'Abasa
আবাসা: 1
মূল আরবি
عَبَسَ وَتَوَلَّىٰٓ
English Translations
He [i.e., the Prophet (ﷺ) ] frowned and turned away
(The Prophet (Peace be upon him)) frowned and turned away,
He (the Prophet) frowned and turned his face,
He frowned and turned away
He frowned and turned away
(The Prophet) frowned and turned away,
বাংলা অনুবাদ
(নবী) মুখ ভার করল আর মুখ ঘুরিয়ে নিল।
সে* ভ্রকুঞ্চিত করল এবং মুখ ফিরিয়ে নিল। *মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)।
সে ভ্রু কুঞ্চিত করল এবং মুখ ফিরিয়ে নিলো,
তিনি ভ্ৰকুঞ্চিত করলেন এবং মুখ ফিরিয়ে নিলেন ,
ভ্রু কুঞ্চিত করল এবং মুখ ফিরিয়ে নিল,
১. রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ভ্রূ কুঞ্চিত করলেন এবং মুখ ফিরিয়ে নিলেন।
তাফসীর
১-১৬ নং আয়াতের তাফসীরবহু তাফসীরকার লিখেছেন যে, একদা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কুরায়েশ নেতাদেরকে ইসলামের শিক্ষা, সৌন্দর্য ও আদর্শ সম্পর্কে অবহিত করছিলেন এবং সেদিকে গভীর মনোযোগ দিয়েছিলেন। তিনি আশা করছিলেন যে, হয়তো আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকেই ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য দান করবেন। ঐ সময়ে হঠাৎ আব্দুল্লাহ্ ইবনে উম্মি মাকতুম (রাঃ) নামক এক অন্ধ সাহাবী তাঁর কাছে এলেন। ইবনে উম্মি মাকতুম (রাঃ) বহু পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। প্রায়ই তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর কাছে হাযির থাকতেন এবং ধর্মীয় বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করতেন। মাসআলা মাসায়েল জিজ্ঞেস করতেন।
সেদিনও তার আচরিত অভ্যাসমত এসে তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে প্রশ্ন করতে শুরু করলেন এবং সামনে অগ্রসর হয়ে তাঁর প্রতি তার মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু মহানবী (সঃ) তখন একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কাজে ব্যস্ত ছিলেন। এ জন্যে তিনি আব্দুল্লাহ্ (রাঃ)-এর প্রতি তেমন মনোযোগ দিলেন না। তাঁর প্রতি তিনি কিছুটা বিরক্তও হলেন। ফলে তার কপাল কুঞ্চিত হলো। এরপর এই আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হয়। আল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ হে রাসূল (সঃ)। তোমার উন্নত মর্যাদা ও মহান চরিত্রের জন্যে এটা শোভনীয় নয় যে, একজন অন্ধ আমার ভয়ে তোমার কাছে ছুটে এলো, ধর্ম সম্পর্কে কিছু জ্ঞান লাভের আশায়, অথচ তুমি তার দিক হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অহংকারী ও উদ্ধতদের প্রতি মনোযোগী হয়ে গেলে?
