ভূমিকা: পরকাল ছাড়া জীবন অর্থহীন—এই দাবির ভিত্তি কোথায়?
“পরকাল না থাকলে জীবনের উদ্দেশ্য কী?”—প্রশ্নটি সাধারণত এমনভাবে উত্থাপিত হয় যেন পরকালের বাস্তব অস্তিত্ব মেনে না নিলেই অর্থহীন জীবনের সিদ্ধান্ত অনিবার্য। কিন্তু যে সিদ্ধান্তটি প্রমাণ করার কথা, সেটিকেই প্রশ্নের ভেতর গোপনে ধরে নেওয়া হয়েছে। কেন অর্থপূর্ণ হওয়ার জন্য জীবনকে অনন্ত হতে হবে? কেন একজন মানুষের ভালোবাসা, চিন্তা, সৃজনশীলতা, ন্যায়বোধ কিংবা অন্যের দুঃখ দূর করার কাজের মূল্য নির্ধারণ করতে হবে মৃত্যুর পরের কোনো পুরস্কারের ভিত্তিতে? একটি শিশুকে বিপদ থেকে উদ্ধার করা, অন্যায়ের শিকার মানুষকে ন্যায়বিচার দেওয়া কিংবা নতুন কোনো রোগের চিকিৎসা আবিষ্কার করার মূল্য এই পৃথিবীতেই উপলব্ধি করা যায়। এসব কাজের প্রভাব বাস্তব; মৃত্যুর পরে আরও একটি জীবন আছে কি না, সেই অজানা তথ্যের জন্য এগুলোর মূল্য স্থগিত থাকে না। পরকাল জীবনের অর্থের অপরিহার্য শর্ত—এটি প্রমাণহীন দার্শনিক দাবি, কোনো স্বতঃসিদ্ধ সত্য নয়। মানুষের জীবনের উৎপত্তি, জীবনের নির্ধারিত কাজ এবং জীবনের অর্থ—এগুলোকে একই প্রশ্নের তিনটি নাম বানিয়ে ফেললেই সমস্যাটি তৈরি হয় [1]।
ধর্মীয় বক্তব্যে প্রায়ই জীবনের অর্থকে “কেন সৃষ্টি করা হয়েছে” প্রশ্নের সঙ্গে এক করে দেখা হয়। অথচ কোনো সত্তা বা বস্তু কীভাবে অস্তিত্ব লাভ করেছে, তার বাইরে থেকে তাকে কোনো কাজ দেওয়া হয়েছে কি না এবং তার অস্তিত্ব মূল্যবান কি না—এই তিনটি আলাদা বিষয়। মানুষের অস্তিত্বের জৈবিক ইতিহাস জানা থাকলেও তাঁর সব নৈতিক লক্ষ্য নির্ধারিত হয়ে যায় না; আবার কেউ একটি লক্ষ্য ঘোষণা করলেই সেই লক্ষ্য ন্যায়সংগত হয় না। ধর্মগ্রন্থে সৃষ্টির উদ্দেশ্য ঘোষণা আছে—এই তথ্যের সঙ্গে সেই ঘোষণা সত্য, এবং সেই উদ্দেশ্যের বাইরে সব জীবন মূল্যহীন—এই দুটি দাবি গুলিয়ে ফেলা যায় না। অর্থপূর্ণতা নিয়ে প্রমাণনির্ভর আলোচনার প্রথম কাজ তাই জীবনকে নির্ধারিত ধর্মীয় লক্ষ্যে আবদ্ধ করা নয়, বরং অর্থপূর্ণ বলে যা দাবি করা হচ্ছে তার কার্যকর মানদণ্ড স্থাপন করা। মানুষ কষ্ট পায়, আনন্দ অনুভব করে, সম্পর্ক গড়ে, চিন্তা করে এবং অন্য মানুষের জীবন পরিবর্তন করতে সক্ষম—এসব বাস্তব বৈশিষ্ট্যের মূল্যকে অলৌকিক অনুমতির অপেক্ষায় ঝুলিয়ে রাখার কোনো যুক্তি নেই।
পুরস্কার ও শাস্তির বিনিময়ে নৈতিকতা: স্বার্থের হিসাব আর ন্যায়ের প্রশ্ন
কোনো কাজ কেন ভালো—এ প্রশ্নের উত্তর এবং কাজটি করতে কাউকে কীভাবে উৎসাহিত করা যায়—এই দুই প্রশ্ন পৃথক। অসহায় মানুষকে সাহায্য করা ন্যায়সংগত, কারণ তাঁর ক্ষতি কমে, নিরাপত্তা বাড়ে এবং মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ব পালিত হয়। এর সঙ্গে যুক্ত করা যায় পুরস্কারের আশ্বাস অথবা শাস্তির ভয়; কিন্তু সেই প্রণোদনা নিজে কাজটির নৈতিকতার প্রমাণ নয়। স্বর্গ লাভ ও নরক এড়ানোর হিসাবকে সর্বোচ্চ নৈতিক ভিত্তি বানানো হলে ন্যায়-অন্যায়ের বিচার সরে গিয়ে আনুগত্যের লাভক্ষতির হিসাব সামনে আসে। ব্যক্তি অন্যের যন্ত্রণা বোঝার কারণে কাজ করছেন, নাকি নিজের মুক্তির হিসাব মেলাতে করছেন—এই পার্থক্য নৈতিক চরিত্র বুঝতে সাহায্য করে। মনোবিজ্ঞানে স্বতঃপ্রণোদনা ও বাহ্যিক প্রণোদনার পার্থক্য সুপ্রতিষ্ঠিত; পুরস্কার বা নিয়ন্ত্রণের কাঠামো অনেক ক্ষেত্রে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহের ধরন বদলে দিতে পারে [2]। ভালো ফল এবং ভালো কাজ করার উদ্দেশ্য এক নয়; পুরস্কার পাওয়ার প্রত্যাশা কাজটির নৈতিকতা প্রতিষ্ঠার যুক্তি হতে পারে না।
ধরা যাক, একজন শিশু রাস্তায় পথ হারিয়ে কাঁদছে। একজন মানুষ শিশুটিকে নিরাপদে পরিবারের কাছে পৌঁছে দিলেন। শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ায় কাজটি ভালো—এ কথা বলার জন্য সাহায্যকারীর ব্যাংক হিসাবে কত অর্থ জমা হলো তা জানার প্রয়োজন নেই। এবার একই ব্যক্তি যদি শিশুটির ধনী পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায়ের আশায় কাজটি করেন, তাহলে কাজটির ভালো ফল অস্বীকার করতে হবে না, কিন্তু তাঁর উদ্দেশ্যের চরিত্র বদলে যায়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: শিশুটিকে সাহায্য করলে পুরস্কার, আর শিশুটিকে নির্যাতন করলে আরও বড় পুরস্কার দেওয়া হবে—এমন ঘোষণা কেউ দিলে কোন কাজটি নৈতিক হবে? ন্যায়ের স্বাধীন মানদণ্ড ছাড়া এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। যদি পুরস্কারদাতার নির্দেশই শেষ বিচার হয়, তাহলে যন্ত্রণা দেওয়া ও রক্ষা করার মধ্যে নৈতিক পার্থক্যও তাঁর ইচ্ছার অধীন হয়ে পড়ে। যে নৈতিকতা ভুক্তভোগীর কষ্টের চেয়ে আদেশদাতার পুরস্কারকে বড় করে, তা মানুষের কল্যাণকে নৈতিকতার কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেয়।
প্লেটোর ইউথিফ্রো সংলাপে যে মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে, তা এখানেও প্রাসঙ্গিক: কোনো কাজ দেবতাদের অনুমোদন পাওয়ার কারণে নৈতিক, নাকি কাজটি নৈতিক বলেই দেবতারা সেটিকে অনুমোদন দেন? প্রথম ক্ষেত্রে ন্যায়-অন্যায় নির্ভর করে কর্তৃত্বের পছন্দের ওপর; দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সেই পছন্দের বাইরে কাজটির নৈতিক গুণের একটি মানদণ্ড থাকে। নিরপরাধ মানুষকে হত্যার আদেশ, দাসত্ব বা অসম্মতিমূলক যৌনসম্পর্কের অনুমোদন কোনো পবিত্র কর্তৃপক্ষের নামে প্রচারিত হলেই সংশ্লিষ্ট কাজের ক্ষতি দূর হয় না। নৈতিক বিচার মানবিক ক্ষতি, সম্মতি, ন্যায়, স্বাধীনতা ও পারস্পরিক দায়িত্বের মতো বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ দাবি করে। যে ধর্মীয় আদেশ এসব মানদণ্ডের সঙ্গে সংঘর্ষে আসে, তার নৈতিকতা প্রশ্ন করা অযৌক্তিক নয়; আদেশটি আদৌ ন্যায়সংগত কি না যাচাই করার স্বাভাবিক পদ্ধতি এটাই [3]।
জীবনের উৎপত্তি, বরাদ্দ করা কাজ ও অর্থপূর্ণতা এক বিষয় নয়
“কেন মানুষ আছে?”—প্রশ্নটির এক অর্থ হতে পারে মানুষ কীভাবে অস্তিত্ব লাভ করেছে; এটির উত্তর খোঁজে বিবর্তন, জীববিজ্ঞান ও ইতিহাস। আরেক অর্থ হতে পারে মানুষকে কোনো স্রষ্টা বিশেষ কাজের জন্য তৈরি করেছেন কি না; এখানে স্রষ্টার অস্তিত্ব, তাঁর ইচ্ছা এবং সেই কাজের প্রকৃতির প্রমাণ দরকার। তৃতীয় অর্থ হলো জীবনের কোন অভিজ্ঞতা, সম্পর্ক বা কাজ মূল্যবান; এটি নৈতিক ও দার্শনিক মূল্যায়নের প্রশ্ন। প্রথমটির ব্যাখ্যা না জানলে দ্বিতীয়টি প্রমাণিত হয় না, দ্বিতীয়টি প্রমাণিত না হলেও তৃতীয়টির উত্তর দেওয়া যায়। একজন মানুষের জন্ম তাঁর নিজের হাতে ছিল না; কিন্তু তিনি কীভাবে অন্যের সঙ্গে আচরণ করবেন, কোন জ্ঞান অর্জন করবেন, কোন অন্যায় প্রতিরোধ করবেন—এই সিদ্ধান্তে তাঁর অংশগ্রহণ বাস্তব। একটি উদ্দেশ্য আগে থেকে নির্ধারিত না থাকা মানেই কোনো উদ্দেশ্য গ্রহণ করা অসম্ভব—এমন কথা নয়। বরং জীবনের অর্থকে আদেশের সঙ্গে অভিন্ন করলে ব্যক্তির নৈতিক বিচারবুদ্ধি, সৃজনশীলতা এবং সম্পর্কের বাস্তব মূল্যকে ছোট করে দেখানো হয়।
