Al-Qasas
আল-কাসাস: 38
মূল আরবি
وَقَالَ فِرْعَوْنُ يَـٰٓأَيُّهَا ٱلْمَلَأُ مَا عَلِمْتُ لَكُم مِّنْ إِلَـٰهٍ غَيْرِى فَأَوْقِدْ لِى يَـٰهَـٰمَـٰنُ عَلَى ٱلطِّينِ فَٱجْعَل لِّى صَرْحًا لَّعَلِّىٓ أَطَّلِعُ إِلَىٰٓ إِلَـٰهِ مُوسَىٰ وَإِنِّى لَأَظُنُّهُۥ مِنَ ٱلْكَـٰذِبِينَ
English Translations
And Pharaoh said, "O eminent ones, I have not known you to have a god other than me. Then ignite for me, O Hāmān, [a fire] upon the clay and make for me a tower that I may look at the God of Moses. And indeed, I do think he is among the liars."
Fir'aun (Pharaoh) said: "O chiefs! I know not that you have an ilah (a god) other than me, so kindle for me (a fire), O Haman, to bake (bricks out of) clay, and set up for me a Sarhan (a lofty tower, or palace, etc.) in order that I may look at (or look for) the Ilah (God) of Musa (Moses); and verily, I think that he [Musa (Moses)] is one of the liars."
And Pharaoh said (to his people,) “O courtiers, I do not recognize any god for you other than me. So kindle for me, O Hāmān, a fire on the clay (to bake bricks) and build for me a tower, so that I may look on to the God of Mūsā. I deem him to be one of the liars.”
Pharaoh said: "O nobles, I do not know that you have any god beside myself. Haman, bake bricks out of clay and build a lofty palace for me so that I may mount up and be able to observe the god of Moses, even though I believe that Moses is a liar."
And Pharaoh said: O chiefs! I know not that ye have a god other than me, so kindle for me (a fire), O Haman, to bake the mud; and set up for me a lofty tower in order that I may survey the god of Moses; and lo! I deem him of the liars.
Pharaoh said: "O Chiefs! no god do I know for you but myself: therefore, O Haman! light me a (kiln to bake bricks) out of clay, and build me a lofty palace, that I may mount up to the god of Moses: but as far as I am concerned, I think (Moses) is a liar!"
বাংলা অনুবাদ
ফিরআউন বলল- ‘হে পারিষদবর্গ! আমি ছাড়া তোমাদের কোন ইলাহ আছে বলে আমি জানি না। কাজেই ওহে হামান! তুমি আমার জন্য ইট পোড়াও, অতঃপর আমার জন্য একটি প্রাসাদ নির্মাণ কর যাতে আমি মূসার ইলাহকে দেখতে পারি, আমার নিশ্চিত ধারণা যে, সে একজন মিথ্যেবাদী।’
