নবীদের শরীর মাটিতে পচবে না

ভূমিকা

ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রেরিত নবী ও রাসূলদের সংখ্যা আনুমানিক এক লক্ষ চব্বিশ হাজার, আর কিছু বর্ণনা অনুসারে দুই লক্ষ চব্বিশ হাজার পর্যন্ত বলা হয়। এই বিশ্বাসের সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা যুক্ত রয়েছে — নবীদের মৃতদেহ কখনও ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না; অর্থাৎ, মৃত্যুর পরও তাদের শরীর অক্ষত অবস্থায় থাকে। হাদীস সমূহেও এ ধারণার উল্লেখ রয়েছে যে, “আল্লাহ নবীদের দেহকে পৃথিবীর জন্য হারাম করেছেন,” অর্থাৎ মাটি তাদের দেহকে পচাতে পারে না।


হাদিস ও আলেমগণের বক্তব্য

আসুন আলেমদের বক্তব্য শুনি, এবং এরপরে হাদিসগুলো পড়ি,

সুনানে ইবনে মাজাহ
অধ্যায়ঃ ৬/ জানাযা
পাবলিশারঃ তাওহীদ পাবলিকেশন
পরিচ্ছদঃ ৬/৬৫. নাবী ﷺ -এর ইনতিকাল ও তাঁর কাফন-দাফন।
১০/১৬৩৬। আওস ইবনু আওস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে জুমু‘আহর দিন সর্বোত্তম। এদিনই আদম (আঃ)–কে সৃষ্টি করা হয়েছে, এদিনই শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে এবং এদিনই ক্বিয়ামাত সংঘটিত হবে। অতএব তোমরা এদিন আমার প্রতি অধিক সংখ্যায় দুরূদ ও সালাম পেশ করো। কেননা তোমাদের দুরূদ আমার সামনে পেশ করা হয়। এক ব্যক্তি বললো, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের দুরূদ আপনার নিকট কিভাবে পেশ করা হবে, অথচ আপনি তো মাটির সাথে মিশে যাবেন? তিনি বলেনঃ আল্লাহ্ তা‘আলা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামগণের দেহ ভক্ষণ যমীনের জন্য হারাম করে দিয়েছেন।
নাসায়ী ১৩৭৪, আবূ দাউদ ১০৪৭, ১৫৩১, আহমাদ ১৫৭২৯, দারেমী ১৫৭২ তাহকীক আলবানীঃ সহীহ্।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সূনান আবু দাউদ (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ২/ সালাত (নামায)
পাবলিশারঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
পরিচ্ছদঃ ৩৬৭. ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা সম্পর্কে।
১৫৩১. আল্‌-হাসান ইব্‌ন আলী (রহঃ) ………. আওস ইব্‌ন আওস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ তোমাদের জন্য উৎকৃষ্ট দিন হলো জুমআর দিন। তোমরা ঐ দিনে আমার উপর অধিক দরূদ পাঠ করবে। কেওননা তোমাদের দরূদ আমার নিকট পেশ করা হয়ে থাকে। রাবী বলেন, সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনার দেহ মোবারক চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে মাটির সাথে মিশে যাবে, তখন কিরূপে তা আপনার সামনে পেশ করা হবে? জবাবে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আল্লাহ তাআলা যমীনের জন্য নবীদের শরীরকে হারাম করে দিয়েছেন – – (নাসাঈ, ইব্‌ন মাজা)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সূনান নাসাঈ (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ১৪/ জুমু’আ
পাবলিশারঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
পরিচ্ছদঃ ৫/ জুমু’আর দিন নবী (ﷺ) এর উপর অধিক দুরুদ পড়া
১৩৭৭। ইসহাক ইবনু মানসূর (রহঃ) … আওস ইবনু আওস (রাঃ) সুত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, তোমাদের সকল দিনের মধ্যে পরমোৎকৃষ্ট দিন হল জুমু’আর দিন, সে দিন আদম (আলাইহিস সালাম) কে সৃষ্টি করা হয়েছিল, সে দিনই তাঁর ওফাত হয়, সে দিনই দ্বিতীয় বার শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া হবে এবং সে দিনই কিয়ামত অনুষ্ঠিত হবে। অতএব, তোমরা আমার উপর বেশি বেশি দরুদ পড়। কেননা, তোমাদের দরুদ আমার কাছে পেশ করা হয়। তারা বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! কিভাবে আমাদের দরুদ আপনার কাছে পেশ করা হবে। যেহেতু আপনি (এক সময়) ওফাত পেয়ে যাবেন অর্থাৎ তারা বললেন, আপনার দেহ মাটির সাথে মিশে যাবে। তিনি বললেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা যমীনের জন্য নাবীগণের দেহ গ্রাস করা হারাম করে দিয়েছেন।
(সহীহ। ইবন মাজাহ হাঃ ১০৮৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)