পক্ষান্তরে সে ব্যক্তি তোমার কাছে এসেছিল, তোমার মুখ থেকে আল্লাহর বাণী শুনে পাপ ও অন্যায় হতে। বিরত থাকার সম্ভাবনা ছিল তার অনেক বেশী। সে হয়তো ধর্মীয় বিধি-বিধান পালনের জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করতো। অথচ তুমি সেই অহংকারী ধনী লোকদের প্রতি পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ করলে এ কেমনতর কথা? ওদের সৎ পথে নিয়ে আসতেই হবে এমন দায়িত্ব তো তোমার উপর নেই। ওরা যদি তোমার কথা না মানে তবে তাদের দুষ্কৃতির জন্যে তোমাকে জবাবদিহি করতে হবে না। অর্থাৎ ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে বহু ছোট, ধনী-গরীব, সবল-দুর্বল, আযাদ-গোলাম এবং পুরুষ ও নারী সঝই সন। তুমি সবাইকে সমান নসীহত করবে।
হিদায়াত আকার হাতে রয়েছে। আল্লাহ যদি কাউকে সৎ পথ থেকে দূরে রাখেন তবে তাৰ বুহস্য তিনিই জানেন, আর যদি কাউকে সৎপথে নিয়ে আসেন সেটার বৃহস্যও তিনিই ভাল জানেন।হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে উম্মি মাকতুম (রাঃ) যখন এসেছিলেন তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উবাই ইবনে খালুফের সাথে কথা বলছিলেন। এরপর থেকে নবী (সঃ) হযরত ইবনে উন্মি মাকতুম (রাঃ)-কে খুবই সম্মান করতেন এবং তাঁকে সাদর সম্ভাষণ জানাতেন। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) বলেনঃ আমি ইবনে উম্মি মাকতূম (রাঃ)-কে কাদেসিয়ার যুদ্ধে দেখেছি যে, তিনি বর্ম পরিহিত অবস্থায় কালো পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ যখন ইবনে উন্মি মাকতুম (রাঃ) এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বললেনঃ “আমাকে দ্বীনের কথা শিক্ষা দিন”, তখন কুরায়েশ নেতৃবৃন্দ রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সামনে উপস্থিত ছিল।
রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদেরকে ধর্মের কথা শোনাচ্ছিলেন আর জিজ্ঞেস করছিলেনঃ “বল দেখি, আমার কথা সত্য কি-না?” তারা উত্তরে বলছিলঃ “জ্বী, আপনি যথার্থই বলছেন। তাদের মধ্যে উত্বা ইবনে রাবীআহ, আবু জাহল ইবনে হিশাম এবং আব্বাস ইবনে আবদিল। মুত্তালিবও ছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) মনে প্রাণে চাচ্ছিলেন যে, এরা যেন মুসলমান হয়ে যায় এবং সত্য দ্বীন গ্রহণ করে। এমনি সময়ে ইবনে উম্মি মাকতুম (রাঃ) এসে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে কুরআনের কোন একটি আয়াত শুনিয়ে আল্লাহর কথা শিক্ষা দিন!” ইবনে উম্মি মাকতুম (রাঃ)-এর কথা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর কাছে অসময়োচিত মনে হলো, তিনি মুখ ফিরিয়ে কুরাইশ নেতৃবৃন্দের প্রতি মনোনিবেশ করলেন।
তাদের সাথে কথা শেষ করে ঘরে ফেরার সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর মাথা ছিল নীচু, চোখের সামনে ছিল অন্ধকার। এই আয়াত ততক্ষণে নাযিল হয়ে গেছে। তারপর থেকে নবী (সঃ) ইবনে উম্মি মাকতুম (রাঃ)-কে খুবই শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন এবং অত্যন্ত মনোযোগের সাথে তাঁর কথা শুনতেন। আসা-যাওয়ার সময়ে জিজ্ঞেস করতেন যে, তাঁর কোন প্রয়োজন আছে কি-না, কোন কথা আছে কি-না এবং কোন কিছু তিনি চান কি-না। এখানে উল্লেখ্য যে, হাদীসের সংজ্ঞায় এই বর্ণনাটি গারীব এবং এর সনদ সম্পর্কেও কথা আছে।হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমার (রাঃ) বলেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “বিলাল (রাঃ) রাত থাকতেই আযান দেয়, সুতরাং তখন তোমরা পানাহার করবে, আব্দুল্লাহ্ ইবনে উম্মি মাকতুম (রাঃ) আযান না দেয়া পর্যন্ত খেতে থাকবে, তার আযান শোনা মাত্র পানাহার বন্ধ করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) ইনি সেই দৃষ্টিহীন লোক যার সম্পর্কে সূরা (আরবি) অবতীর্ণ হয়েছে।
