Al-Qasas

আল-কাসাস: 56

28:56
টেক্সট কপি
28 আল-কাসাস Al-Qasas · 88 আয়াত القصص

মূল আরবি

إِنَّكَ لَا تَهْدِى مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَـٰكِنَّ ٱللَّهَ يَهْدِى مَن يَشَآءُ ۚ وَهُوَ أَعْلَمُ بِٱلْمُهْتَدِينَ

English Translations

Sahih International

Indeed, [O Muḥammad], you do not guide whom you like, but Allāh guides whom He wills. And He is most knowing of the [rightly] guided.

Muhsin Khan

Verily! You (O Muhammad SAW) guide not whom you like, but Allah guides whom He wills. And He knows best those who are the guided.

Taqi Usmani

You cannot give guidance to whomsoever you wish, but Allah gives guidance to whomsoever He wills, and He best knows the ones who are on the right path.

Abul Ala Maududi

(O Prophet), you cannot grant guidance to whom you please. It is Allah Who guides those whom He will. He knows best who are amenable to guidance.

Pickthall

Lo! thou (O Muhammad) guidest not whom thou lovest, but Allah guideth whom He will. And He is Best Aware of those who walk aright.

Yusuf Ali

It is true thou wilt not be able to guide every one, whom thou lovest; but Allah guides those whom He will and He knows best those who receive guidance.

বাংলা অনুবাদ

তাইসিরুল কুরআন

তুমি যাকে ভালবাস তাকে সৎপথ দেখাতে পারবে না, বরং আল্লাহ্ই যাকে চান সৎ পথে পরিচালিত করেন, সৎপথপ্রাপ্তদের তিনি ভাল করেই জানেন।

রাওয়াই আল-বায়ান

নিশ্চয় তুমি যাকে ভালবাস তাকে তুমি হিদায়াত দিতে পারবে না; বরং আল্লাহই যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দেন। আর হিদায়াতপ্রাপ্তদের ব্যাপারে তিনি ভাল জানেন।

শাইখ মুজিবুর রহমান

তুমি যাকে ভালবাস, ইচ্ছা করলেই তাকে সৎ পথে আনতে পারবেনা। তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সৎ পথে আনেন এবং তিনিই ভাল জানেন কারা সৎ পথ অনুসরণকারী।

ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

আপনি যাকে ভালবাসেন ইচ্ছে করলেই তাকে সৎপথে আনতে পারবেন না। বরং আল্লাহ্‌ই যাকে ইচ্ছে সৎপথে আনয়ন করেন এবং সৎপথ অনুসারীদের সম্পর্কে তিনিই ভাল জানেন।

ফাতহুল মাজীদ

তুমি যাকে ভালবাস, ইচ্ছা করলেই তাকে সৎ পথে আনতে পারবে না। তবে আল্লাহ তা‘আলাই যাকে ইচ্ছা সৎ পথে আনয়ন করেন এবং তিনিই ভাল জানেন সৎ পথ অনুসারীদের সম্পর্কে।

মুখতাসার

৫৬. হে রাসূল! নিশ্চয়ই আপনি যাকে চান হিদায়েত তথা ঈমান আনার তাওফীক দিতে পারেন না। যেমন: আবু তালিব ও অন্যান্যরা। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা একাই যাকে চান হিদায়েতের তাওফীক দিয়ে থাকেন। তিনি তাঁর পূর্ব জ্ঞানের ভিত্তিতেই জানেন, কে সঠিক পথের হিতায়েতপ্রাপ্ত।

