Luqman

লুকমান: 27

31:27
টেক্সট কপি
31 লুকমান Luqman · 34 আয়াত لقمان

মূল আরবি

وَلَوْ أَنَّمَا فِى ٱلْأَرْضِ مِن شَجَرَةٍ أَقْلَـٰمٌ وَٱلْبَحْرُ يَمُدُّهُۥ مِنۢ بَعْدِهِۦ سَبْعَةُ أَبْحُرٍ مَّا نَفِدَتْ كَلِمَـٰتُ ٱللَّهِ ۗ إِنَّ ٱللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ

English Translations

Sahih International

And if whatever trees upon the earth were pens and the sea [was ink], replenished thereafter by seven [more] seas, the words of Allāh would not be exhausted. Indeed, Allāh is Exalted in Might and Wise.

Muhsin Khan

And if all the trees on the earth were pens and the sea (were ink wherewith to write), with seven seas behind it to add to its (supply), yet the Words of Allah would not be exhausted. Verily, Allah is All-Mighty, All-Wise.

Taqi Usmani

And if all trees that are on the earth were to be pens, and the ocean (converted into ink) is supported by seven seas following it, the words of Allah would not come to an end. Surely, Allah is Mighty, Wise.

Abul Ala Maududi

If all the trees on earth become pens, and the sea replenished by seven more seas were to supply them with ink, the Words of Allah would not be exhausted.Verily Allah is Most Mighty, Most Wise.

Pickthall

And if all the trees in the earth were pens, and the sea, with seven more seas to help it, (were ink), the words of Allah could not be exhausted. Lo! Allah is Mighty, Wise.

Yusuf Ali

And if all the trees on earth were pens and the ocean (were ink), with seven oceans behind it to add to its (supply), yet would not the words of Allah be exhausted (in the writing): for Allah is Exalted in Power, full of Wisdom.

বাংলা অনুবাদ

তাইসিরুল কুরআন

দুনিয়ার সব গাছ যদি কলম হয় আর সমুদ্র (কালি হয়) আর তার সাথে আরো সাত সমুদ্র যুক্ত হয়, তবুও আল্লাহর (প্রশংসার) কথা (লেখা) শেষ হবে না। আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, মহাপ্রজ্ঞার অধিকারী।

রাওয়াই আল-বায়ান

আর যমীনে যত গাছ আছে তা যদি কলম হয়, আর সমুদ্র (হয় কালি), তার সাথে কালিতে পরিণত হয় আরো সাত সমুদ্র, তবুও আল্লাহর বাণীসমূহ শেষ হবে না। নিশ্চয় আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

শাইখ মুজিবুর রহমান

পৃথিবীর সমস্ত বৃক্ষ যদি কলম হয় এবং এই যে সমুদ্র, এর সাথে যদি আরও সাতটি সমুদ্র যুক্ত হয়ে কালি হয় তবুও আল্লাহর বাণী নিঃশেষ হবেনা। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

আর যমীনের সব গাছ যদি কলম হয় এবং সাগর, তার পরে আরও সাত সাগর কালি হিসেবে যুক্ত হয়, তবুও আল্লাহর বাণী নিঃশেষ হবে না। নিশ্চয় আল্লাহ্ মহা পরাক্রমশালী, হিকমতওয়ালা।

ফাতহুল মাজীদ

আর সমগ্র পৃথিবীতে যত গাছ আছে তা সবই যদি কলম হয় এবং যে সমুদ্র রয়েছে তার সাথে যদি আরও সাতটি সমুদ্র শামিল হয়ে কালি হয় তবুও আল্লাহর বাণী শেষ হবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রতাপশালী, মহা প্রজ্ঞাময়।

মুখতাসার

২৭. যদি যমীনে যত বৃক্ষরাজি রয়েছে সেগুলোকে কেটে কলম বানানো হয় আর সমুদ্রকে সাত গুণ বৃদ্ধি করে কালি বানানো হয় তবুও আল্লাহর অশেষ কথা লিখা শেষ হবে না। আল্লাহ পরাক্রমশালী; তাঁকে পরাভূতকারী কেউ নেই। তিনি তাঁর সৃষ্টি ও পরিচালনায় প্রজ্ঞাবান।

