Al-'Ankabut
আল-আনকাবুত: 8
মূল আরবি
وَوَصَّيْنَا ٱلْإِنسَـٰنَ بِوَٰلِدَيْهِ حُسْنًا ۖ وَإِن جَـٰهَدَاكَ لِتُشْرِكَ بِى مَا لَيْسَ لَكَ بِهِۦ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَآ ۚ إِلَىَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ
English Translations
And We have enjoined upon man goodness to parents. But if they endeavor to make you associate with Me that of which you have no knowledge, do not obey them. To Me is your return, and I will inform you about what you used to do.
And We have enjoined on man to be good and dutiful to his parents, but if they strive to make you join with Me (in worship) anything (as a partner) of which you have no knowledge, then obey them not. Unto Me is your return, and I shall tell you what you used to do.
We have instructed man to do good to his parents. And if they insist upon you that you should ascribe partners to Me, then do not obey them. To Me is your return; then I shall tell you what you used to do.
We have enjoined upon man kindness to his parents, but if they exert pressure on you to associate with Me in My Divinity any that you do not know (to be My associate), do not obey them. To Me is your return, and I shall let you know all that you have done.
We have enjoined on man kindness to parents; but if they strive to make thee join with Me that of which thou hast no knowledge, then obey them not. Unto Me is your return and I shall tell you what ye used to do.
We have enjoined on man kindness to parents: but if they (either of them) strive (to force) thee to join with Me (in worship) anything of which thou hast no knowledge, obey them not. Ye have (all) to return to me, and I will tell you (the truth) of all that ye did.
বাংলা অনুবাদ
পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করার জন্য আমি মানুষের প্রতি ফরমান জারি করেছি। তারা যদি তোমার উপর বলপ্রয়োগ করে আমার সঙ্গে শরীক করার জন্য এমন কিছুকে যে সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদেরকে মান্য কর না। আমার কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন, অতঃপর আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেব যা তোমরা করছিলে।
আর আমি মানুষকে নির্দেশ দিয়েছি তার পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করতে। তবে যদি তারা তোমার উপর প্রচেষ্টা চালায় আমার সাথে এমন কিছুকে শরীক করতে যার সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদের আনুগত্য করবে না। আমার দিকেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর তোমরা যা করতে আমি তা তোমাদেরকে জানিয়ে দেব।
আমি মানুষকে নির্দেশ দিয়েছি তার মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে; কিন্তু তারা যদি তোমার উপর বল প্রয়োগ করে, আমার সাথে এমন কিছু শরীক করতে যে সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই তাহলে তুমি তাদেরকে মান্য করনা। আমারই নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দিব যা তোমরা করতে।
