Al-Anfal
আল-আনফাল: 41
মূল আরবি
۞ وَٱعْلَمُوٓا۟ أَنَّمَا غَنِمْتُم مِّن شَىْءٍ فَأَنَّ لِلَّهِ خُمُسَهُۥ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِى ٱلْقُرْبَىٰ وَٱلْيَتَـٰمَىٰ وَٱلْمَسَـٰكِينِ وَٱبْنِ ٱلسَّبِيلِ إِن كُنتُمْ ءَامَنتُم بِٱللَّهِ وَمَآ أَنزَلْنَا عَلَىٰ عَبْدِنَا يَوْمَ ٱلْفُرْقَانِ يَوْمَ ٱلْتَقَى ٱلْجَمْعَانِ ۗ وَٱللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَىْءٍ قَدِيرٌ
English Translations
And know that anything you obtain of war booty - then indeed, for Allāh is one fifth of it and for the Messenger and for [his] near relatives and the orphans, the needy, and the [stranded] traveler, if you have believed in Allāh and in that which We sent down to Our Servant on the day of criterion [i.e., decisive encounter] - the day when the two armies met [at Badr]. And Allāh, over all things, is competent.
And know that whatever of war-booty that you may gain, verily one-fifth (1/5th) of it is assigned to Allah, and to the Messenger, and to the near relatives [of the Messenger (Muhammad SAW)], (and also) the orphans, Al-Masakin (the poor) and the wayfarer, if you have believed in Allah and in that which We sent down to Our slave (Muhammad SAW) on the Day of criterion (between right and wrong), the Day when the two forces met (the battle of Badr) - And Allah is Able to do all things.
And know that whatever spoils you receive, its one fifth is for Allah and for His Messenger, and for kinsmen and orphans and the needy and the wayfarer, if you do believe in Allah and in what We have sent down upon Our Servant on the decisive day, the day when the two forces encountered each other. And Allah is powerful over everything.
Know that one fifth of the spoils that you obtain belongs to Allah, to the Messenger, to the near of kin, to the orphans, and the needy, and the wayfarer. This you must observe if you truly believe In Allah and in what We sent down on Our servant on the day when the true was distinguished from the false, the day on which the two armies met in battle. Allah has power over all things.
And know that whatever ye take as spoils of war, lo! a fifth thereof is for Allah, and for the messenger and for the kinsman (who hath need) and orphans and the needy and the wayfarer, if ye believe in Allah and that which We revealed unto Our slave on the Day of Discrimination, the day when the two armies met. And Allah is Able to do all things.
And know that out of all the booty that ye may acquire (in war), a fifth share is assigned to Allah,- and to the Messenger, and to near relatives, orphans, the needy, and the wayfarer,- if ye do believe in Allah and in the revelation We sent down to Our servant on the Day of Testing,- the Day of the meeting of the two forces. For Allah hath power over all things.
বাংলা অনুবাদ
তোমরা জেনে রেখ যে, যুদ্ধে যা তোমরা লাভ কর তার এক-পঞ্চমাংশ হচ্ছে আল্লাহ, তাঁর রসূল, রসূলের আত্মীয়স্বজন, ইয়াতীম, মিসকীন ও মুসাফিরদের জন্য যদি তোমরা আল্লাহর উপর আর চূড়ান্ত ফায়সালার দিন অর্থাৎ দু’পক্ষের (মুসলমান ও কাফের বাহিনীর) মিলিত হওয়ার দিন আমি যা আমার বান্দাহর উপর অবতীর্ণ করেছিলাম তার উপর বিশ্বাস করে থাক। আর আল্লাহ হলেন সকল বিষয়ের উপর ক্ষমতাবান।
আর তোমরা জেনে রাখ, তোমরা যা কিছু গনীমতরূপে পেয়েছ, নিশ্চয় আল্লাহর জন্যই তার এক পঞ্চমাংশ ও রাসূলের জন্য, নিকট আত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকীন ও মুসাফিরের জন্য, যদি তোমরা ঈমান এনে থাক আল্লাহর প্রতি এবং হক ও বাতিলের ফয়সালার দিন আমি আমার বান্দার উপর যা নাযিল করেছি তার প্রতি, যেদিন* দু’টি দল মুখোমুখি হয়েছে, আর আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। * অর্থাৎ বদর যুদ্ধের দিন।
আর তোমরা জেনে রেখ যে, যুদ্ধে তোমরা যা কিছু গাণীমাতের মাল লাভ করেছ ওর এক পঞ্চমাংশ আল্লাহ, তাঁর রাসূল, (রাসূলের) নিকটাত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকীন এবং মূসাফিরের জন্য - যদি তোমরা ঈমান এনে থাক আল্লাহর প্রতি এবং যা আমি অবতীর্ণ করেছি আমার বান্দার উপর সেই চুড়ান্ত ফাইসালার দিন, যেদিন দু‘দল পরস্পরের সম্মুখীন হয়েছিল। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান।
আর জেনে রাখ, যুদ্ধে যা তোমরা গনীমত হিসেবে লাভ করেছ, তার এক-পঞ্চামাংশ আল্লাহ্র, রাসূলের, রাসূলের স্বজনদের, ইয়াতীমদের, মিসকীনদের এবং সফরকারীদের যদি তোমরা ঈমান রাখ আল্লাহ্তে এবং তাতে যা মীমাংসার দিন আমরা আমাদের বান্দার প্রতি নাযিল করেছিলাম, যে দিন দু দল পরস্পরের সম্মুখীন হয়েছিল। আর আল্লাহ্ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।
আরও জেনে রাখ যে, যুদ্ধে যা তোমরা লাভ কর তার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহ্র, রাসূলের, রাসূলের স্বজনদের, ইয়াতীমদের, মিসকীনদের এবং পথচারীদের যদি তোমরা ঈমান রাখ আল্লাহর ওপর ও সে বিষয়ের প্রতি যা অবতীর্ণ করেছি আমার বান্দার ওপর মীমাংসার দিনে, যেদিন উভয় সেনা দল মুখোমুখি হয়েছিল এবং আল্লাহ সর্ববিষয়ে শক্তিমান।
