Al-Hajj

আল-হাজ্জ: 39

22:39
টেক্সট কপি
22 আল-হাজ্জ Al-Hajj · 78 আয়াত الحج

মূল আরবি

أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَـٰتَلُونَ بِأَنَّهُمْ ظُلِمُوا۟ ۚ وَإِنَّ ٱللَّهَ عَلَىٰ نَصْرِهِمْ لَقَدِيرٌ

English Translations

Sahih International

Permission [to fight] has been given to those who are being fought, because they were wronged. And indeed, Allāh is competent to give them victory.

Muhsin Khan

Permission to fight is given to those (i.e. believers against disbelievers), who are fighting them, (and) because they (believers) have been wronged, and surely, Allah is Able to give them (believers) victory

Taqi Usmani

Permission (to fight) is given to those against whom fighting is launched, because they have been wronged, and Allah is powerful to give them victory.

Abul Ala Maududi

Permission (to fight) has been granted to those for they have been wronged. Verily Allah has the power to help them:

Pickthall

Sanction is given unto those who fight because they have been wronged; and Allah is indeed Able to give them victory;

Yusuf Ali

To those against whom war is made, permission is given (to fight), because they are wronged;- and verily, Allah is most powerful for their aid;-

বাংলা অনুবাদ

তাইসিরুল কুরআন

যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হয় তাদেরকে যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হল, কেননা তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে। আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করতে অবশ্যই সক্ষম।

রাওয়াই আল-বায়ান

যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হল তাদেরকে, যাদেরকে আক্রমণ করা হচ্ছে। কারণ তাদের ওপর নির্যাতন করা হয়েছে। নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে বিজয় দানে সক্ষম।

শাইখ মুজিবুর রহমান

যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হল তাদেরকে যারা আক্রান্ত হয়েছে। কারণ তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে। আল্লাহ নিশ্চয়ই তাদেরকে সাহায্য করতে সক্ষম।

ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হল তাদেরকে যারা আক্রান্ত হয়েছে; কারণ তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে। আর নিশ্চয় আল্লাহ্‌ তাদেরকে সাহায্য করতে সম্যক সক্ষম;

ফাতহুল মাজীদ

যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হল তাদেরকে যারা আক্রান্ত‎ হয়েছে; কারণ তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে। আল্লাহ নিশ্চয় তাদেরকে সাহায্য করতে সক্ষম;

মুখতাসার

৩৯. যাদের সাথে মুশরিকরা যুদ্ধ করে এমন মু’মিনদের জন্য আল্লাহ যুদ্ধের অনুমতি দিয়েছেন। কারণ, তাদের উপর তাদের শত্রুদের পক্ষ থেকে যুলুম এসে থাকে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা বিনা যুদ্ধে মু’মিনদেরকে তাদের শত্রু পক্ষের উপর বিজয় দিতে সক্ষম। তবে তাঁর কৌশল চাচ্ছে তিনি মু’মিনদেরকে কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করিয়ে পরীক্ষা করবেন।

তাফসীর

তাফসীর ইবনে কাসীর

৩৯-৪০ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সা হাবীবর্গকে মদীনা হতেও বের করে দেয়ার উপক্রম হয় এবং মক্কাবাসী কাফিররা মদীনা আক্রমণ করতে উদ্যত হয় তখন জিহাদের অনুমতির এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। বহু পূর্ব যুগীয় গুরুজন হতে বর্ণিত আছে যে, জিহাদের প্রথম আয়াত এটাই যা কুরআন কারীমে অবতীর্ণ হয়। এর দ্বারা কোন কোন গুরুজন এই দলীল গ্রহণ করেছেন যে, এটা মাদানী সূরা। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কা হতে মদীনায় হিজরত করেন তখন হযরত আবূ বকর (রাঃ) বলে ফেলেনঃ “বড়ই পরিতাপের বিষয় যে, এই কাফিররা আল্লাহর রাসূলকে (সঃ) তাঁর জন্মভূমি হতে বের করে দিলো!

নিঃসন্দেহে এরা ধ্বংস হয়ে যাবে।" অতঃপর এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) জেনে নেন যে, এদের সাথে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী। আল্লাহ তাআলা স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে সাহায্য করতে সক্ষম। ইচ্ছা করলে বিনা যুদ্ধেই তিনি তাদেরকে জয়যুক্ত করতে পারেন। কিন্তু তিনি পরীক্ষা করতে চান। যেমন মহামহিমান্বিত ও প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ “যখন তোমরা কাফিরদের সাথে যুদ্ধে মুকাবিলা কর তখন তাদের গর্দানে আঘাত কর, পরিশেষে যখন তোমরা তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পারাভূত করবে তখন তাদেরকে কষে বাধবে, অতঃপর হয় অনুকম্পা, নয় মুক্তিপণ। তোমরা জিহাদ চালাবে যতক্ষণ না যুদ্ধ ওর অস্ত্র নামিয়ে ফেলে।

এটাই বিধান। এটা এই জন্যে যে, আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদেরকে শাস্তি দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি চান তোমাদের একজনকে অপরের দ্বারা পরীক্ষা করতে। যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তিনি কখনো তাদের কর্ম বিনষ্ট হতে দেন না। তিনি তাদেরকে সৎপথে পরিচালিত করেন এবং তাদের অবস্থা ভাল করে দেন।তিনি তাদেরকে দাখিল করবেন জান্নাতে, যার কথা তিনি তাদেরকে জানিয়ে ছিলেন। আল্লাহ তাআলা আর এক জায়গায় বলেনঃ “তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ কর, আল্লাহ তোমাদের হাতে তাদেরকে শাস্তি দান করবেন এবং তাদেরকে অপদস্থ করবেন, আর তোমাদেরকে তাদের উপর বিজয়ী করবেন, তিনি মুমিনদের বক্ষ খুলে দিবেন এবং তাদের সাথে যাকে ইচ্ছা তিনি তাওবা করার তাওফীক দান করবেন, আল্লাহ মহাজ্ঞানী, বিজ্ঞানময়।" অন্য অন্য আয়াতে রয়েছেঃ “তোমরা কি মনে করেছে যে, তোমাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে?

