Al-Anfal

আল-আনফাল: 70

8:70
টেক্সট কপি
8 আল-আনফাল Al-Anfal · 75 আয়াত الأنفال

মূল আরবি

يَـٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِىُّ قُل لِّمَن فِىٓ أَيْدِيكُم مِّنَ ٱلْأَسْرَىٰٓ إِن يَعْلَمِ ٱللَّهُ فِى قُلُوبِكُمْ خَيْرًا يُؤْتِكُمْ خَيْرًا مِّمَّآ أُخِذَ مِنكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ۗ وَٱللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

English Translations

Sahih International

O Prophet, say to whoever is in your hands of the captives, "If Allāh knows [any] good in your hearts, He will give you [something] better than what was taken from you, and He will forgive you; and Allāh is Forgiving and Merciful."

Muhsin Khan

O Prophet! Say to the captives that are in your hands: "If Allah knows any good in your hearts, He will give you something better than what has been taken from you, and He will forgive you, and Allah is Oft-Forgiving, Most Merciful."

Taqi Usmani

O Prophet, say to the prisoners in your hands, “If Allah knows any goodness in your hearts, He will give you something better than what has been taken from you, and will forgive you. Allah is Most-Forgiving, Very-Merciful.”

Abul Ala Maududi

O Prophet! Say to the captives in your hands: 'If Allah finds any goodness in your hearts He will give you that which is better than what has been taken away from you, and He will forgive you. Allah is Ever-Forgiving, Most Merciful.'

Pickthall

O Prophet! Say unto those captives who are in your hands: If Allah knoweth any good in your hearts He will give you better than that which hath been taken from you, and will forgive you. Lo! Allah is Forgiving, Merciful.

Yusuf Ali

O Prophet! say to those who are captives in your hands: "If Allah findeth any good in your hearts, He will give you something better than what has been taken from you, and He will forgive you: for Allah is Oft-forgiving, Most Merciful."

বাংলা অনুবাদ

তাইসিরুল কুরআন

হে নাবী! তোমাদের হাতে যে সব যুদ্ধবন্দী আছে তাদেরকে বল, ‘আল্লাহ যদি তোমাদের অন্তরে ভাল কিছু দেখেন তাহলে তোমাদের কাছ থেকে (মুক্তিপণ) যা নেয়া হয়েছে তাত্থেকে উত্তম কিছু তোমাদেরকে তিনি দান করবেন আর তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।’

রাওয়াই আল-বায়ান

হে নবী, তোমাদের হাতে যে সব যুদ্ধবন্দি আছে, তাদেরকে বল, ‘যদি আল্লাহ তোমাদের অন্তরসমূহে কোন কল্যাণ আছে বলে জানেন, তাহলে তোমাদের থেকে যা নেয়া হয়েছে, তার চেয়ে উত্তম কিছু দেবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন, আর আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’।

শাইখ মুজিবুর রহমান

হে নাবী! তোমাদের হাতে যারা বন্দী হয়েছে তাদেরকে বল, আল্লাহ যদি তোমাদের অন্তরে কল্যাণকর কিছু রয়েছে বলে অবগত হন তাহলে তোমাদের হতে (মুক্তিপণ রূপে) যা কিছু নেয়া হয়েছে তা অপেক্ষা উত্তম কিছু দান করবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিবেন, আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু।

ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

হে নবী! তোমাদের করায়ত্ত যুদ্ধবন্দীদেরকে বলুন, ’আল্লাহ্‌ যদি তোমাদের হৃদয়ে ভাল কিছু দেখান তবে তোমাদের কাছ থেকে যা নেয়া হয়েছে তা থেকে উত্তম কিছু তিনি তোমাদেরকে দান করবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। তার আল্লাহ্‌ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

ফাতহুল মাজীদ

হে নাবী! তোমাদের করায়ত্ত যুদ্ধবন্দীদেরকে বল:‎ ‘আল্লাহ যদি তোমাদের হৃদয়ে ভাল কিছু দেখেন তবে তোমাদের নিকট হতে যা নেয়া হয়েছে তার অপেক্ষা উত্তম কিছু তিনি তোমাদেরকে দান করবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’

মুখতাসার

৭০. হে নবী! যে মুশরিকরা বদর যুদ্ধে আপনাদের হাতে বন্দী হয়েছে আপনি তাদেরকে বলুন: যদি আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের অন্তরের কল্যাণকামিতা ও নিয়তের পরিশুদ্ধতা দেখতে পান তাহলে তিনি তোমাদেরকে এমন কিছু দিবেন যা উক্ত আদায়কৃত মুক্তিপণের চেয়ে অধিক উত্তম। অতএব, তোমরা তোমাদের থেকে যা কিছু ইতিপূর্বে নেয়া হয়েছে তার উপর চিন্তিত হয়ো না। উপরন্তু তিনি তোমাদের গুনাহগুলো ক্ষমা করে দিবেন। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর তাওবাকারী বান্দাদের প্রতি অতি ক্ষমাশীল ও পরম করুণাময়। আল্লাহ তা‘আলার এ ওয়াদা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর চাচা আব্বাস ও অন্যান্য মুসলিমের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে।

তাফসীর

তাফসীর ইবনে কাসীর

৭০-৭১ নং আয়াতের তাফসীর: ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বদরের দিন বলেছিলেনঃ “নিশ্চিতরূপে আমি অবগত আছি যে, কোন কোন বানু হাশিমকে জোরপূর্বক এই যুদ্ধে বের করে আনা হয়েছে। আমাদের সাথে যুদ্ধ করার তাদের মোটেই ইচ্ছা ছিল না। সুতরাং বানু হাশিমকে হত্যা করো না, আবুল বাখতারী ইবনে হিশামকেও মেরে ফেলো না এবং আব্বাস ইবনে মুত্তালিবকেও হত্যা করো না। লোকেরা তাদেরকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের সাথে টেনে এনেছে।” তখন আবূ হুযাইফা ইবনে উত্মা (রাঃ) বলেনঃ “আমরা আমাদের বাপদাদাদেরকে, আমাদের সন্তানদেরকে, আমাদের ভাইদেরকে এবং আমাদের আত্মীয় স্বজনদেরকে হত্যা করবো, আর আব্বাস (রাঃ)-কে ছেড়ে দেবো?