৪১. হে মু’মিনরা! যদি তোমরা আমি আল্লাহর উপর এবং বদরের দিন আমার বান্দা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর প্রতি যা নাযিল করেছি তার উপর বিশ্বাসী হয়ে থাকো তাহলে এ কথা জেনে রাখো যে, তোমরা আল্লাহর পথে জিহাদ করতে গিয়ে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে কাফিরদের থেকে যা কিছু হাসিল করো তা পাঁচ ভাগে ভাগ করা হবে: যার চার ভাগ মুজাহিদদের মাঝে বন্টন করা হবে এবং অবশিষ্ট পঞ্চম ভাগকে আবারো পাঁচ ভাগে ভাগ করা হবে: যার এক ভাগ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য অর্থাৎ তা মুসলমানদের সাধারণ খরচের খাতে ব্যয় করা হবে। আরেক ভাগ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর আত্মীয় তথা বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবের জন্য। আরেক ভাগ এতীমের জন্য। আরেক ভাগ ফকির ও মিসকিনের জন্য। আরেক ভাগ পথে আটকে পড়া মুসাফিরদের জন্য। যে বদরের দিন আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে নিজেদের শত্রুদের উপর বিজয়ী করে সত্য ও মিথ্যার মাঝে পার্থক্য সৃষ্টি করেছেন। বস্তুতঃ যে আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করেছেন তিনি সব কিছুই করতে সক্ষম।
তাফসীর
এখানে আল্লাহ তা'আলা গনীমত বা যুদ্ধলব্ধ মালের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন যা তিনি বিশেষভাবে উম্মতে মুহাম্মাদিয়ার জন্যেই হালাল করেছেন। পূর্ববর্তী উম্মতদের জন্যে এটা হারাম ছিল। গনীমত ঐ মালকে বলা হয় যা কাফিরদের উপর আক্রমণ চালানোর পর লাভ করা হয়। আর ফাই' হচ্ছে ঐ মাল যা যুদ্ধ না করেই লাভ করা হয়। যেমন তাদের সাথে সন্ধি করে ক্ষতিপূরণ স্বরূপ কিছু আদায় করা হয় বা ঐ মাল যার কোন উত্তরাধিকারী নেই অথবা যে মাল জিযিয়া, খিরাজ ইত্যাদি হিসাবে পাওয়া যায়। ইমাম শাফিঈ (রঃ) এবং পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মাশায়েখদের একটি জামা'আতের অভিমত এটাই। কিন্তু কোন কোন আলেম গনীমতের প্রয়োগ ফাই-এর উপর এবং ফাই-এর প্রয়োগ গনীমতের উপর করে থাকেন।
এ জন্যেই কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এই আয়াত দ্বারা সূরায়ে হাশরের (আরবী) (৫৯:৭)-এই আয়াতটিকে রহিত করা হয়েছে। আর এভাবে গনীমতের মালের পাঁচ অংশের মধ্য হতে চার অংশ তো মুজাহিদদের মধ্যে বন্টিত হবে এবং এক অংশ তাদেরকে দেয়া হবে যাদের বর্ণনা এই আয়াতে রয়েছে। কিন্তু এই উক্তিটি গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা, এই আয়াতটি বদর যুদ্ধের পরে অবতীর্ণ হয়, আর ঐ আয়াতটি ইয়াহদ বানী নাযীরের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। আর জীবনী লেখক ও ইতিহাস লেখক আলেমদের কারো এ ব্যাপারে দ্বি-মত নেই যে, বানী নাযীরের ব্যাপারটি হচ্ছে বদর যুদ্ধের পরের ঘটনা। এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।
কিন্তু যারা গনীমত' ও ফাই’-এর মধ্যে পার্থক্য আনয়ন করে থাকেন তাঁরা বলেন যে, ঐ আয়াতটি ফাই’ সম্পর্কে অবতীর্ণ হয় এবং এই আয়াতটি গনীমত সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়। আবার কতক লোক ‘ফাই’ ও ‘গনীমত'-এর ব্যাপারটিকে ইমামের মতের উপর নির্ভরশীল বলে মনে করেন । ইমাম ঐ ব্যাপারে নিজের মর্জি মোতাবেক কাজ করবেন। এভাবেই এই দু'টি আয়াতের মধ্যে সামঞ্জস্য এসে যায়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এই আয়াতে বর্ণনা রয়েছে যে, গনীমতের মাল হতে এক পঞ্চমাংশ বের করে নিতে হবে, তা কমই হাক আর বেশীই হাক। তা সূচই হাক বা সূতাই হোক না কেন। বিশ্ব প্রতিপালক ঘোষণা করছেন যে, যে খিয়ানত করবে সে তা নিয়ে কিয়ামতের দিন হাযির হবে এবং প্রত্যেককেই তার আমলের পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে।
কারো উপর কোন প্রকার অত্যাচার করা হবে না। বলা হয়েছে যে, এক পঞ্চমাংশ হতে আল্লাহ তাআলার অংশ কা'বা ঘরে দাখিল করা হবে। আবুল আলিয়া রাবাহী (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যুদ্ধলব্ধ মালকে পাঁচ ভাগ করতেন। চার ভাগ তিনি মুজাহিদদের মধ্যে বন্টন করে দিতেন। তারপর এক পঞ্চমাংশ হতে মুষ্টি ভরে বের করতেন এবং তা কা'বা ঘরে দাখিল করে দিতেন। অতঃপর অবশিষ্টাংশকে আবার পাঁচ ভাগে ভাগ করতেন। এক ভাগ তার, দ্বিতীয় ভাগ আত্মীয়দের, তৃতীয় ভাগ ইয়াতীমদের, চতুর্থ ভাগ মিসকীনদের এবং পঞ্চম ভাগ মুসাফিরদের। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এখানে আল্লাহর অংশের নাম শুধুমাত্র বরকতের জন্যে নেয়া হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অংশ থেকেই যেন। বর্ণনা শুরু হয়েছে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন কোন সৈন্যবাহিনী পাঠাতেন এবং গনীমতের মাল লাভ করতেন তখন তিনি ওটাকে প্রথমে পাঁচ ভাগে ভাগ করতেন। তারপর পঞ্চমাংশকে আবার পাঁচ অংশে বিভক্ত করতেন। অতঃপর তিনি এ আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন। সুতরাং (আরবী) এটা শুধু বাক্যের শুরুর জন্যে বলা হয়েছে। আকাশসমূহে ও যমীনে যা কিছু রয়েছে সবই তো আল্লাহর। কাজেই এক পঞ্চমাংশ আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এরই প্রাপ্য। বহু মনীষী ও গুরুজনের এটাই উক্তি যে, আল্লাহ ও রাসূল (সঃ)-এর একটাই অংশ। (এটা নাখঈ (রঃ), হাসান বসরী (র), শাবী (রঃ), আতা (রঃ) এবং কাতাদা (রঃ) প্রমুখ মনীষীয়উক্তি) সহীহ সনদে বর্ণিত নিম্নের হাদীসটি এর পৃষ্ঠপোষকতা করছেঃ আব্দুল্লাহ ইবনে শাকীক (রঃ) একজন সাহাবী হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন, ওয়াদীল কুরায় আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) গনীমতের ব্যাপারে আপনি কি বলেন?