অথচ আল্লাহ জানেন নাই তোমাদের মধ্যে যারা মুজাহিদ তাদেরকে এবং যারা আল্লাহ, তদীয় রাসূল (সঃ) এবং মুমিনদেরকে ছেড়ে অন্য কাউকেও বন্ধুরূপে গ্রহণ করে নাই? তোমরা জেনে রেখো যে, তোমরা যা কিছু করছো আল্লাহ তা সবই খবর রাখেন।" মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, যখন আল্লাহ তোমাদের মধ্যে কে জিহাদ করেছে এবং কে ধৈর্যশীল তা এখনো জানেন না?” (৩:১৪২) আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করবো, যতক্ষণ না আমি জেনে নিই তোমাদের মধ্যে জিহাদকারী ও ধৈর্যশীলদেরকে এবং আমি তোমাদের ব্যাপারে পরীক্ষা করি।” (৪৭:৩১) এই ব্যাপারে আরো বহু আয়াত রয়েছে।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করতে সম্যক সক্ষম।

আর এটাই হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা স্বীয় সেনাবাহিনীকে দুনিয়ার উপর বিজয় দান করেন।জিহাদ যে সময় শরীয়ত সম্মত হয় ঐ সময়টাও ছিল ওর জন্যে সম্পূর্ণরূপে উপযোগী ও সঠিক। যতদিন পর্যন্ত রাসুলুল্লাহ (সঃ) মক্কায় ছিলেন ততদিন পর্যন্ত মুসলমানরা ছিলেন খুবই দুর্বল। সংখ্যায়ও ছিলেন তারা খুবই কম। মুশরিকদের দশজনের স্থলে মুসলমানরা মাত্র একজন। আকাবার রাত্রে যখন আনসারগণ রাসূলুল্লাহর (সঃ) হাতে বায়আত গ্রহণ করেন তখন তারা বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি হুকুম করলে এখন মিনাতে যত মুশরিক একত্রিত হয়ে রয়েছে তাদের উপর আক্রমণ চালিয়ে আমরা তাদেরকে হত্যা করে ফেলবো।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “না, আমাকে এখনো এই হুকুম দেয়া হয় নাই।” এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, ঐ সময় মহান ব্যক্তিদের সংখ্যা ছিল মাত্র আশির কিছু বেশী।

শেষ পর্যন্ত মুশরিকদের উপদ্রব চরম সীমায় পৌঁছে গেল। রাসূলুল্লাহকে (সঃ) তারা নানা ভাবে কষ্ট দিতে লাগলো। এমনকি তাঁকে হত্যা করারও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে পড়লো। অনুরূপভাবে সাহাবায়ে কিরামের উপরও বিপদের পাহাড় চেপে বসলো এবং তাঁরা মাল-ধন, আত্মীয়-স্বজন সবকিছু ছেড়ে যে যেখানে পারলেন পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করলেন। কেউ গেলেন আবিসিনিয়ায় এবং কেউ গেলেন মদীনায়। এমন কি স্বয়ং রিসালাতের সূর্যের (সঃ) উদয়ও মদীনাতেই হলো। মদীনাবাসী মুহাম্মদী পতাকাতলে (সঃ) সমবেত হয়ে গেলেন। ফলে, ওটা একটা সেনাবাহিনীর রূপ নিয়ে ফেললো। কিছু মুসলমানকে এক ঝাণ্ডার নীচে দেখা যেতে লাগলো।

তাঁদের পা রাখার জায়গা হয়ে গেল। এখন ইসলামের দুশমনদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ার হুকুম নাযিল হয়ে গেল। যুদ্ধের এটাই হলো প্রথম আয়াত। এতে বলা হলো যে, এই মুসলমানরা অত্যাচারিত। তাদের ঘরবাড়ী তাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। বিনা কারণে তাদেরকে তাদের ঘর থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। মক্কা থেকে তাদেরকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। নিঃস্ব ও অসহায় অবস্থায় তারা মদীনায় পৌঁছেছে। তাদের কোনই অপরাধ ছিল না। একমাত্র অপরাধ এই যে, তারা এক আল্লাহর উপাসনা করেছে। তাঁকে এক বলে স্বীকার করে নিয়েছে। তারা তাদের প্রতিপালক হিসেবে একমাত্র আল্লাহকেই মেনেছে।