আল্লাহর কসম! যদি আমি তাকে পেয়ে যাই তবে তার গর্দান উড়িয়ে দেবো।” একথা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কানে পৌছলে তিনি বলেন “হে আবু হাফস!” (উমার (রাঃ)-এর কুনিয়াত বা উপনাম) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চাচার মুখে কি তরবারীর আঘাত করা হবে?” উমার ফারূক (রাঃ) বলেনঃ “এটাই ছিল প্রথম দিন যেই দিন রাসূলুল্লাহ আমাকে আমার কুনিয়াত দ্বারা সম্বোধন করেন। তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! অনুমতি হলে আমি আবূ হুযাইফা (রাঃ)-এর গর্দান উড়িয়ে দেবো। আল্লাহর কসম! সে মুনাফিক হয়ে গেছে।” আবু হুযাইফা (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহর কসম! আমার সেই দিনের কথার খটকা আজ পর্যন্তও রয়েছে।

ঐ কথার জন্যে আমি আজও ভীত আছি। আমি তো ঐ দিনই শান্তি লাভ করবো যেই দিন আমার এই কথার কাফফারা আদায় হয়ে যাবে। আর সেই কাফফারা হচ্ছে এই যে, আমি আল্লাহর পথে শহীদ হয়ে যাবো।” অতঃপর তিনি ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদ হয়ে যান। আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন এবং তাঁকে সন্তুষ্ট করুন! ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যেই দিন বদরী বন্দীরা গ্রেফতার হয়ে আসে সেই রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর ঘুম হয়নি। সাহাবীগণ কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “এই কয়েদীদের মধ্য থেকে আমার চাচা আব্বাস (রাঃ)-এর কান্নাকাটির শব্দ আমার কানে আসছে।” তখন সাহাবীরা তাঁর বন্ধন খুলে দেন।

এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঘুম হয়। আব্বাস (রাঃ)-কে একজন আনসারী সাহাবী গ্রেফতার করেছিলেন। তিনি খুব ধনী ছিলেন। মুক্তিপণ হিসেবে তিনি একশ আওকিয়া (এক আওকিয়ার ওজন হচ্ছে এক তোলা সাত মাশা) সোনা প্রদান করেছিলেন। কোন কোন আনসারী নবী (সঃ)-কে বলেনঃ “আমরা আপনার চাচা আব্বাস (রাঃ)-কে মুক্তিপণ ছাড়াই ছেড়ে দিতে চাই।” কিন্তু সমতা কায়েমকারী নবী (সঃ) বলেনঃ “না, আল্লাহর কসম! তোমরা এক দিরহাম কম করো না। বরং পূর্ণ মুক্তিপণ আদায় করো।” কুরায়েশরা মুক্তিপণের অর্থ দিয়ে তাক পাঠিয়েছিল। প্রত্যেকই ধার্যকৃত অর্থ দিয়ে। নিজ নিজ কয়েদীকে ছাড়িয়ে নিয়েছিলেন।

আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল! আমি তো মুসলমানই ছিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আপনার ইসলাম গ্রহণের বিষয় আমি অবগত আছি। যদি আপনার কথা সত্য হয় তবে আল্লাহ আপনাকে এর বিনিময় প্রদান করবেন। কিন্তু আহকাম বাহ্যিকের উপর জারী হয়ে থাকে বলে আপনাকে আপনার মুক্তিপণ আদায় করতেই হবে। তাছাড়া আপনার দু'ভ্রাতুস্পুত্র নওফেল ইবনে হারিস ইবনে আবদিল মুত্তালিব ও আকীল ইবনে আবি তালিব ইবনে আবদিল মুত্তালিবের মুক্তিপণ আপনাকে আদায় করতে হবে। আরো আদায় করতে হবে আপনার মিত্র উৎবা ইবনে আমরের মুক্তিপণ, যে বানু হারিস ইবনে ফাহরের গোত্রভুক্ত।” তিনি বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)!

আমার কাছে তো এতো মাল নেই।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেন, আপনার ঐ মাল কোথায় গেল যা আপনি ও উম্মুল ফযল যমীনে পুঁতে রেখেছেন আর বলেছেন, “আমি যদি এই সফরে সফলকাম হই তবে এই মাল হবে বানুল ফযল, আবদুল্লাহ এবং কাসামের।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর একথা শুনে আব্বাস (রাঃ) স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে উঠলেনঃ “আল্লাহর কসম! আমি জানি যে, আপনি আল্লাহর সত্য রাসূল। আমার এই মাল পুঁতে রাখার ঘটনা আমি ও উম্মুল ফযল (তার স্ত্রী) ছাড়া আর কেউই জানে না! আচ্ছা, এ কাজ করুন যে, আমার নিকট থেকে আপনার সেনাবাহিনী বিশ আওকিয়া সোনা প্রাপ্ত হয়েছে, ওটাকেই আমার মুক্তিপণ হিসেবে গণ্য করা হাক।” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “কখনও নয়।

ওটা তো আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে স্বীয় অনুগ্রহে দান করেছেন। সুতরাং আব্বাস (রাঃ) নিজের, তাঁর দুই ভাতুস্পুত্রের এবং তাঁর মিত্রের মুক্তিপণ নিজের পক্ষ হতে আদায় করলেন। এই পরিপ্রেক্ষিতেই আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ “তোমাদের অন্তরে কল্যাণকর কিছু রয়েছে তা যদি আল্লাহ অবগত হন তবে তোমাদের হতে (মুক্তিপণরূপে) যা কিছু নেয়া হয়েছে তা অপেক্ষা উত্তম কিছু দান করবেন।” আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলার এই ঘোষণা কার্যকরী হয়েছে । আমার ইসলাম গ্রহণের কারণে আমার এই বিশ আওকিয়ার বিনিময়ে আল্লাহ আমাকে এমন বিশটি গোলাম দান করেছেন যারা সবাই ব্যবসায়ী ও সম্পদশালী ।