কিন্তু এই দাবিটি যদি বাস্তবিক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা হয়, তবে এর কোনও প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায় না। পৃথিবীতে গত কয়েক শতাব্দী ধরে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা বিভিন্ন যুগের ফসিল, জীবাশ্ম ও মমি আবিষ্কার করেছেন—ডাইনোসর থেকে শুরু করে প্রাচীন মানুষের অবশেষ পর্যন্ত—যেগুলো কয়েক মিলিয়ন বছর পুরনো। অথচ এমন বিপুল পরিমাণ অনুসন্ধানের পরও এখন পর্যন্ত কোনও নবীর অক্ষত মৃতদেহ আবিষ্কৃত হয়নি।

যদি নবীদের দেহ সত্যিই পচে না থাকে, তাহলে যুক্তিগতভাবে ধরে নেওয়া যায় যে, মাটির নিচে কোথাও না কোথাও সেই অক্ষত দেহগুলো থাকা উচিত ছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের অগ্রগতি, ভূতাত্ত্বিক স্ক্যানিং প্রযুক্তি এবং বায়োকেমিক্যাল বিশ্লেষণ এতটা উন্নত যে, এমন কোনও অস্বাভাবিক দেহাবশেষ পাওয়া গেলে তা সহজেই সনাক্ত করা সম্ভব হতো। কিন্তু ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব কিংবা জীববিজ্ঞানের কোনও শাখাতেই এ সংক্রান্ত কোনও প্রমাণ বা পর্যবেক্ষণ নেই।

আরও একটি যৌক্তিক প্রশ্ন এখানে উঠে আসে — ইসলামকে যদি ঐশী সত্য প্রমাণের উদ্দেশ্যে উপস্থাপন করা হয়, তবে কেন মুসলমান সমাজের মধ্যে কখনও নবী মুহাম্মদের কবর খনন করে তার কথিত অক্ষত দেহ প্রদর্শনের চেষ্টা করা হয়নি? এমন উদ্যোগ, যদি কখনও নেয়া হতো, তা হলে তা ধর্মীয় দাবির একটি বাস্তব প্রমাণ হিসেবে দাঁড়াতে পারত। কিন্তু এই প্রশ্ন উত্থাপন করলেই মুসলিম সমাজে তা ধর্মনিন্দা হিসেবে গণ্য হয়, যার ফলে এর বৈজ্ঞানিক যাচাইয়ের সুযোগই অবরুদ্ধ থাকে।

বৈজ্ঞানিকভাবে মানুষের শরীরের ক্ষয় একটি স্বাভাবিক জৈবপ্রক্রিয়া, যেখানে ব্যাকটেরিয়া, ফাঙ্গাস ও এনজাইমের ক্রিয়ায় জৈব পদার্থ ভেঙে যায়। শরীর সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ যেমন শুষ্কতা, নিম্ন তাপমাত্রা, অক্সিজেনের অভাব, কিংবা রাসায়নিক প্রক্রিয়া—এগুলো ব্যতীত কোনও মৃতদেহের প্রাকৃতিকভাবে অক্ষত থাকা সম্ভব নয়। মিসরের মমিগুলোও সংরক্ষিত থাকে বিশেষ রাসায়নিক প্রক্রিয়া ও পরিবেশগত কারণে, ঈশ্বরীয় শক্তির কারণে নয়। তাই বৈজ্ঞানিকভাবে নবীদের দেহ পচে না—এ দাবি প্রমাণিত নয়, বরং প্রাকৃতিক নিয়মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

