Al-Anfal

আল-আনফাল: 42

8:42
8 আল-আনফাল Al-Anfal · 75 আয়াত الأنفال

আরবি

إِذْ أَنتُم بِٱلْعُدْوَةِ ٱلدُّنْيَا وَهُم بِٱلْعُدْوَةِ ٱلْقُصْوَىٰ وَٱلرَّكْبُ أَسْفَلَ مِنكُمْ ۚ وَلَوْ تَوَاعَدتُّمْ لَٱخْتَلَفْتُمْ فِى ٱلْمِيعَـٰدِ ۙ وَلَـٰكِن لِّيَقْضِىَ ٱللَّهُ أَمْرًا كَانَ مَفْعُولًا لِّيَهْلِكَ مَنْ هَلَكَ عَنۢ بَيِّنَةٍ وَيَحْيَىٰ مَنْ حَىَّ عَنۢ بَيِّنَةٍ ۗ وَإِنَّ ٱللَّهَ لَسَمِيعٌ عَلِيمٌ

English Translations

Sahih International

[Remember] when you were on the near side of the valley, and they were on the farther side, and the caravan was lower [in position] than you. If you had made an appointment [to meet], you would have missed the appointment. But [it was] so that Allāh might accomplish a matter already destined - that those who perished [through disbelief] would perish upon evidence and those who lived [in faith] would live upon evidence; and indeed, Allāh is Hearing and Knowing.

Muhsin Khan

(And remember) when you (the Muslim army) were on the near side of the valley, and they on the farther side, and the caravan on the ground lower than you. Even if you had made a mutual appointment to meet, you would certainly have failed in the appointment, but (you met) that Allah might accomplish a matter already ordained (in His Knowledge); so that those who were to be destroyed (for their rejecting the Faith) might be destroyed after a clear evidence, and those who were to live (i.e. believers) might live after a clear evidence. And surely, Allah is All-Hearer, All-Knower.

Taqi Usmani

(Remember) when you were on the nearest end of the valley, and they were on the farthest one, and the caravan was downwards from you. Had you made an appointment with each other, you would have disagreed about the appointment. But (it happened like this) so that Allah might accomplish what was destined to be done, so that whoever is going to perish may perish knowingly, and whoever is going to live may live knowingly. Allah is indeed All-Hearing, All-Knowing.

Abul Ala Maududi

And recall when you were encamped at the nearer end of the valley (of Badr) and they were at the farther end and the caravan below you (along the seaside). Had you made a mutual appointment to meet in encounter, you would have declined. But encounter was brought about so that Allah might accomplish what He had decreed, and that he who was to perish should perish through a clear proof, and who was to survive might survive through a clear proof. Surely Allah is All-Hearing, All-Knowing.

Pickthall

When ye were on the near bank (of the valley) and they were on the yonder bank, and the caravan was below you (on the coast plain). And had ye trysted to meet one another ye surely would have failed to keep the tryst, but (it happened, as it did, without the forethought of either of you) that Allah might conclude a thing that must be done; that he who perished (on that day) might perish by a clear proof (of His Sovereignty) and he who survived might survive by a clear proof (of His Sovereignty). Lo! Allah in truth is Hearer, Knower.

Yusuf Ali

Remember ye were on the hither side of the valley, and they on the farther side, and the caravan on lower ground than ye. Even if ye had made a mutual appointment to meet, ye would certainly have failed in the appointment: But (thus ye met), that Allah might accomplish a matter already enacted; that those who died might die after a clear Sign (had been given), and those who lived might live after a Clear Sign (had been given). And verily Allah is He Who heareth and knoweth (all things).

