At-Tawbah
আত-তাওবা: 79
9 আত-তাওবা At-Tawbah · 129 আয়াত التوبة
মূল আরবি
ٱلَّذِينَ يَلْمِزُونَ ٱلْمُطَّوِّعِينَ مِنَ ٱلْمُؤْمِنِينَ فِى ٱلصَّدَقَـٰتِ وَٱلَّذِينَ لَا يَجِدُونَ إِلَّا جُهْدَهُمْ فَيَسْخَرُونَ مِنْهُمْ ۙ سَخِرَ ٱللَّهُ مِنْهُمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
English Translations
Those who criticize the contributors among the believers concerning [their] charities and [criticize] the ones who find nothing [to spend] except their effort, so they ridicule them - Allāh will ridicule them, and they will have a painful punishment.
Those who defame such of the believers who give charity (in Allah's Cause) voluntarily, and those who could not find to give charity (in Allah's Cause) except what is available to them, so they mock at them (believers), Allah will throw back their mockery on them, and they shall have a painful torment.
(Among the hypocrites, there are) those who taunt the believers who voluntarily give alms and have nothing but their hard earnings; still they mock at such people. Allah mocks at them, and for them there is a painful punishment.
[9:79] He also knows (the rich that are niggardly) who taunt the believers that voluntarily give alms, they scoff at those who have nothing to give except what they earn through their hard toil. Allah scoffs at them in return. A grievous chastisement awaits them.
Those who point at such of the believers as give the alms willingly and such as can find naught to give but their endeavours, and deride them - Allah (Himself) derideth them. Theirs will be a painful doom.
Those who slander such of the believers as give themselves freely to (deeds of) charity, as well as such as can find nothing to give except the fruits of their labour,- and throw ridicule on them,- Allah will throw back their ridicule on them: and they shall have a grievous penalty.
বাংলা অনুবাদ
মু’মিনদের মধ্যে যারা মুক্ত হস্তে দান করে, তাদেরকে যারা দোষারোপ করে আর সীমাহীন কষ্টে দানকারীদেরকে যারা বিদ্রূপ করে আল্লাহ তাদেরকে জবাবে বিদ্রূপ করেন আর তাদের জন্য রয়েছে ভয়াবহ শাস্তি।
যারা দোষারোপ করে সদাকার ব্যাপারে মুমিনদের মধ্য থেকে স্বেচ্ছাদানকারীদেরকে এবং তাদেরকে যারা তাদের পরিশ্রম ছাড়া কিছুই পায় না। অতঃপর তারা তাদেরকে নিয়ে উপহাস করে, আল্লাহও তাদেরকে নিয়ে উপহাস করেন এবং তাদের জন্যই রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব।
স্বতঃপ্রবৃদ্ধ হয়ে সাদাকাহ প্রদানকারী মু’মিন এবং যারা নিজ পরিশ্রম থেকে দেয়া ছাড়া অন্য কিছু দিতে পারেনা তাদের প্রতি যারা দোষারোপ করে/উপহাস করে, আল্লাহ তাদেরকে এই উপহাসের প্রতিফল দিবেন এবং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
মুমিনদের মধ্যে যারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সদকা দেয় এবং যারা নিজ শ্রম ছাড়া কিছুই পায় না, তাদেরকে যারা দোষারোপ করে। অতঃপর তারা তাদের নিয়ে উপহাস করে, আল্লাহ্ তাদেরকে নিয়ে উপহাস করেন; আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