সাথে সাথে আমি এ আশাও করছি যে, মহামহিমান্বিত আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করে দিবেন।” তিনি বলেনঃ ‘‘আমার ব্যাপারেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে। আমি রাসুলুল্লাহ (সঃ)-কে আমার ইসলাম গ্রহণের খবর দিলাম এবং বললাম, আমার বিশ আওকিয়ার বিনিময় আমাকে দেয়া হাক। তিনি তা অস্বীকার করলেন। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই যে, তিনি আমাকে আমার এই বিশ আওকিয়ার বিনিময়ে এমন বিশটি গোলাম দান করেন যারা সবাই ব্যবসায়ী।” তিনি এবং তাঁর সঙ্গীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেছিলেনঃ “আমরা তো আপনার অহীর উপর ঈমান এনেছি, আপনার রিসালাতের আমরা সাক্ষ্য দান করছি এবং আমাদের কওমের মধ্যে আমরা আপনার মঙ্গল কামনা করেছি।” তখন আল্লাহ তাআলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন।

আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “সারা দুনিয়া লাভ করলেও আমি ততে খুশী হতাম না যতো খুশী হয়েছিলাম এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার কারণে। আল্লাহর কসম! আমার নিকট থেকে মুক্তিপণ হিসেবে যা নেয়া হয়েছিল তার চেয়ে একশ গুণ বেশী আল্লাহ আমাকে প্রদান করেছেন এবং এটাও আশা করছি। যে, আমার পাপগুলোও মাফ করে দেয়া হবে।” এ আয়াতের তাফসীরে কাতাদা (রঃ) বলেন, আমাদের কাছে বর্ণনা করা। হয়েছে যে, বাহরাইন থেকে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে আশি হাজার পরিমাণ মাল এসে পৌঁছে তখন তিনি যোহরের সালাতের জন্যে অযু করছিলেন। অতঃপর তিনি প্রত্যেক অভিযোগকারীকেই সেই দিন ঐ মাল থেকে প্রদান করেন।

এবং কোন প্রার্থনাকারীকেই বঞ্চিত করেননি। সেইদিন তিনি (যোহরের) সালাতের পূর্বেই সমস্ত মাল আল্লাহর পথে বিলিয়ে দেন। আব্বাস (রাঃ)-কে তিনি ঐ মাল থেকে গ্রহণ করার নির্দেশ দেন এবং বোঝা বেঁধে নিতে বলেন। আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আমার থেকে যা নেয়া হয়েছিল তার থেকে এটা বহুগুণে উত্তম এবং আমি আশা করছি যে, আমার পাপরাশি ক্ষমা করে দেয়া হবে।”হামীদ ইবনে হিলাল (রাঃ) বলেন যে, এই মাল ইবনে হাযরামী বাহরাইন থেকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট পাঠিয়েছিলেন। এতো মাল নবী (সঃ)-এর নিকট এর পূর্বে এবং পরে কখনো আসেনি। এ মালের পরিমাণ ছিল আশি হাজার। এ মাল চাটাইর উপর ছড়িয়ে দেয়া হয়।

অতঃপর নামাযের জন্যে আযান দেয়া হয়। রাসলুল্লাহ (সঃ) আগমন করেন এবং মালের কাছে দাঁড়িয়ে যান। মসজিদের নামাযীরাও এসে পড়েন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেককে দিতে শুরু করেন। সেইদিন কোন ওজনও ছিল না এবং গণনাও ছিল না। যে আসে সেই নিয়ে যায়। তারা সবাই ইচ্ছামত নিয়ে যায়। আব্বাস (রাঃ) এসে তো চাদরের বোঝা বাঁধেন। কিন্তু উঠাতে সক্ষম না হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! একটু উঠিয়ে দিন। এতে নবী (সঃ) হেসে উঠেন, এমন কি তাঁর দাঁতের ঔজ্জ্বল্য পরিলক্ষিত হয়। তিনি তাকে বলেনঃ “কিছু কম নিন। যা উঠাতে পারবেন তাই নিন।” সুতরাং তিনি কিছু কমিয়ে নিলেন এবং তা উঠিয়ে নিয়ে বলতে বলতে গেলেনঃ “আল্লাহ তা'আলার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা।

তাঁর একটি কথা তো পূর্ণ হলো। তার দ্বিতীয় ওয়াদাও ইনশাআল্লাহ পূর্ণ হয়ে যাবে (অর্থাৎ তিনি আমাকে ক্ষমা করে দিবেন)। আমার নিকট থেকে মুক্তিপণ হিসেবে যা। নেয়া হয়েছে, তার চেয়ে এটা বহুগুণে উত্তম।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ মাল বন্টন করতেই থাকেন। শেষ পর্যন্ত ঐ মালের কিছুই অবশিষ্ট থাকলো না। তিনি ঐ মাল থেকে নিজের পরিবার-পরিজনকে একটি কানাকড়িও প্রদান করলেন না। অতঃপর তিনি নামাযের জন্যে সামনে এগিয়ে যান এবং নামায পড়িয়ে দেন।এ ব্যাপারে অন্য একটি হাদীস আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বাহরাইন হতে মাল আসে।

