
ভূমিকা
আধুনিক সমাজে নারীদের অধিকার পুরুষদের সমান হিসেবে স্বীকৃত, যেখানে শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র, নেতৃত্ব এবং সামাজিক অংশগ্রহণে তারা সমানভাবে অবদান রাখছে। কিন্তু ইসলামী ধর্মীয় গ্রন্থ এবং ব্যাখ্যায় নারীদের স্বামীর যৌন চাহিদা পূরণে বাধ্যতামূলক ভূমিকা দেওয়া হয়েছে, যা বৈবাহিক ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধকে আইনগত বৈধতা দেয়। উদাহরণস্বরূপ, সুনানে ইবনে মাজাহ (হাদিস ১৮৫৩)-এ বর্ণিত যে স্ত্রী শিবিকায় থাকলেও স্বামীর যৌন চাহিদা প্রত্যাখ্যান করতে পারবে না। অনুরূপভাবে, মিশকাতুল মাসাবীহ (হাদিস ৩২৫৫)-এ বলা হয়েছে যে যদি কাউকে সিজদা করার নির্দেশ দেওয়া হতো, তাহলে স্ত্রীকে স্বামীকে সিজদা করতে বলা হতো। এই হাদিসগুলো নারীকে স্বামীর সম্পত্তি হিসেবে দেখায়, যার ইচ্ছা বা সম্মতির কোনো মূল্য নেই। একইসাথে দেনমোহরের ইসলামী শরিয়তের ব্যাখ্যা থেকে জানা যায়, স্বামী দেনমোহর প্রদানের মাধ্যমে স্ত্রীর যৌনাঙ্গের মালিক হয়ে যায়, যা মানুষের সমানাধিকারের ধারণাকে ভয়ঙ্করভাবে পদদলিত করে [1]। একইসাথে, অবাধ্য স্ত্রীকে প্রহার করে বাধ্য করার অধিকারও ইসলাম স্বামীকে দেয়।
সহিহ মুসলিমের ব্যাখ্যাগ্রন্থে বলা হয়েছে যে, স্বামীর বিছানা পরিত্যাগ করা স্ত্রীর জন্য হারাম, অর্থাৎ স্বামীর ডাকে সাড়া দেওয়া অবশ্যকার্য। রিয়াদুস সালেহীন-এও একই ধরনের বর্ণনা রয়েছে। এই বর্ণনাগুলো নারীর স্বাধীনতা এবং সম্মতিকে অস্বীকার করে, যা আধুনিক যুক্তিবাদ এবং মানবাধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক। ইসলামী ইতিহাসে, তাফসীরে ইবনে কাসীর-এ উল্লেখ আছে যে সাহাবী উমর তার ঘুমন্ত স্ত্রীর সাথে ঘুমের ভেতরেই চেপে বসতেন, সম্মতি ছাড়া সঙ্গম করতেন, এবং নবী এতে কোনো আপত্তি করেননি। এটি দেখায় যে সপ্তম শতাব্দীর সমাজে নারীর সম্মতি গুরুত্বহীন ছিল।
বিবাহের আইনি স্বরূপঃ ‘মুলক আল-বুদহ’ বা যৌনাঙ্গের মালিকানা
ইসলামী ফিকহশাস্ত্রে বিবাহের যে আইনি সংজ্ঞা ও কাঠামো প্রদান করা হয়েছে, তা গভীর পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় এটি কোনো আত্মিক বন্ধন বা মানবিক অংশীদারিত্ব নয়, বরং এটি একটি নিরেট ‘বিনিময় চুক্তি’ (Contract of Exchange বা Mu’awadah)। ধ্রুপদী ইসলামী আইনের প্রায় প্রতিটি আকর গ্রন্থে বিবাহকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে ‘মুলক আল-বুদহ’ বা স্ত্রীর যৌনাঙ্গের ওপর মালিকানা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে। অর্থাৎ, স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে প্রদত্ত দেনমোহর (Mahr) কোনো উপহার নয়, বরং এটি হচ্ছে স্ত্রীর যৌনাঙ্গ ভোগ বা ব্যবহারের আইনি মূল্য বা প্রতিদান [2]। হানাফী মাযহাবের অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য এবং প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘আল-হিদায়া’-তে বিবাহের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে:
“বিবাহ হচ্ছে এমন একটি চুক্তি যা উদ্দেশ্যমূলকভাবে (যৌনাঙ্গ) ভোগের মালিকানা (Ownership of the right to sexual intercourse) প্রদান করে।” [3]
এই একই দর্শনের প্রতিফলন পাওয়া যায় ইমাম কাসানী (র.) রচিত ‘বাদাই’ আস-সানাই’’ গ্রন্থেও। সেখানে বিবাহকে একটি ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির সাথে তুলনা করা হয়েছে, যেখানে স্বামী হলো ক্রেতা, স্ত্রী (বা তার অভিভাবক) হলো বিক্রেতা এবং দেনমোহর হলো সেই পণ্যের বিনিময় মূল্য। এই আইনি কাঠামোর অধীনে স্ত্রীর যৌনাঙ্গকে ‘মা’কুদ আলাইহি’ (Subject matter of the contract) বা চুক্তির ‘বিষয়বস্তু’ হিসেবে গণ্য করা হয়। অর্থাৎ, একবার দেনমোহর পরিশোধ বা তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়ে গেলে, স্বামী সেই ‘বস্তুর’ ওপর একচ্ছত্র ব্যবহারের অধিকার লাভ করেন।
এই ‘মালিকানা’ দর্শনের কারণেই ইসলামী শরিয়তে ‘বৈবাহিক ধর্ষণ’ পরিভাষাটি সম্পূর্ণ অনুপস্থিত এবং অপ্রাসঙ্গিক। কারণ, আইনি যুক্তি অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি যখন কোনো জিনিসের ভোগাধিকার চুক্তির মাধ্যমে ‘ক্রয়’ বা হাসিল করে নেন, তখন সেটি ব্যবহারের জন্য প্রতিবার নতুন করে অনুমতির প্রয়োজন পড়ে না। মধ্যযুগীয় ফকিহগণের মতে, স্ত্রীর কর্তব্য হলো ‘তামকিন’ (Submission) বা নিজেকে স্বামীর জন্য সর্বদা লভ্য রাখা। যদি স্ত্রী নিজেকে বিরত রাখেন, তবে তিনি ‘নাশিজা’ (অবাধ্য) হিসেবে গণ্য হন এবং ফলস্বরূপ তার ভরণপোষণের (Nafaqah) অধিকার হারান। এটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নারীর শারীরিক অখণ্ডতা এবং শরীরের প্রতি নারীর নিজস্ব অধিকারকে অস্বীকার করে। এই ব্যবস্থায়:
এই ধারণাটি নারীকে একজন স্বাধীন মানুষ এবং পূর্ণাঙ্গ নাগরিক সত্তা থেকে বিচ্যুত করে তাকে কেবল একটি ‘যৌন সম্পদ’ বা ‘ভোগযোগ্য বস্তুর’ স্তরে নামিয়ে আনে। আধুনিক মানবাধিকারের মূলনীতি অনুযায়ী, কোনো মানুষের শরীরের ওপর অন্য কারো মালিকানা থাকতে পারে না। কিন্তু ইসলামী ফিকহী আইন এই মধ্যযুগীয় এবং দাসত্বমূলক ব্যবস্থাকেই আজও বৈধতা দিয়ে যাচ্ছে, যা সরাসরি নারীর মৌলিক মানবাধিকার, শারীরিক স্বাধীনতা এবং আত্মমর্যাদার চরম পরিপন্থী। এটি প্রমাণ করে যে, এই আইনি কাঠামো কোনো ডিভাইন বা শাশ্বত ন্যায়বিচার নয়, বরং এটি সপ্তম শতাব্দীর চরম পুরুষতান্ত্রিক ও গোত্রীয় চেতনার একটি আইনি দলিল মাত্র।
আলেমদের বক্তব্যঃ স্বামী জবরদস্তি করতে পারে
আধুনিক সভ্য সমাজে নারীরা পুরুষের মতোই সমান অধিকার ভোগ করেন। তারা শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নেতৃত্ব এবং সমাজসেবার ক্ষেত্রে পুরুষের সমানভাবে অংশগ্রহণ করছেন। আধুনিক সমাজে এরকম ঘটনা অসংখ্য, যেখানে স্বামী তার স্ত্রীর ইচ্ছা ও অনুমতি ছাড়াই তার সাথে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্কে করে বা স্ত্রীকে তা করতে বাধ্য করে। আধুনিক সভ্য সমাজে এটি ধর্ষণ হিসেবে গণ্য, যদিও ইসলামিক দেশগুলোতে স্বামীকে এই ধর্ষণের বৈধতা দেয়া হয়। আসুন কিছু আলেমের বক্তব্য শুনি,
হাদিসের বিবরণঃ স্বামীর আহবান প্রত্যাখ্যান করা হারাম
এবারে আসুন এই সম্পর্কে হাদিসে কী বলা আছে তা পড়ে নিই, [4] [5] [6] [7]
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১৩: বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ – স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৫৭-[২০] ত্বলক্ব ইবনু ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোনো স্বামী নিজ প্রয়োজনে স্বীয় স্ত্রীকে ডাকলে, সে যেন তৎক্ষণাৎ তার ডাকে সাড়া দেয়, যদিও সে চুলার পাশে (গৃহকর্মীর কাজে) ব্যস্ত থাকে। (তিরমিযী)[1]
[1] সহীহ : তিরমিযী ১১৬০, সহীহ আল জামি‘ ৫৩৪, সহীহ আত্ তারগীব ১৯৪৬, সহীহ ইবনু হিব্বান ৪১৬৫।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ তালক ইবনে আলী (রাঃ)
৩২৫৭-[২০] ত্বল্ফ ইবনু ‘আলী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ বলেছেন: কোনো স্বামী নিজ প্রয়োজনে স্বীয় স্ত্রীকে ডাকলে, সে যেন তৎক্ষণাৎ তার ডাকে সাড়া দেয়, যদিও সে চুলার পাশে
(গৃহকর্মীর কাজে) ব্যস্ত থাকে। (তিরমিযী)১৯৯
ব্যাখ্যা: স্বামী তার স্ত্রীর পরিচালক এবং অভিভাবক, সে যে কোনো কাজে তাকে আহ্বান করে সে আহ্বানে তাকে সাড়া দেয়া আবশ্যক, বিশেষ করে তার জৈবিক চাহিদা পূরণের আহ্বানে তাকে অবশ্যই সাড়া দিতে হবে। অত্র হাদীস সেদিকেই ইঙ্গিত করছে। সে যদি চুলায় রুটি তৈরিতেও লিপ্ত থাকে আর সে ছাড়া বিকল্প কোনো লোক না থাকে তবু তা মূলতবী রেখে স্বামীর আহ্বানে সাড়া দিবে। ইবনুল মালিক বলেন, এ রুটি যদি স্বামীর হয় তবেই এ হুকুম। কারণ স্বামী জানছে যে, সে রুটি তৈরিতে ব্যস্ত, এ সময় ডাকলে তার ক্ষতি হবে, তবু সে যখন ডাকছে, তখন তার ডাকে সাড়া দিতে হবে।
বাযযার কিতাবে যায়দ ইবনু আরকাম-এর সূত্রে হাদীসটি এভাবে এসেছে কোনো ব্যক্তি যদি তার স্ত্রীকে স্বীয় বিছানায় আহ্বান করে সে যেন (সাথে সাথে) তার ডাকে সাড়া দেয়, যদি সে জাঁতার খিলের উপরও বসা থাকে। (মিরকাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খণ্ড, হাঃ ১১৬০)
٣٢٥٨ – [٢١] وَعَنْ مُعَادٍ عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ: «لَا تُؤْذِي امْرَأَةٌ زَوْجَهَا فِي الدُّنْيَا إِلَّا قَالَتْ زَوْجَتُهُ مِنَ الْحُورِ الْعِينِ : لَا تُؤْذِيهِ قَاتَلَكِ اللهُ فَإِنَّمَا هُوَ عِنْدَكِ دَخِيلٌ يُوشِكُ أَنْ يُفَارِ قَكِ إِلَيْنَا» . رَوَاهُ التَّرْمِذِيُّ وَابْنُ مَاجَهُ وَقَالَ التَّرْمِذِيُّ : هُذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ
৩২৫৮-[২১] মু’আয হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী বলেছেন: যখন কোনো স্ত্রী তার স্বামীকে দুনিয়াতে কষ্ট দেয় (অর্থাৎ- অশ্রদ্ধা, অবাধ্যতা ইত্যাদির মাধ্যমে)। তখন উক্ত স্বামীর জান্নাতের রমণীগণ (হুরেরা) বলতে থাকে, তুমি তাকে কষ্ট দিও না, (যদি কর) তবে আল্লাহ তোমাকে ধ্বংস করবেন। তিনি তোমার নিকট (কিছু সময়ের দিনের) মেহমান, শীঘ্রই তিনি তোমাকে ছেড়ে আমাদের নিকট চলে আসবে। (তিরমিযী, ইবনু মাজাহ; ইমাম তিরমিযী বলেন, হাদীসটি গরীব) ৫০০
ব্যাখ্যা: মু’মিনদেরকে আল্লাহ তা’আলা জান্নাতে “হুরি’ঈন” বা আয়তনয়না হর দিবেন। আল্লাহ বলেন : “আমি জান্নাতীদেরকে হরি’ঈনদের সাথে জোড়া মিলিয়ে দিবো”- (সূরাহ্ আদ্ দুখান ৪৪ ৫৪)। অর্থাৎ বিয়ে দিয়ে দিবো। হুরি’ঈন হলো অতীব উজ্জ্বল সাদা কালো মিশ্রিত, প্রশস্ত ও আনতচক্ষু বিশিষ্ট বা (ডাগর চক্ষু বিশিষ্ট) অত্যন্ত সুশ্রী, অন্যন্য সুন্দরী জান্নাতের নারী।
মু’মিন নেককার জান্নাতী বান্দাকে যদি তার দুনিয়ার স্ত্রী কষ্ট দেয় তখন তার জন্য নিযুক্ত জান্নাতের ঐ হুরী’ঈন স্ত্রী তা জানতে পারে।

সুনানে ইবনে মাজাহ
তাওহীদ পাবলিকেশন
অধ্যায়ঃ ৯/ বিবাহ
২/১৮৫৩। ‘আবদুল্লাহ্ ইবনু আবূ আওফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুআয (রাঃ) সিরিয়া থেকে ফিরে এসে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে সাজদাহ করেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ হে মু‘আয! এ কী? তিনি বলেন, আমি সিরিয়ায় গিয়ে দেখতে পাই যে, তথাকার লোকেরা তাদের ধর্মীয় নেতা ও শাসকদেরকে সাজদাহ করে। তাই আমি মনে মনে আশা পোষণ করলাম যে, আমি আপনার সামনে তাই করবো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমরা তা করো না। কেননা আমি যদি কোন ব্যক্তিকে আল্লাহ্ ছাড়া অপর কাউকে সাজদাহ করার নির্দেশ দিতাম, তাহলে স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম তার স্বামীকে সাজদাহ করতে। সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! স্ত্রী তার স্বামীর প্রাপ্য অধিকার আদায় না করা পর্যন্ত তার প্রভুর প্রাপ্য অধিকার আদায় করতে সক্ষম হবে না। স্ত্রী শিবিকার মধ্যে থাকা অবস্থায় স্বামী তার সাথে জৈবিক চাহিদা পূরণ করতে চাইলে স্ত্রীর তা প্রত্যাখ্যান করা অনুচিত।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
It was narrated that: Abdullah bin Abu Awfa said “When Muadh bin Jabal came from Sham, he prostrated to the Prophet who said: ‘What is this, O Muadh?’ He said: ‘I went to Sham and saw them prostrating to their bishops and patricians and I wanted to do that for you.’ The messenger of Allah said: ‘Do not do that. If I were to command anyone to prostrate to anyone other than Allah, I would have commanded women to prostrate to their husbands. By the One in Whose Hand is the soul of Muhammad! No woman can fulfill her duty towards Allah until she fulfills her duty towards her husband. If he asks her (for intimacy) even if she is on her camel saddle, she should not refuse.’ ”
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পাবলিশারঃ হাদিস একাডেমি
অধ্যায়ঃ পর্ব-১৩ঃ বিবাহ
পরিচ্ছদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ – স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৫৫-(১৮) আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি যদি কোনো মানবকে সিজদা করার নির্দেশ দিতাম, তবে স্ত্রীকে তার স্বামীর জন্য সিজদা করার নির্দেশ দিতাম। (তিরমিযী)
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)।
আসুন এই একই হাদিস রিয়াদুস সালেহীন গ্রন্থ থেকে পড়ি, [8]
অনুচ্ছেদ: স্বামী স্ত্রীকে বিছানায় ডাকলে শরী’য়াত সম্মত কারণ ছাড়া স্ত্রীর বিছানায় আসতে অস্বীকার করা হারাম।

হাদিসের ব্যাখ্যাঃ স্বামী চাহিবামাত্রই স্ত্রী সঙ্গমে বাধ্য
আসুন সহিহ মুসলিমের ব্যাখ্যাগ্রন্থ থেকে একটি পাতা পড়ে নিই, যেখানে বলা, স্বামীর বিছানা পরিত্যাগ করা স্ত্রীর জন্য হারাম অর্থাৎ স্বামী বিছানায় ডাকা মাত্রই স্ত্রীর সেই ডাকে সাড়া দেয়া অবশ্য কর্তব্য [9]
(৩৪২৬) হাদীছ (ইমাম মুসলিম (রহ.) বলেন) আর আমাদের নিকট হাদীছ বর্ণনা করেন কুতায়বা বিন সাঈদ (রহ.) তিনি … (সূত্র পরিবর্তন) এবং আবদুল ওয়ারিছ বিন আবদুস সামাদ (রহ.) তিনি … (সূত্র পরিবর্তন) এবং মুহাম্মদ বিন মুছান্না (রহ.) তিনি … (সূত্র পরিবর্তন) এবং উবায়দুল্লাহ বিন সাইদ, হারুন বিন আবদুল্লাহ ও আবু মা’ন রুকাশী (রহ.) তাহারা … (সূত্র পরিবর্তন) এবং সুলায়মান বিন মা’বাদ (রহ.) তাহারা … জাবির (রাযিঃ) হইতে এই হাদীছ বর্ণনা করেন। তবে ইমাম যুহরী (রহ.) সূত্রে রাবী নুমান বর্ণিত হাদীছে এতখানি অতিরিক্ত আছে। সে (স্বামী) ইচ্ছা করিলে উপুর করিয়া, ইচ্ছা করিলে উপুর না করিয়া (সঙ্গম) করিবে। তবে সঙ্গম একই (যোনি) দ্বারে হইতে হইবে।
ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ
مُجَنِيَةٍ )উপুর) শব্দটির বর্ণে পেশ বর্ণে যবর বর্ণে তাশদীদসহ যের অতঃপর ও বর্ণ দ্বারা পঠিত। অর্থাৎ مكبوبة على وجهها )স্ত্রীকে অধোমুখী করিয়া) (নওয়াভী) -(ফতহুল মুলহিম ৩ঃ৫১১(
فِي صِمَامٍ وَاحِدٍ )একই (যোনি) দ্বারে হইতে হইবে)। صِمّامٍ শব্দটির এ বর্ণে যের এবং বর্ণে তাশদীদবিহীন পঠিত। ইহা হইতেছে المنفد )ছিদ্র, ফাঁক, পথ, দরজা, জানালা) অর্থাৎ ثقب واحد )একই ফাঁক দিয়া)। ইহা দ্বারা মর্ম হইতেছে القبل )যৌনিপথ)। (ফতহুল মুলহিম ৩৪৫১১(
بَابُ تَحْرِيمِ امْتِنَاعِهَا مِنْ فِرَاشٍ زَوْجِهَا
অনুচ্ছেদ: স্বামীর বিছানা পরিহার করা স্ত্রীর জন্য হারাম-এর বিবরণ
(9829) وحَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ الْمُثَنَّى وَابْنُ بَشَّارٍ وَاللَّفْظُ لِابْنِ الْمُثَنَّى قَالَا حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ جَعْفَرٍ حَدَّثَنَا شُعْبَةُ قَالَ سَمِعْتُ قَتَادَةَ يُحَدِّثُ عَنْ زُرَارَةَ بْنِ أَوْفَى عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ إِذَا بَاتَتْ الْمَرْأَةُ هَاجِرَةً فِرَاشَ زَوْجِهَا لَعَنَتْهَا الْمَلَائِكَةُ حَتَّى تُصْبِحَ.
