সারসংক্ষেপ
ইসলামি ধর্মবিশ্বাস অনুসারে রমজান মাস শুরু হলে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের শিকলবন্দী করা হয়। মুহাম্মদের এই বক্তব্য সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিমসহ একাধিক হাদিসগ্রন্থে সংরক্ষিত রয়েছে। ইসলামের অতিপ্রাকৃত বিশ্বব্যবস্থায় শয়তান এমন একটি সত্তা, যে মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দেয়, মানুষকে পাপের দিকে প্ররোচিত করে এবং আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা করে। ফলে রমজানে শয়তানদের শিকলবন্দী করার ঘোষণাটি কেবল একটি ধর্মীয় উৎসবের গুরুত্ব বোঝানোর বক্তব্য নয়; এর সঙ্গে অদৃশ্য সত্তার অস্তিত্ব, তার কার্যক্ষমতা, মানুষের আচরণের ওপর তার প্রভাব এবং নির্দিষ্ট একটি চান্দ্র মাসে সেই প্রভাব নিয়ন্ত্রণের দাবি জড়িয়ে রয়েছে। অথচ এই অতিপ্রাকৃত ঘটনার কোনো স্বাধীন পর্যবেক্ষণযোগ্য প্রমাণ নেই। শয়তান কোথায় থাকে, কীভাবে মানুষের মনে প্রভাব সৃষ্টি করে, তাকে কী ধরনের শিকল দিয়ে বন্দী করা হয়, বন্দিত্বের ফলে তার কোন ক্ষমতাগুলো বন্ধ হয়ে যায় এবং রমজান শেষ হলে কীভাবে সে আবার মুক্ত হয়—এসব প্রশ্নের উত্তর ধর্মীয় বর্ণনার বাইরে যাচাইযোগ্য কোনো তথ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
এই বিশ্বাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোর একটি ইসলামি হাদিসসমূহের মধ্যেই উপস্থিত। একদিকে মুহাম্মদ ঘোষণা করেছেন যে রমজানে শয়তানদের শিকলবন্দী করা হয়, অন্যদিকে সহিহ বুখারিতে রমজানের জাকাতের খাদ্যসামগ্রী পাহারার সময় আবু হুরায়রার কাছে শয়তানের আগমন এবং খাদ্য চুরির ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফরত অবস্থায় মুহাম্মদ নিজেই দুই ব্যক্তির মনে শয়তানের কুমন্ত্রণা প্রবেশ করার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন হাদিসে সব শয়তানের পরিবর্তে বিশেষভাবে দুর্ধর্ষ শয়তানদের বন্দী করার উল্লেখও রয়েছে। এই বর্ণনাগুলো একত্রে বিবেচনা করলে শয়তানদের বন্দিত্বের প্রকৃতি, পরিসর ও কার্যকারিতা সম্পর্কে মৌলিক অসংগতি ও অস্পষ্টতা দেখা যায়। শিকলবন্দী হওয়ার অর্থ যদি মানুষের ওপর শয়তানের প্রভাব বন্ধ হওয়া হয়, তাহলে রমজানে শয়তানের সক্রিয়তার বর্ণনাগুলো সেই অর্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আর বন্দিত্ব বলতে যদি কেবল কিছু শয়তানের কার্যক্ষমতা সীমিত হওয়া কিংবা তাদের প্রভাব আংশিক কমে যাওয়া বোঝানো হয়, তাহলে সেই সীমাবদ্ধতার প্রকৃতি এবং বাস্তব ফলাফল নির্ধারণের জন্য পৃথক প্রমাণ প্রয়োজন।
এই অতিপ্রাকৃত দাবির সঙ্গে পৃথিবীর ভৌগোলিক বাস্তবতার সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। রমজান শুরু হয় চান্দ্র মাসের ভিত্তিতে, কিন্তু পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন চাঁদ দেখার সময় এবং ধর্মীয়ভাবে মাস শুরুর সিদ্ধান্ত এক নয়। একই মুহূর্তে সৌদি আরবে রমজান শুরু হলেও অন্য কোনো অঞ্চলে শাবান মাস চলতে পারে। এমনকি ইসলামি হাদিসেই পৃথক অঞ্চলে রমজানের চাঁদ দেখার ভিন্নতার বিবরণ রয়েছে। ফলে প্রশ্ন তৈরি হয়, শয়তানদের বন্দিত্ব কি পৃথিবীর কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের রমজান শুরু হওয়ার সঙ্গে কার্যকর হয়, নাকি প্রত্যেক অঞ্চলে স্থানীয়ভাবে রমজান শুরু হওয়ার সঙ্গে পৃথকভাবে কার্যকর হয়? একটি সর্বজনীন অতিপ্রাকৃত ঘটনাকে ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের ধর্মীয় ক্যালেন্ডারের সঙ্গে যুক্ত করলে তার সময়সীমা ও কার্যপরিধি সম্পর্কে নির্দিষ্ট ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে। পৃথিবীর আবর্তন, ভিন্ন স্থানীয় সময়, চন্দ্রদর্শনের পার্থক্য এবং মেরু অঞ্চলের অস্বাভাবিক দিনরাত্রির বাস্তবতা এই প্রশ্নকে আরও বিস্তৃত করে। অথচ শয়তানের বন্দিত্ব কখন এবং কোথায় শুরু হয়, তার কার্যক্রম কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় এবং ভৌগোলিকভাবে পৃথক অঞ্চলে তার অবস্থান কীভাবে নির্ধারিত হয়, এসব বিষয়ে কোনো পরীক্ষাযোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না।
রমজানে সংঘটিত অপরাধ ও অনৈতিক আচরণের বাস্তব ঘটনাগুলোও শয়তান বন্দিত্বের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি করে। রমজান মাসেও হত্যা, চুরি, ডাকাতি, প্রতারণা, চাঁদাবাজি, খাদ্যে ভেজাল, মজুতদারি, সহিংসতা এবং ধর্মীয় উগ্রতার ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশে রোজা না রাখা কিংবা দিনের বেলায় খাবারের দোকান খোলা রাখাকে কেন্দ্র করে হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও জোরপূর্বক দোকান বন্ধ করার ঘটনাও ঘটেছে। কোরআনে মানুষের নিজের প্রবৃত্তিকেও অন্যায়ের কারণ বলা হয়েছে। কিন্তু রমজানে অপরাধ ও অনৈতিকতা চলতে থাকায় শয়তান বন্দিত্বের কথিত প্রভাব কোথায়, তা নির্ধারণ করা যায় না। শয়তান মানুষের মধ্যে মন্দ চিন্তা ও আচরণ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলে তার বন্দিত্বের ফলে কী নির্দিষ্ট পরিবর্তন ঘটে, সেই পরিবর্তন কতটা পরিমাপযোগ্য এবং সাধারণ সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ থেকে তাকে কীভাবে পৃথক করা যায়—তার কোনো প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি নেই।
