Al-Kahf

আল-কাহফ: 50

18:50
18 আল-কাহফ Al-Kahf · 110 আয়াত الكهف

আরবি

وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَـٰٓئِكَةِ ٱسْجُدُوا۟ لِـَٔادَمَ فَسَجَدُوٓا۟ إِلَّآ إِبْلِيسَ كَانَ مِنَ ٱلْجِنِّ فَفَسَقَ عَنْ أَمْرِ رَبِّهِۦٓ ۗ أَفَتَتَّخِذُونَهُۥ وَذُرِّيَّتَهُۥٓ أَوْلِيَآءَ مِن دُونِى وَهُمْ لَكُمْ عَدُوٌّۢ ۚ بِئْسَ لِلظَّـٰلِمِينَ بَدَلًا

English Translations

Sahih International

And [mention] when We said to the angels, "Prostrate to Adam," and they prostrated, except for Iblees. He was of the jinn and departed from [i.e., disobeyed] the command of his Lord. Then will you take him and his descendants as allies other than Me while they are enemies to you? Wretched it is for the wrongdoers as an exchange.

Muhsin Khan

And (remember) when We said to the angels; "Prostrate to Adam." So they prostrated except Iblis (Satan). He was one of the jinns; he disobeyed the Command of his Lord. Will you then take him (Iblis) and his offspring as protectors and helpers rather than Me while they are enemies to you? What an evil is the exchange for the Zalimun (polytheists, and wrong-doers, etc).

Taqi Usmani

(Recall) when We said to the angels, “Prostrate yourselves before ’Ādam.” So, they prostrated themselves, all of them but Iblīs (Satan). He was of the Jinn, so he rebelled against the command of your Lord. Do you still take him and his progeny as friends instead of Me, while they are enemy to you? Evil is he as substitute (of obedience to Allah) for wrongdoers.

Abul Ala Maududi

And recall when We said to the angels: "Prostrate yourselves before Adam"; all of them fell prostrate, except Iblis. He was of the jinn and so disobeyed the command of his Lord. Will you, then, take him and his progeny as your guardians rather than Me although they are your open enemies? What an evil substitute are these wrong-doers taking!

Pickthall

And (remember) when We said unto the angels: Fall prostrate before Adam, and they fell prostrate, all save Iblis. He was of the jinn, so he rebelled against his Lord's command. Will ye choose him and his seed for your protecting friends instead of Me, when they are an enemy unto you? Calamitous is the exchange for evil-doers.

Yusuf Ali

Behold! We said to the angels, "Bow down to Adam": They bowed down except Iblis. He was one of the Jinns, and he broke the Command of his Lord. Will ye then take him and his progeny as protectors rather than Me? And they are enemies to you! Evil would be the exchange for the wrong-doers!

বাংলা অনুবাদ

তাইসিরুল কুরআন

স্মরণ কর, যখন আমি ফেরেশতাদেরকে বলেছিলাম, ‘আদামকে সাজদাহ কর।’ তখন ইবলিশ ছাড়া তারা সবাই সাজদাহ করল। সে ছিল জ্বীনদের অন্তর্ভুক্ত। সে তার প্রতিপালকের নির্দেশ লঙ্ঘন করল। এতদসত্ত্বেও তোমরা কি আমাকে বাদ দিয়ে তাকে আর তার বংশধরকে অভিভাবক বানিয়ে নিচ্ছ? অথচ তারা তোমাদের দুশমন। যালিমদের এই বিনিময় বড়ই নিকৃষ্ট!

রাওয়াই আল-বায়ান

আর যখন আমি ফেরেশতাদের বলেছিলাম, তোমরা আদমকে সিজদা কর। অতঃপর তারা সিজদা করল, ইবলীস ছাড়া। সে ছিল জিনদের একজন। সে তার রবের নির্দেশ অমান্য করল। তোমরা কি তাকে ও তার বংশকে আমার পরিবর্তে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করবে, অথচ তারা তোমাদের শত্রু? যালিমদের জন্য কী মন্দ বিনিময়!