এটা হলো ইসৃতিসনা মুনকাতা। আসলে এটা ছিল মুশরিকদের কাছে অমার্জনীয় অপরাধ। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা রাসূলুল্লাহকে (সঃ) এবং তোমাদেরকে এ কারণেই বের করে দিয়েছে যে, তোমরা তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহর উপর ঈমান এনেছো।” (৬০:১) যেমন আসহাবুল উখদুদের ঘটনায় বলা হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা তাদেরকে নির্যাতন করেছিল শুধু এই কারণে যে, তারা বিশ্বাস করতো পরাক্রমশালী ও প্রশংসনীয় আল্লাহে।” (৮৫:৮)।মুসলমান সাহাবীগণ খন্দক খননের সময় নিম্নলিখিত ছন্দ পাঠ করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আপনি না থাকলে (আপনার দয়া না হলে) আমরা সুপথ প্রাপ্ত হতাম না এবং আমরা দান-খয়রাতও করতাম না, নামাযও পড়তাম না।

সুতরাং আমাদের উপর প্রশান্তি অবতীর্ণ করুন এবং আমরা যুদ্ধের সম্মুখীন হলে আমাদের পা গুলি অটুট ও স্থির রাখুন! নিশ্চয় প্রথমে তারা আমাদের উপর চালিয়েছে, যদি তারা বিশৃংখলা সৃষ্টির ইচ্ছা করে তবে আমরা তা প্রত্যাখ্যান করবো। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের আনুকূল্য করেছিলেন এবং ছন্দের শেষ অংশটি তিনিও তাদের সাথে পাঠ করছিলেন। (আরবী) বলার সময় স্বর খুব উঁচু করেছিলেন।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহ যদি মানব জাতির এক দলকে অন্য দল দ্বারা প্রতিহত না করতেন তবে বিধ্বস্ত হয়ে যেতো খৃস্টান সংসার বিরাগীদের উপাসনা স্থান। অর্থাৎ ভূ-পৃষ্ঠে, বিশৃংখলা ও অশান্তি সৃষ্টি হয়ে যেতো।

শক্তিশালীরা দুর্বলদেরকে খেয়ে ফেলতো। খৃস্টান পাদরীদের ছোট উপাসনালয়কে (আরবী) বলা হয়। একটা উক্তি এটাও আছে যে, সাবী মাযহাবের লোকদের উপাসনালয়কে (আরবী) বলা হয়। কেউ কেউ আবার বলেন যে, অগ্নি উপাসকদের উপাসনালয়কে (আরবী) বলে। মুকাতিল (রঃ) বলেন যে, (আরবী) হলো ঐ ঘর যা পথের উপর থাকে (আরবী) হলো (আরবী) অপেক্ষা বড় ঘর। এটাও খৃস্টান পাদরীদের ইবাদতের ঘর। কেউ কেউ বলেন যে, এটা হলো ইয়াহূদীদের উপাসনালয়। (আরবী) এরও একটি অর্থ এটাই করা হয়েছে। কেউ কেউ আবার বলেন যে, এর দ্বারা গীর্জাকে বুঝানো হয়েছে। কারো কারো উক্তি এই যে, এটা হলো সা’ৰী লোকদের ইবাদতখানা।

রাস্তার উপর আহলে কিতাবের যে ইবাদতখানা থাকে তাকে (আরবী) বলে। আর মুসলমানদের ইবাদতখানা হলো মাসজিদ। (আরবী) এর সর্বনামটি (আরবী) এর দিকে ফিরেছে। কেননা এটাই এর সবচেয়ে বেশী নিকটবর্তী। এটাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা এইসব জায়গাকেই বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ সংসারত্যাগীদের উপাসনালয় (আরবী) খৃস্টানদের (আরবী) ইয়াহুদীদের (আরবী) এবং মুসলমানদের (আরবী) যে গুলিতে অধিক স্মরণ করা হয় আল্লাহর নাম। কোন কোন আলেমের উক্তি এই যে, এখানে কম হতে ক্রমান্বয়ে বেশীর দিকে যাওয়া হয়েছে। তুলনামূলকভাবে দুনিয়ায় মসজিদের সংখ্যা বেশী এবং এতে ইবাদতকারীদের সংখ্যাও অধিকতম।আল্লাহ তাআলার উক্তিঃ আল্লাহ নিশ্চয়ই তাকে সাহায্য করেন যে তাঁকে সাহায্য করে।

যেমন অন্য জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর তবে তিনি তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পাগুলি স্থির রাখবেন। আর যারা কুফরী করেছে তাদের জন্যে রয়েছে দুর্ভোগ এবং তিনি তাদের কর্ম ব্যর্থ করে দিবেন।” (৪৭:৭-৮) এরপর আল্লাহ তাআলা নিজের দুটি বিশেষণের বর্ণনা দিচ্ছেন। তার একটি হলো তার শক্তিশালী হওয়া এই কারণে যে, তিনি সমস্ত সৃষ্ট জীব ও সৃষ্ট বস্তুর সৃষ্টিকর্তা। তাঁর দ্বিতীয় বিশেষণ এই যে, তিনি হলেন মহা মর্যাদাবান ও মহাপরাক্রমশালী। কেননা, সমস্ত কিছুই তার অধীন। সবই তাঁর সামনে হেয় ও তুচ্ছ।

সবাই তার সাহায্যের মুখাপেক্ষী। তিনি সব কিছু হতে, অমুখাপেক্ষী ও অভাবমুক্ত। যাকে তিনি সাহায্য করেন সে জয়যুক্ত হয়। আর যার উপর থেকে তিনি সাহায্যের হাত টেনে নেন সে হয় পরাজিত। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমার প্রেরিত বান্দাদের সম্পর্কে আমার এই বাক্য পূর্বেই স্থির হয়েছে যে, অবশ্যই তারা সাহায্য প্রাপ্ত হবে এবং আমার বাহিনীই হবে বিজয়ী।” (৩৭:১৭১-১৭৩) তিনি আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ লিপিবদ্ধ করেই রেখেছেনঃ আমি ও আমার রাসূলরা জয়যুক্ত থাকবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ শক্তিমান, পরাক্রমশালী।” (৫৮:২১)

তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া

যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হল তাদেরকে যারা আক্রান্ত হয়েছে [১]; কারন তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে [২]। আর নিশ্চয় আল্লাহ্‌ তাদেরকে সাহায্য করতে সম্যক সক্ষম [৩];

[১] ইবনে আব্বাস বলেন, এ আয়াত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবীদের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে। যখন তাদেরকে মক্কা থেকে বের করে দেয়া হয়। [ইবন কাসীর] অধিকাংশ মনীষী বলেছেন, জিহাদের ব্যাপারে এটিই প্রথম নাযিলকৃত আয়াত। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মক্কা থেকে বের করে দেয়া হলো, তখন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, এরা অবশ্যই ধ্বংস হবে, তারা তাদের নবীকে বের করে দিয়েছে। ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন’ তখন এ আয়াত নাযিল হয়। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তখন আমি বুঝতে পারলাম যে, যুদ্ধ হতে যাচ্ছে। আর এটিই প্রথম যুদ্ধের আয়াত। [তিরমিয়ীঃ ৩১৭১; মুসনাদে আহমাদঃ ১/২১৬] এর আগে মুসলিমদেরকে যুদ্ধ করতে নিষেধ করা হয়েছিল। তাদেরকে সবর করতে নির্দেশ দেয়া হচ্ছিল। [মুয়াসসার]

[২] এদের উপর যে ধরনের অত্যাচার করে বের করে দেয়া হয় তা অনুমান করার জন্য একটি ঘটনা থেকেই বোঝা যায়: সুহাইব রুমী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু যখন হিজরত করতে থাকেন তখন কুরাইশ বংশীয় কাফেররা তাঁকে বলে, তুমি এখানে এসেছিলে খালি হাতে। এখন অনেক ধনী হয়ে গেছো। যেতে চাইলে তুমি খালি হাতে যেতে পারো। নিজের ধন-সম্পদ নিয়ে যেতে পারবে না। অথচ তিনি নিজে পরিশ্রম করেই এ ধন-সম্পদ উপার্জন করেছিলেন। কারো দান তিনি খেতেন না। ফলে বেচারা হাত-পা ঝেড়ে উঠে দাঁড়ান এবং সবকিছু ঐ জালেমদের হাওয়ালা করে দিয়ে এমন অবস্থায় মদীনায় পৌঁছেন যে, নিজের পরণের কাপড়গুলো ছাড়া তাঁর কাছে আর কিছুই ছিল না।

[ইবন হিব্বানঃ ১৫/৫৫৭] মক্কা থেকে মদীনায় যারাই হিজরত করেন তাদের প্রায় সবাইকেই এ ধরনের যুলুম-নির্যাতনের শিকার হতে হয়। ঘর-বাড়ি ছেড়ে চলে আসার সময়ও যালেমরা তাদেরকে নিশ্চিন্তে ও নিরাপদে বের হয়ে আসতে দেয়নি। মোটকথাঃ মক্কায় মুসলিমদের উপর কাফেরদের নির্যাতন চরম সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল। এমন কোন দিন যেত না যে, কোন না কোন মুসলিম তাদের নিষ্ঠুর হাতে আহত ও প্রহৃত হয়ে না আসত। মক্কায় অবস্থানের শেষ দিনগুলোতে মুসলিমদের সংখ্যাও যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছিল। তারা কাফেরদের যুলুম ও অত্যাচার দেখে তাদের মোকাবেলায় যুদ্ধ করার অনুমতি চাইতেন।

কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাবে বলতেনঃ সবর কর। আমাকে এখনো যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হয়নি। দীর্ঘ দশ বছর পর্যন্ত এমনিতর পরিস্থিতি অব্যাহত রইল।

[৩] অর্থাৎ তিনি তাঁর মুমিন বান্দাদের বিনা যুদ্ধে সাহায্য করতে সক্ষম। কিন্তু তিনি চান তাঁর বান্দারা তাদের প্রচেষ্টা তাঁর আনুগত্যে কাজে লাগাবে। যেমন অন্য আয়াতে এসেছে, “অতএব যখন তোমরা কাফিরদের সাথে যুদ্ধে মুকাবিলা কর তখন ঘাড়ে আঘাত কর, অবশেষে যখন তোমরা তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পর্যুদস্ত করবে তখন তাদেরকে মজবুতভাবে বাঁধ; তারপর হয় অনুকম্পা, নয় মুক্তিপণ। যতক্ষণ না যুদ্ধ এর ভার (অস্ত্র) নামিয়ে না ফেলে। এরূপই, আর আল্লাহ্‌ ইচ্ছে করলে তাদের থেকে প্রতিশোধ নিতে পারতেন, কিন্তু তিনি চান তোমাদের একজনকে অন্যের দ্বারা পরীক্ষা করতে। আর যারা আল্লাহ্‌র পথে নিহত হয় তিনি কখনো তাদের আমলসমূহ বিনষ্ট হতে দেন না।

