উঁকি দিলে পাথর বা চাকু ছুড়ে চোখ নষ্ট করা

ভূমিকাঃ নৈতিকতা ও শাস্তির সামঞ্জস্য

মানব সভ্যতার ইতিহাসে নৈতিকতা, মানবাধিকার ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সর্বদাই এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত। কোনো ব্যক্তির ঘরের ভিতরে অনুমতি ছাড়া উঁকি দেওয়া বা গোপনে ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করা নিঃসন্দেহে অনৈতিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই অনৈতিক কাজের শাস্তি কী হওয়া উচিত? একটি প্রাপ্তবয়স্ক ও বোধসম্পন্ন সমাজে অপরাধ ও শাস্তির মধ্যে একটি সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। উঁকি দেওয়া নৈতিকভাবে অন্যায় হতে পারে, কিন্তু সেই অপরাধের শাস্তিস্বরূপ কারও চোখ উপড়ে ফেলা কোনোভাবেই সুবিচার হতে পারে না। এমন প্রতিক্রিয়া মূল অপরাধের চেয়ে বহুগুণ নির্মল ও অমানবিক। আধুনিক আইন কিংবা সভ্য সমাজের নীতিতে এই ধরনের অপরাধের শাস্তি সাধারণত আইনি সতর্কতা, জরিমানা বা বড়জোর সামান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হয়ে থাকে, যাতে অপরাধীর শিক্ষাও হয় আবার তার মানবাধিকারও অক্ষুণ্ণ থাকে।


ইসলামের বিধানঃ চক্ষু ফুটা করে দেয়া

কারো ঘরে উঁকি দেওয়া অবশ্যই অনৈতিক, কিন্তু চোখ উপড়ে ফেলা তার সমান নয়। কোনো সমাজ বা ধর্ম যদি এমন সামান্য অপরাধের জন্য অঙ্গহানি বা শারীরিক হিংসার অনুমোদন দেয়, তাহলে সেই সমাজ মানবিকতার নয়, বর্বরতার ধারক। আসুন হাদিসগুলো দেখি [1]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৮৭/ রক্তপণ
পরিচ্ছেদঃ ৮৭/১৫. হাকিমের কাছে মামলা পেশ করা ছাড়া আপন অধিকার আদায় করে নেয়া বা কিসাস গ্রহণ করা।
৬৮৮৮. উক্ত হাদীসের সূত্রে এও বর্ণিত, তিনি বলেছেনঃ যদি কেউ তোমার ঘরে তোমার অনুমতি ব্যতীত উঁকি মারে আর তুমি পাথর মেরে তার চক্ষু ফুটা করে দাও, তাতে তোমার কোন গুনাহ্ হবে না। [৬৭০২; মুসলিম ৩৮/৯, হাঃ ২১৫৮, আহমাদ ১৯৫৩০] (আধুনিক প্রকাশনী- ৬৪০৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৪২২)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৮৭/ রক্তপণ
পরিচ্ছেদঃ ৮৭/১৫. হাকিমের কাছে মামলা পেশ করা ছাড়া আপন অধিকার আদায় করে নেয়া বা কিসাস গ্রহণ করা।
৬৮৮৯. হুমায়দ (রহ.) হতে বর্ণিত যে, এক লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘরে উঁকি মারল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে চাকু নিক্ষেপ করতে উদ্যত হলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, (এ হাদীস) আপনাকে কে বর্ণনা করেছেন? তিনি বললেন, আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)। [৬২৪২] (আধুনিক প্রকাশনী- ৬৪০৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৪২২)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ হুমায়দ (রহঃ)

চাকু

আধুনিক আইন বনাম “Disproportionate Retaliation”

আধুনিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, অপরাধের তুলনায় শাস্তির অতিশয় আধিক্যকে বলা হয় “disproportionate retaliation”। বর্তমান বিশ্বে, বিশেষত মানবিক ও গণতান্ত্রিক সমাজগুলোতে যদি কেউ উঁকি দেয় বা গোপনে কারও বাসায় নজরদারি করে, তবে তা “invasion of privacy” বা “trespassing” হিসেবে বিবেচিত হয়। এতে সাধারণত আইনি হুঁশিয়ারি, জরিমানা বা সর্বোচ্চ কিছুদিনের জেল হওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু ইসলামের নবী মুহাম্মদের প্রদত্ত নির্দেশনায় এই অপরাধের প্রতিক্রিয়ায় এমন শাস্তি অনুমোদিত হয়েছে, যা একবিংশ শতাব্দীর মানবিক মানদণ্ডে চূড়ান্তভাবে নৃশংস ও অমানবিক। ইসলামের বিধান হচ্ছে, কোনো ব্যক্তি ঘরে উঁকি দিলে তার চোখ পাথর মেরে ফুটো করে দিলে তাতে কোনো গুনাহ হবে না। একজন ব্যক্তি কেবল উঁকি দেওয়ার কারণে তার চোখ নষ্ট করে দেওয়া সরাসরি মানবাধিকারের লঙ্ঘন এবং নাগরিক সুরক্ষার পরিপন্থী।


আত্মরক্ষা নাকি প্রতিশোধমূলক সহিংসতা?

হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, মুহাম্মদ নিজেই একবার একজন উঁকিদাতার চোখে ছুরি বা চাকুর মতো তীক্ষ্ণ বস্তু নিক্ষেপ করতে উদ্যত হয়েছিলেন। এখানে প্রশ্ন জাগে—এটি কি ছিল আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ, নাকি ব্যক্তিগত প্রতিশোধ? ঘটনার প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এতে কোনো জরুরি আত্মরক্ষার প্রয়োজন ছিল না। উঁকিদাতা ব্যক্তিটি সশস্ত্র ছিলেন না বা তিনি কোনো তাৎক্ষণিক শারীরিক হুমকিও তৈরি করেননি; তিনি কেবল গোপনে উঁকি দিচ্ছিলেন। ফলে নবীর এই আচরণকে প্রতিরক্ষা নয়, বরং একটি সুনির্দিষ্ট প্রতিশোধমূলক সহিংসতা হিসেবেই চিহ্নিত করা যায়।


রাষ্ট্রীয় আইন বনাম ‘ভিজিল্যান্টি জাস্টিস’ ও মব কালচার

ইসলামী শরীয়তভিত্তিক এই হাদিসগুলোর মাধ্যমে ব্যক্তিগত প্রতিশোধ গ্রহণকে এমনভাবে বৈধতা দেওয়া হয়েছে, যা রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনি কাঠামো এবং বিচারব্যবস্থাকে সরাসরি অস্বীকার করে। এমনকি ‘বিচারকের কাছে মামলা পেশ না করে বা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের তোয়াক্কা না করে নিজের হাতে প্রতিশোধ নেওয়া’ বা কিসাস গ্রহণকেও এখানে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। এটি একটি চরম রাষ্ট্রবিরোধী ও নৈরাজ্যবাদী দর্শনের নামান্তর, যা আধুনিক আইনের শাসনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

এই ধরনের বিধান যখন সমাজে ধর্মের নামে প্রচার করা হয়, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ভয়াবহ হিংস্রতা ও অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি পায়। অপরাধী বা চোর ধরা পড়লে তাকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করার প্রয়োজনীয়তা কেউ অনুভব করে না; বরং ধর্মপ্রদত্ত ‘অধিকার’ মনে করে জনতা নিজেরাই তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলতে কুণ্ঠাবোধ করে না। এর ফলে সমাজে এক আদিম ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনির সংস্কৃতির সূচনা ঘটে। রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বদলে মানুষ যখন নিজেই বিচারক এবং নিজেই জল্লাদ হয়ে ওঠে, তখন দেশে এক অস্থির পরিবেশ তৈরি হয়। সাধারণ মানুষ তখন গঠনমূলক কাজের চেয়ে সারাক্ষণ কে কোন অপরাধ করল, কাকে শাস্তি দিতে হবে—এমন উগ্র ‘সোশ্যাল জাস্টিস’ বা সামাজিক বিচার নিয়ে উন্মত্ত হয়ে থাকে। এই প্রবণতা একটি সভ্য সমাজকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয় এবং নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা বিলীন করে দেয়।


ধর্মীয় উগ্রতা ও মানবাধিকারের অসম্মান

এই হাদিসগুলোর সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো—এগুলো ‘সহীহ’ বা বিশুদ্ধ হাদিস হিসেবে স্বীকৃত। এর ফলে এগুলো ইসলামী শরিয়ত বা আইনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য হয় এবং বহু মুসলিম এগুলোকে আক্ষরিক অর্থেই অনুশীলনের জন্য গ্রহণ করে থাকে। এ ধরণের হাদিস সরাসরি ধর্মীয় উগ্রতার পৃষ্ঠপোষকতা করে। একজন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি মনে করতে পারেন যে, শরীয়ত তাকে অনুমতি দিয়েছে একজন অপরাধীর চোখ উপড়ে শাস্তি দিতে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং ধর্মীয় অনুশাসনের নামে সহিংসতাকে বৈধ করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক হাতিয়ার। এসব বাণী ব্যক্তি স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের প্রতি চরম অসম্মান প্রদর্শন করে এবং সমাজে সহিংসতা উসকে দেয়।


উপসংহারঃ মানবিকতা বনাম বর্বরতা

উঁকি দেওয়া অনৈতিক হতে পারে, কিন্তু চোখ উপড়ে ফেলা তার শাস্তি হতে পারে না। কোনো সমাজ বা ধর্ম যদি সামান্য অপরাধের জন্য অঙ্গহানি বা শারীরিক সহিংসতার অনুমোদন দেয়, তবে সেই সমাজ মানবিকতার নয়, বরং বর্বরতার ধারক হিসেবে পরিচিতি পায়। সভ্যতার মানদণ্ড তখনই উন্নত হয় যখন আইন প্রতিশোধের পরিবর্তে ন্যায়বিচার এবং মানবাধিকারের দিকে মনোযোগী হয়। অঙ্গহানির মতো নৃশংস বিধানগুলো আধুনিক পৃথিবীর জন্য কেবল অনুপযুক্তই নয়, বরং এগুলো মানবিক চেতনার মূলে আঘাত হানে।

আসুন একটি প্রাসঙ্গিক ভিডিও দেখি,



তথ্যসূত্রঃ
  1. সহীহুল বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৯ ↩︎