Al-Haqqah
আল-হাক্কাহ: 19
মূল আরবি
فَأَمَّا مَنْ أُوتِىَ كِتَـٰبَهُۥ بِيَمِينِهِۦ فَيَقُولُ هَآؤُمُ ٱقْرَءُوا۟ كِتَـٰبِيَهْ
English Translations
So as for he who is given his record in his right hand, he will say, "Here, read my record!
Then as for him who will be given his Record in his right hand will say: "Take, read my Record!
Now, as for him who is given his book in his right hand, he will say (to his colleagues), “Come here, read my book.
On that Day, he whose Record is given to him in his right hand will say: “Lo! Read my Record!
Then, as for him who is given his record in his right hand, he will say: Take, read my book!
Then he that will be given his Record in his right hand will say: "Ah here! Read ye my Record!
বাংলা অনুবাদ
তখন যাকে তার ‘আমালনামা তার ডান হাতে দেয়া হবে সে বলবে, ‘এই যে আমার ‘আমালানামা পড়ে দেখ,
তখন যার আমলনামা তার ডান হাতে দেয়া হবে সে বলবে, ‘নাও, আমার আমলনামা পড়ে দেখ’।
তখন যাকে তার ‘আমলনামা ডান হাতে দেয়া হবে সে বলবেঃ নাও, আমার ‘আমলনামা পাঠ করে দেখ।
তখন যাকে তার ‘আমলনামা তার ডান হাতে দেয়া হবে, সে বলবে, ‘লও, আমার ‘আমলনামা পড়ে দেখ;
অতঃপর যার আমলনামা তার ডান হাতে দেওয়া হবে, সে বলবে : নাও, আমার আমলনামা পড়ে দেখো;
১৯. যার আমলনামা ডান হাতে প্রদান করা হবে সে আনন্দ ও খুশিতে বলবে: এই নাও আমার আমলনামা পড়ে দেখো।
তাফসীর
১৯-২৪ নং আয়াতের তাফসীর এখানে বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, যে ভাগ্যবান লোকদেরকে কিয়ামতের দিন ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে তারা অত্যন্ত খুশী হবে এবং আনন্দের আতিশয্যে তারা প্রত্যেককে বলবেঃ তোমরা আমার আমলনামা পড়ে দেখো! এটা এজন্যে যে, মানবীয় স্বভাবের কারণে তাদের দ্বারা যা কিছু গুনাহর কাজ হয়েছিল সেগুলোও তাদের তাওবার কারণে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। শুধু ক্ষমা করে দেয়াই হয়নি, বরং ঐগুলোর পরিবর্তে পুণ্য লিখে দেয়া হয়েছে। সুতরাং তারা শুধু নেকীর আমলনামা আনন্দের সাথে সকলকে দেখাতে থাকবে। হযরত আব্দুর রহমান ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, (আরবি) এর পরে (আরবি) বেশী করা হয়েছে।
কিন্তু প্রকাশমান কথা এই যে, (আরবি)-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবূ উসমান (রঃ) বলেনঃ মু'মিনকে গোপনে পর্দার মধ্যে তার দক্ষিণ হস্তে আমলনামা দেয়া হবে। তাতে সে তার গুনাহগুলো পড়তে থাকবে। এতে সে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে এবং তার চেহারা বিবর্ণ হয়ে যাবে। অতঃপর তার দৃষ্টি তার পুণ্যগুলোর উপর পড়বে এবং সে ওগুলো পড়তে থাকবে। এতে সে মনে শান্তি পাবে এবং স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে। আবার সে দৃষ্টি প্রসারিত করে দেখবে এবং পড়তে থাকবে। তখন দেখবে যে, তার পাপগুলোও পুণ্যের সাথে পরিবর্তন করা হয়েছে এবং প্রত্যেক পাপের স্থলে পুণ্য লিখিত হয়েছে।
