Al-Hajj

আল-হাজ্জ: 78

22:78
টেক্সট কপি
22 আল-হাজ্জ Al-Hajj · 78 আয়াত الحج

মূল আরবি

وَجَـٰهِدُوا۟ فِى ٱللَّهِ حَقَّ جِهَادِهِۦ ۚ هُوَ ٱجْتَبَىٰكُمْ وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِى ٱلدِّينِ مِنْ حَرَجٍ ۚ مِّلَّةَ أَبِيكُمْ إِبْرَٰهِيمَ ۚ هُوَ سَمَّىٰكُمُ ٱلْمُسْلِمِينَ مِن قَبْلُ وَفِى هَـٰذَا لِيَكُونَ ٱلرَّسُولُ شَهِيدًا عَلَيْكُمْ وَتَكُونُوا۟ شُهَدَآءَ عَلَى ٱلنَّاسِ ۚ فَأَقِيمُوا۟ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتُوا۟ ٱلزَّكَوٰةَ وَٱعْتَصِمُوا۟ بِٱللَّهِ هُوَ مَوْلَىٰكُمْ ۖ فَنِعْمَ ٱلْمَوْلَىٰ وَنِعْمَ ٱلنَّصِيرُ

English Translations

Sahih International

And strive for Allāh with the striving due to Him. He has chosen you and has not placed upon you in the religion any difficulty. [It is] the religion of your father, Abraham. He [i.e., Allāh] named you "Muslims" before [in former scriptures] and in this [revelation] that the Messenger may be a witness over you and you may be witnesses over the people. So establish prayer and give zakāh and hold fast to Allāh. He is your protector; and excellent is the protector, and excellent is the helper.

Muhsin Khan

And strive hard in Allah's Cause as you ought to strive (with sincerity and with all your efforts that His Name should be superior). He has chosen you (to convey His Message of Islamic Monotheism to mankind by inviting them to His religion, Islam), and has not laid upon you in religion any hardship, it is the religion of your father Ibrahim (Abraham) (Islamic Monotheism). It is He (Allah) Who has named you Muslims both before and in this (the Quran), that the Messenger (Muhammad SAW) may be a witness over you and you be witnesses over mankind! So perform As-Salat (Iqamat-as-Salat), give Zakat and hold fast to Allah [i.e. have confidence in Allah, and depend upon Him in all your affairs] He is your Maula (Patron, Lord, etc.), what an Excellent Maula (Patron, Lord, etc.) and what an Excellent Helper!

Taqi Usmani

Struggle for (seeking the pleasure of) Allah, a struggle that is owed to Him. He has chosen you and did not impose any hardship on you in the religion, the faith of your father Ibrāhīm. He (Allah) named you as Muslims earlier and also in this (Qur’ān), so that the Messenger becomes a witness to you, and you become witnesses to (other) people. So establish Salāh, pay Zakāh and hold fast to Allah. He is your patron. So, how excellent He is as a patron, and how excellent as a supporter!

Abul Ala Maududi

Strive in the cause of Allah in a manner worthy of that striving. He has chosen you (for His task), and He has not laid upon you any hardship in religion. Keep to the faith of your father Abraham. Allah named you Muslims earlier and even in this (Book), that the Messenger may be a witness over you, and that you may be witnesses over all mankind. So establish Prayer, and pay Zakah, and hold fast to Allah. He is your Protector. What an excellent Protector; what an excellent Helper!

Pickthall

And strive for Allah with the endeavour which is His right. He hath chosen you and hath not laid upon you in religion any hardship; the faith of your father Abraham (is yours). He hath named you Muslims of old time and in this (Scripture), that the messenger may be a witness against you, and that ye may be witnesses against mankind. So establish worship, pay the poor-due, and hold fast to Allah. He is your Protecting friend. A blessed Patron and a blessed Helper!

Yusuf Ali

And strive in His cause as ye ought to strive, (with sincerity and under discipline). He has chosen you, and has imposed no difficulties on you in religion; it is the cult of your father Abraham. It is He Who has named you Muslims, both before and in this (Revelation); that the Messenger may be a witness for you, and ye be witnesses for mankind! So establish regular Prayer, give regular Charity, and hold fast to Allah! He is your Protector - the Best to protect and the Best to help!

বাংলা অনুবাদ

তাইসিরুল কুরআন

আর আল্লাহর পথে জিহাদ কর যেভাবে জিহাদ করা উচিত। তিনি তোমাদেরকে বেছে নিয়েছেন। দ্বীনের ভিতর তিনি তোমাদের উপর কোন কঠোরতা চাপিয়ে দেননি। এটাই তোমাদের পিতা ইবরাহীমের দ্বীন, আল্লাহ তোমাদের নাম রেখেছেন ‘মুসলিম’ পূর্বেও, আর এ কিতাবেও (ঐ নামই দেয়া হয়েছে) যাতে রসূল তোমাদের জন্য সাক্ষী হয় আর তোমরা সাক্ষী হও মানব জাতির জন্য। কাজেই তোমরা নামায প্রতিষ্ঠা কর, যাকাত দাও আর আল্লাহকে আঁকড়ে ধর। তিনিই তোমাদের অভিভাবক। কতই না উত্তম অভিভাবক আর কতই না উত্তম সাহায্যকারী!

রাওয়াই আল-বায়ান

আর তোমরা আল্লাহর পথে জিহাদ কর যেভাবে জিহাদ করা উচিৎ। তিনি তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন। দীনের ব্যাপারে তিনি তোমাদের উপর কোন কঠোরতা আরোপ করেননি। এটা তোমাদের পিতা ইবরাহীমের দীন। তিনিই তোমাদের নাম রেখেছেন ‘মুসলিম’ পূর্বে এবং এ কিতাবেও। যাতে রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষী হয় আর তোমরা মানুষের জন্য সাক্ষী হও। অতএব তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত দাও এবং আল্লাহকে মজবুতভাবে ধর। তিনিই তোমাদের অভিভাবক। আর তিনি কতই না উত্তম অভিভাবক এবং কতই না উত্তম সাহায্যকারী!