মু’মিনদের মধ্যে যারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সদকাহ দেয় এবং যারা নিজ শ্রম ব্যতিরেকে কিছুই পায় না তাদেরকে যারা দোষারোপ করে ও বিদ্রƒপ করে; আল্লাহ তাদের বিদ্রƒপ করেন এবং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
৭৯. যারা মু’মিনদের মধ্যকার স্বেচ্ছামূলক দানকারীদেরকে সামান্য দানের জন্য দোষারোপ করে। মু’মিনদের মধ্যে এমন স্বেচ্ছামূলক দানকারী আছে যাদের দান স্বল্প। অথচ তা তাদের সাধ্যানুযায়ী সর্বোচ্চ। যারা ওদেরকে নিয়ে ঠাট্টা করে বলে: তোমাদের এ সাদাকা কী উপকারে আসবে?! আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদেরকে নিয়ে ঠাট্টা করার দরুন তাদের ঠাট্টার প্রতিশোধ নিবেন। আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
তাফসীর
এটাও মুনাফিকদের একটি বদ অভ্যাস যে, তাদের মুখের ভাষা থেকে দাতা বা কৃপণ কেউই বাঁচতে পারে না। এই দোষযুক্ত ও কর্কশভাষী লোকগুলো খুবই নিকৃষ্ট শ্রেণীর লোক। যদি কোন ব্যক্তি একটা মোটা অংকের অর্থ আল্লাহর পথে দান করে তবে এরা তাকে রিয়াকার বলতে থাকে। আর কেউ যদি সামান্য মাল নিয়ে আসে তবে তারা বলে যে, এই ব্যক্তির দানের আল্লাহ মুখাপেক্ষী নন। যখন সাদকা দেয়ার আয়াত অবতীর্ণ হয় তখন সাহাবীগণ নিজ নিজ সাদকা নিয়ে হাযির হয়ে যান। এক ব্যক্তি প্রাণ খুলে খুব বড় অংকের সাদকা দেন। তখন ঐ মুনাফিকরা তার উপাধি দেয় রিয়াকার। অতঃপর একজন দরিদ্র লোক শুধুমাত্র এক সা’ (ঐ সময় আরবে দু’প্রকার সা’-এর প্রচলন ছিল।
একটি হিজাযী সা’, যার ওজন ছিল পাকা দু’সের এগারো ছটাক। আর একটি ছিল ইরাকী সা', যার ওজন ছিল পাকা তিন সের ছয় ছটাক) শস্য নিয়ে আসেন। তা দেখে মুনাফিকরা বলে যে, তার এটুকু জিনিসের আল্লাহ তা'আলার কি প্রয়োজন ছিল। এরই বর্ণনা এই আয়াতে রয়েছে।একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) বাকী’তে বলেনঃ “যে ব্যক্তি সাদকা প্রদান করবে, আমি কিয়ামতের দিন তার ব্যাপারে সাক্ষ্য প্রদান করবো।” ঐ সময় একজন সাহাবী নিজের পাগড়ীর মধ্য থেকে কিছু দিতে চাইলেন। কিন্তু পরক্ষণেই তিনি তা বেঁধে নিলেন । ইত্যবসরে একজন অত্যন্ত কালো বর্ণের বেঁটে লোক একটি উন্ত্রী নিয়ে আসলেন, যার চেয়ে উত্তম উস্ত্রী সারা বাকীতে ছিল না ।
এসে তিনি বলতে লাগলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা আমি আল্লাহর নামে খয়রাত করলাম।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “বেশ, বেশ, খুব ভালো।” লোকটি বললেনঃ “নেন, এটা গ্রহণ করুন!” তখন একটি লোক বললোঃ “উষ্ট্ৰীটি তো এর চেয়ে উত্তম।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) এটা শুনতে পেয়ে বলেনঃ “তুমি মিথ্যা বলছো। সে বরং তোমার চেয়ে এবং উজ্জ্বীটির চেয়ে বহুগুণে উত্তম।” অতঃপর তিনি বললেনঃ “তোমার মত শত শত উটের মালিকের জন্যে আফসোস!” এ কথা তিনি তিনবার বললেন। তারপর বললেনঃ “শুধুমাত্র ঐ ব্যক্তি দায়িত্বমুক্ত যে তার মাল দ্বারা এরূপ এরূপ করে (অর্থাৎ দান-খয়রাত করে)।”এ কথা বলার সময় তিনি অঞ্জলি ভরে ভরে নিজের হাত দ্বারা ডানে ও বামে ইশারা করেন।