অতএব, “নবীদের শরীর মাটিতে পচে না” — এই বিশ্বাসকে একটি ধর্মীয় প্রতীক বা আধ্যাত্মিক রূপক হিসেবে দেখা যেতে পারে, কিন্তু সেটি বাস্তব পদার্থবিজ্ঞানের বা জীববিজ্ঞানের নিয়মে টিকে থাকে না। যুক্তি ও প্রমাণের বিচারে এই দাবিটি পরীক্ষাযোগ্য নয়, পর্যবেক্ষণযোগ্যও নয় — ফলে এটি বিশ্বাসের অন্ধকার জগতে সীমাবদ্ধ একটি ধারণা, বিজ্ঞানের নয়।


রূপকের মানসিক কসরত ও এড হক ফ্যালাসি

যখন কোনো ধর্মীয় দাবি, ভবিষ্যদ্বাণী বা বক্তব্য তার স্বাভাবিক অর্থে (plain reading) বাস্তবতার সাথে মেলে না, তখন প্রায়শই “এটা আসলে রূপক”, “এলেগরি”, “ভিন্ন স্তরের অর্থ”, “ছোট সংস্করণ”, “ব্যক্তিগত প্রেক্ষিতভিত্তিক” বা “আধ্যাত্মিক অর্থে”—এই জাতীয় ব্যাখ্যা এনে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়। এই ব্যাখ্যাগুলো সাধারণত শুরুতে বলা হয় না; বরং ফলাফল জানার পরে ব্যর্থতার চাপ তৈরি হওয়ার পরে যোগ করা হয়। ফলে মূল বক্তব্যের স্পষ্ট অর্থ, সময়-সীমা এবং শর্তগুলোকে পাশ কাটিয়ে নতুন অর্থ বসানো হয়—যা যুক্তিগতভাবে এড হক ফ্যালাসি (ad hoc fallacy) বা “পরবর্তী রক্ষাকবচ ব্যাখ্যা” হিসেবে পরিচিত।

এড হক ফ্যালাসি কী? এটি ঘটে যখন কোনো দাবি দুর্বল বা ভুল প্রমাণিত হওয়ার মুখে পড়লে, তাকে রক্ষা করার জন্য নতুন শর্ত, নতুন অর্থ বা নতুন ব্যাখ্যা যোগ করা হয়—যেগুলো (১) মূল বক্তব্য থেকে স্বাভাবিকভাবে উদ্ভূত হয় না, (২) স্বাধীন প্রমাণে দাঁড়ায় না, এবং (৩) দাবিটিকে এমনভাবে অস্পষ্ট করে যে আর তা ফালসিফাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে দাবিটি আর পরীক্ষাযোগ্য থাকে না; এটি যেকোনো ফলাফলের সাথে “মিলিয়ে” নেওয়া যায়।

অনেকে “রূপক”কে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রহণযোগ্য মনে করেন, কারণ সাহিত্যে বা প্রাচীন গ্রন্থে রূপকের ব্যবহার আছে। কিন্তু যুক্তিতর্কে প্রশ্নটি ভিন্ন: এই রূপক-ব্যাখ্যা কি মূল বক্তব্যের ভাষা, কাঠামো, সময়-ইঙ্গিত এবং শ্রোতার স্বাভাবিক প্রত্যাশা থেকে যুক্তিযুক্তভাবে বের হয়? নাকি এটি কেবল ব্যর্থতা সামাল দিতে পরে যোগ করা হয়েছে? যদি দ্বিতীয়টি হয়, তাহলে “রূপক” আর সত্যিকারের ব্যাখ্যা নয়—এটি যুক্তিগত ফাঁকি হয়ে দাঁড়ায়।