তাফসীর

তাফসীর ইবনে কাসীর

২৭-২৮ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা তাঁর ইযত, শ্রেষ্ঠত্ব, বড়ত্ব, বুযর্গী, মর্যাদা ও মাহাত্ম্যের বর্ণনা দিচ্ছেন। নিজের পবিত্র গুণাবলী, মহান নাম ও অসংখ্য কালেমার বর্ণনা প্রদান করছেন। না কেউ তা গণনা করে শেষ করতে পারে, না তার পরিধি কারো জানা আছে। তার প্রকৃত তথ্য কারো জানা নেই। মানব-নেতা, শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) বলতেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনার নিয়ামতের গণনা ততো আমি করতে পারবো না যতোটা আপনি নিজের নিয়ামতের বর্ণনা নিজেই দিয়েছেন” বা “আপনার প্রশংসা ও গুণকীর্তন করে আমি শেষ করতে পারবো না যেমন আপনি নিজের প্রশংসা নিজে করেছেন।” মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ জগতের সমস্ত গাছ-পালাকে যদি কলম বানানো হয় এবং সাগরের সমস্ত পানিকে যদি কালি বানানো হয়, এরপর আরো সাতটি সাগরের পানি মিলিত করা হয়, অতঃপর আল্লাহ তা'আলার শ্রেষ্ঠত্ব, গুণাবলী, বুযর্গী এবং বাণীসমূহ লিখতে শুরু করা যায় তবে এই সমুদয় কলম ও কালি শেষ হয়ে যাবে, তথাপি একক ও শরীক বিহীন আল্লাহর প্রশংসা ও গুণাবলী শেষ হবে না।

এতে এটা মনে করা চলবে না যে, যদি সাতের অধিক সাগরের পানি একত্রিত করা হয় তবে আল্লাহর গুণাবলী লিখার জন্যে যথেষ্ট হবে। এটা কখনো নয়। এ গণনা শুধু আধিক্য প্রকাশের জন্যে বলা হয়েছে। এটাও মনে করা চলবে না যে, মাত্র সাতটি সাগর আছে যা সমগ্র দুনিয়াকে পরিবেষ্টন করে রয়েছে। অবশ্য বানী ইসরাঈলের রিওয়াইয়াতে এ সাতটি সাগরের কথা বলা হয়েছে বটে, তাকে আমরা সত্যও বলতে পারি না এবং মিথ্যাও না। তবে আমরা যে তাফসীর করেছি তার পৃষ্ঠপোষক নিম্নের আয়াতটিকে বলা যেতে পারে। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ)! তুমি বলঃ আমার প্রতিপালকের কথা লিপিবদ্ধ করবার জন্যে সমুদ্র যদি কালি হয়, তবে আমার প্রতিপালকের কথা শেষ হবার পূর্বেই সমুদ্র নিঃশেষ হয়ে যাবে সাহায্যার্থে এর অনুরূপ আরো সমুদ্র আনলেও।” (১৮:১০৯) এখানে একটি সমুদ্র উদ্দেশ্য নয়, বরং এক একটি করে যতই হালে না কেন, তবুও আল্লাহর কালেমা শেষ হবে না।হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন, যদি আল্লাহ তা'আলা লিখাতে শুরু করেন ও বলেনঃ এ কাজ লিখো, ও কাজ লিখো, এভাবে লিখতে লিখতে সমস্ত কলম ভেঙ্গে শেষ হয়ে যাবে, তবুও লিখা শেষ হবে না ।মুশরিকরা বলতো যে, এ কালাম শেষ হয়ে যাবে।

