Al-Hajj
আল-হাজ্জ: 47
মূল আরবি
وَيَسْتَعْجِلُونَكَ بِٱلْعَذَابِ وَلَن يُخْلِفَ ٱللَّهُ وَعْدَهُۥ ۚ وَإِنَّ يَوْمًا عِندَ رَبِّكَ كَأَلْفِ سَنَةٍ مِّمَّا تَعُدُّونَ
English Translations
And they urge you to hasten the punishment. But Allāh will never fail in His promise. And indeed, a day with your Lord is like a thousand years of those which you count.
And they ask you to hasten on the torment! And Allah fails not His Promise. And verily, a day with your Lord is as a thousand years of what you reckon.
They ask you to bring the punishment sooner, while Allah will never go back on His promise. In fact, one day with your Lord is like one thousand years according to your calculation.
They ask you to hasten the punishment. Allah shall most certainly not fail His promise; but a Day with your Lord is as a thousand years of your reckoning.
And they will bid thee hasten on the Doom, and Allah faileth not His promise, but lo! a Day with Allah is as a thousand years of what ye reckon.
Yet they ask thee to hasten on the Punishment! But Allah will not fail in His Promise. Verily a Day in the sight of thy Lord is like a thousand years of your reckoning.
বাংলা অনুবাদ
তারা তোমাকে তাড়াতাড়ি শাস্তি নিয়ে আসতে বলে (কিন্তু শাস্তি তো আসবে আল্লাহর ও‘য়াদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে), কেননা আল্লাহ কক্ষনো তাঁর ওয়া‘দা খেলাফ করেন না, তোমার প্রতিপালকের একদিন হল তোমাদের গণনায় এক হাজার বছরের সমান।
আর তারা তোমাকে আযাব তরান্বিত করতে বলে, অথচ আল্লাহ কখনো তাঁর ওয়াদা খেলাফ করেন না। আর তোমার রবের নিকট নিশ্চয় এক দিন তোমাদের গণনায় হাজার বছরের সমান।
তারা তোমাকে শাস্তি ত্বরান্বিত করতে বলে, অথচ আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্রুতি কখনও ভংগ করেননা। তোমার রবের একদিন তোমাদের গণনায় সহস্র বছরের সমান।
আর তারা আপনাকে শাস্তি ত্বরান্বিত করতে বলে, অথচ আল্লাহ্ তাঁর প্রতিশ্রুতি কখনো ভংগ করেন না। আর নিশ্চয় আপনার রবের কাছে একদিন তোমাদের গণনার হাজার বছরের সমান;
তারা তোমাকে শাস্তি ত্বরান্বিত করতে বলে, অথচ আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্র“তি কখনো ভঙ্গ করেন না। তোমার প্রতিপালকের নিকট একদিন তোমাদের গণনার সহস্র বৎসরের সমান;
৪৭. হে রাসূল! আপনার সম্প্রদায়ের কাফিররা দুনিয়ার নগদ ও আখিরাতের বাকি শাস্তি দ্রুত পেতে চায় যখন তাদেরকে এ দু’টির ভয় দেখানো হয়েছে। বস্তুতঃ আল্লাহ তা‘আলা তাদের সাথে কৃত ওয়াদার খিলাফ করবেন না। তাদের দ্রুত শাস্তি হলো যা বদরের দিন পতিত হয়েছে। আর আখিরাতে প্রচুর শাস্তি থাকার দরুন তার শাস্তির একদিন দুনিয়ার বসরের হিসেবে এক হাজার বসরের ন্যায়।
তাফসীর