কোনো কারিগর একটি যন্ত্রকে নির্দিষ্ট কাজে ব্যবহারের জন্য তৈরি করলে যন্ত্রটির উদ্দেশ্য কারিগরের নকশায় পাওয়া যায়। কিন্তু মানুষ যন্ত্র নয়। একজন মানুষ চিন্তা, অনুভূতি ও স্বায়ত্তশাসনের ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি; তাঁর জীবনের মর্যাদা অন্য কেউ তাঁকে কত দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারবে, তার ওপর নির্ভর করে না। সন্তানকে জন্ম দেওয়া পিতা-মাতা সন্তানের জীবনের মালিক হয়ে যান না, কিংবা সন্তানের সমগ্র ভবিষ্যৎ উদ্দেশ্য তাঁরাই স্থির করার অবাধ অধিকার অর্জন করেন না। “আমি তোমাকে তৈরি করেছি, অতএব আমার কাজে নিয়োজিত থাকলেই তোমার জীবন মূল্যবান”—এই যুক্তি মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করলে ব্যক্তি হয়ে ওঠে স্রষ্টার উপকরণ। মানবিক মর্যাদার ভিত্তি হলো তাঁর অনুভব, আকাঙ্ক্ষা, যুক্তিবোধ ও অধিকার; কে তাঁকে তৈরি করেছিল, সেই পরিচয় ব্যক্তির ওপর নিঃশর্ত কর্তৃত্বের নৈতিক বৈধতা দেয় না। ধর্মীয় উদ্দেশ্যের দাবি যখন মানুষকে নিজস্ব অর্থপূর্ণতা নির্ধারণ থেকে বঞ্চিত করে, তখন সেটি শুধু বিশ্বাসের প্রশ্ন থাকে না; ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নেও পরিণত হয়।
মানুষের জীবনের অর্থ সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত খেয়ালও নয়। অন্যের ক্ষতি করে নিজের আনন্দ পাওয়া কারও কাছে আকর্ষণীয় লক্ষ্য হতে পারে, কিন্তু তাকে মানবিক মূল্য বলা যায় না। যেসব লক্ষ্য জ্ঞান, ন্যায়বিচার, সৃজনশীলতা, স্নেহ, পরস্পরের সহায়তা এবং স্বাধীনতা বৃদ্ধি করে, সেগুলো ব্যক্তিগত পছন্দের বাইরেও যুক্তিসমর্থিত গুরুত্ব পায়। অর্থাৎ অর্থপূর্ণতা নির্মিত হতে পারে, আবার নির্মিত সেই অর্থের সমালোচনাও করা যায়। ভাষা, শিক্ষা, আইন কিংবা মানুষের অধিকারও সামাজিক ইতিহাসের মাধ্যমে নির্মিত; তাই বলে এগুলো অলীক নয়। অর্থপূর্ণতা নিয়ে সমকালীন দর্শনে প্রাকৃতিকতাবাদী তত্ত্বগুলো ঠিক এই জগতের সম্পর্ক, কাজ ও অভিজ্ঞতার মধ্যেই মানবজীবনের মূল্য বিশ্লেষণ করে [4]।
কোরআনে মানুষের উদ্দেশ্য: ইবাদত, পরীক্ষা ও প্রত্যাবর্তন
কোরআন মানুষের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সরাসরি বক্তব্য দিয়েছে। সূরা আয-যারিয়াতের ৫৬ নম্বর আয়াতে জিন ও মানুষকে আল্লাহর ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করার দাবি রয়েছে। সূরা মুলকের ২ নম্বর আয়াতে জীবন ও মৃত্যুকে মানুষের কর্মের পরীক্ষা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সূরা মুমিনুনের ১১৫ নম্বর আয়াতে উদ্দেশ্যহীন সৃষ্টি এবং আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তন না হওয়ার ধারণাকে একসঙ্গে প্রশ্ন করা হয়েছে। ফলে ধর্মগ্রন্থের এই বিন্যাসে জীবনের মূল্যায়ন আবর্তিত হয় স্রষ্টার নির্ধারিত দায়িত্ব, পরীক্ষা ও পরকালীন প্রত্যাবর্তনের চারপাশে। কিন্তু এখানে মৌলিক যুক্তিগত ব্যবধানটি রয়ে যায়: কোনো গ্রন্থ উদ্দেশ্য ঘোষণা করেছে—এটি সেই গ্রন্থে কী লেখা আছে তার প্রমাণ; সেই উদ্দেশ্য বাস্তবের সত্য, এবং এর বাইরে মানুষের জীবন অর্থহীন—এই দুটি সিদ্ধান্তের স্বতন্ত্র যুক্তি প্রয়োজন। একটি আদেশ যে সত্য বলে মেনে নেওয়া হয়েছে, শুধু সেই কারণে পৃথিবীতে বিদ্যমান অন্য সব মূল্য অদৃশ্য হয়ে যায় না [5]।
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
বাংলা অনুবাদ: আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি। [ সূরা আয-যারিয়াত ৫১:৫৬ ]
জীবনকে পরীক্ষা হিসেবে বর্ণনা করার মধ্যেও একই সমস্যা রয়েছে। পরীক্ষা একটি পদ্ধতি; এর মূল্য নির্ভর করে কী যাচাই হচ্ছে, কেন যাচাই হচ্ছে এবং সেই যাচাই থেকে কার কী ন্যায়সংগত মঙ্গল হচ্ছে, তার ওপর। বিদ্যালয়ের পরীক্ষা শিক্ষার্থীর দক্ষতা নির্ণয় করে, চিকিৎসার পরীক্ষা রোগ সম্পর্কে তথ্য দেয়। কিন্তু মহাবিশ্বের সর্বজ্ঞ স্রষ্টার পরীক্ষাকে মানুষের জীবনের একমাত্র অর্থ ঘোষণা করলে “কেন এই পরীক্ষাই অস্তিত্বের মূল মূল্য” প্রশ্নের স্বতন্ত্র উত্তর পাওয়া যায় না। পরীক্ষা চলছে বলে পরীক্ষার্থীর ভালোবাসা, শোক, জ্ঞানচর্চা বা অন্যকে সাহায্য করার নিজস্ব মূল্য বিলুপ্ত হয় না। বরং বাস্তব মূল্যবান কাজগুলোকেই পরীক্ষার কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। একই কাজের নৈতিক গুরুত্ব যদি পরীক্ষার আগেই বোঝা যায়, তাহলে সেই গুরুত্বের জন্য পরীক্ষা অপরিহার্য ছিল না [6]।
الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا وَهُوَ الْعَزِيزُ الْغَفُورُ
বাংলা অনুবাদ: যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য—কে কর্মে উত্তম। তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল। [ সূরা মুলক ৬৭:২ ]
ঈশ্বরের উদ্দেশ্য ও মানুষের অর্থপূর্ণতা: দ্বৈত মানদণ্ডের সমস্যা
ধর্মীয় জীবনদর্শনের এক মৌলিক দাবি হলো, মানুষের জীবনের অর্থ তখনই প্রতিষ্ঠিত হয় যখন তা ঈশ্বরের নির্ধারিত উদ্দেশ্য পূরণ করে। এই দাবি অনুসারে মানুষ নিজের সম্পর্ক, কাজ, জ্ঞান কিংবা মানবিক দায়িত্বের মধ্য দিয়ে অর্থপূর্ণ জীবন গড়ে তুললেও তা চূড়ান্ত অর্থ পায় না, যদি ঈশ্বরের উদ্দেশ্যের সঙ্গে তার সম্পর্ক না থাকে। কিন্তু একই মানদণ্ড ঈশ্বরের নিজের অস্তিত্বের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয় না। ঈশ্বরকে স্বয়ংসম্পূর্ণ, অনাদি এবং অপর কারও নির্ধারিত কাজের অপেক্ষা থেকে মুক্ত বলা হয়। এখানেই দ্বৈত মানদণ্ডের কেন্দ্র: অন্যের নির্ধারিত উদ্দেশ্য ছাড়া অস্তিত্বের অর্থ থাকে না—এ কথা মানুষের জন্য ঘোষণা করা হচ্ছে, অথচ ঈশ্বরের অস্তিত্বের অর্থের জন্য সেই শর্ত প্রয়োজন হচ্ছে না। কোনো নিয়ম যদি প্রকৃতপক্ষে অর্থপূর্ণতার অপরিহার্য শর্ত হয়, তাহলে শুধু যার সম্পর্কে কথা বলা হচ্ছে তার পরিচয় পাল্টালেই নিয়মটি অদৃশ্য হওয়ার কথা নয়। আর ঈশ্বরের ক্ষেত্রে যদি বাইরের নির্দেশ ছাড়াও অর্থপূর্ণতা বা মূল্য থাকতে পারে, তাহলে বাইরের নির্দেশকেই অর্থের সার্বজনীন শর্ত বলা ভুল। ধর্মীয় কর্তৃত্ব এখানে যে সমস্যাটি তৈরি করে, তা ঈশ্বর ও মানুষের সমস্ত বৈশিষ্ট্য সমান কি না সেই প্রশ্ন নয়; তা হলো অর্থপূর্ণতার যে শর্ত মানুষের ওপর চাপানো হয়েছে, তার পক্ষে কোনো সর্বজনীন যুক্তি আদৌ আছে কি না।
ঈশ্বরের নিজের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য কী?
