। সপ্তম শতকের আরব এই বৃহত্তর জগতের প্রতিবেশী। একাধিক গোত্রকে একই ধর্মীয় পরিচয়ে সংগঠিত করা, নিয়মিত আনুগত্য দাবি করা, সম্পদ সংগ্রহ করা এবং একটি কেন্দ্রের অধীনে যুদ্ধ পরিচালনা করা ক্ষমতা বিস্তারের কার্যকর উপায় হতে পারে। ইসলামের রাষ্ট্রগঠনে এই বিষয়গুলো প্রত্যক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ধর্মীয় কর্তৃত্ব মানুষকে এমন সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য করতে পারে, যা সাধারণ গোত্রপ্রধানের ব্যক্তিগত অনুরোধে কার্যকর হতো না। নবীর নির্দেশকে আল্লাহর নির্দেশ এবং রাজনৈতিক আনুগত্যকে ঈমানের অংশ করা হলে বিরোধিতাও ধর্মীয় অপরাধে পরিণত হয়। এই কাঠামোয় একক ঈশ্বরের নামে ঘোষিত বিধান একটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হাতে আইন, সম্পদ ও যুদ্ধের ওপর কর্তৃত্ব কেন্দ্রীভূত করে।
মুহাম্মদের সমসাময়িক এবং তাঁর মৃত্যুর অব্যবহিত পরের আরবেও একাধিক ব্যক্তি নবুওয়াত দাবি করেছেন। তাঁদের মধ্যে গোত্রীয় নেতৃত্ব, ধর্মীয় ঘোষণা, সামরিক অনুসারী এবং অঞ্চল নিয়ন্ত্রণের যোগসূত্র পাওয়া যায়। প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বড় অংশ আবু বকরের আমলে সংঘটিত হয়। কারও আন্দোলন দমন করা হয়, কেউ নিহত হন, কেউ পরে বিজয়ী মুসলিম ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হন। এই ঘটনাগুলো দেখায়, নবুওয়াতের ঘোষণা সামাজিক ও রাজনৈতিক আনুগত্য সংগঠনের একটি পরিচিত ভাষা হয়ে উঠেছিল। ক্ষমতার সংঘাতে কোন দাবি প্রতিষ্ঠিত থাকবে এবং কোনটি পরাজিত হবে, তা নির্ধারণে সামরিক ফলাফলও কাজ করেছে। প্রচলিত বিবরণে আলোচিত ব্যক্তিদের পরিচয় ও পরিণতি আলাদা করে রাখলে ধর্মীয় প্রতিযোগিতা এবং রাজনৈতিক সংঘর্ষের প্রকৃতি স্পষ্ট হয়।
| ব্যক্তি | ধর্মীয় বা রাজনৈতিক পরিচয় | পরিণতি ও প্রাসঙ্গিক দলিল |
|---|---|---|
| তুলাইহা ইবনে খুওয়াইলিদ আল-আসাদি | বনু আসাদের নবুওয়াতের দাবিদার; মুহাম্মদের জীবনের শেষভাগে তাঁর উত্থান। | আবু বকরের আমলে খালিদের বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়ে পালান। পরে ইসলাম গ্রহণ ও মুসলিম যুদ্ধে অংশ নেওয়ার বিবরণ আছে। [16] |
| সাজাহ বিনতে হারিস | বনু তামিমের সঙ্গে সম্পর্কিত নারী নবুওয়াতের দাবিদার; রিদ্দার সময় তাঁর নেতৃত্ব বিশেষভাবে আলোচিত। | মুসায়লিমার সঙ্গে যোগ ও বিবাহের বর্ণনা আছে। পরবর্তী ইসলাম গ্রহণ, বসরায় বসবাস ও আনুমানিক ৫৫ হিজরি/৬৭৫ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুর বিবরণও সংরক্ষিত হয়েছে। [17] |
| মালিক ইবনে নুয়াইরা | বনু তামিমের নেতা ও কবি; যাকাত, রাজনৈতিক আনুগত্য ও সাজাহর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে সংঘাতের ব্যক্তি। | খালিদের অভিযানে বন্দী হয়ে নিহত হন। ইবনে কাসিরের বিবরণে তাঁর নামাজ পড়া এবং হত্যার সিদ্ধান্ত নিয়ে মুসলিমদের মধ্যেই বিরোধ আছে। [18] |
| আল-আসওয়াদ আল-আনসি | ইয়েমেনে নবুওয়াত দাবি করেন এবং রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। | মুহাম্মদের জীবনের শেষভাগে ফিরোজ দাইলামি ও তাঁর সহযোগীদের অভিযানে নিহত হন। [19] |
| মুসায়লিমা | বনু হানিফার নবুওয়াতের দাবিদার; মুহাম্মদের সঙ্গে পত্রবিনিময় ও রাজনৈতিক অংশীদারত্বের প্রস্তাবের বিবরণ আছে। [20] | আবু বকরের আমলে ইয়ামামার যুদ্ধে নিহত হন। বুখারিতে ওয়াহশি তাঁর বর্শাঘাতের বিবরণ দিয়েছেন। [21] |
ইবনে কাসির তুলাইহার পরাজয় ও পরবর্তী অবস্থান সম্পর্কে যে বিবরণ সংরক্ষণ করেছেন, তাতে প্রতিদ্বন্দ্বী ধর্মীয় নেতার পুনরায় মুসলিম সামরিক ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার কথাও রয়েছে। [22]
وأما طليحة فإنه راجع الإسلام بعد ذلك أيضا، وذهب إلى مكة معتمرا أيام الصديق واستحيا أن يواجهه مدة حياته، وقد رجع فشهد القتال مع خالد، وكتب الصديق إلى خالد أن استشره في الحرب ولا تؤمره، يعني معاملته له بنقيض ما كان قصده من الرياسة في الباطل. وهذا من فقه الصديق، رضي الله عنه وأرضاه.
বাংলা অনুবাদ:
তুলাইহাও পরে ইসলামে ফিরে আসেন। আবু বকরের সময়ে তিনি উমরা করতে মক্কায় যান এবং আবু বকর জীবিত থাকা পর্যন্ত তাঁর সামনে যেতে লজ্জাবোধ করেন। তিনি ফিরে এসে খালিদের সঙ্গে যুদ্ধে অংশ নেন। আবু বকর খালিদকে লিখে পাঠান: যুদ্ধের বিষয়ে তাঁর পরামর্শ নেবে, কিন্তু তাঁকে সেনাপতি করবে না। অর্থাৎ তিনি আগে যে নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা করেছিলেন, তার বিপরীত ব্যবহার করা হয়। লেখক একে আবু বকরের বিচক্ষণতার উদাহরণ বলেছেন।
নবুওয়াতের প্রতিযোগিতায় একটি গোত্রের নেতা অন্য গোত্রের নেতার প্রতি আনুগত্য স্বীকার করবেন কি না, সেটিও কার্যকর প্রশ্ন ছিল। ইবনে কাসিরের একই আলোচনায় উয়াইনা ইবনে হিসনের মুখে বনু হাশিমের নবীর চেয়ে বনু আসাদের নবীকে বেশি পছন্দ করার বক্তব্য এসেছে। নিজের গোষ্ঠীর নেতৃত্বকে ধর্মীয় ভাষায় সমর্থন করার এই বর্ণনা গোত্রীয় পক্ষপাতের সরাসরি প্রকাশ। বিজয়ী পক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বীকে “মিথ্যাবাদী” নামে ইতিহাসে সংরক্ষণ করেছে এবং নিজের নেতৃত্বকে আল্লাহর নির্বাচনের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। সেই নামকরণের পেছনে ব্যক্তি, অনুসারী, সেনাদল ও সম্পদের একটি বাস্তব সংঘাত ছিল। ধর্মীয় দাবির সামাজিক শক্তি বোঝার জন্য পরাজিত নেতাদের উপস্থিতিও তাই গুরুত্বপূর্ণ।
মুসায়লিমার পত্রে ধর্মীয় পদবির সঙ্গে ভূখণ্ডের অংশীদারত্ব সরাসরি যুক্ত ছিল। নবুওয়াতের দাবির রাজনৈতিক বিষয়বস্তু পত্রটির সম্পূর্ণ ভাষাতেই প্রকাশিত। [23]
من مسيلمة رسول الله، إلى محمد رسول الله: سلام عليك؛ أما بعد، فإني قد أشركت في الأمر معك، وإن لنا نصف الأرض، ولقريش نصف الأرض، ولكن قريشا قوم يعتدون.
বাংলা অনুবাদ:
আল্লাহর রাসুল মুসায়লিমার পক্ষ থেকে আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদের প্রতি। তোমার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। এরপর বলছি, এ বিষয়ে আমাকে তোমার সঙ্গে অংশীদার করা হয়েছে। ভূমির অর্ধেক আমাদের, আর অর্ধেক কুরাইশের। কিন্তু কুরাইশ সীমা অতিক্রমকারী জাতি।
নিজেকে আল্লাহর রাসুল বলে পরিচয় দেওয়ার সঙ্গে অর্ধেক ভূমির দাবি জুড়ে দেওয়ায় ধর্মীয় কর্তৃত্বের বস্তুগত লক্ষ্য স্পষ্ট হয়েছে। পত্রের বক্তব্যে শুধু ব্যক্তিগত উপাসনার স্বাধীনতা নেই; কুরাইশের বিপরীতে অন্য গোষ্ঠীর অংশ দাবি আছে। এই ধর্মীয় প্রতিযোগিতাকে অনুসারীদের বিশ্বাসের পাশাপাশি ভূখণ্ড, আনুগত্য এবং শাসনের প্রশ্ন হিসেবেও দেখতে হয়। প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরিণতিতে সামরিক শক্তির ভূমিকা এবং বিজয়ী ধর্মীয় পরিচয়ের স্থায়িত্ব একই ইতিহাসের মধ্যে যুক্ত হয়েছে।
মুহাম্মদের পৌত্তলিক বংশ
মুহাম্মদের পারিবারিক পরিবেশ সম্পর্কে ইসলামি হাদিসের বিবরণেই মক্কার পূর্ববর্তী ধর্মের উপস্থিতি স্পষ্ট। আবু তালিবের মৃত্যুশয্যার ঘটনায় তাঁর সামনে “আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম” এবং মুহাম্মদের কালিমার মধ্যে নির্বাচন দাঁড় করানো হয়েছে। চাচার শেষ অবস্থান হিসেবে দাদার ধর্মের প্রতি আনুগত্যের উল্লেখ আছে। একই কাহিনিতে আত্মীয় মুশরিকদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা নিষিদ্ধ হওয়ার আয়াত যুক্ত করা হয়েছে। এই বর্ণনাগুলো পরিবারের পূর্ববর্তী ধর্মীয় পরিচয়কে নতুন ইসলামের বাইরে স্থাপন করে। যে পরিবার তাঁকে আশ্রয় ও সামাজিক সুরক্ষা দিয়েছিল, তার সদস্যদের ধর্মকেই নতুন ঘোষণা পরকালীন দণ্ডের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। নিচের উদ্ধৃতিগুলোতে এই পারিবারিক ও ধর্মীয় টানাপোড়েন স্পষ্টভাবে উপস্থিত।
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২০/ জানাযা
পরিচ্ছেদঃ ৮৬৩. মুশরিক ব্যক্তি মৃত্যুকালে (কালিমা-ই-তাওহীদ) লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহু উচ্চারণ করলে।
১২৭৭। ইসহাক (রহঃ) … সায়ীদ ইবনু মূসাইয়্যাব (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবূ তালিব এর মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে আসলেন। তিনি সেখানে আবূ জাহল ইবনু হিশাম ও আবদুল্লাহ ইবনু উমাইয়্যা ইবনু মুগীরাকে উপস্থিত দেখতে পেলেন। (রাবী বলেন) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ তালিবকে লক্ষ্য করে বললেন, চাচাজান! ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ কালিমা পাঠ করুন, তা হলে এর অসীলায় আমি আল্লাহর সমীপে আপনার জন্য সাক্ষ্য দিতে পারব।
আবূ জাহল ও আবদুল্লাহ ইবনু আবূ উমায়্যা বলে উঠল, ওহে আবূ তালিব! তুমি কি আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম থেকে বিমুখ হবে? এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে কালিমা পেশ করতে থাকেন, আর তারা দু’জনও তাদের উক্তি পুনরাবৃত্তি করতে থাকে। অবশেষে আবূ তালিব তাদের সামনে শেষ কথাটি যা বলল, তা এই যে, সে আবদুল মুত্তালিবের ধর্মের উপর অবিচল রয়েছে, সে আবদুল মুত্তালিবের ধর্মের উপর অবিচল রয়েছে, সে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলতে অস্বীকার করল।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহর কসম! তবুও আমি আপনার জন্য মাগফিরাত কামনা করতে থাকব, যতক্ষণ না আমাকে তা থেকে নিষেধ করা হয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক নাযিল করেন, مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ الآيَةَ নবীর জন্য সঙ্গত নয় … (সূরা তাওবাঃ ১১৩)।
( আত্মীয়-স্বজন হলেও মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা নবী ও যারা ঈমান এনেছে তাদের জন্য সংগত নয় যখন এটা সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, নিশ্চিতই তারা প্রজ্বলিত আগুনের অধিবাসী। )
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সাঈদ ইবনু মুসাইয়্যাব (রহঃ)
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১/ কিতাবুল ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ৯. মৃত্যু যন্ত্রনা আরম্ভ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ঈমান গ্রহণযোগ্য হওয়ার, মুশরিকদের ব্যাপারে ইসতিগফার (ইস্তিগফার) রহিত হওয়ার ও মুশরিক অবস্থায় মৃত্যুবরনকারীর জাহান্নামী হওয়ার এবং তার কোনমতেই পরিত্রান না পাওয়ার দলীল।
৩৯। হারামালা ইবনু ইয়াহইয়া আত তূজীবী (রহঃ) … সাঈদ ইবনু মূসায়্যাব (রহঃ)-এর সুত্রে তাঁর পিতা থেকে বর্ননা করেন যে, আবূ তালিবের মৃত্যুর সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে উপস্থিত হলেন। সেখানে আবূ জাহল ও আবদুল্লাহ ইবনু আবূ উমায়্যা ইবনু মুগীরাকে দেখতে পেলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে চাচাজানো! আপনি কালিমা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলুন। আমি আল্লাহর কাছে আপনার জন্য (এর উসিলায়) সাক্ষ্য দিব। আবূ জাহল ও আবদুল্লাহ ইবনু আবূ উমায়্যা বলল, হে আবূ তালিব! তুমি কি আবদুল মুত্তালিবের দ্বীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারবার ঐ কথার পুনরাবৃত্তি করে যাচ্ছিলেন।
আবূ তালিব শেষ কথাটি এ বললেন যে, তিনি আবদুল মুত্তালিবের দ্বীনের উপরই রয়েছেন। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ- বলতে অস্বীকার করলেন। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহর কসম! আমি আপনার জন্য অবশ্যই ইসতিগফার- করতে থাকব, যতক্ষন না আমাকে তা থেকে নিষেধ করা হয়, এ প্রেক্ষাপটে আল্লাহ তায়াআলা নাযিল করেনঃ (অর্থ) আত্মীয়-স্বজন হলেও মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা নবী এবং মুমিনদের সঙ্গত নয় যখন সূস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, তারা জাহান্নামী। (সূরা তাওবাঃ ১১৩) আর আল্লাহ তায়ালা বিশেষভাবে আবূ তালিবের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে লক্ষ করে ইরশাদ করেনঃ (অর্থ) (হে রাসুল) আপনি যাকে চাইবেন তাকে পথ দেখাতে পারবেন না কিন্তু আল্লাহ পথ দেখান, যাকে ইচ্ছা করেন। আর তিনই সম্যক জ্ঞাত আছেন কাদের ভাগ্যে হিদায়াত আছে সে সষ্পর্কে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সাঈদ ইবনু মুসাইয়্যাব (রহঃ)
আল-লুলু ওয়াল মারজান
১/ ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ১/৯. ‘লা- ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’ বলা ঈমানের প্রথম।
১৬. মুসায়্যিব ইবনু হাযন্ বলেন, যখন আবূ তালেবের মৃত্যু ঘণিয়ে আসে তার নিকট রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসলেন এবং তার নিকট আবূ জাহল বিন হিশাম ও ‘আবদুল্লাহ ইবনু আবূ উমাইয়াহ ইবনু মুগীরাকে পেলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ তালিবকে বললেন, হে চাচা! কালিমা লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ বল, আমি তোমার জন্য কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলার নিকট এর সাক্ষ্য দিবো। আবূ জাহল ও আব্দূল্লাহ ইবনু আবূ উমাইয়াহ বলল, হে আবূ তালিব! তুমি ‘আব্দূল মুত্তালিব এর দ্বীন থেকে বিমুখ হবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ঐ কালিমা বার বার উপস্থাপন করতে থাকেন এবং তারা দু’জন বার বার ঐ কথা পুনরাবৃত্তি করতে থাকে এবং আবূ তালিবের সর্বশেষ কথা ছিল সে আব্দুল মুত্তালিবের ধর্মের উপরে (মৃত্যু বরণ করল) এবং সে লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ বলতে অস্বীকার করল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি অবশ্যই তোমার জন্য ক্ষমা চাইতে থাকবো। যতক্ষণ না আমাকে এ থেকে নিষেধ করা হয়। তখন মহান আল্লাহ তা‘আলা এই আয়াত অবতীর্ণ করেন।
সহীহুল বুখারী, পৰ্ব ২৩: জানাযা, অধ্যায় ৮১, হাঃ ১৩৬০; মুসলিম, পর্ব ১: ঈমান, হাঃ ২৪
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সাঈদ ইবনু মুসাইয়্যাব (রহঃ)
পিতার বিষয়ে সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় সরাসরি জাহান্নামের ঘোষণা এসেছে। মায়ের কবরের ঘটনায় তাঁর জন্য ক্ষমা প্রার্থনার অনুমতি না পাওয়ার কথা আছে। পিতা সম্পর্কে ব্যবহৃত বাক্য এবং মাতা সম্পর্কে ব্যবহৃত বাক্য ভিন্ন; দুটির ধর্মীয় তাৎপর্য পরিবারকে ইসলামের গ্রহণযোগ্য বিশ্বাসের বাইরে স্থাপন করা। নতুন ধর্মীয় সীমারেখা এখানে নিকটতম আত্মীয়তার সম্পর্কের ওপরও কার্যকর হয়েছে।
সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ১/ কিতাবুল ঈমান
পরিচ্ছদঃ ৮২. কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী জাহান্নামী; সে কোন শাফায়াত পাবে না এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী বান্দার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্কও তার উপকারে আসবে না
৩৯৪। আবূ বকর ইবনু আবূ শায়বা (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে বর্নিত। জনৈক ব্যাক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসুল! আমার পিতা কোথায় আছেন (জান্নাতে না জাহান্নামে)? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ জাহান্নামে। বর্ণনাকারী বলেন, লোকটি যখন পিছনে ফিরে যাচ্ছিল, তখন তিনি ডাকলেন এবং বললেনঃ আমার পিতা এবং তোমার পিতা জাহান্নামে।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সুনানে ইবনে মাজাহ
অধ্যায়ঃ ৬/ জানাযা
পাবলিশারঃ তাওহীদ পাবলিকেশন
পরিচ্ছদঃ ৬/৪৮. মুশরিকদের কবর যিয়ারত।
১/১৫৭২। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মায়ের কবর যিয়ারত করেন। তিনি কান্নাকাটি করেন এবং তাঁর সাথের লোকেদেরও কাঁদান। অতঃপর তিনি বলেন : আমি আমার রবের নিকট তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনার অনুমতি চাইলে তিনি আমাকে অনুমতি দেননি। আমি আমার রবের নিকট তার কবর যিয়ারতের অনুমতি চাইলে তিনি আমাকে অনুমতি দেন। অতএব তোমরা কবর যিয়ারত করো। কেননা তা তোমাদের মৃত্যু স্মরণ করিয়ে দেয়।
মুসলিম ৯৭৬ ;নাসায়ী ২০৩৪; আবূ দাউদ ৩২৩৪; আহমাদ ৯৩৯৫ ইরওয়াহ ৭৭২। তাহকীক আলবানীঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সূনান নাসাঈ (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ২১/ জানাজা
পরিচ্ছদঃ ১০১/ মুশরিকের কবর যিয়ারত করা
২০৩৮। কুতায়বা (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্নিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মাতার কবর যিয়ারত করার সময় ক্রন্দন করলেন, তার আশ পাশের সবাইও ক্রন্দন করলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমি আম্মার মাগাফিরাতের অনুমতি চাইলাম কিন্তু আমাকে তার অনুমতি প্রদান করা হল না। অতঃপর তার কবর যিয়ারতের অনুমতি চাইলে তার অনুমতি দেওয়া হয়। তাই তোমরা কবর যিয়ারত কর, কেননা তা তোমাদের মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
(সহীহ। ইবন মাজাহ ১৫৭২, ইরউয়াউল গালীল ৭৭২)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এই পারিবারিক বিবরণগুলো মুহাম্মদের শৈশব ও যৌবনকে মক্কার প্রচলিত ধর্মীয় সমাজের মধ্যে স্থাপন করে। আবদুল মুত্তালিবের নাম, কাবার সেবার সঙ্গে পরিবারের সম্পর্ক, আবু তালিবের ধর্ম এবং কাবা নির্মাণে মুহাম্মদের নিজের অংশগ্রহণ একই সামাজিক ধারাবাহিকতার ভিন্ন দিক। পরবর্তী ইসলামের পবিত্র কেন্দ্র, পারিবারিক মর্যাদা ও গোত্রীয় পরিচয়ের বহু উপাদান এই পরিবেশ থেকেই এসেছে। নিজের গোত্রের প্রচলিত ধর্ম প্রত্যাখ্যান করেও তার পবিত্র স্থাপনা এবং বংশগত সম্মান গ্রহণ করা সম্ভব হয়েছে। ফলে ধর্মীয় বিচ্ছেদ এবং প্রতিষ্ঠানগত ধারাবাহিকতা একই জীবনীতে পাশাপাশি পাওয়া যায়।
পিতার বিষয়ে উদ্ধৃত বাংলা বর্ণনার সঙ্গে সহিহ মুসলিমের আরবি মূল বক্তব্যও সরাসরি মেলে। [24]
عَنْ أَنَسٍ، أَنَّ رَجُلًا قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَيْنَ أَبِي؟ قَالَ: «فِي النَّارِ». فَلَمَّا قَفَّى دَعَاهُ فَقَالَ: «إِنَّ أَبِي وَأَبَاكَ فِي النَّارِ».
বাংলা অনুবাদ:
আনাস থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি বলল: হে আল্লাহর রাসুল, আমার পিতা কোথায়? তিনি বললেন: আগুনে। লোকটি ফিরে যেতে থাকলে তিনি তাকে ডেকে বললেন: আমার পিতা এবং তোমার পিতা আগুনে।
জন্মসূত্রে পাওয়া একটি ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে আপনজনকে অনন্ত শাস্তির অধিবাসী বলা ধর্মীয় আনুগত্যের কঠোর চরিত্র প্রকাশ করে। পরিবারের স্নেহ, আশ্রয় বা জীবনভর করা কোনো উপকার এই ঘোষণার প্রধান মানদণ্ড হয়ে ওঠেনি; প্রধান মানদণ্ড হয়েছে বিশ্বাসের পরিচয়। আবু তালিবের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও তীব্র: মুহাম্মদকে রক্ষা করার ভূমিকা সত্ত্বেও তাঁর শেষ ধর্মীয় অবস্থানই বর্ণনার কেন্দ্রে এসেছে। মানুষের কাজের মূল্যকে একটি নির্দিষ্ট মতবাদে আনুগত্যের অধীন করার এই নীতির নৈতিক সমস্যা আছে। একই সঙ্গে এই দলিলগুলো ইসলামের উৎস সম্পর্কে পরিচিত একটি তথ্য সংরক্ষণ করে: এর প্রতিষ্ঠাতার পরিবার আগে থেকেই একটি পৃথক ধর্মীয় সংস্কৃতির অংশ ছিল এবং সেই সংস্কৃতি তাঁর জীবনযাপনের অবিচ্ছেদ্য পরিবেশ গড়ে দিয়েছিল।
মুহাম্মদের কৈশোর এবং পৌত্তলিকতা
কাবা পুনর্নির্মাণে হাজরে আসওয়াদ স্থাপন নিয়ে বিরোধ মীমাংসা এবং হিলফুল ফুজুলের চুক্তি মুহাম্মদের জীবনের দুটি পৃথক ঘটনা। প্রথমটিতে পাথর স্থাপনের সম্মান নিয়ে গোত্রগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দ্বিতীয়টিতে অন্যায়ের শিকার ব্যক্তির অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার সামাজিক অঙ্গীকার ছিল। দুটি ঘটনাই মক্কার পূর্ববর্তী সমাজের ভেতরে সংঘটিত। কাবা নির্মাণে মুহাম্মদের অংশগ্রহণের হাদিস তাঁর সঙ্গে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক দেখায়। তিনি যে ঘরকে পরে মুসলিম উপাসনার কেন্দ্র করবেন, সেই ঘর তাঁর নবুওয়াত ঘোষণার আগেই গোত্রীয় ধর্মজীবনের কেন্দ্র ছিল। পরিবারের মতো তাঁর নিজের জীবনও কাবার সঙ্গে যুক্ত ছিল; নতুন ধর্মের সঙ্গে এই স্থানটির সম্পর্ক সৃষ্টির শুরু মুহাম্মদের ঘোষণার পরে হয়নি। পরবর্তী কিবলা পরিবর্তন ও মক্কা জয়ের ঘটনাগুলো একই কেন্দ্রের ওপর নতুন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ধাপ হিসেবে দাঁড়ায়।
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩/ হায়েয
পরিচ্ছেদঃ ১৯. সতর ঢাকার ব্যাপারে বিশেষভাবে সতর্ক থাকা
৬৬৪। ইসহাক ইবনু ইবরাহীম আল হানযালী ও মুহাম্মাদ ইবনু হাতিম ইবনু মায়মূন, ইসহাক ইবন মানসুর ও মুহাম্মাদ ইবন রাফি’ (রহঃ) … জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন কাবা নির্মাণ করা হচ্ছিল তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আব্বাস (রাঃ) পাথর বয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। আব্বাস (রাঃ) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বললেন, পাথর বহনের সুবিধার্থে তোমার লুঙ্গি কাঁধের ওপর তুলে নাও। এরপর তিনি এরুপ করলেন। সাথে সাথেই তিনি (বেহুশ হয়ে) মাটিতে পড়ে গেলেন। আর তার উভয় চোখ আকাশের দিকে নিবদ্ধ হল। তারপর তিনি দাঁড়িয়ে বললেন, আমার লুঙ্গি! আমার লুঙ্গি! এর পর তার লুঙ্গি পরিয়ে দেয়া হল। ইবনু রাফি তাঁর রিওয়ায়েতে কাঁধের স্থলে ঘাড়ের উল্লেখ করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ)

কাবার পাথর বহনের বর্ণনায় মুহাম্মদ ও আব্বাসকে একই কাজে যুক্ত দেখা যায়। এই শ্রম একটি উপাসনাস্থলের সামাজিক রক্ষণাবেক্ষণের অংশ। কাবা তখন ইসলামের একচ্ছত্র প্রতিষ্ঠান ছিল না; তার মর্যাদা ও সেবার অধিকার নিয়ে কুরাইশের বিভিন্ন পরিবারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। পরবর্তী সময়ে এই ঘরকে কেন্দ্র করে মুসলিমদের বাধ্যতামূলক ধর্মাচার গড়ে ওঠায় আগের স্থানিক মর্যাদাই আরও বিস্তৃত প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। একটি নতুন ধর্ম পুরোনো পবিত্র কেন্দ্রকে গ্রহণ করলে উপাসকদের অভ্যাস, স্থানের পরিচিতি এবং তার চারপাশে গড়ে ওঠা সামাজিক সম্পর্কও নতুন ব্যবস্থার পক্ষে কাজ করে। কাবার দীর্ঘ পূর্বপরিচিত অবস্থান ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্য প্রস্তুত একটি প্রতীকী ভিত্তি সরবরাহ করেছিল।
বংশপরিচয়, পাথর স্থাপনের সম্মান, তীর্থযাত্রীর সেবা এবং কাবার নির্মাণ—এসব বিষয় একত্রে পবিত্রতার সামাজিক উৎপাদন দেখায়। একটি স্থাপনার মর্যাদা শুধু তার দেয়াল বা পাথরে থাকে না; বহু মানুষের আচরণ, বংশের দাবি এবং বর্ণনার মাধ্যমে তা বহন করা হয়। ইসলাম এই পুরোনো মর্যাদাকে আরও বৃহত্তর ধর্মীয় বাধ্যবাধকতায় পরিণত করেছে। নবুওয়াতের আগের ঘটনাগুলো তাই পরবর্তী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বাস্তব পূর্বশর্ত বোঝার উপাদান। এই প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে পারিবারিক উত্তরাধিকার ও গোত্রীয় কর্তৃত্ব স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।
ইসলামপূর্ব মক্কার একেশ্বরবাদীগণ
ইসলামের আগের মক্কায় প্রচলিত দেবতাদের প্রত্যাখ্যান এবং ইব্রাহিমের ধর্ম অনুসন্ধানের বিবরণ পাওয়া যায়। ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় ওয়ারাকা ইবনে নওফল, উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহশ, উসমান ইবনে হুওয়াইরিস এবং যায়দ ইবনে আমর ইবনে নুফাইল—এই চারজন একটি উৎসব থেকে আলাদা হয়ে নিজেদের গোত্রের উপাসনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। উবাইদুল্লাহর মাতা ছিলেন উমাইমা বিনতে আবদুল মুত্তালিব; মুহাম্মদের স্ত্রী যয়নাব বিনতে জাহশ ছিলেন তাঁর বোন। এই পরিচয়গুলো দেখায়, নতুন ধর্মীয় অনুসন্ধান মুহাম্মদের পারিবারিক ও সামাজিক বৃত্তের খুব কাছেই চলছিল। যায়দের পুত্র সাইদ পরে মুহাম্মদের অনুসারীদের অন্তর্ভুক্ত হন। আবু জর তাঁর নিজের বিবরণে মুহাম্মদের সঙ্গে সাক্ষাতের তিন বছর আগে থেকেই আল্লাহর উদ্দেশে প্রার্থনা করার কথা বলেছেন। একেশ্বরবাদ, ইব্রাহিমের অনুসন্ধান এবং প্রচলিত দেবতার সমালোচনা আরবে মুহাম্মদের একক আবিষ্কার ছিল না। [25]
সীরাতের কাহিনিতে চারজনের বক্তব্যের কেন্দ্র পাথরের অক্ষমতা এবং পূর্বপুরুষ ইব্রাহিমের ধর্ম থেকে বিচ্যুতির অভিযোগ। এই দুটি যুক্তিই পরে ইসলামের মূর্তিপূজাবিরোধী ভাষণে গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। [26]
فقال بعضهم لبعض: تعلموا والله ما قومكم على شيء، لقد أخطئوا دين أبيهم إبراهيم، ما حجر نطيف به، لا يسمع ولا يبصر، ولا يضر ولا ينفع، يا قوم التمسوا لأنفسكم دينا، فإنكم والله ما أنتم على شيء. فتفرقوا في البلدان يلتمسون الحنيفية، دين إبراهيم.
বাংলা অনুবাদ:
তাঁরা একে অপরকে বললেন: আল্লাহর শপথ, তোমাদের গোত্র কোনো সঠিক পথে নেই। তারা তাদের পিতা ইব্রাহিমের ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়েছে। যে পাথরের চারপাশে আমরা ঘুরি, সেটি কী? সে শোনে না, দেখে না, ক্ষতি করতে পারে না, উপকারও করতে পারে না। হে লোকেরা, নিজেদের জন্য একটি ধর্ম খোঁজো; আল্লাহর শপথ, তোমরা কোনো সঠিক পথে নেই। এরপর তাঁরা ইব্রাহিমের ধর্ম হানিফিয়্যা অনুসন্ধান করতে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়লেন।
এই বিবরণ মক্কাকে সম্পূর্ণ ধর্মীয় অন্ধকারে ডুবে থাকা একটি বিচ্ছিন্ন জনপদ হিসেবে দেখানোর বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য। নিজস্ব সমাজের ভেতরেই দেবতার সমালোচনা, অন্য ধর্মের গ্রন্থের প্রতি আগ্রহ এবং ভিন্ন বিশ্বাসের অনুসন্ধান চলছিল। ওয়ারাকা খ্রিস্টধর্মে আগ্রহী হন, যায়দ ইব্রাহিমের একেশ্বরবাদ অনুসরণ করার দাবি করেন এবং অন্যরাও পৃথক পথে অগ্রসর হন। এমন পরিবেশে কোনো নতুন ধর্মীয় ঘোষণার জন্য ধারণাগত উপকরণ আগে থেকেই উপস্থিত থাকে। নতুনত্বের দাবি যাচাই করতে তাই আগের এই অনুসন্ধানকারীদের ভূমিকা বাদ দিলে উৎসেরই একটি বড় অংশ হারিয়ে যায়।
মুহাম্মদের সঙ্গে সাক্ষাতের আগেই আবু জরের আল্লাহ-উপাসনা
সহিহ মুসলিমে আবু জর তাঁর পূর্ববর্তী প্রার্থনার যে বিবরণ দিয়েছেন, সেখানে আল্লাহর নাম এবং নির্দিষ্ট দিক ছাড়াই উপাসনার চর্চা উপস্থিত। নবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ তাঁর ধর্মীয় অনুসন্ধানের সূচনাবিন্দু ছিল না। [27]
وَقَدْ صَلَّيْتُ يَا ابْنَ أَخِي قَبْلَ أَنْ أَلْقَى رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِثَلَاثِ سِنِينَ. قُلْتُ: لِمَنْ؟ قَالَ: لِلَّهِ. قُلْتُ: فَأَيْنَ تَوَجَّهُ؟ قَالَ: أَتَوَجَّهُ حَيْثُ يُوَجِّهُنِي رَبِّي، أُصَلِّي عِشَاءً حَتَّى إِذَا كَانَ مِنْ آخِرِ اللَّيْلِ أُلْقِيتُ كَأَنِّي خِفَاءٌ حَتَّى تَعْلُوَنِي الشَّمْسُ.
বাংলা অনুবাদ:
তিনি বলেন: হে ভ্রাতুষ্পুত্র, আল্লাহর রাসুলের সঙ্গে দেখা হওয়ার তিন বছর আগে থেকেই আমি প্রার্থনা করতাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম: কার উদ্দেশে? তিনি বললেন: আল্লাহর উদ্দেশে। আমি বললাম: কোন দিকে মুখ করতেন? তিনি বললেন: আমার রব যেদিকে পরিচালিত করতেন, সেদিকে মুখ করতাম। রাতে প্রার্থনা করতাম; রাতের শেষভাগ হলে চাদরের মতো পড়ে থাকতাম, সূর্য আমার ওপর উঠে আসা পর্যন্ত।
এই সাক্ষ্য আল্লাহর ধারণা ও তাঁর উদ্দেশে ব্যক্তিগত উপাসনাকে মুহাম্মদের শিক্ষা থেকে পৃথক একটি পূর্ববর্তী জীবনে স্থাপন করে। সমাজে শুধু বহু দেবতার অনুসারী ছিল এবং মুহাম্মদ এসে প্রথম এক ঈশ্বরের কথা বললেন—এমন সরল চিত্রের সঙ্গে এর সরাসরি সংঘর্ষ হয়। আবু জরের ভাষায় আগে থেকেই একটি ধর্মীয় অনুসন্ধান ও উপাসনার ধারা ছিল; পরে তিনি মুহাম্মদের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। আগে থেকে উপস্থিত ধারণার ওপর একটি নতুন নবী-কেন্দ্রিক আনুগত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং ধারণাটি প্রথম সৃষ্টি করা এক ঘটনা নয়। ইসলামের গঠনের ইতিহাসে এই পূর্ববর্তী উপাসনার সাক্ষ্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
কাবায় ইব্রাহিম ও মরিয়ম
ইসলামের তীর্থস্থান ও জন্মভূমি কাবায় একসময় নবী ইব্রাহীম এবং মরিয়ম বা খ্রিস্টধর্মের প্রবর্তক যীশুর মাতার ছবি ছিল বলে জানা যায় ইসলামেরই দলিল প্রমাণ থেকে। এর দ্বারা এটি প্রমাণিত হয় যে, ঐ অঞ্চলের মানুষদের কাছে জুডিও খ্রিস্ট ধর্ম খুবই পরিচিত ছিল, এমনকি কিছু মানুষ এই ধর্মগুলো পালনও করতো। তাই জুডিও খ্রিস্ট ধর্ম সম্পর্ক জানা মুহাম্মদের জন্য কঠিন কিছু নিশ্চয়ই ছিল না। আসুন হাদিস থেকে বিষয়টি জেনে নেয়া যাক [28] –
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫০/ আম্বিয়া কিরাম (আঃ)
পরিচ্ছেদঃ ২০০৮. মহান আল্লাহর বাণীঃ আর আল্লাহ ইবরাহীম (আঃ) কে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন। (সূরা নিসা ৪: ১২৫) মহান আল্লাহর বাণীঃ নিশ্চয়ই ইব্রাহীম ছিলেন এক উম্মত, আল্লাহর অনুগত (২৬ঃ ১২০) মহান আল্লাহর বাণীঃ নিশ্চয়ই ইব্রাহীম কোমল হৃদয় ও সহনশীল (৯ঃ ১১৪)। আর আবু মাইসারাহ (রহঃ) বলেন, হাবশী ভাষায় اواه শব্দটি الرَّحِيمُ অর্থে ব্যবহৃত হয়।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৩১১৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৩৩৫১
৩১১৪। ইয়াহ্ইয়া ইবনু সুলায়মান (রহঃ) … ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা কা’বা ঘরে প্রবেশ করলেন। সেখানে তিনি ইব্রাহীম (আলাইহিস সালাম) ও মারইয়ামের ছবি দেখতে পেলেন। তখন তিনি বললেন, তাদের (কুরাইশদের) কি হল? অথচ তারা তো শুনতে পেয়েছে, যে ঘরে প্রাণীর ছবি থাকবে, সে ঘরে (রহমতের) ফিরিশ্তাগণ প্রবেশ করেন না। এ যে ইব্রাহীমের ছবি বানানো হয়েছে, (ভাগ্য নির্ধারক জুয়ার তীর নিক্ষেপরত অবস্থায়) তিনি কেন ভাগ্য নির্ধারক তীর নিক্ষেপ করবেন!
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)
ইব্রাহিম ও মরিয়মের ছবি একই ঘরে থাকার বিবরণ দেখায়, মক্কার পবিত্রতার ভাষায় বাইবেলীয় চরিত্র ইতিমধ্যেই প্রবেশ করেছিল। ইব্রাহিমের ছবিতে ভাগ্যনির্ধারণের তীর থাকার অভিযোগ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ: একটি আব্রাহামিক চরিত্রকে স্থানীয় ধর্মাচারের সঙ্গে যুক্ত করে কল্পনা করা হয়েছে। অর্থাৎ দেবতা, নবী ও ধর্মীয় আচারের সীমারেখা পরে যে কঠোর সংজ্ঞায় আলাদা করা হয়েছে, পূর্ববর্তী লোকাচারে সেগুলো মিশে থাকতে পারত। মুহাম্মদের প্রতিবাদও ছবির অস্তিত্ব স্বীকার করে তার ধর্মীয় যথার্থতা প্রত্যাখ্যান করছে। একই স্থানকে কেন্দ্র করে পুরোনো ব্যাখ্যা বাতিল এবং নতুন ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠার দৃশ্য এখানেও পাওয়া যায়। [29]
মরিয়মের উপস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, কারণ তিনি আরবের স্থানীয় গোত্রদেবী নন; তাঁর পরিচয় খ্রিস্টীয় কাহিনির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কাবার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তাঁর ছবি থাকার বর্ণনা সেই কাহিনির সামাজিক পরিচিতির সাক্ষ্য হিসেবে কাজ করে। একজন মক্কাবাসীর বাইবেলীয় চরিত্র সম্পর্কে জানার জন্য দূরের অজানা জগৎ থেকে প্রতিটি তথ্য আলাদাভাবে আসার প্রয়োজন ছিল না। পারিবারিক যোগাযোগ, ধর্মান্তরিত আত্মীয়, ভ্রমণকারী, দাস ও বাজারের আলাপের মাধ্যমে গল্প ও ধারণা চলাচল করতে পারত। যে পবিত্র কেন্দ্রে তাঁর পরিবার সক্রিয় ছিল, সেখানেই এসব চরিত্রের উপস্থিতি ইসলামের মানবীয় সাংস্কৃতিক পরিবেশকে আরও নির্দিষ্ট করে।
কাবায় বাইবেলসদৃশ উক্তির বিবরণ
ইবনে ইসহাকের সীরাতে কাবার সঙ্গে সিরীয় ভাষার লিপি, একজন ইহুদির পাঠোদ্ধার এবং ভালো-মন্দ বপনের ফল সম্পর্কে একটি নীতিবাক্যের কাহিনি সংরক্ষিত আছে। শেষোক্ত বিবরণটি লাইস ইবনে আবি সুলাইমের নামে এসেছে এবং তার সঙ্গে নবুওয়াতের চল্লিশ বছর আগের সময়ের উল্লেখ যুক্ত। নীতিবাক্যে বলা হয়েছে, মন্দ কাজ করে ভালো প্রতিদান পাওয়া যায় না, যেমন কাঁটা থেকে আঙুর সংগ্রহ করা যায় না। মথির সুসমাচারে কাজের ফল এবং ভালো-মন্দ গাছের ফলের যে উপমা আছে, তার সঙ্গে এই ভাষার স্পষ্ট মিল রয়েছে। সীরাতের বর্ণনার মধ্যে সংরক্ষিত এই সাদৃশ্য মক্কার ধর্মীয় স্মৃতিতে আব্রাহামিক নীতিকথা ও স্থানীয় পবিত্র স্থানের সম্পর্ক দেখায়। [30] [31]
Matthew 7:16-20 New Living Translation (NLT)
You can identify them by their fruit, that is, by the way they act. Can you pick grapes from thornbushes, or figs from thistles? A good tree produces good fruit, and a bad tree produces bad fruit. A good tree can’t produce bad fruit, and a bad tree can’t produce good fruit. So every tree that does not produce good fruit is chopped down and thrown into the fire. Yes, just as you can identify a tree by its fruit, so you can identify people by their actions.
বাঙলা অনুবাদঃ [32]
১৬ তাদের জীবনের ফল দেখেই তোমরা তাদের চিনতে পারবে৷ কেউ কি কাঁটাঝোপের মধ্যে থেকে দ্রাক্ষা বা শিয়ালকাঁটার ভেতর থেকেডুমুর পেতে পারে?
১৭ ঠিক সেই ভাবে প্রত্যেক ভাল গাছে ভাল ফলই ধরে, কিন্তু খারাপ গাছে খারাপ ফলই ধরে৷
১৮ ভাল গাছে খারাপ ফল এবং খারাপ গাছে ভাল ফল ধরতে পারে না৷
মথির উপমার সঙ্গে তুলনা করার জন্য কাবার লিপি সম্পর্কে ইবনে ইসহাকের সংরক্ষিত বিবরণটি নিচে দেওয়া হলো। এখানে সিরীয় ভাষায় লেখা পাঠ করতে একজন ইহুদির সাহায্য নেওয়ার কথা যেমন আছে, তেমনি কাবায় পাওয়া বলে কথিত নীতিবাক্যের বিবরণও আছে। একাধিক বর্ণনা একই পরিচ্ছেদে সংরক্ষিত হয়েছে। [33]
আমাকে একজন বলেছে, যে কোণে কোরাইশরা সিরীয় ভাষায় কিছু লিপি পেয়েছিল, সে লেখা তারা পড়তে পারেনি। পেরেছিল একজন ইহুদি। ইহুদি ভদ্রলোক লেখাটা তাদের পড়ে শুনিয়েছিলেন: আমি আল্লাহ বাক্কার প্রভু, যেদিন আমি আকাশ সৃষ্টি করলাম, পৃথিবী সৃষ্টি করলাম, সূর্য আর চাঁদকে বানালাম, তাদের ঘিরে দিলাম সাতটি গুণাবান ফেরেশতা দিয়ে, সেদিনই আমি এটা সৃষ্টি করেছিলাম। এর দুটি পর্বত দণ্ডায়মান থাকবে, এটাও দণ্ডায়মান থাকবে দুধ আর পানিসহ। এ থাকবে মানুষের কাছে নিয়ামত হয়ে। আমাকে একজন বলেছে, তারা মাকামে আরেকটা লেখা পেয়েছিল এবং তা ছিল মক্কা আল্লাহর পবিত্র ঘর. এর খাদ্য আসে তিন দিক থেকে, এর লোকজন যেন প্রথমে এর অবমাননা না করে।
লায়ছ ইবনে আবু সুলায়ম দাবি করেছেন, রাসুলে করিমের (সা.) নবুয়তের ৪০ বছর আগে তারা কাবায় একটি পাথর পেয়েছিল। তাদের কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে তাদের মতে সেই পাথরে উৎকীর্ণ লিপির পাঠ ছিলঃ যে ভালো বপন করবে, সে আনন্দদায়ক ফসল পাবে, যে মন্দ বপন করবে, সে মন্দ ফসল পাবে। তুমি কি মন্দ করে তার পুরস্কার ভালো পেতে পারো? না, যেমন কাঁটা থেকে আঙুর ফল সংগ্রহ করা যায় না।

ভালো বীজে ভালো ফল, মন্দ বীজে মন্দ ফল এবং কাঁটা থেকে আঙুর না পাওয়ার উপমা মানুষের আচরণকে বিচার করার একটি স্মরণযোগ্য ভাষা। এই উপমা প্রচারিত হলে তার ভাবার্থ বোঝার জন্য মূল ধর্মগ্রন্থ হাতে নিয়ে পড়া বাধ্যতামূলক হয় না। মুখে শোনা একটি বাক্যও ধর্মীয় প্রচারের অংশ হয়ে যেতে পারে। সীরাতের এই কাহিনি তাই মৌখিক ও অনূদিত ধর্মীয় ভাষার চলাচল বোঝার উপাদান। আরবি সমাজে বাইবেলীয় ধারণা পৌঁছানোর প্রশ্নকে কেবল “মুহাম্মদ নিজে বাইবেল পড়েছিলেন কি না” প্রশ্নে নামিয়ে আনলে যোগাযোগের বাস্তব পথগুলো বাদ পড়ে যায়। শ্রবণ, ব্যাখ্যা, অনুবাদ ও লোকমুখে প্রচার—এই প্রতিটি পথেই একটি ধর্মীয় উপমা ভিন্ন সমাজে প্রবেশ করতে পারে।
ইবনে ইসহাক শেষ বিবরণের সময় নিজেই “যদি তাঁর বর্ণনা সত্য হয়” কথাটি ব্যবহার করেছেন। ফলে এখানে হাতে পাওয়া কোনো সংরক্ষিত প্রাচীন পাথর পরীক্ষা করার সুযোগের বদলে একটি সাহিত্যিক সাক্ষ্য পাওয়া যাচ্ছে: পরবর্তী মুসলিম জীবনীকার কাবার অতীত ব্যাখ্যা করতে বাইবেলসদৃশ ভাষার কাহিনি সংরক্ষণ করেছেন। কাবার পবিত্রতা প্রমাণের জন্য আকাশ-পৃথিবীর সৃষ্টির দিন পর্যন্ত তার ইতিহাস টেনে নেওয়া এবং নীতিকথার সঙ্গে তাকে যুক্ত করা একই ধর্মীয় স্মৃতি নির্মাণের অংশ। এই স্মৃতিতে কাবা, আল্লাহ, ফেরেশতা, আসমান এবং নৈতিক প্রতিদান পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। নতুন ধর্মের বর্ণনাজগৎ গড়ে উঠেছে এমন এক পরিবেশে, যেখানে এই চরিত্র ও ধারণাগুলো আগেই প্রচলিত বিভিন্ন ধারায় চলাচল করছিল।
যায়দ ইবনে আমর
যায়দ ইবনে আমর ইবনে নুফাইল মুহাম্মদের নবুওয়াত ঘোষণার আগেই মক্কার প্রচলিত দেবতা ও তাদের উদ্দেশে বলিদানের বিরোধিতা করতেন বলে ইসলামি গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। তাঁর পুত্র সাইদ পরে মুহাম্মদের প্রখ্যাত অনুসারী হন। যায়দকে পরকালে একক উম্মত হিসেবে উত্থাপনের বিবরণও সীরাতসাহিত্যে আছে। ওয়ারাকা ইবনে নওফল এবং যায়দকে একই ধর্মীয় অনুসন্ধানের পরিবেশে স্থাপন করা হয়েছে; যায়দের মৃত্যুতে ওয়ারাকার শোকগাথাও সংরক্ষিত হয়েছে। এই যোগাযোগগুলো মুহাম্মদের পারিবারিক বৃত্তের সঙ্গে আগের একেশ্বরবাদী অনুসন্ধানের সংযোগ দেখায়। যায়দের সঙ্গে মুহাম্মদের সাক্ষাতের আরও প্রত্যক্ষ বিবরণ বুখারিতেও আছে। [34]
একদিন যায়দ ইব্ন আমর রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট আসেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তখন যায়দ ইব্ন হারিছাকে সঙ্গে নিয়ে একটি খাঞ্চা থেকে আহার করছিলেন। যায়দ ইব্ আমরকে খেতে আহ্বান করা হলে তিনি বললেন, ভাতিজা! আমি দেবতার নামে বলি দেওয়া পশু খাই না। “১
মুহাম্মদ ইব্ন সা’দ হিজর ইব্ন আবু ইহাব থেকে বর্ণনা করেছেন যে, হিজর বলেন, যায়দ ইব্ন আমর সিরিয়া থেকে ফিরে আসার পর একদিন আমি দেখতে পেলাম যে, তিনি সূর্যের দিকে লক্ষ্য রাখছেন। আমি তখন বুওয়ানা মূর্তির কাছে দাঁড়িয়ে। সূর্য পশ্চিম দিকে ঢলে পড়লে কিবলার দিকে মুখ করে তিনি দু’সিজদায় এক রাকাত নামায আদায় করেন। তারপর বলেন: এই হলো ইবরাহীম ও ইসমাঈলের কিবলা। আমি পাথরের পূজাও করি না এবং পাথরের উদ্দেশ্যে নামাযও পড়ি না। মূর্তির নামে বলি দেওয়া পশু খাই না, লটারীর মাধ্যমে ভাগ্য নির্ণয় করি না। মরণ পর্যন্ত আমি এই ঘরের দিকে মুখ করে নামায পড়ে যাব।
[ ১. সম্ভবত রসূলুল্লাহ (সা)-যে দেবতার নামে যবাইকৃত পশু গোশত আহার করতেন না, তা তাঁর জানা ছিল না। ]
যায়দ ইব্ন আমর হজ্জ করতেন এবং আরাফায় অবস্থান করতেন। তিনি তালবিয়া পড়তেন এবং তাতে বলতেন, “তোমার দরবারে আমি হাজির। তোমার কোনো অংশীদার নেই। নেই কোন সমকক্ষ।” অতঃপর লাব্বাইক বলতে বলতে পায়ে হেঁটে আরাফ’ থেকে ফিরে আসতেন।
ইমাম বুখারী (র) আব্দুল্লাহ ইবন আমর (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, ইবন উমর (রা) বলেন, ওহী অবতরণ শুরু হওয়ার আগে একদিন বালদাহ-এর নিম্নাঞ্চলে যায়দ ইব্ন আমর-এর সঙ্গে নবী করীম (সা)-এর সাক্ষাত হয়। আমি তাঁর সামনে খাঞ্চা এগিয়ে দিই। কিন্তু তিনি তা খেতে অস্বীকার করেন। তখন যায়দ বলে উঠলেন: আমিও তোমাদের দেবতার নামে বলি দেওয়া পশু খাই না এবং সে পশুও আমি মুখে দেই না, যা তোমরা গাইরুল্লাহ্ নামে যবাই কর। উল্লেখ্য যে, যায়দ ইব্ন আমর যবাইর ব্যাপারে কুরাইশদের সমালোচনা করে বলতেন: বকরী সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ। আল্লাহই আকাশ থেকে পানি অবতারণ করে ঘাস উৎপন্ন করে এর খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন। আর কুরাইশের লোকেরা কিনা তা যবাই করে গাইরুল্লাহর নামে!
মূসা ইবন উব্বা বর্ণনা করেন যে, যায়দ ইবন ‘আমর ইবন নুফায়ল একবার দীনের সন্ধানে সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। পথে এক ইহুদী আলিমের সাক্ষাত পেয়ে তাকে তাদের দীন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন এবং বলেন, আমি আপনাদের দীন গ্রহণ করতে আগ্রহী। অতএব এ সম্পর্কে আমাকে অবহিত করুন। জবাবে তিনি বললেন, আমাদের দীনে আসতে হলে তোমাকে আল্লাহর গযবের ভার মাথায় নিয়ে আসতে হবে। এ কথা শুনে যায়দ বললেন, আমি তো আল্লাহর গযব থেকেই পালিয়ে এসেছি আল্লাহর গযবের সামান্যও আমি বহন করতে পারব না, সে সাধ্যও আমার নেই। সম্ভব হলে আমাকে অন্য কোন দীনের সন্ধান দিন। ইহুদী আলিম বললেন, আমার বিবেচনায় তুমি ‘হানীফ’ হতে পার। যায়দ জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হানীফ’ আবার কি? তিনি বললেন, হানীফ হলো ইবরাহীম (আ)-এর দীন, যিনি ইহুদীও ছিলেন না, খৃষ্টানও ছিলেন না। তিনি আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদত করতেন না। ইহুদী পণ্ডিতের বক্তব্য শুনে যায়দ বেরিয়ে এলেন। তারপর দু’হাত উপরে তুলে বলে উঠেন, “আল্লাহ! তুমি সাক্ষী, আমি ইবরাহীমের দীন গ্রহণ করলাম।”
লায়ছ বলেন, আস্থা বিনতে আবু বকর (রা) বলেছেন আমি একদিন দেখলাম যে, যায়দ কা’বার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বলছেন, “হে কুরাইশ সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে একমাত্র আমিই ইবরাহীমের দীনের অনুসারী।”


যায়দ ইবনে আমরের ঘটনাটি বুখারী এবং নাসাই শরীফেও বর্ণনা করা আছে [35] –
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৭২/ যবহ ও শিকার
পরিচ্ছেদঃ ৭২/১৬. যে জন্তুকে দেব-দেবী ও মূর্তির নামে যবহ করা হয়।
৫৪৯৯. ’’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’বালদাহ’র নিম্নাঞ্চলে যায়দ ইবনু ’আমর ইবনু নবীাইলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এটি ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর অহী অবতীর্ণ হবার পূর্বের ঘটনা। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে দস্তরখান বিছানো হল। তাতে গোশত ছিল। তখন যায়দ ইবনু ’আমর তা থেকে খেতে অস্বীকার করলেন। তারপর তিনি বললেনঃ তোমরা তোমাদের দেব-দেবীর নামে যা যবহ কর, তা থেকে আমি খাই না। আমি কেবল খাই যা আল্লাহর নামে যবহ করা হয়েছে। (আধুনিক প্রকাশনী- ৫০৯৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৯৯০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ)
বুখারির আরবি বিবরণে মুহাম্মদের পক্ষ থেকে যায়দের সামনে মাংসের খাবার এগিয়ে দেওয়ার কথা আছে; যায়দ তা প্রত্যাখ্যান করে নিজের ধর্মীয় অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। বিদ্যমান বাংলা অনুবাদে খাবার এগিয়ে দেওয়ার বাক্যটি নিষ্ক্রিয় রূপে এসেছে। আরবি মূলের সক্রিয় বাক্যে ঘটনাটিতে মুহাম্মদের ভূমিকা আরও স্পষ্ট। [36]
أَنَّهُ لَقِيَ زَيْدَ بْنَ عَمْرِو بْنِ نُفَيْلٍ بِأَسْفَلِ بَلْدَحٍ، وَذَاكَ قَبْلَ أَنْ يُنْزَلَ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْوَحْيُ، فَقَدَّمَ إِلَيْهِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سُفْرَةً فِيهَا لَحْمٌ، فَأَبَى أَنْ يَأْكُلَ مِنْهَا، ثُمَّ قَالَ: إِنِّي لَا آكُلُ مِمَّا تَذْبَحُونَ عَلَى أَنْصَابِكُمْ، وَلَا آكُلُ إِلَّا مِمَّا ذُكِرَ اسْمُ اللَّهِ عَلَيْهِ.
বাংলা অনুবাদ:
তিনি বালদাহর নিম্নভাগে যায়দ ইবনে আমর ইবনে নুফাইলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ঘটনাটি আল্লাহর রাসুলের ওপর ওহি অবতীর্ণ হওয়ার আগের। রাসুল তাঁর সামনে মাংস রাখা একটি খাবারের আয়োজন এগিয়ে দেন। যায়দ তা খেতে অস্বীকার করেন। এরপর তিনি বলেন: তোমরা তোমাদের উপাসনাবেদিতে যা জবাই করো, আমি তা খাই না। যে প্রাণীর ওপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়েছে, আমি শুধু তা-ই খাই।
ঘটনাটিতে যায়দ একজন সক্রিয় ধর্মীয় সমালোচক হিসেবে উপস্থিত। তিনি মুহাম্মদের কাছ থেকে নতুন বিধান শুনে দেবতার উদ্দেশে জবাই প্রত্যাখ্যান করছেন—এমন ক্রম নেই। তাঁর অস্বীকৃতি আগেই গড়ে ওঠা নিজের বিশ্বাসের প্রকাশ। আল্লাহর নাম, উপাসনাবেদির বিরোধিতা এবং খাদ্যের ধর্মীয় বৈধতা নিয়ে তাঁর বক্তব্য পরবর্তী ইসলামের পরিচিত ভাষার সঙ্গে মেলে। এই সাক্ষাৎ সরাসরি দেখায়, মুহাম্মদের সামনে তাঁর সমাজের একজন মানুষ ইতিমধ্যেই এমন বক্তব্য রাখছিলেন। একেশ্বরবাদী সমালোচনার ঐতিহাসিক অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠলে যায়দের এই অবস্থান পাশ কাটানো যায় না।
ধর্মীয় ইতিহাসে আগের সমালোচকের ভূমিকা আড়াল হলে পরে সফল আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতাই সমস্ত ধারণার একমাত্র উৎস বলে মনে হতে পারেন। যায়দের বর্ণনা সেই ধারণার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট একটি উদাহরণ। মূর্তির অক্ষমতা, বিশেষ বলিদান বর্জন এবং ইব্রাহিমের ধর্ম অনুসন্ধানের কথা তাঁর সঙ্গে যুক্ত ছিল। মুহাম্মদের ঘোষণায় এসব উপাদান পরে একটি বৃহত্তর অনুসারীসমাজ, ধর্মগ্রন্থ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হয়েছে। কোনো ধারণার প্রচারে সাফল্য এবং ধারণাটির প্রথম উদ্ভাবনকে এক করে ফেললে আগের এই উপস্থিতি মুছে যায়।
ওয়ারাকা বিন নওফলের ভূমিকা
ওয়ারাকা ইবনে নওফল ছিলেন খাদিজার চাচাতো ভাই এবং ইসলামপূর্ব মক্কার খ্রিস্টধর্ম গ্রহণকারী একজন গ্রন্থপরিচিত ব্যক্তি। বুখারির বর্ণনায় তাঁর ইনজিল থেকে আরবিতে লেখার কথা আছে; অন্য বর্ণনায় হিব্রু ভাষায় লেখার উল্লেখ রয়েছে। মুহাম্মদের প্রথম অভিজ্ঞতা বোঝাতে খাদিজা তাঁকেই বেছে নেন। মুহাম্মদ নিজের অভিজ্ঞতা বলতে গেলে ওয়ারাকা সেটিকে মুসার কাছে আগত নামুসের সঙ্গে চিহ্নিত করেন এবং ভবিষ্যৎ বিরোধের কথা বলেন। এই পরিচয় নির্ধারণে তাঁর পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থ-পরিচিতি কার্যকর ছিল। বর্ণনায় অভিজ্ঞতার অতিপ্রাকৃত পরিচয় প্রথম ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন একটি পূর্ববর্তী আব্রাহামিক ঐতিহ্যের মানুষ। ওয়ারাকার সঙ্গে সাক্ষাৎ তাই নতুন নবুওয়াতের দাবির সামাজিক গ্রহণ ও ধর্মীয় অর্থ নির্ধারণের একটি কেন্দ্রীয় ঘটনা। [37] [38] [39]
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫২/ তাফসীর
পরিচ্ছেদঃ পরিচ্ছেদ নাই
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৪৫৯০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪৯৫৩ – ৪৯৫৪
৪৫৯০। ইয়াহইয়া ইবনু বুকায়র ও সাঈদ ইবনু মারওয়ান (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ঘুমন্ত অবস্থায় সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি ওহী শুরু হয়েছিল। ঐ সময় তিনি যে স্বপ্ন দেখতেন, তা প্রভাতের আলোর মতই সুস্পষ্ট হত। এরপর নির্জনতা তাঁর কাছে প্রিয় হয়ে উঠলো। তিনি হেরা গুহায় চলে যেতেন এবং পরিবার-পরিজনের কাছে আসার পূর্বে সেখানে একটানা কয়েকদিন পর্যন্ত তাহান্নুস করতেন। তাহান্নুস মানে বিশেষ নিয়মের ইবাদত। এজন্য তিনি কিছু খাবার নিয়ে যেতেন। এরপর তিনি খাদিজা (রাঃ) কাছে ফিরে এসে পুনরায় অনুরূপ কিছু খাবার নিয়ে যেতেন। অবশেষে হেরা গুহায় থাকা অবস্থায় আকস্মিক তাঁর কাছে সত্যবানী এসে পৌঁছল। ফেরেশতা তাঁর কাছে এসে বললেন, পড়ুন। রাসূলসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি পড়তে পারিনা।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এরপর তিনি আমাকে খুব জোরে জড়িয়ে ধরলেন। এতে আমি খুব মারাত্মক কষ্ট অনুভব করলাম। এরপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, পড়ুন। আমি বললাম, আমি তো পড়তে পারিনা। রাসূলসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এরপর তিনি দ্বিতীয়বারের মত আমাকে খুব জোরে জড়িয়ে ধরলেন। এবারও আমি খুব মারাত্মক কষ্ট অনুভব করলাম। এরপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, পড়ুন। আমি বললাম, আমি পড়তে পারিনা। এরপর তিনি তৃতীয়বারের মত আমাকে খুব জোরে জড়িয়ে ধরলেন। এবারও আমি খুব মারাত্মক কষ্ট অনুভব করলাম। তারপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, “পাঠ করুন আপনার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে আলাক (জমাটবাঁধা রক্তপিণ্ড) হতে। পাঠ করুন এবং আপনার রব মহিমান্বিত। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না”।
এরপর রাসূলসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই আয়াতগুলো নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। এসময় তাঁর কাঁধের পেশী ভয়ে থরথর করে কাঁপছিল। খাদিজার কাছে পৌঁছেই তিনি বললেন, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর। তখন সকলেই তাঁকে বস্ত্রাবৃত করল। অবশেষে তাঁর ভীতি কেটে গেলে তিনি খাদিজাকে বললেন, খাদিজা আমার কি হল? আমি আমার নিজের সম্পর্কে আশংকাবোধ করছি। এরপর তিনি তাঁকে সব খুলে বললেন। একথা শুনে খাদিজা (রাঃ) বললেন, কখনো নয়। আপনার জন্য সুসংবাদ। আল্লাহর কসম! আল্লাহ কখনো আপনাকে লাঞ্ছিত করবেন না। আপনি আত্মীয়দের খোঁজ-খবর নেন, সত্য কথা বলেন, অসহায় লোকদের কষ্ট লাঘব করে দেন, নিঃস্ব লোকদের উপার্জন করে দেন, মেহমানদের আপ্যায়ন করেন এবং সত্যের পথে আগত বিপদাপদে লোকদের সাহায্য করে থাকেন। তারপর খাদিজা তাঁকে নিয়ে তাঁর চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনু নাওফালের কাছে গেলেন। তিনি জাহেলী যুগে খ্রিষ্ট ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি আরবীতে বই লিখতেন। আর তিনি আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী আরবীতে ইনজীল কিতাব অনুবাদ করে লিখতেন। তিনি খুব বৃদ্ধ ও অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন।
খাদিজা (রাঃ) তাঁকে বললেন, হে আমার চাচাতো ভাই! আপনার ভাতিজা কি বলতে চায় তা শুনুন। ওয়ারাকা বললেন, হে আমার ভাতিজা! তুমি কি দেখেছ? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা কিছু দেখেছেন তা খুলে বললেন। ওয়ারাকা বললেন, এটা তো সেই ফেরেশতা যাকে পাঠানো হয়েছিল মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে। আহ! আমি যদি যুবক হতাম। আহ! সেসময় আমি যদি জীবিত থাকতাম। এরপর তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করলে রাসূলসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সত্যই তারা কি আমাকে তাড়িয়ে দিবে? ওয়ারাকা বললেন, হ্যাঁ, তারা তোমাকে তাড়িয়ে দিবে। তুমি যে দাওয়াত নিয়ে এসেছ, এ দাওয়াত যেই নিয়ে এসেছে তাকেই কষ্ট দেয়া হয়েছে। তোমার নবুয়তকালে আমি জীবিত থাকলে অবশ্যই আমি বলিষ্ঠভাবে তোমাকে সাহায্য করতাম। কিন্তু কিছুদিন পরেই ওয়ারাকা ইন্তেকাল করলেন এবং ওহী নাযিলও বেশ কিছিদিন ধরে বন্ধ ছিল যে রাসূলসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়লেন।
জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহী বন্ধ থাকা সময়কাল সম্পর্কে আলোচনার মাঝে বলেন, একবার আমি পথে হাঁটছিলাম, তখন আকাশ থেকে একটি আওয়াজ শুনতে পেলাম। মাথা উপরে তুলেই আমি দেখলাম, যে ফেরেশতা হেরা গুহায় আমার কাছে এসেছিলেন তিনি আসমান ও জমিনের মাঝে রক্ষিত একটি আসনে বসে আছেন। আমি এতে ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বাড়ি ফিরে এসে বললাম, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর। সুতরাং সকলেই আমাকে বস্ত্রাবৃত করল। তখন আল্লাহ নাযিল করলেন, “হে বস্ত্রাবৃত! উঠুন অপবিত্রতা হতে দূরে থাকুন” (সূরা মুদ্দাসসির, আয়াত ০১-০৫)। আবূ সালামা (রাঃ) বলেন, আরবরা জাহেলী যুগে সেসব মূর্তির পূজা করত তাদের الرجز বলে ঐসব মূর্তিকে বুঝানো হয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর থেকে ওহীর সিলসিলা অব্যাহত থাকে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)
খাদিজা মুহাম্মদের আচরণ ও সামাজিক গুণের কথা বলে তাঁকে আশ্বস্ত করেন; ওয়ারাকা পরিচিত ধর্মীয় ইতিহাস দিয়ে ঘটনাটির নামকরণ করেন। দুটি ভূমিকার পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। খাদিজার বক্তব্য থেকে অভিজ্ঞতাটি কষ্টদায়ক ও ভীতিকর হলেও তার ফল ভালো হবে—এমন আস্থা পাওয়া যায়। ওয়ারাকার বক্তব্য অভিজ্ঞতাটিকে সরাসরি নবুওয়াতের ধারায় স্থাপন করে। একজন উদ্বিগ্ন মানুষের অভিজ্ঞতা কখন “নবীর কাছে ফেরেশতার আগমন” হিসেবে পরিচিত হবে, সে প্রশ্নে এমন ব্যাখ্যাকারীর স্বীকৃতি বাস্তব প্রভাব ফেলে। ঘটনাটির ধর্মীয় পরিচয় কোনো স্বাধীন পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষার ফল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি; প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অভিজ্ঞতাকারীর বিবরণ এবং আরেকজন ধর্মবিশ্বাসীর ব্যাখ্যার মাধ্যমে।
ওয়ারাকার কাছে মুহাম্মদের উপস্থিতি ধর্মীয় ধারণা চলাচলের একটি বাস্তব পথও দেখায়। গ্রন্থপরিচিত আত্মীয়, তাঁর অনুবাদচর্চা, খাদিজার সঙ্গে পারিবারিক ঘনিষ্ঠতা এবং মুহাম্মদকে নিয়ে তাঁর কাছে যাওয়া—এই প্রতিটি উপাদান ইসলামি উৎসে এসেছে। লিখতে-পড়তে অক্ষমতার দাবি এই পথ বন্ধ করে না। কাহিনি, ধর্মীয় শব্দ এবং অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যা মৌখিকভাবেই বিনিময় করা যায়। তাঁদের মধ্যে যোগাযোগ ও মতামত গ্রহণের ঘটনাটি এই বর্ণনায় সরাসরি উপস্থিত। নবুওয়াতের দাবিকে বোঝার জন্য বাইরের জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এক ব্যক্তির ছবি এখানে কাজ করে না।
বিরোধীদের হাতে বহিষ্কারের সম্ভাবনার কথা বলার সময় ওয়ারাকা পূর্ববর্তী বার্তাবাহকদের বিরোধিতার একটি ধর্মীয় কাঠামো ব্যবহার করেন। এর ফলে ভবিষ্যতের বাধাও দাবির বিপক্ষে সাক্ষ্য না হয়ে নবুওয়াতের প্রত্যাশিত লক্ষণে পরিণত হতে পারে। সমর্থন মিললে তা ধর্মীয় স্বীকৃতি, বিরোধিতা মিললে তা আগের নবীদের ভাগ্যের পুনরাবৃত্তি—এমন ব্যাখ্যা একটি দাবিকে অভ্যন্তরীণভাবে খুব শক্ত করে। কিন্তু সেই ব্যাখ্যার প্রতিটি ফল আবার একই ধর্মীয় ধারণার মধ্যে ফিরে আসে। ওয়ারাকার ভূমিকা তাই শুধু সান্ত্বনার মধ্যে সীমিত থাকে না; তিনি অভিজ্ঞতার নাম, ইতিহাস এবং সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ প্রতিক্রিয়ার অর্থ নির্ধারণ করে দেন।
ওয়ারাকার মৃত্যু ও ওহী বন্ধ
ওয়ারাকার মৃত্যুর পর ওহির বিরতির উল্লেখ প্রথম অভিজ্ঞতার বর্ণনাতেই পাওয়া যায়। বুখারির ধারাবাহিকতায় প্রথম অভিজ্ঞতা, খাদিজার আশ্বাস, ওয়ারাকার স্বীকৃতি, তাঁর মৃত্যু এবং ওহির বিরতি এসেছে। এর আগে দীর্ঘদিন নিয়মিত ওহি চলছিল—এমন বিবরণ ওই ধারাবাহিকতায় নেই। বর্ণনার গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হলো, নবুওয়াতের ব্যাখ্যা দেওয়া ব্যক্তির মৃত্যু এবং নতুন দাবির শুরুর দিকের সংকট পাশাপাশি সংরক্ষিত হয়েছে। ৬৯৮২ নম্বরের দীর্ঘ বর্ণনায় ওহি বন্ধ থাকার কষ্টের সঙ্গে পর্বত থেকে নিজেকে ফেলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে যাওয়ার কথাও যুক্ত আছে। ধর্মীয় অভিজ্ঞতার অনিশ্চয়তা, স্বীকৃতির প্রয়োজন এবং বিরতির মানসিক প্রতিক্রিয়া এই অংশে প্রবলভাবে প্রকাশিত। [40] [41]
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
হাদিস নম্বরঃ (6982)
অধ্যায়ঃ ৯১/ স্বপ্নের ব্যাখ্যা করা
পাবলিশারঃ তাওহীদ পাবলিকেশন
…এরপর কিছু দিনের মধ্যেই ওরাকার মৃত্যু হয়। আর কিছু দিনের জন্য ওয়াহীও বন্ধ থাকে। এমনকি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ অবস্থার কারণে অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়লেন। এমনকি আমরা এ সম্পর্কে তার থেকে জানতে পেরেছি যে, তিনি পর্বতের চূড়া থেকে নিচে পড়ে যাবার জন্য একাধিকবার দ্রুত সেখানে চলে গেছেন। যখনই নিজেকে ফেলে দেয়ার জন্য পর্বতের চূড়ায় পৌঁছতেন, তখনই জিবরীল (আঃ) তাঁর সামনে আত্মপ্রকাশ করে বলতেন, হে মুহাম্মাদ! নিঃসন্দেহে আপনি আল্লাহর রাসূল। এতে তাঁর অস্থিরতা দূর হত এবং নিজ মনে শান্তিবোধ করতেন। তাই সেখান থেকে ফিরে আসতেন। ওয়াহী বন্ধ অবস্থা যখন তাঁর উপর দীর্ঘ হত তখনই তিনি ঐরূপ উদ্দেশে দ্রুত চলে যেতেন। যখনই তিনি পর্বতের চূড়ায় পৌঁছতেন, তখনই জিবরীল (আঃ) তাঁর সামনে আত্মপ্রকাশ করে আগের মত বলতেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

কারও মৃত্যুর পরে একটি অভিজ্ঞতার ধারা থেমে যাওয়ার উল্লেখ থাকলে তাঁর ভূমিকা সম্পর্কে অনুসন্ধান যৌক্তিক হয়ে ওঠে। ওয়ারাকা গ্রন্থজ্ঞানী ছিলেন, অনুবাদ করতেন, মুহাম্মদের অভিজ্ঞতাকে নাম দিয়েছিলেন এবং সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এই একাধিক ভূমিকার কারণে তাঁর অনুপস্থিতির তাৎপর্য আছে। অভিজ্ঞতার ধারায় বাহ্যিক আশ্বাস, ধর্মীয় কাহিনির সরবরাহ, ব্যাখ্যার নির্ভরতা বা আত্মবিশ্বাসের প্রশ্ন কতটা কাজ করেছিল—সেই প্রশ্নগুলো ওই বর্ণনার বাস্তব উপাদান থেকেই ওঠে। পাশাপাশি ওহির বিরতি দাবিটির নিয়ন্ত্রণহীন চরিত্রও প্রকাশ করে: দাবিদার প্রয়োজনের মুহূর্তে নিজ ইচ্ছায় বার্তা হাজির করতে পারছেন না এবং সেই অনুপস্থিতি তাঁর জন্য তীব্র সংকট তৈরি করছে।
৬৯৮২ নম্বর বর্ণনার পর্বতসংক্রান্ত অংশে “আমাদের কাছে যেমন পৌঁছেছে” বাক্যটি আছে। ইবনে হাজর এটি যুহরির সংযুক্ত বিবরণ হিসেবে শনাক্ত করেছেন। প্রথম অভিজ্ঞতার বিবরণ, ওয়ারাকার মৃত্যুর কথা এবং পর্বতের ঘটনাটির বর্ণনাপথ তাই একই স্তরের সাক্ষ্য নয়। এই পাঠগত তথ্যের সঙ্গে মূল প্রশ্নটি সরাসরি সম্পর্কিত: নবুওয়াতের প্রথম ব্যাখ্যা ও বিরতির ইতিহাসের কোন অংশ কোন সূত্রে সংরক্ষিত হয়েছে। ওয়ারাকার ভূমিকা, তাঁর মৃত্যু এবং বিরতির উল্লেখ একত্রে পাওয়া যায়; পর্বতসংক্রান্ত অংশ আলাদা সূত্রগত পরিচয় বহন করে। ধর্মীয় অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় মানবীয় আশ্বাস ও ব্যাখ্যাকারীর উপস্থিতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সেই অনুসন্ধানের পক্ষে প্রথম সম্পর্কটিই যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। [42]
চিকিৎসক হারিস ইবনে কালাদা
হারিস ইবনে কালাদা মুহাম্মদের সময়কার চিকিৎসক হিসেবে আরবি চিকিৎসা-ইতিহাসে পরিচিত। পরবর্তী চিকিৎসক-জীবনীতে তাঁর পারস্যভ্রমণ এবং গুন্দেশপুর অঞ্চলে চিকিৎসা শেখার কথা আছে। তায়েফের এই চিকিৎসকের পরিচয় আরবের সঙ্গে বাইরের জ্ঞানচর্চার যোগাযোগের একটি উদাহরণ। চিকিৎসা, খাদ্যসংযম, রোগ ও প্রতিকারের ধারণা সমাজে মানুষের অভিজ্ঞতা, পেশাগত শিক্ষানবিশি এবং ভ্রমণের মাধ্যমে ছড়াত। মুহাম্মদের পরিবেশকে চিকিৎসা বা শারীরবিদ্যাসংক্রান্ত সব মানবীয় জ্ঞানের বাইরে স্থাপন করলে এই পেশাগত জগৎ বাদ পড়ে যায়। নিচের ফতোয়ায় একটি বহুল প্রচলিত কথাকে মুহাম্মদের হাদিসের বদলে হারিসের উক্তি হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
২১৯৯. প্রশ্ন
আমি একজন আলেমকে স্বাস্থ্য রক্ষার গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে নিম্নোক্ত হাদীসটি বলতে শুনেছি।
المعدة بيت الداء، والحمية رأس الدواء، وأعط كل بدن ما عودته
(অর্থাৎ) উদর হল সর্বরোগের কেন্দ্র। আর খাদ্য-সংযম সর্বরোগের মহৌষধ। দেহকে তা-ই দাও, যাতে তাকে অভ্যস্ত করেছ। জানার বিষয় হল, এটি কি হাদীস। হাদীস হলে তা কোন কিতাবে আছে? জানিয়ে উপকৃত করবেন।
উত্তর
প্রশ্নোক্ত কথাটি কোথাও হাদীস হিসেবে উল্লেখেতি হলেও হাদীস বিশারদগণ বলেছেন, এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস হিসেবে প্রমাণিত নয়; বরং তা আরবের প্রসিদ্ধ চিকিৎসক হারিস ইবনে কালদাহ-এর উক্তি।
অতএব তা হাদীস হিসেবে বর্ণনা করা যাবে না।
-আলমাকাসিদুল হাসানাহ পৃ. ৬১১; কাশফুল খাফা ২/৯৩; আদ্দুরারুল মুনতাছিরাহ ১৬৮; আল লাআলিল মানসুরাহ ১৪৫; আলফাওয়াইদুল মাজমূআহ ১৬৬; যাদুল মাসীর ৩/১৮৮; রুহুল মাআনী ৫/১১০; তাফসীরে কুরতুবী ৭/১৯২
হারিসের কাছে চিকিৎসা নিতে পাঠানোর বিবরণ আবু দাউদ ও মিশকাতেও সংরক্ষিত আছে। সংশ্লিষ্ট সংকলনে এর বর্ণনাসূত্রকে দুর্বল বলা হয়েছে; একই সঙ্গে কাহিনির ভেতরে চিকিৎসকের পেশাগত ভূমিকা স্বীকৃত। একটি খাদ্যসংযমবিষয়ক উক্তি কখনো চিকিৎসকের পরামর্শ হিসেবে, কখনো নবীর বাণী হিসেবে প্রচলিত হওয়া মানবীয় জ্ঞানকে ধর্মীয় কর্তৃত্ব দেওয়ার পথ দেখায়। একই বাক্যের বিষয়বস্তু অপরিবর্তিত থেকেও বক্তার পরিচয় বদলে গেলে তার মর্যাদা বদলে যায়। চিকিৎসকের অভিজ্ঞতালব্ধ মন্তব্যকে নবীর নামে বললে তা সাধারণ পরামর্শ থেকে ধর্মীয় অনুসরণের বিষয়ে পরিণত হয়। নিচের দীর্ঘ বিবরণগুলোতে এই চিকিৎসাজগতের কয়েকটি উপাদান স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়।
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব ২১: খাদ্য
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪২২৪-[৬৬] সা‘দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক সময় আমি মারাত্মকভাবে পীড়িত হয়ে পড়লাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার খোঁজ-খবর নিতে তাশরিফ আনলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজের হাতখানা আমার দু’ স্তনের মাঝখানে (বুকের উপর) রাখলেন। তাতে আমি আমার কলিজায় শীতলতা অনুভব করলাম। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তুমি একজন হৃদ-বেদনার রোগী। সুতরাং তুমি সাক্বীফ গোত্রীয় হারিস ইবনু কালদাহ্-এর নিকট যাও। সে একজন চিকিৎসক। পরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ সে যেন অবশ্যই মদীনার সাতটি ‘আজওয়াহ্ খেজুর বীচিসহ পিষে তোমার মুখের মধ্যে ঢেলে দেয়। (আবূ দাঊদ)[1]
[1] য‘ঈফ : আবূ দাঊদ ৩৮৭৫, য‘ঈফুল জামি‘উস্ সগীর ২০৩৩, আল মু‘জামুল কাবীর লিতু ত্ববারানী ৫৩৪৬, য‘ঈফুল জামি‘ ২০৩৩।
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ হলো মুজাহিদ সা‘দ হতে বর্ণনা করাটা মুরসাল। আবূ যুর্‘আহ্ আর্ রাযী এমনটিই বলেছেন। বিস্তারিত দেখুন- ‘আওনুল মা‘বূদ ১০/২৫৫ পৃঃ, হাঃ ৩৮৭৫।
হাদিসের মানঃ যঈফ (Dai’f)
বর্ণনাকারীঃ সা’দ বিন আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ)
সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২২/ চিকিৎসা
পরিচ্ছেদঃ ১২. আজওয়া খেজুর সম্পর্কে।
৩৮৩৫. ইসহাক ইবন ইসমাইল (রহঃ) …. সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একবার আমি পীড়িত হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দেখার জন্য আসেন। এ সময় তিনি তাঁর হাত আমার বুকের উপর রাখলে আমি তাঁর শৈত্যতা আমার হৃদয়ে অনুভব করি। এরপর তিনি বলেনঃ তুমি হার্টের রুগী। কাজেই তুমি ছাকীফ গোত্রের অধিবাসী হারিছা ইবন কালদার নিকট যাও। কেননা, সে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক। আর সে যেন মদীনার আজওয়া খেজুরের সাতটা খেজুর নিয়ে, তা বীচিসহ চূর্ণ করে তোমার জন্য তা দিয়ে সাতটি বড়ি তৈরী করে দেয়।
হাদিসের মানঃ যঈফ (Dai’f)
বর্ণনাকারীঃ সা’দ বিন আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ)
ইবনে আবি উসাইবিয়ার চিকিৎসক-জীবনীতে হারিসের শিক্ষার সঙ্গে পারস্য ও গুন্দেশপুরের সম্পর্ক সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে। [43]
هو الحارث بن كلدة بن عمرو بن علاج الثقفي وثقيف من بقايا عاد، وكان الحارث من الطائف، وسافر البلاد وتعلم الطب بناحية فارس ومن أهل جنديسابور وتمرن هناك وعرف الداء والدواء، وكان يضرب بالعود تعلم ذلك أيضا بفارس واليمن. وبقي الحارث أيام رسول الله صلى الله عليه وسلم وأيام أبي بكر وعمر وعثمان وعلي بن أبي طالب ومعاوية. ولما كان بفارس كان يطب هناك ويعتمد أهلها عليه، وشاع اسمه بينهم بالفضيلة والعلم، وكان قد عالج بعض أجلائهم فبرأ وأعطاه مالا وجارية سماها الحارث سمية. ثم إن نفس الحارث اشتاقت إلى بلاده فرجع إلى الطائف واشتهر طبه بين العرب فكان يأتيه منهم الجم الغفير.
বাংলা অনুবাদ:
তিনি হারিস ইবনে কালাদা ইবনে আমর ইবনে ইলাজ আস-সাকাফি। লেখকের বংশবিবরণে সাকিফকে আদের অবশিষ্ট বংশ বলা হয়েছে। হারিস তায়েফের অধিবাসী ছিলেন। তিনি বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন, পারস্য অঞ্চলে এবং গুন্দেশপুরের লোকদের কাছে চিকিৎসা শেখেন, সেখানে অনুশীলন করেন এবং রোগ ও ওষুধ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন। তিনি বীণাও বাজাতেন; সেটিও পারস্য ও ইয়েমেনে শিখেছিলেন। লেখকের বর্ণনায় তিনি রাসুলের সময় এবং আবু বকর, উমর, উসমান, আলি ও মুআবিয়ার সময় পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। পারস্যে অবস্থানকালে তিনি চিকিৎসা করতেন এবং সেখানকার লোকেরা তাঁর ওপর নির্ভর করত। জ্ঞান ও গুণে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে। তিনি সেখানকার এক বিশিষ্ট ব্যক্তির চিকিৎসা করলে সে সুস্থ হয়ে তাঁকে অর্থ ও এক দাসী দেয়; হারিস তাঁর নাম রাখেন সুমাইয়া। পরে স্বদেশের জন্য ব্যাকুল হয়ে তিনি তায়েফে ফিরে আসেন। আরবদের মধ্যে তাঁর চিকিৎসার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেক মানুষ তাঁর কাছে আসত।
এই জীবনী মুহাম্মদের কয়েক শতক পরে লেখা চিকিৎসা-ইতিহাসের অংশ। এর বক্তব্যে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক বিষয় হলো জ্ঞান লাভের পথ: ভ্রমণ, শিক্ষা, অনুশীলন এবং রোগীর চিকিৎসা। চিকিৎসাবিষয়ক ধারণা ছড়ানোর জন্য এই পথগুলো সম্পূর্ণ মানবীয়। ধর্মীয় সাহিত্যে চিকিৎসকের নাম, তাঁর পরামর্শ এবং তাঁর কাছে যাওয়ার কাহিনি সংরক্ষিত থাকার ফলে আরবের জ্ঞানজগৎকে কোনো শূন্য অবস্থা হিসেবে দেখানো যায় না। শরীর, খাদ্য ও রোগ সম্পর্কে পরিচিত বক্তব্য ধর্মীয় ভাষণে প্রবেশ করলে তার বিষয়বস্তুর মূল্যায়নও সেই আগের চিকিৎসাচর্চার সঙ্গে তুলনা করেই করতে হয়। নবীর নামে প্রচারিত হওয়া একটি বক্তব্যের জাগতিক পূর্বসূত্র অনুসন্ধানের প্রয়োজন এখানেই তৈরি হয়।
কোরআন ও পূর্ববর্তী নবীদের গল্প
মুহাম্মদ নিজে লিখতে-পড়তে না জানলে তিনি আগের নবীদের কাহিনি কীভাবে জানতে পারতেন—এই প্রশ্নের সঙ্গে মৌখিক যোগাযোগের বিষয়টি সরাসরি যুক্ত। বুখারির একটি বর্ণনায় ইসলাম গ্রহণ করে পরে খ্রিস্টধর্মে ফিরে যাওয়া এক ওহি-লেখকের অভিযোগ সংরক্ষিত আছে: মুহাম্মদ তাঁর লিখে দেওয়া কথার বেশি জানেন না। এটি ওই ব্যক্তির অভিযোগ; বর্ণনাটি তাকে নিন্দা করার উদ্দেশ্যে পরবর্তী অলৌকিক পরিণতির কাহিনিও যুক্ত করেছে। অন্য বর্ণনায় আহলে কিতাবের লোকদের হিব্রু ভাষার ধর্মগ্রন্থ আরবিতে ব্যাখ্যা করে শোনানোর কথা আছে। কোরআনেও মানুষ থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং পুরোনো কাহিনি লিখিয়ে নেওয়ার অভিযোগ সংরক্ষিত হয়েছে। ফলে মানবীয় উৎসের প্রশ্নটি আধুনিক যুগে প্রথম তৈরি হয়নি; ইসলামের নিজস্ব গ্রন্থেই এই বিতর্কের প্রাচীন উপস্থিতি আছে। [44] [45] [46] [47] [48]
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫০/ আম্বিয়া কিরাম (আঃ)
পরিচ্ছেদঃ ২০৭৫. ইসলাম আগমনের পর নবুয়্যতের নিদর্শনসমূহ
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৩৩৫৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৩৬১৭
৩৩৫৯। আবূ মামার (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক খৃস্টান ব্যাক্তি মুসলিম হল এবং সুরা বাকারা ও সুরা আলে ইমরান শিখে নিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য সে অহী লিপিবদ্ধ করত। তারপর সে পুনরায় খৃস্টান হয়ে গেল। সে বলতে লাগল, আমি মুহাম্মদ কে যা লিখে দিতাম তার চেয়ে অধিক কিছু তিনি জানেন না। (নাউযুবিল্লাহ) কিছুদিন পর আল্লাহ তাঁকে মৃত্যু দিলেন। খৃস্টানরা তাকে যথারীতি দাফন করল। কিন্তু পরদিন সকালে দেখা গেল, কবরের মাটি তাকে বাইরে নিক্ষেপ করে দিয়েছে। তা দেখে খৃস্টানরা বলতে লাগল – এটা মুহাম্মদসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীদের কাজ।
যেহেতু আমাদের এ সাথী তাদের থেকে পালিয়ে এসেছিল। এ জন্যই তারা আমাদের সাথীকে কবর থেকে উঠিয়ে বাইরে ফেলে দিয়েছে। তাই যতদুর সম্ভব গভীর করে কবর খুঁড়ে তাতে তাকে দাফন করা হল। কিন্তু পরদিন সকালে দেখা গেল, কবরের মাটি তাঁকে (গ্রহণ না করে) আবার বাইরে ফেলে দিয়েছে। এবারও তারা বলল, এটা মুহাম্মদ ও তাঁর সাহাবীদের কাণ্ড। তাদের নিকট থেকে পালিয়ে আসার কারণে তারা আমাদের সাথীকে কবর থেকে উঠিয়ে বাইরে ফেলে দিয়েছে। এবার আরো গভীর করে কবর খনন করে সমাহিত করল। পরদিন ভোরে দেখা গেল কবরের মাটি এবারও তাঁকে বাইরে নিক্ষেপ করেছে। তখন তারাও বুঝতে পারল, এটা মানুষের কাজ নয়। কাজেই তারা শবদেহটি বাইরেই ফেলে রাখল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)
তারা বলে- ‘এগুলো পূর্ব যুগের কাহিনী যা সে [অর্থাৎ মুহাম্মাদ (সা.)] লিখিয়ে নিয়েছে আর এগুলোই তার কাছে সকাল-সন্ধ্যা শোনানো হয়।’
— Taisirul Quran
এবং তারা বলেঃ এগুলিতো সেকালের উপকথা যা সে লিখিয়ে নিয়েছে; এগুলি সকাল-সন্ধ্যায় তার নিকট পাঠ করা হয়।
— Sheikh Mujibur Rahman
তারা বলে, ‘এটি প্রাচীনকালের উপকথা যা সে লিখিয়ে নিয়েছে; এগুলো সকাল-সন্ধ্যায় তার কাছে পাঠ করা হয়।
— Rawai Al-bayan
তারা আরও বলে, ‘এগুলো তো সে কালের উপকথা, যা সে লিখিয়ে নিয়েছে; তারপর এগুলো সকাল-সন্ধ্যা তার কাছে পাঠ করা হয়।’
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
And they say, “Legends of the former peoples which he has written down, and they are dictated to him morning and afternoon.”
— Saheeh International
এভাবেই আমি নিদর্শনগুলোকে বার বার নানাভাবে বর্ননা করি। যার ফলে তারা (অর্থাৎ অবিশ্বাসীরা) বলে, তুমি (এসব কথা অন্যের কাছ থেকে) শিখে নিয়েছ, বস্তুত আমি জ্ঞানী লোকদের জন্য তা সুস্পষ্টভাবে বিবৃত করি।
— Taisirul Quran
এ রূপেই আমি নিদর্শনসমূহ প্রকাশ করি, যেন লোকেরা না বলে – তুমি কারও নিকট থেকে পাঠ করে নিয়েছ, আর যেন আমি একে বুদ্ধিমান লোকদের জন্য প্রকাশ করে দিই।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর এভাবেই আমি নানাভাবে আয়াতসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা করি এবং যাতে তারা বলে, তুমি পাঠ করেছ এবং আমি যাতে বর্ণনা করি, এ কুরআন এমন কওমের জন্য যারা জানে।
— Rawai Al-bayan
আর এভাবেই আমরা নানাভাবে আয়াতসমূহ বিবৃত করি [১] এবং যাতে তারা বলে, ‘আপনি পড়ে নিয়েছেন [২]’, আর যাতে আমরা এটাকে [৩] সুস্পষ্টভাবে জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য বর্ণনা করি [৪]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
And thus do We diversify the verses so they [i.e., the disbelievers] will say, “You have studied,”1 and so We may make it [i.e., the Qur’ān] clear for a people who know.
— Saheeh International
আমি জানি, তারা বলে, ‘এক মানুষ তাকে [অর্থাৎ মুহাম্মাদ (সা.)-কে] শিখিয়ে দেয়।’ অথচ দুষ্টবুদ্ধি প্রণোদিত হয়ে তারা যে লোকটির কথা বলছে তার ভাষা তো অনারব, অপরপক্ষে কুরআনের ভাষা হল স্পষ্ট আরবী।
— Taisirul Quran
আমিতো জানিই তারা বলেঃ তাকে শিক্ষা দেয় জনৈক ব্যক্তি। তারা যার প্রতি এটা আরোপ করে তার ভাষাতো আরাবী নয়; কিন্তু কুরআনের ভাষা স্পষ্ট আরাবী ভাষা
— Sheikh Mujibur Rahman
আর আমি অবশ্যই জানি যে, তারা বলে, তাকে তো শিক্ষা দেয় একজন মানুষ, যার দিকে তারা ঈঙ্গিত করছে, তার ভাষা হচ্ছে অনারবী। অথচ এটা হচ্ছে সুস্পষ্ট আরবী ভাষা।
— Rawai Al-bayan
আর আমরা অবশ্যই জানি যে, তারা বলে, ‘তাকে তো কেবল একজন মানুষ [১] শিক্ষা দেয়’। তারা যার প্রতি এটাকে সম্পর্কযুক্ত করার জন্য ঝুঁকছে তার ভাষা তো আরবী নয়; অথচ এটা- কুরআন- হচ্ছে সুস্পষ্ট আরবী ভাষা।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৮৫/ কুরআন ও সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে ধারন
পরিচ্ছেদঃ ৩০৯৯. রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) এর বাণীঃ আহলে কিতাবদের কাছে কোন বিষয়ে জিজ্ঞাসা করো না। আবুল ইয়ামান (রহঃ) বলেন, শুয়াইব (রহঃ), ইমাম যুহরী (রহঃ) হুমায়দ ইবন আবদুর রহমান (রহঃ) সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি মু’আবিয়া (রাঃ) কে মদীনায় বসবাসরত কুরায়শ বংশীয় কতিপয় লোককে আলাপ-আলোচনা করতে শুনেছেন। তখন কা’ব আহযাবের কথা এসে যায়। মু’আবিয়া (রাঃ) বললেন, যারা পূর্ববর্তী কিতাব সম্পর্কে আলোচনা করেন, তাদের মধ্যে তিনি অধিকতর সত্যবাদী, যদিও বর্ণিত বিষয়সমূহ ভিত্তিহীন
৬৮৫৯। মুহাম্মাদ ইবনু বাশশার (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আহলে কিতাব হিব্রু ভাষায় তাওরাত পাঠ করে মুসলিমদের সামনে তা আরবী ভাষায় ব্যাখ্যা করত। (এই প্রেক্ষিতে) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আহলে কিতাবকে তোমরা সত্যবাদী মনে করো না এবং তাদেরকে মিথ্যাবাদীও ভেবো না। তোমরা বলে দাও, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর প্রতি এবং আমাদের প্রতি যা অবতীর্ন হয়েছে এর প্রতি …. শেষ পর্যন্ত।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৮৫/ কুরআন ও সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে ধারন
পরিচ্ছেদঃ ৩০৯৯. রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) এর বাণীঃ আহলে কিতাবদের কাছে কোন বিষয়ে জিজ্ঞাসা করো না। আবুল ইয়ামান (রহঃ) বলেন, শুয়াইব (রহঃ), ইমাম যুহরী (রহঃ) হুমায়দ ইবন আবদুর রহমান (রহঃ) সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি মু’আবিয়া (রাঃ) কে মদীনায় বসবাসরত কুরায়শ বংশীয় কতিপয় লোককে আলাপ-আলোচনা করতে শুনেছেন। তখন কা’ব আহযাবের কথা এসে যায়। মু’আবিয়া (রাঃ) বললেন, যারা পূর্ববর্তী কিতাব সম্পর্কে আলোচনা করেন, তাদের মধ্যে তিনি অধিকতর সত্যবাদী, যদিও বর্ণিত বিষয়সমূহ ভিত্তিহীন
৬৮৬০। মূসা ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) … উবায়দুল্লাহ ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেছেন, তোমরা কিভাবে আহলে কিতাবদেরকে কোন বিষয়ে জিজ্ঞাসা কর? অথচ তোমাদের কিতাব (আল-কুরআন) তাঁর রাসূলের উপর সদ্য নাযিল হয়েছে, তা তোমরা পড়ছ। যা পূত-পবিত্র ও নির্ভেজাল। এই কিতাব তোমাদেরকে বলে দিচ্ছে, আহলে কিতাবগণ আল্লাহর কিতাবকে পরিবর্তন ও বিকৃত করে দিয়েছে। তারা স্বহস্তে কিতাব লিখে তা আল্লাহর কিতাব বলে ঘোষণা দিয়েছে, যাতে তার দ্বারা সামান্য সুবিধা লাভ করতে পারে। তোমাদের কাছে যে (কিতাব ও সুন্নাহর) ইল্ম রয়েছে তা কি তোমাদেরকে তাদের কাছে কোন মাসআলা জিজ্ঞাসা করতে নিষেধ করছে না? আল্লাহর কসম! আমরা তো তাদের কাউকে দেখিনি কখনো তোমাদের উপর অবতীর্ণ কিতাবের বিষয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করতে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উবাইদুল্লাহ ইবনু আবদুল্লাহ ইবন ‘উতবাহ (রহঃ)
সীরাতে মুহাম্মদের সঙ্গে খ্রিস্টান দাস জাবরের যোগাযোগের বিবরণও এসেছে। ইবনে ইসহাকের নামে সংরক্ষিত বক্তব্যে তাঁর দোকানের কাছে বসার কথা আছে এবং প্রতিপক্ষরা এই যোগাযোগকে কোরআনের মানবীয় উৎসের অভিযোগে ব্যবহার করত। একজন খ্রিস্টান দাসের সঙ্গে দেখা হওয়া, তাঁর কথাবার্তা শোনা এবং তাঁর কাছ থেকেই কোরআনের সব বিষয় নেওয়ার অভিযোগ একমাত্রার দাবি নয়। প্রথম সম্পর্কটি সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগের বিবরণ; শেষ দাবিটি প্রতিপক্ষের ব্যাখ্যা। এই পার্থক্য বজায় রেখেই যোগাযোগটির তাৎপর্য স্পষ্ট: ধর্মীয় গল্প ও ধারণা শোনার মানবীয় সুযোগ তাঁর চারপাশে ছিল। [49] [9]
আমার জানামতে, রাসুলে করিম (সা.) প্রায়ই আল-মারওয়ার বনু আল-হাজরামির ক্রীতদাস জাবর নামের এক জোয়ান খ্রিষ্টানের দোকানে বসতেন। ওরা সবাই বলত, ‘মুহাম্মদ যা আনে, তার বেশির ভাগ জিনিস শিখিয়ে দেয় ওই জাবর খ্রিষ্টান, বনু আল-হাজরামির ক্রীতদাস।’
আল্লাহ তাদের সেই কথার ওপর নাজিল করেন, ‘আমরা ভালো করে জানি তারা বলে, “কোন একজন মরা মানুষই তাকে শিক্ষা দেয়।” যে ভাষায় তারা কথা বলে, তা বিদেশি কিন্তু এ তো একেবারে বিশুদ্ধ আরবি জবান।

