গাছপালাও জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ধ্বংস করতেন নবী

ভূমিকা

ইতিহাস কেবল জয়-পরাজয়ের সংকলন নয়, বরং এটি সেই সময়ের নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের এক আয়না। ইসলামের প্রাথমিক যুগের বহু ঘটনা আজ যখন আমরা আধুনিক জ্ঞানতত্ত্ব ও বিশ্বজনীন মানবাধিকারের আলোকে বিশ্লেষণ করি, তখন তা আমাদের প্রচলিত বিশ্বাসের বিপরীতে গিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। ইসলামের প্রবর্তক মুহাম্মদ-এর জীবনে ঘটে যাওয়া তেমনই একটি অত্যন্ত বিতর্কিত ও স্পর্শকাতর ঘটনা হলো মদিনার ইহুদি গোত্র বনু নাজীর-এর সুদীর্ঘকালের পরিশ্রমে গড়ে তোলা জীবিকার প্রধান উৎস—তাদের বিশাল খেজুর বাগান পুড়িয়ে দেওয়া এবং বৃক্ষনিধন করা।

ঐতিহ্যগতভাবে ইসলামী ইতিহাসবিদ ও তাফসীরকারকগণ এই ধ্বংসলীলাকে একটি ‘চতুর সামরিক কৌশল’ বা ‘শত্রুকে দমনের বৈধ পন্থা’ হিসেবে উপস্থাপন করে এসেছেন। এমনকি কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে একে ‘ঐশ্বরিক অনুমোদন’ প্রাপ্ত একটি কাজ হিসেবেও দাবি করা হয়। তবে বর্তমানের যুক্তিবাদী মননশীল চিন্তা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের (IHL) আলোকে এই ঘটনাটি গভীর নৈতিক ও আইনি প্রশ্নের জন্ম দেয়। একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর প্রধান খাদ্য উৎস এবং অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ধ্বংস করে দিয়ে তাদের প্রান্তিক ও দুর্বল করে ফেলা কি কোনো সভ্য সমাজের রণকৌশল হতে পারে? যে আদর্শ নিজেকে ‘রহমতুল্লিল আলামিন’ বা বিশ্বজগতের জন্য করুণা হিসেবে দাবি করে, সেই আদর্শের ধারক কীভাবে একটি অঞ্চলের বাস্তুসংস্থান (Ecology) এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক অবকাঠামো পুড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারেন?

বনু নাজীর গোত্রের সেই খেজুর বাগানগুলো কেবল কিছু গাছ ছিল না, বরং তা ছিল একটি জাতির বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। সেই বাগান ধ্বংস করা মানে ছিল তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এক অনিশ্চিত খাদ্যাভাব ও দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেওয়া। এই প্রবন্ধে আমরা দেখার চেষ্টা করব, মুহাম্মদের এই কর্মকাণ্ড কীভাবে আধুনিক জেনেভা কনভেনশন এবং যুদ্ধকালীন আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। পাশাপাশি, ‘ঐশ্বরিক নির্দেশের’ দোহাই দিয়ে বেসামরিক সম্পত্তির ওপর এই ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ চালানোকে সমকালীন নৈতিকতার মানদণ্ডে আদৌ বিচার করা সম্ভব কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হবে।


আধুনিক প্রেক্ষাপটে একটি তুলনামূলক উদাহরণ

ঐতিহাসিক ঘটনার গুরুত্ব ও নৈতিকতা বুঝতে আমরা সমসাময়িক একটি পরিস্থিতির অবতারণা করতে পারি। কল্পনা করুন, বর্তমান গাজা উপত্যকার শাসক গোষ্ঠী হামাস যদি ইসরায়েলের সঙ্গে করা কোনো শান্তি চুক্তি ভঙ্গ করে কিংবা কোনো গুপ্তহত্যার পরিকল্পনা করে (যেমনটি বনু নাজীরদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল)। এই চুক্তিবদ্ধ বা আইনি বিচ্যুতির জবাবে ইসরায়েলি বাহিনী যদি গাজার কোনো সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণ না করে বরং সেখানকার সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান উৎসগুলো ধ্বংস করে দেয়, তবে বিশ্ববিবেকের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে?

ধরা যাক, ইসরায়েল গাজার একমাত্র সুপেয় পানির প্ল্যান্টগুলো ধ্বংস করে দিল, কৃষিজমিগুলো পুড়িয়ে দিল এবং তাদের অর্থ উপার্জনের মূল ক্ষেত্রগুলো (যেমন মাছ ধরার অবকাঠামো বা কলকারখানা) গুঁড়িয়ে দিল। এর সপক্ষে ইসরায়েল যদি যুক্তি দেয় যে—এটি একটি ‘সামরিক কৌশল’ যাতে গাজার সাধারণ মানুষ চরম খাদ্য ও পানি সংকটে পড়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে এবং তাদের শাসকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, কিংবা এটি একটি ‘ঐশ্বরিক প্রতিশোধ’—তবে কি কোনো বিবেকবান মানুষ একে সমর্থন করবে? [1] [2]

বনু নাজীর গোত্রের ক্ষেত্রে মুহাম্মদ ঠিক এই কাজটিই করেছিলেন। কতিপয় নেতার তথাকথিত ষড়যন্ত্রের অভিযোগে (যার কোনো বাস্তব প্রমাণ জিবরাইলের বাণী ছাড়া ছিল না) পুরো গোত্রের কয়েক প্রজন্মের সম্পদ ও খাদ্য উৎস ধ্বংস করা হয়েছিল। আধুনিক মানবাধিকার আইনের ভাষায় একে বলা হয় ‘Collective Punishment’ বা সম্মিলিত শাস্তি। কোনো গোষ্ঠীর গুটিকয়েক সদস্যের বা শাসকের অপরাধের জন্য পুরো বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে মৌলিক মানবাধিকার (খাদ্য, পানি ও জীবিকা) থেকে বঞ্চিত করা একটি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। [3]