তাফসীর

তাফসীর ইবনে কাসীর

৫৬-৫৭ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! কাউকে হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত করা তোমার শক্তির বাইরে। তোমার দায়িত্ব শুধু আমার বাণী জনগণের নিকট পৌঁছিয়ে দেয়া। হিদায়াতের মালিক আমি। আমি যাকে ইচ্ছা হিদায়াত কবূল করার তাওফীক দান করে থাকি। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তাদেরকে হিদায়াত করার দায়িত্ব তোমার নয়, বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করে থাকেন।” (২:২৭২) অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমার লিলা থাকলেও অধিকাংশ লোক মুমিন নয়।” (১২:১০৩) হিদায়াত লাভের হকদার কে এবং কে পথভ্রষ্ট হবার হকদার এর জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই রয়েছে।সহীহ বুখারী ও সহীহ্ মুসলিমে রয়েছে যে, এ আয়াতটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চাচা আবু তালিবের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, যিনি তাঁকে খুবই সাহায্য সহানুভূতি করেছিলেন।

সর্বক্ষেত্রেই তিনি তার সহযোগিতা করে এসেছিলেন এবং আন্তরিকভাবে তাকে ভালবাসতেন। কিন্তু তার এ ভালবাসা ছিল আত্মীয়তার সম্পর্কের কারণে প্রকৃতিগত। এ ভালবাসা শরীয়তগত ছিল না। যখন তাঁর মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসে তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে ইসলামের দাওয়াত দেন। তিনি তাকে ঈমান আনয়নের ব্যাপারে উৎসাহিত করেন। কিন্তু তাঁর তকদীরের লিখন এবং আল্লাহ পাকের ইচ্ছা জয়যুক্ত হয়। তিনি ইসলাম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান এবং কুফরীর উপরই অটল থাকেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার মৃত্যুর সময় তাঁর নিকট আগমন করেন। আবু জেহেল ও আবদুল্লাহ ইবনে উবাইও তাঁর পাশে উপবিষ্ট ছিল।

রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “হে আমার প্রিয় চাচা! আপনি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু পাঠ করুন। এই কারণে আমি আল্লাহর নিকট আপনার জন্যে সুপারিশ করবো।” তখন আবু জেহেল ও আবদুল্লাহ ইবনে উবাই তাঁকে বলেঃ “হে আবু তালিব! তুমি কি তোমার পিতা আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম হতে ফিরে যাবে?” এভাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বুঝাতে থাকেন এবং তারা দু'জন তাকে ফিরাতে থাকে। অবশেষে তার মুখ দিয়ে শেষ কথা বের হয়ঃ “আমি এ কালেমা পাঠ করবো না, আমি আবদুল মুত্তালিবের ধর্মের উপরই থাকলাম।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “আচ্ছা, আমি আপনার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা। করতে থাকবো।

তবে যদি আল্লাহ আমাকে এর থেকে বিরত রাখেন এবং নিষেধ। করে দেন তাহলে অন্য কথা।” তৎক্ষণাৎ এ আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ (আরবি) অর্থাৎ “নবী (সঃ) ও মুমিনদের জন্যে মোটেই উচিত নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে যদিও তারা তাদের নিকটতম আত্মীয় হয়।” (৯:১১৩) আর আবূ তালিবের ব্যাপারে (আরবি) এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। (এটা ইমাম মুসলিম (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন) হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবু তালিবের মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “হে চাচা! লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ পাঠ করুন, আমি কিয়ামতের দিন এর সাক্ষ্য দান করবো।” উত্তরে আবূ তালিব বলেনঃ “হে আমার ভ্রাতুস্পুত্র!

আমার যদি আমার বংশ কুরায়েশদের বিদ্রুপ বলে ভয় না থাকতো যে, আমি মৃত্যুর ভয়ে ভীত হয়ে এ কালেমা পাঠ করছি তবে অবশ্যই আমি এটা পাঠ করতাম। আর এভাবে তোমার চক্ষু ঠাণ্ডা করতাম।” ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা .. (আরবি)-এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেন)অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, শেষ পর্যন্ত তিনি কালেমা পড়তে অস্বীকার করেন এবং পরিষ্কারভাবে বলে দেন- “হে আমার ভ্রাতুস্পুত্র! আমি তো আমার বড়দের ধর্মের উপর রয়েছি।” তাঁর মৃত্যু একথারই উপর হয় যে, তিনি আবদুল মুত্তালিবের মাযহাবের উপর রয়েছেন।হযরত সাঈদ ইবনে আবি রাশেদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রোমক সম্রাট কায়সারের দূত যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয় এবং কায়সারের পত্রখানা নবী (সঃ)-এর সামনে পেশ করে তখন নবী (সঃ) তা নিজের ক্রোড়ে রেখে দেন।

