Al-Ma'arij
আল-মাআরিজ: 19
মূল আরবি
۞ إِنَّ ٱلْإِنسَـٰنَ خُلِقَ هَلُوعًا
English Translations
Indeed, mankind was created anxious:
Verily, man (disbeliever) was created very impatient;
Indeed man is created weak in courage,
Verily man is impatient by nature:
Lo! man was created anxious,
Truly man was created very impatient;-
বাংলা অনুবাদ
মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে খুবই অস্থির-মনা করে,
নিশ্চয় মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে অস্থির করে।
মানুষতো সৃষ্টি হয়েছে অতিশয় অস্থির চিত্ত রূপে।
নিশ্চয় মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে অতিশয় অস্থিরচিত্তরূপে ।
নিশ্চয়ই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে অস্থির মনারূপে;
১৯. বস্তুতঃ মানুষকে প্রচণ্ড লোভী হিসাবে সৃষ্টি করা হয়েছে।
তাফসীর
১৯-৩৫ নং আয়াতের তাফসীর এখানে মানব প্রকৃতির দুর্বলতা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা বড়ই অসহিষ্ণু ও অস্থির চিত্ত। যখন কোন বিপদে পড়ে তখন বড়ই হা-হুতাশ করতে থাকে এবং নিরাশায় একেবারে ভেঙ্গে পড়ে। পক্ষান্তরে, যখন কোন কল্যাণ লাভ করে ও অবস্থা স্বচ্ছল হয় তখন হয়ে যায় অতি কৃপণ। আল্লাহ তা'আলার হকের কথাও তখন সে ভুলে যায়।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “মানুষের নিকৃষ্টতম জিনিস হলো অত্যন্ত কৃপণতা ও চরম পর্যায়ের কাপুরুষতা।” (এ হাদীসটি সুনানে আবু দাউদেও বর্ণিত হয়েছে)এরপর আল্লাহ্ পাক বলেনঃ তবে হ্যাঁ, এই নিন্দনীয় স্বভাব হতে তারাই দূরে রয়েছে যাদের উপর আল্লাহর বিশেষ রহমত রয়েছে এবং যারা চিরন্তনভাবে কল্যাণের তাওফীক লাভ করেছে।
যাদের গুণাবলীর মধ্যে একটি বড় গুণ এই যে, তারা পুরোপুরিভাবে নামায কায়েম করে থাকে। তারা নামাযের সময়ের প্রতি যত্নবান থাকে। ফরয নামায তারা ভালভাবে আদায় করে। নিজেদের নামাযে তারা তা প্রকাশ করে। যেমন মহান আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মু'মিনগণ, যারা বিনয়-নম্র নিজেদের নামাযে।” (২৩:১-২) আরবরা বদ্ধ ও হরকতবিহীন পানিকেও (আরবি) বলে থাকে। এর দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, নামাযে ইতমীনান বা স্থিরতা ওয়াজিব। যে ব্যক্তি ধীরে সুস্থে ও স্থিরতার সাথে রুকু-সিজদাহ্ আদায় করে না সে তার নামাযে সদা নিষ্ঠাবান নয়। কেননা, সে নামাযে স্থিরতা প্রকাশ করে না, বরং কাকের মত ঠোকর মারে।
সুতরাং তার নামায তাকে মুক্ত করাবে না বা পরিত্রাণ লাভে সহায়তা করবে না। এটাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা প্রত্যেক ঐ ভাল আমলকে বুঝানো হয়েছে যা স্থায়ী হয়। যেমন সহীহ্ হাদীসে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর নিকট ঐ আমলই অধিক পছন্দনীয় যা চিরস্থায়ী হয়, যদিও তা অল্প হয়। অন্য শব্দে রয়েছেঃ “যার উপর আমলকারী স্থায়ীভাবে থাকে।” হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর অভ্যাস ছিল এই যে, যখন তিনি কোন আমল করতেন তখন তাঁর উপর চিরস্থায়ী থাকতেন (অর্থাৎ কখনো ঐ আমল পরিত্যাগ করতেন না)হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) (আরবি)-এই আয়াতের তাফসীরে বলেনঃ আমাদের কাছে বর্ণনা করা হয়েছে যে, হযরত দানইয়াল (আঃ) উম্মতে মুহাম্মাদী (সঃ)-এর প্রশংসা করতে গিয়ে বলেনঃ “তারা এমন নামায পড়বে যে, যদি হযরত নূহ (আঃ)-এর সম্প্রদায় এরূপ নামায পড়তো তবে তারা ডুবে মরতো না।
আ'দ সম্প্রদায়ের এরূপ নামায় হলে তাদের উপর দিয়ে অকল্যাণকর বায়ু প্রবাহিত হতো না। সামূদ সম্প্রদায় এরূপ নামায পড়লে তাদেরকে ভীষণ চীৎকারের মাধ্যমে ধ্বংস করে দেয়া হতো না। সুতরাং হে লোক সকল! তোমরা ভালভাবে নামাযের পাবন্দ হয়ে যাও। এটা মু'মিনদের জন্যে উত্তম চরিত্র (গত গুণ)।”মহান আল্লাহ্ এরপর বলেনঃ যাদের সম্পদে নির্ধারিত হক রয়েছে প্রার্থী ও বঞ্চিতের। (আরবি) ও (আরবি) এর পূর্ণ তাফসীর সূরা যারিয়াতে গত হয়েছে।মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ বলেনঃ এ লোকগুলো কর্মফল দিবসকে সত্য বলে জানে। এ কারণেই তারা এমন সব আমল করে যাতে পুরস্কার লাভ করবে এবং আযাব হতেও পরিত্রাণ পাবে।আল্লাহ তা’আলা তাদের আরো গুণ বর্ণনা করছেন যে, তারা তাদের প্রতিপালকের শাস্তিকে ভয় করে, যে শাস্তি হতে কোন জ্ঞানী ব্যক্তি নির্ভয় থাকতে পারে না।
তবে হ্যাঁ, আল্লাহ তা'আলা যাকে নিরাপত্তা দান করেন সেটা স্বতন্ত্র কথা। আর এ লোকগুলো নিজেদের যৌন অঙ্গকে সংযত রাখে, তাদের পত্নী অথবা তাদের অধিকারভুক্ত দাসীদের ক্ষেত্র ব্যতীত, এতে তারা নিন্দনীয় হবে না। তবে কেউ এদেরকে ছাড়া অন্যকে কামনা করলে তারা হবে সীমালংঘনকারী। এ দু'টি আয়াতের পূর্ণ তাফসীর (আরবি)-এর মধ্যে গত হয়েছে। এরা আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে, আত্মসাৎ করে না ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে না। এগুলো হলো মু'মিনদের গুণাবলী। আর যারা এদের বিপরীত আমল করে তারা মুনাফিক। যেমন সহীহ্ হাদীসে এসেছেঃ “মুনাফিকের লক্ষণ বা নিদর্শন তিনটি।
কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে খেলাফ করে এবং তার কাছে কিছু আমানত রাখা হলে তা আত্মসাৎ করে।” অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, কখনও কোন অঙ্গীকার করলে তা ভঙ্গ করে। আর ঝগড়া করলে গালি দেয়।তারা তাদের সাক্ষ্যদানে অটল। অর্থাৎ তাতে কম বেশী করে না ও সাক্ষ্যদানে অস্বীকৃতি জানিয়ে পালিয়েও যায় না। তারা সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে কিছুই গোপন করে না। যারা তা গোপন করে তাদের অন্তর পাপী।এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ তারা তাদের নামাযে যত্নবান থাকে। অর্থাৎ সময় মত ওয়াজিব ও মুসতাহাব পূর্ণভাবে বজায় রেখে নামায পড়ে। এ কথাটি এখানে বিশেষ লক্ষণীয় যে, এই জান্নাতীর গুণাবলী বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ্ পাক শুরুতেও নামাযের উল্লেখ করেছেন এবং শেষেও করেছেন।