এতে সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাকেই সামনে পাবে তাকেই বলবেঃ আমার আমলনামাটা একটু পড়ে দেখো! যে আব্দুল্লাহ ইবনে হানযালা (রাঃ)-কে ফেরেশতাগণ তাঁর শাহাদাতের পর গোসল দিয়েছিলেন তাঁর পুত্র আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেন যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাকে তাঁর সামনে দাঁড় করাবেন এবং তার আমলনামার পৃষ্ঠে তার মন্দ আমল লিখিত থাকবে, যেগুলো তার কাছে প্রকাশিত হবে। আল্লাহ তা'আলা তাকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “বল তো, তুমি এ আমল করেছিলে?” সে উত্তরে বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! হ্যাঁ, আমি এটা করেছিলাম।” আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তখন তাকে বলবেনঃ “দেখো, আমি দুনিয়াতেও তোমাকে অপদস্থ করিনি, এখন এখানেও তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম।
তোমার সমস্ত গুনাহ্ মাফ করলাম।” মহান আল্লাহর এ বাণী শুনে সে আহ্লাদে আটখানা হয়ে তার আমলনামা সবাইকে দেখাতে থাকবে। হযরত উমার (রাঃ) বর্ণিত হাদীসটি পূর্বেই গত হয়েছে, যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা স্বীয় বান্দাকে নিজের কাছে ডেকে নিবেন এবং তাকে তার গুনাহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। তিনি বলবেনঃ “তুমি কি অমুক অমুক গুনাহ করেছিলে?” সে স্বীকার করতে থাকবে, এমন কি সে ধারণা করবে যে, তার ধ্বংস অনিবার্য। ঐ সময় মহামহিমান্বিত আল্লাহ তাকে বলবেনঃ “হে আমার বান্দা! দুনিয়ায় আমি তোমার গুনাহগুলোর উপর পর্দা ফেলে দিয়েছিলাম।
আজকেও আমি তোমাকে লজ্জিত করবো না। যাও, তোমাকে আমি ক্ষমা করে দিলাম।” অতঃপর তাকে তার আমলনামা ডান হাতে দেয়া হবে, যাতে শুধু পুণ্যই লিখিত থাকবে। পক্ষান্তরে কাফির ও মুনাফিকদের সম্পর্কে সাক্ষীগণ বলবেনঃ “এরা ওরাই, যারা তাদের প্রতিপালকের উপর মিথ্যা আরোপ করেছিল। জেনে রেখো যে, যালিমদের উপর আল্লাহর অভিশাপ!”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, যার ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে সে বলবেঃ দুনিয়াতেই তো আমার পূর্ণ বিশ্বাস ছিল যে, আমাকে অবশ্যই আমার হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যারা বিশ্বাস করতো যে, নিশ্চয়ই তারা তাদের প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাকারী।”(২:৪৬)মহান আল্লাহ বলেনঃ সুতরাং তাদের প্রতিদান এই যে, তারা যাপন করবে সন্তোষজনক জীবন।
তারা সুমহান জান্নাতে প্রবেশ করবে, যার অট্টালিকাগুলো হবে উঁচু উঁচু। ঐ জান্নাতের হ্রগুলো হবে অত্যন্ত সুন্দরী ও পবিত্র চরিত্রের অধিকারিণী। ওর ঘরগুলো নিয়ামতে পরিপূর্ণ থাকবে। এই নিয়ামত রাশি কখনো শেষও হবে না এবং কমেও যাবে না, বরং এগুলো হবে চিরস্থায়ী। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! (উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন ও নিম্ন মর্যাদা সম্পন্ন) জান্নাতীরা কি একে অপরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলবেনঃ “হ্যাঁ। উঁচুতে অবস্থানকারী জান্নাতীরা নিম্নে অবস্থানকারী জান্নাতীদের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে নীচে নেমে আসবে এবং খুবই ভালবাসা ও হৃদ্যতার সাথে তাদেরকে সালাম জানাবে।