রমজানে শয়তানদের বন্দিত্বের ঘোষণা এবং একই মাসে শয়তানের সক্রিয়তার বর্ণনাগুলোর মধ্যে অসংগতি রয়েছে। এই অসংগতির ব্যাখ্যা দিতে ইসলামি ব্যাখ্যাকাররা বন্দিত্বের অর্থ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করেছেন। ব্যাখ্যাকারীদের মধ্যে কেউ একে বাস্তব শিকলবন্দিত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছেন, কেউ কেবল দুর্ধর্ষ শয়তানদের বন্দিত্বের কথা বলেছেন, কেউ শয়তানের প্রভাব দুর্বল হয়ে যাওয়ার অর্থ গ্রহণ করেছেন, আবার কেউ এর রূপক অর্থ আলোচনা করেছেন। এই ব্যাখ্যাগত বৈচিত্র্য দেখায় যে একই ধর্মীয় ঘোষণার কার্যকর অর্থ সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ও অভিন্ন অবস্থান প্রতিষ্ঠিত হয়নি। রমজানে শয়তান বন্দী থাকার দাবিটি সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু হাদিসে বক্তব্যটি উপস্থিত থাকা যথেষ্ট নয়; দাবিকৃত ঘটনাটির বাস্তব অস্তিত্ব এবং প্রভাবের স্বাধীন প্রমাণ প্রয়োজন। রমজানে শয়তানকে শিকলবন্দী করার বিশ্বাসের মৌলিক সমস্যা এখানেই: একটি অপ্রমাণিত অতিপ্রাকৃত সত্তার অপ্রমাণিত বন্দিত্বকে ধর্মীয় কর্তৃত্বের ভিত্তিতে সত্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়, অথচ ঘটনাটির অস্তিত্ব, কার্যকারিতা ও বাস্তব প্রভাব স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না।
ভূমিকা
মানুষের জীবনে অপরাধ, অন্যায়, নিষ্ঠুরতা, প্রতারণা, হিংসা এবং নৈতিক বিচ্যুতি কেন ঘটে, তা মানবসভ্যতার প্রাচীনতম প্রশ্নগুলোর একটি। মানুষ কেন অন্য মানুষকে হত্যা করে, কেন প্রতারণা করে, কেন অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করে, কেন ক্ষমতার অপব্যবহার করে কিংবা নিজের স্বার্থে অন্যের ক্ষতি করে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিভিন্ন সভ্যতায় নানা ধর্মীয় ও অতিপ্রাকৃত ব্যাখ্যার জন্ম হয়েছে। ইসলামি ধর্মতত্ত্বে মানুষের মন্দ চিন্তা ও আচরণের সঙ্গে শয়তানের প্ররোচনার একটি বিশেষ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কোরআনে শয়তানকে মানুষের প্রকাশ্য শত্রু হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে; তাকে এমন একটি সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যে মানুষকে পথভ্রষ্ট করতে চায়, মন্দ কাজকে আকর্ষণীয় করে তোলে এবং মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দেয়। এই ধারণায় শয়তান কেবল অন্যায়ের প্রতীক নয়; সে নিজস্ব ইচ্ছা, উদ্দেশ্য ও কার্যক্ষমতাসম্পন্ন একটি অতিপ্রাকৃত সত্তা, যার অস্তিত্ব মানুষের সাধারণ ইন্দ্রিয়ের কাছে অদৃশ্য হলেও ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে সত্য বলে গ্রহণ করা হয়।
এই ধর্মীয় বিশ্বচিত্রে রমজান মাসের একটি বিশেষ অবস্থান রয়েছে। মুহাম্মদের বক্তব্য অনুসারে, রমজান শুরু হলে জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করা হয় এবং শয়তানদের শিকলবন্দী করা হয়। বক্তব্যটির তাৎপর্য শুধু রমজানের ধর্মীয় মর্যাদার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে এমন একটি অতিপ্রাকৃত ঘটনার ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে, যা বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং যে ঘটনার প্রভাব মানুষের নৈতিক ও ধর্মীয় জীবনের সঙ্গে যুক্ত বলে বিবেচিত হয়। সাধারণ অবস্থায় শয়তান মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দিতে পারে, অথচ রমজানে তার ক্ষমতা কোনো এক বিশেষ প্রক্রিয়ায় সীমিত হয়ে যায়—এমন একটি ধারণাই এই বক্তব্য থেকে তৈরি হয়। কিন্তু শয়তানের কার্যক্ষমতা সীমিত হওয়ার ঘটনাটি যদি বাস্তবেই ঘটে থাকে, তাহলে বন্দিত্বের আগে ও পরে তার আচরণে কী পরিবর্তন হয়, মানুষের ওপর তার প্রভাব কতটুকু কমে এবং সেই পরিবর্তন কীভাবে শনাক্ত করা যায়, এসব প্রশ্ন অনিবার্যভাবে সামনে আসে। কোনো অদৃশ্য সত্তার ওপর একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার দাবি সেই ব্যবস্থার প্রকৃতি ও ফলাফল সম্পর্কে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না।
শয়তানের অস্তিত্ব সম্পর্কে মানুষের কাছে কোনো স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত তথ্য নেই। মানুষের মস্তিষ্কে চিন্তা, আবেগ, ভয়, ক্রোধ, আকাঙ্ক্ষা, সিদ্ধান্ত এবং আচরণের সঙ্গে স্নায়বিক কার্যকলাপের সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ করা যায়। একইভাবে সামাজিক পরিবেশ, শৈশবের অভিজ্ঞতা, পারিবারিক শিক্ষা, অর্থনৈতিক অবস্থা, ব্যক্তিত্ব, মানসিক চাপ, সামাজিক সম্পর্ক এবং আইনগত পরিস্থিতির সঙ্গে মানুষের আচরণের সম্পর্কও গবেষণার মাধ্যমে পরীক্ষা করা যায়। কিন্তু কোনো মানুষের মনে একটি নির্দিষ্ট চিন্তা জন্ম নেওয়ার পেছনে শয়তান নামের কোনো অদৃশ্য সত্তা কাজ করছে—এমন দাবি প্রতিষ্ঠা করার জন্য কোনো স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক শনাক্তকরণপদ্ধতি নেই। মানুষের মনে মন্দ চিন্তা তৈরি হওয়াকে শয়তানের কাজ বলে ঘোষণা করলেই সেই চিন্তার অতিপ্রাকৃত কারণ প্রমাণিত হয় না। একইভাবে কোনো ব্যক্তি অপরাধ থেকে বিরত থাকলে কিংবা রমজানে বেশি ধর্মীয় আচরণ করলে তার পেছনে শয়তানের শিকলবন্দিত্ব কাজ করেছে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়ারও যৌক্তিক ভিত্তি তৈরি হয় না। কারণ একই আচরণের পেছনে ধর্মীয় অনুশাসন, সামাজিক প্রত্যাশা, ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, শাস্তির ভয়, আত্মসংযম কিংবা অভ্যাসের পরিবর্তনের মতো পর্যবেক্ষণযোগ্য কারণ থাকতে পারে।