নবী (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “ওর এক পঞ্চমাংশ হচ্ছে আল্লাহর জন্যে এবং বাকী চার অংশ হচ্ছে মুজাহিদদের জন্যে।” আমি পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম, কারো উপর কারো কি অধিক হক নেই? তিনি জবাব দিলেন- “না, এমন কি তুমি তোমার বন্ধুর দেহ থেকে যে তীরটি বের করবে সেই তীরটিও তুমি তোমার সেই মুসলিম ভাই এর চেয়ে বেশী নেয়ার হকদার নও।” (এ হাদীসটি ইমাম হাফিয আবু বকর আল-বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হাসান (রাঃ) স্বীয় মাল হতে এক পঞ্চমাংশের অসিয়ত করেন এবং বলেনঃ “আমি কি নিজের জন্যে ঐ অংশের উপর সম্মত হবো না যা আল্লাহ স্বয়ং নিজের জন্যে নির্ধারণ করেছেন?”ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, গনীমতের মালকে পাঁচ ভাগে বিভক্ত করা হতো।
চার ভাগ ঐ সৈন্যদের মধ্যে বন্টন করে দেয়া হতো যারা ঐ যুদ্ধে শরীক থাকতেন। আর পঞ্চম ভাগটি থাকতো আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর জন্যে। এটাকে আবার চারভাগে ভাগ করা হতো। এর এক চতুর্থাংশের প্রাপক হতেন আল্লাহ ও তার রাসূল (সঃ)। আল্লাহ ও তার র আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)। আল্লাহ ও তার রাসুল (সঃ)-এর প্রাপ্য এই অংশটি রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর আত্মীয়দের মধ্যে বণ্টন করে দেয়া হতো। এক পঞ্চমাংশ থেকে নবী (সঃ) নিজে কিছুই গ্রহণ করতেন না। আব্দুল্লাহ ইবনে বুরাইদা (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহর অংশ হচ্ছে তাঁর নবী (সঃ)-এর অংশ এবং নবী (সঃ)-এর অংশ তাঁর স্ত্রীদের প্রাপ্য।
আতা ইবনে আবি রাবাহ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর যেটা অংশ সেটা শুধু রাসূল (সঃ)-এরই অংশ। ওটা তার ইচ্ছাধীন, তিনি যে কোন কাজে তা ব্যয় করতে পারেন । মিকদাদ ইবনে মা’দীকারাব (রাঃ) একদা উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ), আবু দারদা (রাঃ) এবং হারিস ইবনে মুআবিয়া কান্দীর (রাঃ) সাথে বসেছিলেন। তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাদীসগুলোর আলোচনা করছিলেন। আবূ দারদা (রাঃ) উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “অমুক অমুক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক পঞ্চমাংশের ব্যাপারে কি কথা বলেছিলেন?” উত্তরে উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক যুদ্ধে গনীমতের এক পঞ্চমাংশের একটি উটের পিছনে সাহাবীদেরকে নামায পড়ান।
সালাম ফিরাবার পর তিনি দাঁড়িয়ে যান এবং ঐ উটটির কিছু পশম হাতে নিয়ে বলেন- “গনীমতের এই উটটির এই পশমগুলোও গনীমতের মালেরই অন্তর্ভুক্ত। এ মাল আমার নয়। আমার অংশ তো তোমাদেরই সাথে এক পঞ্চমাংশ মাত্র। এটাও আবার তোমাদেরকেই ফিরিয়ে দেয়া হয়। সুতরাং সুঁচ, সূতা এবং ওর চেয়ে বড় ও ছোট প্রত্যেক জিনিসই পৌছিয়ে দাও। খিয়ানত করো না। খিয়ানত বড়ই দূষণীয় কাজ এবং খিয়ানতকারীর জন্যে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় স্থানেই আগুন রয়েছে। নিকটবর্তী ও দূরবর্তী লোকদের সাথে আল্লাহর পথে জিহাদ জারী রাখো । শরীয়তের কাজে ভৎসনাকারীর ভৎসনার প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপ করো না।
স্বদেশে এবং বিদেশে আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত হদ জারী করতে থাকো। আল্লাহর ব্যাপারে জিহাদ করতে থাকো। জিহাদ হচ্ছে জান্নাতের বড় বড় দরজাসমূহের মধ্যে একটি দরজা। এই জিহাদের মাধ্যমেই আল্লাহ তা'আলা দুঃখ ও চিন্তা হতে মুক্তি দিয়ে থাকেন।” (ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন, এটা হচ্ছে অতি উত্তম হাদীস। আমি এটা এভাবে ছয়টি গ্রন্থে দেখিনি। তবে এর পক্ষে বহু সাক্ষ্য প্রমাণ রয়েছে)আমর ইবনে আনবাসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে নিয়ে গনীমতের একটি উটের কাছে নামায পড়েন। সালাম ফিরানোর পর তিনি ঐ উটের কিছু পশম নিয়ে বলেনঃ “তোমাদের গনীমতের মালের মধ্য হতে আমার জন্যে এক পঞ্চমাংশ ছাড়া এই পশম পরিমাণও হালাল নয়।
আর এই পঞ্চমাংশও তোমাদেরকেই ফিরিয়ে দেয়া হয়। (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এই অংশের মধ্য হতে কিছুটা রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজের জন্যেও নির্দিষ্ট করতেন। যেমন দাস, দাসী, তরবারী, ঘোড়া ইত্যাদি। এটা মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রঃ), আমির শা'বী (রঃ) এবং অধিকাংশ আলেম বর্ণনা করেছেন। ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, যুলফিকার’ তরবারীটি বদর যুদ্ধের গনীমতেরই অন্তর্ভুক্ত, যা নবী (সঃ)-এর কাছে ছিল এবং যার ব্যাপারে তিনি উহুদ যুদ্ধের দিন স্বপ্ন দেখেছিলেন। আয়েশা (রাঃ) বলেন যে, সাফিয়া (রাঃ) এভাবেই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হস্তগত হয়েছিলেন।
(ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এটা স্বীয় সুনানে বর্ণনা করেছেন)ইয়াযীদ ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা একটা বেড়ার মধ্যে বসেছিলাম এমন সময় একটি লোক আমাদের কাছে আসলেন। তার হাতে এক খণ্ড চামড়া ছিল। তাতে যা লিখিত ছিল আমরা তা পড়তে লাগলাম। তাতে লিখিত ছিল- “এটা আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ (সঃ)-এর পক্ষ হতে যুহাইর ইবনে আকীশের নিকট প্রেরিত। যদি তোমরা আল্লাহর একত্র ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর রিসালাতের সাক্ষ্য প্রদান কর, নামায সুপ্রতিষ্ঠিত কর, যাকাত দাও, যুদ্ধলব্ধ মালের এক পঞ্চমাংশ আদায় কর এবং নবী (সঃ)-এর অংশ ও উৎকৃষ্ট অংশ আদায় করতে থাকো তবে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর নিরাপত্তার মধ্যে থাকবে।” (বর্ণনাকারী বলেনঃ) আমরা জিজ্ঞেস করলামঃ “এটা কে লিখেছেন?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “(এটা) রাসূলুল্লাহ (সঃ) (লিখেছেন)।” (এটা ইমাম আবু দাউদ (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) সুতরাং এসব বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা এটাই প্রমাণিত হচ্ছে এবং এ জন্যেই অধিকাংশ গুরুজন এটাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিশিষ্টতার মধ্যে গণ্য করেছেন।কেউ কেউ বলেন যে, এক পঞ্চমাংশ গনীমতের ব্যাপারে তৎকালীন সময়ের শাসনকর্তার স্বাধীনতা রয়েছে।
তিনি মুসলমানদের কল্যাণার্থে তা ইচ্ছামত ব্যয় করতে পারেন। যেমন ফাই’-এর মালের ব্যাপারে তার সব কিছু করার অধিকার রয়েছে। শায়েখ আল্লামা ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রঃ) বলেন যে, ইমাম মালিক (রঃ)-এর এটাই উক্তি। অধিকাংশ গুরুজনেরও উক্তি এটাই এবং এটাই সর্বাধিক সঠিক উক্তি। এটা যখন প্রমাণিত হয়ে গেল এবং জানাও হলো তখন এও মনে রাখা দরকার যে, পঞ্চমাংশ যা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অংশ ছিল, এখন তার পরে ওটা কি করতে হবে? এ ব্যাপারে কেউ কেউ বলেন যে, এখন এটা সমকালীন ইমাম অর্থাৎ খলীফাতুল মুসলিমীনের অধিকারে থাকবে। আবু বকর (রাঃ), আলী (রাঃ), কাতাদা (রঃ) এবং একটি জামা'আতের এটাই উক্তি।
আর এ ব্যাপারে একটি মারফু হাদীসও এসেছে। অন্যান্যেরা বলেন যে, এটা মুসলমানদের কল্যাণে ব্যয় করা হবে। অন্য একটি উক্তি রয়েছে যে, এটাও অবশিষ্ট অন্যান্য শ্রেণীর মধ্যে খরচ করা হবে অর্থাৎ আত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকীন ও মুসাফিরদের মধ্যে বণ্টিত হবে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাই পছন্দ করেছেন। অন্যান্য বুযুর্গদের নির্দেশ এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অংশ ও তার আত্মীয়দের অংশ ইয়াতীম, মিসকীন ও মুসাফিরদেরকে দিয়ে দেয়া হবে। ইরাকবাসী একটি দলের এটাই উক্তি। আবার এ কথাও বলা হয়েছে যে, পঞ্চমাংশের এই পঞ্চমাংশ সবই আত্মীয়দের প্রাপ্য। যেমন ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, মিনহাল ইবনে আমর (রঃ) বলেন, আমি আব্দুল্লাহ্ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আলী (রঃ)-কে এবং আলী ইবনে হুসাইন (রঃ)-কে এক পঞ্চমাংশ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তারা বলেনঃ “এটা আমাদেরই প্রাপ্য।” আমি তখন জিজ্ঞেস করলাম, আয়াতে ইয়াতীম ও মিসকীনদের বর্ণনাও ততা রয়েছে?
