Ibrahim

ইবরাহীম: 24

14:24
টেক্সট কপি
14 ইবরাহীম Ibrahim · 52 আয়াত ابراهيم

মূল আরবি

أَلَمْ تَرَ كَيْفَ ضَرَبَ ٱللَّهُ مَثَلًا كَلِمَةً طَيِّبَةً كَشَجَرَةٍ طَيِّبَةٍ أَصْلُهَا ثَابِتٌ وَفَرْعُهَا فِى ٱلسَّمَآءِ

English Translations

Sahih International

Have you not considered how Allāh presents an example, [making] a good word like a good tree, whose root is firmly fixed and its branches [high] in the sky?

Muhsin Khan

See you not how Allah sets forth a parable? - A goodly word as a goodly tree, whose root is firmly fixed, and its branches (reach) to the sky (i.e. very high).

Taqi Usmani

Have you not seen how Allah has set forth a parable: A good word is like a good tree, having its root firm and its branches in the sky.

Abul Ala Maududi

Do you not see how Allah has given the example of a good word? It is like a good tree, whose root is firmly fixed, and whose branches reach the sky,

Pickthall

Seest thou not how Allah coineth a similitude: A goodly saying, as a goodly tree, its root set firm, its branches reaching into heaven,

Yusuf Ali

Seest thou not how Allah sets forth a parable? - A goodly word like a goodly tree, whose root is firmly fixed, and its branches (reach) to the heavens,- of its Lord. So Allah sets forth parables for men, in order that they may receive admonition.

বাংলা অনুবাদ

তাইসিরুল কুরআন

তুমি কি দেখ না কীভাবে আল্লাহ দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেন? উৎকৃষ্ট বাক্যের তুলনা উৎকৃষ্ট গাছের ন্যায় যার মূল সুদৃঢ়ভাবে স্থাপিত আর শাখা-প্রশাখা আকাশপানে বিস্তৃত।

রাওয়াই আল-বায়ান

তুমি কি দেখ না, আল্লাহ কীভাবে উপমা পেশ করেছেন? কালিমা তাইয়েবা, যা একটি ভাল বৃক্ষের ন্যায়, যার মূল সুস্থির আর শাখা-প্রশাখা আকাশে।

শাইখ মুজিবুর রহমান

তুমি কি লক্ষ্য করনা আল্লাহ কিভাবে উপমা দিয়ে থাকেন? সৎ বাক্যের তুলনা উৎকৃষ্ট বৃক্ষ যার মূল সুদৃঢ় এবং যার প্রশাখা উর্ধ্বে বিস্তৃত ।

ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

আপনি কি লক্ষ্য করেন না আল্লাহ্ কিভাবে উপমা দিয়ে থাকেন? সৎবাক্যের তুলনা উৎকৃষ্ট গাছ যার মূল সুদৃঢ় ও যার শাখা-প্রশাখা উপরে বিস্তৃত,

ফাতহুল মাজীদ

তুমি কি লক্ষ্য কর না, আল্লাহ কিভাবে উপমা পেশ করে থাকেন? সৎ বাক্যের তুলনা উৎকৃষ্ট বৃক্ষের ন্যায় যার মূল সুদৃঢ় ও যার শাখা-প্রশাখা আকাশপানে বিস্তৃত,

মুখতাসার

২৪. হে রাসূল! আপনি কি জানেন না আল্লাহ তা‘আলা কিভাবে কালিমায়ে তাওহীদ তথা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর দৃষ্টান্ত দিয়েছেন। তিনি সেটিকে পবিত্র গাছ তথা খেজুর গাছের সাথে তুলনা করেছেন। যার গোড়া জমিনের তলদেশে প্রোথিত আছে। পবিত্র জড়গুলোর মাধ্যমে সে পানি চুষে নিচ্ছে। আর তার শাখাগুলো আকাশের দিকে উঁচু হয়ে শিশিরে ভিজে ও পবিত্র বায়ু গ্রহণ করে।

