Al-Hajj
আল-হাজ্জ: 25
আরবি
إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُوا۟ وَيَصُدُّونَ عَن سَبِيلِ ٱللَّهِ وَٱلْمَسْجِدِ ٱلْحَرَامِ ٱلَّذِى جَعَلْنَـٰهُ لِلنَّاسِ سَوَآءً ٱلْعَـٰكِفُ فِيهِ وَٱلْبَادِ ۚ وَمَن يُرِدْ فِيهِ بِإِلْحَادٍۭ بِظُلْمٍ نُّذِقْهُ مِنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ
English Translations
Indeed, those who have disbelieved and avert [people] from the way of Allāh and [from] al-Masjid al-Ḥarām, which We made for the people - equal are the resident therein and one from outside - and [also] whoever intends [a deed] therein of deviation [in religion] by wrongdoing - We will make him taste of a painful punishment.
Verily! Those who disbelieve and hinder (men) from the Path of Allah, and from Al-Masjid-al-Haram (at Makkah) which We have made (open) to (all) men, the dweller in it and the visitor from the country are equal there [as regards its sanctity and pilgrimage (Hajj and 'Umrah)]. And whoever inclines to evil actions therein or to do wrong (i.e. practise polytheism and leave Islamic Monotheism), him We shall cause to taste a painful torment.
Surely (We will punish) those who disbelieve and prevent (people) from the way of Allah and from Al-Masjid-ul-Harām (the Sacred Mosque), which We have made for all men, where residents and visitors are all equal. And whoever intends therein to commit deviation with injustice, We will make him taste a painful punishment.
Indeed those who disbelieve and who (now) hinder people from the Way of Allah and hinder them from the Holy Mosque which We have set up (as a place of worship) for all people, equally for those who dwell therein and for those who come from outside, (they surely deserve punishment). Whosoever deviates therein from the Right Way and acts with iniquity, We shall cause him to taste a painful chastisement.
Lo! those who disbelieve and bar (men) from the way of Allah and from the Inviolable Place of Worship, which We have appointed for mankind together, the dweller therein and the nomad: whosoever seeketh wrongful partiality therein, him We shall cause to taste a painful doom.
As to those who have rejected (Allah), and would keep back (men) from the Way of Allah, and from the Sacred Mosque, which We have made (open) to (all) men - equal is the dweller there and the visitor from the country - and any whose purpose therein is profanity or wrong-doing - them will We cause to taste of a most Grievous Penalty.