হ্যাঁ, তবে নিম্নে অবস্থানকারী জান্নাতীরা তাদের আমলের স্বল্পতার কারণে উপরে উঠবে না।” অন্য একটি বিশুদ্ধ হাদীসে আছে যে, জান্নাতে একশটি শ্রেণী রয়েছে। এক শ্রেণী হতে অপর শ্রেণীর দূরত্ব হলো আকাশ ও পৃথিবীর মাঝের দূরত্বের সমান। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ জান্নাতের ফলরাশি অবনমিত থাকবে নাগালের মধ্যে। হযরত ইবনে আযিব (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেনঃ জান্নাতের গাছের ফল এতো অবনমিত থাকবে যে, জান্নাতীরা ছাপর খাটে শুয়ে শুয়েই ফল ভাঙ্গতে পারবে।হযরত সালমান ফারসী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না যে পর্যন্ত না তাকে একটা লিখিত সমন দেয়া হবে।
তাতে লিখিত থাকবেঃ বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। এটা আল্লাহর পক্ষ হতে অমুকের পুত্র অমুকের নামে পত্র। তাকে তোমরা (ফেরেশতারা) সুমহান জান্নাতে প্রবিষ্ট করো, যার ফলরাশি অবনমিত থাকবে নাগালের মধ্যে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) কোন কোন রিওয়াইয়াতে আছে যে, এই পরওয়ানা বা সমন পুলসিরাতের উপর প্রদান করা হবে। মহান আল্লাহ্ বলেন যে, জান্নাতীদেরকে অনুগ্রহ ও অধিক মেহেরবানীর ভিত্তিতে মুখেও পানাহারের অনুমতি দেয়া হবে এবং বলা হবেঃ এটা তোমাদের অতীত দিনের ভাল কৃতকর্মের বিনিময়। ভাল কর্মের বিনিময় বলা হয়েছে শুধুমাত্র স্নেহ ও মেহেরবানীর ভিত্তিতে।
কেননা, হাদীস শরীফে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আমল করতে থাকো, পরস্পর কোমল ব্যবহার কর এবং মধ্য পন্থা অবলম্বন কর, আর জেনে রেখো যে, তোমাদের কাউকেও তার আমল জান্নাতে প্রবিষ্ট করবে না। অর্থাৎ কাউকেও জান্নাতে প্রবিষ্ট করার জন্যে শুধু তার আমল যথেষ্ট নয়।” জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। আপনাকেও কি নয়?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “আমাকেও নয়। তবে আল্লাহর করুণা ও অনুগ্রহ আমাকে ঢেকে ফেলেছে (সুতরাং এটা স্বতন্ত্র কথা)।”
তখন যাকে তার ‘আমলনামা তার ডান হাতে দেয়া হবে, সে বলবে, ‘লও, আমার ‘আমলনামা পড়ে দেখ [১] ;
[১] هاؤم শব্দের এক অর্থ, আস। অন্য অর্থ, লও। উদ্দেশ্য এই যে, আমলনামা ডানহাতে পাওয়ার সাথে সাথেই তারা আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠবে এবং নিজের বন্ধু-বান্ধবদের তা দেখাবে। সে আহলাদে আটখানা হয়ে আশেপাশের লোকজনকে বলবে, লও আমার আমলনামা পাঠ করে দেখ। কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে যে, “সে আনন্দচিত্তে আপনজনদের কাছে ফিরে যাবে” [সূরা আল-ইনশিকাক: ৯]
[সূরা আল-হাক্কাহ (৬৯): আয়াত ১৯ থেকে ৩৪] পূর্ণ পৃষ্ঠা
