Al-Hajj
আল-হাজ্জ: 52
আরবি
وَمَآ أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ مِن رَّسُولٍ وَلَا نَبِىٍّ إِلَّآ إِذَا تَمَنَّىٰٓ أَلْقَى ٱلشَّيْطَـٰنُ فِىٓ أُمْنِيَّتِهِۦ فَيَنسَخُ ٱللَّهُ مَا يُلْقِى ٱلشَّيْطَـٰنُ ثُمَّ يُحْكِمُ ٱللَّهُ ءَايَـٰتِهِۦ ۗ وَٱللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
English Translations
And We did not send before you any messenger or prophet except that when he spoke [or recited], Satan threw into it [some misunderstanding]. But Allāh abolishes that which Satan throws in; then Allāh makes precise His verses. And Allāh is Knowing and Wise.
Never did We send a Messenger or a Prophet before you, but; when he did recite the revelation or narrated or spoke, Shaitan (Satan) threw (some falsehood) in it. But Allah abolishes that which Shaitan (Satan) throws in. Then Allah establishes His Revelations. And Allah is All-Knower, All-Wise:
We did not send any messenger before you nor a prophet, but (he faced a situation that) when he recited (the revelation), the Satan cast (doubts in the hearts of his opponents) about what he recited. So, Allah nullifies what the Satan casts, then Allah makes His verses firm, and Allah is All-Knowing, All-Wise
Never did We send a Messenger or a Prophet before you (O Muhammad), but that whenever he had a desire, Satan interfered with that desire. Allah eradicates the interference of Satan and strengthens His Signs. Allah is All-Knowing, All-Wise.
Never sent We a messenger or a prophet before thee but when He recited (the message) Satan proposed (opposition) in respect of that which he recited thereof. But Allah abolisheth that which Satan proposeth. Then Allah establisheth His revelations. Allah is Knower, Wise;
Never did We send a messenger or a prophet before thee, but, when he framed a desire, Satan threw some (vanity) into his desire: but Allah will cancel anything (vain) that Satan throws in, and Allah will confirm (and establish) His Signs: for Allah is full of Knowledge and Wisdom:
বাংলা অনুবাদ
আমি তোমার পূর্বে যে সব রসূল কিংবা নবী পাঠিয়েছি তাদের কেউ যখনই কোন আকাঙ্ক্ষা করেছে তখনই শয়ত্বান তার আকাঙ্ক্ষায় (প্রতিবন্ধকতা, সন্দেহ-সংশয়) নিক্ষেপ করেছে, কিন্তু শয়ত্বান যা নিক্ষেপ করে আল্লাহ তা মুছে দেন, অতঃপর আল্লাহ তাঁর নিদর্শনসমূহকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। কারণ আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্বশ্রেষ্ঠ হিকমতওয়ালা।