উত্তরে তাঁরা দু’জন বললেনঃ “এর দ্বারাও আমাদেরই ইয়াতীম ও মিসকীনদেরকে বুঝানো হয়েছে।” ইমাম হাসান ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়্যাহ (রঃ)-কে (আরবী)-এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “বাক্যটি এভাবে শুরু করা হয়েছে মাত্র, নচেৎ দুনিয়া ও আখিরাতের সব কিছুই তো আল্লাহরই।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পরে এ দুটো অংশ কে পাবেন এ ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অংশ তাঁর খলীফাগণ পাবেন। কারো কারো মতে এটা তাঁর আত্মীয়েরা পাবেন। আবার কেউ কেউ বলেন যে, ওটা খলীফার আত্মীয়েরা পাবেন। সম্মিলিতভাবে তাঁদের মত এই যে, এই অংশ দুটোকেই ঘোড়া ও অস্ত্রশস্ত্রের কাজে লাগানো হবে।
আবু বকর (রাঃ) ও উমার (রাঃ)-এর খিলাফতের যুগে এরূপই করা হয়েছিল। ইবরাহীম (রঃ) বলেন যে, আবু বকর (রাঃ) এবং উমার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অংশটি জিহাদের কাজে খরচ করতেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হলোঃ “আলী (রাঃ) এ ব্যাপারে কি করতেন?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “এ ব্যাপারে তিনি সর্বাপেক্ষা কঠিন ছিলেন।” অধিকাংশ আলেমের এটাই উক্তি। হ্যাঁ, তবে আত্মীয়দের অংশটির প্রাপক আব্দুল মুত্তালিবের সন্তানরা । কেননা, তাঁরাই অজ্ঞতার যুগে এবং ইসলামের প্রাথমিক যুগে হাশিমের সন্তানদের সাথে সহযোগিতা করেছিল এবং তাদের সাথে তারা ঘাঁটিতে বন্দী জীবন যাপনকেও স্বীকার করে নিয়েছিল।
কারণ রাসূলুল্লাহ (সঃ) অত্যাচারিত হচ্ছিলেন বলে এ লোকগুলো রাগান্বিত হয়েছিল এবং তার সাহায্যার্থে এগিয়ে এসেছিল। মুসলমানরা তাকে সাহায্য করেছিলেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্যের কারণে। আর এই কাফিররা তাকে সাহায্য করেছিল বংশীয় পক্ষপাতিত্ব এবং আত্মীয়তার খাতিরে । কিন্তু বানু আবদে শামস্ ও বানু নাওফিল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চাচাতো ভাই হলেও তার সাথে সহযোগিতা করেনি, বরং বিরুদ্ধাচরণ করেছিল এবং তাঁকে পৃথক করে দিয়েছিল। তারা তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল এবং বলেছিল যে, কুরায়েশের অন্যান্য সমস্ত গোত্রই তাঁর বিরোধী। এ জন্যেই আবু তালিব তাঁর ভৎসনামূলক ও নিন্দাসূচক কবিতায় তাদেরকে বহু তিরস্কার ও নিন্দে করেছেন।
কেননা, তারা ছিল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকটতম আত্মীয়। তিনি বলেছেনঃ “অতিসত্বরই তারা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তাদের অপকর্মের পূর্ণ বদলা পেয়ে যাবে। এই নির্বোধরা নিজের লোক হয়েও এবং একই বংশ ও রক্তের লোক হয়েও আমাদের দিক থেকে চক্ষু ফিরিয়ে নিচ্ছে!” ইত্যাদি। জুবাইর ইবনে মুতঈম ইবনে আদী ইবনে নওফেল (রাঃ) বলেন, আমি এবং উসমান ইবনে আফফান ইবনে আবিল আস ইবনে উমাইয়া ইবনে আবদে শামস্ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে গেলাম এবং বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি খায়বারের যুদ্ধলব্ধ মালের এক পঞ্চমাংশ হতে বানু আবদিল মুত্তালিবকে দিলেন, কিন্তু আমাদেরকে ছেড়ে দিলেন।
অথচ আপনার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্কের দিক দিয়ে আমরা ও তারা সমান! তখন তিনি বললেনঃ “বানু হাশিম ও বানু মুত্তালিব তো একই জিনিস।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) কয়েকটি বাবে বা অনুচ্ছেদে বর্ণনা করেছেন) কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে যে, তাঁরা বলেনঃ “তারা তো অজ্ঞতার যুগেও আমাদের থেকে পৃথক হয়নি এবং ইসলামের যুগেও না।” এটা হচ্ছে জমহুর উলামার উক্তি যে, তারা হলো বানু হাশিম ও বানু মুত্তালিব। কেউ কেউ বলেন যে, এরা হচ্ছে শুধু বানু হাশিম। মুজাহিদ (রঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা জানতেন যে, বানু হাশিমের মধ্যে দরিদ্র লোক রয়েছে। তাই সাদকার স্থলে গনীমতের মালে তাদের অংশ নির্ধারিত করেছেন।
এরা হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঐ আত্মীয় যাদের জন্যে সাদকা হারাম।” আলী ইবনে হুসাইন (রঃ) হতেও এরূপই বর্ণিত আছে। কেউ কেউ বলেন যে, এরা সবাই কুরায়েশ। ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলঃ “যাবীল কুরবা কারা?” তিনি উত্তরে বলেছিলেন- “আমরা তো বলতাম যে, আমরাই। কিন্তু আমাদের কওম তা স্বীকার করে না। তারা বলে যে, সমস্ত কুরায়েশই যাবিল কুরবা।” (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিম ও অন্যান্য হাদীস গ্রন্থে রয়েছে) কোন কোন রিওয়াইয়াতে শুধু প্রথম বাক্যটিই রয়েছে। দ্বিতীয় বাক্যটির বর্ণনাকারী হচ্ছে আবু মাশার নাজীহ্ ইবনে আবদির রহমান মাদানী। তার বর্ণনাতেই এই বাক্যটি রয়েছে।
তারা বলে যে, সমস্ত কুরায়েশই যাবীল কুরবা'। এতে দুর্বলতাও রয়েছে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের জন্যে লোকদের ময়লা থেকে আমি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি। তোমাদের জন্যে এক পঞ্চমাংশের পঞ্চমাংশই যথেষ্ট।” (ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এটা বড়ই উত্তম হাদীস। এর বর্ণনাকারী ইবরাহীম ইবনে মাহদীকে ইমাম আবু হাতিম (রঃ) বিশ্বাসযোগ্য বলেছেন) এই আয়াতে ইয়াতীমদের উল্লেখ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, ইয়াতীমরা যদি দরিদ্র হয় তবে তারা হকদার হবে। আবার অন্য কেউ বলেন যে, ধনী দরিদ্র সব ইয়াতীমই এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত।