এ আয়াত দ্বারা তাদের উক্তিকে খণ্ডন করা হয়েছে। না আল্লাহর বিস্ময়কর ব্যাপারগুলো শেষ হবে, না তার জ্ঞানের পরিধি জরিপ করা যাবে, না তার জ্ঞান ও সিফাতের পরিমাপ করা সম্ভব হবে। আল্লাহর জ্ঞানের তুলনায় সমস্ত বান্দার জ্ঞান এমনই যেমন সমুদ্রের পানির তুলনায় এক ফোটা পানি। আল্লাহর কথা শেষ হবার নয়। আমরা তার যে প্রশংসা করি, তাঁর প্রশংসা এর বহু উপরে।মদীনায় ইয়াহূদী আলেমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেছিল ও “আপনি যে পাঠ করে থাকেন (আরবি) অর্থাৎ “তোমাদেরকে খুব অল্প জ্ঞানই দেয়া হয়েছে। (১৭:৮৫) এর দ্বারা উদ্দেশ্য কারা, আমরা, না আপনার কওম?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “আমরা ও তোমরা সবাই।” তারা পুনরায় বলেঃ “তাহলে আপনি কালামুল্লাহর এ আয়াতের অর্থ কি করবেন যেখানে বলা হয়েছে যে, তাওরাতে সবকিছুরই বর্ণনা রয়েছে?” জবাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “জেনে রেখো যে, তোমাদের কাছে যা কিছু রয়েছে ওগুলো আল্লাহ তা'আলার কালেমার তুলনায় অতি অল্প।

তোমাদের জন্যে যথেষ্ট হয় এ পরিমাণই তিনি তোমাদের প্রতি নাযিল করেছেন।” ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা (আরবি) -এই আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। কিন্তু এর দ্বারা জানা যাচ্ছে আয়াতটি মাদানী হওয়া উচিত। অথচ এটা প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে যে, এটা মক্কী আয়াত। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।আল্লাহ তা'আলা সবকিছুর উপরই বিজয়ী। সবকিছুই তার কাছে যৎকিঞ্চিৎ ও বিজিত। কিছুই তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যেতে পারে না। তিনি নিজের কথায়, কাজে, আইন-কানুনে, বুদ্ধিতে ও অন্যান্য গুণাবলীতে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্ববিজয়ী এবং প্রতাপশালী ।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ সমস্ত মানুষকে সৃষ্টি করা এবং তাদেরকে মেরে ফেলে পুনরুজ্জীবিত করা আমার কাছে একটি লোককে মেরে জীবিত করার মতই সহজ।

কোন কিছু হওয়ার ব্যাপারে আমার শুধু হুকুম করাই যথেষ্ট। কোন কিছু করতে আমাকে চোখের পলক ফেলার সমানও সময় লাগে না। দ্বিতীয়বার হুকুম করার আমার প্রয়োজন হয় না। কোন উপকরণ ও যন্ত্রপাতিরও দরকার হয় না। একটা হুকুমেই কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে। একটি শব্দ মাত্রই সবাই জীবিত হয়ে উঠবে। আল্লাহ সবকিছু শুনেন এবং সবকিছু দেখেন। একটি লোকের কথা ও কাজ যেমন তাঁর কাছে গোপন থাকে না, অনুরূপভাবে সারা দুনিয়ারও কিছুই তার কাছে লুক্কায়িত নয়।

তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া

আর যমীনের সব গাছ যদি কলম হয় এবং সাগর, তার পরে আরও সাত সাগর কালি হিসেবে যুক্ত হয়, তবুও আল্লাহর বাণী [১] নিঃশেষ হবে না। নিশ্চয় আল্লাহ্ মহা পরাক্রমশালী, হিকমতওয়ালা।

[১] ‘আল্লাহর কালেমা বা কথা’ এর মানে কি? এ ব্যাপারে বিভিন্ন মত আছে। যদিও এর প্রতিটিই এখানে উদ্দেশ্য হতে পারে। অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, আয়াতে বৰ্ণিত ‘আল্লাহর কালেমা বা কথা বলে মহান আল্লাহর জ্ঞানপূর্ণ ও প্রজ্ঞাময় বাক্যাবলীই বুঝানো হয়েছে। আল্লাহর বাণীর কোন শেষ নেই। [সাদী; মুয়াসসার] এ কুরআন তার বাণীরই অংশ। অর্থ এই যে, এক সমুদ্রের সাথে আরো সাতটি সমুদ্রে সংযুক্ত হয়েছে বলে যদি ধরেও নেয়া হয়, তা সত্বেও এসবগুলির পানি দিয়ে আল্লাহর প্রজ্ঞাময় বাক্যসমূহ লিখে শেষ করা যাবে না। এখানে সাতের সংখ্যা উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা হয়েছে- সীমিত করে দেয়া উদ্দেশ্য নয়।