আর ফির‘আউন বলল, ‘হে পারিষদবর্গ, আমি ছাড়া তোমাদের কোন ইলাহ আছে বলে আমি জানি না। অতএব হে হামান, আমার জন্য তুমি ইট পোড়াও, তারপর আমার জন্য একটি প্রাসাদ তৈরী কর। যাতে আমি মূসার ইলাহকে দেখতে পাই। আর নিশ্চয় আমি মনে করি সে মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত’।
ফির‘আউন বললঃ হে পরিষদবর্গ! আমি ছাড়া তোমাদের অন্য উপাস্য আছে বলে আমি জানিনা। হে হামান! তুমি আমার জন্য ইট পোড়াও এবং একটি সুউচ্চ প্রাসাদ তৈরী কর; হয়তো আমি তাতে উঠে মূসার মা‘বূদকে দেখতে পাব। তবে আমি অবশ্য মনে করি যে, সে মিথ্যাবাদী।
আর ফির‘আউন বলল, ‘হে পরিষদবর্গ ! আমি ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো ইলাহ আছে বলে জানি না ! অতএব হে হামান! তুমি আমার জন্য ইট পোড়াও এবং একটি সুউচ্চ প্রাসাদ তৈরী কর; হয়ত আমি সেটাতে উঠে মূসার ইলাহকে দেখতে পারি। আর আমি তো মনে করি, সে অবশ্যই মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত।’
ফির‘আউন বলল: ‘হে পারিষদবর্গ। আমি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন ইলাহ আছে বলে আমি জানি না। হে হামান! তুমি আমার জন্য ইট পোড়াও এবং একটি সুউচ্চ প্রাসাদ তৈরি কর; হয়ত আমি তাতে উঠে মূসার ইলাহকে দেখতে পাব। তবে আমি অবশ্যই মনে করি সে মিথ্যাবদী।’
৩৮. ফিরআউন তার বংশের নেতৃস্থানীয়দেরকে সম্বোধন করে বললো: হে গণ্যমান্যরা! আমি ছাড়া তোমাদের জন্য কোন মা’বূদ আছে বলে আমার জানা নেই। সুতরাং হে হামান! তুমি আমার জন্য মাটি পুড়িয়ে ইট বানাও। অতঃপর আমার জন্য একটি সুউচ্চ প্রাসাদ তৈরি করো। যাতে আমি মূসার মা’বূদকে দেখতে ও তার সম্পর্কে কিছু জানতে পারি। আমার নিশ্চিত ধারণা যে, মূসা তার দাবিতে তথা তাকে যে আমি ও আমার বংশের লোকদের নিকট পাঠানো হয়েছে সে দাবিতে সে একজন মিথ্যুক।
তাফসীর
৩৮-৪২ নং আয়াতের তাফসীরএখানে ফিরাউনের ঔদ্ধত্যপনা এবং তার খোদায়ী দাবীর বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। যে, সে তার কওমকে নির্বোধ বানিয়ে তাদের দ্বারা তার দাবী আদায় করে। সে ঐ ইতর ও অজ্ঞদেরকে একত্রিত করে উচ্চস্বরে বলেঃ “তোমাদের রব, বা প্রতিপালক আমিই। সবচেয়ে উচ্চ ও উন্নত অস্তিত্ব আমারই।” তার এই ঔদ্ধত্য ও হঠকারিতার কারণে আল্লাহ তা'আলা তাকে দুনিয়া ও আখিরাতের শাস্তিতে পাকড়াও করেন। আর অন্যান্যদের জন্যে এটাকে শিক্ষণীয় বিষয় করেন। ঐ ইতর লোকেরা তাকে খোদা মেনে নিয়ে তার দম্ভ এত বাড়িয়ে দিয়েছিল যে, সে কালীমুল্লাহ হযরত মূসা (আঃ)-কে ধমকের সুরে বলেছিলঃ “তুমি যদি আমাকে ছাড়া অন্য কাউকেও মাবুদ বানিয়ে নাও তবে আমি তোমাকে কয়েদখানায় বন্দী করবো।” সে ঐ নিম্নস্তরের লোকদের মধ্যে বসে তাদের দ্বারা নিজের দাবী পূরণ করে নিয়ে তারই মত ম্লেচ্ছ উযীর হামানকে বললো: “হে হামান!
