Ghafir

গাফির: 60

40:60
টেক্সট কপি
40 গাফির Ghafir · 85 আয়াত غافر

মূল আরবি

وَقَالَ رَبُّكُمُ ٱدْعُونِىٓ أَسْتَجِبْ لَكُمْ ۚ إِنَّ ٱلَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِى سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ

English Translations

Sahih International

And your Lord says, "Call upon Me; I will respond to you." Indeed, those who disdain My worship will enter Hell [rendered] contemptible.

Muhsin Khan

And your Lord said: "Invoke Me, [i.e. believe in My Oneness (Islamic Monotheism)] (and ask Me for anything) I will respond to your (invocation). Verily! Those who scorn My worship [i.e. do not invoke Me, and do not believe in My Oneness, (Islamic Monotheism)] they will surely enter Hell in humiliation!"

Taqi Usmani

Your Lord has said, “Call Me, I will respond to you. Definitely those who show arrogance against worshipping Me shall enter Jahannam (Hell) with disgrace.

Abul Ala Maududi

Your Lord said: “Pray to Me, and I will accept your prayers. Surely those who wax too proud to worship Me shall enter Hell, utterly abased.”

Pickthall

And your Lord hath said: Pray unto Me and I will hear your prayer. Lo! those who scorn My service, they will enter hell, disgraced.

Yusuf Ali

And your Lord says: "Call on Me; I will answer your (Prayer): but those who are too arrogant to serve Me will surely find themselves in Hell - in humiliation!"

বাংলা অনুবাদ

তাইসিরুল কুরআন

তোমার প্রতিপালক বলেন- তোমরা আমাকে ডাকো, আমি (তোমাদের ডাকে) সাড়া দেব। যারা অহংকারবশতঃ আমার ‘ইবাদাত করে না, নিশ্চিতই তারা লাঞ্ছিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে।

রাওয়াই আল-বায়ান

আর তোমাদের রব বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের জন্য সাড়া দেব। নিশ্চয় যারা অহঙ্কার বশতঃ আমার ইবাদাত থেকে বিমুখ থাকে, তারা অচিরেই লাঞ্ছিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে।’

শাইখ মুজিবুর রহমান

তোমাদের রাব্ব বললেনঃ তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব। কিন্তু যারা অহংকারে আমার ইবাদাতে বিমুখ তারা অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত হয়ে।

ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

আর তোমাদের রব বলেছেন, 'তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। নিশ্চয় যারা অহংকারবশে আমার 'ইবাদাত থেকে বিমুখ থাকে, তারা অচিরেই জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত হয়ে।'

ফাতহুল মাজীদ

তোমাদের প্রতিপালক বলেন : তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। যারা অহংকারে আমার ইবাদত হতে বিমুখ, তারা অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত অবস্থায়।

মুখতাসার

৬০. আর তোমাদের প্রতিপালক বলেছেন: হে লোক সকল! তোমরা আমাকে ইবাদাতে ও আহ্বানে একক বলে মান্য করো। আমি তোমাদের দু‘আ কবুল করবো, পাপরাশি ক্ষমা করবো এবং তোমাদেরকে দয়া করবো। যারা ইবাদাতে আমাকে একক সাব্যস্ত করতে বড়ত্ব প্রদর্শন করে অচিরেই তারা অপমান ও অপদস্ত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।

তাফসীর

তাফসীর ইবনে কাসীর

আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলার এই অনুগ্রহ ও দয়ার উপর আমাদের জীবনকে উৎসর্গ করা উচিত যে, তিনি আমাদেরকে তাঁর নিকট প্রার্থনা করার জন্যে হিদায়াত করছেন এবং তা কবূল করার ওয়াদা করছেন! হযরত সুফিয়ান সাওরী (রঃ) বলতেন:“হে ঐ সত্তা, যাঁর কাছে ঐ বান্দা খুবই প্রিয়পাত্র হয় যে তার কাছে খুব বেশী প্রার্থনা করে এবং ঐ বান্দা খুবই মন্দ ও অপ্রিয় হয় যে তার কাছে প্রার্থনা করে না। হে আমার প্রতিপালক! এই গুণ তো একমাত্র আপনার মধ্যেই রয়েছে। কবি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহর মাহাত্ম্য এই যে, যদি তুমি তার কাছে চাওয়া পরিত্যাগ কর তবে তিনি অসন্তুষ্ট হন, পক্ষান্তরে আদম সন্তানের কাছে যখন চাওয়া হয় তখন সে অসন্তুষ্ট হয়।”হযরত কা'বুল আহ্বার (রাঃ) বলেন, উম্মতে মুহাম্মাদ (সঃ)-কে এমন তিনটি জিনিস দেয়া হয়েছে যা পূর্ববর্তী কোন উম্মতকে দেয়া হয়নি।

