Al-Qasas
আল-কাসাস: 52
মূল আরবি
ٱلَّذِينَ ءَاتَيْنَـٰهُمُ ٱلْكِتَـٰبَ مِن قَبْلِهِۦ هُم بِهِۦ يُؤْمِنُونَ
English Translations
Those to whom We gave the Scripture before it - they are believers in it.
Those to whom We gave the Scripture [i.e. the Taurat (Torah) and the Injeel (Gospel), etc.] before it, - they believe in it (the Quran).
As for those to whom We gave the Book before this, they believe in it (Qur’ān).
Those on whom We bestowed the Book before do believe in this (to wit, the Qur'an).
Those unto whom We gave the Scripture before it, they believe in it,
Those to whom We sent the Book before this,- they do believe in this (revelation):
বাংলা অনুবাদ
এর পূর্বে আমি যাদেরকে কিতাব দিয়েছিলাম তারা (অর্থাৎ তাদের কতক লোক) তাতে বিশ্বাস করে।
এর পূর্বে আমি যাদেরকে কিতাব দিয়েছিলাম তারা এর প্রতি ঈমান আনে।
এর পূর্বে আমি যাদেরকে কিতাব দিয়েছিলাম তারা এতে বিশ্বাস করে।
এর আগে আমরা যাদেরকে কিতাব দিয়েছিলাম, তারা এতে ঈমান আনে।
তার পূর্বে আমি যাদেরকে কিতাব দিয়েছিলাম, তারা তাতে বিশ্বাস করে।
৫২. যারা কুর‘আন নাযিলের পূর্বে তাওরাতের প্রতি ঈমানের ব্যাপারে অটল ছিলো তারা কুর‘আনের প্রতিও ঈমান আনবে। কারণ, তারা নিজেদের কিতাবে এ কুর‘আনের সংবাদ ও এর বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা পেয়েছে।
তাফসীর
৫২-৫৫ নং আয়াতের তাফসীরআহলে কিতাবের আলেমগণ, যারা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর প্রিয়পাত্র ছিলেন, তাঁদের গুণাবলী বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা কুরআনকে মেনে চলেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যাদেরকে আমি কিতাব দান করেছি তারা ওটাকে সঠিকভাবে পাঠ করে থাকে, তারা ওর উপর ঈমান আনয়ন করে।” (২:১২১) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আহলে কিতাবের মধ্যে অবশ্যই এমন লোকও আছে যারা আল্লাহ্র উপর ঈমান আনয়ন করে এবং তোমাদের উপর যা অবতীর্ণ করা হয়েছে ও তাদের উপর যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, এসবগুলোর উপরই বিশ্বাস স্থাপন করে, আর তারা আল্লাহর নিকট বিনীত হয়।” (৩:১৯৯) অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যাদেরকে এর পূর্বে জ্ঞান দেয়া হয়েছে তাদের নিকটে যখন এটা পাঠ করা হয় তখনই তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়ে।