এড হক উদ্ধার-ব্যাখ্যার সাধারণ কায়দা

  • অর্থ-স্থানান্তর (Meaning shift): মূল বক্তব্যে “X ঘটবে” বলা হয়েছে; না ঘটলে পরে বলা হয় “X মানে আসলে Y” বা “পূর্বের বক্তব্যে X বলতে আসলে Y বোঝানো হয়েছিল”। অথচ পূর্বে Y-এর কোনো ইঙ্গিত ছিল না।
  • গোলপোস্ট সরানো (Moving the goalposts): পরীক্ষার মানদণ্ড বদলে দেওয়া—যা আগে স্পষ্ট ও পরিমাপ্য ছিল, তাকে অস্পষ্ট করে ফেলা।
  • বিশেষ শর্ত যোগ করা (Auxiliary assumptions): “শুধু এই শর্তে”, “আসলে ওই প্রেক্ষিতে”, “কেবল বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য”—এই ধরনের নতুন শর্ত যোগ করা, যার স্বাধীন ভিত্তি নেই।
  • সিলেক্টিভ পাঠ (Selective reading): বক্তব্যের অসুবিধাজনক অংশ (যেমন সময়-সীমা) বাদ দিয়ে কেবল সুবিধাজনক অংশ নিয়ে ব্যাখ্যা দাঁড় করানো।
  • অব্যর্থতার পূর্বধারণা (Presumed infallibility): শুরুতেই ধরে নেওয়া যে বক্তব্য ভুল হতেই পারে না; তাই যেকোনো অমিলকে “বোঝা ভুল” বলে চালিয়ে দেওয়া।

বাস্তব উদাহরণসমূহ

উদাহরণ ১: বন্যার ভবিষ্যদ্বাণী
কেউ বললেন, “আগামী বছর পৃথিবীব্যাপী মহাপ্লাবন হবে।” বছর শেষে কোনো বিশ্বব্যাপী বন্যা হলো না—কেবল কয়েকটি অঞ্চলে স্বাভাবিক মৌসুমি বন্যা। তখন বলা হলো, “পৃথিবী বলতে আমি আসলে ওই অঞ্চলই বুঝিয়েছিলাম” বা “এটা আসলে রূপক—মানুষের পাপের বন্যা”
বিশ্লেষণ: মূল বক্তব্যে “পৃথিবীব্যাপী” স্পষ্ট ছিল; পরে অর্থ সংকুচিত বা রূপক করা হলো। এটি গোলপোস্ট সরানো এবং অর্থ-স্থানান্তর উভয়ই। যদি শুরুতেই রূপক বা সীমিত অর্থ উদ্দেশ্য হতো, তাহলে ভাষা সেভাবে নির্দিষ্ট হতো।

উদাহরণ ২: রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি
নির্বাচনের আগে একজন নেতা বললেন, “আমি ক্ষমতায় এলে বেকারত্ব শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনব।” ক্ষমতায় এসে বেকারত্ব কমল কিন্তু শূন্য হলো না। তখন বলা হলো, “আসলে আমি বুঝিয়েছিলাম যে বেকারত্ব অনেক কমবে” বা “এটা ছিল একটা রূপক—মানুষের মনের বেকারত্ব দূর করা”
বিশ্লেষণ: “শূন্যের কোঠায়” একটি পরিমাপ্য দাবি ছিল; পরে তাকে অস্পষ্ট করে ফেলা হলো। এটি ক্লাসিক গোলপোস্ট সরানো।

উদাহরণ ৩: বিনিয়োগের পরামর্শ
একজন বিশ্লেষক বললেন, “এই স্টকের দাম আগামী ছয় মাসে দ্বিগুণ হবে।” ছয় মাস পর দাম বাড়েনি। তখন বলা হলো, “আসলে ছয়মাস বলতে দীর্ঘ সময়কাল বুঝিয়েছিলাম” বা “দ্বিগুণ বলতে আমি মূল্যের বৃদ্ধি বুঝিয়েছিলাম”
বিশ্লেষণ: সময়-সীমা স্পষ্ট ছিল; পরে তা বাড়িয়ে দেওয়া হলো। এটি সিলেক্টিভ পাঠ এবং বিশেষ শর্ত যোগ করা।