৪৭-৪৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবীকে (সঃ) বলছেনঃ এই বিপথগামী কাফিররা, আল্লাহকে, তাঁর রাসূলকে (সঃ) এবং কিয়ামতের দিনকে মিথ্যা প্রতিপাদনকারীরা তোমাকে শাস্তি ত্বরান্বিত করতে বলছে। তারা বলছে যে, তাদের উপর শান্তি আসতে বিলম্ব হচ্ছে কেন? যে শাস্তি হতে তাদেরকে ভয় দেখানো হচ্ছে তা তাদের উপর কেন তাড়াতাড়ি আসে না? তারা তো স্বয়ং আল্লাহকেও বলতোঃ “হে আল্লাহ! যদি এটা আপনার পক্ষ হতে সত্য হয় তবে আমাদের উপর আকাশ হতে প্রস্তর বর্ষণ করুন অথবা আমাদের কাছে বেদনাদায়ক শাস্তি আনয়ন করুন!" আল্লাহ তাআলা বলেনঃ দেখো, আল্লাহর ওয়াদা সত্য।
কিয়ামত ও শাস্তি অবশ্যই আসবে। আল্লাহর বন্ধুদের মর্যাদা লাভ এবং তার শত্রুদের লাঞ্ছনা ও অপমান অবশ্যম্ভাবী।হযরত আসমাঈ (রঃ) বলেনঃ “আমি একদা আবু আমর ইবনু আ’লার কাছে ছিলাম। এমন সময় আমর ইবনু উবায়েদ আসলো এবং বললোঃ “হে আবু আমর! আল্লাহ তাআলা নিজের ওয়াদা ভঙ্গ করেন কি? উত্তরে তিনি বললেনঃ “না।" তৎক্ষণাৎ সে উপরোক্ত আয়াতটি পাঠ করলো। তখন তিনি বললেনঃ “তুমি কি আজমী? (আরব ছাড়া অন্যান্য সমস্ত দেশের লোককে আজমী বলে) শুনে রেখো যে, আরবে (আরবী) অর্থাৎ ভাল জিনিসের ওয়াদার খেলাপ করা মন্দ বলে বিবেচিত হয়। কিন্তু (আরবী) অর্থাৎ শাস্তির হুকুমের রদবদল করা বা ক্ষমা করে দেয়াকে মন্দ মনে করা হয় না; বরং ওটাকে করুণা ও অনুকম্পা মনে করা হয়।
দেখো, কবি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি যদি কাউকেও শাস্তি দেয়ার কথা বলি অথবা কাউকেও পুরস্কার দেয়ার ওয়াদা করি তবে এটা হতে পারে যে, শাস্তি দেয়ার কথা উলটিয়ে দিতে পারি এবং সম্পূর্ণ মাফ করে দিতে পারি। কিন্তু আমার পুরস্কার দানের ওয়াদা আমি অবশ্যই পূর্ণ করি। মোট কথা, শাস্তি দেয়ার ওয়াদা করে শাস্তি না দেয়া ওয়াদা ভঙ্গ নয়। কিন্তু ইনআমের ওয়াদা করে ইনআ’ম না দেয়া খারাপ বিশেষণ যা থেকে আল্লাহর সত্তা অতি পবিত্র।মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহর নিকট এক একটি দিন তোমাদের হাজার দিনের সমান। তিনি যে শাস্তি দিতে বিলম্ব করেন এটা তাঁর সহনশীলতা।
কেননা, তিনি জানেন যে, যে কোন সময় তিনি তাদেরকে পাকড়াও করতে সক্ষম। কাজেই তাড়াহুড়ার প্রয়োজন কি? তাদের রশি যতই ঢিল দেয়া হোক না কেন, যখন তিনি তাদেরকে পাকড়াও করার ইচ্ছা করবেন, তখন তাদের শ্বাস গ্রহণেরও সময় থাকবে না।ঘোষিত হচ্ছেঃ বহু জনপদবাসী অত্যাচার করার কাজে উঠে পড়ে লেগে গিয়েছিলে। আমি ওটা দেখেও দেখি না। যখন তারা তাতে সম্পূর্ণরূপে নিমগ্ন হয়ে গেল তখন আমি অকস্মাৎ তাদেরকে পাকড়াও করে ফেলি। তারা সবাই আমার কাছে প্রত্যাবর্তন করবে। এছাড়া তাদের কোন উপায় নেই। আমার সামনে তাদেরকে হাজির হতেই হবে। হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দরিদ্র মুসলমানরা ধনী মুসলমানদের অর্ধদিন পুর্বে (অর্থাৎ পাঁচশ বছর পূর্বে) জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (এ হাদীসটি ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন।
জামে তিরমিযী ও সুনানে নাসায়ীতেও এটা বর্ণিত হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “দরিদ্র মুসলমানরা ধনী মুসলমানদের অর্ধদিন পরিমাণ পূর্বে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “অর্ধদিনের পরিমাণ কত?" তিনি উত্তরে বলেনঃ “তুমি কি কুরআন পড় ?” জবাবে বলা হয়ঃ “হাঁ, পড়ি। তিনি তখন (আরবী) এ আয়াতটি পড়ে শুনিয়ে দেন। অর্থাৎ “তোমার প্রতিপালকের একদিন তোমাদের গণনায় সহস্র বছরের সমান।” (২২:৪৭) (এটা ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সা'দ ইবনু আবি অক্কাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর কাছে আমি আশা রাখি যে, তিনি আমার উম্মতকে অর্ধ দিন পিছিয়ে রাখবেন।" হযরত সা’দকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “অর্ধদিনের পরিমাণ কত?