আর বলে- আমাদের প্রতিপালক পবিত্র, মহান। আমাদের প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি কার্যকর হয়েই থাকে।” (১৭:১০৭-১০৮) আর একটি আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “মুসলমানদের সাথে বন্ধুত্ব হিসেবে সমস্ত লোক হতে বেশী নিকটতম ঐ লোকদেরকে তুমি পাবে যারা বলে- আমরা নাসারা, এটা এই কারণে যে, তাদের মধ্যে আলেম ও বিবেকবান লোকেরা রয়েছে, তারা অহংকার ও দাম্ভিকতা শূন্য এবং তারা কুরআন শুনে কেঁদে ফেলে ও বলে ওঠেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা ঈমান এনেছি, সুতরাং (ঈমানের) সাক্ষ্যদাতাদের সাথে আমাদের নাম লিখে নিন।” (৫:৮২-৮৩)।হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, যাদের ব্যাপারে এটা অবতীর্ণ হয়েছে তাঁরা ছিলেন সত্তরজন খৃষ্টান আলেম।
তারা আবিসিনিয়ার বাদশাহ্ নাজ্জাশী কর্তৃক প্রেরিত প্রতিনিধি ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে সূরায়ে ‘ইয়াসীন’ শুনিয়ে দেন। শোনা মাত্রই তাঁরা কান্নায় ফেটে পড়েন এবং সাথে সাথেই মুসলমান হয়ে যান। তাঁদের ব্যাপারেই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এখানে তাদেরই প্রশংসা করা হয় যে, আয়াতগুলো শোনা মাত্রই তাঁরা। নিজেদেরকে খাটি একত্ববাদী ঘোষণা করেন এবং ইসলাম কবূল করে মুমিন ও মুসলমান হয়ে যান। তাঁদের ব্যাপারেই আল্লাহ পাক বলেনঃ তাদেরকে দু’বার পারিশ্রমিক প্রদান করা হবে। প্রথম পুরস্কার তাঁদের নিজেদের কিতাবের উপর ঈমান আনয়নের কারণে এবং দ্বিতীয় পুরস্কার কুরআনকে বিশ্বাস করে নেয়ার কারণে।
তাঁরা সত্যের অনুসরণে অটল থাকেন, যা প্রকৃতপক্ষে একটি বড় কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ।সহীহ্ হাদীসে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তিন প্রকারের লোককে দ্বিগুণ পুরস্কার দেয়া হবে। প্রথম হলো ঐ আহলে কিতাব যে নিজের নবীকে মেনে নেয়ার পর আমার উপরও ঈমান আনে। দ্বিতীয় হলো ঐ গোলাম যে নিজের পার্থিব মনিবের আনুগত্য করার পর আল্লাহর হকও আদায় করে। তৃতীয় হলো ঐ ব্যক্তি, যার কোন ক্রীতদাসী রয়েছে। তাকে আদব ও বিদ্যা শিক্ষা দেয়। অতঃপর তাকে আযাদ করে দিয়ে বিয়ে করে নেয়।”হযরত কাসেম ইবনে আবি উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “মক্কা বিজয়ের দিন আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সওয়ারীর সাথে ছিলাম এবং তাঁর খুবই নিকটে ছিলাম।
তিনি খুবই ভাল ভাল কথা বলেন। সেদিন তিনি একথাও বলেনঃ “ইয়াহুদী ও নাসারার মধ্যে যে মুসলমান হয়ে যায় তার জন্যে দ্বিগুণ পুরস্কার। তার জন্যে আমাদের সমান (অর্থাৎ সাধারণ মুসলমানের সমান অধিকার রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাঁদের গুণ বর্ণনা করছেন যে, তারা মন্দের প্রতিদান মন্দ দ্বারা গ্রহণ করেন না, বরং ক্ষমা করে দেন। তাঁদের সাথে যারা মন্দ ব্যবহার করে তাদের সাথে তারা উত্তম ব্যবহারই করে থাকেন। তাদের হালাল ও পবিত্র জীবিকা হতে তারা আল্লাহর পথে খরচ করে থাকেন, নিজেদের সন্তানদেরকেও লালন পালন করেন, দান-খয়রাত করার ব্যাপারেও তারা কার্পণ্য করেন না এবং বাজে ও অসার কার্যকলাপ হতে তারা দূরে থাকেন।
