Al-Ma'idah

আল-মায়িদা: 45

5:45
5 আল-মায়িদা Al-Ma'idah · 120 আয়াত المائدة

আরবি

وَكَتَبْنَا عَلَيْهِمْ فِيهَآ أَنَّ ٱلنَّفْسَ بِٱلنَّفْسِ وَٱلْعَيْنَ بِٱلْعَيْنِ وَٱلْأَنفَ بِٱلْأَنفِ وَٱلْأُذُنَ بِٱلْأُذُنِ وَٱلسِّنَّ بِٱلسِّنِّ وَٱلْجُرُوحَ قِصَاصٌ ۚ فَمَن تَصَدَّقَ بِهِۦ فَهُوَ كَفَّارَةٌ لَّهُۥ ۚ وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُو۟لَـٰٓئِكَ هُمُ ٱلظَّـٰلِمُونَ

English Translations

Sahih International

And We ordained for them therein a life for a life, an eye for an eye, a nose for a nose, an ear for an ear, a tooth for a tooth, and for wounds is legal retribution. But whoever gives [up his right as] charity, it is an expiation for him. And whoever does not judge by what Allāh has revealed - then it is those who are the wrongdoers [i.e., the unjust].

Muhsin Khan

And We ordained therein for them: "Life for life, eye for eye, nose for nose, ear for ear, tooth for tooth, and wounds equal for equal." But if anyone remits the retaliation by way of charity, it shall be for him an expiation. And whosoever does not judge by that which Allah has revealed, such are the Zalimun (polytheists and wrong-doers - of a lesser degree).

Taqi Usmani

We prescribed for them therein: A life for a life, an eye for an eye, a nose for a nose, an ear for an ear and a tooth for a tooth; and for wounds, an equal retaliation. Then, if one forgives it, that will be expiation for him. Those who do not judge according to what Allah has sent down, they are the unjust.

Abul Ala Maududi

And therein We had ordained for them: 'A life for a life, and an eye for an eye, and a nose for a nose, and an ear for an ear, and a tooth for a tooth, and for all wounds, like for like. But whosoever forgoes it by way of charity, it will be for him an expiation. Those who do not judge by what Allah has revealed are indeed the wrong-doers.

Pickthall

And We prescribed for them therein: The life for the life, and the eye for the eye, and the nose for the nose, and the ear for the ear, and the tooth for the tooth, and for wounds retaliation. But whoso forgoeth it (in the way of charity) it shall be expiation for him. Whoso judgeth not by that which Allah hath revealed: such are wrong-doers.

Yusuf Ali

We ordained therein for them: "Life for life, eye for eye, nose or nose, ear for ear, tooth for tooth, and wounds equal for equal." But if any one remits the retaliation by way of charity, it is an act of atonement for himself. And if any fail to judge by (the light of) what Allah hath revealed, they are (No better than) wrong-doers.

বাংলা অনুবাদ

তাইসিরুল কুরআন

আমি তাদের জন্য তাতে বিধান দিয়েছিলাম যে, জানের বদলে জান, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান, আর দাঁতের বদলে দাঁত। আর জখমের বদলে অনুরূপ জখম। কেউ ক্ষমা করে দিলে তাতে তারই পাপ মোচন হবে। আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিচার ফায়সালা করে না তারাই যালিম।

রাওয়াই আল-বায়ান

আর আমি এতে তাদের উপর অবধারিত করেছি যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চোখের বিনিময়ে চোখ, নাকের বিনিময়ে নাক, কানের বিনিময়ে কান ও দাঁতের বিনিময়ে দাঁত এবং জখমের বিনিময়ে সমপরিমাণ জখম। অতঃপর যে তা ক্ষমা করে দেবে, তার জন্য তা কাফ্ফারা হবে। আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম।