শাইখ মুজিবুর রহমান

এবং জিহাদ কর আল্লাহর পথে যেভাবে জিহাদ করা উচিত; তিনি তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন। তিনি দীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কঠোরতা আরোপ করেননি। এটা তোমাদের পিতা ইবরাহীমের মিল্লাত; তিনি পূর্বে তোমাদের নামকরণ করেছেন মুসলিম এবং এই কিতাবেও, যাতে রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষী স্বরূপ হয় এবং তোমরা স্বাক্ষী হও মানব জাতির জন্য। সুতরাং তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত দাও এবং আল্লাহকে অবলম্বন কর; তিনিই তোমাদের অভিভাবক, কত উত্তম অভিভাবক এবং কত উত্তম সাহায্যকারী তিনি!

ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

আর জিহাদ কর আল্লাহ্‌র পথে যেভাবে জিহাদ করা উচিত। তিনি তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন। তিনি দীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোনো সংকীর্ণতা রাখেননি। তোমাদের পিতা ইবরাহিমের মিল্লাত। তিনি আগে তোমাদের নামকরণ করেছেন ‘মুসলিম’ এবং এ কিতাবেও; যাতে রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষীস্বরূপ হন এবং তোমরা সাক্ষীস্বরূপ হও মানুষের জন্য। কাজেই তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত দাও এবং আল্লাহকে মজবুতভাবে অবলম্বন কর; তিনিই তোমাদের অভিভাবক, তিনি কতই না উত্তম অভিভাবক আর কতই না উত্তম সাহায্যকারী!

ফাতহুল মাজীদ

এবং জিহাদ কর‎ আল্লাহর পথে যেভাবে জিহাদ করা উচিত, তিনি তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন। তিনি দীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোন কঠোরতা আরোপ করেননি। এটাই তোমাদের পিতা ইব্রাহীমের ধর্ম। তিনি পূর্বে তোমাদের নামকরণ করেছেন ‘মুসলিম’ এবং এ কিতাবেও; যাতে রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষীস্বরূপ হয় এবং তোমরাও সাক্ষী হও মানব জাতির জন্য। সুতরাং তোমরা সালাত কায়েম কর‎, যাকাত দাও এবং আল্লাহকে আঁকড়ে ধর‎; তিনিই তোমাদের অভিভাবক, কত উত্তম অভিভাবক এবং কতই না উত্তম সাহায্যকারী তিনি!

মুখতাসার

৭৮. আর তোমরা আল্লাহর পথে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য নির্ভজাল সংগ্রাম করো। তিনিই তোমাদেরকে বাছাই করেছেন এবং তোমাদের ধর্মকে সহজ করে দিয়েছেন। যাতে কোন ধরনের সঙ্কীর্ণতা ও কঠোরতা নেই। এ সহজ ধর্মটি হলো মূলতঃ তোমাদের পিতা ইব্রাহীম (আলাইহিস-সালাম) এর ধর্ম। আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের নাম মুসলমান রেখেছেন পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে এবং কুর‘আনেও। যাতে রাসূল তোমাদের ব্যাপারে এ ক্ষেত্রে সাক্ষী হতে পারেন যে, নিশ্চয়ই তিনি তাঁকে যা পৌঁছানোর আদেশ করা হয়েছে তা তোমাদেরকে পৌঁছে দিয়েছেন। আর যাতে তোমরাও পূর্ববর্তী উম্মতগুলোর ব্যাপারে এ ক্ষেত্রে সাক্ষী হতে পারো যে, নিশ্চয়ই তাদের রাসূলগণও তাদেরকে যা পৌঁছানোর তা পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। তাই তোমরা পরিপূর্ণভাবে সালাত আদায়ের মাধ্যমে এ ব্যাপারে আল্লাহর কতজ্ঞতা আদায় করো এবং নিজেদের সম্পদের যাকাত দাও। উপরন্তু আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাও এবং তোমাদের সকল ব্যাপারে তাঁর উপর ভরসা করো। মু’মিনদের মধ্যকার যে তাঁকে বন্ধু বানিয়েছে তিনি তার জন্য উত্তম বন্ধু। আর তাদের মধ্যকার যে তাঁর সাহায্য কামনা করেছে তার জন্য তিনি উত্তম সাহায্যকারী। তাই তোমরা তাঁকে বন্ধু বানাও। তিনি তোমাদের বন্ধুত্বের মর্যাদা দিবেন। আর তোমরা তাঁর নিকট সাহায্য কামনা করো। তিনি তোমাদেরকে সাহায্য করবেন।

তাফসীর

তাফসীর ইবনে কাসীর

22:77

তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া

আর জিহাদ কর আল্লাহ্‌র পথে যেভাবে জিহাদ করা উচিত [১]। তিনি তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন [২]। তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোন সংকীর্ণতা রাখেননি [৩]। তোমাদের পিতা [৪] ইবরাহিমের মিল্লাত [৫]। তিনি আগে তোমাদের নামকরণ করেছেন ‘মুসলিম’ এবং এ কিতাবেও [৬]; যাতে রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষীস্বরূপ হন এবং তোমরা সাক্ষীস্বরূপ হও মানুষের জন্য [৭]। কাজেই তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত দাও [৮] এবং আল্লাহ্‌ কে মজবুতভাবে অবলম্বন কর [৯]; তিনিই তোমাদের অভিভাবক, তিনি কতই না উত্তম অভিভাবক আর কতই না উত্তম সাহায্যকারী!