তিনি সাহাবীদেরকে বলেনঃ “এগুলো আমার মসজিদে ছড়িয়ে দাও।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট অন্য সময় যে মাল এসেছিল, ওগুলোর চেয়ে এটাই ছিল অধিক মাল অর্থাৎ এর পূর্বে বা পরে এতো অধিক মাল তাঁর কাছে আসেনি। অতঃপর তিনি নামাযের জন্যে বেরিয়ে আসেন। কারো দিকে তিনি ফিরে তাকালেন না। নামায পড়িয়ে দিয়ে তিনি বসে পড়লেন। অতঃপর তিনি যাকেই দেখলেন তাকেই দিলেন। ইতিমধ্যে আব্বাস (রাঃ) এসে গেলেন এবং বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকেও প্রদান করুন। আমি আমার নিজের ও আকীলের মুক্তিপণ আদায় করেছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “আপনি নিজের হাতেই নিয়ে নিন।" তিনি চাদরে পুটলি বাঁধলেন।

কিন্তু ওটা ওজনে ভারী হয়ে যাওয়ার কারণে উঠাতে পারলেন না। সুতরাং বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কাউকে এটা আমার কাঁধে উঠিয়ে দিতে বলুন।” নবী (সঃ) বললেনঃ “কাউকে আমি এটা উঠিয়ে দিতে বলবো না।” তখন তিনি বললেনঃ “তাহলে আপনিই উঠিয়ে দিন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবারও অস্বীকৃতি জানালেন। কাজেই বাধ্য হয়ে তাকে কিছু কম করতেই হলো। অতঃপর তিনি ওটা কাঁধে উঠিয়ে চলতে শুরু করলেন। তাঁর এ লোভ দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর দিকে চেয়েই থাকলেন যে পর্যন্ত না তিনি তাঁর দৃষ্টির অন্তরাল হলেন। যখন সমস্ত মাল বন্টিত হয়ে গেল এবং একটা কড়িও বাকী থাকলো না তখন তিনি ওখান থেকে উঠলেন।

ইমাম বুখারীও (রঃ) স্বীয় কিতাব সহীহ বুখারীর মধ্যে এ বর্ণনাটিকে কয়েক জায়গায় এনেছেন।আল্লাহ পাক বলেনঃ এ লোকগুলো যদি বিশ্বাসঘাতকতা করে তবে এটা কোন নতুন কথা নয়। এর পূর্বে তারা আল্লাহর সাথেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। সুতরাং তাদের দ্বারা এটাও সম্ভব যে, এখন মুখে তারা যা প্রকাশ করছে, অন্তরে হয়তো এর বিপরীত কিছু গোপন করছে। এতে ঘাবড়াবার কিছুই নেই। এখন যেমন আল্লাহ তা'আলা এদেরকে তোমার ক্ষমতাধীনে রেখেছেন, এরূপই তিনি সব সময়েই করতে সক্ষম। আল্লাহর কোন কাজই কোন জ্ঞান ও হিকমত থেকে শূন্য নয়। এদের সাথে এবং সমস্ত মাখলুকের সাথে তিনি যা কিছু করেন তা নিজের চিরন্তন পূর্ণ জ্ঞান ও পূর্ণ নিপুণতার সাথেই করে থাকেন।কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি লেখক আবদুল্লাহ ইবনে আবি সারাহ।

এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে মুশরিকদের সাথে মিলিত হয়েছিল। আতা খুরাসানী (রঃ) বলেন যে, এটা আব্বাস (রাঃ) এবং তাঁর সাথীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, যখন তারা বলেছিলেনঃ “আমরা আপনার মঙ্গল কামনা করতে থাকবো।” সুদ্দী (রঃ) বলেন, এটা সাধারণ এবং সবগুলোই এর অন্তর্ভুক্ত। এটা সঠিকও বটে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া

হে নবী ! তোমাদের করায়ত্ত যুদ্ধবন্দীদেরকে বলুন, ’আল্লাহ্‌ যদি তোমাদের হৃদয়ে ভাল কিছু দেখান তবে তোমাদের কাছ থেকে যা নেয়া হয়েছে তা থেকে উত্তম কিছু তিনি তোমাদেরকে দান করবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। তার আল্লাহ্‌ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু [১]

[১] বদর যুদ্ধের বন্দীদিগকে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়। ইসলাম ও মুসলিমদের সে শক্র যা তাদেরকে কষ্ট দিতে, মারতে এবং হত্যা করতে কখনোই কোন ক্রটি করেনি; যখনই কোন রকম সুযোগ পেয়েছে একান্ত নির্দয়ভাবে অত্যাচার-উৎপীড়ন করেছে, মুসলিমদের হাতে বন্দী হয়ে আসার পর এহেন শক্রদেরকে প্রাণে বাচিয়ে দেয়াটা সাধারণ ব্যাপার ছিল না; এটা ছিল তাদের জন্য বিরাট প্রাপ্তি এবং অসাধারণ দয়া ও করুণা। পক্ষান্তরে মুক্তিপণ হিসেবে তাদের কাছ থেকে যে অর্থ গ্রহণ করা হয়েছিল, তাও ছিল অতি সাধারণ। এটা আল্লাহর একান্ত দয়া ও মেহেরবাণী যে, এই সাধারণ অর্থ পরিশোধ করতে গিয়ে তাদের যে কষ্ট হয়, তাও তিনি কি চমৎকারভাবে দূর করে দিয়েছেন।

আল্লাহ বলেন, যদি আল্লাহ তোমাদের মন-মানসিকতায় কোন রকম কল্যাণ দেখতে পান, তবে তোমাদের কাছ থেকে যা কিছু নেয়া হয়েছে, তার চেয়ে উত্তম বস্তু তোমাদের দিয়ে দেবেন। তদুপরি তোমাদের অতীত পাপও তিনি ক্ষমা করে দেবেন। এখানে (خير) অর্থ ঈমান ও নিষ্ঠা। [ফাতহুল কাদীর] অর্থাৎ মুক্তি লাভের পর সেসব বন্দীদের মধ্যে যারা পরিপূর্ণ নিষ্ঠার সাথে ঈমান ও ইসলাম গ্রহণ করবে, তারা যে মুক্তিপণ দিয়েছে, তার চাইতে অধিক ও উত্তম বস্তু পেয়ে যাবে। বন্দীদেরকে মুক্ত করে দেয়ার সাথে সাথে তাদেরকে এমনভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে যে, তারা যেন মুক্তি লাভের পর নিজেদের লাভ-ক্ষতির ব্যাপারে মনোনিবেশ সহকারে লক্ষ্য করে।