আল্লাহ তা'আলা যখন কোন নবী (আঃ)-কে পাঠাতেন তখন তাকে বলতেনঃ “তুমি তোমার উম্মতের উপর সাক্ষী থাকলে।” আর তোমাদেরকে (উম্মতে মুহাম্মাদী সঃ-কে) তিনি সমস্ত লোকের উপর সাক্ষী করেছেন। পূর্ববর্তী প্রত্যেক নবী (আঃ)-কে বলা হতোঃ “দ্বীনের ব্যাপারে তোমার উপর কোন বাধ্য-বাধকতা নেই। পক্ষান্তরে এই উম্মতকে বলা হয়েছেঃ “তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোন বাধ্যবাধকতা নেই।” পূর্ববর্তী প্রত্যেক নবী (আঃ)-কে বলা হতোঃ “তুমি আমাকে ডাকো, আমি তোমার ডাকে সাড়া দিবো।” আর এই উম্মতকে বলা হয়েছেঃ “তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবো।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) নবী (সঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁকে বলেনঃ “চারটি স্বভাব রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে একটি আমার জন্যে, একটি তোমার জন্যে, একটি আমার ও তোমার মাঝে এবং একটি তোমার ও অন্যান্য বান্দাদের মাঝে।

যা আমার জন্যে তা এই যে আমারই ইবাদত করবে এবং আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করবে না। তোমার হক আমার উপর এই যে, আমি তোমাকে তোমার প্রতিটি ভাল কাজের পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবো। যা তোমার ও আমার মাঝে তা এই যে, তুমি আমার কাছে প্রার্থনা করবে এবং আমি তোমার প্রার্থনা কবুল করবো। আর যা তোমার এবং আমার অন্যান্য বান্দাদের মাঝে তা এই যে, তুমি তাদের জন্যে ওটাই পছন্দ করবে যা তুমি নিজের জন্যে পছন্দ কর।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু ইয়ালা (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দু'আ হলো ইবাদত।” অতঃপর তিনি ...

(আরবী)-এই আয়াতটি পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সুনানের মধ্যে এ হাদীসটি রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন। ইবনে হিব্বান (রঃ) এবং হাকিমও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি মহামহিমান্বিত আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে না তিনি তার প্রতি রাগান্বিত হন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত মুহাম্মাদ ইবনে মুসাল্লামা আনসারীর (রাঃ) মৃত্যুর পর তাঁর তরবারীর কোষ হতে এক টুকরা কাগজ বের হয়। তাতে লিখিত ছিলঃ “তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের রহমত লাভের সুযোগ অন্বেষণ করতে থাকো।

খুব সম্ভব যে, তোমরা কল্যাণের দু'আ করবে, আর ঐ সময় আল্লাহর রহমত উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠবে এবং তোমরা এমন সৌভাগ্য লাভ করবে যার পরে আর কখনো তোমাদেরকে দুঃখ ও আফসোস করতে হবে না।” (এটা হাফিয আবু মুহাম্মদ হাসান ইবনে আবদির রহমান রামহারামযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এ আয়াতে ইবাদত দ্বারা দু'আ ও তাওহীদকে বুঝানো হয়েছে।হযরত আমর ইবনে শুআয়েব (রাঃ) তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন অহংকারী লোকদেরকে পিঁপড়ার আকারে একত্রিত করা হবে। ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতম জিনিসও তাদের উপর থাকবে। তাদেরকে কূলাস নামক জাহান্নামের জেলখানায় নিক্ষেপ করা হবে।

প্রজ্বলিত অগ্নি তাদের মাথার উপর থাকবে। তাদেরকে জাহান্নামীদের রক্ত, পুঁজ এবং প্রস্রাব-পায়খানা খেতে দেয়া হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)অহীব ইবনুল অরদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তাঁকে একজন বুযুর্গ ব্যক্তি বলেছেন, রোমে আমি কাফিরদের হাতে বন্দী হয়েছিলাম। একদা আমি শুনতে পেলাম যে, এক অদৃশ্য আহ্বানকারী পর্বতের চূড়া হতে উচ্চস্বরে আহ্বান করে বলছেঃ “হে আমার প্রতিপালক! ঐ ব্যক্তির জন্যে বিস্মিত হতে হয় যে আপনাকে চেনা জানা সত্ত্বেও অন্যের সাথে তার আশা-আকাঙ্ক্ষার সম্পর্ক রাখতে চায়। হে আমার প্রতিপালক!