আর আমরা মানুষকে নির্দেশ দিয়েছি তার পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে। তবে তারা যদি তোমার উপর বল প্রয়োগ করে আমার সাথে এমন কিছু শরীক করতে যার সম্পর্কে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদেরকে মেনো না। আমারই কাছে তোমাদের ফিরে আসা। অতঃপর তোমরা কি করেছিলে তা আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেব।
আমি মানুষকে নির্দেশ দিয়েছি তার পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে। তবে তারা যদি তোমার ওপর বল প্রয়োগ করে আমার সাথে এমন কিছুকে শরীক করার জন্য যার সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তুমি তাদেরকে অনুসরণ কর না। আমারই নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেব তোমরা কী আমল করছিলে।
৮. আমি মানুষদেরকে আদেশ করেছি তাদের মাতা-পিতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার ও তাদের প্রতি দয়া করতে। হে মানুষ! যদি তোমার মাতা-পিতা তোমার উপর আমার সাথে এমন কোন কিছুকে শরীক করতে বল প্রয়োগ করে -যার অংশীদারিত্বের ব্যাপারে তোমার কোন জ্ঞান নেই (যা একদা সা’দ বিন আবু ওয়াক্কাসের সাথে ঘটেছে তার মায়ের পক্ষ থেকে)- তাহলে তুমি এ ব্যাপারে তাদের অনুসরণ করো না। কারণ, স্রষ্টার অবাধ্য হয়ে তাঁর সৃষ্টির আনুগত্য করা যায় না। কিয়ামতের দিন কেবল আমার কাছেই তোমাদেরকে ফিরে আসতে হবে। তখন আমি তোমাদেরকে সংবাদ দেবো সে আমলগুলোর যা তোমরা দুনিয়ায় করতে। উপরন্তু তোমাদেরকে সেগুলোর প্রতিদানও দেবো।
তাফসীর
৮-৯ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম তার তাওহীদের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার নির্দেশ দেয়ার পর এখন পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিচ্ছেন। কেননা, পিতা-মাতার মাধ্যমেই মানুষ অস্তিত্বে এসে থাকে। পিতা সন্তানের জন্যে খরচ করে এবং তাকে লালন-পালন করে। আর মা তাকে স্নেহ দান করে, ভালবাসে এবং লালন-পালন করে থাকে। এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করতে ও পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে। তাদের একজন অথবা উভয়েই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদেরকে ‘উফ’ বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিয়ো না; তাদের সাথে বলো সম্মান সূচক নম্র কথা।
মমতাবশে তাদের প্রতি নম্রতার পক্ষপুট অবনমিত করো এবং বলল- হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া কর যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন।” (১৭:২৩-২৪) তবে এটা মনে রাখতে হবে যে, যদি তারা শিরকের দিকে আহ্বান করে তবে তাদের কথা মানতে হবে না। মানুষের জেনে রাখা উচিত যে, তাদেরকে আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রত্যাবর্তন করতে হবে। অতঃপর তারা যা করতো তা তিনি তাদেরকে জানিয়ে দিবেন। যদি মানুষ আল্লাহর সাথে শিরক করার ক্ষেত্রে তাদের পিতা-মাতার আদেশ না মানে এবং আল্লাহর উপর ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তবে অবশ্যই তিনি তাদেরকে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত করবেন।হযরত সা'দ (রাঃ) বলেন, আমার ব্যাপারে চারটি আয়াত অবতীর্ণ হয়।