আর আমি তোমার পূর্বে যে রাসূল কিংবা নবী পাঠিয়েছি, সে যখনই (ওহীকৃত বাণী) পাঠ করেছে, শয়তান তার পাঠে (কিছু) নিক্ষেপ করেছে। কিন্তু শয়তান যা নিক্ষেপ করে আল্লাহ তা মুছে দেন। অতঃপর আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূহকে সুদৃঢ় করে দেন। আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, অতি প্রজ্ঞাময়।
আমি তোমার পূর্বে যে সব রাসূল কিংবা নাবী প্রেরণ করেছি তাদের কেহ যখনই কিছু আকাংখা করেছে তখনই শাইতান তার আকাংখায় কিছু প্রক্ষিপ্ত করেছে। কিন্তু শাইতান যা প্রক্ষিপ্ত করে আল্লাহ তা বিদূরিত করেন; অতঃপর আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূহকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
আর আমরা আপনার পূর্বে যে রাসূল কিংবা নবী প্রেরণ করেছি, তাদের কেউ যখনই (ওহীর কিছু) তিলাওয়াত করেছে, তখনই শয়তান তাদের তিলাওয়াতে (কিছু) নিক্ষেপ করেছে, কিন্তু শয়তান যা নিক্ষেপ করে আল্লাহ্ তা বিদূরিত করেন। তারপর আল্লাহ্ তাঁর আয়াতসমূহকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন এবং আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
আমি তোমার পূর্বে যে সমস্ত রাসূল কিংবা নাবী প্রেরণ করেছি তাদের কেউ যখনই কিছু আকাক্সক্ষা করেছে, তখনই শয়তান তার আকাক্সক্ষায় কিছু প্রক্ষিপ্ত করেছে; শয়তান যা কিছু নিক্ষেপ করেছে আল্লাহ তা বিদূরিত করে দেন। অতঃপর আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূহকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়;
৫২. হে রাসূল! আমি আপনার পূর্বে যে রাসূল বা নবীই পাঠিয়েছি যখন তিনি আল্লাহর কিতাব পড়তেন তখন শয়তান তাঁর পড়ার মধ্যে এমন কিছু ঢুকিয়ে দিতো যা মানুষ ওহী বলেই মনে করতো। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা শয়তানের ঢুকিয়ে দেয়া বস্তুকে বাতিল করে নিজের আয়াতগুলোকে চূড়ান্ত করতেন। বস্তুতঃ আল্লাহ তা‘আলা সব কিছুই জানেন। তাঁর নিকট কোন কিছুই গোপন নয়। তিনি তাঁর সৃষ্টি, নির্ধারণ ও পরিচালনায় অত্যন্ত প্রজ্ঞাময়।
তাফসীর
৫২-৫৪ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে তাফসীরকারদের অনেকেই গারানীকের কাতি বর্ণনা করেছেন এবং এটাও বর্ণনা করেছেন যে, এই ঘটনার কারণে আবির য়ায় হিজরতকারী সাহাবীগণ মনে করেন যে, মক্কার মুশরিকরা মুসলমান হয়ে গেছে, তাই তাঁর মক্কায় ফিরে আসেন।” (কিন্তু এই রিওয়াইয়াতটির প্রত্যেকটি সনদেই মুরসাল। কোন বিশুদ্ধ সনদে এটা বর্ণিত হয় নাই। এ সব ব্যাপারে আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন)হযরত সাঈদ ইবনু জুবায়ের (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কায় সূরায়ে নাজম তিলাওয়া করেন। যখন তিনি নিম্নলিখিত স্থানে পৌঁছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমরা কি ভেবে দেখেছো ‘লাত’ ও ‘উয’ সম্বন্ধে এবং তৃতীয় আরেকটি ‘মানাত সম্বন্ধে?) (৫৩:১৯-২০) তখন শয়তান তাঁর যুবান মুবারকে নিম্নলিখিত কথাগুলি প্রক্ষিপ্ত করেঃ (আরবী) (অর্থাৎ “এগুলো হলো মহান গারানীক এবং এদের সুপারিশের আশা করা যায়। তাঁর একথা শুনে মুশরিকরা খুবই খুশী হয় এবং বলেঃ “আজ তিনি আমাদের দেবতাদের এমন প্রশংসা করলেন যা তিনি ইতিপূর্বে করেন নাই।" অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) সিজদায় পড়ে যান এবং ওদিকে তারাও সিজদায় পড়ে যায়। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। (এটা মুসনাদে ইবনু আবি হাতিমে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম ইবনু জারীর ও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন। এটা মুরসাল। মুসনাদে বাযযারেও এটা উল্লিখিত হওয়ার পরে রয়েছে যে, শুধু এই সনদেই এটা মুত্তাসিলরূপে বর্ণিত হয়েছে। শুধু উমাইয়া ইবনু খালেদের মাধ্যমেই এটা মুত্তাসিল হয়েছে। তিনি প্রসিদ্ধ ও বিশ্বাস যোগ্য বর্ণনাকারী। শুধু কালবীর পন্থাতেই এটা বর্ণিত হয়েছে। ইবনু আবি হাতিম (রঃ) এটাকে দুটি সনদে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু দু'টোই মুরসাল। ইবনু জারীরও (রঃ) মুরসাল রূপেই এটা বর্ণনা করেছেন)কাতাদা (রঃ) বলেন, যে মাকামে ইবরাহীমের (আঃ) পাশে নামাযরত অবস্থায় রাসূলুল্লাহর (সঃ) একটু তন্দ্রা এসে যায় এবং ঐ সময় শয়তান তাঁর যুবান মুবারকে নিম্ন লিখিত কথাগুলি প্রক্ষিপ্ত করে এবং তার যুবান দিয়ে বেরিয়ে যায়ঃ (আরবী) মুশরিকরা এই কথাগুলি লুফে নেয় এবং শয়তান এটা ছড়িয়ে দেয়। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং তাকে লাঞ্ছিত হতে হয়।ইবনু শিহাব (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সূরায়ে নজুিম অবতীর্ণ হলো এবং মুশরিকরা বলছিলঃ “যদি এই লোকটি (হযরত মুহাম্মদ (সঃ) আমাদের দেবতাগুলির বর্ণনা ভাল ভাষায় করতো তবে তো আমরা তাকে ও তার সঙ্গীদেরকে ছেড়ে দিতাম। কিন্তু তার অবস্থান তো এই যে, সে তার ধর্মের বিরোধী ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের চেয়ে বেশী খারাপ ভাষায় আমাদের দেবতাগুলির বর্ণনা দিচ্ছে এবং তাদেরকে গালি দিচ্ছে।” ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও তাঁর সাহাবীদেরকে কঠিন বিপদের মধ্যে ফেলে দেয়া হয়েছিল। মুশরিকদের হিদায়াত লাভ তিনি কামনা করছিলেন। যখন তিনি সূরায়ে নাজুমের তিলাওয়াত শুরু করেন এবং (আরবী) পর্যন্ত পাঠ করেন তখন শয়তান দেবতাদের নাম উচ্চারণের সময় তাঁর পবিত্র যুবানে নিম্নলিখিত কথাগুলি প্রক্ষিপ্ত করেঃ (আরবী) এটা ছিল শয়তানের ছন্দযুক্ত ভাষা। প্রত্যেক মুশরিকের অন্তরে এই কালেমা বসে যায়। প্রত্যেকের তা মুখস্থ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত এটা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে যে, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) নিজের পূর্ব ধর্ম হতে ফিরে এসেছেন। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সূরায়ে নাজমের তিলাওয়াত শেষ করে সিজদা করেন তখন সমস্ত মুসলমান ও মুশরিকও সিজদায় পড়ে যায়। ওয়ালীদ ইবনু মুগীরা অত্যন্ত বৃদ্ধ ছিল বলে সে এক মুষ্টি মাটি নিয়ে ওটা কপালে ঠেকিয়ে দেয়। সবাই বিস্মিত হয়ে যায়। কেননা, রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে দু'টো দলই সিজদায় ছিল। মুসলমানরা বিস্মিত ছিলেন এই কারণে যে, মুশরিকরা আল্লাহর উপর ঈমান আনে নাই এটা তারা ভালরূপেই জানতেন। অথচ কি করে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও মুসলমানদের সাথে সিজ্দা করলো? শয়তান যে শব্দগুলি মুশরিকদের কানে ফুঁকে দিয়েছিল মুসলমানরা তা শুনতেই পান নাই। এদিকে তাদের অন্তর খোলা ছিল। কেননা, শয়তান শব্দের মধ্যে শব্দ এমনভাবে মিলিয়ে দেয় যে, মুশরিকরা তাতে কোন পার্থক্যই করতে পারছিল না। সে তো তাদের মনে এই দৃঢ় বিশ্বাস জন্মিয়ে দিয়েছিল যে, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই সূরারই এই দু'টো আয়াত পাঠ করেছেন। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে মুশরিকরা তাদের দেবতাগুলিকেই সিজদা করেছিল। শয়তান এই ঘটনাকে এমনভাবে ছড়িয়ে দেয় যে, এ খবর হাবশায় পৌঁছে গিয়েছিল। হযরত উছমান ইবনু মাযউন (রাঃ) এবং তার সঙ্গীরা যখন শুনতে পান যে, মক্কাবাসীরা মুসলমান হয়ে গেছে, এমনকি তারা রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে নামায পড়েছে এবং ওয়ালীদ ইবনু মুগীরা অত্যধিক বুড়ো হওয়ার কারণে এক মুষ্টি মাটি উঠিয়ে নিয়ে তা তার মাথায় ঠেকিয়েছেন এবং মুসলমানরা এখন পূর্ণ শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে রয়েছে তখন তারা সেখান থেকে মক্কায় ফিরে আসার স্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। অতঃপর তারা খুশী মনে মক্কায় ফিরে আসেন। তাঁদের মক্কায় পৌঁছার পূর্বেই আল্লাহ তাআলা শয়তানের ঐ শব্দগুলির রহস্য খুলে দিয়েছিলেন এবং তা সরিয়ে ফেলে স্বীয় কালামকে রক্ষিত রেখেছিলেন। ফলে মুশরিকদের শত্রুতার অগ্নি আরো বেশী প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠেছিল তারা মুসলমানদের উপর নতুন বিপদ আপদের বৃষ্টি বর্ষণ শুরু করে দিয়েছিল।” (এ রিওয়াইয়াতটিও মুরসাল। ইমাম বায়হাকীর (রঃ) কিতাবুল দালায়েলিন নবুওয়াহ’ নামক গ্রন্থেও এ রিওয়াইয়াতটি রয়েছে। ইমাম মুহাম্মদ ইবনু ইসহাক (রঃ) এটাকে স্বীয় সীরাত' গ্রন্থে আনয়ন করেছেন। কিন্তু এই সব সনদই মুরসাল ও মুক্কাতা। এসব ব্যাপারে আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন) ইমাম বাগাভী (রঃ) এ সব কিছু হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) প্রভৃতি গুরুজনের কালাম দ্বারা এভাবেই স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে আনয়ন করেছেন। তারপর নিজেই একটা প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) রক্ষক যখন আল্লাহ তাআলা স্বয়ং, তখন কি করে শয়তানের কালাম মহান আল্লাহর পবিত্র কালামের মধ্যে প্রবেশ করতে পারে? অতঃপর এর বহু জবাব দেয়া হয়েছে। এগুলির মধ্যে একটি সূক্ষ জবাব এও আছে যে, শয়তান এই শব্দগুলি লোকদের কানে নিক্ষেপ করে এবং তাদের মধ্যে এই খেয়াল জাগিয়ে দেয় যে, এই শব্দগুলি রাসূলুল্লাহর (সঃ) পবিত্র মুখ দিয়ে বের হয়েছে। প্রকৃতপক্ষ এরূপ ছিল না। এটা ছিল শুধু শয়তানী কাজ কারবার। এটা রাসূলুল্লাহর (সঃ) মুখের আওয়াজ মোটেই ছিল না। এসব ব্যাপারে সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী এক মাত্র আল্লাহ।