সমস্যাটি আরও গভীর হয় যখন শয়তানের বন্দিত্বের ঘোষণাকে ইসলামের অন্য বর্ণনাগুলোর সঙ্গে তুলনা করা হয়। সহিহ হাদিসে রমজানের জাকাতের খাদ্যসামগ্রী নিতে আসা শয়তানের কথা রয়েছে। রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফরত মুহাম্মদের বক্তব্যেই মানুষের মনে শয়তানের কুমন্ত্রণা প্রবেশ করার আশঙ্কা প্রকাশ পেয়েছে। আবার কিছু বর্ণনায় শয়তানদের সাধারণভাবে বন্দী করার পরিবর্তে তাদের বিশেষ একটি শ্রেণিকে বন্দী করার কথা বলা হয়েছে। ফলে প্রথমেই প্রশ্ন ওঠে, ঠিক কোন শয়তানদের বন্দী করা হয় এবং বন্দী হওয়ার ফলে তাদের কোন ক্ষমতাগুলো কার্যকর থাকে বা বন্ধ হয়ে যায়? শিকলবন্দী হওয়ার পরেও যদি কোনো শয়তান মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে, মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারে কিংবা মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দেওয়ার সম্ভাবনা বজায় থাকে, তাহলে সেই বন্দিত্বের কার্যকর অর্থ কী? আর যদি বন্দিত্ব কেবল আংশিক ক্ষমতাহ্রাস বোঝায়, তাহলে তার পরিমাণ, সীমা ও বাস্তব প্রভাব কীভাবে নির্ধারিত হয়? প্রশ্নগুলো একই হাদিসসমূহের পারস্পরিক অসংগতি থেকে তৈরি হয়েছে।
রমজান ও শয়তানের বন্দিত্বের সময়কাল নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। পৃথিবীর সর্বত্র একই মুহূর্তে দিন শুরু হয় না, একই মুহূর্তে সূর্যাস্ত ঘটে না এবং একই দিনে রমজানের চাঁদ দেখা যায় না। ইসলামি ঐতিহ্যেই ভিন্ন অঞ্চলে চাঁদ দেখার পার্থক্য এবং পৃথকভাবে রোজা শুরু করার নজির রয়েছে। ফলে একটি অঞ্চলে রমজান শুরু হওয়ার সময় অন্য অঞ্চলে শাবান মাস চলা সম্ভব। এই অবস্থায় শয়তানদের বন্দিত্বের সঙ্গে রমজানের সম্পর্ক কীভাবে কার্যকর হয়, তা স্পষ্ট নয়। শয়তান যদি একটি সর্বজনীন অতিপ্রাকৃত সত্তা হয় এবং তার কার্যক্ষমতা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের ওপর প্রযোজ্য হয়, তাহলে একই মুহূর্তে পৃথক অঞ্চলের ভিন্ন ধর্মীয় তারিখ তার বন্দিত্বকে কীভাবে প্রভাবিত করে? আবার শয়তানদের বন্দিত্ব যদি সমগ্র পৃথিবীতে একই সময়ে শুরু হয়, তাহলে সেই সময় নির্ধারণের ভিত্তি কী? ধর্মীয় ক্যালেন্ডারের স্থানীয় পার্থক্যের মধ্যে শয়তান বন্দিত্বের শুরু, শেষ ও ভৌগোলিক পরিসর অনির্ধারিত।
বাস্তব জীবনের ঘটনাগুলোও এই বিশ্বাসের প্রভাব যাচাইয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। রমজান মাসে ধর্মীয় অনুশাসন, রোজা, নামাজ, দান এবং আত্মসংযমের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু একই মাসে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অপরাধ, সহিংসতা, প্রতারণা ও শোষণের ঘটনা অব্যাহত থাকে। বাংলাদেশেও রমজানে খাদ্যে ভেজাল, অতিরিক্ত মুনাফা আদায়, চাঁদাবাজি, ছিনতাই এবং বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার ঘটনা ঘটে। আরও উদ্বেগজনক হলো, কখনো কখনো রমজানের পবিত্রতা রক্ষার নামে মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর আক্রমণ চালানো হয়। দিনের বেলায় খাবারের দোকান খোলা রাখা, প্রকাশ্যে খাদ্য গ্রহণ কিংবা রোজা না রাখার কারণে মানুষকে হেনস্থা করা, দোকান বন্ধ করতে বাধ্য করা এবং হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনা দেখায়, রমজানের পবিত্রতার ধারণা মানুষের নৈতিক আচরণ নিশ্চিত করে না। শয়তান বন্দিত্বের কথিত প্রভাবও অপরাধ ও সহিংসতার বাস্তব চিত্রে শনাক্ত করা যায়নি।
ধর্মীয় বর্ণনার সত্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিশ্বাস এবং প্রমাণের পার্থক্যটি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ধর্মগ্রন্থে একটি ঘটনার কথা লেখা আছে, কোনো নবী সেটি বলেছেন কিংবা কোনো ধর্মীয় ব্যাখ্যাকার সেটিকে সত্য বলে গ্রহণ করেছেন—এসব থেকে সংশ্লিষ্ট ধর্মের বিশ্বাস ও মতবাদ সম্পর্কে জানা যায়। কিন্তু সেই বক্তব্যের অতিপ্রাকৃত বিষয়বস্তু বাস্তবেই সত্য, সেটি স্বতন্ত্রভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। শয়তানকে শিকলে বাঁধার ঘটনা কোনো মানুষ প্রত্যক্ষভাবে যাচাই করতে পারেনি; তার বন্দিত্বের শিকল, অবস্থান, সময়সীমা কিংবা কার্যকারিতা সম্পর্কে কোনো পরীক্ষাযোগ্য তথ্যও নেই। ঘটনাটির সত্যতা শেষ পর্যন্ত মুহাম্মদের সংবাদকে সত্য ধরে নেওয়ার ওপর নির্ভরশীল। অথচ মুহাম্মদের সংবাদ সত্য, কারণ তিনি আল্লাহর রাসুল—এই বিশ্বাসকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করতে হলে প্রথমেই তাঁর ঐশী কর্তৃত্বের স্বাধীন সত্যতা প্রতিষ্ঠা করতে হয়। সেই কর্তৃত্ব আগে থেকেই সত্য ধরে নিয়ে তাঁর অতিপ্রাকৃত ঘোষণাকে সত্য প্রমাণ করার চেষ্টা একটি বৃত্তাকার যুক্তি তৈরি করে।
রমজানে শয়তানদের শিকলবন্দী করার দাবি তাই তিনটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি হয়: শয়তান নামের সত্তাটির বাস্তব অস্তিত্বের প্রমাণ কী, রমজানে তার বন্দিত্বের ঘটনাটি কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো এবং সেই বন্দিত্বের বাস্তব প্রভাব কোথায় শনাক্ত করা যায়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কেবল ধর্মীয় ঘোষণা, অলৌকিক ব্যাখ্যা কিংবা বিশ্বাসের প্রতি আনুগত্যের মাধ্যমে পাওয়া যায় না। ইসলামি হাদিসের পরস্পরসম্পর্কিত বক্তব্য, ধ্রুপদি ব্যাখ্যাকারদের ভিন্ন অবস্থান, পৃথিবীর ভৌগোলিক ও সময়গত বাস্তবতা এবং মানুষের আচরণ সম্পর্কে পর্যবেক্ষণযোগ্য তথ্য একত্রে বিচার করলে ধর্মীয় দাবিটির জ্ঞানতাত্ত্বিক দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোনো ঘটনার সত্যতার মানদণ্ড ধর্মীয় কর্তৃত্ব নয়; সেই ঘটনার পক্ষে কতটা স্বাধীন, সঙ্গতিপূর্ণ ও যাচাইযোগ্য প্রমাণ রয়েছে, সেটিই নির্ধারক। শয়তানের শিকলবন্দিত্বের ক্ষেত্রে সেই প্রমাণ অনুপস্থিত।
হাদিস সম্পর্কে ইসলামিক আকীদা