বাংলা অনুবাদ
যারা কুফুরী করে আর আল্লাহর পথে (মানুষের চলার ক্ষেত্রে) বাধা সৃষ্টি করে আর মাসজিদে হারামে যেতেও- যাকে আমি করেছি স্থানীয় বাসিন্দা ও অন্যদেশবাসী সকলের জন্য সমান। যে তাতে অন্যায়ভাবে কোন ধর্মদ্রোহী কাজ করার ইচ্ছে করে তাকে আমি আস্বাদন করাব ভয়াবহ শাস্তি।
নিশ্চয় যারা কুফরী করে এবং আল্লাহর পথ থেকে ও মসজিদে হারাম থেকে বাধা দেয়, যাকে আমি স্থানীয় ও বহিরাগত সকলের জন্য সমান করেছি। আর যে ব্যক্তি সীমালঙ্ঘন করে সেখানে পাপকাজ করতে চায়, তাকে আমি যন্ত্রণাদায়ক আযাব আস্বাদন করাব।
যারা কুফরী করে এবং মানুষকে নিবৃত্ত করে আল্লাহর পথ হতে ও মাসজিদুল হারাম হতে, যা আমি করেছি স্থানীয় ও বহিরাগত সবারই জন্য সমান, আর যে ইচ্ছা করে ওতে পাপ কাজের সীমা লংঘন করে তাকে আমি আস্বাদন করাব মর্মন্তদ শাস্তি।
নিশ্চয় যারা কুফরী করেছেও মানুষকে বাধা দিয়েছে আল্লাহর পথ থেকে ও মসজিদুল হারাম থেকে, যা আমরা করেছি স্থানীয় ও বহিরাগত সব মানুষের জন্য সমান, আর যে সেখানে অন্যায়ভাবে ‘ইলহাদ’ তথা দীনবিরোধী পাপ কাজের ইচ্ছে করে তাকে আমরা আস্বাদন করাব যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
যারা কুফরী করে এবং মানুষকে বাধা দেয় আল্লাহর পথ হতে ও মাসজিদুল হারাম হতে, যা আমি করেছি স্থানীয় ও বহিরাগত সকলের জন্য সমান, আর যে ইচ্ছা করে সীমালংঘন করে তাতে পাপ কার্যের, তাকে আমি আস্বাদন করাব যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
২৫. যারা আল্লাহর সাথে কুফরি করে এবং অন্যদেরকে ইসলামে প্রবেশ করা থেকে দূরে সরিয়ে দেয় উপরন্তু মানুষদেরকে মসজিদে হারামে আসতেও তারা বাধা দেয় -যেমনিভাবে মুশরিকরা হুদাইবিয়ার বছর তা করেছে- আমি অচিরেই তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি আস্বাদন করাবো। যে মসজিদকে আমি মানুষের জন্য সালাত আদায়ের কিবলা এবং হজ্জ ও উমরাহর বিধানাবলী বাস্তবায়নের জায়গা বানিয়েছি। যাতে মক্কার অধিবাসী এবং মক্কার অধিবাসী ছাড়াও অন্যান্য আগন্তুক সমান। যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোন গুনাহে লিপ্ত হয়ে সেখানে সত্যভ্রষ্ট হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে আমি তাকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি আস্বাদন করাবো।
তাফসীর
আল্লাহ তাআলা কাফিরদের এ কাজ খণ্ডন করছেন যে, তারা মুসলমানদেরকে মসজিদুল-হারাম হতে নিবৃত্ত রাখতো এবং তাদেরকে হজ্জের আহকাম পালন করা হতে বিরত রাখতো। এতদসত্ত্বেও তারা নিজেদেরকে আল্লাহর ওয়ালী বা প্রিয় পাত্র মনে করতো। অথচ তার ওয়ালী তো তারাই যাদের অন্তরে আল্লাহর ভয় আছে। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, এটা মাদানী আয়াত। যেমন মহান আল্লাহ সূরা বাকারায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “পবিত্র মাসে যুদ্ধ করা সম্পর্কে লোকেরা তোমাকে জিজ্ঞেস করে, তুমি বলে দাওঃ ওতে যুদ্ধ করা ভীষণ অন্যায়, কিন্তু আল্লাহর পথে বাধা দান করা, আল্লাহকে অস্বীকার করা, মসজিদুল-হারামে বাধা দেয়া এবং ওর বাসিন্দাকে ওখান থেকে বহিষ্কার করা আল্লাহর নিকট তদপেক্ষা বেশী অন্যায়।”