মজার বিষয় হলো, গাজায় সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি বা সিভিলিয়ান অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে যারা একে ‘নির্মমতা’ বা ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ হিসেবে তীব্র নিন্দা জানান, তারাই আবার ১৪০০ বছর আগে বনু নাজীরদের খেজুর বাগান পুড়িয়ে নিঃস্ব করে দেওয়াকে ‘মুহাম্মদের চমৎকার যুদ্ধকৌশল’ হিসেবে মহিমান্বিত করেন। এই দ্বিমুখী নৈতিকতা বা ‘Selective Morality’ প্রমাণ করে যে, অনেক ক্ষেত্রে মানুষের বিচারবুদ্ধি নিরপেক্ষ যুক্তির চেয়ে ধর্মীয় আনুগত্যের দ্বারা বেশি প্রভাবিত হয়। যদি ইসরায়েলের দ্বারা গাজার জীবনরক্ষা সরঞ্জাম ধ্বংস করা অপরাধ হয়, তবে মুহাম্মদের দ্বারা বনু নাজীরদের জীবিকার উৎস ধ্বংস করাও সমভাবে অপরাধ এবং অমানবিক।

এই উদাহরণটি স্পষ্ট করে দেয় যে, সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের তৈরি আইন উন্নত হয়েছে এবং প্রাচীন অনেক ‘কৌশল’ আজ অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত। ধর্মের দোহাই দিয়ে এই জাতীয় অমানবিক কাজকে বৈধতা দেওয়া কেবল নৈতিক দেউলিয়াপনাই নয়, বরং এটি আধুনিক সভ্যতার অর্জিত মানবিক মূল্যবোধের প্রতি এক চরম অবমাননা।


ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

হিজরতের পর মদিনায় অবস্থানকালে মুহাম্মদ ইহুদি গোত্রসমূহের সঙ্গে নানা ধরণের রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন। তেমনই এক ইহুদি গোত্র ছিল বনু নাজীর। ইসলামী ইতিহাস মতে, বনু নাজীর গোত্রের লোকেরা মুহাম্মদকে হত্যা করতে চেয়েছিল, যদিও তার কোন বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায় না, জিবরাইল নাকি গোপনে এই তথ্য মুহাম্মদকে দিয়ে গিয়েছিল। এই নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা এখানে করা হয়েছে। এবং এই ষড়যন্ত্রের জবাবে তিনি তাদের ঘিরে ফেলেন এবং তাদের খেঁজুর বাগানের কিছু অংশ পুড়িয়ে দেন। এই ঘটনা কুরআনের সূরা হাশরের ৫নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে, [4]

তোমরা খেজুরের যে গাছগুলো কেটেছ আর যেগুলোকে তাদের মূলকান্ডের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে দিয়েছ, তা আল্লাহর অনুমতিক্রমেই (করেছ)। আর (এ অনুমতি আল্লাহ এজন্য দিয়েছেন) যেন তিনি পাপাচারীদেরকে অপমানিত করেন।
— Taisirul Quran
তোমরা যে খেজুর বৃক্ষগুলি কর্তন করেছ এবং যেগুলি কান্ডের উপর স্থির রেখে দিয়েছ, তাতো আল্লাহরই অনুমতিক্রমে; এটা এ জন্য যে, আল্লাহ পাপাচারীদেরকে লাঞ্ছিত করবেন।
— Sheikh Mujibur Rahman
তোমরা যে সব নতুন খেজুর গাছ কেটে ফেলছ অথবা সেগুলোকে তাদের মূলের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে দিয়েছ। তা তো ছিল আল্লাহর অনুমতিক্রমে এবং যাতে তিনি ফাসিকদের লাঞ্ছিত করতে পারেন।
— Rawai Al-bayan
তোমরা যে খেজুর গাছগুলো কেটেছ এবং যেগুলোকে কাণ্ডের উপর স্থিত রেখে দিয়েছ, তা তো আল্লাহ্‌রই অনুমতিক্রমে [১] এবং এ জন্যে যে, আল্লাহ ফাসিকদেরকে লাঞ্ছিত করবেন।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

অর্থাৎ, খেজুর গাছ পুড়িয়ে দেওয়ার কাজটি মুহাম্মদের পক্ষ থেকে ধর্মীয় বৈধতা পেয়েছে। আসুন এই আয়াতটির তাফসীর পড়ে নেয়া যাক, [5]