ঐ ব্যক্তির জন্যে বিস্ময়বোধ হয় যে আপনার পরিচয় লাভ করা সত্ত্বেও নিজের প্রয়োজন পুরো করবার জন্যে অন্যের কাছে গমন করে!” এরপর কিছুক্ষণ থেমে থেকে আরো উচ্চস্বরে বললোঃ “আরো বেশী বিস্মিত হতে হয় ঐ ব্যক্তির জন্যে যে মহান আল্লাহর পরিচয় জানা সত্ত্বেও অন্যের সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে এমন কাজ করে যে কাজে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন।” একথা শুনে আমি উচ্চস্বরে ডাক দিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করলামঃ তুমি কি দানব, না মানব? সে উত্তরে বললোঃ “মানব!” তারপর বললোঃ “ঐ সব কাজ হতে তুমি তোমার ধ্যান সরিয়ে নাও যাতে তোমার কোন উপকার নেই এবং যে কাজে তোমার উপকার আছে সেই কাজে মগ্ন হয়ে পড়।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া

আর তোমাদের রব বলেছেন, 'তোমরা আমাকে ডাক [১], আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। নিশ্চয় যারা অহংকারবশে আমার 'ইবাদাত থেকে বিমুখ থাকে, তারা অচিরেই জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত হয়ে [২]।'

[১] ‘দোআ’র শাব্দিক অর্থ ডাকা, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিশেষ কোন প্রয়োজনে ডাকার অর্থে ব্যবহৃত হয়। কখনও যিকরকেও দোআ বলা হয়। যেমন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আরাফাতে আমার দো'আ ও পূর্ববর্তী সকল নবী-রাসূলগণের দোআ এই কলেমা:

لٰا إِلَهَ إِلَّااللّٰهُ وَحْلَهُ لٰا شَرِيْكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمدُ وَهُوَ عَلٰى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ

এতে যিকরকে দোআ বলা হয়েছে। কারণ, দো'আ দু' প্রকারঃ ১. প্রার্থনা বা কিছু পেতে দোআ করা ও ইবাদাতের মাধ্যমে দো'আ করা। চাওয়া বা প্রার্থনার দো'আ হল - আল্লাহর কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ চাওয়া। এতে চাওয়া আছে, যাচঞা আছে। পক্ষান্তরে ইবাদাতের দো’আর মধ্যে চাওয়া নেই। শুধু নৈকট্য লাভের জন্য যা যা করা হয় তাই এ প্রকারের ইবাদত। নৈকট্য লাভের সকল প্রকাশ্য-অপ্ৰকাশ্য কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে; কেননা যে আল্লাহর ইবাদাত করে, সে স্বীয় কথা ও অবস্থার ভাষায় তার রবের কাছে উক্ত ইবাদাত কবুল করার এবং এর উপর সাওয়াব দেয়ার আবেদন করে থাকে। পবিত্র কুরআনে দো’আর যত নির্দেশ এসেছে, আর আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে দো'আ করা থেকে যত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে এবং দো'আকারীদের যত প্রশংসা করা হয়েছে, সে সবই প্রার্থনার দো'আ ও ইবাদাতের দো’আকে শামিল করে থাকে। যেমন, আল্লাহ বলেন,

فَادْعُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ

“সুতরাং আল্লাহকে ডাক তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে”। [সূরা গাফিরঃ ১৪] আরও বলেন,

وَأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا

“আর মসজিদসমূহ আল্লাহরই জন্য। সুতরাং আল্লাহর সাথে তোমরা অন্য কাউকে ডেকো না”। [সূরা আল-জ্বিনঃ ১৮] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার এক বাণীতে বলেছেন, ‘দো’আই ইবাদত। তারপর তিনি এ আয়াত পাঠ করলেন। [আবু দাউদ: ১৪৭৯, তিরমিযি: ২৯৬৯, ইবন মাজাহ: ৩৮২৮] অর্থাৎ প্রত্যেক দো'আই ইবাদত এবং প্রত্যেক ইবাদতই দো'আ। কারণ এই যে, ইবাদত বলা হয় কারও সামনে চুড়ান্ত দীনতা অবলম্বন করাকে। বলাবাহুল্য, নিজেকে কারও মুখাপেক্ষী মনে করে তার সামনে সওয়ালের হস্ত প্রসারিত করা বড় দীনতা, যা ইবাদতের অর্থ। এমনিভাবে প্রত্যেক ইবাদতের সারমর্মও আল্লাহর কাছে মাগফেরাত ও জান্নাত তলব করা এবং দুনিয়া ও আখেরাতের নিরাপত্তা প্রার্থনা করা।

আলোচ্য আয়াতেও “দো’আ” ও “ইবাদত” শব্দ দু'টিকে সমার্থক শব্দ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। কেননা, প্রথম বাক্যাংশে যে জিনিসকে দোআ শব্দ দ্বারা প্ৰকাশ করা হয়েছে দ্বিতীয় বাক্যাংশে সে জিনিসকেই ইবাদাত শব্দ দ্বারা প্ৰকাশ করা হয়েছে। এ দ্বারা একথা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, দো’আই ইবাদাত আর ইবাদতই দো'আ। ঠিক এ বিষয়টিকে আমরা পবিত্র কুরআনের অন্য আয়াতে লক্ষ্য করতে পারি। সেখানে আল্লাহ বলেনঃ

وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّن يَدْعُو مِن دُونِ اللَّهِ مَن لَّا يَسْتَجِيبُ لَهُ إِلَىٰ يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَهُمْ عَن دُعَائِهِمْ غَافِلُونَ *وَإِذَا حُشِرَ النَّاسُ كَانُوا لَهُمْ أَعْدَاءً وَكَانُوا بِعِبَادَتِهِمْ كَافِرِينَ

“সে ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক বিভ্রান্ত কে, যে আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুকে আহবান করে যা ক্বিয়ামত দিবস পর্যন্তও তার আহবানে সাড়া দিবে না? আর অবস্থা তো এরকম যে, এসব কিছু তাদের আহবান সম্পর্কে অবহিতও নয়। যখন (কিয়ামতের দিন) মানুষদেরকে একত্রিত করা হবে, তখন সে সকল কিছু হবে তাদের শত্রু এবং সেগুলো তাদের ইবাদাত অস্বীকার করবে”। [সূরা আল-আহকাফঃ ৫-৬]

[২] উম্মতে মুহাম্মদীয়ার বিশেষ সম্মানের কারণে এই আয়াতে তাদেরকে দো'আ করার আদেশ করা হয়েছে এবং তা কবুল করারও ওয়াদা করা হয়েছে। আর যারা দো'আ করে না, তাদের জন্যে শাস্তিবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে। আলোচ্য আয়াতে দো'আ অর্থ যদি ইবাদতের দো'আ বোঝানো হয় তবে দো'আ বর্জনকারী অবশ্যই গুনাহগার এমনকি কাফেরও হবে। আর সে হিসেবেই ইবাদত বর্জনকারীকে জাহান্নামের শাস্তিবাণী শোনানো হয়েছে। আর যদি দো'আ' বলে “চাওয়া’ বা “যাচঞা করা” উদ্দেশ্য হয় তখন দোআ না করলে জাহান্নামের শাস্তিবাণী ঐ সময়ই শুধু হবে যখন সে অহংকারবশত: তা বর্জন করে। কেননা, অহংকারবশত: দো'আ বর্জন করা কুফরের লক্ষণ, তাই সে জাহান্নামের যোগ্য হয়ে যায়।

নতুবা সাধারণ দো'আ ফরয বা ওয়াজিব নয়। দোআ না করলে গোনাহ হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহর কাছে দো'আ অপেক্ষা অধিক সম্মানিত কোন বিষয় নেই। তিরমিযি: ৩৩৭০] অন্য এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে তার প্রয়োজন প্রার্থনা করে না, আল্লাহ তার প্রতি রুষ্ট হন। [তিরমিযি:৩৩৭৩]

উপরোক্ত আয়াতে ওয়াদা রয়েছে যে বান্দা আল্লাহর কাছে যে দো'আ করে, তা কবুল হয়। কিন্তু মানুষ মাঝে মাঝে দো'আ কবুল না হওয়াও প্রত্যক্ষ করে। এর জওয়াব দুটি। এক. দো'আ কবুল হওয়ার উপায় তিনটি। তন্মধ্যে কোন না কোন উপায়ে দো'আ কবুল হয়। (এক) যা চাওয়া হয়, তাই পাওয়া (দুই) প্রার্থিত বিষয়ের পরিবর্তে আখেরাতের কোন সওয়াব ও পুরস্কার দান করা এবং (তিন) প্রার্থিত বিষয় না পাওয়া। কিন্তু কোন সম্ভাব্য আপদ-বিপদ সরে যাওয়া। সুতরাং এর যে কোন একটি হলেই দোআ কবুল হয়েছে ধরে নিতে হবে। দুই. নির্ভরযোগ্য হাদীসমূহে কোন বিষয়কে দো'আ কবুলের পথে বাধা বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

এসব বিষয় থেকে বেঁচে থাকা জরুরী। এক. হারাম খাবার ও হারাম পরিধেয় পরিধান; হাদীসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, কোন কোন লোক খুব সফর করে এবং আকাশের দিকে হাত তুলে ইয়া রব, ইয়া রব, বলে দো'আ করে; কিন্তু তাদের পানাহার ও পোশাক-পরিচ্ছেদ হারাম পস্থায় অর্জিত। এমতাবস্থায় তাদের দো'আ কিরূপে কবুল হবে? [মুসলিম: ১০১৫] দুই. অসাবধান বেপরোয়া ও অন্যমনস্কভাবে দো'আর বাক্যাবলী উচ্চারণ করলে তাও কবুল হয় না বলেও হাদীসে বর্ণিত আছে। [তিরমিযি: ৩৪৭৯] তিন. অন্যায় কোন দো'আ যেন না হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, মুসলিম আল্লাহর কাছে যে দো”আই করে, আল্লাহ তা দান করেন, যদি তা কোন গোনাহ অথবা সম্পর্কচ্ছেদের দোআ না হয়।

[মুসলিম: ২৭৩৫]

