An-Nur
আন-নূর: 36
আরবি
فِى بُيُوتٍ أَذِنَ ٱللَّهُ أَن تُرْفَعَ وَيُذْكَرَ فِيهَا ٱسْمُهُۥ يُسَبِّحُ لَهُۥ فِيهَا بِٱلْغُدُوِّ وَٱلْـَٔاصَالِ
English Translations
[Such niches are] in houses [i.e., mosques] which Allāh has ordered to be raised and that His name be mentioned [i.e., praised] therein; exalting Him within them in the morning and the evenings
In houses (mosques), which Allah has ordered to be raised (to be cleaned, and to be honoured), in them His Name is glorified in the mornings and in the afternoons or the evenings,
(The guided people worship Allah) in the houses that Allah has permitted to be raised, and where His name is recounted and His purity is pronounced, in the morning and in the evening,
(Those who are directed to this Light are found) in houses which Allah has allowed to be raised and wherein His name is to be remembered: in them people glorify Him in the morning and in the evening,
(This lamp is found) in houses which Allah hath allowed to be exalted and that His name shall be remembered therein. Therein do offer praise to Him at morn and evening.
(Lit is such a Light) in houses, which Allah hath permitted to be raised to honour; for the celebration, in them, of His name: In them is He glorified in the mornings and in the evenings, (again and again),-
বাংলা অনুবাদ
(এ রকম আলো জ্বালানো হয়) সে সব গৃহে (অর্থাৎ মাসজিদে ও উপাসনালয়ে) যেগুলোকে সমুন্নত রাখতে আর তাতে তাঁর নাম স্মরণ করতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, ওগুলোতে তাঁর মাহাত্ম্য ঘোষণা করা হয় সকাল ও সন্ধ্যায় (বার বার)
সেসব ঘরে যাকে সমুন্নত করতে এবং যেখানে আল্লাহর নাম যিক্র করতে আল্লাহই অনুমতি দিয়েছেন। সেখানে সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁর তাসবীহ পাঠ করে-
সেই সব গৃহ, যাকে মর্যাদায় সমুন্নত করতে এবং যাতে তাঁর নাম স্মরণ করতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে।
সে সব ঘরে যাকে সমুন্নত করতে এবং যাতে তাঁর নাম স্মরণ করতে আল্লাহ্ নির্দেশ দিয়েছেন, সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে,
সে সকল ঘরকে সমুন্নত করতে এবং যাতে তাঁর নাম স্মরণ করতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে,
৩৬. এ প্রদীপটি জ্বালানো হয় সেই মসজিদগুলোতে যেগুলোর নির্মাণ ও সম্মানকে সুউচ্চ করতে এবং সেখানে আযান, যিকির ও সালাতের মাধ্যমে তাঁর নামকে স্মরণ করতে তিনি আদেশ করেন। যেখানে দিনের শুরু ও শেষে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করা হয়।
তাফসীর
৩৬-৩৮ নং আয়াতের তাফসীরমুমিনের অন্তরের এবং ওর মধ্যে যে হিদায়াত ও ইলম রয়েছে ওর দৃষ্টান্ত উপরের আয়াতে ঐ উজ্জ্বল প্রদীপের সাথে দেয়া হয়েছে যা স্বচ্ছ কাচের মধ্যে রয়েছে এবং পরিষ্কার যয়নের উজ্জ্বল তেল দ্বারা জ্বলতে থাকে। এ জন্যে এখানে ওর স্থানের বর্ণনা মহান আল্লাহ দিচ্ছেন যে, ওটা আবার রয়েছে ঐসব গৃহে অর্থাৎ মসজিদে, যা সবচেয়ে উত্তম জায়গা এবং আল্লাহর প্রিয় স্থান। যেখানে তাঁর ইবাদত করা হয় এবং তার একত্ববাদের বর্ণনা দেয়া হয়। যার রক্ষণাবেক্ষণ করা, পাক-সাফ রাখা এবং অশ্লীল কথা ও কাজ থেকে বাঁচিয়ে রাখার নির্দেশ আল্লাহ তা'আলা দিয়েছেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, (আরবি) এর অর্থ হলো সেখানে অশ্লীল ও বাজে কাজ না করা। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য ঐ মসজিদগুলো যেগুলো নির্মাণ করা, আবাদ করা ও পবিত্র রাখার হুকুম দেয়া হয়েছে। হযরত কা'ব (রঃ) বলতেনঃ তাওরাতে লিখিত আছে- যমীনে আমার ঘর হলো মসজিদসমূহ। যে কেউ অযু করে আমার ঘরে আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসবে আমি তার সম্মান করবো।যে কেউ কারো বাড়ীতে তার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসে, তার কর্তব্য হলো তার সম্মান করা। এটা তাফসীরে ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত আছে। মসজিদ নির্মাণ করা, ওর আদব ও সম্মান করা এবং ওকে সুগন্ধময় ও পাক-সাফ রাখার ব্যাপারে বহু হাদীস এসেছে, যেগুলোকে আমি একটি পৃথক কিতাবে লিপিবদ্ধ করেছি। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। এখানেও অল্প বিস্তর আনয়ন করছি। আল্লাহ আমাদেরকে সাহায্য করুন! আমাদের তার উপরই ভরসা।আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় মসজিদ নির্মাণ করে, আল্লাহ তার জন্যে জান্নাতে ওর মত ঘর নির্মাণ করবেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) তাখরীজ করেছেন)হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি একটি মসজিদ নির্মাণ করে যাতে আল্লাহর নাম যিকর করা হয়, আল্লাহ তার জন্যে জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করবেন।" (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মহল্লায় মসজিদ নির্মাণ করার এবং ওটাকে পাক-পবিত্র ও সুগন্ধময় করে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) ছাড়া অন্যান্য আহলুস সুনান বর্ণনা করেছেন)হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “তোমরা লোকদের জন্যে মসজিদ নির্মাণ কর যেখানেই জায়গা পাও। কিন্তু লাল ও হলদে রঙ থেকে বেঁচে থাকো, যাতে মানুষ ফিৎনায় না পড়ে।” (এটা ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কোন কওমের আমল কখনো খারাপ হয় না যে পর্যন্ত না তারা তাদের মসজিদগুলোকে রঙিন, নকশা বিশিষ্ট ও চাকচিক্যময় করে।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করছেন। কিন্তু এর সনদ দুর্বল)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মসজিদগুলোকে উচ্চ ও পাকা করে নির্মাণ করতে আমি আদিষ্ট হইনি।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “নিশ্চয়ই তোমরা তোমাদের মসজিদগুলোকে সুন্দর চাকচিক্যময় ও নকশা বিশিষ্ট বানাবে যেমন ইয়াহুদী ও খৃষ্টানরা বানিয়েছিল (অর্থাৎ তাদের অনুকরণ করা ঠিক নয়)।" হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামত সংঘটিত হবে না যে পর্যন্ত না লোকেরা মসজিদগুলোর ব্যাপারে পুরুস্পর একে অপরের উপর ফখর ও গর্ব প্রকাশ করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) ছাড়া অন্যান্য আহলে সুনান বর্ণনা করেছেন)হযরত বুরাইদাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক তার হারানো উট খুঁজতে মসজিদে এসে বলে- “আমার একটি লাল বর্ণের হারানো উটের কেউ কোন খোঁজ-খবর দিতে পারে কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “তুমি যেন তা না পাও। মসজিদকে যে কাজের জন্যে নির্মাণ করা হয়েছে ওটা ঐ কাজেই ব্যবহৃত হবে (তোমার উট খোঁজ করার জায়গা হিসেবে নয়)। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আমর ইবনে শুআইব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) মসজিদে ক্রয়-বিক্রয় করতে এবং কবিতা পাঠ করতে নিষেধ করেছেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং আহলে সুনান বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান বলেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমরা কাউকে দেখবে যে, সে মসজিদে বেচা-কেনা করছে তখন তোমরা বলবে, আল্লাহ তোমাকে তোমার ব্যবসায়ে লাভবান না করুন! আর যখন তোমরা কাউকে দেখবে যে, সে তার হারানো জন্তু মসজিদে খোজ করছে তখন তোমরা বলবে- আল্লাহ যেন তোমাকে তোমার হারানো জন্তু ফিরিয়ে না দেন!” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং তিনি এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: “কতকগুলো অভ্যাস বা কাজ রয়েছে সেগুলো মসজিদের পক্ষে সমীচীন নয়। যেমন, মসজিদকে রাস্তা বানানো চলবে না, সেখানে অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে আসা চলবে, সেখানে তীর, কামান ব্যবহার করা চলবে না, কাচা গোশত সেখানে আনা যাবে না, সেখানে হদ মারা যাবে না, গল্প-গুজব ও কাহিনী বলা সেখানে চলবে এবং ওটাকে বাজার বানানো যাবে না।