(৩৪২৭) হাদীছ (ইমাম মুসলিম (রহ.) বলেন) আর আমাদের নিকট হাদীছ বর্ণনা করেন মুহাম্মদ বিন মুছান্না ও ইবন বাশার (রহ.) তাহারা … আবু হুরায়রা (রাযিঃ) হইতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হইতে, তিনি ইরশাদ করেন, স্বামীর বিছানা ত্যাগ করিয়া কোন স্ত্রী রাত্রি যাপন করিলে ফিরিশতাগণ তাহার প্রতি ফজর পর্যন্ত বদ-দু’আ করিতে থাকেন।
ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ
مَاجِرَةً )ত্যাগ করে) সহীহ বুখারী শরীফে বর্ণিত হইয়াছে مهاجرة )ছাড়িয়া যাওয়া, পরিহার করা, দেশত্যাগ করা, হিজরত করা)। হাফিয ইবন হাজার (রহ.) বলেন, مهاجرة শব্দটি প্রকাশ্য হিসাবে مفاعلة এর সীগা হইলেও এই স্থানে مفاعلة এর শব্দ নহে; বরং ইহা দ্বারা মর্ম হইতেছে انهاهي التي هجرت )তিনি সেই পরিহার-কারিণী)। কখনও مفاعلة শব্দ দ্বারা نفس الفعل )খোদ কর্ম) মর্ম হইয়া থাকে। ফলে তাহার উপর ভর্ৎসনা পতিত হইবে না। তবে যদি সে প্রকাশ্যভাবে পরিহারকারিণী হয় এবং ইহার কারণে তাহার উপর তাহার স্বামী ক্রোধান্বিত থাকে।-(ফতহুল মুলহিম ৩ঃ৫১১)

তাফসীরঃ উমর ঘুমন্ত স্ত্রীর ওপর চেপে বসতেন
ইসলামের ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি যে, নবী মুহাম্মদ এবং তার সাহাবীগণ আসলে তাদের স্ত্রীদের সম্মতির তেমন কোন গুরুত্বই দিতেন না। যৌন সঙ্গমের বিষয়ে স্বামীর ভূমিকা ছিল প্রভুর মত, আর স্ত্রীর ভূমিকা ছিল দাসীবাঁদীর মত। আসুন তাফসীরে ইবনে কাসীর থেকে একটি ঘটনা জেনে নেয়া যাক, যেখানে দেখা যাচ্ছে নবীর প্রখ্যাত সাহাবী উমর তার ঘুমন্ত স্ত্রীর ওপর চেপে বসে এবং তার অনুমতি বা সম্মতির তোয়াক্কা না করেই সঙ্গমে লিপ্ত হয়। বিষয়টি নবীকে জানাবার পরেও নবী তা নিয়ে কোন কথাই বলেন না, অর্থাৎ সেই সময়ে নবীর কাছে এটিই ছিল খুব স্বাভাবিক বিষয় [10]
… কাছে করিয়া থাকে। আমার স্ত্রী জানাইল, সে নিদ্রা গিয়াছিল। আমি উহাকে তাহার বাহানা ভাবিয়া তাহার সহিত সহবাস করিয়াছি।’ তখনই তাহার উপলক্ষে এই আয়াত নাযিল হইলঃ ثُمَّ اَتِمُوا الصَّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ …. ইব্ন আবু লায়লা হইতে শু’বা ও আমর ইবন শু’বা পর্যায়ক্রমে অনুরূপ বর্ণনা প্রদান করেন। কা’ব ইব্ন আবদুল মালেক হইতে পর্যায়ক্রমে আবদুল্লাহ ইব্ন কা’ব বনু সালমার গোলাম মূসা ইব্ন্ন জুবায়ের, আবু লাহীআ, ইবনুল মুবারক সুয়ায়েদ, মুছান্না ও আবূ জা’ফর ইব্ন জারীর বর্ণনা করেন:
“রমযান মাসে লোকদের অবস্থা এই ছিল যে, যদি কেহ রোযা রাখিয়া রাত্রে ঘুমাইয়া পড়িত তাহা হইলে উহার পর হইতে তাহার জন্য পরবর্তী ইফতার পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রী সহবাস হারাম হইত। এক রাত্রে উমর ইবন খাত্তাব রাসূলুল্লাহর (সা) দরবার হইতে দেরীতে ঘরে ফিরেন। তখন তাহার স্ত্রী ঘুমাইতেছিলেন। তিনি তাহার কাছে কামনা চরিতার্থের অভিলাষ ব্যক্ত করিলে তাহার স্ত্রী বলিলেন, আমি তো নিদ্রা গিয়াছিলাম। তিনি উহা অবিশ্বাস করিলেন এবং তাহার সহিত সহবাস করিলেন। কা’ব ইন্ন মালেক বলেন-প্রত্যূষেই উমর ইব্ন্ন খাত্তাব রাসূল (সা)-এর খিদমতে হাযির হন এবং তাঁহাকে এই অবস্থা বর্ণনা করেন। তখন আল্লাহ তা’আলা علِمَ اللَّهُ أَنَّكُمْ كُنْتُمْ تَخْتَانُونَ أَنْفُسَكُمْ فَتَابَ عَلَيْكُمْ وَعَفَا : 94 ARIG IR عَنْكُمْ فَالْأَنَ بَاشِرُوهُنَّ অর্থাৎ তোমরা যে নিজ ব্যাপারে খিয়ানত করিতেছিলে, তাহা আল্লাহ তা’আলা জানিয়াছেন। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা তোমাদের তাওবা কবুল করিয়াছিলেন তাই এখন হইতে তোমরা স্ত্রীগমন কর।
অনুরূপভাবে মুজাহিদ, আতা, ইকরামা, কাতাদাহ প্রমুখ হযরত উমর (রা) ও সুরাকা ইন্ন কয়েস আনসারীর ঘটনাকে এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ হিসাবে বর্ণনা করিয়াছেন। অতঃপর আল্লাহর রহম, অনুগ্রহ ও ভালবাসা স্বরূপ রমযানের সারা রাত্র স্ত্রী সহবাস করা, আহার করা ও পান করাকে আল্লাহ তা’আলা মুবাহ করিয়া দিয়াছেন।
, R) Cons) وَابْتَغُوا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَكُمْ উহা অন্বেষণ কর) আয়াতাংশের ব্যাখ্যা প্রসংগে আবূ হুরায়রা, ইব্ন আব্বাস, আনাস, কাজী শুরাইহ, মুজাহিদ, ইকরামা, সাঈদ ইন্ন জুবায়র, আতা, রবী ইন্ন আনাস, সুদ্দী, যায়দ ইব্ন আসলাম, হাকাম ইন্ন উতবা, মাকাতিল ইন্ন হাইয়ান, হাসান বসরী, যিহাক, ও কাতাদাহ (র) প্রমুখ সাহাবা ও তাবেঈন বলেনঃ ইহার অর্থ ‘সন্তান’।

মৃত সন্তানকে পাশে রেখে সাহাবীর যৌনসঙ্গম
ইসলামী পারিবারিক কাঠামোতে নারীর নিজস্ব আবেগ ও শোকের তুলনায় স্বামীর যৌন পরিতৃপ্তিকে কতটা প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, তা আবু তালহা (রা.) ও তাঁর স্ত্রী উম্মে সুলাইমের এই ঘটনাটি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়। এই বর্ণনায় দেখা যায়, নিজের সন্তান ঘরে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকা সত্ত্বেও উম্মে সুলাইম তাঁর মাতৃত্বকালীন তীব্র শোক গোপন করে স্বামীর জন্য নিজেকে সুসজ্জিত করেন এবং যৌন মিলনে লিপ্ত হন [11]। আধুনিক মনস্তত্ত্ব ও মানবিক মূল্যবোধের নিরিখে এটি একটি অত্যন্ত অস্বাভাবিক চিত্র, যেখানে একজন নারীর স্বাভাবিক আবেগীয় প্রতিক্রিয়াকে পুরোপুরি অবদমন করে তাঁকে কেবল পুরুষের যৌন চাহিদা মেটানোর একটি মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়েছে।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৭১/ আক্বীক্বাহ
পরিচ্ছেদঃ ৭১/১. যে সন্তানের ‘আক্বীক্বাহ দেয়া হবে না, জন্ম লাভের দিনেই তার নাম রাখা ও তাহনীক করা (কিছু চিবিয়ে তার মুখে দেয়া)।
৫৪৭০. আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ ত্বলহার এক ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়ল। আবূ ত্বলহা বাইরে গেলেন, তখন ছেলেটি মারা গেল। আবূ ত্বলহা ফিরে এসে জিজ্ঞেস করলেনঃ ছেলেটি কী করছে? উম্মু সুলাইম বললেনঃ সে আগের চেয়ে শান্ত। তারপর তাঁকে রাতের খাবার দিলেন। তিনি আহার করলেন। তারপর উম্মু সুলাইমের সঙ্গে যৌন সঙ্গম করলেন। যৌন সঙ্গম ক্রিয়া শেষে উম্মু সুলাইম বললেনঃ ছেলেটিকে দাফন করে আস। সকাল হলে আবূ ত্বলহা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে এসে তাঁকে এ ঘটনা বললেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ গত রাতে তুমি কি স্ত্রীর সঙ্গে রয়েছ? তিনি বললেনঃ হাঁ! নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে আল্লাহ! তাদের জন্য তুমি বারাকাত দান কর।
কিছুদিন পর উম্মু সুলাইম একটি সন্তান প্রসব করল। রাবী বলেনঃ) আবূ ত্বলহা আমাকে বললেন, তাকে তুমি দেখাশোনা কর যতক্ষণ না আমি তাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে নিয়ে যাই। অতঃপর তিনি তাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে নিয়ে গেলেন। উম্মু সুলাইম সঙ্গে কিছু খেজুর দিয়ে দিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে (কোলে) নিলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, তার সঙ্গে কিছু আছে কি? তাঁরা বললেনঃ হাঁ, আছে। তিনি তা নিয়ে চিবালেন এবং তারপর মুখ থেকে বের করে বাচ্চাটির মুখে দিলেন। তিনি এর দ্বারাই তার তাহ্নীক করলেন এবং তার নাম রাখলেন ’আবদুল্লাহ। [১৩০১; মুসলিম ৩৮/৫, হাঃ ২১৪৪] (আধুনিক প্রকাশনী- ৫০৬৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৯৬১)
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি উক্ত হাদীসটিই বর্ণনা করেন। (আধুনিক প্রকাশনী- ৫০৬৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৯৬২)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, মোহাম্মদ এই বিষয়টিকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেন এবং তাঁদের সেই মিলনের ওপর আল্লাহর বারাকাত বা কল্যাণ কামনা করে বিশেষ দোয়া করেন। মৃত সন্তানের লাশের পাশে এই যৌনক্রিয়াকে একটি ‘মহত’ বা ‘বরকতময়’ কাজ হিসেবে উপস্থাপন করা মূলত নারীর মানবিক মর্যাদা ও ব্যক্তিসত্তার চরম অবমাননা। এটি সমাজে এই বার্তাই দেয় যে, যেকোনো পরিস্থিতিতেই নারীর প্রধান ও আবশ্যিক কর্তব্য হলো তাঁর শরীরকে স্বামীর কামনাবাসনা চরিতার্থ করার জন্য লভ্য রাখা, এমনকি নিজের সন্তানের মৃত্যুর মতো চরম বিয়োগান্তক মুহূর্তেও। নবীর পক্ষ থেকে এই আচরণের ভূয়সী প্রশংসা ও দোয়া প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় এই বিধানে নারীর মানসিক স্বাস্থ্যের বা যন্ত্রণার চেয়ে পুরুষের তথাকথিত যৌন অধিকারের স্থান অনেক উঁচুতে। এ ধরনের বর্ণনা নারীকে কেবল একটি যৌনদাসীসুলভ অবস্থানে নামিয়ে আনে, যেখানে তার মাতৃত্ব বা মানবিক সত্তার চেয়ে স্বামীর তৃপ্তিই চূড়ান্ত মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হয়।
সহবাসে অসম্মতি জানালে মারপিট করে বাধ্য করার ফতোয়া
নিচে এই সম্পর্কিত সমস্ত দলিল প্রমাণ এক এক করে উল্লিখিত হচ্ছে। এই ফতোয়াগুলো সবই ইসলামী বিশ্বে সর্বাধিক অথেনটিক দলিল হিসেবে পরিগণিত হয়। দলিলগুলো দেখার আগে আসুন একটি ভিডিও দেখে নিই,
রওজাতুত তালেবীন (Rawdat at-Taalibeen)- দাসী সংক্রান্ত বিধান
ইসলামি আইনশাস্ত্র বা ফিকহ্-এর ইতিহাসে ‘রওজাতুত তালেবীন ওয়া উমদাতুল মুফতীন’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আকর গ্রন্থ। এটি শাফি’ঈ মাযহাবের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে গণ্য। কিতাবটি রচনা করেছেন জগদ্বিখ্যাত ইসলামিক মুহাদ্দিস ও ফকিহ ইমাম মুহিউদ্দিন আবু জাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবনে শরাফ আন-নববী (র.) (মৃত্যু: ৬৭৬ হিজরি)। তিনি অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে এই গ্রন্থে ইবাদত, মুয়ামালাত (লেনদেন) এবং পারিবারিক আইনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়গুলো আলোচনা করেছেন। বিশেষ করে ফতোয়া প্রদানের ক্ষেত্রে এই গ্রন্থটিকে শাফি’ঈ ঘরানায় চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
মূল আরবি পাঠ (নির্বাচিত অংশ) – এই অংশে দাসী ও সংশ্লিষ্ট মাসআলা সংক্রান্ত মূল ইবারত নিচে দেওয়া হলো, [12]
ويحرم على الزوجة والأمة تحريما غليظا أن تمتنع إذا طلبها للاستمتاع الجائز
It is strongly forbidden for a wife or slave concubine to refuse when her husband or master seeks permissible sexual intimacy from her.