তাফসিরের দীর্ঘ আলোচনায় অনারব দাস, কামার, ধর্মগ্রন্থ পাঠকারী ব্যক্তি এবং মুহাম্মদের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা সংরক্ষিত হয়েছে। বালআম, ইয়াঈশ, জাবর এবং অন্য নামগুলো সব বিবরণে অভিন্ন নয়। ব্যাখ্যাকারীরা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করার উদ্দেশ্যে লিখলেও তাঁদের সংরক্ষিত বিবরণে যোগাযোগের বাস্তব পথগুলো উপস্থিত আছে। প্রতিপক্ষের বক্তব্য উদ্ধৃত করে পরে তাকে মিথ্যা বলা সেই বক্তব্যের ঐতিহাসিক উপস্থিতি প্রকাশ করে; সত্যতা যাচাইয়ে তখন সংশ্লিষ্ট যোগাযোগ, সময় ও অভিযোগের বিষয়বস্তু আলাদাভাবে পরীক্ষা করা যায়। নিচের উদ্ধৃতিতে এসব বর্ণনা ও ব্যাখ্যা বিস্তারিতভাবে আছে। [50]
আল্লামা বগভী (র.) লিখেছেন, যে ব্যক্তি সম্পর্কে তারা এ মিথ্যা কথা বলত, তাকে নির্দিষ্ট করে কেউ এ পর্যন্ত তার নাম ঠিকানা বলেনি তবে ইবনে জারীর মসনদে অতি দুর্বল সনদে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর কথার উদ্ধৃতি দিয়েছেন । মক্কা মুয়াযযামায় সে যুগে একজন অনারব খ্রিস্টান গোলাম ছিল, তার নাম ছিল বালআম। পেশার দিক থেকে সে ছিল একজন কামার । হযরত রাসূলুল্লাহ -এর সঙ্গে বালআমের কোনো কোনো সময় কথাবার্তা হতো। তাই কাফেররা বলত লাগল, এই বালআমই তাঁকে কুরআন শিক্ষা দেয়।
হযরত ইকরিমা (র.) বলেছেন, বনী মুগীরার ইয়াইশা নামক একজন গোলাম ছিল। হুজুর তাকে কুরআন শিক্ষা দিতেন। কাফেররা বলতে লাগল, এ ইয়াইশাই তাঁকে কুরআন শিক্ষা দেয়।
ইমাম ফররা বলেছেন, হুয়াইতব ইবনে আব্দুল ওযযার আয়েশ নামক এক গোলাম ছিল। সে অনারবি ভাষায় কথা বলত। কোনো কোনো কাফের বলত যে তিনি আয়েশ থেকেই কুরআন শিখে নেন। অবশেষে আয়েশ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং সুদৃঢ় ঈমানের অধিকারী হয়েছিলেন।
হযরত ইবনে ইসহাক (র.) বর্ণনা করেন, হযরত রাসূলে আকরাম এর একজন রুমী ঈসায়ী গোলামের সঙ্গে কথা বলতেন, তার নাম ছিল জবর । সে বনীল হজরম গোত্রের এক ব্যক্তির গোলাম ছিল সে কিতাব পত্র পাঠ করতে পারত। আব্দুল্লাহ ইবনে মুসলিম হাজরামী বর্ণনা করেন, আমাদের দুটি ইয়ামনী গোলাম ছিল। একজনের নাম ছিল ইয়াছার, আরেকজন ছিল জবর । তারা উভয়ে মক্কায় তরবারি তৈরি করত এবং তাওরাত ইঞ্জিল পাঠ করত। কখনো কখনো হযরত রাসূলুল্লাহ তাদের দিক দিয়ে অতিক্রম করতেন, তাদেরকে তাওরাত ইঞ্জিল পাঠ করতে দেখে তিনি তা তা শ্রবণ করতেন। ইবনে আবি হাতেম হুসাইন ইবনে আব্দুল্লাহর সূত্রে একথাই বর্ণনা করেছেন।
যাহহাক (র.) বর্ণনা করেছেন, দুর্বৃত্তরা যখন হুজুর -কে কষ্ট দিত, তখন তিনি এ দু ব্যক্তির সঙ্গে বসতেন এবং তাদের কথায় তিনি সান্তনা লাভ করতেন। মুশরিকরা বলতে লাগল, মুহাম্মদ এ দু ব্যক্তি থেকেই এসব কথা শিক্ষা করেন, তখন আলোচ্য আয়াত নাজিল হয়। আল্লাহ পাক মুশরিকদের মিথ্যা কথার প্রতিউত্তরে ইরশাদ করেছেন। -[তাফসীরে ইবনে মাযহারী, খ. ৬, পৃ. ৪৩৮]
তারা যার প্রতি ইঙ্গিত করে তার ভাষা অনারবি, অথচ এ কিতাব স্পষ্ট আরবি ভাষায় রয়েছে। কোনো কোনো তাফসীরকার লিখেছেন, ‘আয়েশ’ ছিলেন রুমী নওমুসলিম। পূর্বে ঈসায়ী ছিল। ইঞ্জিলের শিক্ষা সম্পর্কেও তার ভালো ধারণা ছিল। হযরত রাসূলে কারীম -এর কথাবার্তা তিনি অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করতেন। এজন্য তিনি কখনো কখনো তাঁর আবাসস্থলে গমন করতেন। শুধু এ কারণেই কাফেররা বলত যে, এ ব্যক্তির নিকটই তিনি কুরআন করীম শিক্ষা করতেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, এরা দুজন গোলাম ছিল। কাফেররা তাদের সম্পর্কে একথা বলত। একবার কাফেররা তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেছিল তোমরাই কি মুহাম্মদ কুরআন শেখাও? তারা বলল, আমরা তাঁকে কি করে শেখাব? বরং আমরাই তাঁর নিকট শিখি। এতদসত্ত্বেও তারা বলত- মানুষ এসে শিক্ষা দিয়ে যায়।
‘তাকে একজন মূলত পবিত্র কুরআনের ভাষার অলঙ্কার এবং মাধুর্য, নতুন নতুন তথ্য এবং তাৎপর্যমণ্ডিত শিক্ষা দেখে তারা বিস্মিত হতো এবং কে প্রিয়নবী -কে এসব শিক্ষা দিত তার অনুসন্ধান করতে থাকত। ঐ অবস্থায় কখনো একজনের নাম বলত, কখনো আরেক জনের নাম বলত । -[তাফসীরে মাজেদী; খ. ১, পৃ. ৫৭১]
আল্লামা ইবনে কাছীর (র.) লিখেছেন, ওবায়দুল্লাহ ইবনে মুসলিম বলেছেন, ক্রমের অধিবাসী দু ব্যক্তি তাদের নিজেদের ভাষায় ইঞ্জিল পাঠ করত । কখনো হুজুর এ ঐ পথ দিয়ে অতিক্রম করতেন। তারা যদি ইঞ্জিল পাঠ করত তবে তিনি তা শ্রবণ করতেন। এতেই মুশরিকরা এ গুজব রটিয়ে দেয় যে, প্রিয়নবী দ্র এদের থেকে কুরআন শিক্ষা করেন।
হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যেব (র.) বর্ণনা করেন, কাফেরদের এক ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণের পর ওহী লিপিবদ্ধ করত। কিন্তু পরে সে মুরতাদ হয় । সে এসব আপত্তিকর কথা রটায়। [তাফসীরে ইবনে কাছীর; পারা ১৪, পৃ. ৫৮]

মানুষ থেকে শিক্ষা নেওয়ার অভিযোগে ভাষাগত আপত্তির সীমা
ইবনে কাসির নাহল ১৬:১০৩-এর ব্যাখ্যায় ইবনে ইসহাকের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তাতে জাবরের সঙ্গে মুহাম্মদের বসা ও প্রতিপক্ষের অভিযোগ পাশাপাশি আছে। [51]
قال محمد بن إسحاق بن يسار في السيرة: كان رسول الله صلى الله عليه وسلم — فيما بلغني — كثيرا ما يجلس عند المروة إلى مبيعة غلام نصراني، يقال له جبر، عبد لبعض بني الحضرمي، فكانوا يقولون: والله ما يعلم محمدا كثيرا مما يأتي به إلا جبر النصراني غلام بني الحضرمي. فأنزل الله: ﴿وَلَقَدْ نَعْلَمُ أَنَّهُمْ يَقُولُونَ إِنَّمَا يُعَلِّمُهُ بَشَرٌ لِسَانُ الَّذِي يُلْحِدُونَ إِلَيْهِ أَعْجَمِيٌّ وَهَذَا لِسَانٌ عَرَبِيٌّ مُبِينٌ﴾.
বাংলা অনুবাদ:
মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক ইবনে ইয়াসার সীরাতে বলেছেন: আমার কাছে পৌঁছানো বিবরণ অনুযায়ী রাসুল প্রায়ই মারওয়ার কাছে জাবর নামের এক খ্রিস্টান দাসের বিক্রয়স্থলে বসতেন। সে ছিল বনু হাদরামির কারও দাস। লোকেরা বলত: আল্লাহর শপথ, মুহাম্মদ যে কথাগুলো নিয়ে আসেন, তার অনেক কিছু বনু হাদরামির খ্রিস্টান দাস জাবরই তাঁকে শেখায়। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়: আমরা জানি, তারা বলে—তাকে একজন মানুষ শিক্ষা দেয়। তারা যার দিকে ইঙ্গিত করছে, তার ভাষা অনারবি; আর এটি স্পষ্ট আরবি ভাষা।
অনারব ভাষাভাষী কারও কাছ থেকে কোনো কাহিনি শোনার পরে আরবিতে তা বলা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক মানবীয় কাজ। একটি গল্পের বিষয়বস্তু এবং সেই গল্প প্রকাশের ভাষা এক জিনিস নয়। কেউ সিরীয় বা হিব্রু ঐতিহ্য থেকে আদম, নূহ কিংবা ইব্রাহিমের কাহিনি শুনে নিজের ভাষায় বলতে পারেন; মূল বক্তব্য অন্যের কাছ থেকে এসেছে কি না, তা নির্ধারণে তাঁর বাক্যের আরবি সৌন্দর্য চূড়ান্ত প্রমাণ হয় না। নাহলের আয়াতে নির্দিষ্ট ব্যক্তির অনারব ভাষাকে অভিযোগের জবাব হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু অনারব উৎস থেকে আরবি রচনায় ধারণা আসার সম্ভাবনা ভাষার পার্থক্যের কারণে দূর হয় না। অনুবাদ ও ব্যাখ্যার স্বীকৃত সামাজিক চর্চা থাকলে ভাষাগত ব্যবধান অতিক্রমের উপায়ও থাকে।
বুখারিতে আহলে কিতাবের লোকদের হিব্রু তাওরাত আরবিতে ব্যাখ্যা করে শোনানোর বর্ণনা এই বিষয়টি আরও সরাসরি প্রতিষ্ঠা করে। ধর্মগ্রন্থের শ্রোতাদের সবার হিব্রু জানা প্রয়োজন হচ্ছিল না; একজন ব্যাখ্যাকারী দুই ভাষার মধ্যে সেতু তৈরি করছিলেন। একইভাবে মুহাম্মদের পক্ষে কোনো কাহিনির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য তার আসল লিখিত পাঠ নিজ হাতে পড়ার প্রয়োজন নেই। সামাজিক যোগাযোগের ইতিহাসে শিক্ষা শুধু বিদ্যালয়, পাণ্ডুলিপি ও আনুষ্ঠানিক শিক্ষকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বাজারে বসা, পরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে কথাবার্তা, পরিবারে ধর্মীয় আলোচনা এবং জনসমক্ষে ধর্মগ্রন্থ পাঠ শোনা—এসবও জ্ঞান লাভের পথ। নিরক্ষরতার যুক্তি দিয়ে এই পথগুলো অস্বীকার করা যুক্তিগতভাবে ভুল। [52]
কোরআনের আগের ধর্মীয় কাহিনিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পরীক্ষা করার সময় একই উৎসের পুনর্কথন এবং একাধিক স্বতন্ত্র সাক্ষ্যও পৃথক থাকে। ইবনে ইসহাকের বিবরণ পরে ইবনে কাসির উদ্ধৃত করেছেন বলেই নতুন কোনো স্বাধীন প্রত্যক্ষদর্শী তৈরি হয় না। কিন্তু পরে প্রামাণ্য তাফসিরে তার ব্যবহার দেখায়, ঘটনাটি ইসলামি ব্যাখ্যার ধারায় পরিচিত ছিল এবং আয়াত বোঝানোর উপাদান হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। এই গ্রহণের ইতিহাসই তাৎপর্যপূর্ণ: মানবীয় শিক্ষা থেকে কোরআনকে বিচ্ছিন্ন প্রমাণ করতে যে ব্যাখ্যা লেখা হয়েছে, তার মধ্যেও মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, অনুবাদ এবং আগের ধর্মের উপস্থিতির বিবরণ টিকে আছে।
কুরাইশ বংশ এবং নবীর বংশপ্রেম
হুনাইনের যুদ্ধের বর্ণনায় মুহাম্মদ নিজের নবুওয়াতের ঘোষণার পাশাপাশি “আমি আবদুল মুত্তালিবের পুত্র” বলে পরিচয় দিয়েছেন। আরবি বংশপরিচয়ের ব্যবহারে এখানে দাদার নাম দিয়ে নিজ বংশের পরিচয় বোঝানো হয়েছে। যে আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম থেকে সরে আসাকে আবু তালিবের মৃত্যুশয্যার ঘটনায় ইসলামে প্রবেশের শর্ত হিসেবে দাঁড় করানো হয়, যুদ্ধক্ষেত্রে সেই আবদুল মুত্তালিবের নামই পরিচয় ও মর্যাদার ঘোষণা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ধর্মীয় বিচ্ছেদ ঘটলেও পারিবারিক প্রতিপত্তির ব্যবহার বহাল থেকেছে।
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৩/ জিহাদ ও এর নীতিমালা
পরিচ্ছেদঃ ২৮. হুনায়নের যুদ্ধ
৪৪৬৫। আহমাদ ইবনু জানাব মিসসিসী (রহঃ) … আবূ ইসহাক (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি বারা (রাঃ) এর নিকট এসে বললো, আপনারা কি হুনায়নের দিনে পলায়ন করেছিলেন? তখন তিনি বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি পলায়ন করেন নি। কিন্তু কিছু সংখ্যক অতি ব্যস্ত ও বর্মহীন লোক হাওয়ায়িন গোত্রের দিকে গিয়েছিল। আর তারা ছিল তীরন্দায সম্প্রদায়। তারা তাদের প্রতি ঝাঁকে ঝাঁকে তীর ছুড়লো, যেন সেগুলো পঙ্গপালের পায়ের মত। তখন তারা পিছন দিকে হটে গেল। আর লোকেরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এগিয়ে এলো। আবূ সুফিয়ান ইবনু হারেস (রাঃ) তাঁর খচ্চর টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি অবতরণ করলেন এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়ে দুআ করলেন এবং তিনি বললেনঃ আমি অবশ্যই আল্লাহর নবী, একথা মিথ্যে নয়। আমি আবদূল মুত্তালিব এর পুত্র। “ইয়া আল্লাহ! আপনার সাহায্য নাযিল করুন”।
বারা (রাঃ) বললেনঃ, আল্লাহর কসম! যুদ্ধের-উত্তেজনা যখন ঘোরতর হয়ে উঠল, তখন আমরা তার মাধ্যমে আত্মরক্ষা করতাম। নিশ্চয়ই আমাদের মাঝে বীরপুরুষ তিনিই যিনি যুদ্ধে তাঁর অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে দাঁড়াতে সাহসী হত।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ ইসহাক (রহঃ)
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৫৬/ জিহাদ ও যুদ্ধকালীন আচার ব্যবহার
পরিচ্ছেদঃ ৫৬/৯৭. পরাজয়ের সময় সঙ্গীদের সারিবদ্ধ করা, নিজের সওয়ারী থেকে নামা ও আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করা।
২৯৩০. বারা’ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তাকে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, হে আবূ উমারা! হুনায়নের দিন আপনারা কি পলায়ন করেছিলেন? তিনি বললেন, না, আল্লাহর কসম, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পলায়ন করেননি। বরং তাঁর কিছু সংখ্যক নওজোয়ান সাহাবী হাতিয়ার ছাড়াই অগ্রসর হয়ে গিয়েছিলেন। তারা বানূ হাওয়াযিন ও বানূ নাসর গোত্রের সুদক্ষ তীরন্দাজদের সম্মুখীন হন। তাদের কোন তীরই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়নি। তারা এদের প্রতি এমনভাবে তীর বর্ষণ করল যে, তাদের কোন তীরই ব্যর্থ হয়নি। সেখান থেকে তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে উপস্থিত হলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাঁর সাদা খচ্চরটির পিঠে ছিলেন এবং তাঁর চাচাতো ভাই আবূ সুফ্ইয়ান ইবনু হারিস ইবনু ‘আবদুল মুত্তালিব তাঁর লাগাম ধরে ছিলেন। তখন তিনি নামেন এবং আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করেন। অতঃপর তিনি বলেন, আমি নবী, এ কথা মিথ্যা নয়। আমি ‘আবদুল মুত্তালিবের পুত্র। অতঃপর তিনি সাহাবীদের সারিবদ্ধ করেন। (২৮৬৪) (মুসলিম ৩২/২৮ হাঃ ১৭৭৬, আহমাদ ১৮৪৯৫) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৭১৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৭২৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ বারা’আ ইবনু আযিব (রাঃ)
কুরাইশের ক্ষেত্রে এই বংশমর্যাদা ব্যক্তিগত পরিচয় ছাড়িয়ে রাষ্ট্রক্ষমতার প্রশ্নেও এসেছে। একাধিক হাদিসে খিলাফত কুরাইশের মধ্যে থাকার কথা বলা হয়েছে; কোনো বর্ণনায় দুই ব্যক্তি অবশিষ্ট থাকলেও এই অধিকার বহাল থাকার ভাষা আছে। জন্মপরিচয়কে শাসনক্ষমতার যোগ্যতার শর্ত বানালে অ-কুরাইশ মানুষ শুধু বংশের কারণেই বাদ পড়েন। একজন অ-কুরাইশ ব্যক্তি জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক দক্ষতায় এগিয়ে থাকলেও তাঁর জন্মের পরিচয় বদলাতে পারবেন না। বংশগত অধিকার এভাবেই দক্ষতা যাচাইয়ের আগেই একটি গোষ্ঠীর জন্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দরজা বন্ধ করে দেয়। কুরাইশের পূর্ববর্তী পৌত্তলিক পরিচয় নতুন ধর্মে তাদের রাজনৈতিক বিশেষাধিকার বিলোপ করেনি। [53] [54]
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৪/ রাষ্ট্রক্ষমতা ও প্রশাসন
পরিচ্ছেদঃ ১. জনগন কুরায়শ এর অনুগামী এবং খিলাফত কুরায়শ এর জন্য
৪৫৫০। আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামা ইবনু কানাব, কুতায়বা ইবনু সাঈদ, যুহায়র ইবনু হারব ও আমর আন নাকিদ (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “জনগণ এর বিষয়ে (প্রশাসনিক ব্যাপারে) কুরায়শদের অনুসারী। মুসলিমরা তাদের মুসলিমদের এবং কাফেররা তাঁদের কাফেরদের (অনুসারী)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৩৪। প্রশাসন ও নেতৃত্ব
পরিচ্ছেদঃ ১. জনগণ কুরায়শদের অনুগামী এবং খিলাফত কুরায়শদের মধ্যে সীমিত
৪৫৯৭-(৩/১৮১৯) ইয়াহইয়া ইবনু হাবীব হারিসী (রহঃ) ….. জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ লোকজন ভাল-মন্দ উভয় ব্যাপারেই কুরায়শদের অনুসারী। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৫৫২, ইসলামিক সেন্টার ৪৫৫৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ)
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৮২/ আহকাম
পরিচ্ছেদঃ ৩০০৬. আমীর কুরাইশদের থেকে হবে
৬৬৫৪। আবূল ইয়ামান (রহঃ) … মুহাম্মাদ ইবনু জুবায়র ইবনু মুতঈম (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বর্ণনা করেন যে, তারা কুরাইশের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে মুআবিয়া (রাঃ) এর নিকট ছিলেন। তখন মুআবিয়া (রাঃ) এর নিকট সংবাদ পৌছল যে, আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, অচিরেই কাহতান গোত্র থেকে একজন বাদশাহ হবেন। এ শুনে তিনি ক্ষুদ্ধ হলেন এবং দাঁড়ালেন। এরপর তিনি আল্লাহ তা’আলার যথাযোগ্য প্রশংসা করলেন, তারপর তিনি বললেন, যা হোক! আমার নিকট এ মর্মে সংবাদ পৌছেছে যে, তোমাদের কতিপয় ব্যাক্তি এরূপ কথা বলে থাকে, যা আল্লাহর কিতাবে নেই এবং যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকেও বর্ণিত নেই। এরাই তোমাদের মাঝে সবচেয়ে অজ্ঞ। সুতরাং তোমরা এ সকল মনগড়া কথা থেকে যা স্বয়ং বক্তাকেই পথভ্রষ্ট করে সতর্ক থাক। আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি যে, (খিলাফতের) এ বিষয়টি কুরাইশদের মধ্যেই থাকবে, যতদিন তারা দ্বীনের উপর কায়েম থাকবে। যে কেউ তাদের সঙ্গে বিরোধিতা করে তবে আল্লাহ তা’আলা তাকেই অধোমুখে নিপতিত করবেন। নুআয়ম (রহঃ) মুহাম্মাদ ইবনু জুবায়র (রহঃ) সুত্রে শুআয়ব এর অনুসরণ করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জুবায়র ইবনু মুত‘ইম (রাঃ)
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৮২/ আহকাম
পরিচ্ছেদঃ ৩০০৬. আমীর কুরাইশদের থেকে হবে
৬৬৫৫। আহমাদ ইবনু ইউনুস (রহঃ) … ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (খিলাফতের) এই বিষয়টি সর্বদাই কুরাইশদের মধ্যেই থাকবে, যতদিন তাদের থেকে দু’জন লোকও অবশিষ্ট থাকবে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইব্ন উমর (রাঃ)
রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের বর্ণনায় অপছন্দনীয় আচরণ দেখলেও আমিরের বিষয়ে ধৈর্য ধরার নির্দেশ রয়েছে। নিচের হাদিসে সাধারণভাবে আমির ও জামাআত থেকে বিচ্ছিন্নতার কথা বলা হয়েছে। এটি কুরাইশের রাজনৈতিক বিশেষাধিকারসংক্রান্ত বর্ণনাগুলোর পাশে রাখলে ক্ষমতার দুটি স্তর পাওয়া যায়: নেতৃত্বে নির্দিষ্ট বংশের অধিকার এবং প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের অধীনে থাকার ধর্মীয় চাপ। শাসকের সিদ্ধান্তে আপত্তি ও ধর্মীয় আনুগত্যের মধ্যে এই সম্পর্ক রাজনৈতিক জবাবদিহির সীমা নির্ধারণ করে। [55]
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৮২/ আহকাম
পরিচ্ছেদঃ ৩০০৮. ইমামের আনুগত্য ও মান্যতা, যতক্ষন তা নাফরমানীর কাজ না হয়
৬৬৫৮। সুলায়মান ইবনু হারব (রহঃ) … ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যদি কেউ তার আমীর (ক্ষমতাসীন) থেকে এমন কিছু দেখে, যা সে অপছন্দ করে, তাহলে সে যেন ধৈর্য ধারণ করে। কেননা, যে কেউ জামাআত থেকে এক বিঘত পরিমাণ দুরে সরে মরবে, তার মৃত্যু হবে জাহিলিয়াতের মৃত্যু।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)
বংশের ধর্মীয় মর্যাদাও আল্লাহর বিশেষ নির্বাচনের ভাষায় ঘোষণা করা হয়েছে। কিনানা থেকে কুরাইশ, কুরাইশ থেকে বনু হাশিম এবং বনু হাশিম থেকে মুহাম্মদকে নির্বাচনের বর্ণনা একটি ক্রমবিন্যস্ত বংশমর্যাদা তৈরি করে। কোনো মানুষের ব্যক্তিগত কাজের মূল্যায়নের আগেই এই ক্রম তাঁর জন্মপরিচয়কে আলাদা অবস্থানে বসিয়ে দেয়। [56] [57]
সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৪৬/ রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তার সাহাবীগণের মর্যাদা
পরিচ্ছেদঃ ৬৬. আনসারগণের ও কুরাইশদের মর্যাদা
৩৯০৫। মুহাম্মাদ ইবনু সা’দ (রহঃ) হতে তার বাবার সনদে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে কেউ কুরাইশদেরকে অপদস্ত করার ইচ্ছা করবে, আল্লাহ তাকে অপদগ্ৰস্ত করবেন।
সহীহঃ সহীহাহ (১১৭৮)।
আবূ ঈসা বলেন, এ সনদ সূত্রে হাদীসটি গারীব। আবদ ইবনু হুমাইদ-ইয়াকুব ইবনু ইবরাহীম ইবনু সা’দ হতে, তিনি তার পিতা হতে, তিনি সালিহ ইবনু কাঈসান হতে, তিনি ইবনু শিহাব (রাহঃ) হতে উক্ত সনদে একই রকম বর্ণনা করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৪৪। ফাযীলাত
পরিচ্ছেদঃ ১. নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বংশের ফযীলত এবং নুবুওয়াত প্রাপ্তির আগে (তাকে) পাথরের সালাম করা প্রসঙ্গ
৫৮৩২-(১/২২৭৬) মুহাম্মাদ ইবনু মিহরান আর রাযী ও মুহাম্মাদ ইবনু ‘আবদুর রহমান ইবনু সাহম (রহঃ) …… আবূ আম্মার শাদ্দাদ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি ওয়াসিলাহ্ ইবনু আসকা (রহঃ) কে বলতে শুনেছেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেনঃ মহান আল্লাহ ইসমাঈল (আঃ) এর সন্তানদের থেকে কিনানাহ-কে চয়ন করে নিয়েছেন, আর কিনানাহ (‘র বংশ) হতে, কুরায়শ’ কে বাছাই করে নিয়েছেন আর কুরায়শ (বংশ) হতে বানু হাশিমকে বাছাই করে নিয়েছেন এবং বানু হাশিম হতে আমাকে বাছাই করে নিয়েছেন। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৫৭৩৯, ইসলামিক সেন্টার ৫৭৭০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
কুরাইশ, আনসার, হাবশি ও আযদের জন্য পৃথক ভূমিকা উল্লেখ করা আরেক হাদিসে পাওয়া যায়। এতে রাজত্বকে কুরাইশের সঙ্গে, বিচারকে আনসারদের সঙ্গে, আজানকে হাবশিদের সঙ্গে এবং আমানতদারিকে আযদের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। বিভিন্ন গোষ্ঠীকে এভাবে পৃথক কাজের সঙ্গে চিহ্নিত করলে সামাজিক মর্যাদার একটি বিভাজনও প্রকাশ পায়। খিলাফতের ক্ষেত্রে কুরাইশ-বংশের শর্ত পরে ফিকহেও স্থান পেয়েছে। ফলে কোনো বাঙালি, পারসিক বা আফ্রিকান মুসলিমের ব্যক্তিগত যোগ্যতার প্রশ্নের আগেই তাঁর বংশ তাঁকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদের বাইরে রাখতে পারে। [58]
সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৪৬/ রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তার সাহাবীগণের মর্যাদা
পরিচ্ছেদঃ ৭২. ইয়ামানের মর্যাদা
৩৯৩৬। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রাজত্ব কুরাইশদের মাঝে, বিচার-বিধান আনসারদের মধ্যে, (সুমধুর সুরে) আযান হাবশীদের মাঝে এবং আমানতদারি আযদ অর্থাৎ ইয়ামানবাসীদের মাঝে।
সহীহঃ সহীহাহ (১০৮৩)।
মুহাম্মাদ ইবনু বাশশার আব্দুর রহমান ইবনু মাহদী হতে, তিনি মু’আবিয়াহ ইবনু সালিহ হতে, তিনি আবূ মারইয়াম আল-আনসারী হতে, তিনি আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে এই সনদে উপর্যুক্ত হাদীসের একই রকম বর্ণনা করেছেন, তবে মারফুরূপে নয়। এ হাদীস যাইদ ইবনু হুবাবের বর্ণিত হাদীসটির তুলনায় অনেক বেশি সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
নববির মিনহাজুত তালিবিনে ইমামের শর্তের মধ্যে কুরাইশি হওয়া সরাসরি অন্তর্ভুক্ত। নির্দিষ্ট শর্তের বাক্যটি হলো: [59]
شَرْطُ الْإِمَامِ كَوْنُهُ مُسْلِمًا مُكَلَّفًا حُرًّا ذَكَرًا قُرَشِيًّا مُجْتَهِدًا شُجَاعًا ذَا رَأْيٍ وَسَمْعٍ وَبَصَرٍ وَنُطْقٍ.
বাংলা অনুবাদ:
ইমামের শর্ত হলো: তিনি মুসলিম, শরিয়তের দায়িত্বপ্রাপ্ত, স্বাধীন, পুরুষ, কুরাইশি, মুজতাহিদ, সাহসী, বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন এবং শ্রবণ, দৃষ্টি ও বাকশক্তির অধিকারী হবেন।
এই বিধানে “কুরাইশি” একটি বাস্তব যোগ্যতার পরীক্ষা নয়; এটি বংশপরিচয়ের পরীক্ষা। কেউ শিক্ষা অর্জন করতে পারেন, সাহসের পরিচয় দিতে পারেন, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারেন; জন্মের পরে নিজের বংশ পরিবর্তন করতে পারেন না। সেই অপরিবর্তনীয় পরিচয়কে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদের শর্ত বানানো রাজনৈতিক বংশবাদের স্পষ্ট রূপ। কুরাইশের পুরোনো মর্যাদা এখানে ধর্মীয় ভাষায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পূর্ববর্তী ধর্মের উপাস্য বর্জনের সঙ্গে সেই ধর্মীয় কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক গোত্রের রাজনৈতিক বিশেষাধিকার অক্ষুণ্ণ রাখা নতুন ব্যবস্থার ক্ষমতার কাঠামো প্রকাশ করে।
নিজ গোত্রের ধর্ম বাতিল করা এবং নিজ গোত্রের শাসনাধিকার বহাল রাখা একই পরিবর্তনের দুই ফল। একটি ঘোষণা বিশ্বাসের কর্তৃত্ব কেন্দ্রীয় করেছে; অন্যটি নেতৃত্বের সুযোগ একটি বংশগত সীমার ভেতর রেখেছে। ফলে পুরোনো সমাজের সব স্তর ভেঙে সমান রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন বক্তব্য সংশ্লিষ্ট বিধানের সঙ্গে মেলে না। ধর্মীয় পরিচয় সম্প্রসারিত হয়ে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে এক সম্প্রদায়ে অন্তর্ভুক্ত করলেও শাসনের সর্বোচ্চ মর্যাদায় জন্মসূত্রের সুবিধা বহাল থেকেছে। ইসলামের গোত্রীয় উৎস তাই কেবল নাম বা পরিবারের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়; পরবর্তী রাষ্ট্রচিন্তার বিধানেও তার উপস্থিতি আছে।
হিলফুল ফুজুল সংগঠন
হিলফুল ফুজুল ছিল মুহাম্মদের নবুওয়াত ঘোষণার আগের মক্কায় অন্যায়ের শিকার মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি চুক্তি। মুহাম্মদের চাচা যুবাইর ইবনে আবদুল মুত্তালিবের উদ্যোগের বিবরণ আছে এবং বিভিন্ন গোত্রের অংশগ্রহণে আবদুল্লাহ ইবনে জুদআনের বাড়িতে চুক্তি সম্পাদিত হয়। মুহাম্মদ এতে অংশ নিয়েছিলেন। চুক্তির প্রস্তাবক, আয়োজক গোত্রসমূহ এবং একজন অংশগ্রহণকারীর ভূমিকা পৃথক। যুবাইর ও তাঁর সমসাময়িকদের উদ্যোগকে বাদ দিয়ে পুরো প্রতিষ্ঠানের কৃতিত্ব এককভাবে মুহাম্মদের নামে দেওয়া ইতিহাসকে বিকৃত করে। ইসলামি গ্রন্থেই এর পূর্ববর্তী সামাজিক ভিত্তি সংরক্ষিত আছে। [60] [61] [62] [63]
হাফিজ বায়হাকী বর্ণনা করেন যে, জুবায়র ইবনে মুতইম (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “আমি আমার চাচাদের সঙ্গে ‘হিলফুল মুতায়্যিবীনে ‘উপস্থিত ছিলাম। এখন আমি তা’ ভঙ্গ করা পছন্দ করি না; বিনিময়ে বহমূল্য লাল উট দিলেও নয়।”
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণিত হাদীসে আছে: রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “হিলফুল মুতায়্যিবীন ছাড়া আমি কুরায়শদের কোন চুক্তিতে উপস্থিত ছিলাম না। এখন বিনিময়ে আমাকে লাল উট দেয়া হলেও আমি তা ভঙ্গ করা পছন্দ করি না।” আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, মুতায়্যিবীন বলতে বোঝানো হয়েছে হাশিম, উমাইয়া, যুহরা ‘ও মাখযুমকে। বায়হাকী বলেন, হাদীসের এই ব্যাখ্যাটি মুদরাজ বা রাবীর বাড়তি বর্ণনা। এ রাবীর পরিচয়ও অজ্ঞাত। কোন কোন সীরাত বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এখানে ‘হিলফুল মুতায়্যিবীন’ বলতে হিলফুল ফুযুল বোঝান হয়েছে। কেননা রাসূলুল্লাহ (সা) হিলফুল মুতায়্যিবীন-এর সময়কাল পাননি।
আমার মতে, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। তার কারণ কুরায়শরা অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়েছিল কুসাই-এর মৃত্যুর পর। কুসাই কর্তৃক তাঁর পুত্র আব্দুদ্দারকে সিকায়া, রিফাদা, লিওয়া, নাদওয়া ও হিজাবার দায়িত্ব প্রদানকে কেন্দ্র করে বিরোধ ছিল। এই সিদ্ধান্তে বনু ‘আব্ব্দে মানাফের আপত্তি ছিল। কুরায়শের সকল গোত্র এ ব্যাপারে সোচ্চার হয় এবং নিজ নিজ পক্ষের সহযোগিতা করার ব্যাপারে পরস্পর অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়। এ খবর শুনে আব্দে মানাফের গোত্রের লোকরা একটি পাত্রে সুগন্ধি রেখে তাতে হাত রেখে তারাও অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। বৈঠক থেকে উঠে তারা বায়তুল্লাহ্র খুঁটিতে হাত মুছে। এ কারণে তাঁদেরকে ‘মুতায়্যিবীন’ বা সুগন্ধিওয়ালা নাম দেয়া হয়। এ ঘটনাটি প্রাচীন আমলের। কাজেই প্রমাণিত হয় যে, আলোচ্য অঙ্গীকার দ্বারা হিলফুল ফুযুল বোঝানো হয়েছে। হিলফুল ফুযুল সম্পাদিত হয়েছিল আব্দুল্লাহ ইব্ন জাদ’আনের ঘরে। যেমন হুমায়দী বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “আমি আব্দুল্লাহ ইবনে জাদ’আনের ঘরে একটি অঙ্গীকার অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলাম। ইসলামের যুগেও যদি আমাকে তেমন অঙ্গীকারের প্রতি আহ্বান করা হতো, আমি তাতে সাড়া দিতাম।” উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ তাতে নগরবাসীর ওপর অত্যাচার ও অন্যায়ের প্রতিরোধ করার শপথ নিয়েছিলেন।
ঐতিহাসিকগণ বলেন, হিলফুল ফুযুল সম্পাদিত হয়েছিল রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নবুয়ত লাভের কুড়ি বছর আগে যুলকা’দা মাসে, ফিজার যুদ্ধের চার মাস পরে। ফিজার সংঘটিত হয়েছিল একই বছরের শাবান মাসে।
হিলফুল ফুযুল ছিল আরবের ইতিহাসে সবাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ শপথ। এ ব্যাপারে সর্বপ্রথম যিনি মুখ খুলেন এবং যিনি এর প্রস্তাব উত্থাপন করেন, তিনি হলেন যুবায়র ইবনে আব্দুল মুত্তালিব।



ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় চুক্তির সদস্যগোষ্ঠী এবং উদ্দেশ্য উভয়ই বিস্তারিতভাবে এসেছে। [64]
تداعت قبائل من قريش إلى حلف، فاجتمعوا له في دار عبد الله بن جدعان بن عمرو بن كعب بن سعد بن تيم بن مرة بن كعب بن لؤي، لشرفه وسنه، فكان حلفهم عنده: بنو هاشم، وبنو المطلب، وأسد بن عبد العزى، وزهرة بن كلاب، وتيم بن مرة، فتعاقدوا وتعاهدوا على أن لا يجدوا بمكة مظلوما من أهلها وغيرهم ممن دخلها من سائر الناس إلا قاموا معه، وكانوا على من ظلمه حتى ترد عليه مظلمته، فسمت قريش ذلك الحلف حلف الفضول.
বাংলা অনুবাদ:
কুরাইশের কয়েকটি গোত্র একটি চুক্তির আহ্বানে একত্র হয়। আবদুল্লাহ ইবনে জুদআন ইবনে আমর ইবনে কাব ইবনে সাদ ইবনে তাইম ইবনে মুররা ইবনে কাব ইবনে লুয়াইয়ের মর্যাদা ও বয়সের কারণে তাঁর বাড়িতে তারা সমবেত হয়। সেখানে চুক্তিতে অংশ নেয় বনু হাশিম, বনু মুত্তালিব, আসাদ ইবনে আবদুল উজ্জা, যুহরা ইবনে কিলাব এবং তাইম ইবনে মুররা। তারা অঙ্গীকার করে, মক্কায় স্থানীয় অধিবাসী কিংবা বাইরে থেকে আগত যেকোনো মানুষের ওপর অন্যায় হলে তারা তাঁর পাশে দাঁড়াবে। তাঁর অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া পর্যন্ত অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে। কুরাইশ এই চুক্তিকে হিলফুল ফুজুল নাম দেয়।
এই অঙ্গীকারে ভুক্তভোগীর অধিকার রক্ষার ভিত্তি তাঁর ওপর সংঘটিত অন্যায়। চুক্তির ভাষায় মক্কার স্থানীয় মানুষ এবং বাইরে থেকে আগত মানুষ উভয়েই অন্তর্ভুক্ত। ফলে ন্যায়বোধ ও সামাজিক সহযোগিতার উপস্থিতিকে কেবল নতুন নবুওয়াতের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না। মুহাম্মদের আগের সমাজের মানুষ নিজেরাই অন্যায় শনাক্ত করেছেন, মিলিত প্রতিরোধের পদ্ধতি স্থির করেছেন এবং অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। যে সমাজকে সামগ্রিকভাবে নৈতিক অন্ধকার বলা হয়, সেই সমাজের মধ্যেই এই প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল। মুহাম্মদ তার সুবিধা ও মর্যাদা স্বীকার করেছেন এবং পরে সেই অভিজ্ঞতাকে স্মরণ করেছেন।
চুক্তিতে অংশগ্রহণ নৈতিক প্রশংসার কারণ হতে পারে; প্রস্তাব ও আয়োজনের ইতিহাসও সেই প্রশংসার অংশ। একজন অংশগ্রহণকারীকে একমাত্র প্রতিষ্ঠাতা বানালে অন্যদের উদ্যোগ হারিয়ে যায়। ধর্মীয় জীবনীতে এই ধরনের কৃতিত্ব কেন্দ্রীভূত হলে সমাজের মানবীয় সহযোগিতা একটি ব্যক্তির অতিপ্রাকৃত মহিমার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। হিলফুল ফুজুলের নিজস্ব বিবরণে মানুষের অধিকার রক্ষা, গোত্রের সমঝোতা এবং অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে যৌথ অবস্থানই কার্যকর ছিল। এই মানবীয় ন্যায়বোধ ইসলামের আগের সমাজেই সক্রিয় ছিল এবং মুহাম্মদ সেই সমাজের অংশ হিসেবে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন।
যুবাইরের উদ্যোগ সম্পর্কে ইবনে কাসিরের বক্তব্যে পাওনাবঞ্চিত ব্যবসায়ীর পাশে দাঁড়ানোর ঘটনাটিও নির্দিষ্টভাবে আছে। [65]
فقام في ذلك الزبير بن عبد المطلب، وقال: ما لهذا مترك. فاجتمعت هاشم وزهرة وتيم بن مرة في دار عبد الله بن جدعان فصنع لهم طعاما، وتحالفوا في ذي القعدة في شهر حرام، فتعاقدوا وتعاهدوا بالله: ليكونن يدا واحدة مع المظلوم على الظالم حتى يؤدي إليه حقه ما بل بحر صوفة وما رسى ثبير وحراء مكانهما، وعلى التأسي في المعاش. فسمت قريش ذلك الحلف حلف الفضول، وقالوا: لقد دخل هؤلاء في فضل من الأمر. ثم مشوا إلى العاص بن وائل فانتزعوا منه سلعة الزبيدي فدفعوها إليه.
বাংলা অনুবাদ:
তখন যুবাইর ইবনে আবদুল মুত্তালিব উদ্যোগ নিলেন এবং বললেন: এ বিষয়টি ছেড়ে দেওয়া যায় না। হাশিম, যুহরা ও তাইম ইবনে মুররা আবদুল্লাহ ইবনে জুদআনের বাড়িতে সমবেত হয়। তিনি তাদের খাবার দেন। পবিত্র যিলকদ মাসে তারা আল্লাহর নামে অঙ্গীকার করে: সমুদ্র যত দিন পশম ভেজাবে এবং সাবির ও হেরা পাহাড় যত দিন নিজ স্থানে থাকবে, তত দিন অন্যায়ের শিকার ব্যক্তির অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া পর্যন্ত তারা অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে এক হাত হয়ে থাকবে। জীবিকা ভাগ করে নেওয়ার বিষয়েও তারা অঙ্গীকার করে। কুরাইশ সেই চুক্তিকে হিলফুল ফুজুল বলে এবং মন্তব্য করে, এরা মহৎ একটি কাজে প্রবেশ করেছে। এরপর তারা আস ইবনে ওয়াইলের কাছে গিয়ে যুবাইদি ব্যবসায়ীর পণ্য ফিরিয়ে এনে তাঁকে দিয়ে দেয়।
কাহিনির কার্যকর উদ্যোগ, সমাবেশ এবং অধিকার উদ্ধারের প্রতিটি ধাপে একাধিক মানুষের ভূমিকা আছে। যুবাইরের প্রস্তাব, ইবনে জুদআনের আয়োজন এবং বিভিন্ন গোত্রের যৌথ প্রতিরোধ মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি কাজ করেছে। ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরে মানুষের ওপর হওয়া অন্যায় শনাক্ত করার সামর্থ্য এবং তার প্রতিকার করার নৈতিক ইচ্ছা এই বিবরণেই উপস্থিত। ইসলামের আগে মানুষের ন্যায়বোধ ছিল না—এমন প্রচারণার বিপরীতে এটি একটি নির্দিষ্ট সামাজিক ঘটনার সাক্ষ্য।
হেরাগুহায় পৌত্তলিক প্রার্থনা
হেরাগুহায় মুহাম্মদের নির্জন অবস্থানকে প্রথম ওহির প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত করে বর্ণনা করা হয়। তিনি খাবার নিয়ে যেতেন, কয়েক রাত বা নির্দিষ্ট সময় সেখানে থাকতেন এবং পরে বাড়ি ফিরতেন। এই আচারের জন্য ব্যবহৃত শব্দ ‘তাহান্নুস’। কিন্তু নির্জন উপাসনার এই রীতি তাঁর নবুওয়াতের ঘোষণার পরে প্রথম চালু হয়নি। ইবনে ইসহাকের বিবরণে কুরাইশের ইসলামপূর্ব চর্চার সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক আছে। পরবর্তী নবুওয়াতের কাহিনির সূচনাস্থল হিসেবেও একটি পূর্বপরিচিত ধর্মীয় রীতি ব্যবহৃত হয়েছে।
বাংলা সীরাতের আলোচনাতেও হেরায় নির্জন উপাসনাকে জাহেলি যুগের রীতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আবদুল মুত্তালিবের সঙ্গে এই চর্চার সম্পর্কের কথাও সেখানে আছে। পরিবারের পূর্ববর্তী ধর্মীয় পরিবেশ, কাবার সঙ্গে সংযোগ এবং হেরায় অবস্থানের রীতি মিলিয়ে মুহাম্মদের ধর্মীয় অনুসন্ধানের সামাজিক ধারাবাহিকতা পাওয়া যায়। যে নির্জন অবস্থানের শেষে নতুন ওহির দাবি এসেছে, তার আচারগত প্রস্তুতি পূর্ববর্তী সমাজের ভেতরেই ছিল। [66]
প্রায় ছয় মাস। যা ছিল ২৩ বছরের নবুঅতকালের ৪৬ ভাগের এক ভাগ। হাদীছে সম্ভবতঃ একারণেই সত্যস্বপ্নকে নবুঅতের ৪৬ ভাগের এক ভাগ বলা হয়েছে।৮৫
এসে গেল রামাযান মাস। পূর্বের ন্যায় এবারেও তিনি পুরা রামাযান সেখানে ই’তিকাফে কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। স্বগোত্রীয় লোকদের পৌত্তলিক ও বস্তুবাদী ধ্যান-ধারণা তাঁকে পাগল করে তুলত। কিন্তু তাদের ফিরানোর কোন পথ তাঁর জানা ছিল না।
মূলতঃ হেরা গুহায় নিঃসঙ্গ অবস্থানের বিষয়টি ছিল আল্লাহর দূরদর্শী পরিকল্পনা ও মহতী ব্যবস্থাপনারই অংশ। ইবনু আবী জামরাহ )ابن أبي جمرة বলেন, এর মধ্যে তিনটি ইবাদত এক সাথে ছিল। (১) নির্জনবাস (২) আল্লাহর ইবাদত এবং (৩) সেখান থেকে কা’বাগৃহ দেখতে পাওয়া। ইবনু ইসহাক বলেন, ‘এভাবে নিঃসঙ্গ ইবাদত জাহেলিয়াতের রীতি ছিল। তাঁর কওম পূর্ব থেকেই যেমন আশূরার ছিয়াম পালন করত, তেমনি হেরা গুহায় নিঃসঙ্গ ইবাদত করত। আব্দুল মুত্ত্বালিব এটি প্রথম করেন’। বরং এটি ছিল ইবরাহীমী ইবাদতের )فَالتَّحَنُّتْ مِنْ بَقَايَا الْإِبْرَاهِيمية অবশিষ্টাংশ’ (সীরাহ ছহীহাহ ১/১২৩-টীকা)। যার মাধ্যমে আল্লাহভীরু বান্দার মধ্যে অধ্যাত্ম চেতনার সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটা সম্ভব হয়। এভাবে হেরা গুহায় থাকা অবস্থায় একদিন আল্লাহর পক্ষ থেকে অহী নিয়ে জিব্রীল (আঃ) এসে হাযির হন।
শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ-২ )۲ – العبر( :
(১) শ্রেষ্ঠ বংশের জগতশ্রেষ্ঠ রাসূল ইয়াতীম অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেন। এর দ্বারা আল্লাহ তাঁকে ইয়াতীম ও অসহায় শ্রেণীর দুঃখ-বেদনা অনুভবের অভিজ্ঞতা অর্জন করান।
(২) তাঁকে উম্মী বা নিরক্ষর নবী করা হয়। যাতে কেউ বলতে না পারে যে, তিনি নিজের ইলম দিয়ে কুরআন তৈরী করেছেন। এছাড়া দুনিয়ার কোন মানুষ যেন তাঁর উস্তাদ হওয়ার বড়াই করতে না পারে।
(৩) ভবিষ্যতে তিনি যে নবী হবেন, তার নমুনা দুগ্ধপানকাল থেকেই বিভিন্ন মু’জেযা ও শুভ লক্ষণের মাধ্যমে ফুটে ওঠে। যাবতীয় কুসংস্কার ও অন্যায়-অনাচারের প্রতি ঘৃণাবোধ, যুলুম প্রতিরোধে ‘হিলফুল ফুযুল’ সংগঠন প্রতিষ্ঠা, কা’বাগৃহ পুনর্নির্মাণকালে সাক্ষাৎ রক্তারক্তি থেকে সম্প্রদায়কে রক্ষা, সর্বত্র আল-আমীন হিসাবে প্রশংসিত হওয়া, অতঃপর মানুষের মঙ্গল চিন্তায় নিঃসঙ্গপ্রিয়তা ও হেরা গুহায় আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন হওয়া ও সত্যস্বপ্ন লাভ প্রভৃতি ছিল ভবিষ্যৎ নবুঅত প্রাপ্তির অভ্রান্ত পূর্ব নিদর্শন। এতে প্রমাণিত হয় যে, শ্রেষ্ঠতম আমানত সমর্পণের জন্য শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তি আবশ্যক।
৮৫. বুখারী ফৎসহ হা/৬৯৮৩-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য।
৮৬. বুখারী ফৎহসহ হা/৬৯৮২-এর আলোচনা; ইবনু হিশাম ১/২৩৫।

তাহান্নুসের ইসলামপূর্ব পরিচয় সম্পর্কে ইবনে ইসহাকের সূত্রে উবাইদ ইবনে উমাইরের বক্তব্যটি সরাসরি উদ্ধৃত করা যায়। [67] [68]
قال ابن إسحاق: وحدثني وهب بن كيسان، مولى آل الزبير، قال: سمعت عبد الله بن الزبير وهو يقول لعبيد بن عمير بن قتادة الليثي: حدثنا يا عبيد كيف كان بدء ما ابتدئ به رسول الله صلى الله عليه وسلم من النبوة، حين جاءه جبريل عليه السلام؟ قال: فقال عبيد — وأنا حاضر يحدث عبد الله بن الزبير ومن عنده من الناس —: كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يجاور في حراء من كل سنة شهرا، وكان ذلك مما تحنث به قريش في الجاهلية.
বাংলা অনুবাদ:
ইবনে ইসহাক বলেন: যুবাইর পরিবারের মুক্তদাস ওয়াহব ইবনে কাইসান আমাকে বলেছেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইরকে উবাইদ ইবনে উমাইর ইবনে কাতাদা আল-লাইসিকে বলতে শুনেছি: হে উবাইদ, জিব্রাইল আসার সময়ে রাসুলের নবুওয়াতের সূচনা কীভাবে হয়েছিল, আমাদের বলুন। ওয়াহব বলেন: আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম; উবাইদ আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর এবং উপস্থিত লোকদের বললেন, রাসুল প্রতি বছর এক মাস হেরায় অবস্থান করতেন। এটি ছিল জাহেলি যুগে কুরাইশের তাহান্নুসের অন্তর্ভুক্ত রীতি।
তাবারিতে সংরক্ষিত একই বর্ণনায় হেরার অবস্থান শেষ করে বাড়ি ঢোকার আগে কাবায় গিয়ে সাতবার বা ইচ্ছামতো তাওয়াফ করার কথাও আছে। ফলে নির্জন সাধনা ও কাবাকেন্দ্রিক আচার দুটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হয়ে থাকেনি; একই ধর্মজীবনের ধারাবাহিক ক্রিয়া হিসেবে এসেছে। এই যোগসূত্র বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ইসলামপূর্ব সমাজের একটি রীতির মধ্যে অবস্থান করে মুহাম্মদের অভিজ্ঞতা ঘটেছে বলে কাহিনিটি দাবি করছে এবং সেই অভিজ্ঞতাই পরে নতুন ধর্মের উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নতুনত্ব এসেছে অভিজ্ঞতার ধর্মীয় পরিচয় ও তার কর্তৃত্বের ঘোষণায়; স্থান, নির্জন অবস্থান এবং উপাসনাচর্চার পূর্ববর্তী ভিত্তি তাঁর সমাজেই উপস্থিত ছিল।
একটি পুরোনো রীতিকে পরে ইব্রাহিমের অনুসরণ বলা হলে তার ওপর নতুন ব্যাখ্যা বসে। কিন্তু কুরাইশের আগের চর্চা হিসেবে তার যে নির্দিষ্ট পরিচয় সংরক্ষিত আছে, সেটি ইতিহাসের বাস্তব উপাদান। নিজের সমাজের লোকেরা যে পর্বতে যেত, যেভাবে নির্জনে থাকত এবং যে কাবাকে কেন্দ্র করে ধর্মজীবন পরিচালনা করত, সেই পরিচিত জগতের মধ্যেই মুহাম্মদের প্রথম অভিজ্ঞতার কাহিনি স্থাপিত হয়েছে। ওহির দাবি তাই মানবীয় সংস্কৃতির বাইরে কোনো শূন্য মঞ্চে আবির্ভূত হয়নি। পূর্ববর্তী ধর্মাচারই তার স্থান, অনুশীলন এবং সামাজিক অর্থের বড় অংশ সরবরাহ করেছে।
প্রথম ওহির নির্দেশ: নিরক্ষরতা, চাপপ্রয়োগ ও অসংগতি
প্রথম ওহির বর্ণনায় আগন্তুকের “পড়ুন” নির্দেশ এবং মুহাম্মদের “আমি পাঠক নই” উত্তরের পরে বারবার শক্ত করে চেপে ধরার ঘটনা আছে। নিরক্ষর মানুষকে পড়তে বললে তাঁর অক্ষমতার জবাব শিক্ষা দেওয়া হতে পারে; শারীরিক চাপ তাঁকে বর্ণ চিনতে বা লেখা বুঝতে শেখায় না। অথচ কাহিনিতে প্রথম ও দ্বিতীয় চাপের পরেও একই উত্তর আসে এবং তৃতীয়বারের পরে পাঠ বলে দেওয়া হয়। সর্বজ্ঞ সত্তার পরিকল্পিত যোগাযোগ হিসেবে এই পদ্ধতি ব্যাখ্যা করতে গেলে একটি মৌলিক অসংগতি দেখা দেয়: প্রাপকের জানা সামর্থ্যের সঙ্গে নির্দেশের সামঞ্জস্য নেই, আর ব্যবহৃত শারীরিক পদ্ধতির সঙ্গে শিক্ষা দেওয়ার কার্যকর সম্পর্কও দেখানো হয়নি। কাহিনিতে ফল হলো তীব্র কষ্ট, ভয় এবং পরে পরিচিত মানুষের আশ্বাসের প্রয়োজন।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৯১/ স্বপ্নের ব্যাখ্যা করা
পরিচ্ছেদঃ ৯১/১. রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ওয়াহীর শুরু হয় ভালো স্বপ্নের মাধ্যমে।
৬৯৮২. ‘আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওয়াহীর শুরু হয় ঘুমের ঘোরে ভালো স্বপ্নের মাধ্যমে। তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন তা ভোরের আলোর মত উদ্ভাসিত হতো। তিনি হেরা গুহায় গিয়ে সেখানে বেশ কয়েক রাত ‘ইবাদাতে কাটিয়ে দিতেন এবং এজন্য খাদ্য দ্রব্যও সঙ্গে নিয়ে যেতেন। এরপর খাদীজাহ (রাঃ)-এর কাছে ফিরে আসতেন এবং তিনি তাকে এরূপ খাদ্য দ্রব্য তৈরি করে দিতেন। শেষে তাঁর কাছে সত্যের বাণী (ওয়াহী) আসল। আর এ সময় তিনি হেরা গুহায় ছিলেন।
সেখানে ফেরেশতা এসে তাঁকে বলল, আপনি পড়ুন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি বললামঃ আমি তো পাঠক নই। তখন তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে শক্ত করে চেপে ধরলেন। এমনকি এতে আমার খুব কষ্ট হল। তারপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিলেন এবং বললেন, আপনি পড়ুন। আমি বললাম, আমি পাঠক নই। তিনি দ্বিতীয়বার আমাকে শক্ত করে চেপে ধরলেন। এবারেও এতে আমার খুব কষ্ট হল। অতঃপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, আপনি পড়ুন। আমি বললাম, আমি তো পাঠক নই। এরপর তিনি তৃতীয়বার আমাকে শক্ত করে এমন চেপে ধরলেন যে, এবারেও এতে আমার খুব কষ্ট হল। তারপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, পাঠ করুন, আপনার প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন……যা সে জানত না (সূরাহ আল-আলাক ৯৬/১-৫) এ আয়াত পর্যন্ত।
… (আধুনিক প্রকাশনী- ৬৪৯৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৫১১)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)
কাহিনিতে শারীরিক চাপ এবং জ্ঞানের মধ্যে যে সম্পর্ক দাঁড় করানো হয়েছে, তার ব্যাখ্যা নেই। কোনো বাক্য মুখে বলে দিলে অন্য ব্যক্তি তা শুনতে ও পুনরাবৃত্তি করতে পারেন; তার জন্য আগে তাঁকে তিনবার কষ্ট দিয়ে চেপে ধরার শিক্ষাগত প্রয়োজন হয় না। মুহাম্মদের উত্তর প্রথমবারেই তাঁর অক্ষমতা প্রকাশ করে। পরের দুইবারও একই নির্দেশ এবং চাপের পুনরাবৃত্তি প্রাপকের অবস্থাকে আরও যন্ত্রণাদায়ক করেছে। ফলে ঘটনাটির নাটকীয়তা থেকে অতিপ্রাকৃত জ্ঞানপ্রেরণের সত্যতা অনুসরণ করে না। অচেনা আগন্তুকের পরিচয়, নির্দেশের উদ্দেশ্য এবং শারীরিক আচারের প্রয়োজনীয়তা—এই তিনটি বিষয়ই পরে ধর্মীয় ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তাবারিতে সংরক্ষিত ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় লিখিত পাঠের উপস্থিতি আরও সরাসরি এসেছে। সেখানে স্বপ্নের মধ্যে রেশমি কাপড়ে লেখা নিয়ে আগমনের কথা আছে এবং “কী পড়ব” প্রশ্নের সঙ্গে চাপ প্রয়োগের ঘটনা যুক্ত হয়েছে। [69]
فجاءني وأنا نائم بنمط من ديباج فيه كتاب، فقال: اقرأ، فقلت: ما أقرأ؟ فغتني حتى ظننت أنه الموت، ثم أرسلني فقال: اقرأ، فقلت: ماذا أقرأ؟
বাংলা অনুবাদ:
তিনি আমার কাছে এলেন, তখন আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। তাঁর সঙ্গে ছিল রেশমি এক কাপড়, যাতে লেখা ছিল। তিনি বললেন: পড়ো। আমি বললাম: কী পড়ব? তখন তিনি আমাকে এমনভাবে চেপে ধরলেন যে আমি ভাবলাম, এ যেন মৃত্যু। পরে আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন: পড়ো। আমি বললাম: কী পড়ব?
এই সংস্করণে লেখাসংবলিত কাপড়ের উল্লেখ পাঠের নির্দেশকে একটি নির্দিষ্ট বস্তুগত দৃশ্য দিয়েছে। বুখারির সংস্করণে সেই বস্তুটির উল্লেখ নেই; সেখানে নিজের পড়ার অক্ষমতা এবং কষ্টের কথাই প্রধান। দুটি বর্ণনায় দৃশ্যের এই পার্থক্য প্রথম অভিজ্ঞতার কাহিনিটি কীভাবে সংরক্ষিত ও সম্প্রসারিত হয়েছে, সেই প্রশ্ন তোলে। একই সঙ্গে দুটিতেই আগন্তুকের চাপ প্রয়োগকে কেন্দ্র করে ভয় ও যন্ত্রণার বিবরণ আছে। কোনো দৃশ্যের ধর্মীয় পরিচয় শুধু পরে “ফেরেশতা” নাম দেওয়ার কারণে স্বাধীনভাবে যাচাই হয়ে যায় না। বর্ণিত অভিজ্ঞতার সত্যতা, আগন্তুকের অতিপ্রাকৃত পরিচয় এবং তার মাধ্যমে ঘোষিত বক্তব্যের ঐশী উৎস—প্রতিটির জন্য আলাদা প্রমাণের প্রশ্ন থাকে।
ইসলামপূর্ব আল্লাহ কে ছিলেন?
ইসলামপূর্ব আরবে আল্লাহ একটি পরিচিত উপাস্যনাম ছিল। মুহাম্মদের জন্মের বহু আগে মানুষ এই নামে শপথ করত, সন্তানদের নাম রাখত এবং সৃষ্টিকর্তাকে সম্বোধন করত। বহু উপাস্য স্বীকারকারী আরবদের মধ্যেও আল্লাহকে আকাশ-পৃথিবীর স্রষ্টা হিসেবে মানার বিবরণ কোরআনেই আছে। ফলে মুহাম্মদের প্রচারের সূচনায় শ্রোতাদের প্রথমে সম্পূর্ণ অপরিচিত কোনো দেবতার নাম শেখাতে হয়নি। পরিচিত আল্লাহর নামে অন্য উপাস্যদের কর্তৃত্ব প্রত্যাখ্যান করা, তাঁর সঙ্গে অংশীদার স্বীকার নিষিদ্ধ করা এবং তাঁর একমাত্র অনুমোদিত মুখপাত্র হিসেবে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করা ছিল নতুন ধর্মীয় দাবির কেন্দ্র। একটি দেবতার নাম আগে থেকে প্রচলিত থাকা এবং পরে তাঁর উপাসনার একচ্ছত্র বিধান প্রতিষ্ঠিত হওয়া ধর্মীয় ইতিহাসের দুটি পৃথক পর্যায়।
কোরআন মক্কার বিরোধীদের সম্পর্কে বলছে, সৃষ্টির প্রশ্নে তারাও আল্লাহর নামই বলবে। তাদের সঙ্গে বিরোধটি তাই স্রষ্টার নামের অপরিচয় নিয়ে ছিল না; বিরোধ ছিল অন্য উপাস্যদের মর্যাদা, উপাসনার অধিকার এবং মুহাম্মদের ঘোষিত কর্তৃত্ব নিয়ে। [70]
وَلَئِن سَأَلْتَهُم مَّنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ ۖ فَأَنَّىٰ يُؤْفَكُونَ
বাংলা অনুবাদ:
তুমি যদি তাদের জিজ্ঞেস করো, কে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং সূর্য ও চন্দ্রকে নিয়োজিত করেছেন, তারা অবশ্যই বলবে: আল্লাহ। তাহলে তারা কীভাবে বিপথে চালিত হচ্ছে!
এই স্বীকারোক্তির তাৎপর্য স্পষ্ট। ইসলামপূর্ব আরবের ধর্মীয় ভাণ্ডারে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ উপস্থিত ছিলেন; ইসলামে সেই পরিচিত নাম নতুন একচ্ছত্র আনুগত্যের দাবির কেন্দ্র হয়েছে। কোরআন একটি পুরোনো ধর্মীয় সম্পর্ককে প্রত্যাখ্যান করে অন্য সম্পর্ক বাধ্যতামূলক করেছে। পুরোনো উপাস্যদের মন্দির, প্রতিমা ও মধ্যস্থতার স্থান বাতিল হয়েছে, আর আল্লাহর নামে ঘোষিত বিধান সমাজ ও রাজনীতির কর্তৃত্ব পেয়েছে। পরিচিত নামকে সর্বোচ্চ ধর্মীয় ক্ষমতার একমাত্র উৎস করা মানুষের ইতিহাসে অনুসরণযোগ্য একটি প্রক্রিয়া। তার ওপর অলৌকিক উৎপত্তির ঘোষণা বসালেই পূর্ববর্তী উপাসনার দলিল অদৃশ্য হয় না।
ভাষাগত ও ঐতিহাসিক সংযোগ
আরবি ইলাহ, হিব্রু এল ও এলোয়া এবং আরামীয়-সিরিয়াক এলাহা একই সেমিটিক ভাষাপরিবারের ঈশ্বরবাচক শব্দভাণ্ডারের সঙ্গে সম্পর্কিত। ভাষাগুলোর দীর্ঘ ইতিহাসে অনুরূপ ধ্বনি ও অর্থ টিকে আছে। আল্লাহকে “আল-ইলাহ” থেকে সংকুচিত রূপ হিসেবে ব্যাখ্যা করার মত প্রাচীন আরবি ভাষাতাত্ত্বিকদের মধ্যেও পাওয়া যায়। ইবনে কাসির কিসাই ও ফাররার এই ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ শব্দের ব্যুৎপত্তি নিয়ে ইসলামি পণ্ডিতদের নিজেদের মধ্যেই মতভেদ আছে; এই মতভেদও শব্দটির ওপর পরবর্তী ধর্মীয় ব্যাখ্যার ইতিহাসের অংশ। আরবের ধর্মীয় শব্দভাণ্ডার পূর্ববর্তী সেমিটিক জগতের সঙ্গে যুক্ত ছিল—এই সম্পর্কই ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। [71]
| ভাষা বা পরম্পরা | শব্দ | অর্থ ও ব্যবহার | ঐতিহাসিক সম্পর্ক |
|---|---|---|---|
| কানানীয় ও উত্তর-পশ্চিম সেমিটিক | El / ʾil | ঈশ্বরবাচক শব্দ; উগারিতীয় ধর্মে এল একটি নির্দিষ্ট দেবতার নামও। | সাধারণ উপাধি এবং ব্যক্তিনাম হিসেবে ব্যবহারের দুই স্তর আছে। |
| হিব্রু | Eloah / Elohim | এলোয়া একবচন; এলোহিম রূপগতভাবে বহুবচন, কিন্তু ইসরায়েলের ঈশ্বর বোঝাতে একবচন অর্থেও ব্যবহৃত। | শব্দের ব্যাকরণিক রূপ থেকে প্রতিটি বাক্যের দেবতার সংখ্যা নির্ধারিত হয় না। |
| আরামীয় ও সিরিয়াক | Elāhā / Alāhā | ঈশ্বর; সিরিয়াক খ্রিস্টীয় ভাষাতেও ব্যবহৃত। | আরবি ইলাহর সঙ্গে সেমিটিক ভাষাগত আত্মীয়তা আছে। |
| আরবি | Ilāh / al-ilāh / Allāh | ইলাহ অর্থ উপাস্য; আল্লাহ একটি প্রতিষ্ঠিত ঈশ্বরবাচক নাম। | ইসলামপূর্ব ব্যবহার এবং ইসলামে ব্যবহারের মধ্যে নামগত ধারাবাহিকতা আছে। |
একই ভাষাপরিবারে উপাস্যের নামের আত্মীয়তা একটি সাধারণ ঐতিহাসিক ঘটনা। মানুষের ভাষা, নামকরণ ও ধর্মীয় ধারণা প্রতিবেশী সমাজের সঙ্গে সংযোগ রেখে গড়ে ওঠে। আল্লাহ শব্দের ক্ষেত্রে আরবি ধর্মীয় ভাষার এই মানবীয় ইতিহাস সরাসরি সামনে আসে। শব্দটির অস্তিত্ব ব্যাখ্যা করতে আসমান থেকে সম্পূর্ণ নতুন একটি নাম নেমে আসার অনুমান দরকার হয় না। পুরোনো শব্দের সঙ্গে নতুন ধর্মতত্ত্ব জুড়ে দেওয়া যায়, যেমন পূর্বপরিচিত কোনো উপাস্যের মর্যাদা বদলে তাঁকে একমাত্র গ্রহণযোগ্য উপাস্য ঘোষণা করা যায়। ভাষাগত আত্মীয়তার সঙ্গে দেবতাদের পৃথক কাহিনি, আচার ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসও যুক্ত থাকে।
কানানীয় দেবধারণা, আরবের ধর্মীয় পরিবেশ এবং বাইবেলের সঙ্গে আরবের সম্পর্ক নিয়ে ধ্রুপদি গবেষণার মধ্যে ফ্র্যাঙ্ক মুর ক্রসের Canaanite Myth and Hebrew Epic, জেমস মন্টগোমারির Arabia and the Bible এবং ভেলহাউসেনের Reste Arabischen Heidentums উল্লেখযোগ্য। এসব আলোচনায় ভাষা, দেবনাম, গোত্র ও আচার একসঙ্গে আসে। একটি নামের ধ্বনিগত সাদৃশ্য থেকে প্রত্যেক দেবতার পূর্ণ পরিচয় অভিন্ন ঘোষণা করলে সেই নির্দিষ্ট ইতিহাস হারিয়ে যায়। আরবি আল্লাহর ইসলামপূর্ব ব্যবহার প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে সরাসরি উপাদান হলো আরবের নিজস্ব নাম, কবিতা, শিলালিপি এবং ইসলামি উৎসে সংরক্ষিত পূর্ববর্তী উপাসনার বিবরণ।
ধর্মীয় গঠনের সাদৃশ্য
সর্বোচ্চ দেবতা, তাঁর অধীনস্থ শক্তি, দেবসভা, বার্তাবাহক এবং মানুষের সঙ্গে মধ্যস্থতাকারী সত্তা—এ ধরনের ধর্মীয় বিন্যাস বহু প্রাচীন সমাজে পাওয়া যায়। একটি দেবতাকে সবচেয়ে বড় বলার অর্থ অন্য সব অলৌকিক সত্তার অনস্তিত্ব ঘোষণা করা নয়। বরং তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব অনেক সময় অধীনস্থ দেবতা ও শক্তির উপস্থিতির মধ্যেই প্রকাশ করা হয়। ইসলামপূর্ব আরবের আল্লাহর সঙ্গে অন্য উপাস্যদের সম্পর্কও এই প্রশ্ন তোলে: স্রষ্টা হিসেবে আল্লাহকে স্বীকার করার পরেও মানুষ অন্য দেবতার কাছে যেত কেন? ইসলামি উৎসের উত্তর হলো, তারা মধ্যস্থতা, নৈকট্য এবং সুপারিশ চাইত। অর্থাৎ তাদের ধর্মজীবনে সৃষ্টিকর্তা ও স্থানীয় উপাস্যের ভূমিকা পাশাপাশি ছিল।
| ধর্মীয় কাঠামো | কানানীয় পরম্পরা | মেসোপটেমীয় পরম্পরা | ইসলামপূর্ব আরবের বিবরণ |
|---|---|---|---|
| সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব | এলের পিতৃতুল্য মর্যাদা ও দেবসভা। | আনুর আকাশীয় মর্যাদা; ব্যাবিলনের ধর্মে মারদুকের প্রধানত্ব। | কোরআনে বিরোধীদের আল্লাহকে স্রষ্টা স্বীকারের উল্লেখ। |
| অধীনস্থ শক্তি | একাধিক দেবতার দায়িত্ব ও পারিবারিক সম্পর্ক। | দেবসভায় পৃথক দেবতা ও তাদের ক্ষমতা। | স্থানীয় দেবতা, দেবী ও মধ্যস্থতার উপাসনা। |
| ধর্ম ও প্রতিষ্ঠান | উপাসনাস্থল, পুরোহিত ও রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা। | মারদুকের মর্যাদার সঙ্গে ব্যাবিলনের রাজনৈতিক পরিচয়। | কাবা, গোত্রীয় উপাস্য, তীর্থ ও মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ। |
| কর্তৃত্ব পুনর্বিন্যাস | পৃথক সময় ও অঞ্চলে দেবতাদের মর্যাদা পরিবর্তন। | এনুমা এলিশে দেবসভার মাধ্যমে মারদুকের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা। | ইসলামে অন্য উপাস্যদের অধিকার বাতিল করে আল্লাহর একচ্ছত্র উপাসনা প্রতিষ্ঠা। |
কোরআন নিজেই সমুদ্রযাত্রার বিপদে আল্লাহকে একনিষ্ঠভাবে ডাকা এবং নিরাপদে ফিরে অন্য উপাস্যদের অংশীদার করার কথা বলেছে। আল্লাহ তাই দৈনন্দিন ধর্মজীবন থেকে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত কোনো নাম ছিলেন না। বিপদের বিশেষ পরিস্থিতিতে তাঁর সাহায্য চাওয়ার রীতি ধর্মীয় আচরণের অংশ ছিল। [72]
فَإِذَا رَكِبُوا فِي الْفُلْكِ دَعَوُا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ فَلَمَّا نَجَّاهُمْ إِلَى الْبَرِّ إِذَا هُمْ يُشْرِكُونَ
বাংলা অনুবাদ:
তারা যখন নৌযানে আরোহণ করে, তখন আল্লাহকে ডাকে তাঁর জন্য আনুগত্য একনিষ্ঠ করে। পরে তিনি যখন তাদের স্থলে উদ্ধার করে আনেন, তখনই তারা অংশীদার স্থাপন করে।
ধর্মীয় পরিবর্তনের নির্দিষ্ট জায়গাটি এখানেই। মানুষ যে স্রষ্টার কাছে বিপদে সাহায্য চাইত, তাঁর সঙ্গে অন্য দেবতার সম্পর্ক কী হবে, সেটি নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছে। ইসলাম সেই সম্পর্কের মধ্যে সহাবস্থানের জায়গা বন্ধ করে দিয়েছে। একটি গোত্র তার পুরোনো দেবতাকে সুপারিশকারী বলে মানবে, নাকি মুহাম্মদের ঘোষিত বিধান অনুসারে তাকে প্রত্যাখ্যান করবে—এই সিদ্ধান্ত পরে ধর্মীয় আনুগত্য ও রাজনৈতিক অধীনতার পরীক্ষাও হয়েছে। দেবতাতত্ত্বের প্রশ্ন তখন মন্দির, সম্পদ, গোত্রীয় মর্যাদা এবং কার আদেশ সমাজে কার্যকর হবে, সেই প্রশ্নের সঙ্গে মিশেছে।
প্রাক-ইসলামিক কবিতায় আল্লাহর অবস্থান
ইবনে কালবির কিতাবুল আসনাম-এ আউস ইবনে হাজারের নামে একটি শপথের পঙ্ক্তি সংরক্ষিত আছে। সেখানে লাত ও উজ্জার পাশাপাশি আল্লাহর শপথ নেওয়া হয়েছে এবং তাঁকে ওই দেবীদের চেয়ে বড় বলা হয়েছে। একই বক্তব্যে একাধিক উপাস্যের স্বীকৃতি এবং তাদের মধ্যে মর্যাদার পার্থক্য স্পষ্ট। [73]
وقال أوس بن حجر يحلف باللات:
وباللات والعزى ومن دان دينها ** وبالله إن الله منهن أكبر
বাংলা অনুবাদ:
আউস ইবনে হাজার লাতের শপথ করে বলেছেন:
লাত, উজ্জা এবং যারা তাদের ধর্ম মেনে চলে তাদের শপথ; আর আল্লাহর শপথ, নিশ্চয় আল্লাহ তাদের চেয়ে মহান।
পঙ্ক্তিটির ধর্মীয় ভাষা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করার জন্য কবিকে লাত ও উজ্জার অস্তিত্ব বা উপাসনা অস্বীকার করতে হয়নি। দেবমণ্ডলীর মধ্যে একজন বড় এবং অন্যরা ছোট—এই বিন্যাসেই বাক্যটি অর্থবহ। পরবর্তী ইসলামে যে আল্লাহ নাম একমাত্র বৈধ উপাস্যের পরিচয় হয়েছে, এই কাব্যিক স্মৃতিতে সেই নাম অন্য দেবীদের সঙ্গে একই শপথের পরিসরে আছে। একচ্ছত্র উপাসনার বিধান প্রতিষ্ঠার আগে নামটির সামাজিক জীবন কেমন ছিল, তা এই ধরনের উপাদান থেকে বোঝা যায়।
শিলালিপির গবেষণাও নামটির প্রাচীনত্বকে স্বাধীন বস্তুগত উপাদানের সঙ্গে যুক্ত করেছে। আহমদ আল-জাল্লাদের ২০২৫ সালের গবেষণা Ancient Allāh: An Epigraphic Reconstruction-এর সারসংক্ষেপে উত্তর-পূর্ব জর্ডানের হাররা অঞ্চলের MH09 স্থাপনার সাফাইটিক লেখার আলোচনা আছে। গবেষক ওই পাঠে আল্লাহকে আলোদাতা সৃষ্টিকর্তা এবং মৃত্যু-অন্ধকারের বিরুদ্ধে আহ্বান করা সত্তা হিসেবে শনাক্ত করেছেন। [74]
This complex text proffers strong evidence for Allāh’s role as a light-giving creator deity, called upon to act against death, represented by darkness.
বাংলা অনুবাদ:
এই জটিল পাঠ আল্লাহর আলোদাতা সৃষ্টিকর্তা দেবতার ভূমিকার পক্ষে শক্তিশালী সাক্ষ্য দেয়; অন্ধকারের মাধ্যমে উপস্থাপিত মৃত্যুর বিরুদ্ধে কাজ করার জন্য তাঁকে আহ্বান করা হয়েছে।
এই সাক্ষ্যের গুরুত্ব বস্তুগত উৎসের ধরনে। পরবর্তী মুসলিম লেখকের পূর্বপুরুষের কাহিনি এবং পাথরে উৎকীর্ণ প্রাচীন আহ্বান একই ধরনের উৎস নয়। শিলালিপির নির্দিষ্ট স্থান, লিপি ও প্রত্নতাত্ত্বিক পরিসর নিয়ে প্রশ্ন করা যায়; কবিতার ক্ষেত্রে পাঠসংরক্ষণ ও পরবর্তী সংকলনের ইতিহাস পরীক্ষা করা যায়। দুই ধরনের উপাদানই আল্লাহ নামের ইসলামপূর্ব উপস্থিতির আলোচনাকে সমৃদ্ধ করে। মুহাম্মদের আবির্ভাবের সঙ্গে নামটির উৎপত্তিকে এক করে দেখানো তাই ঐতিহাসিকভাবে ভুল। ইসলাম একটি বিদ্যমান ধর্মীয় শব্দ ও পরিচিত স্রষ্টাধারণাকে নিজের একচ্ছত্র বিধানের অধীনে সংগঠিত করেছে।
মেসোপটেমীয় দেবতাদের শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা
| দেবতা | ধর্মীয় পরিচয় | ক্ষমতার চিত্র |
|---|---|---|
| আনু | মেসোপটেমীয় আকাশদেবতা | দেবতাদের উচ্চ মর্যাদার একটি প্রাচীন মাপকাঠি। |
| মারদুক | ব্যাবিলনের প্রধান উপাস্য | দেবসভা, সার্বভৌমত্ব এবং শত্রুবিনাশের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা। |
ব্যাবিলনীয় সৃষ্টিকাব্য এনুমা এলিশ-এ মারদুকের প্রধানত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য দেবসভা, অনুমোদন, শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং বিশ্বশাসনের অধিকার একত্র হয়েছে। দেবতারা তাঁকে নিজেদের প্রধান ঘোষণা করছে। এল. ডব্লিউ. কিংয়ের ১৯০২ সালের অনুবাদের চতুর্থ ফলকে কথাগুলো আছে। [75]
Thou art chiefest among the great gods,
Thy fate is unequaled, thy word is Anu!
বাংলা অনুবাদ:
তুমি মহান দেবতাদের মধ্যে প্রধান;
তোমার নিয়তি অতুলনীয়, তোমার আদেশ আনুর আদেশ!
পরের ঘোষণা সরাসরি পৃথিবীর ওপর ক্ষমতার অধিকার দিচ্ছে। দেবতার ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্বকে রাজসার্বভৌমত্বের ভাষায় প্রকাশ করা হয়েছে। [76]
We give thee sovereignty over the whole world.
বাংলা অনুবাদ:
আমরা তোমাকে সমগ্র বিশ্বের ওপর সার্বভৌমত্ব দিচ্ছি।
সপ্তম ফলকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন মর্যাদার ভাষা আরও তীব্র। [77]
None among the gods can rival him!
বাংলা অনুবাদ:
দেবতাদের মধ্যে কেউ তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে না!
অধীনস্থ দেবতাদের সঙ্গে সম্পর্ক বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে রাখাল ও পালের চিত্র। [78]
He shepherded all the gods like sheep!
বাংলা অনুবাদ:
তিনি সব দেবতাকে ভেড়ার পালের মতো পরিচালনা করেছেন!
এই ভাষায় দেবতা এবং শাসকের প্রতিচ্ছবি একে অপরের মধ্যে প্রবেশ করে। সর্বোচ্চ দেবতার আদেশ অমান্য করা যায় না, তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী নেই, অন্যরা তাঁর অধীন এবং তাঁর বিজয়ই মহাজাগতিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করে। মানুষ যে রাজনৈতিক জগতে বাস করত, সেই জগতের সভা, রাজত্ব, সেনাশক্তি ও আনুগত্য দেবলোকেও বিস্তৃত হয়েছে। দেবতার শ্রেষ্ঠত্বের দাবির জন্য একাধিক অলৌকিক সত্তা থাকা বাধা হয়নি; অধীনস্থদের উপস্থিতিই প্রধানের ক্ষমতা দেখানোর উপায় হয়েছে।
ইসলামের একচ্ছত্র উপাসনার ঘোষণা হলো:
Lā ilāha illā Allāh.” — There is no god but Allah.
মারদুকের ঘোষণায় অন্য দেবতারা থেকে যায়, কিন্তু প্রধানের সমকক্ষ হতে পারে না। ইসলামি ঘোষণায় আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও বৈধ উপাস্য হওয়ার অধিকার প্রত্যাখ্যাত হয়। দুটি ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ কর্তৃত্বের বিন্যাসের মিল এবং উপাসনার সীমানার পার্থক্য নির্দিষ্ট। একটিতে দেবতাদের ওপর এক দেবতার প্রধানত্ব, অন্যটিতে উপাসনার ওপর এক সত্তার একচ্ছত্র অধিকার। উভয় ক্ষেত্রেই বিশ্বাসীর সামনে এমন এক কর্তৃত্ব দাঁড় করানো হয়, যার আদেশের ঊর্ধ্বে আর কোনো ধর্মীয় আপিল নেই। এই কর্তৃত্বের বর্ণনা নিজে তার অতিপ্রাকৃত সত্যতার প্রমাণ দেয় না; তা সংশ্লিষ্ট সমাজের ধর্মীয় ক্ষমতার ভাষা প্রকাশ করে।
মুহাম্মদের পরিবার ছিল আল্লাহর দাস
মুহাম্মদের বাবার নাম আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব। আবদুল্লাহ অর্থ আল্লাহর দাস। নবুওয়াত ঘোষণার আগেই তাঁর পরিবারের নামের মধ্যে আল্লাহর পরিচয় ছিল। পরিবারে একটি উপাস্যের নামে দাসত্বসূচক নাম থাকার অর্থ সেই উপাস্য তাঁদের পরিচিত ধর্মীয় জগতের অংশ ছিলেন। একই সমাজে আবদ মানাফ ও আবদুল উজ্জার মতো নামও প্রচলিত ছিল। সন্তানকে কোনো দেবতার দাস হিসেবে নামকরণ করা আরবের ধর্মজীবনের একটি পরিচিত রীতি; আল্লাহ নাম সেই রীতির বাইরের কোনো পরবর্তী আবিষ্কার ছিল না।
মুশরিকদের তীর্থযাত্রার তালবিয়ায় আল্লাহর সঙ্গে অংশীদারের সম্পর্ক কীভাবে কল্পিত হতো, তার সরাসরি বিবরণ সহিহ মুসলিমে আছে। অংশীদারকে তাঁরা আল্লাহর মালিকানার অধীন বলেই স্বীকার করত। [79]
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ كَانَ الْمُشْرِكُونَ يَقُولُونَ لَبَّيْكَ لاَ شَرِيكَ لَكَ – قَالَ – فَيَقُولُ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” وَيْلَكُمْ قَدْ قَدْ ” . فَيَقُولُونَ إِلاَّ شَرِيكًا هُوَ لَكَ تَمْلِكُهُ وَمَا مَلَكَ . يَقُولُونَ هَذَا وَهُمْ يَطُوفُونَ بِالْبَيْتِ .
বাংলা অনুবাদ:
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত: মুশরিকরা বলত, হে আল্লাহ, আমরা উপস্থিত; তোমার কোনো অংশীদার নেই। তখন রাসুল বলতেন, তোমাদের দুর্ভোগ হোক, এই পর্যন্তই, এই পর্যন্তই। তারা বলত, তবে এমন অংশীদার ছাড়া, যে তোমারই অধীন; তুমি তার এবং সে যা কিছুর মালিক তারও মালিক। তারা কাবা প্রদক্ষিণ করার সময়ে এ কথা বলত।
এই তালবিয়া দেখায়, অংশীদার স্বীকারকারী আরবরা আল্লাহকে অন্য দেবতার সমপর্যায়ের একজন হিসেবেই মানত—এমন সরল ছবি যথেষ্ট নয়। এখানে তিনি অংশীদারেরও মালিক। অধীনস্থ দেবতাকে স্বীকার করেও তাঁর সর্বোচ্চ মালিকানা মেনে নেওয়া হচ্ছিল। ইসলামি পরিবর্তন এই অধীনস্থ উপাস্যের অনুমোদন প্রত্যাহার করেছে। পরিবারে আল্লাহর দাস নাম রাখা, কাবার প্রদক্ষিণে তাঁকে ডাকা এবং অন্য উপাস্যকে তাঁর অধীন বলা একই ধর্মীয় পরিবেশের পরস্পরসংযুক্ত উপাদান। মুহাম্মদের ধর্মীয় ভাষা গড়ে ওঠার আগেই এই পরিবেশ প্রস্তুত ছিল।
আরবের আল্লাহ নামক সৃষ্টি দেবতা
আল্লাহ শব্দটির ইতিহাস ইসলামের চেয়ে পুরোনো। হিব্রু বাইবেলের এলোহিমও একটি পুরোনো ঈশ্বরবাচক শব্দ, যার অক্ষর হলো আলেফ, লামেদ, হে, ইউদ ও মেম। সূরা বাকারার সূচনায় আলিফ, লাম ও মিম আছে। দুটি লেখায় কিছু অক্ষরের সাদৃশ্য দেখা যায়; তাদের পূর্ণ অক্ষরক্রম এবং শব্দের ব্যাকরণিক পরিচয় পৃথক। বাকারার বিচ্ছিন্ন অক্ষরগুলোকে এলোহিমের সংকেত হিসেবে শনাক্ত করার কোনো প্রতিষ্ঠিত পাঠপ্রমাণ নেই। সেমিটিক ভাষাগুলোর ঈশ্বরবাচক শব্দের সম্পর্ক পরীক্ষা করার নির্ভরযোগ্য উপাদান হলো নিয়মিত শব্দরূপ, অর্থ ও ব্যবহারের ইতিহাস। আল্লাহর নামের ইসলামপূর্ব উপস্থিতি তার নিজস্ব আরবি সাক্ষ্যেই প্রতিষ্ঠিত; বিচ্ছিন্ন অক্ষরের অনুমান তার জন্য দরকার হয় না।

হিব্রু এলোয়া একবচন এবং এলোহিম রূপগতভাবে বহুবচন; বাইবেলে এলোহিম দিয়ে একক ঈশ্বরও বোঝানো হয়। আরবি ইলাহর সঙ্গে এই শব্দগুলোর সেমিটিক আত্মীয়তা আছে। মক্কার ধর্মীয় জীবনে আল্লাহকে স্রষ্টা মানা এবং একাধিক উপাস্যের কাছে সাহায্য চাওয়া পাশাপাশি চলত। কে বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন এবং কার মাধ্যমে মানুষের প্রার্থনা গৃহীত হবে—এই দুটি প্রশ্নে তাঁদের উত্তর একই সত্তায় সীমাবদ্ধ ছিল না। অন্যান্য ধর্মেও সর্বোচ্চ সত্তা, বিভিন্ন দেবতার পৃথক কাজ এবং স্থানীয় উপাসনার এমন বিন্যাস দেখা যায়। হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন ধারায় ব্রহ্ম, ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবের সম্পর্ক যেমন পৃথকভাবে ব্যাখ্যাত হয়, আরবের দেবধারণার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট গোত্র ও উৎসের বর্ণনা জরুরি। আল্লাহকে স্রষ্টা বলা থেকে মক্কার প্রত্যেক মানুষ একই ধর্মতত্ত্ব মানত, এমন সিদ্ধান্ত আসে না।
আবরাহার অভিযানের কাহিনিতে আবদুল মুত্তালিবের সঙ্গে কাবার রবের সম্পর্ক বিশেষভাবে প্রকাশিত। সীরাতের বিবরণে আবরাহার লোকেরা তাঁর দুইশ উট নিয়ে যায়। তিনি আবরাহার কাছে উট ফেরত চান। আবরাহা তখন প্রশ্ন করেন, নিজের ও পূর্বপুরুষের ধর্মের কেন্দ্র ধ্বংস হতে চলেছে, অথচ তিনি কেবল উটের কথা বলছেন কেন? আবদুল মুত্তালিবের উত্তর ছিল, তিনি উটের মালিক, আর ঘরটিরও একজন রব আছেন, যিনি তা রক্ষা করবেন। কথোপকথনটি আবরাহার সঙ্গে; কাবা ছেড়ে যাওয়ার সময়ে সাধারণ মানুষের প্রশ্নের উত্তর হিসেবে ঘটনাটি বর্ণিত হয়নি। ইসলামি সীরাতের এই কাহিনি নবুওয়াতের আগেই কাবার রবের ধারণাকে মুহাম্মদের পারিবারিক জগতে স্থাপন করেছে। [80]
বদর ও উহুদের সংঘাতে পক্ষগুলোর আল্লাহকে সম্বোধন এবং নিজেদের উপাস্যদের মর্যাদা দাবি করার বিবরণ আছে। বদরের মক্কাবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন আবু জাহলসহ কুরাইশ নেতারা; আবু সুফিয়ান তখন কাফেলার নেতৃত্বে ছিলেন। উহুদে আবু সুফিয়ানের মুখে হুবালের জয়ধ্বনি এবং মুসলিমদের উত্তরে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা সহিহ বুখারিতে সংরক্ষিত। কুরাইশের শপথ ও প্রার্থনায় আল্লাহর নামের উপস্থিতি তাঁদের ধর্মীয় ভাষার পূর্বপরিচিত উপাদান। একই নাম উচ্চারণ করেও দুই পক্ষের উপাসনার বিধান ও রাজনৈতিক আনুগত্য পরস্পরবিরোধী হতে পারে। [81] [82]
আবূ সুফইয়ানের বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে নিরাপদে চলে যাওয়া
এদিকে আবূ সুফইয়ান ইবন হাব সতর্কতার খাতিরে কাফেলা পেছনে রেখে নিজে আগে আগে এল। সে জলাশয়ের কাছে গিয়ে মাজদী ইব্ন ‘আমরকে জিজ্ঞেস করল কারো আনাগোনা টের পেয়েছ কি? সে বলল সন্দেহজনক কাউকে দেখিনি। তবে দু’জন উট সওয়ারকে দেখলাম এ টিলাটার কাছে এসে উট থেকে নামল। তারপর মশকে পানি ভরে নিয়ে চলে গেল। এ কথা শুনে আবু সুফইয়ান বাস্বাস্ ও ‘আদী (রা)-এর উট বসাবার জায়গাটিতে উপস্থিত হল। সেখানে তাদের উটদ্বয়ের খানিকটা গোবর পেয়ে তা তুলে নিয়ে সেটা ভেঙ্গে ফেলল। তার ভেতরে সে কতকগুলো খেজুরের আঁটি পেল। ঐ আঁটি দেখে সে বলল: আল্লাহর কসম! এটা ইয়াসরিবের পশুর গোবর। সে দ্রুতবেগে নিজের কাফেলার কাছে ছুটে গেল। সে কাফেলাকে ভিন্নপথে পরিচালিত করল এবং বদর প্রান্তর বামে রেখে, সমুদ্র কিনারের পথ ধরে দ্রুত চলে গেল।
ওদিকে কুরায়শরা অগ্রসর হয়ে জুহফাতে যাত্রা বিরতি করল। তখন তাদের দলের জুহায়ম ইন্ন সান্ত ইন্ন মাখরামা ইব্ন আবদুল মুত্তালিব ইব্ন ‘আব্দ মানাফ স্বপ্নে দেখল, যেন একটি লোক ঘোড়ার পিঠে চড়ে এসে থামল। তার সাথে একটা উটও ছিল। তারপর সে বলল: উত্তা ইব্ন রবী’আ, শায়বা ইব্ন রবী’আ, আবুল হাকাম ইব্ন হিশাম (আবু জাহল), উমাইয়া ইব্ন খাল্ল্ফ এবং অমুক অমুক নিহত হয়েছে। এভাবে বদরের যুদ্ধে কুরায়শের যে সব নেতা নিহত হয়েছিল, তাদের নাম সে উল্লেখ করল। এরপর আমি দেখলাম, সে ব্যক্তি তার *উটটিকে রক্তাক্ত করে কুরায়শ বাহিনীর মধ্যে ছেড়ে দিল। বাহিনীর কোন একটি শিবিরও অবশিষ্ট থাকল না, যাকে সে নিজের রক্তে রঞ্জিত করল না। জুহায়ম ইব্ন সালত তার এই স্বপ্নের বিষয় আবু জাহলের কাছে বর্ণনা করলে সে বলল: এ দেখি মুত্তালিব গোষ্ঠীর আর এক নবী! যদি মুকাবিলা হয় তবে কালই জানা যাবে কে নিহত হয়।
আবু জাহলের হঠকারিতা
ইবন ইসহাক বলেন: আবু সুফইয়ান যখন নিশ্চিত হল যে, তার কাফেলাকে সে বাঁচিয়ে নিয়ে এসেছে, তখন সে কুরায়শ বাহিনীর কাছে এ মর্মে বার্তা পাঠাল যে, তোমরা তো তোমাদের বাণিজ্যিক কাফেলা, লোকজন ও ধনসম্পদকে রক্ষা করার জন্যই এসেছিলে। এখন এগুলোকে আল্লাহ্ রক্ষা করেছেন। কাজেই তোমরা ফিরে যাও। কিন্তু আবু জাহল ইব্ন হিশাম বলল: আল্লাহর কসম! বদরে না গিয়ে ফিরব না। ওখানে তিন দিন থাকব, পশু যবেহ করে খাওয়াব, মদ পান করাব, গায়িকারা বাদ্য বাজিয়ে গান গাইবে, আরবে আমাদের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়বে। আমাদের সমাবেশ ও আভিযানের কথা প্রচারিত হবে; ফলে তাদের মনে আমাদের ভীতি ও প্রতাপ চিরদিনের জন্য বদ্ধমূল হয়ে যাবে। অতএব তোমরা চল।