মানুষের কাছে যখন জানতে চাওয়া হয় “তোমার জীবনের উদ্দেশ্য কী”, তখন ধর্মীয় উত্তর হিসেবে ঈশ্বরের ইবাদত, তাঁর আদেশ পালন এবং পরকালের সফলতা সামনে আসে। কিন্তু সেই উত্তর অনুসারে উদ্দেশ্য যদি সবসময় উচ্চতর কর্তৃপক্ষের দ্বারা নির্ধারিত কাজ হয়, তাহলে ঈশ্বর কীসের উদ্দেশ্যে আছেন? তাঁকে কে সেই কাজ দিয়েছেন? যে মুহূর্তে বলা হয়, ঈশ্বরের কোনো বাইরের নির্দেশদাতা প্রয়োজন নেই, উচ্চতর কর্তৃপক্ষের দ্বারা নির্ধারিত উদ্দেশ্য ছাড়াই তার জীবন পূর্ণ, সে মুহূর্তেই অর্থপূর্ণতার জন্য বাইরের নির্দেশদাতার অনিবার্যতা বাতিল হয়ে যায়। আর যদি বলা হয় ঈশ্বর নিজেই তাঁর উদ্দেশ্য নির্ধারণ করেন, তবে আত্মনির্ধারিত উদ্দেশ্য নীতিগতভাবে অর্থপূর্ণ হয়—এই সত্যও স্বীকার করা হয়। মানুষও চিন্তাভাবনা করে নিজের লক্ষ্য নির্ধারণ করে, ভুল লক্ষ্য বদলায়, নতুন সম্পর্ক গড়ে এবং অন্যের মঙ্গলকে বেছে নেয়। এই ক্ষমতাকে অর্থহীন ঘোষণা করার জন্য শুধু “ঈশ্বর ভিন্ন” বলার কোনো মূল্য নেই। পার্থক্য দেখালেই সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠিত হয় না; দেখাতে হয় সেই পার্থক্য কেন অর্থপূর্ণতার মাপকাঠিকে বদলে দেয়। অর্থের উৎস যদি নিজের প্রকৃতি, কাজ ও সম্পর্কেও থাকতে পারে, তাহলে মানুষকে একমাত্র বাহ্যিক ধর্মীয় নির্দেশের ওপর নির্ভরশীল বানানো অযৌক্তিক।
কোনো মানুষ জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে চিকিৎসা, শিক্ষা, শিল্প, বিজ্ঞান বা মানবাধিকারের কাজ বেছে নিলে সেই উদ্দেশ্যের অর্থ নির্ধারিত হয় কাজটির প্রকৃতি দিয়ে। চিকিৎসা রোগীর কষ্ট কমায়; শিক্ষা জ্ঞান ও সিদ্ধান্তের ক্ষমতা বাড়ায়; ন্যায়বিচার ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে সুরক্ষা দেয়। ঈশ্বরের নামে ঘোষণা করা না হলেও এসব কাজের ফল বাস্তব। অথচ এ ধরনের কাজকে অর্থপূর্ণতার মূল ভিত্তি বলে মানতে অস্বীকার করে যদি বলা হয়, “উদ্দেশ্য তখনই উদ্দেশ্য, যখন ওপরের কোনো কর্তৃপক্ষ তা দিয়েছেন”, তাহলে উদ্দেশ্য বলতে আসলে অর্থ নয়, অধীনস্থতার নির্দেশ বোঝানো হচ্ছে। এই যুক্তিতে মানুষ কেন বাঁচবেন—তার জবাব আর মানুষের জীবনের মূল্য থেকে আসে না; আসে কে তাঁকে কী কাজে নিয়োগ করেছে, সেই প্রশ্ন থেকে। চাকরিদাতা কর্মচারীর দায়িত্ব নির্ধারণ করেন বলে কর্মচারীর মানবিক মূল্য চাকরিদাতার পরিকল্পনায় শেষ হয়ে যায় না। একইভাবে সৃষ্টির দাবি সত্য বলে ধরে নিলেও স্রষ্টার পরিকল্পনা থেকে ব্যক্তির নৈতিক মর্যাদা ও প্রতিটি জীবনকর্মের সম্পূর্ণ অর্থ নির্ধারিত হয়ে যায় না। একটি জীবনের ওপর কর্তৃত্বের দাবি এবং জীবনটির অর্থপূর্ণতার প্রমাণ একই জিনিস নয়।
স্বয়ংসম্পূর্ণ ঈশ্বর এবং ‘নির্ভরশীল’ মানুষ: কোন নির্ভরশীলতার কথা?
সূরা ফাতির ৩৫:১৫-এ মানুষকে আল্লাহর মুখাপেক্ষী এবং আল্লাহকে অভাবমুক্ত ও প্রশংসিত বলা হয়েছে। বক্তব্যটি ধর্মীয় কাঠামোয় ঈশ্বর ও মানুষের সম্পর্কের প্রকৃতি পরিষ্কার করে: এক পক্ষ স্বয়ংসম্পূর্ণ, অন্য পক্ষ নির্ভরশীল। কিন্তু এই নির্ভরশীলতা দিয়ে মানবজীবনকে অর্থহীন ঘোষণা করা হয় কীভাবে? মানুষ খাদ্য, পানি, অক্সিজেন, পরিবেশ ও অন্য মানুষের সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। এসব বাস্তব প্রয়োজন থেকে মানুষের জীবন অর্থহীন—এ সিদ্ধান্ত আসে না। সন্তান পিতা-মাতার যত্নের ওপর নির্ভরশীল বলে তার আনন্দ বা কষ্ট কম গুরুত্বপূর্ণ হয় না; অসুস্থ মানুষ চিকিৎসকের ওপর নির্ভরশীল বলে তাঁর বেঁচে থাকার মূল্য শেষ হয়ে যায় না। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য নির্ভরশীল হওয়া এবং অস্তিত্বের নৈতিক বা মানবিক মূল্য অন্য কারও নির্দেশের ওপর নির্ভর করা সম্পূর্ণ ভিন্ন সম্পর্ক। প্রথমটির সত্যতা দ্বিতীয়টির কোনো প্রমাণ নয়। “ঈশ্বর অভাবমুক্ত, মানুষ অভাবগ্রস্ত ও নির্ভরশীল”—এই পরিচয় দিয়ে অর্থপূর্ণতার প্রশ্নের নিষ্পত্তি করতে চাওয়া তাই বিষয়ান্তর; প্রয়োজনের বিবরণকে মূল্যের সংজ্ঞা হিসেবে চালিয়ে দেওয়া। কোরআনে বলা হয়েছে [7]
يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَنْتُمُ الْفُقَرَاءُ إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ
বাংলা অনুবাদ: হে মানুষ, তোমরাই আল্লাহর মুখাপেক্ষী; আর আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসিত। [ সূরা ফাতির ৩৫:১৫ ]
নির্ভরশীলতার এই গুলিয়ে ফেলা একটি বড় যুক্তিগত ভুল। মাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি গাছ মাটি, জল ও আলো ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। তাতে গাছের ছায়া, ফল বা প্রাণবৈচিত্র্যে তার অবদান অর্থহীন হয় না। মানুষের অবস্থাও তাই: কোনো জীবন টিকে থাকতে পরিবেশ ও অন্যের সহায়তা লাগে—এটি তার অস্তিত্বের শর্ত; সে জীবন কীভাবে মূল্যবান হতে পারে, তার উত্তর নয়। আরও কঠিন প্রশ্ন হলো, মানুষকে যদি আল্লাহর ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করা হয়ে থাকে, অথচ আল্লাহ নিজে কারও ইবাদত বা সহায়তার মুখাপেক্ষী না হন, তাহলে এই ইবাদতের প্রয়োজন কার? আল্লাহর কোনো অভাব পূরণ হয় না বলে দাবি করা হলে ইবাদতকে তাঁর প্রয়োজনের বস্তু বলা যায় না। সে ক্ষেত্রে মানুষের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হিসেবে ইবাদতকে স্থাপন করার জন্য মানুষের মঙ্গল, নৈতিক বিকাশ অথবা অন্য কোনো বাস্তব মূল্য দেখাতে হবে। আর যদি সেই মঙ্গলই যুক্তির ভিত্তি হয়, তাহলে মঙ্গল নিজেই মূল্যায়নের মানদণ্ড হয়ে ওঠে; কেবল আদেশ পালনের ঘটনা নয়। অতএব প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই: কারও অভাব না থাকলেও মানুষের ওপর তাঁকে সেবা করার চূড়ান্ত দায়িত্ব কেন আরোপিত হবে, এবং সেই দায়িত্বের বাইরে মানুষের জীবন কেন অর্থহীন?