যার প্রমাণ কুরআনের অন্য এক আয়াতে-যেখানে বলা হয়েছে – ‘আল্লাহর মহিমাসুচক বাণীসমূহ প্রকাশ করতে যদি সমুদ্রকে কালিতে রূপান্তরিত করে দেয়া হয়, তবে সমুদ্র শূন্য হয়ে যাবে-কিন্তু সে বাণীসমূহ শেষ হবে না। আর শুধু এ সমুদ্র নয়, অনুরূপ আরো সমুদ্র অন্তর্ভুক্ত করলেও অবস্থা একই থাকবে। [সূরা আল-কাহফ: ১০৯] মোটকথা: সমুদ্রসমুহের যতগুণ বা সংখ্যাই মেনে নেয়া হোক না কেন, এসবগুলোর পানি কালি হলেও আল্লাহর মহিমা প্রকাশক বাণীসমূহ লিখে শেষ করতে পারবে না। যুক্তি-বুদ্ধির দিক দিয়ে একথা সুস্পষ্ট যে সমুদ্র সাতটি কেন সাত হাজারও যদি হয়, তবুও তা সীমাবদ্ধ, শেষ অবশ্যই হবে-কিন্তু আল্লাহর বাক্যাবলী অসীম ও অনন্ত- কোন সসীম বস্তু অসীমকে কিরূপে আয়ত্ব করতে পারে?

[দেখুন, ইবন কাসীর, কুরতুবী, সাদী]

কোন কোন মুফাসসিরের মতে “আল্লাহর কালেমা বা কথা’ বলে এই আয়াতে মহান আল্লাহ তাঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা, তাঁর নেয়ামত (কৃপা ও দয়াসমূহ) যে একেবারে অসীম ও অফুরন্ত,- কোন ভাষার সাহায্যে তা প্রকাশ করা চলে না, তাই বুঝিয়েছেন। [কুরতুবী; মুয়াসসার; ইবন কাসীর] মূলত: আল্লাহর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা, তাঁর নেয়ামতসমূহ কোন কলম দিয়ে লিপিবদ্ধ করা চলে না, এখানে আল্লাহ এ তথ্যটুকুই সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন। অধিকন্তু তিনি এরূপভাবে উদাহরণ পেশ করেছেন যে, ভূ-পৃষ্ঠে যত বৃক্ষ আছে, যদি সেগুলোর সব শাখা-প্ৰশাখা দিয়ে কলম তৈরী করা হয় এবং বিশ্বের সাগরসমূহের পানি কালিতে রূপান্তরিত করে দেয়া হয় এবং এসব কলম আল্লাহ তা'আলার প্রজ্ঞা ও জ্ঞান-গরিমা এবং তাঁর ক্ষমতা ব্যবহারের বিবরণ লিখতে আরম্ভ করে, তবে সমুদ্রের পানি নিঃশেষ হয়ে যাবে; তবু তাঁর অফুরন্ত প্রজ্ঞা ও মহিমার বর্ণনা শেষ হবে না।

কেবল একটি মাত্র সমুদ্র কেন— যদি অনুরূপ আরো সাত সমুদ্রেও অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয়, তবুও সব সাগর শেষ হয়ে যাবে তথাপি আল্লাহর মহিমা প্রকাশক বাণীসমূহের পরিসমাপ্তি ঘটবে না।

