
Table of Contents
- 1 সারসংক্ষেপ
- 2 ভূমিকা
- 3 শুরুতেই সমস্যা: কালামের দুই প্রেমিস কি আসলে একটিই দাবি?
- 4 প্রথম প্রস্তাবনার ব্যবচ্ছেদঃ কার্যকারণ তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা
- 5 দ্বিতীয় প্রস্তাবনার সমালোচনা: মহাবিশ্বের কি সত্যিই শুরু আছে?
- 6 মডাল লজিকের আলোকে কালাম আর্গুমেন্ট
- 7 সিদ্ধান্তের অসঙ্গতিঃ কারণ কেন ‘ঈশ্বর’?
- 8 অ্যাপোলোজেটিক অসততার ব্যবচ্ছেদ
- 8.1 খুনের তদন্তঃ ‘জানি না’ কেন একটি যৌক্তিক সৎ অবস্থান
- 8.2 অজ্ঞেয়বাদের সুবিধাবাদী রূপান্তরঃ একটি ধাপ পিছিয়ে থাকা
- 8.3 গডফাদার আক্কাস আলী ও ইনফিনিট রিগ্রেসের গোলকধাঁধা
- 8.4 আত্মপ্রসাদের কল্পগল্পঃ নাস্তিক প্রফেসরের মিথ এবং স্ট্রোম্যান আর্গুমেন্ট
- 8.5 সীমাবদ্ধতার রূপকঃ জরায়ুর ভেতর দুই যমজ এবং ‘অজ্ঞতার আবরণ’
- 9 উপসংহার
সারসংক্ষেপ
ঐতিহাসিক ও দার্শনিক রচনাবলীতে ‘কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট’ (Kalam Cosmological Argument — KCA) দীর্ঘকাল ধরে শক্তিশালী প্রতিপাদ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। মধ্যযুগীয় ইসলামী তর্কশৈলী থেকে লালিত—পরে আধুনিক খ্রিস্টীয় অ্যাপোলোজেটিক্সে নতুন প্রাণ পেয়েছে—এই যুক্তি মহাবিশ্বকে সসীম ধরে নিয়ে তার পিছনে কোনো একটি অতিরিক্ত-মহাজাগতিক কারণ, অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তা দাবি করে। কিন্তু দাবিটা যত সরল, ততই প্রশ্নগুলো জটিল: কীভাবে ‘প্রসারণের শুরু’কে অটলভাবে ‘অস্তিত্বের পরম শুরু’ হিসেবে রূপান্তর করা যায়? কোন পর্যায়ে দৈনন্দিন কারণ-শৈলীকে বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যুক্তিযুক্ত?
এই প্রবন্ধের লক্ষ্য হলো তর্কটিকে কেবল আবেগ, বিশ্বাস বা ঐতিহ্যের ভিত্তিতে নয়—বস্তুনিষ্ঠ বৈজ্ঞানিক ও লজিক্যাল মানদণ্ডে—পুনর্মূল্যায়ন করা। আমরা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান, সমকালীন কসমোলজিক্যাল মডেল এবং মডাল লজিক ব্যবহার করে KCA-র মূল প্রস্তাবনাগুলো বিচ্ছিন্নভাবে পরীক্ষা করবো। প্রাথমিক ফলাফলটি সরল: KCA প্রথমেই একটি গাঠনিক সংকটে পড়ে, কারণ এর প্রথম দুই প্রেমিস প্রকৃত অর্থে স্বাধীন নয়; “যা কিছুর অস্তিত্ব শুরু হয়” বাক্যটি কার্যত “মহাবিশ্বের অস্তিত্ব শুরু হলে তার কারণ আছে”—এই প্রমাণসাপেক্ষ দাবিরই সার্বজনীন ছদ্মবেশ। এর সঙ্গে যুক্ত হয় কোয়ান্টাম মেকানিক্স ও সাম্প্রতিক কসমোলজির অনিশ্চয়তা, ‘মহাবিশ্ব প্রসারণের সূচনা’ ও ‘মহাবিশ্বের অস্তিত্বের পরম সূচনা’ একভাবে মিলিয়ে দেওয়ার প্রবণতা, এবং অংশ থেকে সমগ্রে লজিক্যাল ট্রান্সফার করার ফলে ঘটে যাওয়া কম্পোজিশন ফ্যালাসি। সংক্ষেপে, KCA যতটা শাস্ত্রীয় প্রভাবশালী, ততটাই তা লজিক্যাল, বৈজ্ঞানিক ও মডাল বিশ্লেষণে পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট (KCA) এর যে মৌলিক দুর্বলতাগুলো রয়েছে:
কালাম আর্গুমেন্টের প্রথম দুই প্রেমিস প্রকৃত অর্থে স্বাধীন নয়; “যা কিছুর অস্তিত্ব শুরু হয়” বাক্যটি কার্যত “মহাবিশ্ব শুরু হলে তার কারণ আছে”—এই প্রমাণসাপেক্ষ দাবিরই সার্বজনীন ছদ্মবেশ।
বিগ ব্যাং প্রসারণের শুরু নির্দেশ করে, কিন্তু এটিই মহাবিশ্বের পরম শুরু কি না, তা অমীমাংসিত [1]।
আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা সময়কে ব্লক-ইউনিভার্স ব্যাখ্যার দিকে শক্তভাবে ঠেলে দেয়, যেখানে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ যুগপৎ বিদ্যমান [2]।
ঈশ্বরকে ‘অনাদি’ বলে নিয়মের ঊর্ধ্বে রাখা, অথচ মহাবিশ্ব বা মৌলিক ভৌত বাস্তবতার ক্ষেত্রে একই সম্ভাবনা অস্বীকার করা, একটি যৌক্তিক ফ্যালাসি। মহাবিশ্ব কেন আদি সত্য হতে পারবে না? [3]।
অংশের বৈশিষ্ট্যকে সমগ্রের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একটি লজিক্যাল ভুল। মহাবিশ্বের কারণ থাকতেই হবে এমন নয় [4]।
মহাবিশ্বের কারণ থাকলেও সেটি যে কোনো “ব্যক্তিসত্তা” বা ঈশ্বর হবেন, তার সপক্ষে কোনো অকাট্য যুক্তি নেই [5]। ক্রেগ এখানে যুক্তি দেন যে মহাবিশ্বের কারণটিকে “personal explanation”-এর অধীনে রাখতে হবে, কারণ কালহীন ও অ-বস্তুগত সত্তা কেবল ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমেই কার্য ঘটাতে পারে। কিন্তু এই যুক্তিটি বৃত্তাকার (circular): এটি আগে থেকে ধরে নেয় যে একটি “কালহীন ইচ্ছাশীল সত্তা” সম্ভব এবং কার্যকর — যা নিজেই প্রমাণসাপেক্ষ দাবি। তাছাড়া, “ব্যক্তিগত ইচ্ছা” ধারণাটি সম্পূর্ণভাবে সময়-নির্ভর একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া; কাল-বর্জিত পরিবেশে “ইচ্ছা” বা “সিদ্ধান্ত” অর্থপূর্ণ কি না, তার কোনো ব্যাখ্যা KCA দেয় না।
সময়ের বাইরে কোনো সত্তা কীভাবে ‘সিদ্ধান্ত’ নিতে পারে তা ধারণাগতভাবে অসম্ভবপ্রায়, কারণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিজেই আগে-পরে-নির্ভর একটি প্রক্রিয়া [6]।
সৃষ্টির মেকানিজম নিয়ে প্রশ্ন তুললে “ঈশ্বর জানাননি” বলা কোনো সমাধান নয়, বরং রহস্যের প্রতিস্থাপন মাত্র।
ভূমিকা
ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণের নামে যে কয়েকটি যুক্তি যুগে যুগে ‘অকাট্য’ বলে বাজারজাত হয়েছে, কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট তাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রচারিত। এর শক্তি তার সরলতায়—বরং বলা ভালো, তার বিপজ্জনক সরলতায়। যুক্তিটির কাঠামো এমনভাবে সাজানো যে এটি সাধারণ বুদ্ধির সঙ্গে তাৎক্ষণিক সাযুজ্য তৈরি করে; শুনলেই মনে হয়, “এ তো খুব স্বাভাবিক কথা।” কিন্তু দর্শনের ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, যা স্বাভাবিক বলে মনে হয়, তা প্রায়ই যৌক্তিক বিশ্লেষণে টেকে না।
ঐতিহাসিকভাবে এর দূরবর্তী সূত্র খুঁজে পাওয়া যায় গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল-এর কার্যকারণ ভাবনায়। তবে যুক্তিটির সুসংহত ধর্মতাত্ত্বিক রূপ নির্মিত হয় মধ্যযুগীয় ইসলামী তর্কচর্চায়। একাদশ শতকে আল-গাজালি তাঁর তাহাফুত আল-ফালাসিফা-তে অ্যারিস্টটলের অনাদি মহাবিশ্ব ধারণার বিরোধিতা করতে গিয়ে এই যুক্তিকে কেন্দ্রীয় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন [7]. বহু শতাব্দী পরে, বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে, আমেরিকান দার্শনিক উইলিয়াম লেন ক্রেগ এই যুক্তিটিকে আধুনিক কসমোলজির ভাষায় পুনর্গঠন করেন এবং একে সমকালীন খ্রিস্টীয় অ্যাপোলজেটিক্সের কেন্দ্রস্থলে নিয়ে আসেন [8]।
গাঠনিকভাবে এটি একটি অবরোহী বা ডিডাক্টিভ সিলোজিজম। উল্লেখ্য যে, এই যুক্তিটি কেবল মহাবিশ্বের ‘শুরু’ (Beginning) নিয়ে কাজ করে, যা একে লাইবনিজীয় ‘কনটিঞ্জেন্সি আর্গুমেন্ট’ (যা মহাবিশ্বের শুরু থাকুক বা না থাকুক—এর ব্যাখ্যার আবশ্যকতা দাবি করে) থেকে আলাদা করে। তবে গভীরে গেলে দেখা যায়, উভয় যুক্তির প্রাণভোমরা একই কার্যকারণ তত্ত্বের ওপর দাঁড়িয়ে, অথবা বলা যায় একই যুক্তির কিছুটা ভিন্ন শব্দে উপস্থাপন। KCA-র রূপ অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত:
এই সিদ্ধান্তকে আরও বিস্তৃত করে বলা হয়, সেই ‘কারণ’ অবশ্যই স্থান-কাল-পাত্রের ঊর্ধ্বে, অসীম শক্তিসম্পন্ন এবং ইচ্ছাশীল ব্যক্তিসত্তা—অর্থাৎ ঈশ্বর। কিন্তু এখানেই প্রশ্নের সূত্রপাত। একটি বিমূর্ত “কারণ” থেকে কীভাবে সরাসরি একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় ঈশ্বরের দিকে অগ্রসর হওয়া যায়? এই লাফটি কি যুক্তিগতভাবে বৈধ, নাকি এটি কেবলমাত্র ধর্মতাত্ত্বিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন?
এই কাঠামোটি প্রথম দৃষ্টিতে পরিচ্ছন্ন মনে হলেও, এর ভেতরে একটি আরও মৌলিক সমস্যা আছে: প্রেমিস দুইটি আদৌ স্বাধীন কি না। তাই প্রথমে আমরা দেখব, কালাম যুক্তির তথাকথিত ডিডাক্টিভ গঠন নিজেই কতটা সন্দেহজনক। এরপর তর্কের খাতিরে প্রেমিসগুলো আলাদাভাবে ধরে নিয়ে দেখা হবে, সেগুলো বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক ও মডাল বিশ্লেষণে টেকে কি না।
শুরুতেই সমস্যা: কালামের দুই প্রেমিস কি আসলে একটিই দাবি?
কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্টকে সাধারণত একটি ডিডাক্টিভ সিলোজিজম হিসেবে সাজানো হয়। এর প্রচলিত রূপ হলো: “যা কিছুর অস্তিত্ব শুরু হয়, তার একটি কারণ আছে; মহাবিশ্বের অস্তিত্ব শুরু হয়েছে; অতএব, মহাবিশ্বের একটি কারণ আছে।” প্রথম দৃষ্টিতে মনে হয় এখানে দুইটি স্বাধীন প্রেমিস আছে, এবং সেখান থেকে একটি উপসংহার বের করা হয়েছে। কিন্তু আসল সমস্যা এখানেই: এই দুইটি প্রেমিস প্রকৃত অর্থে স্বাধীন নয়। বরং একই বক্তব্যকে দুইটি আলাদা বাক্যে ভেঙে উপস্থাপন করা হয়েছে।
প্রথম প্রেমিসটি বলে, “যা কিছুর অস্তিত্ব শুরু হয়, তার একটি কারণ আছে।” এই বাক্যটি শুনতে সার্বজনীন নীতির মতো লাগে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, “যা কিছু” বলতে এখানে আসলে কী বোঝানো হচ্ছে? যদি সাধারণ জগতের বস্তু বোঝানো হয়—মানুষ, গাছ, নক্ষত্র, প্রাণী, বস্তু, ঘটনা—তাহলে এগুলো মহাবিশ্বের ভেতরের পরিবর্তন মাত্র। কিন্তু কালাম এখানে সেই অর্থে “শুরু” ব্যবহার করতে চায় না। কালামের উদ্দেশ্য হলো মহাবিশ্বের “অস্তিত্বের শুরু” নিয়ে কথা বলা। অর্থাৎ এখানে “শুরু হওয়া” বলতে সাধারণ কোনো পরিবর্তন নয়, বরং পুরো বাস্তবতার অস্তিত্বে আসাকে বোঝানো হচ্ছে।
এখন সমস্যা হলো, এই অর্থে “অস্তিত্ব শুরু হওয়া”র কোনো স্বাধীন উদাহরণ আমাদের কাছে নেই। আমরা কখনো কোনো সম্পূর্ণ বাস্তবতা, কোনো স্থান-কাল কাঠামো, কোনো মহাবিশ্ব, বা মহাবিশ্বের বাইরের কোনো সত্তাকে অস্তিত্বে আসতে দেখিনি। ফলে প্রথম প্রেমিসে যে “যা কিছু” বলা হচ্ছে, সেটি বাস্তবে কোনো প্রমাণিত সার্বজনীন শ্রেণি নয়। এটি এমন একটি ফাঁকা সার্বজনীনতা, যার একমাত্র প্রাসঙ্গিক লক্ষ্য হলো মহাবিশ্ব।
অতএব, “যা কিছুর অস্তিত্ব শুরু হয়, তার কারণ আছে”—এই বাক্যটি বাস্তবে দাঁড়ায়: “মহাবিশ্বের মতো কোনো বাস্তবতার অস্তিত্ব শুরু হলে তার কারণ আছে।” কিন্তু “মহাবিশ্বের মতো কোনো বাস্তবতা” বলতে আমাদের কাছে মহাবিশ্ব ছাড়া আর কোনো স্বাধীন উদাহরণ নেই। ফলে বাক্যটি আরও সঙ্কুচিত হয়ে দাঁড়ায়: “মহাবিশ্বের অস্তিত্ব শুরু হলে তার কারণ আছে।” এবার এর পাশে দ্বিতীয় প্রেমিসটি রাখুন: “মহাবিশ্বের অস্তিত্ব শুরু হয়েছে।” দেখা যাচ্ছে, প্রথম প্রেমিস ও দ্বিতীয় প্রেমিস মিলিয়ে নতুন কোনো স্বাধীন যুক্তিগত কাঠামো তৈরি করছে না; প্রথম প্রেমিসেই মহাবিশ্বকে লক্ষ্য করে উপসংহারটি শর্তাকারে বসিয়ে রাখা হয়েছে, আর দ্বিতীয় প্রেমিস সেই একই লক্ষ্যবস্তুর নাম উচ্চারণ করছে মাত্র।
অন্যভাবে বললে, কালাম আসলে এভাবে কাজ করছে: “মহাবিশ্ব শুরু হলে তার কারণ আছে; মহাবিশ্ব শুরু হয়েছে; অতএব মহাবিশ্বের কারণ আছে।” এখানে প্রথম বাক্যটি কোনো স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত মহাজাগতিক আইন নয়; এটি উপসংহারকে শর্তাকারে আগে থেকেই ধরে নেওয়া। কারণ “মহাবিশ্ব শুরু হলে তার কারণ আছে”—এই দাবিটিই তো প্রমাণের বিষয়। সেটিকে “যা কিছু শুরু হয়” নামের সার্বজনীন নীতির ছদ্মবেশ পরিয়ে দিলে সেটি প্রমাণিত হয়ে যায় না।
এই কারণেই কালামকে প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী ডিডাক্টিভ যুক্তি বলা যায় না। একটি যুক্তিতে প্রেমিসগুলো উপসংহারের আগে স্বাধীনভাবে দাঁড়াতে হয়। কিন্তু এখানে প্রথম প্রেমিস উপসংহারেরই পূর্বলিখিত সংস্করণ। দ্বিতীয় প্রেমিস কেবল সেই পূর্বলিখিত সংস্করণের মধ্যে “মহাবিশ্ব” শব্দটি বসিয়ে দেয়। ফলে যুক্তিটি বাইরে থেকে তিন ধাপের মনে হলেও ভেতরে এটি এক ধাপের: “মহাবিশ্বের কারণ আছে, কারণ মহাবিশ্বের কারণ থাকতে হবে।”

এখানে বাগ্মিতার কৌশলটি খুব স্পষ্ট। “মহাবিশ্বের কারণ আছে”—এই সরাসরি দাবিটি করলে সঙ্গে সঙ্গে প্রমাণ চাইতে হয়। তাই দাবিটিকে সরাসরি না বলে আগে একটি সার্বজনীন বাক্যে রূপান্তর করা হয়: “যা কিছু শুরু হয়, তার কারণ আছে।” তারপর বলা হয়, “মহাবিশ্ব শুরু হয়েছে।” এতে মনে হয় যেন একটি সাধারণ নীতি থেকে বিশেষ ক্ষেত্রে যুক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে। কিন্তু আসলে সাধারণ নীতিটি স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়; সেটি মহাবিশ্বের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করার জন্য বানানো। কারণ “যা কিছু” নামে যে সার্বজনীন শ্রেণির কথা বলা হচ্ছে, তার মহাবিশ্ব ছাড়া আর কোনো স্বাধীন উদাহরণ এখানে দেখানো হয়নি।
এই অর্থে কালামের প্রথম দুই প্রেমিস একই দাবির দুই ভাষ্য। প্রথমটি বলে: “মহাবিশ্বের অস্তিত্ব শুরু হলে তার কারণ থাকতে হবে”—কিন্তু সেটিকে “যা কিছু” বলে ঢেকে দেয়। দ্বিতীয়টি বলে: “মহাবিশ্বের অস্তিত্ব শুরু হয়েছে।” এই দুইটিকে একত্র করলে যে সিদ্ধান্ত আসে, সেটি নতুন কোনো আবিষ্কার নয়; সেটি প্রথম প্রেমিসেই শর্তাকারে ঢোকানো ছিল। তাই কালাম আর্গুমেন্টে যুক্তির প্রকৃত অগ্রগতি নেই; আছে একই দাবিকে সার্বজনীন নীতি, নির্দিষ্ট ঘটনা এবং উপসংহার—এই তিনটি স্তরে সাজানোর কৌশল।
প্রতীকীভাবে দেখালেও সমস্যাটি পরিষ্কার হয়। কালাম প্রথমে বলে: “সব B-এর C আছে।” তারপর বলে: “U হলো B।” তারপর সিদ্ধান্ত টানে: “U-এর C আছে।” কাগজে এটি বৈধ ফর্মের মতো দেখায়। কিন্তু এখানে B শ্রেণির স্বাধীন সদস্য দেখানো হয় না। বাস্তবে B বলতে শেষ পর্যন্ত U-কেই বোঝানো হচ্ছে। অর্থাৎ “যা কিছুর অস্তিত্ব শুরু হয়” শ্রেণিটি কার্যত “মহাবিশ্ব”—এই একমাত্র লক্ষ্যবস্তুতে এসে দাঁড়াচ্ছে। তখন যুক্তিটি হয়ে যায়: “U হলে C; U; অতএব C।” কিন্তু “U হলে C”—এই দাবিই প্রমাণসাপেক্ষ ছিল। সেটিকে প্রথম প্রেমিস বানিয়ে নিলেই তা প্রমাণ হয়ে যায় না।

তাই কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্টের শুরুতেই ভ্যালিডিটির প্রশ্ন ওঠে। এখানে সমস্যা শুধু এই নয় যে প্রেমিসগুলো সত্য কি মিথ্যা। আরও মৌলিক সমস্যা হলো, প্রথম দুই প্রেমিস আসলেই দুইটি স্বাধীন প্রেমিস কি না। যদি প্রথম প্রেমিসের তথাকথিত “যা কিছু” শেষ পর্যন্ত মহাবিশ্বকেই লক্ষ্য করে, এবং দ্বিতীয় প্রেমিসও মহাবিশ্বকেই লক্ষ্য করে, তাহলে এটি কোনো প্রকৃত ডিডাক্টিভ সিলোজিজম নয়। এটি একই দাবিকে দুইবার বলা—একবার সার্বজনীন ভাষায়, আরেকবার নির্দিষ্ট নাম দিয়ে।
সুতরাং কালামের চটক এখানেই: এটি “মহাবিশ্বের কারণ আছে”—এই দাবিকে সরাসরি প্রমাণ না করে, আগে সেই দাবিকে “যা কিছু শুরু হয় তার কারণ আছে” নামে সাধারণীকরণ করে। তারপর মহাবিশ্বকে সেই সাধারণীকরণের মধ্যে বসিয়ে আবার একই সিদ্ধান্তে ফিরে আসে। এটি যুক্তির অগ্রগতি নয়; এটি উপসংহারকে প্রেমিসের ভেতরে লুকিয়ে রাখা। তাই কালামকে “অকাট্য যুক্তি” বলা যায় না। বরং এটি একই দাবিকে ভিন্ন শব্দে সাজিয়ে ডিডাক্টিভ যুক্তির আবহ তৈরি করা একটি বাগ্মিতামূলক কৌশল।
প্রথম প্রস্তাবনার ব্যবচ্ছেদঃ কার্যকারণ তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা
আগের অংশে দেখা গেল, কালামের প্রথম প্রস্তাবনা স্বাধীন সার্বজনীন নীতি হিসেবে দাঁড়ায় না; সেটি অনেকাংশে উপসংহারকেই শর্তাকারে ধরে নেয়। তবুও তর্কের খাতিরে যদি আমরা প্রেমিসটিকে আলাদা করে পরীক্ষা করি—“যা কিছুর শুরু আছে, তার একটি কারণ আছে”—তাহলেও এটি গুরুতর সমস্যায় পড়ে। এটি আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি স্বজ্ঞাত ধারণা (Intuition), যাকে দর্শনের ভাষায় ‘কজাল প্রিন্সিপাল’ (Causal Principle) বলা হয়। কিন্তু এই আপাত সত্যটি যখন মহাজাগতিক বা মৌলিক বাস্তবতার স্তরে প্রয়োগ করা হয়, তখন সেটি আর নিরাপদভাবে দাঁড়ায় না। এখানে একটি দার্শনিক প্রশ্নও আসে: প্রথম প্রস্তাবনাটি কি a priori সত্য (যেমন গণিতের সূত্র), নাকি a posteriori সত্য (অভিজ্ঞতা থেকে প্রাপ্ত সাধারণীকরণ)? যদি এটি কেবল অভিজ্ঞতালব্ধ সাধারণীকরণ হয়, তবে এটি সম্ভাব্য (contingent) এবং ব্যতিক্রমসম্পন্ন হতে পারে, যেমনটা কোয়ান্টাম মেকানিক্স দেখায়। আর যদি এটিকে a priori সত্য দাবি করা হয়, তাহলে তা প্রমাণের দায়িত্ব প্রবক্তাদেরই, যা KCA কখনো পালন করেনি। ফলে এই প্রস্তাবনাটি একটি অপ্রমাণিত deductive সত্যের ছদ্মবেশে আসলে একটি inductive generalization।
কার্যকারণ ধারণা ও সময়ের ওপর নির্ভরতা
কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্টে ‘কারণ’ শব্দটি এমনভাবে ব্যবহৃত হয় যেন এটি সময়ের বাইরে থাকা কোনো অকালিক (atemporal) সম্পর্ককে নির্দেশ করে। কিন্তু আমাদের প্রচলিত কার্যকারণ ধারণা সম্পূর্ণভাবে সময়-নির্ভর। একটি ঘটনা ‘আগে’ ঘটে, আরেকটি ‘পরে’ ঘটে — এবং তবেই আমরা প্রথমটিকে দ্বিতীয়টির কারণ বলি।
ইমানুয়েল কান্ত (Immanuel Kant) তাঁর Critique of Pure Reason-এ দেখিয়েছেন যে, কার্যকারণ আসলে আমাদের অভিজ্ঞতার সময়-গঠিত কাঠামোর (temporal framework) মধ্যেই অর্থপূর্ণ। এটি কোনো বাস্তবিক (mind-independent) সম্পর্ক নয়, বরং আমাদের জ্ঞানের একটি a priori শ্রেণি যা সময়ের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত (Kant, Critique of Pure Reason, trans. Paul Guyer and Allen W. Wood, Cambridge University Press, 1998, A189–A211)।
যদি বিগ ব্যাং-এর সাথে সাথে সময়েরও সূচনা হয় (যা আধুনিক কসমোলজির মূল ধারণা), তাহলে “সময়ের আগে কী ঘটেছিল?” বা “সময়ের আগে কে কারণ ছিল?” — এই প্রশ্নগুলো স্ববিরোধী (self-contradictory) হয়ে যায়। কারণ ‘আগে–পরে’র ভাষা নিজেই সময়ের অস্তিত্ব ধরে নেয়। কালাম আর্গুমেন্ট এই সমস্যা এড়িয়ে “অ-কালিক কারণ” (atemporal cause) শব্দটি ব্যবহার করে, কিন্তু এতে একই শব্দ ‘কারণ’-কে দুই ভিন্ন অর্থে প্রয়োগ করা হয় — একবার সময়ের ভেতরে (মহাবিশ্বের মধ্যে), আরেকবার সময়ের বাইরে (ঈশ্বরের ক্ষেত্রে)। এই ধারণাগত দ্বৈততা (conceptual equivocation) স্পষ্ট যুক্তির দিক থেকে অগ্রহণযোগ্য।
এই সময়-নির্ভরতার সমস্যা ছাড়াও, KCA-র প্রথম প্রস্তাবনা — “যা কিছুর অস্তিত্ব শুরু হয়, তার একটি কারণ থাকে” — একটি আরোহী (inductive) সিদ্ধান্ত মাত্র। এটি আমাদের স্থূল জগতের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা থেকে উদ্ভূত, কিন্তু মহাবিশ্বের আদি অবস্থায় (Planck scale বা quantum vacuum) এই নিয়মকে সার্বজনীন metaphysical law হিসেবে ব্যবহার করা বিপজ্জনকভাবে অরক্ষিত হয়ে পড়ে। হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি (Heisenberg Uncertainty Principle, ১৯২৭) অনুসারে, শক্তি (ΔE) ও সময় (Δt)-এর মধ্যে একটি মৌলিক অনিশ্চয়তা বিদ্যমান:
এই সমীকরণ দেখায় যে, অত্যন্ত ক্ষুদ্র সময়সীমায় (প্ল্যাঙ্ক টাইমের কাছাকাছি, প্রায় ১০-৪৩ সেকেন্ড) শূন্যস্থান (quantum vacuum) থেকে শক্তি বা ভার্চুয়াল কণা স্বতঃস্ফূর্তভাবে উৎপন্ন হতে পারে — এর জন্য কোনো ধ্রুপদী কার্যকারণ বা পূর্ববর্তী ঘটনার প্রয়োজন হয় না।
ভৌত কসমোলজির ক্ষেত্রে আরও একটি বৈপ্লবিক সংযোজন হলো অ্যালেকজান্ডার ভিলেনকিনের ১৯৮২ সালের মডেল—“Creation of Universes from Nothing”। ভিলেনকিন গাণিতিকভাবে দেখান যে, মহাবিশ্বের সূচনার জন্য কোনো আদি বস্তুকণা বা শক্তির আধারেরও প্রয়োজন নেই; বরং একটি অতি-ক্ষুদ্র আদি মহাবিশ্ব কোয়ান্টাম টানেলিং (Quantum Tunneling) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরাসরি ‘শূন্য’ (যাকে তিনি স্থান-কাল ও জ্যামিতিহীন একটি অবস্থা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন) থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আবির্ভূত হতে পারে।
এই ধারণাটি বোঝার জন্য আমাদের অতিক্ষুদ্র জগতের পদার্থবিজ্ঞানে ফিরে যেতে হবে। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের নিয়ম অনুযায়ী, প্রকৃতিতে কোয়ান্টাম কসমোলজিতে ‘nothing’ বলতে ধর্মতাত্ত্বিক পরম শূন্যতা বোঝায় না; বরং স্থান-কাল/জ্যামিতিহীন, আইন-নির্ভর একটি তাত্ত্বিক অবস্থা বোঝানো হয়। হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি () অনুসারে, অত্যন্ত ক্ষুদ্র সময়সীমায় শক্তির বিপুল তারতম্য ঘটা সম্ভব, যা কোনো বাহ্যিক কারণ ছাড়াই ভার্চুয়াল কণা তৈরি করতে পারে। ভিলেনকিনের যুক্তি হলো—যদি একটি কণা কোয়ান্টাম অস্থিরতার কারণে ধ্রুপদী অর্থে ‘অকারণে’ সৃষ্টি হতে পারে, তবে একটি আদি মহাজাগতিক বিন্দু বা সিঙ্গুলারিটিও একই ‘কোয়ান্টাম ইনডিটারমিনেসি’ (Quantum Indeterminacy)-র নিয়মে কোনো সচেতন কারিগর ছাড়াই অস্তিত্ব লাভ করতে পারে।
এই পর্যায়ে আমাদের পরিচিত স্থূল জগতের ‘কার্যকারণ’ (Classical Causality) বোধকে মহাবিশ্বের আদি অবস্থার ওপর চাপানো বুদ্ধিবৃত্তিক জালিয়াতির পর্যায়ে চলে যায়। যেখানে স্বয়ং স্থান ও কালের জ্যামিতিই কোয়ান্টাম টানেলিংয়ের মাধ্যমে আবির্ভূত হচ্ছে, সেখানে ‘সৃষ্টির আগের কারণ’ খোঁজা যৌক্তিকভাবেই অর্থহীন। ফলে, কালাম আর্গুমেন্টের দাবি অনুযায়ী মহাবিশ্বের সূচনার পেছনে কোনো অতিপ্রাকৃত ‘সচেতন এজেন্ট’ বা স্রষ্টার আবশ্যকতা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের এই গাণিতিক মডেলের মাধ্যমে সরাসরি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়।
‘এক্স নিহিলো’ বনাম পদার্থের পুনর্বিন্যাস
আমাদের অভিজ্ঞতায় আমরা যা কিছু ‘শুরু’ হতে দেখি, তা আসলে আগে থেকে বিদ্যমান পদার্থের রূপান্তর মাত্র। যেমন—একটি চেয়ারের অস্তিত্ব ‘শুরু’ হয় কাঠ মিস্ত্রির কাজের মাধ্যমে, কিন্তু কাঠের অণু-পরমাণুগুলো আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। অর্থাৎ, আমাদের অভিজ্ঞালব্ধ কার্যকারণ সম্পর্ক সর্বদা ‘পদার্থের পুনর্বিন্যাস’ (Rearrangement of matter)-এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু মহাবিশ্বের উদ্ভবের ক্ষেত্রে ধর্মতাত্ত্বিকরা দাবি করেন ‘শূন্য থেকে সৃষ্টি’ (Creatio Ex Nihilo)। আমাদের অভিজ্ঞতার জগত থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানকে (যেখানে সব কিছুই রূপান্তর) এমন একটি ক্ষেত্রে (শূন্য থেকে সৃষ্টি) প্রয়োগ করা, যেখানে আমাদের কোনো অভিজ্ঞতাই নেই—এটি একটি ক্যাটাগরি এরর বা শ্রেণিগত ভুল [9]।
তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্রঃ শক্তির নিত্যতা বনাম ‘শূন্য থেকে সৃষ্টি’র সংকট
ভৌত বিজ্ঞানের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি হলো তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্র (First Law of Thermodynamics), যা বদ্ধ সিস্টেমে শক্তির রূপান্তর-নীতি ব্যাখ্যা করে। এই সূত্রটি দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করে যে—একটি বদ্ধ সিস্টেমে (Closed system) শক্তি বা পদার্থ নতুন করে সৃষ্টি করা সম্ভব নয়, আবার তা ধ্বংসও করা যায় না; একে কেবল এক রূপ থেকে অন্য রূপে রূপান্তর করা সম্ভব মাত্র [10].