যারা অসার কার্যকলাপে লিপ্ত থাকে তাদের সাথে তারা বন্ধুত্ব করেন না। তাদের মজলিস হতে তারা দূরে থাকেন। ঘটনাক্রমে সেখান দিয়ে হঠাৎ গমন করলে ভদ্রভাবে তারা সেখান হতে সরে পড়েন। এইরূপ লোকদের সাথে তারা মেলামেশা করেন না এবং তাদের সাথে ভালবাসাও রাখেন না। পরিষ্কারভাবে তাদেরকে বলে দেনঃ “আমাদের কাজের ফল আমাদের জন্যে এবং তোমাদের কাজের ফল তোমাদের জন্যে। তোমাদের প্রতি সালাম। আমরা অজ্ঞদের সঙ্গ চাই না।” অর্থাৎ তারা অজ্ঞদের কঠোর ভাষাও সহ্য করে নেন। তাদেরকে এমন জবাব দেন না যাতে তারা আরো উত্তেজিত হয়ে যায়। বরং তারা তাদের অপরাধ ক্ষমা করে থাকেন।
যেহেতু তারা নিজেরা পাক-পবিত্র, সেহেতু মুখ দিয়ে পবিত্র কথাই বের করে থাকেন। ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, আবিসিনিয়া হতে প্রায় বিশ জন খৃষ্টান রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন এবং তাঁর সাথে আলাপ আলোচনা শুরু করেন। ঐ সময় কুরায়েশরা নিজ নিজ মজলিসে কাবা ঘরের চতুর্দিকে বসেছিল। ঐ খৃষ্টান আলেমগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে প্রশ্ন করে সঠিক উত্তর পেয়ে যান। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেন এবং কুরআন কারীম পাঠ করে শুনিয়ে দেন। তাঁরা ছিলেন শিক্ষিত ও ভদ্র এবং তাঁদের মস্তিষ্ক ছিল প্রখর। তাই কুরআন কারীম তাঁদের মনকে আকৃষ্ট করলো এবং তাদের চক্ষুগুলো অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো।
তৎক্ষণাৎ তারা দ্বীন ইসলাম কবুল করে নিলেন। তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর ঈমান আনয়ন করলেন। কেননা, আসমানী কিতাবসমূহে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যেসব বিশেষণ তারা পড়েছিলেন সেগুলোর সবই তার মধ্যে বিদ্যমান পেয়েছিলেন। যখন তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হতে বিদায় নিয়ে চলতে শুরু করেন তখন অভিশপ্ত আবূ জেহেল তার লোকজনসহ পথে তাদের সাথে মিলিত হয় এবং তাদেরকে বিদ্রুপ করতে থাকে। তারা তাদেরকে বলেঃ “তোমাদের ন্যায় জঘন্যতম প্রতিনিধি আমরা কখনো কোন কওমের মধ্যে দেখিনি। তোমাদের কওম তোমাদেরকে এই লোকটির (হযরত মুহাম্মদের সঃ) অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার জন্যে এখানে পাঠিয়েছিলেন।
এখানে এসেই তোমরা তোমাদের পিতৃপুরুষদের ধর্ম ত্যাগ করে দিলে এবং এই লোকটির প্রভাব তোমাদের উপর এমনভাবে পড়ে যায় যে, অল্পক্ষণের মধ্যেই তোমরা তোমাদের নিজেদের ধর্ম পরিত্যাগ করে তার ধর্ম গ্রহণ করে বসলে। সুতরাং তোমাদের চেয়ে বড় আহমক আর কেউ আছে কি?” তারা ঠাণ্ডা মনে তাদের কথাগুলো শুনলেন এবং উত্তরে বললেনঃ “আমরা তোমাদের সাথে অজ্ঞতামূলক আলোচনা করতে চাই না। আমাদের ধর্ম আমাদের সাথে এবং তোমাদের ধর্ম তোমাদের সাথে। আমরা যে কথার মধ্যে আমাদের কল্যাণ নিহিত পেয়েছি সেটাই আমরা কবুল করে নিয়েছি।” একথাও বলা হয়েছে যে, তাঁরা ছিলেন নাজরানের খৃষ্টান প্রতিনিধি।