তাফসীর

তাফসীর ইবনে কাসীর

২৪-২৬ নং আয়াতের তাফসীর হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, লা ইলালাহ ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া কেউ উপাস্য নেই) এর সাক্ষ্য দেয়াই বুঝানো হয়েছে কালেমায়ে তায়্যেবা দ্বারা। আর উত্তম ও পবিত্র বৃক্ষ দ্বারা মুমিনকে বুঝানো হয়েছে। এর মূল দৃঢ়, অর্থাৎ মুমিনের অন্তরে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ রয়েছে। এর শাখা রয়েছে ঊর্ধ্বে অর্থাৎ মুমিনের তাওহীদ বা একত্ববাদের কালেমার কারণে তার আমলগুলি আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়। আরো বহু মুফাসির হতে এটাই বর্ণিত হয়েছে যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে মুমিনের আমল, কথা ও সৎ কার্যাবলী। মুমিন খেজুর বৃক্ষের ন্যায়। প্রত্যেক দিন সকালে ও সন্ধ্যায় তার আমলগুলি আকাশে উঠে যায়।হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) কাছে একটি খেজুর গুচ্ছ আনয়ন করা হলে তিনি (আরবি) এই অংশটুকু পাঠ করেন এবং বলেনঃ “ওটা খেজুর বৃক্ষ।”হযরত ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমরা (একদা) রাসূলুল্লাহর (সঃ) কাছে ছিলাম।

তিনি আমাদেরকে বলেনঃ “ওটা কোন্ গাছ যা মুসলমানের মত, যার পাতা ঝরে পড়ে না, গ্রীষ্ম কালেও না শীতকালেও না; যা সব মওসুমেই ফল ধারণ করে থাকে?” হযরত আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি মনে মনে বললাম যে, বলে দিইঃ ওটা খেজুর গাছ। কিন্তু আমি দেখলাম যে, মজলিসে হযরত আবু বকর (রাঃ) , হযরত উমার (রাঃ) রয়েছেন। এবং তাঁরা নীরব আছেন, কাজেই আমিও নীরব থাকলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “ওটা হচ্ছে খেজুরের গাছ।” এখান থেকে বিদায় হয়ে আমি আমার পিতা হযরত উমারকে (রাঃ) এটা বললে তিনি বলেনঃ “হে আমার প্রিয় বৎস! যদি তুমি এই উত্তর দিয়ে দিতে তবে এটা আমার কাছে সমস্ত কিছু পেয়ে যাওয়ার অপেক্ষাও প্রিয় ও পছন্দনীয় ছিল।” (এ হাদিসটি ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেনঃ “আমি মদীনায় হযরত ইবনু উমারের (রাঃ) সঙ্গ লাভ করি।

আমি তাঁকে একটি মাত্র হাদীস ছাড়া কোন হাদীস রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণনা করতে শুনি নাই। তিনি বলেনঃ আমরা রাসূলুল্লাহর (সঃ) কাছে বসেছিলাম, এমন সময় তাঁর কাছে খেজুর গাছের ভিতরের মজ্জা আনয়ন করা হয়। তখন তিনি বলেনঃ “গাছের মধ্যে এমন এক গাছ রয়েছে যা মুসলমানের মত।” আমি তখন বলবার ইচ্ছা করলাম যে, আমিই হলাম কওমের মধ্যে সর্ব কনিষ্ঠ (তাই, আমি বললাম না)। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “ওটা হচ্ছে খেজুর বৃক্ষ।” অন্য রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, ঐ সময় উত্তরদাতাদের খেয়াল বন্য গাছ পালার দিকে গিয়েছিল।হযরত কাতাদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)!

সম্পদশালী লোকেরা তো মর্যাদায় খুব বেড়ে গেল!” যদি দুনিয়ার সমস্ত কিছু নিয়ে স্কুপ করে দেয়া হয় তবুও কি তা আকাশ পর্যন্ত পেঁৗছতে পারবে? (কখনই না) তোমাকে কি এমন আমলের কথা বলবো যার মূল দৃঢ় এবং শাখা গুলি আকাশে (চলে গেছে)?” সে জিজ্ঞেস করলোঃ “ওটা কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার, সুবহানাল্লাহ এবং আলহামদু লিল্লাহ প্রত্যেক ফরয নামাযের পর দশ বার করে পাঠ করো তা হলেই এটা হবে এমন আমল যার মূল মযবুত এবং শাখা আকাশে।” হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন ঐ পবিত্র গাছ জান্নাতে রয়েছে। আল্লাহ পাকের উক্তিঃ ওটা প্রত্যেক মওসূমে ফলদান করে অর্থাৎ-সকাল-সন্ধ্যায় প্রতি মাসে বা প্রতি দু’মাসে অথবা প্রতি ছ’মাসে বা প্রতি সাত মাসে অথবা প্রতি বছরে।