অর্থাৎ তোমরা যে খর্জুর বৃক্ষগুলি কর্তন করিয়াছ এবং যেগুলি কাণ্ডের উপর স্থির রাখিয়া দিয়াছ; তাহাতো আল্লাহরই অনুমতিতে; ইহা এইজন্য যে, তিনি পাপাচারীদেরকে লাঞ্ছিত করিবেন।
উন্নতমানের এক ধরনের খেজুর বৃক্ষকে বলা হয়। আবু উবায়দা (রা) বলেনঃ আজওয়া ও বারনী খর্জুর ব্যতীত অন্যান্য খর্জুর বৃক্ষকে বলা হয়। বহুসংখ্যক মুফাস্স্সিরের মত হইল, ‘আজওয়া ছাড়া সকল বর্ণের খেজুর বৃক্ষকেই ইন জারীর (র) বলেনঃ যে কোন খর্জুর বৃক্ষকেই (র)-এরও মত। বলা হয়। বলা হয় এবং ইহা মুজাহিদ
বনূ নাযীরের সম্প্রদায়কে অবরোধ করিবার পর রাসূলুল্লাহ্ (সা): তাহাদের ভীতি ও ঘৃণা প্রদর্শন ও হুমকিরূপে তাহাদিগের খর্জুর বৃক্ষগুলি কাটিয়া ফেলার নির্দেশ দেন।
যায়েদ ইন্ন রূমান, কাতাদা ও মুকাতিল ইন্ন হায়য়ান (র) বলেন: বনূ নাযীরের এই ঘটনার পর বনু কুরায়যা এই বলিয়া অভিযোগ তোলে যে, কি:ব্যাপার? আপনি দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা বলিতেছেন আর এইসব ধ্বংস চালাইতেছেন? এই অভিযোগের উত্তরে আল্লাহ্ তা’আলা এই আয়াতটি নাযিল করেন। অর্থাৎ খর্জুর বৃক্ষ কর্তন করা বা কর্তন না করিয়া নিরাপদে রাখিয়া দেওয়া এই সবই আল্লাহ্র নির্দেশ ও অনুমতিক্রমেই হইতেছে। শত্রুপক্ষের অপমান ও দর্প চূর্ণ করাই ইহার উদ্দেশ্য।
মুজাহিদ (র) বলেন: কতিপয় মুজাহিদ খর্জুর বৃক্ষগুলি কাটিতে চাহিলে অন্যরা বাধা দিয়া বলিল যে, বৃক্ষ কাটিয়া লাভ কি? শেষ পর্যন্ত তো এইগুলি আমাদিগের হাতেই চলিয়া আসিবে। ফলে উভয় দলের সমর্থনে আলোচ্য আয়াত নাযিল হয়। অর্থাৎ বৃক্ষ কাটিয়া ফেলা এবং না কাটিয়া অক্ষত রাখিয়া দেওয়া উভয়েই আল্লাহ্ অনুমোদন রহিয়াছে।
ইমাম নাসাঈ (র) আব্বাস (রা) বলেন: مَا قَطَعْتُمْ مِنْ لَيْنَة الخ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন: বনূ নাযীরের কিছু বৃক্ষ কার্টিয়া ফেলিবার এবং কিছু রাখিয়া দেওয়ার পর সাহাবাগণের মনে সংশয় সৃষ্টি হয় যে, কাটিয়া ফেলা ঠিক হইল না-কি রাখিয়া দেওয়া ঠিক হইল? ফলে তাহারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট গিয়া জিজ্ঞাসা করেন যে, হুযূর! আমরা যাহা কাটিয়া ফেলিয়াছি উহাতে আমরা কোন সওয়াব পাইব? আর যাহা রাখিয়া দিয়াছি ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, ইন্ন উহাতে কি কোন গুনাহ হইবে? তখন আল্লাহ্ তা’আলা এই আয়াতটি নাযিল করেন। مَا قَطَعْتُمْ مِّنْ لَّيْنَةٍ .
অনুরূপ জাবির (রা) হইতে এটি আবূ ইয়ালা (র) বর্ণনা করিয়াছেন।
ইমাম আহমদ (র) …… ইবন উমর (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, ইবন উমর (রা) বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) বনূ নাযীরের খর্জুর বৃক্ষগুলি কাটিয়া আগুন দ্বারা পোড়াইয়া ফেলিয়াছিলেন।

গাছপালা

অন্যান্য প্রবন্ধে আমরা আলোচনা করেছি, কীভাবে নারী শিশু হত্যা, প্রাপ্তবয়স্ক কাফির পুরুষদের হত্যা, দাসদাসীতে পরিণত করা, এগুলো করেই থামেননি মুহাম্মদ, গাছপালাও তার হিংস্র আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়নি। যার আরও প্রমাণ মেলে বুখারী মুসলিমের হাদিস থেকেই [6] [7] [8]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৩/ বর্গাচাষ
পরিচ্ছেদঃ ১৪৫০. খেজুর গাছ ও অন্যান্য গাছ কেটে ফেলা। আনাস (রা.) বলেন, নবী (সঃ) খেজুর গাছ কেটে ফেলার আদেশ দেন এবং টা কেটে ফেলা হয়।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ২১৭৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৩২৬
২১৭৫। মূসা ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) … আবদুল্লাহ‌ ইবনু উমর (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনূ নযির গোত্রের বুওয়াইরা নামক স্থানে অবস্থিত বাগানটির খেজুর গাছ জ্বালিয়ে দিয়েছেন এবং বৃক্ষ কেটে ফেলেছেন। এ সম্পর্কে হাস্‌সান (রাঃ) (তাঁর রচিত কবিতায়) বলেছেন, বুওয়াইরা নামক স্থানে অবস্থিত বাগানটিতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে আর বনূ লূয়াই গোত্রের সর্দাররা তা সহজে মেনে নিল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৩৩। জিহাদ ও সফর
পরিচ্ছেদঃ ১০. কাফিরদের গাছ-পালা কাটা ও জ্বালিয়ে দেয়া বৈধ
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৪৪৪৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৭৪৬
৪৪৪৪-(২৯/১৭৪৬) ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া, মুহাম্মাদ ইবনু রুমূহ ও কুতাইবাহ ইবনু সাঈদ (রহঃ) ….. ‘আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাযীর গোত্রের খেজুর বাগান জ্বালিয়ে দিলেন এবং কেটে দিলেন। বুওয়াইরাহ ছিল সে বাগানের নাম। কুতাইবাহ এবং ইবনু রুমূহ (রহঃ) উভয়েই তাদের হাদীসে অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন। এরপর মহান আল্লাহ এ আয়াত নাযিল করেনঃ “তোমরা যেসব খেজুর বৃক্ষ কেটে ফেলেছে কিংবা তার কাণ্ডের উপর খাড়া রেখেছ, সবই ছিল আল্লাহর নির্দেশে, যাতে তিনি পাপাচারীদের অপদস্থ করেন।” (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৪০২, ইসলামিক সেন্টার ৪৪০২)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৩৩। জিহাদ ও সফর
পরিচ্ছেদঃ ১০. কাফিরদের গাছ-পালা কাটা ও জ্বালিয়ে দেয়া বৈধ
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৪৪৪৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৭৪৬
৪৪৪৫-(৩০/…) সাঈদ ইবনু মানসূর … ইবনু উমর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাযীর গোত্রের খেজুর বাগান কেটেছিলেন এবং জ্বলিয়ে দিয়েছিলেন। এ সম্পর্কে কবি হাস্‌সান (রাযিঃ) বলেন, “বনী লুওয়াই (অর্থাৎ- কুরায়শ) এর নেতাদের কাছে বুওয়াইরায় আগুনের লেলিহান শিখা খুব সহজ হয়ে গেছে।” আর এ সম্পর্কেই নাযিল হয়েছে এ আয়াতঃ (অর্থ) “তোমরা যেসব খেজুর গাছ কেটেছে অথবা তা কাণ্ডের উপর রেখে দিয়েছ” আয়াতটির শেষ পর্যন্ত। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৪০৩, ইসলামিক সেন্টার ৪৪০৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ)