ইনিও মুআযযিন ছিলেন। তাঁর দৃষ্টিশক্তি ছিল ত্রুটিপূর্ণ, পাশের লোকেরা যখন বলতো যে, সুবহে সাদেক হয়ে গেছে তখন তিনি আযান দিতেন।সুপ্রসিদ্ধ মত এই যে, তার নাম আবদুল্লাহ্ (রাঃ)। কেউ কেউ বলেন যে, তাঁর নাম আমর (রাঃ)। অবশ্য এ সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।(আরবি) অর্থাৎ না, এই আচরণ অনুচিত, এটা তো উপদেশ বাণী। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হয়তো এই সূরা অথবা ইলমে দ্বীন প্রচারের ব্যাপারে মানুষের মাঝে ইতর-ভদ্র নির্বিশেষে সমতা রক্ষার উপদেশ, যে, তাবলীগে দ্বীনের ক্ষেত্রে ছোট-বড়, ইতর-দ্র সবাই সমান। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, (আরবি) দ্বারা কুরআনকে বুঝানো হয়েছে।যে ইচ্ছা করবে সে এটা স্মরণ রাখবে।
অর্থাৎ আল্লাহকে স্মরণ করবে এবং সকল কাজ-কর্মে তাঁর ফরমানকেই অগ্রাধিকার দিবে ? ক্রিয়া (আরবি) সঙ্গীয় যমীর বা সর্বনাম দ্বারা অহীর প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। এই সূরা, এই নসীহত তথা সমগ্র কুরআন সম্মানিত ও নির্ভরযোগ্য সহীফায় সংরক্ষিত রয়েছে, যা অতি উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। যা অপবিত্রতা হতে মুক্ত এবং যা কমও করা হয় না বা বেশীও করা হয় না।(আরবি) অর্থ ফেরেশতাগণ, তাঁদের পবিত্র হাতে কুরআন রয়েছে। এটা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত যহহাক (রঃ) এবং হযরত ইবনে যায়েদ (রঃ)-এর উক্তি। অহাব ইবনে মুনাব্বাহ্ (রঃ) বলেন যে, দ্বারা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর সাহাবীদেরকে বুঝানো হয়েছে।
কাতাদা (রঃ) বলেন। যে, তারা হচ্ছেন কুরআনের পাঠকগণ। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এটা নতী ভাষার শব্দ, যার অর্থ হলো কারিগণ। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর মতে এর দ্বারা ঐ ফেরেশতাদেরকেই বুঝানো হয়েছে যারা আল্লাহ্ এবং তার মাখলুকের মাঝে সাফীর বা দূত হিসেবে রয়েছেন। তিনি এটাকেই সঠিক উক্তি বলেছেন। যারা মানুষের মধ্যে সমঝোতা, আপোষ-মীমাংসা এবং কল্যাণের জন্যে চেষ্টা করেন তাদেরকে সাফীর বা দূত বলা হয়। যেমন কবি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমি আমার সম্প্রদায়ের মাঝে দৌত্যকার্য পরিত্যাগ করি না এবং আমি চললে অচৈতন্য হয়ে চলি না।”ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন যে, এখানে (আরবি) দ্বারা ফেরেশতাদেরকেই বুঝানো হয়েছে যারা আল্লাহ্ তা'আলার নিকট হতে অহী ইত্যাদি নিয়ে আসেন।
তাঁরা মানুষের মাঝে শান্তি রক্ষাকারী দূতদেরই মত। তাদের চেহারা সুন্দর, পবিত্র ও উত্তম এবং তাঁদের চরিত্র ও কাজকর্মও পূত-পবিত্র ও উত্তম। এখান হতে এটাও জানা যায় যে, কুরআন পাঠকদের আমল-আখলাক অর্থাৎ কাজকর্ম ও চরিত্র ভাল হতে হবে। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কুরআন পাঠ করে ও তাতে ব্যুৎপত্তি লাভ করে সে মহান ও পূত-পবিত্র লিপিকর ফেরেশতাদের সাথে থাকবে। আর যে ব্যক্তি কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও কুরআন পাঠ করে তার জন্যে দ্বিগুণ পুণ্য রয়েছে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)