কিয়ামতের দিন মানুষের আমলনামা তিনবার পেশ করা হবে। এর মধ্যে প্রথম দুইবার হবে বিতর্ক এবং ওজর-আপত্তি পেশ করার জন্য। আর তৃতীয়বার আমলনামাসমূহ উড়ে হাতে আসবে; তখন কেউ তা ডান হাতে গ্রহণ করবে এবং কেউ তা বাম হাতে গ্রহণ করবে। (এটি তিরমিযী বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন: এটি সহীহ নয়, কারণ হাসান (বসরী) আবু হুরায়রা থেকে সরাসরি শোনেননি।) 'তোমাদের কোনো গোপন বিষয়ই গোপন থাকবে না' অর্থাৎ তিনি তোমাদের আমলের প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে সম্যক অবগত। ইবনে শাজারা বলেন, এখানে 'খাফিয়াহ' অর্থ হচ্ছে 'খাফিয়্যাহ' (গোপন আমল), যা তারা মানুষের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখত।
অন্য মতে বলা হয়েছে: আল্লাহর কাছে কোনো মানুষই গোপন থাকবে না, অর্থাৎ প্রতিটি মানুষই হিসাবের সম্মুখীন হবে। আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস বলেন: মুমিন থেকে কাফের এবং সৎকর্মশীল থেকে পাপাচারী আলাদা করা অস্পষ্ট থাকবে না। আবার কেউ বলেছেন: তোমাদের কোনো লজ্জাস্থান আবৃত থাকবে না, যেমনটি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: (মানুষকে হাশরের ময়দানে নগ্নপদ ও উলঙ্গ অবস্থায় সমবেত করা হবে)। আসিম ব্যতীত কুফাবাসী ক্বারীগণ 'ইয়া' যোগে 'লা ইয়াখফা' পাঠ করেছেন, কারণ 'খাফিয়াহ' শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ হওয়াটি প্রকৃত নয়। যেমন মহান আল্লাহর বাণী: 'আর যারা জুলুম করেছিল, মহানাদ তাদেরকে পাকড়াও করল' [সূরা হুদ: ৬৭]।
আবু উবাইদ এই কিরাআতটি পছন্দ করেছেন, কারণ এখানে ক্রিয়া এবং স্ত্রীলিঙ্গ বিশেষ্যের মাঝে অব্যয় ও বিশেষ্য (যার-মাজরুর) ব্যবধান তৈরি করেছে। অন্যান্য ক্বারীগণ 'তা' দিয়ে পাঠ করেছেন এবং আবু হাতেম 'খাফিয়াহ' শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ রূপের বিবেচনায় এটি পছন্দ করেছেন। [সূরা আল-হাক্কাহ (৬৯): আয়াত ১৯ থেকে ৩৪]অতঃপর যার আমলনামা তার ডান হাতে দেওয়া হবে, সে বলবে, ‘নাও, আমার আমলনামা পড়ে দেখ। (১৯) আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, আমাকে আমার হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে।’ (২০) সুতরাং সে থাকবে সন্তোষজনক জীবনযাপনে, (২১) সুউচ্চ জান্নাতে, (২২) যার ফলসমূহ অবনমিত থাকবে।
(২৩)(বলা হবে) তোমরা বিগত দিনগুলোতে যা করেছিলে, তার বিনিময়ে তৃপ্তির সাথে আহার করো ও পান করো। (২৪) পক্ষান্তরে যার আমলনামা তার বাম হাতে দেওয়া হবে, সে বলবে, ‘হায়, আমাকে যদি আমার আমলনামা না দেওয়া হতো! (২৫) আর যদি আমি না জানতাম আমার হিসাব কী! (২৬) হায়, মৃত্যুই যদি শেষ হতো! (২৭) আমার ধন-সম্পদ আমার কোনো উপকারে আসল না। (২৮)আমার ক্ষমতাও ধ্বংস হয়ে গেল।’ (২৯) (ফেরেশতাদের বলা হবে) ‘ওকে ধরো এবং ওর গলায় বেড়ি পরিয়ে দাও। (৩০) তারপর ওকে নিক্ষেপ করো প্রজ্বলিত আগুনে। (৩১) এরপর তাকে শৃঙ্খলিত করো এমন এক শিকলে যার দৈর্ঘ্য সত্তর গজ। (৩২) নিশ্চয় সে মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখত না, (৩৩)এবং সে অভাবগ্রস্তকে অন্নদানে উৎসাহিত করত না।’ (৩৪)(১).