অর্থাৎ আল্লাহর পথে প্রত্যেক ভাল কাজে খরচ করে। অতঃপর তিনি বলেনঃ “ঐ ব্যক্তি সফলকাম হয়েছে যে অল্প মালের অধিকারী এবং অধিক ইবাদতকারী।” এ কথা তিনি তিনবার বলেন।এ আয়াতের ব্যাপারে আলী ইবনে আবি তালহা (রাঃ) ইবনে আব্বাস (রাঃ)। হতে বর্ণনা করেছেন যে, আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) চল্লিশ ঊকিয়া (উকিয়ার ওজন হচ্ছে এক তোলা সাত মাশা) সোনা নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন এবং একজন (দরিদ্র) আনসারী এক সা’ খাদ্য নিয়ে আসেন। তখন কোন কোন মুনাফিক বলেঃ “আল্লাহর শপথ! আব্দুর রহমান (রাঃ) যা এনেছে তা রিয়া (লোক-দেখাননা) ছাড়া কিছুই নয়।” আর ঐ আনসারী সম্পর্কে তারা বলেঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সাঃ) এই সা’-এর মুখাপেক্ষী নন।” ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) জন-সম্মুখে বের হয়ে ঘোষণা করেনঃ “তোমরা তোমাদের সাদকাগুলো জমা কর।” তখন জনগণ তাদের সাদকাগুলো জমা করেন।
সর্বশেষ একটি লোক এক সা' খেজুর নিয়ে হাযির হন এবং বলেন- “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! রাত্রে বোঝা বহন করার বিনিময়ে আমি দু'সা' খেজুর লাভ করেছিলাম। এক সা' আমার সন্তানদের জন্যে রেখে বাকী এক সা’ আপনার কাছে নিয়ে এসেছি।” রাসুলুল্লাহ (সঃ) তখন তাঁর ঐ মালকে জমাকৃত মালের মধ্যে ঢেলে দিতে বললেন। মুনাফিকরা তখন বলাবলি করতে লাগলো যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এই এক সা' খেজুরের মুখাপেক্ষী নন। অতঃপর আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বললেনঃ “সাদকা দানকারীদের আর কেউ অবশিষ্ট আছে। কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “তুমি ছাড়া আর কেউ অবশিষ্ট নেই।” তখন আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) বললেনঃ, “আমার কাছে একশ’ উকিয়া সোনা রয়েছে, সবগুলো আমি সাদকা করে দিলাম।” উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) তখন তাকে বললেনঃ “তুমি কি পাগল?” তখন তিনি উত্তরে বললেনঃ “আমার মধ্যে পাগলামি নেই।
আমি যা করলাম সজ্ঞানেই করলাম।” উমার (রাঃ) বললেনঃ “তুমি যা করলে তা চিন্তা করে দেখেছো কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “হ্যা শুনুন! আমার মাল রয়েছে আট হাজার। চার হাজার আমি আল্লাহ তা'আলাকে ঋণ দিচ্ছি এবং বাকী চার হাজার নিজের জন্য রাখছি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তুমি যা রাখলে এবং যা দান করলে তাতে আল্লাহ বরকত দান করুন!” মুনাফিকরা তখন বলতে লাগলোঃ “আল্লাহর কসম! আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) যা দান করলেন তা রিয়া ছাড়া কিছুই নয়।” আল্লাহ তা'আলা আয়াত নাযিল করে বড় ও ছোট দানকারীদের সত্যবাদিতা এবং মুনাফিকদের কষ্টদায়ক কথা প্রকাশ করে দিলেন।
বানু আজলান গোত্রের আসিম ইবনে আদী (রাঃ) নামক একটি লোকও মোটা অংকের দান করেছিলেন। তিনি দান করেছিলেন একশ’ অসক খেজুর । মুনাফিকরা তাঁকে রিয়াকার বলেছিল। আবূ আকীল (রাঃ) নিজের পারিশ্রমিক ও মজুরীর অংশ হতে সামান্য দান করেছিলেন। তিনি ছিলেন বানু আনীফ গোত্রের লোক । তিনি এক সা’ পরিমাণ জিনিস দান করলে মুনাফিকরা তাকে উপহাস ও নিন্দা করে। অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুজাহিদদের একটি দলকে যুদ্ধে প্রেরণ করার উদ্দেশ্যে এই চাঁদা আদায় করেছিলেন। তাতে রয়েছে যে, আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) দু'হাজার দিয়েছিলেন এবং দু'হাজাররেখেছিলেন।