এই ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। এটাও বর্ণিত আছে যে, এ আয়াতগুলো তাদেরই ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। হযরত যুহরী (রঃ)-কে এ আয়াতগুলোর শানে নুযূল জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “আমি তো আমার আলেমদের থেকে শুনে আসছি যে, এ আয়াতগুলো নাজ্জাশী ও তাঁর সাথীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে এবং সূরায়ে মায়েদার (আরবি) হতে (আরবি) (৫:৮২-৮৩) পর্যন্ত এই আয়াতগুলোও তাঁদেরই ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে।
এর আগে আমরা যাদেরকে কিতাব দিয়েছিলাম, তারা এতে ঈমান আনে [১]।
[১] এ আয়াতে সেসব আহলে কিতাবের কথা বলা হয়েছে, যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াত ও কুরআন নাযিলের পূর্বেও তাওরাত ও ইঞ্জীল প্রদত্ত সুসংবাদের ভিত্তিতে কুরআন ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াতে বিশ্বাসী ছিল। এরপর যখন প্রেরিত হন, তখন সাবেক বিশ্বাসের ভিত্তিতে কালবিলম্ব না করে মুসলিম হয়ে যায়। [ইবন কাসীর] যেমন অন্য আয়াতে এসেছে, “যাদেরকে আমরা কিতাব দিয়েছি, তাদের মধ্যে যারা যথাযথভাবে তা তিলাওয়াত করে, তারা তাতে ঈমান আনে।” [সূরা আল-বাকারাহঃ ১২১] কোন কোন ঐতিহাসিক ও জীবনীকার এ ঘটনাকে মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাকের বরাত দিয়ে নিন্মোক্তভাবে বর্ণনা করেছেনঃ ‘আবিসিনিয়ায় হিজরাতের পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াত প্ৰাপ্তি এবং তার দাওয়াতের খবর যখন সেই দেশে ছড়িয়ে পড়লো তখন সেখান থেকে প্রায় ২০ জনের একটি খৃষ্টান প্রতিনিধি দল প্রকৃত অবস্থা অনুসন্ধানের জন্য মক্কায় এলো।
তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে মসজিদে হারামে সাক্ষাৎ করলো। কুরাইশদের বহু লোকও এ ব্যাপার দেখে আশপাশে দাঁড়িয়ে গেলো। প্রতিনিধি দলের লোকেরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কিছু প্রশ্ন করলেন। তিনি সেগুলোর জবাব দিলেন। তারপর তিনি তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন এবং কুরআন মজীদের আয়াত তাদের সামনে পাঠ করলেন। কুরআন শুনে তাদের চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হতে লাগলো। তারা একে আল্লাহ্র বাণী বলে অকুণ্ঠভাবে স্বীকার করলেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ঈমান আনলেন। মজলিস শেষ হবার পর আবু জাহল ও তার কয়েকজন সাথী প্রতিনিধিদলের লোকদেরকে পথে ধরলো এবং তাদেরকে যাচ্ছে তাই বলে তিরস্কার করলো।
তাদেরকে বললো, “তোমাদের সফরটাতো বৃথাই হলো। তোমাদের স্বধৰ্মীয়রা তোমাদেরকে এজন্য পাঠিয়েছিল যে, এ ব্যাক্তির অবস্থা সম্পর্কে তোমরা যথাযথ অনুসন্ধান চালিয়ে প্রকৃত ও যথার্থ ঘটনা তাদেরকে জানাবে। কিন্তু তোমরা সবেমাত্র তার কাছে বসেছিলে আর এরি মধ্যেই নিজেদের ধর্ম ত্যাগ করে তার প্রতি ঈমান আনলে? তোমাদের চেয়ে বেশী নির্বোধ কখনো আমরা দেখিনি।” একথায় তারা জবাব দিল, “ভাইয়েরা, তোমাদের প্রতি সালাম। আমরা তোমাদের সাথে জাহেলী বিতর্ক করতে চাই না। আমাদের পথে আমাদের চলতে দাও এবং তোমরা তোমাদের পথে চলতে থাকো। আমরা জেনেবুঝে কল্যাণ থেকে নিজেদেরকে বঞ্চিত করতে পারি না।” [সীরাতে ইবনে হিশাম, ২/৩২, এবং আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৩/৮২]