উদাহরণ ৪: নস্ট্রাদামাস-স্টাইলের অস্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী
কেউ একটি অস্পষ্ট কবিতা লিখলেন যাতে “আগামী বছর আগুনের পাখি আকাশ থেকে নামবে”। পরে কোনো বড় ঘটনা (যেমন বিমান দুর্ঘটনা) ঘটলে বলা হয়, “দেখো, এটাই পূরণ হয়েছে”। আবার বিমান দুর্ঘটনা না হয়ে যদি কোথাও উল্কাপাত হয়, তখন বলা হবে, দেখো ভবিষ্যতবাণী মিলে গেছে।
বিশ্লেষণ: অস্পষ্টতা থেকেই এড হক ব্যাখ্যা সহজ হয়; যেকোনো ঘটনার সাথে মিলিয়ে নেওয়া যায়। এটি দাবিকে চিরকাল “সত্য” রাখে কিন্তু কোনো প্রকৃত ভবিষ্যদ্বাণী ক্ষমতা প্রমাণ করে না।


কেন এটি যুক্তিগতভাবে গুরুতর সমস্যা?

যেকোনো নির্ভরযোগ্য দাবি বা জ্ঞানের জন্য তিনটি জিনিস অপরিহার্য: (১) স্পষ্ট অর্থ, (২) স্পষ্ট পরীক্ষার মানদণ্ড (ফালসিফায়েবিলিটি), (৩) ব্যর্থতার সম্ভাবনা স্বীকার করা। এড হক ব্যাখ্যা এই তিনটিকেই ধ্বংস করে। ফলে দাবিটি আর “ভুল হতে পারে” এই ঝুঁকি নেয় না—এটি সবসময় “সত্য” থাকে, কিন্তু কোনো নতুন তথ্য দেয় না। এটি যুক্তির পরিবর্তে মানসিক সান্ত্বনা দেয়।

যদি কোনো দাবি সত্যিই শক্তিশালী প্রমাণ বা যুক্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে বারবার অর্থ পরিবর্তন বা উদ্ধার-ব্যাখ্যার প্রয়োজন কেন? এই প্রশ্নটিই এড হক ফ্যালাসির মূল দুর্বলতা প্রকাশ করে।


ডায়াগ্রাম: “না মেলা” থেকে “উদ্ধার-ব্যাখ্যা” — এড হক সাইকেল
ব্যবহারবিধি: এটি একটি সাধারণ বিশ্লেষণী ফ্রেমওয়ার্ক। যেকোনো দাবি/ভবিষ্যদ্বাণী বিশ্লেষণ করতে “মূল পাঠ”, “পর্যবেক্ষণ” এবং “পরবর্তী ব্যাখ্যা” আলাদা করে দেখুন।
মূল দাবি/পাঠ যাচাই/পর্যবেক্ষণ অমিল/চাপ উদ্ধার-ব্যাখ্যা (Ad Hoc) ফলাফল/নীতিগত শিফট
ধাপ ১ মূল দাবি/স্বাভাবিক পাঠ
বক্তব্যটি সাধারণ শ্রোতার কাছে যে অর্থ দেয়—বিশেষ করে সময়-ইঙ্গিত, শর্ত এবং প্রত্যাশিত ফলাফল।
চেকলিস্ট: অর্থ স্পষ্ট? সময়-সীমা আছে? শ্রোতা কী বুঝবে?
ধাপ ২ সময়/বাস্তবতার পরীক্ষা
বাস্তবে কী ঘটলো? মূল প্রত্যাশিত অর্থে দাবিটি পূরণ হলো কি না।
চেকলিস্ট: পূর্বানুমান কী? পর্যবেক্ষণ কী?
ধাপ ৩ অমিল/ব্যাখ্যাগত চাপ
না মিললে চাপ তৈরি হয়—“তাহলে দাবিটি কীভাবে সত্য থাকবে?”
পথ দুটি: (ক) দাবি সংশোধন/প্রত্যাখ্যান, (খ) নতুন ব্যাখ্যা যোগ।
ধাপ ৪ উদ্ধার-ব্যাখ্যা (Ad Hoc)
নতুন অর্থ/শর্ত যোগ: “রূপক”, “ভিন্ন স্তর”, “ছোট সংস্করণ” ইত্যাদি।
রেড ফ্ল্যাগ: ব্যাখ্যা কি আগে থেকে স্পষ্ট? স্বাধীন প্রমাণ আছে?
ধাপ ৫ ফলাফল: দাবি অধরা হয়
দাবি আর স্পষ্টভাবে ভুল প্রমাণিত হয় না; পরীক্ষাযোগ্যতা হারায়।
নীতিগত শিফট: “ভুল নয় → বোঝা ভুল → নতুন অর্থই সত্য”।