তিনি ভ্ৰকুঞ্চিত করলেন এবং মুখ ফিরিয়ে নিলেন [১] ,
সূরা সম্পর্কিত তথ্যঃ
এ সূরাটি সাহাবী আবদুল্লাহ্ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু এর সাথে বিশেষভাবে জড়িত। তাঁর মা উম্মে মাকতুম ছিলেন খাদীজা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার পিতা খুওয়াইলিদের সহোদর বোন। তিনি ছিলেন নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের শ্যালক। বংশ মর্যাদার দিক দিয়ে সমাজের সাধারণ শ্রেণীভুক্ত নন বরং অভিজাত বংশীয় ছিলেন। আবদুল্লাহ্ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু অন্ধ হওয়ার কারণে জানতে পারেননি যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্যের সাথে আলোচনারত আছেন। তিনি মজলিসে প্রবেশ করেই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আওয়াজ দিতে শুরু করেন এবং বার বার আওয়াজ দেন।
কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কুরআন এর একটি আয়াতের পাঠ জিজ্ঞাসা করেন এবং সাথে সাথে জওয়াব দিতে পীড়াপীড়ি করেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন মক্কার কাফের নেতৃবর্গের সাথে আলোচনায় মশগুল ছিলেন। এই নেতৃবর্গ ছিলেন ওতবা ইবনে রবীয়া, আবু জাহল ইবনে হিশাম এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পিতৃব্য আব্বাস। তিনি তখনও মুসলিম হননি। এরূপ ক্ষেত্রে আবদুল্লাহ্ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু এর এভাবে কথা বলা এবং মামুলী প্রশ্ন নিয়ে তাৎক্ষনিক জওয়াবের জন্য পীড়াপীড়ি করা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে বিরক্তিকর ঠেকে।
এই বিরক্তির প্রধান কারণ ছিল এই যে, আবদুল্লাহ্ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু পাক্কা মুসলিম ছিলেন এবং সদা সবৰ্দা মজলিসে উপস্থিত থাকতেন। তিনি এই প্রশ্ন অন্য সময়ও রাখতে পারতেন। তাঁর জওয়াব বিলম্বিত করার মধ্যে কোন ধর্মীয় ক্ষতির আশংকা ছিল না। কিন্তু আল্লাহ্ তা'আলা নবীর এ বিরক্তি প্রকাশ পছন্দ করলেন না। তিনি আয়াত নাযিল করে তার প্রতিকার করেন। [দেখুন: তিরমিয়ী: ৩৩২৮, ৩৩৩১, মুয়াত্তা মালেক: ১/২০৩]
___________________
[১] عبس শব্দের অর্থ রুষ্টতা অবলম্বন করা এবং চোখে মুখে বিরক্তি প্ৰকাশ করা। تولى শব্দের অর্থ মুখ ফিরিয়ে নেয়া। [জালালাইন|
[সূরা আবাসা (৮০): আয়াত ১ থেকে ৪] পূর্ণ পৃষ্ঠা
[সূরা আবাসা-এর তাফসীর]সকলের মতে সূরা আবাসা মক্কী এবং এটি একচল্লিশটি আয়াত নিয়ে গঠিত। পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে। [সূরা আবাসা (৮০): আয়াত ১ থেকে ৪]পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামেতিনি ভ্রুকুঞ্চিত করলেন এবং মুখ ফিরিয়ে নিলেন (১) কারণ তাঁর কাছে সেই অন্ধ ব্যক্তিটি এল (২) আপনি কী করে জানবেন, হয়তো সে পরিশুদ্ধ হতো (৩) অথবা উপদেশ গ্রহণ করত, ফলে উপদেশ তার উপকারে আসত (৪)এর মধ্যে ছয়টি মাসআলা বা আলোচনা রয়েছে: প্রথম— মহান আল্লাহর বাণী: ‘তিনি ভ্রুকুঞ্চিত করলেন’ অর্থাৎ তিনি তাঁর চেহারা সংকুচিত বা বিবর্ণ করলেন; বলা হয়: তিনি ভ্রুকুঞ্চিত হলেন এবং গম্ভীর হলেন।