অচিরেই তিনি তাদেরকে পথনির্দেশ করবেন এবং তাদের অবস্থা ভাল করে দিবেন। আর তিনি তাদেরকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে, যার পরিচয় তিনি তাদেরকে জানিয়েছিলেন।” [সূরা মুহাম্মদঃ ৪-৬] আর এজন্যই ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, তিনি অবশ্যই সে সাহায্য করেছেন। [ইবন কাসীর] জিহাদ তো তিনি তখনই ফরয করেছেন যখন তার উপযোগিতা দেখা গিয়েছিল। কেননা, তারা যখন মক্কায় ছিল তখন মুসলিমদের সংখ্যা ছিল কম। যদি তখন জিহাদের কথা বলা হত, তবে তাদের কষ্ট আরও বেড়ে যেত। আর এজন্যই যখন মদীনাবাসীরা আকাবার রাত্রিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে বাই‘আত বা শপথ নিয়েছিল, তারা ছিল আশি জনেরও কিছু বেশী।

তখন তারা বলেছিল, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আমরা কি উপত্যকাবাসীদের উপর আক্রমন করবো না? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমাকে এ জন্য নির্দেশ দেয়া হয়নি। তারপর যখন তারা সীমালঙ্ঘন করল, আর তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাদের কাছ থেকে বের করে দিল এবং তাকে হত্যা করতে চাইল। আর সাহাবায়ে কিরামের কেউ হাবশাতে কেউ মদীনাতে হিজরত করল। তারপর যখন মদীনাতে তারা স্থির হলো এবং তাদের কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে পৗঁছালেন, তারা তার চারপাশে জমা হলেন। তাকে সাহায্য করার জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন।

আর তাদের জন্য একটি ইসলামী দেশ হলো, একটি কেল্লা হলো যেখানে তারা আশ্রয় নিতে পারে, তখনই আল্লাহ্‌ শক্ৰদের সাথে জিহাদ করার অনুমতি দিলেন। [ইবন কাসীর]

তাফসীর আল-কুরতুবী

[সূরা আল-হজ্জ (২২): আয়াত ৩৯] পূর্ণ পৃষ্ঠা

পঞ্চম পরিচ্ছেদ- মহান আল্লাহর বাণী: (এবং সৎকর্মপরায়ণদের সুসংবাদ দিন) বর্ণিত আছে যে, এটি চার খলীফার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে, যেমনটি পূর্ববর্তী আয়াতের আলোচনায় অতিক্রান্ত হয়েছে। তবে শব্দের বাহ্যিক অর্থ সকল সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তির ক্ষেত্রে সাধারণ হওয়াকেই দাবি করে। ‌‌[সূরা আল-হজ্জ (২২): আয়াত ৩৮]নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের রক্ষা করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো বিশ্বাসঘাতক, অকৃতজ্ঞকে পছন্দ করেন না। (৩৮)বর্ণিত আছে যে, এটি মুমিনদের কারণে অবতীর্ণ হয়েছে যখন মক্কায় তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং কাফেররা তাদের কষ্ট দিতে থাকে এবং যারা হিজরত করার তারা হাবশা (আবিসিনিয়া) অভিমুখে হিজরত করেন।

মক্কার কিছু মুমিন চাইলেন যে, কাফেরদের মধ্যে যাকে সম্ভব হত্যা করবেন এবং অতর্কিতে আক্রমণ, বিশ্বাসঘাতকতা ও চক্রান্তের আশ্রয় নেবেন; তখন এই আয়াতটি "অকৃতজ্ঞ" শব্দ পর্যন্ত অবতীর্ণ হয়। এতে মহান আল্লাহ রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতারণা থেকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছেন। বিশ্বাসঘাতকতার কঠোরতা সম্পর্কে 'আল-আনফাল' সূরায় ইতিপূর্বে আলোচনা অতিবাহিত হয়েছে এবং এও বর্ণিত হয়েছে যে, (প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকের জন্য কিয়ামতের দিন তার পশ্চাদ্দেশে তার বিশ্বাসঘাতকতার মাত্রা অনুযায়ী একটি পতাকা স্থাপন করা হবে এবং বলা হবে—এটি অমুক ব্যক্তির বিশ্বাসঘাতকতা)।

কেউ কেউ বলেছেন: এর অর্থ হলো, আল্লাহ মুমিনদের রক্ষা করেন তাদের তাওফীক বা সামর্থ্যকে স্থায়িত্ব দান করার মাধ্যমে, যাতে ঈমান তাদের অন্তরে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। ফলে কাফেররা তাদের দ্বীন থেকে বিচ্যুত করতে সক্ষম হবে না। যদি জবরদস্তি বা বাধ্য করার মতো পরিস্থিতি ঘটেও, তবে তিনি তাদের হেফাযত করবেন যাতে তারা অন্তরে মুরতাদ বা ধর্মত্যাগী না হয়ে যায়। আবার কেউ কেউ বলেছেন: তিনি মুমিনদের রক্ষা করেন প্রমাণের মাধ্যমে তাদের বিজয়ী করার দ্বারা। অতঃপর, কোনো কাফেরের পক্ষে কোনো মুমিনকে হত্যা করা একটি বিরল ঘটনা; আর যদি ঘটেও, তবে আল্লাহ সেই মুমিনকে তাঁর রহমতের দিকে তুলে নেওয়ার মাধ্যমে তাকে রক্ষা করেন।