অতঃপর দূতকে বলেনঃ “তুমি কোন গোত্রের লোক?” সে উত্তরে বলেঃ “আমি তানূখ গোত্রের লোক।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “তুমি কি চাও যে, তুমি তোমার পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর দ্বীনের উপর এসে যাবে?” জবাবে সে বলেঃ “আমি যে কওমের দূত, যে পর্যন্ত না আমি তাদের পয়গামের জবাব তাদের কাছে পৌছাতে পারবো, তাদের মাযহাব পরিত্যাগ করতে পারবো না।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুচকি হেসে তার সাহাবীদের দিকে তাকিয়ে (আরবি) এই আয়াতটিই পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মুশরিকরা তাদের ঈমান আনয়ন না করার একটি কারণ এও বর্ণনা করতো যে, তারা যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কর্তৃক আনীত হিদায়াত মেনে নেয় তবে তাদের ভয় হচ্ছে যে, এই ধর্মের বিরোধী লোকেরা যে তাদের চতুর্দিকে রয়েছে তারা তাদের শত্রু হয়ে যাবে, তাদেরকে কষ্ট দেবে এবং তাদেরকে ধ্বংস করে ফেলবে।

আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, এটাও তাদের ভুল কৌশল। আল্লাহ পাক তো তাদেরকে এক নিরাপদ হারামে অর্থাৎ মক্কা শরীফে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, যেখানে দুনিয়ার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত নিরাপত্তা বিরাজ করছে। তাহলে কুফরীর অবস্থায় যখন তারা সেখানে নিরাপত্তা লাভ করছে, তখন আল্লাহর দ্বীন গ্রহণ করলে কি করে ঐ নিরাপত্তা উঠে যেতে পারে? এটাতো ঐ শহর যেখানে তায়েফ ইত্যাদি বিভিন্ন শহর হতে ফলমূল, ব্যবসার মাল ইত্যাদি বহুল পরিমাণে আমদানী হয়ে থাকে। সমস্ত জিনিস এখানে অতি সহজে চলে আসে এবং এভাবে মহান আল্লাহ তাদেরকে রিযক পৌঁছিয়ে থাকেন। কিন্তু তাদের অধিকাংশই এটা জানে না।

এজন্যেই তারা এরূপ বাজে ওর পেশ করে থাকে। বর্ণিত আছে যে, এ কথা যে বলেছিল তার নাম ছিল হারিস ইবনে আমির ইবনে নাওফিল।

তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া

আপনি যাকে ভালবাসেন ইচ্ছে করলেই তাকে সৎপথে আনতে পারবেন না। বরং আল্লাহ্‌ই যাকে ইচ্ছে সৎপথে আনয়ন করেন এবং সৎপথ অনুসারীদের সম্পর্কে তিনিই ভাল জানেন [১]।

[১] ‘হেদায়াত’ শব্দটি কয়েক অর্থে ব্যবহৃত হয়। এক, শুধু পথ দেখানো। এর জন্য জরুরী নয় যে, যাকে পথ দেখানো হয় সে গন্তব্যস্থলে পৌছতেই হবে। দুই, পথ দেখিয়ে গন্তব্যস্থলে পৌছে দেয়া। প্রথম অর্থের দিক থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বরং সমস্ত নবীগণ যে হাদী বা পথপ্রদর্শক ছিলেন এবং হেদায়াত যে তাদের ক্ষমতাধীন ছিল, তা বলাই বাহুল্য। কেননা, এই হেদায়াতই ছিল তাদের পরম দায়িত্ব ও কর্তব্য। এটা তাদের ক্ষমতাধীন না হলে তারা নবুওয়াত ও রিসালাতের কর্তব্য পালন করবে কীরূপে? আলোচ্য আয়াতে বলা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিদায়াতের উপর ক্ষমতাশীল নন।