তাফসীর আল-কুরতুবী

[সূরা গাফির (৪০): আয়াত ৬০ থেকে ৬৫] পূর্ণ পৃষ্ঠা

মহান আল্লাহর বাণী: "নিশ্চয় কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী"; এখানে (লা-আতিয়াহ শব্দের) 'লাম' অক্ষরটি তাকিদ বা দৃঢ়তা জ্ঞাপক, যা 'ইন্না' এর খবরের সাথে যুক্ত হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী এটি বাক্যের শুরুতে থাকার কথা ছিল, কারণ এটি পুরো বাক্যকে তাকিদ প্রদান করে; কিন্তু একে তার মূল স্থান থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে (যাহলাকা)। সিবওয়াইহি এমনই বলেছেন। আপনি যেমন বলে থাকেন: "নিশ্চয় ওমর অবশ্যই বহির্গত"। এটিকে তার মূল স্থান থেকে বিলম্বিত করা হয়েছে যেন 'লাম' এবং 'ইন্না' একত্রে মিলিত না হয়; কারণ উভয়েই একই অর্থ (দৃঢ়তা) প্রকাশ করে। একইভাবে বসরার ব্যাকরণবিদদের মতে 'ইন্না' এবং 'আন্না' কে একত্রে যুক্ত করা হয় না।

হিশাম বৈধ বলেছেন— "নিশ্চয় যে যায়েদ প্রস্থানকারী তা সত্য" বলা। তবে যদি 'হাক্কুন' (সত্য) শব্দটি বিলুপ্ত করা হয়, তবে আমার জানামতে কোনো ব্যাকরণবিদের নিকটই তা বৈধ নয়। নাহহাস এটি উল্লেখ করেছেন। "তাতে কোনো সন্দেহ নেই"— অর্থাৎ এতে কোনো সংশয় বা দ্বিধা নেই। "কিন্তু অধিকাংশ মানুষ ঈমান আনে না"— অর্থাৎ তারা একে সত্য বলে স্বীকার করে না। আর তখনই অনুগত এবং অবাধ্যদের মধ্যকার পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠবে। ‌‌[সূরা গাফির (৪০): আয়াত ৬০ থেকে ৬৫]তোমাদের পালনকর্তা বলেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। যারা অহংকারবশত আমার ইবাদত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তারা অচিরেই লাঞ্ছিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে (৬০)।

আল্লাহ-ই সেই সত্তা যিনি তোমাদের জন্য রাত সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা তাতে প্রশান্তি লাভ করো এবং দিনকে করেছেন আলোকময়। নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের প্রতি পরম দয়ালু, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না (৬১)। তিনিই আল্লাহ, তোমাদের পালনকর্তা, সবকিছুর স্রষ্টা। তিনি ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই। অতএব তোমরা কোথায় বিভ্রান্ত হচ্ছ? (৬২)। এভাবেই বিভ্রান্ত হয় তারা, যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করত (৬৩)। আল্লাহ-ই সেই সত্তা যিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীকে বসবাসের স্থান এবং আকাশকে ছাদ বানিয়েছেন, এবং তিনি তোমাদের আকৃতি দান করেছেন—অতঃপর তোমাদের আকৃতি অতি সুন্দর করেছেন—এবং তোমাদেরকে পবিত্র বস্তুসমূহ থেকে জীবিকা দান করেছেন।

তিনিই আল্লাহ, তোমাদের পালনকর্তা। সুতরাং বিশ্বজগতের পালনকর্তা আল্লাহ অতি বরকতময় (৬৪)।তিনিই চিরঞ্জীব, তিনি ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই। অতএব তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে তাঁকে ডাকো। সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজগতের পালনকর্তা আল্লাহর জন্য (৬৫)।মহান আল্লাহর বাণী: "তোমাদের পালনকর্তা বলেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব"— এই আয়াতের ব্যাখ্যায় নুমান ইবনে বশীর (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: "দুয়াই হলো ইবাদত।" এরপর তিনি তিলাওয়াত করলেন: "তোমাদের পালনকর্তা বলেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।

যারা অহংকারবশত আমার ইবাদত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তারা অচিরেই লাঞ্ছিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে।" আবু ঈসা (ইমাম তিরমিযী) বলেন: এই হাদীসটি হাসান সহীহ। এটি প্রমাণ করে যে, দুয়াই হলো ইবাদত। অধিকাংশ মুফাসসিরও অনুরূপ বলেছেন।

তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর

পূর্ণ পৃষ্ঠা পূর্ণ পৃষ্ঠা পূর্ণ পৃষ্ঠা

...কিবলা। অতঃপর যখন আমরা সফর থেকে ফিরে এলাম, তখন আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি নীরব রইলেন, অতঃপর আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন: পূর্ব ও পশ্চিম আল্লাহরই আয়াতের শেষ পর্যন্ত।সাঈদ ইবনে মানসুর এবং ইবনুল মুনযির আতা রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন যে, একদল লোকের কাছে কিবলার দিক অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ফলে তাদের প্রত্যেকে এক এক দিকে মুখ করে সালাত আদায় করল। এরপর তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বিষয়টি বর্ণনা করলেন। তখন আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন: অতএব তোমরা যেদিকেই মুখ ফেরাও না কেন, সেদিকেই আল্লাহর অভিমুখ রয়েছে