দেখুন খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ৬১।
পূর্ণ পৃষ্ঠা পূর্ণ পৃষ্ঠা পূর্ণ পৃষ্ঠা
মিযান (পাল্লা) একটি শস্যদানা পরিমাণ ওজনেও হালকা বা ভারী হয়। আর যার পুণ্য ও পাপ সমান হবে, সে ‘আরাফ’-বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হবে, ফলে তারা আরাফের ওপর অবস্থান করবে।ইবনে আবিদ দুনিয়া তাঁর ‘কিতাবুল ইখলাস’-এ আলী ইবনে আবি তালিব থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: যার বাহ্যিক দিক তার অভ্যন্তরীণ দিকের চেয়ে ভারী হবে, কিয়ামতের দিন তার পাল্লা হালকা হয়ে যাবে; আর যার অভ্যন্তরীণ দিক তার বাহ্যিক দিকের চেয়ে ভারী হবে, কিয়ামতের দিন তার পাল্লা ভারী হবে।আবুশ শায়খ জাবির থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, কিয়ামতের দিন মিযান স্থাপন করা হবে, অতঃপর পুণ্য ও পাপসমূহ ওজন করা হবে।
সুতরাং যার পুণ্য তার পাপের চেয়ে ভারী হবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে; আর যার পাপ তার পুণ্যের চেয়ে ভারী হবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।বাজ্জার, ইবনে মারদুওয়াইহ, লালকাঈ এবং বায়হাকী আনাস থেকে মারফু সূত্রে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: নিশ্চয়ই একজন ফেরেশতা মিযানের দায়িত্বে নিয়োজিত। কিয়ামতের দিন বান্দাকে আনা হবে এবং তাকে মিযানের দুই পাল্লার মাঝে দাঁড় করানো হবে। যদি তার পাল্লা ভারী হয়, তবে সেই ফেরেশতা এমন উচ্চস্বরে ঘোষণা করবেন যা সমস্ত সৃষ্টিজগত শুনতে পাবে: ‘অমুকের পুত্র অমুক এমন সৌভাগ্য লাভ করেছে যে, এরপর সে আর কখনো দুর্ভাগা হবে না।’ আর যদি তার পাল্লা হালকা হয়, তবে সেই ফেরেশতা ঘোষণা করবেন: ‘অমুক এমন দুর্ভাগ্যগ্রস্ত হয়েছে যে, এরপর সে আর কখনো সৌভাগ্যবান হবে না।’ইবনে আবি শায়বাহ, আবদ ইবনে হুমাইদ, আবু দাউদ, আজুররী ‘আশ-শারীআহ’ গ্রন্থে, হাকেম (যিনি একে সহীহ বলেছেন) এবং বায়হাকী ‘আল-বাস’ গ্রন্থে আয়েশা থেকে বর্ণনা করেছেন যে—তিনি আগুনের কথা স্মরণ করে কাঁদলেন।
তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: তোমার কী হয়েছে? তিনি বললেন: আমি আগুনের কথা স্মরণ করে কাঁদছি। কিয়ামতের দিন আপনারা কি আপনাদের পরিবার-পরিজনের কথা স্মরণ করবেন? তিনি (সা.) বললেন: তিনটি স্থান এমন যেখানে কেউ কাউকে স্মরণ করবে না— যতক্ষণ না মিযান স্থাপন করা হবে এবং সে জানতে পারবে যে তার পাল্লা হালকা হলো না ভারী। আর আমলনামা উড়ে আসার সময়, যখন বলা হবে: নাও, তোমরা আমার আমলনামা পড়ে দেখো