এতে দ্বিতীয় অর্থের হেদায়াত বোঝানো হয়েছে অর্থাৎ গন্তব্যস্থলে পৌছে দেয়া। উদ্দেশ্য এই যে, প্রচার ও শিক্ষার মাধ্যমে আপনি কারও অন্তরে ঈমান সৃষ্টি করে দিবেন এবং মুমিন বানিয়ে দিবেন, এটা আপনার কাজ নয়। এটা সরাসরি আল্লাহ্‌ তা‘আলার ক্ষমতাধীন। এ সংক্রান্ত আলোচনা সূরা আল-ফাতিহার তাফসীরে উল্লেখিত হয়েছে। হাদীসে এসেছে, এই আয়াত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচা আবু তালিব সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আন্তরিক বাসনা ছিল যে, সে কোনরূপেই ইসলাম গ্ৰহণ করুক। এর প্রেক্ষাপটে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলা হয়েছে যে, কাউকে মুমিন-মুসলিম করে দেয়া আপনার ক্ষমতাধীন নয়।

[দেখুন, বুখারীঃ ৩৬৭১, মুসলিমঃ ২৪]।

তাফসীর আল-কুরতুবী

[سورة القصص (28): آية 56] পূর্ণ পৃষ্ঠা

তা থেকে (বিমুখ থাকা), অর্থাৎ তারা তাতে লিপ্ত হননি (এবং তারা বলতেন, আমাদের কর্ম আমাদের জন্য এবং তোমাদের কর্ম তোমাদের জন্য, তোমাদের প্রতি সালাম) অর্থাৎ এটি সম্পর্ক ছিন্ন করা বা এড়িয়ে চলা, যেমন মহান আল্লাহর বাণী: "এবং যখন মূর্খরা তাদের সম্বোধন করে, তারা বলে—সালাম।" অর্থাৎ আমাদের জন্য আমাদের দীন এবং তোমাদের জন্য তোমাদের দীন। (তোমাদের প্রতি সালাম) অর্থাৎ আমাদের পক্ষ থেকে তোমরা নিরাপদ, কেননা আমরা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করব না এবং তোমাদের গালিগালাজও করব না; এটি অভিবাদনমূলক সালামের অন্তর্ভুক্ত নয়। আজ-জাজ্জাজ বলেন: এটি যুদ্ধের নির্দেশ আসার পূর্বের কথা।

(আমরা মূর্খদের সান্নিধ্য চাই না) অর্থাৎ আমরা বিতর্ক, বাদানুবাদ এবং গালিগালাজের জন্য তাদের খুঁজি না。 ‌‌[সুরা আল-কাসাস (২৮): আয়াত ৫৬]নিশ্চয়ই আপনি যাকে ভালোবাসেন তাকে হিদায়াত দিতে পারেন না, বরং আল্লাহ যাকে চান তাকে হিদায়াত দান করেন এবং হিদায়াতপ্রাপ্তদের সম্পর্কে তিনিই সম্যক অবগত। (৫৬)মহান আল্লাহর বাণী: (নিশ্চয়ই আপনি যাকে ভালোবাসেন তাকে হিদায়াত দিতে পারেন না) আজ-জাজ্জাজ বলেন: মুসলিমগণ এই বিষয়ে একমত যে, এটি আবু তালিবের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। আমি (গ্রন্থকার) বলছি: সঠিক কথা হলো এটি বলা যে, অধিকাংশ মুফাসসির এ বিষয়ে একমত যে এটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা আবু তালিবের বিষয়ে অবতীর্ণ হয়েছে, যা বুখারি ও মুসলিমের হাদিসের সুস্পষ্ট পাঠ; এবং এর আলোচনা ইতিপূর্বে "বারাআত" (সুরা আত-তাওবাহ) এর ব্যাখ্যায় অতিক্রান্ত হয়েছে।