ইসলামী আইন বা ফিকাহের গ্রন্থগুলোতেও গাছপালা ধ্বংসের বিষয়ে নানা ধরণের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। আল হিদায়া গ্রন্থে আরো বর্ণিত রয়েছে কিভাবে কাফিরদের ঘরবাড়ি, গাছপালা, বাগানে মুসলিমরা গিয়ে জ্বালা পোড়াও করবে [9] জিহাদ অধ্যায়ে –

ইমাম কুদূরী বলেন, যদি তারা প্রত্যাখ্যান করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করবে এবং লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবে।
কেননা সোলায়মান বিন বুরায়দা (রা) সম্পর্কিত হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যদি তারা দাওয়াত অস্বীকার করে তাহলে তাদেরকে যিযয়া প্রদানের আহ্বান জানাও। এরপর তিনি বলেছেন, যদি তারা তা প্রত্যাখ্যান করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করো এবং তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করো।
আর যেহেতু আল্লাহই তাঁর প্রিয় বান্দাদের সাহায্যকারী এবং তাঁর শত্রুদের ধ্বংসকারী। সুতরাং সকল বিষয়ে তারই সাহায্য প্রার্থনা করা কর্তব্য। আর তাদের বিরুদ্ধে মিনজনিক (কামান) মোতায়েন করবে। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তায়েফের বিরুদ্ধে করেছিলেন এবং তাদের বিরুদ্ধে জ্বালাও পোড়াও চালাবে। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বোয়াইরা অঞ্চল (প্রয়োজনে) জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন।
ইমাম কুদূরী (র) বলেন, (বাঁধ ভেংগে বা অন্য উপায়ে) তাদের উপর পানি ছেড়ে দেবে এবং তাদের বৃক্ষ নিধন করবে এবং তাদের ফসল নষ্ট করবে।
কেননা এসব দ্বারা তাদের লাঞ্ছিত করা হয়, তাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করা হয়, তাদের প্রতিপত্তি ভেঙ্গে দেওয়া হয় এবং তাদের সংহতি বিচ্ছিন্ন করা হয়। সুতরাং তা বৈধ হবে।
তাদের মাঝে মুসলিম বন্দী বা ব্যবসায়ী থাকলেও তাদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করতে বাধা নেই। কেননা তীর বর্ষণে ইসলামের কেন্দ্র থেকে প্রতিরোধের মাধ্যমে বৃহৎ ক্ষতিরোধ করা হয়। পক্ষান্তরে মুসলিম বন্দী ও ব্যবসায়ী নিহত হওয়ায় সীমিত ক্ষতি। তাছাড়া খুব কম দুর্গই কিছুসংখ্যক মুসলমান থেকে খালি হয়। সুতরাং তা বিবেচনা করে যদি বিরত থাকতে হয় তাহলে তো জিহাদের দরজাই বন্ধ হয়ে যাবে।
যদি তারা মুসলিম বালকদের কিংবা বন্দীদের ‘ঢাল’ রূপে ব্যবহার করে তাহলে (আমাদের বর্ণিত কারণে) তাদের প্রতি তীর বর্ষণ থেকে বিরত থাকবেনা। অবশ্য কাফিরদের প্রতি তীর বর্ষণের নিয়ত করবে। কেননা কার্যতঃ পার্থক্য করা অসম্ভব হলেও উদ্দেশ্যগতভাবে তা সম্ভব। আর আদেশ পালনের দায়িত্ব সাধ্য অনুযায়ী। আর ঐ মুসলমানদের যে কজন তাদের তীর বর্ষণের শিকার হবে তাদের দিয়ত মুজাহিদদের উপর ওয়াজিব হবে না। আর কাফফারারও ওয়াজিব হবে না।
কেননা জিহাদ হলো ফরয, আর ফরয পালনের সাথে ‘দন্ড’ যুক্ত হতে পারে না।
জীবনাশংকাপূর্ণ ক্ষুধার সময় অন্যের মাল গ্রহণের বিষয়টি ভিন্ন। কেননা ক্ষতিপূরণের ভয়ে কেউ তা থেকে বিরত থাকে না। কারণ তাতে নিজের জীবন বাঁচানোর বিষয় রয়েছে। পক্ষান্তরে জিহাদের ভিত্তি হল প্রাণনাশ করার উপর। সুতরাং ক্ষতিপূরণের ভয়ে তা থেকে বিরত থাকতে পারে।
ইমাম কুদূরী (র) বলেন, মুসলিম বাহিনীর সাথে নারীদেরকে এবং কুরআন শরীফ নিয়ে যাওয়ায় বাধা নেই, যদি এমন বড় বাহিনী হয়, যাতে নিরাপত্তার উপর নির্ভর করা যায়। কেননা এক্ষেত্রে নিরাপত্তাই প্রবল, আর যা প্রবল তা সুনিশ্চিতের মত। কিন্তু নিরাপদ নয় এমন ক্ষুদ্র বাহিনী সাথে নিয়ে যাওয়া মাকরূহ।