কোন কোন মুফাসসিরের মতে এর অর্থ, তাঁর সৃষ্টিকর্ম এবং তাঁর শক্তির নিদর্শন। [কুরতুবী] অর্থাৎ পৃথিবীর গাছগুলো কেটে যতগুলো কলম তৈরী করা যেতে পারে এবং পৃথিবীর বর্তমান সাগরের পানির সাথে আরো তেমনি সাতটি সাগরের পানিকে কালিতে পরিণত করলে তা দিয়ে আল্লাহর শক্তি ও সৃষ্টির কথা লিখে শেষ করা তো দূরের কথা হয়তো পৃথিবীতে যেসব জিনিস আছে সেগুলোর তালিকা তৈরী করাই সম্ভবপর হবে না। শুধুমাত্র এ পৃথিবীতেই যেসব জিনিসের অস্তিত্ব রয়েছে সেগুলোই গণনা করা কঠিন, তার ওপর আবার এই অথৈ মহাবিশ্বের সৃষ্টির বিবরণ লেখার তো কোন প্রশ্নই উঠতে পারে না।

তাফসীর আল-কুরতুবী

[সূরা লুকমান (৩১): আয়াত ২৭] পূর্ণ পৃষ্ঠা

(আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সব আল্লাহরই) অর্থাৎ মালিকানা ও সৃষ্টির দিক থেকে। (নিশ্চয় আল্লাহ তিনিই অভাবমুক্ত) অর্থাৎ তিনি তাঁর সৃষ্টিজগত ও তাদের ইবাদত থেকে অমুখাপেক্ষী। তিনি তাদের কেবল তাদেরই উপকারের জন্য ইবাদতের নির্দেশ দিয়েছেন। (প্রশংসিত) অর্থাৎ তাঁর কারুকার্য ও সৃষ্টির জন্য তিনি প্রশংসিত। ‌‌[সূরা লুকমান (৩১): আয়াত ২৭]আর জমিনে যত বৃক্ষ আছে তা যদি কলম হয় এবং সমুদ্রের সাথে আরও সাতটি সমুদ্র যুক্ত হয়ে কালি হয়, তবুও আল্লাহর বাণীসমূহ শেষ হবে না। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় (২৭)।মুশরিকদের বিরুদ্ধে যখন তিনি অকাট্য প্রমাণ উপস্থাপন করলেন, তখন তিনি স্পষ্ট করে দিলেন যে তাঁর পবিত্র বাণীর অর্থসমূহ নিঃশেষিত হয় না এবং এর কোনো শেষ নেই।

আল-কাফফাল বলেছেন: যখন আল্লাহ উল্লেখ করেছেন যে তিনি মানুষের জন্য আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে তা বশীভূত করে দিয়েছেন এবং নেয়ামত পূর্ণ করে দিয়েছেন, তখন তিনি এ বিষয়ে সচেতন করেছেন যে, যদি গাছগুলো কলম এবং সমুদ্রগুলো কালি হতো এবং তা দিয়ে আল্লাহর কুদরত ও একত্ববাদের পরিচায়ক বিস্ময়কর সৃষ্টিরাজি লেখা হতো, তবে সেই বিস্ময়কর বিষয়গুলো শেষ হতো না। আল-কুশায়রী বলেছেন: তিনি উক্ত ‘কালিমা’র অর্থকে আল্লাহর সক্ষমতাধীন বিষয়াবলির (মাকদুরাত) দিকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। তবে আয়াতটিকে ‘কালামে কাদীম’ বা আল্লাহর অনাদি বাণীর ওপর প্রয়োগ করা অধিকতর শ্রেয়। কারণ সৃষ্টির অবশ্যই শেষ রয়েছে।

সুতরাং যখন তাঁর সক্ষমতাধীন বিষয়গুলো থেকে সীমাবদ্ধতা নাকচ করা হয়, তখন ভবিষ্যতে তিনি যা কিছু সৃষ্টি করতে সক্ষম তা থেকেও সীমাবদ্ধতা নাকচ হয়ে যায়। আর যা কিছু অস্তিত্ব লাভ করেছে এবং গণনাযোগ্য, তার শেষ থাকা অনিবার্য। পক্ষান্তরে, যা অনাদি ও চিরন্তন, প্রকৃতপক্ষে তার কোনো শেষ নেই। ‘আল্লাহর বাণীসমূহ’ (কালিমাতুল্লাহ)-এর অর্থ সম্পর্কে সূরা কাহফের শেষে আলোচনা অতিবাহিত হয়েছে [১]। আবু আলী বলেছেন: কালিমা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো—আল্লাহই ভালো জানেন—আল্লাহর সক্ষমতাধীন ঐ সকল বিষয় যা এখনো অস্তিত্ব লাভ করেনি। এটি আল-কাফফাল যা বলেছেন তারই অনুরূপ।