শাইখ মুজিবুর রহমান

এবং স্মরণ কর, আমি যখন মালাইকা/ফেরেশতাদেরকে বলেছিলামঃ তোমরা আদমের প্রতি নত হও। তখন সবাই নত হল ইবলীস ছাড়া; সে জিনদের একজন, সে তার রবের আদেশ অমান্য করল; তাহলে কি তোমরা আমার পরিবর্তে তাকে ও তার বংশধরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করছ? তারা তো তোমাদের শত্রু; সীমালংঘনকারীদের জন্য রয়েছে কত নিকৃষ্ট বদলা।

ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

আর স্মরণ করুন, আমরা যখন ফিরিশতাদেরকে বলেছিলাম, ‘আদমের প্রতি সাজদাহ কর’, তখন তারা সবাই সাজদাহ করল ইবলীস ছাড়া; সে ছিল জিনদের একজন, সে তার রবের আদেশ অমান্য করল। তবে কি তোমরা আমার পরিবর্তে তাকে এবং তার বংশধরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করবে, অথচ তারা তোমাদের শত্রু। যালেমদের এ বিনিময় কত নিকৃষ্ট!

ফাতহুল মাজীদ

এবং স্মরণ কর‎, আমি যখন ফেরেশ্তাগণকে বলেছিলাম, ‘আদমকে সিজ্দা কর‎’, তখন তারা সকলেই সিজদা করল ইবলীস ব্যতীত; সে জিনদের একজন, সে তার প্রতিপালকের আদেশ অমান্য করল। তবে কি তোমরা আমার পরিবর্তে তাকে এবং তার বংশধরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করছ? তারা তোমাদের শত্র“। জালিমদের এ বিনিময় কতই না নিকৃষ্ট।

মুখতাসার

৫০. হে রাসূল! আপনি স্মরণ করুন সেদিনের কথা যখন আমি ফিরিশতাগণকে বললাম: তোমরা আদমকে সম্মানার্থে সাজদাহ করো। তখন তারা সবাই তাদের প্রতিপালকের আদেশ পালনার্থে তাকে সাজদাহ করলো। তবে ইবলীস, -যে মূলতঃ জিন ছিলো; ফিরিশতা ছিলো না- সে দম্ভভরে সাজদাহ করতে অস্বীকৃতি জানালো। ফলে সে তার প্রতিপালকের আনুগত্য থেকে বেরিয়ে গেলো। হে মানুষ! তোমরা কি আমাকে বাদ দিয়ে তাকে ও তার সন্তানদেরকে তোমাদের বন্ধু বানিয়ে নিবে। অথচ তারা তোমাদেরই শত্রু। তাহলে তোমরা নিজেদের শত্রুদেরকে কিভাবে তোমাদের বন্ধু বানিয়ে নিতে পারো?! সেই যালিমদের কর্মকাণ্ড কতোই না নিরর্থক ও নিকৃষ্ট যারা আল্লাহর বন্ধুত্বের বদলে শয়তানকে নিজেদের বন্ধু বানিয়ে নিয়েছে।