— Rawdat at-Taalibeen
বাংলা অনুবাদঃ “…এবং স্ত্রী বা দাসীর জন্য (মালিক বা স্বামীর) বৈধ উপভোগের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে নিজেকে বিরত রাখা কঠোরভাবে হারাম।
আসুন সরাসরি বই থেকে দেখে নেয়া যাক,

অর্থাৎ, স্ত্রী বা দাসীর সম্মতির কোনো মূল্য নেই; তার কর্তব্য হলো তার স্বামী বা মালিককে খুশি রাখা, সন্তুষ্ট রাখা এবং যখনই তার স্বামী বা মালিক চাইবে শরীয়া সম্মত কোন কারণ (যেমন মারাত্মক অসুস্থতা) না থাকলে তাকে যৌনসুখ প্রদান করা।
আল-মুহাল্লা বিল-আসার (Al-Muhalla bi’l-Aathaar)
“আল-মুহাল্লা বিল-আসার“ হলো ইমাম ইবনে হাজম আল-আন্দালুসি (র.) রচিত ফিকহ্ শাস্ত্রের একটি কিংবদন্তি গ্রন্থ। এটি জাহিরি মাজহাবের প্রধান নির্ভরযোগ্য আকর। এই গ্রন্থে ইমাম ইবনে হাজম কুরআন ও সুন্নাহর সরাসরি পাঠের ওপর ভিত্তি করে ইসলামি আইনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং যুক্তি বা অনুমানের (কিয়াস) পরিবর্তে দলিলকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তুলনামূলক আইনশাস্ত্র বা ‘ইখতিলাফুল ফুকাহা’ (আলেমদের মতভেদ) বোঝার জন্য এই গ্রন্থটিকে ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই গ্রন্থে দাসী ও স্ত্রীর সম্মতি (Consent) এবং তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে,
[مَسْأَلَةٌ فَرْضُ الْأَمَةِ وَالْأَمَةِ وَالْحُرَّةِ أَنْ لَا يَمْنَعَا السَّيِّدَ وَالزَّوْجَ الْجِمَاعَ مَتَى دَعَاهُمَا]
অনুবাদ: স্বাধীন স্ত্রী এবং দাসী উভয়ের জন্য ফরজ (আবশ্যক) হলো তারা যেন স্বামী বা মালিককে সহবাসে বাধা না দেয় যখনই তিনি তাদের আহ্বান করেন।
“…مَسْأَلَةٌ: وَفَرْضُ الْأَمَةِ وَالْحُرَّةِ أَنْ لَا يَمْنَعَا السَّيِّدَ وَالزَّوْجَ الْجِمَاعَ مَتَى دَعَاهُمَا، مَا لَمْ تَكُنْ الْمَدْعُوَّةُ حَائِضًا، أَوْ مَرِيضَةً تَتَأَذَّى بِالْجِمَاعِ، أَوْ صَائِمَةَ فَرْضٍ، فَإِنْ امْتَنَعَتْ لِغَيْرِ عُذْرٍ، فَهِيَ مَلْعُونَةٌ…”
অনুবাদ: “দাসীর ওপর এবং স্বাধীন স্ত্রীর ওপর এটি আবশ্যকীয় কর্তব্য যে, মালিক বা স্বামী যখনই তাদের মেলামেশার জন্য ডাকবেন, তারা যেন বাধা না দেয়— যতক্ষণ না সেই নারী ঋতুবতী হয়, অথবা এমন অসুস্থ হয় যে সহবাসে অনেক কষ্ট হবে, কিংবা ফরজ রোজা পালনকারী হয়। যদি কোনো ওজর (উপযুক্ত কারণ) ছাড়া সে বিরত থাকে, তবে সে অভিশপ্ত।”
“…عَنْ النَّبِيِّ – صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ – قَالَ: «إذَا بَاتَتْ الْمَرْأَةُ مُهَاجِرَةً إلَى زَوْجِهَا أَوْ فِرَاشِ زَوْجِهَا لَعَنَتْهَا الْمَلَائِكَةُ حَتَّى تَرْجِعَ»…”
অনুবাদ: “…নবীজি (সা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: যদি কোনো নারী তার স্বামীর বিছানা ত্যাগ করে (বিমুখ হয়ে) রাত কাটায়, তবে ফিরে না আসা পর্যন্ত ফেরেশতারা তাকে অভিশাপ দিতে থাকে।”
“…قَالَ رَسُولُ اللَّهِ – صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ -: «إذَا دَعَا الرَّجُلُ زَوْجَتَهُ لِحَاجَتِهِ فَلْتَأْتِهِ وَإِنْ كَانَتْ عَلَى التَّنُّورِ»…”
অনুবাদ: “…রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: যখন কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে নিজ প্রয়োজনে (শারীরিক চাহিদা মেটাতে) ডাকে, সে যেন অবশ্যই আসে— এমনকি সে যদি চুলার (রান্নার) কাজেও ব্যস্ত থাকে।”
আসুন এই গ্রন্থ থেকে দেখে নেয়া যাক, [13]

সালিহ আল মুনাজ্জিদ (islamqa.info)
ইসলামের আরেকটি সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য ফতোয়া ওয়েবসাইট Islamqa-এর একটি ফতোয়া Fatwa No. 33597- এ বলা হয়েছে [14] –
إجبار الزوج زوجته على الجماع
السؤال: 33597
هل يجوز للرجل أن يُجبر زوجته أو أمته على الجماع إذا رفضت ؟.
الجواب
الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله، وبعد:
ليس للمرأة أن تمنع نفسها من زوجها ، بل يجب عليها أن تلبي طلبه كلما دعاها ما لم يضرها أو يشغلها عن واجب .
روى البخاري (3237) ومسلم (1436) عن أبي هريرة رضي الله عنه قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : ( إذا دعا الرجل امرأته إلى فراشه فأبت فبات غضبان عليها لعنتها الملائكة حتى تصبح ) .
فإن امتنعت من غير عذر كانت عاصية ناشزا ، تسقط نفقتها وكسوتها .
وعلى الزوج أن يعظها ويخوفها من عقاب الله ، ويهجرها في المضجع ، وله أن يضربها ضرباً غير مُبَرِّح، قال الله تعالى :
( وَاللاتِي تَخَافُونَ نُشُوزَهُنَّ فَعِظُوهُنَّ وَاهْجُرُوهُنَّ فِي الْمَضَاجِعِ وَاضْرِبُوهُنَّ فَإِنْ أَطَعْنَكُمْ فَلا تَبْغُوا عَلَيْهِنَّ سَبِيلًا إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيًّا كَبِيرًا ) النساء/34 .
وسئل شيخ الإسلام ابن تيمية رحمه الله عما يجب على الزوج إذا منعته من نفسها إذا طلبها ؟ فأجاب : ( لا يحل لها النشوز عنه ، ولا تمنع نفسها منه ، بل إذا امتنعت منه وأصرت على ذلك فله أن يضربها ضربا غير مبرح ، ولا تستحق نفقة ولا قسما ) مجموع الفتاوى 32/279 .
وسئل عن رجل له زوجة وهي ناشز تمنعه نفسها فهل تسقط نفقتها وكسوتها وما يجب عليها ؟
فأجاب : ( تسقط نفقتها وكسوتها إذا لم تمكنه من نفسها ، وله أن يضربها إذا أصرت على النشوز . ولا يحل لها أن تمتنع من ذلك إذا طالبها به ، بل هي عاصية لله ورسوله ، وفي الصحيح : ” إذا طلب الرجل المرأة إلى فراشه فأبت عليه كان الذي في السماء ساخطا عليها حتى تصبح ” )
انتهى من مجوع الفتاوى 32/278 ، والحديث رواه مسلم (1736) .
فينبغي وعظ الزوجة أولا ، وتحذيرها من النشوز وغضب الله عليها ولعنة الملائكة لها ، فإن لم تستجب هجرها الزوج في الفراش ، فإن لم تستجب ضربها ضربا غير مبرح ، فإن لم ينفع معها ذلك ، منع عنها النفقة والكسوة ، وله أن يطلقها أو يخالعها لتفتدي منه بمالها .
وكذلك الأمة ليس لها أن تمتنع من تلبية رغبة سيدها إلا من عذر ، فإن فعلت كانت عاصية ، وله أن يؤدبها بما يراه مناسباً وأذن الشرع به .
والله أعلم .
প্রশ্ন নং: 33597
প্রশ্ন:
কোনো পুরুষ কি তার স্ত্রী বা দাসীকে জোর করে সহবাসে বাধ্য করতে পারবে, যদি সে অস্বীকার করে?
উত্তর
আল্লাহর প্রশংসা এবং রাসূল ﷺ-এর প্রতি দরূদ ও সালাম:
নারীর জন্য বৈধ নয় যে, সে নিজেকে স্বামী থেকে বিরত রাখবে। বরং তার উচিত স্বামীর আহ্বানে সাড়া দেওয়া, যখনই স্বামী তাকে আহ্বান করে, যদি না এমন কোনো ক্ষতি বা অজুহাত থাকে যা তাকে বৈধভাবে বিরত রাখে।
সহীহ বুখারী (হাদিস 3237) ও সহীহ মুসলিমে (হাদিস 1436) আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“যখন কোনো পুরুষ তার স্ত্রীকে শয্যায় আহ্বান করে, আর সে অস্বীকার করে, তখন স্বামী রাগ করে রাত কাটালে ফেরেশতারা তাকে (স্ত্রীকে) সকাল পর্যন্ত লানত করতে থাকে।”
সুতরাং, যদি কোনো নারী অকারণে অস্বীকৃতি জানায়, তবে তাকে অবাধ্য গণ্য করা হবে, এবং এর ফলে তার ভরণপোষণ ও পোশাকের অধিকার নষ্ট হয়ে যাবে।
স্বামীর কর্তব্য হলো, তাকে (স্ত্রীকে) আল্লাহর ভয় দেখানো ও উপদেশ দেওয়া; যদি না শোনে, তবে তাকে শয্যা থেকে পৃথক করা; আর তাতেও কাজ না হলে হালকা প্রহার করা—কিন্তু এমন প্রহার নয় যা আঘাত বা ক্ষত সৃষ্টি করে। আল্লাহ বলেন:
“আর যেসব নারীর অবাধ্যতার আশঙ্কা কর, তাদের উপদেশ দাও, তাদের শয্যা ত্যাগ কর, এবং প্রহার কর; তারপর যদি তারা অনুগত হয়, তবে তাদের বিরুদ্ধে অন্য কোনো পথ অবলম্বন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বোচ্চ, মহান।” (সূরা নিসা ৪:৩৪)
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.) বলেছেন:
স্ত্রীর জন্য বৈধ নয় যে, সে নিজেকে স্বামী থেকে বিরত রাখবে। বরং যখন স্বামী আহ্বান করবে, তখনই তার সাড়া দেওয়া ওয়াজিব, যদি না শরীয়তসম্মত কোনো কারণ থাকে যা তাকে বিরত রাখে। (মাজমূআ ফাতাওয়া ৩২/২৭৯)
প্রশ্ন:
যদি কোনো পুরুষ তার স্ত্রীর ভরণপোষণ ও পোশাক দেয়, অথচ স্ত্রী তাকে (সহবাসে) নিজেকে দিতে অস্বীকৃতি জানায়—এক্ষেত্রে কী হবে?
উত্তর:
সে (স্ত্রী) যদি বৈধ অজুহাত ছাড়াই স্বামীকে নিজেকে না দেয়, তবে তার ভরণপোষণ ও পোশাকের অধিকার বাতিল হয়ে যাবে। আর তাকে প্রহার করা বৈধ হবে, তবে এমনভাবে নয় যে এতে গুরুতর ক্ষতি হয়।
কিন্তু, যদি অস্বীকৃতি শরীয়তসিদ্ধ কোনো কারণে হয়, তবে স্ত্রী গোনাহগার হবে না। বরং গোনাহ হবে স্বামীর, যদি সে তখনও জোর করে।
উপসংহার
স্ত্রীর জন্য স্বামীর আহ্বান অকারণে প্রত্যাখ্যান করা বৈধ নয়।
অকারণে অস্বীকার করলে ফেরেশতাদের লানতের শিকার হবে, এবং তার ভরণপোষণ ও পোশাকের অধিকার নষ্ট হবে।
স্বামীকে প্রথমে উপদেশ দিতে হবে, তারপর শয্যা আলাদা করতে হবে, এবং প্রয়োজনে হালকা প্রহার করতে পারবে।
শরীয়তসম্মত কারণ থাকলে স্ত্রী অস্বীকৃতি জানাতে পারবে, এবং সেক্ষেত্রে দায় স্বামীর ওপর বর্তাবে।
ইবনে তাইমিয়ার মাজমু’আ ফাতাওয়া থেকে উদ্ধৃতি শেষ হলো (৩২/২৭৮)। আর হাদিসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে (১৭৩৬)।
অতএব, প্রথমে স্বামীর উচিত স্ত্রীকে উপদেশ দেওয়া, তাকে অবাধ্যতার (নুশূজ) ভয় দেখানো, আল্লাহর শাস্তির ভয় দেখানো, ফেরেশতাদের লানতের কথা স্মরণ করানো। যদি স্ত্রী তারপরও সাড়া না দেয়, তবে স্বামী শয্যা ত্যাগ করে তার থেকে দূরে থাকবে। যদি তবুও সে সাড়া না দেয়, তবে তাকে এমনভাবে প্রহার করতে পারবে, যা ব্যথাদায়ক হলেও ক্ষতিকর নয়। যদি তবুও কোনো উপকার না হয়, তবে স্বামী তার ভরণপোষণ ও পোশাক বন্ধ করে দিতে পারে, এমনকি চাইলে তাকে তালাক দিতে পারে বা তার থেকে আলাদা হয়ে অন্য বিয়ে করতে পারে।
একইভাবে, দাসীর ক্ষেত্রেও—তার জন্য বৈধ নয় যে, সে কোনো অজুহাত ছাড়া মালিকের যৌন চাহিদা পূরণ থেকে বিরত থাকবে। যদি বিরত থাকে, তবে সে গুনাহগার হবে। আর মালিকের অধিকার আছে তাকে শাস্তি দেওয়ার এবং যেভাবে উপযুক্ত মনে করে, শরীয়তের অনুমোদিত সীমার মধ্যে তার ওপর ব্যবস্থা নেওয়ার।
আল্লাহই সর্বাধিক জানেন।
কাতারের সর্বোচ্চ ফতোয়া কমিটি (islamweb.net)
আরেকটি অত্যন্ত বিখ্যাত ফতোয়া ওয়েবসাইট Islamweb-এর ফতোয়াতেও একই কথা পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে: [15]
معلومات الكتاب
المحلى بالآثار
ابن حزم الأندلسي – علي بن أحمد بن سعيد بن حزم
إظهار / إخفاء التشكيل بحث في الكتاب
1883 – مسألة : وفرض الأمة والحرة أن لا يمنعا السيد والزوج الجماع متى دعاهما ، ما لم تكن المدعوة حائضا ، أو مريضة تتأذى بالجماع ، أو صائمة فرض ، فإن امتنعت لغير عذر ، فهي ملعونة . روينا من طريق مسلم نا ابن أبي عمر نا مروان – هو ابن معاوية الفزاري – عن يزيد بن كيسان عن أبي حازم عن أبي هريرة قال : قال رسول الله صلى الله عليه وآله وسلم { والذي نفسي بيده ما من رجل يدعو امرأته إلى فراشها فتأبى عليه إلا كان الذي في السماء ساخطا عليها حتى يرضى عنها } .