ইবনে মারদুইয়াহ একটি দুর্বল সনদে ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি সেনাদল পাঠিয়েছিলেন। পথিমধ্যে তারা কুয়াশার কবলে পড়ে এবং কিবলার দিক নির্ণয় করতে পারেনি। ফলে তারা কিবলা ছাড়া অন্য দিকে সালাত আদায় করল। সূর্য উদিত হওয়ার পর তাদের কাছে স্পষ্ট হলো যে, তারা ভুল দিকে সালাত আদায় করেছে। তারা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ফিরে এসে ঘটনাটি জানাল, তখন আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন: পূর্ব ও পশ্চিম আল্লাহরই আয়াতের শেষ পর্যন্ত।ইবনে জারীর ও ইবনুল মুনযির কাতাদাহ রহ.

থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "তোমাদের এক ভাই ইন্তেকাল করেছেন—অর্থাৎ নাজাশী—কাজেই তোমরা তাঁর জানাযা আদায় করো।"তারা বলল: "আমরা কি এমন এক ব্যক্তির জানাযা পড়ব যে মুসলিম নয়?" তখন আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন: আর আহলে কিতাবদের মধ্যে অবশ্যই এমন লোক আছে যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে... (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৯৯)তারা বলল: "সে তো কিবলার দিকে মুখ করে সালাত আদায় করত না।" তখন আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন: পূর্ব ও পশ্চিম আল্লাহরই আয়াতের শেষ পর্যন্ত।ইবনে জারীর এবং ইবনুল মুনযির মুজাহিদ রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: যখন অবতীর্ণ হলো— তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব (সূরা গাফির, আয়াত: ৬০), তখন তারা জিজ্ঞাসা করল: "কোন দিকে ফিরে ডাকব?" তখন অবতীর্ণ হলো— অতএব তোমরা যেদিকেই মুখ ফেরাও না কেন, সেদিকেই আল্লাহর অভিমুখ রয়েছে।ইবনে আবি হাতিম ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে অতএব তোমরা যেদিকেই মুখ ফেরাও না কেন, সেদিকেই আল্লাহর অভিমুখ রয়েছে আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন: "পূর্ব বা পশ্চিম যেদিকেই মুখ করো না কেন, সেটিই আল্লাহর নির্ধারিত কিবলা।"ইবনে আবি শায়বাহ, আবদ ইবনে হুমাইদ, তিরমিযী এবং বায়হাকী তাঁর 'সুনান'-এ মুজাহিদ রহ.

থেকে সেদিকেই আল্লাহর অভিমুখ রয়েছে আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: "তা হলো আল্লাহর কিবলা; সুতরাং তোমরা পূর্ব বা পশ্চিম যেখানেই থাকো না কেন, সেদিকেই মুখ করো।"আবদ ইবনে হুমাইদ এবং তিরমিযী কাতাদাহ রহ. থেকে এই আয়াত সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: "এটি মানসুখ বা রহিত হয়ে গেছে; আল্লাহ তাআলার এই বাণী দ্বারা তা রহিত হয়েছে— সুতরাং তোমার চেহারা মাসজিদুল হারামের দিকে ফেরাও (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৪৯), অর্থাৎ তার অভিমুখে।"ইবনে আবি শায়বাহ, তিরমিযী (যিনি একে সহীহ বলেছেন) এবং ইবনে মাজাহ আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যবর্তী অংশই কিবলা।"ইবনে আবি শায়বাহ, দারা কুতনী এবং বায়হাকী ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা থেকেঅনুরূপ বর্ণনা করেছেন।

আহমদ, আবু ইয়ালা, ইবনে হিব্বান, আল-হাকিম, আবু নুয়াইম 'আল-হিলয়া' গ্রন্থে, আল-বায়হাকী 'শুআবুল ঈমান'-এ এবং আল-দিয়া 'আল-মুখতারা' গ্রন্থে আনাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: "যদি কোনো মুসলিম ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করে এবং তার নিকটতম প্রতিবেশী চার ঘরের অধিবাসী তার সম্পর্কে এই সাক্ষ্য প্রদান করে যে তারা তার মধ্যে কল্যাণ ব্যতীত আর কিছুই জানে না, তবে আল্লাহ বলেন: আমি তার সম্পর্কে তোমাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করলাম এবং তার সম্পর্কে যা তোমরা জানো না তা আমি ক্ষমা করে দিলাম।"ইবনে আবী শায়বা, হান্নাদ, ইবনে জারীর এবং আত-তাবারানী সালামাহ ইবনুল আকওয়া (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পাশ দিয়ে জনৈক আনসারী ব্যক্তির জানাজা নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল এবং সেটির ভূয়সী প্রশংসা করা হলো।