তুমি আমার জন্যে ইট পোড়াও এবং একটি সুউচ্চ প্রাসাদ তৈরী কর; যেন আমি তাতে উঠে দেখতে পারি যে, সত্যি মূসা (আঃ)-এর কোন মা'বুদ আছে কি না। সে যে প্রতারক এটা তো আমার নিকট পরিষ্কার, কিন্তু আমি চাই যে, সে যে মিথ্যাবাদী এটা যেন তোমাদের সবারই নিকট প্রকাশ হয়ে পড়ে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “ফিরাউন বললো: হে হামান! আমার জন্যে তুমি নির্মাণ কর এক সুউচ্চ প্রাসাদ যাতে আমি পাই অবলম্বন-আসমানে আরোহণের অবলম্বন, যেন দেখতে পাই মূসা (আঃ)-এর মা'বুদকে; তবে তাকে তো আমি মিথ্যাবাদী মনে করি। এভাবেই ফিরাউনের নিকট শোভনীয় করা হয়েছিল তার মন্দ কর্মকে এবং তাকে নিবৃত্ত করা হয়েছিল সরল পথ হতে এবং ফিরাউনের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়েছিল সম্পূর্ণরূপে।” (৪০:৩৬-৩৭) সুতরাং তার জন্যে এমন সুউচ্চ প্রাসাদ নির্মাণ করা হয় যা দুনিয়ায় কখনো দেখা যায়নি।
ফিরাউন যে শুধু হযরত মূসা (আঃ)-এর রিসালাতকে অস্বীকার করেছিল তা নয়, বরং সেতো আল্লাহর অস্তিত্বকেই বিশ্বাস করতো না। যেহেতু সে হযরত মূসা (আঃ)-কে প্রশ্ন করেছিলঃ (আরবি) অর্থাৎ “জগতসমূহের প্রতিপালক কি?” সে এও বলেছিল : “হে মূসা (আঃ)! তুমি আমাকে ছাড়া যদি অন্য কাউকেও মাবুদ মেনে থাকো তবে আমি তোমাকে বন্দী করে দেবো।”এখানে ফিরাউন তার পারিষদবর্গকে বলেছিলঃ “হে পারিষদবর্গ! আমি ছাড়া তোমাদের জন্যে কোন মা'বুদ আছে বলে আমার জানা নেই।” যখন তার ও তার কওমের ঔদ্ধত্য ও হঠকারিতা চরমে পৌঁছে যায়, দেশে তাদের বিপর্যয় সৃষ্টি সীমাছাড়িয়ে যায়, তাদের আকীদা অচল পয়সার মত হয়ে পড়ে এবং কিয়ামতের হিসাব কিতাবকে তারা সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে বসে তখন শেষ পর্যন্ত তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি নেমে আসে এবং তারা ভূ-পৃষ্ঠ হতে সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
একই শাস্তি সবকে পেয়ে বসে এবং একই দিনে, একই সময়ে এবং একই সাথে তাদেরকে সমুদ্রে নিমজ্জিত করা হয়। সুতরাং হে লোক সকল! তোমরা চিন্তা করে দেখো, যালিমদের পরিণাম কি হয়ে থাকে।এরপর মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “তাদেরকে আমি নেতা করেছিলাম; তারা লোকদেরকে জাহান্নামের দিকে আহ্বান করতো। যারাই তাদের পথে চলেছে তাদেরকেই তারা জাহান্নামে নিয়ে গেছে। যারাই রাসূলদেরকে অবিশ্বাস করেছে এবং আল্লাহ তা'আলাকে অমান্য করেছে তারাই তাদের পথে রয়েছে। কিয়ামতের দিন তাদেরকে কোন সাহায্য করা হবে না। উভয় জগতেই তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমি তাদেরকে ধ্বংস করেছি এবং তাদেরকে সাহায্য করার কেউ ছিল না।” (৪৭:১৩) দুনিয়াতেও এরা অভিশপ্ত হলো।
তাদের উপর আল্লাহর, তার ফেরেশতাদের, তাঁর নবীদের এবং সমস্ত সৎ লোকের অভিসম্পাত। যে কোন ভাল লোক তাদের নাম শুনবে সেই তাদেরকে অভিশাপ দেবে। সুতরাং দুনিয়াতেও তারা অভিশপ্ত হলো এবং আখিরাতেও তারা হবে ঘৃণিত। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি আল্লাহ তা'আলার নিম্নের উক্তির মতঃ (আরবি)অর্থাৎ “এই দুনিয়ায় তাদেরকে করা হয়েছিল অভিশাপগ্রস্ত এবং অভিশাপগ্রস্ত হবে তারা কিয়ামতের দিনেও। কত নিকৃষ্ট সেই পুরস্কার যা তারা লাভ করবে।” (১১:৯৯)