نا حمام نا عباس بن أصبغ نا محمد بن عبد الملك بن أيمن نا بكر بن حماد نا مسدد نا يحيى – هو ابن سعيد القطان – نا شعبة عن قتادة عن زرارة بن أوفى عن أبي هريرة رضي الله عنه عن النبي صلى الله عليه وآله وسلم قال : { إذا باتت المرأة مهاجرة إلى زوجها أو فراش زوجها لعنتها الملائكة حتى ترجع } .
ومن طريق أحمد بن شعيب نا هناد بن السري عن ملازم بن عمرو نا عبد الله بن بدر عن قيس بن طلق عن أبيه طلق بن علي قال : سمعت رسول الله صلى الله عليه وآله وسلم يقول : { إذا دعا الرجل زوجته لحاجته فلتأته وإن كانت على التنور } .
এবারে আসুন ফতোয়াটি বাংলা অনুবাদ দেখি, ( AI দ্বারা অনুদিত )
ফতোয়া নম্বর ১৮৮৩
দাসী এবং স্ত্রী — উভয়ের জন্যই স্বামী বা মালিক যখন যৌন সম্পর্কের জন্য আহ্বান জানায়, তখন তা মেনে নেওয়া আবশ্যক।
যদি স্ত্রী ঋতুমতী না হয়, প্রসূতি অবস্থায় না থাকে, অসুস্থ না হয়, অথবা কোনো বৈধ অজুহাত ছাড়া অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে সে গোনাহগার ও অবাধ্য (ناشزة/নাশিজা) হিসেবে গণ্য হবে।
এ ব্যাপারে মুসলিম ইমাম ইবনু আবী উমর আল-মারওয়ান, ইবনু মু’আবিয়া আল-ফারাযী, ইয়াজীদ ইবনু কিসান, আবূ হাযিম, এবং আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“যে পুরুষ তার স্ত্রীকে শয্যায় ডাকে, আর স্ত্রী অস্বীকার করে, ফলে স্বামী রাগ করে রাত কাটায়—তাহলে আসমানের ফেরেশতারা সকাল পর্যন্ত তাকে অভিশাপ দিতে থাকে।”
(সহীহ হাদিস: বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত)
হাম্মাম ইবন আব্বাস, ইবন আসবাহ, মুহাম্মদ ইবন আবদুল মালিক, ইবন আইয়ূব, ইবন জাহাদ, ইবন মাসউদ ইত্যাদি রাবিদের সূত্রেও এসেছে।
শা’বী থেকে হাদিস: আয়েশা (রা.) বলেছেন, নবী ﷺ বলেছেন:
“যদি কোনো নারী রাত কাটায় এভাবে যে তার স্বামী তার শয্যা থেকে তাকে ডাকছে অথচ সে সাড়া দেয়নি, তাহলে ফেরেশতারা তাকে সকাল পর্যন্ত অভিশাপ দিতে থাকে।”
অন্য সূত্রে আলী (রা.) বলেছেন: আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ -কে বলতে শুনেছি:
“যখন কোনো পুরুষ তার স্ত্রীকে শয্যায় আহ্বান করে, আর সে অস্বীকৃতি জানায়, তখন আসমানের মালিক (আল্লাহ) তার প্রতি ক্রোধান্বিত থাকেন, যতক্ষণ না সে স্বামীর ডাকে সাড়া দেয়।”
সারসংক্ষেপঃ
স্ত্রী বা দাসী উভয়ের জন্য স্বামী/মালিকের যৌন আহ্বান প্রত্যাখ্যান করা বৈধ নয়, যদি না কোনো বৈধ শরয়ী অজুহাত থাকে।
অকারণে অস্বীকার করলে ফেরেশতাদের লানত ও আল্লাহর ক্রোধের শিকার হতে হবে।
এই হাদিসগুলোকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করে ফিকহবিদরা স্ত্রীর ওপর স্বামীর যৌন অধিকারের বাধ্যতামূলকতা প্রতিষ্ঠা করেছেন।


এসব ফতোয়া থেকে স্পষ্ট হয় যে ইসলামি শরিয়াহ স্ত্রী বা দাসীর সম্মতি অস্বীকার করে এবং যৌন সম্পর্ককে স্বামী বা প্রভুর আইনগত অধিকার হিসেবে ঘোষণা করে।
বিশেষ কারণে স্ত্রীকে গোলামের মতো পেটাতে নিষেধ
কিছু হাদিসে নবী মুহাম্মদ স্ত্রীদেরকে “গোলামের মতো” বা “দাসীর মতো”, আবার অনেক হাদিসে “গৃহপালিত পশুর মতো” প্রহার করতে নিষেধ করেছেন। এই বক্তব্যকে অনেক সময় স্ত্রী-নির্যাতনের বিরুদ্ধে ইসলামের অবস্থান দেখাবার জন্য ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বর্ণনাটির ভেতরের যুক্তি লক্ষ্য করলে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে দাঁড়ায়। সেখানে স্ত্রীদেরকে “গোলামের মতো” বা “দাসীর মতো”, আবার অনেক হাদিসে “গৃহপালিত পশুর মতো” মারতে নিষেধ করার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, দিনের শেষে সেই স্ত্রীর সঙ্গেই আবার সহবাস করতে হবে। অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞার ভিত্তি স্ত্রীর মানবিক মর্যাদা, শারীরিক নিরাপত্তা বা সহিংসতার নৈতিক প্রত্যাখ্যান নয়; বরং অতিরিক্ত প্রহারের ফলে স্বামীর পরবর্তী যৌনসম্পর্কে অসুবিধা হতে পারে—এই ব্যবহারিক বিবেচনা।
এই ধরনের ভাষ্য প্রহারকে নীতিগতভাবে অস্বীকার করে না। বরং প্রহারের মাত্রা এমন পর্যায়ে না নেওয়ার পরামর্শ দেয়, যাতে স্ত্রী পরে স্বামীর যৌন চাহিদা পূরণে অনাগ্রহী হয়ে পড়ে। এতে নারী একজন স্বাধীন ব্যক্তি হিসেবে নয়, স্বামীর বৈবাহিক ভোগাধিকারভুক্ত সত্তা হিসেবেই বিবেচিত হয়। তার ওপর সহিংসতা চালানো যাবে কি না, সেটি মুখ্য নয়; মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়, সহিংসতার পরও স্বামীর যৌন সুবিধা অক্ষুণ্ণ থাকবে কি না। তাই এই বর্ণনাকে স্ত্রী-নির্যাতনবিরোধী নৈতিক ঘোষণা হিসেবে পড়া যায় না। এটি বরং সীমিত প্রহারের ধারণাকে ধরে রেখে মাত্রাতিরিক্ত প্রহারের অসুবিধা ব্যাখ্যা করে। স্ত্রীকে দাসীর মতো না মারার নির্দেশ এখানে স্ত্রীর শরীরের প্রতি সম্মান থেকে আসেনি; সহবাস বিষয়ে তার মতামতের ক্ষেত্রে আসেনি, এসেছে সেই শরীরের ওপর স্বামীর পরবর্তী প্রবেশাধিকার বজায় রাখার হিসাব থেকে [16] –

এবার একই বক্তব্য আরেকটি হাদিসগ্রন্থ থেকে পড়া যাক, যেখানে স্ত্রীকে গোলামের মতো প্রহার করতে নিষেধ করার কারণটি আরও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। হাদিসটির একটি বর্ণনা অনুসারে, গোলামের মতো প্রহার করলে স্ত্রী দিনের শেষে সহবাসে অনাগ্রহ প্রকাশ করতে পারে। [17]
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১৩: বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ – স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৪২-[৫] ‘আব্দুল্লাহ ইবনু যাম্‘আহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যেন ক্রীতদাসীর ন্যায় স্ত্রীকে না মারে (অত্যাচার না করা হয়), অথচ দিনের শেষেই তার সাথে সহবাস করে।
অপর বর্ণনায় আছে- তোমাদের কেউ যেন ইচ্ছা করে স্ত্রীকে ক্রীতদাসীর ন্যায় মারমুখো না হয়, হয়তো দিন শেষে তার সাথে সহবাস করতে চাইবে; আর এতে সে অনাগ্রহ প্রকাশ করবে। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বায়ু নির্গত হওয়ায় হাসি-ঠাট্টাচ্ছলের কারণে উপদেশ করলেন, যে কাজ নিজে কর অন্যের সে কাজে তোমরা কেন হাসবে! (বুখারী ও মুসলিম)[1]
[1] সহীহ : বুখারী ৪৯৪২, মুসলিম ১৪৭০।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু যাম‘আহ (রাঃ)
এই বর্ণনায় স্ত্রীকে প্রহার করার নৈতিকতা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হয়নি। বরং অতিরিক্ত প্রহারের অসংগতিকে বোঝাতে বলা হয়েছে, একই ব্যক্তি দিনের বেলায় স্ত্রীকে দাসীর মতো মারবে এবং দিনের শেষেই আবার তার সঙ্গে সহবাস করবে। অন্য বর্ণনায় বিষয়টি আরও স্পষ্ট: এমন প্রহারের পর স্ত্রী সহবাসে অনাগ্রহী হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ উদ্বেগের কেন্দ্রে নির্যাতিত নারীর যন্ত্রণা নয়, বরং নির্যাতনের ফলে স্বামীর যৌনপ্রাপ্তি ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা।
এখানে “দাসীর মতো” প্রহার নিষিদ্ধ করার অর্থ স্ত্রীকে কোনোভাবেই প্রহার করা যাবে না—এমন নয়। বরং দাসীর মতো কঠোর বা মাত্রাতিরিক্ত প্রহার না করার কথা বলা হচ্ছে। ফলে বর্ণনাটি স্ত্রী প্রহারের বিরুদ্ধে সার্বিক নিষেধাজ্ঞা প্রতিষ্ঠা না করে, বৈধ প্রহারের একটি সীমা নির্ধারণ করে। আর সেই সীমা নির্ধারণের অন্যতম ব্যবহারিক কারণ হলো, স্ত্রীকে এমন অবস্থায় না পৌঁছানো যাতে সে পরে স্বামীর সঙ্গে সহবাসে অনাগ্রহী হয়ে পড়ে।
ঘৃণা সত্ত্বেও বিছানায় আসতে বাধ্য স্ত্রী
স্ত্রী স্বামীর সঙ্গে যৌনসম্পর্কে অনিচ্ছুক হলে তাকে কীভাবে বাধ্য করা যাবে, প্রাচীন ইসলামি ফিকহে তার একটি স্পষ্ট বিবরণ পাওয়া যায় আছ-ছাওরীর সূত্রে বর্ণিত মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক হাদিস গ্রন্থের ১১,৮৭৮ নম্বর বর্ণনায়। এখানে স্ত্রীর অবাধ্যতা সংশোধনের জন্য প্রথমে উপদেশ, পরে কথা বলা বন্ধ করা ও কঠোর ভাষা প্রয়োগ এবং শেষ পর্যন্ত প্রহারের বিধান দেওয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত লক্ষ্যও অস্পষ্ট রাখা হয়নি: স্ত্রী স্বামীকে ঘৃণা করলেও তাকে বিছানায় আসতে হবে। বিছানায় উপস্থিত হয়ে যৌন আনুগত্য প্রদর্শন করলেই তাকে অনুগত হিসেবে গণ্য করা হবে [18]।
উল্লেখ্য, নিচে সংরক্ষিত বাংলা অনুবাদের একটি বাক্য যথাযথ নয়। সেখানে “هَجَرَهَا بِلِسَانِهِ” অংশটির অনুবাদ করা হয়েছে, “সে তার জিহ্বার মাধ্যমে তাকে বর্জন করবে।” এটি বাংলায় অস্পষ্ট ও আক্ষরিক অনুবাদ। এর সঠিক অর্থ হবে: “সে তার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করবে এবং এ বিষয়ে তার সঙ্গে কঠোর ভাষায় কথা বলবে।” হাদিসের সম্পূর্ণ বর্ণনাটি নিচে দেওয়া হলো—
হাদিস ১১,৮৭৮
মূল আরবি
عَنِ الثَّوْرِيِّ قَالَ: قَالَ أَصْحَابُنَا: ” يَبْدَأُ فَيَعِظُهَا فَإِنْ قَبِلَتْ، وَإِلَّا هَجَرَهَا بِلِسَانِهِ، وَأَغْلَظَ لَهَا فِي ذَلِكَ، فَإِنْ قَبِلَتْ وَإِلَّا ضَرَبَهَا ضَرْبًا غَيْرَ مُبَرِّحٍ، فَإِنْ أَطَعْنَكُمْ [النساء: 34] أَتَتِ الْفِرَاشَ وَهِيَ تَبْغَضُكَ فَلَا تَبْغُوا عَلَيْهِنَّ سَبِيلًا [النساء: 34] “
বাংলা অনুবাদ
আছ-ছাওরী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমাদের সাথীগণ বলেছেন, সে (স্বামী) প্রথমে তাকে নসীহত করবে। যদি সে মেনে নেয় (তবে ভালো)। অন্যথায়, সে তার জিহ্বার মাধ্যমে তাকে বর্জন করবে এবং এ বিষয়ে তার প্রতি কঠোরতা অবলম্বন করবে। যদি সে মেনে নেয় (তবে ভালো)। অন্যথায়, সে তাকে হালকা প্রহার করবে, যা আঘাতের চিহ্ন ফেলে না। আর (আল্লাহর বাণী) “ফাইন আতা’নাকুম[সূরা আন-নিসা: ৩৪]” (এর অর্থ হলো): সে বিছানায় আসবে, যদিও সে তোমাকে ঘৃণা করে। (তখন তোমরা তাকে আর কিছু বলবে না), “ফালা তাবগু আলাইহিন্না সাবীলান[সূরা আন-নিসা: ৩৪]” (সুতরাং তোমরা তাদের বিরুদ্ধে অন্যায় পথ অনুসন্ধান করো না)।
এই বর্ণনায় প্রহারের সঙ্গে যৌন আনুগত্যের সম্পর্ক সরাসরি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। স্ত্রী কেন স্বামীর বিছানায় যেতে চাইছে না, তার মানসিক অবস্থা কী, স্বামীর প্রতি তার অনিচ্ছা বা ঘৃণার কারণ কী, এসবের কোনো মূল্য এখানে নেই। বরং স্ত্রী বিছানায় না এলে তাকে প্রথমে মানসিক চাপ, পরে মৌখিক কঠোরতা এবং শেষ পর্যন্ত শারীরিক প্রহারের মাধ্যমে বাধ্য করার কথা বলা হয়েছে। সে স্বামীকে ঘৃণা করলেও বিছানায় উপস্থিত হলেই তাকে “অনুগত” হিসেবে গণ্য করা হবে। অর্থাৎ স্ত্রীর আন্তরিক ইচ্ছা বা যৌন সম্মতি নয়, তার শারীরিক আত্মসমর্পণই এই ফিকহি ব্যবস্থায় আনুগত্যের চূড়ান্ত মানদণ্ড। আসুন একই হাদিস গ্রন্থ থেকে আরেকটি বর্ণনা পড়ি, [19]
হাদিস ১৭,৯৭৪
মূল আরবি
عَنْ مَعْمَرٍ، عَنِ الزُّهْرِيِّ قَالَ: «لَا تُقَادُ الْمَرْأَةُ مِنْ زَوْجِهَا فِي الْأَدَبِ» يَقُولُ: «لَوْ ضَرَبَهَا فَشَجَّهَا، وَلَكِنْ إِنِ اعْتَدَى عَلَيْهِا فَقَتَلَهَا كَانَ الْقَوَدُ»
বাংলা অনুবাদ