তখন তিনি বললেন: "ওয়াজিব হয়ে গেল।"অতঃপর তাঁর পাশ দিয়ে আরেকটি জানাজা নিয়ে যাওয়া হলো এবং সেটির প্রশংসা আগের চেয়ে কিছুটা কম করা হলো। তিনি বললেন: "ওয়াজিব হয়ে গেল।"তখন জিজ্ঞেস করা হলো: হে আল্লাহর রাসূল! কী ওয়াজিব হলো? তিনি বললেন: "ফেরেশতারা আসমানে আল্লাহর সাক্ষী এবং তোমরা জমিনে আল্লাহর সাক্ষী।"আল-খতীব তাঁর 'তারীখ' গ্রন্থে আনাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: "যদি কোনো মুসলিম ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করে এবং তার নিকটতম প্রতিবেশীদের মধ্য থেকে দুইজন ব্যক্তি এই সাক্ষ্য দেয় যে—হে আল্লাহ!

আমরা তার সম্পর্কে কল্যাণ ব্যতীত আর কিছু জানি না—তবে আল্লাহ ফেরেশতাদের বলেন: তোমরা সাক্ষী থাকো যে আমি তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করেছি এবং তারা যা জানে না তা আমি ক্ষমা করে দিয়েছি।"আল-ফিরইয়াবী, সাঈদ ইবনে মানসুর, আবদ ইবনে হুমাইদ এবং ইবনে আবী হাতিম কাব (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: এই উম্মতকে তিনটি এমন বৈশিষ্ট্য দান করা হয়েছে যা ইতিপূর্বে কেবল নবীদের দান করা হতো। জনৈক নবীকে বলা হতো: "প্রচার করো এবং তোমার কোনো সংকীর্ণতা নেই", "তুমি তোমার কওমের ওপর সাক্ষী" এবং "প্রার্থনা করো, আমি তোমার ডাকে সাড়া দেব।"আর এই উম্মতকে বলা হয়েছে: "তিনি দীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা রাখেননি" (সূরা হজ, আয়াত ৭৮); এবং তিনি বলেছেন: "যাতে তোমরা মানবজাতির ওপর সাক্ষী হতে পারো" (সূরা হজ, আয়াত ৭৮); এবং তিনি বলেছেন: "তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব" (সূরা গাফির, আয়াত ৬০)।ইবনে জারীর যায়দ ইবনে আসলাম (রহ.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, কিয়ামতের দিন পূর্ববর্তী জাতিসমূহ বলবে: আল্লাহর কসম!

আল্লাহ এই উম্মতকে যা দান করেছেন তা দেখে মনে হচ্ছে তারা যেন সকলেই নবী হয়ে যেতেন।ইবনে মুবারক 'আয-যুহদ' গ্রন্থে এবং ইবনে জারীর হিব্বান ইবনে আবী জাবালাহ (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি তা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছেন (মারফু সূত্রে), তিনি বলেন: যখন কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাঁর বান্দাদের একত্রিত করবেন, তখন সর্বপ্রথম ইসরাফীলকে ডাকা হবে। তখন তাঁর রব তাকে বলবেন: "তুমি আমার আমানতের বিষয়ে কী করেছ? তুমি কি আমার পয়গাম পৌঁছে দিয়েছ?" তিনি বলবেন: "হ্যাঁ হে রব! আমি তা জিবরাঈলের কাছে পৌঁছে দিয়েছি।"অতঃপর জিবরাঈলকে ডাকা হবে এবং জিজ্ঞেস করা হবে: "ইসরাফীল কি তোমার কাছে আমার পয়গাম পৌঁছে দিয়েছে?" তিনি বলবেন: "হ্যাঁ।"তখন ইসরাফীলকে অব্যাহতি দেওয়া হবে এবং জিবরাঈলকে বলা হবে: "তুমি কি আমার পয়গাম পৌঁছে দিয়েছ?" তিনি বলবেন: "হ্যাঁ, আমি রাসূলদের কাছে তা পৌঁছে দিয়েছি।" তখন রাসূলদের ডাকা হবে এবং তাদের জিজ্ঞেস করা হবে: "জিবরাঈল কি তোমাদের কাছে আমার পয়গাম পৌঁছে দিয়েছে?" তারা বলবেন: "হ্যাঁ।"তখন জিবরাঈলকে অব্যাহতি দেওয়া হবে।

অতঃপর রাসূলদের বলা হবে: "তোমরা কি আমার পয়গাম পৌঁছে দিয়েছ?" তারা বলবেন: "হ্যাঁ, আমরা তা জাতিসমূহের কাছে পৌঁছে দিয়েছি।" অতঃপর জাতিসমূহকে ডাকা হবে...