[সূরা আল-কাসাস (২৮): আয়াত ৫২ হতে ৫৩] পূর্ণ পৃষ্ঠা
"লাহুম" (তাদের জন্য) সর্বনামটি কুরাইশদের নির্দেশ করছে, এটি মুজাহিদ থেকে বর্ণিত। কেউ কেউ বলেছেন: এটি ইয়াহুদিদের জন্য। আবার কেউ কেউ বলেছেন: এটি তাদের সকলের জন্যই। আর এই আয়াতটি তাদের প্রতি উত্তর যারা বলেছিল, "কেন মুহাম্মাদকে সম্পূর্ণ কুরআন একযোগে প্রদান করা হলো না?" (যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে) ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন: তারা মুহাম্মাদ (সা.)-কে স্মরণ করবে এবং তাঁর প্রতি ঈমান আনবে। কেউ কেউ বলেছেন: তারা উপদেশ গ্রহণ করবে এবং তাদের পূর্ববর্তীদের ওপর যা আপতিত হয়েছিল, তাদের ওপরও তেমন কিছু আপতিত হওয়ার ভয় করবে; এটি আলি ইবনে ঈসা বলেছেন।
আবার কেউ বলেছেন: সম্ভবত তারা কুরআনের মাধ্যমে মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করার শিক্ষা গ্রহণ করবে। এটি আন-নাক্কাশ উল্লেখ করেছেন। [সূরা আল-কাসাস (২৮): আয়াত ৫২ হতে ৫৩]যাদেরকে আমি এর পূর্বে কিতাব প্রদান করেছি, তারা এতে বিশ্বাস স্থাপন করে। (৫২) আর যখন তাদের নিকট এটি পাঠ করা হয়, তখন তারা বলে, "আমরা এতে ঈমান আনলাম; নিশ্চয়ই এটি আমাদের রবের পক্ষ থেকে আগত সত্য। আমরা তো এর পূর্বেই আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) ছিলাম।" (৫৩)মহান আল্লাহর বাণী: (যাদেরকে আমি এর পূর্বে কিতাব প্রদান করেছি, তারা এতে বিশ্বাস স্থাপন করে) এখানে সংবাদ দেওয়া হয়েছে যে, কুরআনের পূর্বে বনী ইসরাঈলের কিতাবধারীদের একটি দল কুরআনের প্রতি ঈমান আনয়ন করেন, যেমন আবদুল্লাহ ইবনে সালাম এবং সালমান (রা.)।
এর অন্তর্ভুক্ত সেই সকল খ্রিস্টান আলেমগণও যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা সংখ্যায় ছিলেন চল্লিশ জন এবং জাফর ইবনে আবি তালিবের সাথে মদিনায় আগমন করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে বত্রিশ জন ছিলেন হাবশা (আবিসিনিয়া) থেকে এবং আট জন ব্যক্তি সিরিয়া থেকে আগমন করেছিলেন, তাঁরা ছিলেন খ্রিস্টানদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি: তাঁদের মধ্যে ছিলেন বাহীরা রাহিব, আবরাহা, আশরাফ, আমির, আয়মান, ইদরিস এবং নাফি। আল-মাওয়ার্দী তাঁদের এভাবেই নামকরণ করেছেন। আর আল্লাহ তাআলা তাঁদের সম্পর্কেই এই আয়াত এবং এর পরবর্তী আয়াত—"তাদেরকে দুই বার প্রতিদান প্রদান করা হবে, যেহেতু তারা ধৈর্য ধারণ করেছে"—নাজিল করেছেন।