আর ফির‘আউন বলল, ‘হে পরিষদবর্গ ! আমি ছাড়া তোমাদের অন্য কোন ইলাহ আছে বলে জানি না ! অতএব হে হামান! তুমি আমার জন্য ইট পোড়াও এবং একটি সুউচ্চ প্রাসাদ তৈরী কর; হয়ত আমি সেটাতে উঠে মূসার ইলাহকে দেখতে পারি। আর আমি তো মনে করি, সে অবশ্যই মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত।’
[সূরা আল-কাসাস (২৮): আয়াত ৩৬ থেকে ৪২] পূর্ণ পৃষ্ঠা
তিনি একটি বর্শার বর্ণনা দিচ্ছেন: এবং তামাটে বর্ণের। এটি একটি কাব্যপঙ্ক্তি। আল-জাওহারী বলেন: কোনো কিছু খারাপ হওয়া অর্থে ‘রাদউয়া’ (رَدُؤَ) ব্যবহৃত হয়, সে হিসেবে এটি ‘রাদী’ (ردئ) অর্থাৎ মন্দ বা নষ্ট। আর ‘আরদাতুহু’ অর্থ আমি তাকে নষ্ট করেছি। আবার ‘আরদাতুহু’ শব্দটি সাহায্য করা অর্থেও ব্যবহৃত হয়। আপনি বলবেন: ‘আমি স্বয়ং তাকে সাহায্য করেছি’, অর্থাৎ আমি তার জন্য ‘রিদউন’ (রূদ) বা সাহায্যকারী ছিলাম। মহান আল্লাহ বলেছেন: “সুতরাং তাকে আমার সাথে সাহায্যকারী হিসেবে প্রেরণ করুন, যে আমাকে সত্যায়ন করবে।” আন-নাহহাস বলেন: ‘রাদআতুহু’ (رَدَأْتُهُ) রূপটিও বর্ণিত হয়েছে।
‘রিদউন’ এর বহুবচন হলো ‘আরদাউন’। আসিম এবং হামযাহ ‘ইউসাদ্দিকুনি’ (يُصَدِّقُنِي) শব্দটি পেশ যোগে পড়েছেন। অন্য পাঠকরা জজম বা সাকিন দিয়ে পড়েছেন; প্রার্থনার উত্তর হিসেবে আবু হাতিমের নিকট এটিই পছন্দনীয়। আবু উবাইদ পেশ যোগে পড়াকেই পছন্দ করেছেন, ‘ফা-আরসিলহু’ (فَأَرْسِلْهُ) এর মধ্যে থাকা ‘হু’ সর্বনাম থেকে ‘হাল’ বা অবস্থা হিসেবে। অর্থাৎ, তাকে এমন অবস্থায় সাহায্যকারী হিসেবে প্রেরণ করুন যখন সে সত্যায়ন করবে। যেমন আল্লাহর বাণী: “আমাদের জন্য আকাশ থেকে এক দস্তরখান অবতীর্ণ করুন যা হবে...”, অর্থাৎ যা বিদ্যমান হবে; এটি এমন একটি বর্তমান অবস্থা যা ভবিষ্যৎকাল নির্দেশ করে।
আবার এটি ‘রিদউন’ শব্দের বিশেষণ হওয়াও সম্ভব। (আমি ভয় পাচ্ছি যে তারা আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে) যখন আমার কোনো উজির বা সাহায্যকারী থাকবে না; কারণ তারা আমার কথা সহজে বুঝতে পারে না। তখন মহান আল্লাহ তাকে (বললেন): (আমি তোমার ভাইয়ের মাধ্যমে তোমার বাহুকে শক্তিশালী করব) অর্থাৎ আমি তোমাকে তার মাধ্যমে শক্তিশালী করব। এটি একটি রূপক প্রকাশ, কারণ হাতের শক্তি বাহুর মাধ্যমে সুসংহত হয়। তারাফাহ বলেছেন:হে লুবাইনার বংশধররা! তোমরা তো কোনো শক্তিশালী হাত নও … কেবল এমন এক হাত যার কোনো বাহু নেই।কল্যাণের কামনায় বলা হয়: ‘আল্লাহ তোমার বাহুকে (শক্তিকে) সুদৃঢ় করুন’।
আর এর বিপরীতে বলা হয়: ‘আল্লাহ তোমার বাহু চূর্ণ করুন’। (এবং আমি তোমাদের উভয়কে প্রতিপত্তি দান করব) অর্থাৎ দলিল ও অকাট্য প্রমাণ। (ফলে তারা তোমাদের নিকট পৌঁছাতে পারবে না) কোনো প্রকার অনিষ্ট নিয়ে। (আমার নিদর্শনাবলীর মাধ্যমে) অর্থাৎ তোমরা আমার নিদর্শনাবলীর কারণে তাদের থেকে নিরাপদ থাকবে। এমতাবস্থায় ‘তোমাদের নিকট’ শব্দে থামা সম্ভব এবং বাক্যের বিন্যাসে অগ্র-পশ্চাৎ হওয়ার অবকাশ রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন: এর প্রচ্ছন্ন অর্থ হলো ‘তোমরা এবং যারা তোমাদের অনুসরণ করবে তারা বিজয়ী হবে’ আমার নিদর্শনাবলীর কারণে। এটি আল-আখফাশ ও আত-তাবারী বলেছেন।