শাইখ মুজিবুর রহমান

আর আমি তাদের প্রতি তাতে (তাওরাতে) এটা ফরয করেছিলাম যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চক্ষুর বিনিময়ে চক্ষু, নাকের বিনিময়ে নাক, কানের বিনিময়ে কান, দাঁতের বিনিময়ে দাঁত এবং (তদ্রুপ অন্যান্য) যখমেরও বিনিময়ে যখম রয়েছে; কিন্তু যে ব্যক্তি তাকে ক্ষমা করে দেয়, তাহলে এটা তার জন্য (পাপের) কাফ্ফারা হয়ে যাবে; আর যে ব্যক্তি আল্লাহর অবতারিত বিধান অনুযায়ী ফাইসালা করেনা, তাহলেতো এমন ব্যক্তি পূর্ণ যালিম।

ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

আর আমরা তাদের উপর তাতে অত্যাবশ্যক করে দিয়েছিলাম যে, প্রাণের বদলে প্রাণ, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান, দাঁতের বদলে দাঁত এবং যখমের বদলে অনুরূপ যখম। তারপর কেউ তা ক্ষমা করলে তা তার জন্য কাফফারা হবে। আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিধান দেয় না, তারাই যালিম।

ফাতহুল মাজীদ

আমি তাদের জন্য তাতে ফরয করে দিয়েছিলাম যে, প্রাণের বদলে প্রাণ, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান, দাঁতের বদলে দাঁত এবং জখমের বদলে অনুরূপ জখম। তবে কেউ তা ক্ষমা করে দিলে তা তার (ক্ষমাকারীর) জন্য পাপের কাফফারা হবে। আর যারা আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন সে অনুযায়ী মীমাংসা করে না তারাই অত্যাচারী।

মুখতাসার

৪৫. আমি তাওরাতে ইহুদিদের উপর যে বিষয়টি অবধারিত করেছি তা হলো যে কাউকে ইচ্ছাকৃত অবৈধভাবে হত্যা করবে তাকে তার পরিবর্তে হত্যা করা হবে। যে চোখ উপড়ে ফেলবে তার চোখও উপড়ে ফেলা হবে। যে নাক কেটে ফেলবে তার নাকও কেটে দেয়া হবে। যে কান কেটে ফেলবে তার কানও কেটে দেয়া হবে। যে দাঁত উঠিয়ে নিবে তার দাঁতও উঠিয়ে নেয়া হবে। আমি তাদের উপর আরো অবধারিত করেছি যে, জখম করা হলে অপরাধীকে তার অপরাধের সমপরিমাণ শাস্তি দেয়া হবে। আর যে অপরাধীকে এমনিতেই ক্ষমা করে দিবে তার এ ক্ষমা তার গুনাহগুলোর জন্য কাফফারা হবে। কারণ, সে তার জালিমকে ক্ষমা করলো। আর যে কিসাস ও অন্যান্য বিষয়ে আল্লাহর অবতীর্ণ বিধান অনুযায়ী ফায়সালা করবে না সে বস্তুতঃ আল্লাহর দেয়া সীমারেখা অতিক্রমকারী।