মুতাকাল্লেমীন এ ধরনের আরো বহু জবাব দিয়েছেন। কাযী আইয়াও (রঃ) স্বীয় কিতাবুশ শিক্ষা গ্রন্থে এর জবাব দিয়েছেন।মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি তোমার পূর্বে যে সব রাসূল বা নবী পাঠিয়েছি তাদের কেউ যখনই কিছু আকাংখা করেছে, তখনই শয়তান তার আকাংখায় কিছুই প্রক্ষিপ্ত করেছে। এর দ্বারা রাসূলুল্লাহকে (সঃ) সান্ত্বনা দেয়া হয়ে যে, তার এতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনই কারণ নেই। কেননা, তার পূর্ববর্তী নবী রাসূলদেরও এরূপ ঘটনা ঘটেছিল। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) এর অর্থ হলো (তিনি বলেন)। (আরবী) এর অর্থ (আরবী) (তার পঠনে)। (আরবী) এর ভাবার্থ হলোঃ তিনি পড়েন, লিখেন না। অধিকাংশ তাফসীরকার (আরবী) এর অর্থ (আরবী) করেছেন। অর্থাৎ যখন তিনি আল্লাহর কিতাব পাঠ করেন তখন শয়তান ঐ তিলাওয়াতের মধ্যে কিছু প্রক্ষিপ্ত করে। হযরত উছমান (রাঃ) যখন শহীদ হন তখন কবি তার প্রশংসায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি (হ্যরত উছমান (রাঃ) রাত্রির প্রথমভাগে ও শেষ ভাগে। আল্লাহর কিতাব পাঠ করতেন। তিনি তার ভাগ্যে লিখিত মৃত্যুর সাথে সাক্ষাৎ করলেন।” এখানেও। (আরবী) শব্দটিকে পাঠ করার অর্থে ব্যবহার করা। হয়েছে। ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বলেন যে, এই উক্তিটি খুবই নিকটের ব্যাখ্যা বিশিষ্ট। এর আভিধানিক অর্থ হলো (আরবী) অর্থাৎ সরিয়ে ফেলা ও উঠিয়ে দেয়া। মহামহিমান্বিত আল্লাহ সরিয়ে ফেলেন যা শয়তান প্রক্ষিপ্ত করে। হযরত জিবরাঈল (আঃ) শয়তানের বৃদ্ধিকৃত শব্দগুলিকে উঠিয়ে ফেলেন বা মিটিয়ে দেন। ফলে আল্লাহ তাআলার আয়াতগুলি সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।আল্লাহ হলেন সর্বজ্ঞ। কোন গোপনীয় কথা তাঁর কাছে অজানা থাকে না। তিনি সবই জানেন। তিনি প্রজ্ঞাময়। তার সব কাজই নিপুণতাপূর্ণ। এটা এই জন্যে যে, যাদের অন্তরে সন্দেহ, শিরক, কুফরী এবং নিফাক রয়েছে তাদের জন্যে যেন এটা ফিৎনা বা পরীক্ষার বিষয় হয়ে যায়। যেমন, মুশরিকরা ওটাকে আল্লাহর পক্ষ হতে অবতারিত মনে করেছিল; অথচ তা তার পক্ষ হতে অবতারিত ছিল না বরং শয়তানী শব্দ ছিল। সুতরাং যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে’ এর দ্বারা মুনাফিকদেরকে বুঝানো হয়েছে।আর যারা পাষাণ হৃদয়, এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে মুশরিকদেরকে। এও একটি উক্তি যে, এর দ্বারা ইয়াহুদীদেরকে বুঝানো হয়েছে।ঘোষিত হচ্ছেঃ জালিমরা দুস্তর মতভেদে রয়েছে। তারা হক থেকে বহু দূরে সরে গেছে। সরল-সঠিক পথ তারা হারিয়ে ফেলেছে।