আবদুল মুত্তালিবের বক্তব্যের প্রাসঙ্গিক সম্পূর্ণ কথোপকথনটি ইবনে কাসিরের সীরাত থেকে উদ্ধৃত হয়েছে। [83]
فلما قال له ذلك، قال أبرهة لترجمانه: قل له: لقد كنت أعجبتني حين رأيتك، ثم قد زهدت فيك حين كلمتني، أتكلمني في مائتي بعير أصبتها لك، وتترك بيتا هو دينك ودين آبائك، قد جئت لأهدمه لا تكلمني فيه! ؟ فقال له عبد المطلب: إني أنا رب الإبل، وإن للبيت ربا سيمنعه. فقال: ما كان ليمتنع مني. قال: أنت وذاك.
বাংলা অনুবাদ:
তিনি এ কথা বললে আবরাহা দোভাষীকে বললেন: তাকে বলো, তোমাকে দেখে প্রথমে মুগ্ধ হয়েছিলাম, কিন্তু তোমার কথা শুনে সেই মুগ্ধতা কমে গেল। তোমার দুইশ উট নিয়েছি, তুমি আমাকে তা নিয়ে বলছ; আর যে ঘর তোমার ও তোমার পূর্বপুরুষদের ধর্মের কেন্দ্র, যা ধ্বংস করতে এসেছি, তা নিয়ে কিছু বলছ না! আবদুল মুত্তালিব বললেন: আমি উটের মালিক; ঘরটিরও একজন রব আছেন, তিনি তা রক্ষা করবেন। আবরাহা বললেন: সেটি আমার হাত থেকে রক্ষা পাবে না। তিনি বললেন: তুমি আর তিনি বোঝাপড়া করো।
এই কথোপকথনের ধর্মীয় বিন্যাসে কাবা, পূর্বপুরুষের ধর্ম এবং ঘরের রব একই সূত্রে বাঁধা। যে সীরাত মুহাম্মদের নবুওয়াত প্রতিষ্ঠা করতে চায়, সেটিই তাঁর দাদার মুখে পূর্ববর্তী ধর্মজীবনের মধ্যে ঘরের অতিপ্রাকৃত রক্ষকের ধারণা রেখেছে। মক্কায় আল্লাহর পরিচয় যে নবুওয়াতের ঘোষণার সঙ্গে প্রথম তৈরি হয়নি, ইসলামি স্মৃতির মধ্যেই তার এই ধারাবাহিকতা আছে। কাবার ওপর কর্তৃত্বের লড়াইও তাই শুধু একটি স্থাপনা নিয়ে ছিল না; তার রবের নামে কার দাবি কার্যকর হবে, সেটিও ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষমতার প্রশ্ন হয়ে উঠেছিল।
হুবাল দেবতা কে ছিলেন?
হুবাল ইসলামপূর্ব মক্কার একটি প্রধান উপাস্য ছিলেন। কাবার ভেতরে তাঁর মনুষ্যাকৃতির প্রতিমা এবং তার সামনে ভাগ্যনির্ণায়ক তীর রাখার কথা ইবনে কালবি লিখেছেন। জন্মপরিচয়, বিবাহ, মৃত্যু, যাত্রা ও বিরোধের নিষ্পত্তিতে এই তীর ব্যবহার করা হতো। ফলে হুবালের উপাসনা শুধু ব্যক্তিগত প্রার্থনায় সীমাবদ্ধ ছিল না; পরিবার ও গোত্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ওপরও তার প্রতিষ্ঠানগত প্রভাব ছিল। তীরের ফলকে দেবতার সিদ্ধান্ত বলে মানলে মানুষের জীবনের বাস্তব অধিকার এক ধর্মীয় দৈবচয়নের হাতে চলে যায়। কে কার সন্তান হিসেবে স্বীকৃত হবে, কার পরিকল্পনা অনুমোদিত হবে এবং কোন বিরোধে কী সিদ্ধান্ত হবে—এসব বিষয়ে দেবতার নামে পুরোহিততন্ত্র কার্যকর কর্তৃত্ব পেত।
৬৩০ খিস্টাব্দে মক্কা বিজয়ের পর মুহাম্মদ কাবাঘরের রক্ষিত হুবাল সহ ৩৬০টি মূর্তি ভেঙে ফেলে। হিশাম ইবনে আল কালবি লিখিত কিতাব আল-আসনাম (দেবতাদের বই) বইয়ে হুবালের মূর্তির ডান হাত ভাঙা ছিল এবং তা সোনার হাত দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছিলো বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এই বিষয়ে আরো বিস্তারিত লেখা হয়েছে এই লেখাটিতে [12]


ইসলামপূর্ব আরবদের মধ্যে আল্লাহর সঙ্গে অন্য উপাস্যের সম্পর্কের একাধিক ধারণা ছিল। কোরআনে দেবীদের সঙ্গে কন্যাত্বের ধারণা, আল্লাহ ও জিনের মধ্যে বংশসম্পর্কের দাবি এবং বিপদে আল্লাহকে একনিষ্ঠভাবে ডাকার উল্লেখ আছে। হুবাল ও আল্লাহর নাম উহুদের বর্ণনায় পৃথক স্লোগানে এসেছে: আবু সুফিয়ান হুবালের মর্যাদা ঘোষণা করছেন, আর মুসলিমদের উত্তরে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব জানাতে বলা হচ্ছে। এ উৎসে হুবালকে সরাসরি আল্লাহর আরেক নাম বলা হয়নি। একই ধর্মীয় পরিবেশে একাধিক উপাস্যের অবস্থান এবং তাদের মর্যাদা নিয়ে সংঘাতই বর্ণনাটির নির্দিষ্ট বিষয়। [84]
মুহাম্মদের প্রচারের আগে জায়েদ ইবনে আমর ইব্রাহিমের ঈশ্বরের উপাসনার কথা বলতেন। কাবাকেন্দ্রিক সমাজের ভেতরেই প্রচলিত উপাস্যদের প্রত্যাখ্যান এবং পূর্বপুরুষের ধর্মের শুদ্ধ সংস্করণ দাবি করার ধারা ছিল। মুহাম্মদ সেই পরিচিত ধর্মীয় জগতের মধ্যে আল্লাহর একচ্ছত্র উপাসনা প্রতিষ্ঠা করেন। ইসলামি উৎসে আল্লাহর হাত, পা এবং আরশে অবস্থানের মতো বর্ণনা আছে; এসবের ব্যাখ্যা নিয়ে মুসলিম ধর্মতত্ত্বে বিভিন্ন মতও গড়ে উঠেছে। উপাস্যের মর্যাদা, অঙ্গবাচক ভাষা এবং অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার যে প্রশ্ন অন্য ধর্মের ক্ষেত্রে ওঠে, ইসলামি বর্ণনার ক্ষেত্রেও তার যথার্থতা পরীক্ষা করতে হয়। অলৌকিক সত্তার ধর্মীয় নাম নিজে তার অস্তিত্বের প্রমাণ সরবরাহ করে না। [85]
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৮/ জিহাদ
পরিচ্ছেদঃ ১৯০৫. যুদ্ধক্ষেত্রে ঝগড়া ও মতবিরোধ করা অপছন্দনীয়। কেউ যদি ইমামের আবাধ্যতা করে তার শাস্তি। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ আর তোমরা ঝগড়া-বিবাদ করবে না, করলে তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলবে এবং তোমাদের শক্তি বিলুপ্ত হবে। (৮ঃ ৪৬) الرِّيحُ অর্থ যুদ্ধ
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ২৮২৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৩০৩৯
২৮২৫। আমর ইবনু খালিদ (রহঃ) … বারা ইবনু আযিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদ যুদ্ধের দিন আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইর (রাঃ) কে পঞ্চাশজন পদাতিক যোদ্ধার উপর আমীর নিযুক্ত করেন এবং বলেন, তোমরা দেখ যে, আমাদের কে পক্ষীকুল ছোঁ মেরে নিয়ে যাচ্ছে, তথাপি তোমরা আমার নিকট হতে সংবাদ প্রেরণ করা ব্যতীত স্ব-স্থান ত্যাগ করবে না। আর যদি তোমরা দেখ যে, আমরা শত্রু দলকে পরাস্ত করেছি এবং আমরা তাদেরকে পদদলিত করেছি, তখনও আমার পক্ষ হতে সংবাদ প্রেরণ করা ব্যতীত স্ব-স্থান ত্যাগ করবে না। অনন্তর মুসলিমগণ কাফিরদেরকে যুদ্ধে পরাস্ত করে দিল। বারা (রাঃ) বলেন, আল্লাহর শপথ! আমি মুশরিকদের মহিলাদেরকে দেখতে পেলাম তারা নিজ পরিধেয় বস্ত্র উপরে উঠিয়ে পলায়ন করছে। যাতে পায়ের অলঙ্কার ও পায়ের নলা উন্মুক্ত হয়ে গিয়েছ।
তখন আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইর (রাঃ) এর সহযোগীগণ বলতে লাগলেন, ‘লোক সকল! এখন তোমরা গনীমতের মাল সংগ্রহ কর। তোমাদের সাথীরা বিজয় লাভ করেছ। আর অপেক্ষা কিসের? তখন আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইর (রাঃ) বললেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদেরকে যা বলেছিলেন, তা তোমরা ভুলে গিয়েছ?’ তারা বললেন, ‘আল্লাহর শপথ, আমরা লোকদের সাধে মিলিত হয়ে গনীমতের মাল সংগ্রহে অংশগ্রহণ করব।’ তারপ যখন তারা স্ব-স্থান ত্যাগ করে নিজেদের লোকজনের নিকট পৌঁছল, তখন (কাফিরগণ কর্তৃক) তাদের মুখ ফিরিয়ে দেয়া হয় আর তারা পরাজিত হয়ে পলায়ন করতে থাকেন। এটা সে সময় যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে পেছন থেকে ডাকছিলেন।
তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে বারজন লোক ব্যতীত অপর কেউই অবশিষ্ট ছিল না। কাফিরগণ এ সুযোগে মুসলিমদের সত্তর বক্তিকে শহীদ করে ফেলে। এর পূর্বে বদর যুদ্ধে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাথীগণ মুশরিকদের সত্তরজনকে বন্দী ও সত্তরজনকে নিহত করেন। এ সময় আবূ সুফিয়ান তিনবার আওয়াজ দিল, ‘লোকদের মধ্যে কি মুহাম্মদ জীবিত আছে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উত্তর দিতে নিষেধ করেন। পুনরায় তিনবার আওয়াজ দিল লোকদের মধ্যে কি আবূ কুহাফার পুত্র (আবূ বকর (রাঃ) জীবিত আছে?’ পুনরায় তিনবার আওয়াজ দিল, ‘লোকদের মধ্যে কি খাত্তাবের পুত্র (উমর (রাঃ) জীবিত আছে?’ তারপর সে নিজ লোকদের নিকট গিয়ে বলল, ‘এরা সবাই নিহত হয়েছে।’ এ সময় উমর (রাঃ) ধৈর্যধারণ করতে পারলেন না। তিনি বলে উঠলেন, ‘ওহে আল্লাহর শত্রু! আল্লাহর শপথ, তুমি মিথ্যা বলেছো। যাদের তুমি নাম উচ্চারণরণ করেছো তারা সবাই জীবিত আছেন। তোমাদের জন্য চরম পরিণতি অবশিষ্ট রয়েছে।’
আবূ সুফিয়ান বলল, আজ বদরের দিনের প্রতিশোধ। যুদ্ধ তো বালতির ন্যায়। তোমরা তোমাদের লোকজনের মধ্যে নাক-কান কর্তিত দেখবে, আমি এর আদেশ করিনি কিন্তু তা আমি অপছন্দও করিনি। এরপর বলতে লাগল, ‘হে হুবাল (মূর্তি)! তুমি উন্নত শির হও।’ তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাগণকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘তোমরা এর উত্তর দিবে না?’ তারা বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা কি বলব?’ তিনি বললেন, ‘তোমরা বল, আল্লাহ তা‘আলাই সর্বোচ্চ মর্যাদাবান, তিনিই মাহিমান্বিত।’ আবূ সুফিয়ান বলল, আমাদের উয্যা (দেবতা) রয়েছে, তোমাদের উয্যা নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা কি এর উত্তর দিবে না?’ বারা (রাঃ) বলেন, ‘সাহাবাগণ বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা কি বলব?’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তোমরা বল আল্লাহ আমাদের সাহায্যকারী বন্ধু, তোমাদের কোন সাহায্যকারী বন্ধু নেই।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ বারা’আ ইবনু আযিব (রাঃ)
ইবনে কালবির বর্ণনায় প্রতিমার উপাদান, ভাঙা হাত এবং তীরের ব্যবহার একসঙ্গে এসেছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বাস্তব সামাজিক ক্ষমতা বুঝতে এই বিবরণ গুরুত্বপূর্ণ। [86]
وكان فيما بلغني من عقيق أحمر على صورة الإنسان، مكسور اليد اليمنى. أدركته قريش كذلك، فجعلوا له يدا من ذهب. وكان أول من نصبه خزيمة بن مدركة بن اليأس بن مضر. وكان يقال له هبل خزيمة. وكان في جوف الكعبة، قدامه سبعة أقدح. مكتوب في أولها: «صريح» والآخر: «ملصق». فإذا شكوا في مولود، أهدوا له هدية ثم ضربوا بالقداح. فإن خرج «صريح» ألحقوه، وإن خرج «ملصق» دفعوه، وقدح على الميت، وقدح على النكاح، وثلاثة لم تفسر لي على ما كانت.
বাংলা অনুবাদ:
আমার কাছে পৌঁছানো বিবরণ অনুসারে, সেটি ছিল লাল আকিক পাথরের মনুষ্যাকৃতির প্রতিমা, যার ডান হাত ভাঙা ছিল। কুরাইশরা তাকে সেই অবস্থায় পেয়ে সোনার একটি হাত লাগায়। প্রথম যিনি তাকে স্থাপন করেন তিনি খুজাইমা ইবনে মুদরিকা ইবনে ইলিয়াস ইবনে মুদার। তাকে খুজাইমার হুবালও বলা হতো। সেটি কাবার ভেতরে ছিল; সামনে ছিল সাতটি তীর। প্রথমটিতে লেখা ছিল “বিশুদ্ধ বংশজাত”, অন্যটিতে “সংযুক্ত”। কোনো শিশুর বংশপরিচয়ে সন্দেহ হলে তারা উপহার দিয়ে তীর তুলত। “বিশুদ্ধ বংশজাত” উঠলে শিশুকে বংশে যুক্ত করত, “সংযুক্ত” উঠলে প্রত্যাখ্যান করত। একটি তীর মৃত ব্যক্তির বিষয়ে, একটি বিবাহের বিষয়ে; বাকি তিনটির ব্যবহার আমাকে ব্যাখ্যা করা হয়নি।
প্রতিমার হাত মানুষ সোনা দিয়ে তৈরি করে দিয়েছে, কিন্তু সেই প্রতিমার সামনে রাখা তীর মানুষের বংশপরিচয় নির্ধারণ করছে। এই উল্টো সম্পর্ক কুসংস্কারের সামাজিক ক্ষমতাকে স্পষ্ট করে। বস্তুটি মানুষের নির্মাণ ও সংস্কারের ওপর নির্ভরশীল, অথচ তার নামে মানুষের অধিকার নির্ধারিত হয়। কোনো শিশুর পরিচয় সম্পর্কে যাচাইযোগ্য সাক্ষ্যের বদলে তীরের ফলকে চূড়ান্ত বলে মানা যুক্তিগতভাবে ভিত্তিহীন এবং সামাজিকভাবে নিষ্ঠুর। হুবালের সামনে ভাগ্যনির্ণয়ের আচার ধর্মের সেই কাঠামোর উদাহরণ, যেখানে মানবনির্মিত পদ্ধতিকে অদৃশ্য দেবতার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে তোলা হয়।
অন্যান্য প্রাচীন দেবতারা
আরবের আল্লাহ, গ্রিক জিউস, রোমান জুপিটার এবং মিশরের আমুনের মধ্যে তুলনার একটি জায়গা হলো সর্বোচ্চ ধর্মীয় মর্যাদার ধারণা। পৃথক সভ্যতায় দেবতার নাম, কাহিনি ও দায়িত্ব আলাদা হলেও প্রধান দেবতা এবং অধীনস্থ শক্তির বিন্যাস পাওয়া যায়। স্থানীয় জনগোষ্ঠী তাদের উপাসনাস্থল, জীবনযাত্রা ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দেবতাদের সম্পর্ক তৈরি করেছে। আরবের উপাস্যদের ক্ষেত্রেও গোত্র, তীর্থ, উৎসর্গ এবং পবিত্র স্থানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এই বৈচিত্র্যকে ইসলামের আগের আরবের নিজস্ব ধর্মীয় ইতিহাস হিসেবে বুঝলে পরবর্তী ধর্মীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার বাস্তব ক্ষেত্রটি পরিষ্কার হয়।
মক্কার গুরুত্বপূর্ণ উপাস্য হুবালের প্রতিমা কাবার ভেতরে ছিল এবং তার সামনে ভাগ্যনির্ণয়ের আচার চলত। কাবার আশপাশে তিনশ ষাটটি প্রতিমা থাকার কথা বুখারিতেও এসেছে। এই সংখ্যা থেকে বছরের প্রতিটি দিনের জন্য একটি দেবতা ছিল বলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দলিল নেই। তবে প্রতিমাগুলোর উপস্থিতি কাবাকে বহু উপাস্যের ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে দেখায়। মুহাম্মদের মক্কা বিজয়ের পরে সেই বহুউপাস্যকেন্দ্রের ওপর একচ্ছত্র ইসলামি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। একই পবিত্র স্থান বহাল রেখে তার অনুমোদিত উপাসনার সীমানা বদলে দেওয়া ধর্মীয় রূপান্তরের একটি প্রত্যক্ষ উদাহরণ। [87]
মানাফ আরবের আরেকটি উপাস্যনাম। ইবনে কালবি জানিয়েছেন, এই নামের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেই কুরাইশদের মধ্যে আবদ মানাফ নাম রাখা হতো। তিনি মানাফের অবস্থান ও প্রথম স্থাপনকারী সম্পর্কে নিজের অজ্ঞতাও স্পষ্ট করেছেন। একই আলোচনায় ঋতুমতী নারীদের প্রতিমার কাছে না যাওয়া এবং তা স্পর্শ না করার সাধারণ বিধির কথা আছে। নারীদের ওই নিষেধাজ্ঞা থেকে মানাফকে ঋতুস্রাবের দেবতা বানানো ভুল। এখানে প্রাসঙ্গিক বিষয় হলো পবিত্রতা-অপবিত্রতার ধর্মীয় বিভাজন এবং দেবতার নামে পরিবারের নামকরণ। মুহাম্মদের পিতৃকুল ও মাতৃকুলের বংশপরিচয়েও আবদ মানাফ নাম পাওয়া যায়। [88]
| ব্যক্তি | মুহাম্মদের সঙ্গে সম্পর্ক | নামের তাৎপর্য |
|---|---|---|
| আবদ মানাফ ইবনে কুসাই | পিতৃকুলের ঊর্ধ্বতন পূর্বপুরুষ | আবদ মানাফ অর্থ মানাফের দাস। |
| হাশিম ইবনে আবদ মানাফ | প্রপিতামহ | হাশিমের পিতার নাম আবদ মানাফ; হাশিমের নিজের নামের অর্থ মানাফের দাস নয়। |
| ওয়াহব ইবনে আবদ মানাফ | মাতামহ; আমিনার পিতা | মাতৃকুলের বংশপরিচয়েও আবদ মানাফ নাম রয়েছে। |

লাত, উজ্জা ও মানাত আরবের তিন গুরুত্বপূর্ণ দেবী। তাঁদের উপাসনাস্থল একই জায়গায় ছিল না: লাতের কেন্দ্র তাইফ, উজ্জার প্রসিদ্ধ উপাসনাস্থল নাখলা এবং মানাতের স্থান কুদাইদের কাছে আল-মুশাল্লাল অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত। তীর্থের সমাপ্তি, মানত, উৎসর্গ এবং গোত্রীয় পরিচয়ের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক ছিল। ইসলাম প্রতিষ্ঠার পরে এই উপাসনাকেন্দ্রগুলো ধ্বংস করার বর্ণনা মুসলিম উৎসেই সংরক্ষিত। ফলে ধর্মীয় পরিবর্তন শুধু মানুষের ব্যক্তিগত মত বদলানোর ঘটনা ছিল না; প্রতিদ্বন্দ্বী উপাসনার দৃশ্যমান প্রতিষ্ঠানও বলপ্রয়োগে অপসারিত হয়েছে।
| দেবী | উপাসনার পরিচয় | স্থান ও পরবর্তী ঘটনা |
|---|---|---|
| লাত — اللات | ইবনে কালবির বর্ণনায় চারকোনা পাথর এবং তার ওপর নির্মিত উপাসনাকেন্দ্র; সাকিফ ও অন্য আরবদের সম্মানিত দেবী। | তাইফ; সাকিফ ইসলাম গ্রহণের পরে মুগিরা ইবনে শুবাকে দিয়ে ধ্বংস করানোর বিবরণ আছে। |
| উজ্জা — العزى | কুরাইশের অত্যন্ত মর্যাদাপ্রাপ্ত দেবী; উপহার ও উৎসর্গ দেওয়া হতো। | নাখলা; খালিদ ইবনে ওয়ালিদের অভিযানে উপাসনাকেন্দ্র ধ্বংসের বিবরণ আছে। |
| মানাত — مناة | আউস ও খাজরাজের তীর্থ এবং মস্তক মুণ্ডনের রীতির সঙ্গে যুক্ত দেবী। | কুদাইদের কাছে সমুদ্রতীরবর্তী স্থান; মুসলিম অভিযানে প্রতিমা ধ্বংসের কথা বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে। |

মানাফ সম্পর্কে ইবনে কালবির বক্তব্যের ভাষাই দেবনাম ও নারীদের পবিত্রতাবিধির সম্পর্ক পরিষ্কার করে। [89]
قال: وكان لهم أيضا مناف. فبه كانت تسمى قريش عبد مناف. ولا أدري أين كان ولا من نصبه. ولم تكن الحيض من النساء تدنو من أصنامهم ولا تمسح بها. إنما كانت تقف ناحية منها.
বাংলা অনুবাদ:
তিনি বলেন: তাদের মানাফ নামেও একটি উপাস্য ছিল। তার নামেই কুরাইশরা আবদ মানাফ নাম রাখত। আমি জানি না সেটি কোথায় ছিল এবং কে তা স্থাপন করেছিল। ঋতুমতী নারীরা তাদের প্রতিমাগুলোর কাছে যেত না এবং সেগুলো স্পর্শ করত না। তারা সেগুলো থেকে দূরে এক পাশে দাঁড়াত।
দেবতার দাস হিসেবে নামকরণ একটি শিশুকে জন্মের সময়েই পরিবারের ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করে। সে নিজে কোনো মত নির্বাচন করার আগে তার পরিচয়ে আনুগত্য বসে যায়। মন্দিরের সামনে নারীর প্রবেশ ও স্পর্শের নিয়ন্ত্রণও একইভাবে দৈহিক অবস্থাকে ধর্মীয় মর্যাদার মাপকাঠি বানায়। ফলে প্রাচীন উপাসনার ইতিহাসে কেবল দেবতার নামের তালিকা নেই; পরিবারে কর্তৃত্ব, নারীর ওপর বিধিনিষেধ এবং কোন ব্যক্তি পবিত্রতার পরিসরে প্রবেশ করতে পারবে, তার সামাজিক ব্যবস্থা আছে। এই ব্যবস্থা পরবর্তী ধর্মীয় আইন ও আচার বিচার করার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ তুলনামূলক ক্ষেত্র।
লাত ও উজ্জার উপাসনা উত্তর আরবের বাইরেও নাবাতীয় অঞ্চল ও বোসরার শিলালিপিতে শনাক্ত হয়েছে। ফরাসি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক বিবরণে বোসরার দেবী হিসেবে উজ্জা এবং লাতের উল্লেখ, দুশারার প্রাধান্য এবং মঞ্চের ওপর স্থাপিত পবিত্র পাথরের উপাসনার দলিল আলোচনা করা হয়েছে। দেবী ও দেবতার নামে আলাদা নগর ও গোত্র নিজেদের পরিচয় সংগঠিত করত। একটি ধর্মের ভাষায় যাদের শুধু “মিথ্যা উপাস্য” বলা হয়, প্রত্নতত্ত্বে তারা বাস্তব মানুষের বাস্তব উপাসনা, স্থাপত্য ও স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে। [90]
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দেবদেবী
| উপাস্য | পরিচয় | সাক্ষ্যের ধরন |
|---|---|---|
| ওয়াদ — ود | দুমাতুল জান্দালের কালব গোত্রের উপাস্য; ইবনে কালবি অস্ত্রধারী মনুষ্যাকৃতির প্রতিমার বিবরণ দিয়েছেন। | ইবনে কালবি; বুখারিতে ইবনে আব্বাসের বক্তব্য। |
| আম্ম — ʿAmm | দক্ষিণ আরবের কাতাবান রাজ্যের প্রধান দেবতা। | দক্ষিণ আরবীয় শিলালিপি নিয়ে গবেষণায় তাঁর উপাসনা আলোচিত। |
| তালাব রিয়াম — تألب ريام | দক্ষিণ আরবের সামাই অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত উপাস্য; মন্দির, উৎসর্গ ও দৈবপরামর্শের বিবরণ আছে। | দক্ষিণ আরবীয় শিলালিপি ও রিয়ামের উপাসনাকেন্দ্রের দলিল। |
| যুল-খালাসা — ذو الخلصة | তাবালা অঞ্চলের উপাসনাকেন্দ্র; পাথর ও ভাগ্যনির্ণয়ের আচারের সঙ্গে যুক্ত। | ইবনে কালবির বিবরণ; ধ্বংসের অভিযান সম্পর্কে হাদিস। |
| শাই আল-কওম — شيع القوم | নাবাতীয় পরিবেশের উপাস্য; কাফেলার রক্ষক হিসেবে পরিচিত। | পালমিরার ১৩২ খ্রিস্টাব্দের উৎসর্গলিপি এবং অন্য শিলালিপি। |
| দুশারা — ذو الشرى | পেত্রার নাবাতীয়দের প্রধান উপাস্য; শারা অঞ্চলের সঙ্গে নামের সম্পর্ক। | নাবাতীয় শিলালিপি, প্রতিমা, পবিত্র পাথর ও উপাসনাকেন্দ্র। |
ওয়াদ, সুওয়া, ইয়াগুস, ইয়াউক ও নাসরের আরবীয় গোত্রভিত্তিক উপাসনার বিবরণ ইবনে আব্বাসের বক্তব্য হিসেবে বুখারিতে আছে। একই বর্ণনা দেবতাদের উৎপত্তিকে নূহের জাতির সৎ ব্যক্তিদের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত করেছে। প্রথম অংশে নির্দিষ্ট আরবীয় স্থান ও গোত্রের পরিচয়, পরের অংশে সেই উপাসনার ধর্মীয় উৎপত্তিকাহিনি এসেছে। [91]
صَارَتِ الأَوْثَانُ الَّتِي كَانَتْ فِي قَوْمِ نُوحٍ فِي الْعَرَبِ بَعْدُ، أَمَّا وُدٌّ كَانَتْ لِكَلْبٍ بِدَوْمَةِ الْجَنْدَلِ، وَأَمَّا سُوَاعٌ كَانَتْ لِهُذَيْلٍ، وَأَمَّا يَغُوثُ فَكَانَتْ لِمُرَادٍ ثُمَّ لِبَنِي غُطَيْفٍ بِالْجُرْفِ عِنْدَ سَبَا، وَأَمَّا يَعُوقُ فَكَانَتْ لِهَمْدَانَ، وَأَمَّا نَسْرٌ فَكَانَتْ لِحِمْيَرَ، لآلِ ذِي الْكَلاَعِ. أَسْمَاءُ رِجَالٍ صَالِحِينَ مِنْ قَوْمِ نُوحٍ، فَلَمَّا هَلَكُوا أَوْحَى الشَّيْطَانُ إِلَى قَوْمِهِمْ أَنِ انْصِبُوا إِلَى مَجَالِسِهِمُ الَّتِي كَانُوا يَجْلِسُونَ أَنْصَابًا، وَسَمُّوهَا بِأَسْمَائِهِمْ فَفَعَلُوا فَلَمْ تُعْبَدْ حَتَّى إِذَا هَلَكَ أُولَئِكَ وَتَنَسَّخَ الْعِلْمُ عُبِدَتْ.
বাংলা অনুবাদ:
নূহের জাতির প্রতিমাগুলো পরে আরবদের মধ্যে আসে। ওয়াদ ছিল দুমাতুল জান্দালে কালব গোত্রের; সুওয়া ছিল হুজাইলের; ইয়াগুস প্রথমে মুরাদের, পরে সাবার কাছের জুরফে বনু গুতাইফের; ইয়াউক ছিল হামদানের এবং নাসর ছিল হিমইয়ারের যু-কালা পরিবারের। এগুলো নূহের জাতির কয়েকজন সৎ ব্যক্তির নাম। তাঁরা মারা গেলে শয়তান তাঁদের লোকদের প্ররোচনা দেয়, তাঁরা যেখানে বসতেন সেখানে স্মারক স্থাপন করে তাঁদের নামে নাম রাখতে। তারা তাই করে। প্রথমে সেগুলোর উপাসনা করা হতো না; পরে ওই লোকেরাও মারা গেলে এবং জ্ঞান হারিয়ে গেলে সেগুলোর উপাসনা শুরু হয়।
ধর্মীয় উৎপত্তিকাহিনিতে স্মৃতিস্তম্ভ থেকে উপাস্য তৈরি হওয়ার ব্যাখ্যা আছে। এর ভেতরেও একটি মানবীয় প্রক্রিয়া স্বীকার করা হয়েছে: মানুষ বস্তু স্থাপন করে, নাম দেয়, পরবর্তী প্রজন্ম সেই বস্তুর মর্যাদা বদলায় এবং আচার তৈরি হয়। দেবতার অতিপ্রাকৃত অস্তিত্ব প্রমাণের বদলে ধর্মীয় মর্যাদা কীভাবে মানুষের আচরণে প্রতিষ্ঠিত হয়, সেই ইতিহাস এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আরবের গোত্রগুলোর ভিন্ন উপাস্য ও পবিত্র কেন্দ্র দেখায়, মুহাম্মদের সমাজ আগে থেকেই সমৃদ্ধ এক ধর্মীয় প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র ছিল। নতুন ধর্ম তার মধ্যে প্রবেশ করে এবং বিজয়ের পরে অন্য উপাসনাকেন্দ্রের বৈধতা প্রত্যাহার করে।
পালমিরার একটি লিপিতে ১৩২ খ্রিস্টাব্দে এক নাবাতীয় অশ্বারোহীর শাই আল-কওমের উদ্দেশে বেদি উৎসর্গের উল্লেখ আছে। তেইক্সিদোর ওই দেবতার কাফেলা-রক্ষক পরিচয় এবং প্রাচীন সেমিটিক অঞ্চলে দেবতার বার্তাবাহক বা সহায়ক সত্তার উপাসনা আলোচনা করেছেন। ধর্মীয় যোগাযোগের এই জগৎ আরবের উপাসনাকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হিসেবে দেখার সুযোগ দেয় না। বাণিজ্যপথ, যাত্রা, সামরিক চাকরি এবং গোত্রীয় যোগাযোগের সঙ্গে দেবনাম ও রক্ষকসত্তার ধারণাও চলাচল করেছে। [92]
দক্ষিণ আরবের তালাব রিয়ামের উদ্দেশে উৎসর্গলিপিতে ভালো ফসল, শীত, ক্ষতি, জাদু, পোকামাকড় ও শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষার আবেদন আছে। ষাঁড়ের প্রতিমা এবং ডান হাতের প্রতিরূপ উৎসর্গের বিবরণও গবেষণায় আলোচিত হয়েছে। কৃষি, শরীর ও নিরাপত্তার বাস্তব উদ্বেগকে দেবতার সাহায্যের সঙ্গে বাঁধা হচ্ছে। পূজার সামগ্রী ও দৈবপরামর্শের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট উপাসনাকেন্দ্র মানুষের জীবনে কর্তৃত্ব পায়। আরবের এই ধর্মীয় ইতিহাসে প্রার্থনা, উৎসর্গ এবং অতিপ্রাকৃত সুরক্ষার ধারণা আগে থেকেই একত্র ছিল। [93]
অন্যান্য অলৌকিক সত্তা
আরবের ধর্মীয় সাহিত্য ও পরবর্তী লোককাহিনিতে জিন, ইফরিত, গুল, নাসনাস ও বিশাল মহাজাগতিক মাছের মতো সত্তার বিবরণ আছে। এসব নামের উৎস ও সময় এক নয়। জিন ও ইফরিত কোরআনে এসেছে; নাসনাস ও বাহামুতের বিস্তৃত অবয়ব লোককাহিনি ও বিশ্ববর্ণনামূলক সাহিত্যে পাওয়া যায়। মানুষের ভয়, রোগ, নির্জন স্থানের অজানা শব্দ এবং বিপদের জন্য অদৃশ্য প্রাণী কল্পনা করার অভ্যাস এই সাহিত্যকে পুষ্ট করেছে। ইসলাম পুরোনো জিনবিশ্বাসকে ধর্মগ্রন্থের ভেতরে স্থান দিয়ে তাদের জন্য বিশ্বাস, অবিশ্বাস, নবীর প্রচার গ্রহণ এবং শাস্তির আলাদা জগৎ তৈরি করেছে।
| সত্তা | বিবরণ ও কাহিনির বৈশিষ্ট্য | উৎসের পরিসর |
|---|---|---|
| জিন — جن | স্বাধীন ইচ্ছা, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, ভালোমন্দ কাজ এবং মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষমতাসম্পন্ন অদৃশ্য জাতি। | কোরআন ও হাদিস; আগের আরবীয় বিশ্বাসের ধর্মীয় পুনর্গঠন। |
| মারিদ — مارد | উদ্ধত বা বিদ্রোহী সত্তা; পরবর্তী লোককাহিনিতে অত্যন্ত শক্তিশালী, স্বাধীন ইচ্ছাসম্পন্ন জিন, যে মানুষের ইচ্ছা পূরণ করতে পারে। গল্পে তার সঙ্গে যুদ্ধ, শাস্তি, বিশেষ অনুষ্ঠান বা তুষ্টির মাধ্যমে তাকে বশ করে দৈনন্দিন কাজ আদায়ের কল্পনা আছে। | কোরআনে বিদ্রোহী শয়তানের বিশেষণ; পরবর্তী কাহিনিতে বিস্তৃত শ্রেণিচরিত্র। |
| ইফরিত — عفريت | কোরআনে জিনদের একজন শক্তিশালী কর্মীর পরিচয়। পরবর্তী গল্পে অগ্নিময় ডানাওয়ালা, প্রবল ও ধূর্ত সত্তা; মাটির নিচে বা ধ্বংসাবশেষে বাসের কল্পনা আছে। নারী-পুরুষ, রাজা, গোত্র, নিজেদের মধ্যে বিবাহ এবং মানুষের সঙ্গে বিবাহের কাহিনিও এই বিস্তৃত লোকজ রূপের অংশ। গল্পে সাধারণ অস্ত্রের বদলে জাদু দিয়ে হত্যা বা বন্দী করার কথা বলা হয়; ভালো-মন্দ ও বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী চরিত্রও পাওয়া যায়। | কোরআন ২৭:৩৯; অতিরিক্ত অবয়ব ও জাদুতে বন্দিত্ব লোককাহিনির বিস্তার। |
| নাসনাস — نسناس | অর্ধেক মাথা ও দেহ, একটি হাত ও পা নিয়ে চলা প্রাণীর কল্পনা; কখনো শিক নামের সত্তা ও মানুষের বংশধর হিসেবে বর্ণিত। | আরবি বিচিত্র প্রাণীর কাহিনি ও পরবর্তী লোকসাহিত্য। |
| গুল — غول | মরুভূমির পথভ্রষ্টকারী ও রূপবদলকারী দৈত্য। লোককাহিনিতে পশু, বিশেষ করে হায়েনার রূপ ধারণ, অসাবধানী পথিক ও শিশু খাওয়া, কবরস্থানে হানা, রক্তপান এবং মৃতদেহ ভক্ষণের বিবরণ আছে। কখনো যাকে খেয়েছে তার রূপ নেওয়ার কথাও বলা হয়। মৃতভোজী বা নিষ্ঠুর ব্যক্তির জন্য গুলসদৃশ পরিচয় ব্যবহারের পেছনেও এই কল্পচিত্র আছে। | আরবীয় লোককাহিনি; হাদিসে “লা গুল” কথাটিও আছে। |
| বাহামুত — بهموت | পৃথিবী বহনকারী বিশাল মাছের কল্পনা; বিভিন্ন কাহিনি ও চিত্রে অবয়বের পার্থক্য আছে, কখনো হাতি বা জলহস্তিসদৃশ মাথাও আঁকা হয়েছে। | মধ্যযুগীয় মহাজাগতিক বর্ণনা ও লোককাহিনির ধারা। |
হাদিসে জিনের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করতে আগুন এবং ফেরেশতার উৎপত্তিতে আলোর কথা বলা হয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞান অগ্নিশিখাকে দহনে অংশ নেওয়া উত্তপ্ত গ্যাসীয় পদার্থ ও বিকিরণের প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করে। শিখা কোনো স্বতন্ত্র জীবদেহ নির্মাণের মৌলিক উপাদানের নাম নয়। একটি প্রক্রিয়ার দৃশ্যমান আলো ও উত্তাপ থেকে চিন্তাশীল, ভাষাসম্পন্ন এবং বংশবিস্তারকারী প্রাণীর উৎপত্তি দাবি করতে হলে সেই রূপান্তরের যাচাইযোগ্য ব্যাখ্যা প্রয়োজন। হাদিসে তার বদলে সৃষ্টির উপাদানের ধর্মীয় ঘোষণা আছে। এই ঘোষণা জীববিজ্ঞানের জ্ঞান সরবরাহ করে না; আগুন, আলো ও মাটিকে আলাদা প্রাণীজাতির উৎস বানানো প্রাচীন সৃষ্টিকাহিনির কাঠামো প্রকাশ করে। [94]
রিয়াযুস স্বা-লিহীন
অধ্যায়ঃ ১৯/ বিবিধ চিত্তকর্ষী হাদিসসমূহ
পাবলিশারঃ তাওহীদ পাবলিকেশন
পরিচ্ছদঃ ৩৭০ : দাজ্জাল ও কিয়ামতের নিদর্শনাবলী সম্পর্কে
৩৯/১৮৫৫। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘ফিরিশতাদেরকে জ্যোতি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। জিন জাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে অগ্নিশিখা হতে। আর আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে সেই বস্তু থেকে, যা তোমাদেরকে বর্ণনা করা হয়েছে। (অর্থাৎ মাটি থেকে)।’’ (মুসলিম) (1)
(1) মুসলিম ২৯৯৬, আহমাদ ২৪৬৬৮, ২৪৮২৬
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
হাদিসে জিনদের খাদ্য হিসেবে হাড় এবং তাদের পশুর খাদ্য হিসেবে গোবরের বিবরণ আছে। খাবার সংগ্রহ, পশুপালন এবং মানুষের কাছে খাদ্যের ব্যবস্থা চাওয়ার মাধ্যমে অদৃশ্য জাতিটিকে মানুষের পরিচিত জীবনযাত্রার অনুকরণে আঁকা হয়েছে। জিনের শরীরে খাদ্য কীভাবে কাজ করে, কীভাবে শক্তি সরবরাহ করে এবং মানুষের ফেলে দেওয়া হাড় তাদের খাদ্যব্যবস্থায় কীভাবে প্রবেশ করে, তার কোনো পরীক্ষাযোগ্য বিবরণ পাওয়া যায় না। গল্পে এই প্রয়োজনগুলো বাস্তব, কিন্তু বাস্তবে তাদের স্বাধীন অস্তিত্বের সাক্ষ্য নেই। মানুষের উচ্ছিষ্টকে অদৃশ্য প্রাণীর খাদ্য ঘোষণা করে পরে সেই বিশ্বাসের ভিত্তিতে শৌচাচারের বিধি তৈরি করা হয়েছে।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৬৩/ আনসারগণ (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহুম)-এর মর্যাদা
পাবলিশারঃ তাওহীদ পাবলিকেশন
পরিচ্ছদঃ ৬৩/৩২. জ্বিনদের উল্লেখ।
৩৮৬০. আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উযু ও ইস্তিন্জার ব্যবহারের জন্য পানি ভর্তি একটি পাত্র নিয়ে পিছনে পিছনে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ তিনি তাকিয়ে বললেন, কে? আমি বললাম, আমি আবূ হুরাইরাহ। তিনি বললেন, আমাকে কয়েকটি পাথর তালাশ করে দাও। আমি তা দিয়ে ইস্তিন্জা করব। (১) তবে, হাড় এবং গোবর আনবে না। আমি আমার কাপড়ের কিনারায় কয়েকটি পাথর এনে তাঁর কাছে রেখে দিলাম এবং আমি সেখান থেকে কিছুটা দূরে গেলাম। তিনি যখন ইস্তিন্জা হতে বেরোলেন, তখন আমি এগিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, হাড় ও গোবর এর ব্যাপার কী? তিনি বললেন, এগুলো জ্বিনের খাবার। আমার কাছে নাসীবীন (২) নামের জায়গা হতে জ্বিনের একটি প্রতিনিধি দল এসেছিল। তারা ভাল জ্বিন ছিল। তারা আমার কাছে খাদ্যদ্রব্যের আবেদন জানাল। তখন আমি আল্লাহর নিকট দু‘আ করলাম যে, যখন কোন হাড্ডি বা গোবর তারা লাভ করে তখন তারা যেন তাতে খাদ্য পায়। (৩) (১৫৫) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৫৭৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৫৭৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
জিনদের খাদ্যসংক্রান্ত মুসলিমের বর্ণনায় মানুষের খাবারের হাড় মাংসে পূর্ণ হয়ে তাদের হাতে আসার কথা এবং গোবর তাদের বাহনের খাদ্য হওয়ার কথা সরাসরি বলা হয়েছে। এখানে অলৌকিক খাদ্যব্যবস্থার দাবিটি স্পষ্ট। [95]
وَسَأَلُوهُ الزَّادَ فَقَالَ ” لَكُمْ كُلُّ عَظْمٍ ذُكِرَ اسْمُ اللَّهِ عَلَيْهِ يَقَعُ فِي أَيْدِيكُمْ أَوْفَرَ مَا يَكُونُ لَحْمًا وَكُلُّ بَعَرَةٍ عَلَفٌ لِدَوَابِّكُمْ ” . فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” فَلاَ تَسْتَنْجُوا بِهِمَا فَإِنَّهُمَا طَعَامُ إِخْوَانِكُمْ ” .
বাংলা অনুবাদ:
তারা তাঁর কাছে খাদ্যের ব্যবস্থা চাইল। তিনি বললেন: যে হাড়ের ওপর আল্লাহর নাম নেওয়া হয়েছে, তা তোমাদের হাতে এলে প্রচুর মাংসসহ হবে; আর প্রতিটি গোবরের টুকরা তোমাদের পশুদের খাদ্য। রাসুল বললেন: এই দুটি দিয়ে ইস্তিনজা করবে না, কারণ এগুলো তোমাদের ভাইদের খাদ্য।
কোরআনেও আগের মানুষের জিনের আশ্রয় নেওয়ার কথা আছে। মানুষ ও জিনের সম্পর্ককে নতুন ধর্মের ভেতরে ধরে রেখে তার আনুগত্য ও বিপদের ব্যাখ্যা বদলানো হয়েছে। অদৃশ্য সত্তার বাস্তব অস্তিত্বের জন্য বাহ্যিক প্রমাণের জায়গায় ধর্মীয় বর্ণনাই সিদ্ধান্তের ভিত্তি। ফলে একটি লোকবিশ্বাস কেবল গল্প হয়ে থাকে না; ব্যক্তির পরিচ্ছন্নতা, ভয়, প্রার্থনা এবং দৈনন্দিন আচরণে তার বিধান কার্যকর হয়। আধুনিক পাঠকের সামনে প্রশ্নটি তাই কোনো কল্পকাহিনি উপভোগের নয়। যাচাইহীন অতিপ্রাকৃত প্রাণীর নামে মানুষের বাস্তব জীবন নিয়ন্ত্রণ করার যৌক্তিকতা এখানে প্রশ্নবিদ্ধ। [96]
পরবর্তীতে ইসলামে অন্তর্ভুক্ত ফেরেশতাগণ
ইসলামে সর্বশক্তিমান আল্লাহর অধীনে বার্তাবাহক, মৃত্যুদূত, কাজ লিপিবদ্ধকারী, প্রহরী, শাস্তিদাতা এবং আরশবহনকারী ফেরেশতার বিবরণ আছে। ইচ্ছামাত্র সব করতে সক্ষম এক সত্তার শাসনব্যবস্থাকে এখানে দায়িত্ববণ্টিত দরবারের মতো সাজানো হয়েছে। রাজা যেমন দূত পাঠান, হিসাবরক্ষক রাখেন, কারাগারের প্রহরী নিয়োগ করেন এবং আদেশ কার্যকর করার কর্মী রাখেন, দেবশাসনেও তেমন পরিচিত সামাজিক ভূমিকা বসেছে। এই কল্পনার ভাষা মানুষের রাজনীতি ও প্রশাসনের ভাষা। সর্বশক্তিমানত্বের দাবি নিজে এমন বাহিনীর প্রয়োজন ব্যাখ্যা করে না; বরং মানুষের পরিচিত ক্ষমতার কাঠামো মহাজগতে বিস্তৃত হয়েছে।
| নাম বা শ্রেণি | দায়িত্ব ও পরিচয় | পাঠগত অবস্থান |
|---|---|---|
| হামালাতুল আরশ | আল্লাহর আরশ বহনকারী। | কোরআন ৬৯:১৭; শেষবিচারের দিনে আটজন বহনকারীর উল্লেখ। |
| জিব্রাইল | বার্তা পৌঁছানো এবং ওহির সঙ্গে যুক্ত ফেরেশতা। | কোরআন ২:৯৭; হাদিসে ছয়শ ডানা। |
| মিকাইল | ফেরেশতার নাম; বৃষ্টি ও জীবিকার সঙ্গে যুক্ত দায়িত্বের বিবরণ ধর্মীয় সাহিত্যে প্রচলিত। | কোরআন ২:৯৮-এ নাম আছে। |
| ইসরাফিল | শেষবিচারের শিঙা ফোঁকার দায়িত্বের সঙ্গে পরিচিত। | মুসলিম ৭৭০-এ নাম; কোরআনে শিঙার উল্লেখে ফুঁকার ব্যক্তির নাম নেই। |
| মালাকুল মউত; প্রচলিত নাম আজরাইল | মৃত্যুর দায়িত্বপ্রাপ্ত। | কোরআন ৩২:১১-এ মৃত্যুদূত; আজরাইল নাম কোরআন বা প্রামাণ্য হাদিসে নেই। |
| আসমান ও জান্নাতের ফেরেশতারা | আসমানের দায়িত্ব ও জান্নাতের দ্বারের প্রহরী। | সাত আসমান এবং জান্নাতের দ্বাররক্ষক পৃথক বর্ণনার বিষয়। |
| হাফাজা | তত্ত্বাবধায়ক ও কাজ লিপিবদ্ধকারী ফেরেশতাদের পরিচয়। | কোরআন ১৩:১১; ৮২:১০–১২। |
| মুনকার ও নাকির | কবরে প্রশ্নকারী দুই ফেরেশতা। | তিরমিজি ১০৭১-এ নাম। |
| দারদাইল | পরবর্তী ধর্মীয় কাহিনি ও ফেরেশতার নামের তালিকায় ব্যবহৃত নাম। | কোরআনের নামের তালিকার অংশ নয়; পরবর্তী বর্ণনাসাহিত্যের পরিচয়। |
| মালিক | জাহান্নামের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা। | কোরআন ৪৩:৭৭-এ নাম। |
| রিদওয়ান | জান্নাতের রক্ষক হিসেবে প্রচলিত নাম। | ইসলাম প্রশ্নোত্তর ২৫৯৫৮৬ অনুসারে প্রামাণ্য হাদিসে নাম প্রতিষ্ঠিত নয়। |
| জাবানিয়া | শাস্তিদানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতাদের পরিচয়। | কোরআন ৯৬:১৮; জাহান্নামের প্রহরী বিষয়ে ৭৪:৩০–৩১। |
| সারিবদ্ধ ও আদেশপালনকারী ফেরেশতা | নির্দিষ্ট অবস্থান, শৃঙ্খলা ও আদেশ পালন। | কোরআন ৩৭:১–৩-এর প্রচলিত তাফসিরি ব্যাখ্যা। |
বহু হাত, মাথা বা ডানা দিয়ে অলৌকিক শক্তি বোঝানোর চিত্র নানা ধর্মে আছে। দুর্গার বহু হাত, ব্রহ্মার চার মাথা এবং জিব্রাইলের ছয়শ ডানার বর্ণনা মানুষের পরিচিত শরীরকে বহুগুণিত করে অতিমানবীয় ক্ষমতার ছবি তৈরি করে। হাদিসে জিব্রাইলের ছয়শ ডানা একটি নির্দিষ্ট সংখ্যাগত দাবি। এত ডানা কীভাবে বসে, কীভাবে ব্যবহৃত হয় এবং বার্তা পৌঁছানোর সঙ্গে তার কার্যকর সম্পর্ক কী, তার ব্যাখ্যা নেই। পাখির অঙ্গকে আকাশযাত্রার চিহ্ন করে অলৌকিক সত্তার শরীরে বসানোর কল্পনাই দৃশ্যমান। সংখ্যার বিশালতা বিস্ময় তৈরি করে; সেই বিস্ময় প্রাণীটির অস্তিত্ব বা বর্ণনার সত্যতার প্রমাণ দেয় না।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৫৯/ সৃষ্টির সূচনা
পরিচ্ছদঃ ৫৯/৭. তোমাদের কেউ যখন আমীন বলে আর আকাশের ফেরেশতাগণও আমীন বলে। অতঃপর একের আমীন অন্যের আমীনের সঙ্গে মিলিতভাবে উচ্চারিত হয় তখন পূর্বের পাপরাশি মুছে দেয়া হয়।
৩২৩২. আবূ ইসহাক শায়বানী (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি যির ইবনু হুবাইশ (রাঃ)-কে মহান আল্লাহর এ বাণীঃ ‘‘অবশেষে তাদের মধ্যে দুই ধনুকের দূরত্ব রইল অথবা আরও কম। তখন আল্লাহ স্বীয় বান্দার প্রতি যা ওয়াহী করার ছিল, তা ওয়াহী করলেন’’- (আন্-নাজম ৯-১০)। এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ) আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিব্রাঈল (আঃ)-কে দেখেছেন। তাঁর ছয়শ’টি ডানা ছিল। (৪৮৫৬, ৪৮৫৭) (মুসলিম ১/৭৬ হাঃ ১৭৪) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৯৯২, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩০০২)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

জিব্রাইল ও মিকাইল নামের ইসলামপূর্ব উপস্থিতি প্রমাণ করতে দূরবর্তী সভ্যতার অস্পষ্ট সাদৃশ্যের ওপর দাঁড়াতে হয় না। বাইবেলের দানিয়েল গ্রন্থেই গ্যাব্রিয়েল ও মাইকেলের উল্লেখ আছে। একই নামের বার্তাবাহক ও ঊর্ধ্বতন স্বর্গীয় সত্তা ইহুদি-খ্রিস্টীয় সাহিত্যে আগে থেকে উপস্থিত ছিলেন। ইসলামে তাঁদের আরবি নাম ও নিজস্ব দায়িত্ববিন্যাস প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে ফেরেশতার জগৎকে পূর্ববর্তী ধর্মীয় ইতিহাস থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এক নতুন আবিষ্কার হিসেবে দেখানো ভুল। পরিচিত চরিত্র নতুন ধর্মীয় কর্তৃত্বের মধ্যে প্রবেশ করে এবং নতুন ওহির বাহক হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পায়।
দানিয়েলের দর্শন ব্যাখ্যা করার নির্দেশে গ্যাব্রিয়েলের নাম এসেছে। পুরোনো কিং জেমস অনুবাদে সম্পূর্ণ পদটি হলো: [97]
And I heard a man’s voice between the banks of Ulai, which called, and said, Gabriel, make this man to understand the vision.
বাংলা অনুবাদ:
আমি উলাইয়ের দুই তীরের মধ্য থেকে একজন মানুষের কণ্ঠস্বর শুনলাম। সে ডেকে বলল: গ্যাব্রিয়েল, এই মানুষকে দর্শনটি বুঝিয়ে দাও।
একই গ্রন্থে মাইকেলকে প্রধান নেতাদের একজন হিসেবে দেখানো হয়েছে। [98]
But the prince of the kingdom of Persia withstood me one and twenty days: but, lo, Michael, one of the chief princes, came to help me; and I remained there with the kings of Persia.
বাংলা অনুবাদ:
পারস্যরাজ্যের নেতা একুশ দিন আমার বিরোধিতা করল। তখন দেখো, প্রধান নেতাদের একজন মাইকেল আমাকে সাহায্য করতে এলেন; আমি সেখানে পারস্যের রাজাদের সঙ্গে রইলাম।
দর্শন ব্যাখ্যা করা দূত, ঊর্ধ্বতন স্বর্গীয় নেতা এবং পার্থিব রাজ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত অদৃশ্য দ্বন্দ্ব—এসব কল্পনা ইসলামের আগেই ধর্মীয় সাহিত্যে ছিল। ইসলামি ফেরেশতাতত্ত্বে তার সঙ্গে ওহি বহন, বিশ্বপ্রলয়, কবরের প্রশ্ন এবং হিসাব লিপিবদ্ধ করার নতুন বিন্যাস যুক্ত হয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় মানুষের প্রশাসনিক জগত ও অতিপ্রাকৃত জগত পরস্পরকে অনুকরণ করে। ধর্মীয় চরিত্রের নাম ও কাজের ইতিহাস অনুসরণ করা যায়; স্বাধীনভাবে তাদের অস্তিত্ব যাচাইয়ের জায়গাটি ধর্মীয় দাবির স্তরেই থেকে যায়।
ফেরেশতার জনপ্রিয় নামও একইভাবে সময়ের সঙ্গে বাড়ে। ইসলামওয়েব আজরাইল নামকে কোরআন ও প্রামাণ্য হাদিসে অনুপস্থিত বলেছে; ইসলাম প্রশ্নোত্তর রিদওয়ান নামের প্রচলন এবং তার পক্ষে প্রামাণ্য হাদিস না থাকার কথা জানিয়েছে। সাধারণ প্রচারে এসব নাম প্রায়ই একই নিশ্চয়তায় বলা হয়। ধর্মীয় কাহিনি বহুল প্রচলিত হলে তার উৎসগত পার্থক্য চাপা পড়ার এটি একটি স্পষ্ট উদাহরণ। [99] [100]
কোরআনে শয়তানের আয়াত
লাত, উজ্জা ও মানাতকে প্রশংসা করে পাঠ উচ্চারণ এবং পরে তা প্রত্যাহারের কাহিনি তাবারির তাফসিরসহ প্রাচীন ইসলামি সাহিত্যে সংরক্ষিত। এসব বর্ণনায় মুহাম্মদ সূরা নাজম পড়ার সময়ে দেবীদের উচ্চ মর্যাদা ও সুপারিশের কথা বলেন; পরে সেই বাক্যগুলোকে শয়তানের প্রক্ষেপণ বলে চিহ্নিত করা হয়। কাহিনিটির কেন্দ্রে আছে বিরোধী কুরাইশদের সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা, তাদের দেবীদের স্বীকৃতি এবং পরে সেই স্বীকৃতি বাতিল করা। নিচের প্রথম বাংলা রূপটি ওই প্রচলিত কাহিনির ভাবানুবাদ; পরেরটিতে “গারানিক” শব্দকে সারস হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। [101]
তোমরা কী ভেবে দেখেছো লাত ও উযযা সম্পর্কে?
এবং আরেক (দেবী) মানাত সম্পর্কে?
তাঁরা হলেন খুব-ই উঁচু পর্যায়ের (ক্ষমতাবান) দেবী
তাদের কাছে সাহায্যও চাওয়া যায় ( শয়তানের দ্বারা প্রভাবিত আয়াত )
একই কাহিনির আরেকটি বাংলা রূপে দেবীদের জন্য সারসের চিত্র এবং সুপারিশের আশা এসেছে। “গারানিক” শব্দের অনুবাদে উচ্চমর্যাদার সত্তা ও দীর্ঘগ্রীব পাখির চিত্রের ব্যবহার পাওয়া যায়; মূল বাক্যে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় দাবি হলো তাঁদের সুপারিশ প্রত্যাশা করা।
তোমরা কী ভেবে দেখেছো লাত ও উযযা সম্পর্কে?
এবং আরেক (দেবী) মানাত সম্পর্কে?
এঁঁরা হচ্ছে সেই উড়ন্ত সারস।
তাই এদের মধ্যস্ততা আশা করা যেতে পারে।
কাহিনির পরবর্তী পর্যায়ে দেবীদের সুপারিশের প্রশংসাসূচক বাক্য প্রত্যাহার করা হয়। বর্তমান সূরা নাজমের ১৯–২৩ আয়াতে তিন দেবীর নামের পরেই কন্যাসন্তানের আরোপ এবং উপাস্যনামের ভিত্তি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। পূর্ববর্তী প্রশংসা ও বর্তমান প্রত্যাখ্যানের এই বিপরীত সম্পর্কই গারানিক কাহিনির সংঘাত। বর্ণনায় যে মানুষ আগে একটি পাঠকে নবীর ঘোষণা হিসেবে মেনে নিয়েছিল, তাকেই পরে শুনতে হয়েছে, সেই উচ্চারণের কিছু অংশের উৎস ছিল শয়তান।
তোমরা কি ভেবে দেখেছ লাত ও ওযযা সম্পর্কে।
এবং তৃতীয় আরেকটি মানাত সম্পর্কে?
পুত্র-সন্তান কি তোমাদের জন্যে এবং কন্যা-সন্তান আল্লাহর জন্য?
এমতাবস্থায় এটা তো হবে খুবই অসংগত বন্টন।
এগুলো কতগুলো নাম বৈ নয়, যা তোমরা এবং তোমাদের পূর্ব-পুরুষদের রেখেছ। এর সমর্থনে আল্লাহ কোন দলীল নাযিল করেননি। তারা অনুমান এবং প্রবৃত্তিরই অনুসরণ করে। অথচ তাদের কাছে তাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে পথ নির্দেশ এসেছে। ( সংশোধিত আয়াত )
এই বিষয়ে বিস্তারিত প্রমাণাদি দেয়া হয়েছে এই লেখাটিতে [102]।
তাবারিতে সংরক্ষিত একটি বর্ণনার প্রথম পূর্ণ অনুচ্ছেদে পাঠ উচ্চারণের ঘটনাটি এইভাবে এসেছে। [103]
حدثنا القاسم, قال: ثنا الحسين, قال: ثنا حجاج, عن أبي معشر, عن محمد بن كعب القرظي ومحمد بن قيس قالا جلس رسول الله صلى الله عليه وسلم في ناد من أندية قريش كثير أهله, فتمنى يومئذ أن لا يأتيه من الله شيء فينفروا عنه, فأنزل الله عليه: وَالنَّجْمِ إِذَا هَوَى * مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوَى فقرأها رسول الله صلى الله عليه وسلم, حتى إذا بلغ: أَفَرَأَيْتُمُ اللاتَ وَالْعُزَّى * وَمَنَاةَ الثَّالِثَةَ الأُخْرَى ألقى عليه الشيطان كلمتين: تلك الغرانقة العلى, وإن شفاعتهنّ لترجى, فتكلم بها.
বাংলা অনুবাদ:
কাসিম আমাদের বলেছেন, হুসাইন বলেছেন, হাজ্জাজ আবু মাশারের মাধ্যমে মুহাম্মদ ইবনে কাব আল-কুরাজি ও মুহাম্মদ ইবনে কাইস থেকে বর্ণনা করেছেন: রাসুল কুরাইশের একটি জনবহুল সভায় বসেছিলেন। সেদিন তিনি কামনা করলেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন কিছু না আসুক, যাতে তারা তাঁর কাছ থেকে বিমুখ হয়। তখন তাঁর ওপর “শপথ নক্ষত্রের, যখন তা অস্ত যায়; তোমাদের সঙ্গী পথভ্রষ্ট হয়নি, বিপথেও যায়নি” অবতীর্ণ হয়। তিনি তা পড়তে পড়তে “তোমরা লাত ও উজ্জা এবং তৃতীয় আরেকটি মানাত সম্পর্কে ভেবে দেখেছ কি” পর্যন্ত পৌঁছালে শয়তান তাঁর ওপর দুটি বাক্য প্রক্ষেপণ করে: “এরা উচ্চমর্যাদার গারানিক; নিশ্চয় তাদের সুপারিশ প্রত্যাশিত।” তিনি তা উচ্চারণ করেন।
এই বর্ণনায় শ্রোতারা কোনো অচেনা বক্তার কথা শোনেনি; তারা মুহাম্মদের নিজের মুখে পাঠ শুনেছে। অথচ পরে ওই উচ্চারণের অংশকে অগ্রহণযোগ্য উৎসের বলে ঘোষণা করা হচ্ছে। ফলে শ্রোতার কাছে প্রথম উচ্চারণ গ্রহণের মাপকাঠি এবং পরে প্রত্যাহার মেনে নেওয়ার মাপকাঠি একই ব্যক্তির কর্তৃত্বের মধ্যে আটকে যায়। ঘোষণাকারীর মুখ থেকে বেরোনো কথাই যদি প্রথমে ওহি গ্রহণের ভিত্তি হয়, সেই একই মাধ্যম দিয়ে ভুল পাঠও আসার কাহিনি মাধ্যমটির নির্ভুলতার দাবিকে আঘাত করে। “শয়তান বলিয়েছে” ব্যাখ্যাটি ভুল উচ্চারণের দায়কে অতিপ্রাকৃত প্রতিপক্ষের ওপর সরায়; শ্রোতার জন্য স্বাধীন যাচাইয়ের কোনো নতুন পদ্ধতি সরবরাহ করে না।
দেবীদের প্রশংসা গ্রহণ করলে কুরাইশের সন্তুষ্টি এবং তা প্রত্যাহার করলে বিরোধ ফিরে আসার যে সামাজিক বিন্যাস কাহিনিতে আছে, সেটিও তাৎপর্যপূর্ণ। ধর্মীয় শব্দের সামান্য পরিবর্তন বড় রাজনৈতিক সম্পর্ক তৈরি বা ভাঙতে পারে। এখানে দেবীদের মর্যাদা স্বীকারের সঙ্গে মুহাম্মদের গ্রহণযোগ্যতার সম্পর্ক সরাসরি বর্ণিত হয়েছে। পরে একচ্ছত্র উপাসনার সীমানা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। পুরোনো দেবতাদের সঙ্গে নতুন দাবির সংঘাত তাই কেবল বিমূর্ত বিশ্বাসের ইতিহাস নয়; মানুষের সমর্থন, সম্মিলিত আচার এবং নেতৃত্ব মেনে নেওয়ার বাস্তব প্রশ্নও ছিল।
প্রমিথিউস, লোকি এবং শয়তান
গ্রিক পুরাণে প্রমিথিউস মানুষের জন্য আগুন সংগ্রহ করে দেবশাসনের বিরোধিতার মুখে পড়েন। হেসিয়ডের বর্ণনায় জিউস তাঁকে শৃঙ্খলিত করেন এবং ঈগল তাঁর যকৃৎ খায়; রাতে তা আবার বৃদ্ধি পায়। নর্স পুরাণে লোকি ছলনা, দেবতাদের সঙ্গে সংঘাত এবং বালদারের মৃত্যুর কাহিনির সঙ্গে যুক্ত। পরে তাঁকে বেঁধে রাখা এবং মুখে সাপের বিষ পড়ার যন্ত্রণার বর্ণনা আসে। দেবশাসন, বিদ্রোহ, অপরাধ ও অতিপ্রাকৃত শাস্তির এই নাটকীয় বিন্যাস বহু পুরাণে পাওয়া যায়। আব্রাহামিক ধর্মে শয়তানও আনুগত্যের বিরোধী, প্রলুব্ধকারী এবং অশুভ কাজের ব্যাখ্যাকারী চরিত্র। আধুনিক গল্পে নায়ক-প্রতিপক্ষের সংঘাত যেমন কাহিনি এগিয়ে নেয়, ধর্মীয় কাহিনিতেও এমন চরিত্র নৈতিক দ্বন্দ্বকে দৃশ্যমান করে। [104] [105]
প্রাকৃতিক ঘটনা এবং মানুষের আবেগকে ব্যক্তিসত্তার কাজ হিসেবে কল্পনা করলে গল্পের মাধ্যমে তার সহজ কারণ তৈরি করা যায়। বজ্রপাত তখন দেবতার অস্ত্র, ঝড় তাঁর ক্রোধ এবং বিপদ কোনো অদৃশ্য প্রতিপক্ষের আক্রমণ হয়। শয়তানের ক্ষেত্রে লোভ, রাগ, প্রলোভন বা মানুষের ভুল আচরণকে একটি সত্তার সক্রিয় কাজের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। প্রাচীন মানুষের বিমূর্ত চিন্তার সামর্থ্য ছিল না—এমন দাবি এর ব্যাখ্যা নয়; বরং বিমূর্ত অভিজ্ঞতাকে চরিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপনের পরিচিত কাহিনিরীতি এখানে কাজ করছে। সমস্যা তৈরি হয় যখন এই চরিত্রকে পরীক্ষাযোগ্য বাস্তব কারণের জায়গায় বসানো হয় এবং তার নামে মানুষের দৈনন্দিন কাজের বিধি নির্ধারণ করা হয়।
রিয়াজুস সালিহিনে বাজারকে শয়তানের আড্ডা এবং বারকানির সূত্রে শয়তানের ডিম পাড়া ও বাচ্চা ফোটানোর স্থান বলা হয়েছে। প্রথম বক্তব্যটি সালমানের উক্তি, আর দ্বিতীয়টি রাসুলের নামে উদ্ধৃত অতিরিক্ত বর্ণনা হিসেবে এসেছে। বাজারের লোভ ও প্রতারণাকে বোঝাতে অদৃশ্য শত্রুর ঘাঁটির চিত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। সেই চিত্রে পতাকা, প্রজনন এবং নির্দিষ্ট স্থান দখলের মতো মানুষের ও প্রাণীর পরিচিত আচরণ একত্র হয়েছে।
রিয়াযুস স্বা-লিহীন
১৯/ বিবিধ চিত্তকর্ষী হাদিসসমূহ
পরিচ্ছেদঃ ৩৭০ : দাজ্জাল ও কিয়ামতের নিদর্শনাবলী সম্পর্কে
৩৫/১৮৫১। সালমান ফারেসী রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর উক্তি (মওকূফ সূত্রে) বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘তুমি যদি পার, তাহলে সর্বপ্রথম বাজারে প্রবেশকারী হবে না এবং সেখান থেকে সর্বশেষ প্রস্থান-কারী হবে না। কারণ, বাজার শয়তানের আড্ডা স্থল; সেখানে সে আপন ঝাণ্ডা গাড়ে।’ (মুসলিম)(1)
বারক্বানী তাঁর ‘সহীহ’ গ্রন্থে সালমান রাদিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘সর্বপ্রথম বাজারে প্রবেশকারী হয়ো না এবং সেখান থেকে সর্বশেষ প্রস্থান-কারী হয়ো না। কারণ, সেখানে শয়তান ডিম পাড়ে এবং ছানা জন্ম দেয়।’’
(1) সহীহুল বুখারী ৩৬৩৪, মুসলিম ২৪৫১
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
হাই তোলার সময়ে মুখে শয়তানের প্রবেশের বর্ণনায় একটি স্বাভাবিক দৈহিক ক্রিয়ার সঙ্গে অতিপ্রাকৃত বিপদ যুক্ত হয়েছে। মুখ বন্ধ রাখার আচারকে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে অদৃশ্য সত্তার প্রবেশের ভয় দিয়ে। হাই তোলার দৃশ্যমান ঘটনা আছে; তার মধ্যে শয়তান ঢোকার ঘটনাটির জন্য আলাদা সাক্ষ্য নেই। অদৃশ্য বিপদটি বিশ্বাস করলেই শারীরিক আচারের ওপর ধর্মীয় নির্দেশের কর্তৃত্ব তৈরি হয়। [106]
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
অধ্যায়ঃ পর্ব-৪ঃ সলাত
পাবলিশারঃ হাদিস একাডেমি
পরিচ্ছদঃ ১৯. প্রথম অনুচ্ছেদ – সলাতের মাঝে যে সব কাজ করা নাজায়িয ও যে সব কাজ করা জায়িয
৯৮৫-(৮) আবূ সা‘ঈদ আল্ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সলাতে তোমাদের কারো ‘হাই’ আসলে যথাসাধ্য তা আটকে রাখবে। কারণ (‘হাই’ দেয়ার সময়) শায়ত্বন (শয়তান) (মুখে) ঢুকে যায়। (মুসলিম)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সালাতের জন্য না ওঠা ব্যক্তির কানে শয়তানের প্রস্রাব করার বর্ণনাও আছে। ঘুম ও ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের ব্যর্থতার ব্যাখ্যায় মানুষের মূত্রত্যাগের কাজ একটি অদৃশ্য সত্তার ওপর বসানো হয়েছে। ঘুমের দৈহিক কারণ পরীক্ষা করার বদলে এই ব্যাখ্যা ব্যক্তিকে অদৃশ্য অপমানের শিকার হিসেবে চিহ্নিত করে। ঘুম থেকে না ওঠার জন্য মানুষকে এভাবে শয়তানের অপমানের শিকার ঘোষণা করা হয়। ধর্মীয় সময়সূচি মেনে চলার চাপের সঙ্গে অদৃশ্য আক্রমণের ভয় যুক্ত হয়ে যায়। [107]
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ১৯/ তাহাজ্জুদ
পরিচ্ছদঃ ১৯/১৩. সলাত আদায় না করে ঘুমিয়ে পড়লে তার কানে শয়তান পেশাব করে দেয়।
১১৪৪. ‘আবদুল্লাহ্ ইব্নু মাস‘ঊদ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে এক ব্যক্তির ব্যাপারে আলোচনা করা হল- সকাল বেলা পর্যন- সে ঘুমিয়েই কাটিয়েছে, সালাতের জন্য জাগ্রত হয়নি, তখন তিনি (নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ) ইরশাদ করলেনঃ শয়তান তার কানে পেশাব করে দিয়েছে। (৩২৭০; মুসলিম ৬/২৮, হাঃ ৭৭৪) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১০৭৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১০৭৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
অধ্যায়ঃ পর্ব-৪ঃ সলাত
পাবলিশারঃ হাদিস একাডেমি
পরিচ্ছদঃ ৩৩. প্রথম অনুচ্ছেদ – ক্বিয়ামুল লায়ল-এর প্রতি উৎসাহ দান
১২২১-(৩) ‘আবদুল্লাহ ইবনু মাস্‘ঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মুখে এক লোক সম্পর্কে আলোচনা করা হলো। তাঁকে বলা হলো, লোকটি সকাল পর্যন্ত একটানা ঘুমিয়ে থাকে, সলাতের জন্যে উঠে না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন, এ লোকের কানে অথবা তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, তার দু’কানে শায়ত্বন (শয়তান) পেশাব করে দিয়েছে। (বুখারী, মুসলিম)
সহীহ : বুখারী ৩২৭০, মুসলিম ৭৭৪।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বাম হাতে খাওয়াকে শয়তানের আচরণের সঙ্গে মিলিয়ে নিষিদ্ধ করার বর্ণনায় ধর্মীয় চরিত্রটি সামাজিক শৃঙ্খলার হাতিয়ার হয়েছে। কোন হাত দিয়ে খাবার ধরতে হবে, তার সিদ্ধান্তে খাবারের নিরাপত্তা বা ব্যক্তির শারীরিক সামর্থ্যের বদলে অদৃশ্য প্রতিপক্ষের অনুকরণের অভিযোগ আনা হচ্ছে। শয়তান এখানে খায়, পান করে এবং নির্দিষ্ট হাত ব্যবহার করে। মানুষের পরিচিত অঙ্গ ও অভ্যাস অলৌকিক চরিত্রে বসিয়ে পরে সেই চরিত্রকে মানুষের অভ্যাস নিয়ন্ত্রণের কারণ করা হয়েছে। [108]
সূনান আবু দাউদ (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ২১/ খাদ্যদ্রব্য
পরিচ্ছদঃ ৪৭১. ডান হাতে খাওয়া সম্পর্কে।
৩৭৩৪. আহমদ ইবন হাম্বল (রহঃ) ………… ইবন উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন তোমাদের কেউ খাবার খায়, তখন সে যেন তার ডান হাত দিয়ে খায় এবং যখন পানি পান করে, তখন যেন ডান হাতে পান করে। কেননা, শয়তান বাম হাতে খায় এবং পানি পান করে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এই বর্ণনাগুলোর সামাজিক ফল এক জায়গায় এসে মেলে: বাজারে প্রবেশের সময়, হাই তোলা, ঘুম থেকে ওঠা এবং খাওয়ার হাত—প্রতিটি সাধারণ কাজে অদৃশ্য সত্তার উপস্থিতি বসানো হয়। ফলে স্বাভাবিক মানবজীবন অতিপ্রাকৃত নজরদারির পরিসরে ঢুকে পড়ে। কোনো ব্যক্তি নির্দেশ মানতে ব্যর্থ হলে শুধু একটি কাজ ভুল করেন না; তিনি শয়তানের সঙ্গে সাদৃশ্য, অনুপ্রবেশ বা অপমানের সম্পর্কেও জড়িয়ে যান। ধর্মীয় আনুগত্য তৈরি করার জন্য এই ভয় কার্যকর হতে পারে, কিন্তু ভয় থেকে বর্ণনার সত্যতা অনুসরণ করে না। শয়তানের নামে ঘোষিত কারণগুলোর বদলে দৃশ্যমান জগতে মানুষের আচরণ ও তার ফল পরীক্ষা করাই বাস্তব জ্ঞান সরবরাহ করে।
কাবার নির্মাণ সম্পর্কিত সমস্যাবলি
কাবা প্রথম কে নির্মাণ করেছিলেন, সে বিষয়ে ইসলামি বর্ণনায় আদম, ইব্রাহিম এবং আরও প্রাচীন স্থাপনার ধারণা পাওয়া যায়। কোরআন কাবাকে প্রথম উপাসনাগৃহ বলেছে, ইব্রাহিম ও ইসমাইলকে তার সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং মাকামে ইব্রাহিমে সালাতের নির্দেশ দিয়েছে। এই বক্তব্যগুলো একটি পবিত্র বংশপরম্পরা প্রতিষ্ঠা করে। কাবা যে পৃথিবীর সব উপাসনাস্থলের আগে নির্মিত হয়েছিল, সেই অগ্রাধিকারের স্বাধীন ঐতিহাসিক প্রমাণ এই ধর্মীয় ঘোষণার মধ্যে নেই। স্থাপনার নাম, ইব্রাহিমের স্মৃতি এবং তীর্থের বিধান একত্র করে বর্তমান উপাসনাকেন্দ্রকে মানবজাতির আদি ধর্মের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। [109] [110]
এবং স্মরণ কর যখন আমি কা‘বাগৃহকে মানুষের জন্য মিলনকেন্দ্র এবং নিরাপদস্থল করলাম এবং বললাম, ‘মাকামে ইবরাহীমকে সলাতের স্থান হিসেবে গ্রহণ কর’ এবং ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে বলেছিলাম, ‘আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, ই‘তিকাফকারী এবং রুকূ ও সাজদাহকারীদের জন্য পবিত্র রাখবে’।
— Taisirul Quran
এবং যখন আমি কা‘বা গৃহকে মানব জাতির জন্য সুরক্ষিত স্থান ও পুণ্যধাম করেছিলাম, এবং মাকামে ইবরাহীমকে সালাতের জায়গা নির্ধারণ করেছিলাম; এবং আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলের নিকট অঙ্গীকার নিয়েছিলাম যে, তোমরা আমার গৃহকে তাওয়াফকারী ও ই’তিকাফকারী এবং রুকু ও সাজদাহকারীদের জন্য পবিত্র রেখ।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর স্মরণ কর, যখন আমি কাবাকে মানুষের জন্য মিলনকেন্দ্র ও নিরাপদ স্থান বানালাম এবং (আদেশ দিলাম যে,) ‘তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে সালাতের স্থানরূপে গ্রহণ কর’। আর আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম যে, ‘তোমরা আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, ‘ইতিকাফকারী ও রুকূকারী-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র কর’।
— Rawai Al-bayan
আর স্মরণ করুন, যখন আমরা কা’বা ঘরকে মানবজাতির মিলনকেন্দ্র ও নিরাপত্তাস্থল করেছিলাম এবং বলেছিলাম, তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে সালাতের স্থান রূপে গ্রহণ করো। আর ইবরাহীম ও ইসমা’ঈলকে আদেশ দিয়েছিলাম তাওয়াফকারী, ই’তিকাফকারী, রুকূ’ ও সিজদাকারীদের জন্য আমার ঘরকে পবিত্র রাখতে।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
কা’বা ঘর নির্মাণের ইতিহাস
সর্বপ্রথম কা’বা শরীফ নির্মাণ সম্বন্ধে বিভিন্নরূপ উপাখ্যান বর্ণিত হইয়াছে। কথিত আছে, পৃথিবীতে হযরত আদম (আ)-এর আগমনের পূর্বে ফেরেশতাগণ কা’বা শরীফ নির্মাণ করেন। আবূ জা’ফর বাকের মুহাম্মদ ইব্ন আলী ইব্ন হুসাইন হইতে উপরোক্ত রিওয়ায়েত বর্ণিত হইয়াছে। ইমাম কুরতুবীও হাদীসটি উল্লেখ করিয়াছেন। অবশ্য উক্ত রিওয়ায়েতটি অন্য কোন হাদীস দ্বারা সমর্থিত হয় নাই। ইহাও কথিত হইয়াছে যে, ‘হযরত আদম (আ) সর্বপ্রথম কা’বা শরীফ নির্মাণ করেন।’ আতা, সাঈদ ইব্ন মুসাইয়্যেব প্রমুখ ব্যক্তি হইতে ধারাবাহিকভাবে ইন্ন জুরায়জ ও আব্দুর রায্যাক বর্ণনা করিয়াছেন:
‘হযরত আদম (আ) পাঁচটি পর্বত হইতে পাথর আনিয়া কা’বা নির্মাণ করিয়াছিলেন। উক্ত পাঁচটি পর্বত হইতেছে-হেরা, সিনাই, যায়তা )زینا(, লেবানন এবং জুদী। অবশ্য উক্ত রিওয়ায়েতও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত’ নহে। হযরত ইবন আব্বাস (রা), কা’ব আহবার, কাতাদাহ এবং ওয়াহাব ইব্ন মুনাব্বিহ হইতে বর্ণিত হইয়াছে: সর্বপ্রথম কা’বা শরীফ নির্মাণ করেন হযরত শীছ (আ)।’
উপরোক্ত রিওয়ায়েতসমূহ সম্ভবত ইয়াহুদী-খ্রিস্টানদের পুস্তক হইতে গৃহীত হইয়াছে। উল্লেখ্য, যতক্ষণ না কোন বিষয় সহীহ হাদীস দ্বারা সমর্থিত হয়, ততক্ষণ এইরূপ রিওয়ায়েতকে সত্য বা মিথ্যা কোনটিই বলা যায় না। অবশ্য এইরূপ রিওয়ায়েতের সমর্থনে কোন সহীহ হাদীস পাওয়া গেলে উহা অবশ্যই গ্রহণ করিতে হইবে।’
আল্লাহ্ তা’আলার কালাম:
وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِمْ رَبِّ اجْعَلْ هَذَا بَلَدًا آمِنًا وَارْزُقْ أَهْلَهُ مِنَ الثَّمَرَتِ مَنْ أَمَنْ مِنْهُمْ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ .
অর্থাৎ সেই সময়টি স্মরণযোগ্য, যখন ইবরাহীম বলিয়াছিল, ‘প্রভু হে! তুমি ইহাকে নিরাপদ জনপদ বানাইও আর উহার অধিবাসীদিগের মধ্য হইতে যাহারা আল্লাহর প্রতি ও আখিরাতের প্রতি ঈমান আনিবে, তাহাদিগকে ফলসমূহ হইতে রিযিক দিও।’
এই প্রসঙ্গে হযরত জাবির ইব্ন আব্দুল্লাহ হইতে ধারাবাহিকভাবে আবু যুবায়র, সুফিয়ান, আব্দুর রহমান ইব্ন মাহদী ইব্ন বিশার ও ইমাম আবূ জা’ফর ইবন জারীর বর্ণনা করিয়াছেন: নবী করীম (সা) বলিয়াছেন: ‘হযরত ইবরাহীম (আ) আল্লাহর ঘর (কা’বা)-কে সম্মানিত ও নিরাপদ ঘোষণা করিয়াছিলেন আর আমি মদীনা শহর অর্থাৎ উহার প্রস্তরময় দুই প্রান্ডের মধ্যবর্তী স্থানকে সম্মানিত ঘোষণা করিতেছি। উহাতে শিকার করা এবং উহার কাঁটা-বৃক্ষ কাটা যাইবে না।’