আল-মাহদাবী বলেন: এতে সংযোগকারী অংশটি (সিলাহ) তার সম্পর্কিত পদের (মাওসুল) পূর্বে চলে আসে, যদি না এমনটি ধরে নেওয়া হয় যে—তোমরা আমার নিদর্শনাবলীর কারণে বিজয়ী হবে এবং তোমরা ও তোমাদের অনুসারীরাই প্রবল থাকবে। এখানে নিদর্শনাবলী বলতে তাঁর সকল মুজিজাকে বোঝানো হয়েছে। [সূরা আল-কাসাস (২৮): আয়াত ৩৬ থেকে ৪২]অতঃপর মূসা যখন তাদের কাছে আমার সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী নিয়ে আসলেন, তখন তারা বলল, “এ তো অলীক জাদু ছাড়া আর কিছুই নয়। আমাদের পূর্বপুরুষদের আমলে আমরা এ জাতীয় কথা কখনও শুনিনি।” (৩৬) মূসা বললেন, “আমার পালনকর্তা ভালো করেই জানেন কে তাঁর নিকট থেকে হেদায়েত নিয়ে এসেছে এবং কার জন্য আখেরাতের শুভ পরিণাম নির্ধারিত।
নিশ্চয়ই জালেমরা সফলকাম হয় না।” (৩৭) ফেরাউন বলল, “হে পরিষদবর্গ, আমি তোমাদের জন্য (আমি ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য আছে বলে) জানি না...
পূর্ণ পৃষ্ঠা পূর্ণ পৃষ্ঠা পূর্ণ পৃষ্ঠা
হে আল্লাহ, আমি আপনাকে সাক্ষী রাখছি যে আমি এটি আপনার পথে দান করলাম।আর অন্যজন সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তার পরিবারের লোকজন তার থেকে দূরে সরে গিয়েছিল এবং পুনরায় তার নিকট একত্রিত হয়েছিল। তখন সে বলল: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে অনেক যুদ্ধ করেছি, তাই এই বছর যদি আমি আমার পরিবারের সাথে থাকতাম!অতঃপর যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবীগণ বের হয়ে গেলেন, তখন সে বলল: হে পরিবারবর্গ! তোমাদের প্রতি অতিরিক্ত মায়াই আমাকে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং আল্লাহর পথে মুজাহিদদের সেই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া থেকে পিছিয়ে রেখেছে।
হে আল্লাহ! আপনার নিকট আমার অঙ্গীকার রইল যে, যতক্ষণ না আপনি আমার ব্যাপারে চূড়ান্ত ফয়সালা করেন, ততক্ষণ আমি আমার পরিবার ও সম্পদের কাছে ফিরে যাব না।আর অপর ব্যক্তি বলল: হে আল্লাহ! আপনার নিকট আমার অঙ্গীকার রইল যে, আমি অবশ্যই এই দলের সাথে মিলিত হব, যতক্ষণ না আমি তাদের নাগাল পাই অথবা আমার শক্তি শেষ হয়ে যায়।অতঃপর সে উঁচু-নিচু ও ধূলিময় পথ অতিক্রম করতে লাগল এবং শেষ পর্যন্ত কাফেলার নাগাল পেল। তখন আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন, "আল্লাহ ক্ষমা করেছেন নবীকে..." আয়াতের শেষ পর্যন্ত: "এবং সেই তিনজনের প্রতি যাদের ফয়সালা স্থগিত রাখা হয়েছিল, এমনকি পৃথিবী প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য তা সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল।" হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: সুবহানাল্লাহ!