কালাম আর্গুমেন্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পরোক্ষভাবে ‘শূন্য থেকে সৃষ্টি’ (Creatio ex nihilo) তত্ত্বের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যাকে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র দিয়ে সহজে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। যদি মহাবিশ্বের মোট ভর-শক্তির পরিমাণ ধ্রুব হয়, তবে এর কোনো ‘পরম শূন্যবিন্দু’ বা ‘অস্তিত্বহীনতা থেকে অস্তিত্বে আসা’র যৌক্তিক অবকাশ থাকে না। বরং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে মহাবিশ্বের তথাকথিত ‘শুরু’ আসলে পদার্থের একটি বিশেষ অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় রূপান্তরের একটি পর্যায় মাত্র [11].
রূপান্তর বনাম পরম সূচনা
আমাদের অভিজ্ঞতায় আমরা যা কিছু ‘শুরু’ হতে দেখি—হোক সেটা নক্ষত্রের জন্ম কিংবা কণার উদ্ভব—তা মূলত আগে থেকে বিদ্যমান কোনো শক্তি বা পদার্থের পুনর্বিন্যাস (Rearrangement)। ধর্মতাত্ত্বিকরা যখন এই জাগতিক অভিজ্ঞতাকে ব্যবহার করে মহাবিশ্বের ‘পরম শুরু’র দাবি করেন, তখন তারা একটি ক্যাটাগরি এরর বা শ্রেণিগত ভুল করেন। কারণ, শক্তির নিত্যতা-ধারণা অন্তত এটুকু দেখায় যে ‘শূন্য থেকে শক্তির পাহাড়’—এই ধর্মতাত্ত্বিক ভাষা পদার্থবিজ্ঞানের ভাষা নয়; বিগ ব্যাং আমাদের পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের ঘন-উষ্ণ অবস্থা থেকে প্রসারণ-ইতিহাস নির্দেশ করে, অস্তিত্বহীনতা থেকে সৃষ্টির সার্টিফিকেট নয়, তার পরম উৎস বা ‘অস্তিত্বহীনতা’র প্রমাণ দেয় না।
জিরো-এনার্জি হাইপোথিসিস ও বাহ্যিক কারণের অনাবশ্যকতা
যদি তর্কের খাতিরে মহাবিশ্বের উদ্ভবকে শূন্য থেকে আসা হিসেবে ধরেও নেওয়া হয়, তবুও পদার্থবিজ্ঞান কোনো অতিপ্রাকৃতিক ‘ইচ্ছাশক্তি’কে ব্যাখ্যার আবশ্যিক শর্ত হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য করে না। ‘শূন্য-শক্তি মহাবিশ্ব’ (Zero-Energy Universe) মডেল অনুযায়ী, মহাবিশ্বের সমস্ত পদার্থের ধনাত্মক শক্তি এবং মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের ঋণাত্মক শক্তি পরস্পরকে বাতিল করতে পারে বলে কিছু কসমোলজিক্যাল মডেল প্রস্তাব করে। ফলে মহাবিশ্বের মোট শক্তির যোগফল সম্ভবত শূন্য () [12].
গাণিতিক এবং ভৌতভাবে শূন্য থেকে শূন্যের এই বিশেষ জ্যামিতিক বিন্যাস ঘটা সম্ভব, যার জন্য কোনো বাহ্যিক সচেতন কারণের প্রয়োজন পড়ে না। সুতরাং, “পরম শূন্য থেকে পদার্থ সৃষ্টি”-র ধর্মীয় দাবিটি কোনো পর্যবেক্ষণযোগ্য প্রমাণ ছাড়াই করা হচ্ছে এবং এটি তাপগতিবিদ্যার প্রমাণিত সত্যকে পাশ কাটিয়ে কেবল একটি ‘অপ্রমাণিত বিশ্বাসের’ ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যুক্তির বিচারে, যেখানে প্রাকৃতিক নিয়মেই মহাবিশ্বের স্থিতি ও রূপান্তর ব্যাখ্যা করা সম্ভব, সেখানে প্রমাণের ভার (Burden of proof) ধর্মতাত্ত্বিকদের ওপরই বর্তায়—যা তারা এ পর্যন্ত কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্য দিয়ে পূরণ করতে পারেননি।
শূন্য-শক্তি মহাবিশ্ব হাইপোথিসিসঃ মহাজাগতিক শক্তির নিখুঁত ভারসাম্য
ধর্মতাত্ত্বিকগণ প্রায়ই দাবি করেন যে, ঈশ্বর শূন্য থেকে এই বিশাল ভর এবং শক্তির মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন। তাদের মতে, এই বিশাল শক্তির পাহাড় কোনো কারণ বা উৎস ছাড়া তৈরি হওয়া অসম্ভব। কিন্তু আধুনিক কসমোলজি এবং পদার্থবিজ্ঞানের শক্তির নিত্যতা সূত্র (Conservation of Energy) এই দাবিকে একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। পদার্থবিজ্ঞানের ‘শূন্য-শক্তি মহাবিশ্ব’ (Zero-Energy Universe) মডেলটি দেখায় যে, মহাবিশ্বের মোট শক্তি শূন্য হতে পারে, এ সম্ভাবনাই কালামের ‘অবশ্যই বাহ্যিক স্রষ্টা’ দাবিকে ছিন্নভিন্ন করার জন্য যথেষ্ট।
ধনাত্মক বনাম ঋণাত্মক শক্তির ভারসাম্য
এই গাণিতিক মডেলে মহাবিশ্বের অস্তিত্বকে একটি বিশাল ‘অ্যাকাউন্টিং লেজার’ বা হিসাবের খাতার সাথে তুলনা করা যায়। মহাবিশ্বের দৃশ্যমান সমস্ত পদার্থ, নক্ষত্র এবং গ্যালাক্সির যে ভর () ও গতিশক্তি রয়েছে, তাকে ধরা হয় ধনাত্মক শক্তি (Positive Energy)। অন্যদিকে, মহাজাগতিক বস্তুগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক আকর্ষণ বা মহাকর্ষ বল (Gravity) হলো একটি বন্ধন শক্তি, যা গাণিতিকভাবে ঋণাত্মক শক্তি (Negative Energy) হিসেবে কাজ করে।
গাণিতিক সমীকরণ ও বাহ্যিক উৎসের অনাবশ্যকতা
সাধারণ আপেক্ষিকতার গাণিতিক কাঠামো অনুযায়ী, মহাবিশ্বের এই ধনাত্মক ভর-শক্তি এবং ঋণাত্মক মহাকর্ষীয় শক্তি পরস্পরকে নিখুঁতভাবে বাতিল করে দেয়। গাণিতিকভাবে:
যদি মহাবিশ্বের নিট শক্তির পরিমাণ শূন্য হয়, তবে এর উৎপত্তির জন্য কোনো বাহ্যিক ‘শক্তিদাতা’ বা অলৌকিক উৎসের সঞ্চারের প্রয়োজন পড়ে না। একটি আদি কোয়ান্টাম অবস্থা থেকে মহাজাগতিক স্ফীতি বা ইনফ্লেশনের মাধ্যমে শূন্য থেকে এই বিশেষ জ্যামিতিক রূপান্তর ঘটা লজিক্যালি এবং ফিজিক্যালি গাণিতিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব। লরেন্স ক্রাউসের ভাষায়, প্রকৃতিতে ‘কিছু না’ বা Nothingness অত্যন্ত অস্থিতিশীল; তাই কোনো অতিপ্রাকৃতিক ইচ্ছাশক্তি ছাড়াই পদার্থবিদ্যার তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যেই এমন মহাবিশ্বের উদ্ভব মডেল করা যায়—যেখানে ধর্মতাত্ত্বিক ‘কারিগর’ অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত অনুমান [13]।
যৌক্তিক সিদ্ধান্ত
কালাম আর্গুমেন্ট দাবি করে যে মহাবিশ্বের অস্তিত্বের জন্য একটি বাহ্যিক কারণ প্রয়োজন। কিন্তু যদি মহাবিশ্বের মোট শক্তির যোগফল শূন্য হয়, তবে সেখানে আদতে নতুন কোনো কিছুর ‘যোগ’ ঘটেনি। বরং এটি একটি পূর্বতন অস্থিতিশীল অবস্থা থেকে স্থায়িত্বে আসার প্রাকৃতিক রূপান্তর মাত্র। ফলে, যেখানে কোনো শক্তির ঘাটতি নেই, সেখানে কোনো ‘ঈশ্বর’ বা অতিপ্রাকৃতিক সঞ্চালকের কল্পনা করা ওকামের রেজর (Occam’s Razor) নীতির পরিপন্থী এবং অপ্রয়োজনীয়।
কোয়ান্টাম মেকানিক্স ও অ-কারণতা
আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম স্তম্ভ কোয়ান্টাম মেকানিক্স কার্যকারণ তত্ত্বের ধ্রুপদী ধারণাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে। সাব-এটমিক লেভেলে বা অতি-পারমাণবিক স্তরে এমন অনেক ঘটনা ঘটে যার কোনো সুনির্দিষ্ট ‘কারণ’ নেই। যেমন, একটি তেজস্ক্রিয় পরমাণু ঠিক কখন ক্ষয় হবে, তা আগে থেকে বলা অসম্ভব এবং এর পেছনে কোনো বাহ্যিক কারণও নেই। হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি (Heisenberg’s Uncertainty Principle) অনুসারে, শূন্যস্থানেও প্রতিনিয়ত ‘ভার্চুয়াল পার্টিকেল’ (Virtual Particles) সৃষ্টি ও ধ্বংস হচ্ছে কোনো কারণ ছাড়াই [14]। বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী লরেন্স ক্রাউস দেখিয়েছেন যে, কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি অনুযায়ী ‘কিছু না’ (Nothing) অস্থিতিশীল এবং সেখান থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মহাবিশ্বের উদ্ভব গাণিতিকভাবে সম্ভব [15]। সুতরাং, “সব কিছুরই কারণ থাকতে হবে”—এই দাবিটি সর্বজনীনভাবে সত্য নয়।
ফ্যালাসি অফ কম্পোজিশন
উপরের সমস্যাটি ছিল প্রেমিস দুইটির স্বাধীনতা নিয়ে; এবার আলাদা একটি সমস্যা দেখা যায় অংশ থেকে সমগ্রে নিয়ম স্থানান্তর করার ক্ষেত্রে। মহাবিশ্বের ভেতরের প্রতিটি বস্তুর একটি কারণ আছে, এই প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে সমগ্র মহাবিশ্বেরও একটি কারণ আছে দাবি করা যৌক্তিকভাবে “ফ্যালাসি অফ কম্পোজিশন” (Fallacy of Composition)। ইমানুয়েল কান্ট দেখিয়েছেন যে কার্যকারণ (Causality) নামক ধারণাটি কেবল স্থান-কালের ভেতরেই প্রযোজ্য; স্থান-কালের বাইরের কোনো কিছুর ওপর একে প্রয়োগ করা লজিক্যালি এবং বৈজ্ঞানিকভাবে ভিত্তিহীন। একটি ইটের ওজন এক কেজি হওয়ার অর্থ এই নয় যে, ওই ইট দিয়ে তৈরি একটি বাড়ির ওজনও এক কেজি হবে। তেমনি, মহাবিশ্বের ভেতরের নিয়মনীতি সমগ্র মহাবিশ্বের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অযৌক্তিক এবং এর সপক্ষে কোনো বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ নেই [16]। Bertrand Russell (১৯৪৮) স্পষ্ট করে বলেছেন — একটি দেয়ালের প্রতিটি ইট ছোট হওয়ার মানে এই নয় যে পুরো দেয়াল ছোট। মহাবিশ্ব নিজেই একটি closed system বা brute fact হতে পারে — যার কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। অংশগুলোর সম্পত্তি (causation within the universe) সমগ্রের সম্পত্তিতে (causation of the universe) স্থানান্তরিত হয় না। এটি একটি classic logical fallacy যা KCA-কে আরও দুর্বল করে।
দ্বিতীয় প্রস্তাবনার সমালোচনা: মহাবিশ্বের কি সত্যিই শুরু আছে?