আবার, কোরআনের সূরা ইমরানে আবার বলা হয়েছে, [111] [112]
নিঃসন্দেহে প্রথম ঘর যা মানুষের জন্য স্থাপন করা হয়েছিল, তাতো মক্কা্য়, যা বরকতমন্ডিত এবং সারা জাহানের জন্য পথপ্রদর্শক।
— Taisirul Quran
নিশ্চয়ই সর্ব প্রথম গৃহ, যা মানবমন্ডলীর জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে তা ঐ ঘর যা বাক্কায় (মাক্কায়) অবিস্থত; ওটি সৌভাগ্যযুক্ত এবং সমস্ত বিশ্ববাসীর জন্য পথ প্রদর্শক।
— Sheikh Mujibur Rahman
নিশ্চয় প্রথম ঘর, যা মানুষের জন্য স্থাপন করা হয়েছে, তা মক্কায়। যা বরকতময় ও হিদায়াত বিশ্ববাসীর জন্য।
— Rawai Al-bayan
নিশ্চয় মানব জাতির জন্য সর্বপ্রথম যে ঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা তো বাক্কায়, বরকতময় ও সৃষ্টিজগতের দিশারী হিসাবে।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
তাতে সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী রয়েছে (যেমন) মাক্বামে ইবরাহীম(ইবরাহীমের দাঁড়ানোর জায়গা)। যে কেউ তাতে প্রবেশ করবে নিরাপদ হবে। আল্লাহর জন্য উক্ত ঘরের হাজ্জ করা লোকেদের উপর আবশ্যক যার সে পর্যন্ত পৌঁছার সামর্থ্য আছে এবং যে ব্যক্তি অস্বীকার করবে, (সে জেনে রাখুক) নিঃসন্দেহে আল্লাহ বিশ্ব জাহানের মুখাপেক্ষী নন।
— Taisirul Quran
ওর মধ্যে প্রকাশ্য নিদর্শনসমূহ বিদ্যমান রয়েছে, মাকামে ইবরাহীম উক্ত নিদর্শনসমূহের অন্যতম। আর যে ওর মধ্যে প্রবেশ করে সে নিরাপত্তা প্রাপ্ত হয় এবং আল্লাহর উদ্দেশে এই গৃহের হাজ্জ করা সেই সব মানুষের কর্তব্য যারা সফর করার আর্থিক সামর্থ্য রাখে এবং যদি কেহ অস্বীকার করে তাহলে নিশ্চয়ই আল্লাহ সমগ্র বিশ্ববাসী হতে প্রত্যাশামুক্ত।
— Sheikh Mujibur Rahman
তাতে রয়েছে স্পষ্ট নির্দশনসমূহ, মাকামে ইবরাহীম। আর যে তাতে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ হয়ে যাবে এবং সামর্থ্যবান মানুষের উপর আল্লাহর জন্য বায়তুল্লাহর হজ্জ করা ফরয। আর যে কুফরী করে, তবে আল্লাহ তো নিশ্চয় সৃষ্টিকুল থেকে অমুখাপেক্ষী।
— Rawai Al-bayan
তাতে অনেক সুস্পষ্ট নিদর্শন আছে, যেমন মাকামে ইবরাহীম। আর যে কেউ সেখানে প্রবেশ করে সে নিরাপদ। আর মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহ্র উদ্দেশ্যে ঐ ঘরের হজ্ব করা তার জন্য অবশ্য কর্তব্য। আর যে কেউ কুফরী করল সে জেনে রাখুক, নিশ্চয় আল্লাহ সৃষ্টিজগতের মুখাপেক্ষী নন।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
বুখারি ও মুসলিমে মসজিদুল হারাম এবং মসজিদুল আকসার প্রথম প্রতিষ্ঠার মধ্যে চল্লিশ বছরের ব্যবধান বলা হয়েছে। ইব্রাহিমের সঙ্গে কাবা এবং সুলাইমানের সঙ্গে জেরুজালেমের উপাসনাগৃহ নির্মাণের পরিচিত সম্পর্কের পাশে এই সময়ের দাবি একটি নির্দিষ্ট সমস্যা তৈরি করে। আব্রাহামিক কাহিনির নিজস্ব বংশপরম্পরাতেই ইব্রাহিম ও সুলাইমানের মধ্যে বহু প্রজন্ম আছে। জেরুজালেমের প্রথম মন্দিরকে সুলাইমানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়; বর্তমান আল-আকসা স্থাপনার ইতিহাস তার থেকে পৃথক। “মসজিদ” শব্দ দিয়ে কোনো পবিত্র স্থানের প্রথম প্রতিষ্ঠান বোঝানো এবং বর্তমান ভবন বোঝানোও এক প্রশ্ন নয়। চল্লিশ বছরের দাবির পক্ষে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠাতা, সমসাময়িক দলিল বা প্রত্নতাত্ত্বিক সাক্ষ্য দরকার; হাদিসটি শুধু সময়ের ঘোষণা দিয়েছে। [113] [114]
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫০/ আম্বিয়া কিরাম (আঃ)
পরিচ্ছেদঃ ২০০৯. يَزِفُّونَ অর্থ দ্রুত চলা।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৩১২৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৩৩৬৬
৩১২৭। মূসা ইবনু ইসলামাঈল (রহঃ) … আবূ যার থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! পৃথিবীতে সর্বপ্রথম কোন মসজিদ তৈরি করা হয়েছে? তিনি বললেন, মসজিদে হারাম। আমি বললাম, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, মসজিদে আকসা। আমি বললাম, উভয় মসজিদের (তৈরীর) মাঝে কত ব্যাবধান ছিল? তিনি বললেন, চল্লিশ বছর। (তিনি আরো বললেন) এরপর তোমার যেখানেই সালাতের সময় হবে, সেখানেই সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করে নিবে। কেননা এর মধ্যে ফযীলত নিহিত রয়েছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ যার আল-গিফারী (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৫। মাসজিদ ও সালাতের স্থানসমূহ
পরিচ্ছেদঃ পরিচ্ছেদ নাই
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ১০৪৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৫২০
১০৪৮-(১/৫২০) আবূ কামিল আল জাহদারী, আবূ বকর ইবনু আবূ শায়বাহ ও আবূ কুরায়ব (রহঃ) … আবূ যর (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রসূল! পৃথিবীতে কোন মসজিদটি সর্বপ্রথম নির্মিত হয়েছিল? তিনি বললেন, মসজিদুল হারাম। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, এরপর কোনটি (মাসজিদটি)। তিনি বললেন, আল মাসজিদুল আকসা বা বায়তুল মাকদিস। আমি পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম, এ দু’টি মসজিদের নির্মাণকালের মধ্যে ব্যবধান কত? তিনি বললেন, চল্লিশ বছর। (তিনি আরো বললেন) যে স্থানেই সালাতের সময় উপস্থিত হবে, তুমি সেখানেই সালাত আদায় করে নিবে। কারণ সে জায়গাটাও মাসজিদ।
আবূ কামিল বর্ণিত হাদীসে আছে, তাই যেখানেই সালাতের সময় হবে তুমি সেখানেই সালাত আদায় করে নিবে। কারণ সেটিও মাসজিদ। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ১০৪২, ইসলামিক সেন্টার ১০৫২)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ যার আল-গিফারী (রাঃ)
সুলাইমানের সঙ্গে বায়তুল মাকদিস নির্মাণের সম্পর্ক হাদিসের বাইরের কোনো অনুমানমাত্র নয়। নাসায়িতে তাঁর নির্মাণশেষের প্রার্থনার পূর্ণ বর্ণনা আছে। [115]
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو، عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” أَنَّ سُلَيْمَانَ بْنَ دَاوُدَ صلى الله عليه وسلم لَمَّا بَنَى بَيْتَ الْمَقْدِسِ سَأَلَ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ خِلاَلاً ثَلاَثَةً سَأَلَ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ حُكْمًا يُصَادِفُ حُكْمَهُ فَأُوتِيَهُ وَسَأَلَ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ مُلْكًا لاَ يَنْبَغِي لأَحَدٍ مِنْ بَعْدِهِ فَأُوتِيَهُ وَسَأَلَ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ حِينَ فَرَغَ مِنْ بِنَاءِ الْمَسْجِدِ أَنْ لاَ يَأْتِيَهُ أَحَدٌ لاَ يَنْهَزُهُ إِلاَّ الصَّلاَةُ فِيهِ أَنْ يُخْرِجَهُ مِنْ خَطِيئَتِهِ كَيَوْمِ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ ” .
বাংলা অনুবাদ:
আবদুল্লাহ ইবনে আমর থেকে রাসুলের নামে বর্ণিত: দাউদের পুত্র সুলাইমান বায়তুল মাকদিস নির্মাণের পরে আল্লাহর কাছে তিনটি বিষয় চান। তিনি এমন বিচার চান, যা আল্লাহর বিচারের সঙ্গে মেলে; তাঁকে তা দেওয়া হয়। তিনি এমন রাজত্ব চান, যা তাঁর পরে আর কারও জন্য হবে না; তাঁকে তাও দেওয়া হয়। মসজিদ নির্মাণ শেষ করে তিনি আল্লাহর কাছে চান, যে ব্যক্তি শুধু সেখানে সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে আসবে, আল্লাহ যেন তাকে এমনভাবে পাপমুক্ত করেন, যেমন তার মা তাকে জন্ম দিয়েছিল।
ধ্রুপদি ব্যাখ্যাকারীরা এই সময়ের সমস্যার সমাধানে আরও আগের নির্মাণের অনুমান এনেছেন। ইবনে জাওজি ইব্রাহিম ও সুলাইমানকে প্রথম নির্মাতা না ধরে আদম ও তাঁর সন্তানদের মধ্যে প্রথম স্থাপনকারী খুঁজেছেন। তাঁর বক্তব্য ইসলাম প্রশ্নোত্তরেও উদ্ধৃত হয়েছে। [116]
الإشارة إلى أول البناء، ووضع أساس المسجدين؛ وليس أول من بنى الكعبة إبراهيم، ولا أول من بنى بيت المقدس سليمان، وفي الأنبياء والصالحين والبانين كثرة، فالله أعلم بمن ابتدأ. وقد روينا أن أول من بنى الكعبة: آدم، ثم انتشر ولده في الأرض، فجائز أن يكون بعضهم قد وضع بيت المقدس.
বাংলা অনুবাদ:
এখানে দুটি মসজিদের প্রথম নির্মাণ ও ভিত্তিস্থাপনের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। কাবার প্রথম নির্মাতা ইব্রাহিম নন এবং বায়তুল মাকদিসের প্রথম নির্মাতা সুলাইমান নন। নবী, সৎ ব্যক্তি ও নির্মাতার সংখ্যা অনেক; কে শুরু করেছিলেন, আল্লাহই ভালো জানেন। আমাদের কাছে বর্ণিত হয়েছে, প্রথম কাবা নির্মাণ করেন আদম। পরে তাঁর সন্তানরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে; সুতরাং তাঁদের কেউ বায়তুল মাকদিস প্রতিষ্ঠা করে থাকতে পারেন।
এই ব্যাখ্যার শেষ বাক্যে “হতে পারে” কথাটিই তার প্রমাণগত অবস্থান প্রকাশ করে। চল্লিশ বছরের হিসাবকে প্রতিষ্ঠিত রাখতে একজন সম্ভাব্য পূর্ববর্তী নির্মাতার ধারণা আনা হয়েছে। তাঁর নাম, সময়, সমসাময়িক লিপি বা স্থাপনার প্রমাণ এখানে দেওয়া হয়নি। হাদিসের ঘোষিত সংখ্যাকে যাচাই করার বদলে সংখ্যাটিকে সত্য ধরে অজ্ঞাত নির্মাণপর্ব বসানো হয়েছে। ফলে ঐতিহাসিক সমস্যার উত্তর একটি নতুন অপ্রমাণিত কাহিনির ওপর নির্ভর করে। ইব্রাহিম ও সুলাইমানকে পুনর্নির্মাতা বললেই প্রথম নির্মাণের দাবি প্রমাণিত হয় না; অগ্রাধিকারের পুরো দাবির ভিত্তি তখনও ধর্মীয় বর্ণনার ভেতরেই ঘুরতে থাকে।
কাবার প্রাচীনত্বের দাবি পরবর্তী হজবিধানের কর্তৃত্বের সঙ্গেও যুক্ত। একটি স্থানীয় উপাসনাকেন্দ্রকে মানবজাতির প্রথম গৃহ বলা হলে সেখানে যাওয়ার নির্দেশ বিশ্বজনীন মর্যাদা পায়। মাকামে ইব্রাহিম, পবিত্রতা এবং প্রথমত্ব একসঙ্গে মক্কার কেন্দ্রীয় অবস্থানকে বৈধতা দেয়। এই ধর্মীয় গুরুত্ব এবং স্থাপনার প্রকৃত নির্মাণকাল পৃথক প্রশ্ন। কোনো স্থান লক্ষ মানুষের কাছে পবিত্র বলে তার সর্বপ্রাচীন হওয়ার দাবি সত্য হয়ে যায় না। অতীতের নির্দিষ্ট ঘটনা প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাসীর সংখ্যার বদলে নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সাক্ষ্য প্রয়োজন।
কাবার কসম এবং ইহুদির সংশোধন
নাসায়ির বর্ণনায় একজন ইহুদি মুহাম্মদের কাছে এসে মুসলিমদের কথাবার্তায় আল্লাহর অংশীদার স্থাপনের অভিযোগ করেন। অভিযোগের দুটি উদাহরণ ছিল “আল্লাহ ও তুমি যা চাও” বলা এবং “কাবার কসম” করা। মুহাম্মদ পরে ওই বাক্যগুলো সংশোধনের নির্দেশ দেন। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একেশ্বরবাদ প্রতিষ্ঠার দাবি করা সম্প্রদায়ের ভাষার অসংগতি একজন বহিরাগত শনাক্ত করছেন এবং তাঁর আপত্তির পরে আচরণ বদলাচ্ছে। মুসলিমদের প্রচলিত বাক্যের জন্য নবীর আলাদা নির্দেশ প্রয়োজন হয়েছে। সর্বজ্ঞ উৎসের তত্ত্বাবধানের দাবি থাকা সত্ত্বেও সংশোধনের দৃশ্যমান উপলক্ষ এসেছে মানুষের প্রশ্ন ও সমালোচনা থেকে। [117]
সুনান আন-নাসায়ী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৫/ মানত ও কসম
পরিচ্ছেদঃ ৮. কাবার কসম করা
৩৭৭৪. ইউসুফ ইন ঈসা (রহঃ) … জুহায়না গোত্রের এক মহিলা থেকে বর্ণিত যে, এক ইয়াহুদী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বললোঃ আপনারা তো আল্লাহর সাথে শরীক ও তার সমকক্ষ স্থির করে থাকেন। আপনারা বলে থাকেনঃ যা আল্লাহ্ ইচ্ছা করেন আর যা তুমি ইচ্ছা কর। আর আপনারা আরো বলে থাকেন, কাবার কসম! তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিলেন যে, যখন কসম করার ইচ্ছা করবে, তখন বলবেঃ কাবার রবের কসম! আরো বলবেঃ আল্লাহ্ যা চেয়েছেন। এরপর তুমি চেয়েছ।
তাহক্বীকঃ সহীহ। সহীহাহ ১৩৬।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
কাবার শপথকে “কাবার রবের শপথ” করা এবং আল্লাহ ও মানুষের ইচ্ছার মধ্যে “এবং”-এর বদলে “তারপর” বসানো ধর্মীয় ভাষার সীমানা নির্ধারণ করে। ঘরটির পবিত্রতা বহাল থাকছে, কিন্তু তার নামে শপথের অনুমতি প্রত্যাহার হচ্ছে। মানুষ কোন শব্দে অতিপ্রাকৃত কর্তৃত্ব প্রকাশ করবে, তার নিয়মও ক্রমে তৈরি হচ্ছে। ধর্মীয় সঙ্গতি পরীক্ষা করার এই কাজ মানুষের ভাষা, আপত্তি এবং পরে দেওয়া নির্দেশের মধ্য দিয়ে ঘটেছে। বাইরের ব্যক্তির সংশোধনকে গ্রহণযোগ্য মনে করার অর্থ তাঁর যুক্তির কার্যকারিতা স্বীকার করা; সেই যুক্তি প্রকাশের জন্য তাঁর আগে মুসলিম হওয়ার প্রয়োজন পড়েনি।
ইবনে মাজাহতে স্বপ্নের মধ্যে আহলে কিতাবের এক ব্যক্তির একই অভিযোগ এবং পরে বক্তব্য সংশোধনের আরেক বর্ণনা আছে। স্বপ্নের কাহিনিতেও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ভাষাগত অসংগতি একজন আহলে কিতাবের মুখ দিয়ে সামনে আনা হয়েছে। [118]
عَنْ حُذَيْفَةَ بْنِ الْيَمَانِ، أَنَّ رَجُلاً، مِنَ الْمُسْلِمِينَ رَأَى فِي النَّوْمِ أَنَّهُ لَقِيَ رَجُلاً مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ فَقَالَ نِعْمَ الْقَوْمُ أَنْتُمْ لَوْلاَ أَنَّكُمْ تُشْرِكُونَ تَقُولُونَ مَا شَاءَ اللَّهُ وَشَاءَ مُحَمَّدٌ . وَذَكَرَ ذَلِكَ لِلنَّبِيِّ ـ صلى الله عليه وسلم ـ فَقَالَ ” أَمَا وَاللَّهِ إِنْ كُنْتُ لأَعْرِفُهَا لَكُمْ قُولُوا مَا شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ شَاءَ مُحَمَّدٌ ” .
বাংলা অনুবাদ:
হুজাইফা ইবনে ইয়ামান থেকে বর্ণিত: একজন মুসলিম স্বপ্নে দেখলেন, তিনি আহলে কিতাবের এক ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করেছেন। সে বলল: তোমরা কত ভালো জাতি হতে, যদি অংশীদার স্থাপন না করতে! তোমরা বলো, আল্লাহ যা চান এবং মুহাম্মদ যা চান। তিনি কথাটি নবীকে জানালেন। নবী বললেন: আল্লাহর শপথ, আমি তোমাদের এ কথাটি জানতাম। তোমরা বলো, আল্লাহ যা চান, তারপর মুহাম্মদ যা চান।
এখানে একই নৈতিক-ধর্মীয় আপত্তি স্বপ্নের কাহিনির মাধ্যমে সামনে এসেছে। অভিযোগের বিষয় মানুষের ভাষায় কর্তৃত্বের সমপর্যায় স্থাপন, আর সংশোধনটি একটি সংযোজক শব্দ বদলে সম্পন্ন। এই সামান্য ভাষাগত পরিবর্তনের ওপর শিরক ও গ্রহণযোগ্য বক্তব্যের সীমানা দাঁড় করানো হচ্ছে। ধর্মীয় বিধান কীভাবে মানুষের কথাবার্তার সূক্ষ্ম অংশ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করে, তার এটি স্পষ্ট উদাহরণ। একই সঙ্গে সংশোধনের ঘটনাগুলো দেখায়, নবুওয়াতের সমাজেও বিধির বাস্তব রূপ প্রশ্ন, আপত্তি ও পরবর্তী নির্দেশের মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হচ্ছিল।
ইহুদিদের আকৃষ্ট করতে কিবলা পরিবর্তন
ইসলামের আগে কাবা ছিল তীর্থ, প্রদক্ষিণ, উৎসর্গ ও গোত্রীয় উপাসনার কেন্দ্র। উলঙ্গ তাওয়াফ এবং বিশেষ পোশাকসংক্রান্ত রীতির কথাও হাদিসে আছে। সাফা-মারওয়ার যাত্রা, কালো পাথরের মর্যাদা এবং তীর্থের বিভিন্ন ক্রিয়া পূর্ববর্তী আরবের ধর্মজীবনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ইসলাম এসব উপাদানের কিছু গ্রহণ করে, কিছু বর্জন করে এবং গ্রহণ করা আচারের জন্য নতুন ব্যাখ্যা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। ফলে কাবাকে কিবলা করা মানে সম্পূর্ণ অপরিচিত কোনো স্থানে ধর্মীয় গুরুত্ব সৃষ্টি করা ছিল না। একটি পূর্বপরিচিত তীর্থকেন্দ্রকে নতুন সম্প্রদায়ের কেন্দ্রীয় দিক হিসেবে স্থাপন করা হয়েছিল। স্থানের পুরোনো সামাজিক গুরুত্ব এবং নতুন ধর্মীয় বিধান একে অন্যকে শক্তিশালী করেছে।
মুহাম্মদের মক্কার সময়ের প্রথম কিবলা নিয়ে সাহাবি ও পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীদের মধ্যে মতভেদ আছে। একটি মতে শুরু থেকেই বায়তুল মাকদিসের দিকে সালাত পড়া হতো; আরেক মতে মক্কায় কাবা, মদিনায় বায়তুল মাকদিস এবং পরে আবার কাবা কিবলা হয়েছে। কুরতুবি উভয় মতই উল্লেখ করেছেন। মদিনায় ষোলো বা সতেরো মাস বায়তুল মাকদিসের দিকে মুখ করার পরে কাবার দিকে ঘোরার ঘটনা হাদিসে স্পষ্ট। ইহুদিদের আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে তাঁদের কিবলার দিকে মুখ করার ব্যাখ্যাও তাফসিরে সরাসরি সংরক্ষিত। এই ব্যাখ্যা মানুষের সমর্থন লাভ এবং ধর্মীয় দিকনির্দেশের মধ্যে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপন করে। [119]
দান, উপবাস, খাদ্যনিষেধ, শুচিতা ও খতনার মতো আচারের সঙ্গে ইহুদি এবং আরবের অন্যান্য ধর্মীয় পরম্পরার সম্পর্ক আছে। হিব্রু ত্সেদাকা এবং আরবি সাদাকায় ভাষাগত আত্মীয়তা ও দানের অর্থগত যোগ আছে; দুই সমাজেই দরিদ্রকে দেওয়ার ধর্মীয় মূল্য প্রতিষ্ঠিত ছিল। শনিবার, রবিবার ও শুক্রবারের পৃথক মর্যাদা দেখায়, পরিচিত সামাজিক রীতির মধ্যে নতুন সম্প্রদায়ের নিজস্ব দিনও নির্ধারণ করা যায়। এসব ক্ষেত্রে পুরোনো ধর্মীয় জগৎ থেকে গ্রহণ এবং স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি পাশাপাশি ঘটে। কিবলার পরিবর্তনেও একই সামাজিক প্রশ্ন সামনে আসে: কোন পূর্ববর্তী ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন সম্প্রদায় নিজেকে যুক্ত করবে এবং কোন আচারের মাধ্যমে নিজের পৃথক কর্তৃত্ব প্রকাশ করবে?
মদিনার বিভিন্ন ইহুদি গোষ্ঠীর সঙ্গে মুহাম্মদের সম্পর্ক পরে রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়। বহিষ্কার, বনু কুরাইজার পুরুষদের হত্যা এবং নারী-শিশুদের বন্দিত্বের ঘটনা পৃথক আলোচনার বিষয়। আরব উপদ্বীপ থেকে অমুসলিমদের অপসারণের নির্দেশও হাদিসে এসেছে। মদিনার গোষ্ঠীগত বিরোধ, মিত্রতা ও সামরিক ক্ষমতার পরিবর্তনের মধ্যে নতুন সম্প্রদায়ের পৃথক পরিচয়ও আরও দৃঢ় হয়েছে। কিবলার ক্ষেত্রে ধর্মীয় উৎস নিজেই আকর্ষণ, হতাশা ও পৃথক পরিচয়ের ব্যাখ্যা দিয়েছে। মদিনায় বায়তুল মাকদিসমুখী সালাত এবং পরে কাবামুখী হওয়ার মূল বর্ণনাগুলো নিচে আছে। [120] [121] [122] [123] [124] [125]
সুনান আন-নাসায়ী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫/ নামাজ প্রসঙ্গে
পরিচ্ছেদঃ ২২/ কিবলামুখী হওয়া ফরজ প্রসঙ্গে
৪৮৯। মুহাম্মদ ইবনু বাশ্শার (রহঃ) … বা’রা ইবনু আযিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমরা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে ষোল মাস বা সতর মাস (বর্ণনাকারী সুফিয়ানের সন্দেহ) বায়তুল মুকাদ্দাস অভিমুখী হয়ে সালাত আদায় করি। পরে তাঁকে (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে) কাবার দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়।
সহিহ, ইরউয়াউল গালীল হাঃ ৪৯০, বুখারি হাঃ ৪৪৯২, মুসলিম (ইসলামিক সেন্টার) হাঃ ১০৬৬
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ বারা’আ ইবনু আযিব (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫/ মসজিদ ও সালাতের স্থান
পরিচ্ছেদঃ ২. বায়তুল মুকাদ্দাস হতে কা’বার দিকে কিবলা পরিবর্তন
১০৬১। শায়বান ইবনু ফাররূখ ও কুতায়বা ইবনু সাঈদ (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, লোকেরা কুবাতে ফজরের সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করছিল, ইতিমধ্যে একজন লোক এসে বলল, এ রাত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে এবং কাবার দিকে মুখ করবার আদেশ প্রদান করা হয়েছে। অতএব, তোমরাও কাবার দিকে মুখ করে দাঁড়াও। তাদের চেহারা ছিল তখন সিরিয়ার দিকে। অতঃপর তারা কা’বার দিকে ঘূরে গেলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ)
আল-লুলু ওয়াল মারজান
৫/ মাসজিদ ও সালাতের স্থানসমূহের বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ ৫/২. বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে কা’বার দিকে কিবলা পরিবর্তন।
৩০৪. ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ একদা লোকেরা কুবা নামক স্থানে ফজরের সালাত আদায় করছিলেন। এমন সময় তাদের নিকট এক ব্যক্তি এসে বললেন যে, এ রাতে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ওয়াহী অবতীর্ণ হয়েছে। আর তাঁকে কা‘বামুখী হবার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কাজেই তোমারা কা‘বার দিকে মুখ কর। তখন তাঁদের চেহারা ছিল শামের (বায়তুল মুকাদ্দাসের) দিকে। একথা শুনে তাঁরা কা‘বার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন।
সহীহুল বুখারী, পৰ্ব ৮। সালাত, অধ্যায় ৩২, হাঃ ৪০৩; মুসলিম, পর্ব ৫ মসজিদ ও সালাতের স্থানসমূহের বর্ণনা, অধ্যায় ২, হাঃ ৫২৬
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ)
কিবলা পরিবর্তনের ধর্মীয় জীবনবৃত্তান্তে এই ঘটনাকে ওহির নির্দেশের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ইবনে কাইয়্যিমের যাদুল মাআদ-এর সংক্ষিপ্ত বাংলা সংস্করণেও ঘটনাটি আলোচিত। এখানে ঐশী নির্দেশের পরিচয় এবং মানুষের বাস্তব আচরণের পরিবর্তন একই বর্ণনার দুই স্তর। নির্দেশ ঘোষণার আগে একটি দিক মান্য ছিল, পরে অন্য দিক মান্য হয়েছে; অনুসারীদের নতুন ঘোষণা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অবস্থান বদলাতে হয়েছে। [126]
কিবলা পরিবর্তনের এই ঘটনায় বড় বড় অনেকগুলো হিকমত রয়েছে এবং এটি ছিল মুসলিম, মুশরিক, ইহুদী এবং মুনাফিক সকল সম্প্রদায়ের জন্যই পরীক্ষা। মুসলিমদের তো কোন সমস্যাই ছিলনা। আল্লাহর পক্ষ হতে হিদায়াত পাওয়ার কারণে তারা বললেন- আমরা ঈমান এনেছি, সব কিছুই আল্লাহর পক্ষ হতে। তাই আমরা শুনলাম এবং মেনে নিলাম। তাদের কাছে বিষয়টি তেমন বড় ছিলনা।
মুশরিকরা বলতে লাগল, সে যেমন আমাদের কিবলার (কাবার) দিকে ফেরত এসেছে তেমন অচিরেই আমাদের দ্বীনে ফেরত আসবে। আমাদের কিবলাকে সত্য মনে করেই সেদিকে ফিরে এসেছে। ইহুদীরা বলতে লাগল- সে তাঁর পূর্বের সকল নাবীদের কিবলার বিরোধীতা করছে।
মুনাফিকরা বলতে লাগল- জানিনা, এই লোক কোথায় যাচ্ছে? প্রথম কিবলা সঠিক হয়ে থাকলে সে একটি সত্য বিষয় পরিত্যাগ করেছে। আর দ্বিতীয়টি সঠিক হয়ে থাকলে প্রথমে সে বাতিলের উপর ছিল। এ ছাড়া মূর্খরা আরও অনেক কথাই বলেছে। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন-
وَإِنْ كَانَتْ لَكَبِيرَةً إِلَّا عَلَى الَّذِينَ هَدَى اللَّهُ )
“নিশ্চয়ই এটা (কিবলা পরিবর্তন) কঠিন বিষয়, কিন্তু তাদের জন্যে নয়, যাদেরকে আল্লাহ্ পথ প্রদর্শন করেছেন”। (সূরা বাকারা-২:১৪৩)
নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তা’আলার পক্ষ হতে এটি মুমিন বান্দাদের জন্য একটি কঠিন পরীক্ষাও ছিল। যাতে তিনি দেখে নেন কে রসূলের অনুসরণ করে এবং কে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। কিবলার বিষয়টি যেহেতু একটি বিরাট ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাই আল্লাহ্ তআলা কিবলা পরিবর্তনের পূর্বে ভূমিকা স্বরূপ নাসেখ-মানসুখ তথা শরীয়তের কোন বিষয়কে রহিত করার বিধি-বিধান বর্ণনা করেছেন। এ বিষয়ে আল্লাহ্ তা’আলা পূর্ণ ক্ষমতাবান। তিনি বলেছেন যে, কোন বিষয়কে মানসুখ (রহিত) করলে তার স্থলে আরও উত্তম হুকুম প্রদান করেন কিংবা অনুরূপ বিষয় স্থাপন করেন। এরপরই তিনি ঐ সমস্ত লোকদেরকে ধমক দিয়েছেন, যারা রসূল এর হুকুমের বিরুদ্ধে হঠকারিতা প্রদর্শন করে এবং তাঁর হুকুমের সামনে মাথা নত করেনা।
অতঃপর আল্লাহ্ তা’আলা ইহুদীদের পারস্পারিক মতভেদের কথা উল্লেখ করে বলেছেন যে, তাদের একদল অন্যদলকে দোষারোপ করে বলে থাকে যে, তোমরা সঠিক পথের উপর প্রতিষ্ঠিত নও। আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর বান্দাদেরকে ইহুদী-খৃষ্টানদের অনুরূপ করতে এবং তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করা হতে সতর্ক করেছেন। অতঃপর আল্লাহ্ তা’আলা তাদের কুফর ও শির্কের বিষয় উল্লেখ করেছেন। তারা বলে যে, আল্লাহর পুত্র সন্তান রয়েছে। তিনি এ থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র এবং তাদের ধারণার অনেক ঊর্ধ্বে।
কিবলা পরিবর্তনের আলোচনার ধারাবাহিকতায় তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, আল্লাহর জন্যই পূর্ব ও পশ্চিম তথা সকল দিক। সুতরাং তাঁর বান্দাগণ যেদিকেই মুখ ফিরাবে আল্লাহ্ সেদিকেই রয়েছেন। তার জ্ঞান অত্যন্ত ব্যাপক ও প্রশস্ত। তিনি তাঁর বড়ত্ব ও বিশালতার মাধ্যমে সকল কিছুকে বেষ্টন করে রেখেছেন বলেই বান্দা যেদিকে মুখ ফিরাবে আল্লাহ্ তা’আলা সেদিকেই রয়েছেন। অতঃপর আল্লাহ্ তা’আলা সংবাদ দিয়েছেন যে, যারা তাঁর অনুসরণ না করার কারণে এবং তাঁকে সত্যায়ন না করার কারণে জাহান্নামে যাবে তাদের সম্পর্কে তিনি তাঁর রসূলকে কিছুই জিজ্ঞেস করবেন না।

তাফসিরে মা’আরেফুল কোরআন প্রথম কিবলা নিয়ে দুই মতই উল্লেখ করে এবং ইহুদিদের আকৃষ্ট করার ব্যাখ্যা উদ্ধৃত করে। গ্রন্থটির রচয়িতা মুফতি মুহাম্মদ শফি দেওবন্দি ধারার হানাফি পণ্ডিত এবং দারুল উলুম দেওবন্দের প্রধান মুফতি ছিলেন। তাঁর তাফসিরের এই বক্তব্যে উদ্দেশ্যটি কোনো সমালোচকের কল্পিত অভিযোগ হিসেবে আসেনি; ধর্মীয় পরিবর্তনের তাৎপর্য বোঝাতে মুসলিম ব্যাখ্যাকারী নিজেই তা উল্লেখ করেছেন। ইহুদিদের কাছে নতুন ধর্মকে গ্রহণযোগ্য করা এবং পরে সেই প্রচেষ্টায় ফল না পাওয়ার বিবরণ সরাসরি রাজনৈতিক-সামাজিক কার্যকারণ তৈরি করে। [127]
আনুষঙ্গিক জ্ঞাতব্য বিষয়:
কা’বা শরীফ সর্বপ্রথম কখন নামাজের কিবলা হয়ঃ হিজরতের পূর্বে মক্কা মুকাররমায় যখন নামাজ ফরজ হয়, তখন কা’বাগৃহই নামাজের জন্য কিবলা ছিল, না বায়তুল মুকাদ্দাস ছিল—এ প্রশ্নে সাহাবি ও তাবেঈগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন: শুরু থেকেই কিবলা ছিল বায়তুল মুকাদ্দাস। হিজরতের পরও ষোল-সতের মাস পর্যন্ত বায়তুল মুকাদ্দাসই কিবলা ছিল। এরপর কা’বাকে কিবলা করার নির্দেশ আসে। তবে রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কায় অবস্থানকালে হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানির মাঝখানে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তেন, যাতে কা’বা ও বায়তুল মুকাদ্দাস—উভয়টিই সামনে থাকে। মদীনায় পৌঁছার পর এরূপ করা সম্ভব ছিল না। তাই তাঁর মনে কিবলা পরিবর্তনের বাসনা দানা বাঁধতে থাকে। (ইবনে কাসীর)
অন্যদিকে, অন্যান্য সাহাবি ও তাবেঈগণ বলেন: মক্কায় নামাজ ফরজ হওয়ার সময় কা’বাগৃহই ছিল মুসলমানদের প্রাথমিক কিবলা। কেননা, হযরত ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আ.)-এর কিবলাও তাই ছিল। মহানবী (সা.) মক্কায় অবস্থানকালে কা’বাগৃহের দিকেই মুখ করে নামাজ পড়তেন। মদীনায় হিজরতের পর তাঁর কিবলা বায়তুল মুকাদ্দাস সাব্যস্ত হয়। তিনি মদীনায় ষোল-সতের মাস পর্যন্ত বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামাজ পড়েন। এরপর প্রথম কিবলা—অর্থাৎ কা’বাগৃহের দিকে মুখ করার নির্দেশ অবতীর্ণ হয়। তাফসীরে কুরতুবীতে আবু আমরের বরাতে এ শেষোক্ত উক্তিকেই অধিকতর বিশুদ্ধ বলা হয়েছে। এর রহস্য বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা হয় যে, মদীনায় আগমনের পর যখন ইহুদিদের সাথে মেলামেশা শুরু হয়, তখন মহানবী (সা.) তাদের আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে আল্লাহর নির্দেশে তাদের কিবলাকেই কিবলা হিসেবে গ্রহণ করেন। কিন্তু পরে যখন অভিজ্ঞতার দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ইহুদিরা হঠকারিতা ত্যাগ করবে না, তখন হুজুর (সা.)-কে সাবেক কিবলার দিকে মুখ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। কারণ, পিতৃপুরুষ হযরত ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আ.)-এর কিবলা হওয়ার কারণে তিনি স্বভাবতই তাকে পছন্দ করতেন।

বাংলা তাফসিরে সংরক্ষিত আরেক বক্তব্যে ইহুদিদের সন্তুষ্ট করার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার কথা বলা হয়েছে। উদ্ধৃত ভাষায় তাঁদের আপত্তিকে বিদ্বেষ ও হিংসা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এটি ব্যাখ্যাকারীর প্রতিপক্ষ-চিত্রণ; একই সঙ্গে তাঁর নিজের বিবরণেই কিবলা গ্রহণের সঙ্গে মন জয় করার প্রচেষ্টার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে ধর্মীয় বিধানের বর্ণনার মধ্যে পক্ষসমর্থন আদায় এবং বিরোধীর চরিত্র সম্পর্কে রায় পাশাপাশি থাকে। [128]
৪. সাবেক কিবলা বায়তুল মুকাদ্দাস দ্বারা আহলে কিতাবদের আকৃষ্ট করা উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু ষোলো / সতের মাসের অভিজ্ঞতার পর সে উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে যায়। কারণ মদিনার ইহুদিরা এর কারণে ইসলামের নিকটবর্তী হওয়ার পরিবর্তে দূরেই সরে যাচ্ছিল। -[তাফসীরে মা’আরিফুল কুরআন : মুফতি শফী (র.) ও আহকামুল কুরআন থেকে সংক্ষপিত]

প্রাসঙ্গিক আলোচনা : আপনি তাদের যতই মন যুগিয়ে চলুন না কেন এবং তাদের সাথে সমবেদনা ও সহমর্মিতার আচরণই করুন না কেন তারা কিছুতেই আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না। কেননা তাদের অসন্তুষ্টির কারণ হলো বিদ্বেষ এবং হিংসা। এর কোনো চিকিৎসা নেই। আপনি তাদের মনতুষ্টির জন্য বায়তুল মুকাদ্দাসের অভিমুখী হয়ে নামাজ পড়েছেন । এতে তাদের হিংসা ও বিদ্বেষের সীমা বৃদ্ধি হওয়া ছাড়া আর কোনো ফল হয়নি। তাদের অসন্তুষ্টির কারণ তো এটা নয় যে, তারা প্রকৃত সত্যের সন্ধান করছে আর আপনি তাদের সামনে সত্য প্রকাশ করতে কৃপণতা করছেন; বরং তাদের মনোবাসনা হলো আপনিও তাদের রঙ্গে রঞ্জিত হয়ে যান। আপনিও তাদের চরিত্রে চরিত্রবান হোন। তবেই তারা আপনাকে সাহায্য-সহযোগিতা করবে। সুতরাং যারা প্রকাশ্য মুশরিক এবং ইসলামি আকিদা-বিশ্বাসে যাদের সঙ্গে কোনো স্তরেই সমদর্শিতা-সংযোগ নেই, তাদের তুষ্টি কামনা ও তাদের সঙ্গে আপস-মিল রক্ষা করে চলার চেষ্টা সম্পর্কে কি বিধান হতে পারে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। [জামালাইন : খ. ১, পৃ. ২১৫]

ইব্রাহিম ও ইসমাইলের সঙ্গে কাবার সম্পর্ক স্থাপন মক্কার পুরোনো ধর্মীয় কেন্দ্রকে আব্রাহামিক বংশপরম্পরায় যুক্ত করে। কোরআনের ঘোষণায় এই সংযোগ আছে; ইব্রাহিমের মক্কা সফরের স্বাধীন সমসাময়িক সাক্ষ্য তার বাইরে আলাদা প্রশ্ন। মুহাম্মদের ইসমাইলীয় বংশপরিচয়ের দাবিও নতুন ধর্মকে একটি প্রাচীন বৈধতার কাঠামো দেয়। এর ফলে কাবা কেবল গোত্রীয় তীর্থ হয়ে থাকে না; মানবজাতির আদি একেশ্বরবাদী ধর্মের কেন্দ্র হিসেবে পুনর্ব্যাখ্যাত হয়। পরিচিত স্থান ও আচারকে নতুন ইতিহাস দেওয়ার এই পদ্ধতিতে ধর্মীয় উত্তরাধিকার এবং বর্তমান নেতৃত্ব একসঙ্গে বৈধতা পায়।
মক্কা বিজয়ের পরে কাবায় মুহাম্মদের একচ্ছত্র ধর্মীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং প্রতিমাগুলো অপসারিত হয়। অন্য উপাস্যের অনুসারীরা নিজেদের পুরোনো পবিত্র স্থানে আগের মতো উপাসনার অধিকার হারায়। ধর্মীয় বৈচিত্র্যের এই সংকোচন একটি বাস্তব ক্ষমতার পরিবর্তন। প্রতিদ্বন্দ্বী আচারকে মিথ্যা ঘোষণা করার পরে তার দৃশ্যমান কেন্দ্র ধ্বংস করা নতুন কর্তৃত্বকে স্থায়ী করে। কাবার স্থান, মর্যাদা ও তীর্থের কেন্দ্রীয়তা বহাল থেকেছে, কিন্তু কারা সেখানে কোন আচার করতে পারবে, সেই অধিকার বিজয়ী সম্প্রদায়ের হাতে গেছে। এই ইতিহাসে বিশ্বাসের ঘোষণা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না।
ইহুদিদের আকৃষ্ট করার ব্যাখ্যাটি কুরতুবির আরবি পাঠে এইভাবে আছে। [129]
قال غيره: وذلك أن النبي صلى الله عليه وسلم لما قدم المدينة أراد أن يستألف اليهود فتوجه إلى قبلتهم ليكون ذلك أدعى لهم، فلما تبين عنادهم وأيس منهم أحب أن يحول إلى الكعبة فكان ينظر إلى السماء، وكانت محبته إلى الكعبة لأنها قبلة إبراهيم، عن ابن عباس. وقيل: لأنها كانت أدعى للعرب إلى الإسلام، وقيل: مخالفة لليهود، عن مجاهد.
বাংলা অনুবাদ:
অন্য একজন বলেছেন: নবী মদিনায় এসে ইহুদিদের অনুকূল করতে চাইলেন; তাই তাঁদের কিবলার দিকে মুখ করলেন, যাতে তা তাঁদের আকৃষ্ট করতে বেশি কার্যকর হয়। পরে তাঁদের অবাধ্যতা প্রকাশ পেলে এবং তাঁদের বিষয়ে নিরাশ হলে তিনি কাবার দিকে ঘুরতে পছন্দ করলেন এবং আকাশের দিকে তাকাতেন। ইবনে আব্বাসের সূত্রে বলা হয়েছে, কাবার প্রতি তাঁর পছন্দের কারণ তা ইব্রাহিমের কিবলা। আরও বলা হয়েছে, তা আরবদের ইসলামের দিকে আহ্বানে বেশি কার্যকর ছিল। মুজাহিদের সূত্রে বলা হয়েছে, ইহুদিদের বিরোধিতা করার জন্য।
এই অনুচ্ছেদে ধর্মীয় দিক পরিবর্তনের তিনটি সামাজিক ব্যাখ্যা পাশাপাশি আছে: ইহুদিদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা, আরবদের আকৃষ্ট করা এবং ইহুদিদের থেকে পৃথক অবস্থান। তিনটিই মানুষের সমাজের লক্ষ্য। দিকের নিজস্ব কোনো অপরিবর্তনীয় নৈতিক গুণ এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। একই সম্প্রদায় এক সময়ে একটি দিকে এবং পরে অন্য দিকে দাঁড়িয়েছে, আর প্রতিটি অবস্থান সেই সময়ের অনুমোদিত নির্দেশ হয়েছে। ফলে কিবলার কর্তৃত্ব নির্ভর করে কোন স্থানটি স্বভাবত পবিত্র, সেই প্রশ্নের পাশাপাশি কে সর্বশেষ আদেশ দিতে পারেন এবং অনুসারীরা কাকে মানবেন, তার ওপর।
| পর্যায় বা দাবি | উৎসে পাওয়া বিবরণ | সামাজিক ও ধর্মীয় তাৎপর্য |
|---|---|---|
| মক্কার প্রথম কিবলা | কাবা ও বায়তুল মাকদিস নিয়ে দুই মত। | প্রাথমিক আচারের ইতিহাস নিয়েও পরবর্তী ধর্মীয় সংকলনে মতভেদ আছে। |
| মদিনার প্রথম ষোলো বা সতেরো মাস | বায়তুল মাকদিসের দিকে সালাত। | অন্য আব্রাহামিক সম্প্রদায়ের কেন্দ্রের সঙ্গে দৃশ্যমান সংযোগ। |
| কাবার দিকে প্রত্যাবর্তন | অনুসারীরা সালাতের মধ্যেই নতুন নির্দেশে ঘুরে যান। | নতুন ঘোষণার সঙ্গে আচার বদলানোর তাৎক্ষণিক আনুগত্য। |
| কুরতুবিতে উদ্দেশ্যের ব্যাখ্যা | আকর্ষণ, আরবদের কাছে কার্যকারিতা এবং পৃথক পরিচয়। | দিকনির্দেশের সঙ্গে সম্প্রদায় গঠন ও সমর্থনলাভের সম্পর্ক। |
| কোরআনে পরিবর্তনের ব্যাখ্যা | রাসুলের অনুসারী এবং ফিরে যাওয়া ব্যক্তিকে আলাদা করার পরীক্ষা। | নির্দেশপালনকেই বিশ্বাসের মানদণ্ড করা। |
কোরআন কিবলার পরিবর্তনকে রাসুলের অনুসারী এবং ফিরে যাওয়া ব্যক্তিকে আলাদা করার পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত করেছে। সম্পূর্ণ আয়াতে এই আনুগত্যের মানদণ্ড রয়েছে। [130]
وَكَذَٰلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِّتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا ۗ وَمَا جَعَلْنَا الْقِبْلَةَ الَّتِي كُنتَ عَلَيْهَا إِلَّا لِنَعْلَمَ مَن يَتَّبِعُ الرَّسُولَ مِمَّن يَنقَلِبُ عَلَىٰ عَقِبَيْهِ ۚ وَإِن كَانَتْ لَكَبِيرَةً إِلَّا عَلَى الَّذِينَ هَدَى اللَّهُ ۗ وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُضِيعَ إِيمَانَكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ بِالنَّاسِ لَرَءُوفٌ رَّحِيمٌ
বাংলা অনুবাদ:
এভাবেই আমি তোমাদের মধ্যমপন্থী জাতি করেছি, যাতে তোমরা মানুষের ওপর সাক্ষী হও এবং রাসুল তোমাদের ওপর সাক্ষী হন। তুমি যে কিবলার ওপর ছিলে, তা আমি এ জন্যই নির্ধারণ করেছিলাম, যাতে জানতে পারি কে রাসুলকে অনুসরণ করে এবং কে পেছনে ফিরে যায়। আল্লাহ যাদের পথ দেখিয়েছেন তারা ছাড়া অন্যদের জন্য এটি অবশ্যই কঠিন ছিল। আল্লাহ তোমাদের ঈমান নষ্ট করবেন না। নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের প্রতি স্নেহশীল, দয়ালু।
এখানে স্থান নির্বাচনের যুক্তি থেকে মানদণ্ড সরে গিয়ে নির্দেশপালনে দাঁড়িয়েছে। পূর্বের দিক কেন গ্রহণযোগ্য ছিল এবং পরের দিক কেন গ্রহণযোগ্য হলো, তার উত্তর শেষ পর্যন্ত রাসুলের ঘোষিত কর্তৃত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অনুসারীর কাজ নতুন দিকের স্বতন্ত্র সত্যতা যাচাই করা নয়, নতুন আদেশ মেনে ঘুরে দাঁড়ানো। সেই আনুগত্যকে আবার বিশ্বাস ও পথভ্রষ্টতার পার্থক্য করা হয়েছে। একটি আচারের পরিবর্তন এভাবে নেতৃত্বের প্রতি নিষ্ঠা যাচাইয়ের উপায় হয়। ধর্মীয় বিধানের মাধ্যমে সম্প্রদায়কে সংগঠিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করার ক্ষমতা এখানে প্রত্যক্ষ।
পরের আয়াতে মুহাম্মদের আকাশের দিকে বারবার মুখ তোলা এবং তাঁর পছন্দের কিবলার দিকে ঘোরানোর কথা আছে। এতে ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা ও নতুন বিধান একই কাহিনিতে যুক্ত হয়েছে। মক্কার পরিচিত কেন্দ্র নতুন ধর্মের কেন্দ্রীয় দিক হয়ে ওঠে, আর সেই পরিবর্তনকে আল্লাহর সিদ্ধান্ত বলা হয়। মানুষের পছন্দ, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং ঐশী অনুমোদনের ঘোষণার এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কিবলার ইতিহাসকে রাজনৈতিক অর্থও দেয়। [131]
শালোম আলেইকেম থেকে আস-সালামু আলাইকুম এর বিবর্তন
“আসসালামু আলাইকুম” অর্থ আপনার বা আপনাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। হিব্রু শালোম, আরামীয়-সিরিয়াক শ্লামা এবং আরবি সালাম সেমিটিক ভাষাপরিবারের আত্মীয় শব্দ। শান্তি, নিরাপত্তা ও মঙ্গলের ভাষায় অপরকে অভিবাদন করার রীতি ইসলামের আগের ইহুদি-খ্রিস্টীয় পাঠেও উপস্থিত। আরবি বাক্যটির অর্থ বোঝার জন্য অলৌকিক আবিষ্কারের ধারণা লাগে না; পরিচিত ভাষাগত উত্তরাধিকার এবং মানুষের সামাজিক শিষ্টাচারেই তার ব্যাখ্যা আছে। ধর্মীয় বিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠার পরে একটি সাধারণ কল্যাণকামনামূলক বাক্য পরিচয়, পুরস্কার ও আনুগত্যের নির্দিষ্ট নিয়ম পেয়েছে।
| ভাষা | শান্তিবাচক শব্দ | বাক্যরীতির উদাহরণ | অর্থ |
|---|---|---|---|
| হিব্রু | শালোম — שלום | শালোম আলেইখেম; বাইবেলে শালোম লাখেম ও শালোম লেখা। | আপনাদের বা তোমার জন্য শান্তি। |
| আরামীয়-সিরিয়াক | শ্লামা — ܫܠܡܐ | শান্তি তোমাদের সঙ্গে বা তোমাদের ওপর—এ ধরনের অভিবাদনের ভাষা। | শান্তি ও নিরাপত্তার কামনা। |
| আরবি | সালাম — سلام | আসসালামু আলাইকুম; ওয়া আলাইকুমুস সালাম। | আপনাদের ওপর শান্তি; আপনাদের ওপরও শান্তি। |
এই আত্মীয়তা ধর্মীয় ভাষা কীভাবে মানুষের ভাষার মধ্যেই গড়ে ওঠে, তার সহজ উদাহরণ। একটি পরিবার বা প্রতিবেশী সমাজের অভিবাদন নতুন ধর্ম গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে সম্পূর্ণ অপরিচিত শব্দে বদলে যায় না। বরং পরিচিত সৌজন্যকে নতুন বিধি দিয়ে ধর্মীয় জীবনের অংশ করা যায়। সালামের ক্ষেত্রে তার ইসলামীকরণ হয়েছে কাকে আগে বলা হবে, কীভাবে উত্তর দেওয়া হবে এবং কোন সম্প্রদায়ের মানুষকে এই অভিবাদনের সমান মর্যাদা দেওয়া হবে, সেই সিদ্ধান্তে। সাধারণ শুভেচ্ছা তখন শুধু সদিচ্ছার প্রকাশ থাকে না; সম্প্রদায়ের সীমানাও প্রকাশ করে।
ইহুদি ঐতিহ্যে ‘শালোম আলেইকেম’
হিব্রু “শালোম আলেইখেম” এবং তার উত্তর “আলেইখেম শালোম” শান্তিকামনামূলক অভিবাদনের পরিচিত রূপ। বাইবেলের আদিপুস্তকে “শালোম লাখেম” এবং বিচারকর্তৃগণ গ্রন্থে “শালোম লেখা” ধরনের বাক্য আছে। শব্দক্রম ও সম্বোধনের রূপ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পরিবর্তিত হলেও শান্তি ও নির্ভয়ের কামনা একই সামাজিক কাজ করে। ইসলামপূর্ব পাঠে এই অর্থের উপস্থিতি কোনো পরবর্তী মুসলিম ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে না। ইহুদি ধর্মীয় সাহিত্যের নিজস্ব পাঠেই তা সরাসরি পাওয়া যায়।
আদিপুস্তকের সম্পূর্ণ পদে অভিবাদনের পরে ভয় না পাওয়ার আশ্বাস এবং সম্পদের ব্যাখ্যা এসেছে। কিং জেমস অনুবাদে পদটি হলো: [132]
And he said, Peace be to you, fear not: your God, and the God of your father, hath given you treasure in your sacks: I had your money. And he brought Simeon out unto them.
বাংলা অনুবাদ:
তিনি বললেন: তোমাদের শান্তি হোক, ভয় পেয়ো না। তোমাদের ঈশ্বর এবং তোমাদের পিতার ঈশ্বর তোমাদের বস্তার মধ্যে ধন দিয়েছেন; তোমাদের টাকা আমি পেয়েছি। আর তিনি শিমিয়োনকে তাদের কাছে বের করে আনলেন।
বিচারকর্তৃগণ গ্রন্থে ঈশ্বরের মুখেও শান্তির আশ্বাস এসেছে। [133]
And the LORD said unto him, Peace be unto thee; fear not: thou shalt not die.
বাংলা অনুবাদ:
প্রভু তাঁকে বললেন: তোমার শান্তি হোক; ভয় পেয়ো না, তুমি মারা যাবে না।
দুটি পাঠেই শান্তির বাক্য মানুষের ভয় কমানো এবং সদিচ্ছা প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত। প্রথম ক্ষেত্রে এক ব্যক্তি অন্যদের আশ্বস্ত করছেন, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে ধর্মীয় কাহিনির ঈশ্বর একই ভাষায় আশ্বাস দিচ্ছেন। ফলে একই অভিবাদন সামাজিক ও ধর্মীয় দুই পরিসরেই কাজ করতে পারে। কোনো বাক্য ধর্মগ্রন্থে স্থান পেলেই তার সামাজিক পূর্বইতিহাস বাতিল হয় না। পরবর্তী ধর্মে অনুরূপ বাক্য ব্যবহৃত হলে তার অর্থ বোঝার জন্য এই পুরোনো অর্থগত ভাণ্ডার যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। শান্তির কামনা মানুষের প্রয়োজন থেকে বোঝা যায়; তার মূল্য প্রতিষ্ঠা করতে নতুন অলৌকিক উৎসের দাবি প্রয়োজন হয় না।
সিরিয়াক ও খ্রিস্টান প্রভাব
সিরিয়াক খ্রিস্টীয় ভাষায় শান্তিবাচক শ্লামা এবং অভিবাদনের বিভিন্ন রূপ ব্যবহৃত হয়েছে। খ্রিস্টীয় ধর্মীয় পাঠে যিশুর মুখেও শান্তির অভিবাদন আছে। গ্রিক ও লাতিন খ্রিস্টীয় ভাষায় শান্তিকামনার অনুরূপ বাক্য ধর্মীয় সভা ও উপাসনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এসব ভাষা একই শব্দ ব্যবহার করে না, কিন্তু শুভেচ্ছার সামাজিক কাজটি বহন করে। আরবের পাশের ইহুদি ও খ্রিস্টীয় সমাজের ধর্মীয় ভাষায় এই রীতি উপস্থিত থাকায় সালামকে ইতিহাসহীন, সম্পূর্ণ নতুন সামাজিক আচরণ বলে হাজির করা ভুল।
যোহনের সুসমাচারে শিষ্যদের সমাবেশে যিশুর আগমনের পরে শান্তির অভিবাদন এসেছে। কিং জেমস অনুবাদে সম্পূর্ণ পদটি হলো: [134]
Then the same day at evening, being the first day of the week, when the doors were shut where the disciples were assembled for fear of the Jews, came Jesus and stood in the midst, and saith unto them, Peace be unto you.
বাংলা অনুবাদ:
সেই দিন সন্ধ্যায়, সপ্তাহের প্রথম দিনে, শিষ্যরা যেখানে একত্র হয়েছিলেন সেখানকার দরজা ইহুদিদের ভয়ে বন্ধ ছিল। তখন যিশু এসে তাঁদের মধ্যে দাঁড়িয়ে বললেন: তোমাদের শান্তি হোক।
এই কাহিনিতে শান্তির বাক্য অলৌকিক আগমনের দৃশ্যেও ব্যবহৃত হয়েছে। পরিচিত মানবীয় অভিবাদন ধর্মীয় চরিত্রের মুখে বসে নতুন পবিত্র মর্যাদা পেয়েছে। ইসলামেও একই অর্থের আরবি অভিবাদন ধর্মীয় পরিচয়ের অংশ হয়েছে। ভাষা ও আচার ছড়িয়ে পড়ার জন্য প্রতিটি ক্ষেত্রে নতুন ফেরেশতার হস্তক্ষেপ কল্পনা করার প্রয়োজন হয় না। প্রতিবেশী সমাজ, শ্রুত কাহিনি, সামাজিক যোগাযোগ এবং একই ভাষাপরিবারের শব্দভাণ্ডার পরিচিত উপাদান বহন করে। ধর্মীয় সংস্কৃতির এই ধারাবাহিকতার মধ্যে ইসলামি অভিবাদনের অবস্থান সহজেই বোঝা যায়।
ইসলামে আত্তীকরণ (Syncretism)
ইসলামে শান্তির অভিবাদন একটি নির্দিষ্ট বিধি পেয়েছে। কোরআন অভিবাদনের উত্তরে আরও উত্তম বা সমপরিমাণ অভিবাদন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। সামাজিক সৌজন্যকে ধর্মীয় নির্দেশের মধ্যে আনার এই প্রক্রিয়ায় পরিচিত বাক্য একটি বাধ্যবাধকতার মর্যাদা পায়। পুরোনো সেমিটিক অভিবাদনের সঙ্গে আরবি সালামের ভাষাগত ও অর্থগত ধারাবাহিকতা আছে। এই পরিচিত সৌজন্য ইসলামে নির্দিষ্ট উত্তর, ধর্মীয় পুরস্কার এবং কার সঙ্গে কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তার নিয়ম পেয়েছে। সামাজিক আচারের ওপর ধর্মীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার এই প্রক্রিয়া সরাসরি অনুসরণ করা যায়। [135]
وَإِذَا حُيِّيتُم بِتَحِيَّةٍ فَحَيُّوا بِأَحْسَنَ مِنْهَا أَوْ رُدُّوهَا ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ حَسِيبًا
বাংলা অনুবাদ:
তোমাদের অভিবাদন জানানো হলে তার চেয়ে উত্তম অভিবাদন জানাও অথবা সমপরিমাণ ফিরিয়ে দাও। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছুর হিসাব গ্রহণকারী।
একই সঙ্গে হাদিসে ইহুদি ও খ্রিস্টানকে আগে সালাম না দেওয়ার নির্দেশ আছে। শান্তিকামনার একটি সাধারণ সামাজিক বাক্যকে এখানে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। [136]
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ” لاَ تَبْدَءُوا الْيَهُودَ وَلاَ النَّصَارَى بِالسَّلاَمِ فَإِذَا لَقِيتُمْ أَحَدَهُمْ فِي طَرِيقٍ فَاضْطَرُّوهُ إِلَى أَضْيَقِهِ ” .
বাংলা অনুবাদ:
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুল বলেছেন: তোমরা ইহুদি ও খ্রিস্টানকে আগে সালাম দেবে না। পথে তাদের কারও সঙ্গে দেখা হলে তাকে পথের সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশে যেতে বাধ্য করবে।
এই নির্দেশে শুধু অভিবাদনের ভাষা নেই; সামাজিক মর্যাদার অসম বণ্টনও আছে। একজন মানুষকে আগে শান্তি না জানানো এবং পথের সরু অংশে ঠেলে দেওয়ার কারণ তার ধর্মীয় পরিচয়। ফলে পারস্পরিক শুভেচ্ছার রীতি সম্প্রদায়গত শ্রেণিবিন্যাসের উপায় হয়ে ওঠে। পূর্ববর্তী ইহুদি-খ্রিস্টীয় পরম্পরার সঙ্গে অর্থগতভাবে যুক্ত শান্তির ভাষাই এখানে তাঁদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক বিধানের অধীন। এটি ধর্মীয় আত্তীকরণের একটি তীক্ষ্ণ উদাহরণ: পরিচিত সামাজিক আচরণ গ্রহণ করা হয়েছে, তার ওপর নতুন কর্তৃত্ব বসেছে এবং সেই কর্তৃত্ব ঠিক করেছে কারা পূর্ণ সৌজন্য পাওয়ার যোগ্য।
শান্তির অভিবাদনের মানবীয় মূল্য পারস্পরিক সম্মানে। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে সেই সম্মান আটকে দিলে ভাষার শান্তিকামনামূলক অর্থ এবং বিধানের বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে সংঘাত তৈরি হয়। একটি সাধারণ সামাজিক রীতিকে পবিত্র ঘোষণা করাই নৈতিক উন্নতি প্রমাণ করে না। তার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে কী সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে, কে সমান মর্যাদা পাচ্ছে এবং কে বঞ্চিত হচ্ছে, সেখানেই বিচার্য ফল পাওয়া যায়। ইসলামি সালামের ইতিহাসে পূর্ববর্তী ভাষাগত উত্তরাধিকার, ধর্মীয় বিধিবদ্ধকরণ এবং সম্প্রদায়ের সীমানা—তিনটি স্তরই স্পষ্ট।
প্রাচীন পৌত্তলিক প্রথা হজ্ব
কাবার তীর্থযাত্রা মুহাম্মদের প্রবর্তিত প্রথা নয়। ইসলামপূর্ব আরবের বিভিন্ন গোত্র সেখানে আসত, প্রদক্ষিণ করত, উৎসর্গ দিত এবং নিজেদের উপাস্যদের সঙ্গে সম্পর্কিত আচার পালন করত। মুহাম্মদ এই প্রতিষ্ঠিত তীর্থব্যবস্থার বড় অংশ গ্রহণ করেন এবং তার অনুমোদিত ধর্মীয় অর্থ ও কিছু নিয়ম বদলে দেন। কাবা, তীর্থের স্থান, যাতায়াতের পথ এবং পুনরাবৃত্ত দৈহিক ক্রিয়া বহাল থাকে; অন্য উপাস্যদের অনুমোদন প্রত্যাহার করে সেগুলো আল্লাহর নিদর্শন ও নবীর অনুসরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। যে ধর্ম অন্যের পাথর ও প্রতিমাকেন্দ্রিক আচারের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষা ব্যবহার করে, সেই ধর্মই একটি বিশেষ পাথর চুম্বন, ঘর প্রদক্ষিণ এবং নির্দিষ্ট স্থানে পাথর নিক্ষেপকে পবিত্র কর্তব্য করেছে। একটি বস্তুর সঙ্গে অতিপ্রাকৃত মর্যাদা জুড়ে দেওয়ার প্রশ্নে এই নির্বাচিত অনুমোদনের যুক্তিগত ভিত্তি কী, সেটিই মৌলিক সমস্যা।
হজে নারী ও পুরুষ একই তীর্থপরিসরে অংশ নেন। বুখারিতে মুহাম্মদের স্ত্রীদের পুরুষদের সঙ্গে একই সময়ে তাওয়াফের বিবরণ আছে; আয়িশা ভিড়ের মধ্যে তাঁদের সঙ্গে মিশতেন না বলেও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। পুরুষের ইহরামে বিশেষ পোশাকবিধি আছে, নারীর পোশাক তার অনুরূপ নয়। তীর্থে অংশগ্রহণ, পোশাক এবং ভিড়ের বিন্যাস ধর্মীয় নিয়মের পৃথক বিষয়। পূর্ববর্তী কাবার ভেতরে প্রতিমা ও ছবির উপস্থিতির বর্ণনার পাশে পরবর্তী ইসলামের প্রতিমাবিরোধী নির্দেশ রাখলে একটি ক্ষমতার রূপান্তর স্পষ্ট হয়: পুরোনো পবিত্র কেন্দ্রের মর্যাদা রাখা হয়েছে, কিন্তু তার দৃশ্যমান উপাস্য ও আচার ব্যাখ্যা করার অধিকার নতুন সম্প্রদায়ের হাতে গেছে। পশু উৎসর্গও আল্লাহর নামে কোরবানির কাঠামোয় ধর্মীয় মর্যাদা পেয়েছে। পরিচিত কর্মকে নতুন ঘোষণায় অনুমোদিত করা হয়েছে। [137] [138]
হজের সঙ্গে বাণিজ্যের সম্পর্ক পূর্ববর্তী সমাজের অর্থনীতিরও অংশ ছিল। যুল-মাজাজ ও উকাজের মতো বাজার তীর্থের মৌসুমে সক্রিয় থাকত। ইসলাম গ্রহণের পরে সেই ব্যবসা নিয়ে দ্বিধা দেখা দিলে ধর্মীয় অনুমোদনের মাধ্যমে তা বহাল হয়। তীর্থরক্ষা, পানির ব্যবস্থা, যাত্রীর সমাগম এবং বাজারের আয় পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ফলে হজকে ইসলামে অন্তর্ভুক্ত রাখার সামাজিক ফলের মধ্যে মক্কার কেন্দ্রীয়তা ও সংশ্লিষ্ট অর্থনীতির ধারাবাহিকতা সরাসরি পড়ে। [139]
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ ـ رضى الله عنهما ـ كَانَ ذُو الْمَجَازِ وَعُكَاظٌ مَتْجَرَ النَّاسِ فِي الْجَاهِلِيَّةِ، فَلَمَّا جَاءَ الإِسْلاَمُ كَأَنَّهُمْ كَرِهُوا ذَلِكَ حَتَّى نَزَلَتْ {لَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَنْ تَبْتَغُوا فَضْلاً مِنْ رَبِّكُمْ} فِي مَوَاسِمِ الْحَجِّ.
বাংলা অনুবাদ:
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত: যুল-মাজাজ ও উকাজ জাহেলি যুগে মানুষের ব্যবসার স্থান ছিল। ইসলাম আসার পরে তারা যেন এ ব্যবসা অপছন্দ করতে লাগল। তখন হজের মৌসুম সম্পর্কে অবতীর্ণ হলো: “তোমরা তোমাদের রবের অনুগ্রহ সন্ধান করলে তোমাদের কোনো দোষ নেই।”
এই বিবরণে পুরোনো বাজার বিলুপ্ত হয়নি; নতুন ধর্মীয় অনুমোদনের মধ্যে প্রবেশ করেছে। বাণিজ্যকে রবের অনুগ্রহ সন্ধান বলা হলে অর্থনৈতিক কাজটিও ধর্মীয় ভাষায় বৈধতা পায়। একই তীর্থ একসঙ্গে বিশ্বাসের কেন্দ্র, মানুষের সমাবেশ এবং সম্পদ প্রবাহের ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে। কোনো আচার বহাল রাখার ফলে কার সামাজিক ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সুবিধা টিকে থাকে, সেই প্রশ্ন তাই ধর্মীয় ইতিহাসের ভেতরেই আছে। মক্কার তীর্থব্যবস্থা ধরে রাখায় স্থানটির পুরোনো গুরুত্ব নতুন ইসলামী কর্তৃত্বের অধীনে পুনরুৎপাদিত হয়েছে।
আরাফাত ও মুযদালিফার ক্ষেত্রেও পুরোনো যাত্রাপদ্ধতি ও গোত্রীয় বিশেষাধিকারের নির্দিষ্ট ইতিহাস আছে। বুখারিতে কুরাইশ ও তাদের বংশধরদের হুমস বলা হয়েছে। তারা অন্যদের জন্য পোশাক সরবরাহ করত এবং সাধারণ মানুষের আরাফাতের যাত্রার বদলে মুযদালিফা থেকে ফিরত। পরে তাদেরও আরাফাত থেকে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হয়। [140]
قَالَ عُرْوَةُ كَانَ النَّاسُ يَطُوفُونَ فِي الْجَاهِلِيَّةِ عُرَاةً إِلاَّ الْحُمْسَ، وَالْحُمْسُ قُرَيْشٌ وَمَا وَلَدَتْ، وَكَانَتِ الْحُمْسُ يَحْتَسِبُونَ عَلَى النَّاسِ يُعْطِي الرَّجُلُ الرَّجُلَ الثِّيَابَ يَطُوفُ فِيهَا، وَتُعْطِي الْمَرْأَةُ الْمَرْأَةَ الثِّيَابَ تَطُوفُ فِيهَا، فَمَنْ لَمْ يُعْطِهِ الْحُمْسُ طَافَ بِالْبَيْتِ عُرْيَانًا، وَكَانَ يُفِيضُ جَمَاعَةُ النَّاسِ مِنْ عَرَفَاتٍ، وَيُفِيضُ الْحُمْسُ مِنْ جَمْعٍ. قَالَ وَأَخْبَرَنِي أَبِي عَنْ عَائِشَةَ ـ رضى الله عنها ـ أَنَّ هَذِهِ الآيَةَ نَزَلَتْ فِي الْحُمْسِ {ثُمَّ أَفِيضُوا مِنْ حَيْثُ أَفَاضَ النَّاسُ} قَالَ كَانُوا يُفِيضُونَ مِنْ جَمْعٍ فَدُفِعُوا إِلَى عَرَفَاتٍ.
বাংলা অনুবাদ:
উরওয়া বলেন: জাহেলি যুগে হুমস ছাড়া মানুষেরা উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ করত। হুমস ছিল কুরাইশ ও তাদের বংশধরেরা। হুমসরা মানুষের জন্য সওয়াবের কাজ হিসেবে পোশাক দিত; পুরুষ পুরুষকে এবং নারী নারীকে তাওয়াফের পোশাক দিত। যাকে হুমসরা পোশাক দিত না, সে উলঙ্গ হয়ে কাবা প্রদক্ষিণ করত। সাধারণ লোকেরা আরাফাত থেকে ফিরত, আর হুমসরা জাম্ অর্থাৎ মুযদালিফা থেকে ফিরত। উরওয়া বলেন: আমার বাবা আয়িশা থেকে আমাকে জানিয়েছেন, হুমসদের সম্পর্কে এই আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে: “তারপর সেখান থেকে ফিরে আসো, যেখান থেকে মানুষেরা ফিরে আসে।” তারা মুযদালিফা থেকে ফিরত; পরে তাদের আরাফাতে যেতে বলা হয়।
তীর্থের আচারে স্থান ও পোশাকের নিয়ন্ত্রণ গোত্রীয় মর্যাদা প্রকাশ করত। একটি গোষ্ঠী নিজেকে বিশেষ নিয়মের অধিকারী ভাবত এবং অন্যের পোশাক পাওয়ার সুযোগও তার ওপর নির্ভর করত। ইসলাম সেই প্রতিষ্ঠানের কিছু বিশেষাধিকার বদলেছে, কিন্তু তীর্থের ভৌগোলিক কাঠামো গ্রহণ করেছে। এই রূপান্তর একটি পূর্ববর্তী ব্যবস্থার ভেতরে বিধান পুনর্গঠনের ইতিহাস। আচারগুলো শূন্য থেকে তৈরি হওয়ার কোনো ছবি এই বিবরণে নেই; আছে আগে থেকে চলা যাত্রাকে নতুন নির্দেশে পরিচালিত করার ঘটনা।
মুযদালিফা থেকে যাত্রার সময়ও পরিবর্তনের একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টান্ত। সূর্য ওঠা পর্যন্ত অপেক্ষার বদলে তার আগে যাত্রা করা হয়, কিন্তু মুযদালিফায় অবস্থান ও সেখান থেকে ফেরার আচার বহাল থাকে। [141]
عَنْ عَمْرِو بْنِ مَيْمُونٍ، يَقُولُ شَهِدْتُ عُمَرَ ـ رضى الله عنه ـ صَلَّى بِجَمْعٍ الصُّبْحَ، ثُمَّ وَقَفَ فَقَالَ إِنَّ الْمُشْرِكِينَ كَانُوا لاَ يُفِيضُونَ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ، وَيَقُولُونَ أَشْرِقْ ثَبِيرُ. وَأَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم خَالَفَهُمْ، ثُمَّ أَفَاضَ قَبْلَ أَنْ تَطْلُعَ الشَّمْسُ.
বাংলা অনুবাদ:
আমর ইবনে মাইমুন বলেন: আমি উমরকে মুযদালিফায় ফজরের সালাত পড়তে দেখেছি। পরে তিনি দাঁড়িয়ে বললেন: মুশরিকরা সূর্য ওঠার আগে ফিরত না এবং বলত, হে সাবির, আলোকিত হও। নবী তাদের বিপরীত আচরণ করেছেন এবং সূর্য ওঠার আগেই যাত্রা করেছেন।
পরিবর্তিত সময়কে বিরোধীদের থেকে পৃথক হওয়ার চিহ্ন করা হয়েছে। পুরোনো স্থান ও যাত্রা রাখা হয়েছে, আর সূর্যোদয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত সময়টি বদলে নতুন অনুসরণের পরিচয় তৈরি হয়েছে। এমন নির্বাচন দেখায়, একটি প্রথার ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা শুধু তার শারীরিক রূপে নির্ধারিত হচ্ছে না। একই স্থানে একই যাত্রা নতুন নেতার অনুমোদনে শুদ্ধ আচার হয়ে উঠছে। কোন পুরোনো কাজ বহাল থাকবে এবং কোন অংশ বাতিল হবে, সেই সিদ্ধান্তের ওপর ধর্মীয় কর্তৃত্বের শক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।
সাতবার তাওয়াফ করা
কাবাকে ঘিরে সাতবার চলা এবং সাফা-মারওয়ার মধ্যে যাতায়াত দুটি আলাদা ক্রিয়া। উভয় ক্ষেত্রেই পবিত্র স্থান ও পুনরাবৃত্ত গতির সঙ্গে ধর্মীয় অর্থ জুড়ে দেওয়া হয়েছে। বুখারিতে মুহাম্মদের সাত চক্করের মধ্যে প্রথম তিন চক্করে দ্রুত পায়ে চলার বর্ণনা আছে। অন্য ধর্মে আগুন, স্তূপ বা পবিত্র বস্তুকে কেন্দ্র করে প্রদক্ষিণের আচারও পাওয়া যায়। মানুষের ধর্মীয় কল্পনায় একটি কেন্দ্রকে ঘিরে চলা আনুগত্য ও পবিত্রতার দৈহিক প্রকাশ হয়। কাবার ক্ষেত্রে সেই ক্রিয়াকে নির্দিষ্ট সংখ্যা ও অনুসরণযোগ্য পদ্ধতির অধীন করা হয়েছে। [142]
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২২/ হজ্ব (হাজ্জ)
পরিচ্ছেদঃ ১০৪০. সাফা ও মারওয়ার মাঝে সা’য়ী করা।
১৪৪৫। আহমদ ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) … ‘আসিম (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) কে বললাম, আপনার কি সাফা ও মারওয়া সা’য়ী করতে অপছন্দ করতেন? তিনি বললেন, হাঁ। কেননা তা ছিল জাহেলী যুগের নিদর্শন। অবশেষে মহান আল্লাহ অবতীর্ণ করেনঃ নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শন। কাজেই হাজ্জ (হজ্জ) বা ‘উমরাকারীদের জন্য এ দুইয়ের মধ্যে সা’য়ী করায় কোন দোষ নেই। (২ঃ ১৫৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আসিম আল আহওয়াল (রহঃ)

উলঙ্গ তাওয়াফের ইসলামপূর্ব পরিচয় সীরাতেও সংরক্ষিত। পরে ইসলামি ঘোষণায় উলঙ্গ তাওয়াফ এবং মুশরিকদের হজে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়। প্রদক্ষিণের আচার রাখা হয়, কিন্তু পোশাক ও অংশগ্রহণকারীর ধর্মীয় পরিচয় বদলে দেওয়া হয়। [143] [144]
হযরত সিদ্দীক আকবর (রা) কে হজ্জের আমীর নির্বাচন
৯ম হিজরীর যিলকা’দ মাসে নবী (সা) হযরত আবু বকর (রা)-কে হজ্জের আমীর নির্বাচন করে মক্কা মুকাররমা প্রেরণ করেন। মদীনা থেকে তিন’শ লোক এবং কুরবানীর জন্য বিশটি উট তাঁর সাথে প্রদান করেন, যাতে তিনি শরী’আতের বিধান অনুযায়ী লোকজনের হজ্জ আদায়ের ব্যবস্থা করতে পারেন এবং চুক্তি ভঙ্গ করার ব্যাপারে সূরা তাওবার যে চল্লিশ আয়াত নাযিল হয়েছে, তা ঘোষণা করবেন। আয়াতসমূহে এ বিষয়ে বর্ণনা ছিল যে, এ বছরের পর মুশরিকরা মসজিদে হারামে যেতে পারবে না এবং উলঙ্গ হয়ে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করতে পারবে না, যার সাথে নবী (সা) কোন চুক্তি করেছেন তা ঐ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পূর্ণ করা হবে। যাদের সাথে কোন চুক্তি করা হয়নি, তাদেরকে ‘ইয়াওমুন নাহর’ বা কুরবানীর দিন থেকে চার মাসের সুযোগ দেয়া হলো।

সাফা-মারওয়া সম্পর্কে আনাসের আপত্তির বিবরণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর কাছে আচারটি আগের ধর্মের নিদর্শন ছিল। পরে একই স্থানকে আল্লাহর নিদর্শন বলার ঘোষণায় সেই আপত্তি দূর করা হয়। স্থান দুটি সরেনি, যাতায়াতের মূল দৃশ্যও বদলায়নি; বদলেছে তার ধর্মীয় পরিচয় ও অনুমোদন। একটি পূর্বপরিচিত আচারের ওপর নতুন পবিত্র নাম বসিয়ে তাকে অনুসরণযোগ্য করার প্রক্রিয়া এখানে স্পষ্ট। আচারটির ইসলামপূর্ব অতীত চাপা দেওয়ার বদলে হাদিস নিজেই সেই অতীত উল্লেখ করে তার পুনরায় অনুমোদনের কথা বলেছে। [145]
বিভিন্ন ধর্মের প্রদক্ষিণচিত্রের পাশাপাশি তুলনা করলে পবিত্র কেন্দ্রকে ঘিরে গতির সাধারণ ধরনটি দেখা যায়। হিন্দু বিয়ের আগুনকেন্দ্রিক আচার এবং কাবার তাওয়াফের ধর্মীয় কাহিনি আলাদা, কিন্তু বস্তুকে কেন্দ্র করে আনুগত্য প্রকাশের শরীরী বিন্যাসে সাদৃশ্য আছে। একটি ক্ষেত্রে যাকে “কুসংস্কার” বলে বাতিল করা হয়, নিজের ধর্মে অনুরূপ আচারের পক্ষে কী প্রমাণ দেওয়া হচ্ছে, সেই প্রশ্নও একইভাবে ওঠে। সপ্তমবারের চক্করে এমন কোন পরীক্ষাযোগ্য নৈতিক বা প্রাকৃতিক পরিবর্তন ঘটে, যা ষষ্ঠ বা অষ্টমবারে ঘটে না, তার ব্যাখ্যার বদলে বিধানদাতার আদেশই চূড়ান্ত কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
উলঙ্গ তাওয়াফ বন্ধের ঘোষণায় একই সঙ্গে ধর্মীয় প্রবেশাধিকারও বদলে দেওয়া হয়েছিল। আবু বকরের হজের বছরে প্রচারিত নির্দেশের সম্পূর্ণ বক্তব্যে এই দুই নিষেধ পাশাপাশি আছে। [146]
أَنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ، قَالَ بَعَثَنِي أَبُو بَكْرٍ فِي تِلْكَ الْحَجَّةِ فِي مُؤَذِّنِينَ يَوْمَ النَّحْرِ نُؤَذِّنُ بِمِنًى أَنْ لاَ يَحُجَّ بَعْدَ الْعَامِ مُشْرِكٌ، وَلاَ يَطُوفَ بِالْبَيْتِ عُرْيَانٌ. قَالَ حُمَيْدُ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ ثُمَّ أَرْدَفَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَلِيًّا، فَأَمَرَهُ أَنْ يُؤَذِّنَ بِبَرَاءَةَ قَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ فَأَذَّنَ مَعَنَا عَلِيٌّ فِي أَهْلِ مِنًى يَوْمَ النَّحْرِ لاَ يَحُجُّ بَعْدَ الْعَامِ مُشْرِكٌ، وَلاَ يَطُوفُ بِالْبَيْتِ عُرْيَانٌ.
বাংলা অনুবাদ:
আবু হুরাইরা বলেন: ওই হজে আবু বকর আমাকে অন্য ঘোষকদের সঙ্গে পাঠান। কোরবানির দিনে মিনায় আমরা ঘোষণা করি, এ বছরের পরে কোনো মুশরিক হজ করবে না এবং কেউ উলঙ্গ হয়ে কাবা প্রদক্ষিণ করবে না। হুমাইদ ইবনে আবদুর রহমান বলেন: পরে রাসুল আলিকেও পাঠিয়ে বারা’আত ঘোষণা করতে বলেন। আবু হুরাইরা বলেন: আলি আমাদের সঙ্গে কোরবানির দিনে মিনার লোকদের মধ্যে ঘোষণা করেন, এ বছরের পরে কোনো মুশরিক হজ করবে না এবং কেউ উলঙ্গ হয়ে কাবা প্রদক্ষিণ করবে না।
এর ফলে আগের উপাসকদের কাছ থেকে একটি পবিত্র কেন্দ্রে অংশ নেওয়ার অধিকার সরিয়ে নেওয়া হয়। আচারটি থাকে, কিন্তু যে গোষ্ঠীর ইতিহাসে আচারটি চলত তারা নিজেদের পুরোনো বিশ্বাস নিয়ে সেখানে অংশ নিতে পারে না। পোশাকের পরিবর্তন এবং উপাসনাস্থলের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ একই নির্দেশে যুক্ত হয়েছে। নতুন ধর্ম শুধু পুরোনো রীতিকে ব্যাখ্যা করেনি; কারা তার বৈধ উত্তরাধিকারী বলে গণ্য হবে, সেই সামাজিক সীমানাও নির্ধারণ করেছে।
পৌত্তলিক প্রথায় ইহরাম বাঁধা
মানাতের নামে ইহরাম এবং সাফা-মারওয়ার সঙ্গে আগের উপাসকদের সম্পর্ক বুখারির দীর্ঘ বর্ণনাতেই আছে। ইহরাম একটি বিশেষ ধর্মীয় অবস্থায় প্রবেশ; কেবল সেলাইবিহীন কাপড়ের নাম নয়। কোন উপাস্যের নামে সেই অবস্থায় প্রবেশ করা হবে এবং কোন স্থান পবিত্র বলে মানা হবে, তা আগের আরব সমাজেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ইসলাম গ্রহণের পরে আগের আচার পালন করা যাবে কি না, সেই দ্বিধার উত্তর নতুন ঘোষণার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছে। বর্ণনাটিতে মানাতের অনুসারীদের দ্বিধার সমাধান হয়েছে মুহাম্মদের নির্দেশের মাধ্যমে। [147]
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২২/ হজ্ব (হাজ্জ)
পরিচ্ছেদঃ ১০৩৯. সাফা ও মারওয়ার মধ্যে সা’য়ী করা ওয়াজিব এবং একে আল্লাহর নিদর্শন বানানো হয়েছে
১৫৪১। আবূল ইয়ামান (রহঃ) … ‘উরওয়া (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ‘আয়িশা (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করলাম যে, মহান আল্লাহর এ বাণী সম্পর্কে আপনার অভিমত কি? (অনুবাদঃ) সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম। কাজেই যে কেউ কা’বাঘরে হাজ্জ (হজ্জ) বা ‘উমরা সম্পন্ন করে, এ দু’টির মাঝে যাতায়াত করলে তাঁর কোন দোষ নেই। (২ঃ ১৫৮) (আমার ধারনা যে,) সাফা-মারওয়ার মাঝে কেউ সা’য়ী না করলে তাঁর কোন দোষ নেই। তখন তিনি (‘আয়িশা (রাঃ)) বললেন, হে ভাতিজা! তুমি যা বললে, তা ঠিক নয়। কেননা, যা তুমি তাফসীর করলে, যদি আয়াতের মর্ম তাই হতো, তাহলে আয়াতের শব্দবিন্যাস এভাবে হতো لاَ جُنَاحَ عَلَيْهِ أَنْ لاَ يَتَطَوَّفَ بِهِمَا দুটোর মাঝে সা’য়ী না করায় কোন দোষ নেই!
কিন্তু আয়াতটি আনসারদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে, যারা ইসলাম গ্রহনের পূর্বে মুশাল্লাল নামক স্থানে স্থাপিত মানাত নামের মূর্তির পূজা করত, তাঁর নামেই তাঁরা ইহরাম বাঁধত। সে মূর্তির নামে যারা ইহরাম বাঁধত তাঁরা সাফা-মারওয়া সা’য়ী করাকে দোষ মনে করত। ইসলাম গ্রহণের পর তাঁরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! পূর্বে আমরা সাফা ও মারওয়া সা’য়ী করাকে দূষণীয় মনে করতাম (এখান কি করবো?) এ প্রসঙ্গেই আল্লাহ পাক (إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ) الآيَةَ অবতীর্ণ করেন।
‘আয়িশা (রাঃ) বলেন, (সাফা ও মারওয়ার মাঝে) উভয় পাহাড়ের মাঝে সা’য়ী করা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিধান দিয়েছেন। কাজেই কারো পক্ষে এ দু’য়ের সা’য়ী পরিত্যাগ করা ঠিক নয়। (রাবী বলেন) এ বছর আবূ বকর ইবনু ‘আবদুর রাহমান (রাঃ) কে ঘটনাটি জানোলাম। তখন তিনি বললেন, আমি তো এ কথা শুনিনি, তবে ‘আয়িশা (রাঃ) ব্যতীত বহু ‘আলিমকে উল্লেখ করতে শুনেছি যে, মানাতের নামে যারা ইহরাম বাঁধত তাঁরা সকলেই সাফা ও মারওয়া সা’য়ী করত, যখন আল্লাহ কুরআনে বায়তুল্লাহ তাওয়াফের কথা উল্লেখ করলেন, কিন্তু সাফা ও মারওয়ার আলোচনা তাতে হল না, তখন সাহাবাগন বলতে লাগলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা সাফা ও মারওয়া সা’য়ী করতাম, এখন দেখি আল্লাহ কেবল বায়তুল্লাহ তাওয়াফের কথা অবতীর্ণ করেছেন, সাফার উল্লেখ করেন নি। কাজেই সাফা ও মারওয়ার মাঝে সা’য়ী করলে আমাদের দোষ হবে কি? এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’য়ালা অবতীর্ণ করেন (إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ) الآيَةَ
আবূ বকর (রাঃ) আরো বলেন, আমি শুনতে পেয়েছি, আয়াতটি দু’ প্রকার লোকদের উভয়ের প্রতি লক্ষ্য করেই অবতীর্ণ হয়েছে, অর্থাৎ যারা জাহেলী যুগে সাফা ও মারওয়া সা’য়ী করা হতে বিরত থাকতেন, আর যারা তৎকালে সা’য়ী করত বটে, কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর সা’য়ী করার বিষয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তাঁদের দ্বিধার কারন ছিল আল্লাহ বায়তুল্লাহ তাওয়াফ নির্দেশ দিয়েছেন, কিন্তু সাফা ও মারওয়ার কথা উল্লেখ করেন নি? অবশেষে বায়তুল্লাহ তাওয়াফের কথা আলোচনা করার পর আল্লাহ সাফা ও মারওয়া সা’য়ী করার কথা উল্লেখ করেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উরওয়াহ (রহঃ)
উরওয়ার প্রশ্নের মধ্যে আয়াতের সাধারণ ভাষা এবং পরে প্রতিষ্ঠিত বাধ্যতামূলক বিধানের পার্থক্য আছে। “দোষ নেই” শুনে তিনি সাঈ না করলেও দোষ নেই বলে বুঝেছিলেন। আয়িশা আগের আচারগত পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে এই পাঠ প্রত্যাখ্যান করেন এবং মুহাম্মদের বিধানকে বাধ্যতামূলক মানার কথা বলেন। ফলে একটি আচারের কার্যকর আইন শুধু বাক্যের সরল অর্থে স্থির হচ্ছে না; অতীতের বর্ণনা ও নবীর অনুসরণ সেই অর্থ নির্ধারণ করছে। যে যাতায়াত আগে কারও কাছে পবিত্র কর্তব্য এবং কারও কাছে দূষণীয় ছিল, সেটিকেই পরে সবার জন্য বৈধ ও অপরিত্যাজ্য করা হয়েছে।
একই দীর্ঘ বর্ণনার মধ্যে আগের অনুসারীদের দুই ধরনের আচারের স্মৃতিও আছে। কেউ মানাতের কারণে সাফা-মারওয়া এড়িয়ে চলত, আবার অন্য সূত্রে পূর্বেই সেখানে যাতায়াতের কথা এসেছে। এই বৈচিত্র্য আরবের ধর্মীয় জীবনকে একটি একরকম নিয়মের ছবি বানাতে দেয় না। নতুন ধর্মের বিধিবদ্ধকরণ বিভিন্ন গোত্রের আচারকে একটি কেন্দ্রীয় নির্দেশে একত্র করেছে। আল্লাহর নিদর্শন ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় রীতির স্বতন্ত্র ব্যাখ্যার অধিকার সংকুচিত হয়েছে এবং মুহাম্মদের নির্দেশই কার্যকর মানদণ্ড হয়েছে।
ইহরামের ধর্মীয় অবস্থায় প্রবেশ করলে মানুষের পোশাক, যৌন আচরণ, চুল কাটা এবং দৈনন্দিন কাজের ওপর বিশেষ বিধিনিষেধ আসে। একটি যাত্রার নির্দিষ্ট পর্যায়কে স্বাভাবিক জীবনের বাইরে পবিত্র পরিসর হিসেবে স্থাপন করার এই পদ্ধতি প্রাচীন তীর্থব্যবস্থার পরিচিত কাঠামো। ইসলামে তার ধর্মীয় মালিকানা বদলে আল্লাহর নামে স্থির হয়েছে। উপাস্যের নাম বদলের সঙ্গে সেই অবস্থার সামাজিক শক্তিও নতুন নেতৃত্বের অধীনে যায়: কে প্রবেশের নিয়ম বলবেন, কখন বের হওয়া বৈধ হবে এবং কোন ভুলে প্রতিকার দিতে হবে, সবই বিধানদাতার কর্তৃত্বের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথর
হাজরে আসওয়াদ কাবার সঙ্গে যুক্ত একটি প্রাচীন কালো পাথর। একে ঘিরে উল্কাপিণ্ড হওয়ার অনুমানও প্রচলিত। মহাকাশের কোনো শিলাখণ্ড পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল পেরিয়ে মাটিতে পৌঁছালে তাকে উল্কাপিণ্ড বলা হয়; বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময়ে তার বাইরের অংশ গলে কালো আবরণ তৈরি হতে পারে। এই প্রাকৃতিক ঘটনার ব্যাখ্যা শিলার উপাদান, গঠন ও গতিপথ দিয়ে করা হয়। কোনো পাথর আকাশ থেকে এসেছে বলে অনুমান করা এবং তাকে জান্নাত থেকে অবতীর্ণ পবিত্র বস্তু ঘোষণা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি। প্রথমটি প্রাকৃতিক উৎসের প্রশ্ন, দ্বিতীয়টি ধর্মীয় কাহিনির দাবি। হাজরে আসওয়াদের ইসলামি মর্যাদা মূলত দ্বিতীয় দাবির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। হাদিসে তার জান্নাতি উৎস, রং পরিবর্তন, আলোকক্ষমতা এবং শেষবিচারে সাক্ষ্য দেওয়ার বিবরণ এসেছে। [148]


পবিত্র বস্তুর দৃশ্যমান আকৃতি এবং তাকে ঘিরে দৈহিক আচারের তুলনা অন্য ধর্মের ক্ষেত্রেও পাওয়া যায়। হাজরে আসওয়াদের বর্তমান রৌপ্যঘেরা অবয়ব কারও চোখে নারীজননাঙ্গের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ মনে হতে পারে। ভারতীয় লজ্জা গৌরীর প্রতিমায় জন্মদানের ভঙ্গি, উন্মুক্ত জননাঙ্গ এবং উর্বরতার প্রতীকী সম্পর্ক জাদুঘরের বিবরণেই স্পষ্ট। মেট্রোপলিটন মিউজিয়ামের ষষ্ঠ শতকের প্রতিমাটিকে উর্বরতার দেবীর রূপ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এখানে প্রাচীন ধর্মীয় কল্পনায় দেহ, জন্ম ও বস্তুর পবিত্রতার সম্পর্কের একটি তুলনামূলক ক্ষেত্র আছে। হাজরে আসওয়াদের নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার নিজস্ব কাবাকেন্দ্রিক আচারে—স্পর্শ, চুম্বন এবং পরকালীন সাক্ষ্যের প্রতিশ্রুতিতে। [149] [150]
মুহাম্মদের নবুওয়াতের আগের কাবা পুনর্নির্মাণের কাহিনিতে হাজরে আসওয়াদ স্থাপনের বিরোধ মেটানোর ঘটনা আছে। হিলফুল ফুজুলের অঙ্গীকার পৃথক ঘটনা। পাথরটির পূর্ববর্তী সামাজিক গুরুত্ব এবং মুহাম্মদের সঙ্গে তার সম্পর্ক সীরাতের সেই স্মৃতিতে সংরক্ষিত। নবুওয়াতের পরে তিনি পাথরটি স্পর্শ ও চুম্বনের আচার বহাল রাখেন এবং অনুসারীদের কাছে তা আদর্শ আচরণ হয়। ফলে আগের সমাজের পবিত্র বস্তু নতুন ধর্মেও কেন্দ্রীয় মর্যাদা পায়। প্রতিমা অপসারণের মধ্যে এই বস্তুটির সংরক্ষণ এবং তার বিশেষ ফজিলত ঘোষণার মাধ্যমে পবিত্রতার নতুন সীমানা তৈরি হয়েছে। পাথরকে ঘিরে মানুষের আবেগের ওপর পরকালীন পুরস্কার ও সাক্ষ্যের দাবিও যুক্ত হয়েছে। [151] [152]
সূনান তিরমিজী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৯/ হাজ্জ (হজ্জ)
পরিচ্ছেদঃ হাজরে আসওয়াদ রুকন ও মাকামে ইবরাহীমের ফযীলত।
৮৭৮. কুতায়বা (রহঃ) ……. ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হাজরে আসওয়াদ জান্নাত থেকে অবতীর্ন হয়েছিল তখন সেটি ছিল দুধ থেকেও শুভ্র। মানুষের গুণাহ- খাতা এটিকে এমন কালো করে দিয়েছে। – মিশকাত ২৫৭৭, তা’লীকুর রাগীব ২/১২৩, আল হাজ্জুল কাবীর, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ৮৭৭ (আল মাদানী প্রকাশনী)
এই বিষয়ে আবদুল্লাহ ইবনু আমর ও আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকেও হাদীস বর্ণিত আছে। ইমাম আবূ ঈসা (রহঃ) বলেন, ইবনু আব্বাস (রাঃ) বর্ণিত হাদীসটি হাসান-সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)
হাদীস সম্ভার
১০/ হজ্জ
পরিচ্ছেদঃ রুকনদ্বয়ের মাহাত্ম্য
(১১৬৪) আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট শুনেছি, তিনি বলেছেন, হাজরে আসওয়াদ ও মাকামে ইবরাহীম জান্নাতের পদ্মরাগরাজির দুই পদ্মরাগ। আল্লাহ এ দু’য়ের নূর (প্রভা) কে নিষ্প্রভ করে দিয়েছেন। যদি উভয়মণির প্রভাকে তিনি নিষ্প্রভ না করতেন, তাহলে উদয় ও অস্তাচল (দিগদিগন্ত) কে উভয়ে জ্যোতির্ময় করে রাখত।
(তিরমিযী ৮৭৮, সহীহুল জামে ১৬৩৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রাঃ)
হাদিসে এই পাথরকে শেষবিচারের দিনে চোখ ও জিহ্বা দিয়ে মানুষের পক্ষে সাক্ষ্যদানকারী করা হয়েছে। এতে একটি জড়বস্তু ধর্মীয় স্মৃতি ও বিচারিক ভূমিকা পায়। কে সত্যতার সঙ্গে তাকে স্পর্শ করেছে, সে বিষয়ে পাথর সাক্ষ্য দেবে—এই প্রতিশ্রুতি পাথর ছোঁয়া বা চুম্বনকে মানুষের পরকালীন স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করে। ফলে আচারটি শুধু ঐতিহাসিক স্মৃতির প্রতি সম্মান থাকে না; শেষবিচারের সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশাও তার সঙ্গে জড়ায়। অন্যের পবিত্র বস্তুর অলৌকিক ক্ষমতা প্রত্যাখ্যান করে নিজের পাথরকে এমন মর্যাদা দেওয়ার মধ্যে প্রমাণের এক অভিন্ন মানদণ্ড পাওয়া যায় না। [153] [154]
সুনান ইবনু মাজাহ
১৯/ হজ্জ
পরিচ্ছেদঃ ১৯/২৭. হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা
২/২৯৪৪। সাঈদ ইবনে জুবাইর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনে আব্বাস (রাঃ) কে বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন এই পাথরকে উপস্থিত করা হবে। তার দু‘টি চোখ থাকবে, তা দিয়ে সে দেখবে, যবান থাকবে তা দিয়ে সে কথা বলবে এবং সে এমন লোকের অনুকূলে সাক্ষ্য দিবে যে তাকে সত্যতার সাথে চুমা দিয়েছে।
তিরমিযী ৯৬১, আহমাদ ২২১৬, ২৩৯৪, ২৬৩৮, ২৭৯৩, ৩৫০১, দারেমী ১৮৩৯, মিশকাত ২৫৭৮, আত-তালীক আলা ইবনু খুযাইমাহ ২৭৩৫, ২৭৩৬।
তাহকীক আলবানীঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সা‘ঈদ ইবনু যুবায়র (রহঃ)
সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৭/ হাজ্জ
পরিচ্ছেদঃ ১১৩. হাজরে আসওয়াদ প্রসঙ্গে
৯৬১। ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাজরে আসওয়াদ প্রসঙ্গে বলেছেনঃ আল্লাহর শপথ! এই পাথরকে আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিন এমন অবস্থায় উঠাবেন যে, এর দুটি চোখ থাকবে যা দিয়ে সে দেখবে এবং একটি জিহ্বা থাকবে যা দিয়ে সে কথা বলবে। যে লোক সত্য হৃদয়ে একে পর্শ করবে তার সম্বন্ধে এই পাথর আল্লাহ্ তা’আলার নিকটে সাক্ষ্য দিবে।
— সহীহ, মিশকাত (২৫৭৮), তা’লীকুর রাগীব (২/১২২), তা’লীক আলা ইবনু খুযাইমা (২৭৩৫)
এই হাদীসটিকে আবূ ঈসা হাসান বলেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)
সুনান আদ-দারেমী
৫. হজ্জ অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ২৬. হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করার ফযীলত
১৮৭৬. ইবনু আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন এই পাথরকে আল্লাহ এমন অবস্থায় পুন:উত্থিত করবেন যে, এর দু‘টি চোখ থাকবে, যা দিয়ে সেটি দেখবে এবং একটি জিহবা থাকবে যা দিয়ে সেটি কথা বলবে এবং যে ব্যক্তি তাকে যথাযথভাবে চুম্বন করেছে, সেটি সেই লোকের পক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করবে।(1)
সালমান (তার বর্ণনায়) বলেন: যে ব্যক্তি তাকে চুম্বন করেছে, তার জন্য (অর্থাৎ ‘যথাযথভাবে’ শব্দটি ব্যতীত)।
(1) তাহক্বীক্ব: এর সনদ সহীহ।
তাখরীজ: [155]
আমরা এর পূর্ণ তাখরীজ দিয়েছি মুসনাদুল মাউসিলী নং ২৭১৯; সহীহ ইবনু হিব্বান নং ৩৭১১, ৩৭১২ ও মাওয়ারিদুয যাম’আন নং ১০০৫ তে।
এছাড়া, তাবারানী, আল কাবীর ১২/৬৩ নং ১২৪৭৯।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)
উমরের বক্তব্যে পাথরটিকে ক্ষতি বা উপকার করতে অক্ষম বলা হয়েছে, অথচ মুহাম্মদের অনুকরণে তিনি সেটি চুম্বন করছেন। কাজটির ভিত্তি হিসেবে এখানে পাথরের প্রমাণিত উপযোগিতা দেওয়া হয়নি; দেওয়া হয়েছে নবীর নজির। আগের বর্ণনাগুলোতে পরকালীন সাক্ষ্য ও বিশেষ মর্যাদার প্রতিশ্রুতি আছে, আর উমরের কথায় সাধারণ পাথরের ক্ষমতাহীনতা আছে। এই দুই ভাষার মধ্যে পাথরকেন্দ্রিক আচারের যুক্তিগত টানাপোড়েন স্পষ্ট। ব্যক্তিগত উপযোগিতার ব্যাখ্যা ছাড়াই একজনের কাজ অনুসরণযোগ্য কর্তব্য হয়ে যাচ্ছে, কারণ তিনি ধর্মীয় কর্তৃত্বের অধিকারী। [156]
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৬/ হাজ্জ
পরিচ্ছেদঃ ৩৭. তাওয়াফের সময় হাজারে আসওয়াদ চুম্বন করা মুস্তাহাব
২৯৩৯। খালফ ইবনু হিশাম, মুকাদ্দমী, আবূ কামিল ও কুতায়বা ইবনু সাঈদ (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু সারজিস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি টাক মাথাওয়ালা অর্থাৎ উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) কে কালো পাথর হাজারে আসওয়াদ চুমো দিতে দেখেছি এবং তিনি বলেছেন, আল্লাহর শপথ! আমি অবশ্যই তোমাকে চুন্বন করব এবং আমি অবশ্যই জানি যে, তুমি একটি পাথর, তুমি কারও ক্ষতিও করতে পার না এবং উপকারও করতে পার না। আমি যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তোমায় চুম্বন করতে না দেখতাম তবে আমি তোমায় চুম্বন করতাম না।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু সারজিস (রাঃ)
কালো হওয়ার ব্যাখ্যাতেও মানুষের নৈতিক অপরাধ এবং শিলার দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্যের মধ্যে অলৌকিক সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। গুনাহ কীভাবে একটি শিলার বর্ণ বদলায়, কোন অপরাধে কতটুকু পরিবর্তন হয় এবং সেই পরিবর্তন মাপার পদ্ধতি কী, তার কোনো বিবরণ নেই। দুধের চেয়েও সাদা পাথর মানুষের পাপে কালো হয়েছে—এই ঘোষণা নৈতিক ধারণাকে বস্তুগত রঙের কারণ বানিয়েছে। কোনো দাবি শিলার ওপর প্রভাবের কথা বললে তা বস্তুগত জগত সম্পর্কেও দাবি করে। কিন্তু এখানে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা ও পুনরুৎপাদনযোগ্য ফলের বদলে ধর্মীয় বর্ণনাই কারণ প্রতিষ্ঠা করছে।
রুকন ও মাকামের আলো নিষ্প্রভ করার কাহিনিতেও একই ধরনের বিন্যাস আছে। বস্তুতে বিরাট অলৌকিক বৈশিষ্ট্য আরোপ করা হয়, তারপর বলা হয় বর্তমান অবস্থায় তা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে যে বৈশিষ্ট্যের কারণে বস্তুটির বিশেষ মর্যাদা দাবি করা হচ্ছে, তার দৃশ্যমান অনুপস্থিতিও কাহিনির ভেতরেই ব্যাখ্যা হয়ে যায়। কোনো শিলা পূর্ব ও পশ্চিম আলোকিত করতে পারত—এমন দাবির পক্ষে বর্তমান শিলার পর্যবেক্ষণ সাক্ষ্য দেয় না। অদৃশ্য হয়ে যাওয়া শক্তির গল্প বিশ্বাসের পরিসর বাড়ায়, কিন্তু বস্তুটির অতিপ্রাকৃত পরিচয় যাচাইয়ের সুযোগ বাড়ায় না।
পাথর স্পর্শের সঙ্গে পাপমোচনের সম্পর্ক তিরমিজির আরেকটি পূর্ণ বর্ণনায় এসেছে। এখানে সাতবার প্রদক্ষিণ, দাসমুক্তির সমতুল্য পুরস্কার এবং প্রতিটি পদক্ষেপে গুনাহ কমার কথাও আছে। [157]
عَنْ ابْنِ عُبَيْدِ بْنِ عُمَيْرٍ، عَنْ أَبِيهِ، أَنَّ ابْنَ عُمَرَ، كَانَ يُزَاحِمُ عَلَى الرُّكْنَيْنِ زِحَامًا مَا رَأَيْتُ أَحَدًا مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم يَفْعَلُهُ . فَقُلْتُ يَا أَبَا عَبْدِ الرَّحْمَنِ إِنَّكَ تُزَاحِمُ عَلَى الرُّكْنَيْنِ زِحَامًا مَا رَأَيْتُ أَحَدًا مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم يُزَاحِمُ عَلَيْهِ . فَقَالَ إِنْ أَفْعَلْ فَإِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ ” إِنَّ مَسْحَهُمَا كَفَّارَةٌ لِلْخَطَايَا ” . وَسَمِعْتُهُ يَقُولُ ” مَنْ طَافَ بِهَذَا الْبَيْتِ أُسْبُوعًا فَأَحْصَاهُ كَانَ كَعِتْقِ رَقَبَةٍ ” . وَسَمِعْتُهُ يَقُولُ ” لاَ يَضَعُ قَدَمًا وَلاَ يَرْفَعُ أُخْرَى إِلاَّ حَطَّ اللَّهُ عَنْهُ بِهَا خَطِيئَةً وَكَتَبَ لَهُ بِهَا حَسَنَةً ” .
বাংলা অনুবাদ:
ইবনে উবাইদ ইবনে উমাইর তাঁর বাবা থেকে বর্ণনা করেন: ইবনে উমর দুটি রুকনের কাছে এমনভাবে ভিড় ঠেলে যেতেন, যা নবীর অন্য কোনো সাহাবিকে করতে দেখিনি। আমি বললাম, হে আবু আবদুর রহমান, আপনি রুকন দুটির কাছে এমনভাবে ভিড় ঠেলে যাচ্ছেন, যা অন্য কোনো সাহাবিকে করতে দেখিনি। তিনি বললেন: আমি তা করলে তার কারণ, আমি রাসুলকে বলতে শুনেছি, “এ দুটিকে স্পর্শ করা গুনাহের কাফফারা।” তাঁকে আরও বলতে শুনেছি, “যে এই ঘর সাতবার প্রদক্ষিণ করে সঠিকভাবে তার হিসাব রাখে, তা একজন দাস মুক্ত করার সমান।” তাঁকে আরও বলতে শুনেছি, “সে একটি পা রাখে না বা অন্য পা তোলে না, যার বিনিময়ে আল্লাহ তার একটি গুনাহ দূর করেন না এবং একটি নেকি লেখেন না।”
নৈতিক কাজের ফল সাধারণত মানুষের ক্ষতি কমানো, অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া কিংবা বাস্তব সহায়তার মধ্যে প্রকাশ পায়। এই বর্ণনায় একটি পাথর স্পর্শ এবং নির্দিষ্ট সংখ্যায় ঘোরার বিনিময়ে নৈতিক দায়ের হিসাব কমছে। দাসমুক্তির বাস্তব মানবিক ফলের সমতুল্য পুরস্কারও দেওয়া হচ্ছে প্রদক্ষিণের জন্য। ফলে উপকারভোগী মানুষের স্বাধীনতা এবং পবিত্র স্থানের আচার এক অদৃশ্য পুরস্কারের হিসাবে বিনিময়যোগ্য হয়ে যায়। এই পুরস্কারব্যবস্থা আচারের প্রতি প্রবল আকর্ষণ তৈরি করে; ইবনে উমরের ভিড় ঠেলে যাওয়ার বিবরণে সেই আকর্ষণের আচরণগত ফলও দেখা যায়। পাথরকেন্দ্রিক আচারকে অন্য ধর্মে অবৈধ এবং এখানে পাপমোচক বলার ভিত্তি শেষ পর্যন্ত একই কর্তৃত্বের নির্বাচিত অনুমোদন।
ওজুও ছিল পৌত্তলিক প্রথা
প্রার্থনার আগে পানি দিয়ে শুচিতা অর্জনের রীতি ইসলামের আগের সমাজেও ছিল। ইবনে কাসিরের বর্ণনায় আবদুল মুত্তালিব জমজমের জন্য দুটি জলাধার করেন—একটি পান করার, অন্যটি ওজু বা ধৌতকরণের জন্য। তিনি সেখানে গোসলের অনুমতি না দেওয়ার কথাও বলেন। পান, ধোয়া এবং পূর্ণস্নানের মধ্যে ধর্মীয় স্থানের ব্যবহারভিত্তিক বিভাজন ছিল। ফলে কাবার পবিত্রতার সঙ্গে পানি ও শরীর ধোয়ার সম্পর্ক মুহাম্মদের বিধান ঘোষণার আগের সমাজেই স্থাপিত। [158] [159]
আব্দুল মুত্তালিব থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছেন: “হে আল্লাহ! এই যমযমের পানি আমি গোসলকারীর জন্য হালাল মনে করি না। যমযমের পানি পানকারীর জন্য বৈধ।” কেউ কেউ এ উক্তিটি আব্বাস (রা)-এর বলে মত প্রকাশ করলেও বিশুদ্ধ মতে এটি আবদুল মুত্তালিবেরই উক্তি। কেননা তিনিই এটি পুনঃ খনন করেছিলেন।
উমাবী তাঁর মাগাযীতে বর্ণনা করেছেন যে, আবু উবায়দ ইয়াহইয়া ইব্ন সাঈদ ও আব্দুর রহমান ইবন হারমালাহ সূত্রে বর্ণনা করেছেন। আব্দুর রহমান ইবন হারমালা বলেন, আমি সাঈদ ইব্ন মুসায়্যাবকে বলতে শুনেছি যে, আব্দুল মুত্তালিব ইবন হাশিম যখন যমযম খনন করলেন তখন বলেছিলেন, “এই কূপ গোসলকারীর জন্য হালাল নয়, এটি কেবল পানকারীর জন্যই বৈধ।” তিনি যমযম কূপে দু’টি হাউজ তৈরি করে দিয়েছিলেন। একটি পান করার জন্য অপরটি ওজু করার জন্য। তখন তিনি বলেছিলেন, একে আমি গোসলের জন্য ব্যবহারের অনুমতি দেবে না। তাঁর উদ্দেশ্যে ছিল মসজিদকে পবিত্র রাখা।
আবু উবায়দ অন্য এক সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, আসিম ইব্ন আবুন্নাজদ আব্বাস (রা)-কে বলতে শুনেছেন, আমি একে গোসলকারীর জন্য হালাল করব না। এটি পানকারীর জন্য বৈধ। আব্দুর রহমান ইব্ন মাহ্দী সুফিয়ান ও আব্দুর রহমান ইব্ন আলাকামা সূত্রেও ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে অনুরূপ বর্ণিত আছে।
মূলত যমযমের পানি দ্বারা গোসল করা নিষিদ্ধ নয়। কিন্তু আব্দুল মুত্তালিব ও আব্বাস (রা) এ কাজ থেকে মানুষকে নিরুৎসাহিত করার জন্য এমনটি বলেছিলেন বলে মনে হয়।
উল্লেখ্য যে, আব্দুল মুত্তালিব যতদিন বেঁচে ছিলেন, ততদিন পর্যন্ত তিনিই যমযমের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর মৃত্যুর পর সেই দায়িত্ব পুত্র আবু তালিবের উপর ন্যাস্ত হয়।