«১»। আবু রওক বলেন, আল্লাহর বাণী: (কিন্তু আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দেন) এটি আব্বাস (রাযি.)-এর প্রতি ইঙ্গিত। কাতাদাহও অনুরূপ বলেছেন। (এবং তিনি হিদায়াতপ্রাপ্তদের সম্পর্কে সম্যক অবগত) মুজাহিদ বলেন: অর্থাৎ যাদের জন্য হিদায়াতপ্রাপ্ত হওয়া নির্ধারিত হয়েছে। আবার বলা হয়েছে: "যাকে আপনি ভালোবাসেন" এর অর্থ হলো—যাকে আপনি হিদায়াতপ্রাপ্ত হওয়া পছন্দ করেন। জুবাইর ইবনে মুতইম বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর ওহি অবতীর্ণ হওয়ার শব্দ আবু বকর সিদ্দিক ছাড়া আর কেউ শুনেননি; তিনি জিবরাঈলকে বলতে শুনেছেন: হে মুহাম্মদ, পড়ুন— "নিশ্চয়ই আপনি যাকে ভালোবাসেন তাকে হিদায়াত দিতে পারেন না, বরং আল্লাহ যাকে চান তাকে হিদায়াত দান করেন।" ‌‌[সুরা আল-কাসাস (২৮): আয়াত ৫৭ থেকে ৫৮]এবং তারা বলে, "যদি আমরা তোমার সাথে হিদায়াতের অনুসরণ করি, তবে আমাদের দেশ থেকে আমাদের উচ্ছেদ করা হবে।" আমি কি তাদের জন্য একটি নিরাপদ হারামের ব্যবস্থা করে দেইনি, যেখানে আমাদের পক্ষ থেকে রিযিকস্বরূপ সব ধরণের ফলমূল আনা হয়?

কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা জানে না। (৫৭) এবং আমি কত জনপদ ধ্বংস করেছি যার অধিবাসীরা তাদের জীবনোপকরণের দম্ভ করত! এগুলিই তাদের ঘরবাড়ি, তাদের পর এগুলিতে সামান্যই বসবাস করা হয়েছে। আর আমিই চূড়ান্ত মালিকানার অধিকারী। (৫৮)(১) প্রথম বা দ্বিতীয় মুদ্রণের ৮ম খণ্ড, ২৭২ পৃষ্ঠা ও পরবর্তী অংশ দ্রষ্টব্য।

তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর

পূর্ণ পৃষ্ঠা পূর্ণ পৃষ্ঠা

সুরা আল-কাসাস, আয়াত ৫৬। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আবু তালিবের (হিদায়েত) চেয়েছিলেন এবং আল্লাহ আব্বাস ইবন আবদিল মুত্তালিবের ব্যাপারে যা ইচ্ছা করেছিলেন।আবদ ইবন হুমাইদ, তিরমিযী, ইবন জারীর, ইবনুল মুনযির, ইবন আবি হাতিম, আবুশ শায়খ, হাকিম, আবু নুয়াইম ও বায়হাকী (উভয়ে তাঁদের 'দালাইল' গ্রন্থে) এবং ইবন মারদুওয়াইহ আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে পাহারার বেষ্টনীতে রাখা হতো যতক্ষণ না অবতীর্ণ হলো— "আর আল্লাহ আপনাকে মানুষের (অনিষ্ট) থেকে রক্ষা করবেন" (সুরা মায়িদাহ: ৬৭)।

তখন তিনি তাবু থেকে তাঁর মাথা বের করলেন এবং বললেন: হে লোকসকল, তোমরা ফিরে যাও, কেননা আল্লাহ আমাকে সুরক্ষা দান করেছেন।তাবারানী ও ইবন মারদুওয়াইহ আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর চাচা আব্বাস (রা.) তাঁদের মধ্যে ছিলেন যারা তাঁকে পাহারা দিতেন। যখন "আর আল্লাহ আপনাকে মানুষের থেকে রক্ষা করবেন" আয়াতটি নাজিল হলো, তখন আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পাহারার ব্যবস্থা ত্যাগ করলেন।ইবন মারদুওয়াইহ জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন বাইরে বের হতেন, তখন আবু তালিব তাঁর সাথে পাহারাদার পাঠাতেন যাতে তারা তাঁকে রক্ষা করতে পারে।