এগুলোর মধ্যে একটি (আরবি) আয়াতটিও। এটা এজন্যে অবতীর্ণ হয় যে, আমার মা আমাকে বলেঃ “(হে সা’দ রাঃ)! আল্লাহ কি তোমাকে মায়ের সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দেননি? আল্লাহর শপথ! তুমি যদি হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নবুওয়াতকে অস্বীকার না কর তবে আমি পানাহার ছেড়ে দিয়ে মৃত্যুবরণ করবো।” সে তাই করে। শেষ পর্যন্ত লোকেরা জোরপূর্বক তার মুখ ফেড়ে তার মুখে খাদ্য ও পানীয় প্রবেশ করিয়ে দিতো। ঐ সময় উপরোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আর আমরা মানুষকে নির্দেশ দিয়েছি তার পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে [১]। তবে তারা যদি তোমার উপর বল প্রয়োগ করে আমার সাথে এমন কিছু শরীক করতে যার সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই [২], তাহলে তুমি তাদেরকে মেনো না [৩]। আমারই কাছে তোমাদের ফিরে আসা। অতঃপর তোমরা কি করেছিলে তা আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেব [৪]।
[১] হাদীসে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহ্র কাছে সবচেয়ে উত্তম আমল কোনটি? তিনি বললেনঃ সময়মত সালাত আদায় করা। বললঃ তারপর কোনটি? তিনি বললেনঃ পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহার। বললঃ তারপর কোনটি? তিনি বললেনঃ আল্লাহ্র পথে জিহাদ।’ [বুখারীঃ ৫৯৭০]
[২] আয়াতে বর্ণিত ‘যাকে তুমি আমার শরীক হিসেবে জানো না’ বাক্যাংশটিও অনুধাবনযোগ্য। এর মধ্যে তাদের কথা না মানার সপক্ষে একটি শক্তিশালী যুক্তি প্ৰদান করা হয়েছে। এতে শির্কের জঘন্যতা প্ৰকাশ পেয়েছে। কারণ শির্কের সপক্ষে কোন জ্ঞান নেই। কেউ শির্ককে সঠিক বলে প্ৰমাণ করতে পারবে না। [সা‘দী] এটা পিতা-মাতার অধিকার যে, ছেলেমেয়েরা তাদের সেবা করবে, তাদেরকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করবে এবং বৈধ বিষয়ে তাদের কথা মেনে চলবে। কিন্তু শির্কের ব্যাপারে তাদের অনুসরণ করা যাবে না। অনুরূপভাবে কোন গোনাহর কাজেও নয়। যেমনটি রাসূলের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। [মুয়াসসার] এ অধিকার দেয়া হয়নি যে, মানুষ নিজের জ্ঞানের বিরুদ্ধে পিতামাতার অন্ধ অনুকরণ করবে।
শুধুমাত্ৰ বাপ-মায়ের ধর্ম বলেই তাদের ছেলে বা মেয়ের সেই ধর্ম মেনে চলার কোন কারণ নেই। সন্তান যদি এ জ্ঞান লাভ করে যে, তার বাপ-মায়ের ধর্ম ভুল ও মিথ্যা তাহলে তাদের ধর্ম পরিত্যাগ করে তার সঠিক ধর্ম গ্ৰহণ করা উচিত এবং তাদের চাপ প্রয়োগের পরও যে পথের ভ্রান্তি তার কাছে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে সে পথ অবলম্বন করা তার উচিত নয়। বাপ-মায়ের সাথে যখন এ ধরনের ব্যবহার করতে হবে তখন দুনিয়ার প্রত্যেক ব্যাক্তির সাথেও এ ব্যবহার করা উচিত। যতক্ষণ না কোন ব্যাক্তির সত্য পথে থাকা সম্পর্কে জানা যাবে ততক্ষণ তার অনুসরণ করা বৈধ নয়।
[৩] অর্থাৎ পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার সাথে সাথে এটাও জরুরী যে, আল্লাহ্র নির্দেশাবলীর অবাধ্যতা না হয়, সীমা পর্যন্ত পিতা-মাতার আনুগত্য করতে হবে। তারা যদি সন্তানকে কুফর ও শির্ক করতে বাধ্য করে, তবে এ ব্যাপারে কিছুতেই তাদের আনুগত্য করা যাবে না; যেমন হাদীসে আছে, আল্লাহ্র অবাধ্যতা করে কোন মানুষের আনুগত্য করা বৈধ নয়। [মুসনাদে আহমাদঃ ১/১৩১] কোন কোন বর্ণনা মতে আলোচ্য আয়াত সা‘দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি দশ জন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবীগণের অন্যতম ছিলেন এবং অতিশয় মাতৃভক্ত ছিলেন।