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) প্রমুখ মনীষী বর্ণনা করেছেন)হযরত ওয়ায়েলা ইবনে আসফা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা মসজিদগুলো হতে তোমাদের নাবালক ছেলেদেরকে, পাগলদেরকে, বেচা-কেনাকে, ঝগড়া-বিবাদকে, উচ্চ স্বরে কথা বলাকে, হদ জারী করাকে এবং তরবারী উন্মুক্ত করাকে দূরে রাখবে। মসজিদের দরগুলোর উপর তোমরা অযু ইত্যাদির স্থান বানিয়ে নিবে এবং জুমআর দিনে ওগুলোকে সুগন্ধময় করে রাখবে।” (এটাও ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসটির সনদে দুর্বলতা রয়েছে)কোন কোন আলেম কঠিন প্রয়োজন ছাড়া মসজিদকে যাতায়াতের স্থান বানানো মাকরূহ বলেছেন। একটি আসারে আছে যে, ফেরেশতামণ্ডলী ঐ লোককে দেখে বিস্মিত হন যে ঐ মসজিদের মধ্য দিয়ে গমন করে যেখানে সে নামায পড়ে না। অস্ত্র-শস্ত্র ও তীর-বল্লম নিয়ে মসজিদে যাওয়া নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ এই যে, সেখানে বহু লোক একত্রিত হয়। কাজেই কারো গায়ে লেগে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। এজন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নির্দেশ দিয়েছেন যে, কেউ যদি তীর-বল্লম নিয়ে মসজিদে প্রবেশ করে তবে যেন তীরের ফলাটি নিজের হাতে রাখে যাতে কাউকেও কোন কষ্ট না পৌছে। আর কাঁচা গোশত নিয়ে মসজিদে আগমন নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ এই যে, ওর থেকে ফোঁটা ফোঁটা করে রক্ত পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণেই ঋতুবতী নারীরও মসজিদে আগমন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মসজিদে হদ লাগানো ও কেসাস নেয়া নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ এই যে, হয়তো সে মসজিদকে ময়লা বা বিষ্ঠা দ্বারা অপবিত্র করে দেবে। মসজিদকে বাজারে পরিণত করতে নিষেধ করার কারণ এই যে, বাজার হলো ক্রয়-বিক্রয়ের স্থান আর মসজিদে এ দু'টো কাজ করা নিষিদ্ধ। কেননা, মসজিদ হলো আল্লাহর যিকর করা ও নামায আদায় করার জায়গা। যেমন একজন বেদুঈন মসজিদের এক প্রান্তে প্রস্রাব করে দিলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “মসজিদ এ কাজের জন্যে নির্মাণ করা হয়নি, বরং মসজিদ হলো আল্লাহর যিকর ও নামায পড়ার জায়গা।” অতঃপর তিনি তার প্রস্রাবের উপর বড় এক বালতি পানি বইয়ে দেয়ার নির্দেশ দেন। অন্য হাদীসে রয়েছেঃ “তোমরা নাবালক ছেলেদেরকে মসজিদ হতে দূরে রাখবে। কেননা, খেল-তামাশাই তাদের কাজ। অথচ মসজিদে এটা মোটেই উচিত নয়।” হযরত উমার ফারুক (রাঃ) যখন কোন ছোট ছেলেকে মসজিদে খেলতে দেখতেন তখন তিনি তাকে চাবুক মারতেন এবং এশার নামাযের পরে কাউকেও মসজিদে থাকতে দিতেন না।পাগলদেরকেও মসজিদে আসতে দিতে নিষেধ করা হয়েছে। কেননা, তাদের শ্রন থাকে না। কাজেই তারা মানুষের হাসি-তামাসার পাত্র হয়। আর মসজিদে জমা করা উচিত নয়। তাছাড়া তাদের দ্বারা মসজিদ অপবিত্র হয়ে যাওয়ারও আম রয়েছে।মসজিদে ক্রয়-বিক্রয় করতেও নিষেধ করা হয়েছে। কেননা এ দুটো আল্লাহর যিকুরের কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। মসজিদে ঝগড়া করতে নিষেধ করার কারণ এই যে, তাতে শব্দ উচ্চ হয় এবং ঝগড়াকারীদের মুখ দিয়ে এমন কথাও বেরিয়ে যায় যা মসজিদের আদবের পরিপন্থী। অধিকাংশ আলেমের উক্তি এই যে, মসজিদে বিচার সালিস করা চলবে না। এ জন্যেই এই বাক্যর পরে মসজিদে উচ্চ স্বরে কথা বলা হতে নিষেধ করা হয়েছে। হযরত সাইব ইবনে কান্দী (রঃ) বলেন, আমি একদা মসজিদে দাঁড়িয়েছিলাম এমন সময় হঠাৎ কে আমায় কংকর নিক্ষেপ করে। আমি ফিরে দেখি যে, তিনি হযরত উমার (রাঃ)। তিনি আমাকে বলেনঃ “যাও, ঐ দু'টি লোককে আমার নিকট ধরে নিয়ে এসো।” আমি ঐ দু’জনকে তাঁর কাছে ধরে আনলে তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমরা কে?” অথবা প্রশ্ন করেনঃ “তোমরা কোথাকার লোক?” তারা উত্তরে বলেঃ “আমরা তায়েফের অধিবাসী।” তিনি তখন বলেনঃ “তোমরা যদি এখানকার অধিবাসী হতে তবে আমি তোমাদেরকে শাস্তি দিতাম। তোমরা মসজিদে নববীতে (সঃ) উচ্চ স্বরে কথা বলছো?” (এটা সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার (রাঃ) মসজিদে (নববীতে সঃ) উচ্চ স্বরে একটি লোককে কথা বলতে শুনে বলেনঃ “তুমি কোথায় রয়েছ তা জান কি?” (এটা সুনানে নাসাঈতে হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে)রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদের দরযার উপর অযু ও পবিত্রতা লাভের স্থান বানানোর নির্দেশ দিয়েছেন। মসজিদে নববী (সঃ)-এর নিকটেই পানির কূপ ছিল। লোকেরা সেখান থেকে পানি উঠিয়ে নিয়ে পান করতেন, অযু করতেন এবং পবিত্রতা হাসিল করতেন। আর জুমআর দিন মসজিদকে সুগন্ধময় বানাবার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কেননা, ঐ দিন বহু লোক মসজিদে একত্রিত হন। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার (রাঃ) প্রত্যেক জুমআর দিন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মসজিদকে সুগন্ধময় করতেন। (এটা হাফিয আবু ইয়ালা মুসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর ইসনাদ হাসান। এতে কোন দোষ নেই। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, মানুষ যে নামায একায় বাড়ীতে পড়ে অথবা দোকানে পড়ে ঐ নামাযের উপর জামাআতের নামাযের সওয়াব পঁচিশগুণ বেশী দেয়া হয়। এটা এই কারণে যে, যখন সে ভালরূপে অযু করে শুধু নামাযের উদ্দেশ্যে বের হয় তখন তার উঠানো প্রতিটি পদক্ষেপে একটা মরতবা বৃদ্ধি পায় এবং একটা গুনাহ মাফ হয়। তারপর নামায শেষে যতক্ষণ সে তার নামাযের জায়গায় বসে থাকে ততক্ষণ ফেরেশতারা তার উপর দু'আ পাঠাতে থাকেন। তারা বলেনঃ “হে আল্লাহ! তার উপর আপনি করুণা অবতীর্ণ করুণ! হে আল্লাহ! তার উপর আপনি দয়া করুন!” আর যতক্ষণ সে নামাযের অপেক্ষায় বসে থাকে ততক্ষণ সে নামাযের সওয়াব পেতে থাকে। (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মসজিদের প্রতিবেশীর নামায মসজিদে ছাড়া (শুদ্ধ) হয় না।” (এ হাসীদটি ইমাম দারকুতনী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরো বলেছেনঃ “অন্ধকারে মসজিদে গমনকারীদেরকে শুভ সংবাদ শুনিয়ে দাও যে, কিয়ামতের দিন তারা পূর্ণ আলো প্রাপ্ত হবে।” (এ হাদীসটি সুনানে বর্ণিত হয়েছে)মসজিদে প্রবেশকারীর জন্যে এটা মুসতাহাব যে, সে যেন মসজিদে প্রবেশের সময় প্রথমে ডান পা রাখে এবং এই দু'আ পাঠ করে যা হাদীসে এসেছে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন মসজিদে প্রবেশ করতেন তখন বলতেনঃ(আরবি) অর্থাৎ “মহান, সম্মানিত চেহারার অধিকারী এবং প্রাচীন সাম্রাজ্যের অধিপতি আল্লাহর নিকট আমি বিতাড়িত শয়তান হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।” তিনি বলেন, যখন কেউ এটা বলে তখন শয়তান বলে- “সে সারা দিনের তরে আমার অনিষ্ট থেকে রক্ষা পেয়ে গেল।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে) হযরত আবু হুমাইদ (রাঃ) অথবা হ্যরত উসাইদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের কেউ যখন মসজিদে প্রবেশ করবে তখন যেন সে বলে (আরবি) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমার জন্যে আপনি আপনার রহমতের দরযা খুলে দিন! আর যখন মসজিদ হতে বের হবে তখন যেন বলে (আরবি) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি আমার জন্যে আপনার অনুগ্রহের দরযা খুলে দিন।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের কেউ যখন মসজিদে প্রবেশ করবে তখন সে যেন নবী (সঃ) (আরবি)-এর উপর সালাম দেয় এবং যেন বলে এবং যখন বের হবে তখন যেন বলে(আরবি) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি আমাকে বিতাড়িত শয়তান হতে রক্ষা করুন!” (ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। আর ইবনে কুযাইমা (রঃ) ও ইবনে হিব্বান (রঃ) এটা তাদের সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কন্যা হযরত ফাতিমা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন মসজিদে প্রবেশ করতেন তখন মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর দরূদ ও সালাম বলতেন, তারপর বলতেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমার পাপরাশি ক্ষমা করে দিন এবং আমার জন্যে আপনার রহমতের দরযা খুলে দিন!” আর যখন বের হতেন তখন মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর দরূদ ও সালাম বলতেন, অতঃপর বলতেনঃ “হে আল্লাহ! আমার গুনাহগুলো মাফ করুন এবং আমার জন্যে আপনার অনুগ্রহের দ্য উন্মুক্ত করে দিন!” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, এ হাদীসটি হাসান এবং এর ইসনাদ মুত্তাসিল নয়। কেননা, হযরত হুসাইনের কন্যা ছোট ফাতিমা (রাঃ) বড় ফাতিমা (রাঃ)-কে পাননি)মোটকথা, এ ধরনের বহু হাদীস এই আয়াত সম্পর্কে রয়েছে এবং ঐগুলো মসজিদের নির্দেশাবলীর সাথে সম্পর্কযুক্ত। অন্য আয়াতে রয়েছেঃ “তোমরা মসজিদে নিজেদের মুখমণ্ডল সোজা রাখো এবং আন্তরিকতার সাথে শুধু আল্লাহ তা'আলাকেই ডাকতে থাকো।” আর একটি আয়াতে রয়েছেঃ “নিশ্চয়ই মসজিদসমূহ আল্লাহরই জন্যে।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ মসজিদে তাঁর নাম স্মরণ করতে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন। অর্থাৎ সেখানে কুরআন তিলাওয়াত করতে হবে। তিনি আরো নির্দেশ দিয়েছেন মসজিদে সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করতে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কুরআন কারীমের যেখানেই ‘তাসবীহ’ শব্দ রয়েছে সেখানেই ওর দ্বারা নামাযকে বুঝানো হয়েছে। সুতরাং এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে ফজর ও আসরের নামায। প্রথম প্রথম এই দুই ওয়াক্ত নামাযই ফরয হয়েছিল। সুতরাং এখানে এই দুই ওয়াক্ত নামাযকেই স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে। এক কিরআতে (আরবি) রয়েছে। অর্থাৎ (আরবি) অক্ষরের উপর (আরবি) বা যবর আছে। এই পঠনে (আরবি)-এর উপর (আরবি) করা হয়েছে এবং (আরবি) দ্বারা অন্য বাক্য শুরু করা হয়েছে। এটা যেন উহ্য কর্তার জন্যে মুফাসসির। তাহলে যেন বলা হয়েছেঃ সেখানে কে পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে? জবাবে যেন বলা হয়েছেঃ এইরূপ লোকেরা পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে থাকে। (আরবি) পড়া হলে (আরবি) বা কর্তা হবে। তাহলে (আরবি) হওয়া উচিত (আরবি)-এর বর্ণনার পর।(আরবি) বলার দ্বারা তাদের ভাল উদ্দেশ্য, সৎ নিয়ত এবং বড় কাজের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, এরা আল্লাহর ঘরের আবাদকারী, তাঁর ইবাদতের স্থান তাদের দ্বারা সৌন্দর্য মণ্ডিত হয় এবং তারা তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী। যেমন এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ(আরবি) অর্থাৎ “মুমিনদের মধ্যে কতকগুলো লোক এমন রয়েছে যারা আল্লাহর সাথে ওয়াদাকৃত কথাকে সত্য করে দেখিয়েছে (শেষ পর্যন্ত)।” (৩৩:২৩)হাঁ, তবে স্ত্রীলোকদের জন্যে মসজিদে নামায পড়া অপেক্ষা বাড়ীতে নামায পড়াই উত্তম। হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “স্ত্রীলোকদের সর্বোত্তম মসজিদ হলো তাদের ঘরের কোণা।” (হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সুওয়ায়েদ আনসারী (রাঃ) বলেন যে, তাঁর ফুফু উম্মে হুমায়েদ (রাঃ) আবূ হুমায়েদ সায়েদ (রাঃ)-এর স্ত্রী নবী (সঃ)-এর নিকট এসে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আপনার সাথে নামায পড়তে ভালবাসি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি জানি যে, তুমি আমার সাথে নামায পড়তে ভালবাস। কিন্তু জেনে রেখো যে, তোমার নামায তোমার হুজরায় (ক্ষুদ্র কক্ষে) পড়া অপেক্ষা তোমার ঘরে পড়া উত্তম। তোমার বাড়ীতে নামায পড়া অপেক্ষা তোমার হুজরায় নামায পড়া উত্তম। তোমার মহল্লার মসজিদে নামায পড়ার চেয়ে তোমার বাড়ীতে নামায পড়া উত্তম এবং আমার এই মসজিদে নামায পড়ার চেয়ে তোমার মহল্লার মসজিদে নামায পড়াই উত্তম।” বর্ণনাকারী বলেনঃ তখন তাঁর নির্দেশক্রমে তাঁর ঘরের একেবারে শেষ প্রান্তে একটি নামাযের জায়গা বানিয়ে দেয়া হয়। আল্লাহর শপথ! মৃত্যু পর্যন্ত তিনি ওখানেই নামায পড়তে থাকেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)অবশ্যই মসজিদে পুরুষ লোকদের সাথে স্ত্রীলোকদেরও নামায পড়া জায়েয যদি তারা তাদের সৌন্দর্য পুরুষদের উপর প্রকাশ না করে এবং সুগন্ধি মেখে বের হয়। যেমন সহীহ্ হাদীসে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আল্লাহর বান্দীদেরকে তাঁর মসজিদে আসতে বাধা দিয়োনা বা নিষেধ করো না।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আর একটি হাদীসে বর্ণিত আছে যে, স্ত্রীলোকদের জন্যে তাদের ঘরই উত্তম। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ ও সুনানে আবি দাউদে বর্ণিত আছে) অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, তারা যেন সুগন্ধি ব্যবহার করে বের না হয়।হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর স্ত্রী হযরত যয়নব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের কেউ যদি মসজিদে হাযির হতে ইচ্ছা করে তবে সে যেন খোশবু বা সুগন্ধি স্পর্শ না করে।” (সহীহ মুসলিমে এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে)হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “মুমিনা নারীরা ফজরের নামাযে হাযির হতো। অতঃপর তারা নিজেদেরকে চাদরে জড়িয়ে ফিরে আসতে এবং কিছুটা অন্ধকার থাকতো বলে তাদেরকে চিনতে পারা যেতো না।” (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে এ হাদীসটি বর্ণনা করা হয়েছে)হযরত আয়েশা (রাঃ) হতেই বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “স্ত্রীলোকেরা এই যে নতুন নতুন বিষয় উদ্ভাবন করেছে এটা যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ) জানতেন তবে অবশ্যই তিনি তাদেরকে মসজিদে যেতে নিষেধ করতেন, যেমন বানী ইসরাঈলের নারীদেরকে নিষেধ করে দেয়া হয়েছে।” (এ হাদীসটিও ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আল্লাহ পাকের উক্তিঃ সেই সব লোক, যাদেরকে ব্যবসা বাণিজ্য এবং ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ হতে ভুলিয়ে রাখে না। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ঐশ্বর্য ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণে উদাসীন না করে।” (৬৩৯) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! জুমআর দিনে যখন নামাযের জন্যে আহ্বান করা হয় তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ কর।” (৬২:৯) ভাবার্থ এই যে, সৎ লোকদেরকে দুনিয়া ও দুনিয়ার ভোগ-বিলাস আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন রাখতে পারে না। তাদের আখিরাত ও আখিরাতের নিয়ামতের উপর পূর্ণ বিশ্বাস রয়েছে এবং তারা ওটাকে অবিনশ্বর মনে করে। আর দুনিয়ার সবকিছুকে তারা অস্থায়ী ও ধ্বংসশীল বলে বিশ্বাস করে থাকে। এ জন্যেই তারা দুনিয়া ছেড়ে আখিরাতের দিকে মনোযোগ দেয়। তারা আল্লাহর আনুগত্যকে, তার মহব্বতকে এবং তাঁর হুকুমকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) একদা ব্যবসায়িক লোকদেরকে আযান শুনে তাদের কাজ কারবার ছেড়ে দিয়ে মসজিদের দিকে যেতে দেখে এ আয়াতটিই। তিলাওয়াত করেন এবং বলেনঃ “এ লোকগুলো ওদেরই অন্তর্ভুক্ত।” (হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে)হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) বলেনঃ “আমি ব্যবসা-বাণিজ্য করবো। যদি প্রত্যহ আমি তিনশ’ স্বর্ণমুদ্রা লাভ করি তবুও নামাযের সময় হলেই আমি সবকিছু ছেড়ে দিয়ে নামাযের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যাবো। ব্যবসা যে হারাম এটা ভাবার্থ কখনো নয়। বরং ভাবার্থ এটাই যে, আমাদের মধ্যে এই বিশেষণ থাকতে হবে যা এই আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে।”বর্ণিত আছে যে, হযরত সালিম ইবনে আবদিল্লাহ (রঃ) একদা নামাযের জন্যে যাচ্ছিলেন, তখন দেখতে পান যে, মদীনার ব্যবসায়ীরা নিজ নিজ পদ্রব্যকে কাপড় দ্বারা ঢেকে দিয়ে নামাযের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছেন। তখন তিনি (আরবি)-এই আয়াতটি পাঠ করেন এবং বলেনঃ “এই লোকদেরই প্রশংসা এই আয়াতে করা হয়েছে।”মাতারুল অরাক (রঃ) বলেন যে, তাঁরা বেচাকেনা করতেন, নিক্তি হয়তো তাদের হাতে থাকতো এমতাবস্থায় আযান তাদের কানে আসলে তারা নিক্তি ফেলে দিয়ে নামাযের উদ্দেশ্যে ধাবিত হতেন। জামাআতের সাথে নামায পড়ার প্রতি তাদের খুবই আসক্তি ছিল। তারা নামাযের সময়, রুকন এবং আদবের ফিহাযতসহ নামাযের পাবন্দ ছিলেন। এটা এ কারণে যে, তাদের অন্তরে আল্লাহর ভয় ছিল এবং কিয়ামত যে সংঘটিত হবে এ ব্যাপারে তাদের পূর্ণ বিশ্বাস ছিল। ঐ দিনের ভয়াবহ অবস্থা সম্পর্কে তারা ছিলেন পূর্ণ ওয়াকিফহাল যে, সেই দিন তাদের অন্তর ও দৃষ্টি বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। তাই তো তারা থাকতেন সদা উদ্বিগ্ন ও সন্ত্রস্ত। অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আহার্যের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও তারা অভাবগ্রস্ত, ইয়াতীম ও বন্দীকে আহার্য দান করে এবং বলে- শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমরা তোমাদেরকে আহার্য দান করি, আমরা তোমাদের নিকট হতে প্রতিদান চাই না, কৃতজ্ঞতাও নয়। আমরা আশঙ্কা করি আমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে এক ভীতিপ্রদ ভয়ঙ্কর দিনের। পরিণামে আল্লাহ তাদেরকে রক্ষা করবেন সেই দিনের অনিষ্ট হতে এবং তাদেরকে দিবেন উৎফুল্লতা ও আনন্দ। আর তাদের ধৈর্যশীলতার পুরস্কার স্বরূপ তাদেরকে দিবেন উদ্যান ও রেশমী বস্ত্র।”