ইসলামি ধর্মতত্ত্বে মুহাম্মদের বক্তব্য কেবল একজন সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে বিবেচিত হয় না। তিনি আল্লাহর রাসুল—এই বিশ্বাসের ভিত্তিতে তাঁর ধর্মীয় নির্দেশ, নিষেধ, অদৃশ্য জগতের সংবাদ এবং পরকাল সম্পর্কে বক্তব্যকে বিশেষ কর্তৃত্ব প্রদান করা হয়। কোরআনের পাশাপাশি হাদিস ও সুন্নাহকে ইসলামের ধর্মীয় বিধান ও বিশ্বাসের প্রধান উৎস হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে মুহাম্মদের নামে সংরক্ষিত কোনো বর্ণনাকে সহিহ এবং গ্রহণযোগ্য বলে নির্ধারণ করা হলে সেই বর্ণনার বিষয়বস্তুও ধর্মীয়ভাবে সত্য বলে মেনে নেওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়। বক্তব্যটি মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত হোক কিংবা ফেরেশতা, জিন, শয়তান, জান্নাত, জাহান্নাম ও অন্যান্য অদৃশ্য সত্তার কার্যকলাপ সম্পর্কে হোক—ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে নবীর কর্তৃত্বই তার গ্রহণযোগ্যতার একটি মৌলিক ভিত্তি। এই ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় সমস্যা হলো, কোনো ব্যক্তিকে আল্লাহর রাসুল বলে বিশ্বাস করা এবং সেই ব্যক্তির প্রতিটি অতিপ্রাকৃত সংবাদ বাস্তবেই সত্য হওয়ার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ যৌক্তিক ব্যবধান রয়েছে। প্রথমটি একটি ধর্মীয় বিশ্বাস; দ্বিতীয়টি বাস্তব জগৎ সম্পর্কে নির্দিষ্ট সত্যদাবি। একটি বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠিত ধরে নিলেই তার ওপর নির্ভরশীল সব অতিপ্রাকৃত ঘোষণা স্বাধীনভাবে প্রমাণিত হয়ে যায় না।
মুহাম্মদের বক্তব্যকে বিশেষ কর্তৃত্ব দেওয়ার অন্যতম কোরআনিক ভিত্তি সূরা আন-নাজমের ৩–৪ নম্বর আয়াত। সেখানে মুহাম্মদ নিজের খেয়ালখুশি অনুযায়ী কথা বলেন না এবং তাঁর কাছে যা পৌঁছানো হয় তা ওহি—এমন ঘোষণা রয়েছে। এই বক্তব্যকে নবীর ধর্মীয় সংবাদের সত্যতার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। কিন্তু আয়াতটির বক্তব্য নিজেই কোরআনের একটি দাবি। অর্থাৎ কোরআনে মুহাম্মদের সংবাদকে ঐশী উৎস থেকে আগত বলা হয়েছে—এটি কোরআনের নিজস্ব ঘোষণা। মুহাম্মদের কাছে সত্যিই অতিপ্রাকৃত কোনো সত্তা ওহি পৌঁছে দিয়েছে কি না, সেই ঘটনাটি এই ঘোষণার দ্বারা স্বাধীনভাবে প্রমাণিত হয় না। কোরআনের নিজস্ব ঘোষণা দিয়ে মুহাম্মদের ওহিপ্রাপ্তি প্রমাণ করার যুক্তি বৃত্তাকার। বক্তব্যটির ঐশী উৎসের স্বাধীন প্রমাণ প্রয়োজন। [1]
وَمَا يَنطِقُ عَنِ الْهَوَىٰ ﴿٣﴾ إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَىٰ ﴿٤﴾
বাংলা অনুবাদ: আর সে নিজের খেয়ালখুশি থেকে কথা বলে না। এটি তো কেবল ওহি, যা তার প্রতি প্রেরণ করা হয়।
ইসলামে মুহাম্মদের বক্তব্যের প্রতি আনুগত্যকে কেবল ধর্মীয় শ্রদ্ধার বিষয় হিসেবে রাখা হয়নি; তা ঈমানের শর্তের সঙ্গেও যুক্ত করা হয়েছে। সূরা আন-নিসার ৬৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, মানুষ পরস্পরের বিরোধে মুহাম্মদকে বিচারক হিসেবে গ্রহণ না করা পর্যন্ত, তাঁর সিদ্ধান্ত সম্পর্কে নিজের মনে কোনো সংকোচ না রাখা পর্যন্ত এবং সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত বিশ্বাসী হবে না। এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ দুটি শর্ত হলো, সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অন্তরে কোনো আপত্তি না রাখা এবং সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করা। অর্থাৎ বাহ্যিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত পালন করাই যথেষ্ট নয়; সেই সিদ্ধান্তের প্রতি মানসিক আনুগত্যও ঈমানের সঙ্গে যুক্ত। কোনো সিদ্ধান্তের যথার্থতা নিয়ে আপত্তি বা অস্বস্তি থাকলে সেটিও ধর্মীয়ভাবে সমস্যার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। বিচারসংক্রান্ত বিরোধে নবীর সিদ্ধান্তের প্রতি প্রশ্নহীন আত্মসমর্পণকে এখানে ঈমানের শর্ত করা হয়েছে। [2]
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
বাংলা অনুবাদ: অতএব তোমার প্রতিপালকের শপথ, তারা বিশ্বাসী হবে না, যতক্ষণ না নিজেদের মধ্যে সৃষ্ট বিরোধের বিচারক হিসেবে তোমাকে গ্রহণ করে, তারপর তুমি যে সিদ্ধান্ত দেবে সে বিষয়ে নিজেদের মনে কোনো সংকোচ অনুভব না করে এবং সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করে।
সূরা আল-আহযাবের ৩৬ নম্বর আয়াতেও একই কর্তৃত্বমূলক সম্পর্ক আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার পর বিশ্বাসী নারী বা পুরুষের সেই বিষয়ে পৃথকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার থাকে না। নির্দেশ অমান্য করাকে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এর ফলে ধর্মীয় কর্তৃত্বের একটি নির্দিষ্ট কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়: প্রথমে কোনো সিদ্ধান্তকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সিদ্ধান্ত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়; এরপর সেই সিদ্ধান্তের ওপর ব্যক্তির নিজস্ব পছন্দ ও সিদ্ধান্তক্ষমতার অধিকার অস্বীকার করা হয়। এই কাঠামোয় কোনো বক্তব্যের উৎস হিসেবে নবীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে তার বিষয়বস্তুর ওপর স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ সংকুচিত হয়। বিশ্বাসীর সামনে তখন প্রশ্ন থাকে নির্দেশটি মানবেন কি না; নির্দেশটির উৎস সত্যিই ঐশী কি না, সেটি অনির্দিষ্টভাবে পুনর্বিবেচনার স্বাধীনতা ধর্মীয় আনুগত্যের সঙ্গে সংঘাতে পড়ে। [3]
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا
বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিলে কোনো বিশ্বাসী পুরুষ কিংবা বিশ্বাসী নারীর জন্য সেই বিষয়ে নিজের পছন্দমতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার থাকে না। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অবাধ্য হয়, সে অবশ্যই সুস্পষ্টভাবে পথভ্রষ্ট হয়েছে।