তার মাতা হামনা বিনতে সুফিয়ান পুত্রের ইসলাম গ্রহণের সংবাদ অবগত হয়ে খুবই মর্মাহত হয়। সে পুত্ৰকে শাসিয়ে শপথ করল, আমি তখন পর্যন্ত আহার্য ও পানীয় গ্রহণ করব না, যে পর্যন্ত তুমি পৈতৃক ধর্মে ফিরে না আস। আমি এমনিভাবে ক্ষুধা ও পিপাসায় মৃত্যুবরণ করব, যাতে তুমি মাতৃহন্তা রূপে বিশ্ববাসীর দৃষ্টিতে হেয় প্রতিপন্ন হও। [মুসলিমঃ ১৭৪৮] এই আয়াত সা‘দকে মাতার আবদার রক্ষা করতে নিষেধ করল। অন্য বর্ণনায় এসেছে, সা‘দের জননী একদিন একরাত মতান্তরে তিনদিন তিনরাত শপথ অনুযায়ী অনশন ধর্মঘট অব্যাহত রাখলে সা‘দ উপস্থিত হলেন। মাতৃভক্তি পূর্ববৎ ছিল; কিন্তু আল্লাহ্র ফরমানের মোকাবেলায় তা ছিল তুচ্ছ।
তাই জননীকে সম্বোধন করে তিনি বললেনঃ আম্মাজান, যদি আপনার দেহে একশ’ আত্মা থাকত, এবং একটি একটি করে বের হতে থাকত, তা দেখেও আমি আমার দ্বীন ত্যাগ করতাম না। এখন আপনি ইচ্ছা করলে পানাহার করুন অথবা মৃত্যুবরণ করুন। আমি আমার দ্বীন ত্যাগ করতে পারি না। এ কথায় নিরাশ হয়ে তার মাতা অনশন ভঙ্গ করল। [বাগভী]
[৪] অর্থাৎ এ দুনিয়ার আত্মীয়তা এবং আত্মীয়দের সাহায্য-সহযোগীতা কেবলমাত্র এ দুনিয়ার সীমা ত্রিসীমা পর্যন্তই বিস্তৃত । সবশেষে পিতা-মাতা ও সন্তান সবাইকে তাদের স্রষ্টার কাছে ফিরে যেতে হবে। সেখানে তাদের প্রত্যেকের জবাবদিহি হবে তাদের ব্যক্তিগত দায়িত্বের ভিত্তিতে । যদি পিতা-মাতা সন্তানকে পথভ্রষ্ট করে থাকে তাহলে তারা পাকড়াও হবে । যদি সন্তান পিতা-মাতার জন্য পথভ্রষ্টতা গ্রহন করে থাকে তাহলে তাকে শাস্তি পেতে হবে। আর সন্তান যদি সঠিক পথ অবলম্বন করে থাকে এবং পিতা-মাতার বৈধ অধিকার আদায় করার ক্ষেত্রেও কোন প্রকার ত্রুটি না করে থাকে কিন্তু পিতা-মাতা কেবলমাত্র পথভ্রষ্টতার ক্ষেত্রে তাদের সহযোগী না হবার কারণে তাকে নির্যাতন করে থাকে, তাহলে তারা আল্লাহর পাকড়াও থেকে বাঁচতে পারবে না ।
আল্লাহ বলছেন যে, কিয়ামতের দিন তোমাদের প্রত্যাবর্তন তো আমারই কাছে । তখন আমি তোমাদের কে তোমাদের পিতা-মাতার প্রতি যে সদ্ব্যবহার করেছ এবং তোমাদের দ্বীনের উপর যে দৃঢ়পদ থেকেছ তার জন্য পুরস্কৃত করব । আর আমি তোমাকে সৎবান্দাদের সাথে হাশর করব, তোমার পিতা-মাতার দলে নয় । যদিও তারা দুনিয়াতে তোমার সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিলো । কারণ, একজন মানুষের হাশর কিয়ামতের দিন তার সাথেই হবে, যাকে সে ভালোবাসে । অর্থাৎ, দ্বীনী ভালোবাসা। তাই পরবর্তী আয়াতে বলেছেন যে, “আর যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে আমরা অবশ্যই তাদেরকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত করবো ।” [ ইবনে কাসীর; আরও দেখুন, ফাতহূল কাদীর ]
[সূরা আল-আনকাবুত (২৯): আয়াত ৮ থেকে ৯] পূর্ণ পৃষ্ঠা
মহান আল্লাহর বাণী: (এবং যারা ঈমান এনেছে) অর্থাৎ যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে (এবং সৎকর্ম করেছে, আমি অবশ্যই তাদের মন্দ কাজগুলো মোচন করে দেব) অর্থাৎ আমি ক্ষমার মাধ্যমে তাদের গুনাহসমূহকে তাদের থেকে ঢেকে দেব। (এবং আমি অবশ্যই তাদেরকে তারা যা করত তার শ্রেষ্ঠ প্রতিদান দেব) অর্থাৎ তাদের সর্বোত্তম আমল তথা আনুগত্যের কার্যাবলীর বিনিময়ে। এরপর বলা হয়েছে: এর সম্ভাবনা রয়েছে যে, শিরক অবস্থায় তারা যে সকল পাপাচার করেছিল তা মোচন করে দেওয়া হবে এবং ইসলাম গ্রহণ করার পর তারা যে সকল পুণ্য কাজ করেছে তার জন্য তাদের সওয়াব প্রদান করা হবে। আরও সম্ভাবনা রয়েছে যে, কুফর ও ইসলাম উভয় অবস্থায় কৃত তাদের সকল মন্দ কাজ মোচন করে দেওয়া হবে এবং কুফর ও ইসলাম উভয় অবস্থায় তাদের কৃত পুণ্য কাজের জন্য তাদের প্রতিদান দেওয়া হবে।