(সূরা আল-হাক্কাহ, আয়াত ১৯), যতক্ষণ না সে জানতে পারে তার আমলনামা কোথায় পড়বে— তার ডান হাতে, না বাম হাতে, নাকি পিঠের পেছন দিক থেকে। আর পুলসিরাতের নিকট, যখন তা জাহান্নামের ওপর স্থাপন করা হবে; যার দুই পাশে অনেক আঁকশি ও অসংখ্য কাঁটা থাকবে, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা আটকে দেবেন, যতক্ষণ না সে জানতে পারে যে সে কি মুক্তি পেল কি না।হাকেম সালমান থেকে বর্ণনা করেছেন এবং একে সহীহ বলেছেন যে, নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেছেন: কিয়ামতের দিন মিযান স্থাপন করা হবে।
যদি তাতে আসমানসমূহ ও জমিন ওজন করা হতো, তবে তা সংকুলান হতো। তখন ফেরেশতারা বলবেন: হে রব! এটি কার আমল ওজন করার জন্য? আল্লাহ বলবেন: আমার সৃষ্টির মধ্য থেকে যার জন্য আমি চাইব।তখন ফেরেশতারা বলবেন: আপনি অতি পবিত্র ও মহান! আমরা আপনার ইবাদতের হক যথাযথভাবে আদায় করতে পারিনি। আর ক্ষুরের ধারের মতো তীক্ষ্ণ পুলসিরাত স্থাপন করা হবে। তখন ফেরেশতারা বলবেন: এর ওপর দিয়ে কে পার হতে পারবে? তিনি (আল্লাহ) বলবেন: আমার সৃষ্টির মধ্য থেকে যার জন্য আমি চাইব।তখন তারা বলবেন: আপনি অতি পবিত্র ও মহান! আমরা আপনার ইবাদতের হক যথাযথভাবে আদায় করতে পারিনি।
ইবন জারীর, ইবনুল মুনযির এবং ইবন আবি হাতিম ইবন আব্বাস (রাযি.) থেকে আল্লাহর এই বাণী— “অতঃপর আল্লাহ তাদের পাপসমূহকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তিত করে দেবেন”—এর ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: তারা হলেন মুমিনগণ।তাঁরা ঈমান আনার পূর্বে পাপাচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন; অতঃপর আল্লাহ তাঁদেরকে তা থেকে বিমুখ করলেন এবং তাঁদেরকে পুণ্যের দিকে ফিরিয়ে নিলেন। ফলে তিনি তাঁদের পাপের স্থলাভিষিক্ত করলেন পুণ্যকে।আবদ ইবন হুমাইদ কাতাদাহ (রহ.) থেকে আল্লাহর বাণী—“তবে যে তওবা করে”—এর ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন: অর্থাৎ যে তার পাপ থেকে তওবা করে; “এবং ঈমান আনে”—অর্থাৎ তার রবের প্রতি ঈমান আনে।“এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে”—তিনি বলেন: যা তার এবং তার রবের মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে হয়।
“অতঃপর আল্লাহ তাদের পাপসমূহকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তিত করে দেবেন”—এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন: এই পরিবর্তন হলো আল্লাহর অবাধ্যতার পর তাঁর আনুগত্য করা, তাঁকে ভুলে যাওয়ার পর তাঁকে স্মরণ করা এবং মন্দের পর ভালো কাজ করা।