আর এটা এ জন্যেও যে, যাদেরকে সঠিক জ্ঞান দেয়া হয়েছে তারা যেন জানতে পারে যে, এটা মহান আল্লাহর নিকট হতে প্রেরিত সত্য; অতঃপর তারা যেন তাতে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাদের অন্তর যেন ওর প্রতি অনুগত হয়। এটা আল্লাহর কালাম হওয়ার ব্যাপারে তাদের অন্তরে যেন বিন্দুমাত্র সন্দেহের উদ্রেক না হয়।আল্লাহ তাআলা ঈমানদারদেরকে সরল সঠিক পথে পরিচালিত করে থাকেন। দুনিয়াতে তিনি তাদেরকে হিদায়াত দান করেন, সরল সঠিক পথের সন্ধান দেন এবং আখেরাতে তিনি তাদেরকে জাহান্নামের কঠিন শাস্তি হতে রক্ষা করে জান্নাতে প্রবিষ্ট করবেন এবং সেখানে তারা অফুরন্ত নিয়ামতের অধিকারী হবে।
আর আমরা আপনার পূর্বে যে রাসূল কিংবা নবী প্রেরণ করেছি [১], তাদের কেউ যখনই (ওহীর কিছু) তিলাওয়াত করেছে [২], তখনই শয়তান তাদের তিলাওয়াতে (কিছু) নিক্ষেপ করেছে, কিন্তু শয়তান যা নিক্ষেপ করে আল্লাহ্ তা বিদূরিত করেন [৩]। তারপর আল্লাহ্ তাঁর আয়াতসমূহকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন এবং আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
[১] এ থেকে জানা যায় যে, রাসূল ও নবী এক নয়; পৃথক পৃথক অর্থ রাখে। তবে এ পার্থক্য নির্ধারণে আলেমগণের মধ্যে বিভিন্ন মত রয়েছেঃ
(এক) রাসূল বলা হয়- যার কাছে ওহী পাঠানো হয়েছে এবং প্রচারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে আর নবী বলা হয়- যার কাছে ওহী পাঠানো হয়েছে কিন্তু প্রচারের নির্দেশ দেয়া হয়নি। (দুই) রাসূল হলেন যাকে নতুন শরী‘আত দিয়ে পাঠানো হয়েছে এবং প্রচারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, আর নবী হলেন যাকে পূর্ববর্তী শরীয়াতের অনুসারী সংস্কারক হিসেবে পাঠানো হয়েছে। (তিন) রাসূল হলেন যাকে দ্বীনের বিরোধী কাছে জাতির কাছে পাঠানো হয়েছে, আর নবী হলেন যাকে দ্বীনের স্বপক্ষীয় জাতির কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে সবচেয়ে প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত হল- রাসূল হলেনঃ যাকে দ্বীন-বিরোধী জাতি অর্থাৎ কাফের সম্প্রদায়ের কাছে প্রেরণ করা হয়েছে। তিনি মানুষকে তার কাছে যে শরী‘আত আছে সে শরী‘আতের দিকে আহ্বান করবেন। তাকে সে জাতির কেউ কেউ মিথ্যা প্ৰতিপন্ন করবে এবং তার সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হবে। তিনি প্রচার ও ভীতি প্রদর্শনের জন্য নির্দেশিত হবেন। কখনো কখনো তার সাথে কিতাব থাকবে আর এটাই স্বাভাবিক, আবার কখনো কখনো রাসূলের সাথে কিতাব থাকবে না। কখনো তার শরী‘আত হবে সম্পূর্ণ নতুন, আবার কখনো তার শরী‘আত হবে পূর্ববতী শরী‘আতের পরিপূরক হিসেবে। অর্থাৎ সেখানে বাড়তি বা কমতি থাকবে। আর নবী হলেনঃ যার কাছে ওহী প্রেরণ করা হয়েছে। তিনি মুমিন সম্প্রদায়ের কাছে প্রেরিত হবেন। পূর্ব শরী‘আত অনুযায়ী হুকুম দেবেন। পূর্ব শরী‘আতকে পুনর্জীবিত করবেন এবং সেদিকে মানুষকে আহ্বান করবেন। তাকে প্রচার ও ভীতি প্রদর্শনের নির্দেশও দেয়া হবে। তার জন্য নতুন কিতাব থাকাও অসম্ভব নয়। [এ ব্যাপারে বিস্তারিত দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, আন-নুবুওয়াতঃ ২/৭১৮; ইবনুল কাইয়্যেম, তরীকুল হিজরাতাইন, ৩৪৯; ইবন আবিল ইযয, শারহুত তাহাভীয়্যাঃ ১৫৮; ড. উমর সুলাইমান আল-আশকার, আর-রুসুল ওয়ার রিসালাতঃ ১৪-১৫]