[১] جهاد ও مجاهدة শব্দের অর্থ কোন লক্ষ্য অর্জনের জন্য পূর্ণ শক্তি নিয়োগ করা এবং তজ্জন্যে কষ্ট স্বীকার করা। [বাগভী] কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধেও মুসলিমরা তাদের কথা, কর্ম ও সর্বপ্রকার সম্ভাব্য শক্তি ব্যয় করে। তাই এই যুদ্ধকেও জিহাদ বলা হয়। حَقَّ جِهَادِهٖ ط এর অর্থ আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি লাভের জন্য কাফেরদের বিরুদ্ধে সম্পদ, জিহ্বা ও জান দিয়ে জিহাদ করা। [ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর] অর্থাৎ তাতে জাগতিক নাম-যশ ও গনীমতের অর্থ লাভের লালসা না থাকা। কারও কারও মতে, حَقَّ جِهَادِهٖ ط বা যথাযথ জিহাদ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহ্‌র যাবতীয় নির্দেশ মান্য করা, আর যাবতীয় নিষেধ পরিত্যাগ করা।

অর্থাৎ আল্লাহ্‌র আনুগত্যে নিজেদের প্রবৃত্তির সাথে জিহাদ করা এবং নাফসকে প্রবৃত্তির দাসত্ব হতে ফিরিয়ে আনা। আর শয়তানের সাথে জিহাদ করবে তার কুমন্ত্রণা ঝেঁড়ে ফেলে দিয়ে, যালেমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে তাদের যুলুমের প্রতিরোধ করে এবং কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করতে হবে তাদের কুফরিকে প্রতিহত করে। [কুরতুবী] কারও কারও মতে, حَقَّ جِهَادِهٖ ط এর অর্থ জিহাদে পূর্ণ শক্তি ব্যয় করা এবং কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারে কর্ণপাত না করা। [ফাতহুল কাদীর] দাহহাক ও মুকাতিল বলেনঃ حَقَّ جِهَادِهٖ ط দ্বারা উদ্দেশ্য, আল্লাহ্‌র জন্য কাজ করা, যেমন করা উচিত এবং আল্লাহ্‌র ইবাদাত করা যেমন করা উচিত।

আব্দুল্লাহ ইবন মুবারক বলেনঃ এ স্থলে জিহাদ বলে নিজের প্রবৃত্তি ও অন্যায় কামনা-বাসনার বিরুদ্ধে জিহাদ করা বোঝানো হয়েছে। [বাগভী]

[২] ওয়াসিলা ইবনে আসকা‘ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বৰ্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ্‌ তা'আলা সমগ্র বনী-ইসমাঈলের মধ্য থেকে কেনানা গোত্রকে মনোনীত করেছেন, অতঃপর কেনানার মধ্য থেকে কুরাইশকে, অতঃপর কুরাইশের মধ্য থেকে বনী-হাশেমকে এবং বনী-হাশেমের মধ্য থেকে আমাকে মনোনীত করেছেন। [মুসলিমঃ ২২৭৬]

[৩] অর্থাৎ আল্লাহ্‌ তা‘আলা এ দ্বীনে তোমাদের উপর কোন সংকীর্ণতা রাখেননি। ‘দ্বীনে সংকীর্ণতা নেই' -এই বাক্যের তাৎপর্য বিভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে, কোন কোন মুফাসসির বলেন, এর অর্থঃ এই দ্বীনে এমন কোন গোনাহ নেই, যা তাওবা করলে মাফ হয় না এবং আখেরাতের আযাব থেকে নিস্কৃতি পাওয়ার কোন উপায় হতে পারে না। পূর্ববর্তী উম্মতদের অবস্থা এর বিপরীত। তাদের মধ্যে এমন কতিপয় গোনাহও ছিল, যা তাওবা করলেও মাফ হত না। [ফাতহুল কাদীর]

কারও কারও নিকট এর অর্থ, দ্বীনের মধ্যে এমন কোন হুকুম নেই যা মানুষকে সমস্যায় নিপতিত করবে। বরং এখানে যাবতীয় সংকীর্ণ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় আছে। মূলতঃ ইসলাম সহজ দ্বীন, সুনির্দিষ্ট কোন দিক নয়; বরং সর্বদিক দিয়েই ইসলাম সহজ দ্বীন। এ দ্বীনে কোন সংকীর্ণতার অবকাশ নেই। আল্লাহ্‌ তা'আলা এ দ্বীন ইসলামকে কেয়ামত পর্যন্ত সর্বশেষ দ্বীন হিসাবে অবশিষ্ট রাখবেন। তাই সর্বসাধারণের উপযোগী করে তিনি এ দ্বীন নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এ দ্বীনের মধ্যে সংকীর্ণতা না থাকার ব্যাপারে বিভিন্ন পুস্তক রচনা করা হয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়- অযুর পানি না পেলে তায়াম্মুমের অনুমতি, যমীনের সমস্ত স্থান সালাতের জন্য নির্দিষ্ট করে দেয়া, সফর অবস্থায় সালাতের কসর, সওমের জন্য অন্য সময়ে পূরণ করার অনুমতি ইত্যাদি অন্যতম। [দেখুন, ইবন কাসীর]

[৪] এখানে প্রশ্ন হতে পারে যে, তোমাদের পিতা বলে কাদের বোঝানো হয়েছে? কোন কোন মুফাসসির বলেনঃ এখানে প্রকৃতপক্ষে কুরাইশী মুমিনদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে, যারা সরাসরি ইবরাহীম ‘আলাইহিস সালাম-এর বংশধর। [কুরতুবী] এরপর কুরাইশদের অনুগামী হয়ে সব মুসলিম এই ফযীলতে শামিল হয়; যেমন-হাদীসে আছেঃ সব মানুষ দ্বীনের ক্ষেত্রে কুরাইশদের অনুগামী। মুসলিম মুসলিম কুরাইশদের অনুগামী এবং কাফের কাফের কুরাইশদের অনুগামী। [মুসনাদে আহমাদঃ ১৯, অনুরূপ হাদীস- বুখারীঃ ৩৪৯৫, মুসলিমঃ ১৮১৮, ইবনে হিব্বানঃ ৬২৬৪] কারও কারও মতে, এ আয়াতে সব মুসলিমকে সম্বোধন করা হয়েছে।

ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এদিক দিয়ে সবার পিতা। কারণ, আল্লাহ্‌ তা‘আলা সমগ্র মানব জাতির জন্য ইবরাহীম ‘আলাইহিস সালাম-কে তার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরে নেতা হিসাবে মনোনীত করেন। তিনি আনুগত্যের চরম পারাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন, সুতরাং সমস্ত আনুগত্যকারীদের তিনি পিতা। তাছাড়া ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সম্মান করা তেমনি অবশ্য কর্তব্য যেমনি সন্তান তার পিতার সম্মান করা একান্ত কর্তব্য। কারণ তিনি তাদের নবীর পিতা। [আহকামুল কুরআন লিল জাসসাস; কুরতুবী; ফাতহুল কাদীর]

[৫] আয়াতের অর্থ, তোমরা তোমাদের পিতা ইবরাহীম ‘আলাইহিস সালাম-এর মিল্লাতকে আঁকড়ে ধর। [ফাতহুল কাদীর] আয়াতের অন্য অর্থ হচ্ছে, তোমাদের দ্বীনে তোমাদের জন্য কোন সংকীর্ণতা রাখেন নি, যেমন তোমাদের পিতা ইবরাহীমের মিল্লাতে কোন সংকীর্ণতা ছিল না। [তাবারী; ইবন কাসীর] অপর অর্থ হচ্ছে, পূর্ববর্তী আয়াতে যে নির্দেশগুলো দেয়া হয়েছিল, অর্থাৎ রুকু, সিজদা, কল্যাণমূলক কাজ এবং যথাযথ জিহাদ করা এগুলো ইবরাহীম আলাইহিস সালামের মিল্লাত। তখন আয়াতটির সমর্থন অন্য আয়াতেও এসেছে, “বলুন, ‘আমার রব তো আমাকে সৎপথে পরিচালিত করেছেন। এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন, ইবরাহীমের মিল্লাত (আদর্শ), তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ এবং তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।” [সূরা আল-আন’আমঃ ১৬১] কারণ, রুকু, সিজদা, কল্যাণমূলক কাজ, যথাযথ জিহাদ এসবই সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত। [আদওয়াউল বায়ান]

[৬] তিনি তোমাদেরকে পূর্বে এবং এ কিতাব কুরআনে মুসলিম নামকরণ করেছেন। এখানে তিনি বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে এ ব্যাপারে দু’টি মত রয়েছে- (এক) এখানে ইবরাহীম ‘আলাইহিস সালাম-কে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ ইবরাহীম 'আলাইহিস সালামই কুরআনের পূর্বে উম্মতে মুহাম্মদী এবং সমগ্ৰ বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য ‘মুসলিম’ নামকরণ করেছেন; যেমন, ইবরাহীম ‘আলাইহিস সালাম-এর এই দো‘আ কুরআনে বর্ণিত আছেঃ رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِن ذُرِّيَّتِنَا [সূরা আল-বাকারাঃ ১২৮]-কুরআনে মুমিনদের নামকরণ করা হয়েছে মুসলিম। যদিও এই নামকরণকারী প্রত্যক্ষভাবে ইবরাহীম ‘আলাইহিস সালাম নন, কিন্তু কুরআনের পূর্বে তার এই নামকরণ কুরআনে মুসলিম নামে অভিহিত করার কারণ হয়েছে।

তাই এর সম্বন্ধও ইবরাহীম ‘আলাইহিস সালাম-এর দিকে করে দেয়া হয়েছে। (দুই) প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত হলঃ এখানে “তিনি” বলে আল্লাহ্‌ কে বোঝানো হয়েছে, অর্থাৎ আল্লাহ্‌ই তোমাদেরকে পূর্ববতী গ্রন্থসমূহে এবং কুরআনে মুসলিম নামে অভিহিত করেছেন। [কুরতুবী; ফাতহুল কাদীর] সে হিসেবে এখানে “তোমাদের” সম্বোধনটি শুধুমাত্র এ উম্মতের জন্য নির্দিষ্ট। অর্থাৎ এ উম্মতকেই আল্লাহ্‌ তা'আলা পূর্ববর্তী কিতাব ও এ কিতাবে মুসলিম হিসেবে নামকরণ করেছেন। এটি এ উম্মতের উপর আল্লাহ্‌র খাস রহমত ও দয়া। [দেখুন, ইবন কাসীর]

(৭) অর্থাৎ ওপরে যে খিদমতের কথা বলা হয়েছে সমগ্ৰ মানব জাতির মধ্য থেকে তোমাদেরকে তা সম্পাদন করার জন্য বাছাই করে নেয়া হয়েছে। এ বিষয়বস্তুটি কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্নভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এভাবে আমরা তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী জাতিতে পরিণত করেছি, যাতে তোমরা মানবজাতির উপর স্বাক্ষী হও এবং রাসূল তোমাদের উপর সাক্ষী হতে পারেন”। [সূরা আল-বাকারাহঃ ১৪৩] এখানে একথাটিও জানা দরকার যে, সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা যেসব আয়াতের মাধ্যমে প্রকাশিত হয় এবং যেসব আয়াতের মাধ্যমে সাহাবায়ে কেরামের বিরুদ্ধে বিদ্রুপ ও দোষারোপকারীদের ভ্ৰান্তি প্রমাণিত হয় এ আয়াতটি সেগুলোর অন্তর্ভুক্ত। একথা সুস্পষ্ট যে, এ আয়াতে সরাসরি সাহাবায়ে কেরামকে সম্বোধন করা হয়েছে, অন্যলোকদের প্রতি সম্বোধন মূলত তাদেরই মাধ্যমে করা হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে বিভিন্ন হাদীসে বিস্তারিতভাবে এসেছে, যার সারমর্ম হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাশরের ময়দানে সাক্ষ্য দেবেন যে, আমি আল্লাহ্‌ তা'আলার বিধি-বিধান এই উম্মতের কাছে পৌছে দিয়েছিলাম। তখন উম্মতে মুহাম্মদী তা স্বীকার করবে। কিন্তু অন্যান্য নবীগণ যখন এই দাবী করবেন, তখন তাদের উম্মতরা অস্বীকার করে বসবে। তখন উম্মতে মুহাম্মদী সাক্ষ্য দেবে যে, সব নবীগণ নিশ্চিতরূপেই তাদের উম্মতের কাছে আল্লাহ্‌ তা'আলার বিধানাবলী পৌঁছে দিয়েছিলেন। সংশ্লিষ্ট উম্মতের পক্ষ থেকে তাদের এই সাক্ষ্যের উপর জেরা করা হবে যে, আমাদের যামানায় উম্মতে মুহাম্মদীর অস্তিত্বই ছিল না।