মিসকীন শব্দ দ্বারা ঐ অভাবীদেরকে বুঝানো হয়েছে যাদের কাছে এই পরিমাণ মাল নেই যে, তা দ্বারা তাদের দারিদ্রতা ও অভাব দূর হতে পারে এবং তা তাদের জন্যে যথেষ্ট হয়। ইবনুস সাবীল দ্বারা ঐ মুসাফিরকে বুঝানো হয়েছে যে দেশ থেকে বের হয়ে এতো দূরে যাচ্ছে যেখানে পৌছলে তার জন্যে নামায কসর করা জায়েয হবে এবং সফরের যথেষ্ট খরচ তার কাছে নেই। এর তাফসীর সূরায়ে বারাআতের। (আরবী) (৯:৬০) এই আয়াতে ইনশাআল্লাহ আসবে। আল্লাহ তা'আলার উপরই আমাদের ভরসা এবং তাঁরই কাছে আমরা সাহায্য প্রার্থনা করছি। (আরবী) অর্থাৎ হে মুমিনগণ! তোমরা যদি আল্লাহর উপর এবং তাঁর বান্দার প্রতি নাযিলকৃত কিতাবের উপর ঈমান এনে থাকো তবে তিনি যা আদেশ করেছেন তা পালন কর।
অর্থাৎ, যুদ্ধলব্ধ মাল হতে এক পঞ্চমাংশ পৃথক করে দাও। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আবদে কায়েস গোত্রের প্রতিনিধিদলকে বলেছিলেনঃ “আমি তোমাদেরকে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়নের নির্দেশ দিচ্ছি। আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার অর্থ কি তা কি তোমরা জান? তা হচ্ছে সাক্ষ্য দান করা যে, আল্লাহ ছাড়া কেউ উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ (সঃ) তাঁর রাসূল। আর নামায সুপ্রতিষ্ঠিত করা, যাকাত দেয়া এবং গনীমতের মাল থেকে এক পঞ্চমাংশ আদায় করা”। সুতরাং এক পঞ্চমাংশ আদায় করাও ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় কিতাব সহীহ বুখারীতে একটি বাব বা অনুচ্ছেদ বেঁধেছেন যে, ‘খুমুস বা এক পঞ্চমাংশ বের করা ঈমানের অন্তর্ভুক্ত।
অতঃপর তিনি ঐ হাদীস আনয়ন করেছেন। আমরা শারহে সহীহ বুখারীর মধ্যে এর পূর্ণ ভাবার্থ আলোচনা করেছি। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্যে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাঁর একটা ইহসান ও ইনআমের কথা বর্ণনা করছেন যে, তিনি হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য আনয়ন করেছেন। তিনি স্বীয় দ্বীনকে জয়যুক্ত করেছেন, স্বীয় নবী (সঃ) ও তার সেনাবাহিনীকে সাহায্য করেছেন এবং বদরের যুদ্ধে তাদেরকে জয়যুক্ত করেছেন। তিনি ঈমানের কালেমাকে কুফরীর কালেমার উপর উঠিয়ে দিয়েছেন অর্থাৎ কুফরীর কালেমা ঈমানের কালেমার নীচে পড়ে গেছে। সুতরাং (আরবী) দ্বারা বদরের দিনকে বুঝানো হয়েছে, যেই দিন হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য সূচিত হয়েছে।
বহু গুরুজন হতে এর তাফসীর এরূপই বর্ণিত হয়েছে। এটাই ছিল প্রথম যুদ্ধ। মুশরিক সেনাদলের নেতা ছিল উবা ইবনে রাবীআ'। ঐ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ১৭ই বা ১৯শে রমযান, রোজ শুক্রবার। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীবর্গের সংখ্যা ছিল তিন শ'র কিছু বেশী। আর মুশরিকদের সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় এক হাজার। এতদ্সত্ত্বেও আল্লাহ তা'আলা কাফিরদের পরাজয় ঘটিয়ে দেন। তাদের সত্তরজনেরও অধিক নিহত হয় এবং ততজনই বন্দী হয়।মুসতাদরিকে হাকিমে রয়েছে যে, ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “তোমরা একাদশ রাত্রিতেই লায়লাতুল কদরকে নিশ্চিতরূপে অনুসন্ধান কর। কেননা, ওর সকালই ছিল বদরের যুদ্ধের দিন।” হাসান ইবনে আলী (রাঃ) বলেন যে, লায়লাতুল ফুরকান, যেইদিন উভয় দলে ভীষণ ও ঘোরতর যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ওটা ছিল রমযান মাসের সতের তারিখ এবং রাত্রিটিও ছিল জুমআ’র রাত্রি।
ধর্মযুদ্ধ ও জীবনী গ্রন্থের লেখকদের মতে এটাই সঠিক কথা। তবে ইয়াযীদ ইবনে জাআ'দ (রঃ), যিনি তার যুগের মিশরীয় এলাকার একজন ইমাম ছিলেন, তিনি বলেন যে, বদর যুদ্ধের দিনটি ছিল সোমবার। কিন্তু অন্য কেউই তাঁর অনুসরণ করেননি এবং জমহুরের উক্তিটিই নিশ্চিতরূপে তার এই উক্তির উপর প্রাধান্য পাওয়ার যোগ্য। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারী।
আর জেনে রাখ, যুদ্ধে যা তোমরা গনীমত হিসেবে লাভ করেছ ,তার এক-পঞ্চামাংশ আল্লাহ্র [১] , রাসূলের, রাসূলের স্বজনদের, ইয়াতীমদের, মিসকীনদের এবং সফরকারীদের [২] যদি তোমারা ঈমান রাখ আল্লাহ্তে এবং তাতে যা মীমাংসার দিন আমারা আমাদের বান্দার প্রতি নাযিল করেছিলাম [৩], যে দিন দু দল পরস্পরের সম্মুখীন হয়েছিল।আর আল্লাহ্ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।
[১] এ আয়াতে গনীমতের বিধান ও তার বন্টননীতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অভিধানে গনীমত বলা হয় সে সমস্ত মাল-সামানকে যা শক্রর নিকট থেকে লাভ করা হয়। শরীআতের পরিভাষা অনুযায়ী অমুসলিমদের নিকট থেকে যুদ্ধ-বিগ্রহে বিজয়ার্জনের মাধ্যমে যে মালামাল অর্জিত হয়, তাকেই বলা হয় ‘গনীমতী’ [ফাতহুল কাদীর] আর যা কিছু আপোষ, সন্ধি-সম্মতির মাধ্যমে অর্জিত হয়, তাকে বলা হয় ’ফাই’। [ইবন কাসীর] কুরআনুল কারামে এতদুভয় শব্দের মাধ্যমে (অর্থাৎ ‘গনীমত’ ও ‘ফাই’) এতদুভয় প্রকার মালামালের হুকুম-আহকাম তথা বিধি-বিধান বর্ণনা করা হয়েছে সূরা আনফালের প্রথম আয়াতে এবং এ আয়াতে শুধুমাত্র গনীমতের মালামালের কথাই আলোচিত হয়েছে যা যুদ্ধকালে অমুসলিমদের কাছ থেকে লাভ হয়েছে। ‘ফাই’-এর আলোচনা সূরা হাশর-এ আসবে।
[২] এখানে জিহাদের পর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ গণীমতের হকদারদের বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে। সমস্ত সম্পদ পাঁচ ভাগে ভাগ করা হবে। এর চার ভাগ যোদ্ধাদের মধ্যে বন্টন করা হবে। আর বাকী এক পঞ্চমাংশ পাঁচভাগে ভাগ করা হবে। প্রথমভাগ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের। এ অংশ মুসলিমদের সাধারণ স্বার্থ সংরক্ষনে ব্যয় হবে। দ্বিতীয়ভাগ রাসূলের স্বজনদের জন্য নির্ধারিত। তারা হলেন ঐ সমস্ত লোক যাদের উপর সদকা খাওয়া হারাম। অর্থাৎ বনু হাশেম ও বনু মুত্তালিব। কারণ তাদের দেখাশুনার দায়িত্ব রাসূলের ছিল। তিনি তার নবুওয়াতের কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত থাকায় তাদের জন্য এ গণীমতের মাল থেকে দেয়া ছাড়া কোন উপায় নেই। তৃতীয়ভাগ ইয়াতিমদের জন্য