অন্য একজন দরিদ্র লোক সারা রাত্রির পরিশ্রমের বিনিময়ে দু’সা’ খেজুর লাভ করেছিলেন। এক সা' নিজের জন্যে রেখে বাকী এক সা' তিনি দান করেন। এ লোকটির নাম ছিল আবু আকীল (রাঃ)। সারারাত ধরে তিনি নিজের পিঠের উপর বোঝা বহন করেছিলেন। কেউ কেউ বলেন যে, তাঁর নাম ছিল হাবাব (রাঃ), আর একটি উক্তি আছে যে, তাঁর নাম ছিল আব্দুর রহমান ইবনে সা'লাবা (রাঃ)।ঐ মনাফিকদের এই উপহাসের শাস্তিস্বরূপ আল্লাহ তাআলা তাদের থেকে এই প্রতিশোধই গ্রহণ করলেন। পরকালে তাদের জন্যে রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। কেননা আমলের শাস্তি তো আমল অনুযায়ীই হয়ে থাকে।
মুমিনদের মধ্যে যারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সদকা দেয় এবং যারা নিজ শ্রম ছাড়া কিছুই পায় না, তাদেরকে যারা দোষারোপ করে [১]। অতঃপর তারা তাদের নিয়ে উপহাস করে, আল্লাহ্ তাদেরকে নিয়ে উপহাস করেন [২]; আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
[১] আবু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, যখন সদকার নির্দেশ দেয়া হলো, তখন আমরা পরস্পর অর্থের বিনিময়ে বহন করতাম। তখন আবু আকীল অর্ধ সা নিয়ে আসল। অন্য একজন আরও একটু বেশী আনল। তখন মুনাফিকরা বলতে লাগল, আল্লাহ এর সদকা থেকে অবশ্যই অমুখাপেক্ষী, আর দ্বিতীয় লোকটিও দেখানোর জন্যই এটা করেছে। তখন এ আয়াত নাযিল হয়। [বুখারী ৪৬৬৮]
[২] আল্লাহ্ তা'আলা কর্তৃক কাফের মুনাফিকদের উপহাসের বিপরীতে উপহাস করা কোন খারাপ গুণ নয়। তাই তাদের উপহাসের বিপরীতে আল্লাহর পক্ষ থেকে উপহাস হতে পারে। [সিফাতুল্লাহিল ওয়ারিদা ফিল কিতাবি ওয়াস সুন্নাতি] এ উপহাস সম্পর্কে কোন কোন মুফাসসির বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা মুমিনদের পক্ষ নিয়ে কাফের ও মুনাফিকদেরকে অপমানিত ও লাঞ্ছিত করবেন। তাদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন। এভাবেই তিনি তাদের সাথে উপহাস করবেন। কোন কোন মুফাসসির বলেন, এখানে তাদের উপর বদদোআ করা হয়েছে যে, যেভাবে তারা মুমিনদের সাথে উপহাস করেছে আল্লাহও তাদের সাথে সেভাবে উপহাস করুন। [ফাতহুল কাদীর]
[সূরা আত-তাওবাহ (৯): আয়াত ৭৯] পূর্ণ পৃষ্ঠা
সে রূপ? আমরা বললাম: না। তিনি বললেন: (তোমাদের কোনো ভয় নেই, তোমরা তা থেকে মুক্ত। আর আমার কথা ‘যখন সে প্রতিশ্রুতি দেয়, তা ভঙ্গ করে’—এটি সেই বিষয়ে যা আল্লাহ আমার ওপর অবতীর্ণ করেছেন: (আর তাদের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছিল যে, তিনি যদি আমাদের তাঁর অনুগ্রহ থেকে দান করেন...) -পরবর্তী তিনটি আয়াত পর্যন্ত- (তোমরা কি তেমন?) আমরা বললাম: না, আল্লাহর শপথ! যদি আমরা আল্লাহর সাথে কোনো বিষয়ে অঙ্গীকার করি, তবে অবশ্যই তা পূর্ণ করব। তিনি বললেন: (তোমাদের কোনো ভয় নেই, তোমরা তা থেকে মুক্ত। আর আমার কথা ‘যখন তার কাছে আমানত রাখা হয়, সে খেয়ানত করে’—এটি সেই বিষয়ে যা আল্লাহ আমার ওপর অবতীর্ণ করেছেন: "নিশ্চয় আমি আকাশমন্ডলী, পৃথিবী ও পর্বতমালার ওপর আমানত পেশ করেছিলাম" «১» [আল-আহজাব: ৭২]-পুরো আয়াত- (সুতরাং প্রত্যেক মানুষ তার দ্বীনের ব্যাপারে আমানতদার।
মুমিন ব্যক্তি গোপনে ও প্রকাশ্যে জানাবত (নাপাকি) থেকে গোসল করে, [আর মুনাফিক তা কেবল প্রকাশ্যে করে থাকে]। তোমরা কি তেমন?) আমরা বললাম: না। তিনি বললেন: (তোমাদের কোনো ভয় নেই, তোমরা তা থেকে মুক্ত)। এবং অনেক তাবিঈ ও ইমাম এই অভিমত গ্রহণ করেছেন। একদল আলেম বলেছেন: এটি সেই ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যার ওপর এই স্বভাবগুলো প্রাধান্য বিস্তার করে। ইমাম বুখারী এবং অন্যান্য জ্ঞানীদের মাযহাব থেকে এটিই স্পষ্ট হয় যে, এই নিন্দনীয় গুণাবলি দ্বারা যে ব্যক্তি বৈশিষ্ট্যমন্ডিত হবে, সে কিয়ামত পর্যন্ত মুনাফিক হিসেবে গণ্য হবে। ইবনুল আরাবি বলেন: আমার অভিমত হলো, যদি তার ওপর পাপসমূহ প্রাধান্য লাভ করে তবুও সে কারণে সে কাফির হবে না, যতক্ষণ না তা বিশ্বাসের (আকিদার) ওপর প্রভাব ফেলে।