তাফসীর

তাফসীর ইবনে কাসীর

মহান আল্লাহ বলছেনঃ ইবলীস তোমাদের এমনকি তোমাদের মূল পিতা হযরত আদমেরও (আঃ) প্রাচীন শত্রু। সুতরাং নিজেদের সৃষ্টিকর্তা ও মালিককে ছেড়ে তার অনুসরণ করা তোমাদের জন্যে মোটেই সমীচীন নয়। আল্লাহর অনুগ্রহ, দয়া ও স্নেহ-মমতার প্রতি লক্ষ্য কর যে, তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদেরকে প্রতিপালন করেছেন। সুতরাং তাকে ছেড়ে তার এবং তোমাদের নিজেদেরও শত্রুকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করা কত সাংঘাতিক ও মারাত্মক ভুল! এর পূর্ণ তাফসীর সূরায়ে বাকারার শুরুতে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা হযরত আদমকে (আঃ) সৃষ্টি করে তার শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা প্রকাশার্থে সমস্ত ফেরেশতাকে তার সামনে সিজদাবনত হওয়ার নির্দেশ দেন। সবাই হুকুম পালন করে কিন্তু ইবলীসের মূল ছিল খারাপ, তাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করা হয়েছিল, তাই সে মহান আল্লাহর আদেশ অমান্য করে এবং পাপাচারী হয়ে যায়। ফেরেশতাদেরকে নূর দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছিল। সহীহ্ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, ফেরেশতাদেরকে সৃষ্টি করা হয় নূর (জ্যোতি) থেকে, ইবলীস সৃষ্ট হয় অগ্নিশিখা হতে, আর আদমকে (আঃ) যা থেকে সৃষ্টি করা হয় তার বর্ণনা তোমাদের সামনে পেশ করে দেয়া হয়েছে। এটা প্রকাশ্য ব্যাপার যে, প্রত্যেক জিনিসই তার মূলের উপর এসে থাকে। ইবলীস যদিও ফেরেশতাদের মতই আমল করছিল এবং তাদের সাথেই সাদৃশ্যযুক্ত ছিল আর আল্লাহর ইবাদতের কাজে দিনরাত নিমগ্ন ছিল, কিন্তু আল্লাহর ঐ নির্দেশ শোনা মাত্রই তার আসল রূপ ফুটে উঠলো। সুতরাং সে অহংকার করলো এবং পরিষ্কারভাবে আল্লাহ তাআলার আদেশ অমান্য করে বসলো। তার সৃষ্টিই তো ছিল আগুন থেকে। যেমন সে নিজেই বলেছেঃ “আমাকে আপনি সৃষ্টি করেছেন আগুন থেকে আর আদমকে (আঃ) সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে।” ইবলীস কখনই ফেরশতাদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। সে হচ্ছে জ্বিনদের মূল, যেমন হযরত আদম (আঃ) হলেন মানুষের মূল।এটাও বর্ণিত আছে যে, এই জ্বিনেরাও ছিল ফেরেশতাদের একটি শ্রেণী, যাদেরকে তেজ আগুন দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছিল। ইবলীসের নাম ছিল হারত। সে ছিল জান্নাতের দারোগা। এই দলটি ছাড়া অন্যান্য ফেরেশতারা ছিল নূরী (জ্যোতির্ময়)। জ্বিনের অগ্নিশিখা দ্বারা সৃষ্ট ছিল।হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ইবলীস সম্রান্ত ফেরেশতাদের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং সে ছিল সম্রান্ত গোত্রভুক্ত। জান্নাত সমূহের সে দারোগা ছিল। সে ছিল দুনিয়ার আকাশের বাদশাহ। যমীনেরও সম্রাট সে-ই ছিল। এ কারণেই তার মনে অহংকার এসে গিয়েছিল যে, সে সমস্ত আকাশবাসী হতে শ্রেষ্ঠ। তার সেই অহংকার বেড়েই চলছিল। এর সঠিক পরিমাণ আল্লাহ তাআলাই জানতেন। সুতরাং এটা প্রকাশকরণার্থেই তিনি হযরত আদমকে (আঃ) সিজ্বদা করার তাকে নির্দেশ দেন। সাথে সাথেই তার অহংকার প্রকাশ পেয়ে যায়। অহংকার বশতঃই সে স্পষ্টভাবে আল্লাহ তাআলার নির্দেশ অমান্য করে এবং কাফির হয়ে যায়। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সে জ্বিন ছিল এবং জান্নাতের দারোগা ছিল; যেমন লোকদেরকে শহরের দিকে সম্পর্ক লাগিয়ে বলা হয়-মক্কী, মাদানী, বসরী, কূফী ইত্যাদি। সে জান্নাতের খাজাঞ্চি ছিল। সে ছিল দুনিয়ার আকাশের কামান বাহক। এখানকার ফেরেশতাদের সে ছিল নেতা। এই অবাধ্যাচরণের পূর্বে সে ফেরেশতাদের • অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু থাকতো সে যমীনে। সমস্ত ফেরেশতা অপেক্ষা সে ছিল। বেশী ইবাদতকারী এবং সবচেয়ে বড় আলেম। একারণেই সে গর্বে ফুলে উঠেছিল। তার গোত্রের নাম ছিল জুিন। আসমান ও যমীনের মাঝে সে চলাফেরা করতো। প্রতিপালকের নাফরমানীর কারণে সে তার রোষানলে পতিত হয়। ফলে সে বিতাড়িত শয়তান হয়ে যায় এবং অভিশপ্ত হয়। সুতরাং অহংকারীর তাওবার কোন আশা নেই। তবে, যদি সে অহংকারী না হয় এবং তার দ্বারা কোন পাপকার্য হয়ে যায় তা হলে তার নিরাশ হওয়া উচিত নয়।বর্ণিত আছে যে, যারা জান্নাতের মধ্যে কাজকাম করতো, এই ইবলীস ছিল তাদের দলভুক্ত। পূর্বযুগীয় গুরুজন হতে এ ব্যাপারে আরো বহু ‘আছার’ বর্ণিত আছে। কিন্তু এগুলির অধিকাংশই বানী ইসরাঈলী ‘আছার’। এর অধিকাংশের সঠিক অবস্থা আল্লাহ তাআলাই অবগত রয়েছেন। এটা সত্য কথা যে, বানী ইসরাঈলের রিওয়াইয়াতগুলি সম্পূর্ণরূপে খণ্ডন ও পরিত্যাগ যোগ্য হবে যদি ওগুলি আমাদের কাছে বিদ্যমান দলীলগুলির বিপরীত হয়। কথা এই যে, আমাদের জন্যে তো কুরআনই যথেষ্ট। পূর্বের কিতাবগুলি আমাদের কোনই প্রয়োজন নেই। আমরা ওগুলি থেকে সম্পূর্ণরূপে অভাবমুক্ত। কেননা ওগুলি পরিবর্তন ও পরিবর্ধন মুক্ত নয়। বহু বানানো কথা ওগুলির মধ্যে প্রবেশ করেছে। তাদের মধ্যে এমন কোন লোক পাওয়া যায় না, যারা উচ্চমানের হাফিয, যারা ঐ সব কিতাবকে দোষমুক্ত করতে পারে। পক্ষান্তরে মহামহিমান্বিত আল্লাহ এই উম্মতের মধ্যে স্বীয় ফল ও করমে এমন ইমাম, আলেম, বুযুর্গ, খোদাভীরু ও হাফিযের জন্ম দিয়েছেন যারা হাদীসগুলিকে জমা করে লিপিবদ্ধ করেছেন। তারা সহীহ হাসান, যঈফ, মুনকার, মাতরূক, মাওযূ' ইত্যাদি সবগুলিকেই পৃথক পৃথক করে দিয়েছেন। তারা তাদেরকেও ছাটাই করে পৃথক করে দিয়েছেন। যারা নিজেরাই কথা বানিয়ে নিয়ে হাদীস নামে প্রচার করেছে। যাতে নবীকুল শিরোমণি হযরত মুহাম্মদ মুস্তফার (সঃ) পবিত্র ও বরকতময় কথাগুলি রক্ষিত হয় এবং মিথ্যা থেকে বেঁচে থাকে। কারো যেন সাধ্য না হয় মিথ্যাকে সত্যের সাথে মিশ্রিত করে দেয়। আমরা মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি যে, তিনি যেন এই শ্রেণীর সমস্ত লোকের উপর স্বীয় করুণা বর্ষণ করেন এবং তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন ও তাদেরকে সন্তুষ্ট রাখেন! আমীন, আমীন! আল্লাহ তাদেরকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন! আর তারা নিঃসন্দেহে এরই যোগ্য বটে। সুতরাং তিনি তাদের প্রতি খুশী থাকুন ও তাদেরকে খুশী করুন!মোট কথা, ইবলীস আল্লাহর আনুগত্য হতে বেরিয়ে গেল। সুতরাং হে মানবমণ্ডলী! তোমরা তার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করো না এবং আমাকে (আল্লাহকে) ছেড়ে তার সাথে সম্পর্ক জুড়ে দিয়ো না। অত্যাচারী ও সীমালংঘনকারীরা মন্দ প্রতিফল পাবে। এটা ঠিক ঐরূপ যেইরূপভাবে সূরায়ে ইয়াসীনে কিয়ামতের ভয়াবহ দৃশ্যের এবং পাপী ও পুণ্যবানদের পরিণাম বর্ণনা করে আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ (আরবী) “হে অপরাধীরা আজ তোমরা (মু'মিনগণ হতে) পৃথক হয়ে যাও।” (৩৬:৫৯)

তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া

আর স্মরণ করুন, আমরা যখন ফিরিশতাদেরকে বলেছিলাম, ‘আদমের প্রতি সিজদা কর’, তখন তারা সবাই সিজদা করল ইবলীস ছাড়া; সে ছিল জিনদের একজন [১] সে তার রব-এর আদেশ অমান্য করল [২]। তবে কি তোমরা আমার পরিবর্তে তাকে এবং তার বংশধরকে [৩] অভিভাবকরূপে গ্রহণ করবে, অথচ তারা তোমাদের শত্রু [৪]। যালেমদের এ বিনিময় কত নিকৃষ্ট [৫]।

সপ্তম রুকু

[১] ইবলিস কি ফেরেশতাদের অন্তর্ভুক্ত ছিল নাকি ভিন্ন প্রজাতির ছিল এ নিয়ে দু'টি মত দেখা যায়। [দুটি মতই ইবন কাসীর বর্ণনা করেছেন।] কোন কোন মুফাসসিরের মতে, সে ফিরিশতাদেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল। তখন তাদের মতে, এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলার বাণী “সে জিনদের একজন”। এর 'জিন' শব্দ দ্বারা ফেরেশতাদের এমন একটি উপদল উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে, যাদেরকে ‘জিন’ বলা হতো। সম্ভবত: তাদেরকে মানুষের মত নিজেদের পথ বেছে নেয়ার এখতিয়ার দেয়া হয়েছিল। সে হিসেবে ইবলিস আল্লাহ তা'আলার নির্দেশের আওতায় ছিল। কিন্তু সে নির্দেশ অমান্য করে অবাধ্য ও অভিশপ্ত বান্দা হয়ে যায়। তবে অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে ইবলীস ফেরেশতাদের দলভুক্ত ছিল না। তারা আলোচ্য আয়াত থেকে তাদের মতের সপক্ষে দলীল গ্ৰহণ করেন। ফেরেশতাদের ব্যাপারে কুরআন সুস্পষ্ট ভাষায় বলে, তারা প্রকৃতিগতভাবে অনুগত ও হুকুম মেনে চলেঃ “আল্লাহ তাদেরকে যে হুকুমই দেন না কেন তারা তার নাফরমানী করে না এবং তাদেরকে যা হুকুম দেয়া হয় তাই করে।" [সূরা আত-তাহরীমঃ ৬]

আরো বলেছেনঃ “তারা অবাধ্য হয় না, তাদের রবের, যিনি তাদের উপর আছেন, ভয় করে এবং তাদেরকে যা হুকুম দেয়া হয় তাই করে। ” [সূরা আন-নাহলঃ ৫০]

তাছাড়া হাদীসেও এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ফেরেশতাদেরকে নূর থেকে তৈরী করা হয়েছে, ইবলীসকে আগুনের ফুল্কি থেকে এবং আদমকে যা থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে তা তোমাদের কাছে বিবৃত করা হয়েছে ৷' [মুসলিম: ২৯৯৬]