সুনির্দিষ্ট। চতুর্থভাগ ফকীর ও মিসকিনদের জন্য, আর পঞ্চম ভাগ মুসাফিরদের জন্য। [ইবন কাসীর] ইবন তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, পুরো এক পঞ্চমাংশই বর্তমানে ইমামের কর্তৃত্বে থাকবে। তিনি মুসলিমদের অবস্থা অনুযায়ী কল্যাণকর কাজে ব্যয় করবেন। [ইবন কাসীর] সুতরাং বুঝা যাচ্ছে যে, গণীমতের মাল যদিও পূর্বে সূরা আনফালের প্রথম আয়াতে শুধু আল্লাহ ও তার রাসূলের বলা হয়েছে তবুও তা মূলতঃ মুসলিমদের মধ্যেই পুনরায় বন্টন হয়ে গেছে। রাসূল তার জন্য তার জীবদ্দশায় যা কিছু পেতেন তাও বর্তমানে সাধারণ জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা হয়ে থাকে।
[৩] অর্থাৎ সে সাহায্য ও সহায়তা, যার বদৌলতে তোমরা জয়লাভ করেছ। [মুয়াসসার] এখানে মীমাংসার দিন বলে বদরের দিনকে বুঝানো হয়েছে। কারণ এ দিন তিনি হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য করেছেন, ঈমানের কালেমাকে কুফরীর কালেমার উপর বিজয়ী করেছেন এবং তার দ্বীন, তার নবী ও অনুসারীদেরকে উপরে উঠিয়েছেন। [ইবন কাসীর]
[সূরা আল-আনফাল (৮): আয়াত ৪১] পূর্ণ পৃষ্ঠা
অষ্টম খণ্ডপরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে।[সূরা আল-আনফালের তাফসীরের অবশিষ্টাংশ] [সূরা আল-আনফাল (৮): আয়াত ৪১]আর তোমরা জেনে রেখো যে, যুদ্ধে যা কিছু তোমরা গনীমত হিসেবে লাভ করো, তার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহর, তাঁর রাসূলের, তাঁর নিকটাত্মীয়দের, ইয়াতীমদের, মিসকীনদের এবং মুসাফিরদের জন্য; যদি তোমরা আল্লাহতে এবং সেই ফয়সালার দিনে যা আমি আমার বান্দার ওপর অবতীর্ণ করেছিলাম—যেদিন দুই দল পরস্পরের সম্মুখীন হয়েছিল—তাতে বিশ্বাসী হও। আর আল্লাহ সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান। (৪১)মহান আল্লাহর বাণী: (আর তোমরা জেনে রেখো যে, যুদ্ধে যা কিছু তোমরা গনীমত হিসেবে লাভ করো, তার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহর, তাঁর রাসূলের, তাঁর নিকটাত্মীয়দের, ইয়াতীমদের, মিসকীনদের এবং মুসাফিরদের জন্য; যদি তোমরা আল্লাহতে বিশ্বাসী হও)।
এতে ছাব্বিশটি (১) মাসআলা বা আলোচ্য বিষয় রয়েছে:প্রথমত: মহান আল্লাহর বাণী "আর তোমরা জেনে রেখো যে, যুদ্ধে যা কিছু তোমরা গনীমত হিসেবে লাভ করো"। আভিধানিক অর্থে 'গনীমত' (الْغَنِيمَةُ) হলো যা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী প্রচেষ্টার মাধ্যমে লাভ করে। যেমন একজন কবির উক্তি:আমি দিগন্তজুড়ে ভ্রমণ করেছি, পরিশেষে … ফিরে আসাকেই গনীমত (লাভ) হিসেবে মেনে নিয়ে সন্তুষ্ট হয়েছি।অন্য একজন কবি বলেছেন:গনীমতের দিনে যাকে গনীমত দেওয়া হয়, সে যেখানেই থাকুক তাকে দেওয়া হয়; … আর যে বঞ্চিত, সে তো বঞ্চিতই।'মাগনাম' (الْمَغْنَمُ) এবং 'গনীমত' (الْغَنِيمَةُ) একই অর্থবোধক।
বলা হয়: 'কওমটি গনীমত লাভ করেছে'। জেনে রাখা উচিত যে, এ ব্যাপারে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, মহান আল্লাহর বাণী "যা কিছু তোমরা গনীমত হিসেবে লাভ করো" এর উদ্দেশ্য হলো কাফেরদের ওই সম্পদ, যা মুসলমানরা বিজয় ও শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে অর্জন করে। ভাষা বা আভিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই বিশেষীকরণ (কেবল কাফেরদের সম্পদ হওয়া) অপরিহার্য নয়, যেমনটি আমরা ব্যাখ্যা করেছি (২); তবে শরীয়তের পরিভাষা এই শব্দটিকে এই বিশেষ ধরনের সম্পদের জন্যই নির্ধারিত করেছে। শরীয়ত কাফেরদের কাছ থেকে আমাদের হস্তগত হওয়া সম্পদকে দুটি নামে অভিহিত করেছে: 'গনীমত' এবং 'ফায়'।
সুতরাং মুসলমানরা তাদের শত্রুদের কাছ থেকে প্রচেষ্টা এবং অশ্ব ও উষ্ট্র চালনার (৩) মাধ্যমে যা অর্জন করে, তাকে 'গনীমত' বলা হয়। আর এই নামটির ব্যবহার এই (সম্পদের সাথে) অবিচ্ছেদ্য হয়ে গেছে—(১). লক্ষণীয় যে, মাসআলাগুলো প্রকৃতপক্ষে পঁচিশটি।(২). 'যা' পাণ্ডুলিপিতে রয়েছে: 'যেমনটি আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি'।(৩). 'ইজাফ' (الإيجاف) অর্থ দ্রুত গতিতে চলা; অর্থাৎ তারা এটি লাভের জন্য ঘোড়া বা উট চালনা করেনি বরং যুদ্ধ ব্যতিরেকেই তা অর্জিত হয়েছে। 'রিকাব' (الركاب) বলতে সেই উটসমূহকে বোঝায় যেগুলোতে চড়ে সফর করা হয়, এর স্বীয় শব্দ হতে কোনো একবচন রূপ নেই।
পূর্ণ পৃষ্ঠা পূর্ণ পৃষ্ঠা পূর্ণ পৃষ্ঠা
তিনি বললেন: তোমরা যা গ্রহণ করেছ তা ফিরিয়ে দাও এবং তা ন্যায় ও সমতার ভিত্তিতে বণ্টন করো, কারণ আল্লাহ তোমাদের সেই নির্দেশই দিচ্ছেন।তারা বললেন: আমরা তা সওয়াবের আশায় গ্রহণ করেছি এবং খেয়ে ফেলেছি। তিনি বললেন: তোমরা তা সওয়াবের নিরূপণেই গণ্য করো।ইবনে জারীর এবং ইবনে মারদুওয়াইহ আমর ইবনে শুআইব থেকে, তিনি তাঁর পিতা থেকে এবং তিনি তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, বদরের দিন লোকেরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল, তখন অবতীর্ণ হলো: "তারা আপনাকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে।"ইবনে মারদুওয়াইহ তাঁর পিতা ও দাদার সূত্রে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: "তারা আপনাকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে" আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘খুমুস’ (এক-পঞ্চমাংশ) ব্যতীত অতিরিক্ত আর কিছু প্রদান করেননি।