বাংলা অনুবাদ

তাইসিরুল কুরআন

স্মরণ কর, যখন তোমরা উপত্যকার নিকট প্রান্তে ছিলে আর তারা ছিল দূরের প্রান্তে আর উটের আরোহী কাফেলা (আবূ সুফইয়ানের নেতৃত্বে কুরাইশের সম্পদ সহ কাফেলা) ছিল তোমাদের অপেক্ষা নিম্নভূমিতে। যদি তোমরা যুদ্ধ করার ব্যাপারে পরস্পরের মধ্যে পূর্বেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে, তবুও যুদ্ধ করার এ সিদ্ধান্ত তোমরা অবশ্যই রক্ষা করতে পারতে না (তোমাদের দুর্বল অবস্থার কারণে), যাতে আল্লাহ সে কাজ সম্পন্ন করতে পারেন যা ছিল পূর্বেই স্থিরীকৃত, যেন যাকে ধ্বংস হতে হবে সে যেন সুস্পষ্ট দলীলের ভিত্তিতে ধ্বংস হয় আর যাকে জীবিত থাকতে হবে সেও যেন সুস্পষ্ট দলীলের ভিত্তিতে জীবিত থাকে। আল্লাহ নিশ্চয়ই সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।

রাওয়াই আল-বায়ান

যখন তোমরা ছিলে নিকটবর্তী প্রান্তরে, আর তারা ছিল দূরবর্তী প্রান্তরে এবং কাফেলা* ছিল তোমাদের চেয়ে নিম্নভূমিতে, আর যদি তোমরা পরস্পর ওয়াদাবদ্ধ হতে, (যুদ্ধে মুখোমুখি হওয়ার ব্যাপারে) তাহলে অবশ্যই সে ওয়াদার ক্ষেত্রে তোমরা মতবিরোধ করতে, কিন্তু আল্লাহ (তাদেরকে একত্র করেছেন) যাতে সম্পন্ন করেন এমন কাজ যা হওয়ারই ছিল, যে ধ্বংস হওয়ার সে যাতে সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ার পর ধ্বংস হয়, আর যে জীবিত থাকার সে যাতে সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ার পর বেঁচে থাকে, আর নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। * কুরাইশ কাফেলা।

শাইখ মুজিবুর রহমান

আর স্মরণ কর, যখন তোমরা প্রান্তরের এই দিকে ছিলে, আর তারা প্রান্তরের অপর দিকে শিবির রচনা করেছিল, আর উষ্ট্রারোহী কাফেলা তোমাদের অপেক্ষা নিম্নভূমিতে ছিল, যদি পূর্ব হতেই তোমাদের ও তাদের মধ্যে যুদ্ধ সম্পর্কে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে চাইতে তাহলে তোমাদের মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি হত, কিন্তু যা ঘটানোর ছিল তা আল্লাহ সম্পন্ন করার জন্য উভয় দলকে যুদ্ধক্ষেত্রে সমবেত করলেন, তাতে যে ধ্বংস হবে সে যেন সত্য সুস্পষ্ট রূপে প্রতিভাত হবার পর ধ্বংস হয়, আর যে জীবিত থাকবে সে যেন সত্য সুস্পষ্ট রূপে প্রতিভাত হবার পর জীবিত থাকে। আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও মহাজ্ঞানী।

ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

স্মরণ কর, যখন তোমরা ছিলে উপত্যকার নিকট প্রান্তে এবং তারা ছিল দূর প্রান্তে আর আরোহী দল ছিল তোমাদের থেকে নিম্নভূমিতে। আর যদি তোমরা পরস্পর যুদ্ধ সম্পর্কে কোনো পূর্বসিদ্ধান্তে থাকতে তবে এ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তোমরা মতভেদ করতে। কিন্তু যা ঘটার ছিল আল্লাহ্‌ তা সম্পন্ন করলেন, যাতে যে কেউ ধ্বংস হবে সে যেন সুস্পষ্ট প্রমান পাওয়ার পর ধ্বংস হয় এবং যে জীবিত থাকবে সে যেন সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ার পর জীবিত থাকে; আর নিশ্চয় আল্লাহ্‌ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।

ফাতহুল মাজীদ

স্মরণ কর! যখন তোমরা ছিলে উপত্যকার নিকট প্রান্তে এবং তারা ছিল দূর প্রান্তে আর উষ্ট্রারোহী দল ছিল তোমাদের অপেক্ষা নিুভূমিতে। যদি তোমরা পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ সম্পর্কে কোন সিদ্ধান্ত করতে চাইতে তবে এ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটত। কিন্তু যা ঘটার ছিল, আল্লাহ তা সম্পন্ন করলেন, যাতে যে কেউ ধ্বংস হবে সে যেন সত্য স্পষ্ট হওয়ার পর ধ্বংস হয় এবং যে জীবিত থাকবে সে যেন সুস্পষ্ট দলীলের ভিত্তিতে জীবিত থাকে; আল্লাহ তো সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।