দ্বিতীয় প্রস্তাবনায় বলা হয়: “মহাবিশ্বের একটি শুরু আছে।” এই দাবির স্বপক্ষে সাধারণত বিগ ব্যাং থিওরি এবং এনট্রপি বা তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্রকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু আধুনিক কসমোলজি এই সরলীকরণকে সমর্থন করে না।
প্রসারণের শুরু বনাম অস্তিত্বের শুরু (The Crucial Distinction)
কালাম আর্গুমেন্টের সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক দুর্বলতা হলো ‘প্রসারণের শুরু’ এবং ‘মহাবিশ্বের শুরু’কে গুলিয়ে ফেলা। বিগ ব্যাং থিওরি দেখায় যে প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে আমাদের পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্ব অত্যন্ত ঘন-উষ্ণ অবস্থা থেকে প্রসারণের ইতিহাসে প্রবেশ করে [17]। কিন্তু এটি মহাবিশ্বের অস্তিত্বের শুরু কি না, তা আমরা জানি না। বিগ ব্যাং-এর শুরুতে যে ‘সিঙ্গুলারিটি’ বা অতি-ঘন অবস্থার কথা বলা হয়, সেখানে আমাদের বর্তমান পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো ভেঙে পড়ে। ফলে সিঙ্গুলারিটির আগে মহাবিশ্ব অন্য কোনো রূপে (যেমন: কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন বা অন্য কোনো স্টেট) অনাদিকাল ধরে ছিল কি না, তা বর্তমান বিজ্ঞানে অমীমাংসিত। প্রসারণের একটি শুরু থাকা মানেই অস্তিত্বের শুরু থাকা নয়। নিচে এই পার্থক্যটি সহজ ডায়াগ্রামের মাধ্যমে বোঝানো হলোঃ
(Singularity / Quantum State)
(The Big Bang)
(Expanding Universe)
সিংগুলারিটি: গাণিতিক সীমাবদ্ধতা বনাম পরম শুরু
কালাম আর্গুমেন্টের প্রবক্তারা বিগ ব্যাং-এর ‘সিংগুলারিটি’কে মহাবিশ্বের শূন্য থেকে অস্তিত্বে আসার (Creatio ex nihilo) প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেন। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানে সিংগুলারিটি মানে ‘কিছু না’ নয়; এটি কালামপন্থীদের ঈশ্বর ঢোকানোর দরজা নয়। এটি মূলত একটি গাণিতিক সংকেত যা নির্দেশ করে যে, ওই বিন্দুতে আমাদের বর্তমান পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো (বিশেষ করে সাধারণ আপেক্ষিকতা) আর কাজ করছে না। যখন কোনো গাণিতিক মডেলে ঘনত্ব বা তাপমাত্রা ‘অসীম’ (Infinite) হয়ে যায়, তখন তাকে সিংগুলারিটি বলা হয়—যা আসলে একটি গাণিতিক ত্রুটি বা ‘Mathematical Breakdown’ মাত্র [18].
আধুনিক কোয়ান্টাম কসমোলজি অনুযায়ী, মহাবিশ্ব হয়তো সিংগুলারিটি দিয়ে শুরুই হয়নি। লুপ কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি (Loop Quantum Gravity) কিংবা স্ট্রিং কসমোলজির মতো উন্নত মডেলগুলোতে সিংগুলারিটিকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এই মডেলগুলো অনুযায়ী, মহাবিশ্ব হয়তো আগের কোনো সংকুচিত অবস্থা থেকে ‘বাউন্স’ (Bounce) করে প্রসারিত হতে শুরু করেছে। সুতরাং, সিংগুলারিটিকে মহাবিশ্বের ‘পরম সূচনা’ হিসেবে দাবি করা বৈজ্ঞানিক তথ্যের ধর্মতাত্ত্বিক অপপ্রয়োগ ছাড়া আর কিছুই নয়। সিংগুলারিটি কোনো অতিপ্রাকৃত শুরুর বিন্দু নয়, বরং এটি আমাদের মহাবিশ্ব সম্পর্কে জানার সীমানা নির্দেশ করে মাত্র [19].
এই প্রসঙ্গে উইলিয়াম লেন ক্রেগ প্রায়শই Borde, Guth ও Vilenkin (২০০৩)-এর একটি উপপাদ্য (BGV Theorem) উদ্ধৃত করেন, যেখানে বলা হয়েছে: যে কোনো স্থান-কাল যার গড় হাবল প্রসারণ হার ধনাত্মক, তার অতীতকাল অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে না — অর্থাৎ সেই জ্যামিতিক অর্থে একটি ‘শুরু’ থাকতে হবে। কিন্তু এখানে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয়। প্রথমত, BGV থিওরেম inflationary spacetime-এর geodesic past-incompleteness দেখায়; এটি কোনো ধর্মীয় সৃষ্টিতত্ত্ব নয়; কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটির রাজ্যে প্ল্যাঙ্ক স্কেলে এই উপপাদ্য আর কার্যকর নয়। দ্বিতীয়ত, উপপাদ্যটির সহ-লেখক আলেকজান্ডার ভিলেনকিন নিজেই স্পষ্ট করেছেন যে BGV মহাবিশ্বের প্রসারণের ট্র্যাজেক্টরির একটি গাণিতিক সীমা নির্ধারণ করে, কোনো অতিপ্রাকৃত সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব প্রমাণ করে না এবং এটি থেকে “অস্তিত্বের পরম শুরু” সিদ্ধান্ত টানা একটি extrapolation মাত্র — যা পদার্থবিজ্ঞানের বাইরে গিয়ে মেটাফিজিক্যাল অনুমানের আশ্রয় নেয় [20]।
সময়ের প্রকৃতিঃ হকিং-হার্টল মডেল
স্টিফেন হকিং এবং জেমস হার্টল প্রস্তাবিত ‘নো বাউন্ডারি প্রপোজাল’ (No Boundary Proposal) অনুযায়ী, সময়ের কোনো শুরু নেই, ঠিক যেমন পৃথিবীর পৃষ্ঠের কোনো ‘শুরু’ বা ‘শেষ’ প্রান্ত নেই। আমরা যেমন দক্ষিণ মেরুর দক্ষিণে কী আছে তা জানতে চাইতে পারি না (কারণ দক্ষিণ মেরুই শেষ বিন্দু), তেমনি বিগ ব্যাং-এর ‘আগে’ কী ছিল—এই প্রশ্নটিও অর্থহীন। এই মডেলে মহাবিশ্ব সসীম হলেও এর কোনো সূচনা বিন্দু বা ‘Boundary’ নেই [21]। যদি সময়ের কোনো শুরু না থাকে, তবে ‘শুরু’ হওয়ার প্রশ্নটিই অবান্তর হয়ে পড়ে।
এই মডেলে মহাবিশ্বের একটি নির্দিষ্ট তীক্ষ্ণ শুরু বা ‘সিঙ্গুলারিটি’ আছে। ফলে অবধারিতভাবেই প্রশ্ন ওঠে, “এই বিন্দুর আগে কী ছিল?”
এই মডেলে সময় স্থান-কালের সাথে মিশে একটি গম্বুজের মতো আকার ধারণ করে। এর কোনো তীক্ষ্ণ শুরু নেই, তাই ‘আগে কী ছিল?’ প্রশ্নটি অবান্তর।
দক্ষিণ মেরুর উপমা (The South Pole Analogy) ভৌগোলিকভাবে পৃথিবীর পৃষ্ঠের যেমন কোনো ‘শেষ প্রান্ত’ নেই এবং “দক্ষিণ মেরুর দক্ষিণে কী আছে?”—এই প্রশ্নটি যেমন সম্পূর্ণ অর্থহীন, হকিং-হার্টল মডেলে মহাবিশ্বের সময়ও ঠিক তেমনি। সময়ের কোনো সূচনাবিন্দু বা বাউন্ডারি না থাকায়, “বিগ ব্যাং-এর আগে কী ছিল?”—এমন কোনো প্রশ্নের যৌক্তিক অস্তিত্ব এই মডেলে নেই।
অসীমের ভীতি এবং গাণিতিক বাস্তবতা
কালাম আর্গুমেন্টের প্রবক্তারা দাবি করেন যে ‘প্রকৃত অসীম’ (Actual Infinite) বাস্তবে অসম্ভব, তাই অতীত সময় অসীম হতে পারে না। এর স্বপক্ষে তাঁরা ‘হিলবার্টের হোটেল’ (Hilbert’s Hotel) প্যারাডক্সের উদাহরণ দেন। তবে আধুনিক গণিত, বিশেষ করে জর্জ ক্যান্টরের ‘সেট থিওরি’ প্রমাণ করেছে যে অসীম বা ইনফিনিটি একটি সুসংজ্ঞায়িত গাণিতিক ধারণা এবং বাস্তবে এর অস্তিত্ব অসম্ভব নয় [22]। এছাড়া, পদার্থবিজ্ঞানের বহু মডেলে (যেমন ইটারনাল ইনফ্লেশন) অসীম সময়ের ধারণা ব্যবহার করা হয় [23]।
কালাম প্রবক্তারা দাবি করেন যে ‘প্রকৃত অসীম’ বাস্তবে থাকতে পারে না। তারা ‘হিলবার্টের হোটেল’ প্যারাডক্সের উদাহরণ টেনে প্রমাণ করতে চান যে অসীম অতীত যৌক্তিকভাবে অসম্ভব এবং এটি কেবল একটি কাল্পনিক ধারণা।
আধুনিক গণিতে জর্জ ক্যান্টরের ‘সেট থিওরি’ প্রমাণ করেছে যে অসীম বা ইনফিনিটি কোনো বিভ্রান্তি বা প্যারাডক্স নয়। এটি একটি অত্যন্ত সুসংজ্ঞায়িত গাণিতিক ধারণা, যার যৌক্তিক ও গাণিতিক অস্তিত্ব সম্পূর্ণভাবে প্রমাণিত।
অ্যালান গুথের ‘ইটারনাল ইনফ্লেশন’-এর মতো আধুনিক কসমোলজিক্যাল মডেলগুলোতে অসীম সময়ের ধারণা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। অর্থাৎ, ভৌত বাস্তবতায় অসীম অতীত থাকাটা বৈজ্ঞানিক মডেলের সাথে মোটেও সাংঘর্ষিক নয়।
সময়ের প্রকৃতিঃ এ-থিওরি বনাম বি-থিওরি
কালাম আর্গুমেন্ট সম্পূর্ণভাবে সময়ের ‘এ-থিওরি’ (A-Theory of Time)-এর ওপর নির্ভরশীল, যা মনে করে অতীত থেকে ভবিষ্যতে সময়ের প্রবাহ একটি বস্তুনিষ্ঠ সত্য এবং কেবল বর্তমানেরই অস্তিত্ব আছে। কিন্তু আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান, বিশেষ করে আলবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব, সময়ের ‘বি-থিওরি’ (B-Theory of Time বা Block Universe) দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে। এই বৈজ্ঞানিক মডেলে অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ একটি চতুর্মাত্রিক স্থান-কাল ব্লকে যুগপৎ অবস্থান করে। বি-থিওরি অনুযায়ী মহাবিশ্বের নতুন করে কোনো “আবির্ভাব” বা “শুরু” ঘটে না, বরং স্থান-কালের একটি নির্দিষ্ট সীমানা (boundary) মাত্র রয়েছে। যেহেতু পদার্থবিজ্ঞান বি-থিওরিকে সমর্থন করে, তাই মহাবিশ্বের পরম সূচনার দাবিটি বৈজ্ঞানিকভাবে অকার্যকর এবং এটি কেবল বাতিল দার্শনিক অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে [24]।
এই তত্ত্বে মনে করা হয় সময় অতীত থেকে ভবিষ্যতের দিকে প্রবাহিত হচ্ছে এবং কেবল ‘বর্তমান’ মুহূর্তেরই প্রকৃত অস্তিত্ব আছে। কালাম আর্গুমেন্ট সম্পূর্ণভাবে সময়ের এই সেকেলে দার্শনিক ধারণার ওপর নির্ভরশীল।
আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব একে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে। এই মডেলে অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ একটি চতুর্মাত্রিক স্থান-কাল ব্লকে যুগপৎ (একইসাথে) অবস্থান করে। এখানে সময়ের কোনো প্রবাহ নেই।
বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত: পরম সূচনার পতন যেহেতু আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান বি-থিওরি (Block Universe)-কে সমর্থন করে, তাই মহাবিশ্বের নতুন করে কোনো “আবির্ভাব” বা “শুরু” ঘটে না, বরং স্থান-কালের একটি নির্দিষ্ট সীমানা (boundary) মাত্র রয়েছে। অর্থাৎ, মহাবিশ্ব ‘অস্তিত্বে এসেছে’—কালাম আর্গুমেন্টের এই মূল দাবিটি বৈজ্ঞানিকভাবে অকার্যকর এবং এটি কেবল বাতিল দার্শনিক অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
মডাল লজিকের আলোকে কালাম আর্গুমেন্ট
মডাল লজিক (Modal Logic) সম্ভাব্যতা ও অনিবার্যতার (Possibility & Necessity) ধারণা বিশ্লেষণের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। কালাম আর্গুমেন্টে সাধারণত এমনভাবে কথা বলা হয়, যেন “যা কিছু অস্তিত্ব শুরু করে, তা অবশ্যই (necessarily) কোনো কারণে নির্ভরশীল” এবং “ঈশ্বর অবশ্যই (necessarily) অনাদি ও কারণ-নিরপেক্ষ।” কিন্তু মডাল লজিকের ভাষায় এই দাবিগুলো সর্বোচ্চ ক্ষেত্রে কেবল contingently true—অর্থাৎ, কিছু সম্ভাব্য বিশ্বে সত্য হতে পারে, আবার অন্য সম্ভাব্য বিশ্বে মিথ্যা হতে পারে [25].