(২:২১৭) এই আয়াতে এই তারতীব বিন্যাসই রয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলার উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের বিশেষণ এই যে, যারা ঈমান আনে তাদের অন্তর আল্লাহর যিকরের কারণে প্রশান্ত থাকে। জেনে রেখো, আল্লাহর স্বরণেই চিত্ত প্রশান্ত হয়।” (১৩:২৮)। মসজিদুল-হারামকে আল্লাহ তাআলা সবারই জন্যে সমানভাবে মর্যাদাপূর্ণ করেছেন। এতে স্থানীয় ও বহিরাগতদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। মক্কাবাসীও মসজিদে হারামে যেতে পারে এবং বাইরের লোকও পারে। তথাকার ঘরবাড়ীতে তথাকার বাসিন্দা ও বাইরের লোক সমান অধিকার রাখে। এই মাসআলায় ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বলের (রঃ) সামনে ইমাম শাফেয়ী (রঃ) ও ইমমি ইসহাক ইবনু রাহওয়াই-এর (রঃ) মধ্যে মতানৈক্য হয়। ইমাম শাফেয়ী (রাঃ) বলেন যে, মক্কার ঘর বাড়ীগুলোকে মালিকানাধীনে আনা যেতে পারে, ওয়ারিসদের মধ্যে বন্টন করা যেতে পারে এবং ভাড়াও দেয়া যেতে পারে। দলীল হিসেবে তিনি ইমাম যুহীর (রঃ) বর্ণিত হাদীসটি পেশ। করেছেন। তা এই যে, হযরত উসামা ইবনু যায়েদ (রাঃ) রাসূলুল্লাহকে (সঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আগামীকাল আপনি আপনার মক্কার বাড়ীতে প্রবেশ করবেন কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “আকীল আমার জন্যে কি কোন বাড়ী ছেড়েছে?” অতঃপর তিনি বলেনঃ “কাফির মুসলমানের উত্তরাধিকারী হয় না এবং মুসলমান কাফিরের ওয়ারিস হয় না।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে তাখরীজ করা হয়েছে)ইমাম শাফেয়ীর (রঃ) আরো দলীল এই যে, হযরত উমার ইবনু খাত্তাব (রাঃ) হযরত সাফওয়ান ইবনু উমাইয়ার (রাঃ) বাড়ীটি চার হাজার দিরহামের বিনিময়ে ক্রয় করে নিয়ে ওটাকে জেল খানা বানিয়েছেন। তাউস (রঃ) আমর ইবনু দীনারও (রঃ) এই মাসআ’লায় ইমাম শাফিয়ীর (রঃ) সাথে একমত হয়েছেন।ইমাম ইসহাক ইবনু রাওয়াই (রঃ) ইমাম শাফেয়ীর (রঃ) বিপরীত মত পোষণ করেন। তিনি বলেন যে, মক্কার ঘরবাড়ী ওয়ারিসদের মধ্যেও বন্টন করা যাবে না এবং ভাড়ার উপরও দেয়া চলর্বে না। পূর্ব যুগীয় গুরুজনদের একটি দলও এদিকেই গিয়েছেন। মুজাহিদ (রঃ) ও আতা’ও (রঃ) এ কথাই বলেন। তাদের দলীল হলো নিম্নের হাদীসটিঃ হযরত উছমান ইবনু আবি সুলাইমান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আলকামা ইবনু ফাযলাহ্ (রাঃ) বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ), হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযরত উমার (রাঃ) ইন্তেকাল করেছেন, (তাদের যামানায়) মক্কার ঘরবাড়ীকে আযাদ ও মালিকানাবিহীন হিসেবে গণ্য করা হতো। প্রয়োজন হলে তাতে বাস করতেন, অন্যথায় অপরকে