এখানেও আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যাতে তারা যে কর্ম করে তজ্জন্যে আল্লাহ তাদেরকে উত্তম পুরস্কার দেন এবং নিজ অনুগ্রহে তাদের প্রাপ্যের অধিক দেন। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহ অণুপরিমাণ যুলুম করেন না।” (৪: ৪০) অন্য এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ “যে ব্যক্তি কোন ভাল কাজ করে তার জন্যে ওর দশগুণ পুণ্য রয়েছে। অন্য এক স্থানে তিনি বলেনঃ “কে এমন আছে যে আল্লাহকে করযে হাসানা দিতে পারে?” আরো বলেনঃ “তিনি যার জন্যে ইচ্ছা করেন (পুণ্য) বৃদ্ধি করে থাকেন।” এখানে মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন অপরিমিত জীবিকা দান করেন। বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কাছে দুধ আনয়ন করা হয়। তিনি তার মজলিসের সব লোককেই তা পান করাবার ইচ্ছা করেন। কিন্তু সবাই রোযার অবস্থায় ছিলেন বলে পুনরায় দুধের পাত্রটি তার কাছেই ফিরিয়ে আনা হয়। তখন তিনি তা পান করেন, যেহেতু তিনি রোযা অবস্থায় ছিলেন না। অতঃপর তিনি (আরবি)-এই আয়াতটি পাঠ করেন।” (এটা ইমাম নাসাঈ (রঃ) ও ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আসমা বিনতে ইয়াযীদ ইবনে সাকান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন যখন প্রথম ও শেষ সবকেই একত্রিত করা হবে তখন আল্লাহ তাআলা একজন ঘোষণাকারীকে ঘোষণা করতে বলবেন, ফলে ঘোষণাকারী খুবই উচ্চ স্বরে ঘোষণা করবেন যা হাশরের একত্রিত লোকদের সবাই শুনতে পাবে। ঘোষণায় বলা হবে- আজ সবাই জানতে পারবে যে, আল্লাহ তা'আলার কাছে সবচেয়ে সম্মানিত কে? অতঃপর বলবেনঃ যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য আল্লাহর স্মরণ হতে ভুলিয়ে রাখতে পারতো তারা যেন দাঁড়িয়ে যায়। তখন তারা দাড়িয়ে যাবে এবং সংখ্যায় খুবই অল্প। হবে। তারপর সমস্ত মাখলুকের হিসাব গ্রহণ করা হবে।” হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি) (৩৫:৩০) (তিনি তাদেরকে পূর্ণভাবে তাদের প্রতিদান প্রদান করবেন এবং প্রাপ্যের অধিক দিবেন)-এর ব্যাখ্যায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তাদের প্রতিদান এই যে, আল্লাহ তাদেরকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করবেন। আর তাদের প্রাপ্যের অধিক দিবেন, এর ভাবার্থ এই যে, যারা তাদের প্রতি ইহসান করেছিল এবং তারা শাফাআতের হকদারও বটে, তাদের জন্যে শাফাআত করার অধিকার এরা লাভ করবে। (এটা ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
সে সব ঘরে [১] যাকে সমুন্নত করতে [২] এবং যাতে তাঁর নাম স্মরণ করতে আল্লাহ্ নির্দেশ দিয়েছেন [৩], সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে [৪],
[১] পূর্ববর্তী আয়াতে আল্লাহ্ তা‘আলা মানুষের অন্তরে নিজের হেদায়াতের আলো রাখার একটি বিশেষ দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন এবং শেষে বলেছেনঃ এই নূর দ্বারা সে-ই উপকার লাভ করে, যাকে আল্লাহ্ চান ও তাওফীক দেন। [ইবন কাসীর] আলোচ্য আয়াতে এমন মুমিনদের আবাসস্থল ও স্থান বর্ণনা করা হয়েছে যে, এরূপ মুমিনদের আসল আবাসস্থল, যেখানে তারা প্রায়ই বিশেষতঃ পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের সময় দৃষ্টিগোচর হয়- সেসব গৃহ, যেগুলোকে উচ্চ রাখার জন্য এবং যেগুলোতে আল্লাহ্র নাম উচ্চারণ করার জন্য আল্লাহ্ তা‘আলা আদেশ করেছেন। এসব গৃহে সকাল-সন্ধ্যায় অর্থাৎ সর্বদা এমন লোকেরা আল্লাহ্ তা‘আলার পবিত্ৰতা বর্ণনা করে, যাদের বিশেষ গুণাবলী পরবর্তী আয়াতে বর্ণিত হচ্ছে। অধিকাংশ তাফসীরবিদের মতে এসব গৃহ হচ্ছে মসজিদ। অধিকাংশ মুফাসসিরগণ এ তাফসীরকেই অগ্ৰাধিকার দিয়েছেন। [দেখুন-কুরতুবী, বাগভী]