ইমাম নাফি' "ইউদাফি'উ" এবং "ওয়া লাওলা দিফা'উ" পাঠ করেছেন। আবু আমর ও ইবনে কাসীর "ইয়াদফাউ" এবং "ওয়া লাওলা দাফউ" পাঠ করেছেন। আসিম, হামজা ও কিসায়ী "ইউদাফি'উ" এবং "ওয়া লাওলা দাফউল্লাহ" পাঠ করেছেন। আর "ইউদাফি'উ" শব্দটি "ইয়াদফাউ" (প্রতিহত করা) অর্থেই ব্যবহৃত হয়, যেমন 'আমি চোরকে শাস্তি দিয়েছি' এবং 'আল্লাহ তাকে আরোগ্য দান করেছেন'—এর মূল ধাতু হলো 'প্রতিহত করা'। আজ-জাহরাবি উল্লেখ করেছেন যে, 'দিফা'আন' শব্দটি 'দাফা-আ' এর একটি মূল রূপ, যেমন 'হিসাব করা' অর্থে ব্যবহৃত হয়। ‌‌[সূরা আল-হজ্জ (২২): আয়াত ৩৯]যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হচ্ছে তাদেরকে যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হলো, কারণ তারা নির্যাতিত।

আর নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের সাহায্য করতে পূর্ণ সক্ষম। (৩৯)এতে দুটি মাসআলা বা আলোচনা রয়েছে: প্রথমটি—মহান আল্লাহর বাণী: "যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হচ্ছে তাদেরকে অনুমতি দেওয়া হলো"—বলা হয়েছে যে, এটি তাঁর বাণী: "নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের রক্ষা করেন" এর ব্যাখ্যা। অর্থাৎ, তিনি তাদের জন্য যুদ্ধ বৈধ করার মাধ্যমে এবং তাদের সাহায্য করার মাধ্যমে কাফেরদের অনিষ্টতা প্রতিহত করবেন। এখানে একটি শব্দ উহ্য রয়েছে, অর্থাৎ...(১). দেখুন: ৮ম খণ্ড, ৩৩ পৃষ্ঠা।(২). পাণ্ডুলিপি 'কাফ'-এ রয়েছে: "অমুকের পুত্র অমুক"।

তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর

পূর্ণ পৃষ্ঠা পূর্ণ পৃষ্ঠা পূর্ণ পৃষ্ঠা

ইবনে জারির, ইবনুল মুনজির এবং ইবনে আবি হাতিম ইবনে আব্বাস (রাযি.) থেকে আল্লাহর বাণী আপনি ক্ষমা বা সহজতা গ্রহণ করুন এর ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন: তিনি বলেন, তাদের সম্পদ থেকে আপনার জন্য যা সহজলভ্য বা উদ্বৃত্ত তা গ্রহণ করুন। তারা আপনাকে যা কিছু প্রদান করে তা গ্রহণ করুন। এটি সূরা বারাআত অবতীর্ণ হওয়ার এবং জাকাতের বিধান ও তার বিস্তারিত বিবরণ আসার পূর্বের কথা।ইবনে আবি হাতিম এবং আবুশ শায়খ ইবনে আব্বাস (রাযি.) থেকে আল্লাহর বাণী আপনি ক্ষমা বা সহজতা গ্রহণ করুন এর ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন: তিনি বলেন, উদ্বৃত্ত অংশ গ্রহণ করুন এবং তা দান করুন।

এবং আপনি সৎকাজের আদেশ দিন অর্থ তিনি বলছেন—সৎকাজের নির্দেশ দিন।তুস্তি তাঁর মাসায়িল গ্রন্থে ইবনে আব্বাস (রাযি.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নাফি ইবনুল আরজাক তাঁকে বললেন: আমাকে আপনি ক্ষমা বা সহজতা গ্রহণ করুন সম্পর্কে অবহিত করুন। তিনি বললেন: তাদের ধনসম্পদ থেকে উদ্বৃত্ত অংশ গ্রহণ করুন; আল্লাহ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন আপনার জন্য তা গ্রহণ করতে।তিনি জিজ্ঞেস করলেন: আরবরা কি এর অর্থ জানত? তিনি বললেন: হ্যাঁ, তুমি কি ওবাইদ ইবনুল আবরাসকে বলতে শোননি: "সে মূর্খতা ও মন্দ কাজগুলোকে ক্ষমা করে দেয় (ছেড়ে দেয়), যেমন বসন্তের বৃষ্টি বারিধারা দিয়ে সব পূর্ণ করে দেয়।" ইবনে জারির এবং আন-নাহহাস তাঁর ‘নাসিখ’ গ্রন্থে সুদ্দি (রহ.) থেকে আল্লাহর বাণী আপনি ক্ষমা বা সহজতা গ্রহণ করুন প্রসঙ্গে বর্ণনা করেছেন: তিনি বলেন, (এর অর্থ) সম্পদের উদ্বৃত্ত অংশ; যা পরবর্তীতে জাকাতের বিধান দ্বারা রহিত হয়েছে।আবুশ শায়খ সুদ্দি (রহ.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আপনি ক্ষমা বা সহজতা গ্রহণ করুন এই আয়াতটি যখন অবতীর্ণ হয়, তখন মানুষ তার সম্পদের মধ্যে যতটুকু নিজের প্রয়োজনে লাগত তা রেখে বাকি উদ্বৃত্ত অংশ সদকা করে দিত।