যতক্ষণ না "আর আল্লাহ আপনাকে মানুষের থেকে রক্ষা করবেন" আয়াতটি নাজিল হলো। এরপর তিনি (আবু তালিব) পুনরায় লোক পাঠাতে চাইলে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: হে চাচা, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাকে সুরক্ষা দিয়েছেন, সুতরাং আপনি যাদের পাঠান তাদের আর প্রয়োজন নেই।তাবারানী, আবুশ শায়খ, আবু নুয়াইম (দালাইল গ্রন্থে), ইবন মারদুওয়াইহ এবং ইবন আসাকির ইবন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে পাহারা দেওয়া হতো এবং তাঁর চাচা আবু তালিব প্রতিদিন তাঁর সাথে বনু হাশিমের একজন ব্যক্তিকে পাঠাতেন তাঁকে পাহারা দেওয়ার জন্য।

অতঃপর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: হে চাচা, আল্লাহ আমাকে সুরক্ষা দান করেছেন, সুতরাং আপনি যাদের পাঠান তাদের আমার আর প্রয়োজন নেই।আবু নুয়াইম 'দালাইল' গ্রন্থে আবু যার (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখনই ঘুমাতেন, আমরা নানাবিধ বিপদের আশঙ্কায় তাঁর চারপাশ ঘিরে থাকতাম; যতক্ষণ না সুরক্ষার আয়াত— "আর আল্লাহ আপনাকে মানুষের থেকে রক্ষা করবেন" নাজিল হলো।তাবারানী ও ইবন মারদুওয়াইহ ইসমা ইবন মালিক আল-খাতমি (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমরা রাতে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে পাহারা দিতাম যতক্ষণ না "আর আল্লাহ আপনাকে মানুষের থেকে রক্ষা করবেন" নাজিল হলো।

এরপর তিনি পাহারার ব্যবস্থা ত্যাগ করলেন।ইবন আবি হাতিম জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: যখন আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বনু আনমার গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযানে বের হলেন, তখন তিনি নখলের উপরিভাগে 'জাতুর রিকা' নামক স্থানে অবস্থান গ্রহণ করলেন। এক পর্যায়ে তিনি একটি কূপের পাড়ে পা ঝুলিয়ে বসেছিলেন। এমতাবস্থায় গাওরাস ইবনুল হারিস বলল: আমি অবশ্যই মুহাম্মদকে হত্যা করব। তার সঙ্গীরা তাকে বলল: তুমি তাকে কীভাবে হত্যা করবে? সে বলল: আমি তাকে বলব, তোমার তলোয়ারটি আমাকে দাও। যখন সে আমাকে তা দেবে, আমি তা দিয়েই তাকে হত্যা করব।অতঃপর সে তাঁর কাছে এসে বলল: হে মুহাম্মদ, তোমার তলোয়ারটি আমাকে দাও, আমি তা পরীক্ষা করে দেখতে চাই।