এতে বুঝা যায় যে, দ্বীনের কার্যসমূহে নামাযের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশী এবং এটা খুবই মর্যাদাপূর্ণ কাজ। এটা আদায় করা অত্যন্ত জরুরী এবং এর হিফাযত করা একান্ত কর্তব্য। সূরা (আরবি)-এর মধ্যে ঠিক এভাবেই বর্ণনা করা হয়েছে। ওখানে আল্লাহ পাক এসব বিশেষণ বর্ণনা করার পর বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তারাই হবে অধিকারী, অধিকারী হবে ফিরদাউসের, যাতে তারা স্থায়ী হবে।” (২৩:১০-১১) আর এখানে বলেছেনঃ তারাই সম্মানিত হবে জান্নাতে। অর্থাৎ বিভিন্ন প্রকারের ভোগ্যবস্তু পেয়ে তারা আনন্দিত হবে এবং মহাসম্মান লাভ করবে।
নিশ্চয় মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে অতিশয় অস্থিরচিত্তরূপে [১] ।
[১] هلوع এর শাব্দিক অর্থ ভীষণ লোভী ও অতি ভীরু ব্যক্তি। [কুরতুবী] ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা এখানে অর্থ নিয়েছেন সেই ব্যক্তি, যে হারাম ধন-সম্পদ লোভ করে। সাঈদ ইবনে জুবাইর রাহেমাহুল্লাহ বলেন, এর অর্থ কৃপণ। মুকাতিল বলেন, এর অর্থ সংকীর্ণমনা ব্যক্তি। এসব অর্থ কাছাকাছি। স্বয়ং আল্লাহ্ই কুরআনে এর পরবর্তী দু’ আয়াতে এ শব্দের ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন। [বাগাভী] এখানে মানুষের খারাপ কর্মকাণ্ড ও স্বভাব উল্লেখ করে বলেন যে, সে “যখন দুঃখ কষ্ট সম্মুখীন হয়, তখন হা-হুতাশ শুরু করে দেয়। পক্ষান্তরে কোন সুখ শান্তি ও আরাম লাভ করে, তখন কৃপণ হয়ে যায়।” অতঃপর সাধারণ মানুষদের এই বদ-অভ্যাস থেকে সৎকর্মী সালাত আদায়কারী মুমিনদের ব্যতিক্রম প্রকাশ করে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ যারা এরূপ সৎকর্ম করে, তারা অতিশয় ভীরু ও লোভী নয়। [তাবারী।]
[সূরা আল-মা'আরিজ (৭০): আয়াত ১৯ থেকে ২১] পূর্ণ পৃষ্ঠা
আবু সালিহ বলেন: এর অর্থ হাত ও পায়ের প্রান্তভাগ। কবি বলেছেন:যখন তুমি তাকাবে, তুমি তার মাঝে আভিজাত্য খুঁজে পাবে … এবং তার দু’চোখে, কিন্তু তার দেহের প্রান্তভাগ (শাওয়া) চিনবে না।অর্থাৎ তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। হাসানও বলেছেন: শাওয়া মানে মাথার খুলি। (সে ডাকবে তাকে, যে পিঠ ফিরিয়েছিল ও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল) অর্থাৎ জাহান্নামের আগুন তাকে ডাকবে যে দুনিয়াতে আল্লাহর আনুগত্য থেকে বিমুখ হয়েছিল এবং ঈমান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। আর তার ডাক হবে এই বলে: "হে মুশরিক, আমার দিকে আয়; হে কাফের, আমার দিকে আয়।" ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন: জাহান্নাম কাফের ও মুনাফিকদের তাদের নাম ধরে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ডাকবে: "হে কাফের, আমার দিকে আয়; হে মুনাফিক, আমার দিকে আয়", এরপর সে তাদের এমনভাবে ছোঁ মেরে তুলে নেবে যেমন পাখি দানা খুঁটে তুলে নেয়।