সুতরাং তারা আমাদের ব্যাপারে কিরূপে সাক্ষ্য হতে পারে? উম্মতে মুহাম্মদীর পক্ষ থেকে জেরার জবাবে বলা হবেঃ আমরা বিদ্যমান ছিলাম না ঠিকই, কিন্তু আমরা আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুখ থেকে এ কথা শুনেছি, যার সত্যবাদিতায় কোন সন্দেহ নেই। কাজেই আমরা সাক্ষ্য দিতে পারি। অতঃপর তাদের সাক্ষ্য কবুল করা হবে। এই বিষয়বস্তু বুখারী ইত্যাদি গ্রন্থে আবু সায়ীদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু-এর হাদীসে বর্ণিত আছে। [দেখুন- বুখারীঃ ৩৩৩৯]

(৮) উদ্দেশ্য এই যে, আল্লাহ্‌ তা'আলা যখন তোমাদের প্রতি এতসব বিরাট অনুগ্রহ করেছেন যেগুলো ওপরে বর্ণিত হয়েছে, তখন তোমাদের কর্তব্য আল্লাহ্‌র বিধানাবলী পালনে পুরোপুরি সচেষ্ট হওয়া। বিধানাবলীর মধ্যে এস্থলে শুধু সালাত ও যাকাত উল্লেখ করার কারণ এই যে, দৈহিক কর্ম ও বিধানাবলীর মধ্যে সালাত সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং আর্থিক বিধানাবলীর মধ্যে যাকাত সৰ্বাধিক গুরুত্ববহ; যদিও শরী‘আতের সব বিধান পালন করাই উদ্দেশ্য। মূলকথা হচ্ছে, আল্লাহ্‌ যা অবশ্য কর্তব্য করেছেন সেটা সম্পন্ন করা এবং যা হারাম করেছেন সেটা থেকে বেঁচে থাকার মাধ্যমে আল্লাহ্‌র হক আদায় করা।

আর তন্মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, সালাত কায়েম করা, যাকাত দেয়া, আল্লাহ্‌র সৃষ্টির প্রতি ইহসান বা দয়া করা, আল্লাহ্‌ ফকীরদের জন্য, দুর্বল ও অভাবীদের জন্য ধনীদের উপর তাদের সম্পদ থেকে বছরে যৎকিঞ্চিত যা ফরয করেছেন তা বের করে আদায় করা। [ইবন কাসীর]

(৯) অর্থাৎ মজবুতভাবে আল্লাহ্‌কে আঁকড়ে ধরো। পথ নির্দেশনা ও জীবন যাপনের বিধান তাঁর কাছ থেকেই নাও। তাঁরই আনুগত্য করো। তাঁকেই ভয় করো। আশা-আকাংখা তাঁরই সাথে বিজড়িত করো। তাঁরই কাছে হাত পাতো। তাঁরই সত্তার উপর নির্ভর করে তাওয়াক্কুল ও আস্থার বুনিয়াদ গড়ে তোলো। তাঁর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা কর। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেনঃ এই বাক্যের উদ্দেশ্য এই যে, আল্লাহ্‌ তা‘আলার কাছে দো‘আ কর- তিনি যেন তোমাদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতের অপছন্দনীয় বিষয়াদি থেকে নিরাপদ রাখেন। কেউ কেউ বলেনঃ এই বাক্যের অর্থ এই যে, কুরআন ও সুন্নাহকে অবলম্বন কর, সর্বাবস্থায় এগুলোকে আঁকড়ে থাক; যেমন এক হাদীসে আছে- ‘আমি তোমাদের জন্য দু’টি বস্তু ছেড়ে যাচ্ছি। তোমরা যে পর্যন্ত এ দু’টিকে অবলম্বন করে থাকবে; পথভ্রষ্ট হবে না। একটি আল্লাহ্‌র কিতাব ও অপরটি আমার সুন্নাত। [মুয়াত্তা ইমাম মালেকঃ ১৩৯৫]

তাফসীর আল-কুরতুবী

[সূরা আল-হাজ্জ (২২): আয়াত ৭৮] পূর্ণ পৃষ্ঠা

[সূরা আল-হাজ্জ (২২): আয়াত ৭৮]আর তোমরা আল্লাহর পথে জিহাদ করো যেভাবে জিহাদ করা উচিত। তিনি তোমাদের মনোনীত করেছেন এবং দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা রাখেননি। এটি তোমাদের পিতা ইবরাহিমের মিল্লাত (আদর্শ)। তিনি পূর্বে তোমাদের নাম রেখেছেন ‘মুসলিম’ এবং এই কিতাবেও (তোমাদের নাম মুসলিম), যাতে রসূল তোমাদের জন্য সাক্ষী হন এবং তোমরা সাক্ষী হও মানবজাতির জন্য। সুতরাং তোমরা সালাত কায়েম করো, জাকাত প্রদান করো এবং আল্লাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো। তিনি তোমাদের অভিভাবক; কতই না উত্তম অভিভাবক এবং কতই না উত্তম সাহায্যকারী! (৭৮)আল্লাহ তাআলার বাণী: (আর তোমরা আল্লাহর পথে জিহাদ করো যেভাবে জিহাদ করা উচিত) বলা হয়েছে: এর দ্বারা কাফিরদের বিরুদ্ধে জিহাদকে বোঝানো হয়েছে।