[সূরা আল-আনকাবুত (২৯): আয়াত ৮ থেকে ৯]আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। তবে তারা যদি তোমাকে আমার সাথে এমন কিছু শরিক করার জন্য পীড়াপীড়ি করে যার সম্পর্কে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তবে তুমি তাদের আনুগত্য করো না। আমারই কাছে তোমাদের প্রত্যাবর্তনস্থল, অতঃপর আমি তোমাদের জানিয়ে দেব তোমরা যা করতে। (৮) আর যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, আমি অবশ্যই তাদেরকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত করব। (৯)মহান আল্লাহর বাণী: (আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি) ইমাম তিরমিযী কর্তৃক বর্ণিত বর্ণনা অনুযায়ী এই আয়াতটি সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে।
সা'দ (রা.) বলেন: আমার সম্পর্কে চারটি আয়াত নাযিল হয়েছে, অতঃপর তিনি একটি ঘটনা উল্লেখ করেন। সা'দের মা বলেছিলেন: আল্লাহ কি পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দেননি? আল্লাহর কসম! আমি কোনো খাবার গ্রহণ করব না এবং কোনো পানীয় পান করব না যতক্ষণ না আমি মারা যাই অথবা তুমি কুফরিতে ফিরে যাও। তিনি (সা'দ) বলেন: তারা যখন তাকে খাবার খাওয়াতে চাইত, তখন তারা একটি কাঠি দিয়ে জোর করে তার মুখ খুলে দিত। অতঃপর এই আয়াত নাযিল হয়: "আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি।" আবু ঈসা (ইমাম তিরমিযী) বলেন: এই হাদীসটি হাসান-সহীহ।
সা'দ (রা.) থেকে আরও বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন: আমি আমার মায়ের প্রতি অত্যন্ত সদ্ব্যবহারকারী ছিলাম। যখন আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম, তখন তিনি বললেন: হয় তুমি তোমার এই দ্বীন ত্যাগ করবে নতুবা আমি খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেব যতক্ষণ না আমি মারা যাই। ফলে তোমাকে এই বলে লজ্জা দেওয়া হবে এবং লোকে বলবে 'হে তার মায়ের হত্যাকারী!'। এভাবে একদিন একরাত কেটে গেল। তখন আমি বললাম: হে মা! আপনার যদি একশটি প্রাণ থাকত এবং একটি একটি করে প্রাণ বেরিয়ে যেত, তবুও আমি আমার এই দ্বীন ত্যাগ করতাম না। এখন আপনার ইচ্ছা হলে খেতে পারেন আর ইচ্ছা হলে নাও খেতে পারেন। যখন তিনি সা'দের দৃঢ়তা দেখলেন, তখন তিনি খাওয়া-দাওয়া করলেন এবং আয়াত নাযিল হলো: (আর যদি তারা তোমাকে আমার সাথে শরিক করার জন্য পীড়াপীড়ি করে...) শেষ পর্যন্ত।
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন: এটি আবু জাহেলের বৈমাত্রেয় ভাই আইয়াশ ইবনে আবি রাবিআ-র ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে, কারণ তার মা-ও অনুরূপ আচরণ করেছিলেন। তাঁর থেকে আরও বর্ণিত হয়েছে যে: এটি সমগ্র উম্মতের ক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়েছে, কেননা আল্লাহর পরীক্ষায় কেবল 'সিদ্দীক' তথা সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিরাই ধৈর্য ধারণ করতে পারে। বসরা অঞ্চলের ভাষাবিদদের মতে "হুসনান" (সদ্ব্যবহার) শব্দটি উহ্য ক্রিয়া পুনরাবৃত্ত হওয়ার কারণে নসব (যবর) যুক্ত হয়েছে, অর্থাৎ "আমরা তাকে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছি"। আবার বলা হয়েছে: এটি 'আল-কাত' তথা একটি পৃথক বাক্য হিসেবে এসেছে যার উহ্য রূপ হলো "আমরা তাকে উত্তমের নির্দেশ দিয়েছি" যেমন কেউ বলে "আমি তাকে কল্যাণের অসিয়ত করেছি" অর্থাৎ...(১).
শাজারু ফাহা: অর্থাৎ তারা তার মুখের ভেতর কাঠের টুকরো বা কাঠি ঢুকিয়ে দিয়েছিল যাতে এর মাধ্যমে তার মুখ খোলা যায়। [ ..... ]
তিনি তাদের বিষয়ে নীরব থাকলেন, অতঃপর এই আয়াত অবতীর্ণ হলো: হে মুমিনগণ, নিশ্চয়ই মদ ও জুয়া...