মুহাম্মদের নিজের মুখ থেকে উচ্চারিত কথার সত্যতা সম্পর্কে সুনান আবু দাউদের একটি হাদিস বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আবদুল্লাহ ইবনে আমর জানান, তিনি মুহাম্মদের কাছ থেকে যা শুনতেন তা লিখে রাখতেন, যাতে সবকিছু সংরক্ষণ করা যায়। কিন্তু কুরাইশদের কয়েকজন তাঁকে এভাবে সব কথা লিখে রাখতে নিষেধ করেন। তাঁদের আপত্তির কারণ ছিল, মুহাম্মদ একজন মানুষ; তিনি রাগের সময় যেমন কথা বলেন, তেমনি সন্তুষ্ট অবস্থাতেও কথা বলেন। অর্থাৎ আপত্তিটি ছিল মানুষের আবেগ ও পরিস্থিতির সঙ্গে তার বক্তব্যের সম্পর্ক নিয়ে। আবদুল্লাহ ইবনে আমর বিষয়টি মুহাম্মদকে জানালে মুহাম্মদ নিজের মুখের দিকে আঙুল দিয়ে ইঙ্গিত করেন এবং শপথ করে জানান, তাঁর মুখ থেকে সত্য ছাড়া কিছু বের হয় না। এই হাদিসে মুহাম্মদ নিজের বক্তব্যের সত্যতার বিষয়ে একটি সর্বব্যাপী ঘোষণা দিয়েছেন। এখানে কেবল কোরআনের আয়াত লিখে রাখার অনুমতি দেওয়া হয়নি; আলোচনার বিষয় ছিল মুহাম্মদের কাছ থেকে শোনা কথাগুলো সংরক্ষণ করা। মূল আরবির শেষ বাক্য, مَا يَخْرُجُ مِنْهُ إِلَّا حَقٌّ, সরাসরি সত্য ছাড়া কিছু বের না হওয়ার দাবিই প্রকাশ করে। [4]
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو، قَالَ كُنْتُ أَكْتُبُ كُلَّ شَىْءٍ أَسْمَعُهُ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أُرِيدُ حِفْظَهُ فَنَهَتْنِي قُرَيْشٌ وَقَالُوا أَتَكْتُبُ كُلَّ شَىْءٍ تَسْمَعُهُ وَرَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بَشَرٌ يَتَكَلَّمُ فِي الْغَضَبِ وَالرِّضَا فَأَمْسَكْتُ عَنِ الْكِتَابِ فَذَكَرْتُ ذَلِكَ لِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَأَوْمَأَ بِأُصْبُعِهِ إِلَى فِيهِ فَقَالَ اكْتُبْ فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا يَخْرُجُ مِنْهُ إِلَّا حَقٌّ
বাংলা অনুবাদ: আবদুল্লাহ ইবনে আমর থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসুলের কাছ থেকে যা কিছু শুনতাম, তা সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে লিখে রাখতাম। কিন্তু কুরাইশরা আমাকে নিষেধ করে বলল, তুমি যা কিছু শোন, তার সবই লিখে রাখছ? অথচ আল্লাহর রাসুল একজন মানুষ; তিনি রাগের অবস্থায়ও কথা বলেন, সন্তুষ্ট অবস্থায়ও কথা বলেন। তখন আমি লেখা বন্ধ করে দিলাম এবং বিষয়টি আল্লাহর রাসুলকে জানালাম। তিনি নিজের মুখের দিকে আঙুল দিয়ে ইঙ্গিত করে বললেন, লিখতে থাকো। সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, এই মুখ থেকে সত্য ছাড়া কিছুই বের হয় না।
সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৯/ শিক্ষা-বিদ্যা, (জ্ঞান-বিজ্ঞান)
পরিচ্ছেদঃ ৪১৭. ইলম লিপিবদ্ধ করা সম্পর্কে।
৩৬০৭. মুসাদ্দাদ (রহঃ) ….. আবদুল্লাহ ইবন আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি যা কিছু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট হতে শ্রবণ করতাম, তা লিখে রাখতাম। আমি ইচ্ছা করতাম যে, আমি এর সবই সংরক্ষণ করি। কিন্তু কুরাইশরা আমাকে এরূপ করতে নিষেধ করে এবং বলেঃ তুমি যা কিছু শোন তার সবই লিখে রাখ, অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন মানুষ, তিনি তো কোন সময় রাগান্বিত অবস্থায় কথাবার্তা বলেন এবং খুশীর অবস্থায়ও বলেন। একথা শুনে আমি লেখা বন্ধ করি এবং বিষয়টি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অবহিত করি। তখন তিনি তার আংগুল দিয়ে নিজের মুখের প্রতি ইাশারা করে বলেনঃ তুমি লিখতে থাক, ঐ যাতের কসম, যাঁর হাতে আমার জীবন, যা কিছু এ মুখ হতে বের হয়, তা সবই সত্য।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রাঃ)
আবু দাউদের হাদিসে মুহাম্মদ নিজের মুখ থেকে সত্য ছাড়া কিছু বের হয় না বলে ঘোষণা করেছেন। কিন্তু নিজের সত্যবাদিতার ঘোষণা নিজের নির্ভুলতার প্রমাণ নয়। তাঁর অনুসারীরা এই ঘোষণাকেই সমস্ত বক্তব্যের সত্যতার প্রমাণ ধরলে যুক্তিটি বৃত্তাকার হয়ে যায়। সত্য বলার ইচ্ছা আর বাস্তব ঘটনা সম্পর্কে নির্ভুল জ্ঞানও এক নয়; একজন ব্যক্তি আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করেও ভুল করতে পারেন। মুহাম্মদের অতিপ্রাকৃত সংবাদগুলোর সত্যতা নির্ধারণেও তাঁর বক্তব্যের বাইরে স্বাধীন প্রমাণ প্রয়োজন।
রমজানে শয়তানদের শিকলবন্দী করার দাবিটি এই সমস্যার একটি নির্দিষ্ট উদাহরণ। মুহাম্মদ বলেছেন, রমজান শুরু হলে শয়তানদের বন্দী করা হয়। তাঁর এই বক্তব্য ইসলামি হাদিসগ্রন্থে সংরক্ষিত রয়েছে। কিন্তু বক্তব্যটি সত্য হিসেবে গ্রহণ করতে গেলে কয়েকটি পৃথক দাবি সত্য ধরে নিতে হয়: শয়তান নামের অতিপ্রাকৃত সত্তাদের অস্তিত্ব রয়েছে; তারা সাধারণ সময়ে স্বাধীনভাবে কার্যকলাপ পরিচালনা করে; রমজান শুরু হলে তাদের ওপর বিশেষ বন্দিত্ব কার্যকর হয়; সেই বন্দিত্ব সম্পর্কে মুহাম্মদ নির্ভুল সংবাদ পেয়েছিলেন; এবং পরবর্তী হাদিসসংবহন সেই বক্তব্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ করেছে। এখানে শয়তানের অস্তিত্ব, বন্দিত্ব ও মুহাম্মদের অতিপ্রাকৃত সংবাদপ্রাপ্তির কোনোটিরই স্বাধীন প্রমাণ নেই। সব কটি দাবির ভিত্তি মুহাম্মদের ধর্মীয় কর্তৃত্ব; সেই কর্তৃত্ব আবার কোরআন ও মুহাম্মদের নিজের ঘোষণার ওপর প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। এটি বৃত্তাকার যুক্তি।