মুখতাসার

৪২. তোমরা স্মরণ করো সে সময়ের কথা যখন তোমরা মদীনার দিকের উপত্যকার নিকটবর্তী অংশে অবস্থান করছিলে আর মুশরিকরা মক্কার দিকের দূরবর্তী অংশে অবস্থান করছিলো। আর মক্কার ব্যবসায়ী দলটি লোহিত সাগর পাড়ের দিকের নি¤œাঞ্চলে অবস্থান করছিলো। যদি তোমরা ও মুশরিকরা বদরে একত্রিত হওয়ার পরস্পর ওয়াদা করতে তাহলে তোমরা একে অপরের সাথে ওয়াদা খেলাফ করতে। অথচ আল্লাহ তা‘আলা পূর্বের কোন ওয়াদা ছাড়াই বদর এলাকায় তোমাদেরকে একত্রিত করেছেন এমন একটি ব্যাপারকে পরিপূর্ণ করার জন্য যা নিশ্চিতভাবে হওয়ারই ছিলো। তা হলো মু’মিনদেরকে সাহায্য ও কাফিরদেরকে অপদস্ত করা। উপরন্তু তাঁর দীনকে বিজয়ী ও শিরককে পরাজিত করা। যেন তাদের মধ্যকার যারা মৃত্যু বরণ করলো তারা সংখ্যা ও সরঞ্জাম কম থাকা সত্ত্বেও মু’মিনদের বিজয়ী হওয়ার বিষয়টি দেখে যায়। আর যাদের জীবন আছে তারা যেন আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রকাশিত এ দিব্য দলীল ও প্রমাণ দেখে বেঁচে থাকে। যাতে আল্লাহর উপর কারো কোন অভিযোগ না থাকে। বস্তুতঃ আল্লাহ তা‘আলা সকলের কথা শুনেন ও সকলের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন। তাঁর নিকট কোন কিছুই গোপন নয়। তিনি অচিরেই তাদেরকে এর প্রতিদান দিবেন।