বসবাসের জন্যে প্রদান করতেন।” (এটা ইমাম ইবনু মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) বলেন যে, মক্কা শরীফের ঘরবাড়ী বিক্রি করাও জায়েয নয় এবং ভাড়া নেয়াও বৈধ নয়।” (এটা আবদুর রাযযাক ইবনু মুজাহিদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত আতা’ও (রঃ) হারাম শরীফে ভাড়া নিতে নিষেধ করেছেন। হযরত উমার ইবনু খাত্তাব (রাঃ) মক্কার ঘরে দরজা রাখতে নিষেধ করতেন। কেননা, প্রাঙ্গনে বা চত্বরে হাজীরা অবস্থান করতেন। সর্বপ্রথম ঘরের দর নির্মাণ করেন সাহল ইবনু আমর (রাঃ)। হযরত উমার (রাঃ) তৎক্ষণাৎ তাঁকে তাঁর কাছে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি এসে বলেনঃ “হে আমীরুল মু'মিনীন! আমাকে ক্ষমা করুন! আমি একজন ব্যবসায়ী লোক। আমি প্রয়োজন বশতঃ এই দরজা বানিয়েছি, যাতে আমার সওয়ারী পশু আমার আয়াত্ত্বের মধ্যে থাকে। তখন হযরত উমার (রাঃ) তাকে বলেনঃ “তা হলে ঠিক আছে তোমাকে অনুমতি দেয়া হলো। অন্য রিওয়াইয়াতে হযরত উমার ফারূকের (রাঃ) নির্দেশ নিম্নলিখিত ভাষায় বর্ণিত আছেঃ “হে মক্কাবাসীরা! তোমরা তোমাদের ঘর গুলিতে দরজা করো না, যাতে বাইরের লোক যেখানে ইচ্ছা সেখানেই অবতরণ করতে পারে।"হযরত আতা’ (রঃ) বলেন যে, এতে শহুরে লোক ও বিদেশী লোক সমান। তারা যেখানে ইচ্ছা সেখানেই অবতরণ করতে পারে।হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনু আমর (রাঃ) বলেন যে, যারা মক্কা শরীফের ঘর বাড়ীর ভাড়া নেয় তারা আগুন ভক্ষণ করে।ইমাম আহমাদ (রঃ) এই দুই-এর মাঝামাঝি পথটি পছন্দ করেছেন। অর্থাৎ মক্কার বাড়ী ঘরের অধিকারিত্ব ও উত্তরাধিকারকে জায়েয বলেছেন বটে, কিন্তু ভাড়া নেয়াকে অবৈধ বলেছেন। এ সব ব্যাপারে মহান আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।আরববাসী কোন কোন তাফসীরকার বলেছেন যে এখানে (আরবী) এর (আরবী) অক্ষরটি অতিরিক্ত। যেমন (আরবী) এর মধ্যে (আরবী) অক্ষরটি অতিরিক্ত এবং অনুরূপভাবে আশীর কবিতাংশে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের পরিবারবর্গের রিকের জামিন হয়েছে আমাদের বর্শাগুলি।" এখানেও অক্ষরটি অতিরিক্ত রূপে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু এর চেয়েও উত্তম কথা আমরা বলতে পারি যে, এখানকার (আরবী) বা ক্রিয়াটি (আরবী) (ইচ্ছা করে) এর অর্থকে অন্তর্ভুক্ত করে। এ জন্যেই (আরবী) এর সাথে এটা (আরবী) হয়েছে।(আরবী) শব্দের ভাবার্থ হলো কাবীরা ও লজ্জাজনক পাপ। এখানে (আরবী) এর অর্থ হলো ইচ্ছাপূর্বক। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) এর অর্থ হলো শিরক। ভাবার্থ এটাও যে, হারাম শরীফের মধ্যে আল্লাহর হারামকৃত কাজকে হালাল মনে করা। যেমন কোন দুষ্কর্ম করা কাউকে হত্যা করা এবং যে যুলুম করে নাই তার উপর যুলুম করা ইত্যাদি। এই ধরনের লোক যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির যোগ্য। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, সেখানে যে কোন দুষ্কর্ম করাই হলো যুলুম ।