গাছপালা 1

অর্থনৈতিক অবকাঠামো ধ্বংসের নৈতিক সমস্যা

ভেবে দেখুন তো, একাত্তর সালে পাক আর্মি যখন আমাদের ফসলী জমিগুলোতে আগুন দিয়ে আমাদের শস্য ধ্বংস করেছিল, আমাদের একজন কৃষকের তখন কী অসহায় অবস্থা হয়েছিল? বা ধরুন আজকের পৃথিবীতে যেসব দেশে যুদ্ধ হচ্ছে, সেসব দেশে যদি সাধারণ মানুষের মূল জীবিকার ওপর আঘাত হানা হয়, সেটি কতটা ভয়ঙ্কর অবস্থার জন্ম দেবে? বেসামরিক মানুষ, নারী শিশুরা এতে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে? একটি সমাজের অর্থনৈতিক অবকাঠামো ধ্বংস করে দেওয়া শুধুই সম্পদের ক্ষতি নয়, বরং একটি জাতিগোষ্ঠীর মৌলিক মানবাধিকারে হস্তক্ষেপের সামিল। যখন একটি জনগোষ্ঠীর প্রধান জীবিকা, খাদ্য, এবং আর্থিক স্বনির্ভরতার উৎস—যেমন খেজুর বাগান—পুড়িয়ে দেওয়া হয়, তখন তা তাদের কেবল আর্থিকভাবে নয়, সামাজিকভাবেও চরমভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। বনু নাজীর গোত্রের জীবিকা ছিল মূলত খেজুর চাষের ওপর নির্ভরশীল। সেই বাগান ধ্বংস করে দেওয়া মানে হলো—তাদের খাদ্য সরবরাহ, পণ্য বাণিজ্য এবং ভবিষ্যৎ জীবনধারার ভিত্তি ধ্বংস করে দেওয়া। যুদ্ধক্ষেত্রে এই ধরনের পদক্ষেপ শত্রুর সামরিক শক্তি নয়, বরং নিরস্ত্র সাধারণ জনগণের ওপর পরোক্ষ আঘাত হানে।তাদের খাদ্য সংকটের মধ্যে ঠেলে দিয়ে তাদের মানসিকভাবে দুর্বল করে ফেলা হয়, যা নৈতিক দিক দিয়ে মেনে নেয়া যায় না।

এই ধরণের কর্মকাণ্ড আধুনিক আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী “collective punishment” বা সামষ্টিক শাস্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। কোনো ব্যক্তির বা গোষ্ঠীর কিছু সদস্যের অপরাধের দায় সমগ্র জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দিয়ে তাদের জীবিকার উপরে আঘাত হানা একটি অমানবিক ও নিষিদ্ধ পদ্ধতি। ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশনের চতুর্থ অনুচ্ছেদে এ ধরনের কর্মকাণ্ড স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে—বেসামরিক জনগণের সম্পত্তি ধ্বংস করা যাবে না, যদি না তা একদম সরাসরি ও অত্যাবশ্যক সামরিক প্রয়োজনের অংশ হয়। মুহাম্মদের ঐ কাজ অত্যাবশ্যকীয় সামরিক প্রয়োজন বা একদম সরাসরি প্রয়োজন ছিল না। বেসামরিক মানুষকে মানসিকভাবে দুর্বল করাই ছিল তার উদ্দেশ্য। খেজুর গাছ পোড়ানো সেই সময়কার প্রেক্ষাপটে কেবল প্রতিশোধমূলক বা মনস্তাত্ত্বিক চাপ প্রয়োগের একটি উপায় ছিল, সামরিক বাধ্যবাধকতা নয়। ফলে তা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী একটি গুরুতর নৈতিক লঙ্ঘন হিসেবে প্রতিভাত হয়।


আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী পর্যালোচনা

আধুনিক সভ্যতায় যুদ্ধকালীন আচরণের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু আন্তর্জাতিক নীতিমালা রয়েছে, যা ‘ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যানিটারিয়ান ল’ (IHL) বা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন নামে পরিচিত। এই আইনের মূল লক্ষ্য হলো যুদ্ধের ভয়াবহতা সীমিত করা এবং যারা সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত নয় (বেসামরিক জনগণ), তাদের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করা। মুহাম্মদের নির্দেশে বনু নাজীর গোত্রের খেজুর বাগান ধ্বংসের ঘটনাটি এই আধুনিক আইনি কাঠামোর আওতায় আনলে তা মারাত্মক অপরাধ হিসেবেই গণ্য হয়।

১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশনের চতুর্থ ধারার ৫৩-নং অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা হয়েছে:

“Any destruction by the Occupying Power of real or personal property belonging individually or collectively to private persons… is prohibited, except where such destruction is rendered absolutely necessary by military operations.” [10]

এই আইনটির মূল কথা হলো, দখলদার কোনো শক্তি বা আক্রমণকারী বাহিনী কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগত সম্পত্তি ধ্বংস করতে পারবে না—যদি না তা সামরিক অভিযানের জন্য ‘একদম অনিবার্য’ (Absolutely Necessary) হয়।

এখন প্রশ্ন ওঠে, বনু নাজীর গোত্রের খেজুর বাগান পুড়িয়ে দেওয়া কি সামরিকভাবে অনিবার্য ছিল? ঐতিহাসিক তথ্যের আলোকে এর উত্তর হলো—না। কারণ:

১. বেসামরিক সম্পদের ব্যবহার খেজুর বাগান কোনো সামরিক স্থাপনা ছিল না। এটি ছিল একটি কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক সম্পদ। যুদ্ধের ময়দানে প্রতিপক্ষের অস্ত্রাগার বা কেল্লা ধ্বংস করা সামরিক প্রয়োজনে পড়ে, কিন্তু ফসলি জমি বা ফলের বাগান ধ্বংস করা কোনো তাৎক্ষণিক সামরিক হুমকি মোকাবিলায় সহায়তা করে না।
২. মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বনাম সামরিক আবশ্যকতা ইসলামী ইতিহাসবিদরা নিজেরাই স্বীকার করেছেন যে, বাগান পোড়ানো হয়েছিল বনু নাজীরদের মনে ভীতি সঞ্চার করার জন্য এবং তাদের ‘লাঞ্ছিত’ করার জন্য। [11]। আধুনিক আইনে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বেসামরিক সম্পদ ধ্বংস করাকে ‘সামরিক আবশ্যকতা’ হিসেবে গণ্য করা হয় না।
৩. সামষ্টিক শাস্তি (Collective Punishment) জেনেভা কনভেনশনের ৩৩-নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো অপরাধের জন্য পুরো গোত্র বা গোষ্ঠীকে শাস্তি দেওয়া (Collective Punishment) নিষিদ্ধ। বনু নাজীরের কয়েকজন নেতার কথিত ষড়যন্ত্রের অজুহাতে পুরো গোত্রের দীর্ঘমেয়াদী খাদ্য ও আয়ের উৎস ধ্বংস করে দেওয়া একটি সামষ্টিক শাস্তিমূলক পদক্ষেপ, যা একটি পরিষ্কার যুদ্ধাপরাধ। [12]
৪. বেসামরিকদের জীবনযাত্রা ব্যাহত করা খেজুর গাছ মরুভূমির মানুষের জন্য কেবল সম্পদ নয়, বরং জীবনধারণের প্রধান অবলম্বন। এই সম্পদ ধ্বংস করা মানে হলো পরোক্ষভাবে একটি জনগোষ্ঠীকে দুর্ভিক্ষের মুখে ঠেলে দেওয়া। ১৯৭৭ সালের জেনেভা কনভেনশনের অতিরিক্ত প্রটোকল-১ এর ৫৪-নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বেসামরিক জনগণের বেঁচে থাকার জন্য অত্যাবশ্যকীয় বস্তু (যেমন খাদ্যশস্য বা কৃষি এলাকা) ধ্বংস করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। [13]

পরিশেষে, বনু নাজীরের ঘটনায় গাছ কাটা বা বাগান জ্বালিয়ে দেওয়া কোনো সরাসরি যুদ্ধের অনিবার্য বাস্তবতা ছিল না। এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক ধ্বংসযজ্ঞ। আজকের দিনের বিচারব্যবস্থায় এ ধরণের কর্মকাণ্ডকে ‘অপ্রয়োজনীয় ধ্বংসলীলা’ (Wanton Destruction) হিসেবে অভিহিত করা হয় এবং এর নির্দেশদাতাকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়।ধ।


পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নের দৃষ্টিকোণ

আধুনিক বিশ্বে পরিবেশ সংরক্ষণ কেবল একটি শখ নয়, বরং এটি মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার এক অনিবার্য সংগ্রাম। বনু নাজীর গোত্রের সুফলা খেজুর বাগান পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাটি কেবল একটি সামরিক বা অর্থনৈতিক অপরাধ ছিল না, বরং এটি ছিল একটি অঞ্চলের পরিবেশগত বিপর্যয় (Ecological Disaster) বা আধুনিক পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘ইকোসাইড’ (Ecocide)। মরুভূমির চরম আবহাওয়ায় একটি সবুজ বাগান গড়ে তোলা এবং তা টিকিয়ে রাখা বছরের পর বছর নিরবচ্ছিন্ন শ্রম ও সাধনার ফসল।

৫. মরুভূমির ইকোসিস্টেমে বৃক্ষের গুরুত্ব আরব উপদ্বীপের মতো শুষ্ক এলাকায় খেজুর গাছ কেবল একটি ফলদ গাছ নয়, এটি সেই অঞ্চলের বাস্তুসংস্থানের মূল ভিত্তি বা ‘লাইফলাইন’। এই গাছগুলো মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখে, মরুকরণ রোধ করে এবং অসংখ্য পশুপাখির আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। মুহাম্মদের নির্দেশে এই বাগান জ্বালিয়ে দেওয়া মানে ছিল সেই অঞ্চলের ক্ষুদ্র ইকোসিস্টেমটিকে চিরতরে ধ্বংস করে দেওয়া। [14]
৬. পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy) যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য প্রকৃতিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা বা শত্রুর প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করাকে ‘পোড়ামাটি নীতি’ বলা হয়। যদিও প্রাচীনকালে অনেক নিষ্ঠুর শাসক এটি করতেন, কিন্তু আধুনিক আন্তর্জাতিক পরিবেশ আইন এবং জেনেভা কনভেনশনের ১৯৭৭ সালের অতিরিক্ত প্রটোকল-১ অনুযায়ী, প্রাকৃতিক পরিবেশের ব্যাপক, দীর্ঘমেয়াদী এবং মারাত্মক ক্ষতি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। [15]
৭. নৈতিকতার দ্বান্দ্বিকতা ইসলামি ধর্মতত্ত্বে মুহাম্মদকে ‘আখলাকুল কারিমা’ বা সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী এবং সৃষ্টির প্রতি দয়াবান হিসেবে চিত্রিত করা হয়। কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে একটি অঞ্চলের কয়েক প্রজন্মের সম্পদ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া কোনোভাবেই মানবিক বা পরিবেশবান্ধব চরিত্রের পরিচায়ক হতে পারে না। যদি তিনি সর্বকালের সেরা আদর্শ হতেন, তবে পরিবেশ রক্ষার আধুনিক সচেতনতা তাঁর আচরণে অনেক আগেই প্রতিফলিত হওয়ার কথা ছিল। [16]
৮. টেকসই উন্নয়নের পথে বাধা জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অনুযায়ী, স্থলজ বাস্তুসংস্থান রক্ষা করা প্রতিটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ১৪০০ বছর আগে মুহাম্মদের এই কর্মকাণ্ড ছিল সেই উন্নয়নের ঠিক বিপরীত মেরুর একটি ধ্বংসাত্মক কাজ। এটি কেবল তৎকালীন মানুষের জীবিকা ধ্বংস করেনি, বরং মাটির উর্বরতা নষ্ট করে সেই স্থানটিকে বসবাসের অনুপযোগী করে তুলেছিল। [11]