আমাদের উলামাগণ বলেন: ইউসুফ আলাইহিস সালামের ভাইয়েরা তাঁদের পিতার সাথে অঙ্গীকার করেছিলেন কিন্তু তা ভঙ্গ করেছিলেন, তাঁর সাথে কথা বলেছিলেন কিন্তু মিথ্যা বলেছিলেন, এবং তিনি তাঁদের কাছে ইউসুফকে আমানত রেখেছিলেন কিন্তু তাঁরা খেয়ানত করেছিলেন—অথচ তাঁরা মুনাফিক ছিলেন না। আতা বিন আবি রাবাহ বলেন: ইউসুফের ভাইয়েরা এই কাজগুলো করেছিলেন অথচ তাঁরা মুনাফিক ছিলেন না বরং তাঁরা নবী ছিলেন «২»। হাসান ইবনে আবুল হাসান আল-বসরী বলেন: নিফাক দুই প্রকার; মিথ্যার নিফাক এবং কর্মের নিফাক। মিথ্যার নিফাক তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে ছিল, আর কর্মের নিফাক কিয়ামত পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে থাকবে।
বুখারী হুযায়ফা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নিফাক ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে; আর বর্তমানে এটি হলো ঈমানের পর কুফরী। মহান আল্লাহর বাণী: (তারা কি জানে না যে, আল্লাহ তাদের গোপন বিষয় এবং তাদের শলাপরামর্শ সম্পর্কে পরিজ্ঞাত?)—এটি একটি তিরস্কার; আর তিনি যখন সব জানেন, তখন অবশ্যই তিনি তাদের প্রতিফল দেবেন। [সূরা আত-তাওবাহ (৯): আয়াত ৭৯]মুমিনদের মধ্যে যারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সদকা দান করে এবং যারা নিজেদের শ্রম ছাড়া আর কিছুই পায় না, তাদের যারা বিদ্রূপ করে এবং উপহাস করে; আল্লাহ তাদের উপহাস করেন এবং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি (৭৯)।(১).
দেখুন ১৩শ খণ্ড, পৃষ্ঠা...।(২). সঠিক কথা হলো তাঁরা নবী ছিলেন না, কারণ তাঁদের কাজ নিষ্পাপ হওয়ার (ইসমত) পরিপন্থী।
“তাদের মধ্যে এমন কতিপয় লোক রয়েছে যারা আল্লাহর নিকট এই মর্মে অঙ্গীকার করেছিল যে, ‘তিনি যদি আমাদের তাঁর অনুগ্রহ হতে দান করেন তবে আমরা অবশ্যই দান-সদকাহ করব’”—এই তিনটি আয়াত সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে।তিনি বলেন: সালাবার কোনো এক আত্মীয় তা শুনতে পেলেন। অতঃপর তিনি সালাবার নিকট এসে বললেন: হে সালাবা, তোমার জন্য আফসোস! আল্লাহ তোমার ব্যাপারে এই এই আয়াত অবতীর্ণ করেছেন।তিনি বলেন: তখন সালাবা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! এটি আমার সম্পদের সদকাহ।তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: আল্লাহ তাআলা আমাকে তোমার থেকে সদকাহ গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন।তিনি বলেন: তখন সে কাঁদতে লাগল এবং নিজের মাথায় মাটি ছিটাতে লাগল।
তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: এটি তোমার নিজের কৃতকর্ম; আমি তোমাকে আদেশ করেছিলাম কিন্তু তুমি আমার আনুগত্য করোনি।আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ওফাত পর্যন্ত সেটি আর গ্রহণ করেননি।অতঃপর তিনি আবু বকর (রা.)-এর নিকট এসে বললেন: হে আবু বকর! আমার পক্ষ থেকে আমার সদকাহ গ্রহণ করুন; আনসারদের মাঝে আমার উচ্চ মর্যাদা সম্পর্কে তো আপনি জানেনই।তখন আবু বকর (রা.) বললেন: আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা গ্রহণ করেননি, আমি তা গ্রহণ করব? সুতরাং আবু বকর (রা.) তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন।