হারাম শরীফের বৈশিষ্ট্য এটাই যে, কোন দূরদেশীয় লোক যখন সেখানে কোন দুষ্কর্ম করার সংকল্প করে তখন সে শাস্তির যোগ্য হয়ে যায় যদিও সে ওটা করে না বসে।হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, যদি কোন লোক আদনে থাকে এবং মক্কায় ইলহাদ ও যুলুমের ইচ্ছা করে তবেও আল্লাহ তাআলা তাকে বেদনাদায়ক শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাবেন। শু’বা (রঃ) বলেনঃ “উনি তো এটাকে মার’রূপে বর্ণনা করেছেন, কিন্তু আমি মারফুরূপে বর্ণনা করি না। এর আরো সনদ রয়েছে যা বিশুদ্ধ এবং এটা মারফু হওয়া অপেক্ষা মাওকূফ হওয়াই সঠিকতর। সতঃ হযরত ইবনু মাসউদের (রাঃ) উক্তি হতেই এটা বর্ণিত হয়েছে। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, কারো উপর শুধু পাপ কার্যের ইচ্ছার কারণেই পাপ লিখা হয় না। কিন্তু যদি সে দূর দূরান্তরে থেকে যেমন আদনে থেকেই হারাম শরীফের কোন লোককে হত্যা করার ইচ্ছা করে তবে আল্লাহ তাআলা তাকে বেদনাদায়ক শান্তির স্বাদ গ্রহণ করাবেন। হযরত সাঈদ ইবনু জুবাইর (রাঃ) বলেন যে, হারাম শরীফে কারো তার নিজের খাদেমকে গালি দেয়াও ইলহাদ বা সীমা লংঘনের মধ্যে গণ্য।হযরত ইবনু আব্বাসের (রাঃ) উক্তি এই যে, এখানে এসে কোন ধনী ব্যক্তির ব্যবসা করাও ইলহাদের অন্তর্ভুক্ত। হযরত ইবনু উমার (রাঃ) বলেন যে, মক্কায় শস্য বিক্রি করাও ইলহাদ বা সীমালংঘন। হাবীব ইবনু আবিসাবিত (রাঃ) বলেন যে, উচ্চ মূল্য বিক্রি করার উদ্দেশ্যে শস্যকে মক্কায় আটক রাখাও ইলহাদের মধ্যে গণ্য। মুসনাদে ইবনু আবি হাতিমেও রাসূলুল্লাহর (সঃ) উক্তি দ্বারা এটাই বর্ণিত আছে। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই আয়াতটি আবদুল্লাহ ইবনু আনীসের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে একজন মুহাজির ও একজন আনসারের সাথে পাঠিয়েছিলেন। একবার তাদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ নসব নামার (বংশ তালিকার) উপর গর্ব করতে শুরু করে। সে তখন ক্রোধান্বিত হয়ে আনসারীকে হত্যা করে ফেলে। অতঃপর সে মক্কায় পালিয়ে যায় এবং মুরতাদ হয়ে যায়। তাহলে ভাবার্থ হবেঃ যে সীমালংঘন করে মক্কায় আশ্রয় নেবে (তার জন্যে রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি) ।এ ‘আছার’সমূহ দ্বারা যদিও এটা বুঝা যাচ্ছে যে, এ সব কাজ ইলহাদ বা সীমালংঘনের অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা এসবগুলি হতে অধিকতর সাধারণ। বরং এতে সতর্কতা রয়েছে এর চেয়ে বড় বিষয়ের উপর। এজন্যেই যখন হাতীওয়ালারা বায়তুল্লাহ শরীফ ধ্বংস করার ইচ্ছা করে তখন আল্লাহ তাআলা তাদের উপর ঝাঁকে ঝাঁকে পাখী পাঠিয়ে দেন, যেগুলি তাদের উপর কংকন নিক্ষেপ করে তাদেরকে ধ্বংস করে দেয় এবং এটাকে অন্যদের জন্যে শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যম বানিয়ে দেন। একারণেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এক সেনাবাহিনী এই বায়তুল্লাহতে যুদ্ধ করতে আসবে। যখন তারা এখানে পৌছবে তাদের প্রথম ও শেষ সবকেই যমীনে ধ্বসিয়ে দেয়া হবে (শেষ পর্যন্ত)।