[২] এতে বুঝা যাচ্ছে যে, জিনরা মানুষের মতো একটি স্বাধীন ক্ষমতাসম্পন্ন সৃষ্টি। তাদেরকে জন্মগত আনুগত্যশীল হিসেবে সৃষ্টি করা হয়নি। বরং তাদেরকে কুফর ও ঈমান এবং আনুগত্য ও অবাধ্যতা উভয়টি করার ক্ষমতা দান করা হয়েছে। এ সত্যটিই এখানে তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, ইবলীস ছিল জিনদের দলভুক্ত, তাই সে স্বেচ্ছায় নিজের স্বাধীন ক্ষমতা ব্যবহার করে ফাসেকীর পথ বাছাই করে নেয়। এখানে আল্লাহর নির্দেশ থেকে অবাধ্য হয়েছিল এর দু'টি অর্থ করা হয়ে থাকে। এক. সে আল্লাহর নির্দেশ আসার কারণে অবাধ্য হয়েছিল। কারণ সিজদার নির্দেশ আসার কারণে সে সিজদা করতে অস্বীকার করেছিল। এতে বাহ্যত: মনে হবে যে, আল্লাহর নির্দেশই তার অবাধ্যতার কারণ। অথবা আয়াতের অর্থ, আল্লাহর নির্দেশ ত্যাগ করে সে অবাধ্য হয়েছিল। [ফাতহুল কাদীর]

তবে ইবলীস ফেরেশতাদের দলভুক্ত না হয়েও নির্দেশের অবাধ্য কারণ হচ্ছে, যেহেতু ফেরেশতাদের সাথেই ছিল, সেহেতু সিজদার নির্দেশ তাকেও শামিল করেছিল। কারণ, তার চেয়ে উত্তম যারা তাদেরকে যখন সিজদা করার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে তখন সে নিজেই এ নির্দেশের মধ্যে শামিল হয়েছিল এবং তার জন্যও তা মানা বাধ্যতামূলক ছিল। [ইবন কাসীর]

[৩] وَذُرِّيَّتَهُ এ শব্দ থেকে বোঝা যায় যে, শয়তানের সন্তান-সন্ততি ও বংশধর আছে। কোন কোন মুফাসসির বলেনঃ এখানে ذرّية অর্থাৎ বংশধর বলে সাহায্যকারী দল বোঝানো হয়েছে। কাজেই শয়তানের ঔরসজাত সন্তান-সন্ততি হওয়া জরুরী নয়। [ফাতহুল কাদীর]

[৪] উদ্দেশ্য হচ্ছে পথভ্ৰষ্ট লোকদেরকে তাদের এ বোকামির ব্যাপারে সজাগ করে দেয়া যে, তারা নিজেদের স্নেহশীল ও দয়াময় আল্লাহ যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যত নেয়ামত তোমার প্রয়োজন সবই সরবরাহ করেছেন এবং শুভাকাংখী নবীদেরকে ত্যাগ করে এমন এক চিরন্তন শত্রুর ফাঁদে পা দিচ্ছে যে সৃষ্টির প্রথম দিন থেকেই তাদের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। সবসময় তোমার ক্ষতি করার অপেক্ষায় থাকে। [ফাতহুল কাদীর]

[৫] যালেম তো তারা, যারা প্রতিটি বস্তুকে তার সঠিক স্থানে না রেখে অন্য স্থানে রেখেছে। তাদের রবের ইবাদাতের পরিবর্তে শয়তানের ইবাদাত করেছে। এত কত নিকৃষ্ট অদল-বদল!! আল্লাহকে বাদ দিয়ে শয়তানের ইবাদাত! [ফাতহুল কাদীর] অন্য আয়াতেও আল্লাহ্ তা'আলা তা বলেছেন, “আর 'হে অপরাধীরা! তোমরা আজ পৃথক হয়ে যাও। ” হে বনী আদম! আমি কি তোমাদেরকে নির্দেশ দেইনি যে, তোমরা শয়তানের দাসত্ব করো না, কারণ সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্ৰু? আর আমারই ইবাদাত কর, এটাই সরল পথ। শয়তান তো তোমাদের বহু দলকে বিভ্রান্ত করেছিল, তবুও কি তোমরা বুঝনি ?" [সূরা ইয়াসীন: ৫৯-৬২]