তবে খায়বারের দিন তিনি খুমুস থেকে নফল (অতিরিক্ত অংশ) দান করেছিলেন।ইবনে মারদুওয়াইহ হাবীব ইবনে মাসলামাহ আল-ফিহরি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুমুস বের করার পর এক-তৃতীয়াংশ অতিরিক্ত দান করতেন।ইবনে আবি শায়বাহ, আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনে জারীর, ইবনে মুনযির, ইবনে হিব্বান, আবুশ শাইখ, ইবনে মারদুওয়াইহ, হাকেম (যিনি একে সহিহ বলেছেন) এবং দালাইল গ্রন্থে বায়হাকী ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: যখন বদরের দিন এল, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "যে ব্যক্তি কোনো শত্রুকে হত্যা করবে, তার জন্য এই এই পুরস্কার; আর যে ব্যক্তি কাউকে বন্দী করবে, তার জন্য এই এই পুরস্কার।"অতঃপর বয়োজ্যেষ্ঠগণ পতাকার নিচে অটল থাকলেন, আর যুবকরা যুদ্ধ ও গণিমত সংগ্রহের জন্য দ্রুত অগ্রসর হলেন।
বয়োজ্যেষ্ঠরা যুবকদের বললেন: "তোমাদের সাথে আমাদেরও অংশীদার করো, কারণ আমরা তোমাদের সাহায্যকারী হিসেবে ছিলাম। যদি তোমাদের কোনো বিপদ হতো, তবে তোমরা আমাদের কাছেই আশ্রয় নিতে।" এরপর তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে বিবাদ নিয়ে গেলেন। তখন অবতীর্ণ হলো: "তারা আপনাকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুন, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য।" অতঃপর তিনি তাদের মধ্যে সমতার ভিত্তিতে গণিমত বণ্টন করে দিলেন।আবদুর রাজ্জাক তাঁর ‘মুসান্নাফ’ গ্রন্থে, আবদ ইবনে হুমাইদ এবং ইবনে মারদুওয়াইহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: যখন বদরের দিন এল, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করবে, তার জন্য অমুক পুরস্কার; আর যে ব্যক্তি কোনো বন্দীকে নিয়ে আসবে, তার জন্য অমুক পুরস্কার।"অতঃপর আবু আল-ইউসর ইবনে আমর আল-আনসারী দুইজন বন্দী নিয়ে উপস্থিত হলেন এবং বললেন: "হে আল্লাহর রাসূল!
আপনি আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।"তখন সাদ ইবনে উবাদাহ দাঁড়িয়ে বললেন: "হে আল্লাহর রাসূল! আপনি যদি এদের এভাবেই দিয়ে দেন, তবে আপনার অন্য সাথীদের জন্য কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। সওয়াবের প্রতি অনীহা কিংবা শত্রুর প্রতি ভীরুতা আমাদের এই কাজ হতে বিরত রাখেনি; বরং আমরা আপনার নিরাপত্তার খাতিরেই এই অবস্থানে দাঁড়িয়ে ছিলাম যাতে শত্রুরা আপনার পেছন দিক থেকে আক্রমণ করতে না পারে।" এরপর তাদের মধ্যে বাদানুবাদ হলো এবং কুরআনের এই আয়াত অবতীর্ণ হলো: "তারা আপনাকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে।" আর আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের অনুসারীগণ আয়াতটি এভাবে পড়তেন: "তারা আপনাকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে।
বলুন, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজেদের মধ্যকার বিবাদ মীমাংসা করো," অর্থাৎ যা নিয়ে তোমরা ঝগড়া করছিলে। অতঃপর তারা গণিমত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট সমর্পণ করলেন এবং কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হলো: "আর জেনে রেখো যে, তোমরা যা কিছু গণিমত হিসেবে লাভ করো, তার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহর জন্য..." (সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ৪১), আয়াতের শেষ পর্যন্ত।ইবনে মারদুওয়াইহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি ক্ষুদ্র বাহিনী প্রেরণ করলেন এবং অবস্থান করলেন।
লশকরে কিছু দুর্বল মানুষ অবস্থান করছিলেন। এমতাবস্থায় একটি সেনাদল যুদ্ধলব্ধ সম্পদ (গনিমত) লাভ করল। রাসূলুল্লাহ (সা.) সেই সম্পদ তাদের সকলের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন। তখন সেই সেনাদলের লোকেরা বলল: "এই দুর্বলরা কি আমাদের সাথে সমান ভাগ পাবে? অথচ তারা মূল বাহিনীতে অবস্থান করছিল কিন্তু আমাদের সাথে অভিযানে বের হয়নি।" তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: "তোমাদেরকে কি কেবল তোমাদের দুর্বলদের অসিলাতেই সাহায্য করা হয় না?" এরপর আল্লাহ তাআলা নাযিল করলেন: "তারা আপনাকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ (আনফাল) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে।"ইবনে মারদুওয়াইহ আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সা.) যখন বদর থেকে ফিরে মদীনায় আসলেন, তখন আল্লাহ তাঁর ওপর সূরা আল-আনফাল নাযিল করেন।
এতে বদরের গনিমত হালাল করা প্রসঙ্গে তাঁকে সম্বোধন করা হয়। কারণ রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবীদের অভাব এবং এই অতিরিক্ত সম্পদ বা নফল নিয়ে তাদের মধ্যকার মতপার্থক্যের কারণে তা বণ্টন করে দিয়েছিলেন। আল্লাহ বলেন: "তারা আপনাকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুন, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের নিজেদের মধ্যকার সম্পর্ক সংশোধন করে নাও এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো, যদি তোমরা মুমিন হও।" অতঃপর আল্লাহ তা রাসূলের ইখতিয়ারে ফিরিয়ে দিলেন এবং তিনি সবার মাঝে তা সমানভাবে বণ্টন করলেন।
এর মধ্যেই নিহিত ছিল আল্লাহর তাকওয়া, তাঁর ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য এবং পারস্পরিক সুসম্পর্ক।ইবনে জারীর মুজাহিদ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, সাহাবীগণ নবী (সা.)-কে চার-পঞ্চমাংশ বণ্টনের পর অবশিষ্ট এক-পঞ্চমাংশ (খুমুস) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তখন "তারা আপনাকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে" আয়াতটি নাযিল হয়।আবদ ইবনে হুমাইদ ইকরিমা থেকে বর্ণনা করেন যে, "তারা আপনাকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে" - এই আয়াতটি বদর যুদ্ধের দিনে নাযিল হয়েছিল।আন-নাহহাস তাঁর 'নাসিখ' গ্রন্থে সাঈদ ইবনে জুবায়ের থেকে বর্ণনা করেছেন যে,সা'দ এবং আনসারদের একজন ব্যক্তি অতিরিক্ত সম্পদের (নফল) খোঁজে বের হলেন।