আবদুল মুত্তালিবের দুটি জলাধারের বিবরণটি মূল আরবিতে আছে। পানি ব্যবহারের ধরন এবং পবিত্র স্থানে গোসলের নিষেধাজ্ঞা একই অনুচ্ছেদে সংরক্ষিত। [160]
وقد قال الأموي في مغازيه: حدثنا أبو عبيد، أخبرني يحيى بن سعيد، عن عبد الرحمن بن حرملة سمعت سعيد بن المسيب يحدث أن عبد المطلب بن هاشم حين احتفر زمزم قال: لا أحلها لمغتسل، وهي لشارب حل وبل. وذلك أنه جعل لها حوضين: حوضا للشرب، وحوضا للوضوء، فعند ذلك قال: لا أحلها لمغتسل لينزه المسجد عن أن يغتسل فيه.
বাংলা অনুবাদ:
উমাবি তাঁর মাগাজিতে বলেছেন: আবু উবাইদ আমাদের বলেছেন, ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আবদুর রহমান ইবনে হারমালার মাধ্যমে জানিয়েছেন: আমি সাঈদ ইবনে মুসাইয়িবকে বলতে শুনেছি, আবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশিম জমজম খনন করে বলেন, গোসলকারীর জন্য আমি তা অনুমোদন করছি না; পানকারীর জন্য তা অনুমোদিত ও উন্মুক্ত। তিনি তার জন্য দুটি জলাধার করেছিলেন—একটি পান করার এবং অন্যটি ওজুর জন্য। মসজিদে গোসল করা থেকে তা মুক্ত রাখার জন্যই তখন তিনি বলেন, গোসলকারীর জন্য আমি তা অনুমোদন করছি না।
পানি দিয়ে শরীর পরিষ্কার করা এবং কোনো আচার পালনের জন্য নিজেকে ধর্মীয়ভাবে শুদ্ধ করা এক কাজের ভেতরে ভিন্ন উদ্দেশ্য পেতে পারে। প্রথমটির ফল শরীরের ময়লা সরানো; দ্বিতীয়টিতে পবিত্র-অপবিত্র অবস্থার বিধান কার্যকর হয়। ধর্মীয় শুদ্ধতার শর্ত নির্ধারণকারী ব্যক্তি ঠিক করেন কোন ধোয়া যথেষ্ট, কোন অবস্থায় আবার ধুতে হবে এবং কার পানি ব্যবহারের অধিকার আছে। জমজমের জলাধারের বর্ণনায় এই নিয়ন্ত্রণের পূর্ববর্তী সামাজিক রূপটি আছে। ইসলামের ওজুবিধান সেই অঞ্চলকে পরিচ্ছন্নতার ধারণা প্রথম শেখায়নি; পরিচিত পানি-শুচিতার আচারের ওপর নির্দিষ্ট অঙ্গ, ক্রম ও ইবাদতের যোগসূত্রের বিধান স্থাপন করেছে।
ইসলামের আগের বাইবেলীয় উপাসনাতেও হাত-পা ধুয়ে ধর্মীয় কাজে প্রবেশের নির্দেশ পাওয়া যায়। নির্গমন গ্রন্থে মূসা, হারুন ও তাঁর পুত্রদের জন্য পানির পাত্র এবং উপাসনার আগে হাত-পা ধোয়ার কথা আছে। প্রার্থনার আগে দেহ ধোয়ার সঙ্গে পবিত্র স্থানের প্রবেশাধিকার যুক্ত করার এই নীতি একটি বহু পুরোনো ধর্মীয় বিন্যাস। মানুষ পানি দিয়ে পরিষ্কার হয়—এই সাধারণ ঘটনাকে ঐশী অনুমোদন ও আচারগত যোগ্যতার শর্তে রূপ দেওয়া হয়েছে। [161]
30. And he set the laver between the tent of the congregation and the altar, and put water there, to wash withal.
31. And Moses and Aaron and his sons washed their hands and their feet thereat:
32. When they went into the tent of the congregation, and when they came near unto the altar, they washed; as the Lord commanded Moses.
বাংলা অনুবাদ:
৩০. তিনি সমাবেশের তাঁবু ও বেদির মাঝখানে ধোয়ার পাত্রটি রাখলেন এবং ধোয়ার জন্য তাতে পানি দিলেন।
৩১. মূসা, হারুন এবং তাঁর পুত্ররা সেখানে নিজেদের হাত ও পা ধুতেন।
৩২. তাঁরা সমাবেশের তাঁবুতে প্রবেশের সময়ে এবং বেদির কাছে যাওয়ার সময়ে ধুতেন, যেমন প্রভু মূসাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন।
ধোয়ার এই নিয়মের মধ্যে ধর্মীয় কর্মীর শরীর এবং পবিত্র স্থানের সম্পর্ক নির্ধারিত হয়েছে। মন্দিরে কাজ করার আগে কোন প্রস্তুতি প্রয়োজন, তার কর্তৃত্ব ধর্মগ্রন্থের নির্দেশে স্থির। ইসলামের ওজুর ক্ষেত্রেও পরিচ্ছন্নতা একটি বিধিবদ্ধ উপাসনাযোগ্য অবস্থার সঙ্গে যুক্ত। মানুষের শরীর, পানি এবং পবিত্রতার এই পুরোনো সম্পর্ককে নতুন করে বাধ্যতামূলক করা ধর্মীয় ইতিহাসের ধারাবাহিক ঘটনা; পরিচ্ছন্নতার ধারণাটিকে ইসলামের একক উদ্ভাবন বলা সেই ইতিহাসকে বিকৃত করে।
নামাজ/সালাতও ছিল পৌত্তলিক প্রথা
নম্র হয়ে দাঁড়ানো, হাত তুলে প্রার্থনা, নতজানু হওয়া এবং মাটিতে মাথা রাখা ইসলামের আগের ধর্মীয় জীবনেও ছিল। এই ভঙ্গিগুলো মানুষের শাসক, দেবতা বা পবিত্র সত্তার সামনে অধীনতা প্রকাশ করে। ইসলাম সেগুলোকে নির্দিষ্ট উচ্চারণ, সময়, অঙ্গভঙ্গি ও ক্রমের অধীনে সংগঠিত করেছে। ইসলামি সালাতের দৈহিক প্রকাশের একটি দীর্ঘ প্রাক্-ইসলামি ইতিহাস আছে। পূর্ববর্তী সভ্যতার প্রার্থনাচিত্র এবং ধর্মীয় পাঠে একই ধরনের দেহভাষা পাওয়া যায়। নিচের ভিডিওতে সেই ভঙ্গিগত তুলনার উপাদান আছে।
প্রাচীন প্রার্থনার চিত্রে হাত তোলা, নতজানু হওয়া ও শরীর নিচু করার ভঙ্গি দেখা যায়। উপাসনার দৃশ্যমান শরীরী ভাষা সভ্যতার সীমানা পেরিয়ে পুনরাবৃত্ত হয়েছে। এমন চিত্র পবিত্র সত্তার সামনে মানুষের অধীনতার পুরোনো প্রকাশরীতিকে সামনে আনে।

মেসোপটেমীয় প্রার্থনাচিত্রের এই তুলনাতেও মানুষের পরিচিত শরীরী আচারের মধ্যে ধর্মীয় আনুগত্য প্রকাশিত হয়েছে। হাতের অবস্থান, নত শরীর ও পবিত্র কেন্দ্রের দিকে মনোযোগ একই দৃশ্যের অংশ। পরবর্তী ধর্ম সেই দেহভাষাকে নিজের বিধানের ভেতরে নিয়ে নির্দিষ্ট অর্থ ও মর্যাদা দিতে পারে।

উমরের হত্যাকাণ্ডসংক্রান্ত বুখারির দীর্ঘ বর্ণনায় মদিনায় আনা বন্দী ও দাসদের প্রসঙ্গ আছে। ঘাতক তখন আত্মহত্যা করেছে; পরে ইবনে আব্বাস অন্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব করলে উমর বহুবচনে বলেন, তারা মুসলিমদের ভাষায় কথা বলে, তাদের কিবলামুখী সালাত আদায় করে এবং হজ করে। এই কথোপকথনের বিষয় একটি জনসমষ্টির ধর্মীয় ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি। উমরের আমলের মদিনায় নতুন জনগোষ্ঠী আরবি ভাষা ও প্রাতিষ্ঠানিক আচারে অংশ নিতে শুরু করেছিল। সালাত ও হজ সেই অংশগ্রহণের প্রকাশ্য চিহ্ন হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় উমর তাদের বিরুদ্ধে নির্বিচার ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। [162] [163]
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫০/ আম্বিয়া কিরাম (আঃ)
পরিচ্ছেদঃ ২০৮৭. উসমান ইবন আফফান (রাঃ) এর প্রতি বায়’আত ও তার উপর (জনগনের) ঐক্যমত হওয়ার ঘটনা এবং এতে উমর ইবন খাত্তাব (রাঃ) এর শাহাদাতের বর্ণনা
৩৪৩৫। মূসা ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) … আমর ইবনু মায়মূন (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) কে আহত হওয়ার কিছুদিন পূর্বে মদিনায় দেখেছি যে তিনি হুযায়ফা ইবনু ইয়ামান (রাঃ) ও উসমান ইবনু হুনায়ফ এর নিকট দাঁড়িয়ে তাঁদেরকে লক্ষ্য করে বলেছেন, (ইরাক বাসীর উপর কর ধার্যের ব্যাপারে) তোমরা এটা কী করলে? তোমরা কী আশঙ্কা করছ যে তোমরা ইরাক ভূমির উপর যে কর ধার্য করেছ তা বহনে ঐ ভূখন্ড অক্ষম? তারা বললেন, আমরা যে পরিমাণ কর ধার্য করেছি, ঐ ভূখন্ড তা বহনে সক্ষম। এতে অতিরিক্ত কোন বোঝা চাপান হয়নি। তখন উমর (রাঃ) বললেন, তোমরা পুনঃচিন্তা করে দেখ যে তোমরা এ ভূখন্ডের উপর যে কর আরোপ করেছ তা বহনে সক্ষম নয়? বর্ণনাকারী বলেন, তাঁরা বললেন, না (সাধ্যাতীত কর আরোপ করা হয় নি) এরপর উমর (রাঃ) বললেন, আল্লাহ যদি আমাকে সুস্থ রাখেন তবে ইরাকের বিধবাগণকে এমন অবস্থায় রেখে যাব যে তারা আমার পরে কখনো অন্য কারো মুখাপেক্ষী না হয়।
বর্ণনাকারী বলেন, এরপর চতুর্থ দিন তিনি (ঘাতকের আঘাতে) আহত হলেন। যেদিন প্রত্যুষে তিনি আহত হন, আমি তাঁর কাছে দাঁড়িয়েছিলাম এবং তাঁর ও আমার মাঝে আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) ব্যতীত অন্য কেউ ছিল না। উমর (রাঃ) (সালাত (নামায/নামাজ) শুরু করার প্রাক্কালে) দু’কাতারের মধ্যে দিয়ে চলার সময় বলতেন, কাতার সোজা করে নাও। যখন দেখতেন কাতারে কোন ত্রুটি নেই তখন তাকবীর বলতেন। তিনি অধিকাংশ সময় সূরা ইউসূফ, সূরা নাহল অথবা এ ধরনের (দীর্ঘ) সূরা (ফজরের) প্রথম রাক’আতে তিলাওয়াত করতেন, যেন অধিক পরিমাণে লোক প্রথম রাকআতে শরীক হতে পারেন। (সেদিন) তাকবীর বলার পরেই আমি তাঁকে বলতে শুনলাম, একটি কুকুর আমাকে আঘাত করেছে অথবা বললেন, আমাকে আক্রমণ করেছে। ঘাতক “ইলজ” দ্রুত পলায়নের সময় দু’ধারী খঞ্জর দিয়ে ডানে বামে আঘাত করে চলছে। এভাবে তেরো জনকে আহত করল। এদের মধ্যে সাতজন শহীদ হলেন।
এ অবস্থা দৃষ্টে এক মুসলিম তার লম্বা চাঁদরটি ঘাতকের উপর ফেলে দিলেন। ঘাতক যখন বুঝতে পারল সে ধরা পড়ে যাবে তখন সে আত্মহত্যা করল। উমর (রাঃ) আবদুর রহমান ইবনু আউফ (রাঃ) এর হাত ধরে আগে এগিয়ে দিলেন। উমর (রাঃ) এর নিকটবর্তী যারা ছিল শুধুমাত্র তারাই ব্যপারটি দেখতে পেল। আর মসজিদের প্রান্তে যারা ছিল তারা ব্যাপারটি এর বেশী বুঝতে পারল না যে উমর (রাঃ) এর কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে না। তাই তারা ‘সুবহানাল্লাহ সুবহানাল্লাহ’ বলতে লাগলেন। আবদুর রহমান ইবনু আউফ (রাঃ) তাঁদেরকে নিয়ে সংক্ষেপে সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলেন। যখন মুসল্লীগণ চলে গেলেন, তখন উমর (রাঃ) বললেন, হে ইবনু আব্বাস (রাঃ) দেখ তো কে আমাকে আঘাত করল। তিনি কিছুক্ষণ অনুসন্ধান করে এসে বললেন, মুগীরা ইবনু শো’বা (রাঃ) এর গোলাম (আবূ লুলু)। উমর (রাঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, ঐ কারীগর গোলামটি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। উমর (রাঃ) বললেন, আল্লাহ তার সর্বনাশ করুন। আমি তার সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত দিয়েছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমার মৃত্যু ইসলামের দাবীদার কোন ব্যাক্তির হাতে ঘটান নি। হে ইবনু আব্বাস (রাঃ) তুমি এবং তোমার পিতা মদিনায় কাফির গোলামের সংখ্যা বৃদ্ধি পছন্দ করতে। আব্বাস (রাঃ) এর নিকট অনেক অমুসলিম গোলাম ছিল।
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বললেন, যদি আপনি চান তবে আমি কাজ করে ফেলি অর্থাৎ আমি তাদেরকে হত্যা করে ফেলি। উমর (রাঃ) বললেন, তুমি ভুল বলছ। (তুমি তা করতে পার না) কেননা তারা তোমাদের ভাষায় কথা বলে তোমাদের কেবলামুখী হয়ে সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করে, তোমাদের ন্যায় হাজ্জ (হজ্জ) করে। তারপর তাঁকে তাঁর ঘরে নেয়া হল। আমরা তাঁর সাথে চললাম। মানুষের অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছিল, ইতিপূর্বে তাদের উপর এতবড় মুসীবত আর আসেনি। কেউ কেউ বলছিলেন, ভয়ের কিছু নেই। আবার কেউ বলছিলেন, আমি তাঁর সম্পর্কে আশংকাবোধ করছি। তারপর খেজুরের শরবত আনা হল তিনি তা পান করলেন। কিন্তু তা তার পেট থেকে বেরিয়ে পড়ল। এরপর দুধ আনা হল, তিনি তা পান করলেন; তাও তার পেট থেকে বেরিয়ে পড়ল। তখন সকলই বুঝতে পারলেন, মৃত্যু তাঁর অবশ্যম্ভাবী। আমরা তাঁর নিকট উপস্থিত হলাম। অন্যান্য লোকজনও আসতে শুরু করল। সকলেই তার প্রশংসা করতে লাগল।
তখন যুবক বয়সী একটি লোক এসে বলল, হে আমীরুল মু’মিনীন। আপনার জন্য আল্লাহর সু-সংবাদ রয়েছে; আপনি তা গ্রহণ করুন। আপনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহচর্য গ্রহণ করেছেন, ইসলামের প্রাথমিক যুগেই আপনি তা গ্রহণ করেছেন, যে সম্পর্কে আপনি নিজেই অবগত আছেন তারপর আপনি খলীফা হয়ে ন্যায বিচার করেছেন। তারপর আপনি শাহাদাত লাভ করেছেন। উমর (রাঃ) বললেন, আমি পছন্দ করি যে তা আমার জন্য ক্ষতিকর বা লাভজনক না হয়ে সমান হয়ে যাক। যখন যুবকটি চলে যেতে উদ্যত হল তখন তার (পরিহিত) লঙ্গিটি মাটি ছুঁয়ে যাচ্ছিল। (এ দেখে) উমর (রাঃ) বললেন, যুবকটিকে আমার নিকট ডেকে আন। (ছেলেটি আসল) তিনি বললেন- হে ভাতিজা, তোমার কাপড়টি উঠিয়ে নাও। এটা তোমার কাপড়ের পরিচ্ছিন্নতার উপর এবং তোমার রবের নিকটও পছন্দনীয়।
(তারপর তিনি বললেন) হে আবদুল্লাহ ইবনু উমর তুমি হিসাব করে দেখ আমার ঋণের পরিমাণ কত। তাঁরা হিসাব করে দেখতে পেলেন ছিয়াশি হাজার (দিরহাম) বা এর কাছাকাছি। তিনি বললেন, যদি উমরের পরিবার পরিজনের মাল দ্বারা তা পরিশোধ হয়ে যায়, তবে তা দিয়ে পরিশোধ করে দাও। অন্যথায় আদি ইবনু কা’ব এর বংশধরদের নিকট থেকে সাহায্য গ্রহণ কর। তাদের মাল দিয়েও যদি ঋণ পরিশোধ না হয় তবে কুরাইশ কবিলা থেকে সাহায্য গ্রহণ করবে এর বাহিরে কারো সাহায্য গ্রহণ করবে না। আমার পক্ষ থেকে তাড়াতাড়ি ঋণ আদায় করে দাও। উম্মূল মু’মিনীন আয়িশা (রাঃ) এর খেদমতে তুমি যাও এবং বল উমর আপনাকে সালাম পাঠিয়েছে। আমীরুল মু’মিনীন, শব্দটি বলবে না। কেননা এখন আমি মু’মিনগণের আমীর নই। তাঁকে বল উমর ইবনু খাত্তাব তাঁর সাথীদ্বয়ের পাশে দাফন হওয়ার অনুমতি চাচ্ছেন।
ইবনু উমর (রাঃ) আয়িশা (রাঃ) এর খেদমতে গিয়ে সালাম জানিয়ে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। তিনি বললেন, প্রবেশ কর, তিনি দেখলেন, আয়িশা (রাঃ) বসে বসে কাঁদছেন। তিনি গিয়ে বললেন, উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) আপনাকে সালাম পাঠিয়েছেন এবং তাঁর সাথীদ্বয়ের পাশে দাফন হওয়ার অনুমতি চেয়েছেন। আয়িশা (রাঃ) বললেন, তা আমার আকাঙ্ক্ষা ছিল। কিন্তু আজ আমি এ ব্যপারে আমার উপরে তাঁকে অগ্রাধিকার প্রদান করছি। আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) যখন ফিরে আসছেন তখন বলা হল- এই যে আবদুল্লাহ ফিরে আসছে। তিনি বললেন আমাকে উঠিয়ে বসাও। তখন এক ব্যাক্তি তাকে ঠেস দিয়ে বসিয়ে ধরে রাখলেন। উমর (রাঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, কি সংবাদ? তিনি বললেন, আমীরুল মু’মিনীন, আপনি যা আকাঙ্ক্ষা করেছেন, তাই হয়েছে, তিনি অনুমতি দিয়েছেন। উমর (রাঃ) বললেন, আলহামদুল্লিাহ। এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয় আমার নিকট ছিল না। যখন আমার ওফাত হয়ে যাবে তখন আমাকে উঠিয়ে নিয়ে, তাঁকে (আয়িশা (রাঃ) আমার সালাম জানিয়ে বলবে, উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) আপনার অনুমতি চাচ্ছেন। যদি তিনি অনুমতি দেন, তবে আমাকে প্রবেশ করাবে আর যদি তিনি অনুমতি না দেন তবে আমাকে সাধারণ মুসলিমদের গোরস্থানে নিয়ে যাবে।
এ সময় উম্মূল মু’মিনীন হাফসা (রাঃ) কে কতিপয় মহিলাসহ আসতে দেখে আমরা উঠে পড়লাম। হাফসা (রাঃ) তাঁর কাছে গিয়ে কিছুক্ষণ কাঁদলেন। তারপর পুরুষগণ এসে প্রবেশের অনুমতি চাইলে, তিনি ঘরের ভিতর চলে (গেলেন) ঘরের ভেতর হতেও আমরা তাঁর কান্নার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। তাঁরা (সাহাবীগণ) বললেন, হে আমীরুল মু’মিনীন, আপনি ওয়াসিয়াত করুন এবং খলীফা মনোনীত করুন। উমর (রাঃ) বললেন, খিলাফতের জন্য এ কয়েকজন ব্যতীত অন্য কাউকে আমি যোগ্য পাচ্ছিনা, যাঁদের প্রতি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ইন্তেকালের সময় রাযী ও খুশী ছিলেন। তারপর তিনি তাদের নাম বললেন, আলী, উসমান, যুবায়র, তালহা, সা’স ও আবদুর রহমান ইবনু আউফ (রাঃ) এবং বললেন, আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) তোমাদের সাথে থাকবে। কিন্তু সে খিলাফত লাভ করতে পারবে না। তা ছিল শুধু সান্তনা হিসাবে।
যদি খিলাফতের দায়িত্ব সা’দের (রাঃ) উপর ন্যাস্ত করা হয় তবে তিনি এর জন্য যোগ্যতম ব্যাক্তি। এর যদি তোমাদের মধ্যে অন্য কেউ খলীফা নির্বাচিত হন তবে তিনি যেন সর্ব বিষয়ে সা‘দের সাহায্য ও পরামর্শ গ্রহণ করেন। আমি তাঁকে (কুফার গভর্নরের পদ থেকে) অযোগ্যতা বা খিয়ানতের কারণে অপসারণ করি না। আমার পরে (নির্বাচিত) খলীফাকে আমি ওয়াসিয়াত করছি, তিনি যেন প্রথম যুগের মুহাজিরগণের হক সম্পর্কে সচেতন থাকেন, তাদের মান-সম্মান রক্ষায় সচেষ্ট থাকেন। এবং আমি তাঁকে আনসার সাহাবীগণের যাঁরা মুহাজিরগণের আগমনের পূর্বে এই নগরীতে (মদিনায়) বসবাস করে আসছিলেন এবং ঈমান এনেছেন, তাঁদের প্রতি সদ্ব্যবহার করার ওয়াসিয়াত করছি যে তাঁদের মধ্যে নেককারগণের ওযর আপত্তি যেন গ্রহণ করা হয় এবং তাঁদের মধ্যে কারোর ভুলত্রুটি হলে তা যেন ক্ষমা করে দেয়া হয়।
আমি তাঁকে এ ওয়াসিয়াতও করছি যে, তিনি যেন রাজ্যের বিভিন্ন শহরের আধিবাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করেন। কেননা তাঁরাও ইসলামের হেফাযতকারী। এবং তারাই ধন-সম্পদের যোগানদাতা। তারাই শত্রুদের চোখের কাঁটা। তাদের থেকে তাদের সন্তুষ্টির ভিত্তিতে কেবলমাত্র তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ যাকাত আদায় করা হয়। আমি তাঁকে পল্লীবাসীদের সহিত সদ্ব্যবহার করারও ওসিয়ত করছি। কেননা তাঁরাই আরবের ভিত্তি এবং ইসলামের মূল শক্তি। তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ এনে তাদের দরিদ্রদের মধ্যে বিলিয়ে দেয়া হয়। আমি তাঁকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জিম্মীদের (অর্থাৎ সংখ্যা লঘু সম্প্রদায়) বিষয়ে ওয়াসিয়াত করছি যে, তাদের সাথে কৃত অঙ্গীকার যেন পুরা করা হয়। (তারা কোন শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হলে) তাদের পক্ষাবিলম্বে যেন যুদ্ধ করা হয়, তাদের শক্তি সামর্থ্যের অধিক জিযিয়া (কর) যেন চাপানো না হয়।
উমর (রাঃ) এর ইন্তেকাল হয়ে গেলে আমরা তাঁর লাশ নিয়ে পায়ে হেঁটে চললাম। আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) আয়িশা (রাঃ) কে সালাম করলেন এবং বললেন, উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) অনুমতি চাচ্ছেন। তিনি (আয়িশা (রাঃ) বললেন, তাকে প্রবেশ করাও। এরপর তাঁকে প্রবেশ করান হল এবং তার সঙ্গীদ্বয়ের পার্শ্বে দাফন করা হল। যখন তাঁর দাফন সম্পন্ন হল, তখন ঐ ব্যাক্তিবর্গ একত্রিত হলেন। তখন আবদুর রহমান (রাঃ) বললেন, তোমরা তোমাদের বিষয়টি তোমাদের মধ্য থেকে তিনজনের উপর ছেড়ে দাও। তখন যুবায়র (রাঃ) বললেন, আমি, আমরা বিষয়টি আলী (রাঃ) এর উপর অর্পণ করলাম। তালহা (রাঃ) বললেন, আমার বিষয়টি উসমান (রাঃ) এর উপর ন্যাস্ত করলাম। সা‘দ (রাঃ) বললেন, আমার বিষয়টি আবদুর রহমান ইবনু আউফ (রাঃ) এর উপর ন্যাস্ত করলাম। তারপর আবদুর রহমান (রাঃ), উসমান ও আলী (রাঃ) কে বললেন, আপনাদের দু’জনের মধ্য থেকে কে এই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেতে ইচ্ছা করেন? (একজন অব্যাহতি দিলে) এ দায়িত্ব অপর জনের উপর অর্পণ করব। আল্লাহ ও ইসলামের হক আদায় করা তাঁর অন্যতম দায়িত্ব হবে। কে অধিকতর যোগ্য সে সম্পর্কে দু’জনেরই চিন্তা করা উচিৎ। ব্যাক্তিদ্বয় [উসমান ও আলী (রাঃ)] নীরব থাকলেন।
তখন আবদুর রাহমান (রাঃ) নিজেই বললেন, আপনারা এ দায়িত্ব আমার উপর ন্যাস্ত করতে পরেন কি? আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমি আপনাদের মধ্যকার যোগ্যতম ব্যাক্তিকে নির্বাচিত করতে একটুও ত্রুটি করব না। তাঁরা উভয়ে বললেন, হ্যাঁ। তাদের একজনের [আলী (রাঃ) এর] হাত ধরে বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে আপনার যে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ত এবং ইসলাম গ্রহণে অগ্রগামীতা রয়েছে আপনিও ভালভাবে জানেন। আল্লাহর ওয়াস্তে এটা আপনার জন্য জরুরী হবে যে যদি আপনাকে খলীফা মনোনীত করি তাহলে আপনি ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবেন। আর যদি উসমান (রাঃ) কে মনোনিত করি তবে আপনি তাঁর কথা শুনবেন এবং তাঁর প্রতি অনুগত থাকবেন। তারপর তিনি অপরজনের [উসমানের (রাঃ)] সঙ্গে একান্তে অনুরূপ কথা বললেন। এভাবে অঙ্গীকার গ্রহণ করে, তিনি বললেন, হে উসমান (রাঃ) আপনার হাত বাড়িয়ে দিন। তিনি [আবদুর রহমান (রাঃ)], তাঁর হাতে বায়’আত করলেন। তারপর আলী (রাঃ) তাঁর [উসমান (রাঃ) এর বায়’আত করলেন)। এরপর মদিনাবাসীগণ অগ্রসর হয়ে সকলেই বায়’আত করলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আমর ইবনু মায়মূন (রহঃ)

উম্মে হানির বাড়িতে ইসরার রাতের বর্ণনাতেও প্রার্থনার পূর্ববর্তী অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন আছে। সীরাতে তাঁর নামে সংরক্ষিত কাহিনিতে মুহাম্মদ এশার সালাত পড়ে ঘুমান এবং সকালে তাঁদের সঙ্গে সালাত পড়ার কথা বলেন। উম্মে হানির ইসলাম গ্রহণকে মক্কা বিজয়ের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, অথচ কাহিনিটি তার আগের মক্কায় স্থাপিত। ইসরার আগে এশা এবং পরে ঘরের লোকদের সঙ্গে সকালের সালাতের ভাষা একই বর্ণনায় এসেছে। প্রার্থনার রীতি, সংশ্লিষ্ট পরিবারের অংশগ্রহণ এবং পরে নির্ধারিত ধর্মীয় পরিচয়ের সম্পর্ক এখানে সরল এক সূচনাকাহিনির সঙ্গে মেলে না। [164] [165] [166] [167]



ইবনে ইসহাকের সূত্রে ইবনে হিশামে সংরক্ষিত উম্মে হানির বর্ণনার প্রথম পূর্ণ অনুচ্ছেদটি এইভাবে এসেছে। [168]
قال محمد بن إسحاق: وكان فيما بلغني عن أم هانئ بنت أبي طالب رضي الله عنها، واسمها هند، في مسرى رسول الله صلى الله عليه وسلم: أنها كانت تقول ما أسري برسول الله صلى الله عليه وسلم إلا وهو في بيتي: نائم عندي تلك الليلة في بيتي، فصلى العشاء الآخرة، ثم نام ونمنا، فلما كان قبيل الفجر أهبنا رسول الله صلى الله عليه وسلم فلما صلى الصبح وصلينا معه، قال: يا أم هانئ، لقد صليت معكم العشاء الآخرة كما رأيت بهذا الوادي، ثم جئت بيت المقدس فصليت فيه، ثم صليت صلاة الغداة معكم الآن كما ترين، ثم قام ليخرج، فأخذت بطرف ردائه، فتكشف عن بطنه كأنه قبطية مطوية، فقلت له: يا نبي الله: لا تحدث بهذا للناس فيكذبوك ويؤذوك؛ قال: والله لأحدثنهموه.
বাংলা অনুবাদ:
মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক বলেন: আবু তালিবের কন্যা উম্মে হানি, যাঁর নাম হিন্দ, তাঁর কাছ থেকে রাসুলের রাতের সফর সম্পর্কে আমার কাছে যে বিবরণ পৌঁছেছে তা হলো: তিনি বলতেন, রাসুলকে রাতের সফরে নেওয়া হয়েছিল আমার বাড়িতে থাকা অবস্থায়। ওই রাতে তিনি আমার বাড়িতে ঘুমাচ্ছিলেন। তিনি এশার সালাত পড়লেন, তারপর তিনি ঘুমালেন এবং আমরাও ঘুমালাম। ফজরের কিছু আগে তিনি আমাদের জাগালেন। তিনি সকালের সালাত পড়লেন, আমরাও তাঁর সঙ্গে পড়লাম। তিনি বললেন: হে উম্মে হানি, তুমি দেখেছ, এই উপত্যকায় আমি তোমাদের সঙ্গে এশার সালাত পড়েছি; তারপর বায়তুল মাকদিসে গিয়ে সেখানে সালাত পড়েছি; তারপর এখন তোমাদের সঙ্গে সকালের সালাত পড়লাম, যেমন তুমি দেখছ। এরপর তিনি বের হতে উঠলেন। আমি তাঁর চাদরের প্রান্ত ধরলাম; তাঁর পেটের অংশ দেখা গেল, যেন ভাঁজ করা কিবতি কাপড়। আমি বললাম: হে আল্লাহর নবী, লোকদের এ কথা বলবেন না; তারা আপনাকে মিথ্যাবাদী বলবে ও কষ্ট দেবে। তিনি বললেন: আল্লাহর শপথ, আমি অবশ্যই তাদের বলব।
এই কাহিনিতে সালাত কোনো ঘটনার শেষে হঠাৎ সম্পূর্ণ অপরিচিত কাজ হিসেবে শুরু হচ্ছে না। রাতের সফরের আগেই তার পরিচিত নাম ও পারিবারিক অনুশীলন আছে। সফরশেষে বলা হচ্ছে, আগে তাঁদের সঙ্গে সালাত পড়েছেন এবং এখন আবার পড়েছেন। কাহিনির ধর্মীয় বিস্ময়ের কেন্দ্র দ্রুত দূরযাত্রা, কিন্তু তার মঞ্চে পূর্বপরিচিত উপাসনাও উপস্থিত। পরবর্তী ধর্মীয় ইতিহাসে প্রার্থনার সময়, সংখ্যা ও মর্যাদা কীভাবে একত্র হয়েছে, সে প্রশ্ন এই বর্ণনায় তৈরি হয়। মুহাম্মদের অনুসরণের আগে প্রার্থনার দৈহিক ও সামাজিক পরিসর ছিল—এই বৃহত্তর ঐতিহাসিক ছবির সঙ্গে এমন কাহিনির অবস্থান যুক্ত।
কোরআনও কাবার কাছে বিরোধীদের আচারের জন্য সালাত শব্দ ব্যবহার করেছে। সেখানে তাদের প্রার্থনাকে শিস ও হাততালির ভাষায় অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। ফলে সালাত শব্দটি শুধু পরবর্তী মুসলিমদের বিধিবদ্ধ প্রার্থনার একচেটিয়া নাম হিসেবে শুরু হয়নি। একই পবিত্র কেন্দ্রের উপাসনা নতুন ধর্মের ভাষায় নিন্দিত এবং অন্য পদ্ধতি অনুমোদিত হয়েছে। [169]
وَمَا كَانَ صَلَاتُهُمْ عِندَ الْبَيْتِ إِلَّا مُكَاءً وَتَصْدِيَةً ۚ فَذُوقُوا الْعَذَابَ بِمَا كُنتُمْ تَكْفُرُونَ
বাংলা অনুবাদ:
ঘরের কাছে তাদের সালাত ছিল শিস দেওয়া ও হাততালি ছাড়া আর কিছু নয়। অতএব তোমাদের অবিশ্বাসের কারণে শাস্তি আস্বাদন করো।
ইহুদি ধর্মীয় পাঠে নির্দিষ্ট দিকে মুখ করে দিনে কয়েকবার নতজানু প্রার্থনার আরও পুরোনো বিবরণ আছে। দানিয়েলের কাহিনিতে জেরুজালেমমুখী জানালা, দিনে তিনবার হাঁটু গেড়ে বসা এবং নিয়মিত প্রার্থনা একই পদে এসেছে। [170]
Now when Daniel knew that the writing was signed, he went into his house; and his windows being open in his chamber toward Jerusalem, he kneeled upon his knees three times a day, and prayed, and gave thanks before his God, as he did aforetime.
বাংলা অনুবাদ:
দানিয়েল যখন জানলেন যে নির্দেশপত্রে স্বাক্ষর হয়েছে, তিনি নিজের বাড়িতে গেলেন। তাঁর ঘরের জানালাগুলো জেরুজালেমের দিকে খোলা ছিল। তিনি আগে যেমন করতেন, তেমনই দিনে তিনবার হাঁটু গেড়ে নিজের ঈশ্বরের সামনে প্রার্থনা ও কৃতজ্ঞতা জানালেন।
এখানে স্থানের দিকে মুখ করা, দৈনিক পুনরাবৃত্তি এবং শরীর নিচু করা একসঙ্গে আছে। এসব উপাদান পরে মুসলিম প্রার্থনায়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। প্রার্থনার নির্দিষ্ট আরবি পাঠ ও পূর্ণ রাকাতবিন্যাসের নিজস্ব ইতিহাস আছে, কিন্তু তার শরীরী কাঠামো ও সময়ভিত্তিক অনুশীলনের পূর্ববর্তী ধর্মীয় জগৎ সুস্পষ্ট। পবিত্র দিক, পুনরাবৃত্ত সময় এবং নতজানু শরীর—এই তিন উপাদানই আগে থেকে মানুষের ধর্মীয় আচারে উপস্থিত। মানুষের প্রার্থনার দীর্ঘ ইতিহাসই তার সাধারণ ভঙ্গি ও শৃঙ্খলার উৎপত্তি বোঝায়।
খ্রিস্টীয় পাঠে যিশুর মুখ মাটির দিকে রেখে প্রার্থনার বর্ণনাও আছে। [171]
And he went a little farther, and fell on his face, and prayed, saying, O my Father, if it be possible, let this cup pass from me: nevertheless not as I will, but as thou wilt.
বাংলা অনুবাদ:
তিনি আরেকটু এগিয়ে গিয়ে মুখ নিচু করে পড়ে প্রার্থনা করলেন: হে আমার পিতা, সম্ভব হলে এই পানপাত্র আমার কাছ থেকে সরে যাক। তবু আমার ইচ্ছামতো নয়, তোমার ইচ্ছামতো হোক।
দেবতার সামনে নিজের শরীর নিচু করা মানুষের পরিচিত আত্মসমর্পণের ভাষা। কোনো শাসকের সামনে নত হওয়া এবং দেবতার সামনে নত হওয়ার সামাজিক অর্থের মধ্যে আনুগত্যের একটি সাধারণ সূত্র থাকে। ইসলাম সেই ভাষাকে নিয়মিত সময়সূচি ও নির্দিষ্ট নির্দেশে আবদ্ধ করেছে। একে মানুষের ধর্মীয় ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করলে শরীরী আনুগত্যের পূর্ববর্তী রূপ হারিয়ে যায়। পরিচিত দেহভাষার ওপর নতুন বিধান বসিয়ে মানুষের শরীর ও সময়কে ধর্মীয় শৃঙ্খলার অধীন করা হয়েছে।
সিয়াম বা রোজা ও পৌত্তলিকতা
কুরাইশের আশুরার উপবাস ইসলামপূর্ব প্রথা হিসেবে বুখারিতে স্পষ্ট উল্লেখিত। মুহাম্মদও তা পালন করতেন। মদিনায় তা পালনের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং পরে রমজানের উপবাস বাধ্যতামূলক হলে আশুরার অবস্থান ঐচ্ছিক হয়। রমজানে নির্জন ধর্মচর্চা বা তাহান্নুসের বিবরণও সীরাতে আছে; দীর্ঘ সাধনা এবং নির্দিষ্ট দিনের খাদ্যসংযম মানুষের ধর্মীয় জীবনে আগেই উপস্থিত ছিল। উপবাসের ধর্মীয় কর্তৃত্ব পরে নতুন সময়সূচি ও বাধ্যবাধকতার মধ্যে নির্ধারিত হয়েছে। [172] [173]
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫০/ আম্বিয়া কিরাম (আঃ)
পরিচ্ছেদঃ ২১৩৬. জাহিলিয়্যাতের (ইসলাম পূর্ব) যুগ
৩৫৫৪। মুসাদ্দাদ (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জাহিলি যুগে আশূরা (আশুরা/আসুরা/আসূরা)র দিন কুরাইশগণ ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাওম (রোযা/রোজা/সিয়াম/ছিয়াম) পালন করতেন। যখন হিজরত করে মদিনায় আগমন করলেন, তিনি নিজেও আশূরার সাওম পালন করতেন এবং অন্যকেও তা পালনে আদেশ দিতেন। যখন রমযানের সাওম ফরয করা হল, (তখন ‘আশূরার সাওম ঐচ্ছিক করে দেওয়া হল)। তখন যার ইচ্ছা রোযা রাখতেন আর যার ইচ্ছা রোযা রাখতেন না।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২৩/ সাওম বা রোজা
পরিচ্ছেদঃ ১২৫১. আশুরার দিনে সাওম পালন করা
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ১৮৭৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২০০৪
১৮৭৮। আবূ মা’মার (রহঃ) … ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় আগমন করে দেখতে পেলেন যে, ইয়াহুদীগণ ‘আশূরা (আশুরা/আসুরা/আসূরা)র দিনে সাওম (রোযা/রোজা/সিয়াম/ছিয়াম) পালন করে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেনঃ কি ব্যাপার? (তোমরা এ দিনে সাওম পালন কর কেন?) তারা বলল, এ অতি উত্তম দিন, এ দিনে আল্লাহ তা’আলা বনী ইসরাঈলকে তাদের শত্রুর কবল হতে নাজাত দান করেন, ফলে এ দিনে মূসা (আলাইহিস সালাম) সাওম পালন করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমি তোমাদের অপেক্ষা মূসার অধিক নিকটবর্তী, এরপর তিনি এ দিনে সাওম পালন করেন এবং সাওম পালনের নির্দেশ দেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)
আয়িশার বর্ণনায় ধারাবাহিকতা তিন ধাপে দেখা যায়: জাহেলি যুগে কুরাইশের পালন, মদিনায় নবীর পালন ও নির্দেশ, পরে রমজান ফরজ হওয়ার সঙ্গে আশুরার ঐচ্ছিক অবস্থান। একই কাজের আইনগত মর্যাদা সময়ের সঙ্গে বদলেছে। খাদ্যসংযমের দৈহিক ক্রিয়া নতুন নয়; কার নির্দেশে কোন দিনে তা পালন করলে ধর্মীয় কর্তব্য হবে, সেটিই পরিবর্তিত হয়েছে। পুরোনো আশুরার দিন বহাল রেখে তাকে নতুন ধর্মীয় নির্দেশের ভেতরে স্থান দেওয়া হয়েছে। পরে রমজানকে কেন্দ্রীয় ও বাধ্যতামূলক রোজার মাস করা হয়েছে।
ইবনে আব্বাসের বর্ণনায় মদিনার ইহুদিদের কাছ থেকে আশুরার তাৎপর্য জিজ্ঞেস করার দৃশ্য আছে। তাঁরা মূসার মুক্তির কাহিনি বলেন, আর মুহাম্মদ মূসার ওপর নিজের অধিকতর অধিকার দাবি করে একই উপবাস পালনের নির্দেশ দেন। এখানে গ্রহণের পাশাপাশি উত্তরাধিকার দখলের ভাষাও আছে। একটি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্মৃতিকে গ্রহণ করে তার প্রধান চরিত্রের অধিকতর বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে ঘোষণা করা হচ্ছে। পরিচিত প্রথার সঙ্গে নতুন নেতৃত্বের সম্পর্ক এভাবেই তৈরি হয়। [174]
দুটি বর্ণনায় উপবাসটির পরিচিতির সূত্র আলাদা: একটিতে মক্কার কুরাইশ, অন্যটিতে মদিনার ইহুদিদের ধর্মীয় ব্যাখ্যা। এই দুই স্মৃতি ইসলামের আশপাশের একাধিক ধর্মীয় পরিবেশকে সামনে আনে। মুহাম্মদের উপবাসচর্চা একটি সংস্কৃতিশূন্য অবস্থায় শুরু হয়নি। আগের সমাজের দিন, আচার ও নবীর কাহিনির সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল। পরে রমজানকে বাধ্যতামূলক করা নতুন সম্প্রদায়ের আলাদা বাৎসরিক শৃঙ্খলা গড়ে তোলে।
কোরআনও উপবাসকে পূর্ববর্তীদের বিধানের সঙ্গে যুক্ত করেছে। পূর্ববর্তী মানুষের ওপর তা নির্ধারিত থাকার স্বীকারোক্তি ইসলামের নিজের ধর্মীয় ভাষাতেই আছে। [175]
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
বাংলা অনুবাদ:
হে বিশ্বাসীরা, তোমাদের ওপর উপবাস নির্ধারিত হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর নির্ধারিত হয়েছিল, যাতে তোমরা সংযমী হতে পারো।
কোরআনের ২:১৮৩ আয়াত উপবাসের পূর্ববর্তী ধর্মীয় ইতিহাসকে স্বীকার করে এবং সেই অনুশীলনের ধারাবাহিকতায় নতুন সম্প্রদায়কে যুক্ত করে। উপবাসের নির্দিষ্ট বিধান, সময় এবং অনুসারীদের আনুগত্য নতুন ধর্মীয় ব্যবস্থায় নির্ধারিত হয়েছে। পেট খালি রাখার একটি পুরোনো সাধনাকে পবিত্র কর্তব্য করে মানুষের দৈনন্দিন সময়, আহার ও যৌনজীবনের ওপর কেন্দ্রীয় নির্দেশ কার্যকর করা হয়েছে। কোন দিন উপবাস রাখতে হবে, কোন অবস্থায় তা বাধ্যতামূলক হবে এবং কখন আহার বা যৌনসম্পর্কের অনুমতি পাওয়া যাবে—এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণের ক্ষমতা নতুন নেতৃত্বের হাতে যায়। আচারের মানবীয় পূর্বইতিহাস এবং সেই আচারের ওপর নতুন ধর্মীয় ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার ইতিহাস একসঙ্গে এখানে দৃশ্যমান।
আশুরার উপবাস ও কাবার আবরণ: মক্কার ধর্মীয় পঞ্জিকার উত্তরাধিকার
আয়েশার আরেকটি বর্ণনায় আশুরার রোজার সঙ্গে কাবার একটি নির্দিষ্ট আচারের সম্পর্ক পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, রমজান ফরজ হওয়ার আগে মানুষ আশুরায় রোজা রাখত এবং ওই দিন কাবায় আবরণ দেওয়া হতো। কুরাইশের আশুরা পালনের আগের বর্ণনার সঙ্গে এই তথ্য মিলিয়ে মক্কার ধর্মীয় জীবনের একটি পরিচিত দিন পাওয়া যায়, যার সঙ্গে উপবাস ও পবিত্র স্থানের আনুষ্ঠানিকতা যুক্ত ছিল। মুহাম্মদের উপবাসচর্চা সেই বিদ্যমান দিনের ধারাবাহিকতায় শুরু হয়েছিল। [176]
حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ بُكَيْرٍ، حَدَّثَنَا اللَّيْثُ، عَنْ عُقَيْلٍ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ عُرْوَةَ، عَنْ عَائِشَةَ ـ رضى الله عنها ـ. وَحَدَّثَنِي مُحَمَّدُ بْنُ مُقَاتِلٍ، قَالَ أَخْبَرَنِي عَبْدُ اللَّهِ ـ هُوَ ابْنُ الْمُبَارَكِ ـ قَالَ أَخْبَرَنَا مُحَمَّدُ بْنُ أَبِي حَفْصَةَ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، عَنْ عُرْوَةَ، عَنْ عَائِشَةَ ـ رضى الله عنها ـ قَالَتْ كَانُوا يَصُومُونَ عَاشُورَاءَ قَبْلَ أَنْ يُفْرَضَ رَمَضَانُ، وَكَانَ يَوْمًا تُسْتَرُ فِيهِ الْكَعْبَةُ، فَلَمَّا فَرَضَ اللَّهُ رَمَضَانَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم «مَنْ شَاءَ أَنْ يَصُومَهُ فَلْيَصُمْهُ، وَمَنْ شَاءَ أَنْ يَتْرُكَهُ فَلْيَتْرُكْهُ».
বাংলা অনুবাদ:
ইয়াহইয়া ইবনে বুকাইর আমাদের বর্ণনা করেছেন। লাইস আমাদের বর্ণনা করেছেন; উকাইল থেকে, তিনি ইবনে শিহাব থেকে, তিনি উরওয়া থেকে, তিনি আয়েশা থেকে। মুহাম্মদ ইবনে মুকাতিলও আমাকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ, অর্থাৎ ইবনুল মুবারক আমাকে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মুহাম্মদ ইবনে আবি হাফসা আমাদের জানিয়েছেন; যুহরি থেকে, তিনি উরওয়া থেকে, তিনি আয়েশা থেকে। আয়েশা বলেন: রমজান ফরজ হওয়ার আগে তারা আশুরায় রোজা রাখত। ওই দিন কাবায় আবরণ দেওয়া হতো। আল্লাহ যখন রমজান ফরজ করলেন, তখন আল্লাহর রাসুল বললেন, ‘যে ব্যক্তি ওই দিনে রোজা রাখতে চায়, সে রাখুক; আর যে তা ছেড়ে দিতে চায়, সে ছেড়ে দিক।’
কাবায় আবরণ দেওয়া এবং একই দিনে উপবাস করার তথ্য আশুরাকে মক্কার সমষ্টিগত ধর্মীয় পঞ্জিকার মধ্যে স্থাপন করে। একটি পবিত্র স্থান, তার আনুষ্ঠানিক পরিচর্যার নির্দিষ্ট দিন এবং সেই দিনের খাদ্যসংযম—এই উপাদানগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। আয়েশার বর্ণনায় কুরাইশ ও মুহাম্মদ একই পুরোনো দিন পালন করছেন। ফলে ইসলামি উপবাসের এই পর্যায়ে উত্তরাধিকারটি ব্যক্তির অভ্যাস এবং সমাজের নির্ধারিত সময়—দুই জায়গাতেই উপস্থিত। আগে থেকে প্রচলিত দিনটি নতুন নেতৃত্বের নির্দেশে অনুসারীদের পালনীয় আচারে স্থান পায়। মক্কার পরিচিত ধর্মীয় সময় মদিনায় গড়ে ওঠা সম্প্রদায়ের মধ্যেও বহন করা হয়।
কুরাইশের মূর্তিপূজক পরিচয় থাকা সত্ত্বেও তাদের পালন করা আশুরার উপবাস মুহাম্মদের ধর্মীয় জীবনে গ্রহণযোগ্য ছিল। এখানে একটি পুরোনো সমাজের অনুশীলনকে গ্রহণ ও পুনর্বিন্যাস করার বাস্তব পদ্ধতি দেখা যায়। আচারের সঙ্গে আগের অনুসারীদের ধর্মীয় পরিচয় অবিচ্ছেদ্য হয়ে থাকেনি; নতুন নেতৃত্ব একই দিন ও অনুশীলনকে নিজের ধর্মীয় ব্যবস্থায় অনুমোদন করেছে। পরে রমজানের মাসব্যাপী রোজা কেন্দ্রীয় স্থান পেলে আশুরার গুরুত্বও নতুনভাবে নির্ধারিত হয়। ধর্মীয় ব্যবস্থার এই নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠাতা একই সঙ্গে পুরোনো আচারের উত্তরাধিকারী এবং তার নতুন মর্যাদা নির্ধারণকারী।
আশুরায় নবম দিনের রোজা: গ্রহণের পরে ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য
ইবনে আব্বাসের আরেকটি বর্ণনায় আশুরার অনুশীলনের মধ্যে অন্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের থেকে পৃথক হওয়ার প্রশ্ন ওঠে। মুহাম্মদ আশুরার রোজা পালন ও তার নির্দেশ দেওয়ার পরে তাঁকে বলা হয়, দিনটিকে ইহুদি ও খ্রিস্টানরা সম্মান করে। উত্তরে তিনি পরবর্তী বছর নবম দিনে রোজা রাখার অভিপ্রায় জানান। বর্ণনার শেষেই আছে, পরবর্তী বছর আসার আগে তাঁর মৃত্যু হয়। ফলে এখানে দশম দিনের পরিচিত অনুশীলনের সঙ্গে নবম দিনের রোজার একটি ঘোষিত পরিকল্পনা পাওয়া যায়। [177]
وَحَدَّثَنَا الْحَسَنُ بْنُ عَلِيٍّ الْحُلْوَانِيُّ، حَدَّثَنَا ابْنُ أَبِي مَرْيَمَ، حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ أَيُّوبَ، حَدَّثَنِي إِسْمَاعِيلُ بْنُ أُمَيَّةَ، أَنَّهُ سَمِعَ أَبَا غَطَفَانَ بْنَ طَرِيفٍ الْمُرِّيَّ، يَقُولُ سَمِعْتُ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عَبَّاسٍ ـ رضى الله عنهما ـ يَقُولُ حِينَ صَامَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَوْمَ عَاشُورَاءَ وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّهُ يَوْمٌ تُعَظِّمُهُ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم «فَإِذَا كَانَ الْعَامُ الْمُقْبِلُ ـ إِنْ شَاءَ اللَّهُ ـ صُمْنَا الْيَوْمَ التَّاسِعَ». قَالَ فَلَمْ يَأْتِ الْعَامُ الْمُقْبِلُ حَتَّى تُوُفِّيَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم.
বাংলা অনুবাদ:
আল-হাসান ইবনে আলি আল-হুলওয়ানি আমাদের বর্ণনা করেছেন। ইবনে আবি মারইয়াম আমাদের বর্ণনা করেছেন। ইয়াহইয়া ইবনে আইয়ুব আমাদের বর্ণনা করেছেন। ইসমাঈল ইবনে উমাইয়া আমাকে বর্ণনা করেছেন যে তিনি আবু গাতাফান ইবনে তারিফ আল-মুররিকে বলতে শুনেছেন: আমি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসকে বলতে শুনেছি—আল্লাহর রাসুল যখন আশুরার দিন রোজা রাখলেন এবং রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন, তখন তাঁরা বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! এটি এমন একটি দিন, যাকে ইহুদি ও খ্রিস্টানরা সম্মান করে।’ আল্লাহর রাসুল বললেন, ‘পরবর্তী বছর এলে, আল্লাহ চাইলে, আমরা নবম দিনে রোজা রাখব।’ তিনি বলেন: পরবর্তী বছর আসার আগেই আল্লাহর রাসুল মৃত্যুবরণ করেন।
মূসার স্মৃতিকে গ্রহণ করে তাঁর ওপর অধিকতর অধিকার দাবির পাশে এই ঘটনায় সম্প্রদায়ের স্বাতন্ত্র্য তৈরির প্রয়োজনও উপস্থিত। প্রথম বর্ণনায় ইহুদিদের উপবাসের ব্যাখ্যার সঙ্গে মুহাম্মদ নিজেকে যুক্ত করেন; পরের বর্ণনায় একই দিন অন্যদের কাছে সম্মানিত হওয়ায় অনুশীলনের সময় বদলানোর অভিপ্রায় আসে। আচারের ধর্মীয় অর্থ তাই তার সঙ্গে যুক্ত সম্প্রদায়ের পরিচয়ের ওপরও নির্ভর করছে। উপবাস গ্রহণের মধ্য দিয়ে পুরোনো ধর্মীয় স্মৃতির উত্তরাধিকার দাবি করা হয়, আবার সময়ের ভিন্নতা দিয়ে নতুন সম্প্রদায়ের পরিচয় চিহ্নিত করার পথ তৈরি হয়।
নববির ফিকহগ্রন্থে নবম দিনের রোজার ব্যাখ্যার মধ্যে এই স্বাতন্ত্র্যের নীতিটি স্পষ্টভাবে এসেছে। তিনি নবম ও দশম—উভয় দিনের রোজাকে মুস্তাহাব বলেছেন এবং নবম দিন যুক্ত করার ব্যাখ্যা হিসেবে ইহুদিদের কেবল দশম দিনে রোজা রাখার সঙ্গে পার্থক্য সৃষ্টি, আশুরার সঙ্গে আরেক দিনের উপবাস সংযুক্ত করা এবং তারিখের ভুল এড়ানোর কথা সংরক্ষণ করেছেন। [178]
وَذَكَرَ الْعُلَمَاءُ مِنْ أَصْحَابِنَا وَغَيْرِهِمْ فِي حِكْمَةِ اسْتِحْبَابِ صَوْمِ تَاسُوعَاءَ أَوْجُهًا: (أَحَدُهَا) أَنَّ الْمُرَادَ مِنْهُ مُخَالَفَةُ الْيَهُودِ فِي اقْتِصَارِهِمْ عَلَى الْعَاشِرِ، وَهُوَ مَرْوِيٌّ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، وَفِي حَدِيثٍ رَوَاهُ الْإِمَامُ أَحْمَدُ بْنُ حَنْبَلٍ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم «صُومُوا يَوْمَ عَاشُورَاءَ، وَخَالِفُوا الْيَهُودَ وَصُومُوا قَبْلَهُ يَوْمًا وَبَعْدَهُ يَوْمًا».
(الثَّانِي) أَنَّ الْمُرَادَ بِهِ وَصْلُ يَوْمِ عَاشُورَاءَ بِصَوْمٍ، كَمَا نُهِيَ أَنْ يُصَامَ يَوْمُ الْجُمُعَةِ وَحْدَهُ، ذَكَرَهُمَا الْخَطَّابِيُّ وَآخَرُونَ.
(الثَّالِثُ) الِاحْتِيَاطُ فِي صَوْمِ الْعَاشِرِ خَشْيَةَ نَقْصِ الْهِلَالِ، وَوُقُوعِ غَلَطٍ فَيَكُونُ التَّاسِعُ فِي الْعَدَدِ هُوَ الْعَاشِرَ فِي نَفْسِ الْأَمْرِ.
বাংলা অনুবাদ:
আমাদের অনুসারী ও অন্যান্য আলেম তাসুআর রোজা মুস্তাহাব হওয়ার তাৎপর্য সম্পর্কে কয়েকটি ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছেন। প্রথমটি হলো: ইহুদিরা কেবল দশম দিনে রোজা রাখে; তাদের থেকে ভিন্নতা সৃষ্টি করাই এর উদ্দেশ্য। এটি ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল ইবনে আব্বাস থেকে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল বলেছেন: ‘আশুরার দিন রোজা রাখো, ইহুদিদের থেকে ভিন্নতা সৃষ্টি করো এবং তার আগে এক দিন ও পরে এক দিন রোজা রাখো।’
দ্বিতীয়টি হলো: আশুরার দিনের সঙ্গে আরেক দিনের রোজা সংযুক্ত করা এর উদ্দেশ্য; যেমন কেবল শুক্রবারে রোজা রাখতে নিষেধ করা হয়েছে। খাত্তাবি ও অন্যরা এই দুটি ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছেন।
তৃতীয়টি হলো: চাঁদের হিসাবের ঘাটতি বা ভুলের আশঙ্কায় দশম দিনের রোজা নিশ্চিত করার জন্য সতর্কতা অবলম্বন করা; কারণ হিসাবে যেটিকে নবম দিন ধরা হচ্ছে, সেটিই প্রকৃতপক্ষে দশম দিন হতে পারে।
এই ব্যাখ্যায় উপবাসের নিয়ম নির্ধারণের একটি মানদণ্ড হচ্ছে অন্য ধর্মীয় গোষ্ঠীর সঙ্গে দৃশ্যমান পার্থক্য। আগের অনুশীলন গ্রহণ করার পর তার সময়ের সঙ্গে আরেক দিন জুড়ে দেওয়া সেই পার্থক্য তৈরি করে। একই শারীরিক সংযম তখন একটি সম্প্রদায়ের বিশেষ পরিচয়সূচক আচারে পরিণত হয়। পুরোনো প্রথা থেকে পাওয়া উপবাস ও স্মৃতি বহাল রেখেই তার চারপাশে নতুন সীমারেখা টানা হচ্ছে। নববির সংরক্ষিত ব্যাখ্যায় এই সীমারেখা তৈরির কাজটি ধর্মীয় গুণ হিসেবেই স্বীকৃত।
ফিদিয়ার বিকল্প থেকে রমজানের বাধ্যবাধকতা
রমজানের রোজার আইনগত কাঠামোর মধ্যেও পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনের বর্ণনা রয়েছে। সালামা ইবনুল আকওয়ার বক্তব্যে সূরা বাকারার ১৮৪ নম্বর আয়াত নাজিল হওয়ার পরে রোজা না রেখে ফিদিয়া দেওয়ার সুযোগের কথা এসেছে। তিনি বলেছেন, পরের আয়াত এসে সেই ব্যবস্থা রহিত করে। ফলে আশুরা থেকে রমজানে গুরুত্ব স্থানান্তরের পাশাপাশি রমজানের মধ্যেও বিকল্প ব্যবস্থা থেকে বাধ্যতামূলক উপবাসে যাওয়ার একটি ধাপ সংরক্ষিত আছে। [179]
حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ، حَدَّثَنَا بَكْرُ بْنُ مُضَرَ، عَنْ عَمْرِو بْنِ الْحَارِثِ، عَنْ بُكَيْرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، عَنْ يَزِيدَ، مَوْلَى سَلَمَةَ بْنِ الأَكْوَعِ عَنْ سَلَمَةَ، قَالَ لَمَّا نَزَلَتْ {وَعَلَى الَّذِينَ يُطِيقُونَهُ فِدْيَةٌ طَعَامُ مِسْكِينٍ} كَانَ مَنْ أَرَادَ أَنْ يُفْطِرَ وَيَفْتَدِيَ حَتَّى نَزَلَتِ الآيَةُ الَّتِي بَعْدَهَا فَنَسَخَتْهَا. مَاتَ بُكَيْرٌ قَبْلَ يَزِيدَ.
বাংলা অনুবাদ:
কুতাইবা আমাদের বর্ণনা করেছেন। বাকর ইবনে মুদার আমাদের বর্ণনা করেছেন; আমর ইবনুল হারিস থেকে, তিনি বুকাইর ইবনে আবদুল্লাহ থেকে, তিনি সালামা ইবনুল আকওয়ার মাওলা ইয়াযিদ থেকে, তিনি সালামা থেকে। সালামা বলেন: যখন ‘যারা তা পালনে সক্ষম, তাদের জন্য ফিদিয়া হচ্ছে একজন অভাবীকে খাবার দেওয়া’ আয়াতটি নাজিল হলো, তখন যে চাইত, রোজা না রেখে ফিদিয়া দিত। এ অবস্থা চলল পরবর্তী আয়াত নাজিল হয়ে সেটিকে রহিত করা পর্যন্ত। বুকাইর ইয়াযিদের আগে মৃত্যুবরণ করেন।
সালামার বর্ণিত প্রথম ব্যবস্থায় খাদ্যদান উপবাসের বিকল্প হিসেবে গ্রহণযোগ্য ছিল। পরের নির্দেশ সেই সাধারণ বিকল্প প্রত্যাহার করে উপবাসকে আবশ্যিক আচারে পরিণত করে। একজন অভাবীকে খাবার দেওয়ার সামাজিক উপকার অক্ষত থাকলেও বিধানের পরিবর্তনে সেই কাজ আর আগের মতো ব্যক্তির রোজার দায় মেটায় না। একই ব্যক্তির একই কাজের ধর্মীয় ফল নির্ধারিত হচ্ছে কোন নির্দেশ তখন কার্যকর, তার ভিত্তিতে। এখানে ধর্মীয় কর্তব্যের কেন্দ্র হলো নির্দেশ মেনে নির্দিষ্ট আচরণ সম্পাদন করা। মানুষের উপকার এবং ধর্মীয় দায় পরিশোধ—এই দুটির মূল্যায়ন পৃথক হয়ে যায়।
ঘুম, খাবার ও যৌনসম্পর্ক: রোজার বিধান সংশোধনের বাস্তব ঘটনা
প্রথম দিকের রোজার অনুশীলনে ইফতারের আগে ঘুমিয়ে পড়লে সেই রাত এবং পরের দিনের সন্ধ্যা পর্যন্ত খাওয়া থেকে বিরত থাকার বিবরণ বুখারিতে রয়েছে। কায়স ইবনে সিরমা দিনের কাজ শেষে বাড়ি ফিরে খাবার চেয়েছিলেন। ঘরে খাবার না থাকায় তাঁর স্ত্রী খাবার সংগ্রহ করতে যান; এই সময়ে ক্লান্তিতে তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। পরের দিন দুপুরে তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। ঘটনাটি মুহাম্মদকে জানানোর পর রাতের খাবার ও যৌনসম্পর্কের অনুমতিসংক্রান্ত আয়াত নাজিল হওয়ার বর্ণনা এসেছে। [180]
حَدَّثَنَا عُبَيْدُ اللَّهِ بْنُ مُوسَى، عَنْ إِسْرَائِيلَ، عَنْ أَبِي إِسْحَاقَ، عَنِ الْبَرَاءِ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ كَانَ أَصْحَابُ مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم إِذَا كَانَ الرَّجُلُ صَائِمًا، فَحَضَرَ الإِفْطَارُ، فَنَامَ قَبْلَ أَنْ يُفْطِرَ لَمْ يَأْكُلْ لَيْلَتَهُ وَلاَ يَوْمَهُ، حَتَّى يُمْسِيَ، وَإِنَّ قَيْسَ بْنَ صِرْمَةَ الأَنْصَارِيَّ كَانَ صَائِمًا، فَلَمَّا حَضَرَ الإِفْطَارُ أَتَى امْرَأَتَهُ، فَقَالَ لَهَا أَعِنْدَكِ طَعَامٌ قَالَتْ لاَ وَلَكِنْ أَنْطَلِقُ، فَأَطْلُبُ لَكَ. وَكَانَ يَوْمَهُ يَعْمَلُ، فَغَلَبَتْهُ عَيْنَاهُ، فَجَاءَتْهُ امْرَأَتُهُ، فَلَمَّا رَأَتْهُ قَالَتْ خَيْبَةً لَكَ. فَلَمَّا انْتَصَفَ النَّهَارُ غُشِيَ عَلَيْهِ، فَذُكِرَ ذَلِكَ لِلنَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَنَزَلَتْ هَذِهِ الآيَةُ {أُحِلَّ لَكُمْ لَيْلَةَ الصِّيَامِ الرَّفَثُ إِلَى نِسَائِكُمْ} فَفَرِحُوا بِهَا فَرَحًا شَدِيدًا، وَنَزَلَتْ {وَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الأَسْوَدِ}.
বাংলা অনুবাদ:
উবাইদুল্লাহ ইবনে মুসা আমাদের বর্ণনা করেছেন; ইসরাঈল থেকে, তিনি আবু ইসহাক থেকে, তিনি বারা থেকে। বারা বলেন: মুহাম্মদের সাহাবিদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি রোজা রাখলে এবং ইফতারের সময় উপস্থিত হওয়ার পর ইফতার করার আগে ঘুমিয়ে পড়লে, সে ওই রাত ও পরের দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত খেত না। কায়স ইবনে সিরমা আনসারি রোজা রেখেছিলেন। ইফতারের সময় তিনি স্ত্রীর কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার কাছে কি খাবার আছে?’ স্ত্রী বললেন, ‘না; তবে আমি গিয়ে তোমার জন্য খাবার খুঁজে আনি।’ তিনি সারা দিন কাজ করেছিলেন, ফলে ঘুম তাঁকে আচ্ছন্ন করল। তাঁর স্ত্রী ফিরে এসে তাঁকে এ অবস্থায় দেখে বললেন, ‘তোমার দুর্ভাগ্য!’ পরের দিন দুপুর হলে তিনি অজ্ঞান হয়ে গেলেন। বিষয়টি নবীকে জানানো হলো। তখন এই আয়াত নাজিল হলো: ‘রোজার রাতে তোমাদের স্ত্রীদের সঙ্গে যৌনসম্পর্ক তোমাদের জন্য বৈধ করা হয়েছে।’ এতে তাঁরা অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। আরও নাজিল হলো: ‘তোমরা খাও ও পান করো, যতক্ষণ না কালো রেখা থেকে সাদা রেখা তোমাদের কাছে স্পষ্ট হয়।’
এই ঘটনায় বিধানের সমস্যাটি একজন শ্রমজীবী মানুষের শরীরে প্রকাশ পেয়েছে। তিনি দিনের কাজ শেষে খাবার সংগ্রহের অপেক্ষায় ঘুমিয়ে পড়েছিলেন; সেই স্বাভাবিক ক্লান্তিই তাঁকে আরও দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার অবস্থায় ফেলে। ঘুমানোর আগে খাবার মুখে তোলার সুযোগ পাওয়া এবং সুযোগ পাওয়ার আগেই ঘুমিয়ে পড়া—এই পার্থক্যের ওপর পরের দিনের উপবাসের দৈর্ঘ্য নির্ভর করছে। মানবদেহের প্রয়োজনের ওপর এমন একটি শর্ত বসানোর ফল হচ্ছে পরের দিন অজ্ঞান হয়ে যাওয়া। আগের ব্যবস্থায় খাবার না পেয়ে ঘুমিয়ে পড়া ব্যক্তিকেই বাড়তি অনাহার বহন করতে হয়েছে। অতিরিক্ত অনাহারের এই ব্যবস্থার মধ্যেই তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন।
ইবনে কাসির সূরা বাকারার ১৮৭ নম্বর আয়াতের শুরুতেই আগের বিধানটি তুলে ধরেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় ইশার নামাজ পর্যন্ত অথবা তার আগে ঘুমিয়ে পড়া পর্যন্ত খাওয়া, পান করা ও যৌনসম্পর্কের অনুমতি থাকত; ঘুম বা ইশার নামাজের পরে পরের রাত পর্যন্ত এগুলো নিষিদ্ধ হয়ে যেত। তিনি এই ব্যবস্থায় বড় ধরনের কষ্ট হওয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন। [181]
هَذِهِ رُخْصَةٌ مِنَ اللَّهِ تَعَالَى لِلْمُسْلِمِينَ، وَرَفْعٌ لِمَا كَانَ عَلَيْهِ الْأَمْرُ فِي ابْتِدَاءِ الْإِسْلَامِ، فَإِنَّهُ كَانَ إِذَا أَفْطَرَ أَحَدُهُمْ إِنَّمَا يَحِلُّ لَهُ الْأَكْلُ وَالشُّرْبُ وَالْجِمَاعُ إِلَى صَلَاةِ الْعِشَاءِ أَوْ يَنَامَ قَبْلَ ذَلِكَ، فَمَتَى نَامَ أَوْ صَلَّى الْعِشَاءَ حَرُمَ عَلَيْهِ الطَّعَامُ وَالشَّرَابُ وَالْجِمَاعُ إِلَى اللَّيْلَةِ الْقَابِلَةِ. فَوَجَدُوا مِنْ ذَلِكَ مَشَقَّةً كَبِيرَةً. وَالرَّفَثُ هُنَا هُوَ: الْجِمَاعُ. قَالَهُ ابْنُ عَبَّاسٍ، وَعَطَاءٌ، وَمُجَاهِدٌ، وَسَعِيدُ بْنُ جُبَيْرٍ، وَطَاوُسٌ، وَسَالِمُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، وَعَمْرُو بْنُ دِينَارٍ وَالْحَسَنُ، وَقَتَادَةُ، وَالزُّهْرِيُّ، وَالضَّحَّاكُ، وَإِبْرَاهِيمُ النَّخَعِيُّ، وَالسُّدِّيُّ، وَعَطَاءٌ الْخُرَاسَانِيُّ، وَمُقَاتِلُ بْنُ حَيَّانَ.
বাংলা অনুবাদ:
এটি মুসলিমদের জন্য আল্লাহর দেওয়া ছাড় এবং ইসলামের শুরুর দিকে প্রচলিত ব্যবস্থার প্রত্যাহার। তখন তাঁদের কেউ ইফতার করলে ইশার নামাজ পর্যন্ত অথবা তার আগে ঘুমিয়ে পড়া পর্যন্তই তাঁর জন্য খাওয়া, পান করা ও যৌনসম্পর্ক বৈধ থাকত। তিনি ঘুমিয়ে পড়লে অথবা ইশার নামাজ আদায় করলে পরের রাত পর্যন্ত তাঁর জন্য খাবার, পানীয় ও যৌনসম্পর্ক নিষিদ্ধ হয়ে যেত। এতে তাঁরা বড় ধরনের কষ্টে পড়েছিলেন। এখানে ‘রাফাস’ অর্থ যৌনসম্পর্ক। ইবনে আব্বাস, আতা, মুজাহিদ, সাঈদ ইবনে জুবাইর, তাউস, সালিম ইবনে আবদুল্লাহ, আমর ইবনে দিনার, হাসান, কাতাদা, যুহরি, দাহহাক, ইবরাহিম নাখাঈ, সুদ্দি, আতা খুরাসানি ও মুকাতিল ইবনে হাইয়ান এ কথা বলেছেন।
ঘুম বা নামাজ আদায়ের সঙ্গে ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও দাম্পত্য যৌনসম্পর্কের ওপর এত দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা জুড়ে দেওয়ায় শরীরের সাধারণ প্রয়োজন ধর্মীয় অপরাধের সীমার মধ্যে চলে যায়। এরপর বিধান বদলে একই রাতের খাবার ও যৌনসম্পর্ক অনুমোদিত হয়। মানুষের শরীর এবং দাম্পত্য সম্পর্ক একই থাকে; বৈধতা বদলায় নির্দেশের পরিবর্তনে। ইবনে কাসির যে বড় ধরনের কষ্টের কথা বলেছেন, সেটি আগের নিষেধাজ্ঞার বাস্তব ফল। পরবর্তী ছাড়ের প্রয়োজন সেই ব্যবস্থার অসহনীয়তাকেই প্রকাশ করে। একজন ক্লান্ত মানুষের অনিচ্ছাকৃত ঘুমের পর খাবার খাওয়ার সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া কঠোরতার একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
ইসলামের পূর্বে ঈদ
মদিনায় মুহাম্মদের আগমনের আগে দুটি বাৎসরিক আনন্দোৎসবের দিন ছিল বলে আনাসের বর্ণনায় আছে। মূল হাদিসে দিন দুটির নাম নেই; মোল্লা আলি কারির মতো ব্যাখ্যাকারীরা সেগুলোকে নওরোজ ও মেহেরজান হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। মুহাম্মদ সেই দিনগুলোর বদলে ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতরকে উত্তম দিন হিসেবে ঘোষণা করেন। ফলে উৎসবের সামাজিক প্রয়োজন ও বাৎসরিক পুনরাবৃত্তি বহাল থাকে, কিন্তু তার দিন, নাম এবং অনুমোদনের উৎস বদলে যায়। নতুন ধর্ম পুরোনো আনন্দের জায়গায় নিজের ক্যালেন্ডার প্রতিষ্ঠা করে। [182] [183]
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-৪: সালাত
পরিচ্ছেদঃ ৪৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ – দু’ ঈদের সালাত
১৪৩৯-[১৪] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আগমন করার পর তাদের দু’টি দিন ছিল। এ দিন দু’টিতে তারা খেলাধূলা ও আমোদ-প্রমোদ করত। (এ দেখে) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, এ দু’টি দিন কি? তারা বলল ইসলামের পূর্বে জাহিলিয়্যাতের সময় এ দিন দু’টিতে আমরা খেলাধূলা করতাম। (এ কথা শ্রবণে) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ দু’দিনের পরিবর্তে আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের জন্য আরো উত্তম দু’টি দিন দান করেছেন। এর একটি হলো ঈদুল আযহার দিন ও অপরটি ঈদুল ফিতরের দিন। (আবূ দাঊদ)[1]
[1] সহীহ : আবূ দাঊদ ১১৩৪, আহমাদ ১৩৬২২, মুসতাদরাক লিল হাকিম ১০৯১।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সুনান আন-নাসায়ী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৯/ উভয় ঈদের নামায
পরিচ্ছেদঃ ১/ পরিচ্ছেদ নাই
১৫৫৯। আলী ইবন হুজর (রহঃ) … আনাস ইবন মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, জাহিলিয়াত যুগের অধিবাসীদের জন্য প্রত্যেক বৎসরে দু’টি দিন ছিল, যাতে তারা খেল-তামশা করতো। যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় আগমন করলেন তখন তিনি বললেন, তোমাদের জন্য দু’টি দিন ছিল, যাতে তোমরা খেল-তামশা করতে। এখন আল্লাহ তা’আলা তোমাদের জন্য উক্ত দু’দিনের পরিবর্তে তার চেয়েও অধিকতর উত্তম দু’টি দিন নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, ঈদুল ফিতরের দিন এবং কুরবানীর দিন।
[সহীহ। আস-সহীহাহ ২০২১, মিশকাত ১৪৩৯]
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)
সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২/ সালাত (নামায)
পরিচ্ছেদঃ ২৫১. দুই ঈদের নামায।
১১৩৪. মুসা ইবনে ইসমাঈল (রহঃ) ………… আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদ্বীনায় পৌঁছে দেখতে পান যে, সেখানকার অধিবাসীরা দুইটি দিন (নায়মূক ও মেহেরজান) খেলাধূলা ও আনন্দ-উৎসব করে থাকে। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করেন, এই দুইটি দিন কিসের? তারা বলেন, জাহেলী যুগে আমরা এই দুই দিন খেলাধূলা ও উৎসব করতাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে এই দুই দিনের পরিবর্তে অন্য দুইটি উত্তম দিন দান করেছেন এবং তা হল: কোরবানীর ঈদ এবং রোযার ঈদ। (তিরমিযী, নাসাঈ)
নাসায়ী (অধ্যায়ঃ দুই ঈদ, হাঃ১১৫৫), আহমাদ (৩/১৭৮), হুমাইদ হতে আনাস সূত্রে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
২/ সালাত
পরিচ্ছেদঃ ২৪৫. দুই ঈদের সালাত
১১৩৪। আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাতে এসে দেখেন, মদীনাহবাসীরা নির্দিষ্ট দু’টি দিনে খেলাধুলা ও আনন্দ করে থাকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেনঃ এ দু‘টি দিন কিসের? সকলেই বললো, জাহিলী যুগে আমরা এ দু’ দিন খেলাধুলা করতাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মহান আল্লাহ তোমাদের এ দু’ দিনের পরিবর্তে উত্তম দু‘টি দিন দান করেছেন। তা হলো, ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিত্বরের দিন।[1]
সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২৩/ সাওম বা রোজা
পরিচ্ছেদঃ ১২৫১. আশুরার দিনে সাওম পালন করা
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ১৮৭৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২০০৫
১৮৭৯। ‘আলী ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রহঃ) … আবূ মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আশূরা (আশুরা/আসুরা/আসূরা)র দিনকে ইয়াহুদীগণ ঈদ মনে করত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরাও এ দিনে সাওম (রোযা/রোজা/সিয়াম/ছিয়াম) পালন কর।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ মূসা আল- আশ’আরী (রাঃ)
হাদিসের কেন্দ্রীয় শব্দ হলো প্রতিস্থাপন। আগের সমাজে মানুষ আনন্দ করত; নতুন নির্দেশ সেই আনন্দের জন্য অন্য দিন নির্ধারণ করেছে। মানুষ একত্র হবে, কাজের বাইরে সময় পাবে এবং উৎসব করবে—এই সামাজিক কাজ বদলায়নি। কিন্তু কোন দিনকে বৈধ ও শ্রেষ্ঠ বলা হবে, তার কর্তৃত্ব আল্লাহর নামে মুহাম্মদের ঘোষণায় স্থানান্তরিত হয়েছে। আনন্দের ক্যালেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করা সম্প্রদায়ের জীবন নিয়ন্ত্রণের একটি কার্যকর পদ্ধতি। কার সঙ্গে একই দিনে উৎসব করা হবে এবং কোন স্মৃতির সঙ্গে মানুষ নিজেদের যুক্ত করবে, তার মধ্য দিয়ে পরিচয়ও তৈরি হয়।
দুটি পুরোনো দিনের নাম সম্পর্কে মোল্লা আলি কারি স্পষ্টভাবে বলেছেন, এই শনাক্তকরণ ব্যাখ্যাকারীদের বক্তব্য। তাঁর প্রাসঙ্গিক বাক্যগুলো হলো: [184]
(يَوْمَانِ يَلْعَبُونَ فِيهِمَا): وَهُمَا: يَوْمُ النَّيْرُوزِ، وَيَوْمُ الْمِهْرَجَانِ. كَذَا قَالَهُ الشُّرَّاحُ. وَفِي الْقَامُوسِ: النَّيْرُوزُ: أَوَّلُ يَوْمِ السَّنَةِ مُعَرَّبُ نَوْرُوزٍ.
বাংলা অনুবাদ:
“দুটি দিন, যেদিন তারা খেলাধুলা করত”—সেগুলো নওরোজের দিন ও মেহেরজানের দিন। ব্যাখ্যাকারীরা এমনই বলেছেন। কামুসে আছে: নওরোজ বছরের প্রথম দিন; এটি নওরোজ শব্দের আরবিকৃত রূপ।
উৎসবের সামাজিক কাজ গ্রহণ করে তার পুরোনো ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক পরিচয় বদলে দেওয়ার এই নীতি ইসলামের গঠনে গুরুত্বপূর্ণ। পূর্ববর্তী আচার সম্পূর্ণ অদৃশ্য হওয়ার বদলে নতুন কাঠামোর ভেতরে পুনর্বিন্যস্ত হয়। ঈদের ক্ষেত্রে দুটি দিনের আনন্দকে নতুন উপবাসচক্র ও উৎসর্গচক্রের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে মানুষের উৎসবের স্বাভাবিক প্রয়োজন ধর্মীয় আনুগত্যের নির্দিষ্ট সময়ে আবদ্ধ হয়। “আল্লাহ উত্তম দিন দিয়েছেন” ঘোষণাটি দিনগুলোর মর্যাদার দাবি; সামাজিক বিন্যাসের পরিবর্তনটি মানুষের ইতিহাসের ঘটনা।
আশুরাকে ইহুদিদের ঈদ বলা বর্ণনাটিও উৎসব ও উপবাসের পুরোনো সম্পর্ক দেখায়। কোনো দিন উৎসবের মর্যাদা পেলেই তার আচারে ভোজ থাকা বাধ্যতামূলক নয়; ধর্মীয় স্মৃতির সঙ্গে উপবাসও যুক্ত হতে পারে। ইসলামে একটি পুরোনো দিনের উপবাস গ্রহণ এবং অন্য দুটি দিনের উৎসব প্রতিস্থাপন—দুই ধরনের নির্বাচন হয়েছে। পরিচিত সংস্কৃতি থেকে কী নেওয়া হবে এবং কী নতুন পরিচয়ে বদলানো হবে, তা এক ধর্মীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হয়েছে।
নিজস্ব ঈদের ঘোষণা: আনন্দের মধ্যে সম্প্রদায়ের সীমানা
আয়েশার বর্ণনায় ঈদের দিন আনসারিদের দুই বালিকা বুআসের দিনের কথাবার্তা নিয়ে গান করছিল। আবু বকর সেই গানকে মুহাম্মদের ঘরে ‘শয়তানের বাদ্য’ বলে আপত্তি করেন। মুহাম্মদ তখন ঈদের পরিচয় সামনে এনে বলেন, প্রত্যেক সম্প্রদায়ের উৎসব আছে এবং এটি তাঁদের উৎসব। এই বক্তব্যে উৎসবের সর্বজনীন সামাজিক প্রচলন এবং তার মাধ্যমে পৃথক সম্প্রদায় চিহ্নিত করার নীতি একই সঙ্গে উপস্থিত। মানুষ আগে থেকেই গান করত, আনন্দ করত এবং নিজেদের জীবনের স্মৃতি উৎসবের মধ্যে বহন করত। নতুন ধর্মীয় নেতৃত্ব সেই পরিচিত কার্যক্রমের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করছে নিজের অনুমোদিত উৎসবের পরিচয় দিয়ে। [185]
حَدَّثَنَا عُبَيْدُ بْنُ إِسْمَاعِيلَ، قَالَ حَدَّثَنَا أَبُو أُسَامَةَ، عَنْ هِشَامٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَائِشَةَ ـ رضى الله عنها ـ قَالَتْ دَخَلَ أَبُو بَكْرٍ وَعِنْدِي جَارِيَتَانِ مِنْ جَوَارِي الأَنْصَارِ تُغَنِّيَانِ بِمَا تَقَاوَلَتِ الأَنْصَارُ يَوْمَ بُعَاثَ ـ قَالَتْ وَلَيْسَتَا بِمُغَنِّيَتَيْنِ ـ فَقَالَ أَبُو بَكْرٍ أَمَزَامِيرُ الشَّيْطَانِ فِي بَيْتِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَذَلِكَ فِي يَوْمِ عِيدٍ. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم «يَا أَبَا بَكْرٍ إِنَّ لِكُلِّ قَوْمٍ عِيدًا، وَهَذَا عِيدُنَا».
বাংলা অনুবাদ:
উবাইদ ইবনে ইসমাঈল আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আবু উসামা আমাদের বর্ণনা করেছেন; হিশাম থেকে, তিনি তাঁর পিতা থেকে, তিনি আয়েশা থেকে। আয়েশা বলেন: আবু বকর প্রবেশ করলেন। তখন আমার কাছে আনসারিদের দুই বালিকা ছিল। তারা বুআসের দিনে আনসারিরা পরস্পর যা বলেছিল, তা নিয়ে গান করছিল। আয়েশা বলেন: তারা গায়িকা ছিল না। আবু বকর বললেন, ‘আল্লাহর রাসুলের ঘরে শয়তানের বাদ্য!’ দিনটি ছিল ঈদের দিন। তখন আল্লাহর রাসুল বললেন, ‘হে আবু বকর! প্রত্যেক সম্প্রদায়ের উৎসব আছে, আর এটি আমাদের উৎসব।’
‘আমাদের ঈদ’ কথাটি উৎসবকে গোষ্ঠীর পরিচয়সূচক চিহ্নে পরিণত করে। একই দিনে সমবেত হওয়া, একই আচরণ করা এবং সেই দিনকে নিজেদের বলে ঘোষণা করার মাধ্যমে সম্প্রদায়ের সীমারেখা দৃশ্যমান হয়। বুআসের স্মৃতিবাহী গান নতুন উৎসবের ঘরেও স্থান পাচ্ছে; তার গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করছেন মুহাম্মদ। আবু বকরের আপত্তি ও মুহাম্মদের অনুমোদনের মধ্যে আনন্দের বিষয়বস্তুর ওপর ধর্মীয় কর্তৃত্বের প্রয়োগও দেখা যায়। কোন গান চলবে এবং কোন উপলক্ষে চলবে, সেই সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত রুচি থেকে ধর্মীয় অনুমোদনের বিষয়ে পরিণত হয়।
এই বর্ণনায় আনন্দের বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্য ‘আমাদের’ পরিচয়টিই সামনে আনা হয়েছে। উৎসবের মধ্যে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, গান, স্মৃতি ও অবসর আগে থেকেই ছিল; ধর্মীয়ভাবে স্বীকৃত দিন সেই কার্যক্রমকে নতুন পরিচয়ের অধীনে সংগঠিত করে। ফলে উৎসবের সঙ্গে একটি আনুগত্যও যুক্ত হয়: মানুষ নির্দিষ্ট দিন পালন করে প্রকাশ করে, সে কোন সম্প্রদায়ের অংশ। বছরে ফিরে আসা এই আয়োজন পরিচয়কে বারবার অনুশীলন করায়। একসঙ্গে বড় হওয়া শিশুদের কাছেও সম্প্রদায়ের পরিচয় গান, পোশাক, সমাবেশ ও নির্দিষ্ট দিনের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
ঈদের দিনে রোজা নিষিদ্ধ: খাওয়া ও উপবাসের সময় নির্ধারণ
নতুন উৎসবের সঙ্গে খাওয়া ও উপবাসের নির্দিষ্ট বিধানও যুক্ত হয়েছে। উমরের ঈদের বক্তব্যে মুহাম্মদের নির্দেশ হিসেবে দুই ঈদের দিনে রোজা নিষিদ্ধ করার কথা এসেছে। একটি দিনকে রোজা সমাপ্তির দিন এবং অন্যটিকে উৎসর্গের পশুর মাংস খাওয়ার দিন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা নাম দুটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপবাস ও উৎসর্গচক্র তাই মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যগ্রহণ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করে। ধর্মীয় পঞ্জিকার নির্দিষ্ট অবস্থান অনুসারে একই উপবাস পালনীয় অথবা নিষিদ্ধ আচারে পরিণত হয়। [186]
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يُوسُفَ، أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ أَبِي عُبَيْدٍ، مَوْلَى ابْنِ أَزْهَرَ قَالَ شَهِدْتُ الْعِيدَ مَعَ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ ـ رضى الله عنه ـ فَقَالَ هَذَانِ يَوْمَانِ نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَنْ صِيَامِهِمَا يَوْمُ فِطْرِكُمْ مِنْ صِيَامِكُمْ، وَالْيَوْمُ الآخَرُ تَأْكُلُونَ فِيهِ مِنْ نُسُكِكُمْ. قَالَ أَبُو عَبْدِ اللَّهِ قَالَ ابْنُ عُيَيْنَةَ مَنْ قَالَ مَوْلَى ابْنِ أَزْهَرَ فَقَدْ أَصَابَ وَمَنْ قَالَ مَوْلَى عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَوْفٍ فَقَدْ أَصَابَ.
বাংলা অনুবাদ:
আবদুল্লাহ ইবনে ইউসুফ আমাদের বর্ণনা করেছেন। মালিক আমাদের জানিয়েছেন; ইবনে শিহাব থেকে, তিনি ইবনে আযহারের মাওলা আবু উবাইদ থেকে। আবু উবাইদ বলেন: আমি উমর ইবনুল খাত্তাবের সঙ্গে ঈদে উপস্থিত ছিলাম। তিনি বললেন, ‘এই দুটি দিনে আল্লাহর রাসুল রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন: যেদিন তোমরা নিজেদের রোজা শেষ করে রোজা ভাঙো এবং অন্য দিনটি, যেদিন তোমরা নিজেদের উৎসর্গের পশু থেকে খাও।’ আবু আবদুল্লাহ বলেন: ইবনে উয়াইনা বলেছেন, যে তাঁকে ইবনে আযহারের মাওলা বলেছে, সে সঠিক বলেছে; আর যে তাঁকে আবদুর রহমান ইবনে আউফের মাওলা বলেছে, সেও সঠিক বলেছে।
এই নিষেধাজ্ঞায় উৎসব পালন ও ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা পরস্পরের সঙ্গে বাঁধা। রোজার ঈদে উপবাস চালিয়ে যাওয়ার ব্যক্তিগত ইচ্ছার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হচ্ছে; উৎসর্গের ঈদে পশুর মাংস খাওয়ার দিনটিও একই বিধানের আওতায়। ফলে উৎসবের গ্রহণযোগ্য প্রকাশ আগেই নির্ধারিত: নির্দিষ্ট সময়ে উপবাস শেষ হবে, নির্দিষ্ট সময়ে উৎসর্গের খাবার গ্রহণের উপলক্ষ আসবে। দিনটির ধর্মীয় শ্রেণিবিভাগ মানুষের শারীরিক আচরণের মূল্যায়ন নির্ধারণ করে। সময়ের ওপর কর্তৃত্ব এখানে শরীরের ওপর কর্তৃত্বেও রূপ নেয়।
উমর এই নিষেধাজ্ঞা ঈদের সমাবেশেই পুনরায় ঘোষণা করছেন। প্রতিষ্ঠাতার নির্দেশ পরবর্তী নেতৃত্বের মুখে জনসমক্ষে পুনরুচ্চারিত হয়ে সম্প্রদায়ের নিয়মে স্থায়িত্ব পায়। বছরের নির্দিষ্ট দিন মানুষের কাছে পরিচিত হয় নির্দিষ্ট করণীয় ও বর্জনীয় দিয়ে। একটি উৎসব এভাবে খাদ্যাভ্যাস, উপাসনা এবং নেতৃত্বের নির্দেশকে একই ব্যবস্থার মধ্যে জুড়ে দেয়। ‘উত্তম দিন’ ঘোষণার বাস্তব অর্থের মধ্যে এই পালনবিধানগুলোও অন্তর্ভুক্ত: নতুন দিন গ্রহণের সঙ্গে মানুষের পুরোনো সময়বোধ ও দৈনন্দিন অভ্যাস নতুন ধর্মীয় নির্দেশের অধীন হয়।
ঈদের প্রকাশ্য সমাবেশ: একই দিনে সমবেত ধর্মীয় পরিচয়
উম্মে আতিয়্যার বর্ণনায় ঈদের দিন বাইরে বের হওয়ার নির্দেশের মধ্যে ঘরে থাকা কুমারী এবং ঋতুমতী নারীদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাঁরা লোকজনের পেছনে অবস্থান করবেন, অন্যদের সঙ্গে তাকবির ও প্রার্থনায় অংশ নেবেন এবং দিনটির বরকত ও পবিত্রতা প্রত্যাশা করবেন। উৎসবের আয়োজন এখানে বিস্তৃত জনগোষ্ঠীকে একই সময়ে একই ধর্মীয় ঘোষণার মধ্যে আনে। পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি, সমবেত উচ্চারণ এবং দিনটির বিশেষ পবিত্রতার প্রত্যাশা মিলিয়ে একটি প্রকাশ্য ধর্মীয় পরিচয় তৈরি হয়। [187]
حَدَّثَنَا مُحَمَّدٌ، حَدَّثَنَا عُمَرُ بْنُ حَفْصٍ، قَالَ حَدَّثَنَا أَبِي، عَنْ عَاصِمٍ، عَنْ حَفْصَةَ، عَنْ أُمِّ عَطِيَّةَ، قَالَتْ كُنَّا نُؤْمَرُ أَنْ نَخْرُجَ يَوْمَ الْعِيدِ، حَتَّى نُخْرِجَ الْبِكْرَ مِنْ خِدْرِهَا، حَتَّى نُخْرِجَ الْحُيَّضَ فَيَكُنَّ خَلْفَ النَّاسِ، فَيُكَبِّرْنَ بِتَكْبِيرِهِمْ، وَيَدْعُونَ بِدُعَائِهِمْ يَرْجُونَ بَرَكَةَ ذَلِكَ الْيَوْمِ وَطُهْرَتَهُ.
বাংলা অনুবাদ:
মুহাম্মদ আমাদের বর্ণনা করেছেন। উমর ইবনে হাফস আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমার পিতা আমাদের বর্ণনা করেছেন; আসিম থেকে, তিনি হাফসা থেকে, তিনি উম্মে আতিয়্যা থেকে। উম্মে আতিয়্যা বলেন: আমাদের ঈদের দিন বের হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হতো। এমনকি আমরা কুমারী মেয়েকে তার অন্তঃপুর থেকে বের করে আনতাম এবং ঋতুমতী নারীদেরও বের করে আনতাম। তাঁরা লোকজনের পেছনে থাকতেন, অন্যদের তাকবিরের সঙ্গে তাকবির বলতেন এবং অন্যদের প্রার্থনার সঙ্গে প্রার্থনা করতেন। তাঁরা সেই দিনের বরকত ও পবিত্রতা প্রত্যাশা করতেন।
এই ব্যবস্থায় উৎসবের সামাজিক শক্তি খুব নির্দিষ্টভাবে কাজে লাগে। ঘরের ভেতরে বিচ্ছিন্ন অবস্থানে থাকা মানুষদের একই দিনে বাইরে আনা হয়; সমবেত তাকবিরে তাঁদের কণ্ঠও একই ধর্মীয় ঘোষণায় যুক্ত হয়। অন্যদের উপস্থিতি প্রত্যেকে প্রত্যক্ষ করে, ফলে সম্প্রদায়ের সদস্যতা পারস্পরিকভাবে দৃশ্যমান হয়। নির্দিষ্ট দিনটির সঙ্গে বরকত ও পবিত্রতার প্রত্যাশা যুক্ত থাকায় সেখানে উপস্থিত হওয়াও ধর্মীয় মূল্য পায়। এমন সমাবেশ ধর্মীয় পরিচয়কে মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় গেঁথে দেওয়ার কার্যকর সামাজিক ব্যবস্থা।
পুরোনো উৎসবে উপহার: আনন্দ থেকে কুফরের অভিযোগ
মোল্লা আলি কারির ব্যাখ্যায় পুরোনো উৎসব প্রতিস্থাপনের পরিণতি কেনাকাটা ও উপহার বিনিময় পর্যন্ত পৌঁছেছে। তিনি মুযহিরের নামে নওরোজ, মেহেরজান ও অন্যান্য অমুসলিম উৎসবকে সম্মান করার নিষেধাজ্ঞা উল্লেখ করেছেন। এরপর আবু হাফস আল-কাবিরের নামে বলেছেন, দিনটিকে সম্মান জানিয়ে একজন মুশরিককে একটি ডিম উপহার দিলেও কুফর হবে এবং আমল নষ্ট হবে। কাজি আবুল মাহাসিনের উদ্ধৃতিতে দিনটির ধর্মীয় মর্যাদা স্বীকারের উদ্দেশ্য এবং প্রচলিত অভ্যাস অনুযায়ী আনন্দ বা ভালোবাসা প্রকাশের উদ্দেশ্য আলাদা করা হয়েছে। প্রথমটির জন্য কুফর এবং দ্বিতীয়টির জন্য অনুকরণের কারণে মাকরুহের বিধান এসেছে। [188]
قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: قُلْ بِفَضْلِ اللَّهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَلِكَ فَلْيَفْرَحُوا. قَالَ الْمُظْهِرُ: فِيهِ دَلِيلٌ عَلَى أَنَّ تَعْظِيمَ النَّيْرُوزِ وَالْمِهْرَجَانِ وَغَيْرِهِمَا أَيْ: مِنْ أَعْيَادِ الْكُفَّارِ مَنْهِيٌّ عَنْهُ. قَالَ أَبُو حَفْصٍ الْكَبِيرُ الْحَنَفِيُّ: مَنْ أَهْدَى فِي النَّيْرُوزِ بَيْضَةً إِلَى مُشْرِكٍ تَعْظِيمًا لِلْيَوْمِ فَقَدْ كَفَرَ بِاللَّهِ تَعَالَى، وَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُ.
وَقَالَ الْقَاضِي أَبُو الْمَحَاسِنَ: الْحَسَنُ بْنُ مَنْصُورٍ الْحَنَفِيُّ: مَنِ اشْتَرَى فِيهِ شَيْئًا لَمْ يَكُنْ يَشْتَرِيهِ فِي غَيْرِهِ، أَوْ أَهْدَى فِيهِ هَدِيَّةً إِلَى غَيْرِهِ فَإِنْ أَرَادَ بِذَلِكَ تَعْظِيمَ الْيَوْمِ كَمَا يُعَظِّمُهُ الْكَفَرَةُ فَقَدْ كَفَرَ، وَإِنْ أَرَادَ بِالشِّرَاءِ التَّنَعُّمَ وَالتَّنَزُّهَ، وَبِالْإِهْدَاءِ التَّحَابَّ جَرْيًا عَلَى الْعَادَةِ، لَمْ يَكُنْ كُفْرًا لَكِنَّهُ مَكْرُوهٌ كَرَاهَةَ التَّشَبُّهِ بِالْكَفَرَةِ، حِينَئِذٍ فَيُحْتَرَزُ عَنْهُ اهـ.
বাংলা অনুবাদ:
আল্লাহ বলেছেন: ‘বলো, আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর রহমতের জন্যই তারা আনন্দ করুক।’ মুযহির বলেছেন: এতে প্রমাণ আছে যে নওরোজ, মেহেরজান এবং কাফিরদের অন্যান্য উৎসবকে সম্মান করা নিষিদ্ধ। হানাফি আবু হাফস আল-কাবির বলেছেন: যে ব্যক্তি নওরোজের দিনটিকে সম্মান জানিয়ে কোনো মুশরিককে একটি ডিম উপহার দেয়, সে আল্লাহর সঙ্গে কুফর করে এবং নিজের আমল বিনষ্ট করে।
হানাফি কাজি আবুল মাহাসিন আল-হাসান ইবনে মানসুর বলেছেন: যে ব্যক্তি ওই দিনে এমন কিছু কেনে, যা অন্য দিনে কিনত না, অথবা ওই দিনে অন্য কাউকে উপহার দেয়—এতে তার উদ্দেশ্য যদি কাফিরদের মতো দিনটিকে সম্মান করা হয়, তাহলে সে কুফর করেছে। আর কেনাকাটার উদ্দেশ্য যদি হয় সুখভোগ ও আনন্দ করা এবং উপহারের উদ্দেশ্য যদি হয় প্রচলিত অভ্যাস অনুযায়ী পারস্পরিক ভালোবাসা প্রকাশ, তাহলে তা কুফর হবে না; কিন্তু কাফিরদের অনুকরণের কারণে তা মাকরুহ হবে। সে ক্ষেত্রে তা থেকে বিরত থাকতে হবে। উদ্ধৃতি সমাপ্ত।
এই বিধানের বিচার্য বিষয় হচ্ছে উপহারের সঙ্গে যুক্ত ধর্মীয় পরিচয় ও উদ্দেশ্য। একটি ডিম দেওয়ার ঘটনায় কাউকে আঘাত করা, সম্পদ হরণ করা বা প্রতারণার কোনো বিবরণ নেই। দিনটিকে সম্মান জানানোর উদ্দেশ্য থাকলেই উপহারটি কুফরের অভিযোগে পরিণত হচ্ছে। একই বস্তু, একই দান এবং একই প্রাপককে কেন্দ্র করে এত কঠোর রায়ের ভিত্তি উৎসবের পরিচয়। মানুষের ছোট একটি সৌজন্যকেও এভাবে ধর্মীয় আনুগত্য পরীক্ষার উপকরণ করা হয়। অন্য সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ দিনকে সম্মান জানানোর বিনিময়ে নিজের সমগ্র আমল হারানোর ভয় জুড়ে দেওয়া সামাজিক সম্পর্কের ওপর সরাসরি ধর্মীয় চাপ।
কাজি আবুল মাহাসিনের উদ্ধৃতিটি এই নিয়ন্ত্রণের পরিধি আরও পরিষ্কার করে। তিনি প্রচলিত রীতি অনুযায়ী ভালোবাসা প্রকাশের উদ্দেশ্যকে আলাদা করেও কাজটিকে মাকরুহ বলেছেন। ফলে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সামাজিক সৌজন্যের নিজস্ব মূল্যও ধর্মীয় অনুকরণের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাচ্ছে না। প্রতিবেশী বা পরিচিত মানুষের সঙ্গে একটি আনন্দের উপলক্ষ ভাগ করার সময় ব্যক্তিকে ভাবতে হচ্ছে, তার আচরণ অন্য ধর্মের সঙ্গে সাদৃশ্য তৈরি করছে কি না। এই বিধানে সম্প্রদায়ের বিভাজন রক্ষার স্বার্থ মানবিক সম্পর্কের ওপর স্থান পায়। উপহার, খাবার, কেনাকাটা ও অবসর—সাধারণ সামাজিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে ধর্মীয় সীমানার পাহারায় বসানো হয়।
উৎসব নির্ধারণে শরিয়তের একচেটিয়া কর্তৃত্ব
ইবনে তাইমিয়া উৎসবকে কিবলা, নামাজ ও রোজার সঙ্গে একই বিধানগত শ্রেণিতে রেখেছেন। তাঁর বক্তব্যে উৎসব ধর্মীয় বিধান ও পরিচয়ের প্রধান চিহ্ন; অন্য ধর্মের উৎসবে অংশগ্রহণ সেই ধর্মের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আচারে অংশগ্রহণ হিসেবে বিচার্য। ইসলামওয়েবের উৎসবসংক্রান্ত ফতোয়ায় তাঁর এই বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে। এখানে উৎসবের ওপর নিয়ন্ত্রণের নীতিটি সরাসরি বলা আছে: অন্য সম্প্রদায়ের উৎসবের কিছু অংশে অংশগ্রহণকেও কুফরের কোনো শাখার সঙ্গে সাদৃশ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে এবং ন্যূনতম অবস্থাতেও পাপ বলা হচ্ছে। [189]
الأعياد من جملة الشرع والمناهج والمناسك، التي قال الله سبحانه: {لِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنْسَكًا هُمْ نَاسِكُوهُ} [الحج: 67] كالقبلة، والصلاة، والصيام، فلا فرق بين مشاركتهم في العيد وبين مشاركتهم في سائر المناهج، فإن الموافقة في جميع العيد موافقة في الكفر.
والموافقة في بعض فروعه موافقة في بعض شعب الكفر، بل الأعياد هي من أخص ما تتميز به الشرائع، ومن أظهر ما لها من الشعائر، فالموافقة فيها موافقة في أخص شرائع الكفر، وأظهر شعائره ولا ريب أن الموافقة في هذا قد تنتهي إلى الكفر في الجملة بشروطه، وأما مبدؤها فأقل أحواله أن تكون معصية.
বাংলা অনুবাদ:
উৎসব শরিয়ত, ধর্মীয় পথ ও আচারগুলোর অন্তর্ভুক্ত। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন: ‘প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য আমি একটি আচার নির্ধারণ করেছি, যা তারা পালন করে।’ [হজ ২২:৬৭] এটি কিবলা, নামাজ ও রোজার মতো। ফলে তাদের উৎসবে অংশগ্রহণ এবং তাদের অন্যান্য ধর্মীয় পদ্ধতিতে অংশগ্রহণের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। উৎসবের সবকিছুতে তাদের সঙ্গে মিল রাখা কুফরের ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে মিল রাখা।
উৎসবের কিছু শাখায় তাদের সঙ্গে মিল রাখা কুফরের কিছু শাখায় মিল রাখা। বরং উৎসব ধর্মীয় বিধানগুলোর স্বাতন্ত্র্যের সবচেয়ে বিশেষ বৈশিষ্ট্য এবং সবচেয়ে প্রকাশ্য নিদর্শনগুলোর অন্তর্ভুক্ত। ফলে এতে তাদের সঙ্গে মিল রাখা কুফরের সবচেয়ে বিশেষ বিধান ও সবচেয়ে প্রকাশ্য নিদর্শনে মিল রাখা। এ ধরনের মিল সংশ্লিষ্ট শর্ত পূরণ হলে সামগ্রিকভাবে কুফর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে; আর এর প্রাথমিক পর্যায়ের ন্যূনতম অবস্থাও পাপ।
ইবনে তাইমিয়ার যুক্তিতে উৎসবের ধর্মীয় পরিচয়ই অংশগ্রহণের অপরাধ নির্ধারণ করছে। মানুষের মধ্যে সম্পর্ক গড়া, আনন্দ ভাগ করা কিংবা কারও গুরুত্বপূর্ণ দিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার সামাজিক মূল্য এই বিচারে অধস্তন। উৎসবকে নামাজ ও কিবলার সমপর্যায়ের পরিচয়চিহ্ন হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার ফলে অন্যদের সঙ্গে উৎসব ভাগ করা নিজের বিশ্বাসের সীমান্ত অতিক্রমের অভিযোগে পরিণত হয়। ধর্মীয় ব্যবস্থাটি এভাবে সমষ্টিগত আনন্দের ক্ষেত্রেও একচেটিয়া আনুগত্য দাবি করে। কার সঙ্গে কোন উপলক্ষে মানুষ মিলিত হবে, সেই স্বাধীনতার ওপর পাপ ও কুফরের ভয় প্রয়োগ করা হয়।
যাকাত ছিল প্রাক ইসলামিক প্রথা
দান, যাত্রীর খাবার, উপাসনাকেন্দ্রের জন্য সম্পদ এবং দেবতার নামে উৎসর্গ ইসলামপূর্ব আরবের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে ছিল। কুরাইশের রিফাদায় মানুষ সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ দিত এবং সেই অর্থে হজের মৌসুমে খাবার ও পানীয়ের ব্যবস্থা করা হতো। পবিত্র কেন্দ্রের দায়িত্ব এবং সামাজিক মর্যাদা এই সমষ্টিগত অর্থসংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ফলে সম্পদ সংগ্রহ করে একটি ধর্মীয় সমাবেশ ও অভাবী মানুষের প্রয়োজন পূরণ করার ধারণা ইসলামের আগে থেকেই পরিচিত। নতুন ধর্ম পরে এই পুরোনো সামাজিক জগতের মধ্যে বাধ্যতামূলক যাকাত ও সাদাকার নিজস্ব বিধান প্রতিষ্ঠা করে।
ইসলামে যাকাতকে সম্পদ ও ব্যক্তির পবিত্রতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। দানের বস্তুগত ফল হলো সম্পদ এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির কাছে যাওয়া; ধর্মীয় ব্যাখ্যায় তার সঙ্গে পাপ, শুদ্ধতা ও ঐশী পুরস্কারের হিসাবও জুড়ে যায়। আগের আরব সমাজের উৎসর্গ, খাবার বিতরণ ও পবিত্র কেন্দ্রের জন্য সম্পদ সংগ্রহ সেই অর্থনৈতিক-ধর্মীয় পরিবেশের অংশ ছিল। কোরআনে পূর্ববর্তী মানুষের আল্লাহ ও অন্য উপাস্যদের নামে শস্য ও গবাদিপশুর অংশ নির্ধারণের উল্লেখও আছে। কোন দেবতার নামে কোন অংশ দেওয়া হবে, সে বিষয়ে ধর্মীয় কর্তৃত্ব বদলেছে, কিন্তু সম্পদকে পবিত্র উদ্দেশ্যে ভাগ করার ধারণার একটি পূর্বইতিহাস ছিল। [190]
রিফাদার প্রকৃতি ইবনে মানজুরের লিসানুল আরব অভিধানে নির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত হয়েছে। সমষ্টিগত অর্থসংগ্রহ এবং তীর্থযাত্রীদের খাবারের ব্যবস্থা এই সংজ্ঞার কেন্দ্র। [191]
والرفادة: شيء كانت قريش تترافد به في الجاهلية، فيخرج كل إنسان مالا بقدر طاقته فيجمعون من ذلك مالا عظيما أيام الموسم، فيشترون به للحاج الجزر والطعام والزبيب للنبيذ، فلا يزالون يطعمون الناس حتى تنقضي أيام موسم الحج، وكانت الرفادة والسقاية لبني هاشم، والسدانة واللواء لبني عبد الدار، وكان أول من قام بالرفادة هاشم بن عبد مناف وسمي هاشما لهشمه الثريد.
বাংলা অনুবাদ:
রিফাদা হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে জাহেলি যুগে কুরাইশরা পরস্পরকে সাহায্য করত। প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ দিত। মৌসুমে তারা এর মাধ্যমে অনেক অর্থ সংগ্রহ করত এবং তা দিয়ে তীর্থযাত্রীদের জন্য উট, খাবার ও নাবিয তৈরির কিশমিশ কিনত। হজের মৌসুমের দিনগুলো শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা মানুষকে খাওয়াত। রিফাদা ও সিকায়ার দায়িত্ব ছিল বনু হাশিমের হাতে; আর মন্দিরের তত্ত্বাবধান ও পতাকার দায়িত্ব ছিল বনু আবদুদ্দারের হাতে। প্রথম রিফাদার ব্যবস্থা করেন হাশিম ইবনে আবদে মানাফ; সারিদের জন্য রুটি ভাঙতেন বলে তাঁর নাম হয় হাশিম।
এই ব্যবস্থায় মানুষের সামর্থ্য, সমষ্টিগত তহবিল এবং প্রাপকের খাদ্য—তিনটি বাস্তব উপাদান আছে। অর্থসংগ্রহের কারণ ও ফল বুঝতে অতিপ্রাকৃত কোনো অনুমান লাগে না। একই কাজ ধর্মীয় মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত হলে আয়োজক পরিবার ও পবিত্র কেন্দ্রও সম্মান ও প্রভাব পায়। ফলে দান শুধু দরিদ্রের সাহায্য নয়, প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা বজায় রাখার উপায়ও হতে পারে। ইসলামি যাকাতের বিধান এই বৃহত্তর ইতিহাসের মধ্যে সম্পদের ওপর নতুন ধর্মীয় দাবি ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। তীর্থযাত্রীর সাহায্য ও ধর্মীয় কেন্দ্রের কর্তৃত্বের এই সংযোগ পূর্ববর্তী আরব সমাজেই কার্যকর ছিল।
যাকাত গ্রহণের সঙ্গে পবিত্রতার সম্পর্ক কোরআনের সরাসরি ভাষাতেই আছে। [192]
خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِم بِهَا وَصَلِّ عَلَيْهِمْ ۖ إِنَّ صَلَاتَكَ سَكَنٌ لَّهُمْ ۗ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
বাংলা অনুবাদ:
তাদের সম্পদ থেকে সাদাকা গ্রহণ করো, যার মাধ্যমে তুমি তাদের পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবে; আর তাদের জন্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয় তোমার প্রার্থনা তাদের প্রশান্তি। আল্লাহ শ্রবণকারী, জ্ঞানী।
এখানে সম্পদ গ্রহণকারী নেতৃত্ব ব্যক্তির ধর্মীয় শুদ্ধতার সঙ্গেও যুক্ত। অর্থ দেওয়া এবং পবিত্র হওয়া একই নির্দেশে বাঁধা হয়েছে; তার সঙ্গে নেতার প্রার্থনার মর্যাদাও আছে। এমন কাঠামো সম্পদ সংগ্রহের জন্য একটি শক্তিশালী আধ্যাত্মিক ভিত্তি তৈরি করে। দাতার বাস্তব দায়িত্বের সঙ্গে অদৃশ্য পবিত্রতার প্রতিশ্রুতি জুড়ে গেলে অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব ধর্মীয় আনুগত্যের অংশ হয়ে যায়। এই সংযোগের সামাজিক শক্তি বোঝা যায়, কিন্তু শুদ্ধতার অলৌকিক হিসাব স্বাধীনভাবে মাপা যায় না।
ইহুদি ধর্মে দান ও সামাজিক ন্যায়
ইহুদি ধর্মে দরিদ্রের সহায়তা, কৃষিজ উৎপাদনের অংশ নির্ধারণ এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য সম্পদ দেওয়ার বিধান ইসলামের বহু আগেই ছিল। ত্সেদাকা শব্দের ন্যায়সঙ্গত আচরণ ও ধার্মিকতার অর্থ থেকে দানের বিশেষ ব্যবহার গড়ে উঠেছে। মা’আসের হলো দশমাংশ, আর তেরুমা উৎসর্গ বা আলাদা করে দেওয়া অংশের পরিচয়। এগুলো সব একই বিধানের নাম নয়; বিভিন্ন প্রাপকের জন্য পৃথক আর্থিক দায়িত্ব ছিল। দ্বিতীয় বিবরণে ফসলের দশমাংশ, লেবীয়, বিদেশি, অনাথ ও বিধবার জন্য বরাদ্দের নির্দিষ্ট নির্দেশ আছে। [193]
দ্বিতীয় বিবরণ ১৪:২২–২৯; কিং জেমস অনুবাদ:
22. Thou shalt truly tithe all the increase of thy seed, that the field bringeth forth year by year.
23. And thou shalt eat before the LORD thy God, in the place which he shall choose to place his name there, the tithe of thy corn, of thy wine, and of thine oil, and the firstlings of thy herds and of thy flocks; that thou mayest learn to fear the LORD thy God always.
24. And if the way be too long for thee, so that thou art not able to carry it; or if the place be too far from thee, which the LORD thy God shall choose to set his name there, when the LORD thy God hath blessed thee:
25. Then shalt thou turn it into money, and bind up the money in thine hand, and shalt go unto the place which the LORD thy God shall choose:
26. And thou shalt bestow that money for whatsoever thy soul lusteth after, for oxen, or for sheep, or for wine, or for strong drink, or for whatsoever thy soul desireth: and thou shalt eat there before the LORD thy God, and thou shalt rejoice, thou, and thine household,
27. And the Levite that is within thy gates; thou shalt not forsake him; for he hath no part nor inheritance with thee.
28. At the end of three years thou shalt bring forth all the tithe of thine increase the same year, and shalt lay it up within thy gates:
29. And the Levite, (because he hath no part nor inheritance with thee,) and the stranger, and the fatherless, and the widow, which are within thy gates, shall come, and shall eat and be satisfied; that the LORD thy God may bless thee in all the work of thine hand which thou doest.
বাংলা অনুবাদ:
২২। তোমার ক্ষেত থেকে বছরের পর বছর যে শস্য উৎপন্ন হয়, তার সমস্ত বৃদ্ধির দশমাংশ অবশ্যই পৃথক করবে।
২৩। তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু নিজের নাম প্রতিষ্ঠার জন্য যে স্থান বেছে নেবেন, সেখানে তাঁর সামনে তোমার শস্য, দ্রাক্ষারস ও তেলের দশমাংশ এবং গরু-ভেড়ার প্রথমজাত বাচ্চা খাবে; যেন তুমি তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভুকে সব সময় ভয় করতে শেখো।
২৪। তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু তোমাকে আশীর্বাদ করার পরে যদি পথ এত দীর্ঘ হয় যে তুমি সেগুলো বহন করতে না পারো, অথবা তিনি নিজের নাম প্রতিষ্ঠার জন্য যে স্থান বেছে নেবেন তা যদি অনেক দূরে হয়,
২৫। তাহলে সেগুলো অর্থে বদলে নেবে, সেই অর্থ হাতে বেঁধে তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভুর নির্বাচিত স্থানে যাবে।
২৬। তোমার যা ইচ্ছা হয়—গরু, ভেড়া, দ্রাক্ষারস, মদ্য কিংবা অন্য যা চাও—তা কিনতে সেই অর্থ খরচ করবে। সেখানে তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভুর সামনে তুমি ও তোমার পরিবার খাবে এবং আনন্দ করবে।
২৭। তোমার জনপদে থাকা লেবীয়কে পরিত্যাগ করবে না; কারণ তোমার সঙ্গে তার কোনো অংশ বা উত্তরাধিকার নেই।
২৮। প্রতি তিন বছরের শেষে সেই বছরে তোমার উৎপাদনের সমস্ত দশমাংশ বের করে তোমার জনপদে জমা করবে।
২৯। তখন লেবীয়—কারণ তোমার সঙ্গে তার কোনো অংশ বা উত্তরাধিকার নেই—এবং তোমার জনপদে থাকা বিদেশি, অনাথ ও বিধবা এসে খেয়ে তৃপ্ত হবে; যেন তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু তোমার হাতের সমস্ত কাজে তোমাকে আশীর্বাদ করেন।
এই বিধানে উৎপাদনের অংশ, নির্দিষ্ট সময় এবং নির্দিষ্ট প্রাপক একত্র হয়েছে। তিন বছরের শেষে স্থানীয়ভাবে সংরক্ষিত অংশ জমিহীন লেবীয়, বিদেশি, অনাথ ও বিধবার খাবারে ব্যবহারের নির্দেশ আছে। ফলে বাধ্যতামূলক সম্পদবণ্টনের ধর্মীয় কাঠামো ইসলামি যাকাতের অনেক আগেই উপস্থিত। ঈশ্বরের সন্তুষ্টি, দাতার দায়িত্ব এবং দুর্বল মানুষের প্রয়োজন আগে থেকেই একই ধর্মীয় ব্যবস্থায় যুক্ত ছিল। নতুন ধর্ম একটি পূর্বপরিচিত সামাজিক সমস্যার জন্য নিজস্ব হার, শর্ত ও আদায়ব্যবস্থা স্থাপন করেছে। নির্গমনে আবার পবিত্র স্থাপনার উপকরণের জন্য স্বেচ্ছায় উৎসর্গ গ্রহণের নির্দেশ আছে। [194]
Speak unto the children of Israel, that they bring me an offering: of every man that giveth it willingly with his heart ye shall take my offering.
বাংলা অনুবাদ:
ইস্রায়েলীয়দের বলো, তারা যেন আমার জন্য উৎসর্গ আনে; প্রত্যেক ব্যক্তি তার মন যেমন অনুপ্রাণিত হয়, সেই অনুসারে তারা আমার জন্য উৎসর্গ আনবে।
নির্গমনের এই তেরুমা প্রসঙ্গে পরের পদগুলোতে পবিত্র স্থাপনার উপকরণের তালিকা আছে। দান কখনো দরিদ্রের জীবিকার জন্য, কখনো পুরোহিত বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য এবং কখনো উপাসনাকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। এই বিভিন্ন খাত একসঙ্গে ধর্মীয় অর্থনীতির ইতিহাস তৈরি করে। ইসলামেও ব্যক্তি-সহায়তা, ধর্মীয় কর্তব্য এবং নেতৃত্বের মাধ্যমে সম্পদ আদায় পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। যাকাত শব্দের পবিত্রতা ও বৃদ্ধির অর্থ সেই দানের ধর্মীয় মূল্যায়নের অংশ; আগের দানের রীতির সঙ্গে তুলনা করলে একই ধরনের সম্পদ-পবিত্রতার সম্পর্ক পাওয়া যায়।