আবু তালিব তাদের সাথে তাঁর শেষ কথা হিসেবে বললেন: তিনি আব্দুল মুত্তালিবের মিল্লাত বা ধর্মের ওপর (অটল) রয়েছেন এবং তিনি 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলতে অস্বীকার করলেন। তখন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: "আমি অবশ্যই আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব যতক্ষণ না আমাকে তা থেকে নিষেধ করা হয়।"অতঃপর অবতীর্ণ হলো: নবী ও মুমিনদের জন্য সংগত নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে... আয়াতটি।আর আল্লাহ তাআলা আবু তালিব সম্পর্কে নাযিল করলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে উদ্দেশ্য করে বললেন: (নিশ্চয় আপনি যাকে ভালোবাসেন তাকে হিদায়াত দিতে পারবেন না, বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করেন) (সূরা আল-কাসাস, আয়াত: ৫৬)।তায়ালিসি, ইবনে আবি শাইবা, আহমদ, তিরমিযী, নাসাঈ, আবু ইয়ালা, ইবনে জারীর, ইবনুল মুনযির, ইবনে আবি হাতিম, আবুশ শায়খ, হাকিম (যিনি একে সহীহ বলেছেন), ইবনে মারদাওয়াইহি, শুআবুল ঈমানে বায়হাকী এবং মুখতারায় দিয়া আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমি এক ব্যক্তিকে তার মুশরিক পিতা-মাতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে শুনলাম।

আমি বললাম: আপনি কি আপনার পিতা-মাতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছেন অথচ তারা মুশরিক? তখন সে বলল: ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) কি তাঁর পিতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেননি? অতঃপর আমি বিষয়টি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে উল্লেখ করলাম। তখন অবতীর্ণ হলো: নবী ও মুমিনদের জন্য সংগত নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে... আয়াতটি।ইবনে জারীর, ইবনুল মুনযির, ইবনে আবি হাতিম ও ইবনে মারদাওয়াইহি আলী ইবনে আবি তালহার সূত্রে ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: তাঁরা (সাহাবীগণ) তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতেন যতক্ষণ না এই আয়াতটি নাযিল হয়।

যখন এটি নাযিল হলো, তখন তাঁরা তাঁদের মৃতদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা থেকে বিরত থাকলেন। তবে তাঁরা জীবিতদের জন্য মৃত্যু পর্যন্ত ক্ষমা প্রার্থনা করা হতে বিরত হননি। এরপর আল্লাহ তাআলা নাযিল করলেন: আর ইবরাহীমের তার পিতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা তো ছিল না... আয়াতটি।অর্থাৎ তিনি (ইবরাহীম) তাঁর জন্য ততক্ষণই ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন যতক্ষণ তিনি জীবিত ছিলেন। অতঃপর যখন তিনি মারা গেলেন, তখন তিনি ক্ষমা প্রার্থনা থেকে বিরত হলেন।ইবনে আবি হাতিম ও আবুশ শায়খ মুহাম্মদ ইবনে কাব থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: যখন আবু তালিব অসুস্থ হলেন, তখন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর কাছে আসলেন।

তখন মুসলমানরা বলতে লাগল: এই যে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর চাচার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছেন, আর ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-ও তাঁর পিতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। ফলে তাঁরাও তাঁদের মুশরিক আত্মীয়-স্বজনের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে লাগলেন।তখন আল্লাহ নাযিল করলেন: নবী ও মুমিনদের জন্য সংগত নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে...। এরপর আল্লাহ তাআলা নাযিল করলেন: আর ইবরাহীমের তার পিতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা তো ছিল কেবল সেই ওয়াদার কারণে যা সে তাকে দিয়েছিল...। তিনি বলেন: তিনি তাঁর জীবদ্দশায় (তার হিদায়াতের) আশা পোষণ করতেন, অতঃপর যখন তাঁর কাছে স্পষ্ট হলো যে সে আল্লাহর শত্রু, তখন তিনি তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলেন।ইবনে জারীর শিবলের সূত্রে আমর ইবনে দীনার থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: "ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) তাঁর পিতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন অথচ সে ছিল মুশরিক।

তাই আমি আবু তালিবের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা অব্যাহত রাখব যতক্ষণ না আমার রব আমাকে তা থেকে নিষেধ করেন।"আর তাঁর সাহাবীগণ বললেন: "নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যেভাবে তাঁর চাচার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন, আমরাও অবশ্যই আমাদের পিতৃপুরুষদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব।" তখন আল্লাহ তাআলা নবী ও মুমিনদের জন্য সংগত নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে... থেকে শুরু করে তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলেন পর্যন্ত নাযিল করলেন।