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “পাঁচ শ' বছর।" (এটা আবু দাউদ (রঃ) কিতাবুল মালাহিম-এর শেষে বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) এই আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “এই দিন ঐ দিনগুলির অন্তর্ভূক্ত যে গুলিতে আল্লাহ তাআলা আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন।
(এটা ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রঃ) কিতাবুর রদ আ’লাল জামিয়্যাহ্ গ্রন্থে এটাকে স্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা করেছেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতটি নিম্নের আয়াতটির মতইঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি আকাশ হতে পৃথিবী পর্যন্ত সমুদয় বিষয় পরিচালনা করেন, অতঃপর একদিন সমস্ত কিছুই তাঁর সমীপে সমুখিত হবে যে দিনের পরিমাণ হবে তোমাদের হিসেবে হাজার বছরের সমান।” (৩২:৫)ইমাম মুহাম্মদ ইবনু সীরীন (রঃ) আহলে কিতাবের একজন নও মুসলিম হতে বর্ণনা করেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা আসমান ও যমীনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন এবং একদিন তোমার প্রতিপালকের নিকট এক হাজার দিনের সমান যা তোমরা গণনা করে থাকে।
আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার আয়ুষ্কাল রেখেছেন ছয় দিন। সপ্তম দিনে কিয়ামত হবে। আর একদিন হাজার দিনের সমান। সুতরাং ছয়দিন তো কেটেই গেছে। এখন তোমরা সপ্তম দিনে রয়েছে। এখন তো অবস্থা ঠিক গর্ভবতী নারীর মত যার গর্ভ পূর্ণ দশ মাসের হয়ে গেছে। জানা যায় না কোন ক্ষণে সে সন্তান প্রসব করে!
আর তারা আপনাকে শাস্তি ত্বরান্বিত করতে বলে, অথচ আল্লাহ্ তাঁর প্রতিশ্রুতি কখনো ভংগ করেন না [১]। আর নিশ্চয় আপনার রব-এর কাছে একদিন তোমাদের গণনার হাজার বছরের সমান [২];
[১] আয়াতের পূর্ণ অর্থ কি? এ ব্যাপারে কয়েকটি মত রয়েছে- (এক) এসব মিথ্যাপ্রতিপন্নকারীরা তাদের মূর্খতা, অবাধ্যতা ও অদূরদর্শিতার কারণে তাড়াতাড়ি আল্লাহ্র আযাব কামনা করছে। অথচ, আল্লাহ্ কখনো ওয়াদা খেলাফ করেন না। তিনি যে শাস্তির ধমকি দিয়েছেন, তা আসবেই। তারা আপনার কাছে তাড়াতাড়ি সে শাস্তি কামনা করলেও তা তো আর আপনার কাছে নেই, সুতরাং তাদের এই তাড়াহুড়া করা নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হওয়ার কিছুই নেই। কেননা, তাদের সামনে রয়েছে কেয়ামত দিবস, যেদিন তিনি পূর্বাপর সমস্ত সৃষ্টিজগতকে একত্রিক করবেন। তখন তিনি তাদেরকে তাদের প্রতিফল দেবেন।
তাদের উপর তো চিরস্থায়ী শাস্তি আপতিত হবে। সুতরাং দুনিয়ার বুকে তাদের উপর শাস্তি আসুক বা নাই আসুক, সেদিন তা তাদের উপর আসবেই। [দেখুন, ইবন কাসীর] (দুই) যদি আয়াতে উল্লেখিত আযাব দ্বারা দুনিয়ার আযাব উদ্দেশ্য হয় তখন আগের অংশের সাথে পরের অংশের মিল হবে এভাবে যে, তোমাদের উপর আযাব দুনিয়াতেই আসবে। আর সেটা এসেছিল বদরের যুদ্ধে। [কুরতুবী]