দশমাংশের নির্দেশ মানুষের জীবিকার ওপর ধর্মীয় কর্তৃত্বের একটি নির্দিষ্ট রূপ। উৎপাদককে নিজের ফলনের সবটুকু ব্যক্তিগত সম্পদ হিসেবে রাখতে দেওয়া হচ্ছে না; একটি অংশ ঈশ্বরের নামে পৃথক করতে হচ্ছে। সেই অংশ কোথায় যাবে, কারা তা খাবে এবং কখন সংরক্ষণ হবে, সেটিও বিধানে নির্ধারিত। সাহায্যের বস্তুগত ফল বাস্তব: খাদ্যহীন মানুষ খাদ্য পেতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে দাতা ও উৎপাদকের ওপর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়। সাহায্যের সামাজিক প্রয়োজন এবং ধর্মীয় কর্তৃত্বের অর্থনৈতিক ভূমিকা তাই এক ব্যবস্থায় পাশাপাশি থাকে।
সম্পদ বিতরণকে একটি ধর্মের অলৌকিক নৈতিক উদ্ভাবন হিসেবে প্রচার করলে আগের এই আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলো অস্বীকার করা হয়। দরিদ্রের প্রয়োজন মানুষের সমাজের পুরোনো বাস্তবতা; তার উত্তরও বিভিন্ন সমাজ দিয়েছে। ইসলামি যাকাতের বিচার করতে হলে কেবল নামের পবিত্রতা নয়, আদায়ের নিয়ম, প্রাপকের অধিকার এবং বণ্টনের ফল পরীক্ষা করতে হয়। একটি ব্যবস্থা আগে থেকে থাকা সামাজিক ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে নতুন শর্ত তৈরি করতে পারে। সেই শর্তকে ঈশ্বরপ্রদত্ত বলার ঘোষণা তার পূর্ববর্তী মানবীয় ইতিহাসের বিকল্প নয়।
খ্রিস্টধর্মে দান দ্বারা আত্মশুদ্ধি
খ্রিস্টীয় ধর্মীয় পাঠেও দানের সঙ্গে আত্মশুদ্ধি, বিনয় ও পরকালীন পুরস্কারের সম্পর্ক আছে। মথির সুসমাচারে দানকে মানুষের সামনে আত্মপ্রচারের বদলে গোপনে করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দাতার সামাজিক মর্যাদা পাওয়ার ইচ্ছাকে প্রত্যাখ্যান করে ঈশ্বরের পুরস্কারের দিকে লক্ষ্য সরানো হয়েছে। অর্থাৎ সম্পদ দেওয়ার কাজের পাশাপাশি দাতার উদ্দেশ্যও ধর্মীয় মূল্যায়নের অধীন। [195]
মথি ৬:১–৪; কিং জেমস অনুবাদ:
1. Take heed that ye do not your alms before men, to be seen of them: otherwise ye have no reward of your Father which is in heaven.
2. Therefore when thou doest thine alms, do not sound a trumpet before thee, as the hypocrites do in the synagogues and in the streets, that they may have glory of men. Verily I say unto you, They have their reward.
3. But when thou doest alms, let not thy left hand know what thy right hand doeth:
4. That thine alms may be in secret: and thy Father which seeth in secret himself shall reward thee openly.
বাংলা অনুবাদ:
১। মানুষের চোখে পড়ার জন্য তাদের সামনে দান করা থেকে সাবধান হও; তাহলে স্বর্গে থাকা তোমাদের পিতার কাছে তোমাদের কোনো পুরস্কার থাকবে না।
২। তাই দান করার সময় নিজের সামনে তূরী বাজিয়ো না, যেমন ভণ্ডেরা মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য উপাসনালয়ে ও রাস্তায় করে। আমি তোমাদের সত্য বলছি, তারা তাদের পুরস্কার পেয়ে গেছে।
৩। বরং দান করার সময় তোমার ডান হাত কী করছে, তা তোমার বাঁ হাতকেও জানতে দিয়ো না।
৪। যেন তোমার দান গোপন থাকে; আর তোমার পিতা, যিনি গোপনে দেখেন, নিজেই তোমাকে প্রকাশ্যে পুরস্কার দেবেন।
টোবিতের পাঠে দান মৃত্যুর হাত থেকে উদ্ধার এবং পাপ পরিষ্কার করার সঙ্গে আরও সরাসরি যুক্ত। এখানে দানের বস্তুগত উপকারের বাইরে একটি অলৌকিক প্রতিদানের দাবি আছে। [196]
For alms doth deliver from death, and shall purge away all sin. Those that exercise alms and righteousness shall be filled with life:
বাংলা অনুবাদ:
কারণ দান মৃত্যুর হাত থেকে উদ্ধার করে এবং সমস্ত পাপ পরিষ্কার করে। যারা দান ও ন্যায়াচরণ করে, তারা জীবনে পরিপূর্ণ হবে।
গোপনে করা দান এবং মানুষের প্রশংসার জন্য দান—এই পার্থক্য দাতার উদ্দেশ্য নিয়ন্ত্রণের ভাষা। একই সময়ে পরকালীন পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি কাজটির প্রেরণা হিসেবে থাকে। ফলে দান একটি সামাজিক সাহায্য এবং অদৃশ্য প্রতিদানের বিনিয়োগ—দুই অর্থ পায়। ইসলামে নিয়ত, সাদাকা এবং পবিত্রতার যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তার আগে থেকেই এই ধরনের ধর্মীয় নৈতিক হিসাব প্রচলিত ছিল। দানের সঙ্গে আত্মশুদ্ধি জুড়ে দেওয়া তাই ইসলামের জন্য ইতিহাসহীন কোনো নতুন ধারণা নয়।
দান পাপ মুছে দেয়—এ দাবির যৌক্তিক সমস্যাও সুস্পষ্ট। কোনো ব্যক্তি অন্যের ক্ষতি করে থাকলে সেই ক্ষতির বাস্তব প্রতিকার হলো অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া ও ভুক্তভোগীর ক্ষতি পূরণ করা। আরেক খাতে দান করার কারণে পূর্বের ক্ষতি নিজে থেকে দূর হয় না। ধর্মীয় হিসাব দানের সঙ্গে অদৃশ্য পাপমোচন যুক্ত করলে নৈতিক দায়কে আনুষ্ঠানিক লেনদেনে রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। মানুষের সহায়তার মূল্য তার বাস্তব ফলে; অলৌকিক দায়মুক্তির প্রতিশ্রুতি তার পৃথক ধর্মীয় দাবি। এই পার্থক্য পুরোনো ও নতুন উভয় ধর্মের দানসংক্রান্ত বক্তব্যের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
তুলনামূলক সংক্ষিপ্তসার
| পরম্পরা | নির্দিষ্ট প্রথা | ধর্মীয় বা সামাজিক কাজ | ইসলামের সঙ্গে তুলনার বিষয় |
|---|---|---|---|
| ইসলামপূর্ব আরব | রিফাদা, তীর্থযাত্রীর খাবার ও পানীয়, উপাস্যদের নামে সম্পদের অংশ। | সামর্থ্য অনুযায়ী সমষ্টিগত সহায়তা, পবিত্র কেন্দ্রের দায়িত্ব ও গোত্রীয় মর্যাদা। | ধর্মীয় পরিসরে সম্পদ সংগ্রহ ও বণ্টনের পূর্ববর্তী আঞ্চলিক পরিবেশ। |
| ইহুদি ধর্ম | মা’আসের, দরিদ্র ও জমিহীনদের বরাদ্দ, পবিত্র স্থাপনার জন্য তেরুমা। | ঈশ্বরের আদেশ, উৎপাদনের অংশ নির্ধারণ ও নির্দিষ্ট প্রাপকের জীবিকা। | বাধ্যতামূলক সম্পদবণ্টন, নির্দিষ্ট প্রাপক ও ধর্মীয় বৈধতা। |
| খ্রিস্টীয় পাঠ | গোপন দান এবং টোবিতে দানের মাধ্যমে পাপ পরিষ্কারের দাবি। | মানুষের প্রশংসার বদলে ঐশী পুরস্কার; দানের আধ্যাত্মিক মূল্য। | সাদাকা, নিয়ত, পবিত্রতা ও পরকালীন প্রতিদানের সম্পর্ক। |
| ইসলাম | যাকাত ও সাদাকা; সম্পদ গ্রহণের মাধ্যমে পবিত্র করার ঘোষণা। | নির্দিষ্ট আর্থিক বিধান, বণ্টন এবং ধর্মীয় আনুগত্য। | পুরোনো ধর্মীয় অর্থনীতির পরিবেশে নিজস্ব বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা। |
এই তুলনায় তিনটি ধারাবাহিক উপাদান পাওয়া যায়: সম্পদ আলাদা করা, মানুষের বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কাছে তা পৌঁছানো এবং কাজটিকে পবিত্রতার ভাষায় মূল্যায়ন করা। সমাজের অভাব ও প্রতিষ্ঠান রক্ষার প্রয়োজন এসব ব্যবস্থাকে অর্থ দেয়। নতুন ধর্ম পুরোনো প্রয়োজন ও কাজকে নিজের বিধানে পুনর্গঠন করে। ফলে কোনো একটি ধর্মে দান বাধ্যতামূলক হওয়ার ঘটনা থেকে সেই ধর্মই দান বা সামাজিক দায়িত্ব প্রথম আবিষ্কার করেছে বলে সিদ্ধান্ত আসে না।
একই সঙ্গে ধর্মীয় অনুশাসনের বাইরে কাজটির বাস্তব ফল পরীক্ষা করা সম্ভব। কত খাদ্য পৌঁছেছে, কার জীবিকা বদলেছে এবং কার হাতে সম্পদের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত হয়েছে, এসব দৃশ্যমান প্রশ্ন। পাপ কমেছে বা আত্মা শুদ্ধ হয়েছে—এগুলো আলাদা বিশ্বাসের ঘোষণা। দানের ইতিহাসে মানুষের পারস্পরিক সহায়তা এবং সেই সহায়তার ওপর ধর্মীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা দুটি সম্পর্কিত স্তর হিসেবে উপস্থিত।
খৎনা এবং আকিকা দেয়া
খতনা ইসলামের প্রবর্তিত প্রথা নয়। বুখারির হিরাক্লিয়াসসংক্রান্ত দীর্ঘ বর্ণনায় আরবদের খতনার কথা আছে। ইহুদি ধর্মে তার আগেই খতনা ঈশ্বরের সঙ্গে অঙ্গীকারের চিহ্ন হিসেবে বিধিবদ্ধ ছিল। আদিপুস্তকে শিশু, পরিবারের সদস্য এবং কেনা দাসের ওপরও এই শারীরিক চিহ্ন আরোপের নির্দেশ আছে। ফলে একটি মানুষের শরীরকে ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্তির চিহ্ন বানানোর ধারণা মুহাম্মদের আগে থেকেই প্রচলিত। ইসলাম সেই পরিচিত প্রথাকে নিজের ফিতরাত ও ধর্মীয় অনুশীলনের ভাষায় মর্যাদা দিয়েছে। [197] [198] [199]
ইবন নাতৃর ছিলেন জেরুযালেমের শাসনকর্তা এবং হিরাকলের বন্ধু ও সিরিয়ার খৃস্টানদের পাদ্রী। তিনি বলেন, ‘হিরাকল যখন জেরুযালেম আসেন, তখন একদিন তাঁকে অত্যন্ত বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। তাঁর একজন বিশিষ্ট সহচর বলল, ‘আমরা আপনার চেহারা আজ বিবর্ণ দেখতে পাচ্ছি’, ইন্ন নাতুর বলেন, হিরাকল ছিলেন জ্যোতিষী, জ্যোতির্বিদ্যায় তাঁর দক্ষতা ছিল। তারা জিজ্ঞাসা করলে তিনি তাদের বললেন, ‘আজ রাতে আমি তারকারাজির দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলাম, খতনাকারীদের বাদশাহ আবির্ভূত হয়েছেন। বর্তমান যুগে কোন্ জাতি খতনা করে’? তারা বলল, ‘ইয়াহুদী ছাড়া কেউ খতনা করে না। কিন্তু তাদের ব্যাপার যেন আপনাকে মোটেই চিন্তিত না করে। আপনার রাজ্যের শহরগুলোতে লিখে পাঠান, তারা যেন সেখানকার সকল ইয়াহুদীকে হত্যা করে ফেলে।’ তারা যখন এ ব্যাপারে ব্যতিব্যস্ত ছিল, তখন হিরাকলের কাছে এক ব্যক্তিকে উপস্থিত করা হলো, যাকে গাস্সানের শাসনকর্তা পাঠিয়েছিল। সে রাসূলুল্লাহ্-এর সম্পর্কে খবর দিচ্ছিল। হিরাকল তার কাছ থেকে খবর জেনে নিয়ে বললেন, ‘তোমরা একে নিয়ে গিয়ে দেখ, তার খতনা হয়েছে কি-না।’ তারা তাকে নিয়ে দেখে এসে সংবাদ দিল, তার খতনা হয়েছে। হিরাকল তাকে আরবদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। সে জওয়াব দিল, ‘তারা খতনা করে।’ তারপর হিরাকল তাদের বললেন, ‘ইনি [রসূলুল্লাহ্। এ উম্মতের বাদশাহ। তিনি আবির্ভূত হয়েছেন।’ এরপর হিরাকল রোমে তাঁর বন্ধুর কাছে লিখলেন। তিনি জ্ঞানে তাঁর সমকক্ষ ছিলেন। পরে হিরাকল হিমস চলে গেলেন। হিমসে থাকতেই তাঁর কাছে তাঁর বন্ধুর চিঠি এলো, যা নবী -এর আবির্ভাব এবং তিনিই যে প্রকৃত নবী, এ ব্যাপারে হিরাকলের মতকে সমর্থন করছিল। তারপর হিরাকল তাঁর হিমসের প্রাসাদে রোমের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের ডাকলেন এবং প্রাসাদের সব দরজা বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। দরজা বন্ধ করা হলো। তারপর তিনি সামনে এসে বললেন, ‘হে রোমবাসী! তোমরা কি কল্যাণ, হিদায়ত এবং তোমাদের রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব চাও? তাহলে এই নবীর বায়’আত গ্রহণ কর।’ এ কথা শুনে তারা জংলী গাধার মত ঊর্ধ্বশ্বাসে দরজার দিকে ছুটল, কিন্তু তারা তা বন্ধ অবস্থায় পেল। হিরাকল যখন তাদের অনীহা লক্ষ্য করলেন এবং তাদের ঈমান থেকে নিরাশ হয়ে গেলেন, তখন বললেন, ‘ওদের আমার কাছে ফিরিয়ে আন।’ তিনি বললেন, ‘আমি একটু আগে যে কথা ‘বলেছি, তা দিয়ে তোমরা তোমাদের দীনের উপর কতটুকু অটল, কেবল তার পরীক্ষা করেছিলাম। এখন আমি তা দেখে নিলাম।’ একথা শুনে তারা তাঁকে সিজদা করল এবং তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হলো। এই ছিল হিরাকল-এর শেষ অবস্থা।

মোবারকপুরীর সীরাতেও আবদুল মুত্তালিবের মাধ্যমে সপ্তম দিনে মুহাম্মদের খতনা ও নামকরণের বিবরণ এসেছে। এই কাহিনিতে ঘটনাটি নবুওয়াতের বহু আগে পরিবারের প্রচলিত আচারের অংশ। নবুওয়াতের পরে যে কাজ ধর্মীয় মর্যাদা পেয়েছে, সীরাতের স্মৃতিতে তা তাঁর নিজের শৈশবেই উপস্থিত। শিশুর ধর্মীয় পরিচয় এবং শরীরের ওপর পরিবারের সিদ্ধান্ত আগের সমাজের প্রথা হিসেবেই কাজ করছিল। [200]

আকিকার ক্ষেত্রেও পূর্ববর্তী প্রথা গ্রহণ ও কিছু উপাদান বদলের সরাসরি বিবরণ আছে। আবু দাউদে বুরাইদা বলেছেন, জাহেলি যুগে শিশুর জন্মে পশু জবাই করে মাথায় রক্ত মাখানো হতো; ইসলামের পরে পশু জবাই ও মাথা মুণ্ডন বহাল রেখে রক্তের বদলে জাফরান ব্যবহার করা হয়। সামুরার বর্ণনায় রক্ত মাখানো এবং নামকরণের শব্দ নিয়ে সংকলকের নিজস্ব মন্তব্যও আছে। রক্তমাখা ও নামকরণের এই শব্দভেদ আচারটির প্রচারিত বিবরণের ভেতরেও পরিবর্তনের সাক্ষ্য বহন করে। [201] [202]
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
১০/ কুরবানী নিয়ম-কানুন
পরিচ্ছেদঃ ২১. আক্বীকাহর বর্ণনা
২৮৩৭। সামুরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ প্রত্যেক শিশু তার আক্বীকাহর সাথে বন্ধক থাকে। সপ্তম দিনে তার পক্ষ থেকে আক্বীকাহ করতে হয়, মাথা মুড়াতে হয় এবং (মাথায়) রক্ত মাখাতে হয়। কাতাদাহকে জিজ্ঞেস করা হলো, রক্ত কিভাবে মাখতে হয়? তিনি বলেন, আক্বীকাহর পশু যবাহ করে তা থেকে একটু পশম দিয়ে তাতে রক্ত মেখে তা বাচ্চার মাথায় নরম তালুতে রেখে দিবে। অতঃপর মাথা থেকে সূতার ন্যায় রক্ত গড়িয়ে পড়লে মাথা ধুইয়ে তা ন্যাড়া করবে। আবূ দাঊদ বলেন, ‘রক্তমাখার’ শব্দটি হাম্মামের ধারণামূলক, অন্যরা তা বর্জন করেছেন। আবূ দাঊদ বলেন, এখন এ হাদীস আমলযোগ্য নয়।[1]
[1]. সহীহঃ তবে ويدمى কথাটি বাদে। মাহফূয হলো و يسمى যেমন নীচের বর্ণনাটি। ইরওয়া (১১৬৫)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সামুরাহ ইবনু জুনদুব (রাঃ)
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
১০/ কুরবানী নিয়ম-কানুন
পরিচ্ছেদঃ ২১. আক্বীকাহর বর্ণনা
২৮৪৩। বুরাইদাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, জাহিলী যুগে আমাদের কারো সন্তান জন্মগ্রহণ করলে সে একটি বকরী যবাহ করতো এবং শিশুর মাথায় ঐ পশুর রক্ত মেখে দিতো। অতঃপর আল্লাহ যখন দীনে ইসলাম আনলেন, ‘আমরা বকরী যবাহ করতাম, শিশুর মাথা মুন্ডন করতাম এবং তাতে যা‘ফরান মাখতাম।[1]
[1]. হাসান সহীহ।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ বুরায়দাহ ইবনু হুসাইব আল-আসলামী (রাঃ)
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
১০/ কুরবানী নিয়ম-কানুন
পরিচ্ছেদঃ ২১. আক্বীকাহর বর্ণনা
২৮৪২। ‘আমর ইবনু শু‘আইব (রহঃ) থেকে পর্যায়ক্রমে তার পিতার ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। তিনি (দাদা) বলেন, একদা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আক্বীকাহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ আল্লাহ আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা ও অবাধ্যতা পছন্দ করেন না। বর্ণনাকারীর ধারণা, তিনি আক্বীকাহ নামটি অপছন্দ করেছিলেন। তিনি বলেনঃ যার কোনো সন্তান জন্মগ্রহণ করে এবং যে তার পক্ষ থেকে পশু উৎসর্গ করতে চায়, সে তা করবে। সে যেন ছেলের পক্ষ থেকে সমবয়স্ক দু’টি বকরী এবং মেয়ের পক্ষ থেকে একটি বকরী যবাহ করে।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ফারা‘আ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ ফারা‘আ বৈধ। তোমরা যদি একে এ সময় পর্যন্ত ছেড়ে দাও যে, তা বয়স্ক, শক্তিশালী, ইবনু মাখাদ কিংবা ইবনু লাবূন হয়, তারপর তা কোনো বিধবাকে দিয়ে দাও বা আল্লাহর পথে বাহন হিসেবে প্রদান করো, তাহলে এ কাজ একে যবাহ করে এর গোশত ও লোম চটচটে করার চেয়ে উত্তম হবে। অথবা তোমার উটকে ভারাক্রান্ত করা ও তোমার দুধের পাত্র উপুর করে দেয়ার চেয়ে উত্তম হবে।[1]
[1]. হাসান।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ আমর ইবনু শু‘আয়ব (রহঃ)
বুরাইদার তুলনাটি আচারটির পূর্ববর্তী অস্তিত্বের সরাসরি সাক্ষ্য হিসেবে সংকলিত। তিনি আগে ও পরের কাজ আলাদা করে বলেছেন। পরিবর্তনটি শিশুর জন্মে পশু জবাইয়ের সম্পূর্ণ বিলোপ নয়; মাথায় প্রয়োগ করা পদার্থের পরিবর্তন। এই নির্বাচন বুঝলে পুরোনো প্রথা নতুন ধর্মের মধ্যে প্রবেশের বাস্তব পদ্ধতি দেখা যায়। একটি অংশ দূষিত বা পরিত্যাজ্য বলে বাদ পড়ে, অন্য অংশ নতুন অনুমোদনে পবিত্র হয়। শিশুকে ঘিরে পরিবারের উৎসব, পশু উৎসর্গ এবং ধর্মীয় প্রত্যাশার সামাজিক সম্পর্ক বহাল থাকে।
সামুরার বর্ণনার শেষে আবু দাউদের বক্তব্যও একই ইতিহাসের অংশ। তিনি রক্ত মাখানোর শব্দকে হাম্মামের ভুল বলেছেন এবং সংরক্ষিত অন্য পাঠে নামকরণের কথা থাকার উল্লেখ করেছেন। ফলে সংকলন নিজেই বিভিন্ন শব্দ ও অনুশীলনের মধ্যে গ্রহণ-বর্জনের কাজ করছে। বুরাইদার আগের রক্তমাখার রীতি এবং সংকলকের পরে অগ্রহণযোগ্য চিহ্নিত পাঠ পাশাপাশি পড়লে আচার ও তার বিবরণের পরিবর্তন বোঝা যায়। ধর্মীয় অনুশীলনের চূড়ান্ত রূপ কেবল একটি বাক্যের মাধ্যমে স্থির হয়নি; পুরোনো অভ্যাস, প্রচারিত পাঠ এবং পরবর্তী বিচার একসঙ্গে তা নির্ধারণ করেছে।
ছেলে ও মেয়ের জন্য পশুর সংখ্যায় পার্থক্যও উল্লেখযোগ্য। ছেলের জন্য দুটি এবং মেয়ের জন্য একটি পশুর নির্দেশে জন্মের মুহূর্ত থেকেই আচারগত ব্যয় ও ধর্মীয় প্রতীকে লিঙ্গভিত্তিক বিভাজন তৈরি হয়েছে। শিশুর প্রয়োজন বা তার ব্যক্তিগত গুণের ভিত্তিতে এই পার্থক্য নির্ধারিত নয়; শুধু ছেলে বা মেয়ে হওয়ার ভিত্তিতে সংখ্যা বদলেছে। এ নিয়মকে ঈশ্বরপ্রদত্ত বলার ঘোষণা তার নৈতিক যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করে না। একই পরিবারে দুই শিশুর আগমনকে অসম আচারগত মাপে মূল্যায়ন করা লিঙ্গভিত্তিক পুরোনো সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। [203]
খতনাকে ফিতরাতের মধ্যে রাখার ভাষা হাদিসে স্পষ্ট। [204]
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، رِوَايَةً ” الْفِطْرَةُ خَمْسٌ ـ أَوْ خَمْسٌ مِنَ الْفِطْرَةِ ـ الْخِتَانُ، وَالاِسْتِحْدَادُ، وَنَتْفُ الإِبْطِ، وَتَقْلِيمُ الأَظْفَارِ، وَقَصُّ الشَّارِبِ ”.
বাংলা অনুবাদ:
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত: ফিতরাত পাঁচটি, অথবা পাঁচটি কাজ ফিতরাতের অন্তর্ভুক্ত—খতনা, যৌনাঙ্গের লোম পরিষ্কার, বগলের লোম উপড়ে ফেলা, নখ কাটা এবং গোঁফ ছাঁটা।
চুল বা নখ কাটার মতো পুনরায় বৃদ্ধি পাওয়া অংশের পরিচর্যার সঙ্গে স্থায়ী অঙ্গচ্ছেদনকে একই তালিকায় রাখা হয়েছে। কিন্তু তালিকায় পাশাপাশি থাকা কাজগুলোকে একই প্রকৃতির করে না। শিশুর নিজের সিদ্ধান্তের আগে তার শরীরে ধর্মীয় চিহ্ন স্থাপন পরিবারের ও সম্প্রদায়ের কর্তৃত্ব প্রকাশ করে। তার অমত বা সম্মতির প্রশ্ন উঠবার আগেই পরিচয় স্থায়ী করা হয়। কাজটির প্রাচীনত্ব এবং ধর্মীয় অনুমোদন ইতিহাসের তথ্য; সেই অনুমোদন শিশুর শরীরের ওপর অন্যের সিদ্ধান্তকে নৈতিকভাবে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে তোলে না।
দেনমোহর ছিল পৌত্তলিক প্রথা
দেনমোহর ইসলামের আবিষ্কার নয়। মুহাম্মদের নবুওয়াতের আগের খাদিজার সঙ্গে বিয়েতে দেনমোহরের বিবরণ সীরাতে আছে। ইবনে হিশাম বিশটি তরুণী উটের কথা বলেছেন। বুখারিতে আয়িশার জাহেলি যুগের বিবাহবর্ণনাতেও অভিভাবকের কাছে প্রস্তাব, মোহর দেওয়া এবং বিয়ে করার রীতি সংরক্ষিত। ফলে বিয়ের সঙ্গে আর্থিক দায় যুক্ত করার পরিচিত সামাজিক ব্যবস্থা ইসলাম গ্রহণ করে নিজের বিধানে স্থান দিয়েছে। মোহরসহ বিয়ের এই আর্থিক কাঠামো মুহাম্মদের নিজের নবুওয়াতপূর্ব বিবাহেও কার্যকর ছিল। [205] [206] [207] [208]
খাদীজার সঙ্গে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বিয়ে
রাসূল (সা) খাদীজার এই প্রস্তাব স্বীয় চাচাদেরকে জানালেন। চাচা হামযা রাসূল (সা)-কে সাথে নিয়ে তৎক্ষণাৎ খাদীজার পিতা খুওয়ায়লিদের’ কাছে চলে গেলেন। তার সাথে দেখা করে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব দিলেন এবং অবিলম্বে বিয়ে সম্পন্ন হল।
ইবন হিশাম জানান, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম খাদীজাকে বিশটি তরুণ উট মোহরানা হিসাবে দিয়েছিলেন। খাদীজাই ছিলেন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রথমা স্ত্রী এবং তাঁর জীবদ্দশায় তিনি আর কোন বিয়ে করেননি।

খাদিজার দেনমোহর সম্পর্কে ইবনে হিশামের সম্পূর্ণ বক্তব্য ইসলাম প্রশ্নোত্তরেও উদ্ধৃত হয়েছে। [209]
وأصدقها رسول اللّه صلى الله عليه وسلم عشرين بكرة، وكانت أوّل امرأة تزوّجها رسول اللّه صلى الله عليه وسلم، ولم يتزوّج عليها غيرها حتّى ماتت، رضي الله عنها.
বাংলা অনুবাদ:
রাসুল তাঁকে বিশটি তরুণী উট দেনমোহর দেন। তিনিই রাসুলের প্রথম বিবাহিত স্ত্রী ছিলেন। তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত রাসুল আর কাউকে তাঁর সঙ্গে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেননি।
দেনমোহরের ইসলামপূর্ব পরিচয় শুধু এই বিয়ের একক ঘটনার ওপর নির্ভর করে না। আয়িশার বর্ণিত প্রথম ধরনের বিবাহের কাঠামোতেও একই উপাদান আছে। প্রস্তাব যেত অভিভাবকের কাছে, মোহর ধার্য হতো এবং তারপর বিয়ে সম্পন্ন হতো। পরিবারের নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক বিনিময় ও বৈধ যৌনসম্পর্কের প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করছিল। ইসলাম সেই কাঠামোকে নতুন ধর্মীয় বিধানের ভেতরে বহাল রেখেছে। ফলে মোহর থাকা মাত্রই বিয়ের পুরো ব্যবস্থাকে নারীর সমান স্বাধীনতার প্রমাণ বলা যায় না। অর্থ পাওয়ার বিধান এবং বিবাহে নিজের শরীর ও জীবনের সমান কর্তৃত্ব পৃথক প্রশ্ন।
বিবাহের শর্তের সঙ্গে যৌনাঙ্গ ভোগ বৈধ হওয়ার সম্পর্ক বুখারির সরাসরি ভাষাতেই আছে। [210]
عَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” أَحَقُّ الشُّرُوطِ أَنْ تُوفُوا بِهِ مَا اسْتَحْلَلْتُمْ بِهِ الْفُرُوجَ ”.
বাংলা অনুবাদ:
উকবা ইবনে আমির থেকে বর্ণিত: রাসুল বলেছেন, যেসব শর্তের মাধ্যমে তোমরা যৌনাঙ্গ ভোগ বৈধ করেছ, সেসব শর্ত পূরণ করাই সবচেয়ে বেশি প্রাপ্য।
এই ভাষায় বিয়ের আর্থিক ও চুক্তিগত শর্ত যৌনসম্পর্কের বৈধতার সঙ্গে যুক্ত। মোহরকে শুধু বিমূর্ত উপহার বললে সেই প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক বাদ পড়ে যায়। একই সঙ্গে কোনো নারী অর্থ পেলেই সম্পর্কের বাকি অসম বিধান ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায় না। নৈতিক প্রশ্ন হলো, তাঁর সম্মতি কতটা কার্যকর, তিনি সমান শর্তে সম্পর্ক থেকে বের হতে পারেন কি না এবং যৌনসম্পর্কে তাঁর নিজস্ব সিদ্ধান্তের মর্যাদা কী। একটি পুরোনো আর্থিক প্রথার ওপর ধর্মীয় অনুমোদন বসানো সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর নয়।
একত্রে চার স্ত্রী রাখা
একসঙ্গে একাধিক স্ত্রী রাখা এবং তার সংখ্যাগত সীমা নিয়ে ইসলামের আগে থেকেই ধর্মীয় আইনে আলোচনা ছিল। ব্যাবিলনীয় তালমুদে চার স্ত্রী পর্যন্ত সীমিত থাকার পরামর্শ এবং একাধিক স্ত্রী পালনের আর্থিক সামর্থ্যের আলোচনা ছিল। ইয়েভামোত ৪৪ক-এর প্রসঙ্গ হলো মৃত ভাইদের বিধবাদের সঙ্গে বিবাহের দায়িত্ব; সেখানে চারজনের বেশি না নেওয়ার ভালো পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যাতে প্রত্যেকের দাম্পত্য সময় থাকে। এই বক্তব্য সর্বজনীন নিষেধাজ্ঞার ভাষায় নয়, পরামর্শের ভাষায় এসেছে। তবু চার সংখ্যার ব্যবহার ও সামর্থ্যভিত্তিক বহুবিবাহের যুক্তি ইসলামের অনেক আগের পাঠেই রয়েছে। বহুবিবাহ বহাল রেখে সংখ্যা নির্ধারণকে নারীর সমান অধিকারের সমার্থক করা আরও বড় যুক্তিগত সমস্যা। [211] [212]
ইয়েভামোত ৪৪ক; মূল হিব্রু-আরামীয় পাঠ:
ושבקי ליה והתניא (דברים כה, ח) וקראו לו זקני עירו הן ולא שלוחן ודברו אליו מלמד שמשיאין לו עצה הוגנת לו שאם היה הוא ילד והיא זקנה הוא זקן והיא ילדה אומרין לו מה לך אצל ילדה מה לך אצל זקנה כלך אצל שכמותך ואל תשים קטטה בביתך לא צריכא דאפשר ליה א”ה אפילו טובא נמי עצה טובה קמ”ל ד’ אין טפי לא כי היכי דנמטייה עונה בחדש
বাংলা অনুবাদ:
তাকে কি তা করতে দেওয়া হয়? অথচ শেখানো হয়েছে: “তার নগরের প্রবীণেরা তাকে ডাকবে”—তাঁরা নিজেরা, তাঁদের প্রতিনিধি নয়। “তার সঙ্গে কথা বলবে”—এ থেকে বোঝায়, তাঁরা তাকে উপযুক্ত পরামর্শ দেবেন। সে যুবক আর নারী বৃদ্ধা হলে, কিংবা সে বৃদ্ধ আর নারী যুবতী হলে তাঁরা বলেন: যুবতীর সঙ্গে তোমার কী সম্পর্ক, বৃদ্ধার সঙ্গে তোমার কী সম্পর্ক? তোমার উপযুক্ত কাউকে বেছে নাও এবং নিজের ঘরে কলহ সৃষ্টি কোরো না। উত্তর: এখানে তার সামর্থ্য আছে। তাহলে আরও বেশিসংখ্যকের ক্ষেত্রেও কেন নয়? উত্তর: এখানে ভালো পরামর্শ শেখানো হচ্ছে—চার, এর বেশি নয়; যেন প্রত্যেকের দাম্পত্য পালা মাসে একবার আসে।


ইয়েভামোত ৬৫ক-তে রাবার বক্তব্য আরও সরাসরি: প্রথম স্ত্রীর পাশাপাশি আরও স্ত্রী নেওয়া যাবে, যদি তাঁদের ভরণপোষণের সামর্থ্য থাকে। এর আগের আলোচনায় রাবি আম্মি অন্য অবস্থান নিয়েছেন। ফলে তালমুদের আলোচনায় আর্থিক সামর্থ্য, আগের স্ত্রীর সম্পর্ক এবং নতুন বিবাহের অধিকার নিয়ে বিতর্ক ছিল। ইসলামি বহুবিবাহের আগেই এসব প্রশ্ন ধর্মীয় আইনের অংশ ছিল। [213] [214]
רבא אמר נושא אדם כמה נשים על אשתו והוא דאית ליה למיזיינינהי
আগের ইংরেজি অনুবাদ:
Raba said: A man may marry wives in addition to his first wife; provided only that he possesses the means to maintain them
বাংলা অনুবাদ:
রাবা বলেছেন: একজন পুরুষ তার বর্তমান স্ত্রীর পাশাপাশি আরও স্ত্রী গ্রহণ করতে পারে, যদি তাদের ভরণপোষণের সামর্থ্য তার থাকে।

ইসলামে চার স্ত্রী নির্বাচনের বিধান নতুন ধর্মে প্রবেশকারীর পারিবারিক জীবনেও প্রয়োগ করা হয়েছে বলে হাদিসে আছে। আট স্ত্রী নিয়ে ইসলাম গ্রহণের বর্ণনায় চারজন বেছে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। [215]
عَنِ الْحَارِثِ بْنِ قَيْسٍ، – قَالَ مُسَدَّدٌ ابْنِ عُمَيْرَةَ. وَقَالَ وَهْبٌ الأَسَدِيِّ – قَالَ أَسْلَمْتُ وَعِنْدِي ثَمَانُ نِسْوَةٍ فَذَكَرْتُ ذَلِكَ لِلنَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم ” اخْتَرْ مِنْهُنَّ أَرْبَعًا ” . قَالَ أَبُو دَاوُدَ وَحَدَّثَنَا بِهِ أَحْمَدُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ حَدَّثَنَا هُشَيْمٌ بِهَذَا الْحَدِيثِ فَقَالَ قَيْسَ بْنَ الْحَارِثِ مَكَانَ الْحَارِثِ بْنِ قَيْسٍ قَالَ أَحْمَدُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ هَذَا الصَّوَابُ. يَعْنِي قَيْسَ بْنَ الْحَارِثِ.
বাংলা অনুবাদ:
হারিস ইবনে কাইস থেকে বর্ণিত—মুসাদ্দাদ তাঁকে ইবনে উমাইরা এবং ওয়াহব আসাদি বলেছেন—তিনি বলেন: আমি ইসলাম গ্রহণ করি, তখন আমার আটজন স্ত্রী ছিল। আমি নবীকে সে কথা জানাই। তিনি বলেন: তাঁদের মধ্য থেকে চারজন বেছে নাও। আবু দাউদ বলেন: আহমদ ইবনে ইব্রাহিমও হুশাইমের মাধ্যমে আমাদের এই হাদিস বলেছেন; সেখানে হারিস ইবনে কাইসের বদলে কাইস ইবনে হারিস বলেছেন। আহমদ ইবনে ইব্রাহিম বলেন, এই নামটিই সঠিক, অর্থাৎ কাইস ইবনে হারিস।
নির্বাচনের অধিকার পুরুষের হাতে। কোন স্ত্রী থাকবেন এবং কোন সম্পর্ক শেষ হবে, নির্দেশের ভাষায় সেই সিদ্ধান্ত তিনিই নিচ্ছেন। সংখ্যা কমানো পুরোনো বহুবিবাহের একটি অংশ সীমিত করে, কিন্তু বাকি কাঠামোতে পুরুষের একাধিক স্ত্রী রাখার অধিকার বজায় থাকে। নারীর জন্য সমান বহুস্বামিত্বের অধিকার দেওয়া হচ্ছে না। তাই চার সংখ্যাটি নির্ধারণের ঘটনা থেকে নারী-পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত আসে না। পুরুষের অনুমোদিত অধিকারের সীমা এবং নারীর সমান স্বাধীনতা এক বিষয় নয়।
ইবনে কাসির সূরা নিসার ব্যাখ্যায় শাফেয়ির বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন যে, চারজনের সীমা মুহাম্মদ ছাড়া অন্যদের জন্য। একই আলোচনায় তাঁর একাধিক স্ত্রীর বিষয়টিকে বিশেষাধিকার বলা হয়েছে। [216]
قال الشافعي: وقد دلت سنة رسول الله صلى الله عليه وسلم المبينة عن الله أنه لا يجوز لأحد غير رسول الله صلى الله عليه وسلم أن يجمع بين أكثر من أربع نسوة.
বাংলা অনুবাদ:
শাফেয়ি বলেছেন: আল্লাহর বিধান ব্যাখ্যাকারী রাসুলের সুন্নাহ প্রমাণ করেছে যে, রাসুল ছাড়া অন্য কারও জন্য চারজনের বেশি স্ত্রী একসঙ্গে রাখা বৈধ নয়।
এই ব্যতিক্রমে বিধানদাতা নিজে সাধারণ অনুসারীদের সীমার বাইরে থাকেন। চারজনকে মানুষের ন্যায়সঙ্গত সর্বোচ্চ সীমা বলা হলে সেই সীমা অতিক্রমকারীর বিশেষ অনুমোদনেরও আলাদা যুক্তি প্রয়োজন। কিন্তু এখানে বৈধতা নির্ধারিত হয়েছে ব্যক্তির ধর্মীয় মর্যাদার ভিত্তিতে। সাধারণ পুরুষের একাধিক স্ত্রীর অধিকার, নারীর অসম অবস্থান এবং নেতার অতিরিক্ত বিশেষাধিকার একই ব্যবস্থায় বহাল থাকে। বিধানের সংখ্যাগত সীমাকে নারী-অধিকারের বড় প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করলে এই ক্ষমতাবণ্টন আড়ালে পড়ে যায়।
পুরোনো তালমুদীয় পরামর্শ এবং ইসলামি বিধান উভয় ক্ষেত্রেই আলোচনার কেন্দ্র পুরুষের সামর্থ্য ও একাধিক স্ত্রীর মধ্যে সময় বা দায়িত্ব বণ্টন। প্রত্যেক নারীর নিজের সঙ্গীর ওপর সমান ও পারস্পরিক অধিকারের প্রশ্ন সেই কাঠামোর কেন্দ্র হয়ে ওঠে না। চার সংখ্যার পূর্ববর্তী উপস্থিতি ইসলামের অভিনবত্বের দাবিকে দুর্বল করে; আর পুরুষের বহুবিবাহকে বৈধ রেখে তার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ সমতার দাবি প্রতিষ্ঠা করে না। একটি পুরোনো পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার সীমা নির্ধারণ এবং সেই ব্যবস্থার নৈতিক যথার্থতা দুটি স্বতন্ত্র বিচার্য বিষয়।
আদমের উচ্চতাও ইহুদী ধর্ম থেকে
আদমের উচ্চতা ষাট হাত এবং তাঁর পর থেকে মানুষের আকার ক্রমে ছোট হয়েছে—বুখারি ও মুসলিমে এই দাবি আছে। প্রচলিত আঠারো ইঞ্চি হাত ধরে ষাট হাত প্রায় নব্বই ফুট বা সাতাশ মিটার; প্রাচীন হাতের মাপের ভিন্নতা এই দৈত্যাকৃতির মূল সমস্যার সমাধান করে না। আধুনিক মানুষের পরিচিত শারীরিক গঠন এত বড় করলে হাড়, পেশি ও রক্তসঞ্চালনের ওপর সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার চাপ পড়ে। মানববিবর্তনের জীবাশ্ম ও জিনগত সাক্ষ্যে আবার একটি প্রস্তুত দৈত্যদেহ থেকে মানুষের ক্রমাগত সংকোচনের ইতিহাস পাওয়া যায় না। সেখানে পাওয়া যায় পূর্ববর্তী প্রাণীগোষ্ঠী থেকে বহু প্রজন্ম ধরে পরিবর্তিত জনসমষ্টির ইতিহাস। একদিনে সম্পূর্ণ তৈরি একজন প্রথম মানুষ এবং তাঁর ক্রমশ ছোট হতে থাকা বংশধরের কাহিনি সেই ইতিহাসের বিপরীত। [217] [218] [219] [220]
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৭৯/ অনুমতি প্রার্থনা
পরিচ্ছেদঃ ৭৯/১. সালামের সূচনা
৬২২৭. আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা আদম (আ.)-কে তাঁর যথাযোগ্য গঠনে সৃষ্টি করেছেন, তাঁর উচ্চতা ছিল ষাট হাত। তিনি তাঁকে সৃষ্টি করে বললেনঃ তুমি যাও। উপবিষ্ট ফেরেশতাদের এই দলকে সালাম করো এবং তুমি মনোযোগ সহকারে শোনবে তারা তোমার সালামের কী জবাব দেয়? কারণ এটাই হবে তোমার ও তোমার বংশধরের সম্ভাষণ (তাহিয়্যা)। তাই তিনি গিয়ে বললেনঃ ’আসসালামু ’আলাইকুম’। তাঁরা জবাবে বললেনঃ ’আসসালামু ’আলাইকা ওয়া রহমাতুল্লাহ’। তাঁরা বাড়িয়ে বললেনঃ ’ওয়া রহমাতুল্লাহ’ বাক্যটি। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বললেনঃ যারা জান্নাতে প্রবেশ করবে তারা আদম (আঃ)-এর আকৃতি বিশিষ্ট হবে। তারপর থেকে এ পর্যন্ত মানুষের আকৃতি ক্রমশঃ কমে আসছে। [৩৩২৬] (আধুনিক প্রকাশনী- ৫৭৮৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৬৮১)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৪/ জান্নাত, জান্নাতের নিয়ামত ও জান্নাতবাসীগনের বিবর
পরিচ্ছেদঃ ১১. জান্নাতে এমন অনেক দল জান্নাতে যাবে যাদের হৃদয় পাখির হৃদয়ের ন্যায়
৬৯০০। মুহাম্মদ ইলূন রাফি’ (রহঃ) … হাম্মাম ইবন মুনাব্বি (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এ হচ্ছে (সে সব হাদীস) যা আবূ হুরায়রা (রাঃ) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আমাদের শুনিয়েছেন। (এভাবে) তিনি কয়েকটি হাদীস উল্লেখ করেন। এর মধ্যে একটি হল এ ই যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তাআলা আদম (আলাইহিস সালাম) কে তার নিজ আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন। তার দৈর্ঘ্য হল ষাট হাত। তাকে সৃষ্টি করার পর তিনি তাকে বললেন, যাও, এ দলটিকে সালাম কর। তারা হচ্ছে ফিরিশতাদের উপবিষ্ট একটি দল। সালামের জবাবে তারা কি বলে তা খুব মনোযোগ সহকারে শ্রবণ কর। কেননা তোমার এবং তোমার বংশধরদের অভিবাদন এ-ই। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর তিনি গেলেন ও বললেন, ‘আসসালামু আলাইকুম’। উত্তরে তারা বললেন, ‘আসসালামু আলাইকা ওয়ারহমাতুল্লাহ’। তাঁরা ওয়া রামাতুল্লাহ বাড়িয়ে বলেছেন। এরপর তিনি বললেন, যে ব্যক্তি জান্নাতে যাবে সে আদম (আলাইহিস সালাম) এর আকৃতিতে যাবে। তার দৈর্ঘ্য হবে ষাট হাত। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ এরপর হতে সৃষ্টি (-র দেহের) দেহের পরিমাণ দিন দিন কমতে থাকে আজ পর্যন্ত।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ হাম্মাম ইবনু মুনাব্বিহ (রহঃ)
ইহুদি আগ্গাদিক সাহিত্যেও অতিকায় আদম এবং তাঁর আকার কমিয়ে দেওয়ার কাহিনি আছে। সানহেদ্রিন ৩৮খ-তে আদম পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত কিংবা পৃথিবী থেকে আকাশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলেন বলে দুটি বক্তব্য সংরক্ষিত। অপরাধের পরে ঈশ্বর তাঁর ওপর হাত রেখে তাঁকে ছোট করেন। বাবা বাত্রা ৭৫ক-তে ভবিষ্যৎ মানুষের উচ্চতা নিয়ে বিতর্কে আদমের মাপ তুলনার মানদণ্ড হয়েছে। রাবি মেইরের দুইশ হাতকে আদমের দ্বিগুণ বলা হয়েছে; রাবি ইয়েহুদার একশ হাত ভবিষ্যৎ মানুষের জন্য মন্দিরের উচ্চতার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। অতিমানবিক আদিপুরুষ, পরবর্তী দেহের ভিন্ন মাপ এবং ধর্মীয় তাৎপর্য দিয়ে সেই পরিবর্তন ব্যাখ্যা করার উপকরণ ইসলামপূর্ব ইহুদি সাহিত্যে উপস্থিত। [221] [222] [223]
מיתיבי (ויקרא כו, יג) ואולך אתכם קוממיות רבי מאיר אומר מאתים אמה כשתי קומות של אדם הראשון רבי יהודה אומר מאה אמה כנגד היכל וכתליו שנאמר (תהלים קמד, יב) אשר בנינו כנטיעים מגודלים בנעוריהם בנותינו כזויות מחוטבות תבנית היכל כי קאמר ר’ יוחנן לכווי דבי זיקא
বাংলা অনুবাদ:
আপত্তি উত্থাপিত হলো: “আমি তোমাদের সোজা হয়ে চলিয়েছি।” রাবি মেইর বলেন: দুইশ হাত, প্রথম আদমের উচ্চতার দ্বিগুণ। রাবি ইয়েহুদা বলেন: একশ হাত, মন্দির ও তার দেয়ালের উচ্চতার অনুরূপ; যেমন বলা হয়েছে, “আমাদের পুত্রেরা যেন যৌবনে বেড়ে ওঠা চারাগাছ, আমাদের কন্যারা যেন মন্দিরের আদলে খোদাই করা কোণস্তম্ভ।” রাবি ইয়োহানান যে কথা বলেছিলেন, তা ছিল বাতাস চলাচলের জানালা সম্পর্কে।
সানহেদ্রিনের বর্ণনায় সংকোচনের কারণও নির্দিষ্ট: আদমের অপরাধ। আদিপুরুষের শরীরকে নৈতিক কাহিনির দৃশ্যমান অংশ করে তোলা হয়েছে। [224]
אמר רב יהודה אמר רב אדם הראשון מסוף העולם ועד סופו היה שנאמר למן היום אשר ברא אלהים אדם על הארץ ולמקצה השמים ועד קצה השמים כיון שסרח הניח הקדוש ברוך הוא ידו עליו ומיעטו שנאמר אחור וקדם צרתני ותשת עלי כפך אמר ר”א אדם הראשון מן הארץ עד לרקיע היה שנאמר למן היום אשר ברא אלהים אדם על הארץ ולמקצה השמים כיון שסרח הניח הקב”ה ידו עליו ומיעטו שנאמר אחור וקדם צרתני וגו’ קשו קראי אהדדי אידי ואידי חדא מידה היא
বাংলা অনুবাদ:
রাবি ইয়েহুদা রবের নামে বলেন: প্রথম আদম পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত ছিলেন; যেমন বলা হয়েছে, “ঈশ্বর যেদিন পৃথিবীতে মানুষ সৃষ্টি করেছেন, সেদিন থেকে এবং আকাশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত।” তিনি অপরাধ করলে পবিত্র সত্তা তাঁর ওপর হাত রেখে তাঁকে ছোট করেন; যেমন বলা হয়েছে, “তুমি আমাকে পেছনে ও সামনে ঘিরেছ এবং আমার ওপর তোমার হাত রেখেছ।” রাবি এলিয়াজার বলেন: প্রথম আদম পৃথিবী থেকে আকাশ পর্যন্ত ছিলেন; যেমন বলা হয়েছে, “ঈশ্বর যেদিন পৃথিবীতে মানুষ সৃষ্টি করেছেন, সেদিন থেকে এবং আকাশের প্রান্ত পর্যন্ত।” তিনি অপরাধ করলে পবিত্র সত্তা তাঁর ওপর হাত রেখে তাঁকে ছোট করেন; যেমন বলা হয়েছে, “তুমি আমাকে পেছনে ও সামনে ঘিরেছ।” দুটি পদকে পরস্পরের বিরোধী মনে হলে উত্তর হলো: উভয়টিই একই মাপ।
হাদিসের ষাট হাত এবং তালমুদের অন্য মাপগুলো এক নয়; মিলটি রয়েছে কাহিনির কাঠামোয়। প্রথম মানবের শরীর বর্তমান মানুষের তুলনায় অসাধারণ বড়, আর পরবর্তী মানুষের শরীর তার ছোট সংস্করণ। কোনো কঙ্কাল মেপে এই মাপ নির্ধারণ করা হয়নি। ধর্মীয় কর্তৃত্বের বক্তব্য থেকেই শরীরের ইতিহাস তৈরি হয়েছে। পূর্ববর্তী আদমকাহিনির এই উপস্থিতি ইসলামের বর্ণনাকে পরিচিত পৌরাণিক ধারার মধ্যে স্থাপন করে। ষাট হাতের নতুন সংখ্যা সেই ধারাকে বৈজ্ঞানিক নৃতত্ত্বে পরিণত করে না।
দেহের মাপ বাড়ানোর সমস্যাটি সাধারণ হিসাবেই বোঝা যায়। একই অনুপাত রেখে উচ্চতা পনেরো গুণ করলে হাড়ের আড়াআড়ি ক্ষেত্রফল বাড়ে পনেরোর বর্গ, অর্থাৎ দুইশ পঁচিশ গুণ; দেহের আয়তন ও ভর বাড়ে পনেরোর ঘন, অর্থাৎ তিন হাজার তিনশ পঁচাত্তর গুণ। ফলে হাড়ের প্রতি একক ক্ষেত্রফলে বহন করতে হওয়া ওজন হয় আগের পনেরো গুণ। সত্তর কিলোগ্রামের দেহের একই অনুপাতের বিশাল সংস্করণ প্রায় দুইশ ছত্রিশ টন হবে। শুধু উচ্চতার সংখ্যা বদলে মানুষের পরিচিত হাড়-পেশিকে সেই ওজন বহনের উপযোগী করা যায় না। হাদিসে এমন ভিন্ন শারীরবৃত্তীয় ব্যবস্থার কোনো বর্ণনা নেই; মানুষের পরিচিত আকৃতিকেই বিশাল করে কল্পনা করা হয়েছে।
“মানুষ ক্রমে ছোট হচ্ছে” দাবিটিও আলাদা পরীক্ষাযোগ্য বক্তব্য। সত্য হলে প্রাচীন কঙ্কাল, মানুষের বসতি, ব্যবহারের উপকরণ এবং প্রজন্মগত মাপে সেই ধারাবাহিক সংকোচনের চিহ্ন পাওয়ার কথা। মানববিবর্তনের সাক্ষ্য এমন একমুখী রেখা দেয় না। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দৈহিক গঠনের মানবপ্রজাতি ছিল এবং খাদ্য, পরিবেশ ও জনগোষ্ঠীভেদে উচ্চতার পরিবর্তনও হয়েছে। আকারের এই বাস্তব বৈচিত্র্যকে একটি দৈত্যদেহ থেকে অবিরাম ক্ষুদ্র হওয়ার কাহিনি দিয়ে প্রতিস্থাপন করা প্রকৃত ইতিহাসকে বিকৃত করে। আদমের বিশালতা বিশ্বাসের গল্প হিসেবে প্রচারিত; তার পক্ষে মানবদেহের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় না।
ইসলামের সৃষ্টিতত্ত্ব
ইসলামের সৃষ্টিকাহিনিতে পানির ওপর আরশ, নির্দিষ্ট দিনে সৃষ্টি, স্তরে স্তরে আসমান, নীচে পৃথিবী এবং আকাশের আলোগুলোর জন্য নির্ধারিত কাজের যে ছবি পাওয়া যায়, তার বহু উপাদান পূর্ববর্তী ধর্মীয় সাহিত্যে আছে। প্রকৃতিকে বোঝার জন্য প্রাচীন মানুষ নিজের পরিচিত জগতের ভাষা ব্যবহার করেছে: শাসকের আসন, ঘরের ছাদ, বিছানো জমি, জলভাগ, সীমানা এবং আকাশের প্রদীপ। ইসলাম এসব পরিচিত উপকরণকে আল্লাহর একচ্ছত্র সৃষ্টিশক্তির অধীনে পুনর্বিন্যস্ত করেছে। বহুদেবতার বদলে একজন সর্বময় সত্তা এলেও মহাজগতের পুরোনো স্থাপত্য ও কাহিনির বহু অংশ বহাল থাকে।
এই বর্ণনাগুলোর শক্তি ধর্মীয় ঘোষণায়, পরিমাপে নয়। কোন স্তরের ওপরে কে থাকেন, কোন বস্তু কেন তৈরি হয়েছে এবং মানুষের সামনে দৃশ্যমান জগতের পেছনে কার নির্দেশ কাজ করে—প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া হয় কর্তৃত্বপূর্ণ বাক্যে। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আবার সেই জগতের উপাদান, বয়স, গতি ও পরিবর্তন পরীক্ষা করে। মাপের ফল কোনো ধর্মীয় বর্ণনার সঙ্গে না মিললে ভুলটি ধর্মীয় বর্ণনার মধ্যেই থাকে। পুরোনো কাহিনিকে নতুন ঈশ্বরের নামে বলা তার ভৌত দাবিগুলোকে সত্য করে না।
থেলিসের পানিদর্শন, বাইবেল ও কোরআন
কোরআনে আসমান-জমিন সৃষ্টির প্রসঙ্গে আল্লাহর আরশ পানির ওপর ছিল বলা হয়েছে। ইবনে কাসিরও এই পানিকে আসমান-জমিন সৃষ্টির আগের অবস্থার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। এ বর্ণনায় মহাজগতের প্রথম দৃশ্য তৈরি হচ্ছে মানুষের পরিচিত একটি তরল এবং তার ওপর রাজাসনের সাহায্যে। আধুনিক মহাজাগতিক ইতিহাসে পানি কোনো আদিম মৌলিক পদার্থ নয়। পানির অণু তৈরি হয় হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন দিয়ে; প্রাথমিক মহাবিশ্বে প্রধানত হাইড্রোজেন-হিলিয়াম ছিল, আর অক্সিজেনের মতো ভারী মৌল এসেছে নক্ষত্রের ভেতরের প্রক্রিয়ায়। ফলে আসমানি রাজাসনের নিচে প্রস্তুত জলরাশির ছবি পদার্থের উৎপত্তির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার বদলে একটি পরিচিত প্রাচীন সৃষ্টিমোটিফ। [225] [226]
মাইলেটাসের থেলিস খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের গ্রিক চিন্তাবিদ। অ্যারিস্টটল তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন, তিনি পানিকে সমস্ত কিছুর আদিম নীতি মনে করতেন এবং পৃথিবী পানির ওপর অবস্থান করছে বলতেন। জীবনের সঙ্গে আর্দ্রতার সম্পর্ক এবং পানির পরিচিত ভূমিকা থেকে এমন ধারণা তৈরি হয়েছিল বলে অ্যারিস্টটল অনুমান করেছেন। পানিকে প্রথম ধরে মহাজগৎ ব্যাখ্যা করার ধারা থেলিসের মধ্যে একটি দার্শনিক রূপ পায়। আবার অ্যারিস্টটল নিজেই তাঁর আগের দেবকাহিনিতে মহাসাগর ও জলীয় শক্তিকে সৃষ্টির উৎস বলার উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ জলকে প্রাথমিক ধরা একটি বিস্তৃত পুরোনো ভাবনার অংশ; তার সমস্ত রূপকে থেলিসের ব্যক্তিগত প্রভাবের ফল বলা যায় না। [227] [228]

