Al-Ma'idah
আল-মায়িদা: 7
5 আল-মায়িদা Al-Ma'idah · 120 আয়াত المائدة
মূল আরবি
وَٱذْكُرُوا۟ نِعْمَةَ ٱللَّهِ عَلَيْكُمْ وَمِيثَـٰقَهُ ٱلَّذِى وَاثَقَكُم بِهِۦٓ إِذْ قُلْتُمْ سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا ۖ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ عَلِيمٌۢ بِذَاتِ ٱلصُّدُورِ
English Translations
And remember the favor of Allāh upon you and His covenant with which He bound you when you said, "We hear and we obey"; and fear Allāh. Indeed, Allāh is Knowing of that within the breasts.
And remember Allah's Favour upon you and His Covenant with which He bound you when you said: "We hear and we obey." And fear Allah. Verily, Allah is All-Knower of the secrets of (your) breasts.
Remember Allah’s favour upon you and His covenant that He has taken from you when you said, “We have listened and obeyed.” Fear Allah. Allah is all-Aware of what lies in the hearts.
Remember Allah's favour upon you and His covenant which He made with you when you said: 'We have heard and we obey.' So do fear Allah. Allah has full knowledge even of that which is hidden in the breasts of people.
Remember Allah's grace upon you and His covenant by which He bound you when ye said: We hear and we obey; And keep your duty to Allah. Lo! He knoweth what is in the breasts (of men).
And call in remembrance the favour of Allah unto you, and His covenant, which He ratified with you, when ye said: "We hear and we obey": And fear Allah, for Allah knoweth well the secrets of your hearts.
বাংলা অনুবাদ
তোমাদের প্রতি আল্লাহর নিআমতের কথা স্মরণ কর আর তাঁর অঙ্গীকারের কথা যা তিনি তোমাদের নিকট থেকে গ্রহণ করেছিলেন যখন তোমরা বলেছিলে- আমরা শুনলাম ও মেনে নিলাম। আল্লাহকে ভয় কর, অন্তরে যা আছে সে সম্পর্কে আল্লাহ খুব ভালভাবেই অবগত আছেন।
আর স্মরণ কর, তোমাদের উপর আল্লাহর নিআমত এবং তাঁর অঙ্গীকার, যা তিনি তোমাদের থেকে নিয়েছেন। যখন তোমরা বললে, ‘আমরা শুনেছি এবং আনুগত্য করেছি’ আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ অন্তরের বিষয় সম্পর্কে বিশেষ অবগত।
আর তোমরা তোমাদের প্রতি বর্ষিত আল্লাহর অনুগ্রহকে স্মরণ কর এবং তাঁর ঐ অঙ্গীকারকেও স্মরণ কর, যে অঙ্গীকার তিনি তোমাদের নিকট থেকে গ্রহণ করেছিলেন। তোমরা বলেছিলে, আমরা শুনলাম ও মেনে নিলাম। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, নিশ্চয়ই তিনি অন্তরের কথাগুলিরও পূর্ণ খবর রাখেন।