সম্ভাব্য বিশ্ব ও ‘অবশ্য সত্তা’র প্রশ্ন
ঈশ্বরবাদী দার্শনিকরা প্রায়ই দাবি করেন যে, ঈশ্বর হলেন একটি “অবশ্য-সত্তা” (Necessary Being)। সহজ ভাষায় এর অর্থ হলো—যে কোনো সম্ভাব্য পরিস্থিতি, মহাবিশ্ব বা বাস্তবতাই কল্পনা করা হোক না কেন, ঈশ্বরকে সেখানে থাকতেই হবে। তাঁর অস্তিত্ব নাকি অনিবার্য। অন্যদিকে, আমাদের এই মহাবিশ্বকে তারা বলেন “সম্ভব-সত্তা” (Contingent Being)। অর্থাৎ, মহাবিশ্ব থাকতে পারত, আবার নাও থাকতে পারত; এর অস্তিত্ব নাকি বাধ্যতামূলক নয় [26]।
এই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই কন্টিঞ্জেন্সি আর্গুমেন্ট দাঁড় করানো হয়। যুক্তিটি মোটামুটি এমন: যেহেতু মহাবিশ্বের অস্তিত্ব অনিবার্য নয়, তাই এর অস্তিত্বের একটি বাহ্যিক ব্যাখ্যা থাকতে হবে। আর সেই ব্যাখ্যাই হলো ঈশ্বর—যিনি নাকি নিজে অনিবার্য বা “অবশ্য-সত্তা”।
কিন্তু সমস্যাটি হলো, এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুরুতেই ধরে নেওয়া হয়—ঈশ্বরই অবশ্য-সত্তা, আর মহাবিশ্ব কেবলই সম্ভব-সত্তা। অথচ এই দাবির পক্ষে কোনো স্বাধীন প্রমাণ দেওয়া হয় না। এটি মূলত যুক্তির উপসংহার নয়; বরং শুরুতেই ধরে নেওয়া একটি অনুমান।
এখানেই মডাল লজিক বা সম্ভাব্য জগতের যুক্তিবিদ্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ পাল্টা প্রশ্ন তোলে। আমরা কেন ধরে নেব যে শুধুমাত্র ঈশ্বরই “অবশ্য-সত্তা” হতে পারেন? কেন ভৌত বাস্তবতা, প্রকৃতির মৌলিক নিয়ম, কোয়ান্টাম ক্ষেত্র, কিংবা একটি মাল্টিভার্স নিজেই অনাদি ও অনিবার্য হতে পারবে না? অর্থাৎ, কেন আমরা উল্টো সম্ভাবনাটি বিবেচনা করব না—যে মহাবিশ্বই আসলে “অবশ্য-সত্তা”, আর ঈশ্বর ধারণাটিই কেবল একটি “সম্ভব-সত্তা”?
বিষয়টি আরও সহজভাবে বোঝা যায় “সম্ভাব্য বিশ্ব” (possible world) ধারণা দিয়ে। মডাল লজিকে “সম্ভাব্য বিশ্ব” বলতে বাস্তবে থাকা কোনো আলাদা গ্রহ বা মহাবিশ্ব বোঝায় না; বরং বোঝায় একটি যৌক্তিকভাবে কল্পনাযোগ্য পরিস্থিতি। যেমন, আমরা সহজেই এমন একটি পরিস্থিতি কল্পনা করতে পারি যেখানে কোনো ব্যক্তিগত ঈশ্বর নেই, কিন্তু তবুও কোনো না কোনো ধরনের ভৌত বাস্তবতা, শক্তি, কোয়ান্টাম ক্ষেত্র বা মহাজাগতিক কাঠামো বিদ্যমান। যদি এমন একটি পরিস্থিতি অন্তত যৌক্তিকভাবে কল্পনা করা সম্ভব হয়, তাহলে “ঈশ্বরের অস্তিত্ব অবশ্যই অনিবার্য”—এই দাবিটি আর নিশ্চিত থাকে না।
কারণ, কোনো কিছুকে “অবশ্য-সত্তা” বলতে হলে সেটিকে প্রতিটি সম্ভাব্য বিশ্বেই থাকতে হবে। কিন্তু যদি এমন একটি সম্ভাব্য পরিস্থিতিও কল্পনা করা যায় যেখানে ঈশ্বর অনুপস্থিত, তাহলে তিনি আর “অবশ্য-সত্তা” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত থাকেন না। তখন ঈশ্বরের ধারণাটিও অন্যান্য সম্ভাব্য ব্যাখ্যার মতোই একটি contingent বা সম্ভাব্য ব্যাখ্যায় পরিণত হয়।
কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্টের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, এটি এই বিকল্প সম্ভাবনাগুলোর সঙ্গে প্রকৃত প্রতিযোগিতায় নামে না। অর্থাৎ, “মহাবিশ্ব নিজেই অনাদি হতে পারে”, “ভৌত বাস্তবতাই মৌলিক হতে পারে”, বা “কোনো brute fact থাকতে পারে”—এসব সম্ভাবনাকে যথেষ্টভাবে বিশ্লেষণ না করেই ঈশ্বরকে একমাত্র গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ফলে যুক্তিটি অনেকাংশে এমন একটি উপসংহারের দিকে এগোয়, যা শুরুতেই আংশিকভাবে ধরে নেওয়া হয়েছে।
কালাম আর্গুমেন্টের সবচেয়ে দুর্বল দিকটি বুঝতে নিচের ছকটি দেখুন
+
মহাবিশ্ব আছে
+
মহাবিশ্ব নেই
+
ভৌত জগত আছে
মূল সমস্যা: ঈশ্বরবাদীরা কোনো প্রমাণ ছাড়াই ধরে নেন যে, ঈশ্বর হলেন ‘অবশ্য সত্তা’ এবং মহাবিশ্ব হলো ‘সম্ভব সত্তা’। কিন্তু মডাল লজিক প্রশ্ন করে—আমরা যদি ওপরের ‘বিশ্ব ৩’ এর মতো এমন একটি মহাবিশ্ব কল্পনা করতে পারি যেখানে কোনো ঈশ্বর নেই, কিন্তু ভৌত জগত বা মাল্টিভার্স নিজেই নিজের কারণে বিদ্যমান, তাহলেই ঈশ্বরের “অবশ্য সত্তা” হওয়ার দাবিটি ভেঙে পড়ে। কালাম আর্গুমেন্ট এই পাল্টা সম্ভাবনাকে এড়িয়ে গিয়ে ঈশ্বরকে জোরপূর্বক একমাত্র ব্যাখ্যা হিসেবে চাপিয়ে দেয়।
ভৌত আবশ্যকতা বনাম সচেতন আবশ্যকতা
মডাল লজিকের আলোচনায় একটি বড় বিভ্রান্তি হলো ‘অনিবার্যতা’ বা ‘আবশ্যকতা’কে (Necessity) কেবল সচেতন বা ব্যক্তিগত ঈশ্বরের একক বৈশিষ্ট্য হিসেবে ধরে নেওয়া। ধর্মতাত্ত্বিকরা দাবি করেন যে মহাবিশ্ব যেহেতু ‘সম্ভব-সত্তা’ (Contingent), তাই এর অস্তিত্বের জন্য একজন ‘অবশ্য-সত্তা’র (Necessary Being) প্রয়োজন। কিন্তু মডাল রিয়ালিজমের (Modal Realism) আলোকে চিন্তা করলে দেখা যায়, খোদ প্রাকৃতিক নিয়ম (Laws of Nature) কিংবা কোনো মৌলিক কোয়ান্টাম ফিল্ড (Quantum Field) নিজেই একটি ‘অবশ্য-সত্তা’ হতে পারে।
যদি কোনো গাণিতিক বা ভৌত কাঠামোর অস্তিত্ব লজিক্যালি অনিবার্য হয়—যেমন কোনো মৌলিক ভৌত কাঠামো বা natural modal base লজিক্যালি অনিবার্য হতে পারে—তাহলে ‘অবশ্য সত্তা’ হওয়ার একচেটিয়া অধিকার ঈশ্বরের থাকে না। এক্ষেত্রে একটি সচেতন স্রষ্টার প্রয়োজনীয়তা মডাল লজিকের নিয়মেই নাকচ হয়ে যায়। দার্শনিক গ্রাহাম অপ্পি (Graham Oppy) যুক্তি দিয়েছেন যে, আস্তিকরা মহাবিশ্বের ‘সম্ভব’ হওয়ার যে দাবি করে, তা আসলে একটি ভিত্তিহীন অনুমান। কারণ মহাবিশ্ব বা মাল্টিভার্স নিজেই তার অস্তিত্বের জন্য যথেষ্ট এবং এটিই হতে পারে সেই ‘আল্টিমেট নেসেসারি বিয়িং’ বা চূড়ান্ত অপরিহার্য সত্য, যার কোনো সচেতন স্রষ্টার প্রয়োজন নেই [27]। আসুন গ্রাহাম অপ্পির যুক্তি ডায়াগ্রামের মাধ্যমে বুঝি,
মডাল লজিকের চূড়ান্ত কথা: ‘অনিবার্যতা’ বা Necessity কেবল কোনো সচেতন বা অলৌকিক ঈশ্বরের একক সম্পত্তি নয়। যদি একটি গাণিতিক বা ভৌত কাঠামো (যেমন: কোয়ান্টাম মেকানিক্স বা লজিকের সূত্র) সব সম্ভাব্য বিশ্বে কাজ করে—এ দাবি প্রমাণসাপেক্ষ; কিন্তু ঈশ্বরবাদীরাও ঈশ্বরের ক্ষেত্রে ঠিক এমনই অপ্রমাণিত necessity দাবি করে, তবে সেই আদি ভৌত অবস্থাই হলো চূড়ান্ত অপরিহার্য সত্য (Ultimate Necessary Being)। গ্রাহাম অপ্পির মতে, আস্তিকরা মহাবিশ্বকে ‘অস্থায়ী’ ধরে নিয়ে প্রথমেই একটি লজিক্যাল ফ্যালাসি বা ভিত্তিহীন অনুমান তৈরি করে।
আন্ডারডিটারমিনেশনঃ একাধিক ব্যাখ্যা, একই তথ্য
মডাল লজিক ও বিজ্ঞানদর্শনের আলোচনায় ‘আন্ডারডিটারমিনেশন’ (Underdetermination) একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা—একই পর্যবেক্ষণ-তথ্য একাধিক তত্ত্ব সমানভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে। কালাম আর্গুমেন্ট তর্ক সাপেক্ষে যদি দেখাতেও পারে যে “মহাবিশ্বের কোনো এক ধরনের কারণ আছে”, তবুও সেই কারণটি হতে পারে একটি প্রাকৃতিক মাল্টিভার্স, একটি নিরাকার কোয়ান্টাম গ্লোবাল স্টেট, বা আরও কোনো অজানা প্রাকৃতিক মেকানিজম। এই সবগুলোই লজিক্যালি এবং মডাল দৃষ্টিতে সম্ভব ব্যাখ্যা। এই পরিস্থিতিতে কেবলমাত্র নির্দিষ্ট এক ধর্মীয় ঈশ্বরকে একমাত্র ব্যাখ্যা হিসেবে ঘোষণা করা আরেকটি লজিক্যাল লীপ বা অযৌক্তিক উল্লম্ফন ছাড়া কিছুই নয়।
অযৌক্তিক উল্লম্ফন (Logical Leap) বিজ্ঞান ও মডাল লজিকের দৃষ্টিতে ওপরের ৪টি ব্যাখ্যার মধ্যে ঈশ্বর-ব্যাখ্যাটি কোনো বিশেষ প্রমাণগত সুবিধা পায় না। কিন্তু কালাম আর্গুমেন্ট প্রথম ৩টি প্রাকৃতিক সম্ভাবনাকে যাচাই না করেই, গায়ের জোরে ৪নং ব্যাখ্যাকে (ঈশ্বর) একমাত্র কারণ হিসেবে ঘোষণা করে—যেন অজানা দেখলেই পুরোহিত/মোল্লার ব্যাখ্যা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার জায়গা দখল করতে পারে। আন্ডারডিটারমিনেশনের নিয়মে এটি একটি মারাত্মক যৌক্তিক ভ্রান্তি।
সিদ্ধান্তের অসঙ্গতিঃ কারণ কেন ‘ঈশ্বর’?