আবদ ইবন হুমাইদ এবং ইবন আবি হাতিম হাসান (বসরী) থেকে আল্লাহর বাণী—“অতঃপর আল্লাহ তাদের পাপসমূহকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তিত করে দেবেন”—সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: এই পরিবর্তন দুনিয়াতেই ঘটে। আল্লাহ মন্দ আমলের পরিবর্তে নেক আমল, শিরকের পরিবর্তে ইখলাস (একনিষ্ঠতা) এবং পাপাচারের পরিবর্তে পবিত্রতা বা চারিত্রিক শুদ্ধতা দান করেন এবং অনুরূপ পরিবর্তন দান করেন।ফিরইয়াবী এবং আবদ ইবন হুমাইদ মুজাহিদ (রহ.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, “আল্লাহ তাদের পাপসমূহকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তিত করে দেবেন”—এর অর্থ হলো শিরকের পর ঈমান গ্রহণ।আবদ ইবন হুমাইদ মাকহুল (রহ.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, “আল্লাহ তাদের পাপসমূহকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তিত করে দেবেন”—এর অর্থ হলো যখন তারা তওবা করে, তখন আল্লাহ তাদের ইতিপূর্বে কৃত পাপগুলোকে পুণ্যে পরিণত করে দেন।আবদ ইবন হুমাইদ আলী ইবনুল হুসাইন (রহ.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি “আল্লাহ তাদের পাপসমূহকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তিত করে দেবেন” সম্পর্কে বলেছেন: এটি পরকালে হবে।
আর হাসান (বসরী) বলেছেন: এটি দুনিয়াতে হবে।আবদ ইবন হুমাইদ এবং ইবনুল মুনযির আবু উসমান আন-নাহদী (রহ.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন: মুমিনকে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক গোপনীয় আবরণে তার আমলনামা দেওয়া হবে। অতঃপর সে তার পাপগুলো পড়বে এবং তা পড়ার সময় (লজ্জা ও ভয়ে) তার চেহারার বর্ণ বিবর্ণ হয়ে যাবে। এরপর যখন সে তার পুণ্যগুলোর কাছে পৌঁছাবে এবং তা পড়বে, তখন তার স্বাভাবিক বর্ণ ফিরে আসবে। অতঃপর সে পুনরায় লক্ষ্য করে দেখবে যে, তার পাপগুলো পুণ্যে পরিবর্তিত হয়ে গেছে। তখন সে (আনন্দে) বলবে: “এসো, তোমরা আমার আমলনামা পড়ে দেখো” (সূরা আল-হাক্কাহ, আয়াত ১৯)।আবদ ইবন হুমাইদ এবং ইবন আবি হাতিম সালমান (রাযি.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে তার আমলনামা প্রদান করা হবে।
সে তার উপরের অংশ পড়বে এবং তাতে তার পাপগুলো দেখতে পাবে। যখন তার ধারণা চরম খারাপের দিকে যাবে (অর্থাৎ সে নিরাশ হতে থাকবে), তখন সে আমলনামার নিচের দিকে তাকাবে এবং সেখানে তার পুণ্যগুলো দেখতে পাবে। এরপর সে পুনরায় উপরের দিকে তাকাবে এবং দেখতে পাবে যে সেগুলো পুণ্যে পরিবর্তিত হয়ে গেছে।আহমদ, হান্নাদ, মুসলিম, তিরমিযী, ইবন জারীর এবং 'আল-আসমা ওয়াস-সিফাত' গ্রন্থে বায়হাকী আবু যার (রাযি.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে উপস্থিত করা হবে এবং বলা হবে, তার সামনে পেশ করো...