আর স্মরণ কর, তোমাদের উপর আল্লাহর নেয়ামত এবং যে অঙ্গীকারে তিনি তোমাদেরকে আবদ্ধ করেছিলেন তা; যখন তোমরা বলেছিলে, ‘শুনলাম এবং মেনে নিলাম’। আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর; নিশ্চয় আল্লাহ অন্তরে যা আছে সে সম্পর্কে সবিশেষ অবগত।
স্মরণ কর, তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ এবং যে অঙ্গীকারে তিনি তোমাদেরকে আবদ্ধ করেছিলেন তা। যখন (অঙ্গীকার মেনে নিয়ে) তোমরা বলেছিলে, ‘শ্রবণ করলাম ও মান্য করলাম’ এবং আল্লাহকে ভয় কর; অন্তরে যা আছে সে সম্বন্ধে আল্লাহ তো সবিশেষ অবহিত।
৭. তোমরা ইসলামের প্রতি হিদায়েতের ন্যায় আল্লাহর নিয়ামতকে স্মরণ করো আর সেই অঙ্গীকারকেও স্মরণ করো যা তিনি তোমাদের সাথে করেছেন যখন তোমরা রাজি ও নারাজ অবস্থায় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর কথা শুনা ও তাঁর আনুগত্য করার বায়আত করতে গিয়ে বললে: আমরা আপনার কথা শুনলাম ও আপনার আদেশ মানলাম। আর তোমরা আল্লাহর আদেশ (তাতে তাঁর সাথে করা অঙ্গীকারও রয়েছে) নিষেধ মেনে তাঁকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের অন্তরের সবই জানেন। তাঁর নিকট কোন কিছুই গোপন নয়।
তাফসীর
৭-১১ নং আয়াতের তাফসীর: এ বিরাট ধর্ম এবং এ মহান রাসূল (সঃ)-কে পাঠিয়ে আল্লাহ তা'আলা এ উম্মতের উপর যে ইহসান করেছেন সেটাই তিনি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। আর সেই অঙ্গীকারের উপর দৃঢ় থাকার জন্যে তাদেরকে হিদায়াত করেছেন, যে অঙ্গীকার মুসলমানরা করেছিল, তারা আল্লাহর রাসূলের (সঃ) অনুগত হবে, তাঁকে সর্ব প্রকারের সাহায্য করবে, দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে, নিজেরা তা কবুল করবে এবং অপরের নিকটও তা পৌছিয়ে দেবে। ইসলাম গ্রহণের সময় প্রতিটি মুমিন স্বীয় বায়আতে উক্ত জিনিসগুলো স্বীকার করতো। সাহাবায়ে কিরাম নিম্নলিখিত ভাষায় বলেছিলেনঃ “আমরা আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর নিকট বায়আত গ্রহণ করছি যে, আমরা শুনতে থাকবো, মানতে থাকবো।
আমাদের মনের চাহিদা হোক বা না-ই হোক অথবা অন্যদেরকে আমাদের উপর প্রাধান্য দেয়া হোক না কেন। কোন যোগ্য লোকের নিকট থেকে আমরা কোন কাজ ছিনিয়ে নেবো না।"ইরশাদ হচ্ছে-তোমরা ঈমান আনছো না কেন? অথচ রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমাদেরকে তোমাদের প্রভুর উপর ঈমান আনার আহ্বান জানাচ্ছেন! আর তিনি তোমাদের নিকট অঙ্গীকারও নিয়েছেন, যদি তোমাদের বিশ্বাস হয়। এটাও বলা হয়েছে যে, এ আয়াতে ইয়াহদীদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে তাদেরকে বলা হচ্ছে- তোমরা তো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আনুগত্য স্বীকারের কথা দিয়েছো, এরপরেও তাঁকে মান্য না করার কি অর্থ হতে পারে? একথাও বলা হয়েছে যে, হযরত আদমের পৃষ্ঠ থেকে বের হবার পর আল্লাহ তা'আলা বানু আদমের নিকট থেকে যে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন- আমি কি তোমাদের প্রভু নই?