[২] এ আয়াতে বলা হয়েছে, “আপনার রব-এর কাছে একদিন তোমাদের গণনার হাজার বছরের সমান”। আখেরাতের একদিন সাৰ্বক্ষণিকভাবে দুনিয়ার এক হাজার বছরের সমান হওয়ার ব্যাপারে বিভিন্ন হাদীসে এর পক্ষে সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ ‘নিঃস্ব মুসলিমগণ ধনীদের থেকে অর্ধেক দিন পাঁচশত বছর পূর্বে জান্নাতে যাবে।' [তিরমিযিঃ ২৩৫৩, ২৩৫৪] সুতরাং আয়াতের অর্থ হবে, বান্দাদের এক হাজার বছরের সমান হচ্ছে আল্লাহ্র একদিন। [ইবন কাসীর]
[সূরা আল-হজ্জ (২২): আয়াত ৪৭] পূর্ণ পৃষ্ঠা
মহান আল্লাহর বাণী: (তবে কি তারা জমিনে ভ্রমণ করেনি?) অর্থাৎ মক্কার কাফিররা, যাতে তারা এই জনপদগুলো প্রত্যক্ষ করে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে এবং তাদের ওপর আল্লাহর আযাব নেমে আসা থেকে সতর্ক হতে পারে, যেমন তাদের পূর্ববর্তীদের ওপর নেমে এসেছিল। (যাতে তাদের এমন হৃদয় হয় যা দিয়ে তারা উপলব্ধি করতে পারে) এখানে আকলকে (উপলব্ধি/বুদ্ধি) হৃদয়ের সাথে সম্বন্ধযুক্ত করা হয়েছে কারণ হৃদয়ই এর আধার, যেমন শ্রবণশক্তির আধার হলো কান। কেউ কেউ বলেছেন: আকলের আধার হলো মস্তিষ্ক; এটি ইমাম আবু হানিফা থেকে বর্ণিত হয়েছে, তবে আমি মনে করি না এটি তাঁর পক্ষ থেকে সঠিক বর্ণনা।
(প্রকৃতপক্ষে চক্ষু তো অন্ধ হয় না) আল-ফাররা বলেন: এখানে ‘হা’ সর্বনামটি একটি ভিত্তি (ইমাদ) হিসেবে এসেছে। ‘ফা-ইন্নাহু’ (পুংলিঙ্গ) পড়াও জায়েয, যা আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের কিরাত; এবং উভয়ের অর্থ একই। পুংলিঙ্গ ব্যবহার করা হয়েছে খবরের প্রেক্ষিতে, আর স্ত্রীলিঙ্গ ব্যবহার করা হয়েছে দৃষ্টিসমূহ (আবসার) বা প্রসঙ্গের (কিসসা) প্রেক্ষিতে। অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে চক্ষুসমূহ অন্ধ হয় না, অথবা প্রকৃত ঘটনা এই যে... (চক্ষু অন্ধ হয় না) অর্থাৎ তাদের বাহ্যিক দৃষ্টিশক্তি অটুট থাকে। (কিন্তু বক্ষস্থিত হৃদয়গুলোই অন্ধ হয়ে যায়) অর্থাৎ সত্য উপলব্ধি ও শিক্ষা গ্রহণ করা থেকে অন্ধ হয়ে যায়।
কাতাদাহ বলেন: বাহ্যিক দৃষ্টিশক্তিকে জীবন নির্বাহ ও উপকারের মাধ্যম করা হয়েছে, আর প্রকৃত উপকারী দৃষ্টি হলো হৃদয়ের দৃষ্টি। মুজাহিদ বলেন: প্রতিটি মানুষের জন্য চারটি চোখ রয়েছে: দুটি তার মাথায় দুনিয়াবি বিষয়ের জন্য, আর দুটি তার হৃদয়ে আখিরাতের বিষয়ের জন্য। যদি কারও মাথার চোখ অন্ধ হয়ে যায় কিন্তু হৃদয়ের চোখ সচল থাকে, তবে তার এই অন্ধত্ব তার কোনো ক্ষতি করবে না। আর যদি মাথার চোখ সচল থাকে কিন্তু হৃদয়ের চোখ অন্ধ হয়ে যায়, তবে তার এই দৃষ্টি তার কোনো উপকারে আসবে না। কাতাদাহ ও ইবনে জুবায়ের বলেন: এই আয়াতটি অন্ধ সাহাবী ইবনে উম্মে মাকতুমের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে।
ইবনে আব্বাস ও মুকাতিল বলেন: যখন অবতীর্ণ হলো— "যে ব্যক্তি এই দুনিয়ায় অন্ধ..." [সূরা বনী ইসরাঈল: ৭২], তখন ইবনে উম্মে মাকতুম বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আমি দুনিয়ায় অন্ধ, তবে কি আমি আখিরাতেও অন্ধ থাকব? তখন অবতীর্ণ হলো— "প্রকৃতপক্ষে চক্ষু তো অন্ধ হয় না, বরং বক্ষস্থিত হৃদয়গুলোই অন্ধ হয়।" অর্থাৎ যে ব্যক্তি দুনিয়ায় তার হৃদয়ের মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণে অন্ধ থাকে, সে আখিরাতে জাহান্নামী হবে। [সূরা আল-হজ্জ (২২): আয়াত ৪৭]তারা আপনার কাছে আযাব ত্বরান্বিত করতে চায়, অথচ আল্লাহ কখনোই তাঁর ওয়াদা ভঙ্গ করেন না। আর আপনার রবের নিকট একদিন তোমাদের গণনার হাজার বছরের সমান।