ছালাব বলেন: 'ডাকবে' অর্থ ধ্বংস করবে। আরবরা বলে: 'আল্লাহ তোমাকে ডাকুন', অর্থাৎ আল্লাহ তোমাকে ধ্বংস করুন। খলীল বলেন: এটি "এসো" বলার মতো সাধারণ ডাক নয়, বরং তাদের প্রতি তার আহ্বান হলো তাদের শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে তার সক্ষমতা লাভ করা। কেউ কেউ বলেন: আহ্বানকারী হলো জাহান্নামের রক্ষীবাহিনী, তাদের ডাককে জাহান্নামের দিকে সম্বন্ধযুক্ত করা হয়েছে। আবার বলা হয়েছে এটি একটি উপমা, অর্থাৎ যারা সত্য ত্যাগ করে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তাদের গন্তব্য যেহেতু জাহান্নাম, তাই মনে হচ্ছে যেন জাহান্নামই তাদের আহ্বান করছে। কবির এই উক্তিটিও তদ্রূপ:আমরা ফুয়াদিয়ার উপত্যকাদ্বয়ে অবতরণ করলাম … যেখানে নির্বাক দংশক মশা সঙ্গীকে আহ্বান করছে।'নির্বাক দংশক' বলতে মাছি বা মশাকে বোঝানো হয়েছে।
এটি প্রকৃতপক্ষে ডাকে না, তবে তার ভনভন শব্দ তার উপস্থিতির জানান দেয় এবং সেদিকে আকৃষ্ট করে। আমি (গ্রন্থকার) বলি: প্রথম অভিমতটিই বাস্তবসম্মত, যা ইতিপূর্বে কুরআনের আয়াত এবং সহীহ সংবাদের মাধ্যমে স্পষ্ট করা হয়েছে। কুশায়রী বলেন: জাহান্নামের এই আহ্বান হবে তখন, যখন সে ডাকার সময় আল্লাহ তাতে প্রাণের সঞ্চার করবেন; আর পরকালে অলৌকিক ঘটনার প্রাচুর্য থাকবে। (আর সে সম্পদ পুঞ্জীভূত করেছিল ও তা সযত্নে আগলে রেখেছিল) অর্থাৎ সে সম্পদ জমা করেছিল এবং তা পাত্রে বা ভাণ্ডারে আবদ্ধ করে রেখেছিল এবং তাতে আল্লাহর হক আদায় করতে বাধা দিয়েছিল, ফলে সে ছিল অতিশয় সম্পদলিপ্সু ও কৃপণ।
হাকাম বলেন: আবদুল্লাহ ইবনে উকাইম তার থলির মুখ বাঁধতেন না এবং বলতেন, আমি আল্লাহকে বলতে শুনেছি: "আর সে সম্পদ পুঞ্জীভূত করেছিল ও তা সযত্নে আগলে রেখেছিল।" [সূরা আল-মা'আরিজ (৭০): আয়াত ১৯ থেকে ২১]আল্লাহ তাআলার বাণী: নিশ্চয়ই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে অতিশয় অস্থিরমনা হিসেবে (১৯) যখন তাকে বিপদ স্পর্শ করে, তখন সে হা-হুতাশ করে (২০) আর যখন তাকে কল্যাণ স্পর্শ করে, তখন সে কৃপণ হয়ে যায় (২১)।আল্লাহ তাআলার বাণী: (নিশ্চয়ই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে অতিশয় অস্থিরমনা হিসেবে) দাহহাকের মতে এখানে 'মানুষ' বলতে কাফেরকে বোঝানো হয়েছে। ভাষাবিদদের মতে 'হালা' অর্থ হলো চরম লোভ এবং অত্যন্ত কদর্য অস্থিরতা।
কাতাদাহ, মুজাহিদ এবং অন্যরাও অনুরূপ বলেছেন। এর ক্রিয়াপদ হলো 'হালিআ-য়াহলাউ', আর 'হালি' ও 'হালু' হলো তার আধিক্যবাচক রূপ। এর মর্মার্থ হলো সে সুখ বা দুঃখ কোনোটাতেই ধৈর্য ধারণ করে না, বরং উভয় ক্ষেত্রেই চরম অস্থিরতা প্রকাশ করে।(১). এই শব্দটি মূল পাণ্ডুলিপির বিভিন্ন কপিতে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে এসেছে; 'হা' ও 'তা' কপিতে 'আদিদ' (আইন ও দদ দিয়ে), 'লাম' কপিতে 'ফাসিস' (ফা ও সদ দিয়ে), 'যা' কপিতে 'ফাদিদ' (ফা ও দদ দিয়ে) এবং 'হা' কপিতে 'আসিস' (আইন ও সদ দিয়ে) হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। অভিধান গ্রন্থসমূহে এই শব্দগুলোর কোনোটির জন্যই উল্লিখিত অর্থের হদিস পাওয়া যায়নি।