(আয়াতের শেষ পর্যন্ত)। তখন আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: মদ হারাম করা হয়েছে।ইবনে জারীর, ইবনে মুনযির, ইবনে আবি হাতিম, আবুশ শায়খ, ইবনে মারদুওয়াইহ এবং আন-নাহহাস তাঁর 'নাসিখ' গ্রন্থে সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: মদ হারাম হওয়ার বিষয়টি আমার ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়েছে। জনৈক আনসারী ব্যক্তি খাবার তৈরি করে আমাদের দাওয়াত দিলেন। কিছু লোক সেখানে উপস্থিত হয়ে আহার ও পান করল, এমনকি তারা মদ পানে মত্ত হয়ে উঠল।আর এটি মদ হারাম হওয়ার পূর্বের ঘটনা।অতঃপর তারা নিজেদের নিয়ে গর্ব করতে শুরু করল।
আনসাররা বলল: আনসাররাই শ্রেষ্ঠ, আর কুরাইশরা বলল: কুরাইশরাই শ্রেষ্ঠ।তখন এক ব্যক্তি উটের চোয়ালের হাড় নিয়ে আমার নাকে আঘাত করল এবং তা বিদীর্ণ করে দিল। ফলে সা'দের নাক বিদীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। তিনি বলেন: আমি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে এসে বিষয়টি তাঁর কাছে উল্লেখ করলাম। তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হলো: হে মুমিনগণ, নিশ্চয়ই মদ ও জুয়া...
আয়াতের শেষ পর্যন্ত।ইবনে জারীর ইবনে শিহাবের সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, সালেম ইবনে আব্দুল্লাহ তাঁকে হাদীস শুনিয়েছেন যে, মদ হারামের প্রাথমিক কারণ ছিল সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস এবং তাঁর কিছু সাথী মদ পান করেন এবং পরস্পরে বিবাদে লিপ্ত হন।
এতে তারা সা'দের নাক ভেঙে ফেলেন। ফলে আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করেন: নিশ্চয়ই মদ ও জুয়া...
(এই আয়াত)।তাবারানী সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আল্লাহর কিতাবের তিনটি আয়াত আমার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। মদের নিষেধাজ্ঞা অবতীর্ণ হলো; আমি এক ব্যক্তির সাথে পানশালায় ছিলাম, তখন আমাদের মাঝে বাদানুবাদ হলো এবং আমি তার সাথে মাতলামি করলাম ও তাকে আহত করলাম। তখন আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করেন: হে মুমিনগণ, নিশ্চয়ই মদ ও জুয়া...
তাঁর এই বাণী পর্যন্ত: তবে কি তোমরা বিরত হবে না?
এবং আমার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে: আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি
(সূরা আনকাবুত, আয়াত ৮), তার মা তাকে কষ্টের সাথে গর্ভে ধারণ করেছে
—আয়াতের শেষ পর্যন্ত।
আর অবতীর্ণ হয়েছে: হে মুমিনগণ! তোমরা যখন রাসূলের সাথে চুপি চুপি কথা বলতে চাও, তখন তোমাদের সেই কথার পূর্বে কিছু সদকা পেশ করো
(সূরা মুজাদালা, আয়াত ১২)। আমি সামান্য পরিমাণ (একটি দানা পরিমাণ) সদকা পেশ করেছিলাম, তখন আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: নিশ্চয়ই তুমি অত্যন্ত মিতব্যয়ী। এরপর অন্য আয়াতটি অবতীর্ণ হলো: তোমরা কি (সদকা) পেশ করতে ভয় পেয়ে গেলে...
(সূরা মুজাদালা, আয়াত ১৩) আয়াতের শেষ পর্যন্ত।আবদ বিন হুমাইদ, নাসাঈ, ইবনে জারীর, ইবনে মুনযির, আবুশ শায়খ, হাকেম (যিনি একে সহীহ বলেছেন), ইবনে মারদুওয়াইহ এবং বায়হাকী ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: মদ হারামের হুকুম আনসারদের দুটি গোত্র সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে।
তারা মদ পান করেছিল এবং যখন তারা নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ল, তখন একে অপরের সাথে অশোভন আচরণ করল। যখন তাদের নেশা কেটে গেল, তখন তাদের কেউ তার মুখে, মাথায় ও দাড়িতে আঘাতের চিহ্ন দেখতে পেল এবং বলতে লাগল: আমার ভাই অমুক আমার সাথে এমন করেছে। অথচ তারা ভাই ভাই ছিল এবং তাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ ছিল না। সে বলল: আল্লাহর কসম, যদি সে আমার প্রতি সদয় হতো তবে এমন করত না।