তাফসীর

তাফসীর ইবনে কাসীর

ইয়াহুদীদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, তাদের কিতাবে পরিষ্কার ভাষায় যে হুকুমগুলো ছিল তারা তো খোলাখুলিভাবে তারও বিরোধিতা করছে এবং দুষ্টামি করে ও বেপরওয়া ভাব দেখিয়ে সেগুলোও পরিত্যাগ করছে। ইয়াহূদ বানু নাযীরকে ইয়াহূদ বানূ কুরাইযার বিনিময়ে হত্যা করছে, কিন্তু ইয়াহূদ বানু কুরাইযাকে ইয়াহূদ বানূ নাযীরের বিনিময়ে হত্যা করছে না। অনুরূপভাবে তারা বিবাহিত ব্যভিচারীর রজমের হুকুমকে বদলিয়ে দিয়েছে এবং মারপিট করে ছেড়ে দিচ্ছে। এজন্যই সেখানে তাদেরকে কাফির বলা হয়েছে। আর এখানে ইনসাফ না করার কারণে তাদেরকে যালিম বলা হয়েছে। সুনানে আবি দাউদ ইত্যাদি হাদীস গ্রন্থে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর (আরবী) পড়াও বর্ণিত আছে। উলামায়ে কিরাম বলেনঃ “পূর্ববর্তী যে শরীয়তকে আমাদের সামনে আলোচনা পর্যায়ে বর্ণনা করা হয়েছে এবং তা মানসূখ বা রহিত করা হয়নি ওটা আমাদের জন্যও শরীয়ত। যেমন উপরোক্ত এ সমস্ত হুকুম আহকাম আমাদের শরীয়তেও একইভাবে প্রযোজ্য।” ইমাম নববী (রঃ) বলেন যে, মাসআলায় তিনটি পন্থা বা নীতি বর্ণিত রয়েছে। প্রথম তো ওটাই যা বর্ণনা করা হলো। দ্বিতীয়টি হচ্ছে এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তৃতীয়টি হচ্ছে এই যে, শুধু হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর শরীয়ত জারী ও বাকী রয়েছে। অন্য কোন শরীয়ত অবশিষ্ট নেই।এ আয়াতটি সাধারণ বলে এর দ্বারা এ দলীলও গ্রহণ করা হয়েছে যে, স্ত্রীলোকের হত্যার বিনিময়েও পুরুষ লোককে হত্যা করা হবে। কেননা, এখানে (আরবী) শব্দ রয়েছে, যদ্দ্বারা নারী পুরুষ উভয়কেই বুঝাচ্ছে। তাছাড়া সুনানে নাসাঈ ইত্যাদি হাদীস গ্রন্থেও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমর ইবনে হাযাম (রাঃ)-কে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, স্ত্রীলোকের হত্যার বিনিময়ে পুরুষ লোককে হত্য করা হবে। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে, মুসলমানদের রক্ত পরস্পরের মধ্যে সমান। কোন কোন মনীষী হতে বর্ণিত আছে যে, কোন পুরুষ লোক যদি কোন স্ত্রীলোককে হত্যা করে তবে তার বিনিময়ে পুরুষ লোকটিকে হত্যা করা হবে না, (আরবী) বরং তার নিকট থেকে রক্তপণ আদায় করতে হবে। এটা কিন্তু জমহুর উলামার বিপরীত কথা। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) তো এতদূর পর্যন্ত বলেছেন যে, যিম্মী কাফিরের হত্যার বিনিময়েও মুসলমানকে হত্যা করা হবে এবং গোলামের হত্যার বিনিময়ে আযাদ ব্যক্তিকেও হত্যা করা হবে। কিন্তু এ মাযহাব জমহূরের বিপরীত। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ কাফিরের হত্যার বিনিময়ে মুলমানকে হত্যা করা হবে না। আর পূর্ববর্তী মনীষীদের বহু নমুনা এ ব্যাপারে বিদ্যমান রয়েছে যে, তারা আযাদ ব্যক্তি হতে গোলাম হত্যার কিসাস গ্রহণ করতেন না। আর গোলামের হত্যার বিনিময়ে আযাদ ব্যক্তিকে হত্যা করা হবে না। এ ব্যাপারে কতগুলো হাদীসও বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু সেগুলো বিশুদ্ধতায় পৌছেনি। ইমাম শাফিঈ (রঃ) তো বলেছেন যে, এ মাসআলা ইমাম আবু হানীফা (রঃ)-এর উক্তির বাতিল হওয়া সাব্যস্ত হয় না যে পর্যন্ত না এ আয়াতের সাধারণত্বকে নির্দিষ্ট করণের কোন যবরদস্ত ও স্পষ্ট দলীল সাব্যস্ত হয়।