(৪৭)মহান আল্লাহর বাণী: (তারা আপনার কাছে আযাব ত্বরান্বিত করতে চায়) এটি নাদর বিন আল-হারিস সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে, যার বক্তব্য ছিল: "আমাদের কাছে তা নিয়ে আসো যার ওয়াদা তুমি আমাদের দিচ্ছ যদি তুমি সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও" [সূরা আল-আরাফ: ৭০]। কেউ কেউ বলেছেন: এটি আবু জাহল বিন হিশাম সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে, যার বক্তব্য ছিল: "হে আল্লাহ! যদি এটিই তোমার পক্ষ থেকে সত্য হয়ে থাকে..." [সূরা আল-আনফাল: ৩২]। (আর আল্লাহ কখনোই তাঁর ওয়াদা ভঙ্গ করেন না) অর্থাৎ আযাব নাজিল করার ক্ষেত্রে। আয-যাজ্জাজ বলেন: তারা আযাব ত্বরান্বিত করতে চেয়েছে, তাই আল্লাহ তাদের জানিয়ে দিলেন যে কোনো কিছুই তাঁর আয়ত্তের বাইরে নয়।
আর তাদের ওপর দুনিয়ায় বদর যুদ্ধের দিন আযাব আপতিত হয়েছিল।(১). দেখুন ১০ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৮।(২). দেখুন ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৩৭।(৩). দেখুন ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৯৮।
আফসোস তোমার প্রতি! তুমি কি আমার আগে আর কাউকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করেছ? তিনি বললেন: না।তিনি বললেন: যদি তুমি (অন্য কাউকে) জিজ্ঞেস করতে তবে ধ্বংস হয়ে যেতে। আল্লাহ তাআলা কি বলেননি: (আর নিশ্চয়ই তোমার রবের নিকট একদিন তোমাদের গণনার এক হাজার বছরের সমান) (সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত ৪৭)? তিনি বললেন: হ্যাঁ।তিনি বললেন: আর নিশ্চয়ই প্রতিটি দিনের পরিমাপের জন্য আলাদা আলাদা স্বরূপ বা বৈশিষ্ট্য রয়েছে।আবদ বিন হুমাইদ ইকরিমা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তাঁকে আল্লাহর এই বাণী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: এমন এক দিন, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর
। তিনি বললেন: তোমরা যা জিজ্ঞেস করছ, আমি কি তোমাদের তার চেয়েও কঠিন কিছু সম্পর্কে বলব না?
ইবনে আব্বাস (রা.) উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন: (সেদিন কোনো মানুষ বা জিনকে তার অপরাধ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে না) (সূরা আর-রহমান, আয়াত ৩৯), (তোমার রবের কসম! আমি অবশ্যই তাদের সকলকে জিজ্ঞাসাবাদ করব) (সূরা আল-হিজর, আয়াত ৯২) এবং এটি এমন এক দিন যখন তারা কথা বলবে না
। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন: এটি আসলে একটি দিনের মধ্যেই অনেকগুলো সময়ের সমষ্টি, যাতে আল্লাহ যা ইচ্ছা তা করবেন। তার মধ্যে এমন সময় আছে যখন তারা কথা বলবে না, আবার এমন সময় আছে যা অত্যন্ত বিভীষিকাময় ও কঠোর হবে।আবদ বিন হুমাইদ আবু আদ-দুহা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নাফে ইবনুল আজরাক এবং আতিয়্যাহ ইবনে আব্বাসের নিকট এসে বললেন: হে ইবনে আব্বাস!