সবাই স্বীকারোক্তি করেছিল-হা, আমরা এর উপর সাক্ষী থাকলাম। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী প্রকাশমান। সুদ্দী (রঃ) ও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এটাই বর্ণিত আছে। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) একে পছন্দনীয় বলেছেন। সর্বাবস্থায় মানুষের আল্লাহকে ভয় করা উচিত। তিনি অন্তরের ও বক্ষের গোপনীয় কথাও পূর্ণভাবে অবগত রয়েছেন। ঘোষিত হচ্ছে-হে মুমনিগণ! লোকদেরকে দেখাবার জন্যে নয়, বরং আল্লাহর জন্যে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক এবং ইনসাফের সাথে সঠিক সাক্ষী হয়ে যাও। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত নোমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ আমার পিতা আমাকে একটি দান দিয়ে রেখেছিলেন।
তখন আমার মা উমরাহ বিনতে রাওয়াহা (রাঃ) বলেনঃ “আমি এ পর্যন্ত নিশ্চিন্ত হতে পারি না যে পর্যন্ত না রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এর উপর সাক্ষী বানানো হয়।' এ কথা শুনে আমার পিতা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হাযির হয়ে ঘটনাটি বর্ণনা করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার পিতাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমার অনান্য সন্তানদেরকেও কি এরূপ দান দিয়ে রেখেছো?” আমার পিতা উত্তরে বললেনঃ ‘না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “আল্লাহকে ভয় কর এবং স্বীয় সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ কায়েম কর। যাও, আমি কোন অত্যাচারের উপর সাক্ষী হতে পারি না। আমার পিতা তখন ঐ দান আমার নিকট হতে ফিরিয়ে নেন।ইরশাদ হচ্ছে- কোন সম্পদায়ের শত্রুতা যেন তোমাদেরকে আদল ও ইনসাফের পথ থেকে সরিয়ে না দেয়।
(এখানে কওম' দ্বারা ইয়াহূদকে বুঝানো হয়েছে। তারা নবী (সঃ)-কে হত্যা করার ইচ্ছা করেছিল। যেমন ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। আর সুহাইলী বলেন যে, এখানে কওম’ দ্বারা গাওরাস ইবনে হারিস গাতফানীকে বুঝানো হয়েছে) বন্ধু হোক বা শত্রু হোক, তোমাদের ইনসাফের পক্ষ অবলম্বন করা উচিত। এটাই হচ্ছে তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী। এখানে (আরবী) ঐ (আরবী)-এর উপর (আরবী) করেছে যার দিকে (আরবী) টি ফিরেছে। এ নযীর কুরআন মাজীদে আরও রয়েছে। আরবদের কথাতেও এর ব্যবহার দেখা যায়। কুরআন কারীমের এক জায়গায় রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ তোমরা যদি কোন বাড়ীতে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা কর, “আর সে সময় তোমাদেরকে বলা হয়- ফিরে যাও, তাহলে তোমরা ফিরে যাবে, এটাই তোমাদের জন্যে অধিক পবিত্র থাকার কারণ হবে।”(২৪:২৮) সুতরাং এখানেও (আরবী) -এর (আরবী) -এর উল্লেখ করা হয়নি, কিন্তু (আরবী) এর (আরবী) বিদ্যমান রয়েছে।
অর্থাৎ ফিরে যাওয়া। অনুরূপভাবে আয়াতেও এ (আরবী) অর্থাৎ “ইনসাফ করা বিদ্যমান রয়েছে। এটাও স্মরণীয় বিষয় যে, এখানে শব্দটি (আরবী) -এর রূপ। এটা এমন জায়গায় রয়েছে যে অন্যদিকে আর কিছুই নেই। যেমনঃ (আরবী) (২৫ ২৪)-এ আয়াতটিতে রয়েছে। আর যেমন এক মহিলার হযরত উমার (রাঃ)-কে (আরবী) -এ কথা বলা। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, নিশ্চয়ই তিনি তোমাদের আমল সম্বন্ধে পূর্ণ ওয়াকিফহাল। তিনি ভাল ও মন্দের পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন। তিনি মুমিনদের পাপ ক্ষমা করে তাদেরকে মহান পুরস্কার অর্থাৎ জান্নাত দান করার অঙ্গীকার করেছেন।
যদিও প্রকৃতপক্ষে তারা এ রহমত একমাত্র আল্লাহর অনুগ্রহের ফলেই লাভ করবে, কিন্তু এ রহমতের প্রতি মনোযোগ দেয়ার কারণ হবে তাদের আমল। অতএব, প্রকৃতপক্ষে সর্বপ্রকারের প্রশংসার যোগ্য একমাত্র আল্লাহ এবং সব কিছুই তারই অনুগ্রহ ও দয়া মাত্র। জ্ঞান ও ইনসাফের দাবী তো এটাই যে, মুমিন ও সৎ লোকদেরকে জান্নাত দেয়া হোক এবং কাফির ও মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদেরকে জাহান্নামে প্রবিষ্ট করা হোক। সুতরাং হবেও তাই। তারপর আল্লাহ পাক নিজের আর একটি নিয়ামতের কথা মুমিনদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। যার বিস্তারিত বিবরণ নিম্নরূপঃহযরত জাবির (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, কোন এক সফরে নবী (সঃ) একটি মনযিলে অবতরণ করেন।
জনগণ ছায়াযুক্ত বৃক্ষরাজির খোঁজে বিচ্ছিন্নভাবে এদিক ওদিক ঘোরাফেরা করছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় হাতিয়ার একটি গাছে লটকিয়ে রাখেন। এমন সময় এক বেদুঈন এসে তাঁর তরবারীখানা হাতে টেনে নিয়ে বলে, আপনাকে এখন আমার হাত থেকে কে বাঁচাতে পারে? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আমাকে বাঁচাবেন)।” সে দ্বিতীয়বার এ প্রশ্নই করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) পুনরায় এ উত্তরই দিলেন। বেদুঈন তৃতীয়বার বললো, “আপনাকে আমা থেকে রক্ষা করবে কে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ আল্লাহ। বর্ণনাকারী বলেন যে, এ কথা বলার সাথে সাথে বেদুঈনের হাত থেকে তরবারী পড়ে গেল।
রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে ডাক দিলেন। তাঁরা এসে গেলে তিনি তাঁদের কাছে বেদুঈনের ঘটনাটি বর্ণনা করলেন। সে তখনও তার পার্শ্বে উপবিষ্ট ছিল। কিন্তু তিনি তার কোন প্রতিশোধ নিলেন না। কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, কতগুলো তোক প্রতারণা করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে হত্যা করতে চেয়েছিল এবং তারাই ঐ বেদুঈনকে গুপ্তঘাতক হিসেবে তাঁর নিকট পাঠিয়েছিল। কিন্তু মহান আল্লাহ তাদের পরিকল্পনা এভাবে ব্যর্থ করে দেন। সহীহ হাদীস দ্বারা জানা যায় যে, ঐ বেদুঈনের নাম ছিল গাওরাস ইবনে হারিস। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ইয়াহূদীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও তাঁর সাহাবীদেরকে হত্য করার উদ্দেশ্যে খাদ্যে বিষ মিশিয়ে তাদেরকে দাওয়াত করে।
কিন্তু মহান আল্লাহ এ সংবাদ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জানিয়ে দেন। সুতরাং তারা বেঁচে যান। একথাও বলা হয়েছে যে, কা'ব ইবনে আশরাফ এবং তার ইয়াহূদী সঙ্গীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বাড়ীতে ডেকে নিয়ে কষ্ট দিতে চেয়েছিল। এটা ঐ সময়ের ঘটনা, যখন নবী (সঃ) আমেরী লোকদের দিয়াত গ্রহণের জন্যে তাদের নিকট গিয়েছিলেন। ঐ সময় দুষ্টেরা আমর ইবনে জাহাশ ইবনে কা'বকে উত্তেজিত করতঃ বলেছিল- “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে নীচে দাঁড় করিয়ে রেখে আলোচনায় লিপ্ত করিয়ে রাখবো, এ সুযোগে তুমি উপর থেকে তার উপর পাথর ফেলে দিয়ে তাঁকে দুনিয়া হতে বিদায় করে দেবে।” কিন্তু মহান আল্লাহ স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে পথেই তাদের দুষ্টামির কথা জানিয়ে দেন।
সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণসহ সেখান হতে ফিরে আসেন। এ আয়াতে ঐ ঘটনারই উল্লেখ রয়েছে।ইরশাদ হচ্ছে-মুমিনদের আল্লাহর উপর ভরসা করা উচিত। বিপদ আপদ থেকে রক্ষাকারী একমাত্র তিনিই। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) মহান আল্লাহর নির্দেশক্রমে বানূ নাযীরের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী নিয়ে অগ্রসর হন। তাদের কিছু সংখ্যক লোককে হত্যা করেন এবং কতক লোককে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেন।
আর স্মরণ কর, তোমাদের উপর আল্লাহর নেয়ামত এবং যে অঙ্গীকারে তিনি তোমাদেরকে আবদ্ধ করেছিলেন তা; যখন তোমরা বলেছিলে, ‘শুনলাম এবং মেনে নিলাম’ [১]। আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর; নিশ্চয় আল্লাহ অন্তরে যা আছে সে সম্পর্কে সবিশেষ অবগত।
[১] সত্যনিষ্ঠ মুফাসসিরদের মতে, এখানে কোন মুখ দিয়ে বের হওয়া অঙ্গীকার উদ্দেশ্য নয়। বরং ঈমান আনার সাথে সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদেশ-নিষেধ পালনের যে অঙ্গীকার স্বতঃই এসে যায়, তা-ই উদ্দেশ্য। [ইবন কাসীর, সাদী, মুয়াসসার]
[সূরা আল-মায়িদাহ (৫): আয়াত ৭] পূর্ণ পৃষ্ঠা
সম্পূর্ণ করেছেন «১», এবং সঠিক হলো আবু আব্দুল্লাহ, আব্দুল্লাহ নয়। এটি ইমাম মালিকের ভ্রমের অন্তর্ভুক্ত। তাঁর নাম আব্দুর রহমান ইবন উসায়লা, তিনি একজন প্রবীণ শামী তাবেয়ী। তিনি আবু বকর (রা.)-এর খেলাফতের প্রথম অংশ পেয়েছিলেন। আবু আব্দুল্লাহ আস-সুনাবিহী বলেন: আমি ইয়েমেন থেকে হিজরতকারী হিসেবে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে রওনা হলাম। আমরা যখন জুহফায় পৌঁছলাম, তখন এক আরোহীর দেখা পেলাম। আমরা তাকে জিজ্ঞেস করলাম, খবর কী? সে বলল, আমরা তিন দিন আগে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে দাফন করেছি। এই হাদীসগুলো এবং আমর ইবন আবাসা ও অন্যদের বর্ণিত হাদীস যা একই অর্থ বহন করে, তা থেকে স্পষ্ট হয় যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ওযু পাপ মোচনের জন্য একটি ইবাদত হিসেবে প্রবর্তিত হওয়া।
আর এটি একটি শরয়ী নিয়তের প্রয়োজনীয়তাকে দাবি করে, কারণ এটি পাপ মুছে ফেলা এবং মহান আল্লাহর কাছে মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য প্রবর্তিত হয়েছে। বত্রিশতম মাসআলা- মহান আল্লাহর বাণী: (আল্লাহ তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা চাপিয়ে দিতে চান না) অর্থাৎ দ্বীনের মধ্যে কোনো সংকীর্ণতা। এর দলীল হলো আল্লাহর বাণী: "এবং তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা আরোপ করেননি" [আল-হাজ্জ: ৭৮]। আর "মিন" শব্দটি এখানে অতিরিক্ত (সিলাহ), অর্থাৎ যাতে তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা আরোপ না করেন। (বরং তিনি তোমাদের পবিত্র করতে চান) অর্থাৎ পাপ থেকে, যেমনটি আমরা আবু হুরায়রা ও আস-সুনাবিহী বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ করেছি।
আবার বলা হয়েছে: অপবিত্রতা ও জানাবাত থেকে। কেউ কেউ বলেছেন: যাতে তোমরা পবিত্রতার সেই গুণের অধিকারী হতে পারো যার মাধ্যমে আনুগত্যশীল ব্যক্তিদের বিশেষায়িত করা হয়। সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব 'লিউতাহহিরাকুম' পাঠ করেছেন এবং উভয় কিরাআতের অর্থ একই, যেমন বলা হয়: 'নাজ্জাহু' ও 'আনজাহু'। (এবং তোমাদের ওপর তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করতে চান) অর্থাৎ অসুস্থতা ও সফরের সময় তায়াম্মুমের অনুমতি প্রদানের মাধ্যমে। কেউ বলেছেন: শরীয়তের বিধানসমূহ স্পষ্টভাবে বর্ণনার মাধ্যমে। কেউ বলেছেন: পাপ মার্জনা করার মাধ্যমে। আর হাদীসে এসেছে, "জান্নাতে প্রবেশ এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তিই হলো অনুগ্রহের পূর্ণতা।" (যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো) অর্থাৎ যাতে তোমরা তাঁর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করো এবং তাঁর আনুগত্যে আত্মনিয়োগ করো।
[সূরা আল-মায়িদাহ (৫): আয়াত ৭]তোমরা তোমাদের ওপর আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ করো এবং সেই অঙ্গীকারের কথা যা তিনি তোমাদের থেকে নিয়েছিলেন, যখন তোমরা বলেছিলে, আমরা শুনলাম ও মান্য করলাম। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ অন্তরের লুকায়িত বিষয় সম্পর্কে সম্যক অবগত। (৭)মহান আল্লাহর বাণী: (তোমরা তোমাদের ওপর আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ করো এবং সেই অঙ্গীকারের কথা যা তিনি তোমাদের থেকে নিয়েছিলেন)। বলা হয়েছে: এটি সেই অঙ্গীকার যা মহান আল্লাহর এই বাণীতে বর্ণিত হয়েছে: "আর স্মরণ করো, যখন তোমার রব বনী আদমের পিঠ থেকে তাদের বংশধরদের গ্রহণ করেছিলেন" [আল-আরাফ: ১৭২]; এটি মুজাহিদ ও অন্যরা বলেছেন।
আমরা যদিও সেই অঙ্গীকারের কথা এখন স্মরণ করতে পারছি না, তবুও সত্যবাদী (রাসূল) আমাদের এ সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন, তাই আমাদের এটি পালনের নির্দেশ দেওয়া বৈধ। আবার কেউ বলেছেন: এটি ইয়াহুদীদের প্রতি সম্বোধন, যেন তারা তাওরাতে তাদের থেকে গৃহীত অঙ্গীকার রক্ষা করে। ইবন আব্বাস ও সুদ্দীসহ অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে...(১). হাদীসটি মালিক (মুয়াত্তা)-তে বর্ণনা করেছেন।(২). দেখুন: খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ৯৯।(৩). দেখুন: খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ৩১৩।
মুমিনদের জন্য ক্ষতি বা উপকারের মালিক...ওমর (রা.) বললেন: হে আবুল হাসান! আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই এমন কওমের মাঝে বেঁচে থাকা থেকে যাদের মাঝে আপনি নেই।আবু আল-শেখ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন (আল্লাহর বাণী) "এবং যখন আপনার পালনকর্তা গ্রহণ করলেন" - এই আয়াত প্রসঙ্গে।তিনি বলেন: আল্লাহ তাআলা তাদের সকলকে তাঁর হাতের তালুতে নিলেন—পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল মানুষকে—যেন তারা সরিষার দানার মতো। তারপর তিনি তাদের তাঁর হাতে দুই বা তিনবার ওলটপালট করলেন, আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী তাদের উপরে তুললেন এবং নিচে নামালেন। অতঃপর তিনি তাদের তাদের পিতাদের পৃষ্ঠদেশে ফিরিয়ে দিলেন, যতক্ষণ না তিনি তাদের বংশ পরম্পরায় বের করে আনেন।