স্রষ্টার পরিকল্পনা কি সৃষ্ট মানুষের জীবনের সমস্ত মূল্য নির্ধারণ করে?
একটি নির্মিত জিনিসের উদ্দেশ্য তার নির্মাতার পরিকল্পনা থেকে জানা যেতে পারে। কলম দিয়ে লেখা হয়, তালা দিয়ে দরজা আটকানো হয়। কিন্তু মানুষকে কলম বা তালার সঙ্গে এক কাতারে ফেললে মৌলিক নৈতিক সমস্যা দেখা দেয়। কলম ব্যথা পায় না, নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবে না, নিজস্ব লক্ষ্য বদলায় না। মানুষ ব্যথা পায়, নিরাপত্তা চায়, চিন্তা করে, ভালোবাসে, প্রতিবাদ করে এবং সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো ব্যক্তির স্বার্থ ও মর্যাদার বাস্তব ভিত্তি। কাউকে তৈরি করা হয়েছে—এই দাবির ওপর দাঁড়িয়ে তাঁর অনুভূতি ও স্বাধীনতাকে নির্মাতার ব্যবহারের উপকরণ বানানো যায় না। কোনো সন্তান জন্মেছেন বলে পিতা-মাতা তাঁকে আজীবন নিজেদের ইচ্ছাপূরণের যন্ত্র হিসেবে ব্যবহারের নৈতিক অধিকার পান না। মানুষের প্রতি মানুষের এই নৈতিক বিচারে যে নীতি কার্যকর—স্রষ্টা দাবি করা সত্তার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম দেখাতে হলে যুক্তি চাই। “তাঁর ক্ষমতা আছে, তাই তাঁর সিদ্ধান্তই ন্যায়”—এটি ক্ষমতার বর্ণনা, ন্যায়ের প্রমাণ নয়। বড় শক্তি অর্জন করলেই কারও আদেশ নৈতিক হয়ে যায় না; ক্ষমতা আর ন্যায্যতা ভিন্ন ধারণা।
অর্থপূর্ণতার প্রশ্নে স্রষ্টার পরিচয়কে একমাত্র মানদণ্ড করলে শেষ পর্যন্ত মানুষের ব্যক্তিসত্তাকে একটি উপকরণে নামিয়ে আনা হয়। স্রষ্টার ইচ্ছার বাইরে মানুষ কাকে ভালোবাসেন, কোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ান, কোন জ্ঞান সৃষ্টি করেন—এসবকে গৌণ করে দেওয়া হয়। কিন্তু একটি শিশুর জীবন রক্ষা করার মূল্য শিশুটির বেঁচে থাকা, ভবিষ্যৎ, অভিজ্ঞতা ও পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কেই উপস্থিত। কোনো ঈশ্বর সেই কাজে সন্তুষ্ট কি না, সেই তথ্য শিশুটির কষ্ট কমার ঘটনাকে আর বেশি সত্য বা কম সত্য করে না। একইভাবে অন্যায়ভাবে কোনো মানুষকে বন্দি করা হলে তাঁর স্বাধীনতা নষ্ট হয়; ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সেই ক্ষতি মুছে দেয় না। কোনো কাজের নৈতিক মূল্য মানুষের জীবনে তার বাস্তব প্রভাব থেকে বিচ্ছিন্ন করে শুধু কর্তৃপক্ষের আদেশে স্থাপন করার চেষ্টা আসলে মূল্যায়নকে কর্তৃত্বের অধীন করা। জীবনের অর্থ সম্পর্কে এটি শক্তিশালী প্রমাণ নয়, বরং মূল প্রশ্নের জায়গায় অন্য একটি প্রশ্ন বসানো: কে নির্দেশ দেবে?
ঈশ্বরের জন্য জবাবদিহির অব্যাহতি, মানুষের জন্য নিঃশর্ত আনুগত্য
কোরআনের সূরা আম্বিয়া ২১:২৩-এ আল্লাহর কাজ সম্পর্কে তাঁকে প্রশ্ন করা হবে না, অথচ অন্যদের প্রশ্ন করা হবে—এমন বক্তব্য রয়েছে। এর ধর্মীয় অর্থ স্পষ্ট: স্রষ্টা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে, সৃষ্টি জবাবদিহির অধীন। কিন্তু নৈতিক বিচারে এটি নতুন সমস্যা তৈরি করে। কাউকে জবাবদিহির বাইরে ঘোষণা করার সঙ্গে তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্ত ন্যায়সংগত প্রমাণ করার কোনো যুক্তিগত সম্পর্ক নেই। মানুষের সমাজে বিচারক, শাসক, অভিভাবক কিংবা শিক্ষকের কর্তৃত্ব নৈতিক মূল্যায়নের বাইরে নয়; তাঁদের সিদ্ধান্তের কারণ, ক্ষতি ও ন্যায্যতা জিজ্ঞাসা করা যায়। কর্তৃত্ব যত ব্যাপক, তার সিদ্ধান্তে ক্ষতির সম্ভাবনাও তত বেশি—তাই যুক্তি যাচাইয়ের প্রয়োজন বিলুপ্ত হয় না। “কেন” প্রশ্ন করার অধিকার বাতিল করে কোনো দাবিকে সত্য বানানো যায় না। মানুষের জীবন ঈশ্বরের দেওয়া কাজে ব্যয় হবে, কিন্তু ঈশ্বর সেই কাজ কেন দিলেন তার জবাব দেবেন না—এই কাঠামো নৈতিক ব্যাখ্যার বদলে একতরফা ক্ষমতাসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে। [8]
لَا يُسْأَلُ عَمَّا يَفْعَلُ وَهُمْ يُسْأَلُونَ
বাংলা অনুবাদ: তিনি যা করেন সে সম্পর্কে তাঁকে প্রশ্ন করা হবে না; অথচ তাদের প্রশ্ন করা হবে। (সূরা আম্বিয়া ২১:২৩)
যে ব্যক্তি অন্যের ওপর শাস্তি আরোপ করেন, তার ক্ষমতার উৎস জানতে চাওয়া এক প্রশ্ন; শাস্তিটি ন্যায়সংগত কি না, সেটি আরেক প্রশ্ন। ক্ষমতার উৎস ধর্মীয় বা অতিপ্রাকৃত বলে দাবি করা হলে দ্বিতীয় প্রশ্নটি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায় না। কেবল “আল্লাহ প্রশ্নাতীত”—এই ঘোষণাকে চূড়ান্ত উত্তর হিসেবে ব্যবহার করলে কোনো নৈতিক বিতর্ক অবশিষ্ট থাকে না, কারণ তখন সিদ্ধান্তের সত্যতার বদলে সিদ্ধান্তদাতার ক্ষমতার অবস্থানই একমাত্র মানদণ্ড। অথচ একই ব্যবস্থা মানুষের বেলায় উদ্দেশ্য, পরীক্ষা, আনুগত্য, অপরাধ ও জবাবদিহি নিয়ে বিস্তারিত দাবি করে। মানুষকে বলা হচ্ছে নিজের জীবনের অর্থ বের করতে হলে আগে ঈশ্বরের উদ্দেশ্য মানতে হবে; কিন্তু ঈশ্বরের সেই উদ্দেশ্য কেন ন্যায্য এবং কেন একমাত্র অর্থপূর্ণ লক্ষ্য, তা প্রশ্ন করার অধিকারকে মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে না। এই অসমতা প্রত্যক্ষভাবে দ্বৈত মানদণ্ডের প্রকাশ। ন্যায্যতা নিয়ে যুক্তি দাঁড় করানোর কোনো বিকল্প নেই: কর্তৃপক্ষের পরিচয় সত্য ও ন্যায়ের মানদণ্ড তৈরি করে না; বরং সেই পরিচয়ের অধীনে দেওয়া আদেশকেও যুক্তির পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়।
শুরুহীন সচেতন ঈশ্বর: বিশেষণ নয়, প্রমাণ প্রয়োজন
ঈশ্বরকে অনাদি, চিরন্তন, সর্বজ্ঞ ও ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন বলা হয়। কিন্তু এক সত্তার চারটি বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে উচ্চারণ করলেই চারটির অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না। “অস্তিত্বের কোনো শুরু নেই”—এটি সময় ও অস্তিত্ব সম্পর্কে দাবি। “সত্তাটি সচেতন”—এটি অভিজ্ঞতা ও তথ্য-প্রক্রিয়াকরণ সম্পর্কে দাবি। “সত্তাটি ইচ্ছা করে”—এটি সিদ্ধান্ত ও কর্মসম্পাদন সম্পর্কে দাবি। “সত্তাটি উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে”—এটি আকাঙ্ক্ষা, লক্ষ্য ও কর্মের সম্পর্ক সম্পর্কে দাবি। একটি দাবির শব্দকে অন্যটির প্রমাণ বানানো যায় না। পরিচিত সচেতন সত্তার স্মৃতি, অনুভূতি, সচেতন অবস্থার পরিবর্তন এবং চিন্তার সঙ্গে কার্যকর স্নায়বিক প্রক্রিয়ার সম্পর্ক রয়েছে; অচেতন করার ওষুধ, মস্তিষ্কের আঘাত এবং স্নায়ুবিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণ এই সম্পর্ক স্পষ্ট করে। তাই মস্তিষ্কবিহীন, শুরুহীন সচেতন সত্তার দাবি করলে সেই সচেতনতা কীভাবে গঠিত ও কার্যকর হয়—তার পক্ষে স্বাধীন ব্যাখ্যা ও প্রমাণ প্রয়োজন। স্বয়ংসম্পূর্ণ বলার মাধ্যমে এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না।