হাদিসের সহিহ শ্রেণিবিন্যাসও এই যৌক্তিক সমস্যার সমাধান করে না। কোনো হাদিসকে সহিহ বলা হলে তা হাদিসশাস্ত্রের অভ্যন্তরীণ সংবহন ও গ্রহণযোগ্যতার নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুসারে মূল্যায়নের ফল। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বর্ণনাটি ইসলামের স্বীকৃত হাদিসসংগ্রহে কী মর্যাদা পেয়েছে, তা জানা যায়। কিন্তু কোনো বর্ণনার সংবহন গ্রহণযোগ্য হওয়া এবং বর্ণিত অতিপ্রাকৃত ঘটনাটি বাস্তবে সংঘটিত হওয়া একই বিষয় নয়। মুহাম্মদ সত্যিই কোনো নির্দিষ্ট কথা বলেছিলেন বলে ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হলেও সেই কথায় বর্ণিত অদৃশ্য ঘটনাটি বাস্তবেই ঘটেছিল—এই অতিরিক্ত সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুসরণ করে না। একজন প্রাচীন ব্যক্তির বক্তব্য সংরক্ষিত থাকার প্রমাণ এবং সেই ব্যক্তির মহাজাগতিক বা অতিপ্রাকৃত জ্ঞানের নির্ভুলতার প্রমাণকে এক করে ফেললে ইতিহাস ও বাস্তব সত্য সম্পর্কে দুটি পৃথক প্রশ্ন গুলিয়ে যায়।
ফলে রমজানে শয়তানদের বন্দিত্বের মতো দাবির ক্ষেত্রে ইসলামি আকীদার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বিশ্বাসীকে একটি অদৃশ্য ঘটনার সত্যতা গ্রহণ করতে বলা হয় এমন একজন ব্যক্তির সংবাদ হিসেবে, যাঁর কর্তৃত্ব ও সত্যবাদিতা ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যেই প্রতিষ্ঠিত। অথচ কোনো ব্যক্তিকে নির্ভুল বলে বিশ্বাস করার মাধ্যমে তাঁর বর্ণিত অতিপ্রাকৃত ঘটনাগুলো নির্ভুল বলে প্রমাণিত হয় না। নির্ভুলতার ঘোষণাটিও প্রমাণের অধীন, প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। ধর্মীয় কর্তৃত্বের ভিত্তিতে বক্তব্য গ্রহণ করা এবং স্বাধীন প্রমাণের ভিত্তিতে বক্তব্য গ্রহণ করার মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য এখানেই। রমজানে শয়তানদের শিকলবন্দী হওয়ার দাবিটি ধর্মীয় বিশ্বাস, প্রমাণিত বাস্তব ঘটনা নয়।
হাদিসের বিবরণ
রমজান মাসে শয়তানদের শিকলবন্দী করার বক্তব্যটি সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনান নাসাঈ ও জামে তিরমিজিসহ একাধিক হাদিসগ্রন্থে সংরক্ষিত রয়েছে। এই বর্ণনাগুলোর কেন্দ্রীয় বক্তব্য হলো, রমজান শুরু হলে অদৃশ্য জগতের তিনটি বিশেষ ঘটনা ঘটে: জান্নাত কিংবা আসমানের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের শিকলবন্দী করা হয়। এখানে কেবল মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি, আত্মসংযম কিংবা নৈতিক আচরণ সম্পর্কে বক্তব্য দেওয়া হয়নি। বর্ণনাগুলোর ভাষায় জান্নাত, জাহান্নাম এবং শয়তানদের ওপর নির্দিষ্ট কার্যক্রম সংঘটিত হওয়ার ঘোষণা রয়েছে। আরবি মূল পাঠে শয়তানকে শিকলবন্দী করার কথাই রয়েছে। বর্ণনাভেদে শয়তানদের শ্রেণি এবং জান্নাত, আসমান ও রহমতের দরজার উল্লেখে পার্থক্য পাওয়া যায়।
সহিহ বুখারির ১৮৯৯ নম্বর হাদিসে আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত হয়েছে, মুহাম্মদ বলেছেন, রমজান মাস প্রবেশ করলে আসমানের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের শিকলবন্দী করা হয়। আরবি মূলের তিনটি ক্রিয়াপদ এখানে গুরুত্বপূর্ণ: فُتِّحَتْ অর্থ খুলে দেওয়া হয়, غُلِّقَتْ অর্থ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং سُلْسِلَتْ অর্থ শিকলবন্দী করা হয়। তিনটি ক্রিয়াই এমনভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে সংশ্লিষ্ট বস্তু বা সত্তার ওপর কোনো কার্যক্রম সংঘটিত হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। বিশেষভাবে سُلْسِلَتِ الشَّيَاطِينُ শব্দগুচ্ছের সরাসরি অর্থ শয়তানদের শিকলবন্দী করা হয়েছে। এখানে শয়তানদের ভালো কাজে উৎসাহিত করা, মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি বৃদ্ধি পাওয়া কিংবা পাপের প্রবণতা কমে যাওয়ার কথা সরাসরি বলা হয়নি। শয়তানদের ওপর একটি বিশেষ বন্দিত্ব কার্যকর হওয়ার ঘোষণাই হাদিসটির মূল বক্তব্যের অংশ। [5]
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم «إِذَا دَخَلَ شَهْرُ رَمَضَانَ فُتِّحَتْ أَبْوَابُ السَّمَاءِ، وَغُلِّقَتْ أَبْوَابُ جَهَنَّمَ، وَسُلْسِلَتِ الشَّيَاطِينُ»
বাংলা অনুবাদ: আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, মুহাম্মদ বলেছেন, যখন রমজান মাস শুরু হয়, তখন আসমানের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের শিকলবন্দী করা হয়।
এই হাদিসে লক্ষণীয় বিষয় হলো, রমজান শুরু হওয়ার ঘটনাটিকে শয়তানদের বন্দিত্বের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে। বক্তব্যটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির রোজা রাখা, নামাজ পড়া, দান করা কিংবা অন্য কোনো ধর্মীয় আচরণের ওপর শর্তযুক্ত নয়। ঘোষণাটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, দেশ বা অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়নি। সাধারণভাবে রমজান মাস শুরু হওয়ার সঙ্গে এই ঘটনাগুলো যুক্ত করা হয়েছে। ফলে বক্তব্যটির স্বাভাবিক পাঠে একটি সময়নির্ভর অতিপ্রাকৃত ব্যবস্থা উপস্থিত হয়। বছরের অন্যান্য সময়ে শয়তানদের যে স্বাধীনতা বা কার্যক্ষমতা রয়েছে, রমজান শুরু হওয়ার পরে তার ওপর বিশেষ নিয়ন্ত্রণ আরোপিত হয়। কিন্তু নিয়ন্ত্রণটি কোথায় কার্যকর হয়, কীভাবে কার্যকর হয় এবং বন্দিত্বের ফলে শয়তানের কোন কোন ক্ষমতা বন্ধ হয়ে যায়, সে সম্পর্কে হাদিসটি কোনো বিস্তারিত তথ্য দেয় না। ঘোষণাটি যত নির্দিষ্টভাবে একটি ঘটনা সংঘটিত হওয়ার কথা বলেছে, সেই ঘটনার কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে ততটাই তথ্যের অভাব রয়েছে।