আবার বলা হয়েছে: এটি আল্লাহর সমস্ত আদেশ পালন এবং সমস্ত নিষেধ থেকে বিরত থাকার প্রতি ইঙ্গিত। অর্থাৎ আল্লাহর আনুগত্যে নিজেদের নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করো এবং তাকে কুপ্রবৃত্তি থেকে ফিরিয়ে রাখো, শয়তানের কুমন্ত্রণা দূর করতে তার বিরুদ্ধে জিহাদ করো, জালিমদের জুলুম প্রতিহত করতে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করো এবং কাফিরদের কুফর প্রত্যাখ্যান করতে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করো। ইবনে আতিয়্যাহ বলেন: মুকাতিল বলেছেন যে, এই আয়াতটি আল্লাহ তাআলার এই বাণী দ্বারা রহিত (মানসুখ) হয়েছে: "তোমরা আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় করো" [আত-তাগাবুন: ১৬]। হিবাতুল্লাহ-ও অনুরূপ বলেছেন যে, তাঁর বাণী "যেভাবে জিহাদ করা উচিত" এবং অন্য আয়াতের বাণী "যেভাবে তাকওয়া অবলম্বন করা উচিত" [আল-ইমরান: ১০২]—এই আদেশগুলো পালনের ক্ষেত্রে সক্ষমতার শর্তারোপের মাধ্যমে সহজিকরণ করে রহিত করা হয়েছে।

তবে রহিত হওয়ার বিষয়টি ধরে নেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই; কারণ বিধানের শুরু থেকেই এটিই উদ্দেশ্য ছিল। কেননা "যথাযথ জিহাদ" বলতে এমন জিহাদকেই বোঝায় যা থেকে সংকীর্ণতা বা অসহনীয় কষ্ট দূর করা হয়েছে। সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: "তোমাদের দ্বীনের মধ্যে সর্বোত্তম হলো যা অধিক সহজ।" আবু জাফর আন-নাহহাস বলেন: এটি এমন একটি বিষয় যাতে রহিত হওয়া বা নাসখ ঘটা জায়েজ নেই, কারণ এটি মানুষের ওপর অপরিহার্য কর্তব্য। যেমন হাইওয়া ইবনে শুরাইহ নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে মারফু সূত্রে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন: "প্রকৃত মুজাহিদ সেই, যে আল্লাহর জন্য নিজের নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করে।" যেমনটি আবু গালিব আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, এক ব্যক্তি প্রথম জামরার নিকট নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করলেন: কোন জিহাদ শ্রেষ্ঠ?

তিনি কোনো উত্তর দিলেন না। পুনরায় দ্বিতীয় জামরার নিকট জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি উত্তর দিলেন না। এরপর যখন জামরাতুল আকাবায় জিজ্ঞাসা করলেন, তখন নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: "প্রশ্নকারী কোথায়?" সে বলল: আমি এখানে। তখন তিনি বললেন: "অত্যাচারী শাসকের সামনে ন্যায় কথা বলা।"(১). দ্রষ্টব্য: ১৮তম খণ্ড, ১৪৪ পৃষ্ঠা।(২). দ্রষ্টব্য: ৪র্থ খণ্ড, ১৫৭ পৃষ্ঠা।

তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর

পূর্ণ পৃষ্ঠা পূর্ণ পৃষ্ঠা পূর্ণ পৃষ্ঠা

আহমদ, আবু ইয়ালা, ইবনে হিব্বান, আল-হাকিম, আবু নুয়াইম 'আল-হিলয়া' গ্রন্থে, আল-বায়হাকী 'শুআবুল ঈমান'-এ এবং আল-দিয়া 'আল-মুখতারা' গ্রন্থে আনাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: "যদি কোনো মুসলিম ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করে এবং তার নিকটতম প্রতিবেশী চার ঘরের অধিবাসী তার সম্পর্কে এই সাক্ষ্য প্রদান করে যে তারা তার মধ্যে কল্যাণ ব্যতীত আর কিছুই জানে না, তবে আল্লাহ বলেন: আমি তার সম্পর্কে তোমাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করলাম এবং তার সম্পর্কে যা তোমরা জানো না তা আমি ক্ষমা করে দিলাম।"ইবনে আবী শায়বা, হান্নাদ, ইবনে জারীর এবং আত-তাবারানী সালামাহ ইবনুল আকওয়া (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পাশ দিয়ে জনৈক আনসারী ব্যক্তির জানাজা নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল এবং সেটির ভূয়সী প্রশংসা করা হলো।

তখন তিনি বললেন: "ওয়াজিব হয়ে গেল।"অতঃপর তাঁর পাশ দিয়ে আরেকটি জানাজা নিয়ে যাওয়া হলো এবং সেটির প্রশংসা আগের চেয়ে কিছুটা কম করা হলো। তিনি বললেন: "ওয়াজিব হয়ে গেল।"তখন জিজ্ঞেস করা হলো: হে আল্লাহর রাসূল! কী ওয়াজিব হলো? তিনি বললেন: "ফেরেশতারা আসমানে আল্লাহর সাক্ষী এবং তোমরা জমিনে আল্লাহর সাক্ষী।"আল-খতীব তাঁর 'তারীখ' গ্রন্থে আনাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: "যদি কোনো মুসলিম ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করে এবং তার নিকটতম প্রতিবেশীদের মধ্য থেকে দুইজন ব্যক্তি এই সাক্ষ্য দেয় যে—হে আল্লাহ!

আমরা তার সম্পর্কে কল্যাণ ব্যতীত আর কিছু জানি না—তবে আল্লাহ ফেরেশতাদের বলেন: তোমরা সাক্ষী থাকো যে আমি তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করেছি এবং তারা যা জানে না তা আমি ক্ষমা করে দিয়েছি।"আল-ফিরইয়াবী, সাঈদ ইবনে মানসুর, আবদ ইবনে হুমাইদ এবং ইবনে আবী হাতিম কাব (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: এই উম্মতকে তিনটি এমন বৈশিষ্ট্য দান করা হয়েছে যা ইতিপূর্বে কেবল নবীদের দান করা হতো। জনৈক নবীকে বলা হতো: "প্রচার করো এবং তোমার কোনো সংকীর্ণতা নেই", "তুমি তোমার কওমের ওপর সাক্ষী" এবং "প্রার্থনা করো, আমি তোমার ডাকে সাড়া দেব।"আর এই উম্মতকে বলা হয়েছে: "তিনি দীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা রাখেননি" (সূরা হজ, আয়াত ৭৮); এবং তিনি বলেছেন: "যাতে তোমরা মানবজাতির ওপর সাক্ষী হতে পারো" (সূরা হজ, আয়াত ৭৮); এবং তিনি বলেছেন: "তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব" (সূরা গাফির, আয়াত ৬০)।ইবনে জারীর যায়দ ইবনে আসলাম (রহ.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, কিয়ামতের দিন পূর্ববর্তী জাতিসমূহ বলবে: আল্লাহর কসম!