সুতরাং বাস্তব ঘটনার দ্বারা প্রমাণিত রয়েছে যে, তাদের মধ্যে যারা মুসলিম হয়েছিলেন, আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে ক্ষমা এবং জান্নাতে সুউচ্চ স্থান দান করা ছাড়াও পার্থিব জীবনে এত অধিক পরিমাণ ধন-সম্পদ দান করেছিলেন, যা তাদের দেয়া মুক্তিপণ অপেক্ষা বহুগুণে উত্তম ও অধিক ছিল।

অধিকাংশ মুফাসসির বলেছেন যে, এ আয়াতটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিতৃব্য আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে নাযিল হয়েছিল। কারণ, তিনিও বদরের যুদ্ধবন্দীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তার কাছ থেকেও মুক্তিপণ নেয়া হয়েছিল। এ ব্যাপারে তার বৈশিষ্ট ছিল এই যে, মক্কা থেকে তিনি যখন বদর যুদ্ধে যাত্রা করেন, তখন কাফের সৈন্যদের জন্য ব্যয় করার উদ্দেশ্যে বিশ ওকিয়া (স্বর্ণমুদ্রা) সাথে নিয়ে যাত্রা করেছিলেন। কিন্তু সেগুলো ব্যয় করার পূর্বেই তিনি গ্রেফতার হয়ে যান। যখন মুক্তিপণ দেয়ার সময় আসে, তখন তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, আমি তো মুসলিম ছিলাম।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আপনার ইসলাম সম্পর্কে আল্লাহই ভাল জানেন। যদি আপনার কথা সত্য হয় তবে আল্লাহ আপনাকে এর প্রতিফল দিবেন। আমরা তো শুধু প্রকাশ্য কর্মকাণ্ডের উপর হুকুম দেব। সুতরাং আপনি আপনার নিজের এবং দুই ভাতিজা আকীল ইবন আবী তালেব ও নওফেল ইবন হারেসের মুক্তিপণও পরিশোধ করবেন। আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু আবেদন করলেন, আমার এত টাকা কোথেকে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ কেন, আপনার নিকট কি সে সম্পদগুলো নেই, যা আপনি মক্কা থেকে রওয়ানা হওয়ার সময়ে আপনার স্ত্রী উন্মুল ফ্যলের নিকট রেখে এসেছেন?

আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেনঃ আপনি সে কথা কেমন করে জানলেন? আমি যে রাত্রের অন্ধকারে একান্ত গোপনে সেগুলো আমার স্ত্রীর নিকট অর্পণ করেছিলাম এবং এ ব্যাপারে তৃতীয় কোন লোকই অবগত নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ সে ব্যাপারে আমার রব আমাকে বিস্তারিত অবহিত করেছেন। তখন আব্বাস বললেন, আমার কাছে যে স্বর্ণ ছিল, সেগুলোকেই আমার মুক্তিপণ হিসেবে গণ্য করা হোক। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ যে সম্পদ আপনি কুফরীর সাহায্যের উদ্দেশ্যে নিয়ে এসেছিলেন, তা তো মুসলিমদের গনীমতের মালে পরিণত হয়ে গেছে, ফিদইয়া বা মুক্তিপণ হতে হবে সেগুলো বাদে।

তারপর আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু তার নিজের ও দুই ভাতিজার ফিদইয়া দিলেন। তখন এ আয়াত নাযিল হয়। [সীরাতে ইবন হিশাম; ইবন কাসীর] তো সে ওয়াদার বিকাশ-বাস্তবতা স্বচক্ষেই প্রত্যক্ষ করছি। কারণ আমার নিকট থেকে মুক্তিপণ বাবদ বিশ উকিয়া সোনা নেয়া হয়েছিল। অথচ এখন আমার বিশটি গোলাম (ক্রীতদাস) বিভিন্ন স্থানে আমার ব্যবসায় নিয়োজিত রয়েছে এবং তাদের কারো ব্যবসায়ই বিশ হাজার দিরহামের কম নয়। [দেখুন, মুস্তাদরাকে হাকিম: ৩/৩২৪] তদুপরি হজের সময় হাজীদের পানি খাওয়ানোর খেদমতটিও আমাকেই অর্পণ করা হয়েছে যা আমার নিকট এমন এক অমূল্য বিষয় যে, সমগ্র মক্কাবাসীর যাবতীয় ধন-সম্পদও এর তুলনায় তুচ্ছ বলে মনে হয়।

তাফসীর আল-কুরতুবী

[সূরা আল-আনফাল (৮): আয়াত ৭০ হতে ৭১] পূর্ণ পৃষ্ঠা

দ্বিতীয় মাসআলা- ইবনুল আরাবী বলেন: এ আয়াতের মধ্যে এ কথার প্রমাণ রয়েছে যে, কোনো বান্দা যদি এমন কোনো কাজ করে যা সে হারাম মনে করে, অথচ আল্লাহর ইলমে তা তার জন্য হালাল ছিল, তবে তার ওপর কোনো শাস্তি বর্তাবে না। যেমন একজন রোজা পালনকারী যদি বলে: 'আজ আমার নওব (সফর বা অসুস্থতার পালার) দিন' এবং সে এখন ইফতার করে ফেলল। অথবা কোনো নারী যদি বলে: 'আজ আমার ঋতুস্রাবের দিন' এবং সে রোজা ভেঙে ফেলল; এরপর যদি নওব ও ঋতুস্রাব বাস্তবেই সংঘটিত হয় যা রোজা ভঙ্গের বৈধতা দেয়, তবে মাযহাবের প্রসিদ্ধ মতানুসারে তার ওপর কাফফারা ওয়াজিব হবে। ইমাম শাফিঈও একই কথা বলেছেন।