সহিহ মুসলিমের ১০৭৯ নম্বর হাদিসেও আবু হুরায়রা থেকে একই মূল বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, রমজান এলে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করা হয় এবং শয়তানদের বন্দী করা হয়। বুখারির সঙ্গে মুসলিমের এই বর্ণনার একটি শব্দগত পার্থক্য রয়েছে। বুখারিতে ব্যবহৃত হয়েছে أَبْوَابُ السَّمَاءِ, অর্থাৎ আসমানের দরজাগুলো; আর মুসলিমের এই বর্ণনায় ব্যবহৃত হয়েছে أَبْوَابُ الْجَنَّةِ, অর্থাৎ জান্নাতের দরজাগুলো। শয়তানদের বন্দিত্ব বোঝাতেও বুখারির سُلْسِلَتْ শব্দের পরিবর্তে মুসলিমে صُفِّدَتْ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। উভয় ক্রিয়াপদই শিকলবন্দী বা বাঁধা অবস্থায় রাখার অর্থ প্রকাশ করে। ফলে শব্দগত এই পার্থক্যের পরেও শয়তানদের বন্দী করার কেন্দ্রীয় বক্তব্য অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে মুসলিম ১০৭৯ক-এর আরবি পাঠে জান্নাতের দরজা বলা হলেও Sunnah.com-এর ইংরেজি অনুবাদে সেখানে রহমতের দরজা লেখা হয়েছে। আরবি الْجَنَّةِ শব্দের সঠিক অনুবাদ এখানে জান্নাত; রহমত নয়। [6]
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ «إِذَا جَاءَ رَمَضَانُ فُتِّحَتْ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ وَغُلِّقَتْ أَبْوَابُ النَّارِ وَصُفِّدَتِ الشَّيَاطِينُ»
বাংলা অনুবাদ: আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, মুহাম্মদ বলেছেন, যখন রমজান মাস আসে, তখন জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের শিকলবন্দী করা হয়।
সহিহ মুসলিমের একই হাদিসের আরেকটি বর্ণনায় জান্নাত বা আসমানের দরজার পরিবর্তে রহমতের দরজার কথা এসেছে। সেখানে আরবি أَبْوَابُ الرَّحْمَةِ ব্যবহৃত হয়েছে, যার সরাসরি অর্থ রহমতের দরজাগুলো। এই পার্থক্য দেখায় যে একই মূল বর্ণনার সংবহনরূপে আসমান, জান্নাত ও রহমতের দরজার উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে। তিনটি অভিব্যক্তি আক্ষরিকভাবে একই শব্দ বা একই বস্তু নির্দেশ করে না। অন্যদিকে শয়তানদের বন্দিত্বের বক্তব্যটি এই ভিন্ন বর্ণনাতেও বহাল রয়েছে। ফলে হাদিসটির একটি স্থায়ী মূল বিষয় হিসেবে শয়তানদের শিকলবন্দী করার দাবিকে শনাক্ত করা যায়। বুখারি ও মুসলিমের এসব বর্ণনায় কেন্দ্রীয় বর্ণনাকারী আবু হুরায়রা; তাই একই বক্তব্য একাধিক হাদিসগ্রন্থে সংরক্ষিত থাকাকে একাধিক স্বতন্ত্র প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য হিসেবে গণ্য করা যায় না। বর্ণনাগুলোর ঐতিহাসিক সংবহন এবং সেগুলোতে বর্ণিত অতিপ্রাকৃত ঘটনার বাস্তব সত্যতা পৃথক প্রশ্ন। [7]
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم «إِذَا كَانَ رَمَضَانُ فُتِّحَتْ أَبْوَابُ الرَّحْمَةِ وَغُلِّقَتْ أَبْوَابُ جَهَنَّمَ وَسُلْسِلَتِ الشَّيَاطِينُ»
বাংলা অনুবাদ: আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, মুহাম্মদ বলেছেন, যখন রমজান মাস আসে, তখন রহমতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের শিকলবন্দী করা হয়।
সুনান নাসাঈর ২১০৬ নম্বর হাদিসে মুহাম্মদ রমজান মাসকে বরকতময় ঘোষণা করে বলেছেন, এ মাসে আসমানের দরজা খোলা হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করা হয় এবং مَرَدَةُ الشَّيَاطِينِ—দুর্ধর্ষ বা প্রবল বিদ্রোহী শয়তানদের শিকলবন্দী করা হয়। مَرَدَةُ শব্দটি বিদ্রোহের তীব্রতা প্রকাশ করে; কিন্তু ‘শয়তান’ শব্দের মধ্যেই অনিষ্ট, অবাধ্যতা ও বিদ্রোহের অর্থ রয়েছে। ফলে ‘বিদ্রোহী শয়তান’ আর ‘সাধারণ শয়তান’—এই শব্দগত পার্থক্যকে ভালো ও মন্দ শয়তানের বিভাজন হিসেবে দেখানোর সুযোগ নেই। সহিহ বুখারি ১৮৯৯ ও সহিহ মুসলিম ১০৭৯-এ কোনো বিশেষণ ছাড়াই শয়তানদের শিকলবন্দী করার ঘোষণা রয়েছে। নাসাঈর বিশেষণকে কেন্দ্র করে ওই সাধারণ ঘোষণার পরিসর সংকুচিত করা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। [8]
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم «أَتَاكُمْ رَمَضَانُ شَهْرٌ مُبَارَكٌ فَرَضَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ عَلَيْكُمْ صِيَامَهُ تُفْتَحُ فِيهِ أَبْوَابُ السَّمَاءِ وَتُغْلَقُ فِيهِ أَبْوَابُ الْجَحِيمِ وَتُغَلُّ فِيهِ مَرَدَةُ الشَّيَاطِينِ لِلَّهِ فِيهِ لَيْلَةٌ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ مَنْ حُرِمَ خَيْرَهَا فَقَدْ حُرِمَ»
বাংলা অনুবাদ: আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, মুহাম্মদ বলেছেন, তোমাদের কাছে বরকতময় রমজান মাস এসেছে। আল্লাহ এই মাসে তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করেছেন। এই মাসে আসমানের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই মাসে দুর্ধর্ষ শয়তানদের শিকলবন্দী করা হয়। এই মাসে আল্লাহর একটি রাত রয়েছে, যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। যে ব্যক্তি সেই রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো, সে প্রকৃতপক্ষেই বঞ্চিত হলো।
সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম ও সুনান নাসাঈর বর্ণনাগুলোর মূল বক্তব্য একই: রমজান মাসে শয়তানদের শিকলবন্দী করা হয়। কিন্তু এই ঘোষণার সঙ্গে একই ইসলামি উৎসে সংরক্ষিত শয়তানের সক্রিয়তার বিবরণগুলোর অসংগতি রয়েছে। বিশেষভাবে দুর্ধর্ষ শয়তানদের বন্দিত্বের কথা এসেছে বলে অন্য শয়তানরা মুক্ত থাকে—এমন সিদ্ধান্ত হাদিসের বক্তব্য নয়, পরবর্তী ব্যাখ্যাকারদের একটি ব্যাখ্যা। কোরআনের সূরা আস-সাফফাতের ৭ নম্বর আয়াতে كُلِّ شَيْطَانٍ مَارِدٍ অর্থাৎ প্রত্যেক বিদ্রোহী শয়তানের কথা বলা হয়েছে। সূরা আল-হাজ্জের ৩ নম্বর আয়াতেও كُلَّ شَيْطَانٍ مَرِيدٍ অর্থাৎ প্রত্যেক বিদ্রোহী শয়তানের উল্লেখ রয়েছে। ফলে বিদ্রোহী শব্দকে শয়তানের মৌলিক বৈশিষ্ট্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি সুবিধাজনক শ্রেণিবিভাগ নির্মাণের ভিত্তি নেই। শয়তানদের বন্দী করার ঘোষণা এবং রমজানেই তাদের মানুষের কাছে আসা ও কুমন্ত্রণা দেওয়ার বিবরণের মধ্যকার সমস্যাটি অপরিবর্তিত রয়েছে। [9] [10]