বর্ণিত আছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনু যুবায়েরকে (রাঃ) বলেনঃ “তুমি এখানে ইলহাদ করা হতে বেঁচে থাকো! আমি রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বলতে শুনেছিঃ “এখানে একজন কুরায়েশী ইলহাদ করবে। তার পাপরাশি যদি সমস্ত দানব ও মানবের পাপরাশি দ্বারা ওজন করা হয় তবে তার পাপরাশিই বেশী হয়ে যাবে।”দেখো, তুমিই যেন ঐ ব্যক্তি হয়ে না যাও।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে) আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, তিনি তাকে হাতীমে বসে এই উপদেশ দিয়েছিলেন।
নিশ্চয় যারা কুফরী করেছেও মানুষকে বাধা দিয়েছে আল্লাহর পথ [১] থেকে ও মসজিদুল হারাম থেকে [২]। যা আমরা করেছি স্থানীয় ও বহিরাগত সব মানুষের জন্য সমান [৩], আর যে সেখানে অন্যায়ভাবে ‘ইলহাদ [৪]’ তথা দ্বীনবিরোধী পাপ কাজের ইচ্ছে করে তাকে আমরা আস্বাদন করাব যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
[১] আল্লাহর পথ বলে ইসলামকে বোঝানো হয়েছে। আয়াতের অর্থ এই যে, তারা নিজেরা তো ইসলাম থেকে দূরে সরে আছেই; অন্যদেরকেও ইসলাম থেকে বাধা দেয়। [ফাতহুল কাদীর]
[২] এটা তাদের দ্বিতীয় গোনাহ। তারা মুসলিমদেরকে মসজিদুল হারামে প্রবেশ করতে বাধা দেয়। মসজিদুল হারাম' ঐ মসজিদকে বলা হয়, যা বায়তুল্লাহর চতুস্পার্শ্বে নির্মিত হয়েছে। এটা মক্কার হারাম শরীফের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু কোন কোন সময় মসজিদুল হারাম" বলে মক্কার সম্পূর্ণ হারাম শরীফ বোঝানো হয়; যেমন হুদায়বিয়ার ঘটনাতে মক্কার কাফেররা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে শুধু মসজিদে হারামে প্রবেশে বাধা দেয়নি; বরং হারামের সীমানায় প্রবেশ করতে বাধা দান করেছিল। সহীহ হাদীস দ্বারা তা-ই প্রমাণিত রয়েছে। কুরআনুল করীম এ ঘটনায় মসজিদুল হারাম শব্দটি সাধারণ হারাম অর্থে ব্যবহার করেছে এবং বলেছেঃ
وَصَدُّوْكُمْ عَنِ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ
[সূরা আল-ফাতহঃ ২৫] তাফসীরে দুররে-মানসূরে এ স্থানে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে রেওয়ায়েত বৰ্ণনা করা হয়েছে যে, আয়াতে মসজিদে হারাম বলে হারাম এলাকা বোঝানো হয়েছে। [ফাতহুল কাদীর]
[৩] এখানে যারা কুফরি করেছে, আল্লাহর পথ থেকে বাধা দিচ্ছে এবং মাসজিদুল হারাম থেকে বাধা দেয়। তাদের কি অবস্থা হবে সেটা উল্লেখ করা হয় নি। তবে আয়াত থেকে সেটা বুঝা যায়, আর তা হচ্ছে, তারা ক্ষতিগ্ৰস্ত হবে বা ধ্বংস হবে। [ফাতহুল কাদীর]