আল্লাহর কসম, তারা কোনো হারাম সম্পদ ভোগ করেননি, কোনো নিষিদ্ধ রক্তপাত করেননি এবং পৃথিবীতে কোনো ফাসাদ সৃষ্টি করেননি; বরং তারা কল্যাণের একটি কাজ অর্থাৎ আল্লাহর পথে জিহাদ থেকে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিলেন মাত্র। অথচ আল্লাহর কসম, তারা পূর্বে বহু জিহাদ করেছেন, জিহাদ করেছেন এবং জিহাদ করেছেন। তবুও তাদের অবস্থা যা শুনলেন তা-ই হলো। মুমিনের ক্ষেত্রে একটি গুনাহের পরিণতি এভাবেই প্রকাশ পায়।ইবনে আবি হাতিম এবং আবুশ শাইখ দাহহাক থেকে আল্লাহর বাণী "এবং সেই তিনজনের প্রতি যাদের স্থগিত রাখা হয়েছিল" সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন যে, এর অর্থ হলো তাদের তওবাকে পিছিয়ে রাখা হয়েছিল।
আবু লুবাবা এবং তাঁর সাথীদের তওবা কবুল না হওয়া পর্যন্ত তাদের তওবা কবুল করা হয়নি।আবদুর রাজ্জাক, ইবনে জারির, ইবনুল মুনজির, আবুশ শাইখ এবং ইবনে আসাকির ইকরিমা থেকে আল্লাহর বাণী "এবং সেই তিনজনের প্রতি যাদের স্থগিত রাখা হয়েছিল" সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন যে, এর অর্থ হলো যাদের তওবা স্থগিত ছিল।ইবনে আবি হাতিম ইকরিমা ইবনে খালিদ মাখজুমি থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি আয়াতটি "এবং সেই তিনজনের প্রতি যারা পেছনে রয়ে গিয়েছিল" হিসেবে পড়তেন; অর্থাৎ যারা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবীদের প্রস্থানের পর পেছনে থেকে গিয়েছিল।ইবনুল মুনজির এবং ইবনে আবি হাতিম ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আল্লাহ তাআলা তাকেও তওবার দিকে আহ্বান করেছেন যে বলেছিল— "আমিই তোমাদের শ্রেষ্ঠ রব" (সূরা আন-নাজিআত, আয়াত: ২৪)।এবং বলেছিল— "আমি ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো উপাস্য আছে বলে আমার জানা নেই" (সূরা আল-কাসাস, আয়াত: ৩৮)।
এমতাবস্থায় এসবের পরেও যারা বান্দাদের তওবা থেকে নিরাশ করে, তারা মূলত আল্লাহর কিতাবকে অস্বীকার করল। তবে বান্দা ততক্ষণ তওবা করতে সক্ষম হয় না যতক্ষণ না আল্লাহ তওবার তাওফিক দেন। আর এটাই মহান আল্লাহর বাণীর অর্থ— "অতঃপর তিনি তাদের প্রতি দয়াশীল হলেন যেন তারা তওবা করতে পারে।" সুতরাং তওবার প্রারম্ভ খোদ মহান আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়। আয়াত ১১৯
ইমাম তাবারানি 'আল-আওসাত'-এ আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন: জিবরাইল (আলাইহিস সালাম) আমাকে বলেছেন, "পৃথিবীর বুকে ফেরাউনের চেয়ে অধিক ঘৃণিত আমার কাছে আর কেউ ছিল না। অতঃপর যখন সে ঈমান আনল (অর্থাৎ কালেমা পাঠের উপক্রম করল), তখন আমি তার মুখে কাদা পুরে দিতে শুরু করলাম এবং তাকে ডুবিয়ে দিচ্ছিলাম এই আশঙ্কায় যে পাছে তাকে আল্লাহর রহমত স্পর্শ করে।"ইবনে জারীর এবং বায়হাকি 'শুআবুল ঈমান'-এ আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন: জিবরাইল (আলাইহিস সালাম) আমাকে বলেছেন, "হে মুহাম্মদ!