আল্লাহ এই উম্মতকে যা দান করেছেন তা দেখে মনে হচ্ছে তারা যেন সকলেই নবী হয়ে যেতেন।ইবনে মুবারক 'আয-যুহদ' গ্রন্থে এবং ইবনে জারীর হিব্বান ইবনে আবী জাবালাহ (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি তা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছেন (মারফু সূত্রে), তিনি বলেন: যখন কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাঁর বান্দাদের একত্রিত করবেন, তখন সর্বপ্রথম ইসরাফীলকে ডাকা হবে। তখন তাঁর রব তাকে বলবেন: "তুমি আমার আমানতের বিষয়ে কী করেছ? তুমি কি আমার পয়গাম পৌঁছে দিয়েছ?" তিনি বলবেন: "হ্যাঁ হে রব! আমি তা জিবরাঈলের কাছে পৌঁছে দিয়েছি।"অতঃপর জিবরাঈলকে ডাকা হবে এবং জিজ্ঞেস করা হবে: "ইসরাফীল কি তোমার কাছে আমার পয়গাম পৌঁছে দিয়েছে?" তিনি বলবেন: "হ্যাঁ।"তখন ইসরাফীলকে অব্যাহতি দেওয়া হবে এবং জিবরাঈলকে বলা হবে: "তুমি কি আমার পয়গাম পৌঁছে দিয়েছ?" তিনি বলবেন: "হ্যাঁ, আমি রাসূলদের কাছে তা পৌঁছে দিয়েছি।" তখন রাসূলদের ডাকা হবে এবং তাদের জিজ্ঞেস করা হবে: "জিবরাঈল কি তোমাদের কাছে আমার পয়গাম পৌঁছে দিয়েছে?" তারা বলবেন: "হ্যাঁ।"তখন জিবরাঈলকে অব্যাহতি দেওয়া হবে।

অতঃপর রাসূলদের বলা হবে: "তোমরা কি আমার পয়গাম পৌঁছে দিয়েছ?" তারা বলবেন: "হ্যাঁ, আমরা তা জাতিসমূহের কাছে পৌঁছে দিয়েছি।" অতঃপর জাতিসমূহকে ডাকা হবে...

ইবনে আবি হাতিম সাঈদ বিন জুবায়ের থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: যখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হলো, তখন মুমিনগণ বললেন: আমরা আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ এবং তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনলাম।ইবনে আবি হাতিম মুকাতিল বিন হাইয়ান থেকে বর্ণনা করেছেন—'আমরা তাঁর রাসূলগণের মধ্যে কোনো পার্থক্য করি না'—অর্থাৎ রাসূলগণ যা নিয়ে এসেছেন আমরা তা অস্বীকার করি না, তাঁদের কারও মধ্যে বিভেদ করি না এবং তাঁদের কাউকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করি না। 'এবং তারা বলল, আমরা শুনেছি'—অর্থাৎ আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত কুরআনের বাণী আমরা শুনেছি; 'এবং আনুগত্য করেছি'—তারা আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ পালনের স্বীকৃতি প্রদান করেছে।ইবনুল মুনযির এবং ইবনে আবি হাতিম ইয়াহইয়া বিন উমায়ের থেকে বর্ণনা করেছেন।তিনি পাঠ করতেন—'সে (আল্লাহ) তাঁর রাসূলগণের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেন না'—এবং তিনি বলতেন: সবাই ঈমান এনেছে এবং সবাই পার্থক্য করে না।ইবনুল মুনযির এবং ইবনে আবি হাতিম ইবনে আব্বাস (রাযি.) থেকে আল্লাহর বাণী 'হে আমাদের রব, আমরা আপনার ক্ষমা প্রার্থনা করছি' সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন—তিনি বলেন: আল্লাহ বলেছেন, আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছি।

'এবং আপনার দিকেই প্রত্যাবর্তন'—তিনি বলেন: কিয়ামত দিবসে আপনার কাছেই ফিরে যাওয়া এবং প্রত্যাবর্তনস্থল।সাঈদ বিন মানসুর, ইবনে জারির এবং ইবনে আবি হাতিম হাকিম বিন জাবির থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: যখন 'রাসূল ঈমান এনেছেন' আয়াতটি অবতীর্ণ হলো, তখন জিবরাঈল (আ.) নবী করীম (সা.)-কে বললেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ আপনার এবং আপনার উম্মতের অনেক প্রশংসা করেছেন, অতএব আপনি প্রার্থনা করুন, আপনাকে তা প্রদান করা হবে।অতঃপর তিনি প্রার্থনা করলেন 'আল্লাহ কোনো সত্তার ওপর তার সাধ্যাতীত বোঝা চাপিয়ে দেন না'—এভাবে সূরার শেষ পর্যন্ত নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রার্থনার মাধ্যমে সমাপ্ত হয়েছে।ইবনে জারির, ইবনুল মুনযির এবং ইবনে আবি হাতিম ইবনে আব্বাস (রাযি.) থেকে আল্লাহর বাণী 'আল্লাহ কোনো সত্তার ওপর তার সাধ্যাতীত বোঝা চাপিয়ে দেন না' সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন—তিনি বলেন: তারা হলো মুমিনগণ, আল্লাহ তাদের জন্য দ্বীনের বিধানকে প্রশস্ত করেছেন।