আয-যুহরী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: নারীকে তার স্বামীর বিরুদ্ধে শিষ্টাচারমূলক প্রহারের ক্ষেত্রে কিসাস (প্রতিশোধ) নেওয়া যাবে না। তিনি আরো বলেন: যদি স্বামী তাকে প্রহার করে এবং জখমও করে ফেলে, (তবুও কিসাস হবে না)। তবে যদি সে (স্বামী) তার উপর বাড়াবাড়ি করে এবং তাকে হত্যা করে ফেলে, তবে কিসাস ওয়াজিব হবে।
সম্মতি বা কনসেন্টের বর্তমান সময়ের ধারণায় ভয়, ধর্মীয় হুমকি, পারিবারিক শাস্তি কিংবা শারীরিক প্রহারের মুখে দেওয়া যৌন সম্মতি কোনো স্বাধীন সম্মতি নয়। এখানে স্বামী নিজে প্রহারের ক্ষমতা প্রয়োগ করছে এবং প্রহারের পর স্ত্রীকে সেই একই ব্যক্তির বিছানায় যেতে হচ্ছে। ফলে এটি পারস্পরিক ভালোবাসা বা স্বেচ্ছামূলক দাম্পত্য সম্পর্কের বিধান নয়; এটি সহিংসতা প্রয়োগ করে যৌন আনুগত্য আদায়ের একটি সুস্পষ্ট কাঠামো। “অপ্রচণ্ড” বা “গুরুতর আঘাত সৃষ্টি করে না”—এমন বিশেষণ প্রহারকে সম্মতিতে রূপান্তরিত করে না। মারধরের মাত্রা কম হলেও তার উদ্দেশ্য যদি স্ত্রীর যৌন প্রত্যাখ্যান ভেঙে তাকে বিছানায় নিয়ে আসা হয়, তবে সেটি বলপ্রয়োগমূলক যৌনতারই ধর্মীয় ও আইনগত অনুমোদন।
এই বর্ণনাটি নবী মুহাম্মদের সরাসরি উক্তি বা কোনো নির্দিষ্ট সাহাবীর ব্যক্তিগত ঘটনার বিবরণ নয়; এটি আছ-ছাওরীর সূত্রে সংরক্ষিত প্রাচীন ফিকহি অবস্থান। কিন্তু ঠিক এই কারণেই এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। এটি দেখায় যে সহবাসে অস্বীকৃতির কারণে স্ত্রীকে প্রহার এবং ঘৃণা সত্ত্বেও বিছানায় আসতে বাধ্য করার ব্যাখ্যা কোনো সাম্প্রতিক উগ্র ফতোয়া নয়; ইসলামের প্রাথমিক ফিকহি চিন্তাতেই এই ধারণা সুস্পষ্টভাবে উপস্থিত ছিল।
স্বামীর যৌন চাহিদার সামনে স্ত্রীর ইবাদতও অধস্তন
ইসলামী বৈবাহিক কাঠামোতে স্বামীর যৌন চাহিদাকে কতটা প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, তার একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ পাওয়া যায় সাফওয়ান ইবনু মুআত্তালের স্ত্রীসংক্রান্ত সহীহ ইবনু হিব্বান এর একটি বর্ণনায়। একজন নারী সরাসরি মুহাম্মদের কাছে অভিযোগ করেছিলেন যে তাঁর স্বামী নামাজ পড়ার সময় তাঁকে প্রহার করেন এবং রোজা রাখলে তাঁর রোজা ভেঙে দেন। স্বামী প্রহারের অভিযোগ অস্বীকার করেননি; বরং ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন যে স্ত্রী নামাজে দুটি সূরা পড়েন, যদিও তিনি তাঁকে তা করতে নিষেধ করেছিলেন। রোজা ভাঙানোর কারণ হিসেবে তিনি আরও স্পষ্টভাবে বলেন, স্ত্রী ঘন ঘন রোজা রাখেন, অথচ তিনি একজন যুবক এবং যৌন সংযম করতে পারেন না [20]
হাদিস ১,৪৮৬
মূল আরবি
أَخْبَرَنَا أَحْمَدُ بْنُ عَلِيِّ بْنِ الْمُثَنَّى، حَدَّثَنَا أَبُو خَيْثَمَةَ، حَدَّثَنَا جَرِيرٌ، عَنِ الْأَعْمَشِ، عَنْ أَبِي صَالِحٍ، عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ، قَالَ: جَاءَتِ امْرَأَةٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَتْ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّ زَوْجِي صَفْوَانَ بْنَ الْمُعَطَّلِ يَضْرِبُنِي إِذَا صَلَّيْتُ، وَيُفَطِّرُنِي إِذَا صُمْتُ، وَلَا يُصَلِّي صَلَاةَ الْفَجْرِ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ، قَالَ: – وَصَفْوَانُ عِنْدَهُ – فَسَأَلَهُ عَمَّا قَالَتْ، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَمَّا قَوْلُهَا: يَضْرِبُنِي إِذَا صَلَّيْتُ، فَإِنَّهَا تَقْرَأُ بِسُورَتِي وَقَدْ نَهَيْتُهَا عَنْهَا، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَوْ كَانَتْ سُورَةً وَاحِدَةً لَكَفَتِ النَّاسَ»، قَالَ: وَأَمَّا قَوْلُهَا: يُفَطِّرُنِي إِذَا صُمْتُ، فَإِنَّهَا تَنْطَلِقُ فَتَصُومُ، وَأَنَا رَجُلٌ شَابٌّ وَلَا أَصْبِرُ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَئِذٍ: «لَا تَصُومُ امْرَأَةٌ إِلَّا بِإِذْنِ زَوْجِهَا»، قَالَ: وَأَمَّا قَوْلُهَا: لَا أُصَلِّي حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ، فَإِنَّا أَهْلُ بَيْتٍ لَا نَكَادُ نَسْتَيْقِظُ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ، فَقَالَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «فَإِذَا اسْتَيْقَظْتَ فَصَلِّ».
বাংলা অনুবাদ
আবূ সাঈদ খুদরী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক নারী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আমার স্বামী সাফওয়ান বিন মুআত্তাল, যখন আমি সালাত আদায় করি, তখন তিনি আমাকে প্রহার করেন; আমি যখন সিয়াম রাখি, তখন তিনি আমার সিয়াম ভেঙে দেন; এবং সূর্য উদিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি ফজরের সালাত আদায় করেন না। এই সময় সাফওয়ান তাঁর কাছেই উপস্থিত ছিলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে তাঁর স্ত্রীর অভিযোগ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, তার বক্তব্য—“যখন আমি সালাত আদায় করি, তখন তিনি আমাকে প্রহার করেন”—এর কারণ হলো, সে নামাজে দুটি সূরা পড়ে, অথচ আমি তাকে তা করতে নিষেধ করেছি। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যদি একটি সূরা হতো, তবে সেটিই মানুষের জন্য যথেষ্ট হতো।” সাফওয়ান বলেন, তার অভিযোগ—“আমি যখন সিয়াম রাখি, তখন তিনি আমার সিয়াম ভেঙে দেন”—এর কারণ হলো, সে একের পর এক সিয়াম রাখে, অথচ আমি একজন যুবক এবং আমি সংযম করতে পারি না। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “কোনো নারী তার স্বামীর অনুমতি ছাড়া নফল সিয়াম পালন করবে না।” সাফওয়ান বলেন, তার অভিযোগ—“তিনি সূর্য উদিত না হওয়া পর্যন্ত ফজরের সালাত আদায় করেন না”—এর কারণ হলো, আমরা এমন পরিবারের মানুষ, যারা প্রায়ই সূর্য উদিত না হওয়া পর্যন্ত জাগতে পারি না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যখন তুমি জাগ্রত হবে, তখনই সালাত আদায় করে নেবে।”
তথ্যসূত্র: মুসনাদ আহমাদ ৩/৮০; সুনান আবু দাউদ ২৪৫৯; তাহাবী, মুশকিলুল আসার ২/৪২৪; আল-হাকিম ১/৪৩৬। শুআইব আল-আরনাউত সনদটিকে বুখারী ও মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহিহ বলেছেন। নাসিরুদ্দিন আলবানীও বর্ণনাটিকে সহিহ বলেছেন—সহিহ আবু দাউদ ২১২২; আস-সিলসিলাতুস সহীহাহ ৩৯৫।
এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নারীটির অভিযোগ শুনে মুহাম্মদ তাঁর স্বামীকে স্ত্রী প্রহারের জন্য তিরস্কার বা শাস্তি দেননি। স্বামী নিজেই স্বীকার করেছেন যে স্ত্রী নামাজে তাঁর নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি পাঠ করায় তিনি তাঁকে মারতেন। অথচ প্রতিক্রিয়ায় প্রহারকে অন্যায় ঘোষণা না করে স্ত্রী কতটুকু সূরা পড়বেন, সেই বিষয়ে স্বামীর অভিযোগকেই কার্যত গ্রহণ করা হয়েছে। এর ফলে একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর ব্যক্তিগত ইবাদতও স্বামীর নিয়ন্ত্রণ ও শারীরিক শাস্তির আওতায় পড়ে যায়। স্বামীর নির্দেশ অমান্য করে নামাজ দীর্ঘ করলে প্রহার—এমন আচরণের বিরুদ্ধে বর্ণনায় কোনো নৈতিক আপত্তি পাওয়া যায় না।
রোজার ঘটনাটি আরও প্রত্যক্ষভাবে স্বামীর যৌন অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। সাফওয়ান বলেছিলেন, তাঁর স্ত্রী ঘন ঘন রোজা রাখেন, অথচ তিনি একজন যুবক এবং যৌন সংযম করতে পারেন না। অর্থাৎ স্ত্রী রোজা রাখলে দিনের বেলায় স্বামী তাঁর সঙ্গে যৌনসম্পর্ক স্থাপন করতে পারবেন না—এটিই তাঁর অভিযোগের মূল কারণ। মুহাম্মদ এই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেননি এবং বলেননি যে স্ত্রীর নিজের শরীর ও ইবাদতের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে। বরং বিধান দিয়েছেন, স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রী নফল রোজা রাখতে পারবে না। ফলে স্ত্রীর ধর্মীয় সাধনা, শারীরিক স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত—সবকিছুর ওপর স্বামীর সম্ভাব্য যৌন চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
এই হাদিসে সরাসরি বলা হয়নি যে সাফওয়ান স্ত্রীকে ধরে জোরপূর্বক সহবাস করেছিলেন। কিন্তু এতে যে ক্ষমতার কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা দ্ব্যর্থহীন। স্ত্রী রোজা রাখার সিদ্ধান্ত নিলে স্বামী সেই রোজা ভাঙিয়ে দিতে পারেন, কারণ তাঁর যৌন চাহিদা রয়েছে; আর স্ত্রী স্বামীর অনুমতি ছাড়া পুনরায় নফল রোজা রাখতেও পারবেন না। অর্থাৎ বিবাহের মাধ্যমে স্বামী স্ত্রীর দেহের ওপর এমন একটি স্থায়ী যৌন অগ্রাধিকার লাভ করছেন, যার কারণে স্ত্রীর আল্লাহর উদ্দেশ্যে করা ব্যক্তিগত ইবাদতও তাঁর অনুমতির অধীন হয়ে যায়। আধুনিক ভাষায় এটি সমান অংশীদারত্ব নয়; এটি স্ত্রীর শরীর ও সময়ের ওপর স্বামীর প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ।
আরও লক্ষণীয়, একই ঘটনার মধ্যে স্ত্রী প্রহারের অভিযোগ, রোজা ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ এবং স্বামীর যৌন অসংযমের বক্তব্য পাশাপাশি এসেছে। তারপরও সিদ্ধান্তের ভার প্রধানত স্ত্রীর ওপরই চাপানো হয়েছে—সে নামাজ সংক্ষিপ্ত করবে এবং স্বামীর অনুমতি ছাড়া নফল রোজা রাখবে না। স্বামীর প্রহার বা নিজের যৌন আকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণে অক্ষমতাকে সমানভাবে নৈতিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। এর ফলে সহিংস স্বামীর আচরণ সংশোধিত না হয়ে স্ত্রীকেই এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত করা হয়েছে, যেন তাঁর ইবাদত ও শরীরের ব্যবহার স্বামীর সুবিধার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। এই বর্ণনা দেখায়, ইসলামী বৈবাহিক কাঠামোয় স্ত্রীর ব্যক্তিস্বাধীনতার তুলনায় স্বামীর কর্তৃত্ব ও যৌন সুবিধাই অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ।
বিবাহ আসলে স্বামীর দাসী হওয়ার নামান্তর
ইসলামের ইতিহাসে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মুসলিম দার্শনিক ইমাম আবু হামেদ মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ আল-গাযযালী রচিত ‘এহইয়াউ উলুমিদ্দীন’ বিগত আট শতাধিক বছর ধরে সমগ্র মুসলিম জাহানে সর্বাধিক পঠিত একটি মহাগ্রন্থ। আজ পর্যন্ত মুসলিমদের মধ্যে এ গ্রন্থটি একটি অনন্য এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী গ্রন্থ হিসেবে গণ্য করা হয় । এই গ্রন্থে স্ত্রীর ওপর স্বামীর হক পরিচ্ছেদে বলা আছে, স্ত্রী হওয়া আসলে স্বামীর দাসী হোওয়ারই নামান্তর। তাই একজন মুসলিম নারীর সদাসর্বদাই স্বামীর প্রভুত্ব মেনে তার দাসীর মতই জীবন যাপন করা উচিত [21]
স্ত্রীর উপর স্বামীর হক: এক্ষেত্রে চূড়ান্ত কথা, বিবাহ প্রকারান্তরে বাঁদী হওয়ার নামান্তর বিধায় স্ত্রী যেন স্বামীর বাঁদী হয়ে যায়। সুতরাং স্বামীর আনুগত্য করা সর্বাবস্থায় তার উপর ওয়াজিব। স্ত্রীর উপর স্বামীর হক যে বেশী, এ সম্পর্কে অনেক হাদীস বর্ণিত আছে।
রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন:
ايما امرأة ماتت وزوجها عنها راض دخلت الجنة .