এটি কাতাদাহ (রহ.)-এর অভিমত। তাঁর থেকে আরও বর্ণিত হয়েছে যে: এটি আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম, তামীম আদ-দারী, জারুদ আল-আবদী এবং সালমান আল-ফারিসী (রা.)-দের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে; তাঁরা ইসলাম গ্রহণ করলে তাঁদের সম্পর্কেই এই আয়াতটি নাজিল হয়। রিফায়া আল-কুরাজী (রা.) থেকে বর্ণিত: এটি দশ জনের ব্যাপারে নাজিল হয়েছে এবং আমি তাঁদের একজন। উরওয়াহ ইবনে যুবায়ের (রহ.) বলেন: এই আয়াতটি নাজাশী ও তাঁর সঙ্গীদের সম্পর্কে নাজিল হয়েছে। তিনি বারো জন ব্যক্তি প্রেরণ করেছিলেন যারা নবী করীম (সা.)-এর সাথে মজলিসে বসেছিলেন। আবু জাহেল ও তার সঙ্গীরা তাদের নিকটেই ছিল।
তারা নবী (সা.)-এর প্রতি ঈমান আনয়ন করলেন। তারা যখন তাঁর নিকট থেকে প্রস্থান করলেন, তখন আবু জাহেল ও তার সঙ্গীরা তাদের অনুসরণ করল এবং তাদের উদ্দেশ্যে বলল: "আল্লাহ তোমাদের এই আরোহী দলকে ব্যর্থ করুন এবং এই প্রতিনিধি দলকে লাঞ্ছিত করুন। তোমরা তাঁর কথাকে সত্য বলে স্বীকার করতে দেরি করলে না! তোমাদের মতো নির্বোধ ও মূর্খ যাত্রীদল আমরা আর দেখিনি।" তখন তারা বলল: "তোমাদের ওপর সালাম (শান্তি), আমরা আমাদের হিদায়াতের ব্যাপারে কোনো ত্রুটি করিনি। আমাদের আমল আমাদের জন্য এবং তোমাদের আমল তোমাদের জন্য।" ইতিপূর্বে সূরা "আল-মায়িদাহ"-তে এর আলোচনা অতিক্রান্ত হয়েছে।(১).
দেখুন ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫৫ এবং পরবর্তী অংশ, প্রথম অথবা দ্বিতীয় মুদ্রণ।
মারইয়াম, অতঃপর তারা কুরআনের প্রতি ঈমান আনল এবং তাদের চক্ষুসমূহ অশ্রুসিক্ত হলো। আর তারা তারাই, যাদের সম্পর্কে এই আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে: আপনি তাদের অবশ্যই ভালোবাসায় সবচেয়ে নিকটবর্তী পাবেন
থেকে সাক্ষ্যদানকারীদের অন্তর্ভুক্ত
পর্যন্ত।আবদ বিন হুমাইদ, ইবনুল মুনজির, ইবনে আবি হাতিম, আবুশ শাইখ এবং ইবনে মারদুওয়াইহ সাঈদ বিন জুবাইর থেকে এই আয়াত সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন: এটি এজন্য যে, তাদের মধ্যে অনেক আলেম ও সংসারবিরাগী সাধক রয়েছে
। তিনি বলেন: তারা ছিলেন নাজাশির প্রেরিত দূত, যাদের তিনি নিজের এবং তাঁর জাতির ইসলাম গ্রহণের বার্তা দিয়ে পাঠিয়েছিলেন।
তারা সত্তর জন লোক ছিলেন, যাদের তিনি তাঁর জাতির মধ্য হতে শ্রেষ্ঠদের মধ্য থেকে উত্তরোত্তর শ্রেষ্ঠতর এবং ইলমে ফিকহ ও বয়সে প্রবীণদের মধ্য থেকে নির্বাচন করেছিলেন। অন্য বর্ণনায় এসেছে: তিনি তাঁর শ্রেষ্ঠ সঙ্গীদের মধ্য থেকে ত্রিশ জন ব্যক্তিকে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে পাঠিয়েছিলেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর দরবারে উপস্থিত হলেন এবং তাঁর নিকট প্রবেশ করলেন, তখন তিনি তাঁদের সামনে সূরা ইয়াসিন পাঠ করলেন। কুরআন শুনে তারা কাঁদতে লাগলেন এবং বুঝতে পারলেন যে এটিই সত্য। তখন আল্লাহ তাআলা তাঁদের সম্পর্কে অবতীর্ণ করলেন: এটি এজন্য যে, তাদের মধ্যে অনেক আলেম ও সংসারবিরাগী সাধক রয়েছে
—আয়াতের শেষ পর্যন্ত।আর তাঁদের সম্পর্কে এই আয়াতটিও অবতীর্ণ হয়েছে: যাদেরকে আমি এর পূর্বে কিতাব দিয়েছি, তারা এতে বিশ্বাস স্থাপন করে