আপনি যদি আমাকে দেখতেন যখন আমি এক হাত দিয়ে ফেরাউনকে তলিয়ে দিচ্ছিলাম এবং তার মুখে সমুদ্রের তলদেশের কাদা পুরে দিচ্ছিলাম এই ভয়ে যে, পাছে তাকে রহমত পেয়ে বসে এবং তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়।"ইবনে মারদুওয়াইহ ইবনে ওমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি: জিবরাইল (আলাইহিস সালাম) আমাকে বলেছেন, "আপনার প্রতিপালক ফেরাউনের ওপর যতটা রাগান্বিত হয়েছিলেন, অন্য কারও ওপর ততটা রাগান্বিত হননি; যখন সে বলেছিল: 'আমি তোমাদের জন্য আমি ব্যতীত অন্য কোনো উপাস্য আছে বলে জানি না' (সূরা আল-কাসাস, আয়াত: ৩৮) এবং যখন সে বলেছিল: 'আমিই তোমাদের শ্রেষ্ঠ প্রতিপালক' (সূরা আন-নাজিআত, আয়াত: ২৪)।
অতঃপর যখন সে নিমজ্জিত হতে লাগল, তখন সে আর্তনাদ করল এবং আমি তার মুখে কাদা পুরে দিতে লাগলাম এই ভয়ে যে, পাছে তাকে রহমত স্পর্শ করে।"আবুশ শেখ সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: ফেরাউনের ডুবে মরার দিন জিবরাইল (আলাইহিস সালাম)-এর পরিহিত পাগড়িটি ছিল কালো রঙের।আবুশ শেখ আবু উমামাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন: জিবরাইল (আলাইহিস সালাম) আমাকে বলেছেন, "আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে আমি ইবলিসকে যতটা ঘৃণা করেছি—যেদিন তাকে সিজদা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল আর সে অস্বীকার করেছিল—তার চেয়ে বেশি কাউকে ঘৃণা করিনি; তবে ফেরাউনকে আমি তার চেয়েও চরমভাবে ঘৃণা করেছি।
যখন তার নিমজ্জনের দিন এল, আমি শংকিত হলাম যে সে হয়তো ইখলাসের বাণী (তাওহীদ) আঁকড়ে ধরবে এবং মুক্তি পেয়ে যাবে; তাই আমি এক মুষ্টি কাদা নিয়ে তার মুখে ছুড়ে মারলাম। তখন আমি আল্লাহকে তার ওপর আমার চেয়েও অধিক রাগান্বিত দেখতে পেলাম। অতঃপর আল্লাহ মিকাইল (আলাইহিস সালাম)-কে নির্দেশ দিলেন তাকে ভর্ৎসনা করার জন্য, আর তিনি বললেন: 'এখন? অথচ ইতিপূর্বে তুমি অবাধ্যতা করেছিলে এবং তুমি বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে'।"ইবনে আবি হাতিম আস-সুদ্দী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আল্লাহ তাআলা মিকাইল (আলাইহিস সালাম)-কে তার কাছে পাঠিয়েছিলেন তাকে তিরস্কার করার জন্য, অতঃপর তিনি বললেন: "এখন?
অথচ ইতিপূর্বে তুমি নাফরমানি করেছিলে।"ইবনে মুনজির এবং তাবারানি 'আল-আওসাত'-এ আবু বকর সিদ্দিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন: আমাকে জানানো হয়েছে যে ফেরাউন ছিল সম্মুখের দাঁতহীন। আয়াত ৯২
আবদ ইবনে হুমাইদ এবং ইবনুল মুনযির ইকরিমা থেকে আপনার কি পবিত্র হওয়ার আগ্রহ আছে?
- এই আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আপনার কি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই) বলার আগ্রহ আছে?বায়হাকী ‘আল-আসমা ওয়াস-সিফাত’-এ ইকরিমার সূত্রে ইবনে আব্বাস থেকে আপনার কি পবিত্র হওয়ার আগ্রহ আছে?