[২] মূল শব্দটি হচ্ছে, تمني (তামান্না)। আরবী ভাষায় এ শব্দটি দু’টি অর্থে ব্যবহৃত হয়। একটি অর্থ হচ্ছে কোন জিনিসের আশা-আকাংখা করা। [ফাতহুল কাদীর] দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে তিলাওয়াত অর্থাৎ কিছু পাঠ করা। তবে আয়াতে تمني শব্দের অর্থ قرأ অর্থাৎ আবৃত্তি করে এবং أمنية শব্দের অর্থ قراءة অর্থাৎ আবৃত্তি করা। [কুরতুবী; ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর] আরবী অভিধানে এ অর্থ প্রসিদ্ধ ও সুবিদিত। আয়াতের অর্থ হল- আল্লাহ্ তা'আলা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পূর্বে যখনই কোন নবী বা রাসূল পাঠিয়েছেন, তিনি যখন মানুষকে উপদেশ দেয়ার জন্য আদেশ-নিষেধ প্রদান করতেন, তখনি সেখানে শয়তান মানুষের কানে তার ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তমূলক এমন কথাবার্তা প্রবিষ্ট করত যা নবীর কথা ও পড়ার সম্পূর্ণ বিপরীত বিষয়। আর আল্লাহ্ যেহেতু নবী-রাসূলদেরকে উম্মতের জন্য প্রচার করা বিষয়সমূহ এবং তাঁর ওহীর হেফাযত ও সম্পূর্ণ নিরাপত্তা বিধান করেছেন, সেহেতু তিনি শয়তানের সে সমস্ত কারসাজি ও ষড়যন্ত্রকে স্থায়িত্ব দেন না; বরং অন্ধুরেই বিনষ্ট করে দেন। ফলে কোনটা আল্লাহ্র আয়াত আর কোনটা তাঁর আয়াত নয়, তা সুস্পষ্ট হয়ে পড়ে। এভাবেই আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর আয়াতসমূহের হেফাযত করে থাকেন। মূলতঃ আল্লাহ্ প্রবল পরাক্রান্ত মহাশক্তিধর। তিনি একদিকে তাঁর সুনির্দিষ্ট হেকমত ও প্রজ্ঞার কারণে শয়তানের পক্ষ থেকে তা হতে দেন। অপরদিকে তাঁর শক্তিতে তাঁর ওহীর হেফাযত করেন। যাতে করে যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে এবং কঠোর হৃদয়ের অধিকারী মানুষদের মনে শয়তানের এ বাক্যগুলো ফেৎনা সৃষ্টি করতে পারে। এর বিপরীতে যাদের কাছে রয়েছে ইলম বা জ্ঞান, তারা এ দু’য়ের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে এবং শয়তানের প্রক্ষিপ্ত বিষয় ত্যাগ করে একমাত্র আল্লাহ্র আয়াতসমূহে বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে। বরং এতে তাদের অন্তরে ঈমান বর্ধিত হয় এবং তারা আল্লাহ্র জন্য বিনম্র ও বিনয়ী হয়ে পড়ে। [বাগভী; কুরতুবী; ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর; সা‘দী থেকে সংক্ষেপিত]
[৩] অর্থাৎ তিনি জানেন শয়তান কোথায় কি বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে এবং তার কি প্রভাব পড়েছে। তাঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা শয়তানী ফিতনার প্রতিবিধান করে থাকে। তিনি শয়তানী চক্রান্তকে কখনো সফল হতে দেন না। প্রক্ষিপ্ত অংশ বাতিল করে দেন। [দেখুন, ইবন কাসীর]