মূলত এর উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর বাণীর অর্থের প্রাচুর্য সম্পর্কে অবগত করা, যা প্রকৃতগতভাবে অসীম। মানুষের বোধগম্য করার জন্য একে সীমাবদ্ধ জিনিসের উদাহরণের মাধ্যমে নিকটবর্তী করা হয়েছে, কারণ মানুষের অভিজ্ঞতায় প্রাচুর্যের সর্বোচ্চ সীমা এটিই। এর অর্থ এই নয় যে, এই নির্দিষ্ট সংখ্যক কলম ও সমুদ্রের চেয়ে বেশি কিছু হলে তা ফুরিয়ে যাবে। আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট নির্দেশ করে যে, এখানে ‘কালিমা’ দ্বারা ‘কালামে কাদীম’ বা অনাদি বাণীই উদ্দেশ্য। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন: এই আয়াতের অবতীর্ণ হওয়ার কারণ হলো—ইয়াহুদিরা বলেছিল: হে মুহাম্মদ! আপনি কীভাবে আমাদের সম্পর্কে এই কথা বলেন যে, “তোমাদের সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে” [সূরা বনী ইসরাইল: ৮৫]?

অথচ আমাদের তাওরাত দেওয়া হয়েছে যাতে আল্লাহর বাণী ও বিধানসমূহ রয়েছে, আর আপনার মতে এটি (কুরআন) তো সবকিছুর বিশদ বর্ণনা? তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের বললেন: “তাওরাত আল্লাহর অসীম জ্ঞানের তুলনায় অতি সামান্য।” অতঃপর এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং এটি মাদানি আয়াত। আবু জাফর আন-নাহহাস বলেছেন: এ থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে, এখানে ‘কালিমা’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর জ্ঞান এবং বস্তুর প্রকৃত রহস্য। কারণ মহান আল্লাহ আগে থেকেই জানতেন...(১). দেখুন: খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ৬৮।(২). দেখুন: খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ৩২৪। [ ..... ]

তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর

পূর্ণ পৃষ্ঠা পূর্ণ পৃষ্ঠা পূর্ণ পৃষ্ঠা

রুহ বা আত্মা কী? সে সময় তাঁর হাতে একটি খেজুরের ডাল ছিল যার ওপর তিনি ভর দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। এরপর তিনি আকাশের দিকে মাথা তুললেন এবং তিলাওয়াত করলেন: "তারা আপনাকে আত্মা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে..." আয়াতটির "সামান্যই" (জ্ঞান দান করা হয়েছে) অংশ পর্যন্ত। ইবনে আসাকির বর্ণনা করেন: আবদুর রহমান ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে হাকাম আস-সাকাফি থেকে বর্ণিত, বলা হয় যে তিনি একজন সাহাবী ছিলেন।ইবনুল আনবারী 'কিতাবুল আদদাদ'-এ মুজাহিদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 'রুহ' (আত্মা) ফেরেশতাদের সাথে সৃজিত এমন এক সৃষ্টি যাদের ফেরেশতারা দেখতে পায় না, যেমনটি তোমরা ফেরেশতাদের দেখতে পাও না।এবং 'রুহ' এমন একটি বিষয় যার জ্ঞান মহান আল্লাহ নিজের জন্য নির্দিষ্ট রেখেছেন এবং তাঁর সৃষ্টির কাউকে সে বিষয়ে অবহিত করেননি।আর এটাই মহান আল্লাহর বাণী: "তারা আপনাকে আত্মা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে; বলুন, আত্মা আমার রবের আদেশঘটিত।"আবুশ শায়খ সালমান (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: মানুষ ও জিন দশটি ভাগে বিভক্ত; তার মধ্যে মানুষ এক ভাগ এবং জিন নয় ভাগ।ফেরেশতা ও জিন দশটি ভাগে বিভক্ত; তার মধ্যে জিন এক ভাগ এবং ফেরেশতারা নয় ভাগ।ফেরেশতা ও রুহ দশটি ভাগে বিভক্ত; তার মধ্যে ফেরেশতা এক ভাগ এবং রুহ নয় ভাগ।রুহ এবং কারুবিয়্যুন (নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতাগণ) দশটি ভাগে বিভক্ত; তার মধ্যে রুহ এক ভাগ এবং কারুবিয়্যুন নয় ভাগ।ইবনে ইসহাক এবং ইবনে জারির আতা ইবনে ইয়াসার থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: "তোমাদেরকে সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে" আয়াতটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছিল।

যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরত করলেন, তখন ইহুদি পণ্ডিতরা তাঁর কাছে এসে বললেন: হে মুহাম্মদ! আমাদের কাছে কি এই সংবাদ পৌঁছায়নি যে আপনি তিলাওয়াত করেন: "তোমাদেরকে সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে"? আপনি কি এর দ্বারা আমাদের উদ্দেশ্য করেছেন নাকি আপনার কওমকে? তিনি বললেন: উভয়কেই উদ্দেশ্য করেছি।তারা বলল: আপনি তো পাঠ করেন যে আমাদের তাওরাত দেওয়া হয়েছে এবং তাতে সবকিছুর সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: আল্লাহর জ্ঞানের তুলনায় সেটি অতি সামান্য। আর আল্লাহ তোমাদের যা দান করেছেন, তোমরা যদি সে অনুযায়ী আমল করো তবেই তোমরা উপকৃত হবে।তখন আল্লাহ অবতীর্ণ করলেন: (আর পৃথিবীতে যত গাছ আছে তা যদি কলম হয়...) থেকে শুরু করে (নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা) (সূরা লুকমান, আয়াত: ২৭-২৮) পর্যন্ত।ইবনে জারির এবং ইবনুল মুনযির ইবনে জারির থেকে বর্ণনা করেন আল্লাহর এই বাণী: "তোমাদেরকে যে জ্ঞান দান করা হয়েছে" - এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন: হে মুহাম্মদ, এর অর্থ হলো (আপনি) এবং সমগ্র মানবজাতি।ইবনে জারির কাতাদাহ থেকে বর্ণনা করেন: "তোমাদেরকে সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে" - এখানে ইহুদিদের বোঝানো হয়েছে।

আয়াত ৮৬ - ৮৭

পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে -সূরা লুকমানএটি মক্কী সূরা এবং এর আয়াত সংখ্যা চৌত্রিশ।- সূরা লুকমানের ভূমিকা: ইবনে আদ-দোরইস, ইবনে মারদুওয়াইহ এবং আল-বায়হাকী তাঁর ‘দালাইল’ গ্রন্থে ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: সূরা লুকমান মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে।আন-নাহহাস তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: সূরা লুকমান মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে, তবে এর তিনটি আয়াত মদীনায় অবতীর্ণ; সেগুলো হলো: আর পৃথিবীর সমস্ত গাছ যদি কলম হয়... (সূরা লুকমান, আয়াত: ২৭) থেকে পরবর্তী তিনটি আয়াত সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত।আন-নাসাঈ এবং ইবনে মাজাহ আল-বারা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমরা নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পিছনে যোহরের সালাত আদায় করতাম এবং তাঁর নিকট থেকে সূরা লুকমান ও সূরা আয-যারিয়াতের আয়াত একে একে শুনতে পেতাম।