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, হযরত আনাস ইবনে ন্যর (রাঃ)-এর ফুফু হযরত রাবী (রঃ) একটি দাসীর একটি দাঁত ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। তখন জনগণ তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে। কিন্তু সে ক্ষমা করতে অস্বীকৃতি জানায়। তারা তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গমন করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘কিসাস নেয়া হবে। তখন হযরত আনাস ইবনে নযর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তার কি সামনের দাঁত ভেঙ্গে দেয়া হবে?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হ্যা! হে আনাস! আল্লাহর কিতাবে কিসাসের হুকুম বিদ্যমান রয়েছে।” তখন হযরত আনাস (রাঃ) বললেনঃ না, না, যে আল্লাহ আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন তার শপথ! তার দাঁত কখনও ভেঙ্গে ফেলা হবে না। বস্তুতঃ হলোও তাই। দাসীটির কওম সম্মত হয়ে গেল এবং কিসাস ছেড়ে দিলো, এমন কি সম্পূর্ণরূপে ক্ষমাই করে দিলো। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “অবশ্যই আল্লাহর কতক বান্দা এমন রয়েছে যে, তারা আল্লাহর উপর কোন কিছুর কসম করলে তিনি তা পুরো করেই ছাড়েন।” দ্বিতীয় বর্ণনায় রয়েছে যে, প্রথমে তারা ক্ষমাও করেনি এবং দিয়্যাতও মঞ্জুর করেনি। সুনানে নাসাঈ ইত্যাদি হাদীস গ্রন্থে রয়েছে যে, একটি গরীব। জামাআতের গোলাম কোন এক ধনী জামাআতের গোলামের কান কেটে দেয়। ঐ লোকগুলো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে আরয করেঃ আমরা দরিদ্র লোক, আমাদের কাছে মালধন নেই। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের উপর কোন জরিমানা করেননি। হতে পারে যে, গোলামটি হয়তো প্রাপ্ত বয়স্ক হয়নি, কিংবা। হতে পারে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজের পক্ষ থেকে দিয়্যাত প্রদান করেছিলেন। আবার এটাও হতে পারে যে, তিনি তাদেরকে সুপারিশ করে তাদের নিকট থেকে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, প্রাণের বদলে প্রাণ হত্যা করা হবে, কেউ কারও চক্ষু উঠিয়ে নিলে তারও চক্ষু উঠিয়ে নেয়া হবে, কেউ কারও নাক কেটে নিলে তারও নাক কেটে নেয়া হবে, কেউ কারও দাঁত ভেঙ্গে দিলে তারও দাত ভেঙ্গে দেয়া হবে এবং যখমেরও বদলা নেয়া হবে। এ ব্যাপারে আযাদ মুসলমান সবাই সমান। নারী ও পুরুষের একই হুকুম, যখন তারা ইচ্ছাপূর্বক এ কাজ করবে। তাতে গোলামেরাও পরস্পরের মধ্যে সমান। তাদের পুরুষ লোকেরাও সমান এবং স্ত্রীলোকেরাও সমান। নীতিমালাঃ অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো কর্তন কখনও জোড়ার উপর হয়ে থাকে। এতে কিসাস ওয়াজিব হয়। যেমন হাত, পা, হাতের তালু ইত্যাদি। কিন্তু যে ক্ষত জোড়ের উপর হয় না, বরং অস্থির উপর হয়, সে সম্পর্কে ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, উরু এবং উরুর ন্যায় অন্য অঙ্গ ছাড়া অস্থিতেও ওয়াজিব। কেননা, ওটা ভয় ও বিপদের জায়গা। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয়ের মাযহাব এই যে, দাঁত ছাড়া কোন অস্থিতে কিসাস ওয়াজিব নয়। ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর নিকট কোন অস্থির উপর সাধারণভাবে কিসাস ওয়াজিব নয়। হযরত উমার ফারূক (রাঃ) এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এরূপই বর্ণিত আছে। আতা (রঃ), শাবী (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), যুহরী (রঃ), ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) এবং উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ) এ কথাই বলেছেন। সুফিয়ান সাওরী (রঃ) এবং লায়েস ইবনে সাদও (রঃ) এদিকেই গিয়েছেন। ইমাম আহমাদ (রঃ) হতেও এ উক্তিটিই বেশী প্রসিদ্ধ হয়ে আছে। ইমাম আবু হানীফা (রঃ)-এর দলীল হচ্ছে হযরত আনাস (রাঃ) বর্ণিত হাদীসটি যাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর রাবী (রাঃ) হতে দাঁতের কিসাস গ্রহণের উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ রিওয়ায়াত দ্বারা এ মাযহাব সাব্যস্ত হচ্ছে না। কেননা, তাতে এ শব্দগুলো রয়েছে যে, তিনি তার সামনের দাঁত ভেঙ্গে ছিলেন। আর হতে পারে যে, দাঁত না ভেঙ্গেই ঝরে পড়েছিল। এ অবস্থায় কিসাস ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে সবাই একমত। তাঁর দলীলের পূর্ণ অংশ ওটাই যা সুনানে ইবনে মাজায় রয়েছে। তা এই যে, একটি লোক অপর একটি লোকের বাহুতে কনুইর নীচে তালোয়ার মেরেছিল, যার ফলে তার হাতের কজি কেটে গিয়েছিল। এ মুকদ্দমা নবী (সঃ)-এর সামনে পেশ করা হয়। তিনি দিয়্যাত আদায়ের নির্দেশ দেন। তখন লোকটি বলেঃহে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি কিসাস চাই। তিনি বললেনঃ “তুমি দিয়্যাত গ্রহণ কর। আল্লাহ তোমাকে তাতে বরকত দান করবেন। তিনি কিসাসের নির্দেশ দিলেন না। কিন্তু এ হাদীসটি খুবই দুর্বল। এর একজন বর্ণনাকারী হাশাম ইবনে উকলী আবারী দুর্বল। তার হাদীস দ্বারা দলীল গ্রহণ করা হয় না। আর একজন বর্ণনাকারী হচ্ছে গেরান ইবনে জারিয়া আরাবী, সেও দুর্বল। অতঃপর তারা বলেন যে, যখম ভাল ও ঠিক হয়ে যাওয়ার পূর্বে ওর কিসাস নেয়া জায়েয নয়। আর যদি ভাল হওয়ার পূর্বেই কিসাস নিয়ে নেয়, তারপর যখম বেড়ে যায় তবে আবার বদলা নেয়া যাবে না। এর দলীল হচ্ছে মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হাদীসটি। তা হচ্ছে নিম্নরূপঃ আমর ইবনে শুআইব তাঁর পিতা এবং তিনি তার দাদা হতে বর্ণনা করেছেন যে, একটি লোক অন্য একটি লোকের জানুতে আঘাত করে। সে তখন নবী (সঃ) এর নিকট হাযির হয়ে বলেঃ আমাকে কিসাস নিয়ে দিন।' তিনি বললেনঃ যখম ভাল হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা কর।' সে আবার এসে বললোঃ আমাকে কিসাস নিয়ে দিন। তিনি তখন কিসাস নিয়ে দিলেন। এরপর লোকটি আবার নবী (সঃ)-এর নিকট এসে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি তো খোড়া হয়ে গেছি। তখন তিনি বললেনঃ “আমি তো তোমাকে (যখম ভাল হওয়ার পূর্বে কিসাস নিতে) নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু তুমি তা মেনে নাওনি। এখন তোমার এ খোঁড়ামির কোন বদলা নেই।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখম ভাল হওয়ার পূর্বে কাউকে তার প্রতিপক্ষের নিকট হতে কিসাস গ্রহণ করতে নিষেধ করেন।মাসআলাঃ কেউ যদি অন্যকে যখম করে এবং তার থেকে প্রতিশোধ নিয়ে নেয়া হয়, অতঃপর সে ঐ যখমেই মারা যায় তবে বিবাদীর উপর আর কিছুই ওয়াজিব হবে না। ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং জমহুর সাহাবা এবং তাবেঈনের এটাই উক্তি। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এর উক্তি এই যে, তার মাল থেকেই তার উপর দিয়্যাত ওয়াজিব হবে। আতা’ (রঃ) বলেন যে, তার পিতা-মাতার পক্ষীয় আত্মীয়-স্বজনদের উপর দিয়্যাত ওয়াজিব হবে। ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং নাখঈ (রঃ) বলেন যে, বিবাদীর উপর হতে ঐ যখম পরিমাণ তো উঠে যাবে, আর বাকীটা তারই মাল থেকে ওয়াজিব হবে।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ অনন্তর যে ব্যক্তি তাকে ক্ষমা করে দেবে, ওটা ঐ যখমকারীর জন্যে কাফফারা হয়ে যাবে এবং যাকে যখম করা হয়েছে তার জন্যে সওয়াব বা পুণ্যের কারণ হবে, যা আল্লাহরই দায়িত্বে রয়েছে। কেউ কেউ এটাও বলেছেন যে, ঐ কাফফারা হবে যখমকৃত ব্যক্তির জন্যে অর্থাৎ তার ঐ যখম পরিমাণ গুনাহ্ আল্লাহ মাফ করে দেবেন। একটি মারফু হাদীসে এসেছে যে, ওটা যদি দিয়্যাতের এক চতুর্থাংশ বরাবর জিনিস হয় এবং তা সে ক্ষমা করে দেয় তবে তার গুনাহ্র এক চতুর্থাংশ মাফ হয়ে যাবে। যদি এক তৃতীয়াংশের সমান হয় তবে এক তৃতীয়াংশ গুনাহ মাফ হবে। যদি অর্ধাংশের সমান হয় তবে অর্ধাংশ গুনাহ্ মাফ হবে। আর যদি পুরো দিয়্যাতের সমান হয় তবে তার সমস্ত গুনাহ্ মাফ হয়ে যাবে।ইমাম আহমাদ (রঃ) আবূ সফর (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, একজন কুরাইশী একজন আনসারীকে সজোরে ধাক্কা দেন। ফলে তাঁর সামনের দাঁত ভেঙ্গে যায়। হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর নিকট এ মুকদ্দমা নিয়ে যাওয়া হয়। তখন মুআবিয়া (রাঃ) ঐ বাদীকে বলেন, বিবাদীর ব্যাপারে তোমাকে অধিকার দেয়া হলো, তুমি যা ইচ্ছা তাই করতে পার। ঐ সময় হযরত আবু দারদা (রাঃ) সেখানে উপবিষ্ট ছিলেন। তিনি বললেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি-কেউ যদি কোন মুসলমানের দেহের উপর কোন কষ্ট দেয়, অতঃপর সে ধৈর্য ধারণ করে এবং প্রতিশোধ গ্রহণ না করে তবে আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন এবং তার পাপসমূহ ক্ষমা করে দেন।” একথা শুনে ঐ আনসারী বললেনঃ “আপনি কি সত্যি সত্যিই আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর মুখে এ কথা শুনেছেন?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “আমার কান শুনেছে এবং আমার অন্তর তা স্মরণ রেখেছে।” তখন আনসারী বললেনঃ “আমি আমার বিবাদীকে মাফ করে দিলাম।” হযরত মুআবিয়া (রাঃ) এ কথা শুনে খুবই খুশী হলেন এবং তাঁকে পুরস্কৃত করলেন। (তাফসীরে ইবনে জারীর) জামেউত তিরমিযীতেও এ হাদীসটি রয়েছে। কিন্তু ইমাম তিরমিযী একে গারীব বলেছেন। বর্ণনাকারী আবু সফরের হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে শ্রবণ সাব্যস্ত নয়। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, বিবাদী তিনগুণ দিয়াত দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তাতেও সম্মত হচ্ছিলেন না। তাতে হাদীসের শব্দগুলো নিম্নরূপ রয়েছে-“যে ব্যক্তি রক্ত বা তদপেক্ষা কমকে মাফ করে দেবে, ওটা তার জন্যে তার জীবন থেকে নিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত সময়ের কাফফারা হয়ে যাবে।” মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কোন ব্যক্তির দেহে যদি কারও দ্বারা কোন যখম হয় এবং সে তাকে মাফ করে দেয় তবে আল্লাহ তার সেই পরিমাণ গুনাহ মাফ করে দেন।” মুসনাদে আহমাদে নিম্নের হাদীসটিও রয়েছে-“যারা আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী ফায়সালা করে না তারা যালিম।” পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, কুফরীর মধ্যে কম বেশী আছে, যুলুমেরও কম বেশী আছে এবং ফিসকের মধ্যেও শ্রেণীভেদ রয়েছে।

তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া

আর আমরা তাদের উপর তাতে অত্যাবশ্যক করে দিয়েছিলাম যে, প্রাণের বদলে প্রাণ, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান, দাঁতের বদলে দাঁত এবং যখমের বদলে অনুরূপ যখম। তারপর কেউ তা ক্ষমা করলে তা তার জন্য কাফফারা হবে [১]। আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিধান দেয় না, তারাই যালিম।

[১] এ আয়াতে তাওরাতের বরাত দিয়ে কেসাসের বিধান বর্ণনা করে বলা হয়েছে, “আমি ইয়াহুদীদের জন্য তাওরাতের এ বিধান নাযিল করেছিলাম যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চোখের বিনিময়ে চোখ, নাকের বিনিময়ে নাক, কানের বিনিময়ে কান, দাঁতের বিনিময়ে দাঁত এবং বিশেষ জখমেরও বিনিময় আছে”। এ উম্মতের জন্যও কিসাসের উক্ত বিধান পুরোপুরি প্রযোজ্য। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, বনী ইসরাঈলের জন্য আল্লাহ্ তা’আলা তাওরাতে মূসা ‘আলাইহিস সালামকে যে বিধান দিয়েছিলেন, তাতে হত্যা, জখম, দাঁত, চোখ, কান ইত্যাদির বিপরীতে দিয়াত দেয়ার কোন সুযোগ ছিল না। হয় কিসাস নিতে হবে, না হয় তাকে ক্ষমা করে দিতে হবে। [তাবারী] এ উম্মতের জন্য তিনটি সুযোগ রয়েছে। তন্মধ্যে কিসাসের ব্যাপারটি এ আয়াতসহ অন্য আয়াত ও হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। আর দিয়াতের ব্যাপারটি হাদীসে এসেছে, আনাস ইবন মালেকের ফুফী রুবাই আনসারী এক মেয়ের দাঁত ভেঙ্গে ফেলেছিল। রাসূলের কাছে যখন এ মোকদ্দমা আসল, তখন তিনি তারও দাঁত ভেঙ্গে ফেলতে নির্দেশ দিলেন। তখন আনাস ইবন মালেকের চাচা আনাস ইবন নদর বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি রুবাইয়ার দাঁত ভেঙ্গে ফেলবেন না। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হে আনাস! আল্লাহর কিতাব কিসাসের কথাই বলছে। সবশেষে আনসারী মহিলার অভিভাবকরা দিয়াত গ্রহণে রাজী হয়েছিল। [বুখারী ৪৬১১; মুসলিম: ১৬৭৫]

এ হাদীসে কিসাস ও দিয়াত উভয় বিধানই প্রমানিত হলো। আর ক্ষমার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ “যে অংশের কেসাস ওয়াজিব হয়েছে সে অংশের কেসাস না নিয়ে সদকা করে দিলে আল্লাহ্ তা’আলা তার জন্য সে পরিমাণ গোনাহর কাফফারা করে দেবেন। [মুসনাদে আহমাদঃ ৫/৩১৬]