পরিশেষে বলা যায়, বনু নাজীরদের অপরাধ (যদি তা প্রমাণিতও হতো) কেবল নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির ওপর সীমাবদ্ধ থাকা উচিত ছিল। কিন্তু তার বদলে একটি অঞ্চলের দীর্ঘজীবী বৃক্ষরাজি পুড়িয়ে ফেলা ছিল প্রকৃতির বিরুদ্ধে এক চরম অপরাধ। আধুনিক পরিবেশবাদী দর্শনের আলোকে এই কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই ‘যুদ্ধকৌশল’ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়, বরং এটি ছিল একটি অপরিবর্তনীয় পরিবেশগত সহিংসতা।


দ্বিমুখী নীতি: যুদ্ধকৌশল না নির্মমতা?

ইসলামী ঐতিহাসিক ও রক্ষণশীল চিন্তাবিদগণ বনু নাজীর গোত্রের খেজুর বাগান ধ্বংসের ঘটনাকে প্রায়ই একটি ‘অনিবার্য যুদ্ধকৌশল’ হিসেবে জায়েজ করার চেষ্টা করেন। তাদের মতে, এটি ছিল শত্রুকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করার একটি মনস্তাত্ত্বিক চাল। তবে এই ব্যাখ্যার গভীরে প্রবেশ করলে এক চরম নৈতিক দ্বিচারিতা (Moral Double Standard) বা দ্বিমুখী নীতির দেখা মেলে, যা কোনো নিরপেক্ষ ও যুক্তিবাদী মন গ্রহণ করতে পারে না।

এই দ্বিমুখী নীতিটি আমরা নিচের কয়েকটি পয়েন্টে বিশ্লেষণ করতে পারি:

৯. আদর্শ বনাম বাস্তবতা ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর যখন সিরিয়ায় সৈন্য পাঠিয়েছিলেন, তখন তিনি দশটি কঠোর নির্দেশ দিয়েছিলেন, যার মধ্যে অন্যতম ছিল—’কোনো ফলবান বৃক্ষ কাটা যাবে না এবং শস্য পোড়ানো যাবে না।’ [17]। প্রশ্ন ওঠে, খলিফা আবু বকর যে কাজটিকে যুদ্ধনীতি বিরোধী মনে করেছিলেন, স্বয়ং ইসলামের নবী কেন সেই একই কাজ বনু নাজীরের ক্ষেত্রে করেছিলেন? যদি গাছ কাটা অন্যায় হয়, তবে তা সবার জন্যই অন্যায় হওয়ার কথা। কিন্তু এখানে দেখা যায়, যখন নবী নিজে গাছ কাটেন, তখন তা ‘আল্লাহর নির্দেশ’ হিসেবে বৈধতা পায়, অথচ অন্য কেউ করলে তা ‘ফাসাদ’ বা বিশৃঙ্খলা হিসেবে গণ্য হয়। [11]
১০. শত্রুর ক্ষেত্রে ভিন্ন মানদণ্ড ভেবে দেখুন, যদি আরবের অন্য কোনো পৌত্তলিক বা ইহুদি গোত্র মদিনার মুসলমানদের খেজুর বাগান পুড়িয়ে দিত এবং মুসলিমদের খাদ্য সংকটে ফেলে মানসিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা করত, তবে কি ইসলামী ইতিহাস তাকে ‘চমৎকার যুদ্ধকৌশল’ হিসেবে স্বীকৃতি দিত? অবশ্যই না। বরং সেক্ষেত্রে একে ‘কাপুরুষোচিত আক্রমণ’, ‘অমানবিক জুলুম’ এবং ‘পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি’ (ফাসাদ ফিল আরদ) হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। একই কাজ যখন মুহাম্মদ করেন, তখন তা ‘কৌশল’ আর অন্যরা করলে তা ‘নির্মমতা’—এই ধরণের চিন্তাধারাকে আধুনিক দর্শনে ‘স্পেশাল প্লিডিং’ (Special Pleading) বা বিশেষ ওজরখাহি বলা হয়।
১১. ঐশ্বরিক বৈধতার ঢাল বনু নাজীরের বাগান কাটার ফলে যখন খোদ মুসলমানদের মধ্যেই নৈতিক সংশয় তৈরি হয়েছিল এবং ইহুদিরা মুহাম্মদের ‘শান্তি ও সংস্কারের’ দাবির বিপরীতে এই ধ্বংসযজ্ঞ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল, তখনই সূরা হাশরের ৫ নং আয়াতটি নাজিল হয়। [4]। এটি একটি লক্ষ্যণীয় প্যাটার্ন—যখনই কোনো বিতর্কিত বা নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ কাজ সংঘটিত হয়েছে, তখনই ‘ওহী’র মাধ্যমে তাকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। এটি নৈতিকতাকে কোনো চিরন্তন বা ধ্রুব সত্যের ওপর না রেখে বরং ব্যক্তির প্রয়োজনে পরিবর্তনশীল একটি হাতিয়ারে পরিণত করে।
১২. মানবিক মূল্যবোধের অবমাননা যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের সামরিক শক্তিকে মোকাবিলা করা আর নিরপরাধ সাধারণ মানুষের জীবিকার মূলে কুঠারাঘাত করা এক বিষয় নয়। আধুনিক নীতিশাস্ত্র অনুযায়ী, যুদ্ধের একটি সীমা থাকা উচিত (Just War Theory)। কিন্তু বনু নাজীরের ঘটনায় দেখা যায়, বিজয়ী হওয়ার জন্য বা ক্ষমতা সংহত করার জন্য প্রকৃতি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি করাকে কোনো অপরাধই মনে করা হয়নি। এই মানসিকতাটি ‘সবার জন্য এক নিয়ম’—এই বৈশ্বিক নৈতিকতাকে লঙ্ঘন করে।