তাফসীর

তাফসীর ইবনে কাসীর

(আরবী) সম্পর্কে সংবাদ দিতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “ঐ দিন তোমরা ওয়াদী দুনিয়ায় ছিলে যা মদীনার নিকটবর্তী একটি জায়গা। আর মুশরিকরা মক্কার দিকে এবং মদীনার দূরবর্তী উপত্যকায় অবস্থান করছিল। এদিকে আবু সুফিয়ান ও তার বাণিজ্যিক কাফেলা ব্যবসার মাল সম্ভারসহ নীচের দিকে সমুদ্রের ধারে ছিল। হে মুমিনরা! যদি তোমরা ও কাফির কুরায়েশরা প্রথম থেকেই যুদ্ধ করার ইচ্ছা পোষণ করতে তবে যুদ্ধ কোথায় সংঘটিত হবে এ নিয়ে তোমাদের মধ্যে অবশ্যই মতানৈক্য সৃষ্টি হতো।” ভাবার্থ নিম্নরূপও বর্ণনা করা হয়েছেঃ “হে মুমিনগণ! তোমরা যদি পরস্পরের সিদ্ধান্তক্রমে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে থাকতে তবে তোমরা মুশরিক সৈন্যদের আধিক্য ও তাদের রণ সম্ভারের আধিক্য সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পর খুব সম্ভব হতোদ্যম হয়ে পড়তে। এ জন্যেই মহান আল্লাহ কোন পূর্ব সিদ্ধান্ত ছাড়াই দু’টি দলকে আকস্মিকভাবে একত্রে মিলিয়ে দিলেন যাতে আল্লাহর ইচ্ছা পূর্ণ হয়ে যায় এবং ইসলাম ও মুসলিমদের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব এবং মুশরিকদের হীনতা ও নীচতা প্রকাশ পায়। সুতরাং আল্লাহ পাক যা করতে চেয়েছিলেন তা তিনি করেই ফেললেন।” কাব ইবনে মালিক (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও মুসলমানরা একমাত্র কাফেলার উদ্দেশ্যেই বের হয়েছিলেন। কোন তারিখ নির্ধারণ ও কোন যুদ্ধ প্রস্তুতি ছাড়াই তিনি মুসলমানদেরকে কাফিরদের সাথে মিলিয়ে দিলেন। আবু সুফিয়ান (রাঃ) সিরিয়া হতে কাফেলাসহ ফিরছিলেন। এদিকে আবু জেহেল কাফেলাকে মুসলমানদের হাত থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিল। বাণিজ্যিক কাফেলা অন্য পথ ধরে আসছিল। অতঃপর মুসলমান ও কাফিরদের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়ে গেল। এর পূর্বে উভয় দল একে অপর থেকে সম্পূর্ণরূপে বে-খবর ছিল । পানি নেয়ার জন্যে আগমনকারীদেরকে দেখে এক দল অপর দলের অবস্থা অবগত হয়। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ)-এর ‘সীরাত' গ্রন্থে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে চলছিলেন। সাফরা নামক স্থানের নিকটবর্তী হয়ে বাসবাস ইবনে আমর (রাঃ) ও আদী ইবনে আবু যা’বা জুহনী (রাঃ)-কে আবু সুফিয়ান (রাঃ)-এর গতিবিধি লক্ষ্য করার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। তারা দু'জন বদর প্রান্তরে উপস্থিত হয়ে বাতহার একটি টিলার উপর নিজেদের সওয়ারীকে বসিয়ে দেন। অতঃপর তারা পানি নেয়ার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন। পথিমধ্যে তাঁরা দুটি মেয়েকে পরস্পর ঝগড়া করতে দেখতে পান। একজন অপরজনকে বলছিলঃ “তুমি আমার ঋণ পরিশোধ করছে না কেন?” অপর মেয়েটি উত্তরে বললোঃ “এতো তাড়াহুড়া করো না। আগামীকাল অথবা। পরশু এখানে বাণিজ্যিক কাফেলার আগমন ঘটবে। আমি তখন তোমাকে তোমার প্রাপ্য দিয়ে দেবো।” মাজদা ইবনে আমর নামক একটি লোক মধ্য থেকে বলে উঠলোঃ “এ মেয়েটি সঠিক কথাই বলেছে।” ঐ সাহাবী দু’জন তাদের কথাগুলো শুনে নেন এবং তৎক্ষণাৎ উটের উপর সওয়ার হয়ে নবী (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে যান ও তাঁর কাছে ঐ সংবাদ পরিবেশন করেন। ওদিকে আবু সুফিয়ান (রাঃ) কাফেলার পূর্বে একাকীই ঐ জায়গায় পৌঁছেন এবং মাজদা ইবনে আমরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এই কূপের কাছে তুমি কাউকে দেখেছিলে কি?” সে উত্তরে বললোঃ “অবশ্যই দু’জন উষ্ট্রারোহী এসেছিল। তারা তাদের উট দু'টি ঐ টিলার উপর বসিয়ে রেখে এখানে এসে মশকে পানি ভর্তি করে নিয়ে