অতঃপর আল্লাহ তাআলা জাকাতের বিধান দ্বারা এটি রহিত করেন। এবং সৎকাজের আদেশ দিন অর্থাৎ কল্যাণের নির্দেশ দিন। আর মূর্খদের এড়িয়ে চলুন সম্পর্কে তিনি বলেন: এই আয়াতটি সালাত, জাকাত এবং জিহাদ ফরজ হওয়ার পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছিল। আল্লাহ তাঁকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন, অতঃপর জিহাদের বিধান দ্বারা তা রহিত হয়ে যায় এবং অবতীর্ণ হয়: যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হচ্ছে, তাদেরকে যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হলো, কারণ তাদের ওপর জুলুম করা হয়েছে (সূরা হজ, আয়াত ৩৯)। - আয়াত (২০০)

...একটি ধারালো তলোয়ার নিয়ে তারা তাকে আঘাত করবে—অর্থাৎ এক ব্যক্তির আঘাতের মতো—অতঃপর তোমরা যখন তাকে হত্যা করবে, তখন তার রক্ত সকল গোত্রের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যাবে। তখন আমার মনে হয় না যে বনু হাশিমের এই শাখাটি সকল কুরাইশের সাথে যুদ্ধে সক্ষম হবে। আর তারা যখন তা চাইবে, তখন তারা রক্তপণ গ্রহণ করবে, আর আমরা শান্ত হব এবং আমাদের থেকে তার কষ্টদায়ক বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন করে দেব।অতঃপর নজদী শায়খ বললেন: "আল্লাহর কসম, এটিই হলো সঠিক সিদ্ধান্ত; এই যুবক যা বলেছে তাই হলো চূড়ান্ত কথা, আমি এর বাইরে অন্য কোনো পথ দেখছি না।" অতঃপর তারা এই সিদ্ধান্তের ওপর বিচ্ছিন্ন হলো এবং তারা এ বিষয়ে তাঁর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ছিল।অতঃপর জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট আসলেন এবং তাঁকে নির্দেশ দিলেন যেন তিনি তাঁর সেই বিছানায় রাত না কাটান যেটিতে তিনি সচরাচর রাত কাটাতেন।

তিনি তাঁকে সেই সম্প্রদায়ের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে অবহিত করলেন। ফলে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেই রাতে তাঁর ঘরে রাত কাটালেন না। সে সময় আল্লাহ তাঁকে হিজরতের অনুমতি দিলেন এবং তাঁদের হিজরত করার নির্দেশ দিলেন এবং তাঁদের ওপর যুদ্ধের বিধান অবতীর্ণ করলেন। অতঃপর আল্লাহ নাজিল করলেন: "যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হলো তাদেরকে, যাদের সাথে যুদ্ধ করা হচ্ছে..." (সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত ৩৯)। এই দুই আয়াতই ছিল যুদ্ধ সম্পর্কে অবতীর্ণ প্রথম আয়াত। মদিনায় আগমনের পর তাঁর ওপর আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ করিয়ে দিতে আল্লাহ অবতীর্ণ করেন: "স্মরণ করো সেই সময়ের কথা যখন কাফিররা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিল..." আয়াতটি শেষ পর্যন্ত।সুনাইদ, ইবনে জারির, ইবনে মুনযির, ইবনে আবি হাতিম এবং আবু শায়খ উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: যখন তারা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বন্দি করার, হত্যা করার বা বের করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করল, তখন তাঁর চাচা আবু তালিব তাঁকে বললেন: "তুমি কি জানো তারা তোমার বিরুদ্ধে কী ষড়যন্ত্র করেছে?" তিনি বললেন: "তারা আমাকে কারারুদ্ধ করতে চায়, অথবা আমাকে হত্যা করতে চায়, অথবা আমাকে বের করে দিতে চায়।"তিনি বললেন: "তোমাকে এ কথা কে জানাল?" তিনি বললেন: "আমার প্রতিপালক।"তিনি বললেন: "তোমার প্রতিপালক কতই না উত্তম প্রতিপালক!

তুমি তাঁর নিকট কল্যাণ প্রার্থনা করো।" তিনি বললেন: "আমি কি তাঁর নিকট কল্যাণ প্রার্থনা করব? বরং তিনিই আমার কল্যাণের ভার গ্রহণ করবেন।"ইবনে জারির উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর সূত্রে মুত্তালিব ইবনে আবি ওয়াদা'আ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আবু তালিব নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বললেন: "তোমার কওম তোমার বিরুদ্ধে কী ষড়যন্ত্র করছে?" তিনি বললেন: "তারা আমাকে কারারুদ্ধ করতে চায়, অথবা আমাকে হত্যা করতে চায়, অথবা আমাকে বের করে দিতে চায়।"তিনি বললেন: "তোমাকে এ কথা কে জানাল?" তিনি বললেন: "আমার প্রতিপালক।"তিনি বললেন: "তোমার প্রতিপালক কতই না উত্তম প্রতিপালক!