ইবনে জারীর এবং ইবনুল মুনযির ইবনে আব্বাস (রাযি.) থেকে ক্বফ শব্দটির ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: এটি আল্লাহর নামসমূহের মধ্য হতে একটি নাম।ইবনে আবি হাতিম ইবনে আব্বাস (রাযি.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আল্লাহ তাআলা এই পৃথিবীর পেছনে একটি পরিবেষ্টনকারী সমুদ্র সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তার বাইরে একটি পাহাড় সৃষ্টি করেছেন যাকে ক্বফ বলা হয়, যার ওপর দুনিয়ার আকাশ ঝুলে আছে। এরপর তিনি সেই পাহাড়ের পেছনে এই পৃথিবীর মতো আরও সাতটি ভূমি সৃষ্টি করেছেন। এরপর তার পেছনে একটি পরিবেষ্টনকারী সমুদ্র সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তার পেছনে একটি পাহাড় সৃষ্টি করেছেন যাকে ক্বফ বলা হয় এবং তার ওপর দ্বিতীয় আকাশ ঝুলে আছে।

এভাবে তিনি সাতটি পৃথিবী, সাতটি সমুদ্র, সাতটি পাহাড় এবং সাতটি আকাশ গণনা করলেন। তিনি বলেন: আর এটিই হলো আল্লাহর বাণীর মর্ম— "আর সমুদ্র, তার সাথে আরও সাতটি সমুদ্র যুক্ত হলেও" (সূরা লুকমান, আয়াত: ২৭)।ইবনুল মুনযির, ইবনে মারদুওয়াইহ, আবুশ শাইখ এবং হাকেম আবদুল্লাহ ইবনে বুরাইদাহ (রাযি.) থেকে ক্বফ সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: এটি একটি পান্নার পাহাড় যা পৃথিবীকে পরিবেষ্টন করে আছে এবং যার ওপর আসমানের প্রান্তসমূহ অবস্থিত।ইবনে আবিদ দুনিয়া 'আল-উকুয়ুবাত' গ্রন্থে এবং আবুশ শাইখ 'আল-আজমাত' গ্রন্থে ইবনে আব্বাস (রাযি.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আল্লাহ তাআলা একটি পাহাড় সৃষ্টি করেছেন যাকে ক্বফ বলা হয়, যা জগতকে পরিবেষ্টন করে আছে।

এর শিকড়সমূহ সেই মহা-প্রস্তর পর্যন্ত বিস্তৃত যার ওপর পৃথিবী অবস্থিত। যখন আল্লাহ কোনো জনপদে ভূমিকম্প সৃষ্টি করতে চান, তখন তিনি সেই পাহাড়কে নির্দেশ দেন, ফলে সে ওই জনপদের নিকটবর্তী শিকড়টি নাড়িয়ে দেয়, যা সেখানে ভূমিকম্প ও কম্পন সৃষ্টি করে। এ কারণেই এক জনপদে কম্পন হয় কিন্তু তার পার্শ্ববর্তী জনপদে হয় না।আবদুর রাজ্জাক মুজাহিদ (রহ.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: ক্বফ হলো পৃথিবীকে পরিবেষ্টনকারী একটি পাহাড়।আবদুর রাজ্জাক এবং আবদ ইবনে হুমাইদ কাতাদাহ (রহ.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ক্বফ হলো কুরআনের নামসমূহের একটি নাম।আবদুর রাজ্জাক, আবদ ইবনে হুমাইদ এবং ইবনে আবি হাতিম ইবনে আব্বাস (রাযি.) থেকে ওয়াল-কুরআনিল মাজীদ সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন: এর অর্থ হলো মহাসম্মানিত।ইবনে আবি হাতিম ইবনে আব্বাস (রাযি.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: ওয়াল-কুরআনিল মাজীদ এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং উত্তম আর কিছুই নেই।ইবনুল মুনযির ইবনে জুরাইজ (রহ.) থেকে এটি সুদূরপরাহত প্রত্যাবর্তন আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: তারা পুনরুত্থানকে অস্বীকার করে বলেছিল— কে আমাদের পুনরায় ফিরিয়ে আনতে এবং জীবিত করতে সক্ষম?ইবনুল মুনযির এবং ইবনে আবি হাতিম ইবনে আব্বাস (রাযি.) থেকে বর্ণনা করেছেন: মাটি তাদের দেহ থেকে যা ক্ষয় করে তা আমার জানা আছে আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন: এর দ্বারা তাদের শরীর এবং যা কিছু পচে নিঃশেষ হয়ে যায় তাকে বোঝানো হয়েছে।