অর্থাৎ, যে স্ত্রী এমতাবস্থায় মারা যায় যে, তার স্বামী তার প্রতি সন্তুষ্ট, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
কোন এক ব্যক্তি সফরে যাওয়ার সময় স্ত্রীকে বলে গেল: উপর তলার কক্ষ থেকে নীচে নামবে না। নীচে তার পিতা বসবাস করত। ঘটনাক্রমে সে অসুস্থ হয়ে পড়ল। স্ত্রী নীচে পিতার কাছে নামার অনুমতি চেয়ে রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাছে লোক পাঠালে তিনি বললেন: স্বামীর আদেশ পালন কর। শেষ পর্যন্ত পিতা মারা গেলে সে আবার অনুমতি ‘প্রার্থনা করল। রসূলুল্লাহ (সাঃ) আবার বললেন: স্বামীর আদেশ পালন কর। ফলে পিতা সমাধিস্থও হয়ে গেল; কিন্তু সে নীচে নামল না। অতঃপর রসূলুল্লাহ (সাঃ) এই মহিলাকে বলে পাঠালেন: তুমি যে স্বামীর আদেশ পালন করেছ, এর বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা তোমার পিতার মাগফেরাত করেছেন। অন্য এক হাদীসে আছে:
اذا صلت المرأة خمسها وصامت شهرها وحفظت فرجها
واطاعت زوجها دخلت جنة ربها
অর্থাৎ, যখন স্ত্রী পাঞ্জেগানা নামায পড়ে, রমযান মাসের রোযা রাখে, আপন গুপ্ত অঙ্গের হেফাযত করে এবং স্বামীর আনুগত্য করে, তখন সে তার পালনকর্তার জান্নাতে প্রবেশ করবে।
এ হাদীসে স্বামীর আনুগত্যকে ইসলামের রোকনসমূহের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে। একবার রসূলুল্লাহ (সাঃ) মহিলাদের আলোচনা প্রসঙ্গে বললেন: গর্ভবতী নারী, সন্তান প্রসবকারিণী নারী, দুগ্ধদানকারিণী নারী, সন্তানদের প্রতি দয়াশীলা নারী, স্বামীর সাথে যে অসদাচারণ করে, যদি তা না করত, তবে তাদের মধ্যে যারা নামাযী, তারা জান্নাতে প্রবেশ করত। এক হাদীসে তিনি বলেন:
اطلعت في النار فاذا اكثر اهلها النساء فقلن لم يا
رسول الله قال يكثرن اللعن ويكفرن العشيرة .
অর্থাৎ, আমি দোযখে উঁকি দিয়ে দেখলাম, তার অধিকাংশ বাসিন্দাই মহিলা। মহিলারা আরজ করল: ইয়া রসূলাল্লাহ্, এর কারণ কি? তিনি বললেন: মহিলারা অভিসম্পাত বেশী করে এবং স্বামীদের না-শোকরী করে।
অন্য এক হাদীসে বলা হয়েছে, আমি জান্নাতে উঁকি দিয়ে দেখলাম, তাতে পুরুষ জান্নাতীদের তুলনায় মহিলাদের সংখ্যা খুব নগণ্য। আমি জিজ্ঞেস করলাম: মহিলারা কোথায়? উত্তর হল: দু’টি লাল বস্তু তাদের জান্নাতে আসার পথে বাধা হয়েছে। একটি স্বর্ণ ও অপরটি জাফরান। অর্থাৎ, অলংকার ও রঙ্গিন পোশাক। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন: কোন এক যুবতী রসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর খেদমতে হাযির হয়ে আরজ করল: ইয়া রসূলাল্লাহ্, আমি যুবতী। মানুষ আমার কাছে বিবাহের প্রস্তাব দেয়, কিন্তু বিবাহ আমার কাছে ভাল লাগে না। এখন জানতে চাই, স্ত্রীর উপর স্বামীর হক কি? তিনি বললেন: ধরে নেয়া যাক, স্বামীর আপাদমস্তক পুঁজে ভর্তি। যদি স্ত্রী এই পুঁজ চেটে নেয়, তবুও তার শোকর আদায় করতে পারবে না। মহিলা বলল: আমি বিবাহ করব কি? তিনি বললেনঃ করে নাও। বিবাহ করা উত্তম। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন: খাসআম গোত্রের জনৈকা মহিলা রসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর খেদমতে এসে আরজ করল : আমি স্বামীহীনা, বিবাহ করতে চাই। এখন স্বামীর হক কি, জানতে চাই। তিনি বললেন: স্বামীর এক হক, সে-যদি উটের পিঠে থেকেও সহবাস করার ইচ্ছা প্রকাশ করে, তবে স্ত্রী অস্বীকার করতে পারবে না। আরেক হক, কোন বস্তু তার গৃহ থেকে তার অনুমতি ব্যতীত কাউকে দেবে না। দিলে তুমি রোযা রেখে কেবল ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্তই থাকবে। তোমার রোযা কবুল হবে না। যদি তুমি স্বামীর আদেশ ছাড়া ঘর থেকে বের হও, তবে ঘরে ফিরে না আসা পর্যন্ত এবং তওবা না করা পর্যন্ত ফেরেশতারা তোমার প্রতি অভিসম্পাত করতে থাকবে। এক হাদীসে আছে-
لو امرت احد أن يسجد لأحد لأمرت المرأة أن تسجد
لزوجها .
অর্থাৎ, যদি আমি কাউকে সেজদা করার নির্দেশ করতাম, তবে অবশ্যই স্ত্রীকে নির্দেশ করতাম যেন সে তার স্বামীকে সেজদা করে।
এরূপ বলার কারণ, স্ত্রীর উপর স্বামীর হক বেশী। রসূলে আকরাম (সাঃ) আরও বলেন: স্ত্রী আল্লাহ্র পবিত্র সত্তার অধিকতর নিকটবর্তী তখন হয়, যখন সে তার কক্ষের অভ্যন্তরে থাকে। স্ত্রীর পক্ষে গৃহের আঙ্গিনায় নামায পড়া মসজিদে নামায পড়া অপেক্ষা উত্তম। আর কক্ষের ভেতরকার কক্ষে নামায পড়া কক্ষের ভেতরে নামায পড়ার তুলনায় শ্রেয়ঃ। এটা বলার কারণ, স্ত্রীর অবস্থার উৎকৃষ্টতা ও অপকৃষ্টতা পর্দার উপর নির্ভরশীল। সুতরাং যে অবস্থায় পর্দা বেশী হবে, সে অবস্থাই তার জন্যে উত্তম। এ কারণেই রসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেন : المراة عورة فاذا خرجت استشرفها الشيطان )নারী হল নগ্নতা। সে যখন বের হয়



বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি
আসুন একটি ভিডিও দেখি। এই ভিডিওতে একজন শিশুকে প্রাপ্তবয়স্ক একজন পুরুষের সাথে বাবা মা জোর করে বিয়ে দিচ্ছে, যা ইসলামী শরীয়তে বৈধ [22]। ভাবুন তো, এই শিশু মেয়েটির সাথে বাসর রাতে কী ঘটতে যাচ্ছে?
এবারে আসুন একটি নিউজ পড়ি, [23] [24]
বৈবাহিক ধর্ষণে কিশোরীর মৃত্যু: এরপরও কেন এটি বৈধ?
ছবি: নূরনাহার ও তার স্বামী রাজিব খান।
গত ২৫ অক্টোবর টাঙ্গাইল থেকে আসা ১৪ বছরের এক কিশোরী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য মতে, তার মৃত্যুর কারণ ছিল যোনিপথে অত্যধিক রক্তক্ষরণ।
পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ভুক্তভোগীর নাম নূরনাহার। টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার কাউলজানি ইউনিয়নের কালিয়া গ্রামের মেয়ে নূরনাহার কালিয়া বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল। নূরনাহারের পরিবারের আর্থিক টানাপোড়েন লেগেই ছিল। তার বাবা-মা দুই জনেই দিনমজুর হিসেবে সারাদিন কাজ করেন। দিনমজুরির কাজে দিনের বড় একটা সময় তারা বাসার বাইরে থাকতেন। বাড়িতে থাকার সময়টুকু কাটত কলহে। এমন পরিবেশ থেকে নূরনাহারকে দূরে রাখার জন্য মাত্র চার বছর বয়সে তার নানা লাল খান তাকে নিজ বাড়িতে নিয়ে যান। নূরনাহার তার নানার কাছেই মানুষ হচ্ছিল। লাল খানই নূরনাহারকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। দিনমজুর হিসেবে পাওয়া সামান্য উপার্জন থেকে নাতনির লেখাপড়া ও অন্যান্য খরচ চালাতেন। মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে নূরনাহারের সুনাম ছিল। বার্ষিক পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে সে এ বছর অষ্টম শ্রেণিতে পড়া শুরু করেছিল।
কিন্তু বিধি বাম। করোনার আঘাতে লাল খানের ছোট্ট সংসার পর্যদুস্ত হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় গত ২০ সেপ্টেম্বর পার্শ্ববর্তী গ্রামের ৩৪/৩৫ বছরের রাজিব খানের সঙ্গে নূরনাহারের বাল্যবিয়ে হয়। অভিবাসী শ্রমিক রাজিব আরব আমিরাতে কাজ করেন। ছুটিতে দেশে এসেছিলেন। রাজিব ভালো উপার্জন করেন, এমন কথার ভিত্তিতে নূরনাহারের পরিবার রাজিবের সঙ্গে মেয়েকে বিয়ে দিতে আগ্রহী হয়। লাল খান ৩০ হাজার টাকা খরচ করে নাতনির বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭’র বিধান অনুযায়ী, নূরনাহারের বয়স বিবাহযোগ্য না হওয়ায় (১৮ বছর) উভয় পরিবার বিয়ে নিবন্ধন না করার সিদ্ধান্ত নেয়। বিয়ের পর নূরনাহার বাসাইল উপজেলার ফুলকি পশ্চিমপাড়া গ্রামে তার শ্বশুরবাড়িতে চলে যায়।
একটি পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে লাল খান বলেন, ‘আমার নাতনি আমাকে খবর দেয় যে, বিয়ের প্রথম রাত থেকেই তার রক্তক্ষরণ হচ্ছিল।’ রাজিব তার নববধূর উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা তো করেননি, বরং মেয়েটির গভীর ক্ষতকে উপেক্ষা করে তিনি সহবাস চালিয়ে যান। রক্তপাত না থামায় নূরনাহারের শাশুড়ি তাকে স্থানীয় কবিরাজি দাওয়াই এনে খাওয়ান। পরবর্তীতে নূরনাহারের অবস্থা সংকটাপন্ন হলে ২২ অক্টোবর টাঙ্গাইলের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে তাকে নেওয়া হয় এবং সুকৌশলে পুত্রবধূর যাবতীয় দায়-দায়িত্ব বাপের বাড়ির লোকের ওপর বুঝিয়ে দিয়ে শ্বশুরবাড়ির লোকেরা চলে যান।
অবস্থার অবনতিতে মেয়েটিকে তারপর মির্জাপুরের কুমুদিনী হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসার খরচ মেটাতে নূরনাহারের পরিবার হিমশিম খাচ্ছিল। তখন পাড়া-প্রতিবেশীরা এগিয়ে এসে ৬০ হাজার টাকা জোগাড় করে পরিবারের হাতে তুলে দেয়। শেষ পর্যন্ত নূরনাহারকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে আনা নয়। কিন্তু, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। অবশেষে ২৫ অক্টোবর নূরনাহার পরাজয় স্বীকার করে। পরের দিন ময়নাতদন্ত শেষে নানাবাড়ির নিকটবর্তী স্থানীয় গোরস্থানে তার দাফনকার্য সম্পাদিত হয়। লাল খান তার নাতনির মৃত্যুর জন্য রাজিবকে দায়ী করেছেন। রাজীব তার সদ্যমৃত স্ত্রীর জানাজায় পর্যন্ত যাননি।
নূরনাহারের শাশুড়ি বিলকিস বেগমের বক্তব্য, ‘নূরনাহারকে জিনে ধরেছিল। তাই তার যোনিপথে এত রক্তক্ষরণ হয়েছে।’ বাসাইল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফিরোজুর রহমান সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, মেয়েদের প্রথম মিলনের ক্ষেত্রে ভয় ও আতঙ্ক বোধ করা খুবই স্বাভাবিক। তা ছাড়া, অপরিণত বয়সে বিয়ে হলে যোনিপথে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এসব ক্ষেত্রে রক্তক্ষরণ বন্ধ করার জন্য বিলম্ব না করে গাইনোকোলজিস্ট দেখানো জরুরি।
গ্রাম্য সালিশে নূরনাহারের শ্বশুরবাড়ির লোকেরা টাকা দিয়ে বিষয়টি ‘মিটমাট’ করে ফেলার প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে, জানা গিয়েছে যে, নূরনাহারের পরিবার বাসাইল থানায় শ্বশুরবাড়ির নামে অভিযোগ দাখিল করেছেন। প্রসঙ্গত, উল্লেখ্য যে, বাল্যবিবাহ সংঘটনের মাধ্যমে নূরনাহারের পরিবারের লোকেরাও বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭’র ৮ ধারা অনুযায়ী অপরাধী। যার জন্য তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে দুই বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডেই দণ্ডিত করা যায়।
নূরনাহারের পরিবারের একটিবারও মনে হয়নি যে, নূরনাহারের মতো একজন মেধাবী শিক্ষার্থী একদিন তাদের দারিদ্র্যের কষাঘাত থেকে মুক্তি এনে দেবে। তাদের কাছে মোটা টাকা কামানো প্রবাসী পাত্রের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেওয়াটাই বড় ছিল। অথচ নূরনাহারের নানা কিনা নিজ উদ্যোগে নাতনিকে স্কুলে পড়াচ্ছিলেন! আজও এ সমাজে মেয়ের বিয়ের কাছে তাদের লেখাপড়া, তাদের স্বনির্ভরতা, তাদের দক্ষতা অর্জন হেরে যাচ্ছে।
একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া জরুরি যে, নূরনাহার মারা গেছে তার বরের জবরদস্তিমূলক উপর্যুপরি সঙ্গমের কারণে। কিন্তু, দুঃখের বিষয় এই যে, বাংলাদেশের আইনে ১৩ বছরের বেশি বয়সের স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস ধর্ষণ বলে বিবেচিত না। রাজিবের এই পাশবিকতা আমাদের দণ্ডবিধি ১৮৬০’র ৩৭৫ ধারায় (যে ধারায় ধর্ষণের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে) অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে না। উপরন্তু, দণ্ডবিধির ৩৭৬ ধারা অনুযায়ী (যেখানে ধর্ষণের শাস্তি বর্ণিত হয়েছে) বৈবাহিক ধর্ষণের শাস্তি কেবল তখনই দেওয়া যেতে পারে, যখন স্ত্রীর বয়স ১২ বছরের কম হবে এবং সেই শাস্তির পরিমাণ মাত্র অনূর্ধ্ব দুই বছরের কারাদণ্ড বা জরিমানা।
এই আইনগুলো আমাদের দেশে ব্রিটিশ আমলে তৈরি করা। ঔপনিবেশিক শাসনকালে যখন ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতা সমাজের সর্বস্তরে বিরাজমান, তখন এই আইনের সৃষ্টি। ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতায় স্ত্রীকে তার ‘স্বামী’ অর্থাৎ মালিকের সহধর্মিণী না, বরং সম্পত্তি ভাবা হতো। সেই সমাজে নিজের স্ত্রীকে যথেচ্ছা ভোগ করার জন্য পুরুষকে দায়বদ্ধ করা ছিল অকল্পনীয়। এমন একটি রক্ষণশীল ধর্ষণের সংজ্ঞা আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির মতো আজও আগলে রেখেছি।
স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা নিরোধের জন্য এই পর্যন্ত তিন বার বিশেষ আইন প্রণীত হয়েছে। প্রথমে ১৯৮৩ সালে, এরপর ১৯৯৫ এবং সর্বশেষ ২০০০ সালে। কিন্তু, প্রতিবারই আমাদের আইন প্রণেতারা সজ্ঞানে দণ্ডবিধি থেকে বৈবাহিক ধর্ষণের দায়মুক্তি দেওয়া ওই ব্যতিক্রম ধারা বাতিলের পরিবর্তে বহাল রেখেছেন। এই আইনের হোতা যেই ব্রিটিশ, তারা কিন্তু সেই ১৯৯১ সালেই বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এমনকি পাকিস্তান (দেশভাগের পর ওই আইন পাকিস্তানেও বলবত ছিল) ২০০৬ সালে বৈবাহিক ধর্ষণের ওই ব্যতিক্রম ধারা বাতিল করেছে।
নারীর প্রতি সহিংসতা সংক্রান্ত জাতীয় জরিপের (২০১৫ সাল) তথ্য অনুযায়ী, বিবাহিত নারীদের ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ তাদের বৈবাহিক জীবনে স্বামীর কাছে জবরদস্তিমূলক সহবাসের পাশাপাশি অন্যান্য যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। অর্থাৎ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর কাছে সাক্ষাৎকার দেওয়া ১৯ হাজার ৯৮৭ জন নারীর মধ্যে পাঁচ হাজার ৩৯০ জন নারী বলেছেন, তাদের স্বামী তাদের ধর্ষণ করেছেন। ধর্ষণের ব্যতিক্রম ধারা বহাল রেখে আমরা এই নারীদের কী বার্তা দিচ্ছি?