আর ইমাম আবু হানীফা বলেন: তার ওপর কোনো কাফফারা নেই; এটি অন্য একটি বর্ণনা। প্রথম বর্ণনার যুক্তি হলো, হালাল হওয়ার বিষয়টি পরে প্রকাশ পাওয়া হারাম লঙ্ঘনের সময়কার শাস্তির ক্ষেত্রে কোনো ওজর হিসেবে গণ্য হয় না; যেমন কেউ কোনো নারীর সাথে ব্যভিচার করার পর তাকে বিবাহ করল। দ্বিতীয় বর্ণনার যুক্তি হলো, মহান আল্লাহর কাছে ওই দিনের মর্যাদা আগেই রহিত হয়ে গিয়েছিল, ফলে সেই লঙ্ঘন এমন এক স্থানে ঘটেছে যার আল্লাহর ইলমে কোনো পবিত্রতা বা সম্মান ছিল না। এটি সেই ব্যক্তির মতো যে এমন এক নারীর সাথে সহবাসের ইচ্ছা করল যাকে বাসর ঘরে তার কাছে পাঠানো হয়েছে, অথচ সে তাকে নিজের স্ত্রী নয় বলে মনে করেছিল, কিন্তু বাস্তবে সে তারই স্ত্রী ছিল।

আর এটিই অধিক সঠিক মত। আর প্রথম যুক্তিটি অপরিহার্য নয়, কারণ [বিবাহের উদাহরণের ক্ষেত্রে] হারামের মাসআলায় আল্লাহর ইলম ও আমাদের জ্ঞান অভিন্ন ছিল। কিন্তু আমাদের এই মাসআলায় আমাদের জ্ঞান ও আল্লাহর ইলম ভিন্ন ছিল, তাই আল্লাহর ইলমই হবে নির্ভরতার ভিত্তি। যেমনটি তিনি ইরশাদ করেছেন: "যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে পূর্ব-নির্ধারিত বিধান না থাকত, তবে তোমরা যা গ্রহণ করেছ তার জন্য তোমাদের ওপর মহাশাস্তি আপতিত হতো।" ‌‌[সূরা আল-আনফাল (৮): আয়াত ৬৯]সুতরাং তোমরা যা গনীমত হিসেবে লাভ করেছ তা থেকে হালাল ও পবিত্র হিসেবে আহার করো এবং আল্লাহকে ভয় করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু (৬৯)এর বাহ্যিক অর্থ দাবি করে যে, সমুদয় গনীমত যোদ্ধাদের জন্য হবে এবং তারা এতে সমানভাবে অংশীদার হবে; তবে মহান আল্লাহর বাণী: "আর জেনে রেখো যে, তোমরা যা কিছু গনীমত হিসেবে লাভ করো তার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহর জন্য" [আল-আনফাল: ৪১] - এই আয়াতটি তা থেকে এক-পঞ্চমাংশ বের করা এবং তা নির্দিষ্ট খাতসমূহে ব্যয় করার আবশ্যকতা বর্ণনা করেছে।

এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে। ‌‌[সূরা আল-আনফাল (৮): আয়াত ৭০ হতে ৭১]হে নবী! তোমাদের হাতে বন্দীদের মধ্যে যারা রয়েছে তাদেরকে বলো, যদি আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ে কোনো কল্যাণ দেখেন, তবে তোমাদের থেকে যা নেয়া হয়েছে তার চেয়ে উত্তম কিছু তোমাদের দান করবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করবেন; আর আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু (৭০) আর যদি তারা তোমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে চায়, তবে তারা ইতিপূর্বেও আল্লাহর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, অতঃপর তিনি তাদেরকে তোমাদের আয়ত্তাধীন করে দিয়েছেন; আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময় (৭১)এতে তিনটি মাসআলা রয়েছে:(১).

নওব: যা তোমার থেকে একদিন ও একরাতের পথ দূরত্বে অবস্থিত। কেউ কেউ বলেছেন: তিন দিনের পথ। আবার কেউ কেউ বলেছেন: যা দুই বা তিন ফরসাখ দূরত্বে অবস্থিত।

তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর

পূর্ণ পৃষ্ঠা পূর্ণ পৃষ্ঠা পূর্ণ পৃষ্ঠা

ইবনে জারীর ইবনে যায়িদ থেকে এই আয়াতের প্রেক্ষাপটে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রেরিত হলেন এবং ইসলাম বিজয় লাভ করল ও ঈমানের জাগরণ ঘটল, তখন তার সাথে নিফাক বা কপটতারও উন্মেষ ঘটল। কিছু লোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বলল: হে আল্লাহর রাসূল! আমরা যদি এই কওমের পক্ষ থেকে আমাদের ওপর নির্যাতন ও নানা নিপীড়নের ভয় না পেতাম, তবে আমরা অবশ্যই ইসলাম গ্রহণ করতাম; কিন্তু আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসূল। তারা তাঁর কাছে এ কথা বলত। অতঃপর বদরের যুদ্ধের দিন যখন এল, মুশরিকরা দাঁড়িয়ে ঘোষণা করল: আমাদের মধ্য থেকে কেউ যদি যুদ্ধে যেতে পেছনে পড়ে থাকে, তবে আমরা তার ঘরবাড়ি ধ্বংস করে দেব এবং তার ধন-সম্পদ হরণ করব।ফলে যারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ওই সব কথা বলত, তারা তাদের (মুশরিকদের) সাথে বেরিয়ে পড়ল।