হুদ ১১:৭-এ ছয় দিনে আসমান-জমিন সৃষ্টি এবং পানির ওপর আরশের অবস্থান একই আয়াতে এসেছে। মানুষের কর্মপরীক্ষা ও পুনরুত্থানের দাবিও সেই বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত। [229] [230]
وَهُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا ۗ وَلَئِن قُلْتَ إِنَّكُم مَّبْعُوثُونَ مِن بَعْدِ الْمَوْتِ لَيَقُولَنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا إِنْ هَٰذَا إِلَّا سِحْرٌ مُّبِينٌ
বাংলা অনুবাদ:
তিনিই আসমানসমূহ ও পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, আর তাঁর আরশ ছিল পানির ওপর, যাতে তোমাদের পরীক্ষা করেন—কাজে কে সবচেয়ে উত্তম। তুমি যদি বলো, মৃত্যুর পরে তোমাদের পুনরুত্থিত করা হবে, তবে অবিশ্বাসীরা অবশ্যই বলবে: এ তো সুস্পষ্ট জাদু ছাড়া কিছু নয়।
বুখারি ৭৪২৭-এর উদ্ধৃত বর্ণনাটির অধ্যায়শিরোনামে পানির আয়াত আছে; হাদিসের মূল বক্তব্যে মূসাকে আরশের একটি পায়া ধরে থাকতে দেখার কথা বলা হয়েছে। এতে আরশের দৃশ্যমান অঙ্গের কল্পনা পাওয়া যায়। পানির ওপর আরশ এবং পরবর্তী আসমান-জমিন সৃষ্টির সরাসরি বিবরণ বুখারির ইমরান ইবনে হুসাইনের বর্ণনায় আছে। রাজাসন, তার অবস্থান এবং আগে থেকে থাকা জলরাশি—এগুলো একটি বস্তুগত দৃশ্যের উপাদান হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে। [231] [232]
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৯৭/ তাওহীদ
পরিচ্ছেদঃ ৯৭/২২. আল্লাহর বাণীঃ তখন তাঁর আরশ পানির ওপর ছিল- (সূরাহ হূদ ১১/৭)। তিনি আরশে ‘আযীমের প্রতিপালক- (সূরাহ আত্-তাওবাহ ৯/১২৯)।
৭৪২৭. আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন সব মানুষ বেহুঁশ হয়ে পড়বে। (আমার হুঁশ ফিরলে) তখন আমি মূসা (আঃ)-কে আরশের একটি পায়া ধরে দাঁড়ানো দেখতে পাব।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ)
আদিপুস্তকের সৃষ্টিকাহিনিতেও জলরাশি, তার ওপর ঈশ্বরের আত্মা, জলকে ভাগ করা এবং পরে শুকনো ভূমি প্রকাশ পাওয়ার ধারাবাহিকতা আছে। মহাজগৎ নির্মাণের প্রাথমিক উপকরণ হিসেবে জল আগে থেকেই দৃশ্যে উপস্থিত। আকাশ সেই জলকে ওপর ও নিচে ভাগ করার একটি সীমানা। রাজাসন ও ঈশ্বরের আত্মার ভূমিকা আলাদা হলেও জলের ওপর দৈব উপস্থিতি এবং জল থেকে বাসযোগ্য জগতের বিন্যাস—এই মোটিফ দুটি কাহিনিকে একই পুরোনো কল্পজগতের সঙ্গে যুক্ত করে। [233]
আদিপুস্তক ১
১ শুরুতে, ঈশ্বর আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করলেন। প্রথমে পৃথিবী সম্পূর্ণ শূন্য ছিল; পৃথিবীতে কিছুই ছিল না।
২ অন্ধকারে আবৃত ছিল জলরাশি আর ঈশ্বরের আত্মা সেই জলরাশির উপর দিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছিল।
৬ তারপর ঈশ্বর বললেন, “জলকে দুভাগ করবার জন্য আকাশমণ্ডলের ব্যবস্থা হোক।”
৭ তাই ঈশ্বর আকাশমণ্ডলের সৃষ্টি করে জলকে পৃথক করলেন। এক ভাগ জল আকাশমণ্ডলের উপরে আর অন্য ভাগ জল আকাশমণ্ডলের নীচে থাকল।
৯ তারপর ঈশ্বর বললেন, “আকাশের নীচের জল এক জায়গায় জমা হোক যাতে শুকনো ডাঙা দেখা যায়।” এবং তা-ই হল।
ভারতীয় সৃষ্টিকাহিনিতেও জলের মধ্যে সৃষ্টিবীজ ও সুবর্ণ ডিমের বিবরণ আছে। মনুসংহিতা ১:৮–১৩-এ সেই ধারাবাহিকতা স্পষ্ট: প্রথমে জল, জলে বীজ, তার থেকে সুবর্ণ ডিম, ডিমের মধ্যে ব্রহ্মার জন্ম এবং তার দুই ভাগ থেকে আকাশ-পৃথিবী। ব্রহ্মার মানসসন্তানদের নামও পরে এই গ্রন্থে আছে। জল, বীজ, জন্ম এবং ডিমের পরিচিত অভিজ্ঞতা দিয়ে গোটা মহাজগতের উৎপত্তি কল্পনা করা হয়েছে। [234]
8. He, desiring to produce beings of many kinds from his own body, first with a thought created the waters, and placed his seed in them.
9. That (seed) became a golden egg, in brilliancy equal to the sun; in that (egg) he himself was born as Brahman, the progenitor of the whole world.
10. The waters are called narah, (for) the waters are, indeed, the offspring of Nara; as they were his first residence (ayana), he thence is named Narayana.
11. From that (first) cause, which is indiscernible, eternal, and both real and unreal, was produced that male (Purusha), who is famed in this world (under the appellation of) Brahman.
12. The divine one resided in that egg during a whole year, then he himself by his thought (alone) divided it into two halves;
13. And out of those two halves he formed heaven and earth, between them the middle sphere, the eight points of the horizon, and the eternal abode of the waters.
বাংলা অনুবাদ:
৮। নিজের দেহ থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রাণী উৎপন্ন করার ইচ্ছায় তিনি প্রথমে চিন্তার মাধ্যমে জল সৃষ্টি করলেন এবং তাতে নিজের বীজ রাখলেন।
৯। সেই বীজ সূর্যের মতো উজ্জ্বল একটি সুবর্ণ ডিম হলো; সেই ডিমের মধ্যে তিনি নিজেই সমগ্র জগতের আদিপিতা ব্রহ্মা হিসেবে জন্ম নিলেন।
১০। জলকে নারা বলা হয়, কারণ জল নরের সন্তান। জল তাঁর প্রথম বাসস্থান ছিল বলে তাঁর নাম নারায়ণ।
১১। সেই প্রথম কারণ থেকে, যা অদৃশ্য, চিরন্তন এবং সৎ ও অসৎ উভয়ই, সেই পুরুষের উৎপত্তি হয়, যিনি জগতে ব্রহ্মা নামে পরিচিত।
১২। সেই দৈব সত্তা ডিমের মধ্যে পুরো এক বছর অবস্থান করে নিজের চিন্তার মাধ্যমে তাকে দুই ভাগ করলেন।
১৩। সেই দুই ভাগ থেকে তিনি আকাশ ও পৃথিবী, তাদের মাঝের অঞ্চল, দিগন্তের আট দিক এবং জলের চিরন্তন আবাস তৈরি করলেন।
এ ধরনের কাহিনিতে পরিচিত জল নিজেই আর ব্যাখ্যার বিষয় থাকে না; সেটিকে ধরে পরের জগত তৈরি করা হয়। কিন্তু পানির গঠন, তার উপাদানের উৎপত্তি এবং অণু তৈরির পরিবেশ বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে আলাদা প্রশ্ন। পদার্থের ইতিহাস বোঝাতে জলকে একেবারে প্রথমে বসালে যৌগকে তার উপাদানের ইতিহাসের আগে এনে ফেলা হয়। আসমান-জমিনের আগের জলকে অলৌকিকভাবে তৈরি বলা সম্ভব, কিন্তু তখন বক্তব্যটি প্রাকৃতিক সৃষ্টিবিবরণ থেকে সরাসরি অলৌকিক ঘোষণায় চলে যায়। তার সত্যতা প্রমাণের জন্য প্রাচীন গল্পের বাইরে সাক্ষ্য প্রয়োজন।
পানির ওপর ভাসমান পৃথিবী, জলের ওপর দৈব উপস্থিতি এবং জলকে ভাগ করে বাসযোগ্য জগত তৈরির ধারণাগুলো প্রাচীন মানুষের দৃশ্যমান অভিজ্ঞতার সম্প্রসারণ। জল থেকে ভূমি ওঠে, বন্যায় ভূমি ঢাকে, প্রাণী ও ফসল জলের ওপর নির্ভর করে—এই অভিজ্ঞতা মহাজগতের অতীতে বসানো হয়েছে। ইসলামি বর্ণনায় সেই জগতের ওপর সর্বময় শাসকের আরশ রাখা হয়েছে। পরিচিত উপকথার ভাষা এখানে একেশ্বরবাদী কর্তৃত্বের ভাষা পেয়েছে; পানির রাসায়নিক ও মহাজাগতিক ইতিহাসের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
ইমরান ইবনে হুসাইনের বর্ণনায় সৃষ্টি সম্পর্কে প্রশ্নের সরাসরি উত্তরে পানির ওপর আরশ এবং পরে আসমান-জমিন সৃষ্টির কথা এসেছে। [235]
عن عمران بن حصين قال: دخلت على النبي صلى الله عليه وسلم وعقلت ناقتي بالباب، فأتاه ناس من بني تميم فقال: اقبلوا البشرى يا بني تميم. قالوا: قد بشرتنا فأعطنا، مرتين. ثم دخل عليه ناس من أهل اليمن فقال: اقبلوا البشرى يا أهل اليمن إذ لم يقبلها بنو تميم. قالوا: قد قبلنا يا رسول الله. قالوا: جئناك نسألك عن هذا الأمر. قال: كان الله ولم يكن شيء غيره، وكان عرشه على الماء، وكتب في الذكر كل شيء، وخلق السماوات والأرض. فنادى مناد: ذهبت ناقتك يا ابن الحصين. فانطلقت فإذا هي يقطع دونها السراب، فوالله لوددت أني كنت تركتها.
বাংলা অনুবাদ:
ইমরান ইবনে হুসাইন বলেন: আমি নবীর কাছে এসে দরজায় উটটি বাঁধলাম। বনু তামিমের কিছু লোক এলে তিনি বললেন: হে বনু তামিম, সুসংবাদ গ্রহণ করো। তাঁরা দুবার বললেন: সুসংবাদ দিয়েছেন, এবার আমাদের কিছু দিন। তারপর ইয়েমেনের কিছু লোক এলে তিনি বলেন: হে ইয়েমেনবাসী, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো; বনু তামিম তা নেয়নি। তাঁরা বলেন: আমরা গ্রহণ করেছি, রাসুল। আমরা এই বিষয়ের শুরু সম্পর্কে জানতে এসেছি। তিনি বলেন: আল্লাহ ছিলেন, তিনি ছাড়া অন্য কিছু ছিল না। তাঁর আরশ ছিল পানির ওপর। তিনি যিকরে সবকিছু লিখেছেন এবং আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। তখন কেউ ডাকল: ইবনে হুসাইন, তোমার উট চলে গেছে। আমি বেরিয়ে গেলাম; দেখি মরীচিকা তার সামনে আড়াল সৃষ্টি করছে। আল্লাহর শপথ, উটটি ছেড়ে থাকলেই ভালো হতো বলে আমার মনে হয়েছে।
একটি সভায় মানুষের প্রশ্নের উত্তরে এই মহাজাগতিক ছবি বলা হচ্ছে; বক্তব্যের কর্তৃত্ব আসে বক্তার নবুওয়াত থেকে। জল, আরশ ও সৃষ্টির ক্রমের স্বাধীন পর্যবেক্ষণ সেখানে দেওয়া হয়নি। সেই একই পরিচিত উপাদান পূর্ববর্তী কাহিনিতেও আছে। ফলে মহাজগতের শুরু সম্পর্কে অজানা অবস্থার জায়গায় একটি বিস্তারিত ধর্মীয় দৃশ্য বসে যায়, কিন্তু দৃশ্যটির বিস্তারিততা তার পক্ষে স্বতন্ত্র সাক্ষ্যের কাজ করে না।
ছয়দিনে মহাবিশ্ব সৃষ্টি
পৃথিবীর দিন-রাত তৈরি হয় সূর্যের আলো এবং পৃথিবীর ঘূর্ণনের সম্পর্ক থেকে। মহাবিশ্বের বয়স আবার ঘড়ি, জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ও ভৌত মডেলের সাহায্যে মাপা হয়। সৃষ্টি শুরুর সময় “দিন” বললে সেই সময়ের একক ও ঘটনাক্রম কী—প্রশ্নটি তাই গুরুত্বপূর্ণ। কোরআনে আসমান-জমিনের সৃষ্টি ছয় দিনে বলা হয়েছে, আর অন্য ধর্মীয় বর্ণনায় সপ্তাহের পরিচিত দিনের নামে কাজ ভাগ করা হয়েছে। এই ভাষা মানুষের দৈনন্দিন ক্যালেন্ডারকে মহাজগতের গোড়ায় বসায়। আধুনিক মহাজাগতিক মডেল মহাবিস্ফোরণের একেবারে আগের অবস্থা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করেনি; কিন্তু সূর্য, পৃথিবী ও জীবজগতের পর্যায়ক্রমিক উৎপত্তির যে সাক্ষ্য আছে, তা এই সপ্তাহভিত্তিক নির্মাণসূচির সঙ্গে মেলে না। [236] [237] [238]
নি:সন্দেহ, তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ , যিনি আসমান ও জমীন ছয় দিনে সৃষ্টি করিয়াছেন, অনন্তর সিংহাসনে সমাসীন হইয়াছেন, তিনিই দিনকে রাত্রির দ্বারা আচ্ছাদিত করেন, যাহা উহার পিছনে দৌড়াইয়া চলে এবং তিনিই চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্রসমূহকে তাহার নির্দেশাধীন করিয়াছেন।
তোমাদের প্রতিপালক সেই আল্লাহ তিনি আকাশ ও ভূমন্ডল সৃষ্টি করিয়াছেন ছয় দিবসে, তৎপর তিনি অধিষ্ঠিত হন আরশের উপর।
মুসলিমে সংরক্ষিত আবু হুরাইরার বর্ণনায় শনিবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত সৃষ্টি ভাগ করা হয়েছে। প্রথমে মাটি, পরে পাহাড়, তারপর গাছ, আরও পরে আলো এবং শেষে প্রাণী ও আদম। সাতটি দিনের পরিচিত নাম দিয়ে ঘটনা নির্ধারণ করা হয়েছে; আদমের সৃষ্টিকে শুক্রবার আসরের পরের সময়েও স্থাপন করা হয়েছে। এখানে পৃথিবীর মানুষের সপ্তাহ ও দিনের ধর্মীয় বিভাজন সৃষ্টির আদিসূচি নির্ধারণ করছে। কোন ক্যালেন্ডারে এই দিন গণনা চলছে এবং তখনকার কোনো পর্যবেক্ষক কীভাবে সময়টি মাপবেন, তার ব্যাখ্যা নেই। [239] [240]
সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ৫২। কিয়ামাত, জান্নাত ও জান্নামের বর্ণনা
পরিচ্ছদঃ ১. সৃষ্টির সূচনা এবং আদাম (আঃ) এর সৃষ্টি
৬৯৪৭-(২৭/২৭৮৯) সুরায়জ ইবনু ইউনুস ও হারূন ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রহঃ) ….. আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার হাত ধরে বললেন, আল্লাহ তা’আলা শনিবার দিন মাটি সৃষ্টি করেন এবং এতে পর্বত সৃষ্টি করেন রবিবার দিন। সোমবার দিন তিনি বৃক্ষরাজি সৃষ্টি করেন। মঙ্গলবার দিন তিনি বিপদাপদ সৃষ্টি করেন। তিনি নূর সৃষ্টি করেন বুধবার দিন। তিনি বৃহস্পতিবার দিন পৃথিবীতে পশু-পাখি ছড়িয়ে দেন এবং জুমুআর দিন আসরের পর জুমুআর দিনের শেষ মুহূর্তে অর্থাৎ আসর থেকে নিয়ে রাত পর্যন্ত সময়ের মধ্যবর্তী সময়ে সর্বশেষ মাখলুক আদাম (আঃ) কে সৃষ্টি করেন। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৭৯৭,ইসলামিক সেন্টার ৬৮৫১)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৫৩/ কিয়ামত, জান্নাত ও জাহান্নামের বিবরণ
পরিচ্ছদঃ ২. সৃষ্টির সূচনা এবং আদম (আঃ) এর সৃষ্টি
৬৭৯৭। সুরায়জ ইবনু ইউনুস ও হারুন ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার হাত ধরে বললেন, আল্লাহ তাআলা শনিবার দিন মাটি সৃষ্টি করেন। রোববার দিন তিনি এতে পর্বত সৃষ্টি করেন। সোমবার দিন তিনি বৃক্ষরাজি সৃষ্টি করেন। মঙ্গলবার দিন তিনি আপদ বিপদ সৃষ্টি করেন। বুধবার দিন তিনি নূর সৃষ্টি করেন। বৃহস্পতিবার দিন তিনি পৃথিবীতে পশু-পাখি ছড়িয়ে দেন এবং জুমুআর দিন আসরের পর তিনি আদম (আলাইহিস সালাম) কে সৃষ্টি করেন। অর্থাৎ জুমুআর দিনের সময়সমূহের শেষ মুহূর্তে (মাখলূক) আসর থেকে রাত পর্যন্ত সময়ের মধ্যবর্তী সময়ে তিনি সৃষ্টি করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
আদিপুস্তকেও সৃষ্টি দিনের কাজে ভাগ করা হয়েছে। তৃতীয় দিনে উদ্ভিদ, চতুর্থ দিনে সূর্য-চাঁদ-নক্ষত্র এবং পরে জলজ প্রাণী, পাখি ও স্থলজ প্রাণীর বিবরণ আছে। মহাজগত ও জীবনের ক্রম এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যেন একটি বাসযোগ্য ঘর পর্যায়ক্রমে প্রস্তুত করা হচ্ছে: ভূমি, খাদ্য, আলো, বাসিন্দা। প্রকৃত ইতিহাসে সূর্যের চেয়ে পৃথিবীর গাছপালা পুরোনো নয়, আর পৃথিবীর সূর্যের চেয়ে বহু নক্ষত্র ও ছায়াপথ অনেক পুরোনো। এই ক্রমগুলোর সঙ্গে ধর্মীয় নির্মাণসূচির সংঘাত সরাসরি। [241]
10 ঈশ্বর শুকনো জমির নাম দিলেন, “পৃথিবী” এবং এক জায়গায় জমা জলের নাম দিলেন, “মহাসাগর।” ঈশ্বর দেখলেন ব্যবস্থাটা ভাল হয়েছে।
11 তখন ঈশ্বর বললেন, “পৃথিবীতে ঘাস হোক, শস্যদায়ী গাছ ও ফলের গাছপালা হোক। ফলের গাছগুলিতে ফল আর ফলের ভেতরে বীজ হোক। প্রত্যেক উদ্ভিদ আপন আপন জাতের বীজ সৃষ্টি করুক। এইসব গাছপালা পৃথিবীতে বেড়ে উঠুক।” আর তাই-ই হল।
12 পৃথিবীতে ঘাস আর শস্যদায়ী উদ্ভিদ উত্পন্ন হল। আবার ফলদায়ী গাছপালাও হল, ফলের ভেতরে বীজ হল। প্রত্যেক উদ্ভিদ আপন আপন জাতের বীজ সৃষ্টি করল এবং ঈশ্বর দেখলেন ব্যবস্থাটা ভাল হয়েছে।
13 সন্ধ্যা হল এবং সকাল হল। এভাবে হল তৃতীয় দিন।
14 তারপর ঈশ্বর বললেন, “আকাশে আলো ফুটুক। এই আলো দিন থেকে রাত্রিকে পৃথক করবে। এই আলোগুলি বিশেষ সভাশুরু করার বিশেষ বিশেষ সংকেত হিসেবে ব্যবহৃত হবে। আর দিন ও বছর বোঝাবার জন্য এই আলোগুলি ব্যবহৃত হবে।
15 পৃথিবীতে আলো দেওয়ার জন্য এই আলোগুলি আকাশে থাকবে।” এবং তা-ই হল।
16 তখন ঈশ্বর দুটি মহাজ্যোতি বানালেন। ঈশ্বর বড়টি বানালেন দিনের বেলা রাজত্ব করার জন্য আর ছোটটি বানালেন রাত্রিবেলা রাজত্ব করার জন্য। ঈশ্বর তারকারাজিও সৃষ্টি করলেন।
17 পৃথিবীকে আলো দেওয়ার জন্য ঈশ্বর এই আলোগুলিকে আকাশে স্থাপন করলেন।
18 দিন ও রাত্রিকে কর্তৃত্ত্ব দেবার জন্য ঈশ্বর এই আলোগুলিকে আকাশে সাজালেন। এই আলোগুলি আলো আর অন্ধকারকে পৃথক করে দিল এবং ঈশ্বর দেখলেন ব্যবস্থাটা ভাল হয়েছে।
19 সন্ধ্যা হল এবং সকাল হল। এভাবে চতুর্থ দিন হল।
20 তারপর ঈশ্বর বললেন, “বহু প্রকার জীবন্ত প্রাণীতে জল পূর্ণ হোক আর পৃথিবীর ওপরে আকাশে ওড়বার জন্য বহু পাখী হোক।”
21 সুতরাং ঈশ্বর বড় বড় জলজন্তু এবং জলে বিচরণ করবে এমন সমস্ত প্রাণী সৃষ্টি করলেন। অনেক প্রকার সামুদ্রিক জীব রয়েছে এবং সে সবই ঈশ্বরের সৃষ্টি। যত রকম পাখী আকাশে ওড়ে সেইসবও ঈশ্বর বানালেন। এবং ঈশ্বর দেখলেন ব্যবস্থাটি ভাল হয়েছে।
22 ঈশ্বর এই সমস্ত প্রাণীদের আশীর্বাদ করলেন। ঈশ্বর সামুদ্রিক প্রাণীদের সংখ্যাবৃদ্ধি করে সমুদ্র ভরিয়ে তুলতে বললেন। ঈশ্বর পৃথিবীতে পাখীদের সংখ্যাবৃদ্ধি করতে বললেন।
23 সন্ধ্যা হয়ে গেল এবং তারপর সকাল হল। এভাবে পঞ্চম দিন কেটে গেল।
24 তারপর ঈশ্বর বললেন, “নানারকম প্রাণী পৃথিবীতে উত্পন্ন হোক। নানারকম বড় আকারের জন্তু জানোয়ার আর বুকে হেঁটে চলার নানারকম ছোট প্রাণী হোক এবং প্রচুর সংখ্যায় তাদের সংখ্যাবৃদ্ধি হোক।” তখন য়েমন তিনি বললেন সব কিছু সম্পন্ন হল।
25 সুতরাং ঈশ্বর সব রকম জন্তু জানোয়ার তেমনভাবে তৈরী করলেন। বন্য জন্তু, পোষ্য জন্তু আর বুকে হাঁটার সবরকমের ছোট ছোট প্রাণী ঈশ্বর বানালেন এবং ঈশ্বর দেখলেন প্রতিটি জিনিসই বেশ ভালো হয়েছে।
26 তখন ঈশ্বর বললেন, “এখন এস, আমরা মানুষ সৃষ্টি করি। আমাদের আদলে আমরা মানুষ সৃষ্টি করব। মানুষ হবে ঠিক আমাদের মত। তারা সমুদ্রের সমস্ত মাছের ওপরে আর আকাশের সমস্ত পাখীর ওপরে কর্তৃত্ত্ব করবে। তারা পৃথিবীর সমস্ত বড় জানোয়ার আর বুকে হাঁটা সমস্ত ছোট প্রাণীর উপরে কর্তৃত্ত্ব করবে।”
27 তাই ঈশ্বর নিজের মতোই মানুষ সৃষ্টি করলেন। মানুষ হল তাঁর ছাঁচে গড়া জীব। ঈশ্বর তাদের পুরুষ ও স্ত্রীরূপে সৃষ্টি করলেন।
28 ঈশ্বর তাদের আশীর্বাদ করে বললেন, “তোমাদের বহু সন্তানসন্ততি হোক। মানুষে মানুষে পৃথিবী পরিপূর্ণ করো এবং তোমরা পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণের ভার নাও, সমুদ্রে মাছেদের এবং বাতাসে পাখিদের শাসন করো। মাটির ওপর যা কিছু নড়েচড়ে, যাবতীয় প্রাণীকে তোমরা শাসন করো।”
29 ঈশ্বর বললেন, “আমি তোমাদের শস্যদায়ী সমস্ত গাছ ও সমস্ত ফলদাযী গাছপালা দিচ্ছি। ঐসব গাছ বীজযুক্ত ফল উত্পাদন করে। এই সমস্ত শস্য ও ফল হবে তোমাদের খাদ্য।
30 এবং জানোয়ারদের সমস্ত সবুজ গাছপালা দিচ্ছি। তাদের খাদ্য হবে সবুজ গাছপালা। পৃথিবীর সমস্ত জন্তু জানোয়ার, আকাশের সমস্ত পাখি এবং মাটির উপরে বুকে হাঁটে য়েসব কীট সবাই ঐ খাদ্য খাবে।” এবং এই সব কিছুই সম্পন্ন হল।
31 ঈশ্বর যা কিছু সৃষ্টি করেছেন সেসব কিছু দেখলেন এবং ঈশ্বর দেখলেন সমস্ত সৃষ্টিই খুব ভাল হয়েছে। সন্ধ্যা হল, তারপর সকাল হল। এভাবে ষষ্ঠ দিন হল।
শনিবারের সৃষ্টিবর্ণনার উৎস নিয়ে মুসলিম পণ্ডিতদের নিজেদের মধ্যেই বড় বিরোধ আছে। ইবনে কাসির বুখারির মূল্যায়ন উদ্ধৃত করে কাহিনিটি কাব আল-আহবারের কাছ থেকে আবু হুরাইরার শোনা বক্তব্য হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। ইহুদি ধর্মীয় বর্ণনা এবং নবীর নামে প্রচারিত হাদিসের সীমা নিয়ে এই বিরোধ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। [242]
اختلف فيه على ابن جريج، وقد تكلم في هذا الحديث علي بن المديني، والبخاري، والبيهقي وغيرهم من الحفاظ، قال البخاري في التاريخ: وقال بعضهم عن كعب وهو أصح. يعني أن هذا الحديث مما سمعه أبو هريرة وتلقاه من كعب الأحبار، فإنهما كان يصطحبان ويتجالسان للحديث، فهذا يحدثه عن صحفه وهذا يحدثه بما يصدقه عن النبي صلى الله عليه وسلم، فكان هذا الحديث مما تلقاه أبو هريرة عن كعب عن صحفه، فوهم بعض الرواة فجعله مرفوعا إلى النبي صلى الله عليه وسلم، وأكد رفعه بقوله: أخذ رسول الله صلى الله عليه وسلم بيدي. ثم في متنه غرابة شديدة فمن ذلك أنه ليس فيه ذكر خلق السموات، وفيه ذكر خلق الأرض وما فيها في سبعة أيام، وهذا خلاف القرآن؛ لأن الأرض خلقت في أربعة أيام ثم خلقت السماوات في يومين.
বাংলা অনুবাদ:
ইবনে জুরাইজ থেকে এটি বিভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে। আলি ইবনে মাদিনি, বুখারি, বাইহাকি এবং অন্য হাদিসবিশারদেরা এই হাদিস সম্পর্কে আপত্তি করেছেন। বুখারি তারিখে বলেছেন: কেউ কেউ এটি কাব থেকে বর্ণনা করেছেন, আর সেটিই অধিক সঠিক। অর্থাৎ আবু হুরাইরা কাব আল-আহবারের কাছ থেকে এটি শুনে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা একসঙ্গে চলতেন এবং হাদিস নিয়ে আলোচনা করতে বসতেন। একজন নিজের সহিফা থেকে বলতেন, অন্যজন নবীর কাছ থেকে এমন কথা বলতেন যা তার সত্যতা সমর্থন করে। এটি ছিল কাবের সহিফা থেকে আবু হুরাইরার গ্রহণ করা বর্ণনার একটি। কোনো বর্ণনাকারী ভুল করে একে নবীর বক্তব্য বানিয়েছেন এবং “রাসুল আমার হাত ধরলেন” কথাটি দিয়ে সেই আরোপ আরও জোর দিয়েছেন। এর মূল বক্তব্যেও বড় অস্বাভাবিকতা আছে। যেমন এতে আসমান সৃষ্টির কথা নেই; পৃথিবী ও তার মধ্যে থাকা জিনিস সাত দিনে সৃষ্টির কথা আছে। এটি কোরআনের বিরোধী; কারণ পৃথিবী চার দিনে এবং আসমান দুই দিনে সৃষ্টি হয়েছে।
এই মূল্যায়ন অনুযায়ী সমস্যাটি শুধু কোনো নামের সঙ্গে “দুর্বল” বিশেষণ জুড়ে দেওয়ার নয়। একটি পূর্ববর্তী ধর্মীয় কাহিনি কীভাবে নবীর ব্যক্তিগত বক্তব্যের রূপ পেতে পারে, তার নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া বর্ণনা করা হয়েছে। “হাত ধরে বললেন” দৃশ্যটিও তখন কাহিনির সত্যতার স্বতন্ত্র নিশ্চয়তা হয় না; সেটিও আরোপিত বিবরণের অংশ হতে পারে। মুসলিমের সংকলনে উপস্থিতি এবং বুখারি-ইবনে কাসিরের আপত্তি একত্রে দেখায়, ধর্মীয় বয়ানের সীমানা নির্ধারণের কাজ ছিল মানবীয় ও বিতর্কিত।
আদিপুস্তক ও মুসলিমের বর্ণনার বিস্তারিত ক্রম অভিন্ন নয়। কিন্তু পরিচিত সপ্তাহকে মহাজগতের কাজের ছক বানানো, ভূমি ও উদ্ভিদকে আকাশের আলোর আগে বসানো এবং মানুষকে শেষ নির্মাণ হিসেবে রাখা—এই আখ্যানরীতি একই ধরনের। চাষ, গৃহনির্মাণ ও কর্মসপ্তাহের অভিজ্ঞতা দিয়ে সৃষ্টির ইতিহাস সাজানো হয়েছে। কাজগুলোকে ঈশ্বরের কাজ বলার পরে কল্পিত নির্মাণসূচি পবিত্র ইতিহাসের মর্যাদা পেয়েছে। প্রকৃতির উৎপত্তি বোঝাতে তার প্রমাণমূল্য নির্ধারিত হবে পর্যবেক্ষণে, সংকলকের ধর্মীয় মর্যাদায় নয়।
সাত আসমান ও সাত জমিন
দিনের নীল আকাশ কোনো নীল রঙের কঠিন ছাদ নয়। সূর্যের আলো বায়ুমণ্ডলের অণুতে বিক্ষিপ্ত হয়; ক্ষুদ্র অণুর ক্ষেত্রে ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো বেশি ছড়ায়। রেলি বিক্ষেপণে এই নির্ভরতা তরঙ্গদৈর্ঘ্যের চতুর্থ ঘাতের ব্যস্তানুপাতিক। সূর্যের আলোর বর্ণবণ্টন ও মানুষের চোখের সংবেদনশীলতার কারণে আকাশ প্রধানত নীল দেখায়। এটি একটি বাস্তব আলোকীয় প্রক্রিয়া, দৃষ্টির ভুলে দেখা কল্পিত বস্তু নয়। সূর্যাস্তে আলোর পথ দীর্ঘ হলে লালচে রং প্রাধান্য পায়; বায়ুমণ্ডলের বাইরে এই নীল পর্দাও থাকে না। ফলে আকাশের দৃশ্যমান চেহারাকে স্তরে স্তরে কঠিন গৃহস্থালি স্থাপত্য হিসেবে কল্পনা করা এবং তার ভৌত ব্যাখ্যা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন কাজ। [243]
কোরআনে সাত আসমান এবং তার অনুরূপ জমিনের কথা আছে। সংখ্যাটি এখানে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় মহাজাগতিক বিন্যাসের অংশ। ওপর-নিচে সেই অঞ্চলগুলোর মধ্যে আল্লাহর নির্দেশ নেমে আসে বলা হয়েছে। আধুনিক ভূতত্ত্বে পৃথিবীর ভেতরের শিলা, ম্যান্টল ও কেন্দ্রের যে গঠন পাওয়া যায়, তার সঙ্গে এই একাধিক জমিনের ধর্মীয় পরিচয় ও ওপর থেকে নির্দেশ নামার বর্ণনা এক নয়। [244]
আল্লাহই সাত আসমান বানিয়েছেন আর ওগুলোর মত পৃথিবীও, সবগুলোর মাঝে (অর্থাৎ সকল আসমানে আর সকল যমীনে) নেমে আসে আল্লাহর নির্দেশ যাতে তোমরা জানতে পার যে, আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান আর আল্লাহ (স্বীয়) জ্ঞানে সব কিছুকে ঘিরে রেখেছেন।
— Taisirul Quran
আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন সপ্ত আকাশ এবং পৃথিবীও সেই পরিমাণ। ওগুলির মধ্যে নেমে আসে তাঁর নির্দেশ; ফলে তোমরা বুঝতে পার যে, আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান এবং জ্ঞানে আল্লাহ সব কিছুকে পরিবেষ্টন করে রয়েছেন।
— Sheikh Mujibur Rahman
তিনি আল্লাহ, যিনি সাত আসমান এবং অনুরূপ যমীন সৃষ্টি করেছেন; এগুলির মাঝে তাঁর নির্দেশ অবতীর্ণ হয় যেন তোমরা জানতে পার যে, আল্লাহ সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান এবং আল্লাহর জ্ঞানতো সব কিছুকে বেষ্টন করে আছে।
— Rawai Al-bayan
তিনি আল্লাহ্, যিনি সৃষ্টি করেছেন সাত আসমান এবং অনুরূপ যমীন, তাদের মধ্যে নেমে আসে তাঁর নির্দেশ; যাতে তোমরা জানতে পার যে, আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান এবং জ্ঞানে আল্লাহ্ সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছেন।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
এই একাধিক জমিনের ধারণা পরবর্তী ধর্মীয় আলোচনায় ভূগর্ভের অন্য জগতের বর্ণনা তৈরি করেছে। বুখারিতেও অন্যায়ভাবে জমি দখলকারীর সাত জমিন পর্যন্ত ধসে যাওয়ার কথা আছে। ওপর-নিচের এই ছবি একাধিক পৃথিবীকে মহাকাশে দূরে ছড়ানো গ্রহের আধুনিক ধারণার চেয়ে পৃথক করে। মুফতি ইব্রাহীমের বক্তব্যে সেই স্তরভিত্তিক ভূগর্ভের কল্পনাই পুনরায় প্রচারিত হয়েছে। [245]
সাত আসমানকে বায়ুমণ্ডলের সাত স্তর বলার ব্যাখ্যার সঙ্গে তারকারাজির অবস্থানের সংঘাত রয়েছে। কোরআনে নিকটবর্তী আসমান তারকারাজি দিয়ে সজ্জিত বলা হয়েছে। নক্ষত্র পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের অংশ নয়; সূর্যও তার বাইরে। আবার বায়ুমণ্ডলকে তাপমাত্রা অনুযায়ী সাধারণত পাঁচ প্রধান স্তরে ভাগ করা হয়। আয়নিত অঞ্চল বা অন্য বৈশিষ্ট্য ধরে বাড়তি বিভাগ করা হলে সেই বিভাগগুলো পরস্পরকে আংশিকভাবে অতিক্রম করে। ইচ্ছামতো বিভাগ যোগ করে সাত সংখ্যা বানানো কোরআনের নক্ষত্রবেষ্টিত আসমানের সঙ্গে বাস্তব মিল তৈরি করে না। ধর্মীয় সংখ্যার জন্য বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিভাগকে বদলে নেওয়া প্রমাণের উল্টো ব্যবহার। [246] [247] [248]
নিশ্চয় আমি নিকটবর্তী আকাশকে তারকারাজির দ্বারা সুশোভিত করেছি। এবং তাকে সংরক্ষিত করেছি প্রত্যেক অবাধ্য শয়তান থেকে। ওরা উর্ধ্ব জগতের কোন কিছু শ্রবণ করতে পারে না এবং চার দিক থেকে তাদের প্রতি উল্কা নিক্ষেপ করা হয়। ওদেরকে বিতাড়নের উদ্দেশে। ওদের জন্যে রয়েছে বিরামহীন শাস্তি। তবে কেউ ছোঁ মেরে কিছু শুনে ফেললে জ্বলন্ত উল্কাপিন্ড তার পশ্চাদ্ধাবন করে।
আমি সর্বনিম্ন আকাশকে প্রদীপমালা দ্বারা সুসজ্জত করেছি; সেগুলোকে শয়তানদের জন্যে ক্ষেপণাস্ত্রবৎ করেছি এবং প্রস্তুত করে রেখেছি তাদের জন্যে জলন্ত অগ্নির শাস্তি।
জালালাইনের এই বাংলা সংস্করণের “প্রাসঙ্গিক আলোচনা” অংশে আসমানের বিভিন্ন উপাদানের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। আরবি মূল তাফসিরের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যার পাশাপাশি অনুবাদকের যুক্ত এই আলোচনায় ইবনে আব্বাস ও কাবের নামে বিভিন্ন বর্ণনা আছে। তাই ছবির এই অংশ মুদ্রিত সংস্করণে প্রাচীন মহাজাগতিক কাহিনি প্রচারের সাক্ষ্য। একই পৃষ্ঠায় মূল আরবি ব্যাখ্যা এবং তার পাশে যোগ করা বিস্তৃত বর্ণনার দুই স্তর রয়েছে। [249]

ধাপে ধাপে আকাশ এবং নিচে অন্য জগতের কল্পনা বহু ধর্মীয় সাহিত্যে পাওয়া যায়। এগুলো শুধু দৃশ্যমান আলোর স্তর নয়; সেখানে দেবতা, ফেরেশতা, আত্মা, সিংহাসন ও পবিত্র স্থাপনার অবস্থান নির্ধারণ করা হয়। ওপরের দিকে যাওয়া উচ্চতর মর্যাদা এবং নিচে নামা ভূগর্ভের ভিন্ন জগতে প্রবেশের রূপ পায়। মানুষের সামাজিক স্তরবিন্যাস ও প্রাসাদ-স্থাপত্য মহাজগতের কল্পিত মানচিত্রেও বসানো হয়েছে। আকাশের প্রতিটি অঞ্চল তখন নির্দিষ্ট শক্তি ও কর্তৃত্বের আবাস হয়ে দাঁড়ায়।
মেসোপটেমীয় পাঠে একাধিক আসমান ও জমিনের ধারণা নিয়ে ওয়েন হোরোভিৎজের গবেষণায় পৃথক অধ্যায় রয়েছে। পিটার জেমস ও মারিনাস অ্যান্থনি ভান ডের স্লুইসও সুমেরীয় মন্ত্রে সাত আসমান ও সাত জমিনের উল্লেখ এবং তার পাশাপাশিই অন্য সংখ্যার স্তরবিন্যাসের উপস্থিতি আলোচনা করেছেন। “আন” আকাশ এবং “কি” ভূমির পরিচিত সুমেরীয় নাম। সাতের এই বিন্যাস প্রাচীন পশ্চিম এশিয়ার ধর্মীয় কল্পনার একটি পুনরাবৃত্ত রীতি। তারিখ, উপাদান ও বাসিন্দার বিবরণ বদলালেও বহুস্তর মহাজগতের মৌলিক ছক বিভিন্ন ধর্মীয় সাহিত্যে ব্যবহৃত হয়েছে। [250] [251] [252]
হিন্দু পুরাণেও ঊর্ধ্বলোক ও অধোলোকের বহুস্তর মানচিত্র আছে। ভূলোক, ভুবর্লোক, স্বর্লোক, মহর্লোক, জনলোক, তপোলোক ও সত্যলোক—এই সাত ঊর্ধ্বস্তরের তালিকায় পৃথিবীও একটি স্তর। সবগুলোকে ইন্দ্রের স্বর্গলোকের সমার্থক করা ভুল। আবার নিচের সাত অঞ্চলের নাম অতল, বিতল, সুতল, তলাতল, মহাতল, রসাতল ও পাতাল। ভাগবতের সরাসরি বর্ণনায় পৃথিবীর নিচে এগুলোর অবস্থান এবং পরস্পরের ব্যবধানও নির্ধারিত। ভূগর্ভের এই অঞ্চলগুলোকে এক কথায় সবই নরক বললে পুরাণের বিভিন্ন জগতের পার্থক্য হারিয়ে যায়। তুলনার নির্দিষ্ট জায়গা হলো ওপর-নিচে সাজানো বহুস্তর মহাজগৎ। [253] [254]
তালমুদের হাগিগা ১২খ-তে রেশ লাকিশের নামে সাত আসমানের একটি নামযুক্ত তালিকা আছে। একই আলোচনায় কারও মতে দুটি আকাশও বলা হয়েছে। সাত স্তরের ব্যাখ্যায় কোথাও সূর্য-চাঁদ-নক্ষত্র, কোথাও স্বর্গীয় মন্দির, কোথাও ফেরেশতাদের স্তব এবং সর্বোচ্চ অঞ্চলে ঈশ্বরের সিংহাসনের অবস্থান নির্ধারিত হয়েছে। হিব্রু শামাইম ও আরবি সামা একই সেমিটিক শব্দপরিবারের; সামাওয়াত আরবিতে বহুবচন। ভাষার আত্মীয়তা এবং মহাজাগতিক কাহিনির মিল একত্রে পূর্ববর্তী ধর্মীয় পরিবেশের উপস্থিতি প্রকাশ করে। [255] [256]
| আসমানের নাম | তালমুদের বর্ণিত বৈশিষ্ট্য |
|---|---|
| বিলোন — וילון | পর্দার মতো; সকাল-সন্ধ্যায় পরিবর্তনের মাধ্যমে সৃষ্টির নবায়নের সঙ্গে যুক্ত। |
| রাকিয়া — רקיע | সূর্য, চাঁদ, নক্ষত্র ও নক্ষত্রমণ্ডল স্থাপিত। |
| শেহাকিম — שחקים | ধার্মিকদের জন্য মান্না প্রস্তুতের চাকি। |
| যেবুল — זבול | স্বর্গীয় জেরুজালেম, মন্দির ও বেদি; মিখায়েলের উৎসর্গ। |
| মাওন — מעון | ফেরেশতাদের দল রাতে স্তব করে। |
| মাখোন — מכון | তুষার, শিলাবৃষ্টি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক উপকরণের ভাণ্ডার। |
| আরাবোত — ערבות | আত্মা, ন্যায়বিচার, শান্তি, আশীর্বাদ, স্বর্গীয় সত্তা এবং ঈশ্বরের সিংহাসন। |
মেরকাবাহ বা স্বর্গীয় রথ এবং হেখালৎ বা প্রাসাদসমূহের সাহিত্যে আকাশে আরোহণ ও স্বর্গীয় কর্তৃত্বের আরও বিস্তৃত কল্পনা আছে। তৃতীয় হনোকের মতো পাঠ সেই ধারার অংশ। মানুষের শাসকের প্রাসাদে যেমন প্রবেশাধিকার, প্রহরা ও পদমর্যাদা থাকে, এই আখ্যানগুলোতেও ওপরের অঞ্চলে যাওয়ার নিয়ম এবং দৈব সত্তাদের স্থান থাকে। স্বর্গের মহিমা প্রকাশের ভাষা এখানে পরিচিত রাজকীয় স্থাপত্য ও প্রশাসনিক ক্ষমতার সম্প্রসারণ। [257] [258] [259]
খ্রিস্টীয় পাঠেও একাধিক স্বর্গের ধারণা আছে। দ্বিতীয় করিন্থীয়তে তৃতীয় স্বর্গ ও পরমদেশে তুলে নেওয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণিত। এই অংশ নির্দিষ্টভাবে তৃতীয় স্বর্গের কথা বলে; সব খ্রিস্টান ধারায় একই সাত স্তরের বাধ্যতামূলক মত প্রতিষ্ঠা করে না। কিন্তু পৃথিবীর ওপরে বিভিন্ন স্তর এবং দৈব অভিজ্ঞতায় সেই স্তরে ওঠার কল্পনা ইসলামের আগে খ্রিস্টীয় সাহিত্যে উপস্থিত ছিল। [260]
2. I knew a man in Christ above fourteen years ago, (whether in the body, I cannot tell; or whether out of the body, I cannot tell: God knoweth;) such an one caught up to the third heaven.
3. And I knew such a man, (whether in the body, or out of the body, I cannot tell: God knoweth;)
4. How that he was caught up into paradise, and heard unspeakable words, which it is not lawful for a man to utter.
বাংলা অনুবাদ:
২। খ্রিষ্টে আশ্রিত এক ব্যক্তিকে আমি জানি, যিনি চোদ্দ বছরেরও আগে তৃতীয় স্বর্গে তুলে নেওয়া হয়েছিলেন। শরীরসহ, না শরীর ছাড়া—আমি বলতে পারি না; ঈশ্বর জানেন।
৩। এমন এক ব্যক্তিকে আমি জানি—তিনি শরীরসহ ছিলেন, না শরীর ছাড়া, আমি বলতে পারি না; ঈশ্বর জানেন।
৪। তাঁকে পরমদেশে তুলে নেওয়া হয়েছিল এবং তিনি এমন অব্যক্ত কথা শুনেছিলেন, যা মানুষের উচ্চারণ করা বৈধ নয়।
হাগিগার সাত আসমানের মূল নামতালিকা এবং তার পরের নির্দিষ্ট মহাজাগতিক অবস্থান একসঙ্গে এই স্তরবিন্যাসের প্রকৃতি পরিষ্কার করে। [261]
ריש לקיש אמר שבעה ואלו הן וילון רקיע שחקים זבול מעון מכון ערבות
বাংলা অনুবাদ:
রেশ লাকিশ বলেন: সাতটি; এগুলো হলো বিলোন, রাকিয়া, শেহাকিম, যেবুল, মাওন, মাখোন ও আরাবোত।
রাকিয়ার বৈশিষ্ট্য হিসেবে আকাশের দৃশ্যমান আলোগুলোর অবস্থানও নির্দিষ্ট করা হয়েছে। [262]
רקיע שבו חמה ולבנה כוכבים ומזלות קבועין שנאמר ויתן אותם אלהים ברקיע השמים
বাংলা অনুবাদ:
রাকিয়া হলো সেই অঞ্চল, যেখানে সূর্য, চাঁদ, নক্ষত্র ও নক্ষত্রমণ্ডল স্থাপিত; যেমন বলা হয়েছে, “ঈশ্বর সেগুলোকে আকাশের রাকিয়ায় স্থাপন করলেন।”
ভাগবতের পাতালবিন্যাসও অস্পষ্ট রহস্যের বদলে নাম, অবস্থান ও দূরত্বসহ বর্ণিত। [263]
उपवर्णितं भूमेर्यथासन्निवेशावस्थानमवनेरप्यधस्तात् सप्त भूविवरा एकैकशो योजनायुतान्तरेणायामविस्तारेणोपक्लृप्ता अतलं वितलं सुतलं तलातलं महातलं रसातलं पातालमिति ॥ ७ ॥
বাংলা অনুবাদ:
পৃথিবীর অঞ্চলগুলোর বিন্যাস ও অবস্থান যেমন বর্ণিত হয়েছে, পৃথিবীর নিচেও তেমন সাতটি ভূগর্ভস্থ অঞ্চল আছে। দৈর্ঘ্য-প্রস্থসহ সেগুলো একটির নিচে আরেকটি দশ হাজার যোজন ব্যবধানে স্থাপিত—অতল, বিতল, সুতল, তলাতল, মহাতল, রসাতল ও পাতাল।
সাত সংখ্যা এবং একই ওপর-নিচের স্থাপত্য পুনরাবৃত্ত হলেও প্রতিটি ধর্ম নিজস্ব বাসিন্দা ও কর্তৃত্ব বসিয়েছে। কোথাও মিখায়েলের বেদি, কোথাও ইন্দ্র বা ব্রহ্মার লোক, কোথাও আল্লাহর নির্দেশ নেমে আসা সাত আসমান ও সাত জমিন। এই ধর্মীয় মানচিত্রগুলো মানুষের কল্পনার ইতিহাসে তুলনীয়। জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ভূতত্ত্বে তাদের বাস্তবতার প্রমাণ নেই। একটি স্তরের নামকে আধুনিক কোনো বৈজ্ঞানিক বিভাগের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া সেই স্তরের দেবতা, প্রাসাদ, পথ ও দূরত্বকে বাস্তব করে না।
পৃথিবী স্থির এবং নড়াচড়া করে না
কোরআনে আসমান-জমিনকে ধরে রাখা এবং স্থানচ্যুতি থেকে রক্ষার ভাষা আছে। তার প্রাচীন ব্যাখ্যাগুলোতে এই স্থায়িত্বকে স্থির মহাজগতের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। পরবর্তী ফতোয়ায় আয়াত ও সূর্যের উদয়-অস্তের বর্ণনা দিয়ে পৃথিবীর ঘূর্ণন প্রত্যাখ্যানের সুস্পষ্ট নজিরও আছে। বাস্তবে পৃথিবী নিজের অক্ষে ঘোরে এবং সূর্যের চারদিকে পরিভ্রমণ করে। তাই স্থায়িত্বের ধর্মীয় ভাষা থেকে পৃথিবী গতিহীন—এই সিদ্ধান্তে যাওয়া ভুল। সেই ভুলটি কেবল বাইরের সমালোচকের তৈরি নয়; মুসলিম ব্যাখ্যাকারীর নিজস্ব যুক্তিতেও সংরক্ষিত। [264] [265] [266]
আল্লাহই আসমান ও যমীনকে স্থির রাখেন যাতে ও দু’টো টলে না যায়। ও দু’টো যদি টলে যায় তাহলে তিনি ছাড়া কে ও দু’টোকে স্থির রাখবে? তিনি পরম সহিষ্ণু, পরম ক্ষমাশীল।
— Taisirul Quran
আল্লাহ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীকে সংরক্ষণ করেন যাতে ওরা স্থানচ্যূত না হয়, ওরা স্থানচ্যূত হলে তিনি ব্যতীত কে ওদেরকে সংরক্ষণ করবে? তিনি অতি সহনশীল, ক্ষমাপরায়ণ।
— Sheikh Mujibur Rahman
নিশ্চয় আল্লাহ আসমানসমূহ ও যমীনকে ধরে রাখেন যাতে এগুলো স্থানচ্যুত না হয়। আর যদি এগুলো স্থানচ্যুত হয়, তাহলে তিনি ছাড়া আর কে আছে, যে এগুলোকে ধরে রাখবে? নিশ্চয় তিনি পরম সহনশীল, অতিশয় ক্ষমাপরায়ণ।
— Rawai Al-bayan
নিশ্চয় আল্লাহ্ আসমানসমূহ ও যমীনকে ধারণ করেন, যাতে তারা স্থানচ্যুত না হয়, আর যদি তারা স্থানচ্যুত হয়, তবে তিনি ছাড়া কেউ নেই যে, তাদেরকে ধরে রাখতে পারে [১]। নিশ্চয় তিনি অতি সহনশীল, অসীম ক্ষমাপরায়ণ।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
পাহাড় স্থাপন করার উদ্দেশ্য হিসেবে পৃথিবী মানুষকে নিয়ে ঢলে না পড়ার কথাও বলা হয়েছে। এই ভাষায় ভূমিকে একটি স্থাপনযোগ্য ভারের সাহায্যে স্থির রাখার ছবি তৈরি হয়। ইবনে কাসির আরও নির্দিষ্টভাবে পানির ওপর পৃথিবী ভারী করে স্থিত রাখার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সেখানে পর্বত একটি ভারসাম্যরক্ষাকারী বোঝা, যেন ভাসমান বস্তুতে ভার চাপিয়ে তার দুলুনি থামানো হচ্ছে। আধুনিক ভূতত্ত্বে পর্বত গঠন ভূত্বকের চলাচল, সংকোচন, সংঘর্ষ ও উত্থানের ফল। সেই ভিন্ন ব্যাখ্যা ধর্মীয় ভারচাপার কল্পনাকে পরীক্ষাযোগ্য প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া দিয়ে প্রতিস্থাপন করে। [267] [268] [269]
তিনি আকাশমন্ডলী নির্মাণ করেছেন স্তম্ভ ছাড়া যা তোমরা দেখছ। তিনি পৃথিবীতে স্থাপন করেছেন দৃঢ়ভাবে দন্ডায়মান পর্বতমালা যাতে পৃথিবী তোমাদেরকে নিয়ে নড়াচড়া না করে আর তাতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সকল প্রকার জীবজন্তু, আর আমিই আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করি, অতঃপর তাতে উদ্গত করি যাবতীয় কল্যাণকর উদ্ভিদ।
— Taisirul Quran
তিনি আকাশমন্ডলী নির্মাণ করেছেন স্তম্ভ ব্যতীত, তোমরা এটা দেখছ। তিনিই পৃথিবীতে স্থাপন করেছেন পবর্তমালা যাতে এটা তোমাদেরকে নিয়ে ঢলে না পড়ে এবং এতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সর্ব প্রকার জীব-জন্তু এবং আমিই আকাশ হতে বারি বর্ষণ করে এতে উদ্ভব করি সর্বপ্রকার কল্যাণকর উদ্ভিদ।
— Sheikh Mujibur Rahman
তিনি খুঁটি ছাড়া আসমানসমূহ সৃষ্টি করেছেন, যা তোমরা দেখছ, আর যমীনে স্থাপন করেছেন সুদৃঢ় পাহাড়, যাতে তা তোমাদেরকে নিয়ে হেলে না পড়ে, আর তাতে ছড়িয়ে দিয়েছেন প্রত্যেক প্রকারের প্রাণী; আর আসমান থেকে আমি পানি পাঠাই। অতঃপর তাতে আমি জোড়ায় জোড়ায় কল্যাণকর উদ্ভিদ জন্মাই।
— Rawai Al-bayan
তিনি আসমানসমূহ নির্মাণ করেছেন খুঁটি ছাড়া—তোমরা এটা দেখতে পাচ্ছ; তিনিই যমীনে স্থাপন করেছেন সুদৃঢ় পর্বতমালা যাতে এটা তোমাদেরকে নিয়ে ঢলে না পড়ে এবং এতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সব ধরনের জীব-জন্তু। আর আমরা আকাশ হতে বারি বর্ষণ করি তারপর এতে উদ্গত করি সব ধরণের কল্যাণকর উদ্ভিদ।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
ইবনে কাসিরের বাংলা অনুবাদের এই পৃষ্ঠায় পৃথিবী, পানি এবং স্থিতির সম্পর্ক দেখা যায়। তাঁর লুকমান ৩১:১০-এর আরবি ব্যাখ্যাতেও পাহাড় পৃথিবীকে ভারী করার এবং পানির ওপর অধিবাসীদের নিয়ে দোলা ঠেকানোর কথা সরাসরি আছে। ধর্মীয় বর্ণনার সমস্যাটি তাই শুধু অনুবাদে “স্থির” শব্দ ব্যবহার করার নয়; তার ব্যাখ্যায় একটি নির্দিষ্ট ভৌত মডেল আছে। [270] [271]
কেহ কেহ বলেন, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করার পরপরই উহার সংস্থাপন কার্য করা হয়। এই অভিমতটি হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে আলী ইব্ন আবু তালহা বর্ণনা করেন।
আস্ সুদ্দী স্বীয় তাফসীরে ইবন মাসউদ ও অন্যান্য সাহাবা (রা) হইতে পর্যায়ক্রমে মুরাহ, ইব্ন আব্বাস, আবু সালেহ ও আবু মালিক হইতে বর্ণনা করেন- সৃষ্টির পূর্বে আল্লাহ্ তা’আলার আরশ পানির উপর সংস্থাপিত ছিল। পানির পূর্বে আল্লাহ্ পাক কোন বস্তুই সৃষ্টি করেন নাই। সুতরাং সৃজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সর্বপ্রথম তিনি পানি হইতে বাষ্প সৃষ্টি করিলেন। উহা ক্রমান্বয়ে ঊর্ধ্বলোকে উত্থিত হইল এবং উত্থিত বাষ্প ছাদরূপ পরিগ্রহ করিয়া আকাশে পরিণত হইল। এইজন্য উহার নাম হইল (উর্ধ্বলোক)। অতঃপর পানি শুকাইয়া একটি ভূখণ্ড দেখা দিল। তখন উহাকে সপ্তখণ্ডে বিভক্ত করা হইল। রবি-সোম দুই দিনে এই সপ্তখণ্ড সৃষ্টি হইল। অতঃপর পৃথিবীকে সেই মৎসের উপর স্থাপন করা হইল যাহার বর্ণনা সূরা ‘নূন ওয়াল কলম’-এ আসিয়াছে। মৎসটি পানির উপর এবং পানির নীচে সকাত জাতীয় পদার্থ বা পরিচ্ছন্ন মৃত্তিকা শিলা বিদ্যমান। মৃত্তিকা শিলার ধারক হইলেন ফেরেশতা। ফেরেশতা দণ্ডায়মান প্রস্তরের আন্তরের উপর এবং প্রস্তরের আস্তরটি বায়ুমণ্ডলের উপর ভাসমান রহিয়াছে। লুকমান হাকীম এই প্রস্তর আস্তরের কথাই বলিয়াছেন। উহা আকাশ কিংবা পৃথিবীর কোথাও স্থাপিত নহে। মৎসটি নড়াচড়া করা মাত্র পৃথিবী কম্পিত হয় এবং ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়। তাই পৃথিবীকে পাহাড় চাপা দেওয়া হইল। ফলে পৃথিবী সুস্থির হইল। পর্বত তাই পৃথিবীর কাছে নিজের বড়াই করিয়া থাকে।
আল্লাহ্ পাক বলেন:
face area afte وَجَعَلْنَا فِي الأَرْضِ رَوَاسِي أَنْ تَمِيدَ بِهِمْ
রাখার জন্য পর্বতমালা স্থাপন করিয়াছি।’

জাকারিয়া আল-কাজউইনির আজায়িবুল মাখলুকাত বিস্ময়কর সৃষ্টি ও মহাজাগতিক কল্পনার মধ্যযুগীয় সংকলন। তাঁর নামে প্রচলিত চিত্রিত সংস্করণে পরিচিত ভূতল, প্রাণী ও অতিপ্রাকৃত শক্তিকে এক জগৎধারণের ছবিতে সাজানো হয়েছে। এই ধরনের চিত্র ধর্মীয় সংস্কৃতিতে পৃথিবীর অবস্থান কল্পনা করার ইতিহাসের সাক্ষ্য। ছবিতে ব্যবহৃত প্রাণী বা বাহকের উপস্থিতি কোনো পর্যবেক্ষিত মহাজাগতিক শক্তির প্রমাণ দেয় না। পাণ্ডুলিপির চিত্রকে প্রকৃত জগতের মানচিত্র ভাবলে চিত্রকরের কল্পনাকেই ভূগোলের জায়গায় বসানো হয়। [272]

মুহাম্মদ ইবনে সালিহ আল-উসাইমিন পৃথিবীর চারদিকে সূর্য ঘোরার পক্ষে শরিয়তের প্রকাশ্য দলিলের দাবি করেছেন। তাঁর ফতোয়ায় সূর্য ওঠে, নামে, পাশ কাটায় এবং গন্তব্যে যায়—এই দৈনন্দিন ভাষাকেই গতির কেন্দ্র নির্ধারণের প্রমাণ বানানো হয়েছে। পৃথিবী ঘুরলে আয়াতে পৃথিবীর চলার কথা বলা হতো—এমন অনুমান তাঁর যুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে ধর্মীয় ভাষার কর্তৃত্ব পর্যবেক্ষণের ওপর বসানো হয়েছে এবং সূর্যাস্তের স্থানীয় দৃশ্য থেকে গোটা সৌরজগতের গতি নির্ধারণ করা হয়েছে। [273] [274]
প্রশ্ন: (১৬) সূর্য কি পৃথিবীর চার দিকে ঘুরে?
উত্তর: মান্যবর শাইখ উত্তরে বলেন যে, শরী‘আতের প্রকাশ্য দলীলগুলো প্রমাণ করে যে, সূর্যই পৃথিবীর চতুর্দিকে ঘুরে। এ ঘুরার কারণেই পৃথিবীতে দিবা-রাত্রির আগমণ ঘটে। আমাদের হাতে এ দলীলগুলোর চেয়ে বেশি শক্তিশালী এমন কোনো দলীল নেই, যার মাধ্যমে আমরা সূর্য ঘূরার দলীলগুলোকে ব্যাখ্যা করতে পারি। সূর্য ঘুরার দলীলগুলো হলো আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿فَإِنَّ ٱللَّهَ يَأۡتِي بِٱلشَّمۡسِ مِنَ ٱلۡمَشۡرِقِ فَأۡتِ بِهَا مِنَ ٱلۡمَغۡرِبِ﴾ [البقرة: ٢٥٨]
“আল্লাহ তা‘আলা সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদিত করেন। তুমি পারলে পশ্চিম দিক থেকে উদিত কর।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৫৮] সূর্য পূর্ব দিক থেকে উঠার মাধ্যমে প্রকাশ্য দলীল পাওয়া যায় যে, সূর্য পৃথিবীর উপর পরিভ্রমণ করে।
২) আল্লাহ বলেন,
﴿فَلَمَّا رَءَا ٱلشَّمۡسَ بَازِغَةٗ قَالَ هَٰذَا رَبِّي هَٰذَآ أَكۡبَرُۖ فَلَمَّآ أَفَلَتۡ قَالَ يَٰقَوۡمِ إِنِّي بَرِيٓءٞ مِّمَّا تُشۡرِكُونَ ٧٨﴾ [الانعام: ٧٨]
“অতঃপর যখন সূর্যকে চকচকে অবস্থায় উঠতে দেখলেন তখন বললেন, এটি আমার রব, এটি বৃহত্তর। অতপর যখন তা ডুবে গেল, তখন বলল হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যেসব বিষয়ে শরীক কর আমি ওসব থেকে মুক্ত।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ৭৮]
এখানে নির্ধারণ হয়ে গেল যে, সূর্য অদৃশ্য হয়ে যায়। একথা বলা হয় নি যে, সূর্য থেকে পৃথিবী ডুবে গেল। পৃথিবী যদি ঘূরত তাহলে অবশ্যই তা বলা হত।
৩) আল্লাহ বলেন,
﴿وَتَرَى ٱلشَّمۡسَ إِذَا طَلَعَت تَّزَٰوَرُ عَن كَهۡفِهِمۡ ذَاتَ ٱلۡيَمِينِ وَإِذَا غَرَبَت تَّقۡرِضُهُمۡ ذَاتَ ٱلشِّمَالِ﴾ [الكهف: ١٧]
“তুমি সূর্যকে দেখবে, যখন উদিত হয়, তাদের গুহা থেকে পাশ কেটে ডান দিকে চলে যায় এবং যখন অস্ত যায়, তাদের থেকে পাশ কেটে বাম দিকে চলে যায়।” [সূরা কাহাফ, আয়াত: ১৭] পাশ কেটে ডান দিকে বা বাম দিকে চলে যাওয়া প্রমাণ করে যে, নড়াচড়া সূর্য থেকেই হয়ে থাকে। পৃথিবী যদিনড়াচড়া করত তাহলে অবশ্যই বলতেন সূর্য থেকে গুহা পাশ কেটে যায়। উদয় হওয়া এবং অস্ত যাওয়াকে সূর্যের দিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এটা থেকে বুঝা যায় যে, সূর্যই ঘুরে। পৃথিবী নয়।
৪) আল্লাহ বলেন,
﴿وَهُوَ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلَّيۡلَ وَٱلنَّهَارَ وَٱلشَّمۡسَ وَٱلۡقَمَرَۖ كُلّٞ فِي فَلَكٖ يَسۡبَحُونَ ٣٣﴾ [الانبياء: ٣٣]
“এবং তিনিই দিবা-নিশি এবং চন্দ্র-সূর্য সৃষ্টি করেছেন। সবাই আপন আপন কক্ষ পথে বিচরণ করে।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৩৩]
ইবন আব্বাস বলেন, লাটিম যেমন তার কেন্দ্র বিন্দুর চার দিকে ঘুরতে থাকে, সূর্যও তেমনিভাবে ঘুরে।
৫) আল্লাহ বলেন,
﴿يُغۡشِي ٱلَّيۡلَ ٱلنَّهَارَ يَطۡلُبُهُۥ حَثِيثٗا﴾ [الاعراف: ٥٤]
“তিনি রাতকে আচ্ছাদিত করেন দিনের মাধ্যমে, দিন দৌড়ে দৌড়ে রাতের পিছনে আসে।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ৫৪]
আয়াতে রাতকে দিনের অনুসন্ধানকারী বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অনুসন্ধানকারী পিছনে পিছনে দ্রুত অনুসন্ধান করে থাকে। এটা জানা কথা যে, দিবা-রাত্রি সূর্যের অনুসারী।
৬) আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ بِٱلۡحَقِّۖ يُكَوِّرُ ٱلَّيۡلَ عَلَى ٱلنَّهَارِ وَيُكَوِّرُ ٱلنَّهَارَ عَلَى ٱلَّيۡلِۖ وَسَخَّرَ ٱلشَّمۡسَ وَٱلۡقَمَرَۖ كُلّٞ يَجۡرِي لِأَجَلٖ مُّسَمًّىۗ أَلَا هُوَ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡغَفَّٰرُ ٥﴾ [الزمر: ٥]
“তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন যথাযথভাবে। তিনি রাত্রিকে দিবস দ্বারা আচ্ছাদিত করেন এবং দিবসকে রাত্রি দ্বারা আচ্ছাদিত করেন এবং তিনি সূর্য ও চন্দ্রকে কাজে নিযুক্ত করেছেন। প্রত্যেকেই বিচরণ করে নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত। জেনে রাখুন, তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৫]
আয়াতের মাধ্যমে আমরা জানতে পারলাম যে, পৃথিবীর উপরে দিবা-রাত্রি চলমান রয়েছে। পৃথিবী যদি ঘুরতো তাহলে তিনি বলতেন, দিবা-রাত্রির উপর পৃথিবীকে ঘূরান। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “সূর্য এবং চন্দ্রের প্রত্যেকেই চলমান”। এ সমস্ত দলীলের মাধ্যমে জানা গেল যে, সুস্পষ্টভাবেই সূর্য ও চন্দ্র এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলাচল করছে। এ কথা সুস্পষ্ট যে, চলমান বস্তুকে বশীভুত করা এবং কাজে লাগানো একস্থানে অবস্থানকারী বস্তুকে কাজে লাগানোর চেয়ে অধিক যুক্তিসঙ্গত।
৭) আল্লাহ বলেন,
﴿وَٱلشَّمۡسِ وَضُحَىٰهَا ١ وَٱلۡقَمَرِ إِذَا تَلَىٰهَا ٢﴾ [الشمس: ١، ٢]
“শপথ সূর্যের ও তার কিরণের, শপথ চন্দ্রের যখন তা সূর্যের পশ্চাতে আসে।” [সূরা আশ-শামস, আয়াত: ১-২]
এখানে বলা হয়েছে যে, চন্দ্র সূর্যের পরে আসে। এতে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, সূর্য এবং চন্দ্র চলাচল করে এবং পৃথিবীর উপর ঘুরে। পৃথিবী যদি চন্দ্র বা সূর্যের চার দিকে ঘুরত, তাহলে চন্দ্র সূর্যকে অনুসরণ করতনা। বরং চন্দ্র একবার সূর্যকে, আর একবার সূর্য চন্দ্রকে অনুসরণ করত। কেননা সূর্য চন্দ্রের অনেক উপরে। এ আয়াত দিয়ে পৃথিবী স্থীর থাকার ব্যাপারে দলীল গ্রহণ করার ভিতরে চিন্তা-ভাবনার বিষয় রয়েছে।
৮) মহান আল্লাহ বলেন,
﴿وَٱلشَّمۡسُ تَجۡرِي لِمُسۡتَقَرّٖ لَّهَاۚ ذَٰلِكَ تَقۡدِيرُ ٱلۡعَزِيزِ ٱلۡعَلِيمِ ٣٨ وَٱلۡقَمَرَ قَدَّرۡنَٰهُ مَنَازِلَ حَتَّىٰ عَادَ كَٱلۡعُرۡجُونِ ٱلۡقَدِيمِ ٣٩ لَا ٱلشَّمۡسُ يَنۢبَغِي لَهَآ أَن تُدۡرِكَ ٱلۡقَمَرَ وَلَا ٱلَّيۡلُ سَابِقُ ٱلنَّهَارِۚ وَكُلّٞ فِي فَلَكٖ يَسۡبَحُونَ ٤٠﴾ [يس: ٣٨، ٤٠]
“সূর্য তার নির্দিষ্ট অবস্থানে আবর্তন করে। এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ আল্লাহর নির্ধারণ। চন্দ্রের জন্যে আমি বিভিন্ন মঞ্জিল নির্ধারিত করেছি। অবশেষে সে পুরাতন খর্জুর শাখার অনুরূপ হয়ে যায়। সূর্যের পক্ষে চন্দ্রকে নাগাল পাওয়া সম্ভব নয়। রাতের পক্ষেও দিনের অগ্রবতী হওয়া সম্ভব নয়। প্রত্যেকেই আপন আপন কক্ষপথে পরিভ্রমণ করে।” [সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ৩৮-৪০]
সূর্যের চলা এবং এ চলাকে মহা পরাক্রমশালী আল্লাহর নির্ধারণ বলে ব্যাখ্যা করা এটাই প্রমাণ করে যে, সূর্য প্রকৃতভাবেই চলমান। আর এ চলাচলের কারণেই দিবা-রাত্রি এবং ঋতুর পরিবর্তন হয়। চন্দ্রের জন্য মঞ্জিল নির্ধারণ করার অর্থ এ যে, সে তার মঞ্জিলসমূহে স্থানান্তরিত হয়। যদি পৃথিবী ঘুরত, তাহলে পৃথিবীর জন্য মঞ্জিল নির্ধারণ করা হত। চন্দ্রের জন্য নয়। সূর্য কর্তৃক চন্দ্রকে ধরতে না পারা এবং দিনের অগ্রে রাত থাকা সূর্য, চন্দ্র, দিন এবং রাতের চলাচলের প্রমাণ বহন করে।
৯) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় আবু যরকে বলেছেন,
«أَتَدْرِي أَيْنَ تَذْهَبُ قُلْتُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ قَالَ فَإِنَّهَا تَذْهَبُ حَتَّى تَسْجُدَ تَحْتَ الْعَرْشِ فَتَسْتَأْذِنَ فَيُؤْذَنُ لَهَا وَيُوشِكُ أَنْ تَسْجُدَ فَلَا يُقْبَلَ مِنْهَا وَتَسْتَأْذِنَ فَلَا يُؤْذَنَ لَهَا يُقَالُ لَهَا ارْجِعِي مِنْ حَيْثُ جِئْتِ فَتَطْلُعُ مِنْ مَغْرِبِهَا»
“হে আবু যর! তুমি কি জান সূর্য যখন অস্ত যায় তখন কোথায় যায়? আবু যার বললেন, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় ‘আরশের নিচে গিয়ে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং পুনরায় উদিত হওয়ার অনুমতি চায়। অতঃপর তাকে অনুমতি দেওয়া হয়। সে দিন বেশি দূরে নয়, যে দিন অনুমতি চাবে কিন্তু তাকে অনুমতি দেওয়া হবে না। তাকে বলা হবে যেখান থেকে এসেছ, সেখানে ফেরত যাও। অতঃপর সূর্য পশ্চিম দিক থেকেই উদিত হবে।”[1]
এটি হবে কিয়ামতের পূর্ব মুহূর্তে। আল্লাহ সূর্যকে বলবেন, যেখান থেকে এসেছ সেখানে ফেরত যাও, অতঃপর সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হওয়ার বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, সূর্য পৃথিবীর উপরে ঘুরছে এবং তার এ ঘুরার মাধ্যমেই উদয়-অস্ত সংঘটিত হচ্ছে।
১০) অসংখ্য হাদীসের মাধ্যমে জানা যায় যে, উদয় হওয়া, অস্ত যাওয়া এবং ঢলে যাওয়া এ কাজগুলো সূর্যের সাথে সম্পৃক্ত। এগুলো সূর্য থেকে প্রকাশিত হওয়া খুবই সুস্পষ্ট। পৃথিবী হতে নয়। হয়তো এ ব্যাপারে আরো দলীল-প্রমাণ রয়েছে। সেগুলো আমার এ মুহূর্তে মনে আসছেনা। তবে আমি যা উল্লেখ করলাম, এ বিষয়টির দ্বার উম্মুক্ত করবে এবং আমি যা উদ্দেশ্য করেছি, তা পূরণে যথেষ্ট হবে। আল্লাহর তাওফীক চাচ্ছি!
[1] সহীহ বুখারী, অধ্যায়: বাদউল খালক; সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: ঈমান



তাবারির সংকলনে ইবনে মাসউদের নামে আকাশের ঘূর্ণন প্রত্যাখ্যানের বর্ণনা আছে। কাবের আকাশঘোরার ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে তিনি আসমান-জমিন ধরে রাখার আয়াত ব্যবহার করেন। [275]
حدثنا جرير عن مغيرة عن إبراهيم قال: ذهب جندب البجلي إلى كعب الأحبار فقدم عليه ثم رجع فقال له عبد الله: حدثنا ما حدثك. فقال: حدثني أن السماء في قطب كقطب الرحا، والقطب عمود على منكب ملك. قال عبد الله: لوددت أنك افتديت رحلتك بمثل راحلتك، ثم قال: ما تنتكت اليهودية في قلب عبد فكادت أن تفارقه، ثم قال إن الله يمسك السماوات والأرض أن تزولا كفى بها زوالا أن تدور.
বাংলা অনুবাদ:
জারির মুগিরার সূত্রে ইব্রাহিম থেকে বর্ণনা করেন: জুনদুব আল-বাজালি কাব আল-আহবারের কাছে গেলেন। ফিরে এলে আবদুল্লাহ তাঁকে বললেন: তিনি তোমাকে কী বলেছেন বলো। তিনি বলেন: আমাকে বলেছেন, আকাশ চাকির অক্ষের মতো এক অক্ষের ওপর আছে; সেই অক্ষ একটি স্তম্ভ, যা একজন ফেরেশতার কাঁধে। আবদুল্লাহ বলেন: তোমার বাহনের সমপরিমাণ দিয়ে যদি তুমি এই সফর থেকে রক্ষা পেতে! তারপর বলেন: কোনো দাসের হৃদয়ে ইহুদি ভাবনা গেঁথে গেলে তা সহজে ছাড়ে না। তারপর তিনি বলেন: “আল্লাহ আসমানসমূহ ও পৃথিবীকে ধরে রাখেন, যাতে তারা স্থানচ্যুত না হয়।” ঘুরলেই তো স্থানচ্যুতি ঘটার জন্য যথেষ্ট।
এই বিতর্কে উভয় পক্ষ পরিচিত বস্তু দিয়ে আকাশের ব্যবস্থা কল্পনা করছে। একদিকে চাকির অক্ষ ও ফেরেশতার কাঁধ, অন্যদিকে আয়াত দিয়ে ঘূর্ণন প্রত্যাখ্যান। আকাশের দৃশ্যমান পরিবর্তনের পেছনে প্রকৃতপক্ষে কোন গতি কাজ করছে, তা পর্যবেক্ষণ ও গাণিতিক মডেলে পরীক্ষা করা হয়নি। ধর্মীয় বাক্যের অনুমোদিত অর্থই মহাজাগতিক সিদ্ধান্তের জায়গা নিয়েছে। ইবনে মাসউদের আপত্তির নির্দিষ্ট বিষয় আকাশের ঘূর্ণন; উসাইমিনের ফতোয়ায় সেই ধরনের আক্ষরিক যুক্তি পৃথিবীর ঘূর্ণন অস্বীকারে ব্যবহৃত হয়েছে।
ইবনে কাসিরের পাহাড়সংক্রান্ত ব্যাখ্যা সংক্ষিপ্ত হলেও তার ভৌত ছবিটি দ্ব্যর্থহীন। [276]
(وألقى في الأرض رواسي) يعني: الجبال أرست الأرض وثقلتها لئلا تضطرب بأهلها على وجه الماء؛ ولهذا قال: (أن تميد بكم وبث فيها من كل دابة) أي: وذرأ فيها من أصناف الحيوانات مما لا يعلم عدد أشكالها وألوانها إلا الذي خلقها.
বাংলা অনুবাদ:
“পৃথিবীতে সুদৃঢ় পর্বত স্থাপন করেছেন”—অর্থাৎ পাহাড় পৃথিবীকে স্থির ও ভারী করেছে, যাতে পানির ওপর তা তার অধিবাসীদের নিয়ে দুলতে না থাকে। তাই বলা হয়েছে, “যাতে তা তোমাদের নিয়ে ঢলে না পড়ে এবং তাতে সব ধরনের জীব ছড়িয়ে দিয়েছেন।” অর্থাৎ তিনি বিভিন্ন ধরনের জীবজন্তু তাতে ছড়িয়ে দিয়েছেন, যার আকৃতি ও বর্ণের সংখ্যা স্রষ্টা ছাড়া কেউ জানে না।
পর্বতকে পৃথিবীর কম্পনরোধী ভার বলার সঙ্গে ভূমিকম্পপ্রবণ পর্বতাঞ্চলের বাস্তব সংঘাত আছে। হিমালয় ভারতীয় ও ইউরেশীয় ভূত্বকীয় পাতের সংঘর্ষে গড়ে উঠেছে; একই চলাচল অঞ্চলটিতে ভূমিকম্পও ঘটায়। পর্বত থাকা কম্পন থামার নিশ্চয়তা দেয়নি। যে বল ও বিকৃতির ফলে পর্বত উঁচু হয়, তার সঙ্গেই বিপজ্জনক ভূকম্পন যুক্ত। ফলে পানির ওপর দুলতে থাকা পৃথিবীকে পাহাড় দিয়ে চেপে রাখার ব্যাখ্যা পৃথিবীর প্রকৃত অভ্যন্তরীণ গঠন ও গতির সঙ্গে অসঙ্গত। [277]
উসাইমিনের ফতোয়ার আরও মৌলিক ভুল হলো আপাত গতি ও প্রকৃত গতির পার্থক্য না করা। চলন্ত ট্রেন থেকে বাইরের গাছকে পেছনে যেতে দেখা যায়; সেই দৃশ্য থেকে গাছই চলেছে এবং ট্রেন স্থির—সিদ্ধান্ত আসে না। একইভাবে পৃথিবীর পৃষ্ঠে দাঁড়িয়ে সূর্যকে পূর্ব থেকে পশ্চিমে যেতে দেখা পৃথিবী স্থির থাকার প্রমাণ নয়। দিনের আকাশে দেখা সূর্যের দৈনিক গতির ব্যাখ্যায় পৃথিবীর ঘূর্ণন কার্যকর। আবার সূর্যের নিজের গতি থাকাও সত্য; সেই সত্যকে পৃথিবীর চারদিকে প্রতিদিন ঘোরার দাবির সঙ্গে এক করা ভুল। ভিন্ন গতিকে এক শব্দে মিশিয়ে দেওয়া ফতোয়ার ভৌত সমস্যার সমাধান করে না।
চাঁদের মঞ্জিল থাকা থেকে পৃথিবী ঘোরে না—এই সিদ্ধান্তও যুক্তিহীন। চাঁদের কক্ষপথ ও আলোকিত অংশের দৃশ্যমান পরিবর্তন এবং পৃথিবীর নিজের ঘূর্ণন একই সময়ে ঘটতে পারে। একটি বস্তুর নিয়মিত অবস্থানপরিবর্তনের বর্ণনায় অন্য বস্তুর গতি অনুপস্থিত থাকলেই অন্যটি স্থির হয়ে যায় না। ফতোয়ায় অনুল্লেখকে গতিহীনতার প্রমাণ বানানো হয়েছে। ফলে প্রতিটি আয়াতে পৃথিবীর গতি আলাদা করে না বলার ঘটনাই যেন পৃথিবী অচল রাখার বৈজ্ঞানিক দলিল। এমন পদ্ধতি দিয়ে আকাশের বাস্তব গতিবিদ্যা প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
সূর্য রাতের বেলা কই যায়?
সূর্যকে চলমান দৈব শক্তি, রথযাত্রী কিংবা নির্দেশমান্য সত্তা হিসেবে বর্ণনা করা বহু পুরোনো ধর্মীয় কাহিনির পরিচিত রীতি। মানুষের কাছে ভোরে সূর্য আসে, সন্ধ্যায় চলে যায়; অদৃশ্য হয়ে থাকা সময়ের জন্য কল্পনায় একটি গন্তব্য তৈরি করা হয়। ইসলামি হাদিসে সেই দৈনিক যাত্রা আল্লাহর আরশ, সিজদা এবং পুনরায় উদয়ের অনুমতির সঙ্গে যুক্ত। এই কাহিনির কেন্দ্রীয় প্রশ্নই হলো, অস্ত যাওয়ার পরে সূর্য কোথায় যায়। পৃথিবীর নির্দিষ্ট স্থানের দিগন্তের নিচে অদৃশ্য হওয়ার ঘটনাকে সূর্যের নিজের যাত্রাবিরতি ও ফেরার নির্দেশ দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
পৃথিবীর এক অঞ্চলে সূর্যাস্তের সময় অন্য অঞ্চলে সূর্য উদিত হচ্ছে বা দুপুরের আলো দিচ্ছে। রাত পৃথিবীর একটি অংশের অবস্থা; গোটা সূর্য তখন দিনের কাজ শেষ করে কোথাও আড়াল হয় না। অথচ আবু যরের বর্ণনায় প্রশ্ন, গন্তব্য, সিজদাবনত হয়ে থাকা, ওঠার নির্দেশ এবং আবার নির্দিষ্ট উদয়স্থল দিয়ে ফেরার ধারাবাহিকতা আছে। মুসলিমের দীর্ঘ বর্ণনায় একই চক্রের পুনরাবৃত্তিও স্পষ্ট। মানুষের স্থানীয় দিগন্তকে মহাজগতের সার্বজনীন দিন-রাতের সময়সূচি বানালে এই সংঘাত অনিবার্য। [278] [279] [280] [281]
সূনান আবু দাউদ (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ২৫/ কুরআনের হরুফ এবং কিরাত
পরিচ্ছদঃ পরিচ্ছেদ নাই।
৩৯৬১. উবায়দুল্লাহ্ ইবন উমার (রহঃ) …… আবূ যার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদা আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংগে একটি গাধার পেছনে সওয়ার ছিলাম। এ সময় সূর্য অস্ত যাচ্ছিল। তখন তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করেনঃ তুমি কি জান, সূর্য কোথায় অস্তমিত হয়? আমি বলি, আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল এ ব্যাপারে অধিক অবহিত। তিনি বলেন عَيْنِ حَامِيَةٍ এটি অর্থাৎ গরম প্রসবণের মধ্যে যায়।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
২৯৭২। মুহাম্মদ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) আবূ যার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় আবূ যার (রাঃ)-কে বললেন, তুমি কি জানো, সূর্য কোথায় যায়? আমি বললাম, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল ই ভাল জানেন। তিনি বললেন, তা যেতে যেতে আরশের নীচে গিয়ে সিজদায় পড়ে যায়। এরপর সে পুনঃ উদিত হওয়ার অনুমতি চায় এবং তাকে অনুমতি দেওয়া হয়। আর অচিরেই এমন সময় আসবে যে, সিজদা করবে তা কবূল করা হবে না এবং সে অনুমতি চাইবে কিন্তু অনুমতি দেওয়া হবে না। তাকে বলা হবে যে পথে এসেছ, সে পথে ফিরে যাও। তখন সে পশ্চিম দিক হতে উদিত হবে–এটাই মর্ম হল আল্লাহ তাআলার বাণীঃ আর সূর্য গমন করে তার নির্দিষ্ট গন্ত্যব্যের দিকে, এটাই পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ।
(কুরআন ৩৬:৩৮)
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫২/ তাফসীর
পরিচ্ছেদঃ আল্লাহর বাণীঃ والشمس تجري لمستقر لها ذلك تقدير العزيز العليم “এবং সূর্য ভ্রমন করে তার নির্দৃিষ্ট গন্তব্যের দিকে, এ পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রন।”
৪৪৩৯ আবূ নু’আয়ম (রহঃ) … আবূ যার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা সূর্যাস্তের সময় আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে মসজিদে ছিলাম। তিনি বললেন, হে আবূ যার! তুমি কি জানো সূর্য কোথায় ডুবে? আমি বললাম, আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল সবচেয়ে ভাল জানেন। তিনি বললেন, সূর্য চলে, অবশেষে আরশের নিচে গিয়ে সিজদা করে। নিম্নবর্ণিত আয়াতوَالشَّمْسُ تَجْرِي لِمُسْتَقَرٍّ لَهَا ذَلِكَ تَقْدِيرُ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ এ এ কথাই বর্ণনা করা হয়েছে, অর্থাৎ সূর্য ভ্রমণ করে তার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে, এ পরাক্রমশলী সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ যার আল-গিফারী (রাঃ)
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫২/ তাফসীর
পরিচ্ছেদঃ আল্লাহর বাণীঃ والشمس تجري لمستقر لها ذلك تقدير العزيز العليم “এবং সূর্য ভ্রমন করে তার নির্দৃিষ্ট গন্তব্যের দিকে, এ পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রন।”
৪৪৪০। হুমায়দী (রহঃ) … আবূ যার গিফারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আল্লাহর বাণীঃمُسْتَقَرُّ এর ব্যাখ্যা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বলেছেন, সূর্যের গন্তব্যস্থল আরশের নিচে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ যার আল-গিফারী (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১/ কিতাবুল ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ৭১. যে সময়ে ঈমান কবুল হবে না
২৯৬। ইয়াহইয়া ইবনু আইউব ও ইসহাক ইবনু ইবরাহীম (রহঃ) … আবূ যার (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা কি জানো, এ সূর্য কোথায় যায়? সাহাবীগণ বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভাল জানেন। তিনি বললেনঃ এ সূর্য চলতে থাকে এবং (আল্লাহ তা’আলার) আরশের নিচে অবস্থিত তার অবস্থানস্থলে যায়। সেখানে সে সিজদাবনত হয়ে পড়ে থাকে। শেষে যখন তাকে বলা হয়, ওঠ এবং যেখান থেকে এসেছিলে সেখানে ফিরে যাও! অনন্তর সে ফিরে আসে এবং নির্ধারিত উদয়স্থল দিয়েই উদিত হয়। তা আবার চলতে থাকে এবং আরশের নিচে অবস্থিত তার অবস্থানস্থলে যায়। সেখানে সে সিজদাবনত অবস্থায় পড়ে থাকে। শেষে যখন তাকে বলা হয়, ওঠ এবং যেখান থেকে এসেছিলে সেখানে ফিরে যাও। তখন সে ফিরে আসে এবং নির্ধারিত উদয়লে হয়েই উদিত হয়।
সে আবার চলতে থাকে এবং আরশের নিচে অবস্থিত তার অবস্থান স্থলে যায়। সেখানে সে সিজদাবনত অবস্থায় পড়ে থাকে। শেষে যখন তাকে বলা হয়, ওঠ এবং যেখান থেকে এসেছিলে সেখানে ফিরে যাও। তখন সে ফিরে আসে এবং নির্ধারিত উদয়স্থল হয়েই সে উদিত হয়। এমনিভাবে চলতে থাকবে; মানুষ তার থেকে অস্বাভাবিক কিছু হতে দেখবে না। শেষে একদিন সূর্য যথার্রীতি আরশের নিচে তার নিদৃষ্টস্থলে যাবে। তাকে বলা হবে, ওঠ এবং অস্তাচল থেকে উদিত হও। অনন্তর সেদিন সূর্য পশ্চিম গগনে উদিত হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ কোন দিন সে অবস্থা হবে তোমরা জানো? সে দিন ঐ ব্যাক্তির ঈমান কোন কাজে আসবে না, যে ব্যাক্তি পুর্বে ঈমান আনে নাই কিংবা যে ব্যাক্তি ঈমানের মাধ্যমে কল্যাণ অর্জন করে নাই।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ যার আল-গিফারী (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১/ কিতাবুল ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ৭১. যে সময়ে ঈমান কবুল হবে না
২৯৮। আবূ বকর ইবনু আবূ শায়বা ও আবূ কুরায়ব (রহঃ) … আবূ যার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি মসজিদে নববীতে প্রবেশ করলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তথায় উপবিষ্ট ছিলেন। সূর্য অন্তমিত হলে তিনি বললেনঃ হে আবূ যার! জানো, এ সূর্য কোথায় যায়? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভাল জানেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ সে তার গন্তব্য স্থলে যায় এবং আল্লাহর কাছে সিজদার অনুমতি চায়। তখন তাকে অনুমতি দেয়া হয়। পরে একদিন যখন তাকে বলা হবে যেদিক থেকে এসেছো সেদিকে ফিরে যাও। অনন্তর তা অস্থাচল থেকে উদিত হবে। এরপর তিনি আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদের কিরাআত অনুসারে তিলাওয়াত করেনঃذَلِكَ مُسْتَقَرٌّ لَهَا এ তার গন্তব্যস্থল
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ যার আল-গিফারী (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১/ কিতাবুল ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ৭১. যে সময়ে ঈমান কবুল হবে না
২৯৯। আবূ সাঈদ আল আশাজ্জ ও ইসহাক ইবনু ইবরাহীম (রহঃ) … আবূ যার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আামরা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেوَالشَّمْسُ تَجْرِي لِمُسْتَقَرٍّ لَهَا “এবং সূর্য ভ্রমণ করে উহার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিবে” (৩৬ঃ ৩৮) এ আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেনঃ আরশের নিচে তার গন্তব্য স্থল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ যার আল-গিফারী (রাঃ)
সহীহ হাদিসে কুদসি
১/ বিবিধ হাদিসসমূহ
পরিচ্ছেদঃ আল্লাহর প্রশংসামূলক কতক বাক্যের ফযিলত
১৬১. আবূ যর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি একটি গাধার ওপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলাম। তখন তার উপর একটি পাড়যুক্ত চাদর ছিল। তিনি বলেন: এটা ছিল সূর্যাস্তের সময়, তিনি আমাকে বলেন: “হে আবূ যর তুমি জান এটা কোথায় অস্ত যায়?” তিনি বলেন: আমি বললাম: আল্লাহ এবং তার রাসূল ভাল জানেন। তিনি বলেন: সূর্যাস্ত যায় একটি কর্দমাক্ত ঝর্ণায়, সে চলতে থাকে অবশেষে আরশের নিচে তার রবের জন্য সেজদায় লুটিয়ে পড়ে, যখন বের হওয়ার সময় আল্লাহ তাকে অনুমতি দেন, ফলে সে বের হয় ও উদিত হয়। তিনি যখন তাকে যেখানে অস্ত গিয়েছে সেখান থেকে উদিত করার ইচ্ছা করবেন আটকে দিবেন, সে বলবে: হে আমার রব আমার পথ তো দীর্ঘ, আল্লাহ বলবেন: যেখান থেকে ডুবেছে সেখান থেকেই উদিত হও, এটাই সে সময় যখন ব্যক্তিকে তার ঈমান উপকার করবে না”। [আহমদ] হাদিসটি সহিহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৫/ কুরআন মাজীদের তাফসীর
পরিচ্ছেদঃ ৬৫/৩৬/১. আল্লাহর বাণীঃ আর সূর্য নিজ গন্তব্য স্থানের দিকে চলতে থাকে। এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ। (সূরাহ ইয়াসীন ৩৬/৩৮)
৪৮০২. আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় আমি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে মসজিদে ছিলাম। তিনি বললেন, হে আবূ যার! তুমি কি জান সূর্য কোথায় ডুবে? আমি বললাম, আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল সবচেয়ে ভাল জানেন। তিনি বললেন, সূর্য চলে, অবশেষে আরশের নিচে গিয়ে সিজদা করে। নিম্নবর্ণিত وَالشَّمْسُ تَجْرِيْ لِمُسْتَقَرٍّ لَّهَا ذٰلِكَ تَقْدِيْرُ الْعَزِيْزِ الْعَلِيْمِ এ আয়াতের কথাই বর্ণনা করা হয়েছে, অর্থাৎ সূর্য ভ্রমণ করে তার নির্দিষ্ট গন্তব্যের পানে, এ হল পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ। [৩১৯৯] (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪৪৩৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪৪৩৯)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ যার আল-গিফারী (রাঃ)
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৫/ কুরআন মাজীদের তাফসীর
পরিচ্ছেদঃ ৬৫/৩৬/১. আল্লাহর বাণীঃ আর সূর্য নিজ গন্তব্য স্থানের দিকে চলতে থাকে। এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ। (সূরাহ ইয়াসীন ৩৬/৩৮)
৪৮০৩. আবূ যার গিফারী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আল্লাহর বাণীঃ وَالشَّمْسُ تَجْرِيْ لِمُسْتَقَرٍّ لَّهَا সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বলেছেন, সূর্যের গন্তব্যস্থল আরশের নিচে। [৩১৯৯] (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪৪৩৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪৪৪০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ যার আল-গিফারী (রাঃ)
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৯৭/ তাওহীদ
পরিচ্ছেদঃ ৯৭/২৩. আল্লাহর বাণীঃ ফেরেশতা এবং রূহ্ আল্লাহর দিকে ঊর্ধ্বগামী হয়- (সূরা আল মা‘আরিজ ৭০/৪)। এবং আল্লাহর বাণীঃ তাঁরই দিকে পবিত্র বাণীসমূহ আরোহণ করে- (সূরাহ ফাত্বির ৩৫/১০)।
৭৪৩৩. আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করেছি, ‘‘আর সূর্য ভ্রমণ করে তার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে’’ আল্লাহর এ কথা সম্পর্কে। তিনি বলেছেনঃ সূর্যের নির্দিষ্ট গন্তব্য হল আরশের নিচে। [৩১৯৯] (আধুনিক প্রকাশনী- ৬৯১৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৯২৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ যার আল-গিফারী (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১। ঈমান [বিশ্বাস]
পরিচ্ছেদঃ ৭২. যে সময়ে ঈমান কবুল হবে না।
২৮৯-(২৫০/১৫৯) ইয়াহইয়া ইবনু আইয়ুব ও ইসহাক ইবনু ইবরাহীম (আঃ) ….. আবূ যার (রাযিঃ) বলেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা কি জান, এ সূর্য কোথায় যায়? সাহাবাগণ বললেন, আল্লাহ ও তার রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বললেন, এ সূর্য চলতে থাকে এবং (আল্লাহ তা’আলার) আরশের নীচে অবস্থিত তার অবস্থান স্থলে যায়। সেখানে সে সাজদাবনত হয়ে পড়ে থাকে। শেষে যখন তাকে বলা হয়, উঠ এবং যেখান থেকে এসেছিলে সেখানে ফিরে যাও! অনন্তর সে ফিরে আসে এবং নির্ধারিত উদয়স্থল দিয়েই উদিত হয়। তা আবার চলতে থাকে এবং আরশের নীচে অবস্থিত তার অবস্থান স্থলে যায়। সেখানে সে সাজদাবনত অবস্থায় পড়ে থাকে। শেষে যখন তাকে বলা হয় উঠ এবং যেখান থেকে এসেছিলে সেখানে ফিরে যাও। তখন সে ফিরে আসে এবং নির্ধারিত উদয়স্থল হয়েই সে উদিত হয়। এমনিভাবে চলতে থাকবে; মানুষ তার থেকে অস্বাভাবিক কিছু হতে দেখবে না। শেষে একদিন সূর্য যথারীতি আরশের নীচে তার অবস্থানে যাবে। তাকে বলা হবে, উঠ এবং অস্তাচল থেকে উদিত হও। অনন্তর সেদিন সূর্য পশ্চিমাকাশে উদিত হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, (কুরআনের বাণী) “কোন দিন সে অবস্থা হবে তোমরা জান? সেদিন ঐ ব্যক্তির ঈমান কোন কাজে আসবে না, যে ব্যক্তি পূর্বে ঈমান আনেনি কিংবা যে ব্যক্তি ঈমানের মাধ্যমে কল্যাণ অর্জন করেনি”- (সূরাহ আল আনআম ৬ঃ ১৫৮)*। (ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৯৬, ইসলামিক সেন্টারঃ ৩০৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ যার আল-গিফারী (রাঃ)

উষ্ণ প্রস্রবণে অস্ত যাওয়ার বক্তব্য সমস্যাটিকে আরও নির্দিষ্ট করে। একটি পৃথিবীস্থ জলাধারে সূর্য প্রবেশ করলে তার আকার, দূরত্ব ও পদার্থগত গঠন সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভুল ধারণা গ্রহণ করতে হয়। সূর্য পৃথিবীর ছোট কোনো জলাশয়ে ঢুকে যাওয়ার মতো বস্তু নয়। আরশের নিচে যাওয়ার বর্ণনাতেও সূর্যাস্তের পরের কাজকে মানুষের বিশ্রাম, উপাসনা ও কর্তৃপক্ষের অনুমতির মতো করে সাজানো হয়েছে। একটি প্রাকৃতিক ঘটনার পেছনে প্রাসাদকেন্দ্রিক দৈব প্রশাসনের কাহিনি বসেছে। এখানে সূর্যের নিজস্ব পরিচিত গতি সম্পর্কে মাপ নেই; আছে তাকে সচেতন আনুগত্যশীল চরিত্র বানানোর আখ্যান।
একই আবু যরের বর্ণনা বুখারি-মুসলিমের বিভিন্ন অধ্যায়ে কিংবা বিভিন্ন বাংলা অনুবাদে থাকা আলাদা আলাদা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ নয়। কিন্তু তার প্রচলন ও ধর্মীয় ব্যবহারের পরিসর বড়। কোথাও সৃষ্টির ব্যাখ্যা, কোথাও নির্দিষ্ট আয়াতের তাফসির, কোথাও শেষবিচারের পূর্বলক্ষণ হিসেবে একই কাহিনি স্থান পেয়েছে। ফলে এই আখ্যান শুধু ব্যক্তিগত গল্প থাকে না; মহাজগত সম্পর্কে ধর্মীয় শিক্ষার অংশ হয়ে ওঠে। প্রাকৃতিক ঘটনা বোঝার জন্য মানুষকে যে বিবরণ মুখস্থ করানো হচ্ছে, সেটি বাস্তব সূর্য-পৃথিবী ব্যবস্থার সঙ্গে মেলে না।
পশ্চিম দিক থেকে ওঠার ভবিষ্যদ্বাণীও একই যাত্রাপথ উল্টে দেওয়ার ভাষায় বলা হয়েছে। “যেখান থেকে এসেছ, সেখানে ফিরে যাও”—সূর্যকে দেওয়া এই নির্দেশে পশ্চিমের অস্তাচলই পরের উদয়স্থল হয়। আধুনিক গতিবিদ্যায় পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে সূর্যোদয়ের দিক পৃথিবীর ঘূর্ণনের সঙ্গে সম্পর্কিত। আকাশে সূর্যকে ঘুরিয়ে ফেরত পাঠানোর কাহিনি এবং পৃথিবীর ঘূর্ণন বদলানোর ভৌত ঘটনা এক ব্যাখ্যা নয়। হাদিসের ঘটনাপ্রবাহ সূর্যকেই যাত্রী ও নির্দেশগ্রহীতা করেছে। তার পৌরাণিক দৈনিক যাত্রাকে পৃথিবীর ঘূর্ণনের বৈজ্ঞানিক বিবরণ বলা অর্থ পরিবর্তন।
স্থানীয় সূর্যাস্তের পরে সূর্যের গন্তব্য জানতে চাওয়ার এই কাহিনি এমন দৃষ্টিভঙ্গি বহন করে, যেখানে মানুষের দৃশ্যমান দিগন্তই জগতের প্রধান সীমানা। সেই সীমানা পেরিয়ে কী হয়, উত্তর পাওয়া যায় অদৃশ্য রাজাসনের কাছে। কিন্তু পৃথিবীর অন্য দ্রাঘিমায় দাঁড়ানো মানুষ একই মুহূর্তে সূর্যের আলো দেখেন। তাঁর কাছে তখন সূর্য দৃশ্যমান কর্মে আছে। একটি সূর্যকে গোটা গোলাকার পৃথিবীর জন্য একই রাতের বিরতি ও সকালের অনুমতির অধীন করলে ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের সমকালীন দিন-রাত আর ব্যাখ্যা করা যায় না। ধর্মীয় কাহিনির এই সীমাবদ্ধতা সরাসরি পৃথিবীর আকার ও সময়ের বাস্তব সম্পর্কের সঙ্গে সংঘর্ষে আসে।
পৃথিবী সমতলভাবে বিছানো

পৃথিবীকে বিছানা, বিস্তৃত ভূমি এবং ওপরের আকাশকে ছাদ হিসেবে বর্ণনা করার ভাষা কোরআনে বারবার এসেছে। এতে মানুষের বসবাসের পৃষ্ঠকে ঘর নির্মাণের পরিচিত রীতিতে কল্পনা করা হয়। ভূপৃষ্ঠে দাঁড়ানো মানুষের অভিজ্ঞতায় জমি বিস্তৃত, আকাশ মাথার ওপর, আর পর্বত সেই জমিতে দাঁড়ানো। ধর্মীয় মহাজাগতিক ছবিতে এই স্থানীয় অভিজ্ঞতা সমগ্র পৃথিবী ও আকাশের স্থাপত্য হয়ে ওঠে। জালালাইনের ব্যাখ্যায় এই ভাষা থেকে পৃথিবী গোলক নয়, সমতল—এমন সিদ্ধান্ত সরাসরি নেওয়া হয়েছে। ফলে সমতল পৃথিবীর পাঠের বাস্তব লিখিত সাক্ষ্য আছে; সেটিকে সমালোচকের বানানো ব্যাখ্যা বলা মিথ্যা।
এবং পৃথিবীর দিকে যে, তা কিভাবে সমতল বিছানো হয়েছে?
কুরআন ৮৮ঃ২০
যে পবিত্রসত্তা তোমাদের জন্য পৃথিবীকে বিছানা এবং আকাশকে ছাদ স্বরূপ স্থাপন করে দিয়েছেন, আর আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে তোমাদের জন্য ফল-ফসল উৎপাদন করেছেন তোমাদের খাদ্য হিসাবে। অতএব, আল্লাহর সাথে তোমরা অন্য কাকেও সমকক্ষ করো না। বস্তুতঃ এসব তোমরা জান।
কুরআন সুরা বাকারা ২:২২
তিনি তোমাদের জন্যে পৃথিবীকে শয্যা করেছেন এবং তাতে চলার পথ করেছেন, আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেছেন এবং তা দ্বারা আমি বিভিন্ন প্রকার উদ্ভিদ উৎপন্ন করেছি।
কুরআন সুরা ত্বা-হা ২০:৫৩
আমি পৃথিবীকে বিছিয়েছি। আমি কত সুন্দরভাবেই না বিছাতে সক্ষম।
কুরআন সুরা যারিয়া’ত ৫১:৪৮
আল্লাহ তা’আলা তোমাদের জন্যে পৃথিবীকে করেছেন বিছানা।
কুরআন সুরা নূহ ৭১:১৯
আমি কি করিনি পৃথিবীকে বিছানা ?
কুরআন সুরা নাবা ৭৮:৬
আমি পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছি এবং তার উপর পর্বতমালা স্থাপন করেছি এবং তাতে প্রত্যেক বস্তু সুপরিমিতভাবে উৎপন্ন করেছি।
কুরআন সুরা হিজর ১৫:১৯
জালালাইনের গাশিয়া ৮৮:২০-এর ব্যাখ্যায় “সমতল করা হয়েছে” থেকে সমতল পৃথিবীর সিদ্ধান্ত এবং জ্যোতির্বিদদের গোলক মতের প্রত্যাখ্যান আছে। এই অংশ জালালুদ্দিন আল-মহল্লীর তাফসিরের অন্তর্গত; পরে জালালুদ্দিন আস-সুয়ুতি গ্রন্থের অন্য অংশ পূর্ণ করেন। গ্রন্থটির রচনাকে ১০০৪ হিজরির ঘটনা বলা ভুল; দুই লেখকই তার আগের মানুষ। ছবির পৃষ্ঠার সঙ্গে অনলাইনের মূল আরবি মিলিয়ে দেখলে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তটি সরাসরি পাওয়া যায়। [282] [283]
২০. আর ভূতলের দিকে কিরূপে তাকে সমতল করা
হয়েছে? সম্প্রসারিত করা হয়েছে। সারকথা, এ সকল বস্তুর প্রতি লক্ষ্য করে আল্লাহর কুদরত ও একত্বের প্রতি ঈমান আনাই বাঞ্ছনীয় ছিল। সর্বপ্রথম উষ্ট্রের উল্লেখ এ জন্য করা হয়েছে, যেহেতু এটা তাদের সাথে অন্যগুলোর তুলনায় অধিক সম্পৃক্ত। سط শব্দ দ্বারা বাহ্যত এটাই প্রমাণিত হয় যে, পৃথিবী সমতল। শরিয়তের আলিমগণের মতও এটাই, ভূতত্ত্ববিদদের মতানুরূপ গোলাকার নয়। যদিও তাদের সে দৃষ্টিভঙ্গি শরিয়তের কোনো আহকামের জন্য বিপত্তিকর নয়।

ইবনে কাসিরের অনুবাদের এই পৃষ্ঠাগুলোতেও ভূমি বিস্তার, তার ব্যবহার এবং পাহাড় স্থাপনের আলোচনা আছে। ভৌগোলিক উপমা, তাফসিরকারের গ্রহণ করা মহাজাগতিক ধারণা এবং সেই ধারণার ভৌত দাবির সম্পর্ক এখানেও গুরুত্বপূর্ণ। জমিতে পথ ও উদ্ভিদ থাকা মানুষের অভিজ্ঞতার তথ্য; গোটা পৃথিবীর আকৃতি ও স্থিতি নির্ধারণের জন্য পৃথক পরিমাপ লাগে। মাটিতে দাঁড়িয়ে চারদিকে বিস্তৃত দেখার অনুভূতিকে বিশ্বের সম্পূর্ণ আকৃতির প্রমাণ করা ভুল। [284]
তাফসীর: হুরুফুল হিজা সম্পর্কে সূরা বাকারার শুরুতে বিস্তারিত আলোচনা করা হইয়াছে। বিধায় পূনরায় আলোচনা করা নিষ্প্রয়োজন। আলোচ্য আয়াতের শুরুতে হরফটিও قص ইত্যাদি হুরূফে মুকাত্তায়ার ন্যায় একটি হরফ।
কেহ কেহ বলেন, ধারণ করিয়া রাখিয়াছে। বিরাটকায় একটি মৎসের নাম যাহা সাত তবক যমীনকে
যেমন ইবন জারীর (র)……. ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, ইন্ন আব্বাস (রা) বলেনঃ আল্লাহ্ তা’আলা সর্বপ্রথম কলম তৈয়ার করিয়া বলিলেন, লিখ। কলম বলিল, কি লিখিব? আল্লাহ্ বলিলেন, তাকদীর লিপিবদ্ধ কর। ফলে সেই দিন হইতে কিয়ামত পর্যন্ত যাহা সংঘটিত হইবার ছিল কলম লিখিতে আরম্ভ করিল।
অতঃপর আল্লাহ্ তা’আলা نون তথা মৎস সৃষ্টি করেন। তাহার পর পানির ফেনা হইতে আকাশ সৃষ্টি করেন ও মৎসের পিঠের উপর পৃথিবীকে বিছাইয়া দেন। ফলে মৎস নড়াচড়া করিতে আরম্ভ করে। সংগে সংগে পৃথিবীও নড়িয়া উঠে। তখন আল্লাহ্ তা’আলা পর্বতমালা দ্বারা পৃথিবী স্থির করেন। অন্য এক সূত্রে আছে যে, ইব্ন আব্বাস (রা) এই
কথা বলিয়া ن وَالْقُلَمِ وَمَا يَسْطُرُونَআয়াতটি তিলাওয়াত করেন।
ইবন জারীর (র)……. ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন: আমার প্রতিপালক সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করিয়া বলিলেন, লিখ। ফলে কলম কিয়ামত পর্যন্ত যাহা সংঘটিত হইবে সবই লিপিবদ্ধ করিল। অতঃপর আল্লাহ্ তা’আলা পানির উপর মৎস সৃষ্টি করেন। তাহার পর সেই মৎসের উপর পৃথিবীকে বিছাইয়া দেন।
তারাবানী (র)……. ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলিয়াছেন: আল্লাহ্ তা’আলা সর্বপ্রথম কলম ও মৎস )نون( সৃষ্টি করেন। অতঃপর কলমকে বলিলেন, লিখ, লিখ। জিজ্ঞাসা করিল, কি লিখিব? আল্লাহ্ বলিলেন: কিয়ামত পর্যন্ত যাহা হইবে সব লিখ। অতঃপর রাসূল্লাহ্ )1( ن وَالْقَلَمِ وَمَا يَسْطُرُونَআয়াতটি পাঠ করেন।
ইবন আসাকির (র)……. আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বলিতে শুনিয়াছি যে, আল্লাহ্ তা’আলা সর্বপ্রথম কলম ও নূন তথা দোয়াত সৃষ্টি করেন। অতঃপর কলমকে বলিলেন, লিখ। কলম জিজ্ঞাসা করিল, কি লিখিব? আল্লাহ্ বলিলেন: কিয়ামত পর্যন্ত যাহা সংঘটিত হইবে সব লিখ। ن والقلم وَمَا يَسْطُرُونَ এই আয়াতে এই কথাই বলা হইয়াছে। অতঃপর কলমের মুখে মোহর করিয়া কথা বলিবার শক্তি রহিত করা হয়। ফলে কিয়ামত পর্যন্ত আর সে কথা বলিতে পারিবে না। তাহার পর বিবেক সৃষ্টি করিয়া বলিলেন, আমি আমার ইজ্জতের শপথ করিয়া বলিতেছি যে, আমার প্রিয় লোকদের মধ্যে আমি তোমাকে পরিপূর্ণতা দান করিব আর আমার অপ্রিয় লোকদের মধ্যে তোমাকে অসম্পূর্ণ রাখিব। (অর্থাৎ যাহারা আমার আপন লোক তাহাদিগকে আমি পরিপূর্ণ জ্ঞান দান করিব, যাহারা আমার আপন নহে তাহাদিগের জ্ঞান হইবে অসম্পূর্ণ।
মুজাহিদ (র) বলেন: নূন সাত তবক যমীনের নীচের বসবাসকারী বিরাটকায় একটি মাছ বলিয়া কথিত আছে।
হাসান বসরী (র) সহ একদল মুফাস্সির বলেনঃ এই মৎসটির পিঠের উপর আকাশ যমীন সমান মোটা একটি পাথর আছে। সেই পাথরের উপর আছে চল্লিশ হাজার শিং বিশিষ্ট একটি ষাঁড়। আর সেই ষাঁড়ের পিঠের উপর সাত তবক যমীন ও তন্মধ্যস্ত সমুদয় বস্তু অবস্থিত। কেহ কেহ এই অর্থের উপর নিম্ন বর্ণিত হাদীসটির ব্যাখ্যা করিয়াছেন।
ইমাম আহমদ (র)……. আনাস (রা) হইতে বর্ণিত যে, আব্দুল্লাহ ইব্ন সালাম যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মদীনা আগমনের সংবাদ পাইলেন, তখন তিনি তাঁহার নিকট আসিয়া কতটি প্রশ্ন করেন। তিনি বলেন, আমি আপনার নিকট এমন কতক প্রশ্ন করিব যাহার উত্তর নবী ব্যতীত কেহ জানিতে পারে না। তিনি বলেন, কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সর্বপ্রথম আলামত কি? জান্নাতবাসীগণ প্রথম কি বস্তু দিয়া আহার করিবেন? কি কারণে সন্তান তাহার পিতার বর্ণ ও আকৃতি ধারণ করে এবং কি কারণে সন্তান তাহার মাতার বর্ণ ও আকৃতি ধারণ করে? নবী (সা) বলিলেন, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নিয়া এই মাত্র জিবরাঈল (আ) আমার নিকট আসিয়া বলিয়া গিয়াছেন। তখন ইব্ন সালাম বলিলেন, জিবরাঈল তো ফিরিশতাগণের মধ্যে ইয়াহুদীদের জন্য চিরশত্রু। নবী (সা) বলিলেন, কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সর্বপ্রথম আলামত হইল যে, একটি অগ্নি প্রকাশিত হইবে, যাহা সকল মানুষকে পূর্ব দিক হইতে পশ্চিম দিকে একত্রিত করিবে এবং জান্নাতীগণ সর্বপ্রথম যাহা আহার করিবেন তাহা হইল মাছের কলিজা এবং যখন মাতার উপর পিতার বীর্য প্রবল হইবে তখন সন্তান পিতার আকৃতি ধারণ করিবে। আর যখন পিতার উপর মাতার বীর্য প্রবল হইবে তখন সন্তান মাতার আকৃতি ধারণ করিবে।
হাদীসটি বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হইয়াছে।
মুসলিমে অপর এক সনদে সাওবান (রা) হইতে বর্ণিত আছে যে, একবার এক ইয়াহুদী পণ্ডিত কয়েকটি বিষয়ে নবী (সা)-কে জিজ্ঞাসা করিয়াছিল। এইগুলির মধ্যে ইহাও ছিল যে, জান্নাতীগণ জান্নাতে প্রবেশ করিবার পর সর্বপ্রথম তাহাদেরকে কি তুহফা দেওয়া হইবে? নবী (সা) বলিলেন, মাছের কলিজার একাংশ। আবার প্রশ্ন করিল, ইহার পর তাহাদের খাদ্য কি হইবে? নবী (সা) বলিলেন, তাহাদের জন্য জান্নাতের একটি ষাঁড় জবেহ করা হইবে। যে ষাঁড়টি জান্নাতের মধ্যে বিচরণ করিত। অতঃপর প্রশ্ন করিল, ইহার পর তাহাদের পানীয় কি হইবে? নবী (সা) বলিলেন, সালসাবীল নামক প্রস্রবণ হইতে পানীয় দেওয়া হইবে। কেহ কেহ বলেন, নূন হইল নূরের একটি পলক। ইবন জারীর (র)……. কুররা (র) হইতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলিয়াছেন নূন হইল নূরের একটি পলক এবং কলম হইল নূর দিয়া তৈরি, কিয়ামত পর্যন্ত যাহা সংঘটিত হইবে তাহা লিখিতে থাকিবে। এই হাদীসটি মুরসাল গরীব। ইবন জুরাইজ (র) বলেন, আমাকে বলা হইয়াছে যে, কলমটি নূরের তৈরি যাহার দৈর্ঘ্য এক শত বৎসরের পথের সমান।


তালবিয়ার হাদিসে উপাসকের ডান-বাম দিকের পাথর, গাছ ও মাটির সাড়া দেওয়ার কথা আছে এবং তার বিস্তার পৃথিবীর প্রান্ত পর্যন্ত বলা হয়েছে। এখানে জড় প্রকৃতিকে ধর্মীয় উচ্চারণে অংশগ্রহণকারী বানানো হয়েছে। মানুষের কণ্ঠের সঙ্গে পুরো ভূমির সাড়া দেওয়ার এই ছবি উপাসকের কাজকে মহাজাগতিক গুরুত্ব দেয়। ভূমির দুই প্রান্তের ভাষাও সেই সর্বব্যাপী সাড়ার বর্ণনায় ব্যবহৃত। হাদিসটির নির্দিষ্ট অলৌকিক দাবি হলো জড় বস্তুগুলোর তালবিয়া; পৃথিবীর জ্যামিতিক আকৃতি সম্পর্কে জালালাইনের সরাসরি বক্তব্যটি পৃথক দলিল। [285] [286]
সুনান ইবনু মাজাহ
১৯/ হজ্জ
পরিচ্ছেদঃ ১৯/১৫. তালবিয়া
৪/২৯২১। সাহল ইবনে সাদ আস-সাইদী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে ব্যক্তিই তালবিয়া পাঠ করে, সাথে সাথে তার ডান ও বাঁ দিকের পাথর, গাছপালা অথবা মাটি, এমনকি দুনিয়ার সর্বশেষ প্রান্ত উভয় দিকের সবকিছু তালবিয়া পাঠ করে।
তিরমিযী ৮২৮, মিশকাত ২৫৫০, রাওদুন নাদীর ২/১১৮।
তাহকীক আলবানীঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সাহল বিন সা’দ (রাঃ)
সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৭/ হাজ্জ
পরিচ্ছেদঃ ১৪. তালবিয়া ও কুরবানীর ফযীলত
৮২৮। সাহল ইবনু সা’দ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন কোন মুসলিম তালবিয়া পাঠ করে তখন তার ডান ও বামে পাথর, বৃক্ষরাজি, মাটি সবকিছুই তার সাথে তালবিয়া পাঠ করে। এমনকি পৃথিবীর এ প্রান্ত হতে ও প্রান্ত পর্যন্ত (তালবিয়া পাঠকারীদের দ্বারা) পূর্ণ হয়ে যায়।
— সহীহ, মিশকাত (২৫৫০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সাহল বিন সা’দ (রাঃ)
জালালাইনের সম্পূর্ণ সংশ্লিষ্ট ব্যাখ্যায় সমতলতা, শরিয়তের আলেম এবং জ্যোতির্বিদদের গোলক মতকে পাশাপাশি রাখা হয়েছে। [287]
وإلى الأرض كيف سطحت أي بسطت، فيستدلون بها على قدرة الله تعالى ووحدانيته، وصدرت بالإبل لأنهم أشد ملابسة لها من غيرها، وقوله: سطحت ظاهر في الأرض سطح، وعليه علماء الشرع، لا كرة كما قاله أهل الهيئة وإن لم ينقض ركنا من أركان الشرع.
বাংলা অনুবাদ:
“পৃথিবীর দিকে, কীভাবে তা সমতল করা হয়েছে”—অর্থাৎ বিস্তৃত করা হয়েছে। তারা এ থেকে আল্লাহর ক্ষমতা ও একত্বের প্রমাণ নেবে। উটের কথা আগে এসেছে, কারণ অন্য কিছুর চেয়ে উটের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বেশি। “সমতল করা হয়েছে” কথার প্রকাশ্য অর্থ, পৃথিবী সমতল; শরিয়তের আলেমদের মতও তাই। জ্যোতির্বিদেরা যেমন বলেছেন, তা গোলক নয়; যদিও গোলক হওয়ার মত শরিয়তের কোনো মৌলিক স্তম্ভ নষ্ট করে না।
এই ব্যাখ্যায় যে বিরোধ দেখা যায়, তা চোখের সামনে থাকা অভিজ্ঞতা এবং বৃহত্তর জ্যামিতিক জ্ঞানের বিরোধ। পৃথিবীর বিশাল ব্যাসার্ধের তুলনায় মানুষের দেখা ছোট অঞ্চল প্রায় সমতল মনে হতে পারে। কিন্তু সেই অনুভূতি থেকে গোটা পৃথিবীকে সমতল ঘোষণা করা স্থানীয় অংশের বৈশিষ্ট্যকে সমগ্রের বৈশিষ্ট্য ধরে নেওয়া। জ্যোতির্বিদদের গোলক মতের কথা জানা থাকা সত্ত্বেও ব্যাখ্যাকারী ধর্মীয় ভাষার প্রকাশ্য অর্থের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ফলে তথ্যের মূল্যায়নে ধর্মীয় পাঠের অগ্রাধিকার কীভাবে ভুল মহাজাগতিক সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছে, তার একটি সরাসরি উদাহরণ পাওয়া যায়।
সমতলতা এবং স্থিরতা পৃথক দাবি। একটি গোলাকার পৃথিবীকেও স্থির কল্পনা করা সম্ভব, আবার সমতল পৃষ্ঠবিশিষ্ট কোনো বস্তু চলতেও পারে। ধর্মীয় কাহিনিগুলোতে এই দুই ধারণা প্রায়ই একই বাসযোগ্য ভূমি ও ওপরের আকাশের ছবিতে যুক্ত হয়েছে। তাদের ভৌত পরীক্ষা আলাদাভাবে করতে হয়। পৃথিবীর গোলাকার গঠন এবং তার ঘূর্ণন দুটোরই পর্যবেক্ষণভিত্তিক সাক্ষ্য আছে। ভূমি বিছানোর উপমা বা সূর্য উদয়ের পরিচিত ভাষা দিয়ে সেই সাক্ষ্য বাতিল করার পদ্ধতি প্রকৃতিকে জানার বদলে একটি আগের ছবি রক্ষা করে।
আসমান ও পৃথিবীর মাঝে দূরত্ব
আসমান ও পৃথিবীর ব্যবধান নিয়ে হাদিসে পথ চলার বছরের ভাষায় নির্দিষ্ট সংখ্যা আছে। এক বর্ণনায় পাঁচশ বছরের পথ, অন্যটিতে একাত্তর, বাহাত্তর বা তিয়াত্তর বছরের ব্যবধান বলা হয়েছে। এগুলো আলাদা বর্ণনার পাঠ; একই সংখ্যার একটিমাত্র অবিকল উক্তি নয়। কিছু বর্ণনা নিয়ে মুহাদ্দিসদের গ্রহণ-বর্জনের বিরোধ আছে এবং তিরমিজিও একটি সূত্রে হাসানের আবু হুরাইরা থেকে না শোনার কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সাত আসমান, তাদের মধ্যবর্তী ব্যবধান, ওপরের সাগর এবং আরশবাহকের শরীরকে দিয়ে মাপ তৈরি করার কল্পনাটি গ্রন্থগুলোতে নির্দিষ্টভাবেই সংরক্ষিত। [288] [289]
وَتَرَى الْمَلَئِكَةُ حَافِيْنَ مِنْ حَوْلِ الْعَرْشِ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَقَضِي بيْنَهُم بِالْحَقِّ وَقِيلَ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ.
অর্থাৎ- ‘এবং তুমি ফেরেশতাদেরকে দেখতে পাবে যে, তারা আরশের চারপাশে ঘিরে তাদের প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করেছে। আর তাদের বিচার করা হবে ন্যায়ের সাথে; বলা হবে, প্রশংসা জগত সমূহের প্রতিপালক আল্লাহর প্রাপ্য। (৩৯:৭৫)
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত বিপদকালীন দু’আয় আছে:
لا إله الا الله العظيم الحليم – لا اله إلا الله رب العرش الكريم – لا
اله الا الله رب السموت ورب الأرض رب العرش الكريم.
অর্থাৎ- আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই, যিনি মহান পরম সহনশীল। আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই, যিনি সম্মানিত আরশের অধিপতি। আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই, যিনি আকাশ মণ্ডলীর অধিপতি ও পৃথিবীর অধিপতি। যিনি সম্মানিত আরশের অধিপতি।
ইমান আহমদ (র) আব্বাস ইব্ন আবদুল মুত্তালিব (রা) থেকে বর্ননা করেন যে, তিনি বলেন, আমরা একদা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে বাহা নামক স্থানে উপবিষ্ট ছিলাম। এ সময়ে একখণ্ড মেঘ অতিক্রম করলে রাসূলুল্লাহ (সা) বললেনঃ তোমরা কি জান এগুলো কী? আমরা বললাম, মেঘমালা! তিনি বললেন, সাদা মেঘ বলতে পার। আমরা বললাম সাদা মেঘ। তিনি বললেন: ‘আনানও (মেঘ) বলতে পার, আমরা বললাম ওয়াল আনান। তারপর বললেন,
আমরা নীরব থাকলাম। তারপর তিনি বললেন: তোমরা কি জান যে, আকাশ ও পৃথিবীর মাঝে দূরত্ব কতটুকু? আব্বাস (রা) বলেন, আমরা বললাম, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই সম্যক অবহিত। তিনি বললেন: উভয়ের মাঝে পাঁচশ বছরের দূরত্ব। এক আকাশ থেকে আরেক আকাশ পর্যন্ত পাঁচশ বছরের দূরত্ব, প্রত্যেকটি আকাশ পাঁচশ বছরের দূরত্ব সমান পুরু এবং সপ্তম আকাশের উপরে একটি সমুদ্র আছে: যার উপর ও নীচের মধ্যে ঠিক ততটুকু দূরত্ব; যতটুকু দূরত্ব আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে। তারপর তার উপরে আছে আটটি পাহাড়ী মেষ, যাদের হাঁটু ও ক্ষুরের মাঝে আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যকার দূরত্বের সমান দূরত্ব। সেগুলোর উপরে হলো আরশ। যার নিচ ও উপরের মধ্যে ততটুকু দূরত্ব, যতটুকু আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে। আল্লাহ হলেন তারও উপরে। কিন্তু বনী আদমের কোন আমলই তাঁর কাছে গোপন থাকে না।
পাঠটি ইমাম আহমদ (র)-এর। আর ইমাম আবু দাউদ ইব্ন মাজাহ ও তিরমিযী (র) সিমাক (রা) সূত্রে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। ইমান তিরমিযী (র) হাদীসটি হাসান বলে মন্তব্য করেছেন। আবার শুরায়ক সিমাক থেকে এ হাদীসটির অংশ বিশেষ মওকুফ পদ্ধতিতে বর্ণনা করেছেন। ইমাম আবূ দাউদ (র)-এর শব্দ হলো:
وهل ترون بعد ما بين السماء والأرض ؟ قالوا لا ندري قال ما بينهما اما واحدة أو اثنين أو ثلاثة وسبعون سنة.