এরপর তিনি বললেন: "এবং আমি তাদের অধিকাংশের মধ্যে কোনো প্রতিশ্রুতি (পালনের সংকল্প) পাইনি" (সূরা আল-আরাফ, আয়াত ১০২)।অতঃপর এর পর অবতীর্ণ হলো: "আর তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ এবং তাঁর সেই অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করো, যার মাধ্যমে তিনি তোমাদেরকে আবদ্ধ করেছিলেন" (সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত ৭)।আল-বায়হাকী 'আল-আসমা ওয়াস-সিফাত' গ্রন্থে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: যখন আল্লাহ আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করলেন, তখন তিনি তাঁকে এমনভাবে ঝাড়লেন যেমন থলি ঝাড়া হয়। ফলে তাঁর থেকে কীটের মতো (মানুষের রূহসমূহ) বের হয়ে আসল। তখন তিনি সেখান থেকে দুই মুষ্টি গ্রহণ করলেন।
ডান হাতের মুষ্টি সম্পর্কে বললেন: "জান্নাতে," আর অপর হাতের মুষ্টি সম্পর্কে বললেন: "জাহান্নামে।"ইবনে সাদ এবং আহমদ আবদুর রহমান ইবনে কাতাদা আস-সুলামী (রা.)—যিনি আল্লাহর রাসুলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) একজন সাহাবী ছিলেন—থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: আমি আল্লাহর রাসুলকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলতে শুনেছি—নিশ্চয়ই আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা আদমকে সৃষ্টি করলেন, তারপর তাঁর পৃষ্ঠদেশ থেকে সৃষ্টিজগতকে বের করলেন। অতঃপর তিনি বললেন: "এরা জান্নাতে যাবে এবং এতে আমার কোনো পরোয়া নেই, আর এরা জাহান্নামে যাবে এবং এতেও আমার কোনো পরোয়া নেই।"এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল: "হে আল্লাহর রাসুল!
তবে আমরা কিসের ভিত্তিতে আমল করব?" তিনি বললেন: "তাকদীরের নির্ধারিত বিষয়ের ওপর।"আহমদ, আল-বাজার এবং আত-তাবারানী আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: আল্লাহ যখন আদমকে সৃষ্টি করলেন, তখন তাঁর ডান কাঁধে হাত মারলেন এবং পিঁপড়ার মতো শ্বেতবর্ণের এক বংশধর বের করলেন। আর তাঁর বাম কাঁধে হাত মারলেন এবং কয়লার মতো কৃষ্ণবর্ণের এক বংশধর বের করলেন। অতঃপর তিনি তাঁর ডান দিকের জন্য বললেন: "জান্নাতের দিকে, আর আমি পরোয়া করি না।" এবং বাম দিকের জন্য বললেন: "জাহান্নামের দিকে, আর আমি পরোয়া করি না।"আল-বাজার, আত-তাবারানী, আল-আজুরী এবং ইবনে মারদুওয়াইহ আবু মুসা আল-আশআরী (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন—আল্লাহ জাল্লা জিকরূহু যেদিন আদমকে সৃষ্টি করলেন, তাঁর পৃষ্ঠদেশ থেকে দুই মুষ্টি গ্রহণ করলেন।
ফলে সমস্ত পবিত্র আত্মা তাঁর ডান হাতে এল এবং সমস্ত অপবিত্র আত্মা তাঁর অন্য হাতে এল। অতঃপর তিনি বললেন: "এরা জান্নাতবাসী এবং আমি পরোয়া করি না, আর এরা জাহান্নামবাসী এবং আমি পরোয়া করি না।" এরপর তিনি তাদের আদমের পৃষ্ঠদেশে ফিরিয়ে দিলেন; সুতরাং তারা এখন পর্যন্ত সেই অনুযায়ীই জন্মলাভ করছে।আল-বাজার, আত-তাবারানী এবং ইবনে মারদুওয়াইহ আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দুই মুষ্টি সম্পর্কে বলেছেন: "এরা জান্নাতে এবং আমি পরোয়া করি না।"