আমাদের আল্লাহর এই বাণী সম্পর্কে বলুন: এটি এমন এক দিন যখন তারা কথা বলবে না
এবং তাঁর এই বাণী: (অতঃপর কিয়ামতের দিন তোমরা তোমাদের রবের নিকট বিবাদে লিপ্ত হবে) (সূরা আজ-জুমার, আয়াত ৩১), এবং তাঁর বাণী: (আমাদের রব আল্লাহর কসম! আমরা মুশরিক ছিলাম না) (সূরা আল-আনআম, আয়াত ৬), এবং তাঁর বাণী: (আর তারা আল্লাহর কাছে কোনো কথাই গোপন করতে পারবে না) (সূরা আন-নিসা, আয়াত ৪২)। তিনি বললেন: আফসোস তোমার জন্য হে ইবনুল আজরাক! এটি এক দীর্ঘ দিন এবং এতে অনেকগুলো পর্যায় রয়েছে যা তাদের ওপর আসবে: এক সময় তারা কথা বলবে না, তারপর তাদের অনুমতি দেওয়া হবে তখন তারা বিবাদে লিপ্ত হবে, এরপর আল্লাহ যতক্ষণ ইচ্ছা তারা সেভাবে থাকবে, তারা কসম খাবে এবং আপ্রাণ চেষ্টা করবে।
যখন তারা তা করবে, তখন আল্লাহ তাদের মুখে মোহর মেরে দেবেন এবং তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে নির্দেশ দেবেন, ফলে তারা যা করেছিল সে সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবে। এরপর তাদের জিহবা কথা বলবে এবং তারা যা করেছিল সে সম্পর্কে তারা নিজেদের বিরুদ্ধেই সাক্ষ্য দেবে।তিনি বললেন: এটাই হলো আল্লাহর বাণী: আর তারা আল্লাহর কাছে কোনো কথাই গোপন করতে পারবে না
।সাঈদ বিন মানসুর, ইবনে আবু শাইবাহ এবং ইবনুল মুনযির আবু আব্দুল্লাহ আল-জাদালি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: আমি বায়তুল মাকদিসে আসলাম এবং সেখানে উবাদাহ ইবনুস সামিত, আব্দুল্লাহ ইবনে আমর এবং কাব আল-আহবারকে বায়তুল মাকদিসে আলোচনা করতে দেখলাম।
উবাদাহ বললেন: যখন কিয়ামত দিবস হবে, তখন সকল মানুষকে এক সমতল ময়দানে একত্রিত করা হবে, যেখানে একজন দর্শক সবাইকে দেখতে পাবে এবং একজন আহ্বানকারীর ডাক সবার কানে পৌঁছাবে। আল্লাহ বলবেন: এটি এমন এক দিন যখন তারা কথা বলবে না
, এটিই ফয়সালার দিন; আমি তোমাদের এবং পূর্ববর্তীদের একত্রিত করেছি। সুতরাং তোমাদের যদি কোনো কৌশল থাকে তবে আমার বিরুদ্ধে তা প্রয়োগ করো
। আজ কোনো স্বৈরাচারী এবং কোনো অবাধ্য শয়তান আমার পাকড়াও থেকে রক্ষা পাবে না। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর বললেন: আমরা কিতাবে পাই যে, সেদিন জাহান্নাম থেকে একটি দীর্ঘ গর্দান বের হবে এবং তা অগ্রসর হতে থাকবে যতক্ষণ না সেটি মানুষের ভিড়ের মাঝখানে পৌঁছাবে।
সেটি বলবে: হে লোকসকল! আমাকে তিন শ্রেণির মানুষের জন্য পাঠানো হয়েছে; আমি তাদের সম্পর্কে পিতা তার সন্তানকে এবং ভাই তার ভাইকে চেনার চেয়েও বেশি ভালো জানি। তারা কোনোভাবেই আমার হাত থেকে বাঁচতে পারবে না।