সালিহ আল-ফাওযানের শরহুল আকিদাহ আল-ওয়াসিতিয়ার মতো পরবর্তী আকিদাগ্রন্থে এই দূরত্বসংক্রান্ত বর্ণনার ব্যবহার দেখায়, মহাজাগতিক ছবিটি শুধু পুরোনো সংকলনে আটকে থাকেনি। ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যে তা নতুন পাঠকের কাছেও পৌঁছেছে। মাপের ভাষা গল্পটিকে নির্দিষ্ট ও কর্তৃত্বপূর্ণ শোনায়: কত দূরে আকাশ, তার ওপরে আরেকটি আকাশ কত দূরে, সাগর কত গভীর এবং আরশ কোথায়। কিন্তু বছরের পথ বলার সময়ে গতির মান না থাকলে আধুনিক দূরত্ব নির্ণয় করা যায় না। একটি পথের সময়কে স্থির দৈর্ঘ্য হিসেবে ব্যবহার করতে হলে যাত্রার পদ্ধতি ও গতি দুটোই জানা প্রয়োজন। [290]
প্রশ্নঃ (৬৬) আল্লাহ তা’আলা উপরে আছেন- হাদীছ থেকে এ কথার দলীল দিন
উত্তরঃ আল্লাহ্ তাআলা উপরে আছেন-হাদীছ শরীফে এ ব্যাপারে অগণিত দলীল রয়েছে।
(১) আওআলের হাদীছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ
والعرش فوق ذلك والله فوق العرش وَهُوَ يَعْلَمُ مَا أَنتُمْ عَلَيْهِ)
“তার উপর আল্লাহর আরশ। আর আল্লাহ্ আরশের উপরে। তিনি তোমাদের অবস্থা সম্পর্কে অবগত আছেন”।’
আওআলের হাদীছের বিস্তারিত বিবরণ এই যে, আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিব (রাঃ) বলেনঃ আমরা একদা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে খোলা ময়দানে বসা ছিলাম। তখন আমাদের মাথার উপর দিয়ে একটি মেঘখন্ড অতিক্রম করার সময় তিনি বললেনঃ তোমরা কি জান এটি কী? আমরা বললামঃ এটি একটি মেঘের খন্ড। অতঃপর তিনি বললেনঃ তোমরা কি জান আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানের দূরত্ব কতটুকু? আমরা বললামঃ আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বললেনঃ উভয়ের মধ্যে রয়েছে পাঁচশত বছরের দূরত্ব। এমনি প্রত্যেক আকাশ ও তার পরবর্তী আকাশের মধ্যবর্তী দূরত্ব হচ্ছে পাঁচশত বছরের পথ। এভাবে সপ্তম আকাশের উপর রয়েছে একটি সাগর। সাগরের গভীরতা হচ্ছে আকাশ ও যমীনের মধ্যবর্তী দূরত্বের সমান। সাগরের উপরে রয়েছে আটটি জংলী পাঠা। তাদের হাঁটু থেকে পায়ের খুর পর্যন্ত দূরত্ব আকাশ ও যমীনের মধ্যবর্তী দূরত্বের সমান। তারা আল্লাহর আরশ পিঠে বহন করে আছে। আরশ এত বিশাল যে, তার উপরের অংশ থেকে নীচের
1- তিরমিজী, অধ্যায়ঃ কিতাবুত তাফসীর, মুসনাদে আহমাদ, (১/২০৬)। আলেমগণ হাদীছটি সহীহ ও যঈফ হওয়ার ব্যাপারে মতভেদ করেছেন। ইমাম ইবনে তাইমীয়া এবং তাঁর ছাত্র ইবনুল কাইয়্যেম হাদীছটি সহীহ বলেছেন। ইমাম তিরমিজী বলেনঃ হাদীছটি হাসান গরীব। ইমাম আলবানী হাদীছটিকে যঈফ বলেছেন। দেখুনঃ সিলসিলায়ে যঈফা, হাদীছ নং- ১২৪৭।

আব্বাসের নামে আবু দাউদে সংরক্ষিত সম্পূর্ণ বর্ণনায় মেঘ থেকে আকাশ, সাগর, আট বাহক এবং আরশের দিকে ধারাবাহিকভাবে ওঠা হয়েছে। [291]
عن العباس بن عبد المطلب قال: كنت في البطحاء في عصابة فيهم رسول الله صلى الله عليه وسلم فمرت بهم سحابة فنظر إليها فقال: ما تسمون هذه؟ قالوا: السحاب. قال: والمزن؟ قالوا: والمزن. قال: والعنان؟ قالوا: والعنان. قال أبو داود: لم أتقن العنان جيدا. قال: هل تدرون ما بعد ما بين السماء والأرض؟ قالوا: لا ندري. قال: إن بعد ما بينهما إما واحدة أو اثنتان أو ثلاث وسبعون سنة، ثم السماء فوقها كذلك، حتى عد سبع سموات، ثم فوق السابعة بحر بين أسفله وأعلاه مثل ما بين سماء إلى سماء، ثم فوق ذلك ثمانية أوعال بين أظلافهم وركبهم مثل ما بين سماء إلى سماء، ثم على ظهورهم العرش بين أسفله وأعلاه مثل ما بين سماء إلى سماء، ثم الله تبارك وتعالى فوق ذلك.
বাংলা অনুবাদ:
আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব বলেন: আমি বাতহায় এক দলের সঙ্গে ছিলাম; তাঁদের মধ্যে রাসুলও ছিলেন। তাঁদের ওপর দিয়ে একটি মেঘ গেল। তিনি তার দিকে তাকিয়ে বললেন: একে তোমরা কী বলো? তাঁরা বললেন: সাহাব। তিনি বললেন: মুযনও? তাঁরা বললেন: মুযনও। তিনি বললেন: আনানও? তাঁরা বললেন: আনানও। আবু দাউদ বলেন: আনান শব্দটি আমি ভালোভাবে সংরক্ষণ করিনি। তিনি বললেন: আসমান ও পৃথিবীর মধ্যে কত দূরত্ব জানো? তাঁরা বললেন: জানি না। তিনি বলেন: তাদের মধ্যে ব্যবধান একাত্তর, বাহাত্তর অথবা তিয়াত্তর বছর। তার ওপরের আসমানও একই রকম। এভাবে তিনি সাত আসমান গণনা করেন। তারপর সপ্তমটির ওপর একটি সাগর, যার নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত ব্যবধান এক আসমান থেকে অন্য আসমানের ব্যবধানের সমান। তার ওপরে আটটি পাহাড়ি ছাগলসদৃশ বাহক; তাদের খুর থেকে হাঁটুর ব্যবধানও দুই আসমানের মধ্যকার ব্যবধানের সমান। তাদের পিঠে আরশ, যার নিচ থেকে ওপরের ব্যবধানও দুই আসমানের ব্যবধানের সমান। তারপর তার ওপরে আল্লাহ।
এই মানচিত্রে পরিমাপের প্রতিটি ধাপ আগেরটির অনুরূপ। আকাশের ফাঁক, সাগরের গভীরতা, বাহকের শরীর ও সিংহাসনের উচ্চতা একই তুলনায় বাঁধা। মানুষের জানা বড় জিনিসের ওপর আরও বড় জিনিস স্তূপ করে মহিমা তৈরি করা হয়েছে। কোথায় মাপ নেওয়া হয়েছিল, কোন যন্ত্রে সাগরের গভীরতা বা বাহকের হাঁটু পর্যন্ত দূরত্ব জানা হয়েছিল, তার কোনো পর্যবেক্ষণসূত্র নেই। দাবির বিস্তারিত হওয়া এবং সত্য হওয়া এক বিষয় নয়। গল্পে মাপ যোগ করলেই সেই মাপ বাস্তব মহাকাশের তথ্য হয় না।
পাঁচশ বছরের বর্ণনায় আবার ওপরের আসমানের পাশাপাশি নিচের জমিনগুলোরও একই ধরনের ব্যবধান আছে। তিরমিজির সম্পূর্ণ বিবরণে শেষের আপাত সমস্যাজনক বাক্যের ব্যাখ্যাও সংকলক সংরক্ষণ করেছেন। [292]
عن الحسن عن أبي هريرة قال: بينما نبي الله صلى الله عليه وسلم جالس وأصحابه إذ أتى عليهم سحاب فقال نبي الله صلى الله عليه وسلم: هل تدرون ما هذا؟ فقالوا: الله ورسوله أعلم. قال: هذا العنان، هذه روايا الأرض يسوقه الله تبارك وتعالى إلى قوم لا يشكرونه ولا يدعونه. ثم قال: هل تدرون ما فوقكم؟ قالوا: الله ورسوله أعلم. قال: فإنها الرقيع سقف محفوظ وموج مكفوف. ثم قال: هل تدرون كم بينكم وبينها؟ قالوا: الله ورسوله أعلم. قال: بينكم وبينها مسيرة خمسمائة سنة. ثم قال: هل تدرون ما فوق ذلك؟ قالوا: الله ورسوله أعلم. قال: فإن فوق ذلك سماءين وما بينهما مسيرة خمسمائة عام، حتى عد سبع سموات ما بين كل سماءين كما بين السماء والأرض. ثم قال: هل تدرون ما فوق ذلك؟ قالوا: الله ورسوله أعلم. قال: فإن فوق ذلك العرش وبينه وبين السماء بعد ما بين السماءين. ثم قال: هل تدرون ما الذي تحتكم؟ قالوا: الله ورسوله أعلم. قال: فإنها الأرض. ثم قال: هل تدرون ما الذي تحت ذلك؟ قالوا: الله ورسوله أعلم. قال: فإن تحتها الأرض الأخرى بينهما مسيرة خمسمائة سنة، حتى عد سبع أرضين بين كل أرضين مسيرة خمسمائة سنة. ثم قال: والذي نفس محمد بيده لو أنكم دليتم رجلا بحبل إلى الأرض السفلى لهبط على الله. ثم قرأ: هو الأول والآخر والظاهر والباطن وهو بكل شيء عليم. قال أبو عيسى: هذا حديث غريب من هذا الوجه. قال: ويروى عن أيوب ويونس بن عبيد وعلي بن زيد قالوا لم يسمع الحسن من أبي هريرة. وفسر بعض أهل العلم هذا الحديث فقالوا: إنما هبط على علم الله وقدرته وسلطانه. علم الله وقدرته وسلطانه في كل مكان وهو على العرش كما وصف في كتابه.
বাংলা অনুবাদ:
হাসান আবু হুরাইরা থেকে বর্ণনা করেন: নবী তাঁর সঙ্গীদের সঙ্গে বসে ছিলেন। তখন তাঁদের ওপর একটি মেঘ এলো। তিনি বললেন: তোমরা জানো এটি কী? তাঁরা বললেন: আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ভালো জানেন। তিনি বলেন: এটি আনান; পৃথিবীতে পানি সরবরাহকারী মেঘ। আল্লাহ তা এমন লোকদের দিকে চালিয়ে নেন, যারা তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না এবং তাঁকে ডাকে না। তারপর বলেন: তোমাদের ওপরে কী আছে জানো? তাঁরা বললেন: আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ভালো জানেন। তিনি বলেন: সেটি আকাশ, সংরক্ষিত ছাদ ও নিবৃত্ত তরঙ্গ। তারপর বলেন: তোমাদের ও তার মধ্যে কত ব্যবধান জানো? তাঁরা বললেন: আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ভালো জানেন। তিনি বলেন: তোমাদের ও তার মধ্যে পাঁচশ বছরের পথ। তারপর বলেন: তার ওপরে কী আছে জানো? তাঁরা বললেন: আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ভালো জানেন। তিনি বলেন: তার ওপরে দুই আসমান রয়েছে; তাদের মধ্যে পাঁচশ বছরের পথ। এভাবে তিনি সাত আসমান গণনা করেন; প্রতি দুই আসমানের ব্যবধান আসমান ও পৃথিবীর ব্যবধানের মতো। তারপর বলেন: তার ওপরে কী আছে জানো? তাঁরা বললেন: আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ভালো জানেন। তিনি বলেন: তার ওপরে আরশ; তার ও আসমানের ব্যবধান দুই আসমানের ব্যবধানের মতো। তারপর বলেন: তোমাদের নিচে কী আছে জানো? তাঁরা বললেন: আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ভালো জানেন। তিনি বলেন: পৃথিবী। তারপর বলেন: তার নিচে কী আছে জানো? তাঁরা বললেন: আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ভালো জানেন। তিনি বলেন: তার নিচে আরেক পৃথিবী, তাদের মধ্যে পাঁচশ বছরের পথ। এভাবে তিনি সাত জমিন গণনা করেন; প্রতি দুই জমিনের মধ্যে পাঁচশ বছরের পথ। তারপর বলেন: যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ, তাঁর শপথ! তোমরা কোনো মানুষকে দড়ি দিয়ে সর্বনিম্ন জমিন পর্যন্ত নামালে সে আল্লাহর ওপর গিয়ে নামবে। তারপর পাঠ করেন: তিনিই প্রথম, শেষ, প্রকাশ্য ও গোপন; তিনি সবকিছু জানেন। আবু ইসা বলেন: এই সূত্রে হাদিসটি গরিব। আইয়ুব, ইউনুস ইবনে উবাইদ ও আলি ইবনে যায়দের কাছ থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, হাসান আবু হুরাইরার কাছ থেকে শোনেননি। কিছু আলেম এর ব্যাখ্যায় বলেছেন: সে আল্লাহর জ্ঞান, ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের মধ্যে নামবে। আল্লাহর জ্ঞান, ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব সর্বত্র, আর তিনি তাঁর কিতাবে যেমন বলেছেন তেমন আরশের ওপর আছেন।
দড়ি দিয়ে নিচে নামানো, ওপরের ছাদ, স্তরগুলোর ফাঁক এবং দিগন্তের ওপরে সিংহাসন—সব মিলিয়ে এটি মানুষের স্থলজ যাত্রা ও স্থাপত্যের ভাষায় গড়া মহাজগৎ। সংকলকের উদ্ধৃত শেষ ব্যাখ্যাটি দৈব অবস্থানসংক্রান্ত বাক্যের অর্থ রক্ষা করে; পাঁচশ বছরের ব্যবধান বা বহুস্তর আকাশের বাস্তবতা প্রতিষ্ঠার কোনো পরিমাপ দেয় না। বিশ্বাসের ভেতরে বাক্যের অর্থ সামলানো এবং বাইরের প্রকৃতিকে মেপে বর্ণনার সত্যতা যাচাই করার পদ্ধতি পৃথক। মহাকাশযান, জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক দূরত্ব ও পৃথিবীর অভ্যন্তরের পর্যবেক্ষণে এই পৌরাণিক স্তূপের সাক্ষ্য পাওয়া যায় না।
চাঁদের জ্যোতি রয়েছে
বাইবেলে সূর্য ও চাঁদকে দুটি বড় আলোকবস্তু এবং কোরআনে চাঁদকে নূর বা আলোকময় বলা হয়েছে। দৃশ্যমান চাঁদের আলোকে ধর্মীয় নিদর্শন ও সময়গণনার উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বাস্তবে পৃথিবীতে দেখা চাঁদের জ্যোৎস্না সূর্যালোকের প্রতিফলন। “আলোকময়” শব্দ একটি দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য বলে; আলোর উৎপত্তির প্রক্রিয়া তার মধ্যে নির্ধারিত নেই। সমস্যাটি আরও স্পষ্ট হয় সেই তাফসিরে, যেখানে চাঁদ আগে সূর্যের মতো উজ্জ্বল ছিল এবং পরে তার আলো মুছে যাওয়ার ফলে কালো দাগ হয়েছে বলা হয়েছে। সেখানে দৃশ্যমান চাঁদের ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের কারণ হিসেবে একটি দৈব অতীতকাহিনি বসানো হয়েছে। [293] [294]
16 তখন ঈশ্বর দুটি মহাজ্যোতি বানালেন। ঈশ্বর বড়টি বানালেন দিনের বেলা রাজত্ব করার জন্য আর ছোটটি বানালেন রাত্রিবেলা রাজত্ব করার জন্য। ঈশ্বর তারকারাজিও সৃষ্টি করলেন।
ইউনুস ১০:৫-এ সূর্যের জন্য দিয়া এবং চাঁদের জন্য নূর, ফুরকান ২৫:৬১-এ প্রদীপ ও আলোকময় চাঁদ এবং নূহ ৭১:১৬-এ চাঁদের আলো ও সূর্যের প্রদীপের ভাষা আছে। এই শব্দগুলো দিয়ে আলোর দৃশ্যমান তেজ ও ভূমিকা বর্ণিত; কোন প্রক্রিয়ায় চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে আলো আসে তার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। কিয়ামাহ ৭৫:৮-এ চাঁদের আলো হারানোর ঘটনাকে পরিণতির অংশ করা হয়েছে। ফলে ভাষার এই ব্যবহারকে আলোর আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের গোপন পরিভাষা বানানোও ভুল। ধর্মীয় কবিত্ব থেকে প্রতিফলন কিংবা নিজস্ব আলো উৎপাদনের বিস্তারিত তত্ত্ব নিজে থেকে বের হয় না। [295] [296] [297] [298] [299] [300] [301] [302]
তিনি সূর্যকে করেছেন তেজোদীপ্ত, আর চন্দ্রকে করেছেন আলোকময় আর তার (হ্রাস বৃদ্ধির) মানযিলসমূহ সঠিকভাবে নির্ধারণ করেছেন যাতে তোমরা বৎসর গুণে (সময়ের) হিসাব রাখতে পার। আল্লাহ এটা অনর্থক সৃষ্টি করেননি, তিনি নিদর্শনগুলোকে বিশদভাবে বর্ণনা করেন জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য।
— Taisirul Quran
আল্লাহ এমন, যিনি সূর্যকে দীপ্তিমান এবং চাঁদকে আলোকময় বানিয়েছেন এবং ওর (গতির) জন্য মানযিলসমূহ নির্ধারিত করেছেন যাতে তোমরা বছরসমূহের সংখ্যা ও হিসাব জানতে পার; আল্লাহ এসব বস্তু অযথা সৃষ্টি করেননি, তিনি এই প্রমাণসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন ঐসব লোকের জন্য যারা জ্ঞানবান।
— Sheikh Mujibur Rahman
তিনিই সূর্যকে করেছেন দীপ্তিময় এবং চাঁদকে আলোময় আর তার জন্য নির্ধারণ করেছেন বিভিন্ন মনযিল, যাতে তোমরা জানতে পার বছরের গণনা এবং (সময়ের) হিসাব। আল্লাহ এগুলো অবশ্যই যথার্থভাবে সৃষ্টি করেছেন। জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য তিনি আয়াতসমূহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন।
— Rawai Al-bayan
তিনি সূর্যকে দীপ্তিময় ও চাঁদকে আলোকময় করেছেন এবং তার জন্য মনযিল নির্দিষ্ট করেছেন যাতে তোমরা বছর গণনা ও সময়ের হিসাব জানতে পার। আল্লাহ্ এগুলোকে যথাযথ ভাবেই সৃষ্টি করেছেন [১]। তিনি এসব নিদর্শন বিশদভাবে বর্ণনা করেন এমন সম্প্রদায়ের জন্য যারা জানে।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
কতই না কল্যাণময় তিনি যিনি আসমানে নক্ষত্ররাজির সমাবেশ ঘটিয়েছেন আর তাতে স্থাপন করেছেন প্রদীপ আর আলো বিকিরণকারী চন্দ্র।
— Taisirul Quran
কত মহান তিনি, যিনি নভোমন্ডলে সৃষ্টি করেছেন তারকারাজি এবং তাতে স্থাপন করেছেন প্রদীপ ও জ্যোতির্ময় চাঁদ!
— Sheikh Mujibur Rahman
বরকতময় সে সত্তা যিনি আসমানে সৃষ্টি করেছেন বিশালকায় গ্রহসমূহ। আর তাতে প্রদীপ ও আলো বিকিরণকারী চাঁদ সৃষ্টি করেছেন।
— Rawai Al-bayan
কত বরকতময় তিনি যিনি নভোমণ্ডলে সৃষ্টি করেছেন বিশাল তারকাপুঞ্জ এবং তাতে স্থাপন করেছেন প্ৰদীপ [১] ও আলো বিকিরণকারী চাঁদ।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
আর তাদের মাঝে চাঁদকে বানিয়েছেন আলো এবং সূর্যকে করেছেন প্রদীপ।
— Taisirul Quran
এবং সেখানে চাঁদকে স্থাপন করেছেন আলোক রূপে ও সূর্যকে স্থাপন করেছেন প্রদীপ রূপে;
— Sheikh Mujibur Rahman
আর এগুলোর মধ্যে চাঁদকে সৃষ্টি করেছেন আলো আর সূর্যকে সৃষ্টি করেছেন প্রদীপরূপে’।
— Rawai Al-bayan
আর সেখানে চাঁদকে স্থাপন করেছেন আলোকরূপে ও সূর্যকে স্থাপন করেছেন প্রদীপরূপে;
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
চাঁদ হয়ে যাবে আলোকহীন
— Taisirul Quran
এবং চন্দ্র হয়ে পড়বে জ্যোতিহীন।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর চাঁদ কিরণহীন হবে,
— Rawai Al-bayan
এবং চাঁদ হয়ে পড়বে কিরণহীন [১],
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
জালালাইনের বাংলা সংস্করণের এই পৃষ্ঠায় চাঁদের আলোকহীন হওয়া বলা হয়েছে। মারেফুল কোরআনের পৃষ্ঠায় তার আলো লোপ পাওয়াকে কিয়ামতের আলামত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এসব বাক্য ধ্বংসের ভবিষ্যৎ বর্ণনা; চাঁদের পৃষ্ঠে আলো তৈরির প্রক্রিয়ার পরীক্ষা নয়। পুরোনো তাফসিরে চাঁদের বর্তমান কালো অংশের জন্য যে আলো মোছার কাহিনি আছে, তার প্রকৃতি আরও নির্দিষ্ট: বাস্তব পৃষ্ঠের রংকে একটি দৈব কর্মের দৃশ্যমান চিহ্ন বলা হয়েছে। [303] [304] [305]


বুখারির এই অংশে অধ্যায়শিরোনামের সঙ্গে বিভিন্ন ব্যাখ্যাকারীর শব্দার্থ এবং শেষে আবু হুরাইরার হাদিস রয়েছে। সূর্য-চাঁদের কক্ষপথ, জ্যোতি এবং কিয়ামতে তাদের গুটিয়ে দেওয়ার বক্তব্য পাশাপাশি এসেছে। কার ব্যাখ্যা কোথায় শেষ এবং নবীর নামে বর্ণনা কোথা থেকে শুরু, তা এই বিন্যাসেই আলাদা। একাধিক আলোকবস্তুর দৃশ্যমান জ্যোতি নিয়ে আলোচনা থেকে চাঁদের অভ্যন্তরে সূর্যের মতো শক্তি উৎপাদনের সিদ্ধান্ত আসে না। ধর্মীয় গ্রন্থে দৃশ্যমান আলো ও ভবিষ্যৎ বিলোপের কথা রয়েছে; তার বাইরে চাঁদের গঠন ও আলোকপ্রক্রিয়া নির্ধারণের জন্য বাস্তব পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। [306] [307]
সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৪৯/ সৃষ্টির সূচনা
পরিচ্ছদঃ ১৯৮৬. চন্দ্র ও সূর্য উভয়ে নির্ধারিত কক্ষপথে আবর্তন করে। এর জন্য মুজাহিদ (রহঃ) বলেন, উভয়ের আবর্তন চাকার আবর্তনের অনুরূপ। আর অন্যেরা বলেন, উভয় এমন এক নির্দিষ্ট হিসাব ও স্থানের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত যা তারা অর্থাৎ চন্দ্র ও সূর্য লঙ্ঘন করতে পারে না। حُسْبَانٌ হল حِسَابٍ শব্দের বহুবচন, যেমন شِهَابٍ এর বহুবচন شُهْبَانٍ – ضُحَاهَا এর অর্থ জ্যোতি। أَنْ تُدْرِكَ الْقَمَرَ চন্দ্র সূর্যের একটির জ্যোতি অপরটিকে ঢাকতে পারে না, আর তাদের পক্ষে এটা সম্ভব নয়। سَابِقُ النَّهَارِ রাত দিনকে দ্রুত অতিক্রম করে। উভয়ে দ্রুত অতিক্রম করতে চায়। نَسْلَخُ আমি উভয়ের একটিকে অপরটি হতে বের করে আনি আর তাদের প্রতিটি চালিত করা হয় وَاهِيَةٌ এবং وَهْيُهَا এর অর্থ তার বিদীর্ণ হওয়া। أَرْجَائِهَا তার সেই অংশ যা বিদীর্ণ হয়নি আর তারা তার উভয় পার্শ্বে থাকবে। যেমন তোমার উক্তি عَلَى أَرْجَاءِ الْبِئْرِ কূপের তীরে أَغْطَشَ وَجَنَّ অন্ধকার ছেয়ে গেল। হাসান বসরী বলেন كُوِّرَتْ অর্থ লেপটিয়ে দেয়া হবে, যাতে তার জ্যোতি নিঃশেষ হয়ে যাবে। আর বলা হয়ে থাকে وَاللَّيْلِ وَمَا وَسَقَ এর অর্থ আর শপথ রজনীর এবং তার যে জীবজন্তু একত্রিত করল। اتَّسَقَ বরাবর হল। بُرُوجًا চন্দ্র সূর্যের কক্ষ ও নির্ধারিত স্থান। الْحَرُورُ গরম বাতাস যা দিনের বেলায় সূর্যের সাথে প্রবাহিত হয়। ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেন, حَرُورُ রাত্রিবেলার আর سَمُومُ দিনের বেলার লু হাওয়া। বলা হয় يُولِجُ অর্থ প্রবিষ্ট করে বা করবে وَلِيجَةً অর্থ এমন প্রতিটি বস্তু যা তুমি অন্যটির মধ্যে ঢুকিয়েছ।
২৯৭৩। মুসাদ্দাদ (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কিয়ামতের দিন চন্দ্র ও সূর্য় উভয়কে লেপটিয়ে দেয়া হবে।
তাবারির সংকলনে ইবনে আব্বাসের নামে চাঁদ আগে সূর্যের মতো আলোকিত ছিল এবং তার কালো অংশ আলো মোছার ফল—এমন বক্তব্য আছে। [308]
حدثنا القاسم، قال: ثنا الحسين، قال: ثني حجاج، عن ابن جريج، قال: قال ابن عباس: كان القمر يضيء كما تضيء الشمس، والقمر آية الليل، والشمس آية النهار، فمحونا آية الليل: السواد الذي في القمر.
বাংলা অনুবাদ:
কাসিম বর্ণনা করেন, হুসাইন তাঁকে বলেছেন, হাজ্জাজ ইবনে জুরাইজ থেকে বলেছেন: ইবনে আব্বাস বলেন, চাঁদ সূর্যের মতো আলো দিত। চাঁদ রাতের নিদর্শন এবং সূর্য দিনের নিদর্শন। “আমরা রাতের নিদর্শন মুছে দিয়েছি”—এর অর্থ চাঁদের মধ্যে থাকা কালো অংশ।
চাঁদের কালো অঞ্চলকে আলো মুছে যাওয়ার চিহ্ন বানালে তার দৃশ্যমান পৃষ্ঠ একটি ধর্মীয় ঘটনার স্মৃতিস্তম্ভ হয়। বাস্তবে চাঁদের বড় অন্ধকার অঞ্চলগুলোর অনেকগুলো প্রাচীন আগ্নেয় লাভা জমে তৈরি ব্যাসল্টের সমভূমি। উজ্জ্বল উচ্চভূমির তুলনায় সেগুলো কম আলো প্রতিফলিত করে। অন্ধকার দেখানোর জন্য আগে সূর্যের মতো উজ্জ্বল থাকা এবং পরে দৈবভাবে আলো মুছে যাওয়ার ঘটনা প্রয়োজন হয় না। শিলার প্রকৃতি, পৃষ্ঠের গঠন ও প্রতিফলনক্ষমতা দিয়েই পার্থক্য ব্যাখ্যা করা যায়। ধর্মীয় কাহিনি সেই ভৌত বৈশিষ্ট্যের ওপর অতিপ্রাকৃত কারণ বসিয়েছে। [309]
চাঁদের কলা বা পর্যায়ক্রমিক আকারবদলও তার আলোকিত অংশ দেখার জ্যামিতির ফল। সূর্য চাঁদের প্রায় অর্ধেক অংশ আলোকিত করে; পৃথিবী থেকে সেই অংশের কতটুকু দেখা যাচ্ছে তা কক্ষপথের অবস্থানের সঙ্গে বদলায়। চাঁদের আলো নিজে প্রতিবার জন্মায় ও নিভে যায় না। কোনো কবিত্বপূর্ণ শব্দকে প্রতিফলনের অগ্রিম আবিষ্কার বলা হলে তার পক্ষে এই সম্পর্কের স্পষ্ট বর্ণনা প্রয়োজন। ধর্মীয় পাঠে শব্দের তেজের পার্থক্য আছে, কিন্তু এই জ্যামিতিক প্রক্রিয়ার বিবরণ নেই। পরবর্তী আবিষ্কারের পরে পুরোনো শব্দের মধ্যে সেই আবিষ্কার ঢুকিয়ে দেওয়া জ্ঞানের উৎসকে উল্টে দেখানো। [310]
এই উদাহরণে প্রাচীন উপমা, পরবর্তী তাফসির এবং প্রকৃতির ব্যাখ্যার পার্থক্য সরাসরি দেখা যায়। সূর্য ও চাঁদ আকাশের দুটি আলো—দৃষ্টিগত এই অভিজ্ঞতা সহজেই ধর্মীয় প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এরপর চাঁদের কালো দাগের জন্য দৈব আলো মোছার কাহিনি যোগ হয়েছে। আধুনিক পর্যবেক্ষণ সেই দাগকে শিলার ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করে। ফলে ধর্মীয় ভাষার পবিত্রতা তার ব্যাখ্যার যথার্থতার নিশ্চয়তা নয়। প্রকৃত চাঁদ ধর্মীয় কাহিনির দাবির অধীন চলে না; তার পৃষ্ঠ ও আলো সম্পর্কে ভুল ধারণা গবেষণাতেই সংশোধিত হয়।
উপসংহার
ইসলামের আচার, কাহিনি ও মহাজাগতিক ধারণার সঙ্গে তার আগের সমাজের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন নয়। কাবার তীর্থ, প্রদক্ষিণ, ইহরাম, উপবাস, পশু উৎসর্গ, দান, খতনা এবং বিবাহের আর্থিক ব্যবস্থার বহু উপাদান আগেই প্রচলিত ছিল। মুহাম্মদের নেতৃত্বে সেগুলোর কিছু গ্রহণ, কিছু পরিবর্তন এবং কিছু বর্জন করা হয়েছে। পরিচিত স্থান ও কাজ বহাল রেখে উপাস্যের নাম, অনুমোদনের উৎস এবং সঠিক আচারের মানদণ্ড বদলে দেওয়া হয়েছে। একটি নতুন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের গঠন এখানে মানুষের জানা সামাজিক উপকরণ ও প্রতিষ্ঠানের ওপর দাঁড়িয়েছে।
কাহিনির ক্ষেত্রেও একই মানবীয় ধারাবাহিকতা আছে। বিশাল আদিপুরুষ, পানির প্রাথমিক জগৎ, দিনভিত্তিক সৃষ্টি, স্তরে স্তরে আকাশ, ওপরের সিংহাসন এবং দৈব নির্দেশে চলা আকাশের আলোগুলো আগের ধর্মীয় সাহিত্যেও পাওয়া যায়। ইসলামে সেগুলো আল্লাহ ও নবীর কর্তৃত্বের অধীনে নতুন বিন্যাস পেয়েছে। সংখ্যার বা চরিত্রের কিছু পরিবর্তন সত্ত্বেও কাহিনি নির্মাণের পরিচিত পদ্ধতি কাজ করছে। রাজা, প্রাসাদ, ছাদ, বাহক, পথ ও আনুগত্যের সামাজিক অভিজ্ঞতা মহাজগতের অদৃশ্য অংশে সম্প্রসারিত হয়েছে। মানুষের পৃথিবীর পরিচিত কাঠামো দিয়েই অতিমানবিক জগৎ কল্পনা করা হয়েছে।
এ ধারাবাহিকতাকে ইব্রাহিমের ধর্মের পুনরুদ্ধার বলা একটি ধর্মীয় ব্যাখ্যা। কোন প্রথা কখন তাঁর কাছ থেকে এসেছে, কোন ধাপে প্রচারিত হয়েছে এবং বর্তমান রূপের সঙ্গে সেই প্রাচীন রূপের সম্পর্ক কী, তার স্বাধীন সাক্ষ্য সেই ঘোষণার সঙ্গে আপনাআপনি পাওয়া যায় না। একইভাবে আগে থেকেই প্রচলিত একটি কাজ পরে আল্লাহর নামে অনুমোদিত হলে তার সামাজিক পূর্বইতিহাস বদলায় না। ধার করা কিংবা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সাংস্কৃতিক উপাদান নতুন সম্প্রদায়ের পরিচয়ে ঢুকতে পারে; ধর্মীয় কর্তৃত্ব সেটিকে পবিত্র অতীতের ভাষায় উপস্থাপন করে। এই প্রক্রিয়ার ইতিহাস পাওয়া যায় মানুষের কাজ, বর্ণনা ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে।
প্রকৃতি সম্পর্কে দাবিগুলোর বিচার আরও কঠোর। অতিকায় আদম থেকে অবিরাম ছোট হওয়া মানুষ, পাহাড় দিয়ে পানির ওপর পৃথিবী চেপে স্থির রাখা, সূর্যাস্তের পরে সিংহাসনের কাছে যাত্রা কিংবা চাঁদের কালো দাগকে দৈব আলো মোছার চিহ্ন বলা—এসব বাস্তব জগৎ সম্পর্কে বক্তব্য। মানুষের আবেগ বা ধর্মীয় মর্যাদা সেই বক্তব্যের পক্ষে শারীরবৃত্তীয়, ভূতাত্ত্বিক বা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সাক্ষ্য তৈরি করে না। ভুল বর্ণনাকে অলৌকিক বললে তার পরীক্ষাযোগ্য অংশ সত্য হয়ে যায় না; তার জন্য শুধু একটি অদৃশ্য কারণ যোগ করা হয়। বিশ্বাসের দৃঢ়তা প্রকৃতির গঠন বদলায় না।
ধর্মীয় বর্ণনার ইতিহাসে সংকলক ও ব্যাখ্যাকারীদের ভূমিকাও প্রত্যক্ষ। কেউ পূর্ববর্তী সমাজের প্রথাকে নতুন বিধানে প্রতিষ্ঠা করেছেন, কেউ পুরোনো কাহিনিকে নবীর নামে প্রচারিত হিসেবে সংরক্ষণ করেছেন, কেউ আবার তার উৎস নিয়ে আপত্তি করেছেন। একই আয়াতের পাশে পরবর্তী যুগের মহাজাগতিক মত ও পাণ্ডুলিপির ছবি বসেছে। এই গ্রহণ-বর্জন, সম্প্রসারণ ও পুনর্ব্যাখ্যার কাজ মানুষের জ্ঞান, স্বার্থ, স্মৃতি ও ক্ষমতার ইতিহাসের অন্তর্গত। ধর্মীয় গ্রন্থের পবিত্রতার ঘোষণা সেই প্রক্রিয়াকে মানবীয় ইতিহাসের বাইরে সরিয়ে নেয় না।
মানুষের জ্ঞান যত বিস্তৃত হয়েছে, পুরোনো মহাজাগতিক ছবির সীমাবদ্ধতা তত নির্দিষ্ট হয়েছে। পৃথিবীর আকার, তার গতি, নক্ষত্রের বয়স, পর্বতের গঠন এবং চাঁদের পৃষ্ঠ পরীক্ষা করে জানা যায়। সেই জ্ঞানের সঙ্গে সংঘাত হলে প্রাচীন বর্ণনাটিকে সংশোধন বা পরিত্যাগ করাই যুক্তিসঙ্গত। আগে একটি বাক্যকে আক্ষরিক সত্য বলা, পরে তথ্যের চাপে তার অর্থ বদলে সেটিকেই চিরন্তন জ্ঞান ঘোষণা করা কোনো আবিষ্কার নয়। তাতে সংশোধনের কৃতিত্ব গবেষণা থেকে সরিয়ে ধর্মীয় কর্তৃত্বকে দেওয়া হয়।
ইসলামের উদ্ভব মানুষের পরিচিত ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জগতের মধ্যেই ঘটেছে। তার আচার ও বয়ানে আগের উপাদানের পুনর্বিন্যাস এবং পরে সেগুলোর ওপর পবিত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার নজির রয়েছে। পূর্ববর্তী উপকথা নতুন নামে সত্য হয় না, আর প্রতিষ্ঠিত প্রথা নতুন অনুমোদনে ইতিহাসহীন হয়ে যায় না। ধর্মীয় মর্যাদার বাইরে প্রমাণ ও যুক্তির মানদণ্ড প্রয়োগ করলেই এই ঐতিহ্যের মানবীয় গঠন, তার ধারাবাহিকতা এবং তার ভুলগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তথ্যসূত্রঃ
- বাংলা অভিধান: পৌত্তলিক ↩︎
- প্যাগান শব্দের ব্যুৎপত্তি ↩︎
- কোরআন, আয-যুমার ৩৯:৩ ↩︎
- সুনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ৩৫৬৩; আন্তর্জাতিক নম্বর ৩৬০২ ↩︎
- সুনান আবু দাউদ ৩৬০২ ↩︎
- সুনান ইবনে মাজাহ ২৩৬৭ ↩︎
- বেদুইনের সাক্ষ্যসংক্রান্ত হাদিসের ব্যাখ্যা ও ফকিহদের মতভেদ ↩︎
- সীরাতে রাসুলাল্লাহ, ইবনে ইসহাক, অনুবাদ: শহীদ আখন্দ, পৃষ্ঠা ৮৩–৮৬ ↩︎
- সীরাতে রাসুলাল্লাহ 1 2
- কোরআন ২৯:৬৭ এবং তাফসিরে তাবারি ↩︎
- ইবনে আসির, আল-কামিল ফিত-তারিখ: জমজম খননের বিবরণ ↩︎
- ধর্ম অবমাননা, সাম্প্রদায়িকতা এবং মূর্তি ভাঙ্গার সুন্নত 1 2
- সহিহ বুখারি ৪২৮৭: মক্কা জয়ে উপাস্য ধ্বংস ↩︎
- ইবনে হিশাম, সীরাত: গোত্রের শত্রুতা প্রকাশের বিবরণ ↩︎
- কোরআন ৯:২৮ এবং তাফসিরে ইবনে কাসির ↩︎
- আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: তুলাইহার বিরুদ্ধে অভিযান ↩︎
- যিরিকলি, আল-আলাম, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৭৮ ↩︎
- আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: মালিক ইবনে নুয়াইরা ↩︎
- ইবনে আবদুল বার, আল-ইস্তিআব: ফিরোজ দাইলামি ↩︎
- ইবনে হিশাম: মুসায়লিমার পত্র ও জবাব ↩︎
- সহিহ বুখারি ৪০৭২: ওয়াহশির বিবরণ ↩︎
- ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: তুলাইহার পরবর্তী জীবন ↩︎
- ইবনে হিশাম, সীরাত, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৬০১ ↩︎
- সহিহ মুসলিম ২০৩: পিতার পরকাল সম্পর্কে ঘোষণা ↩︎
- সাইদ বিন জায়েদ ↩︎
- ইবনে হিশাম, সীরাত: চার ব্যক্তির ধর্মীয় অনুসন্ধান ↩︎
- সহিহ মুসলিম ২৪৭৩ক: আবু জরের ধর্মীয় অনুসন্ধান ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩১১৪ ↩︎
- সহিহ বুখারি ৩৩৫১: কাবায় ইব্রাহিম ও মরিয়মের ছবি ↩︎
- মথি ৭:১৬–২০ ↩︎
- Matthew 7:16-20 ↩︎
- মথি ৭ঃ ১৬-১৮ ↩︎
- ইবনে হিশাম, সীরাত: কাবা পুনর্নির্মাণ ও লিপির বিবরণ ↩︎
- আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৪৯–৪৫২ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস নম্বরঃ ৫৪৯৯ ↩︎
- সহিহ বুখারি ৫৪৯৯: নবুওয়াতের আগে যায়দের সঙ্গে সাক্ষাৎ ↩︎
- সহিহ বুখারি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৫৯০; আন্তর্জাতিক নম্বর ৪৯৫৩–৪৯৫৪ ↩︎
- সহিহ বুখারি ৩: ওয়ারাকার পরিচয় ও প্রথম ব্যাখ্যা ↩︎
- সহিহ বুখারি ৬৯৮২: প্রথম অভিজ্ঞতা ও ওয়ারাকা ↩︎
- সহিহ বুখারি ৬৯৮২; তাওহীদ পাবলিকেশন্স, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ২৮৭ ↩︎
- খণ্ড ৬, ডাউনলোড লিঙ্ক দেখুন, ↩︎
- ইবনে হাজর, ফাতহুল বারি: ওহির বিরতি ও যুহরির সংযুক্ত বিবরণ ↩︎
- ইবনে আবি উসাইবিয়া, উয়ুনুল আনবা: সপ্তম অধ্যায়, হারিস ইবনে কালাদা ↩︎
- সহিহ বুখারি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩৩৫৯; আন্তর্জাতিক নম্বর ৩৬১৭ ↩︎
- সূরা ফুরকান ২৫:৫; আল-আনআম ৬:১০৫; আন-নাহল ১৬:১০৩ ↩︎
- সূরা ফুরকান, আয়াত ৫ ↩︎
- সূরা আনআম, আয়াত ১০৫ ↩︎
- সূরা নাহল, আয়াত ১০৩ ↩︎
- সীরাতে রাসুলাল্লাহ, ইবনে ইসহাক, অনুবাদ: শহীদ আখন্দ, পৃষ্ঠা ২১৪ ↩︎
- তাফসিরে জালালাইন, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫২৯–৫৩০ ↩︎
- তাফসিরে ইবনে কাসির, আন-নাহল ১৬:১০৩ ↩︎
- সহিহ বুখারি ৭৩৬২: হিব্রু তাওরাত আরবিতে ব্যাখ্যা ↩︎
- সহিহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৫৫০; হাদিস একাডেমি ৪৫৯৭ ↩︎
- সহিহ বুখারি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৬৫৪–৬৬৫৫ ↩︎
- সহিহ বুখারি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৬৫৮ ↩︎
- সুনান আত-তিরমিজি ৩৯০৫ ↩︎
- সহিহ মুসলিম, হাদিস একাডেমি ৫৮৩২; আন্তর্জাতিক নম্বর ২২৭৬ ↩︎
- সুনান আত-তিরমিজি ৩৯৩৬ ↩︎
- নববি, মিনহাজুত তালিবিন: কিতাবুল বুগাত, ইমামের শর্ত ↩︎
- আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৭৭ ↩︎
- তাবাকাত আল-কাবির, ইবনে সাদ, পৃষ্ঠা ১৪৩ ↩︎
- আয যুবায়ের ইবনে আব্দুল মুত্তালিব ↩︎
- তাবাকাত আল কাবীর, ইবনে সাদ ↩︎
- ইবনে হিশাম, সীরাত: হিলফুল ফুজুলের চুক্তি ↩︎
- ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: যুবাইরের উদ্যোগ ↩︎
- সীরাতুর রাসুল, নবীদের কাহিনি–৩, মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, পৃষ্ঠা ৮২ ↩︎
- ইবনে হিশাম, সীরাত: জিব্রাইলের আগমনের সূচনা ↩︎
- তাবারি, তারিখ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৮ ↩︎
- তাবারি, তারিখ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৮: লিখিত পাঠ ও চাপের বিবরণ ↩︎
- কোরআন ২৯:৬১; তাফসিরে ইবনে কাসির ↩︎
- ইসলাম প্রশ্নোত্তর ৩০৭১৪২: আল্লাহ শব্দের অর্থ ও ব্যুৎপত্তির মতভেদ ↩︎
- কোরআন ২৯:৬৫; তাফসিরে তাবারি ↩︎
- ইবনে কালবি, কিতাবুল আসনাম: লাতের বিবরণে আউস ইবনে হাজারের পঙ্ক্তি ↩︎
- আহমদ আল-জাল্লাদ, জার্নাল অব সেমিটিক স্টাডিজ ৭০/২, ২০২৫, পৃষ্ঠা ৬৯৩–৭৪৮; গবেষণার সারসংক্ষেপ ↩︎
- এনুমা এলিশ, কিংয়ের অনুবাদ, চতুর্থ ফলক ↩︎
- এনুমা এলিশ, চতুর্থ ফলক: বিশ্বশাসনের ঘোষণা ↩︎
- এনুমা এলিশ, সপ্তম ফলক: দেবতাদের মধ্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী মর্যাদা ↩︎
- এনুমা এলিশ, সপ্তম ফলক: রাখাল ও দেবতাদের পাল ↩︎
- সহিহ মুসলিম ১১৮৫: মুশরিকদের তালবিয়া ↩︎
- ইবনে কাসিরের সীরাত থেকে ইসলামওয়েবের উদ্ধৃতি; ফতোয়া ৪১৭৮৩২ ↩︎
- সীরাতুন নবী, ইবনে হিশাম, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০৮ ↩︎
- সহিহ বুখারি ৩০৩৯: উহুদে হুবাল ও আল্লাহর ঘোষণা ↩︎
- ইসলামওয়েব: কাবার রব ও আবদুল মুত্তালিবের বক্তব্য ↩︎
- কোরআন ৩৭:১৫৮: জিনের সঙ্গে বংশসম্পর্কের দাবি ↩︎
- আল্লাহর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং স্বভাব চরিত্র ↩︎
- ইবনে কালবি, কিতাবুল আসনাম, মুদ্রিত পৃষ্ঠা ২৮: হুবাল ↩︎
- সহিহ বুখারি ৪২৮৭: কাবার চারপাশের তিনশ ষাটটি প্রতিমা ↩︎
- মানাফ ↩︎
- কিতাবুল আসনাম: মানাফ ও ঋতুমতী নারীদের প্রতিমা থেকে দূরে থাকার বিবরণ ↩︎
- বোসরার নাবাতীয় দেবতা ও উপাসনাকেন্দ্র: ফরাসি প্রত্নতাত্ত্বিক বিবরণ ↩︎
- সহিহ বুখারি ৪৯২০: আরবের পাঁচ উপাস্য সম্পর্কে ইবনে আব্বাসের বক্তব্য ↩︎
- হাভিয়ের তেইক্সিদোর, দ্য নাবাতিয়ান প্রেজেন্স অ্যাট পালমিরা, ১৯৭৩, পৃষ্ঠা ৪০৫–৪০৬ ↩︎
- দক্ষিণ আরবীয় উৎসর্গলিপির পাঠ ও তালাব রিয়ামের আলোচনা, ২০১৪, মুদ্রিত পৃষ্ঠা ১৫০–১৫১ ↩︎
- যুক্তরাষ্ট্রের এনআইএসটি: অগ্নিশিখার বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা ↩︎
- সহিহ মুসলিম ৪৫০ক: জিন ও তাদের পশুর খাদ্যসংক্রান্ত সম্পূর্ণ বক্তব্য ↩︎
- কোরআন ৭২:৬: মানুষের জিনের আশ্রয় নেওয়ার বিবরণ ↩︎
- দানিয়েল ৮:১৬; কিং জেমস অনুবাদ ↩︎
- দানিয়েল ১০:১৩; কিং জেমস অনুবাদ ↩︎
- ইসলামওয়েব ৪০৬৯৩০: ফেরেশতার নাম ও পরিচয় ↩︎
- ইসলাম প্রশ্নোত্তর ২৫৯৫৮৬: রিদওয়ান নামের উৎস ↩︎
- তাফসিরে তাবারি, সূরা হজ ২২:৫২: গারানিকসংক্রান্ত বর্ণনাসমূহ ↩︎
- শয়তানের আয়াত বা স্যাটানিক ভার্সেস ↩︎
- তাফসিরে তাবারি, হজ ২২:৫২: মুহাম্মদ ইবনে কাব আল-কুরাজি ও মুহাম্মদ ইবনে কাইসের বর্ণনা ↩︎
- হেসিয়ড, থিওগনি: প্রমিথিউসের কাহিনি ↩︎
- স্নোরি স্তুর্লুসন, গিলফাগিনিং, অধ্যায় ৪৯–৫০: লোকি ↩︎
- সহিহ মুসলিম ২৯৯৫ক: হাই ও শয়তানের প্রবেশ ↩︎
- সহিহ বুখারি ১১৪৪: কানে শয়তানের প্রস্রাবের বর্ণনা ↩︎
- সহিহ মুসলিম ২০২০ক: ডান হাতে খাওয়া ও শয়তানের বাম হাত ↩︎
- কোরআন ২:১২৫: কাবা, মাকামে ইব্রাহিম ও উপাসনা ↩︎
- কোরআন সূরা বাকারা আয়াত ১২৫ ↩︎
- সূরা আল ইমরান, আয়াত ৯৬ ↩︎
- সূরা আল ইমরান, আয়াত ৯৭ ↩︎
- সহিহ বুখারি ৩৩৬৬ ↩︎
- সহিহ মুসলিম ৫২০ক ↩︎
- সুনান আন-নাসায়ি ৬৯৩: সুলাইমানের বায়তুল মাকদিস নির্মাণ ↩︎
- ইবনে জাওজি, কাশফুল মুশকিল ১/৩৬০; ইসলাম প্রশ্নোত্তর ২০৯৩৬৬-এ উদ্ধৃত ↩︎
- সুনান আন-নাসায়ি ৩৭৭৩; ইসলামিক ফাউন্ডেশন সংস্করণে ৩৭৭৪ ↩︎
- সুনান ইবনে মাজাহ ২১১৮: ইচ্ছাসংক্রান্ত বাক্য সংশোধনের বর্ণনা; দারুসসালাম মূল্যায়নে দুর্বল ↩︎
- তাফসিরে কুরতুবি, বাকারা ২:১৪২: প্রথম কিবলা, পরিবর্তন ও ইহুদিদের আকৃষ্ট করার ব্যাখ্যা ↩︎
- সুনান আন-নাসায়ি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৮৯ ↩︎
- সহিহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ১০৬১ ↩︎
- আল-লুলু ওয়াল মারজান ৩০৪ ↩︎
- সহিহ বুখারি ৪০৩: কুবার মুসল্লিদের দিক পরিবর্তন ↩︎
- সহিহ মুসলিম ৫২৬: বায়তুল মাকদিস থেকে কাবার দিকে ঘোরা ↩︎
- ইসলামি শরিয়া রাষ্ট্রে অমুসলিমদের অধিকার ↩︎
- মুখতাসার যাদুল মাআদ, ইবনে কাইয়্যিম, ওয়াহিদীয়া ইসলামিয়া লাইব্রেরি, পৃষ্ঠা ২৩৩ ↩︎
- তাফসিরে মা’আরেফুল কোরআন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১২ ↩︎
- তাফসিরে জালালাইন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪৪ ও ৩০১; উদ্ধৃত টীকায় জামালাইন ১/২১৫ ↩︎
- তাফসিরে কুরতুবি, বাকারা ২:১৪২, পঞ্চম আলোচনায় উদ্দেশ্যসংক্রান্ত পূর্ণ অনুচ্ছেদ ↩︎
- কোরআন ২:১৪৩: কিবলা ও আনুগত্যের পরীক্ষা ↩︎
- কোরআন ২:১৪৪; কুরতুবি: পছন্দের কিবলার দিকে ঘোরানো ↩︎
- আদিপুস্তক ৪৩:২৩: শান্তির অভিবাদন ↩︎
- বিচারকর্তৃগণ ৬:২৩: শান্তি ও নির্ভয়ের আশ্বাস ↩︎
- যোহন ২০:১৯: যিশুর শান্তির অভিবাদন ↩︎
- কোরআন ৪:৮৬: অভিবাদনের উত্তরের বিধান ↩︎
- সহিহ মুসলিম ২১৬৭ক: ইহুদি ও খ্রিস্টানকে আগে সালাম না দেওয়ার নির্দেশ ↩︎
- সহিহ বুখারি ১৬১৮: নারী ও পুরুষের তাওয়াফ ↩︎
- সহিহ বুখারি ১৫৪২: ইহরামের পোশাকবিধি ↩︎
- সহিহ বুখারি ১৭৭০: হজের মৌসুমে ইসলামপূর্ব বাজারে বাণিজ্য ↩︎
- সহিহ বুখারি ১৬৬৫: হুমস, তাওয়াফের পোশাক ও আরাফাত ↩︎
- সহিহ বুখারি ১৬৮৪: মুযদালিফা থেকে যাত্রার সময় পরিবর্তন ↩︎
- সহিহ বুখারি ১৬০৩: সাত চক্কর ও প্রথম তিন চক্করের রমল ↩︎
- সীরাতুল মুস্তফা, তৃতীয় খণ্ড, ইদরিস কান্ধলভি ↩︎
- সহিহ বুখারি ৩৬৯: মুশরিকের হজ ও উলঙ্গ তাওয়াফ নিষিদ্ধ করার ঘোষণা ↩︎
- সহিহ বুখারি ১৬৪৮: সাফা-মারওয়াকে জাহেলি নিদর্শন মনে করার বিবরণ ↩︎
- সহিহ বুখারি ৩৬৯: মিনায় প্রচারিত নির্দেশ ↩︎
- সহিহ বুখারি ১৬৪৩: মানাতের নামে ইহরাম ও সাফা-মারওয়া ↩︎
- নাসা: উল্কা, উল্কাপিণ্ড ও বাইরের গলিত আবরণ ↩︎
- মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম: পদ্মমস্তক উর্বরতার দেবী লজ্জা গৌরী, সংগ্রহ ২০০০.২৮৪.১৩ ↩︎
- লজ্জা গৌরী ↩︎
- তিরমিজি ৮৭৭: হাজরে আসওয়াদের জান্নাতি উৎসের দাবি ↩︎
- তিরমিজি ৮৭৮: রুকন ও মাকামের নূরের বর্ণনা ↩︎
- সুনান ইবনে মাজাহ ২৯৪৪: পাথরের চোখ, জিহ্বা ও সাক্ষ্য ↩︎
- তিরমিজি ৯৬১: স্পর্শকারীর পক্ষে সাক্ষ্য ↩︎
- তিরমিযী, ৯৬১; ইবনু মাজাহ, হাজ্জ ২৯৪৪; আহমাদ ২২১৬, ২৩৯৪, ২৬৩৮, ২৭৯৩, ৩৫০১ – অনুবাদক ↩︎
- সহিহ মুসলিম ১২৭০গ: উমরের পাথর চুম্বন ও ক্ষমতাহীনতার বক্তব্য ↩︎
- তিরমিজি ৯৫৯: রুকন স্পর্শ, সাতবার তাওয়াফ ও পাপমোচনের বর্ণনা ↩︎
- আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পৃষ্ঠা ৪৬১–৪৬২ ↩︎
- ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: জমজম পুনঃখনন ↩︎
- আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: পান ও ওজুর পৃথক জলাধার ↩︎
- নির্গমন ৪০:৩০–৩২: উপাসনার আগে হাত-পা ধোয়ার বিধান ↩︎
- সহিহ বুখারি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩৪৩৫; ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৬–২৯৭ ↩︎
- সহিহ বুখারি ৩৭০০: উমরের আহত হওয়া ও পরবর্তী কথোপকথন ↩︎
- সীরাতুল মুস্তফা, ইদরিস কান্ধলভি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৩ ↩︎
- তাফসির ইবনে কাসির, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫১ ↩︎
- সীরাতুন নবী, ইবনে হিশাম, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭৬ ↩︎
- উম্মে হানী- মুহাম্মদের গোপন প্রণয় ↩︎
- সীরাতে ইবনে হিশাম ২/৩৬: উম্মে হানির বাড়িতে ইসরার রাতের বর্ণনা; দুরার-এ মূলপাঠ ↩︎
- কোরআন ৮:৩৫; তাফসিরে ইবনে কাসির ↩︎
- দানিয়েল ৬:১০: জেরুজালেমমুখী দৈনিক তিনবার প্রার্থনা ↩︎
- মথি ২৬:৩৯: মুখ নিচু করে যিশুর প্রার্থনা ↩︎
- ইরশাদুস সারি লি-শারহি সহিহিল বুখারি ১০/১২০ ↩︎
- সহিহ বুখারি ২০০২: কুরাইশ ও মুহাম্মদের আশুরার উপবাস ↩︎
- সহিহ বুখারি ২০০৪: মূসা, ইহুদিদের উপবাস ও অধিকতর অধিকারের দাবি ↩︎
- কোরআন ২:১৮৩: পূর্ববর্তীদের ওপর উপবাসের বিধান ↩︎
- সহিহ বুখারি ১৫৯২: আশুরার রোজা ও একই দিনে কাবায় আবরণ দেওয়ার বিবরণ ↩︎
- সহিহ মুসলিম ১১৩৪ক: ইহুদি–খ্রিস্টানদের সম্মানিত দিন ও পরবর্তী বছর নবম দিনে রোজা রাখার অভিপ্রায় ↩︎
- নববি, আল-মাজমু শারহুল মুহাযযাব ৬/৪৩৩: তাসুআর রোজা ও ইহুদিদের থেকে ভিন্নতার ব্যাখ্যা ↩︎
- সহিহ বুখারি ৪৫০৭: ফিদিয়া দিয়ে রোজা না রাখার বিকল্প এবং পরবর্তী আয়াতে তার রহিতকরণ ↩︎
- সহিহ বুখারি ১৯১৫: ইফতারের আগে ঘুম, পরের দিন অজ্ঞান হওয়া ও বিধান পরিবর্তনের ঘটনা ↩︎
- তাফসিরে ইবনে কাসির, বাকারা ২:১৮৭: ঘুম বা ইশার পর খাদ্য, পানীয় ও যৌনসম্পর্ক নিষিদ্ধ থাকার পূর্ববর্তী বিধান ↩︎
- সুনান আবু দাউদ ১১৩৪: মদিনার দুটি উৎসবের প্রতিস্থাপন ↩︎
- মিরকাতুল মাফাতিহ, মিশকাত ১৪৩৯-এর ব্যাখ্যা: নওরোজ ও মেহেরজান ↩︎
- মিরকাতুল মাফাতিহ ৩/১০৬৯: উৎসবের দিনের পরিচয় ↩︎
- সহিহ বুখারি ৯৫২: প্রত্যেক সম্প্রদায়ের উৎসব এবং ‘আমাদের ঈদ’ ↩︎
- সহিহ বুখারি ১৯৯০: দুই ঈদের দিনে রোজা পালনে নিষেধাজ্ঞা ↩︎
- সহিহ বুখারি ৯৭১: ঈদে নারীদের উপস্থিতি ও সমবেত তাকবিরের নির্দেশ ↩︎
- মোল্লা আলি কারি, মিরকাতুল মাফাতিহ, দুই ঈদের সালাত অধ্যায়: নওরোজে সম্মান, কেনাকাটা ও উপহারসংক্রান্ত বিধান ↩︎
- ইবনে তাইমিয়া, ইকতিদাউস সিরাতিল মুস্তাকিম; ইসলামওয়েবের ২৩০৭১৩ নম্বর ফতোয়ায় উদ্ধৃত উৎসবসংক্রান্ত বক্তব্য ↩︎
- কোরআন ৬:১৩৬: শস্য ও গবাদিপশুর অংশ নির্ধারণ ↩︎
- লিসানুল আরব, রফদ; রিফাদার বিস্তৃত সংজ্ঞা ↩︎
- কোরআন ৯:১০৩: সম্পদ থেকে সাদাকা গ্রহণ ও পবিত্রতা ↩︎
- দ্বিতীয় বিবরণ ১৪:২২–২৯: দশমাংশ ও সহায়তার সম্পূর্ণ নির্দেশ ↩︎
- নির্গমন ২৫:২: ইচ্ছাপ্রণোদিত উৎসর্গ ↩︎
- মথি ৬:১–৪: দান, গোপনীয়তা ও পুরস্কারের সম্পূর্ণ অনুচ্ছেদ ↩︎
- টোবিত ১২:৯: দান ও পাপমোচনের বক্তব্য ↩︎
- সহিহ বুখারি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬; আন্তর্জাতিক ৭ ↩︎
- সহিহ বুখারি ৭: আরবদের খতনার উল্লেখ ↩︎
- আদিপুস্তক ১৭:১০–১২: খতনা ও অঙ্গীকারের চিহ্ন ↩︎
- আর-রাহিকুল মাখতুম, সফিউর রহমান মোবারকপুরী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, পৃষ্ঠা ৭৬ ↩︎
- সুনান আবু দাউদ ২৮৩৭: রক্ত মাখানো ও নামকরণের পাঠ নিয়ে সংকলকের মন্তব্য ↩︎
- সুনান আবু দাউদ ২৮৪৩: রক্ত থেকে জাফরানে পরিবর্তন ↩︎
- সুনান আবু দাউদ ২৮৪২: ছেলে-মেয়ের জন্য পশুর সংখ্যার পার্থক্য ↩︎
- সহিহ বুখারি ৫৮৮৯: ফিতরাতের পাঁচ কাজ ↩︎
- সিরাতুন নবী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৭৮ ↩︎
- ইসলাম প্রশ্নোত্তর ৫৯৮৩৮০: জাহেলি যুগে মোহর ও খাদিজার দেনমোহর ↩︎
- সহিহ বুখারি ৫১২৭: ইসলামপূর্ব বিবাহে মোহর ↩︎
- দেনমোহর | ইসলামে নারীর লজ্জাস্থান ভোগের মূল্য ↩︎
- সীরাতে ইবনে হিশাম ১/১৯০: খাদিজার দেনমোহরসংক্রান্ত উদ্ধৃতি ↩︎
- সহিহ বুখারি ২৭২১: মোহর ও বিবাহের শর্তের অধ্যায় ↩︎
- ব্যাবিলনীয় তালমুদ, ইয়েভামোত ৪৪ক; সনসিনো অনুবাদ ও পাদটীকা ↩︎
- ইয়েভামোত ৪৪ক: মূল হিব্রু-আরামীয় পাঠ ↩︎
- ব্যাবিলনীয় তালমুদ, ইয়েভামোত ৬৫ক ↩︎
- ইয়েভামোত ৬৫ক: রাবি আম্মি ও রাবার বক্তব্য ↩︎
- সুনান আবু দাউদ ২২৪১: আট স্ত্রী থেকে চারজন নির্বাচন ↩︎
- তাফসিরে ইবনে কাসির, নিসা ৪:৩: চার স্ত্রীর সীমা ও নবীর বিশেষাধিকার ↩︎
- সহিহ বুখারি, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস ৬২২৭ ↩︎
- সহিহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ৬৯০০ ↩︎
- সহিহ বুখারি ৬২২৭: ষাট হাত আদম ও পরবর্তী আকারহ্রাস ↩︎
- স্মিথসোনিয়ান: মানববিবর্তনের জীবাশ্ম ও জিনগত ভিত্তি ↩︎
- ব্যাবিলনীয় তালমুদ, বাবা বাত্রা ৭৫ক ↩︎
- ব্যাবিলনীয় তালমুদ, সানহেদ্রিন ৩৮খ ↩︎
- Hebrewbooks, Baba Batra 75A ↩︎
- সানহেদ্রিন ৩৮খ: অতিকায় আদম ও আকার কমিয়ে দেওয়া ↩︎
- তাফসিরে ইবনে কাসির, হুদ ১১:৭ ↩︎
- নাসা: প্রথম নক্ষত্র ও ভারী মৌলের উৎপত্তি ↩︎
- মো. আবদুল হালিম, দার্শনিক প্রবন্ধাবলি: তত্ত্ব ও বিশ্লেষণ, বাংলা একাডেমি, ২০০৩ ↩︎
- অ্যারিস্টটল, মেটাফিজিক্স, প্রথম গ্রন্থ, ৯৮৩খ ↩︎
- কোরআন ১১:৭: সম্পূর্ণ আয়াত ↩︎
- ১১ঃ৭ ↩︎
- সহিহ বুখারি, তাওহীদ পাবলিকেশন, ৭৪২৭ ↩︎
- সহিহ বুখারি ৩১৯১: পানির ওপর আরশ ও আসমান-জমিন সৃষ্টি ↩︎
- আদিপুস্তক ১:১–৯: আদিজল, আকাশ ও শুকনো ভূমি ↩︎
- মনুসংহিতা ১:৮–১৩; জর্জ বিউলারের অনুবাদ ↩︎
- সহিহ বুখারি ৩১৯১: সম্পূর্ণ বর্ণনা ↩︎
- নাসা: মহাবিশ্বের বিকাশের পর্যায়সমূহ ↩︎
- ৭ঃ৫৪ ↩︎
- ১০:৩ ↩︎
- সহিহ মুসলিম ২৭৮৯ ↩︎
- সহিহ মুসলিম ২৭৮৯: শনিবার থেকে শুক্রবারের সৃষ্টিক্রম ↩︎
- আদিপুস্তক ১:১০–৩১: উদ্ভিদ, আকাশের আলো ও জীবজগৎ ↩︎
- ইসলামওয়েব ১৩৭৭৭৩: আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া থেকে সংশ্লিষ্ট বক্তব্য ↩︎
- যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আবহাওয়া পরিষেবা: আকাশ নীল দেখানোর কারণ ↩︎
- কোরআন ৬৫:১২: সাত আসমান ও অনুরূপ জমিন ↩︎
- সহিহ বুখারি ৩১৯৬: সাত জমিন পর্যন্ত ধসে যাওয়ার বর্ণনা ↩︎
- নাসা: বায়ুমণ্ডলের পাঁচ প্রধান ও অতিরিক্ত স্তর ↩︎
- কোরআন ৩৭:৬–১০: নিকটবর্তী আসমান, নক্ষত্র ও শয়তান ↩︎
- কোরআন ৬৭:৫: প্রদীপ ও ক্ষেপণাস্ত্র ↩︎
- তাফসিরে জালালাইন, ইসলামিয়া কুতুবখানা, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫, প্রাসঙ্গিক আলোচনা ↩︎
- Wayne Horowitz, Mesopotamian Cosmic Geography, ১৯৯৮, “Seven Heavens and Seven Earths”, পৃষ্ঠা ২০৮–২২০ ↩︎
- Jody A. Barnard, The Mysticism of Hebrews, ২০১২, পৃষ্ঠা ৬২ ↩︎
- পিটার জেমস ও মারিনাস অ্যান্থনি ভান ডের স্লুইস: Ziggurats, Colors, and Planets: Rawlinson Revisited ↩︎
- বি. কে. চতুর্বেদী, শিব পুরাণ, ২০০৪, পৃষ্ঠা ১২৪ ↩︎
- শ্রীমদ্ভাগবত ৫.২৪.৭: পৃথিবীর নিচে সাত অঞ্চল ↩︎
- ব্যাবিলনীয় তালমুদ, হাগিগা ১২খ ↩︎
- “Angelology” ↩︎
- Gershom Scholem, Jewish Gnosticism, Merkabah Mysticism, and the Talmudic Tradition, ১৯৬৫; OCLC ৬৩৫০২০ ↩︎
- OCLC ↩︎
- 635020 ↩︎
- দ্বিতীয় করিন্থীয় ১২:২–৪: তৃতীয় স্বর্গ ও পরমদেশ ↩︎
- হাগিগা ১২খ: রেশ লাকিশের সাত আসমানের তালিকা ↩︎
- হাগিগা ১২খ: রাকিয়ায় সূর্য, চাঁদ ও নক্ষত্র ↩︎
- শ্রীমদ্ভাগবত ৫.২৪.৭: সম্পূর্ণ শ্লোক ↩︎
- কোরআন ৩৫:৪১ ↩︎
- নাসা: পৃথিবীর ঘূর্ণন ও সূর্যকে পরিভ্রমণ ↩︎
- কুরআন ৩৫ঃ৪১ ↩︎
- কোরআন ৩১:১০ ↩︎
- ইবনে কাসির: পানির ওপর পৃথিবী স্থির রাখার জন্য পর্বত ↩︎
- কুরআন ৩১ঃ১০ ↩︎
- তাফসিরে ইবনে কাসির, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৬৯ ↩︎
- তাফসিরে ইবনে কাসির, লুকমান ৩১:১০ ↩︎
- জাকারিয়া আল-কাজউইনি, আজায়িবুল মাখলুকাত; আরবি গ্রন্থের চিত্রিত তুর্কি সংস্করণের ঐতিহ্য ↩︎
- ফতোয়ায়ে আরকানুল ইসলাম, ঈমান, মুহাম্মদ ইবনে সালিহ আল-উসাইমিন ↩︎
- একই গ্রন্থ, পৃষ্ঠা ৩৭–৩৯, প্রশ্ন ১৬ ↩︎
- তাফসিরে তাবারি, ফাতির ৩৫:৪১: কাব ও ইবনে মাসউদের বিতর্ক ↩︎
- ইবনে কাসির, লুকমান ৩১:১০: সংশ্লিষ্ট সম্পূর্ণ বাক্য ↩︎
- যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ: হিমালয়ের পাতসংঘর্ষ ও ভূমিকম্প ↩︎
- রাতে আরশের নিচে সূর্যের যাওয়ার হাদিসটি কেন বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল? ↩︎
- নিকটবর্তী আসমানে আল্লাহর রাত্রিকালীন অবতরণ ↩︎
- সহিহ মুসলিম ১৫৯ক: গন্তব্য, সিজদায় অবস্থান এবং ফিরে আসা ↩︎
- সুনান আবু দাউদ ৪০০২: উষ্ণ প্রস্রবণে সূর্যাস্তের বর্ণনা ↩︎
- তাফসিরে জালালাইন, ইসলামিয়া কুতুবখানা, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭৪৯ ↩︎
- তাফসিরে জালালাইন, গাশিয়া ৮৮:২০: পৃথিবীর সমতলতা ↩︎
- তাফসিরে ইবনে কাসির, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, একাদশ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১৬–২১৭ ↩︎
- সুনান ইবনে মাজাহ ২৯২১: জড়বস্তুর তালবিয়া ↩︎
- তিরমিজি ৮২৮: পৃথিবীর প্রান্ত পর্যন্ত সাড়া ↩︎
- জালালাইন, গাশিয়া ৮৮:২০: সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা ↩︎
- তিরমিজি ৩২৯৮: পাঁচশ বছরের ব্যবধান ↩︎
- আবু দাউদ ৪৭২৩: একাত্তর থেকে তিয়াত্তর বছর ও আরশবাহক ↩︎
- সালিহ আল-ফাওযান, শরহুল আকিদাহ আল-ওয়াসিতিয়া; অনুবাদ আব্দুল্লাহ শাহেদ আল-মাদানি ↩︎
- সুনান আবু দাউদ ৪৭২৩: সম্পূর্ণ মূল বর্ণনা ↩︎
- তিরমিজি ৩২৯৮: সম্পূর্ণ মূল বক্তব্য ও সংকলকের মন্তব্য ↩︎
- নাসা: প্রতিফলিত সূর্যালোক ও চাঁদের উজ্জ্বল-অন্ধকার অঞ্চল ↩︎
- আদিপুস্তক ১:১৬: দুটি আলোকবস্তু ↩︎
- কোরআন ১০:৫ ↩︎
- কোরআন ২৫:৬১ ↩︎
- কোরআন ৭১:১৬ ↩︎
- কোরআন ৭৫:৮ ↩︎
- সূরা ইউনুস আয়াত ৫ ↩︎
- সূরা আল-ফুরকান আয়াত ৬১ ↩︎
- সূরা নূহ আয়াত নং ১৬ ↩︎
- সূরা আল-ক্বিয়ামাহ আয়াত ৮ ↩︎
- তাফসিরে জালালাইন, ইসলামিয়া কুতুবখানা, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০০ ↩︎
- তাফসিরে মারেফুল কোরআন, অষ্টম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৩৮ ↩︎
- তাফসিরে তাবারি, ইসরা ১৭:১২: চাঁদের কালো অংশের ব্যাখ্যা ↩︎
- সহিহ বুখারি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৬১ ↩︎
- সহিহ বুখারি ৩২০০: সূর্য-চাঁদ গুটিয়ে দেওয়ার বর্ণনা ↩︎
- তাফসিরে তাবারি, ইসরা ১৭:১২: ইবনে আব্বাসের নামে বর্ণিত সম্পূর্ণ বক্তব্য ↩︎
- নাসা: ব্যাসল্টের অন্ধকার সমভূমি, উজ্জ্বল উচ্চভূমি ও প্রতিফলনক্ষমতা ↩︎
- নাসা: চাঁদের কলা ও আলোকিত অংশের জ্যামিতি ↩︎
About This Article
Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis
Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics
This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.
Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.



কমেন্ট গুলো খুজে পাচ্ছি কেন? কমেন্টের মধ্য একটি লিঙ্ক দেয়া ছিল যেখানে বলা ছিল কোরাইশরা ইসমাইল আঃ এর বংশধর
যদি আমি পাকিস্থানের লেখকের বই থেকে ১৯৭১ সালের যুদ্ধের কাহিনী টা পড়ি; তাহলে তো পাকিস্থান মিলিটারিরাই নায়ক দল হবে তাই না ??? তাই সংশয় নিরসন করতে হলে, দুই পক্ষের বই এ পড়তে হবে, জানতে হবে, এমনকি প্রয়োজনে বিচার বিশ্লেষণ এবং যারা এইসব বিষয়ে সঠিক টা জানে তাদের সরনাপন্ন হতে হবে। তারপর সব কিছু মিলিয়ে নিজের বিবেক দিয়ে চিন্তা করলে সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।
বাকি সব বাদ দিলাম।
হাজরে আসওয়াদ আপনার কাছে স্ত্রী লিঙ্গের মতো দেখতে মনে হলো কোন দিক থেকে?
সব কিছুতেই নারীদের শরীর আর যোনতা খুঁজে পাও। এতোটা নষ্ট মস্তিক নিয়ে কিভাবে চলাফেরা করো তোমরা এই সমাজে?
নষ্ট মস্তিষ্ক আপনার নিজের ! শুধু তাই নয় –গোবর ভরা মস্তিষ্ক ! গোবর না থাকলে বুঝতে পারতেন যে ছবিটা আসিফ মহিউদ্দিন তৈরী করেনি –এটা একটা প্রাচীন মূর্তির ছবি মাত্র ! আসলে আপনার দৃষ্টির ও মানসিকতার মধ্যে সমস্যা
আছে | প্রাচীন কালের পৃথিবীর সমস্ত প্রাচীন সভ্যতার মধ্যেই এমন সব অসংখ্য নগ্ন মূর্তি পাওয়া যাবে –সেই যুগে এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল শিল্পীদের জন্য |
. আসলে মুমিনরা যৌনতার দৃষ্টি দিয়ে সব কিছুকে দেখে : মা যে শিশুকে দুধ খাওয়াচ্ছে –সেই দৃশ্যের ছবিও মুমিনদের নোংরা মানসিকতায় যৌনতা ! তোরা কবে মানুষ হবি , সভ্য হবি ?
ji ji ei jonnoi apnr luiccha nobi moha unmaad khankir pola 12/13 da biya korse, baccha re jor koira chuida dise, dashi sex to asei…mane joto kkohn ei madarchod baicha silo totokkhon khali punda pundi korse….taile tar mathar vitore na jani koto koto narir jinish ghur pak khaito…madarchod mey manush re deha matroi pagol hoia jaito vadro masher kuttar moto…khali kokon chuda suru korbo ei dhada diya aktar por akta koran er ayat namaieto ar allahr naame chalaya dito…eisob toder kase normal mone hoibo karon tora to luiccha nobir ummot…ne akn luiccha nobir dhon da chok off koira chuste thak
bhai ki bokchod naki
কিবলা চেঞ্জ নিয়ে আমার দ্বিমত রয়েছে। মুসলিমরা প্রচার করে তাদের প্রথম কিবলা ছিল আল আকসা, যেটি একসময় চেঞ্জ করে ক্কাবা করা হয়। কিন্তু কুরআন হাদিস অনুসারে কথাটি সত্যি নয়।
মুহাম্মদ নবী দাবি করার পর মক্কায় ছিলেন ১৩ বছর। শুরু থেকেই তিনি ক্কাবা কে ইব্রাহীমের ঘর দাবি করে এসেছেন। আরব পৌত্তলিকরাও ক্কাবার দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করত দিনে ৩ বার। মুহাম্মাদও নবী দাবি করার পরেও ক্কাবার দিকে মুখ করেই নামাজ পড়ত। তাছাড়া ৫ ওয়াক্ত নামার ফরজ হয়েছিল নবুয়তের ১০/১১ তম বছরে৷ আর হিজরত হয় ১৩ তম বছরে। এই মাঝের দুই বছরও সকল মুসলিম ক্কাবার দিকে মুখ করেই ফরজ নামাজ পড়তেন।
মুহাম্মাদ আল আকসা কে কিবলা করেন মদিনায় মাইগ্রেট করার পর। মদিনার লোকজন মূলত ইহুদী-খৃষ্টান হওয়ায় তাদের মাঝে নিজেকে নবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যই মুহাম্মাদ মদিনা যাবার পর থেকে ক্কাবা কে বাদ দিয়ে আল আকসার দিকে মুখ করে সালাত আদায় শুরু করে৷ কিন্তু ইহুদীরা ওনাকে নবী গিসেবে গ্রহণ না করলে মদিনা যাবার ১৬/১৭ মাস পরে উনি আবার কিবলা চেঞ্জ করে ক্কাবায় ফিরে আসে। আল আকসা মুসলিমদের কিবলা ছিল মাত্র ১৬/১৭ মাসের জন্য। নিচে কিছু প্রমাণ দিচ্ছি—-
2:143
Sahih International
And thus we have made you a just community that you will be witnesses over the people and the Messenger will be a witness over you. And We did not make the qiblah which you used to face except that We might make evident who would follow the Messenger from who would turn back on his heels. And indeed, it is difficult except for those whom Allah has guided. And never would Allah have caused you to lose your faith. Indeed Allah is, to the people, Kind and Merciful.
বাকারার ১৪৩ নাম্বার আয়াতের তাফসিরে জালালিল স্পষ্ট করে লিখেছেন যে বাইতুল মুকাদ্দাস কিবলা ছিল মাত্র ১৬/১৭ মাসের জন্য। এবং মুহাম্মাদ নবুয়তের ১৩ তম বছরে মক্কা থেকে মদিনা যাবার পরের “ইহুদীদের মন জয় করার উদ্দেশ্য” ক্কাবা কে বাদ দিয়ে আল আকসা কে কিবলা করেন। ইবনে কাথিরেও উল্লেখ আছে তা। https://www.altafsir.com/Tafasir.asp?tMadhNo=1&tTafsirNo=74&tSoraNo=2&tAyahNo=143&tDisplay=yes&UserProfile=0&LanguageId=2
আবার এই ১৪৩ নাম্বার আয়াতটি পড়লেও কিন্তু বুঝা যায়। এই আয়াতটি কিবলা চেঞ্জ হবার পরেই নাজিল হয়েছে৷ আয়াতে বলা হচ্ছে, আল আকসাকে কিবলা এজন্যই করেছিলাম যেন বুঝতে পারি যে কারা নবীর সঙ্গে থাকে আর কারা উল্টো দিকে ফিরে। পরে বলা এটি কঠিন ছিল, যদিও তোমাদের ইমান নষ্ট করা আল্লাহর উদ্দেশ্য নয়,,,,
এখানে ঈমান হারানো বা পিছটান দেয়ার কথা আসল কেন? এসেছে কারণ ১৩ বছর ধরে মুহাম্মাদ ক্কাবাকেই ইব্রাহীমের ঘর দাবি করে সেটির দিকে মুখ করে সেজদাহ দিত। এবং ক্কাবা কে সেজদাহ করাটাও মক্কার মানুষের জন্য ন্যাচারাল ছিল। বাট মদিনায় যখন মুসলিমরা হিজরত করে আসছিল, এসে দেখে ১৩ বছরের সেজদাহ করার দিক ক্কাবা চেঞ্জ করে এখন ইহুদীদের অনুসরণ করা হচ্ছে। সুতরাং মক্কার মুসলিমদের ঈমানে টান পড়াই স্বাভাবিক।
তাছাড়া হাদিসেও আছে আল আকসা কিবলা ছিল মাত্র ১৬/১৭ মাসের জন্য।
Sunan an-Nasa’i 488
It was narrated that Al-Bara’ said:
“We prayed toward Bait Al-Maqdis (Jerusalem) with the Messenger of Allah (ﷺ) for sixteen or seventeen months – Safwan was not sure – then it was changed to the Qiblah.”
https://sunnah.com/nasai:488
মুসলিমরা এই সত্যটি লুকায় কেন? কারণ মুহাম্মাদের সকল কাজ যে পলিটিক্যাল, যে এলাকার মানুষ যেটি প্রেফার করে উনি যে বারবার সেই অনুসারে তাদের মোটিভেট করার চেষ্টা করেছেন, বারবার কিবলা পরিবর্তন তো সেটি স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয়। এজন্যই কিবলা নিয়ে তারা মিথ্যাচার করে।
অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।। এই বিষয়টি ভুলে গিয়েছিলাম কেন জানি! এখন যুক্ত করে দিয়েছি। কৃতজ্ঞতা জানবেন।
Asif mohiuddin….do you know why Ehudi and Arabian people ask 3 questions to Muhammod ( sallahu alyhe wa sallam)….example: Zulkarnain ( alyhis salam) …Roh….young people in the cave ( sura kahaf) ?….it is because they want to test him…Later Allah answer the question. The problem for you that…you think too much. Please use your brain and return to islam.please.thank you
আপনার নবীজী সাঃ প্রায় একমাস পরে ইহুদিদের সেই তিনটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন। যদি সত্যিই তিনি নবী হয়ে থাকেন, তাহলে তৎক্ষণাৎ কেন আল্লাহর কাছ থেকে ওহীর মাধ্যমে উত্তর দিতে পারেন নি? কারণ তিনি আসলে নবী ছিলেন না এবং ওহী ও পেতেন না। এই একমাস সময় তিনি প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে ব্যয় করেছেন৷ নবীজীর স্ত্রী খাদিজার চাচাতো ভাই ছিল ইহুদি ধর্ম থেকে খ্রিষ্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত। তার ইহুদি ধর্ম সম্পর্কে ছিল বিপুল জ্ঞান।
আর এই একমাস উত্তর দিতে না পারার কারণ হিসেবে নবী মুহাম্মদ বলেছিলেন তিনি নাকি ইনশাআল্লাহ না বলার জন্য আল্লাহ তাকে একমাস অপেক্ষা করিয়েছেন। আসলে মানুষের তিনটা হাত- বামহাত, ডানহাত, অজুহাত৷ আমি এই ইনশাআল্লাহ না বলার জন্য একমাস পরে ওহী আসাকে অজুহাত ছাড়া কিছু বলব না। কারণ ওই তিনটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে একমাস যথেষ্ট সময় ছিল।
Without allah’s help nothing can happen…2nd ….after got 3 answer from 3 questions….ehudi people do not make any protest.thank you
অন্য ধর্মের সাথে ইসলামের মিল থাকলে সমস্যা কোথায়?
যেখানে নবী মুহাম্মদ ইসলামের প্রচারক হিসেবে কখনও বলেনি তিনি নতুন কোন ধর্মের উদ্ভাবন করেছেন। বরং কুরআন ও হাদিসে পূর্বের ধর্ম ও ধর্মের প্রচারকদের সত্যতা স্বিকার করে নেওয়া হয়েছে।
কুরআন ও হাদিস মোতাবেক ইসলাম হচ্ছে ইয়াহুদি বা খ্রীষ্টানদের ই সংশোধিত রুপ। সেখানে মিল থাকাটাই স্বাভাবিক। যুগের প্রয়োজনে আমল বা ইবাদতের ক্ষেত্রে কিছুটা পার্থক্য থাকতে পারে যা খুবই স্বাভাবিক।
সেটাকে কেন নেগেটিভ ভাবে উপস্থাপন করছেন তা বোধগম্য নয়।
বর্তমান যুগে বসে ১৫০০ বছর আগের সামাজিক ব্যবস্থা কিছু বই পুস্তক পড়ে বুঝা সম্ভন না । কেউ যদি বলে আকাশে চাদ উঠেছে সেটা কারও জন্য রুমান্টিকতা আবার কারও জন্য বিভিষিকাময় রাতও হতে পারে। কাজেই ধর্মের মত একটি দার্শনিক বিষয়কে কিছু লজিক বা ইতিহাসের কিছু বই পড়ে সমাজে অরাজকতা সৃষ্টি করা কাম্য নয়্।
হ্যা অবশ্যই কিছু রুগ্ন মানুষ সাধারন মানুষের অজ্ঞতার কারনে ধর্মকে পুজি করে ব্যবসা করছে। তাদের মুখোস অবশ্যই সবার সামনে তুলে ধরতে হবে। তার মানে এই না ধর্মের মূল চিন্তাকেই অস্বিকার করে বসব। ধর্মের ভিতর যদি কোন অধর্ম ঢুকে থাকে তা হলে সেটা অবশ্যই দুর করা উচিৎ শান্তিপূর্ন উপায়ে বা রাজনতিক উপায়ে।
ধন্যবাদ