তারা একটি পড়ে থাকা তরবারি দেখতে পেলেন এবং উভয়েই সেটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। সা'দ বললেন: "এটি আমার।"আনসারী ব্যক্তিটি বললেন: "এটি আমার।"সা'দ বললেন: "আমি এটি ছাড়ব না যতক্ষণ না রাসূলুল্লাহর (সা.) কাছে যাই।" তারা তাঁর কাছে এসে পুরো ঘটনা বর্ণনা করলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: "হে সা'দ! এটি তোমারও নয়, আবার ওই আনসারীরও নয়; বরং এটি আমার।" তখন নাযিল হলো: "তারা আপনাকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুন, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, নিজেদের মধ্যকার সম্পর্ক সংশোধন করো এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো।" অর্থাৎ, তরবারিটি রাসূলুল্লাহর কাছে সমর্পণ করো।
পরবর্তীতে এই আয়াতটি রহিত (মানসুখ) হয়ে যায় এবং নাযিল হয়: "আর জেনে রেখো যে, তোমরা যা কিছু গনিমত হিসেবে লাভ করো, তার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহর, রাসূলের, তাঁর নিকটাত্মীয়দের, এতিমদের, মিসকিনদের এবং মুসাফিরদের জন্য।" (সূরা আল-আনফাল, আয়াত ৪১)।মালিক, ইবনে আবি শায়বাহ, বুখারী, মুসলিম এবং আন-নাহহাস তাঁর 'নাসিখ' গ্রন্থে ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) নজদ অভিমুখে একটি ক্ষুদ্র বাহিনী প্রেরণ করেছিলেন। তারা প্রচুর উট গনিমত হিসেবে লাভ করেন। তাদের প্রত্যেকের ভাগে বারোটি করে উট পড়ে এবং অতিরিক্ত পুরস্কার হিসেবে প্রত্যেককে একটি করে উট প্রদান করা হয়।
ইবনে আসাকির মাকহুলের সূত্রে হাজ্জাজ ইবনে সুহাইল আন-নাসরি থেকে বর্ণনা করেছেন—বলা হয়ে থাকে যে তিনি সাহাবী ছিলেন—তিনি বলেন: যখন বদরের যুদ্ধের দিন এল, তখন মুসলমানদের একটি দল যুদ্ধে লিপ্ত হলো এবং অন্য একটি দল আল্লাহর রাসূলের নিকট অবস্থান করল। অতঃপর যে দলটি যুদ্ধ করেছিল তারা যুদ্ধের সরঞ্জাম ও যুদ্ধলব্ধ মালামাল নিয়ে এল এবং গনিমত তাদের মধ্যেই বণ্টন করা হলো, কিন্তু যারা যুদ্ধ করেনি সেই দলের জন্য কোনো অংশ বণ্টন করা হলো না।তখন যারা যুদ্ধ করেনি সেই দলটি বলল: আমাদের মাঝেও অংশ বণ্টন করুন।কিন্তু তারা (প্রথম দল) তা দিতে অস্বীকার করল এবং এ নিয়ে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হলো।
তখন আল্লাহ অবতীর্ণ করলেন: "তারা আপনাকে আনফাল (গনিমত) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুন, আনফাল হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজেদের মধ্যকার বিষয়গুলো সংশোধন করে নাও।" ফলে তাদের মধ্যকার সংশোধন ছিল এই যে, তারা যা গ্রহণ করেছিল তা ফিরিয়ে দিল এবং যা প্রদান করা হয়েছিল তা ফেরত নেওয়া হলো।ইবনে জারীর, ইবনুল মুনজির, ইবনে আবি হাতিম, ইবনে মারদুইয়াহ এবং বায়হাকী তাঁর 'সুনান' গ্রন্থে ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে আল্লাহর বাণী "তারা আপনাকে আনফাল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে; বলুন, আনফাল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের" এর ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেন: আনফাল হলো গনিমত। এটি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য বিশেষভাবে নির্ধারিত ছিল, এতে অন্য কারও কোনো অধিকার ছিল না। মুসলিম সেনাদল যা কিছু লাভ করত তা তাঁর নিকট নিয়ে আসত। যে ব্যক্তি তা থেকে একটি সুঁই বা একটি সুতাও গোপন করত, তা খেয়ানত হিসেবে গণ্য হতো।অতঃপর তারা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট প্রার্থনা করল যেন তিনি তাদের তা থেকে কিছু অংশ প্রদান করেন।তখন আল্লাহ অবতীর্ণ করলেন: "তারা আপনাকে আনফাল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে; বলুন, আনফাল"—অর্থাৎ এটি আমারই, যা আমি আমার রাসূলের জন্য নির্ধারণ করেছি, তোমাদের এতে কোনো অধিকার নেই—"সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজেদের মধ্যকার সম্পর্ক সংশোধন করো"—'যদি তোমরা মুমিন হও' পর্যন্ত।
এরপর আল্লাহ অবতীর্ণ করলেন: "আর জেনে রাখো যে, তোমরা যা কিছু গনিমত হিসেবে লাভ করো..." (সূরা আনফাল, আয়াত ৪১)।অতঃপর তিনি সেই পঞ্চমাংশ (খুমুস) আল্লাহর রাসূল, তাঁর নিকটাত্মীয়, এতিম, মিসকিন এবং আল্লাহর পথে হিজরতকারীদের জন্য বণ্টন করলেন এবং অবশিষ্ট চার-পঞ্চমাংশ মানুষের মধ্যে সমানভাবে নির্ধারণ করলেন।ঘোড়ার জন্য দুই অংশ, তার আরোহীর জন্য এক অংশ এবং পদাতিকের জন্য এক অংশ।আবু উবাইদ এবং ইবনুল মুনজির ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন, "তারা আপনাকে আনফাল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে" আয়াত প্রসঙ্গে তিনি বলেন: এটি হলো গনিমত।
পরবর্তীতে "আর জেনে রাখো যে, তোমরা যা কিছু গনিমত লাভ করো..." (সূরা আনফাল, আয়াত ৪১) আয়াতটি দ্বারা একে রহিত করা হয়েছে।ইমাম মালিক, ইবনে আবি শাইবাহ, আবু উবাইদ, আবদ ইবনে হুমাইদ, ইবনে জারীর, আন-নাহহাস, ইবনুল মুনজির, ইবনে আবি হাতিম, আবুশ শেখ এবং ইবনে মারদুইয়াহ কাসেম ইবনে মুহাম্মদ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমি একজন লোককে ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে আনফাল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে শুনেছি। তিনি বললেন, "ঘোড়া নফলের (অতিরিক্ত পুরস্কার) অন্তর্ভুক্ত এবং শত্রুর কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া সরঞ্জাম (সালাব) নফলের অন্তর্ভুক্ত।" লোকটি পুনরায় প্রশ্ন করলে ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) আবারও তাই বললেন।
এরপর লোকটি বলল, "আল্লাহ তাঁর কিতাবে যে আনফালের কথা বলেছেন তা কী?" সে অনবরত তাঁকে প্রশ্ন করতে লাগল যতক্ষণ না তাঁকে প্রায় বিব্রত করে তুলল। তখন ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন: এটি হলো—