কিন্তু শব্দগুলির বাহ্যিক ভাবার্থ তো হচ্ছেঃ “মুমিনের দৃষ্টান্ত ঐ বৃক্ষের মত যার ফল সব সময় শীতে, গ্রীষ্মে, দিনে, রাতে নেমে থাকে। অনুরূপভাবে মু'মিনের নেক আমল দিনরাত সব সময় আকাশে উঠে থাকে।”আল্লাহ তাআলা মানুষের শিক্ষা, উপদেশ ও অনুধাবনের জন্যে দৃষ্টান্ত বর্ণনা করে থাকেন।অতঃপর আল্লাহ তাআলা মন্দ কালেমা অর্থাৎ কাফিরের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করছেন, যার কোন মূল নেই এবং যা দৃঢ় নয়। এর দৃষ্টান্ত দেয়া হয়েছে ‘হানযাল গাছের সাথে, যাকে ‘শারইয়ান' বলা হয়। হযরত আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ওটা হান্যাল গাছ। এই রিওয়াইয়াতটি মার’ রূপেও এসেছে।

এর মূল ভূ-পৃষ্ঠ হতে বিচ্ছিন্ন যার কোন স্থায়িত্ব নেই। অনুরূপভাবে কুফরী মূলহীন ও শাখাহীন। কাফিরের কোন ভাল কাজ উপরে উঠে না এবং তার থেকে কিছু কবুলও হয় না।

তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া

আপনি কি লক্ষ্য করেন না আল্লাহ্ কিভাবে উপমা দিয়ে থাকেন? সৎবাক্যের [১] তুলনা উৎকৃষ্ট গাছ যার মূল সুদৃঢ় ও যার শাখা-প্রশাখা উপরে বিস্তৃত [২],

[১] মূল আয়াতে (كَلِمَةً طَيِّبَةً) বলা হয়েছে। “কালেমা তাইয়েবা”র শাব্দিক অর্থ “পবিত্র কথা।” পারিভাষিক অর্থ হচ্ছে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এ কালেমা। [বাগভী] এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেনঃ

(كَلِمَةً طَيِّبَةً)

হলোঃ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর সাক্ষ্য দেয়া আর

(كَشَجَرَةٍ طَيِّبَةٍ)

হলো মু’মিন। [ইবন কাসীর] এরপর

(اَصْلُهَا ثَابِتٌ)

এর অর্থ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মু’মিনের অন্তরে সুপ্রতিষ্ঠিত।

(وَّفَرْعُهَا فِي السَّمَاۗءِ)

অর্থ, এ কালেমার কারণে এর মাধ্যমে মু’মিনের আমল আসমানে উত্থিত হয়। [ইবন কাসীর] আর এ তাফসীরই দাহহাক, সা’য়ীদ ইবনে জুবাইর, ইকরিমাহ এবং কাতাদা সহ অনেক মুফাসসেরীন থেকে বর্ণিত হয়েছে। যার সারকথা হলো, উত্তম বৃক্ষ হলো মু’মিন যার তুলনা খেজুর গাছের সাথে বিভিন্ন হাদীসে দেয়া হয়েছে। খেজুর গাছ শুধু ভাল কিছুই উপহার দেয়। তেমনি ঈমানদার, শুধু ভালকাজই তার কাছ থেকে আসমানে উঠতে থাকে। সে ভাল কথা, ভাল কাজ করেই যেতে থাকে আর তা দুনিয়াতে হলেও তার ফলাফল নির্ধারিত হয় আকাশে। [ইবন কাসীর]