সময়ের বাইরে অবস্থিত ঈশ্বরের ধারণা আরও কঠিন ব্যাখ্যাগত সমস্যা সামনে আনে। সাধারণ অর্থে চিন্তা করা মানে তথ্য বিবেচনা করা, সিদ্ধান্ত নেওয়া মানে বিকল্প থেকে একটি পথ নির্ধারণ করা, কোনো প্রার্থনায় সাড়া দেওয়া মানে প্রার্থনার সঙ্গে প্রতিক্রিয়ার সম্পর্ক থাকা। এগুলোতে ঘটনার ক্রম এবং পরিবর্তনের ধারণা জড়িত। সময়ের ভেতরে থাকা অনন্তকালব্যাপী সত্তা আর সময়ের বাইরে থাকা সত্তা একই ধারণা নয়। প্রথমটির ক্ষেত্রে শুরুহীন অতীতের দাবি রয়েছে; দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা ও ক্রিয়ার সময়গত ক্রমই প্রশ্নবিদ্ধ। যে ঈশ্বর কোনো সময়ে সৃষ্টি করেন, পরে মানুষের কাজের বিচার করেন এবং কারও আবেদন শোনেন, তাঁর কর্মকাণ্ড ও সময়হীনতার সম্পর্ক পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। “সময় তাঁর জন্য প্রযোজ্য নয়”—এই বাক্যটি সেই ব্যাখ্যা নয়; কেবল সমস্যাটিকে নতুন ভাষায় পুনরাবৃত্তি। দর্শনে সময়হীন ঈশ্বরের সঙ্গে পরিবর্তনশীল জগতের সম্পর্ক যে গভীর ও অমীমাংসিত প্রশ্ন, তা সময় ও অনন্তত্ববিষয়ক গবেষণাতেও বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে [9]।
এখানে আলোচনার মূল ফল সরাসরি: শুরুহীন সচেতন সত্তার অস্তিত্বের প্রমাণ না দিয়ে তাঁকে মানুষের জীবনের উদ্দেশ্যদাতা ঘোষণা করা যায় না। ঈশ্বরের ধারণা দিয়ে মানুষের জীবনের একমাত্র অর্থ প্রতিষ্ঠা করতে গেলে প্রথমে সেই সত্তার অস্তিত্ব, সচেতনতা এবং মানুষের জন্য উদ্দেশ্য নির্ধারণের বাস্তব ঘটনা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শুধু ধর্মগ্রন্থে লেখা আছে বলে এই দাবিগুলো সত্য হয়ে যায় না। এমনকি সেই সত্তার অস্তিত্ব প্রমাণিত হলেও কেন তাঁর উদ্দেশ্যের বাইরে মানুষের জীবনে কোনো বাস্তব মূল্য থাকবে না—সেটিও পৃথকভাবে প্রমাণ করতে হবে। ফলে “ঈশ্বর না থাকলে জীবনের অর্থ নেই” দাবি একটিমাত্র প্রমাণহীন অনুমানের ওপর নয়, একাধিক অপ্রমাণিত অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। মানুষের পক্ষে ভালোবাসা, বুদ্ধিবৃত্তি, সামাজিক সম্পর্ক এবং কষ্ট লাঘবের মতো বাস্তব মূল্য চিহ্নিত করার জন্য এসব অনিশ্চিত অনুমান গ্রহণ করা অপরিহার্য নয়।
অন্তর্নিহিত মূল্য ঈশ্বরের জন্য স্বীকৃত হলে মানুষের জন্য নিষিদ্ধ কেন?
কোনো কাজকে আমরা একটি ফল পাওয়ার উপায় হিসেবে মূল্য দিতে পারি, আবার সেই ফলটিকেই নিজের মধ্যে মূল্যবান বলতে পারি। ওষুধ খাওয়া স্বাস্থ্য ফিরে পাওয়ার উপায়; স্বাস্থ্য ভালো থাকার অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা নিজের মধ্যেই মূল্যবান। শিক্ষা চাকরির উপায় হতে পারে; জানার আনন্দ ও বোধের বিকাশও নিজের মধ্যে মূল্যবান। ভালোবাসা পারিবারিক নিরাপত্তা বাড়ায়; একই সঙ্গে ভালোবাসা কেবল আরেকটি পুরস্কারের পথে যাত্রাবিরতি নয়। তাই অর্থপূর্ণ হওয়ার জন্য প্রতিটি অভিজ্ঞতার পরে আরও উঁচু উদ্দেশ্য বসাতে হয় না। এই তত্ত্বটি ঈশ্বরের ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক। ঈশ্বরের অস্তিত্বের মূল্য যদি তাঁর নিজস্ব প্রকৃতি, জ্ঞান বা কর্মের মধ্যেই থাকে বলে ধরা হয়, তবে মূলত অন্তর্নিহিত মূল্য স্বীকার করা হলো। মানুষ নিজের প্রকৃতি, সম্পর্ক, বোধ এবং কর্মের মধ্যেও অন্তর্নিহিত মূল্য খুঁজে পেতে পারেন। এক জায়গায় অন্তর্নিহিত মূল্য সম্ভব বলে মেনে অন্য জায়গায় সেটিকে আগেই বাতিল করার কোনো সাধারণ নিয়ম নেই। অর্থপূর্ণতার যে দরজা ঈশ্বরের জন্য খোলা রাখা হয়, মানুষকে তার বাইরে রাখার সিদ্ধান্তের পক্ষে স্বাধীন যুক্তি প্রয়োজন।
ধর্মীয় উদ্দেশ্যকে সর্বোচ্চ উদ্দেশ্য বলার মধ্যেও আরেকটি সমস্যা রয়েছে: “সর্বোচ্চ” শব্দটি ব্যবহার করলেই অন্য সব মূল্য শূন্যে নেমে আসে না। মানুষের জীবনে একটি বড় লক্ষ্য থাকতে পারে, কিন্তু তার বাইরে বন্ধুত্ব, হাসি, শিল্প, অনুসন্ধান, বিশ্রাম এবং সহমর্মিতার নিজস্ব মূল্য অটুট থাকে। একজন গবেষক দীর্ঘ জীবনের বড় অংশ ক্যানসারের চিকিৎসা আবিষ্কারে ব্যয় করতে পারেন; এই লক্ষ্যটি তাঁর কাছে গভীরতম হলেও তাঁর সন্তানের প্রতি ভালোবাসাকে অর্থহীন করে না। একইভাবে ঈশ্বরের ইবাদতকে কেউ নিজের প্রধান লক্ষ্য বলে মেনে নিলেও সেখান থেকে অন্য মানুষের অ-ধর্মীয় জীবন অর্থহীন—এমন সিদ্ধান্ত বৈধ হয় না। ‘আমার উদ্দেশ্য’ থেকে ‘সকল মানুষের একমাত্র বৈধ উদ্দেশ্য’—এই লাফের মধ্যে কোনো যুক্তি নেই। জীবনের অর্থকে একক কর্তৃপক্ষের হাতে একচেটিয়া তুলে দিতে হলে মানবিক মূল্যবোধের সব স্বতন্ত্র উৎস বাতিল করার প্রমাণ লাগবে; এমন প্রমাণ ধর্মীয় ঘোষণার মধ্যেই নেই।
উদ্দেশ্য নির্ধারণের ক্ষমতা নয়, ন্যায্যতা হলো চূড়ান্ত প্রশ্ন
কোনো শক্তিশালী সত্তা মানুষের জন্য উদ্দেশ্য নির্ধারণ করতে সক্ষম—এটি সত্য হলেও সেই উদ্দেশ্য মেনে চলা নৈতিকভাবে বাধ্যতামূলক কি না, তা আলাদা বিচার। শক্তি ও কর্তৃত্ব কোনো আদেশের বাস্তবায়ন ঘটাতে পারে; সেই আদেশের ন্যায়সংগততা প্রমাণ করতে পারে না। একজন স্বৈরশাসক হাজার মানুষের পেশা ও জীবনপথ ঠিক করে দিতে পারেন, কিন্তু এই ক্ষমতা তাঁর নির্ধারিত জীবনকে অর্থপূর্ণ এবং মানুষের স্বাধীন লক্ষ্যকে অর্থহীন করে না। একই যুক্তি উদ্দেশ্যদাতা হিসেবে উপস্থাপিত যেকোনো সত্তার ক্ষেত্রেও কার্যকর: উদ্দেশ্যটি অন্যের মঙ্গল, স্বাধীনতা এবং ন্যায়ের সঙ্গে কী সম্পর্ক রাখে—সে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না। প্রশ্নবিদ্ধ আদেশকে মানার পুরস্কার যত বড়ই হোক বা অমান্যের শাস্তি যত ভয়ানকই হোক, তাতে আদেশের নৈতিক চরিত্র বদলায় না। অস্তিত্বের কারণ আর কর্তৃত্বের উৎস থেকে উদ্দেশ্যের ন্যায্যতা নির্ধারণ করার প্রচেষ্টা এখানে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়।