[২] কোন কোন মুফাসসির এর অর্থ নিয়েছেন মু‘মিনদের ঘর এবং সেগুলোকে উন্নত করার অর্থ সেগুলোকে নৈতিক দিক দিয়ে উন্নত করা, নৈতিক মান রক্ষার জন্য তাতে মসজিদের ব্যবস্থা করা। এ অর্থের সমর্থনে আমরা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে একটি হাদীস পাই যাতে তিনি বলেছেনঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে বাসগৃহের মধ্যেও মসজিদ অর্থাৎ সালাত আদায় করার বিশেষ জায়গা তৈরী করার এবং তাকে পবিত্র রাখার জন্য আদেশ করেছেন। [ইবনে মাজহঃ ৭৫৮, ৭৫৯]
তবে অধিকাংশ মুফাসসির এ “ঘরগুলো”কে মসজিদ অর্থে গ্রহণ করেছেন এবং এগুলোকে উন্নত করার অর্থ নিয়েছেন এগুলো নির্মাণ ও এগুলোকে মর্যাদা প্ৰদান করা। “সেগুলোর মধ্যে নিজের নাম স্মরণ করতে আল্লাহ্ নির্দেশ দিয়েছেন।” এ শব্দগুলো বাহ্যত মসজিদ সংক্রান্ত ব্যাখ্যার বেশী সমর্থক দেখা যায়। তখন আয়াতের অর্থ হবে, আল্লাহ্ তা‘আলা মসজিদসমূহকে সমুন্নত করার অনুমতি দিয়েছেন। অনুমতি দেয়ার মানে আদেশ করা এবং উচ্চ করা মানে সম্মান করা। উচ্চ করার দু’টি অর্থ করা হয়ে থাকে-
[১] ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেনঃ উচ্চ করার অর্থ আল্লাহ্ তা‘আলা মসজিদসমূহে অনৰ্থক কাজ ও কথাবার্তা বলতে নিষেধ করেছেন।
হাসান বসরী রাহিমাহুল্লাহ বলেনঃ رِفْعُ مَسَا جِدَ বলে মসজিদসমূহের সম্মান, ইযযত ও সেগুলোকে নাপাকী ও নোংরা বস্তু থেকে পবিত্র রাখা বুঝানো হয়েছে। আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, “মসজিদে থুথু ফেলা গোনাহ আর তার কাফফারা হলো তা দাফন করা, মিটিয়ে দেয়া”। [বুখারীঃ ৪১৫, মুসলিমঃ ৫৫২]
[২] ইকরিমা ও মুজাহিদ বলেনঃ رفع বলে মসজিদ নির্মাণ বুঝানো হয়েছে; যেমন কা‘বা নির্মাণ সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছেঃ
وَ اِذْ يَرْ فَعُ اِبْرٰحٖمُ الْقًو اعِدَمِنَ الْبَيْتِ
এখানে رفع قو اعد বলে ভিত্তি নির্মাণ বুঝানো হয়েছে। উসমান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেনঃ আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, “যে আল্লাহ্র জন্য মসজিদ বানায়, আল্লাহ্ তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর বানাবেন”। [বুখারীঃ ৪৫০, মুসলিমঃ ৫৩৩]
প্রকৃত কথা এই যে, تُرْفَعَ শব্দের অর্থ মসজিদ নির্মাণ করা, পাক-পবিত্র রাখা এবং মসজিদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা ইত্যাদি সবই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। [দেখুন-তাবারী, ইবন কাসীর, কুরতুবী] এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম রসুন ও পেঁয়াজ খেয়ে মুখ না ধুয়ে মসজিদে গমন করতে নিষেধ করেছেন। উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেনঃ “আমি দেখেছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে ব্যাক্তির মুখে রসুন বা পেঁয়াজের দুৰ্গন্ধ অনুভব করতেন, তাকে মসজিদ থেকে বের করে ‘বাকী’ নামক স্থানে পাঠিয়ে দিতেন এবং বলতেনঃ যে ব্যাক্তি রসুন-পেঁয়াজ খেতে চায়, সে যেন উত্তম রূপে পাকিয়ে খায় যাতে দুৰ্গন্ধ নষ্ট হয়ে যায়।” [মুসলিমঃ ৫৬৭]
[৩] আবু উমামাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বৰ্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ “যে ব্যাক্তি গৃহে অযু করে ফরয সালাত আদায়ের জন্য মসজিদের দিকে যায়, তার সওয়াব সেই ব্যক্তির সমান, যে ইহরাম বেঁধে গৃহ থেকে হজ্জের জন্য যায়। যে ব্যাক্তি এশরাকের সালাত আদায়ের জন্য গৃহ থেকে অযু করে মসজিদের দিকে যায়, তার সওয়াব উমরাকারীর অনুরূপ। এক সালাতের পর অন্য সালাত ইল্লিয়্যীনে লিখিত হয় যদি উভয়ের মাঝখানে কোন অপ্রয়োজনীয় কাজ না করে।” [আবু দাউদঃ ৫৫৮] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেনঃ “যারা অন্ধকারে মসজিদে গমন করে, তাদেরকে কেয়ামতের দিন পরিপূর্ণ নূরের সুসংবাদ শুনিয়ে দাও।” [আবু দাউদঃ ৫৬১, তিরমিযীঃ ২২৩]
[৪] আল্লাহ্র নাম স্মরণ করা দ্বারা এখানে তাসবীহ (পবিত্রতা বর্ণনা), তাহমীদ (প্ৰশংসা বর্ণনা), নফল সালাত, কুরআন তিলাওয়াত, ওয়াজ-নসীহত, দ্বীনী শিক্ষা ইত্যাদি সর্বপ্রকার যিকর বুঝানো হয়েছে। [তাবারী, সা‘দী, মুয়াসসার]