আয়াতে বর্ণিত সব মানুষের জন্য সমান' বলে বুঝানো হয়েছে যে, হারাম কোন ব্যক্তি, পরিবার বা গোত্রের নিজস্ব সম্পত্তি নয়। বরং সর্বসাধারণের জন্য ওয়াকফকৃত, যার যিয়ারত থেকে বাধা দেবার অধিকার কারো নেই। মাসজিদুল হারাম ও হারাম শরীফের যে যে অংশে হজের ক্রিয়াকর্ম পালন করা হয়; যেমন- ছাফা-মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থান, মীনার সমগ্র ময়দান, আরাফাতের সম্পূর্ণ ময়দান এবং মুযদালিফার গোটা ময়দান, এসব ভূখণ্ড সারা বিশ্বের মুসলিমদের জন্য সাধারণ ওয়াকফ। কোন ব্যক্তি বিশেষের ব্যক্তিগত মালিকানা এগুলোর উপর কখনো হয়নি এবং হতেও পারে না। এ বিষয়ে সমগ্র উম্মত ও ফেকাহবিদগণ একমত। এগুলো ছাড়া মক্কা মুকাররমার সাধারণ বাসগৃহ এবং হারামের অবশিষ্ট ভূখণ্ড সম্পর্কেও কোন কোন ফেকাহাবিদ বলেন যে, এগুলোও সাধারণ ওয়াকফ সম্পত্তি। এগুলো বিক্রয় করা ও ভাড়া দেয়া হারাম। প্রত্যেক মুসলিম যে কোন স্থানে অবস্থান করতে পারে। তবে অধিকসংখ্যক ফেকাহবিদগণের উক্তি এই যে, মক্কার বাসগৃহসমূহের উপর ব্যক্তিবিশেষের মালিকানা হতে পারে। কারণ, ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে প্রমাণিত আছে যে, তিনি সফওয়ান ইবনে উমাইয়ার বাসগৃহ ক্রয় করে কয়েদীদের জন্য জেলখানা নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু আলোচ্য আয়াতে হারামের যে যে অংশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো সর্বাবস্থায় সাধারণ ওয়াকফ। এগুলোতে প্রবেশে বাধা দেয়া হারাম। আলোচ্য আয়াত থেকে এই অবৈধতা প্রমাণিত হয়। [দেখুন, কুরতুবী; ফাতহুল কাদীর]
[৪] অভিধানে إلحاد এর অর্থ সরল পথ থেকে সরে যাওয়া, ঝুঁকে পড়া। অর্থাৎ কোন বড় মারাত্মক গোনাহ করার ইচ্ছা পোষণ করাই ইলাহাদ। [ইবন কাসীর] তবে এখানে আল্লাহ তা’আলা যুলুমের সাথে ইলহাদের কথা বলেছেন। ইবন আব্বাস এর অর্থ করেছেন, ইচ্ছাকৃতভাবে এ অপরাধ করা। ইবন আব্বাস থেকে অপর বর্ণনায় এসেছে, হারাম শরীফে আল্লাহ যা হারাম করেছেন যেমন, হত্যা, খারাপ আচরণ, এসবের কোন কিছুকে হালাল মনে করা। ফলে যে যুলুম করেনি তার উপর যুলুম করা, যে হত্যা করেনি তাকে হত্যা করা। সুতরাং কেউ যদি এ ধরনের কোন আচরণ করে তবে আল্লাহ তার জন্য মর্মন্তুদ শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন। অপর কারও কারও মতে, এখানে যুলুম অর্থ শির্ক। মুজাহিদ বলেন, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও ইবাদত করা। মুজাহিদ থেকে অপর বর্ণনায় এসেছে যে, কোন খারাপ করাই যুলুম শব্দ দ্বারা উদ্দেশ্য। [ইবন কাসীর] মোটকথা: যাবতীয় খারাপ কাজই এর মধ্যে শামিল হবে। যদিও সকল অবস্থায় খারাপ কাজ করা পাপ কিন্তু হারাম শরীফে একাজ করা আরো অনেক বেশী মারাত্মক পাপ। মুফাসসিরগণ বিনা প্রয়োজনে কসম খাওয়া কিংবা চাকরদেরকে গালি দেয়াকে পর্যন্ত হারাম শরীফের মধ্যে বেদ্বীনী গণ্য করেছেন এবং একে এ আয়াতের ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে এই আয়াতের তাফসীর এরূপও বর্ণিত আছে যে, হারাম শরীফ ছাড়া অন্যত্ৰ পাপ কাজের ইচ্ছা করলেই পাপ লেখা হয় না, যতক্ষণ না তা কার্যে পরিণত করা হয়। কিন্তু হারামে শুধু পাকাপোক্ত ইচ্ছা করলেই গোনাহ লেখা হয়। [ইবন কাসীর]