- এই আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই—এ কথা বলার (আগ্রহ আছে)?ইবনুল মুনযির ইবনে জুরাইজ থেকে আপনার কি পবিত্র হওয়ার আগ্রহ আছে?
- এই আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: একনিষ্ঠ হওয়ার (আগ্রহ আছে?)।
আর অতঃপর সে পিঠ ফিরিয়ে দ্রুতপদে প্রস্থান করল
- এই আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন: এটি দৌড়ানোর অর্থে নয়, বরং ফাসাদ ও নাফরমানির কাজে লিপ্ত হওয়ার অর্থে।ইবনুল মুনযির রাবী' থেকে অতঃপর সে পিঠ ফিরিয়ে দ্রুতপদে প্রস্থান করল
- এই আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: সে সত্য থেকে বিমুখ হলো এবং (অনিষ্টের জন্য) সচেষ্ট হলো।ইবনে আবি হাতিম সুদ্দী থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, "হে ফেরাউন! তোমার কি এতে আগ্রহ আছে যে, আমি তোমাকে তোমার যৌবন ফিরিয়ে দেব যাতে তুমি কখনো বৃদ্ধ হবে না, তোমার রাজত্ব তোমার থেকে কেড়ে নেওয়া হবে না, তোমার দাম্পত্য, পানাহার ও সওয়ারির স্বাদ বজায় থাকবে এবং তুমি মারা গেলে জান্নাতে প্রবেশ করবে—শর্ত হলো তুমি আমার প্রতি ঈমান আনবে?" এই কথাগুলো তার মনে দাগ কাটল, আর এগুলোই ছিল সেই ‘নরম কথা’।
সে বলল, "হামান আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো।" যখন হামান আসল, সে তাকে বিষয়টি জানাল। তখন হামান তাকে নিরুৎসাহিত করল এবং বলল, "আপনি কি একজন দাসে পরিণত হবেন, যেখানে আপনি নিজেই একজন উপাস্য রব?" তখনই সে তাদের কাছে বের হয়ে আসল এবং তার কওমকে সমবেত করে বলল, আমিই তোমাদের শ্রেষ্ঠ পালনকর্তা
।ইবনে জারীর ইবনে আব্বাস থেকে ফলশ্রুতিতে আল্লাহ তাকে পরকাল ও ইহকালের শাস্তিতে পাকড়াও করলেন
- এই আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: (শেষেরটি হলো) তার এই উক্তি: আমিই তোমাদের শ্রেষ্ঠ পালনকর্তা
, আর প্রথমটি হলো তার উক্তি: আমি জানতাম না (তোমাদের জন্য আমি ছাড়া কোনো ইলাহ আছে)
।আবদ ইবনে হুমাইদ ইকরিমা ও দাহহাক থেকেও অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।আবদ ইবনে হুমাইদ শাবী থেকে ফলশ্রুতিতে আল্লাহ তাকে পরকাল ও ইহকালের শাস্তিতে পাকড়াও করলেন
- এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: এগুলো হলো তার দুটি উক্তি।
প্রথমটি হলো: আমি তোমাদের জন্য আমি ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য আছে বলে জানি না
(সূরা আল-কাসাস, আয়াত ৩৮), আর অপরটি হলো: আমিই তোমাদের শ্রেষ্ঠ পালনকর্তা
। এই দুই উক্তির মাঝে ব্যবধান ছিল চল্লিশ বছর।আবদ ইবনে হুমাইদ এবং ইবনে আবি হাতিম আবদুল্লাহ ইবনে আমর থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: তার দুই উক্তির মাঝে ব্যবধান ছিল চল্লিশ বছর।আবদুর রাজ্জাক এবং ইবনুল মুনযির খাইসামা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: ফেরাউনের উক্তি আমি তোমাদের জন্য আমি ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য আছে বলে জানি না
এবং তার উক্তি আমিই তোমাদের শ্রেষ্ঠ পালনকর্তা
-এর মাঝে ব্যবধান ছিল চল্লিশ বছর।
আয়াত ২৭ - ৪৬