তর্কের খাতিরে যদি মেনেও নেওয়া হয় যে মহাবিশ্বের একটি কারণ আছে, তবুও কালাম আর্গুমেন্ট যৌক্তিকভাবে সেই কারণকে প্রচলিত ধর্মের ‘ঈশ্বর’ হিসেবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়। এটি একটি বিশাল যৌক্তিক উল্লম্ফন (Logical Leap)।
ব্যক্তি-সত্তা বনাম যান্ত্রিক কারণ
যুক্তিটির উপসংহারে বলা হয়, এই কারণটিকে হতে হবে ‘ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন’ (Personal Agent)। যুক্তি হিসেবে বলা হয়, একটি চিরস্থায়ী কারণ থেকে কীভাবে একটি সসীম মহাবিশ্ব তৈরি হতে পারে? একমাত্র যদি সেই কারণের ‘ইচ্ছা’ থাকে সৃষ্টির। কিন্তু এটি একটি দুর্বল যুক্তি। কোয়ান্টাম মেকানিক্সে আমরা দেখি যে কোনো সচেতন ইচ্ছা ছাড়াই একটি অবস্থা থেকে আরেকটি অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে (যেমন স্পনটেনিয়াস সিমেট্রি ব্রেকিং)। কারণটি কোনো অন্ধ প্রাকৃতিক শক্তি বা ‘মাল্টিভার্স জেনারেটর’ হতে পারে, যার কোনো চেতনা নেই [28]।
ক্রেগ আরও যুক্তি দেন যে, একটি “চিরস্থায়ী যান্ত্রিক কারণ” থেকে সময়-নির্ভর ফলাফল অসম্ভব, তাই কারণটিকে অবশ্যই “ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিসত্তা” হতে হবে। কিন্তু এই যুক্তিটি নিজেই বৃত্তাকার (circular): এটি প্রথমেই ধরে নেয় যে “কালহীন ইচ্ছা” বা “সময়ের বাইরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ” একটি সুসংজ্ঞায়িত ও সম্ভব ধারণা — অথচ এটিই প্রমাণের বিষয়। দার্শনিক Quentin Smith দেখিয়েছেন যে “timeless agency” ধারণাটি ভাষাগত অর্থহীনতায় পর্যবসিত — কারণ “সিদ্ধান্ত নেওয়া”, “ইচ্ছা করা”, “কাজ করা” — এই ক্রিয়াগুলো সংজ্ঞাগতভাবেই ক্রমিক (sequential) এবং সময়-নির্ভর। সময়ের বাইরে “সিদ্ধান্ত নেওয়া” ঠিক ততটাই অর্থহীন যতটা “উত্তর মেরুর উত্তরে যাওয়া” [29]।
বিশেষত্বের কুযুক্তি (Special Pleading Fallacy)
কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্টের একটি বহুল আলোচিত সমস্যা হলো এর ‘বিশেষত্বের কুযুক্তি’ বা special pleading প্রবণতা। আর্গুমেন্টটি শুরু হয় এই দাবির মাধ্যমে যে, “যা কিছুর অস্তিত্ব শুরু হয়, তার অবশ্যই একটি কারণ থাকতে হবে।” এরপর বলা হয়, মহাবিশ্বের অস্তিত্বেরও একটি কারণ আছে। কিন্তু যখন প্রশ্ন ওঠে—“তাহলে সেই কারণ বা ঈশ্বরের কারণ কী?”—তখন হঠাৎ করেই নিয়মের ব্যতিক্রম তৈরি করা হয়। বলা হয়, “ঈশ্বর অনাদি”, “ঈশ্বরের অস্তিত্ব শুরু হয়নি”, তাই তাঁর কোনো কারণেরও প্রয়োজন নেই।
এখানেই মূল দার্শনিক সমস্যাটি দেখা দেয়। যদি কোনো সত্তাকে ‘অনাদি’, ‘necessary’ বা কারণহীন বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে একই বৈশিষ্ট্য সরাসরি মহাবিশ্ব, বহুবিশ্ব (multiverse), কোয়ান্টাম বাস্তবতা, কিংবা কোনো মৌলিক প্রাকৃতিক কাঠামোর ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যেতে পারে। কিন্তু কালাম আর্গুমেন্টে সেই সম্ভাবনাগুলোকে পাশ কাটিয়ে শুরুতেই একটি অতিপ্রাকৃত বুদ্ধিমান সত্তাকে ব্যতিক্রমী মর্যাদা দেওয়া হয়। অর্থাৎ, যে কার্যকারণ নীতি ব্যবহার করে মহাবিশ্বের জন্য কারণ দাবি করা হচ্ছে, সেই একই নীতিকে আবার ঈশ্বরের ক্ষেত্রে স্থগিত করা হচ্ছে। এই নির্বাচিত ব্যতিক্রমীকরণই special pleading-এর মূল বৈশিষ্ট্য।
কালামের সমর্থকেরা অবশ্য যুক্তি দেন যে, তারা “সব কিছুর কারণ আছে” বলছেন না; বরং বলছেন, “যা কিছুর অস্তিত্ব শুরু হয়, তার কারণ আছে।” কিন্তু এখানেও প্রশ্ন থেকেই যায়—কেন মহাবিশ্বকে অনাদি বা necessary reality হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না? কেন সেই বিশেষ মর্যাদা শুধুমাত্র ঈশ্বরের জন্য সংরক্ষিত থাকবে? যদি একটি কারণহীন, অনাদি বাস্তবতা মেনে নিতেই হয়, তাহলে সবচেয়ে কম অনুমাননির্ভর ও সরল ব্যাখ্যাটি বেছে নেওয়াই যুক্তিসঙ্গত। এখানেই ‘ওকামের রেজর’ (Occam’s Razor) নীতিটি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। উইলিয়াম অফ অকামের এই নীতি অনুযায়ী, কোনো ঘটনার ব্যাখ্যায় অপ্রয়োজনীয় সত্তা, অনুমান বা জটিলতা যুক্ত করা উচিত নয় [30]।
সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, একটি অজানা মহাজাগতিক বাস্তবতা বা অনাদি প্রাকৃতিক কাঠামোর পরিবর্তে সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান, চেতনাসম্পন্ন এক অতিপ্রাকৃত সত্তাকে যুক্ত করা বরং ব্যাখ্যাকে আরও জটিল করে তোলে। কারণ তখন নতুন করে প্রশ্ন ওঠে—ঈশ্বর কেন আছেন, তাঁর চেতনার উৎস কী, কেন তিনি নির্দিষ্ট সময়ে সৃষ্টি করলেন, এবং কীভাবে একটি কালাতীত সত্তা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল? অর্থাৎ, কালাম আর্গুমেন্ট যে প্রশ্নের সমাধান দিতে চায়, শেষ পর্যন্ত সেটিকে আরও গভীর ও জটিল রূপে পুনরুত্থিত করে।
অসীম পশ্চাদপসরণ (Infinite Regress) এবং কারণহীন আদি সত্য
কালাম আর্গুমেন্টের মূল দাবি হলো, যা কিছুর অস্তিত্ব শুরু হয় তার একটি কারণ থাকতে হবে। কিন্তু ঈশ্বরের ক্ষেত্রে প্রবক্তারা দাবি করেন তাঁর কোনো শুরু নেই, যা ‘বিশেষ সুবিধা’ বা স্পেশাল প্লিডিং (Special Pleading) নামক যৌক্তিক ফ্যালাসি তৈরি করে। যদি কার্যকারণের শৃঙ্খল অসীম হয়, তবে তা অসীম পশ্চাদপসরণে (Infinite regress) পতিত হয়, যা প্রবক্তারা নিজেরাই অসম্ভব বলে মানেন। আর যদি একটি ‘কারণহীন প্রথম কারণ’ (Uncaused First Cause) থাকতেই হয়, তবে সেই আদি অবস্থানটি স্বয়ং মহাবিশ্ব বা কোয়ান্টাম শূন্যতা হওয়াই বেশি যৌক্তিক। মহাবিশ্বের অস্তিত্বকেই একটি ব্রুট ফ্যাক্ট (Brute fact) হিসেবে ধরে নেওয়া অকামের রেজর (Occam’s razor) নীতি অনুযায়ী বেশি গ্রহণযোগ্য; এর জন্য কোনো প্রমাণহীন অতিপ্রাকৃত সত্তার অবতারণা করা যুক্তিবিরুদ্ধ এবং অপ্রয়োজনীয় [31]। উল্লেখ্য, কন্টিঞ্জেন্সি আর্গুমেন্ট মূলত ‘পর্যাপ্ত কারণের নীতি’ বা PSR-এর ওপর দাঁড়িয়ে। কিন্তু তাদের যেই যুক্তিতে তাদের ঈশ্বরের আদি সত্য, সেই যুক্তি ব্যবহার করেও মহাবিশ্বকে একটি আদি সত্য বা ‘ব্রুট ফ্যাক্ট’ ধরা যেতে পারে যার কোনো বাহ্যিক ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। যদি ঈশ্বর কারণহীন হতে পারেন, তবে মহাবিশ্বও একই নিয়মে ব্যাখ্যা-বহির্ভূত আদি সত্য হওয়ার যোগ্যতা রাখে। এটি বরঞ্চ আরও যৌক্তিক, কারণ অপ্রয়োজনীয় ঈশ্বরের কল্পনা এখানে নেই।
কালাম আর্গুমেন্টের মূল দাবি হলো, যা কিছুর অস্তিত্ব শুরু হয় তার একটি কারণ থাকতে হবে। ইনফিনিট রিগ্রেস বা অসীম পশ্চাদপসরণ এড়ানোর জন্য এই আর্গুমেন্টের প্রবক্তারা একজন ‘অসীম’ ঈশ্বরের ধারণা নিয়ে আসেন।
যুক্তির ফাঁকি: আস্তিকরা মূলত অসংখ্য অসীম ইভেন্টগুলোকে যুক্ত করে একটি ‘ঈশ্বর’-এ পরিণত করেন। কিন্তু ঈশ্বর যদি সংজ্ঞানুসারেই অসীম অতীত থেকে অস্তিত্বশীল হয়ে থাকেন, তাহলে তো ইনফিনিট রিগ্রেসের সমস্যাটি একই থাকলো! এটি সমস্যার কোনো সমাধান করে না, বরং সমস্যাটিকে ঈশ্বরের আবরণে লুকিয়ে রাখে।
ঈশ্বরের ক্ষেত্রে “তাঁর কোনো শুরু নেই” দাবি করাটা ‘বিশেষ সুবিধা’ বা স্পেশাল প্লিডিং (Special Pleading) নামক যৌক্তিক ফ্যালাসি তৈরি করে। যদি কার্যকারণের শৃঙ্খল অসীম হয়, তবে তা অসীম পশ্চাদপসরণে পতিত হয়, যা প্রবক্তারা নিজেরাই অসম্ভব বলে মানেন। আর যদি একটি ‘কারণহীন প্রথম কারণ’ (Uncaused First Cause) থাকতেই হয়, তবে সেই আদি অবস্থানটি স্বয়ং মহাবিশ্ব বা কোয়ান্টাম শূন্যতা হওয়াই বেশি যৌক্তিক। মহাবিশ্বের অস্তিত্বকেই একটি ব্রুট ফ্যাক্ট (Brute fact) হিসেবে ধরে নেওয়া অকামের রেজর (Occam’s razor) নীতি অনুযায়ী বেশি গ্রহণযোগ্য; এর জন্য কোনো প্রমাণহীন অতিপ্রাকৃত সত্তার অবতারণা করা যুক্তিবিরুদ্ধ এবং অপ্রয়োজনীয় [31]।
নাম পরিবর্তন করলে কি যুক্তির সংকট দূর হয়?
(০ বিন্দু)
যুক্তি: আস্তিক্যবাদীরা দাবি করেন ঈশ্বর ‘অনাদি’ বা ‘অসীম’। কিন্তু অসীমকে একটি বাক্সে ভরে তার নাম ‘ঈশ্বর’ দিলেই অসীম অতীত পাড়ি দেওয়ার গাণিতিক সমস্যাটি মিটে যায় না।
যদি বর্তমান (০ বিন্দু)-এ পৌঁছাতে হলে ঈশ্বরকে তাঁর নিজের ভেতরের অসীম অতীত মানসিক অবস্থা (Infinite Mental States) পার হয়ে আসতে হয়, তবে তিনি কখনোই সৃষ্টির মুহূর্তে পৌঁছাতে পারতেন না। অর্থাৎ, বাক্সের ভেতর অসীম থাকলে সেই বাক্সটি কখনোই বর্তমানের দরজায় পৌঁছাতে পারবে না। লেবেলিং বা নাম পরিবর্তন কোনো লজিক্যাল সমাধান নয়।
কালহীন ইচ্ছাশীল সত্তার ধারণাগত স্ববিরোধ
কালাম আর্গুমেন্টের প্রবক্তারা উপসংহারে দাবি করেন যে মহাবিশ্বের কারণ একটি কালহীন (timeless) এবং ইচ্ছাশীল ব্যক্তিসত্তা। কিন্তু এটি একটি চরম স্ববিরোধী (Self-contradictory) ধারণা। সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ইচ্ছা পোষণ একটি মনস্তাত্ত্বিক ও পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়া, যার জন্য সময়ের প্রবাহ অপরিহার্য। সময়ের অস্তিত্ব সৃষ্টির পূর্বে কীভাবে একটি সত্তা পর্যায়ক্রমিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে বা মহাবিশ্ব সৃষ্টির ইচ্ছা পোষণ করতে পারে, তা যৌক্তিকভাবে অসম্ভব। সুতরাং, একটি কালহীন সত্তা কখনোই “ব্যক্তিগত” বা “ইচ্ছাশীল” হতে পারে না; এটি ধর্মতাত্ত্বিক আকাঙ্ক্ষা প্রসূত একটি দাবি, যার লজিক্যাল বা বাস্তব কোনো ভিত্তি নেই [32]।
তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যাক মহাবিশ্বের একটি কারণ আছে। তবুও সেই কারণ কেন একটি ‘ইচ্ছাশীল ব্যক্তিগত ঈশ্বর’ হবে? Quentin Smith (১৯৯৬) দেখিয়েছেন যে একটি disembodied mind বা timeless personal agent স্ববিরোধী। ইচ্ছা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ একটি temporal প্রক্রিয়া — চিন্তা → সিদ্ধান্ত → কর্ম। কিন্তু সৃষ্টির আগে সময়ই যদি না থাকে, তাহলে কোনো ‘ইচ্ছা’ পোষণ করা অসম্ভব। একটি timeless, spaceless, immaterial agent-এর কোনো মানসিক প্রক্রিয়া চালানোর উপায় নেই। ফলে কারণ হিসেবে impersonal quantum law বা brute fact অনেক বেশি যৌক্তিক।
অ্যাপোলোজেটিক অসততার ব্যবচ্ছেদ
তাত্ত্বিক জটিলতা সরিয়ে রেখে এবার চলুন কিছু বাস্তব জীবনের রূপক এবং গল্পের মাধ্যমে দেখি কীভাবে এই আর্গুমেন্টগুলোকে সাধারণ মানুষের কাছে প্রচার করা হয়।
খুনের তদন্তঃ ‘জানি না’ কেন একটি যৌক্তিক সৎ অবস্থান
কল্পনা করুন, একটি বন্ধ ঘরের ভেতর একজন ধনী ব্যবসায়ীর মৃতদেহ পাওয়া গেল। ঘরের সব দরজা-জানালা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল এবং সেখানে আপাতদৃষ্টে খুনি প্রবেশের কোনো চিহ্ন নেই। এমতাবস্থায় সমাজের একদল মানুষ হয়তো বলতে শুরু করল, “এটি নিশ্চয়ই কোনো অশরীরী আত্মা বা জ্বীন-ভূতের কাজ, কারণ সাধারণ মানুষের পক্ষে এই বন্ধ ঘরে ঢোকা অসম্ভব।” কিন্তু একজন পেশাদার গোয়েন্দা যখন এই কেসের তদন্ত করবেন, তিনি কখনোই অশরীরী আত্মাকে খুনি হিসেবে এফআইআর (FIR) করবেন না। কেন? কারণ আইন এবং বিজ্ঞান ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ওপর নয়, বরং যাচাইযোগ্য প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে চলে।