যে ব্যক্তি রমজান মাসে মাদকদ্রব্য পান করবে, আল্লাহ তাআলা তার এক বছরের আমল নিষ্ফল করে দেবেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তোমরা রমজান মাসকে ভয় করো, কারণ এটি আল্লাহর মাস। তিনি তোমাদের জন্য এগারোটি মাস নির্ধারণ করেছেন যাতে তোমরা আহার ও পান করে তৃপ্ত হতে পারো, আর রমজান মাস হলো আল্লাহর মাস, সুতরাং এতে তোমরা নিজেদের (পাপ থেকে) রক্ষা করো।আসবাহানী আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: আমার উম্মত ততক্ষণ পর্যন্ত লাঞ্ছিত হবে না যতক্ষণ তারা রমজান মাসের মর্যাদা রক্ষা করবে।

তখন আনসারদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলেন: রমজান মাস অবজ্ঞা করার কারণে তাদের লাঞ্ছনা কী হবে? তিনি বললেন: আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজসমূহে লিপ্ত হওয়া।যে ব্যক্তি কোনো মন্দ কাজ করবে অথবা ব্যভিচার করবে কিংবা চুরি করবে, তার রমজানের রোজা কবুল করা হবে না এবং পরবর্তী বছরের সমকাল পর্যন্ত তার ওপর মহান রব ও ফেরেশতাদের অভিশাপ বর্ষিত হতে থাকবে। সে যদি পরবর্তী রমজান আসার আগেই মারা যায়, তবে তার জন্য জাহান্নামের সুসংবাদ। সুতরাং তোমরা রমজান মাসকে ভয় করো, কারণ এতে যেমন নেক আমলের সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়, তেমনি গুনাহের মাত্রাও বেড়ে যায়।আসবাহানী আলী (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: রমজানের প্রথম রাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে আল্লাহর প্রশংসা করলেন এবং বললেন: হে লোকসকল!

আল্লাহ তোমাদের জিন শত্রুদের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করেছেন এবং তোমাদের দোয়া কবুল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব’ (সূরা গাফির, আয়াত: ৬০)। জেনে রেখো, আল্লাহ প্রত্যেক অবাধ্য শয়তানের ওপর সাতজন করে ফেরেশতা নিয়োজিত করেছেন, ফলে রমজান মাস শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা মুক্ত হতে পারে না। জেনে রেখো, রমজানের প্রথম রাত থেকে শেষ রাত পর্যন্ত আসমানের দরজাসমূহ উন্মুক্ত থাকে। জেনে রেখো, এই মাসে দোয়া কবুল করা হয়। এমনকি যখন শেষ দশকের প্রথম রাত আসত, তখন তিনি কোমর বেঁধে ইবাদতের প্রস্তুতি নিতেন, ঘর থেকে বের হয়ে ইতিকাফ করতেন এবং সারা রাত জেগে ইবাদত করতেন।জিজ্ঞাসা করা হলো: কোমর বেঁধে প্রস্তুতির অর্থ কী?

তিনি বললেন: এই দিনগুলোতে তিনি স্ত্রীদের সান্নিধ্য বর্জন করতেন।বায়হাকী ‘শুআবুল ঈমান’-এ ইসহাক ইবনে আবু ইসহাক থেকে বর্ণনা করেছেন।আবু হুরায়রা (রা.) কাবকে বললেন: তোমাদের কিতাবে রমজান সম্পর্কে কী পাও? তিনি বললেন: আমরা একে পাপ মোচনের মাস হিসেবে পাই।আহমাদ, বাজ্জার, ইবনে খুযাইমাহ, ইবনে হিব্বান, ইবনে মারদুওয়াইহ এবং বায়হাকী আমর ইবনে মুররাহ আল-জুহানি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: কুযাআ গোত্রের এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বললেন: আমি যদি সাক্ষ্য দিই যে আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসূল, আর আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করি, রমজানের রোজা রাখি ও রাতে কিয়াম করি এবং জাকাত প্রদান করি—তবে আমি কাদের অন্তর্ভুক্ত হব?

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন: যে ব্যক্তি এই অবস্থার ওপর মৃত্যুবরণ করবে, সে কেয়ামতের দিন নবীগণ, সিদ্দিকীন এবং শহীদদের সাথে এইভাবে থাকবে—এই বলে তিনি নিজের দুটি আঙুল খাড়া করে দেখালেন—যতক্ষণ না সে তার পিতা-মাতার অবাধ্য হয়।বায়হাকী আলী (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন।রমজান মাস উপস্থিত হলে তিনি খুতবা দিতেন এবং বলতেন: এটি সেই বরকতময় মাস যার রোজা পালনকে আল্লাহ ফরজ করেছেন, কিন্তু এর রাতের কিয়ামকে (নামাজ) ফরজ করেননি। কোনো ব্যক্তি যেন এমনটি না বলে যে—অমুক রোজা রাখলে আমিও রাখব এবং সে রোজা না রাখলে আমিও রাখব না। জেনে রেখো, রোজা কেবল পানাহার বর্জনের নাম নয়।