আমরা বলছি যে, হাজারো নারী ও কিশোরী যারা নিঃসন্দেহে বৈবাহিক ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ও হচ্ছেন, তাদের বিচার চাওয়ার কোনো অধিকার নেই। আমাদের আইন আমাদের শেখাচ্ছে যে নারী আসলে তার স্বামীর সম্পত্তি। আমরা বলছি যে, কাবিননামায় সই করে বা কবুল বলে বা মন্ত্রপাঠে সাত পাঁকে বাঁধা পড়ে একজন নারী অনন্তকালের জন্য যৌন সম্পর্কের সম্মতি দিয়ে দিচ্ছেন। এ সম্মতি কখনো ফেরত নেওয়া যাবে না। নারীর শরীর খারাপ থাকুক, মর্জি না থাকুক, পরিবেশ না থাকুক, বর ‘চাহিবামাত্র’ নারীকে সহবাস করতেই হবে। তাকে রাজি হতে হবে না। তার রাজি-খুশি নিয়ে আইন চিন্তিত নয়। আমরা মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছি যে, নূরনাহারের মতো বাল্যবিয়ের শিকার হওয়া কিশোরীরা যখন জবরদস্তিমূলক যৌনসঙ্গমে মারা যাচ্ছে, সেই জবরদস্তিমূলক সহবাস আসলে ধর্ষণ না, কেবল এ কারণে যে ওই পুরুষটি মেয়েটির ‘স্বামী’। জোর করে বিয়ে দেওয়া হবে। তারপর জোর করে সহবাস করা হবে। কিন্তু নারী ‘না’ বলতে পারবে না।
রাজিব এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্যদের এখন যেই এক অপরাধের জন্য দায়ী করা যাবে, তা হলো বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের ৭ নম্বর ধারার অধীনে বাল্যবিবাহ করার অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানা। তবে, শাস্তি শুধু জরিমানাও হতে পারে। কাজেই, কোনো পুরুষ যদি মনে করে যে, বাল্যবিবাহের মাধ্যমে তিনি বৈধ উপায়ে প্রতি রাতে একটি বাচ্চা মেয়েকে সবরকম দায়মুক্তভাবে ভোগ (ধর্ষণ) করবে, তাহলে অন্তত আইনত তার সিদ্ধান্ত সঠিক। আমাদের সমাজে বিয়ে দিয়ে ঘাড় থেকে নামানোর মতো মেয়ের সংখ্যা তো কম নয়! কোনো থানা বা আদালতও বৈবাহিক ধর্ষণের অভিযোগ নিতে পারবে না, ইচ্ছা থাকলেও।
এটাই আমাদের আইন। এটাই আমাদের বাস্তবতা। আমাদের জানতে হবে। আমাদের ঘৃণা করতে হবে। আমাদের আপত্তি জানাতে হবে।
তাকবির হুদা, বাংলাদেশ লিগ্যাল অ্যাইড ও সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) গবেষণা বিশেষজ্ঞ

এবারে আসুন একটি ফেইসবুক স্ট্যাটাস দেখি। উল্লেখ্য, এরকম ফেসবুক স্ট্যাটাসের সংখ্যা অগণিত,

ভ্রাতৃত্বের নামে স্ত্রী উপহারঃ উদারতা নাকি অবমাননা?
ইসলামী ইতিহাসে মদিনার আনসার এবং মক্কার মুহাজিরদের মধ্যে স্থাপিত ‘ভ্রাতৃত্ব বন্ধন’ (মুয়াখাত)-কে এক অনন্য ত্যাগের নিদর্শন হিসেবে প্রচার করা হয়। তবে এই ত্যাগের আড়ালে নারীর মানবিক মর্যাদা ও সম্মতির অধিকারকে যেভাবে পদদলিত করা হয়েছে, তার এক ভয়াবহ চিত্র পাওয়া যায় সহিহ বুখারীর ৩৭৮০ নম্বর হাদিসে। বর্ণনায় দেখা যায়, সা’দ ইবনু রাবী‘ (রা.) তাঁর মুহাজির ভাই আবদুর রহমান ইবনু ‘আওফ (রা.)-কে প্রস্তাব দিচ্ছেন: “আমার দু’জন স্ত্রী রয়েছে, আপনার যাকে পছন্দ হয় বলুন, আমি তাকে তালাক দিয়ে দিব। ইদ্দত শেষে আপনি তাকে বিয়ে করে নিবেন” [25]। প্রথাগত ইসলামী আলোচনায় এটিকে সা’দ-এর চরম ‘উদারতা’ হিসেবে দেখা হলেও, আধুনিক মানবাধিকার ও যুক্তির নিরিখে এটি নারীকে একটি জড় বস্তু বা স্থাবর সম্পত্তির সমান্তরালে নামিয়ে আনার নামান্তর।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৩/ আনসারগণ [রাযিয়াল্লাহু ‘আনহুম]-এর মর্যাদা
পরিচ্ছেদঃ ৬৩/৩. নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক মুহাজির ও আনসারগণের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন।
৩৭৮০. ‘আবদুর রহমান ইবনু ‘আওফ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন মুহাজিরগণ মদিনা্য় আগমন করলেন, তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদুর রাহমান ইবনু ‘আউফ ও সা‘দ ইবনু রাবী‘ (রাঃ) এর মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন স্থাপন করে দিলেন। তখন তিনি [সা‘দ (রাঃ)] ‘আবদুর রাহমান (রাঃ) কে বললেন, আনসারদের মধ্যে আমিই সব থেকে বেশি সম্পদের অধিকারী। আপনি আমার সম্পদকে দু’ভাগ করে নিন। আমার দু’জন স্ত্রী রয়েছে, আপনার যাকে পছন্দ হয় বলুন, আমি তাকে তালাক দিয়ে দিব। ইদ্দত শেষে আপনি তাকে বিয়ে করে নিবেন। ‘আবদুর রহমান (রাঃ) বললেন, আল্লাহ আপনার পরিবারে এবং সম্পদে বরকত দান করুন। আপনাদের বাজার কোথায়? তারা তাঁকে বনূ কায়নুকার বাজার দেখিয়ে দিলেন। যখন ঘরে ফিরলেন তখন কিছু পনির ও কিছু ঘি সাথে নিয়ে ফিরলেন। এরপর প্রতিদিন সকাল বেলা বাজার যেতে লাগলেন। একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এমন অবস্থায় আসলেন যে, তাঁর শরীর ও কাপড়ে হলুদ রং এর চিহ্ন ছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ব্যাপার কী! তিনি (রাঃ) বললেন, আমি বিয়ে করেছি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, তাকে কী পরিমাণ মাহর দিয়েছ? তিনি বললেন, খেজুরের এক আঁটির পরিমাণ অথবা খেজুরের এক আঁটির ওজন পরিমাণ স্বর্ণ দিয়েছি। (২০৪৮) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৪৯৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৫০৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুর রহমান ইবনু ‘আওফ (রাঃ)
এই হাদিসটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে:
আধুনিক সভ্যতার চূড়ান্ত অর্জন হচ্ছে ব্যক্তির ‘শারীরিক অখণ্ডতা’ (Body Autonomy) এবং ‘সম্মতি’ (Consent)-কে পরম ও অলঙ্ঘনীয় অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। এই মানদণ্ডে বিচার করলে, একজন নারীকে তাঁর অস্তিত্ব, আবেগ এবং ইচ্ছা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে কেবল হস্তান্তরযোগ্য পণ্য হিসেবে বিলিয়ে দেওয়ার ঘটনাকে যখন কোনো ধর্মতাত্ত্বিক বয়ানে ‘মহৎ ত্যাগ’ বা ‘উদারতা’ হিসেবে মহিমান্বিত করা হয়, তখন তা কেবল নৈতিক স্খলন নয়—বরং একটি সামষ্টিক মানসিক বিকৃতির নামান্তর। এটি নগ্নভাবে উন্মোচিত করে যে, সপ্তম শতাব্দীর সেই কঠোর পুরুষতান্ত্রিক ও ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোতে নারীর অবস্থান ছিল স্রেফ একটি ‘স্থাবর সম্পত্তি’ বা ‘জৈবিক উপযোগবাদী বস্তু’র মতো। সেখানে একজন দাসেরও হয়তো নির্দিষ্ট শ্রমের অধিকার থাকতো, কিন্তু এই ঘটনায় নারীরা ছিলেন পুরুষদের মধ্যকার সামাজিক ও রাজনৈতিক মৈত্রীকে শক্তিশালী করার এক একটি সস্তা মাধ্যম মাত্র। যাকে যখন ইচ্ছা বন্ধুদেরকে উপহার দেয়া যেতো, বিনিময় করা যেতো।
সা’দ ইবনু রাবী‘ এবং আবদুর রহমান ইবনু ‘আওফ-এর মধ্যকার এই লেনদেনে নারীর নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ বা আবেগীয় অবস্থাকে সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ করা হয়েছে। একজন পুরুষ যখন আরেকজন পুরুষকে তাঁর দুই স্ত্রীর মধ্যে যাকে ‘পছন্দ’ তাকে বেছে নিতে বলেন, তখন সেখানে সেই নারীদের কোনো স্বাধীন মানবসত্তা অবশিষ্ট থাকে না; বরং তারা হাটে গরু-ছাগল কেনাবেচার মতো একটি অবমাননাকর পরিস্থিতির শিকার হন। এই তথাকথিত ‘ভ্রাতৃত্ব’ রক্ষার চুক্তিতে নারীর আত্মমর্যাদাকে যে চরম অবজ্ঞা করা হয়েছে, তা প্রমাণ করে যে তৎকালীন ইসলামী চিন্তাধারায় নারীকে কোনো সম্মানজনক অংশীদার হিসেবে নয়, বরং পুরুষের মর্জির ওপর নির্ভরশীল একটি ‘ব্যবহারযোগ্য সম্পদ’ হিসেবেই গণ্য করা হতো। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে এই পদ্ধতিগত অমানবিকীকরণকে নৈতিকতার পরাকাষ্ঠা হিসেবে প্রচার করা মূলত লিঙ্গীয় দাসত্বকে বৈধতা দেওয়ারই নামান্তর।
বৈবাহিক ধর্ষণ বিষয়ে আধুনিক মানবাধিকার
এই হাদিসগুলো এবং হাদিসের ব্যাখ্যাগুলোতে মূলত বলা হয়েছে যে, নারীর কর্তব্য হলো স্বামীর চাহিদা পূরণ করা, এমনকি স্বামী যদি যৌন চাহিদা প্রকাশ করেন এবং স্ত্রী এতে সাড়া না দেন, তবে সেটা স্ত্রীর পক্ষ থেকে চরম অন্যায় এবং ভয়াবহ পাপের কাজ। অনেকগুলো হাদিসে বলা হয়েছে যে, যদি আল্লাহর পরে কাউকে সিজদা করার নির্দেশ দেওয়া হতো, তবে সেটি স্ত্রীকে তার স্বামীকে করার নির্দেশ দেওয়া হতো। এটি নারীর প্রতি এমন একটি মানসিকতা তৈরি করে যে, তিনি তার স্বামীর সম্পত্তি, এবং তার কাজ হলো শুধু স্বামীর চাহিদা ও ইচ্ছার পূরণ করা, নিজের ইচ্ছার বা সম্মতির কোনো মূল্য নেই। এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি নারীর প্রতি এক চরম বৈষম্যমূলক এবং অসম্মানজনক মনোভাবের প্রতিফলন।
এই হাদিসে আরও বলা হয়েছে, স্ত্রীর নিজের প্রভুর প্রতি কর্তব্য পূরণ করার মতই তার স্বামীর চাহিদা পূরণ করতে হবে। এটি নারীর নিজস্ব আত্মমর্যাদাকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করে এবং তাকে স্বামীর সেবাদাসী হিসেবে বিবেচনা করে। এই হাদিস নারীর ইচ্ছা, স্বাধীনতা, মতামত এবং সম্মানের প্রতি কোনো গুরুত্ব দেয় না এবং তাকে পুরুষের অধীনস্থ ও নিয়ন্ত্রিত রাখার নির্দেশ দেয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ অনুযায়ী, প্রত্যেক ব্যক্তি তার শরীরের ওপর সম্পূর্ণ অধিকার রাখে এবং কারও জোরপূর্বক বা চাপের মুখে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো কাজ করানো মানবাধিকার লঙ্ঘন। জাহান্নামের ভয়ভীতি দেখিয়ে কোন নারীকে ধর্ষিত হতে বাধ্য করা চরমভাবে মানবাধিকারের লঙ্ঘন। জাতিসংঘের “নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ” (CEDAW) নারীর সম্মান, ইচ্ছা ও মতামতকে সম্মান করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু ইসলামের এই হাদিস নারীর ইচ্ছাকে উপেক্ষা করে তাকে শুধুমাত্র স্বামীর যৌন চাহিদা পূরণের একটি বস্তু হিসেবে বিবেচনা করে, যা সরাসরি নারীর মৌলিক মানবাধিকারকে লঙ্ঘন করে।
একজন নারী তার শরীরের অধিকার এবং ইচ্ছার প্রতি সম্মান পাওয়ার অধিকার রাখে। যদি স্বামী তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে চান এবং স্ত্রী এতে সম্মতি না দেন, তবে সেটি স্ত্রীর মৌলিক অধিকার। সেটি যে কারণেই হোক না কেন। একই কথা প্রযোজ্য পুরুষটির বেলাতেও। কিন্তু এই হাদিসে বলা হয়েছে, “যদি স্বামী স্ত্রীর কাছে শারীরিক চাহিদা প্রকাশ করেন এবং স্ত্রী যদি তা প্রত্যাখ্যান করেন, এটি নিষিদ্ধ বা হারাম।” এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি একটি নারীর ইচ্ছা, সম্মতি এবং শারীরিক অধিকারকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে। নারীর ওপর এটি একটি চাপ সৃষ্টি, যেন আল্লাহর অভিশাপের ভয়ভীতির কারণে ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও সে কাজটি করতে বাধ্য হয়। আর যৌন কাজে কোন ভাবে চাপ প্রয়োগ, ভয়ভীতি দেখানো, এগুলো সবই সংজ্ঞানুসারে ধর্ষণের অন্তর্ভূক্ত।
বিভিন্ন দেশে মানবাধিকার হরণ
মানবাধিকারের মূলনীতি হলো সম্মতি এবং শারীরিক অখণ্ডতা, যা জাতিসংঘের ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অফ হিউম্যান রাইটস (১৯৪৮)-এ স্পষ্ট। সকল মানুষ সমান অধিকারসম্পন্ন, এবং কোনো ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক কারণে নারীদের যৌন স্বাধীনতা অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু উল্লিখিত হাদিসগুলো নারীর সম্মতিকে অগ্রাহ্য করে, যা সরাসরি মানবাধিকার লঙ্ঘন।
ইসলামী সমাজে এই হাদিসগুলোর প্রভাব দেখা যায় শরিয়া আইনে, যেখানে বৈবাহিক ধর্ষণ অপরাধ নয়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে, যেমন সৌদি আরব, ইরান, বাংলাদেশে, নারীর অধিকার হরণের জন্য এই হাদিসগুলোকে ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশের দণ্ডবিধিতে ১৩ বছরের বেশি বয়সী স্ত্রীর সাথে সহবাস ধর্ষণ নয়, যা ব্রিটিশ আমলের আইনের অবশেষ। এটি CEDAW (কনভেনশন অন দ্য এলিমিনেশন অফ অল ফর্মস অফ ডিসক্রিমিনেশন অ্যাগেইনস্ট উইমেন)-এর সাথে সাংঘর্ষিক, যা নারীর প্রতি সকল বৈষম্য বিলোপের উপর জোর দেয়। বাংলাদেশ CEDAW-এ স্বাক্ষর করলেও বৈবাহিক ধর্ষণ অপরাধ হিসেবে গণ্য করেনি, যা নারীদের অধিকার লঙ্ঘন করে।
আরব লীগ দেশগুলোতে বৈবাহিক ধর্ষণ অপরাধ নয়, যেমন জর্ডান, প্যালেস্টাইন, সিরিয়ায় আইন স্পষ্টভাবে এটি বাদ দেয়। এটি নারীর যৌন স্বাধীনতা অস্বীকার করে, যা জাতিসংঘের মানবাধিকার চুক্তির বিপরীত। এই ধর্মীয় আইনগুলো কোনো প্রমাণ ছাড়া মেনে নেওয়া অন্ধবিশ্বাস, যা নারীর মর্যাদা হরণ করে।
মানসিক ট্রমা, শারীরিক ক্ষতি এবং শিশুদের উপর প্রভাব