এই দ্বৈত মানদণ্ড ভাঙার জন্য ঈশ্বরকে মানুষের মতো হতে হবে না, কিংবা মানুষকে মহাবিশ্বের স্রষ্টা হতে হবে না। প্রয়োজন কেবল অর্থপূর্ণতার দাবির পক্ষে সমান যুক্তিগত নিয়ম। কোনো সত্তার অস্তিত্বের মূল্য বাইরে থেকে বরাদ্দ করা কাজ ছাড়াও থাকতে পারে—এই নীতি স্বীকার করা হলে মানুষের জীবনকে শুধু পরকালীন কর্তব্য না থাকায় অর্থহীন বলার ভিত্তি থাকে না। মানুষের সিদ্ধান্ত ও কাজের মূল্য যদি বাস্তবে অন্যের মঙ্গল, জ্ঞান এবং ন্যায়ের মাধ্যমে যাচাই করা যায়, তাহলে পরকালের অনুমানকে সেই মূল্যায়নের আবশ্যিক দরজা বানানো ভুল। ঈশ্বরের জন্য উদ্দেশ্যহীন অস্তিত্বকে স্বয়ংসম্পূর্ণ বলে মহিমান্বিত করা, আর মানুষের ক্ষেত্রে বাহ্যিক উদ্দেশ্য না থাকাকে শূন্যতা বলে ঘোষণা করা—এটি কোনো গভীর দার্শনিক আবিষ্কার নয়; এটি একই প্রশ্নে দুটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ মানদণ্ড ব্যবহার করা।
ঈশ্বরের অস্তিত্বের অর্থের জন্য বাইরের নির্দেশ আবশ্যক নয়, কিন্তু মানুষের অর্থের জন্য বাইরের নির্দেশ আবশ্যক—এই অসম নিয়মই বিতর্কের কেন্দ্র। নিয়মটির পক্ষে কার্যকর কারণ না দিলে তা দ্বৈত মানদণ্ড।
কারও জন্য নির্দিষ্ট কাজ বরাদ্দ করা এবং তার অস্তিত্বে বাস্তব মূল্য থাকা পৃথক বিষয়। শিশু, বন্ধুত্ব, জ্ঞান ও ন্যায়বিচারের মূল্য কোনো অতিপ্রাকৃত আদেশের অপেক্ষায় স্থগিত থাকে না।
পরকালের পরেও পরকাল? উদ্দেশ্যের অনন্ত শৃঙ্খলের অসংগতি
পরকালকে পৃথিবীর জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য বলা হলে প্রশ্ন জাগে, পরকালে পৌঁছানোর পর সেই জীবনের অর্থ কীভাবে নির্ধারিত হবে? পৃথিবীতে কাজ করা, ইবাদত করা এবং পরীক্ষায় সফল হওয়ার লক্ষ্য যদি পরকালের পুরস্কার হয়, তাহলে পুরস্কার লাভের পর সেই জীবনের উদ্দেশ্য কী হবে? তখন কি আরেকটি পুরস্কারের প্রয়োজন হবে? অনন্ত জীবনও যদি কেবল ভবিষ্যতের আরও উচ্চতর ফলাফলের জন্য মূল্যবান হয়, তবে সেই হিসাব শেষ হবে না। আর যদি জান্নাতের আনন্দ, শান্তি ও সম্পর্ক নিজের মধ্যেই মূল্যবান হয়, তাহলে একটি মৌলিক নীতি স্বীকার করা হয়: সব মূল্যকে তার পরের কোনো পুরস্কারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে হয় না। যে নীতি অনুসারে পরকালের অভিজ্ঞতা নিজের মধ্যে অর্থবহ, সেই নীতিতে পৃথিবীর ভালোবাসা, জ্ঞান ও কল্যাণও নিজের মধ্যে অর্থবহ হতে পারে। পরকালীন আনন্দের জন্য একের পর এক পরকাল দরকার হয় না বলেই যদি ধারণা করা হয়, তাহলে পার্থিব জীবনের অর্থের জন্যও অবশ্যই আরেকটি জীবন লাগবে—এই যুক্তির সাধারণ ভিত্তি থাকে না। পরকালের প্রতি আকাঙ্ক্ষা একটি বিশ্বাস বা প্রত্যাশা হতে পারে; জীবনের অর্থ প্রমাণ করার একমাত্র পদ্ধতি নয়।
একজন চিকিৎসক রোগীর চিকিৎসা করেন কেন? যাতে রোগী সুস্থ হয়। রোগী সুস্থ হয় কেন? যাতে সে যন্ত্রণা থেকে মুক্ত হয়ে নিজের জীবনযাপন করতে পারে। এই ধারায় কোনো একটি পর্যায়ে এসে আনন্দ, স্বাধীনতা, স্বাস্থ্য ও ভালো থাকা নিজের মধ্যেই মূল্যবান বলে স্বীকার করতে হয়। প্রতিটি ভালোর পর আরও একটি অতিরিক্ত বাহ্যিক উদ্দেশ্য বসানোর কোনো যুক্তি নেই। একজন মা সন্তানের আনন্দে আনন্দিত হন; সন্তানের হাসি দেখলে আনন্দ লাগে। সেই অভিজ্ঞতার অর্থ দেখাতে মাকে আরেকটি উচ্চতর উদ্দেশ্যের সনদ আনতে হয় না। সেই মা জান্নাতে যাবে কি যাবে না, পরকালে এই কাজের জন্য পুরস্কৃত হবে কি হবে না, তার ওপর সেই মায়ের কাজের উদ্দেশ্য নির্ভর করে না। একইভাবে অন্যায় প্রতিরোধ সফল হলে সেই সফলতার মূল্য নির্ধারিত হয় ভুক্তভোগীর বাস্তব নিরাপত্তা ও মর্যাদায়। পরকালের বিশ্বাস এ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হলেও ঘটনাটির মূল্য নতুন করে তৈরি হয় না। এখানে উদ্দেশ্যের শৃঙ্খল নিয়ে রীতিমতো বাস্তব ফলাফল হাজির করা সম্ভব: কাজ → উপকার → জীবনমানের উন্নতি। কিন্তু “কাজ → পরকাল → অর্থপূর্ণতা” সূত্রটি ধরে চললে কেন দ্বিতীয় ধাপই সব অর্থের একমাত্র উৎস, সেই যুক্তিগত সংযোগ প্রতিষ্ঠিত হয় না। অর্থের নামে পরকাল বসানো আসলে মূল্যবান কাজের ব্যাখ্যা না দিয়ে মূল্যায়নের দায়িত্ব ভবিষ্যতের অজানা জগতে সরিয়ে দেয়।
সূরা মুমিনুন ২৩:১১৫-এ মানুষকে উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করা হয়নি—এই বক্তব্যকে আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তনের দাবির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে প্রত্যাবর্তন অর্থপূর্ণতার ধর্মীয় ব্যাখ্যার একটি কেন্দ্রীয় অংশ। কিন্তু কোনো ধর্মগ্রন্থ ভবিষ্যৎ প্রত্যাবর্তন ঘোষণা করলেই মৃত্যুর পর আরেকটি জীবন আছে বলে প্রতিষ্ঠিত হয় না; একইভাবে সেই প্রত্যাবর্তনের বিশ্বাস ছাড়া মানুষ অর্থপূর্ণ কাজ করতে অক্ষম—এ কথাও প্রতিষ্ঠিত হয় না। মানুষের জীবন অর্থপূর্ণ হওয়ার মাপকাঠি যদি অন্যের কষ্ট কমানো, সৃজনশীল অর্জন, জ্ঞানের বিস্তার ও ন্যায়সংগত সম্পর্ক হয়, তাহলে এগুলোর মূল্য বর্তমানেই শনাক্তযোগ্য। অদেখা ভবিষ্যতের পুরস্কারকে অনিবার্য বলে দাবি করার জন্য শুধু ধর্মীয় ঘোষণা যথেষ্ট নয় [10]।
أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا وَأَنَّكُمْ إِلَيْنَا لَا تُرْجَعُونَ
বাংলা অনুবাদ: তোমরা কি ভেবেছিলে, আমি তোমাদের উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের আমার কাছে ফিরিয়ে আনা হবে না? [ সূরা মুমিনুন ২৩:১১৫ ]
অনন্তকাল বেঁচে থাকা আর জীবনের মূল্য এক নয়
একটি জীবন সীমিত—এ তথ্য থেকে জীবনটি অর্থহীন—এই সিদ্ধান্ত আসে না। একটি সংগীতের শেষ সুর আছে, কিন্তু সেই শেষ সুর আগের সব সুরকে অর্থহীন করে না। একজন মানুষ কয়েক বছরের চেষ্টায় রোগের চিকিৎসা আবিষ্কার করলে আবিষ্কারটির মূল্য তাঁর নিজের মৃত্যুর সঙ্গে বাতিল হয়ে যায় না। একটি শিশু কয়েক ঘণ্টা যন্ত্রণার মধ্যে ছিল, পরে চিকিৎসায় সুস্থ হলো; যন্ত্রণা দূর হওয়ার মূল্য অনন্তকাল ধরে টিকে থাকতে হবে, এমন কোনো নীতি নেই। সময়ের দৈর্ঘ্য এবং অভিজ্ঞতার গুরুত্ব পৃথক মাত্রা। যদি একটি কাজের মূল্য প্রমাণের জন্য সেটিকে চিরস্থায়ী হতে হয়, তাহলে কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা, ন্যায়বিচার, শিল্পকর্ম কিংবা বন্ধুত্বের মুহূর্তকে মূল্যবান বলার উপায় থাকত না। অথচ প্রতিটি বাস্তব মঙ্গলই কোনো না কোনো নির্দিষ্ট সময় ও পরিস্থিতিতে ঘটে। অনন্তকাল স্থায়িত্ব হলো সময়ের পরিমাণ সম্পর্কে একটি দাবি; জীবনের অর্থ হলো অভিজ্ঞতা, সম্পর্ক, কাজ ও মূল্য সম্পর্কে বিচার। পরিমাণকে গুণের প্রমাণ বানানো যুক্তিগত ভুল।