তাই তিনি বলেছেন, 'তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা রাখেননি' (সূরা হাজ্জ, আয়াত: ৭৮), এবং বলেছেন, 'আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজতা চান এবং তোমাদের জন্য কঠিনতা চান না' (সূরা বাকারা, আয়াত: ১৮৫), এবং আরও বলেছেন, 'অতএব তোমরা আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় করো' (সূরা তাগাবুন, আয়াত: ১৯)।বুখারি, আবু দাউদ, তিরমিযি এবং ইবনে মাজাহ ইমরান বিন হুসাইন (রাযি.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমার অর্শ রোগ ছিল, তাই আমি নবী করীম (সা.)-কে সালাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন: দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করো; যদি সক্ষম না হও তবে বসে, আর যদি তাতেও সক্ষম না হও তবে কাত হয়ে (শুয়ে) সালাত আদায় করো।ইবনে আবি হাতিম ইবনে আব্বাস (রাযি.) থেকে আল্লাহর বাণী 'সে যা অর্জন করেছে তা তারই জন্য এবং যা কামাই করেছে তা তারই ওপর বর্তাবে' সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন—তিনি বলেন: এর দ্বারা মানুষের আমল বা কর্ম উদ্দেশ্য।ইবনে জারির এবং ইবনুল মুনযির যুহরীর সূত্রে ইবনে আব্বাস (রাযি.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: যখন এটি অবতীর্ণ হলো, তখন মুমিনগণ অত্যন্ত বিচলিত হয়ে আর্তনাদ করে উঠলেন এবং বললেন: হে আল্লাহর রাসূল!

হাত ও পায়ের কৃতকর্মের জন্য আমরা তওবা করি।

মহান আল্লাহর বাণী প্রসঙ্গে: "আর তোমরা প্রাচীন জাহেলিয়াতের মতো নিজেদের প্রদর্শন করো না।"ইবনে জারীর, ইবনুল মুনযির, ইবনে আবি হাতিম, হাকেম, ইবনে মারদুওয়াইহ এবং বায়হাকী 'শুয়াবুল ঈমান'-এ ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: নূহ এবং ইদ্রিস (আলাইহিমাস সালাম)-এর মধ্যবর্তী সময়কাল ছিল 'প্রাচীন জাহেলিয়াত' এবং তা ছিল এক হাজার বছর দীর্ঘ। আদম (আলাইহিস সালাম)-এর সন্তানদের দুটি দল ছিল; একটি দল সমতলে বাস করত এবং অন্যটি পাহাড়ে। পাহাড়ের পুরুষরা ছিল সুদর্শন কিন্তু নারীদের মধ্যে ছিল কদর্যতা। পক্ষান্তরে, সমতলের নারীরা ছিল সুন্দরী কিন্তু পুরুষদের মধ্যে ছিল কদর্যতা।

ইবলিস সমতলের এক ব্যক্তির কাছে কিশোর বালকের বেশে এসে নিজেকে মজুর হিসেবে পেশ করল এবং তার সেবা করতে লাগল। এরপর ইবলিস মেষপালকদের বাঁশির মতো একটি বাদ্যযন্ত্র তৈরি করল এবং এমন এক সুর তুলল যার মতো সুর মানুষ ইতিপূর্বে কখনও শোনেনি। আশেপাশে যারা ছিল তাদের কানে সেই সুর পৌঁছালে তারা তা শোনার জন্য সমবেত হতে লাগল। তারা বছরের একটি দিনকে উৎসব হিসেবে নির্ধারণ করল যেখানে তারা সমবেত হতো। সেখানে মহিলারা পুরুষদের সামনে এবং পুরুষরা মহিলাদের সামনে নিজেদের সৌন্দর্য প্রদর্শন করত। পাহাড়ের এক ব্যক্তি তাদের এই উৎসবের দিনে সেখানে অতর্কিত উপস্থিত হয়ে নারীদের রূপ-লাবণ্য দেখতে পেল।

সে ফিরে গিয়ে তার সঙ্গীদের এ সংবাদ দিল। ফলে তারা সমতলে নেমে এসে তাদের সাথে থাকতে শুরু করল এবং তাদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ল। এটাই হলো মহান আল্লাহর বাণী: "আর তোমরা প্রাচীন জাহেলিয়াতের মতো নিজেদের প্রদর্শন করো না।"ইবনে জারীর হাকাম (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে "আর তোমরা প্রাচীন জাহেলিয়াতের মতো নিজেদের প্রদর্শন করো না" আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: আদম এবং নূহ (আলাইহিমাস সালাম)-এর মধ্যবর্তী সময়কাল ছিল আটশ বছর। তাদের নারীরা অত্যন্ত কদাকার ছিল কিন্তু পুরুষরা ছিল সুদর্শন। তখন নারীরা পুরুষদের নিজেদের প্রতি প্রলুব্ধ করত।

ফলে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।ইবনে জারীর, ইবনুল মুনযির, ইবনে আবি হাতিম এবং ইবনে মারদুওয়াইহ ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, উমর ইবনুল খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন: নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পত্নীগণের উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহর বাণী—"আর তোমরা প্রাচীন জাহেলিয়াতের মতো নিজেদের প্রদর্শন করো না"—এখানে জাহেলিয়াত কি একাধিক ছিল? ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) বললেন: আমি যখনই 'প্রথম' (প্রাচীন) শব্দটি শুনেছি, তখনই বুঝেছি যে এর একটি 'পরবর্তী' অংশও রয়েছে।তখন উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁকে বললেন: আমাকে আল্লাহর কিতাব থেকে এমন কিছু জানান যা এর সত্যতা প্রমাণ করে।

তিনি বললেন: আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—"এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করো যেভাবে জিহাদ করা উচিত; যেমন তোমরা প্রথমবার জিহাদ করেছিলে" (সূরা আল-হজ, আয়াত: ৭৮)। উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন: আমাদের কাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে? তিনি বললেন: বনী মাখযুম এবং আবদু শামসের বিরুদ্ধে।ইবনে আবি হাতিম অন্য একটি সূত্রে ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে মহান আল্লাহর বাণী—"আর তোমরা জাহেলিয়াতের মতো প্রদর্শন করো না"—প্রসঙ্গে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: ভবিষ্যতে আরেকটি জাহেলিয়াত আসবে।