উপসংহার

“নবীদের দেহ মাটিতে পচে না”—এই দাবিটি হাদিস-ভিত্তিক ধর্মীয় বিশ্বাস হিসেবে প্রচলিত হলেও, বাস্তব জগতের যাচাইযোগ্য মানদণ্ডে এর পক্ষে কোনো নিরপেক্ষ প্রমাণ হাজির করা যায় না। ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বে হাজার হাজার বছরের মানুষের কঙ্কাল, সমাধিক্ষেত্র, মমি ও নানা জৈবাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে; আধুনিক ভূতাত্ত্বিক স্ক্যানিং, ডিএনএ/বায়োকেমিক্যাল বিশ্লেষণ এবং ফরেনসিক পদ্ধতিতে মৃতদেহের অবস্থা নির্ণয় করা সম্ভব—তবু “অক্ষত নবীদেহ” বলে নিশ্চিতভাবে শনাক্তযোগ্য কোনো নমুনা কোথাও নেই। দাবিটি যদি বাস্তব অর্থেই সত্য হতো, তাহলে বহু যুগের বিপুল সংখ্যক নবীর অন্তত কিছু দেহাবশেষ মানব অনুসন্ধানে পড়ার কথা ছিল; কিন্তু পর্যবেক্ষণ সে দিকে ইঙ্গিত করে না।

এইখানেই আলোচনার মূল টানাপোড়েন: একদিকে হাদিসে “যমীন নবীদের দেহ গ্রাস করতে পারে না”—এমন স্পষ্ট ভাষা, অন্যদিকে বাস্তব প্রমাণের শূন্যতা। এই ফাঁক ঢাকতে সাধারণত যে “রূপক” বা “আধ্যাত্মিক অর্থ” আনা হয়, তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শুরু থেকেই স্পষ্টভাবে বলা থাকে না; বরং পরীক্ষাযোগ্যতা ও পর্যবেক্ষণের চাপ তৈরি হলে পরে যোগ হয়। ফলে “দেহ অক্ষত” কথাটি আর পদার্থবিজ্ঞানের জৈব বাস্তবতায় দাঁড়ায় না; তা হয়ে যায় এমন এক দাবিতে, যাকে কখনও ভুল প্রমাণ করা যাবে না—কারণ প্রয়োজনমতো অর্থ বদলে নেওয়া যাবে। যুক্তিগতভাবে এটি এড হক উদ্ধার-ব্যাখ্যারই পরিচিত কৌশল: ব্যর্থতার সম্ভাবনা স্বীকার না করে দাবিকে অস্পষ্ট করে “অধরা” করে রাখা।

অতএব, প্রমাণ-ভিত্তিক বিশ্লেষণে এই সিদ্ধান্তই দাঁড়ায়: নবীদের দেহ না-পচা ধারণাটি ধর্মীয় বিশ্বাস হিসেবে টিকে থাকতে পারে, কিন্তু তা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত কোনো সত্য নয়। আর যদি এটিকে সত্যের দাবি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তবে তাকে একইভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ, পর্যবেক্ষণ, এবং ব্যর্থতার সম্ভাবনার মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে—যে পরীক্ষায় এ পর্যন্ত এই দাবি কোনো শক্ত ভিত্তি দেখাতে পারেনি।