অনন্ত জীবন প্রাপ্তির ইচ্ছা কেন তৈরি হয়, সেটিও মানুষকে বুঝতে সাহায্য করে: মৃত্যু প্রিয় মানুষ, অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার বিচ্ছেদ ঘটায়। মানুষ সেই বিচ্ছেদ চায় না, কারণ বেঁচে থাকার মধ্যেই তার ভালোবাসা, লক্ষ্য ও আনন্দ রয়েছে। তাই মৃত্যুভয়কে ব্যবহার করে পৃথিবীর জীবন অর্থহীন ঘোষণা করা নিজের যুক্তিকেই দুর্বল করে। মানুষ যদি বর্তমান জীবনকে আগে থেকেই মূল্যবান না মনে করত, তবে সেটি হারানোর ভয়ও এত তীব্র হতো না। অনন্ত জীবনের আকাঙ্ক্ষা বরং সীমিত জীবনের মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। মৃত্যুর অনিবার্যতা বর্তমান কাজের দায় কমায় না; অন্যায় বন্ধের সুযোগ, সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সময়, অসুস্থ মানুষের সেবা করার ক্ষমতা—এসব সীমিত হওয়ায় সিদ্ধান্তের গুরুত্ব বাড়তে পারে। জীবনের অর্থকে তাই মৃত্যুর অস্বীকারে নয়, মৃত্যুর আগের বাস্তব কর্মকাণ্ডে খুঁজে পাওয়া যায়।
অনন্তকাল বাঁচার ধারণা নিজেও একটি নির্দিষ্ট ধরনের জীবন কল্পনা করতে বাধ্য করে। অনন্ত সময় পাওয়া গেলেই সেই সময়ের সব অভিজ্ঞতা নিজে অর্থপূর্ণ হয়ে যায় না। কোনো লক্ষ্য, সম্পর্ক, সৃজনশীলতা, স্বাধীনতা বা বোঝাপড়া না থাকলে শুধু মেয়াদ বাড়ানো মূল্য তৈরি করে না। বিপরীতভাবে, এই বৈশিষ্ট্যগুলো উপস্থিত থাকলে সীমিত সময়েও জীবন মূল্যবান হয়। সুতরাং জীবনের অর্থপ্রশ্নের উত্তর সময়ের শেষে কোনো যান্ত্রিক সংখ্যা নয়; কীভাবে বাঁচা হচ্ছে, কাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে উঠছে, কী সৃষ্টি ও রক্ষা করা হচ্ছে, সেটিই তার বিষয়। জীবনকে অনন্ত ঘোষণা করার আগে জীবনটির মূল্য কোথায় নিহিত তা ব্যাখ্যা করতে হয়। এই ব্যাখ্যা কেবল ভবিষ্যৎ পুরস্কারের নামে দেওয়া হলে ভালোবাসা, জ্ঞান ও ন্যায়বিচারের বর্তমান মূল্য আবারও অবহেলিত হয়। অর্থপূর্ণ জীবন যাপনের জন্য যে কাজগুলো জরুরি, সেগুলো সবই মানুষের জীবিত অবস্থায় সম্ভব।
পরকালীন বিচারের প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তব ন্যায়বিচারের দায়িত্ব
কোনো নির্যাতনকারী শাস্তি না পেয়ে মারা গেলে মানুষের মনে ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। ভুক্তভোগীর ক্ষতি অমীমাংসিত থেকে যায়; সমাজের মনে ক্ষোভ ও অসহায়তা তৈরি হতে পারে। এই আকাঙ্ক্ষা বাস্তব ও যৌক্তিক। কিন্তু ন্যায়বিচার কাম্য—এই সত্য থেকে মৃত্যুর পরে অবশ্যই একটি বিচারালয় আছে—এ সিদ্ধান্ত আসে না। ইচ্ছিত পরিণতি এবং বাস্তবে ঘটতে চলা ঘটনা এক নয়। অনাহারে থাকা মানুষের খাদ্যের প্রয়োজন আছে বলেই তাঁর সামনে খাদ্য অলৌকিকভাবে হাজির হয় না; তাকে খাদ্য জোগাড় করতে হয়। একইভাবে পৃথিবীতে ন্যায়বিচার অসম্পূর্ণ রয়ে গেলে তার প্রতিকার খুঁজতে হবে প্রমাণ, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, সুরক্ষা, ক্ষতিপূরণ এবং অপরাধ প্রতিরোধের মধ্যে। মৃত্যুর পরে সব হিসাব মিটে যাবে—এই আশ্বাস ভুক্তভোগীর আজকের চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তার বিকল্প নয়। পরকালীন বিচারের আশা একটি মনস্তাত্ত্বিক সান্ত্বনা দিতে পারে; সেই আশা থেকে ভবিষ্যৎ বিচারের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায় না।
পরকালে অন্যায়ের ক্ষতিপূরণ হবে—এ ধারণা যখন বর্তমান জীবনের অবিচারকে সহ্য করার উপদেশে পরিণত হয়, তখন তার সামাজিক প্রভাব গুরুতর। নির্যাতনের শিকার নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, শ্রমিকের প্রাপ্য মজুরি দেওয়া, ধর্মীয় বা রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন বন্ধ করা, শিশুর ওপর সহিংসতা প্রতিরোধ করা—এসব তাৎক্ষণিক দায়িত্ব। ভুক্তভোগীকে ভবিষ্যৎ পুরস্কারের আশ্বাস দিয়ে বর্তমান নিপীড়নের অবসান না ঘটালে সামাজিক ক্ষতি চলতেই থাকে। নৈতিকতার প্রকৃত পরীক্ষা ভবিষ্যৎ অলৌকিক আদালতে নয়; এখন বাস্তব মানুষকে কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তার মধ্যে। ন্যায়বিচার শুধু শাস্তির নাম নয়; এটি ক্ষতি বন্ধ করা, অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া, অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধ এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজ। এই কাজগুলোর যৌক্তিকতা ঈশ্বরের আদেশ প্রমাণ হওয়ার অপেক্ষায় থাকে না। মানুষ যন্ত্রণা অনুভব করে—এই বাস্তবতা থেকে যন্ত্রণার বিরুদ্ধে দায়িত্বের ভিত্তি পাওয়া যায়।
নিজের জীবনের অর্থ নির্মাণ: স্বাধীনতা, যুক্তি ও অন্যের প্রতি দায়িত্ব
জীবনের একটি মাত্র পূর্বনির্ধারিত উদ্দেশ্য নেই—এই উপলব্ধি মানুষকে অর্থহীনতার বন্দিশালায় নিক্ষেপ করে না। বরং প্রত্যেক মানুষ নিজের সামর্থ্য, সীমাবদ্ধতা, সম্পর্ক এবং বিচারবুদ্ধির আলোকে অর্থপূর্ণ লক্ষ্য বেছে নেওয়ার ক্ষমতা পান। একজন গবেষক জটিল প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জীবন কাটান; একজন শিক্ষক প্রজন্মের পর প্রজন্মকে চিন্তার স্বাধীনতা দেন; একজন লেখক নতুন ভাষায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ান; একজন অভিভাবক সন্তানের সুরক্ষায় নিজেকে নিয়োজিত করেন; একজন প্রতিবাদকারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগঠিত হন। এসব কাজের মূল্য একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয় অথবা পরকালের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে তৈরি হয় না। মানুষ নিজে লক্ষ্য নির্বাচন করেন বলে সেই লক্ষ্য মিথ্যা হয়ে যায় না—মানুষের নির্মিত ভাষা, শিল্প, আইন, চিকিৎসাব্যবস্থা ও মানবাধিকার বাস্তব ফল সৃষ্টি করে। তবে নিজের পছন্দই চূড়ান্ত নৈতিক মানদণ্ড নয়: ব্যক্তির স্বাধীনতা অন্যের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হতে হয়। অর্থ নির্মাণের স্বাধীনতার সঙ্গে তাই ন্যায়, সমান মর্যাদা ও দায়িত্বের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য।