ইবনে জারির দাহহাক থেকে এই আয়াত সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: ‘আল-কাসর’ হলো বিশাল বৃক্ষের কাণ্ডসমূহ, যেন সেগুলো পীতবর্ণের উটের মধ্যভাগ।ইবনে জারির বলেন: প্রতিটি জিনিসের মধ্যভাগকে ‘জাওযাহ’ বলা হয়।ইবনে জারির হারুন থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: হাসান (বাসরি) এটি ‘কাল-কাসর’ (সাদ অক্ষরে সুকুন যোগে) পাঠ করেছেন এবং বলেছেন: এটি হলো কাঠের মোটা টুকরো।ইবনে জারির হাসান থেকে ‘যেন তারা পীতবর্ণের উট’ (জামালতুন সুফর) সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: এগুলো কৃষ্ণবর্ণের উষ্ট্রীর ন্যায়।ইবনে জারির আলীর সূত্রে ইবনে আব্বাস থেকে ‘যেন তারা পীতবর্ণের উট’ সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: এগুলো তামার টুকরো।আব্দ বিন হুমাইদ এবং ইবনে জারির মুজাহিদ থেকে আল্লাহর বাণী ‘প্রাসাদ সদৃশ’ প্রসঙ্গে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: বৃক্ষের বোঝা এবং খেজুর গাছের কাণ্ড।
‘যেন তারা পীতবর্ণের উট’ সম্পর্কে তিনি বলেন: এগুলো হলো সেতুর রজ্জুসমূহ।আব্দুর রাজ্জাক, আব্দ বিন হুমাইদ, ইবনে জারির এবং ইবনুল মুনযির কাতাদাহ থেকে ‘প্রাসাদ সদৃশ’ প্রসঙ্গে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: বৃক্ষ ও খেজুর গাছের কাণ্ডসমূহ। ‘যেন তারা পীতবর্ণের উট’ সম্পর্কে তিনি বলেন: যেন সেগুলো কৃষ্ণবর্ণের উষ্ট্রী।আব্দ বিন হুমাইদ ইকরিমা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি ‘কাল-কাসর’ পাঠ করতেন এবং বলতেন: এটি স্থূল খেজুর গাছের খণ্ডের মতো। ‘যেন তারা পীতবর্ণের উট’ প্রসঙ্গে তিনি বলেন: এগুলো হলো যুবতী উষ্ট্রী।ইবনে মারদুইয়াহ আব্দুল্লাহ ইবনে সামিত থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমি আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আসকে জিজ্ঞাসা করলাম—আপনি কি আল্লাহর বাণী: ‘এটি এমন এক দিন যখন তারা কথা বলতে পারবে না এবং তাদের ওজর পেশ করার অনুমতিও দেওয়া হবে না’ সম্পর্কে লক্ষ্য করেছেন?
তিনি বললেন: কিয়ামত দিবস এমন একটি দিন যার বিভিন্ন অবস্থা ও পর্যায় রয়েছে। কোনো অবস্থায় তারা কথা বলবে না, কোনো অবস্থায় কথা বলবে এবং কোনো অবস্থায় ওজর পেশ করবে। আমি তোমাদের কাছে কেবল তা-ই বর্ণনা করছি যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন: যখন কিয়ামত দিবস হবে, মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ মেঘমালার ছায়াতলে অবতীর্ণ হবেন। প্রতিটি উম্মত তিনটি পর্দার অন্তরালে হাঁটু গেড়ে বসে থাকবে, প্রতিটি পর্দার দূরত্ব পঞ্চাশ হাজার বছরের পথ। একটি আলোর পর্দা, একটি অন্ধকারের পর্দা এবং একটি পানির পর্দা যা দেখা যাবে না।
অতঃপর তিনি সেই পানিকে আদেশ করবেন এবং তা সেই অন্ধকারে বিলীন হয়ে যাবে। কোনো প্রাণী সেই বাণী শোনা মাত্রই প্রাণ হারাবে; সেই মুহূর্তেই তারা কথা বলতে পারবে না।হাকেম বর্ণনা করেছেন এবং একে সহীহ বলেছেন ইকরিমা সূত্রে, তিনি বলেন: নাফে ইবনুল আযরাক ইবনে আব্বাসকে মহান আল্লাহর বাণী—‘এটি এমন এক দিন যখন তারা কথা বলবে না’, ‘তুমি মৃদু ধ্বনি ছাড়া আর কিছুই শুনতে পাবে না’ (সূরা ত্বহা, আয়াত: ১০৮), ‘তারা একে অপরের মুখোমুখি হয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে’ (সূরা সাফফাত, আয়াত: ২৭) এবং ‘এসো, তোমরা আমার আমলনামা পড়ে দেখো’ (সূরা হাক্কাহ, আয়াত: ১৯) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন যে, এগুলো কী?
তিনি (ইবনে আব্বাস) বললেন:
