Al-Furqan
আল-ফুরকান: 51
মূল আরবি
وَلَوْ شِئْنَا لَبَعَثْنَا فِى كُلِّ قَرْيَةٍ نَّذِيرًا
English Translations
And if We had willed, We could have sent into every city a warner.
And had We willed, We would have raised a warner in every town.
Had We so willed, We would have sent a (separate) warner for every town, (but, according to Our wisdom, We have sent Muhammad as a prophet for all these towns)
Had We so willed, We would have raised up in every town a warner.
If We willed, We could raise up a warner in every village.
Had it been Our Will, We could have sent a warner to every centre of population.
বাংলা অনুবাদ
আমি ইচ্ছে করলে প্রত্যেক জনবসতিতে সতর্ককারী পাঠাতাম। (কিন্তু সারা বিশ্বের জন্য একজন নবী পাঠিয়ে সকলকে একই উম্মাত হওয়ার অনুগ্রহ লাভে ধন্য করেছি)।
আর আমি ইচ্ছা করলে প্রতিটি জনপদে একজন সতর্ককারী পাঠাতাম।
আমি ইচ্ছা করলে প্রতিটি জনপদের জন্য একজন সতর্ককারী প্রেরণ করতে পারতাম।
আর আমরা ইচ্ছে করলে প্রতিটি জনপদে একজন সতর্ককারী পাঠাতে পারতাম।
আমি ইচ্ছা করলে প্রতিটি জনপদে একজন সতর্ককারী প্রেরণ করতে পারতাম।
৫১. আমি যদি চাইতাম তাহলে প্রত্যেক এলাকায় একজন করে রাসূল পাঠাতাম। যিনি তাদেরকে আল্লাহর শাস্তির ভয়-ভীতি দেখাতেন। কিন্তু আমি তা চাইনি। বরং আমি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কেই সকল মানুষের নিকট রাসূল করে পাঠিয়েছি যাতে তারা একই নবীর উম্মত হয়ে ধন্য হতে পারে।
তাফসীর
৫১-৫৪ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি যদি ইচ্ছা করতাম তবে প্রতিটি জনপদে একজন ভয়-প্রদর্শক প্রেরণ করতে পারতাম যে জনগণকে মহামহিমান্বিত আল্লাহর দিকে আহ্বান করতো। কিন্তু হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আমি তোমাকে সারা যমীনবাসীর নিকট প্রেরণের সাথে বিশিষ্ট করেছি এবং তোমাকে আমি আদেশ করেছি যে, তুমি তাদের কাছে এই কুরআনের বাণী পৌছিয়ে দেবে। যেমন নবী (সঃ)-কে বলতে বলা হয়েছেঃ “যাতে আমি তোমাদেরকে এর দ্বারা ভয় প্রদর্শন করি।” আর এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “দলসমূহের মধ্যে যে এটাকে প্রত্যাখ্যান করবে তার প্রতিশ্রুত জায়গা হলো জাহান্নাম।” (১১:১৭) অন্য এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি বলে দাও- হে লোক সকল!
নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সকলের নিকট আল্লাহর রাসূলরূপে প্রেরিত হয়েছি।” (৭:১৫৮) সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি রক্তিম (বর্ণের লোক) এবং কৃষ্ণ (বর্ণের লোক)-এর নিকট প্রেরিত হয়েছি।” সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আরো বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অন্য নবীকে তার কওমের নিকট বিশিষ্টভাবে প্রেরণ করা হতো, কিন্তু আমি সাধারণভাবে সমস্ত মানুষের নিকট নবীরূপে প্রেরিত হয়েছি।” এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ সুতরাং তুমি কাফিরদের আনুগত্য করো না এবং তুমি ওর সাহায্যে অর্থাৎ কুরআনের সাহায্যে তাদের সাথে প্রবল সগ্রাম চালিয়ে যাও।
যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি কাফির ও মুনাফিকদের সাথে সংগ্রাম চালিয়ে যাও।” (৬৬:৯)।মহান আল্লাহ বলেনঃ তিনিই দুই সমুদ্রকে মিলিতভাবে প্রবাহিত করেছেন, একটি মিষ্ট, সুপেয় এবং অপরটি লবণাক্ত, খর। অর্থাৎ তিনি পানি দুই প্রকারের করে দিয়েছেন। একটি মিষ্ট ও অপরটি লবণাক্ত। নদী, প্রস্রবণ ও কূপের পানি সাধারণতঃ মিষ্ট, স্বচ্ছ এবং সুস্বাদু হয়ে থাকে। কতকগুলো স্থির সমুদ্রের পানি লবণাক্ত ও বিস্বাদ হয়ে থাকে। আল্লাহ তা'আলার এই নিয়ামতের জন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত যে, তিনি মিষ্ট পানি চতুর্দিকে প্রবাহিত করে দিয়েছেন যাতে লোকদের গোসল করা, সবকিছু ধৌত করা এবং ক্ষেতে ও বাগানে পৌঁছিয়ে দেয়া সহজসাধ্য হয়।
পূর্বে ও পশ্চিমে তিনি লবণাক্ত পানিবিশিষ্ট প্রশান্ত মহাসাগর প্রবাহিত করেছেন যা স্থির রয়েছে এবং এদিক ওদিকে প্রবাহিত হয় না। কিন্তু ওটা তরঙ্গায়িত হচ্ছে। কোন কোন সমুদ্রে জোয়ার ভাটা হয়ে থাকে। প্রতি মাসের প্রাথমিক দিনগুলোতে তাতে বর্ধন ও প্রবাহ থাকে। অতঃপর চন্দ্রের হ্রাস পাওয়ার সাথে সাথে ওটাও হ্রাস পায়। শেষ পর্যন্ত ওটা স্বীয় অবস্থায় এসে পড়ে। তারপর আবার চন্দ্র বৃদ্ধি পেতে থাকে, তখন ওটাও বৃদ্ধি পেতে শুরু করে এবং চৌদ্দ তারিখ পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে চাঁদের সাথে বাড়তেই থাকে। তারপর আবার কমতে শুরু করে। এই সমুদয় সমুদ্র আল্লাহ তা'আলাই সৃষ্টি করেছেন।
তিনি পূর্ণ ও ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী। লবণাক্ত ও গরম পানি পান কার্যে ব্যবহৃত হয় না বটে, কিন্তু ঐ পানি বায়ুকে নির্মল করে যার ফলে মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয় না। তাতে যে জন্তু মরে যায় ওর দুর্গন্ধে মানুষ কষ্ট পায় না। লবণাক্ত পানির কারণে ওর বাতাস স্বাস্থ্যের অনুকূল হয় এবং ওর স্বাদ পবিত্র ও উত্তম হয়। এজন্যেই যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “আমরা সমুদ্রের পানিতে অযু করতে পারি কি?” তখন তিনি উত্তর দেনঃ “সমুদ্রের পানি পবিত্র এবং ওর মৃত হালাল।” (ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম শাফেয়ী (রঃ) এবং আহলে সুনান এটা রিওয়াইয়াত করেছেন এবং এর ইসনাদও সঠিক ও উত্তম)আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তিনি উভয়ের মধ্যে অর্থাৎ মিষ্ট ও লবণাক্ত পানির মধ্যে রেখে দিয়েছেন এক অন্তরায়, এক অনতিক্রম্য ব্যবধান।
অর্থাৎ আল্লাহ পাকের অসীম ক্ষমতা যে, তিনি স্বীয় ক্ষমতাবলে মিষ্ট ও লবণাক্ত পানিকে পৃথক পৃথক রেখেছেন। না লবণাক্ত পানি মিষ্ট পানির সাথে মিশ্রিত হতে পারে, না মিষ্ট পানি লবণাক্ত পানির সাথে মিলিত হতে পারে। যেমন তিনি বলেছেনঃ(আরবি) অর্থাৎ “তিনি প্রবাহিত করেন দুই সমুদ্র যারা পরস্পর মিলিত হয়। কিন্তু তাদের মধ্যে রয়েছে এক অন্তরায় যা তারা অতিক্রম করতে পারে না। সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে?” (৫৫: ১৯-২১) আর এক আয়াতে রয়েছেঃ কে তিনি যিনি যমীনকে নিরাপদ স্থল বানিয়েছেন এবং তাতে স্থানে স্থানে সমুদ্র প্রবাহিত করে দিয়েছেন, পাহাড়-পর্বত স্থাপন করেছেন, আর দুই সমুদ্রের মাঝে রেখে দিয়েছেন এক অন্তরায়?
আল্লাহর সাথে অন্য কোন উপাস্য রয়েছে কি? প্রকৃত ব্যাপার এই যে, ঐ মুশরিকদের অধিকাংশ লোকই জ্ঞান রাখে না।”মহান আল্লাহর উক্তিঃ তিনিই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন পানি হতে, অতঃপর তিনি তার বংশগত ও বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপন করেছেন। অর্থাৎ তিনি মানুষকে দুর্বল শুক্র হতে সৃষ্টি করেছেন। তারপর তাকে ঠিকঠাক করেছেন এবং তাকে সুন্দরভাবে সৃষ্টি করে নর ও নারী বানিয়েছেন। কিছুদিন পরে বংশগত ও বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপন করেছেন। এ জন্যেই তিনি বলেনঃ তোমার প্রতিপালক সর্বশক্তিমান।
আর আমরা ইচ্ছে করলে প্রতিটি জনপদে একজন সতর্ককারী পাঠাতে পারতাম।
[সূরা আল-ফুরকান (২৫): আয়াত ৫১ থেকে ৫২] পূর্ণ পৃষ্ঠা
[সূরা আল-ফুরকান (২৫): আয়াত ৫১ থেকে ৫২]আমি ইচ্ছা করলে প্রত্যেক জনপদে একজন সতর্ককারী পাঠাতাম। (৫১) সুতরাং আপনি কাফিরদের আনুগত্য করবেন না এবং এর (কুরআনের) মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে মহা সংগ্রামে লিপ্ত হোন। (৫২)আল্লাহ তাআলার বাণী: (আমি ইচ্ছা করলে প্রত্যেক জনপদে একজন সতর্ককারী পাঠাতাম) অর্থাৎ এমন একজন রাসূল যিনি তাদের সতর্ক করবেন, যেমনটি আমি বৃষ্টি বণ্টন করেছি, যাতে নবুওয়তের গুরুভার আপনার ওপর হালকা হয়। কিন্তু আমি তা করিনি; বরং আপনাকে জগতের সকলের জন্য সতর্ককারী করেছি যাতে আপনার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। অতএব আপনার ওপর আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করুন।
(সুতরাং আপনি কাফিরদের আনুগত্য করবেন না) অর্থাৎ তারা আপনাকে তাদের উপাস্যদের অনুসরণের দিকে যে আহ্বান জানায়, তাতে আপনি কর্ণপাত করবেন না। (এবং এর মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করুন) ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন: কুরআনের মাধ্যমে। ইবনে জায়েদ বলেন: ইসলামের মাধ্যমে। কেউ কেউ বলেছেন: তরবারির মাধ্যমে; তবে এ মতটি দূরবর্তী মনে হয়, কারণ সূরাটি মক্কী এবং এটি যুদ্ধের নির্দেশ অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে নাজিল হয়েছে। (মহা সংগ্রাম) যাতে কোনো প্রকার শিথিলতা বা অবসাদ মিশে থাকবে না। [সূরা আল-ফুরকান (২৫): আয়াত ৫৩]আর তিনিই সেই সত্তা যিনি দুই সমুদ্রকে সমান্তরালে প্রবাহিত করেছেন, একটি মিষ্ট ও সুপেয় এবং অন্যটি লোনা ও বিস্বাদ।
আর তিনি উভয়ের মধ্যে এক অন্তরাল ও এক অনতিক্রম্য বাধা রেখে দিয়েছেন। (৫৩)আল্লাহ তাআলার বাণী: (আর তিনিই সেই সত্তা যিনি দুই সমুদ্রকে প্রবাহিত করেছেন) এখানে আলোচনা পুনরায় নিয়ামতসমূহ বর্ণনার দিকে ফিরে এসেছে। আর 'মারাজা' শব্দের অর্থ হলো ছেড়ে দেওয়া, মিশ্রিত করা এবং প্রবাহিত করা। মুজাহিদ (রহ.) বলেন: তিনি উভয়কে প্রবাহিত করেছেন এবং একটিকে অন্যটির ওপর ঢেলে দিয়েছেন। ইবনে আরাফাহ বলেন: 'দুই সমুদ্র প্রবাহিত করেছেন' অর্থাৎ তিনি উভয়কে মিশ্রিত করেছেন যাতে তারা একে অপরের সাথে মিলিত হয়। বলা হয়ে থাকে, 'মারাজতুহু' যখন আমি তাকে মিশ্রিত করি।
আর দ্বীন ও বিষয়ের ক্ষেত্রে 'মারাজা' অর্থ হলো বিশৃঙ্খল ও গোলযোগপূর্ণ হওয়া। এ থেকেই আল্লাহ তাআলার বাণী: "এক বিভ্রান্তিকর বিষয়ে"। এ থেকেই রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.)-কে বলেছিলেন: "যখন তুমি মানুষকে দেখবে যে তাদের অঙ্গীকারসমূহ বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছে এবং তাদের আমানতদারি হ্রাস পেয়েছে এবং তারা এমন ও এমন হয়ে গেছে"—এই বলে তিনি স্বীয় আঙ্গুলসমূহ একটির ভেতর অন্যটি প্রবেশ করালেন। তখন আমি তাঁকে বললাম: হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন, এমতাবস্থায় আমি কী করব? তিনি বললেন: "তুমি নিজের ঘরে অবস্থান করো, নিজের জিহ্বাকে সংযত রাখো, যা (ভালো হিসেবে) চেনো তা গ্রহণ করো এবং যা (মন্দ হিসেবে) জানো তা বর্জন করো।
আর তুমি নিজের ব্যক্তিগত বিষয়ে মনোনিবেশ করো এবং সাধারণ মানুষের বিষয় ত্যাগ করো।" এটি নাসায়ী, আবু দাউদ এবং অন্যান্যরা বর্ণনা করেছেন। আল-আযহারী বলেন: "দুই সমুদ্র প্রবাহিত করেছেন" অর্থ তিনি উভয়ের মধ্যবর্তী পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। যেমন বলা হয়: 'আমি পশুকে চরে খাওয়ার জন্য ছেড়ে দিয়েছি' (মারাজতুদ দাব্বাহ)। সা'লাব বলেন: 'আল-মারজু' অর্থ হলো প্রবাহিত করা; সুতরাং আল্লাহর বাণী "দুই সমুদ্র প্রবাহিত করেছেন" এর অর্থ হলো তিনি উভয়কে প্রবাহিত করেছেন। আল-আখফাশ বলেন: একদল লোক 'আমরাজা' শব্দটিও পাঠ করেন, যা 'মারাজা' শব্দের সমার্থক। (এটি মিষ্ট ও সুপেয়) অর্থাৎ অত্যন্ত সুস্বাদু মিষ্টি।(১).
হাদিসটি ফিতনা সংক্রান্ত অধ্যায়ে বর্ণিত।