হাদিসসমূহে বর্ণিত নারীর সম্মতি অগ্রাহ্য করে স্বামীর যৌন চাহিদা পূরণের নির্দেশনাগুলো সপ্তম শতাব্দীর পুরুষতান্ত্রিক সমাজের স্পষ্ট প্রতিফলন। একইসাথে, আধুনিক মানবাধিকার ও বিজ্ঞানের আলোকে এগুলো সম্পূর্ণ অসমর্থিত এবং ক্ষতিকর। এই ধরনের বর্ণনাগুলো নারীকে যৌন বস্তু হিসেবে দেখায়, যা বৈবাহিক ধর্ষণকে প্রশ্রয় দেয় এবং তার ফলে সৃষ্ট মানসিক, শারীরিক এবং সামাজিক ক্ষতিগুলোকে অস্বীকার করে। বৈজ্ঞানিক গবেষণা স্পষ্টভাবে দেখায় যে অসম্মতিভিত্তিক যৌনতা—বিশেষ করে বৈবাহিক সম্পর্কে—গুরুতর ট্রমা সৃষ্টি করে, যা শুধুমাত্র নারীর উপর নয়, বরং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের, বিশেষ করে শিশুদের উপরও গভীর প্রভাব ফেলে। এই হাদিসসমূহকে সত্য বলে মেনে নেওয়া অন্ধবিশ্বাসের সমতুল্য, কারণ কোনো প্রমাণ ছাড়াই এগুলোকে গ্রহণ করা যুক্তির সাথে সাংঘর্ষিক এবং মানবিক অধিকারের লঙ্ঘন।
বৈবাহিক ধর্ষণের মানসিক প্রভাবগুলো অত্যন্ত গুরুতর এবং দীর্ঘস্থায়ী, যা গবেষণায় বারবার প্রমাণিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, অসম্মতিভিত্তিক যৌনতা পোস্ট-ট্রম্যাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD), ডিপ্রেশন, অ্যাঙ্গজাইটি, ফোবিয়া এবং যৌন ডিসফাংশনের মতো সমস্যা সৃষ্টি করে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে বৈবাহিক ধর্ষণের শিকার নারীরা অপরিচিত ব্যক্তির দ্বারা ধর্ষণের চেয়ে বেশি মানসিক কষ্ট ভোগ করে, কারণ এটি বিশ্বাসঘাতকতা এবং ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ভাঙ্গনের সাথে যুক্ত। এই ট্রমা সেল্ফ-ব্লেম, লো সেল্ফ-ইস্টিম, নেগেটিভ সেল্ফ-ইমেজ, ইনটিমেসি সমস্যা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে, যা নারীর দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে। আরও গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায় যে এই ধরনের ট্রমা নিউরোবায়োলজিকাল পরিবর্তন ঘটায়, যেমন হরমোনাল ইমব্যালেন্স এবং ব্রেন ফাংশনের পরিবর্তন, যা দীর্ঘমেয়াদী ডিপ্রেশন এবং অ্যাঙ্গজাইটির কারণ হয় [26] [27] [28] [29]। হাদিসে যেমন স্বামীর চাহিদা পূরণকে ধর্মীয় কর্তব্য বলা হয়েছে, তা নারীর মানসিক স্বাস্থ্যকে ধ্বংস করতে সহায়ক।
শারীরিক ক্ষতিগুলোও কম নয়; বৈবাহিক ধর্ষণে নারীরা ভ্যাজাইনাল এবং অ্যানাল ইনজুরি, ল্যাসারেশন, ব্রুইজিং, টর্ন মাসলস, ফ্যাটিগ এবং ভমিটিংয়ের মতো সমস্যা ভোগ করে। গাইনোকলজিকাল সমস্যা যেমন ভ্যাজাইনাল স্ট্রেচিং, পেলভিক ইনফ্লেমেশন, অনওয়ান্টেড প্রেগন্যান্সি, মিসক্যারেজ, স্টিলবার্থ, ব্ল্যাডার ইনফেকশন, STI এবং ইনফার্টিলিটি সাধারণ। এই ক্ষতিগুলো বিশেষ করে শিশুবিয়ে এবং কিশোরীদের ক্ষেত্রে আরও গুরুতর, কারণ তাদের শরীর প্রজননের জন্য প্রস্তুত নয়। বাল্যবিয়ে এবং বৈবাহিক ধর্ষণের ফলে কিশোরীরা যোনিপথে অত্যধিক রক্তক্ষরণ, প্রিম্যাচিওর বার্থ, স্টিলবার্থ এবং মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকে। বিজ্ঞান দেখায় যে এই ধরনের অসম্মতিভিত্তিক যৌনতা নারীর শারীরিক স্বাস্থ্যকে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করে।
শিশুদের উপর বৈবাহিক ধর্ষণের প্রভাব আরও ভয়াবহ, কারণ এটি ইন্টারজেনারেশনাল ট্রমা সৃষ্টি করে। পরিবারে বৈবাহিক ধর্ষণ বা ধর্ষণের মতো অসম্মতিভিত্তিক যৌনতা দেখে শিশুরা অ্যাঙ্গজাইটি, ডিপ্রেশন, PTSD, অ্যাগ্রেশন, সাবস্ট্যান্স অ্যাবিউজ এবং ফিজিক্যাল হেলথ প্রবলেম ভোগ করে। শিশুরা যখন মায়ের উপর ধর্ষণ বা ভায়োলেন্স দেখে বা বোঝে, তাদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়, যা পরবর্তী জীবনে তারা নিজেরা ভায়োলেন্সের শিকার বা পারপেট্রেটর হয়ে উঠতে পারে। বাল্যবিয়ে এবং বৈবাহিক ধর্ষণের ক্ষেত্রে কিশোরীরা PTSD, ডিপ্রেশন এবং অ্যাঙ্গজাইটি ভোগ করে, যা তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যতকে ধ্বংস করে। এই প্রভাবগুলো হাদিসের পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির ফল, যা বিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক এবং কোনো প্রমাণ ছাড়া মেনে নেওয়া যায় না।
সারাংশে, ইসলামী হাদিসসমূহের এই বর্ণনাগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে সমাজের সুস্থতার জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বিজ্ঞান দেখায় যে অসম্মতিভিত্তিক যৌনতা মানসিক এবং শারীরিক ক্ষতি করে, এবং শিশুদের উপর তার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। এই ধরনের হাদিস মধ্যযুগীয় পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ফল, যা বর্জন করাই সুস্থ সুন দর সমাজে কাম্য।
কিন্তু মুসলিম নারীরা কী সমানাধিকার চায়?
এখানেই প্রশ্ন ওঠে—মুসলিম নারীরা কী চান? আত্মমর্যাদা, সমান অধিকার প্রত্যাশা করেন নাকি তারা স্বেচ্ছায় সেই কাঠামোকে সমর্থন করেন, যেখানে একজন স্ত্রী স্বামীর দাসীর মত মর্যাদা সম্পন্ন উনমানুষ? আসুন কিছু ভিডিও দেখা যাক, যেখানে বোরখাপরা এক মুসলিম নারী নিজে নারী হয়েও সমঅধিকারের বিরোধিতা করছেন, নিজেরা নারী হয়ে পুরুষতন্ত্রের উকালতি করছেন এবং বাংলাদেশে শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠার পক্ষে মত প্রকাশ করছেন,
উপসংহারঃ একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ
সামগ্রিক আলোচনায় এটি স্পষ্ট যে, ইসলামী ধর্মীয় গ্রন্থ, ফিকহী ব্যাখ্যা এবং ঐতিহাসিক বিবরণগুলোতে নারীর অবস্থানকে একজন স্বাধীন পূর্ণাঙ্গ মানুষের পরিবর্তে পুরুষের অধীনস্থ এবং ভোগযোগ্য সম্পদ হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে। ‘মুলক আল-বুদহ’ বা যৌনাঙ্গের মালিকানার মতো আইনি ধারণাগুলো কেবল তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং এগুলো সরাসরি বৈবাহিক ধর্ষণকে এক ধরনের ‘ধর্মীয় ও আইনি বৈধতা’ প্রদান করে। যখন একজন স্বামী তাঁর স্ত্রীর অসম্মতি সত্ত্বেও যৌন সম্পর্ক স্থাপনকে নিজের ‘হক’ বা পাওনা হিসেবে গণ্য করেন, তখন সেখানে সম্মতির (Consent) আধুনিক ও মানবিক ধারণাটি সমূলে বিনাশপ্রাপ্ত হয়।
এই ব্যবস্থার অমানবিকতা আরও প্রকট হয় যখন আমরা দেখি:
পরিশেষে বলা যায়, এই হাদিস ও বিধানগুলো কোনো শাশ্বত বা ডিভাইন সত্য নয়; বরং এগুলো সপ্তম শতাব্দীর আরব উপদ্বীপের অত্যন্ত কঠোর পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতির আইনি ও সামাজিক প্রতিফলন। আজ একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে যখন মানবসভ্যতা সাম্য, মর্যাদা এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে, তখন দেড় হাজার বছর আগের এই ধ্যান-ধারণাগুলোকে অভ্রান্ত মনে করা কেবল অন্ধবিশ্বাস ছাড়া আর কিছুই নয়। মনে রাখতে হবে,
যুক্তি, অধিকার এবং মানবিকতা কোনো ধর্মীয় অনুভূতির কাছে দায়বদ্ধ নয়।
মুসলিম সমাজকে যদি আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হয় এবং নারীর মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হয়, তবে এই ক্ষতিকর টেক্সট এবং ব্যাখ্যাগুলোকে হয় সমূলে বর্জন করতে হবে, না হয় সরাসরি প্রত্যাখ্যান করতে হবে। সত্য ও ন্যায়ের লড়াইয়ে প্রমাণের অভাব বা অন্ধ আনুগত্যের কোনো স্থান নেই। নারীর শরীর তাঁর নিজস্ব সম্পদ—এটি কোনো চুক্তির বিষয়বস্তু বা পুরুষের মর্জির ওপর নির্ভরশীল বস্তু নয়। যুক্তি ও অধিকারের পক্ষে থাকতে হলে আমাদের অবশ্যই বিশ্বাসের অন্ধ গলি থেকে বেরিয়ে এসে বৈজ্ঞানিক ও মানবাধিকারমূলক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে।
About This Article
Genre: Islamic Marriage Law Critique, Marital-Rape Analysis, Fiqh-Based Gender Review, Hadith Criticism, and Sexual-Consent Ethics
Epistemic Position: Secular Humanism, Feminist Criticism, Human-Rights Ethics, Bodily Autonomy, Anti-Patriarchal Reasoning, and Evidence-Based Religious Law Critique
This article examines Islamic legal and hadith-based teachings on a wife's obligation to respond to her husband's sexual demand, the concept of tamkin, and the juristic framing of marriage as a contract granting sexual access.
The central argument is that when marriage is defined through ownership, mahr, sexual availability, obedience, and punishment for refusal, the wife's ongoing consent is effectively erased and marital rape becomes structurally legitimized within the legal logic of classical fiqh.
The article also discusses hadiths about answering the husband's call, prostration-like obedience, juristic rulings on wives and slave women, the loss of maintenance for refusal, permission to discipline or beat a disobedient wife, and examples from tafsir and early Islamic narratives.
This article should be evaluated through consent, bodily autonomy, gender equality, marital ethics, human dignity, anti-slavery principles, source criticism, and legal accountability—not through patriarchal ownership logic, mahr-based sexual entitlement, devotional obedience, euphemistic fiqh language, or the demand that religious marriage law be shielded from human-rights scrutiny.
তথ্যসূত্রঃ
- দেনমোহর | ইসলামে নারীর লজ্জাস্থান ভোগের মূল্য ↩︎
- দেনমোহরঃ নারীর লজ্জাস্থানের মূল্য ↩︎
- আল-হিদায়া, কিতাবুন নিকাহ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০২ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ৩২৫৭ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), ৪র্থ খণ্ড, হাদীস একাডেমী, পৃষ্ঠা ৩১৮ ↩︎
- সুনানে ইবনে মাজাহ, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ১৮৫৩ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিস একাডেমি, হাদিসঃ ৩২৫৫ ↩︎
- রিয়াদুস সালেহীন, ইমাম নববী, ইসলামিয়া কুরআন মহল প্রকাশনী, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩১ ↩︎
- সহিহ মুসলিম শরীফ (প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যাসহ বঙ্গানুবাদ), মাকতাবাতুল হাদীছ প্রকাশনী, ১৩তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০৬ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, ২য় খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পৃষ্ঠা ১১২ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস নম্বর: ৫৪৭০ ↩︎
- ويحرم على الزوجة والأمة تحريما غليظا أن تمتنع إذا طلبها للاستمتاع الجائز ↩︎
- مسألة فرض الأمة والحرة أن لا يمنعا السيد والزوج الجماع متى دعاهما ↩︎
- Islamqa, Fatwa No. 33597 ↩︎
- مسألة فرض الأمة والحرة أن لا يمنعا السيد والزوج الجماع متى دعاهما ↩︎
- সহিহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ৪৭৭ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ৩২৪২ ↩︎
- মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক পরিচ্ছেদ, হাদিস ১১৮৭৮ ↩︎
- মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক পরিচ্ছেদ, হাদিস ১৭৯৭৪ ↩︎
- সহীহ ইবনু হিব্বান, হাদিস ১৪৮৬ ↩︎
- এহইয়া্উ উলুমিদ্দীন, ২য় খণ্ড, মদিনা পাবলিকেশান্স, পৃষ্ঠা ২৯৬-২৯৮ ↩︎
- আয়িশা কি নয়বছর বয়সে বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছেছিলেন? ↩︎
- বৈবাহিক ধর্ষণে কিশোরীর মৃত্যু: এরপরও কেন এটি বৈধ? ↩︎
- ওয়েব আর্কাইভ লিংক বৈবাহিক ধর্ষণে কিশোরীর মৃত্যু: এরপরও কেন এটি বৈধ? ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস নম্বর: ৩৭৮০ ↩︎
- Marital Rape and Domestic Violence ↩︎
- The Relative Effects of Intimate Partner Physical and Sexual Violence on Post-Traumatic Stress Disorder Symptomatology ↩︎
- Marital Rape: New Research and Directions ↩︎
- Investigating psychological and interpersonal problems in traumatic marriages among women: A phenomenological analysis of unwanted marriages ↩︎
- সহীহ বুখারী, হাদিস নম্বর: ৩৭৮০ ↩︎