এরপর উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) খলিফা হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন, তখন সালাবা তাঁর নিকট এসে বললেন: হে আবু হাফস! হে আমিরুল মুমিনিন! আমার সদকাহ গ্রহণ করুন।তিনি তাঁর কাছে মুহাজির, আনসার এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র পত্নীগণের মাধ্যমে সুপারিশ পেশ করলেন।উমর (রা.) বললেন: আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা গ্রহণ করেননি এবং আবু বকরও (রা.) গ্রহণ করেননি, তা কি আমি গ্রহণ করব? তিনিও তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন। অতঃপর উসমান (রা.) খলিফা হলেন এবং উসমান (রা.)-এর খেলাফতকালেই সালাবার মৃত্যু হয়। তাঁর সম্পর্কেই এই আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল: “মুমিনদের মধ্যে যারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সদকাহ দেয়, তাদের যারা বিদ্রূপ করে” (সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত ৭৯)।
তিনি বলেন: এটি সদকাহর প্রসঙ্গেই ছিল।ইবনে জারীর, ইবনে আবি হাতিম, ইবনে মারদুবাইহ এবং বায়হাকী ‘দালাইল’ গ্রন্থে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে এই আয়াত প্রসঙ্গে বর্ণনা করেছেন: “তাদের মধ্যে এমন কতিপয় লোক রয়েছে যারা আল্লাহর নিকট অঙ্গীকার করেছিল যে, ‘তিনি যদি আমাদের তাঁর অনুগ্রহ হতে দান করেন তবে আমরা অবশ্যই সদকাহ করব এবং অবশ্যই নেককারদের অন্তর্ভুক্ত হব’”—এ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যে, আনসারদের সালাবা নামক এক ব্যক্তি এক মজলিসে উপস্থিত হয়ে সকলকে সাক্ষী রেখে বলেছিল: আল্লাহ যদি আমাকে তাঁর অনুগ্রহ থেকে দান করেন, তবে আমি প্রত্যেক হকদারের হক আদায় করব, তা থেকে সদকাহ করব এবং আত্মীয়-স্বজনের জন্য ব্যয় করব।অতঃপর আল্লাহ তাকে পরীক্ষা করলেন এবং তাঁকে তাঁর অনুগ্রহ হতে সম্পদ দান করলেন।কিন্তু সে তাঁর কৃত ওয়াদা ভঙ্গ করল।
ফলে সে যা ওয়াদা করেছিল তা ভঙ্গ করার কারণে আল্লাহ তার ওপর রাগান্বিত হলেন এবং কুরআনে আল্লাহ তার হীন অবস্থার কথা অবতীর্ণ করলেন।সাঈদ ইবনে মানসুর, ইবনুল মুনজির, ইবনে আবি হাতিম, তাবারানী, আবুশ শাইখ এবং ইবনে মারদুবাইহ আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: তোমরা মুনাফিককে তিনটি বিষয়ের মাধ্যমে চিনতে পারবে: যখন সে কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন সে ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করে এবং যখন সে অঙ্গীকার করে তাতে বিশ্বাসঘাতকতা করে। আর এটি এজন্য যে, মহান আল্লাহ বলেন: “তাদের মধ্যে এমন কতিপয় লোক রয়েছে যারা আল্লাহর নিকট এই মর্মে অঙ্গীকার করেছিল যে, ‘তিনি যদি আমাদের তাঁর অনুগ্রহ হতে দান করেন তবে আমরা অবশ্যই দান-সদকাহ করব’”—আয়াতের শেষ পর্যন্ত।ইবনে আবি শায়বাহ, ইবনুল মুনজির এবং আবুশ শাইখ আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: তিনটি বৈশিষ্ট্য যার মধ্যে থাকবে সে মুনাফিক;যখন সে কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন সে ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করে এবং যখন তার কাছে আমানত রাখা হয় তাতে খেয়ানত করে।অতঃপর তিনি এই আয়াতটি তেলাওয়াত করলেন: “তাদের মধ্যে এমন কতিপয় লোক রয়েছে যারা আল্লাহর নিকট এই মর্মে অঙ্গীকার করেছিল যে, ‘তিনি যদি আমাদের তাঁর অনুগ্রহ হতে দান করেন’”—আয়াতের শেষ পর্যন্ত।