ফ্রিডরিখ নীটশের “ঈশ্বর মৃত” উক্তি কোনো দৈব সত্তার আক্ষরিক মৃত্যুর বিবরণ নয়; ইউরোপীয় বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে ঐতিহ্যগত ধর্মীয় নৈতিক কর্তৃত্বের ভিত নড়ে যাওয়ার সংকটের দার্শনিক চিহ্ন। প্রতিষ্ঠিত কর্তৃত্ব দুর্বল হলে মানুষ মূল্যবোধের প্রশ্ন থেকে মুক্ত হন না; তাঁকে বরং প্রশ্ন করতে হয় কোন মূল্য ন্যায়সংগত, কোন নিয়ম নিপীড়ন তৈরি করে এবং কোন লক্ষ্য সত্যিই মানবজীবনের উন্নতি ঘটায়। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বিশ্বাস শুধু পুরোনো বলেই সত্য নয়, আবার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান অনুমোদন করে বলেই ন্যায়সংগত নয়। চিন্তার স্বাধীনতার অর্থ হলো বিশ্বাস ও আদেশকে প্রমাণের পরীক্ষায় আনা, যুক্তি দিয়ে ভুল সংশোধন করা এবং মানুষের কল্যাণকে সিদ্ধান্তে কার্যকর করা। এই স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণহীন খেয়াল নয়; যুক্তিসংগতভাবে নিজের সিদ্ধান্তের দায় গ্রহণের ক্ষমতা। মানুষ যে স্বাধীনভাবে লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে, সেটিই তাঁর জীবনের অর্থ নির্মাণের মৌলিক শক্তি [11]।
বিজ্ঞানের ইতিহাস ও সাহিত্য মানবিক অর্থের কয়েকটি স্বতন্ত্র ক্ষেত্র দেখায়। জীববিজ্ঞানে ডারউইনের কাজ প্রজাতির ইতিহাস ব্যাখ্যা করেছে; মহাবিশ্বতত্ত্বে হকিংয়ের কাজ প্রকৃতির নিয়ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসাকে এগিয়ে নিয়েছে; রবীন্দ্রনাথের কবিতা ভয়হীন চিন্তা, জ্ঞান ও মানবিক স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে ভাষা দিয়েছে। একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব জীবনের নৈতিক আদেশের বই নয়, কোনো কবিতাও পরীক্ষাগারের ফল নয়। তা সত্ত্বেও বিজ্ঞান ও সাহিত্য যৌথভাবে প্রকাশ করে যে মানুষ বাস্তব জগতের তথ্য অনুসন্ধান, অনুভূতি ও ন্যায়সংগত জীবন গঠনের মাধ্যমে মূল্যবান কাজ করতে পারে। জীবনের উদ্দেশ্যকে একটি অতিপ্রাকৃত পরীক্ষার খাতায় নামিয়ে আনলে এই বিপুল মানবিক কৃতিত্বের বাস্তব গুরুত্ব আড়াল হয়ে যায়।
চার্লস ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচন ও সাধারণ পূর্বপুরুষের ধারণা জীববৈচিত্র্য ও অভিযোজনকে প্রাকৃতিক ইতিহাসের প্রক্রিয়ায় ব্যাখ্যা করে। জীবজগতের বিপুল বৈচিত্র্যের প্রতিটি ধাপের জন্য আলাদা অলৌকিক উদ্দেশ্য ঘোষণা বিজ্ঞানের ব্যাখ্যার বিকল্প নয়। প্রজাতির বিকাশের প্রশ্ন তথ্য ও পরীক্ষাযোগ্য মডেলের মাধ্যমেই নিষ্পত্তিযোগ্য।
স্টিভেন হকিং ও লিওনার্ড ম্লোডিনোর The Grand Design মহাবিশ্বের উদ্ভব ব্যাখ্যায় পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম ও মহাজাগতিক মডেলের ভূমিকা আলোচনা করে। অজানা ঘটনার জন্য স্রষ্টার ইচ্ছা ঘোষণা করা পরীক্ষাযোগ্য ব্যাখ্যা নয়। মহাবিশ্বের ইতিহাসের অনুসন্ধান এবং মানুষের জীবনের অর্থ নির্ধারণ—দুটি পৃথক প্রশ্ন; প্রথমটির অজানা তথ্য দ্বিতীয়টির অর্থহীনতা প্রমাণ করে না।
রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি-র ৩৫ নম্বর কবিতায় ভয়হীন চিত্ত, মুক্ত জ্ঞান, যুক্তির স্বচ্ছ প্রবাহ এবং সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত মানুষের আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। মানুষের বুদ্ধির স্বাধীনতা ও সত্যের অনুসন্ধানের এই সাহিত্যিক আবেদন কোনো পরকালীন পুরস্কারের হিসাবের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। মানুষ জীবিত অবস্থায় কীভাবে চিন্তা করে ও বাঁচে—এই বাস্তব প্রশ্নেই এর মূল্য।
উপসংহার: জীবনের অর্থ কোনো পরকালীন অনুমতির অপেক্ষায় নেই
“পরকাল না থাকলে জীবন অর্থহীন”—এই দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়নি, কারণ অর্থপূর্ণতার সঙ্গে মৃত্যুর পরের জীবনের কোনো অনিবার্য যুক্তিগত সম্পর্ক দেখানো যায়নি। জীবনের উৎপত্তি, অন্যের দেওয়া কাজ, নৈতিকতা এবং অর্থপূর্ণতা ভিন্ন প্রশ্ন। মানুষের কষ্ট লাঘব করা, জ্ঞান সৃষ্টি করা, ভালোবাসা গড়ে তোলা, স্বাধীনতা রক্ষা করা এবং অন্যায় প্রতিরোধ করা বাস্তব মূল্যবান কাজ। এগুলোর কোনোটি মূল্যবান হওয়ার জন্য অনন্তকাল স্থায়ী হতে হয় না, কিংবা অন্য কোনো সত্তার দ্বারা আগেই উদ্দেশ্য হিসেবে বরাদ্দ থাকতে হয় না। ধর্মীয় ঘোষণায় যে উদ্দেশ্য বলা হয়েছে, তাকে বাস্তব সত্য ও সর্বজনীন নৈতিক কর্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে তার পক্ষে স্বাধীন যুক্তি ও প্রমাণ প্রয়োজন। এর পরিবর্তে মানুষের জীবনের অর্থ অস্বীকার করার কোনো অধিকার ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের নেই। মানুষের জীবনের অর্থের প্রমাণ মানুষের জীবনেই আছে—যেখানে কষ্ট, আনন্দ, সিদ্ধান্ত, সম্পর্ক, শ্রম, জ্ঞান ও সংগ্রাম বাস্তব।
ঈশ্বরকে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং বাইরের উদ্দেশ্য থেকে মুক্ত বলার সঙ্গে মানুষের জীবনের অর্থকে একমাত্র বাইরের উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভরশীল ঘোষণা করা একই সঙ্গে সত্য বলে ধরে নেওয়া যায় না, যদি না এই অসামঞ্জস্যের পক্ষে কার্যকর যুক্তি হাজির করা হয়। কোরআন মানুষের জন্য ইবাদত, পরীক্ষা ও প্রত্যাবর্তনের লক্ষ্য ঘোষণা করেছে; একই কোরআন ঈশ্বরকে অভাবমুক্ত এবং তাঁর কাজকে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে রেখেছে। কিন্তু “ঈশ্বরের কোনো নির্দেশদাতা লাগে না, মানুষের অর্থপূর্ণ হতে নির্দেশদাতা লাগে”—এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আবশ্যিক যোগসূত্র অনুপস্থিত। নির্ভরশীলতা মূল্যহীনতা নয়; ক্ষমতা ন্যায় নয়; উদ্দেশ্য আর আদেশও একই জিনিস নয়। জীবন সীমিত বলেই জীবনের সুখ-দুঃখ অবাস্তব হয়ে যায় না। মানুষের অসীম জীবনের কল্পনার চেয়ে বাস্তব মানুষকে এখন কীভাবে বাঁচতে দেওয়া হচ্ছে, তাঁর স্বাধীনতা কতটা সুরক্ষিত এবং তাঁর জীবন অন্যের জীবনে কতটা কল্যাণ আনছে—এই প্রশ্নগুলোই নৈতিকভাবে জরুরি। পরকালের অস্তিত্বের দাবি প্রমাণ না থাকলেও মানুষের জীবনের অর্থ নির্মাণ, মূল্যায়ন ও রক্ষা করার ক্ষমতা বাস্তব, বর্তমান এবং যথেষ্ট।
তথ্যসূত্রঃ
- Stanford Encyclopedia of Philosophy, The Meaning of Life ↩︎
- Ryan ও Deci, Intrinsic and Extrinsic Motivations, ২০০০ ↩︎
- Stanford Encyclopedia of Philosophy, Religion and Morality in Western Philosophy ↩︎
- Stanford Encyclopedia of Philosophy, The Meaning of Life, Naturalism ↩︎
- সূরা আয-যারিয়াত ৫১:৫৬ ↩︎
- সূরা মুলক ৬৭:২ ↩︎
- সূরা ফাতির ৩৫:১৫ ↩︎
- কোরআন, সূরা আম্বিয়া ২১:২৩ ↩︎
- Stanford Encyclopedia of Philosophy, Eternity in Christian Thought ↩︎
- সূরা মুমিনুন ২৩:১১৫ ↩︎
- Stanford Encyclopedia of Philosophy, Friedrich Nietzsche ↩︎