তখন তাদের এক দল নিহত হলো এবং এক দল বন্দি হলো। তিনি বলেন: যারা নিহত হয়েছে, তাদের ব্যাপারেই আল্লাহ তাআলা এই আয়াত নাজিল করেছেন— “নিশ্চয়ই ফেরেশতারা যাদের মৃত্যু ঘটায় নিজেদের ওপর জুলুম করা অবস্থায়,” পুরো আয়াত— “আল্লাহর জমিন কি প্রশস্ত ছিল না যে তোমরা সেখানে হিজরত করতে?” এবং ওই লোকদের ছেড়ে চলে যেতে যারা তোমাদের দুর্বল করে রেখেছিল। “সুতরাং তাদের আবাসস্থল হলো জাহান্নাম এবং তা অত্যন্ত মন্দ গন্তব্য।” এরপর আল্লাহ সত্যবাদীদের ক্ষমা প্রদর্শন করে বললেন, “তবে সেই সব অসহায় পুরুষ, নারী ও শিশুরা যারা কোনো উপায় অবলম্বন করতে সক্ষম নয় এবং কোনো পথও চেনে না।” অর্থাৎ তারা বের হতে চাইলে কোথায় যাবে তা জানত না এবং বের হলে ধ্বংস হয়ে যেত।

“সুতরাং আশা করা যায় আল্লাহ তাদের ক্ষমা করবেন” —মুশরিকদের মাঝে তাদের অবস্থান করা সত্ত্বেও।আর যারা বন্দি হয়েছিল তারা বলল: হে আল্লাহর রাসূল! আপনি তো জানেন যে আমরা আপনার কাছে আসতাম এবং সাক্ষ্য দিতাম যে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসূল। আর আমরা এই লোকদের সাথে কেবল ভয়েই বের হয়েছিলাম। তখন আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন: (হে নবী! আপনার নিকট যে সব বন্দি আছে তাদের বলে দিন, যদি আল্লাহ তোমাদের অন্তরে কোনো কল্যাণ দেখেন তবে তোমাদের থেকে যা নেওয়া হয়েছে তার চেয়ে উত্তম কিছু তোমাদের দান করবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করবেন) (সূরা আল-আনফাল, আয়াত ৭০)

অর্থাৎ তোমাদের সেই কাজ ক্ষমা করবেন যা তোমরা করেছিলে—মুশরিকদের সাথে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে বের হওয়া।(আর যদি তারা আপনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে চায়, তবে তারা তো ইতঃপূর্বেও আল্লাহর সাথে খেয়ানত করেছে) (সূরা আল-আনফাল, আয়াত ৭১)। তারা মুশরিকদের সাথে বের হয়েছিল, ফলে আল্লাহ তাদের বিরুদ্ধে আপনাকে শক্তিশালী করেছেন।আবদুর রাজ্জাক, আবদ ইবনে হুমাইদ, বুখারী, ইবনে জারীর, ইবনে মুনযির, ইবনে আবি হাতিম এবং বায়হাকী তাঁর সুনান গ্রন্থে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমি এবং আমার মা অসহায়দের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।আমি ছিলাম শিশুদের অন্তর্ভুক্ত আর আমার মা ছিলেন নারীদের অন্তর্ভুক্ত।আবদ ইবনে হুমাইদ, বুখারী, ইবনে জারীর, তাবারানী এবং বায়হাকী তাঁর সুনান গ্রন্থে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি তিলাওয়াত করলেন— “তবে সেই সব অসহায় পুরুষ, নারী ও শিশুরা”।

তিনি বললেন: আমি এবং আমার মা তাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম যাদের আল্লাহ ক্ষমা করেছেন।ইবনে জারীর এবং ইবনে আবি হাতিম আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক সালাতের শেষে দোয়া করতেন: হে আল্লাহ! আপনি ওয়ালিদ, সালামাহ ইবনে হিশাম এবং আইয়াশ ইবনে আবি রাবিআহকে মুক্তি দান করুন।

ইবনুল মুনযির, আবুশ শাইখ এবং ইবনে মারদুওয়াইহ নাফে‘-এর সূত্রে ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন: বদরের বন্দীদের বিষয়ে মানুষের মধ্যে মতভেদ দেখা দিল। তখন নবী (সা.) আবু বকর এবং উমর (রা.)-এর সাথে পরামর্শ করলেন। আবু বকর (রা.) বললেন: তাদের থেকে মুক্তিপণ গ্রহণ করুন।আর উমর (রা.) বললেন: তাদের হত্যা করুন।এক ব্যক্তি বললেন: তারা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে হত্যা করতে চেয়েছিল এবং ইসলামকে মিটিয়ে দিতে চেয়েছিল, অথচ আবু বকর তাদের মুক্তিপণ গ্রহণের পরামর্শ দিচ্ছেন! অন্য একজন বললেন: যদি তাদের মধ্যে উমরের পিতা বা ভাই থাকত, তবে তিনি তাদের হত্যার নির্দেশ দিতেন না।

এরপর রাসূলুল্লাহ (সা.) আবু বকরের মত গ্রহণ করলেন এবং তাদের থেকে মুক্তিপণ নিলেন। তখন আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন: "যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে পূর্বনির্ধারিত বিধান না থাকত, তবে তোমরা যা গ্রহণ করেছ তার জন্য তোমাদের ওপর মহাশাস্তি আপতিত হতো।" তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: ইবনুল খাত্তাবের মতের বিরোধিতা করার কারণে আমাদের ওপর মহাশাস্তি আপতিত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল; আর যদি আজাব নাজিল হতো, তবে উমর ব্যতীত কেউ রেহাই পেত না।ইবনে আবি শায়বা তাঁর 'মুসান্নাফ'-এ, তিরমিযী (এবং তিনি একে সহীহ বলেছেন), নাসাঈ, ইবনুল মুনযির, ইবনে আবি হাতিম, আবুশ শাইখ, ইবনে মারদুওয়াইহ এবং বায়হাকী তাঁর 'সুনান'-এ আবু সালেহের সূত্রে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: যখন বদরের দিন উপস্থিত হলো, মানুষ গনীমতের মালের দিকে তাড়াহুড়ো করল এবং তা তাদের জন্য হালাল হওয়ার আগেই তারা তা হস্তগত করল।

তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: তোমাদের পূর্বে কোনো কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের জন্য গনীমত হালাল ছিল না। কোনো নবী ও তাঁর সাথীরা যখন গনীমত লাভ করতেন, তখন তারা তা একত্রিত করতেন এবং আকাশ থেকে আগুন এসে তা পুড়িয়ে ফেলত। এরপর আল্লাহ এই আয়াত অবতীর্ণ করেন: "যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে পূর্বনির্ধারিত বিধান না থাকত..." দুই আয়াতের শেষ পর্যন্ত।ইবনে আবি হাতিম ও ইবনে মারদুওয়াইহ আবু হুরায়রা (রা.) থেকে আল্লাহর বাণী: "যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে পূর্বনির্ধারিত বিধান না থাকত" প্রসঙ্গে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ বলছেন: যদি আমার জ্ঞানে এটি পূর্বনির্ধারিত না থাকত যে আমি অচিরেই গনীমত হালাল করে দেব, তবে তোমরা যা গ্রহণ করেছ তার কারণে তোমাদের ওপর মহাশাস্তি আপতিত হতো।

তিনি বলেন: আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব বলতেন, আল্লাহ আমাকে এই আয়াত দান করেছেন: "হে নবী! তোমাদের কাছে যে বন্দীরা আছে তাদের বলে দাও..." (সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ৭০)। আর আমার থেকে যা গ্রহণ করা হয়েছিল তার বিনিময়ে তিনি আমাকে চল্লিশটি ওকিয়া এবং চল্লিশজন দাস দান করেছেন।ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ, ইবনে জারীর, ইবনুল মুনযির, ইবনে আবি হাতিম, তাবারানী 'আল-আওসাত'-এ, আবুশ শাইখ এবং ইবনে মারদুওয়াইহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে "যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে পূর্বনির্ধারিত বিধান না থাকত, তবে তোমরা যা গ্রহণ করেছ তার জন্য তোমাদের ওপর মহাশাস্তি আপতিত হতো" আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন, অর্থাৎ বদরের গনীমত হালাল হওয়ার পূর্বে তা গ্রহণ করার কারণে।

তিনি বলেন: (আল্লাহর বাণীটির অর্থ হলো) আমি আগে সতর্ক না করে কাউকে শাস্তি দিই না—এই নীতি যদি আগে থেকে নির্ধারিত না থাকত, তবে তোমাদের ওপর মহাশাস্তি আপতিত হতো।ইবনে জারীর, ইবনুল মুনযির, ইবনে আবি হাতিম, নাহহাস তাঁর 'নাসিখ'-এ, ইবনে মারদুওয়াইহ এবং বায়হাকী ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে আল্লাহর বাণী: "কোনো নবীর জন্য সংগত নয় যে তাঁর কাছে যুদ্ধবন্দী থাকবে..." প্রসঙ্গে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন: এটি বদরের দিনের কথা যখন মুসলমানরা সংখ্যায় অল্প ছিল। অতঃপর যখন তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেল এবং তাদের শক্তি সুদৃঢ় হলো, তখন আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন...

যখন আল্লাহ তাদের জন্য তাদের মুক্তিপণ ও সম্পদসমূহ হালাল করে দিলেন।বন্দীরা বলল: "আল্লাহর নিকট আমাদের জন্য কোনো কল্যাণ অবশিষ্ট নেই, যেহেতু আমাদের হত্যা করা হয়েছে এবং বন্দী করা হয়েছে।" তখন আল্লাহ তাদের সুসংবাদ প্রদান করে অবতীর্ণ করলেন: (হে নবী! আপনার হাতে বন্দীদের মধ্যে যারা রয়েছে তাদেরকে বলুন) (সূরা আল-আনফাল, আয়াত ৭০) আল্লাহর বাণী (আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়) পর্যন্ত।ইবনে মারদাওয়াইহ ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে প্রেরণের পূর্বে উম্মতদের মাঝে গণিমতের বিধান এমন ছিল যে, যখন তারা তা লাভ করত, তখন তারা তা উৎসর্গের জন্য রেখে দিত।

আল্লাহ তাদের জন্য এর অল্প বা বিস্তর কোনো অংশই ভক্ষণ করা হারাম করেছিলেন; এটি প্রত্যেক নবী ও তাঁর উম্মতের জন্য হারাম ছিল। ফলে তারা তা থেকে কিছুই ভক্ষণ করত না, আত্মসাৎ করত না এবং সামান্য বা বেশি কিছুই গ্রহণ করত না; অন্যথায় আল্লাহ তাদের শাস্তি দিতেন। আল্লাহ তাদের জন্য এটি অত্যন্ত কঠোরভাবে হারাম করেছিলেন। তিনি মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ব্যতীত অন্য কোনো নবীর জন্য তা হালাল করেননি। আল্লাহর ফয়সালায় পূর্বেই নির্ধারিত ছিল যে, গণিমত তাঁর এবং তাঁর উম্মতের জন্য হালাল। বদরের দিন বন্দীদের থেকে মুক্তিপণ গ্রহণের প্রেক্ষিতে আল্লাহর বাণী এটিই: যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে পূর্বনির্ধারিত বিধান না থাকত, তবে তোমরা যা গ্রহণ করেছ সে কারণে তোমাদের ওপর মহা শাস্তি আপতিত হতো।খতিব ‘আল-মুত্তাফিক ওয়াল মুফতারিক’ গ্রন্থে ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণনা করেছেন, যখন তারা মুক্তিপণ গ্রহণে আগ্রহী হলো, তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হলো: কোনো নবীর জন্য সঙ্গত নয় থেকে যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে পূর্বনির্ধারিত বিধান না থাকত আয়াত পর্যন্ত।তিনি বলেন: আল্লাহর পক্ষ থেকে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের জন্য তাঁর রহমত পূর্বনির্ধারিত ছিল, ফলে আল্লাহ তাদের মার্জনা করেছেন এবং এটি তাদের জন্য হালাল করে দিয়েছেন।

আয়াত ৭০