এটি পূর্বে আলোচিত হয়েছে। ‘এবং মুখ ফিরিয়ে নিলেন’ অর্থাৎ তিনি তাঁর চেহারা ফিরিয়ে বিমুখ হলেন। ‘কারণ তাঁর কাছে এল’ বাক্যে ‘আন’ (যেহেতু) শব্দটি নসবের স্থানে রয়েছে কারণ এটি কারণ নির্দেশক কর্ম (মাফউল লাহু), এর অর্থ হলো যেহেতু তাঁর কাছে সেই অন্ধ ব্যক্তিটি এসেছিল, অর্থাৎ যে ব্যক্তি তার দুই চোখে দেখতে পায় না। তাফসীরকারগণ সর্বসম্মতভাবে বর্ণনা করেছেন যে, কুরাইশদের একদল সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি তাঁদের ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। এমতাবস্থায় আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতূম আগমন করলেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপছন্দ করলেন যে আবদুল্লাহ তাঁর কথাটি মাঝপথে থামিয়ে দিক, ফলে তিনি তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। এই প্রেক্ষাপটেই এই আয়াত নাযিল হয়েছে। ইমাম মালিক বর্ণনা করেছেন: হিশাম ইবনে উরওয়া তাঁর পিতা থেকে আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: ‘আবাসা ওয়া তাওয়াল্লা’ আয়াতটি ইবনে উম্মে মাকতূমের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বলতে লাগলেন: ‘হে মুহাম্মদ, আমাকে আপনার নিকটবর্তী হতে দিন’ (১)। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট মুশরিকদের বড় নেতাদের একজন উপস্থিত ছিলেন।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর (ইবনে উম্মে মাকতূমের) দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অন্য লোকটির দিকে মনোনিবেশ করলেন এবং বলতে লাগলেন: ‘হে অমুক, আমি যা বলছি তাতে কি আপনি কোনো সমস্যা দেখছেন?’ সে উত্তর দিল: ‘না, মূর্তিদের শপথ! আপনি যা বলছেন তাতে আমি কোনো সমস্যা দেখছি না’ (২, ৩)। তখন আল্লাহ নাযিল করলেন: ‘তিনি ভ্রুকুঞ্চিত করলেন এবং মুখ ফিরিয়ে নিলেন’। তিরমিযী শরীফে মুসনাদ আকারে বর্ণিত হয়েছে, তিনি (তিরমিযী) বলেন: সাঈদ ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল-উমায়্যী আমাদের হাদিস শুনিয়েছেন, তিনি বলেন: আমার পিতা আমাকে হাদিস শুনিয়েছেন, তিনি বলেন: এটিই আমরা হিশাম ইবনে উরওয়ার কাছে পেশ করেছি, তিনি তাঁর পিতা থেকে এবং তিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেন: ‘আবাসা ওয়া তাওয়াল্লা’ অন্ধ ইবনে উম্মে মাকতূমের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসেছিলেন এবং...(১) এখানে এবং ইবনুল আরাবীর বর্ণনায় ‘হে মুহাম্মদ’ উল্লেখ আছে। তবে তাফসীরের কিতাবসমূহে প্রসিদ্ধ পাঠ হলো: ‘হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহ আপনাকে যা শিখিয়েছেন তা থেকে আমাকে শিক্ষা দিন’। অন্য একটি বর্ণনায় আছে: ‘হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে সঠিক পথ দেখান’, যা গ্রন্থকার সামনে উল্লেখ করবেন।(২) আদ-দুমা: এটি ‘দুমইয়াহ’ শব্দের বহুবচন যার অর্থ প্রতিচ্ছবি বা প্রতিকৃতি; এখানে এর দ্বারা মূর্তিদের বোঝানো হয়েছে।(৩) বন্ধনীভুক্ত অংশটুকু ‘বা’ পাণ্ডুলিপিতে নেই।
ইবনে সাদ, আবদ বিন হুমাইদ এবং ইবনে জারির যিয়াদ বিন ফায়্যাযের সূত্রে আবু আবদুর রহমান থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: যখন "উপবেশনকারীরা সমান নয়" (আয়াতটি) নাজিল হলো, তখন আমর বিন উম্মে মাকতূম বললেন: হে রব! আপনি আমাকে পরীক্ষায় ফেলেছেন (দৃষ্টিহীন করে), এখন আমি কী করব? তখন নাজিল হলো "অক্ষম ব্যক্তিরা ছাড়া"।ইবনে সাদ এবং ইবনুল মুনযির সাবিতের সূত্রে আবদুর রহমান ইবনে আবি লায়লা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: যখন নাজিল হলো "মুমিনদের মধ্যে যারা ঘরে বসে থাকে—অক্ষম ব্যক্তিরা ছাড়া—এবং যারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে, তারা সমান নয়", তখন ইবনে উম্মে মাকতূম বললেন: হে আমার রব!