(সূরা আল-কাসাস, আয়াত ৫২) থেকে তাদেরকে তাদের পুরস্কার দুবার দেওয়া হবে, যেহেতু তারা ধৈর্য ধারণ করেছে
(সূরা আল-কাসাস, আয়াত ৫৪) পর্যন্ত।
ইবনে আবি শাইবা এবং আবুশ শাইখ উরওয়াহ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: তাঁরা মনে করতেন যে এই আয়াতটি নাজাশি সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে: আর যখন তারা শোনে যা রাসূলের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে
। তিনি বলেন: তারা ছিলেন নাবিক, যারা জাফর বিন আবি তালিবের সাথে হাবশা থেকে এসেছিলেন। যখন আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁদের সামনে কুরআন পাঠ করলেন, তখন তারা ঈমান আনলেন এবং তাঁদের চক্ষু অশ্রুসিক্ত হলো। তখন আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: ‘যখন তোমরা তোমাদের দেশে ফিরে যাবে, তখন কি তোমরা তোমাদের দ্বীন থেকে বিচ্যুত হবে?’ তারা বললেন: ‘আমরা কখনোই আমাদের দ্বীন থেকে বিচ্যুত হব না।’ তখন আল্লাহ তাআলা তাঁদের এই বক্তব্য থেকে অবতীর্ণ করলেন: আর যখন তারা শোনে যা রাসূলের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে
।আবুশ শাইখ কাতাদাহ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমাদের কাছে বর্ণিত হয়েছে যে, এই আয়াতটি তাঁদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে যারা হাবশা থেকে জাফরের সাথে এসেছিলেন।
জাফর হাবশায় হিজরত করেছিলেন এবং তাঁর সাথে কুরাইশদের চল্লিশ জন এবং আশআরী গোত্রের পঞ্চাশ জন লোক ছিল। তাঁদের মধ্যে আক গোত্রের চারজন ব্যক্তি ছিলেন, যাঁদের মধ্যে সবার বড় ছিলেন আবু আমির আল-আশআরী এবং সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন আমির। আমাদের কাছে আরও বর্ণিত হয়েছে যে, কুরাইশরা তাঁদের খোঁজে আমর ইবনুল আস এবং উমারা বিন আল-ওয়ালিদকে পাঠিয়েছিল। তারা নাজাশির কাছে গিয়ে বলল: ‘নিশ্চয়ই এই লোকগুলো তাদের জাতির ধর্ম নষ্ট করে দিয়েছে।’ তখন নাজাশি তাঁদের ডেকে পাঠালেন। তাঁরা আসার পর তিনি তাঁদের জিজ্ঞাসা করলেন। তাঁরা বললেন: ‘আল্লাহ আমাদের মধ্যে একজন নবী পাঠিয়েছেন যেমনটি আমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলোর মধ্যে পাঠিয়েছিলেন।
তিনি আমাদের এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করেন, আমাদের সৎ কাজের আদেশ দেন এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করেন। তিনি আমাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার আদেশ দেন এবং তা ছিন্ন করতে নিষেধ করেন। তিনি আমাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষার আদেশ দেন এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে নিষেধ করেন। আর আমাদের স্বজাতি আমাদের ওপর জুলুম করেছে এবং আমাদের বের করে দিয়েছে যখন আমরা তাঁকে সত্য বলে গ্রহণ করেছি এবং তাঁর ওপর ঈমান এনেছি। অতঃপর আমরা পাইনি...’