তদন্তে যদি কোনো আঙুলের ছাপ, ডিএনএ বা সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া না যায়, তবে একজন দক্ষ গোয়েন্দার একমাত্র সৎ উত্তর হবে— “আমি জানি না”।
এই “জানি না” উত্তরটি কোনো পরাজয় নয়, বরং এটি সত্যের প্রতি চরম আনুগত্য। কোনো একটি রহস্যের কারণ এখন পর্যন্ত খুঁজে না পাওয়ার অর্থ এই নয় যে, সেখানে অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃত কিছু ঘটেছে [33]। প্রমাণের অভাবকে কখনোই অলৌকিক সত্তার অস্তিত্বের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না; একে যুক্তিবিদ্যার ভাষায় বলা হয় অজ্ঞতার কুযুক্তি (Argument from Ignorance)।
ধর্মতাত্ত্বিকরা যখন মহাবিশ্বের সূচনার কারণ হিসেবে সরাসরি ‘ঈশ্বর’-কে বসিয়ে দেন, তখন তারা মূলত গোয়েন্দা রাহুলের বদলে সেই গ্রামবাসীদের ভূমিকা পালন করেন যারা তথ্যের অভাবকে অতিপ্রাকৃত শক্তির প্রমাণ বলে দাবি করছিল। ‘জানি না’ বলাটা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে এই কারণেই সৎ অবস্থান যে, এটি নতুন কোনো তথ্যের জন্য দুয়ার খোলা রাখে। পক্ষান্তরে, কোনো প্রমাণ ছাড়াই ‘ঈশ্বর করেছেন’ বলে দেওয়াটা অনুসন্ধানের পথকে বন্ধ করে দেয় এবং একটি রহস্যকে আরেকটি বড় রহস্য (ঈশ্বরের উৎস কী?) দিয়ে প্রতিস্থাপন করে মাত্র [34]। প্রকৃতপক্ষে, বিজ্ঞানের ইতিহাসে অসংখ্য রহস্য—যা এককালে অলৌকিক বলে মনে হতো—পরবর্তীতে প্রাকৃতিক ও যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যার মাধ্যমে সমাধান হয়েছে। তাই আদি কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত ‘ঈশ্বর’কে দায়ী করা কেবল অলস মস্তিষ্কের কল্পনাপ্রসূত ঢেকুর ছাড়া আর কিছুই নয়।
অজ্ঞেয়বাদের সুবিধাবাদী রূপান্তরঃ একটি ধাপ পিছিয়ে থাকা
মহাবিশ্বের আদি ও চরম সূক্ষ্ম জটিলতাকে প্রাকৃতিক বা গাণিতিক উপায়ে ব্যাখ্যা করতে না পারার বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতা থেকেই ঈশ্বরবাদীগণ একটি পূর্বনির্ধারিত ‘অলৌকিক সমাধান’ বা ঈশ্বরের ধারণা গ্রহণ করেন । মূলত তাঁরা এখানে ‘কন্টিঞ্জেন্সি আর্গুমেন্ট’ বা মহাবিশ্বের নির্ভরশীলতার দোহাই দেন। তাঁদের যুক্তি হলো—যেহেতু মহাবিশ্ব তার অস্তিত্বের জন্য অনিবার্য নয় (Contingent), তাই এর অস্তিত্বের ব্যাখ্যা হিসেবে একজন ‘অবশ্য-সত্তা’ বা ‘অনিবার্য কারণ’ (Necessary Being) থাকা যৌক্তিকভাবে আবশ্যক। কিন্তু এই অবস্থানটি একটি চরম যৌক্তিক দ্বিমুখিতা এবং সুবিধাবাদী অজ্ঞেয়বাদের (Opportunistic Agnosticism) ওপর দাঁড়িয়ে ।
চাতুর্যটি লক্ষ্য করা যায় তখনই, যখন মহাবিশ্ব সৃষ্টির সুনির্দিষ্ট মেকানিজম, স্রষ্টার অ-ভৌতিক সত্তার কার্যপদ্ধতি কিংবা সৃষ্টির পূর্বে তাঁর ‘অনন্তকাল অপেক্ষার’ কারণ নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলা হয়। এই পর্যায়ে ঈশ্বরবাদীগণ তাঁদের পূর্বঘোষিত ‘পর্যাপ্ত কারণের নীতি’ (Principle of Sufficient Reason – PSR) থেকে ত্বরিত পিছু হটেন। যে আর্গুমেন্টে তাঁরা দাবি করেছিলেন যে সবকিছুর একটি ব্যাখ্যা থাকতে হবে, সেই একই যুক্তির শৃঙ্খল যখন স্রষ্টার ওপর প্রয়োগ করা হয়, তখন তাঁরা দাবি করেন—স্রষ্টা যেহেতু এই তথ্যগুলো ‘অহি’র মাধ্যমে জানাননি, তাই এগুলো মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব নয় । এটি আদতে ‘গড অফ দ্য গ্যাপস’ (God of the gaps) পদ্ধতিরই একটি পরিশীলিত রূপ, যেখানে বিজ্ঞানের অজানা অংশকে একটি অলৌকিক ব্যাখ্যা দিয়ে পূর্ণ করার চেষ্টা করা হয় ।
এখানেই বুদ্ধিবৃত্তিক সংঘাতটি নিহিত। একজন অজ্ঞেয়বাদী নাস্তিক যেখানে কোনো অতিপ্রাকৃত কল্পনা ছাড়াই মহাবিশ্বের আদি রহস্যের সামনে দাঁড়িয়ে সরাসরি নিজের অজানাকে স্বীকার করে নেন, সেখানে ঈশ্বরবাদীগণ কেবল একটি অতিরিক্ত স্তর (ঈশ্বর) যোগ করে ঠিক একই অজ্ঞেয়বাদী জায়গায় গিয়ে দাঁড়ান । তাঁরা একটি রহস্যকে (মহাবিশ্ব) সমাধান করার দাবি করে প্রকৃতপক্ষে সেই রহস্যটিকে আরও বড় এবং ব্যাখ্যাতীত একটি রহস্যের (ঈশ্বর) আড়ালে প্রতিস্থাপন করেন মাত্র । যদি ব্যাখ্যার শৃঙ্খল কোথাও গিয়ে থামাতে হয়, তবে লজিক্যালি মহাবিশ্ব বা মাল্টিভার্স নিজেই সেই ‘আদি সত্য’ বা ব্রুট ফ্যাক্ট (Brute Fact) হওয়ার যোগ্যতা রাখে, যার জন্য কোনো অতিপ্রাকৃত সত্তার প্রয়োজন পড়ে না। নাস্তিকদের অজ্ঞেয়বাদ যেখানে বস্তুনিষ্ঠ বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে বুদ্ধিবৃত্তিক সততার সাথে শুরু হয়, ঈশ্বরবাদীদের অজ্ঞেয়বাদ সেখানে শুরু হয় তাঁদের নিজস্ব কল্পিত ঈশ্বরের সীমানা থেকে—যা আদতে কোনো যৌক্তিক সমাধান নয়, বরং একটি সুকৌশলী বুদ্ধিবৃত্তিক পলায়নপরতা—অজ্ঞতাকে ঈশ্বরের নামে পুনর্ব্র্যান্ডিং করা মাত্র।
“আমি জানি না”
বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে সততার সাথে অজানাকে স্বীকার করা।
“ঈশ্বর জানাননি, তাই জানি না”
একটি অতিরিক্ত ধাপ পিছিয়ে গিয়ে একই অজানাকে স্বীকার করা, যা অপ্রমাণিত ঈশ্বরের কল্পনা ছাড়াই করা যায়।

গডফাদার আক্কাস আলী ও ইনফিনিট রিগ্রেসের গোলকধাঁধা
কালাম আর্গুমেন্টের প্রবক্তারা প্রায়শই দাবি করেন, মহাবিশ্বের সৃষ্টির কারণের একটি দীর্ঘ শৃঙ্খল চিরকাল ধরে পেছনে চলতে পারে না। একে তারা বলেন ইনফিনিট রিগ্রেস (Infinite Regress) বা অসীম পশ্চাদপসরণ। তাদের মতে, কোনো একটি আদি কারণ না থাকলে বর্তমান মুহূর্তের অস্তিত্বই সম্ভব হতো না। এই দার্শনিক গেরোটি সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য করতে আমরা ঢাকা শহরের এক কাল্পনিক গডফাদার ‘আক্কাস আলী’র শরণাপন্ন হতে পারি।
মনে করুন, আপনার এক পুলিশ বন্ধু আকরাম দাবি করলেন—শহরের প্রতিটি খুনের পেছনে গডফাদার আক্কাস আলীর হাত আছে। আপনি দেখলেন শহরে অপরাধ ঘটছে, সুতরাং আপনার বন্ধুর দাবি অনুযায়ী এর একজন মাস্টারমাইন্ড থাকতেই হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আক্কাস আলী কি একাই সব করছেন? যদি তিনি কারো নির্দেশে কাজ করেন, তবে সেই উর্ধ্বতন গডফাদার কে? এভাবে যদি একের পর এক বসের নাম আসতেই থাকে, তবে অপরাধের মূল উৎস কোথায়?
এই অসীম শৃঙ্খল এড়াতে আপনি হয়তো একসময় ক্লান্ত হয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন—গডফাদার ‘কুদ্দুস আলী’তে গিয়েই এই শৃঙ্খল শেষ। আপনি বললেন, “কুদ্দুস আলীই আদি গডফাদার, তাঁর আর কোনো বস নেই।” কিন্তু এখানেই বড় একটি যৌক্তিক ফাঁকি বা স্পেশাল প্লিডিং (Special Pleading) ফ্যালাসি তৈরি হয়। আপনি যখন দাবি করেন, “মহাবিশ্বের অস্তিত্বের জন্য অবশ্যই একটি কারণ থাকতে হবে,” কিন্তু পরক্ষণেই ঈশ্বরের ক্ষেত্রে এসে বলেন, “ঈশ্বর অনাদি, তাঁর কোনো কারণের প্রয়োজন নেই,” তখন আপনি নিজের তৈরি করা নিয়মটিই নিজের সুবিধার্থে ভেঙে ফেলছেন [3]।
যদি কোনো অতিপ্রাকৃত সত্তা (ঈশ্বর) কোনো কারণ ছাড়াই ‘অনাদি’ বা ‘স্বয়ম্ভু’ হতে পারেন, তবে সেই একই বিশেষ গুণ মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে বাধা কোথায়? কেন আমরা মহাবিশ্ব বা মাল্টিভার্সকেই একটি ‘ব্রুট ফ্যাক্ট’ বা আদি সত্য হিসেবে মেনে নিতে পারি না? [34]। আস্তিক্যবাদীরা ইনফিনিট রিগ্রেসের হাত থেকে বাঁচতে অসীম সংখ্যক কারণকে একটি কালো বাক্সে ভরে তার গায়ে ‘ঈশ্বর’ লেখা স্টিকার লাগিয়ে দেন, কিন্তু এটি আদতে কোনো সমাধান নয়।
আপনার গল্পের আক্কাস আলীর মতো, ঈশ্বরকেও যদি আমরা আদি কারণ হিসেবে ধরে নেই, তবে কত নম্বর ধাপে গিয়ে আমরা থামব (কুদ্দুস আলী নাকি মোকলেস আলী?), তা নির্ধারণ করার মতো কোনো বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে গিয়ে “আর কোনো কারণ নেই” বলে দেওয়াটা নিছক অনুমানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি কাল্পনিক সমাধান মাত্র। রিচার্ড ডকিন্স যেমনটি বলেছেন, জটিল মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করার জন্য যদি আরও জটিল এক সত্তার প্রয়োজন হয়, তবে সেই সত্তার উৎস ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সমস্যাটি কেবল আরও ঘনীভূত হয়, সমাধান হয় না [3]।
আত্মপ্রসাদের কল্পগল্পঃ নাস্তিক প্রফেসরের মিথ এবং স্ট্রোম্যান আর্গুমেন্ট
কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট বা ঈশ্বরের অস্তিত্বের সপক্ষে প্রচার চালাতে গিয়ে অনেক সময় যুক্তিবিদ্যার চেয়েও বেশি আশ্রয় নেওয়া হয় ‘পপুলার মিথ’ বা সস্তা কিংবদন্তির। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়া বা বিভিন্ন চটি বইয়ে একটি গল্প খুবই প্রচলিত—ক্লাসরুমে একজন উদ্ধত নাস্তিক প্রফেসর সব ছাত্রের সামনে ঈশ্বরকে অস্বীকার করছেন, আর ঠিক তখনই একজন অতি-মেধাবী ধার্মিক ছাত্র এসে এমন কিছু মোক্ষম প্রশ্ন করল যে প্রফেসরের চোয়াল ঝুলে গেল এবং ঈশ্বরের জয় হলো! এই গল্পগুলো শুনতে বেশ তৃপ্তিদায়ক মনে হলেও, এর গোড়ায় রয়েছে একটি মস্ত বড় যৌক্তিক প্রতারণা, যাকে দর্শনের ভাষায় বলা হয় স্ট্রোম্যান আর্গুমেন্ট (Strawman Argument)। [35]
স্ট্রোম্যান বা ‘খড়ের মানুষ’ আর্গুমেন্ট হলো এমন একটি কৌশল, যেখানে বিপক্ষ পক্ষের প্রকৃত যুক্তিকে আক্রমণ না করে তার একটি দুর্বল এবং বিকৃত সংস্করণ তৈরি করা হয়, এবং এরপর সেই বিকৃত রূপটিকে পরাজিত করে বিজয় ঘোষণা করা হয়। এই গল্পের লেখকেরা নাস্তিক প্রফেসরকে দিয়ে এমন সব কথা বলান, যা বাস্তবে কোনো যুক্তিমনস্ক ব্যক্তি কখনোই বলবেন না।
গল্পগুলোতে প্রায়ই দেখা যায়, প্রফেসর বলছেন— “আমি ঈশ্বরকে দেখি না, তাই তিনি নেই।” তখন সেই চৌকস ছাত্র পাল্ট প্রশ্ন করে— “স্যার, আপনি কি বাতাস দেখেন? ব্ল্যাকহোল দেখেন? জীবাণু দেখেন? না দেখলে কেন বিশ্বাস করেন?” এই যুক্তিতে প্রফেসরের পরাজয় দেখানো হলেও, বাস্তবে এটি একটি চরম বোকামি। কারণ:
আস্তিক্যবাদী অ্যাপোলজেটিক্স যখন নাস্তিকদের অবস্থানকে “শুধু চোখে দেখার বিষয়” হিসেবে ছোট করে দেখায়, তখন তারা মূলত একটি বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার আশ্রয় নেয় [37]। তারা নাস্তিকদের প্রকৃত যুক্তিগুলোকে এড়িয়ে গিয়ে একটি কাল্পনিক ‘খড়ের মানুষ’ বা স্ট্রোম্যানের সাথে যুদ্ধ করে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তোলে।
প্রকৃতপক্ষে, বিজ্ঞান এবং যুক্তির ময়দান এমন কোনো সস্তা বীরত্বগাথা দিয়ে চলে না। সেখানে মত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন অকাট্য প্রমাণ। যেমনটি রিচার্ড ডকিন্স উল্লেখ করেছেন, ধর্মীয় বিশ্বাস প্রায়শই প্রমাণের অনুপস্থিতিকে একটি ‘গুণ’ হিসেবে উপস্থাপন করে, যা যুক্তিবাদী চিন্তার পরিপন্থী [3]। এই কাল্পনিক গল্পগুলো হয়তো কিছুক্ষণের জন্য বিশ্বাসীদের মনে স্বস্তি দেয়, কিন্তু প্রকৃত দার্শনিক বিতর্কে এগুলো কেবল হাস্যকর কৌশল হিসেবেই গণ্য হয়।
সীমাবদ্ধতার রূপকঃ জরায়ুর ভেতর দুই যমজ এবং ‘অজ্ঞতার আবরণ’
কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্টের প্রবক্তারা প্রায়ই দাবি করেন যে, মহাবিশ্বের এই সুশৃঙ্খল অস্তিত্বই প্রমাণ করে এর পেছনে একজন স্রষ্টা বা ‘মা’ রয়েছেন। মানুষের এই সীমিত জ্ঞান এবং অজানাকে জানার আকুলতাকে বোঝার জন্য দুই যমজ ভাইয়ের গল্পটি একটি শক্তিশালী দার্শনিক হাতিয়ার হতে পারে [38]।