[২] এ আয়াতে মু’মিন ও তার ক্রিয়াকর্মের উদাহরণে এমন একটি বৃক্ষের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যার কাণ্ড মজবুত ও সুউচ্চ এবং শিকড় মাটির গভীরে প্রেথিত। ভূগর্ভস্থ ঝর্ণা থেকে সেগুলো সিক্ত হয়। গভীর শিকড়ের কারণে বৃক্ষটি এত শক্ত যে, দমকা বাতাসে ভূমিসাৎ হয়ে যায় না। ভূপৃষ্ঠ থেকে উর্ধ্বে থাকার কারণে এর ফল ময়লা ও আবর্জনা থেকে মুক্ত। এ বৃক্ষের দ্বিতীয় গুণ এই যে, এর শাখা উচ্চতায় আকাশ পানে ধাবমান। তৃতীয় গুণ এই যে, এর ফল সবসময় সর্বাবস্থায় খাওয়া যায়। এ বৃক্ষটি কি এবং কোথায়, এ সম্পর্কে তাফসীরবিদগণের বিভিন্ন উক্তি বর্ণিত আছে। সর্বাধিক তথ্যনির্ভর উক্তি এই যে, এটি হচ্ছে খেজুর বৃক্ষ।

[আত-তাফসীরুস সহীহ] এর সমর্থন অভিজ্ঞতা এবং চাক্ষুষ দেখা দ্বারাও হয় এবং বিভিন্ন হাদীস থেকেও পাওয়া যায়। খেজুর বৃক্ষের কাণ্ড যে উচ্চ ও মজবুত, তা প্রত্যক্ষ বিষয়-সবাই জানে। আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেনঃ ‘কুরআনে উল্লেখিত পবিত্র বৃক্ষ হচ্ছে খেজুর বৃক্ষ এবং অপবিত্র বৃক্ষ হচ্ছে হানযল তথা মাকাল বৃক্ষ।’ [তিরমিযিঃ ৩১১৯, নাসায়ীঃ ২৮২]

আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেনঃ ‘একদিন আমরা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খেদমতে উপস্থিত ছিলাম। জনৈক ব্যক্তি তার কাছে খেজুর বৃক্ষের শাঁস নিয়ে এল। তখন তিনি সাহাবায়ে কেরামকে একটি প্রশ্ন করলেনঃ বৃক্ষসমূহের মধ্যে একটি বৃক্ষ হচ্ছে মর্দে-মু’মিনের দৃষ্টান্ত। (বুখারীর রেওয়ায়েত মতে এ স্থলে তিনি আরো বললেন যে, কোন ঋতুতেই এ বৃক্ষের পাতা ঝরে না।) বল, এ কোন বৃক্ষ? ইবনে উমর বললেনঃ আমার মন চাইল যে, বলে দেই- খেজুর বৃক্ষ। কিন্তু মজলিশে আবু বকর, উমর ও অন্যান্য প্রধান প্রধান সাহাবী উপস্থিত ছিলেন। তাদেরকে চুপ দেখে আমি বলার সাহস পেলাম না। এরপর স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ এ হচ্ছে খেজুর বৃক্ষ।’ [বুখারীঃ ৭২, ১৩১, ২২০৯, ৪৬৯৮, মুসলিমঃ ২৮১১, মুসনাদে আহমাদঃ ২/১২, ২/৬১]

এ বৃক্ষ দ্বারা মু’মিনের দৃষ্টান্ত দেয়ার কারণ এই যে, কালেমায়ে তাইয়্যেবার মধ্যে ঈমান হচ্ছে মজবুত ও অনড় শিকড়বিশিষ্ট, দুনিয়ার বিপদাপদ একে টলাতে পারে না। সাহাবী ও তাবেয়ী; বরং প্রতি যুগের খাঁটি মুসলিমদের দৃষ্টান্ত বিরল নয়, যারা ঈমানের মোকাবেলায় জান, মাল ও কোন কিছুর পরওয়া করেনি। দ্বিতীয় কারণ তাদের পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা। তারা দুনিয়ার নোংরামী থেকে সবসময় দূরে সরে থাকেন যেমন ভূপৃষ্ঠের ময়লা-আবর্জনা উঁচু বৃক্ষকে স্পর্শ করতে পারে না। এ দু’টি গুণ হচ্ছে (اَصْلُهَا ثَابِتٌ)-এর দৃষ্টান্ত। তৃতীয় কারণ এই যে, খেজুর বৃক্ষের শাখা যেমন আকাশের দিকে উচ্চে ধাবমান, মু’মিনের ঈমানের ফলাফলও অর্থাৎ সৎকর্মও তেমনি আকাশের দিকে উত্থিত হয়। কুরআন বলেঃ

(اِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ)

[সূরা ফাতিরঃ ১০] -অর্থাৎ পবিত্র বাক্যাবলী আল্লাহ্ তা’আলার যেসব যিকর, তাসবীহ্-তাহলীল, কুরআন তেলাওয়াত ইত্যাদি করে, সেগুলো সকাল-বিকাল আল্লাহ্‌র দরবারে পৌঁছতে থাকে। চতুর্থ কারণ এই যে, খেজুর বৃক্ষের ফল যেমন সব সময় সর্বাবস্থায় এবং সব ঋতুতে দিবারাত্র খাওয়া হয়, মু’মিনের সৎকর্মও তেমনি সবসময়, সর্বাবস্থায় এবং সব ঋতুতে অব্যাহত রয়েছে এবং খেজুর বৃক্ষের প্রত্যেকটি অংশই যেমন উপকারী, তেমনি মু’মিনের প্রত্যেক কথা ও কাজ, ওঠাবসা এবং এসবের প্রতিক্রিয়া সমগ্র বিশ্বের জন্য উপকারী ও ফলদায়ক। তবে শর্ত এই যে, আল্লাহ্ ও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শিক্ষা অনুযায়ী হতে হবে। [দেখুন, ইবনুল কাইয়্যেম, ই’লামুল মুওয়াক্কে’য়ীন, ১/১৩৩; আল-বাদর, তাআম্মুলাত ফী মুমাসালাতিল মু’মিন বিন নাখলাহ] উপরোক্ত বক্তব্য থেকে জানা গেল যে,

(تُؤْتِيْٓ اُكُلَهَا كُلَّ حِيْنٍ)

বাক্যে (اُكُلٌ) শব্দের অর্থ হচ্ছে ফল ও খাদ্যোপযোগী বস্তু এবং (حين) শব্দের অর্থ প্রতিমুহূর্ত। এটিই সবচেয়ে প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত। [তাবারী] যদিও এখানে অন্যান্য মতও রয়েছে। [দেখুন, তাবারী; বাগভী; কুরতুবী; ইবন কাসীর]

তাফসীর আল-কুরতুবী

[সূরা ইব্রাহিম (১৪): আয়াত ২৪ থেকে ২৫] পূর্ণ পৃষ্ঠা

অর্থাৎ, আনুগত্যের ক্ষেত্রে তোমরা আমাকে মহান আল্লাহর সাথে যে শরীক সাব্যস্ত করেছিলে, আমি তা অস্বীকার করলাম। এখানে 'লাম্মা' শব্দটি ক্রিয়ামূলের (মাসদার) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ইবনে জুরাইজ (১) বলেন: তোমরা দুনিয়াতে মহান আল্লাহর সাথে যে শির্ক করতে, আজ আমি তা অস্বীকার করলাম। কাতাদাহ বলেন: নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর অবাধ্যতা করেছি। সাওরী বলেন: দুনিয়াতে তোমরা যে আমার আনুগত্য করতে, আমি তা অস্বীকার করলাম। (নিশ্চয়ই যালিমদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি)। এই আয়াতগুলোতে কাদারিয়া, মুতাযিলা, ইমামিয়া এবং যারা তাদের পথে চলে, তাদের মতবাদের খণ্ডন রয়েছে।

অনুসরণীয় ব্যক্তিদের উক্তি—'যদি আল্লাহ আমাদের পথ দেখাতেন তবে আমরাও তোমাদের পথ দেখাতাম' এবং ইবলিসের উক্তি—'নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সত্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন'—এর দিকে লক্ষ্য করুন; তারা আগুনের অতল গহ্বরে থেকেও কীভাবে মহান আল্লাহর গুণাবলির সত্যতা স্বীকার করেছে, যেমনটি তিনি অন্য স্থানে বলেছেন: 'যখনই তাতে কোনো দলকে নিক্ষেপ করা হবে, তখন তার রক্ষীরা তাদের জিজ্ঞাসা করবে' [আল-মুলক: ৮] থেকে তাঁর বাণী: 'অতঃপর তারা তাদের অপরাধ স্বীকার করবে' (২) [আল-মুলক: ১১] পর্যন্ত। আর লেলিহান আগুনের স্তরে সত্যের এই স্বীকারোক্তি কোনো উপকারে আসবে না; বরং স্বীকারোক্তি কেবল দুনিয়াতেই ব্যক্তির উপকারে আসে।

মহান আল্লাহ বলেন: 'আর অন্য কিছু লোক আছে যারা তাদের অপরাধ স্বীকার করেছে, তারা নেক আমল ও বদ আমল মিশ্রিত করেছে; আশা করা যায় আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করবেন' (৩) [আত-তাওবাহ: ১০২]। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে 'আশা করা যায়' (আসা) শব্দটি নিশ্চিতভাবে ঘটার অর্থ প্রদান করে (৪)। ‌‌[সূরা ইব্রাহিম (১৪): আয়াত ২৩]আর যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদের এমন জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে যার পাদদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত, সেখানে তারা তাদের পালনকর্তার অনুমতিক্রমে চিরকাল অবস্থান করবে; সেখানে তাদের অভিবাদন হবে 'সালাম' (২৩)।মহান আল্লাহর বাণী: (আর যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদের জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে) অর্থাৎ জান্নাতসমূহের অভ্যন্তরে; কারণ 'দাখালতু' (আমি প্রবেশ করলাম) শব্দটি সরাসরি কর্ম গ্রহণ করে না, ঠিক যেমন তার বিপরীত শব্দ 'খারাজতু' (আমি বের হলাম) সরাসরি কর্ম গ্রহণ করে না।

আর এর ওপর ভিত্তি করে অন্য শব্দকে তুলনা করা যাবে না—এ কথা মাহদাবী বলেছেন। মহান আল্লাহ যখন জাহান্নামীদের অবস্থা বর্ণনা করলেন, তখন জান্নাতীদের অবস্থাও বর্ণনা করলেন। জমহুর বা সংখ্যাগুরু পাঠকদের কিরাত হলো 'উদখিলা' (প্রবেশ করানো হবে), যা কর্মবাচ্যের ক্রিয়া। আর হাসান (বসরী) 'ওয়া উদখিলা' পাঠ করেছেন ভবিষ্যৎকাল এবং প্রারম্ভসূচক হিসেবে। (তাদের পালনকর্তার অনুমতিক্রমে) অর্থাৎ তাঁর নির্দেশে। কেউ কেউ বলেছেন: তাঁর ইচ্ছা ও সহজীকরণের মাধ্যমে। তিনি 'তাদের পালনকর্তার অনুমতি' বলেছেন এবং 'আমার অনুমতি' বলেননি—মহিমা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশের জন্য।

(সেখানে তাদের অভিবাদন হবে সালাম) এটি সূরা ইউনুসে (৫) ইতিপূর্বে আলোচিত হয়েছে, আর সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। ‌‌[সূরা ইব্রাহিম (১৪): আয়াত ২৪ থেকে ২৫]আপনি কি লক্ষ্য করেননি আল্লাহ কীভাবে উপমা পেশ করেছেন? একটি পবিত্র বাক্য একটি পবিত্র বৃক্ষের ন্যায়, যার মূল সুদৃঢ় এবং যার শাখা আকাশে বিস্তৃত (২৪)। সেটি তার পালনকর্তার অনুমতিক্রমে প্রতি নিয়ত ফল দান করে। আর আল্লাহ মানুষের জন্য উপমা পেশ করেন যাতে তারা শিক্ষা গ্রহণ করে (২৫)।(১). পাণ্ডুলিপি ভেদে ইবনে বাজর বা ইবনে জুর।(২). দ্রষ্টব্য: ১৮শ খণ্ড, ২১২ পৃষ্ঠা।(৩). দ্রষ্টব্য: ৮ম খণ্ড, ২৪১ পৃষ্ঠা এবং ৩১৩ পৃষ্ঠা।(৪).

অর্থাৎ যা আল্লাহর পক্ষ থেকে নিশ্চিতভাবে বাস্তবায়িত হবে।(৫). দ্রষ্টব্য: ৮ম খণ্ড, ২৪১ পৃষ্ঠা এবং ৩১৩ পৃষ্ঠা।