আমার ওজর (অপারগতা) কোথায়? হে আমার রব! আমার ওজর কোথায়? তখন নাজিল হলো "অক্ষম ব্যক্তিরা ছাড়া"। অতঃপর তা আয়াতের অন্যান্য অংশের মাঝে বসিয়ে দেওয়া হলো। এর পর থেকে তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতেন এবং বলতেন: আমার হাতে ঝাণ্ডা দাও এবং আমাকে দুই সারির মাঝে দাঁড় করিয়ে দাও, কারণ আমি তো আর পালিয়ে যেতে পারব না।ইবনুল মুনযির কাতাদাহ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: ইবনে উম্মে মাকতূম সম্পর্কে চারটি আয়াত নাজিল হয়েছে: "মুমিনদের মধ্যে যারা ঘরে বসে থাকে—অক্ষম ব্যক্তিরা ছাড়া—তারা সমান নয়", এবং তাঁর সম্পর্কে নাজিল হয়েছে (অন্ধের জন্য কোনো দোষ নেই) (সূরা আন-নূর, আয়াত ৬১), এবং তাঁর সম্পর্কে নাজিল হয়েছে (বস্তুত চোখ তো অন্ধ হয় না) ) (সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত ৪৬) আয়াতটি।এবং তাঁর সম্পর্কে নাজিল হয়েছে (সে ভ্রুকুঞ্চিত করল এবং মুখ ফিরিয়ে নিল) (সূরা আবাসা, আয়াত ১)।
তখন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে ডাকলেন এবং নিকটে টেনে নিলেন ও কাছে বসালেন এবং বললেন: আপনিই সেই ব্যক্তি যার ব্যাপারে আমার রব আমাকে অনুযোগ করেছেন।ইবনে আবি হাতেম সাঈদ ইবনে জুবাইর থেকে অত্র আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: শত্রুর মোকাবিলায় না গিয়ে ঘরে বসে থাকা ব্যক্তি এবং মুজাহিদ মর্যাদার ক্ষেত্রে সমান নয়; এখানে 'মর্যাদা' অর্থ শ্রেষ্ঠত্ব। "আর প্রত্যেকের জন্যই" অর্থাৎ মুজাহিদ এবং ওজরসম্পন্ন (অক্ষম) উপবেশনকারী উভয়ের জন্য। "আর আল্লাহ মুজাহিদদের উপবেশনকারীদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন"—যাদের কোনো ওজর নেই তাদের ওপর—"মহাপুরস্কারের মাধ্যমে, যা হলো উচ্চ মর্যাদা", অর্থাৎ শ্রেষ্ঠত্বসমূহ।
"আর আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" সত্তরটি স্তরের শ্রেষ্ঠত্বের মাধ্যমে।ইবনে জারির, ইবনুল মুনযির এবং ইবনে আবি হাতেম আলীর সূত্রে ইবনে আব্বাস থেকে আল্লাহর বাণী "অক্ষম ব্যক্তিরা ছাড়া" সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: এরা হলো ওজরসম্পন্ন লোক।ইবনে জারির, ইবনুল মুনযির এবং ইবনে আবি হাতেম ইবনে জুরাইজ থেকে আল্লাহর বাণী "আল্লাহ মুজাহিদদের তাদের সম্পদ ও জীবন দ্বারা উপবেশনকারীদের ওপর এক ডিগ্রি শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন" সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: (এই শ্রেষ্ঠত্ব) অক্ষম ব্যক্তিদের ওপর।আবদ বিন হুমাইদ, ইবনে জারির এবং ইবনুল মুনযির কাতাদাহ থেকে "আর প্রত্যেকের জন্যই আল্লাহ কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন" সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন, অর্থাৎ জান্নাত; আর আল্লাহ প্রত্যেক মর্যাদাবানকে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা দান করেন।ইবনে জারির ইবনে জুরাইজ থেকে বর্ণনা করেছেন: "আর আল্লাহ মুজাহিদদের উপবেশনকারীদের ওপর মহাপুরস্কার, তাঁর পক্ষ থেকে উচ্চ মর্যাদা ও ক্ষমা দ্বারা শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন"—তিনি বলেন: (এই শ্রেষ্ঠত্ব) সেই সব মুমিনদের ওপর যারা "অক্ষম নয় অথচ ঘরে বসে থাকে"।