পরিশেষে, এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে ধর্মের দোহাই দিয়ে যেকোনো অনৈতিক কাজকে ‘পবিত্র’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার একটি প্রবণতা শুরু থেকেই ছিল। যাকে ‘যুদ্ধকৌশল’ বলে মহিমান্বিত করা হচ্ছে, তা আসলে ছিল এক চরম সাম্প্রদায়িক নির্মমতা এবং ক্ষমতার দাপট। যখন আদর্শ কেবল নিজের সুবিধার্থে নিয়ম পরিবর্তন করে, তখন তাকে আর নৈতিক আদর্শ বলা চলে না, বরং তা এক প্রকার ‘মোরল ইনকন্সিসটেন্সি’ (Moral Inconsistency) বা নৈতিক বেইমানি হিসেবেই প্রতিভাত হয়।


উপসংহার

বনু নাজীর গোত্রের সুফলা খেজুর বাগান ধ্বংসের এই ঘটনা কেবল ইসলামের ইতিহাসের একটি বিচ্ছিন্ন পাতা নয়, বরং এটি একটি গভীর নৈতিক ও মানবিক সংকটের প্রতীক। একদিকে রয়েছে ‘ঐশ্বরিক নির্দেশের’ দোহাই দিয়ে অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ধ্বংসযজ্ঞের ধর্মীয় বৈধতা, আর অন্যদিকে রয়েছে আধুনিক পৃথিবীর সর্বজনীন মানবিক মূল্যবোধ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন। এই দুইয়ের মধ্যকার সংঘাত আজ অত্যন্ত প্রকট।

আন্তর্জাতিক আইন, আধুনিক যুদ্ধনীতি এবং পরিবেশ সংরক্ষণের বৈশ্বিক মানদণ্ডের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মুহাম্মদের এই কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই একটি ‘গৌরবময় কৌশল’ হিসেবে ধোপে টেকে না। বরং এটি ছিল একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত সুপরিকল্পিত সামষ্টিক শাস্তি (Collective Punishment), যা বর্তমান সময়ের বিচারে একটি গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ইকোসাইড (Ecocide) হিসেবে বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে। [12] [15]

ধর্মীয় আবেগ বা অন্ধ আনুগত্যের চশমা সরিয়ে যখন আমরা যুক্তির কষ্টিপাথরে ইতিহাসকে যাচাই করি, তখন এই রূঢ় সত্যটিই সামনে আসে যে—ধর্মের দোহাই দিয়ে জনপদ ও সম্পদ ধ্বংস করা আসলে কোনো আদর্শিক বা নৈতিক বিজয় নয়, বরং তা মানবিক বিবেকের পরাজয়। যে আদর্শ নিজেকে ‘শান্তি’ ও ‘সর্বোত্তম নৈতিকতার’ ধারক হিসেবে দাবি করে, তার ভিত্তি যদি হয় অন্যের জীবিকার উৎস পুড়িয়ে দেওয়া, তবে সেই দাবির অসারতা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। [4] [18]

ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং যুক্তির আলোয় বিশ্লেষণ করা আমাদের বর্তমান সময়ের এক অপরিহার্য দায়িত্ব। কারণ, অতীতের অন্ধকার ও নিষ্ঠুরতাকে যদি আমরা ‘পবিত্র’ বলে স্বীকার করে নিই, তবে ভবিষ্যৎ পৃথিবী কখনোই অন্ধকারের এই বৃত্ত থেকে বের হতে পারবে না। যুক্তিবাদ ও মানবতার জয়গান গাওয়ার মাধ্যমেই আমরা একটি ন্যায়ভিত্তিক ও বিবেকসম্পন্ন সমাজ গড়ে তুলতে পারি, যেখানে কোনো ঐশ্বরিক দোহাই দিয়ে অন্যের মৌলিক অধিকার হরণ করা সম্ভব হবে না।


তথ্যসূত্রঃ
  1. জেনেভা কনভেনশন ৪, অনুচ্ছেদ ৫৩ ↩︎
  2. প্রটোকল ১, জেনেভা কনভেনশন, অনুচ্ছেদ ৫৪ ↩︎
  3. জেনেভা কনভেনশন ৪, অনুচ্ছেদ ৩৩ ↩︎
  4. কোরআন ৫৯:৫ 1 2 3
  5. তাফসীরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ২৭ ↩︎
  6. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২১৭৫ ↩︎
  7. সহীহ মুসলিম, হাদিস একাডেমী, হাদিসঃ ৪৪৪৪ ↩︎
  8. সহীহ মুসলিম, হাদিস একাডেমী, হাদিসঃ ৪৪৪৫ ↩︎
  9. আল হিদায়া, শায়খুল ইসলাম বুরহানুদ্দীন আলী ইব্‌ন আবূ বকর আল-ফারগানী আল-মারগীনানী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৩২ ↩︎
  10. Geneva Convention IV, Article 53 ↩︎
  11. তফসির ইবনে কাসীর, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ২৭ 1 2 3
  12. Geneva Convention IV, Article 33 1 2
  13. Protocol I Additional to the Geneva Conventions, Article 54 ↩︎
  14. জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP), পরিবেশ ও যুদ্ধ সংঘাত নীতিমালা ↩︎
  15. Protocol I Additional to the Geneva Conventions, Article 35(3) 1 2
  16. সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৪৪৪৪ ↩︎
  17. মুওয়াত্তা ইমাম মালিক, হাদিস নং ৯৬৫ ↩︎
  18. সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৪৪৪৫ ↩︎