Ibrahim
ইবরাহীম: 5
মূল আরবি
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا مُوسَىٰ بِـَٔايَـٰتِنَآ أَنْ أَخْرِجْ قَوْمَكَ مِنَ ٱلظُّلُمَـٰتِ إِلَى ٱلنُّورِ وَذَكِّرْهُم بِأَيَّىٰمِ ٱللَّهِ ۚ إِنَّ فِى ذَٰلِكَ لَـَٔايَـٰتٍ لِّكُلِّ صَبَّارٍ شَكُورٍ
English Translations
And We certainly sent Moses with Our signs, [saying], "Bring out your people from darknesses into the light and remind them of the days of Allāh." Indeed in that are signs for everyone patient and grateful.
And indeed We sent Musa (Moses) with Our Ayat (signs, proofs, and evidences) (saying): "Bring out your people from darkness into light, and make them remember the annals of Allah. Truly, therein are evidences, proofs and signs for every patient, thankful (person)."
Surely, We sent Mūsā with Our signs saying to him, “Bring your people out of (all sorts of) darkness into the light, and remind them of the Days of Allah. Surely, there are signs therein for every one who observes patience and gratitude.
We indeed sent Moses with Our Signs, saying: "Lead your people out of all kinds of darkness into light, and admonish them by narrating to them anecdotes from the Days of Allah." Verily in it there are great Signs for everyone who is patient and gives thanks (to Allah).
We verily sent Moses with Our revelations, saying: Bring thy people forth from darkness unto light. And remind them of the days of Allah. Lo! therein are revelations for each steadfast, thankful (heart).
We sent Moses with Our signs (and the command). "Bring out thy people from the depths of darkness into light, and teach them to remember the Days of Allah." Verily in this there are Signs for such as are firmly patient and constant,- grateful and appreciative.
বাংলা অনুবাদ
আর অবশ্যই আমি মূসাকে আমার নিদর্শনসমূহ দিয়ে পাঠিয়েছিলাম আর বলেছিলাম, তোমার জাতিকে অন্ধকার থেকে আলোতে বের করে আন, আর তাদেরকে আল্লাহর হুকুমে ঘটিত অতীতের ঘটনাবলী দিয়ে উপদেশ দাও। এতে প্রত্যেক পরম সহিষ্ণু ও পরম কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য অবশ্যই নিদর্শনসমূহ রয়েছে।
আর আমি মূসাকে আমার আয়াতসমূহ দিয়ে পাঠিয়েছি যে, ‘তুমি তোমার কওমকে অন্ধকার হতে আলোর দিকে বের করে আন এবং আল্লাহর দিবসসমূহ* তাদের স্মরণ করিয়ে দাও’। নিশ্চয় এতে প্রতিটি ধৈর্যশীল, কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য রয়েছে অসংখ্য নিদর্শন। * দিবসসমূহ দ্বারা উদ্দেশ্য ইতঃপূর্বের ঐতিহাসিক ঘটনাসমূহ।
মূসাকে আমি আমার নিদর্শনসহ প্রেরণ করেছিলাম এবং বলেছিলামঃ তোমার সম্প্রদায়কে অন্ধকার হতে আলোতে আনয়ন কর, এবং তাদেরকে আল্লাহর দিনগুলি দ্বারা উপদেশ দাও, এতেতো নিদর্শন রয়েছে পরম ধৈর্যশীল ও পরম কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য।
আর অবশ্যই আমরা মূসাকে আমাদের নিদর্শনসহ পাঠিয়েছিলাম এবং বলেছিলাম, ‘আপনার সম্প্রদায়কে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসুন এবং তাদেরকে আল্লাহ্র দিনগুলোর দ্বারা উপদেশ দিন।’ এতে তো নিদর্শন রয়েছে প্রত্যেক পরম ধৈর্য্যশীল ও পরম কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য।
মূসাকে আমি আমার নিদর্শনসহ প্রেরণ করেছিলাম যে, ‘তোমার সম্প্রদায়কে অন্ধকার হতে আলোতে আনয়ন কর, এবং তাদেরকে আল্লাহর (নেয়ামত ও শাস্তির) দিবসগুলোর দ্বারা উপদেশ দাও।’ এতে তো নিদর্শন রয়েছে প্রত্যেক পরম ধৈর্যশীল ও পরম কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য।
৫. আমি মূসা (আলাইহিস-সালাম) কে রাসূল হিসেবে পাঠিয়ে তাঁর সত্যতা অর্থাৎ তিনি যে সত্যিই তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ থেকে প্রেরিত একজন রাসূল তা বুঝায় এমন নিদর্শনাবলী দিয়ে তাঁকে শক্তিশালী করেছি। আমি তাঁকে আদেশ করেছি তাঁর জাতিকে কুফরি ও মূর্খতা থেকে ঈমান ও জ্ঞানের দিকে বের করে আনার জন্য। আমি তাঁকে আরো আদেশ করেছি আল্লাহর নিয়ামতপূর্ণ দিনগুলোকে তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য। যে দিনগুলোতে তিনি তাদেরকে নিয়ামত দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এ দিনগুলোতে আল্লাহর তাওহীদ ও তাঁর অপার শক্তি এবং মু’মিনদের উপর তাঁর নিয়ামতের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। আল্লাহর আনুগত্যের উপর ধৈর্যশীল এবং সর্বদা তাঁর নিয়ামত ও তাঁর দানের প্রতি কৃতজ্ঞরাই এ দিয়ে লাভবান হতে পারে।
তাফসীর
আল্লাহ তাআলা বলছেনঃ হে মুহাম্মদ (সঃ)! যেমন আমি তোমাকে আমার রাসূল করে পাঠিয়েছি এবং তোমার উপর আমার কিতাব নাযিল করেছি, উদ্দেশ্য এই যে, তুমি লোকদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে নিয়ে আসবে, অনুরূপ ভাবে আমি মূসাকে (আঃ) রাসুল করে বাণী ইসরাঈলের নিকট পাঠিয়েছিলাম। তাকে অনেক নিদর্শনও দিয়েছিলাম, যার বর্ণনা (আরবি) (১৭:১০১) এই আয়াতে রয়েছে, তাকেই ঐ একই নির্দেশ দিয়েছিলামঃ লোকদেরকে ভাল কাজের দিকে আহবান করো। তাদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে এবং অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতা থেকে সরিয়ে হিদায়াতের দিকে নিয়ে এসো। তাদেরকে (বানী ইসরাঈলকে) আল্লাহর ইহসান সমূহের কথাস্মরণ করিয়ে দাও।
সেগুলি হচ্ছেঃ তিনি তাদেরকে ফিরাউনের ন্যায় যালিমের গোলামী থেকে মুক্ত করেছেন, তাদের জন্যে নদীকে খাড়া করে দিয়েছেন, মেঘ দ্বারা তাদের উপর ছায়া করেছেন, ‘মান্না’ ও ‘সালওয়া’ নামক খাবার তাদের উপর অবতীর্ণ করেছেন ইত্যাদি বহু নিয়ামত তাদেরকে দান করেছেন। এটা মুজাহিদ (রঃ) কাতাদা (রঃ) প্রভৃতি গুরুজন বর্ণনা করেছেন।এ সম্পর্কে একটি ‘মরিফু হাদীস এসেছে যা ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বলের (রঃ) পুত্র আবদুল্লাহ (রঃ) তাঁর পিতার মুসনাদে হযরত উবাই ইবনু কাব (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) (আরবি) এর তাফসীর করেছেন (আরবি) অর্থাৎ তাদেরকে আল্লাহর নিয়ামত সমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দাও।' এ হাদীসটি ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) এবং ইমাম ইবনু আবিহাতিম (রঃ) মুহাম্মদ ইবন আব্বানের (রঃ) হাদীস হতে বর্ণনা করেছেন।
এটাই অধিকতর সঠিক তাফসীর। আল্লাহ তাআলার উক্তিঃ এতে তো নিদর্শন রয়েছে পরম ধৈর্যশীল ও পরম কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্যে। অর্থাৎ আমি আমার বান্দা বানী ইসরাঈলের উপর যে ইহসান করেছি, তাদেরকে ফিরাউন ও তার কঠিন লাঞ্ছনা জনক শাস্তি থেকে মুক্তি দিয়েছি এতে প্রত্যেক ধৈর্যশীল ও কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্যে শিক্ষা ও উপদেশ রয়েছে, যারা বিপদের সময় ধৈর্য ধারণ করে এবং সুখের সময় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। যেমন কাতাদা (রঃ) বলেন, উত্তম বান্দা হচ্ছে সেই বান্দা, যে বিপদের (পরীক্ষার সময় ধৈর্য ধারণ করে এবং সুখের সময় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।অনুরূপ ভাবে সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মুমিনের প্রত্যেক কাজই বিস্ময়কর।
আল্লাহ তার জন্যে যে ফায়সালা করেন। সেটাই তার জন্যে কল্যাণকর হয়। যখন তার উপর কোন বিপদ পৌছে তখন সে ধৈর্য ধারণ করে এবং ওটাই তার পক্ষে হয় কল্যাণকর। পক্ষান্তরে যদি সে সুখ শান্তি লাভ করে তখন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং ওটার পরিণামও তার জন্যে কল্যাণকরই হয়ে থাকে।”
আর অবশ্যই আমরা মূসাকে আমাদের নিদর্শনসহ পাঠিয়েছিলাম [১] এবং বলেছিলাম, ‘আপনার সম্প্রদায়কে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসুন [২], এবং তাদেরকে আল্লাহ্র দিনগুলোর দ্বারা উপদেশ দিন [৩]।’ এতে তো নিদর্শন [৪] রয়েছে প্রত্যেক পরম ধৈর্য্যশীল ও পরম কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য [৫]।
[১] এ আয়াতে বলা হয়েছেঃ আমি মূসা ‘আলাইহিস্ সালাম-কে আয়াত দিয়ে প্রেরণ করেছি, যাতে তিনি স্বজাতিকে কুফর ও গোনাহর অন্ধকার থেকে দাওয়াত দিয়ে ঈমান ও আনুগত্যের আলোতে নিয়ে আসে। [বাগভী] এখানে আয়াত শব্দের অর্থ তাওরাতের আয়াতও হতে পারে। কারণ, সেগুলো নাযিল করার উদ্দেশ্যই ছিল সত্যের আলো ছড়ানো। আয়াতের অন্য অর্থ মু’জিযাও হয়। এখানে এ অর্থও উদ্দিষ্ট হতে পারে।
[ফাতহুল কাদীর] মুজাহিদ বলেন, এখানে নয়টি বিশেষ নিদর্শন উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। [ইবন কাসীর] মূসা ‘আলাইহিস্ সালাম-কে আল্লাহ্ তা’আলা ন’টি মু’জিযা বিশেষভাবে দান করেন।
[২] এ আয়াতে ‘কওম’ তথা ‘সম্প্রদায়’ শব্দ ব্যবহার করে নিজ কওমকে অন্ধকার থেকে আলোতে আনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়বস্তুটিই যখন আলোচ্য সূরার প্রথম আয়াতে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে সম্বোধন করে বর্ণনা করা হয়েছে, তখন সেখানে ‘কওম’ শব্দের পরিবর্তে (ناس) (মানুষ) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। বলা হয়েছেঃ
(لِتُخْرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمٰتِ اِلَي النُّوْرِ)
এতে ইঙ্গিত আছে যে, মূসা ‘আলাইহিস্ সালাম শুধু বনী ইসরাঈল ও মিসরীয় জাতির প্রতি নবীরূপে প্রেরিত হয়েছিলেন, অপরদিকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওয়াত সমগ্র মানুষের জন্য।
[৩] এরপর আল্লাহ্ তা’আলা মূসা ‘আলাইহিস্ সালাম-কে নির্দেশ দেন যে, স্বজাতিকে ‘আইয়্যামুল্লাহ্’ স্মরণ করান। কিন্তু আইয়্যামুল্লাহ্ কি? (أيام) শব্দটি (يوم) এর বহুবচন, এর অর্থ দিন। (اَيَّامَ اللّٰهِ) শব্দটি দু’টি অর্থে ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন শাস্তির দিনগুলো, যেমন কাওমে নূহ, আদ ও সামূদের উপর আযাব নাযিল হওয়ার ঘটনাবলী। [ফাতহুল কাদীর]
এসব ঘটনায় বিরাট জাতিসমূহের ভাগ্য ওলট-পালট হয়ে গেছে এবং তারা পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় ‘আইয়্যামুল্লাহ্’ স্মরণ করানোর উদ্দেশ্য হবে, এসব জাতির কুফরের অশুভ পরিণতির ভয় প্রদর্শন করা এবং হুঁশিয়ার করা। ‘আইয়্যামুল্লাহ্’র অপর অর্থ আল্লাহ্ তা’আলার নেয়ামত ও অনুগ্রহও হয়। এ জাতির উপর আল্লাহ্র যেসব নেয়ামত দিবারাত্র বর্ষিত হয় এবং যেসব বিশেষ নেয়ামত তাদেরকে দান করা হয়েছে, সেগুলো স্মরণ করিয়ে আল্লাহ্র আনুগত্য ও তাওহীদের দিকে আহ্বান করুন; উদাহরণতঃ তীহ্ উপত্যকায় তাদের মাথার উপর মেঘের ছায়া, আহারের জন্য মান্না ও সালওয়ার অবতরণ, পানীয় জলের প্রয়োজনে পাথর থেকে ঝর্ণা প্রবাহিত হওয়া ইত্যাদি। [ইবন কাসীর]
এগুলো স্মরণ করানোর লক্ষ্য হবে এই যে, ভাল মানুষকে যখন কোন অনুগ্রহদাতার অনুগ্রহ স্মরণ করানো হয়, তখন সে বিরোধিতা ও অবাধ্যতা করতে লজ্জা বোধ করে। এখানে দু’টি অর্থই উদ্দেশ্য হতে পারে। বিশেষ করে হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “একদিন মূসা আলাইহিসসালাম তার কাওমকে ‘আইয়্যামুল্লাহ্’ সম্পর্কে নসীহত করছিলেন... আর ‘আইয়্যামুল্লাহ্’ হলো আল্লাহ্র নেয়ামত ও বিপদাপদ” [মুসলিমঃ ২৩৮০]
[৪] এখানে (اٰيٰت)-এর অর্থ নিদর্শন ও প্রমাণাদি। অর্থাৎ এসব ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্যে এমন সব নির্দশন রয়েছে যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি আল্লাহ্র একত্ববাদ ও তাঁর ক্ষমতাবান হওয়ার সত্যতা ও নির্ভুলতার প্রমাণ পেতে পারে। [ফাতহুল কাদীর]
এ সংগে এ সত্যের পক্ষেও অসংখ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারে যে, প্রতিদানের বিধান পুরোপুরি হক এবং তার দাবী পূরণ করার জন্য অন্য একটি জগত অর্থাৎ আখেরাতের জগত অপরিহার্য।
[৫] আয়াতে বর্ণিত (صبار) শব্দটি (صبر) থেকে (مبالغة) এর পদ। এর অর্থ অধিক সবরকারী। (شكور) শব্দটি (شكر) থেকে (مبالغة) এর পদ। এর অর্থ অধিক কৃতজ্ঞ। [ফাতহুল কাদীর] বাক্যের অর্থ এই যে, অবিশ্বাসীদের শাস্তি ও আযাব সম্পর্কিত হোক অথবা আল্লাহ্র নেয়ামত ও অনুগ্রহ সম্পর্কিত হোক, উভয় অবস্থাতে অতীত ঘটনাবলীতে আল্লাহ্র অপার শক্তি ও অসীম রহস্যের বিরাট শক্তি বিদ্যমান ঐ ব্যক্তির জন্য, যে অত্যন্ত সবরকারী এবং অধিক শোকরকারী। সংক্ষেপে শোকর ও কৃতজ্ঞতার স্বরূপ এই যে, আল্লাহ্ প্রদত্ত নেয়ামতকে তাঁর অবাধ্যতা এবং হারাম ও অবৈধ কাজে ব্যয় না করা, মুখেও আল্লাহ্ তা’আলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং স্বীয় কাজকর্মকেও তাঁর ইচ্ছার অনুগামী করা।
সবরের সারমর্ম হচ্ছে স্বভাব বিরুদ্ধ ব্যাপারাদিতে অস্থির না হওয়া, কথায় ও কাজে অকৃতজ্ঞতার প্রকাশ থেকে বেঁচে থাকা এবং দুনিয়াতেও আল্লাহ্র রহমত আশা করা, আর আখেরাতে উত্তম পুরস্কার প্রাপ্তিতে বিশ্বাস রাখা। [দেখুন, ইবনুল কাইয়্যেম, উদ্দাতুস সাবেরীন]।
[سورة إبراهيم (14): آية 5] পূর্ণ পৃষ্ঠা
"যেন তিনি সুস্পষ্ট বর্ণনা করেন" কারণ রাসুল প্রেরণ করা হয়েছে স্পষ্ট বর্ণনার জন্য, পথভ্রষ্ট করার জন্য নয়। "তিনি পথভ্রষ্ট করেন" শব্দটিতে জবর হওয়াও বৈধ, কারণ রাসুল প্রেরণ পথভ্রষ্টতার কারণ হয়েছে। সুতরাং এটি আল্লাহর এই বাণীর মতো হবে: "যাতে তিনি তাদের শত্রু ও দুঃখের কারণ হন" [আল-কাসাস: ৮]। আর রাসুল প্রেরণ পথভ্রষ্টতার কারণ হওয়ার অর্থ হলো, যখন তিনি তাদের নিকট আসলেন তখন তারা কুফরি করল, ফলে মনে হলো যেন তিনি তাদের কুফরির কারণ। (তিনি মহাপরাক্রমশালী) এর অর্থ পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে। [সুরা ইবরাহিম (১৪): আয়াত ৫]এবং নিশ্চয়ই আমি মুসাকে আমার নিদর্শনাবলি দিয়ে পাঠিয়েছিলাম (এই নির্দেশ দিয়ে) যে, তোমার কওমকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনো এবং তাদেরকে আল্লাহর দিনগুলোর মাধ্যমে উপদেশ দাও।
নিশ্চয় এতে প্রত্যেক চরম ধৈর্যশীল ও অতিশয় কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে। (৫)মহান আল্লাহর বাণী: (এবং নিশ্চয়ই আমি মুসাকে আমার নিদর্শনাবলি দিয়ে পাঠিয়েছিলাম) অর্থাৎ আমার দলিল ও প্রমাণসমূহ দিয়ে, তথা তাঁর সত্যতার প্রমাণ বহনকারী মুজিজাসমূহ দিয়ে। মুজাহিদ (রহ.) বলেন: তা হলো নয়টি নিদর্শন। (তোমার কওমকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনো) এর সদৃশ হলো সুরার শুরুতে আমাদের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি মহান আল্লাহর বাণী: "যাতে তুমি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনো।" এখানে "আন" শব্দটি "আই" বা ব্যাখ্যামূলক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, যেমন মহান আল্লাহর বাণী: "আর তাদের প্রধানরা এই বলে প্রস্থান করল যে, তোমরা চলে যাও" [সোয়াদ: ৬] অর্থাৎ চলে যাও।
মহান আল্লাহর বাণী: (এবং তাদেরকে আল্লাহর দিনগুলোর মাধ্যমে উপদেশ দাও) অর্থাৎ তুমি তাদের এমন কথা বলো যার দ্বারা তারা মহান আল্লাহর দিনগুলোকে স্মরণ করে। ইবনে আব্বাস, মুজাহিদ ও কাতাদা (রহ.) বলেন: এর অর্থ তাদের ওপর আল্লাহর নেয়ামতসমূহ। উবাই বিন কাব (রা.) এ কথা বলেছেন এবং একে মারফু হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ ফেরাউন থেকে মুক্তি লাভ এবং তিহ ময়দানসহ অন্যান্য যে সকল নেয়ামত আল্লাহ তাদের দান করেছেন। আর নেয়ামতসমূহকে কখনও 'দিনসমূহ' বলা হয়। এর উদাহরণ আমর ইবনে কুলসুমের পঙক্তি:আমাদের এমন সব উজ্জ্বল ও দীর্ঘ দিন রয়েছে(১). ১৩ খণ্ড, ২৫২ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।(২).
নয়টি নিদর্শন হলো: প্লাবন, পঙ্গপাল, উকুন, ব্যাঙ, রক্ত, লাঠি, তাঁর হাত, দুর্ভিক্ষ এবং ফল-ফসলের ঘাটতি।(৩). ১৫ খণ্ড, ১৫১ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।(৪). চরণটি তাঁর মুআল্লাকা থেকে নেওয়া এবং পূর্ণাঙ্গ রূপ হলো:তাতে আমরা বাদশাহর অবাধ্যতা করেছি আমাদের আনুগত্য স্বীকার করানোর ক্ষেত্রে কখনও দিনগুলোকে 'উজ্জ্বল' বলা হতে পারে বাদশাহর ওপর তাদের প্রভাব এবং তাঁর থেকে বিমুখ থাকার কারণে। ফলে তাদের সেই দিনগুলো ছিল তাদের জন্য উজ্জ্বল এবং তাদের শত্রুদের জন্য দীর্ঘ। এ হিসেবে চরণে 'দিনসমূহ' শব্দটি 'নেয়ামত' অর্থে হওয়ার কোনো দলিল থাকে না। আর 'দিনসমূহ' শব্দটি পূর্বের চরণের শব্দের ওপর সংযুক্ত (আতফ) হওয়ার কারণে মাজরুর হয়েছে।
আর 'ওয়াও' অক্ষরটি 'রুব্বা' এর স্থলাভিষিক্ত হওয়াও সম্ভব।
তারা উভয়ে পরিশ্রান্ত ও ক্ষুধার্ত হয়ে পড়েছিলেন, তাই তারা জনপদের অধিবাসীদের কাছে খাবার চাইলেন, কিন্তু তারা তাঁদের মেহমানদারি করতে অস্বীকার করল। অতঃপর সেখানে তিনি একটি প্রাচীর হেলে থাকতে দেখলেন; তখন খিজির সেটি নিজ হাত দিয়ে স্পর্শ করলেন এবং তা সোজা হয়ে গেল। তিনি বললেন: আপনি চাইলে এর বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করতে পারতেন।
মুসা তাঁকে বললেন: আপনি আমাদের ক্লান্তি ও অভাব দেখছেন; যদি আপনি তাদের কাছে পারিশ্রমিক চাইতেন তবে তারা তা দিত এবং তা দিয়ে আমরা রাতের খাবার খেতে পারতাম। তিনি বললেন: এটাই আমার ও তোমার মধ্যে বিচ্ছেদ।
বর্ণনাকারী বলেন: তখন মুসা তাঁর কাপড় ধরে বললেন: আমাদের সাহচর্যের দোহাই দিয়ে বলছি, আপনি যা করেছেন তার ব্যাখ্যা আমাকে না জানানো পর্যন্ত আপনাকে ছাড়ব না।
তিনি বললেন: নৌকাটির ব্যাপার এই যে, সেটি ছিল কয়েকজন দরিদ্র ব্যক্তির, যারা সমুদ্রে কাজ করত...
(আয়াতাংশ) আমি সেটিকে ত্রুটিযুক্ত করার জন্য ছিদ্র করে দিয়েছিলাম যাতে তা ছিনতাই না হয়। পরবর্তীতে মালিকপক্ষ সেটি মেরামত করে নিয়েছিল এবং এর মাধ্যমে নিজেদের রক্ষা করেছিল। আর কিশোরটির বিষয়টি হলো—আল্লাহ তাকে কাফির হিসেবে নির্ধারণ করেছিলেন এবং তার পিতা-মাতা ছিলেন মুমিন; সে বেঁচে থাকলে তার অবাধ্যতা ও কুফুরির মাধ্যমে তাদের অতিষ্ঠ করে তুলত। {তাই আমরা চাইলাম যেন তাদের প্রতিপালক তার পরিবর্তে তাদের এমন এক সন্তান দান করেন যে হবে পবিত্রতায় শ্রেষ্ঠ এবং দয়া-মায়ায় অধিকতর ঘনিষ্ঠ।
আর প্রাচীরটির ব্যাপার এই যে, সেটি ছিল শহরের দুইজন এতিম বালকের...} (আয়াতাংশ) ইবনে জারীর এবং ইবনে আবি হাতিম আওফির সূত্রে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: যখন মুসা ও তাঁর সম্প্রদায় মিশরের ওপর বিজয়ী হলেন, তখন তিনি তাঁর কওমকে মিশরে পুনর্বাসিত করলেন। যখন তারা সেখানে স্থিতি লাভ করল, তখন আল্লাহ অবতীর্ণ করলেন: (এবং তাদের আল্লাহর দিনগুলো স্মরণ করিয়ে দিন) (সূরা ইব্রাহিম, আয়াত ৫)। অতঃপর তিনি তাঁর সম্প্রদায়ের সামনে ভাষণ দিলেন এবং আল্লাহর দেওয়া কল্যাণ ও নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। তিনি তাদের স্মরণ করিয়ে দিলেন যখন আল্লাহ তাদের ফেরাউনের বংশধরদের হাত থেকে উদ্ধার করেছিলেন, তাদের শত্রুদের ধ্বংস করেছিলেন এবং পৃথিবীতে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেছিলেন।
তিনি বললেন: আল্লাহ তোমাদের নবী মুসার সাথে কথা বলেছেন, আমাকে নিজের জন্য মনোনীত করেছেন, আমার ওপর তাঁর ভালোবাসা বর্ষণ করেছেন এবং তোমরা যা চেয়েছ তার সবকিছুই তোমাদের দান করেছেন। সুতরাং তোমাদের নবী পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ এবং তোমরা আজ তা স্বীকার করছ। আল্লাহ তাদের ওপর যেসব নিয়ামত দান করেছিলেন তার কোনোটিই তিনি উল্লেখ করতে বাকি রাখলেন না। তখন বনী ইসরাঈলের এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞাসা করল: হে আল্লাহর নবী, পৃথিবীতে আপনার চেয়ে বড় কোনো জ্ঞানী কি কেউ আছেন? তিনি বললেন: না। তখন আল্লাহ জিবরাঈলকে মুসার কাছে পাঠালেন এবং তিনি বললেন: আল্লাহ বলছেন—আমি আমার জ্ঞান কোথায় গচ্ছিত রাখি তা আপনি কীভাবে জানবেন?
হ্যাঁ, সমুদ্রতীরে এমন একজন ব্যক্তি আছেন যিনি অধিক জ্ঞানী। ইবনে আব্বাস বলেন: তিনি হলেন খিজির। তখন মুসা তাঁর প্রতিপালকের কাছে প্রার্থনা করলেন যেন তাঁকে তাঁর দেখা পাইয়ে দেওয়া হয়। আল্লাহ তাঁর কাছে ওহী পাঠালেন: আপনি সমুদ্রের দিকে যান, সেখানে সমুদ্রতীরে একটি মৃত মাছ দেখতে পাবেন; সেটি গ্রহণ করে আপনার সঙ্গীকে দিয়ে দেবেন। অতঃপর সমুদ্রতীর ধরে চলতে থাকবেন; যখন আপনি মাছটির কথা ভুলে যাবেন এবং সেটি আপনার কাছ থেকে চলে যাবে, সেখানেই আপনি সেই পুণ্যবান বান্দার দেখা পাবেন যাকে আপনি খুঁজছেন। যখন মুসার পথ চলা দীর্ঘ হলো এবং তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়লেন, তখন তিনি তাঁর সঙ্গীকে মাছটির কথা জিজ্ঞাসা করলেন: সে বলল, আপনি কি দেখেছেন—যখন আমরা পাথরের কাছে আশ্রয় নিয়েছিলাম, তখন আমি মাছটির কথা ভুলে গিয়েছিলাম; শয়তানই আমাকে এর কথা স্মরণ করতে ভুলিয়ে দিয়েছিল।
সেই যুবক বলল আমি মাছটিকে অদ্ভুতভাবে সমুদ্রে নিজের পথ করে নিতে দেখেছি।
এতে তিনি আশ্চর্যান্বিত হলেন এবং ফিরে চললেন। অবশেষে সেই পাথরের কাছে এসে মাছটিকে খুঁজে পেলেন। মাছটি সমুদ্রে আঘাত করে চলতে শুরু করল এবং মুসা তাকে অনুসরণ করে এগিয়ে চললেন।