চলে গেছে। এ কথা শুনে আবু সুফিয়ান (রাঃ) ঐ পাহাড়ের উপর গমন করেন এবং উটের গোবর নিয়ে ভেঙ্গে দেখেন যে, ওর মধ্যে খেজুরের আঁটি রয়েছে। ঐ আঁটি দেখে তিনি বলে ওঠেনঃ “আল্লাহর শপথ! এরা মদীনারই লোক।” সেখান থেকে তিনি কাফেলার কাছে ফিরে যান এবং পথ পরিবর্তন করে সমুদ্রের তীর ধরে চলতে থাকেন। সুতরাং এদিক থেকে তিনি আস্বস্ত হলেন এবং তাদের রক্ষার্থে আগমনকারী কুরায়েশদেরকে দূত মারফত জানিয়ে দিলেনঃ “আল্লাহ তোমাদের বাণিজ্যিক কাফেলা ও মালধন রক্ষা করেছেন, সুতরাং তোমরা ফিরে যাও।” এ কথা শুনে আবূ জেহেল বলেঃ “না, এত দূর যখন এসেই গেছি তখন বদর পর্যন্ত অবশ্যই যাবো।” ওখানে একটি বাজার বসতো।তাই সে বললোঃ “ওখানে আমরা তিনদিন অবস্থান করবো এবং উট যবেহ করবো, মদ পান করবো এবং গোশতের কাবাব তৈরী করবো যাতে সারা আরবে আমাদের ধুমধামের কথা ছড়িয়ে পড়ে এবং আমাদের বীরত্বপনার সংবাদ সবারই কানে পৌছে যায়। ফলে যেন তারা সদা সর্বদা আমাদের নামে ভীত-সন্ত্রস্ত থাকে।” কিন্তু আখনাস ইবনে শুরাইক নামক একটি লোক বললোঃ “হে বানী যুহরা গোত্রের ললাকেরা! আল্লাহ তাআলা তোমাদের মাল রক্ষা করেছেন। সুতরাং তোমাদের ফিরে যাওয়াই উচিত।” ঐ গোত্রের লোকেরা তার কথা মেনে। নিলো এবং ফিরে গেল। তাদের সাথে বানু আদী গোত্রের লোকেরাও ফিরে গেল। এদিকে বদরের নিকটবর্তী হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ), সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) এবং যুবাইর ইবনে আওয়াম (রাঃ)-কে খবর নেয়ার জন্যে পাঠিয়ে দেন। আরো কয়েকজন সাহাবীকেও তাদের সঙ্গী করে দেন। তাঁরা বানু সাঈদ ইবনে আস ও বানু হাজ্জাজের গোলামদ্বয়কে কূয়ার ধারে পেয়ে যান। দু’জনকেই গ্রেফতার করে তাঁরা নবী (সঃ)-এর খিদমতে হাযির করেন। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামায পড়ছিলেন। তারা তাদেরকে প্রশ্ন করতে শুরু করলেন। তারা প্রশ্ন করলেনঃ “তোমরা কে?” তারা উত্তরে বললোঃ “আমরা কুরায়েশদের পানি বহনকারী। তারা আমাদেরকে পানি নিতে পাঠিয়েছিল।” সাহাবীদের ধারণা ছিল যে, তারা আবু সুফিয়ানের লোক। এ জন্যে তারা তাদের প্রতি কঠোর হয়ে উঠলেন। তারা ভয় পেয়ে বলে উঠলো যে, তারা আবূ সুফিয়ানের কাফেলার লোক। তখন তারা তাদেরকে ছেড়ে দেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক রাকাআত নামায পড়ে নিয়ে সালাম ফিরিয়ে দেন এবং সাহাবীদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “তারা যখন সত্য কথা বললো তখন তোমরা তাদেরকে মারধর করলে, আর যখন তারা মিথ্যা কথা বললো তখন তোমরা তাদেরকে ছেড়ে দিলে? আল্লাহর কসম! এরা পূর্বে সত্য কথাই বলেছিল। এরা কুরায়েশেরই গোলাম।” অতঃপর তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “আচ্ছা বলতো, কুরায়েশদের সেনাবাহিনী কোথায় রয়েছে?” তারা উত্তরে বললোঃ “কুসওয়া উপত্যকার ঐ দিকের ঐ পাহাড়ের পিছনে রয়েছে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “সংখ্যায় তারা কত হতে পারে?” তারা জবাব দিলোঃ “সংখ্যায় তারা অনেক।” তিনি বললেনঃ “সংখ্যায় তারা কত হতে পারে?” তারা বললোঃ “সংখ্যা তো আমাদের জানা নেই।” তিনি বললেনঃ “আচ্ছা, দৈনিক তারা কয়টা উট যবেহ করে থাকে তা তোমরা বলতে পার কি?” উত্তরে তারা বললোঃ “কোনদিন নয়টি এবং কোন দিন দশটি।” তিনি তখন মন্তব্য করলেনঃ “তাহলে সংখ্যায় তারা নয় হাজার থেকে দশ হাজার হবে। তারপর তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তাদের মধ্যে কুরায়েশ নেতৃবর্গের কে কে আছে?” তারা উত্তর দিলোঃ “তারা হচ্ছে উত্যা ইবনে রাবীআ’, সায়বা ইবনে রাবীআ’, আবুল বাখতারী ইবনে হিশাম, হাকীম ইবনে হিশাম, নাওফেল ইবনে খুয়াইলিদ, হারিস ইবনে আমির ইবনে নাওফেল, তায়ীমা ইবনে আদী, নাযার ইবনে হারিস, যামআ ইবনে আসওয়াদ, আবূ জেহেল ইবনে হিশাম, উমাইয়া ইবনে খালফ, নাবীহ ইবনে হাজ্জাজ, মুনাব্বাহ্ ইবনে হাজ্জাজ, সালাহ ইবনে আমর এবং আমর ইবনে আবদূদ।” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সাহাবীবর্গকে বললেনঃ “জেনে রেখো যে, মক্কা নগরী ওর কলিজার টুকরোগুলোকে তোমাদের দিকে নিক্ষেপ করেছে।”বদরের দিন দু’ দলের মধ্যে যখন মুকাবিলা শুরু হয়ে গেল তখন সা’দ ইবনে মুআয (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি যদি অনুমতি দেন তবে আপনার জন্যে একটা কুটির নির্মাণ করে দেই। সেখানে আপনি অবস্থান করবেন। আর আমরা আমাদের জন্তুগুলো এখানে বসিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে গমন করবো। যদি আমরা জয়যুক্ত হই তবে তো আলহামদুলিল্লাহ, এটাই আমাদের কাম্য। আর যদি আল্লাহ না করুন, অন্য কিছু ঘটে যায় তবে আপনি আমাদের জানোয়ারগুলোর উপর সওয়ার হয়ে ওগুলোকে সাথে নিয়ে আমাদের কওমের ঐ মহান ব্যক্তিদের কাছে যাবেন যারা মদীনায় রয়েছেন। আপনার প্রতি তাদের ভালবাসা আমাদের চেয়ে বেশী রয়েছে। এখানে কোন যুদ্ধ সংঘটিত হবে এটা তাঁদের অজানা ছিল। তা না হলে তারা কখনো আপনার সঙ্গ ছাড়তেন না। আপনার সাহায্যার্থে অবশ্যই তারা বেরিয়ে আসতেন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর এ পরামর্শ মেনে নিলেন এবং তার জন্যে দুআ করলেন। অতঃপর তিনি ঐ তাঁবুর মধ্যে অবস্থান করলেন। তার সাথে আবু বকর (রাঃ) ছাড়া আর কেউই ছিলেন না। সকাল হতেই কুরায়েশ সেনাবাহিনীকে পাহাড়ের পিছন দিক থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা গেল। তাদেরকে দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করতে লাগলেনঃ “হে আল্লাহ! এ লোকগুলো গর্বের সাথে আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে ও আপনার রাসূল (সঃ)-কে মিথ্যা প্রতিপন্ন। করার মানসে এগিয়ে আসছে। হে আল্লাহ! আপনি তাদেরকে পরাজিত ও লাঞ্ছিত করুন।ইবনে ইসহাকের সীরাতের মধ্যে এই আয়াতের শেষ বাক্যটির তাফসীর নিম্নরূপ এসেছেঃ “এটা এ কারণে যে, যেন কাফিররা কুফরীর উপর থেকেও আল্লাহর দলীল প্রমাণ দেখে নেয় এবং মুমিনরাও দলীল দেখেই ঈমানের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। অর্থাৎ কোন উত্তেজনা, শর্ত ও দিন নির্ধারণ ছাড়াই আকস্মিকভাবে আল্লাহ তা'আলা এখানে মুমিন ও কাফিরদেরকে মুকাবিলা করে দিলেন, উদ্দেশ্য এই যে, তিনি সত্যকে মিথ্যার উপর জয়যুক্ত করে সত্যকে সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করবেন, এভাবে যেন কারো মনে কোন সংশয় ও সন্দেহ অবশিষ্ট না থাকে। এখন যে কুফরীর উপর থাকবে সে কুফরীকে কুফরী মনে করেই থাকবে। আর যে মুমিন হবে সে দলীল প্রমাণ দেখেই ঈমানের উপর কায়েম থাকবে। ঈমানই হচ্ছে অন্তরের জীবন এবং কুফরীই হচ্ছে প্রকৃত ধ্বংস।" যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ঐ ব্যক্তি, যে মৃত ছিল, অতঃপর আমি তাকে জীবিত করেছি এবং আমি তার জন্যে একটা নূর বানিয়েছি। সে ঐ নূরের মাধ্যমে লোকদের মধ্যে চলাফেরা করছে।" (৬:১২২) তুহমাত বা অপবাদের ঘটনায় আয়েশা (রাঃ)-এর কথাগুলো ছিলঃ “ যে ধ্বংস হওয়ার ছিল সে ধ্বংস হলো।” অর্থাৎ অপবাদ দেয়ার ব্যাপারে সে অংশ নিলো।(আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদের বিনয়, প্রার্থনা, ইতিগফার, ফরিয়াদ, মুনাজাত ইত্যাদি সবই শ্রবণকারী। (আরবী) অর্থাৎ তোমরা যে আহলে হক, তোমরা যে সাহায্য পাওয়ার যোগ্য এবং তোমরা এরও যোগ্য যে, তোমাদেরকে কাফির ও মুশরিকদের উপর জয়যুক্ত করা উচিত, এসব বিষয় আল্লাহ ভালভাবে অবগত আছেন।

তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া

স্মরণ কর, যখন তোমরা ছিলে উপত্যকার নিকট প্রান্তে এবং তারা ছিল দূর প্রান্তে আর আরোহী দল [১] ছিল তোমাদের থেকে নিম্নভূমিতে। আর যদি তোমরা পরস্পর যুদ্ধ সম্পর্কে কোন পূর্বসিদ্ধান্তে থাকতে তবে এ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তোমরা মতভেদ করতে। কিন্তু যা ঘটার ছিল, আল্লাহ্‌ তা সম্পন্ন করলেন, যাতে যে কেউ ধ্বংস হবে সে যেন সুস্পষ্ট প্রমান পাওয়ার পর ধ্বংস হয় এবং যে জীবিত থাকবে সে যেন সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ার পর জীবিত থাকে [২]; আর নিশ্চয় আল্লাহ্‌ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।

[১] আরোহী দল বলে এখানে মক্কার কুরাইশ কাফেরদেরকে বোঝানো হয়েছে। যাদের নেতৃত্বে ছিল আবু সুফিয়ান, যারা ব্যবসায়ী পণ্য নিয়ে সমুদ্রের পাশ ঘেঁষে যাচ্ছিল [ইবন কাসীর]

[২] বিনা ঘোষণায় কাফের ও ঈমানদারদেরকে বদরের এ যুদ্ধে নিয়ে আসার পিছনে কি রহস্য রয়েছে আল্লাহ তা'আলা এখানে তাই ব্যক্ত করছেন। আর তা হলো, যাতে তোমাদেরকে কাফেরদের উপর বিজয় দেই, হকের ঝান্ডা বাতিলের উপর বুলন্দ করে দেখাই, ফলে কোনটা হক এবং কোনটা বাতিল তা স্পষ্ট হয়ে যায়। ইসলাম ও তার অনুসারীদের সম্মান বৃদ্ধি পায় এবং কুফর-শিক ও তাদের অনুসারীরা অসম্মানিত হয়। [ইবন কাসীরা] যাতে অকাট্য প্রমাণাদি দ্বারা মানুষ বুঝে নিতে পারে যে, মুসলিমরা হকের উপর আছে ফলে তাদের বিজয় এসেছে, আর কাফেররা বাতিলের উপর আছে ফলে তাদের বিপর্যয় ঘটেছে। সুতরাং যারা জীবিত আছে তারা দলীল প্রমাণসহ হক বেছে নিতে পারে। আর তাদের মধ্যে যে বাতিল বেছে নেয় সে তার স্বইচ্ছায় হক স্পষ্ট হওয়ার পরও বাতিলকে গ্রহণ করে নিজের ধ্বংসকেই ডেকে আনলো। মূলতঃ বদরের যুদ্ধের পর অধিকাংশ মানুষের কাছে হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে যায়। আজও মানুষ বদর যুদ্ধের বিজয়কে হক ও বাতিল চেনার ক্ষেত্রে এক বিরাট নিদর্শন বলে বিশ্বাস করে।