অতএব তুমি তাঁর নিকট কল্যাণ প্রার্থনা করো।" তিনি বললেন: "আমি কি তাঁর নিকট কল্যাণ প্রার্থনা করব? বরং তিনিই আমার কল্যাণের ভার গ্রহণ করবেন।" অতঃপর অবতীর্ণ হলো: "স্মরণ করো সেই সময়ের কথা যখন কাফিররা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিল।"ইবনে জারির এবং আবু শায়খ ইবনে জুরাইজ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে "স্মরণ করো সেই সময়ের কথা যখন কাফিররা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিল" আয়াতটি সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন: তিনি বলেন, এটি একটি মক্কী আয়াত।ইবনে মারদুবাইহ আনাস ইবনে মালিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন: নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে দিনসমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল।

যখন শনিবার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো, তিনি বললেন: "এটি ষড়যন্ত্র ও প্রতারণার দিন।"তারা বলল: "হে আল্লাহর রাসূল! সেটি কীভাবে?" তিনি বললেন: "এই দিনেই কুরাইশরা দারুন নদওয়ায় ষড়যন্ত্র করেছিল, যখন আল্লাহ বলেন: 'স্মরণ করো সেই সময়ের কথা যখন কাফিররা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিল যেন তারা তোমাকে বন্দি করতে পারে, অথবা হত্যা করতে পারে, অথবা বের করে দিতে পারে; তারা ষড়যন্ত্র করছিল আর আল্লাহও কৌশল অবলম্বন করছিলেন, আর আল্লাহই শ্রেষ্ঠতম কৌশলী'।"

বনু নাজ্জার গোত্রের আসআদ ইবনে যুরারার অভিভাবকত্বে থাকা ইয়াতীম বালকদ্বয়ের খেজুর শুকানোর স্থানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উট যখন বসে পড়ল, তখন তিনি বললেন: "ইনশাআল্লাহ, এটিই হবে গন্তব্যস্থল।" অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বালক দুজনকে ডেকে পাঠালেন এবং সেখানে মসজিদ নির্মাণের উদ্দেশ্যে সেই স্থানটির মূল্য নির্ধারণের আলোচনা করলেন।তারা বলল: "না হে আল্লাহর রাসুল! বরং আমরা এটি আপনাকে দান করলাম।"কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের নিকট থেকে তা দান হিসেবে গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন এবং শেষ পর্যন্ত তা তাঁদের থেকে ক্রয় করে নিলেন।

এরপর তিনি সেখানে মসজিদ নির্মাণ করলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদ নির্মাণের সময় তাঁদের সাথে কাঁচা ইট বহন করতে শুরু করলেন এবং বলছিলেন: "এই শ্রম (বা এই ভার) খায়বারের ভারের মতো নয়; হে আমাদের প্রতিপালক! এটিই অধিক পুণ্যময় ও পবিত্র। প্রকৃত প্রতিদান তো কেবল আখেরাতেরই প্রতিদান; সুতরাং আপনি আনসার ও মুহাজিরদের প্রতি রহম করুন।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক মুসলিম ব্যক্তির পদ্য আবৃত্তি করছিলেন যার নাম আমার কাছে উল্লেখ করা হয়নি। ইবনে শিহাব বলেন: "হাদিসসমূহে আমার কাছে এমন কোনো তথ্য পৌঁছেনি যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই পঙক্তিগুলো ব্যতীত অন্য কোনো পূর্ণাঙ্গ কবিতা আবৃত্তি করেছেন; তবে মসজিদ নির্মাণের সময় তিনি তাঁদের উৎসাহিত করতে এই ছন্দে আবৃত্তি করতেন।"অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কুরাইশ কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হলেন, তখন যুদ্ধ পরিস্থিতি হাবাশার মুহাজিরদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট পৌঁছাতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

শেষ পর্যন্ত খন্দকের যুদ্ধের সময় তাঁরা মদিনায় তাঁর সাথে মিলিত হন। আসমা বিনতে উমাইস রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করতেন যে, ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু হাবাশা ভূমিতে তাঁদের দীর্ঘ অবস্থানের কারণে তাঁদের নিয়ে ঠাট্টা করতেন। আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা বিষয়টি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট উল্লেখ করলে তিনি বললেন: "তোমরা তেমন নও (অর্থাৎ তোমরা পিছিয়ে নও)।" যুদ্ধের ব্যাপারে অবতীর্ণ প্রথম আয়াতটি ছিল— "যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হচ্ছে তাদেরকে যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হলো, কারণ তাদের প্রতি জুলুম করা হয়েছে" (সুরা আল-হজ, আয়াত ৩৯)— "নিশ্চয়ই তিনি অতি শক্তিশালী ও পরাক্রমশালী" পর্যন্ত।ইবনে আবি শাইবা, আহমদ এবং বুখারি আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় আগমন করলেন এমতাবস্থায় যে, আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর পেছনে সওয়ার ছিলেন।

আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন একজন পরিচিত প্রবীণ ব্যক্তি, আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন অপরিচিত। লোকেরা বলত: "হে আবু বকর, আপনার সামনে এই যুবকটি কে?" তিনি উত্তর দিতেন: "উনি একজন পথপ্রদর্শক, যিনি আমাকে সঠিক পথ দেখাচ্ছেন।"তিনি (আনাস) বলেন: "যখন আমরা মদিনার সন্নিকটে পৌঁছলাম, তখন আমরা হাররাহ নামক স্থানে অবতরণ করলাম এবং আনসারদের নিকট সংবাদ পাঠালাম, অতঃপর তাঁরা এলেন।" তিনি বলেন: "আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মদিনায় প্রবেশের দিনে উপস্থিত ছিলাম; আমি সেই দিনের চেয়ে সুন্দর আর কোনো দিন দেখিনি। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে দিনে ইন্তেকাল করেছিলেন, সেই দিনের চেয়ে কদর্য ও অন্ধকারাচ্ছন্ন আর কোনো দিন আমি দেখিনি।"