কল্পনা করুন, মায়ের অন্ধকার জরায়ুর ভেতর দুই যমজ ভাই—আহান ও হৃদয়। তাদের চেনা জগৎ কেবল ওই ছোট অন্ধকার প্রকোষ্ঠটিই। হৃদয় বিশ্বাস করে, এই জগতের বাইরে একজন ‘মা’ আছেন, যিনি তাদের সৃষ্টি করেছেন এবং একদিন তারা এক বিশাল আলোকময় পৃথিবীতে যাবে। অন্যদিকে আহান একজন সংশয়ী; সে বলে, “আমাদের চোখের সামনে যা আছে, তার বাইরে কিছুর অস্তিত্বের প্রমাণ কোথায়? আমরা কি মাকে দেখেছি? আমরা তো এমনি এমনিই এখানে বড় হচ্ছি।”
হৃদয় যখন দাবি করে, “মা অনাদি এবং অনন্ত, তাঁর কোনো স্রষ্টা নেই,” তখন সে মূলত কালাম আর্গুমেন্টের সেই চিরন্তন ফাঁদে পা দেয়। আহান তখন মোক্ষম প্রশ্নটি তোলে— “মা যদি অনাদি হতে পারেন, তবে এই জরায়ুর জগতটি কেন অনাদি হতে পারে না? মায়েরও কি কোনো মা নেই?” এই রূপকটি আমাদের অস্তিত্বের একটি রূঢ় বাস্তবতা তুলে ধরে:
এই গল্পের মূল শিক্ষা হলো, কোনো কিছু শুনতে ভালো লাগলেই বা তা আমাদের মানসিক প্রশান্তি দিলেই তা সত্য হয়ে যায় না। জরায়ুর বাইরের জগতটি যদি সত্যিই থেকে থাকে, তবে তা জানার উপায় হলো অনুসন্ধান ও প্রমাণ, নিছক কল্পনা বা অন্ধবিশ্বাস নয়। কালাম আর্গুমেন্ট মূলত আমাদের এই ‘সীমিত জ্ঞানকে’ পুঁজি করে একটি রূপকথার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে [34]।
উপসংহার
কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট, তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং দার্শনিক চাতুর্য সত্ত্বেও, বহুযুগ ধরে দর্শনের জগতে আলোচিত হয়েছে যা আধুনিক বৈজ্ঞানিক, যৌক্তিক ও দার্শনিক মানদণ্ডে মহাবিশ্বের উদ্ভবের ব্যাখ্যা হিসেবে অসম্পূর্ণ, ত্রুটিপূর্ণ এবং ধর্মতাত্ত্বিকভাবে অতিরঞ্জিত। এর প্রথম প্রস্তাবনা কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণের সাথে সামঞ্জস্যহীন এবং দ্বিতীয় প্রস্তাবনা মহাবিশ্বের আদি অবস্থার জটিলতাকে অতি-সরলীকরণ করে। সর্বোপরি, এই যুক্তিটি একটি ‘কারণ’ থেকে সরাসরি একটি ‘ব্যক্তিগত ঈশ্বরে’ পৌঁছানোর যে চেষ্টা করে, তা ‘গড অফ দ্য গ্যাপস’ (God of the gaps) অর্থাৎ অজানার ফাঁকে ঈশ্বর ঢুকিয়ে যুক্তির কাজ শেষ বলে ঘোষণা করার নামান্তর। একইসাথে আরও একটি বিষয় উল্লেখ করতে হয়, সেটি হচ্ছে ইসলামের বিশুদ্ধ আকীদা অনুসারে কোরআন হচ্ছে আল্লাহর মতই অনাদি এবং অনন্ত, অর্থাৎ আল্লাহর সিফাত, যা মানুষের দুনিয়াবি হেদায়াতের ওপর নির্ভরশীল। আল্লাহর একটি আদি অনন্ত বৈশিষ্ট্য যদি মানুষের হেদায়াতের ওপর নির্ভর করে, তাহলে মৌলিকভাবে কন্টিঞ্জেন্সি আর্গুমেন্টও ইসলামের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। সেইসাথে অন্যান্য সমস্যাগুলো তো থাকছেই। মহাবিশ্বের উৎপত্তির রহস্য উন্মোচনে আমাদের প্রয়োজন বিজ্ঞানমনস্ক অনুসন্ধান, ধর্মতাত্ত্বিক অন্ধবিশ্বাস বা শর্টকাট নয় এবং প্রমাণের ওপর নির্ভরতা, মধ্যযুগীয় দর্শনের ওপর অন্ধ আস্থা নয়। সংক্ষেপে, কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট প্রথমেই গাঠনিক সংকটে পড়ে: এর প্রথম দুই প্রেমিস স্বাধীন নয়; “যা কিছু শুরু হয়” বাক্যটি কার্যত “মহাবিশ্ব শুরু হলে তার কারণ আছে”—এই প্রমাণসাপেক্ষ দাবিরই সার্বজনীন ছদ্মবেশ। এর সঙ্গে যুক্ত হয় কন্টিঞ্জেন্সি আর্গুমেন্টের অনুরূপ সমস্যা: আমাদের সীমিত অভিজ্ঞতার ‘কার্যকারণ’ নিয়মকে এমন এক ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার চেষ্টা, যেখানে আমাদের জানা পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো ভেঙে পড়ে। এটি একটি ‘গড অফ দ্য গ্যাপস’ (God of the gaps) পদ্ধতি, যা বিজ্ঞানের অজানা অংশকে ধর্মতাত্ত্বিক অনুমান দিয়ে পূর্ণ করার চেষ্টা করে, কিন্তু আধুনিক কসমোলজি ও মডাল লজিক এই অনুমানের প্রতিটি স্তম্ভকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। উল্লেখ্য, এই সমালোচনা নাস্তিকতা প্রতিষ্ঠার জন্য নয়; এটি কেবল একটি epistemological অবস্থান: যে যুক্তি নিজেকে যুক্তিপ্রমাণের মানদণ্ডে উপস্থাপন করে, তাকে সেই একই মানদণ্ডে বিচার করতে হবে — এবং সে বিচারে KCA অপ্রতুল। সংক্ষেপে, কালাম আর্গুমেন্ট মহাবিশ্বের ‘শুরু’ এবং কন্টিঞ্জেন্সি আর্গুমেন্ট মহাবিশ্বের ‘ব্যাখ্যা’ খোঁজার নাম করে মূলত একই ‘গড অফ দ্য গ্যাপস’ পদ্ধতির আশ্রয় নেয়।
প্রথম প্রস্তাবনা: কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অ-কারণতা (Quantum Indeterminacy) এবং স্বতঃস্ফূর্ত ঘটনার সাথে এটি সরাসরি সাংঘর্ষিক।
দ্বিতীয় প্রস্তাবনা: মহাবিশ্বের ‘প্রসারণ’ এবং ‘অস্তিত্বের শুরু’কে এক করে দেখা একটি বৈজ্ঞানিক অতি-সরলীকরণ মাত্র।
যৌক্তিক ভুল: কারণ থেকে সরাসরি ‘ব্যক্তিগত ঈশ্বরে’ পৌঁছানোর চেষ্টা একটি ‘গড অফ দ্য গ্যাপস’ বা যৌক্তিক উল্লম্ফন।
About This Article
Genre: Semi-Academic Philosophical, Logical, and Cosmological Critique
Epistemic Position: Scientific Skepticism, Logical Analysis, and Evidential Naturalism
This article critically examines the Kalam Cosmological Argument through the standards of deductive validity, premise independence, causal reasoning, modern cosmology, modal logic, and conceptual coherence.
Its purpose is not to provide theological reassurance, apologetic balance, or respectful preservation of inherited metaphysical assumptions. Rather, it asks whether the argument actually proves what it claims to prove: that the universe must have a cause, and that this cause must be a timeless, spaceless, immaterial, powerful, personal God.
The article treats the Kalam argument as a philosophical and evidential claim, not as a sacred doctrine immune from scrutiny. Its premises are evaluated according to whether they are independently justified, whether they avoid circularity, whether they survive scientific uncertainty, and whether their conclusion follows without hidden theological assumptions.
Special attention is given to the distinction between the beginning of cosmic expansion and the absolute beginning of existence, the limits of applying ordinary causality to the universe as a whole, the fallacy of composition, the problem of special pleading, and the conceptual difficulty of a timeless personal will causing a temporal universe.
Strong criticism in this article should not be mistaken for bias. If an argument moves from “the universe has a cause” to “therefore God” without demonstrating why the cause must be personal, conscious, divine, or identical with any religious deity, then that inferential leap deserves direct criticism.
This article should be evaluated through logical rigor, scientific caution, philosophical precision, source quality, conceptual clarity, and argumentative validity—not through theological sensitivity, apologetic expectation, inherited reverence, or the demand that criticism of religious arguments must remain rhetorically soft.
তথ্যসূত্রঃ
- Carroll, 2016 ↩︎
- Davies, 1995 ↩︎
- Dawkins, 2006 1 2 3 4 5
- Russell, 1948 ↩︎
- Oppy, 2006 ↩︎
- Smith, 1996 ↩︎
- Abu Hamid Al-Ghazali, The Incoherence of the Philosophers (Tahafut al-Falasifah), trans. Michael E. Marmura (Provo, UT: Brigham Young University Press, 2000), pp. 12–14 ↩︎
- William Lane Craig, The Kalām Cosmological Argument (London: Macmillan, 1979), p. 63 ↩︎
- Adolf Grünbaum, “The Pseudo-Problem of Creation in Physical Cosmology,” Philosophy of Science, Vol. 56, No. 3 (1989), pp. 373-394 ↩︎
- Atkins, P. (2010). The Laws of Thermodynamics: A Very Short Introduction ↩︎
- Carroll, S. (2016). The Big Picture: On the Origins of Life, Meaning, and the Universe Itself ↩︎
- Krauss, L. M. (2012). A Universe from Nothing ↩︎
- Krauss, L. M. (2012). A Universe from Nothing ↩︎
- Werner Heisenberg, The Physical Principles of the Quantum Theory (New York: Dover Publications, 1930), pp. 20-21 ↩︎
- Lawrence M. Krauss, A Universe from Nothing: Why There Is Something Rather Than Nothing (New York: Free Press, 2012), pp. 142-150 ↩︎
- Immanuel Kant, Critique of Pure Reason, 1781 ↩︎
- Planck Collaboration, 2018 ↩︎
- Hawking, S., & Penrose, R. (1996). The Nature of Space and Time ↩︎
- Steinhardt, P. J., & Turok, N. (2007). Endless Universe: Beyond the Big Bang ↩︎
- Vilenkin, A., Many Worlds in One, 2006, pp. 176–178 ↩︎
- James B. Hartle and Stephen W. Hawking, “Wave Function of the Universe,” Physical Review D, Vol. 28, No. 12 (1983), pp. 2960-2975 ↩︎
- Georg Cantor, Contributions to the Founding of the Theory of Transfinite Numbers, trans. Philip E. B. Jourdain (New York: Dover Publications, 1955), pp. 85-90 ↩︎
- Alan H. Guth, “Eternal Inflation and Its Implications,” Journal of Physics A: Mathematical and Theoretical, Vol. 40, No. 25 (2007), pp. 6811-6826 ↩︎
- Paul Davies, About Time: Einstein’s Unfinished Revolution, 1995 ↩︎
- Brian F. Chellas, Modal Logic: An Introduction (Cambridge: Cambridge University Press, 1980), pp. 1-15 ↩︎
- Alexander R. Pruss and Joshua L. Rasmussen, The Principle of Sufficient Reason: A Reassessment (Cambridge: Cambridge University Press, 2018), pp. 64-71 ↩︎
- Graham Oppy, Arguing about Gods (Cambridge: Cambridge University Press, 2006), pp. 147-152 ↩︎
- Graham Oppy, Arguing about Gods (Cambridge: Cambridge University Press, 2006), pp. 137-145 ↩︎
- Quentin Smith, “The Uncaused Beginning of the Universe,” Philosophy of Science, Vol. 55, No. 1, 1988, pp. 39–57 ↩︎
- William of Ockham, Summa Logicae, ed. Philotheus Boehner (St. Bonaventure, NY: Franciscan Institute, 1974), Part II, Chapter 15 ↩︎
- David Hume, Dialogues Concerning Natural Religion, 1779 1 2
- Michael Martin, Atheism: A Philosophical Justification, 1990 ↩︎
- Hume, 1779 1 2
- Russell, 1957 1 2 3
- আত্মপ্রসাদের কল্পগল্পঃ নাস্তিক প্রফেসরের মিথ ↩︎
- Krauss, 2012 ↩︎
- যা দেখা যায় না, নাস্তিকরা সেগুলো বিশ্বাস করে? ↩︎
- যমজ বাচ্চাদের যুক্তিবাদী কথোপকথন ↩︎