এই ব্যাখ্যার দুর্বলতা ইসলামি ব্যাখ্যাসাহিত্যেই স্বীকৃত। ইবনে খুযাইমা রমজানে কেবল দুর্ধর্ষ জিন-শয়তানদের বন্দী করার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু ইসলামQA-এর ২৫৬৮৬৮ নম্বর আলোচনায় এই সীমিত ব্যাখ্যার পক্ষে ব্যবহৃত কয়েকটি বর্ণনার পাঠ ও সনদের সমস্যা দেখিয়ে সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমের সাধারণ বক্তব্যকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, প্রত্যেক শয়তানই বিদ্রোহী; কাজেই مَرِيدٍ বিশেষণটি বন্দিত্বকে কেবল একটি শ্রেণিতে সীমাবদ্ধ করছে বলে ধরে নেওয়ার ভিত্তি নেই। অর্থাৎ ‘বিদ্রোহী শয়তান বন্দী, অন্য শয়তান মুক্ত’—এটি হাদিসের প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত নয়। [11]
فهذه العبارة لا يتعيَّن أن يكون مرادا منها التقييد، لأن كل شيطان هو مريد، لتعرِّيه عن كل خير، وجريانه في معصية الله تعالى.
বাংলা অনুবাদ: এই বাক্য দিয়ে বন্দিত্বকে সীমিত করাই উদ্দেশ্য, এমন সিদ্ধান্ত বাধ্যতামূলক নয়; কারণ প্রত্যেক শয়তানই বিদ্রোহী, সব কল্যাণ থেকে বিচ্যুত এবং আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত।
ইসলামQA-এর আলোচনার শেষ সিদ্ধান্তও সাধারণভাবে শয়তানদের বন্দিত্বের পক্ষে, কেবল দুর্ধর্ষ শয়তানদের বন্দিত্বের পক্ষে নয়। বিদ্রোহের তীব্রতায় শয়তানদের পার্থক্য থাকতে পারে; কিন্তু সেই পার্থক্য দিয়ে অন্য শয়তানদের মুক্ত থাকার ঘোষণা তৈরি করা যায় না। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমের নির্বিশেষ বন্দিত্বের বক্তব্য এবং রমজানে শয়তানের সক্রিয়তার বর্ণনা একত্রে থাকায় মূল অসংগতি থেকেই যায়।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৩০/ সাওম/রোযা
পরিচ্ছেদঃ ৩০/৫. রমাযান বলা হবে, না রমাযান মাস বলা হবে? আর যাদের মতে উভয়টি বলা যাবে।
১৮৯৯. আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলতেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রমাযান আসলে আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয় আর শয়তানগুলোকে শিকলবন্দী করে দেয়া হয়। (১৮৯৮) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৭৬৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১৭৭৫ )
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১৪। সিয়াম (রোযা)
পরিচ্ছেদঃ ১. রমযান মাসের ফযীলত
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ২৩৮৫ , আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১০৭৯
২৩৮৫-(১/১০৭৯) ইয়াহইয়া ইবনু আইয়ুব, কুতায়বাহ ও ইবনু হুজুর (রহঃ) ….. আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রমযান মাস আসলে জান্নাতের দরজাসমূহ উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয় এবং শাইতানগুলোকে শিকলে বন্দী করা হয়। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ২৩৬২, ইসলামীক সেন্টার ২৩৬৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
এই হাদিসগুলোর আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, শয়তানদের বন্দী হওয়ার ঘটনাটি সাধারণ মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বা কোনো পর্যবেক্ষণযোগ্য অবস্থার বিবরণ হিসেবে উপস্থাপিত হয়নি। আবু হুরায়রা নিজে শয়তানদের শিকলবন্দী হতে দেখেছেন বলে দাবি করেননি। তিনি মুহাম্মদের বক্তব্য বর্ণনা করেছেন। ফলে হাদিসে সংরক্ষিত সাক্ষ্যের প্রত্যক্ষ বিষয় হলো মুহাম্মদের ঘোষণা; শয়তানদের বন্দিত্বের ঘটনা নয়। মুহাম্মদ কীভাবে এই সংবাদ পেয়েছিলেন, বন্দিত্বের ঘটনাটি তাঁর কাছে কীভাবে জানা সম্ভব হয়েছিল এবং সেই তথ্যের সত্যতা কীভাবে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়, তার কোনো পর্যবেক্ষণমূলক বিবরণ এসব হাদিসে নেই। শয়তানদের অস্তিত্ব সত্য ধরে না নিলে তাদের বন্দিত্বের ঘোষণাও সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। আবার বন্দিত্বের ঘোষণাকে শয়তানের অস্তিত্বের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করলে যুক্তিটি বৃত্তাকার হয়ে পড়ে। কারণ যে অতিপ্রাকৃত সত্তার অস্তিত্ব প্রমাণ করা প্রয়োজন, সেই সত্তা সম্পর্কে দেওয়া অপ্রমাণিত সংবাদকেই তার অস্তিত্বের পক্ষে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
হাদিসগুলোর ভাষায় তিনটি অতিপ্রাকৃত কার্যক্রম একসঙ্গে বর্ণিত হওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আসমান বা জান্নাতের দরজা খোলা, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করা এবং শয়তানদের শিকলবন্দী করা—এগুলো একটি ধর্মীয় ঘোষণার অংশ হলেও বাস্তব সত্যতার বিচারে পৃথক দাবি। আসমান কিংবা জান্নাতের দরজা খোলা হয়েছে বলে দাবি করা হলে সেই দরজার বাস্তব অস্তিত্ব ও খোলা হওয়ার ঘটনাটি প্রতিষ্ঠা করতে হয়। জাহান্নামের দরজা বন্ধ করার ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। শয়তানদের বন্দিত্বের দাবি আরও একটি পৃথক অতিপ্রাকৃত ঘটনার অস্তিত্ব দাবি করে। কিন্তু তিনটি ঘোষণা একই হাদিসে এসেছে বলে একটি অন্যটির স্বাধীন প্রমাণ হয়ে যায় না। একই সংবাদদাতার দেওয়া একাধিক অতিপ্রাকৃত বক্তব্য একত্রে গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে স্বাধীন সাক্ষ্য বা পর্যবেক্ষণের ঘাটতি পূরণ হয় না। ধর্মীয় কর্তৃত্ব তিনটি অতিপ্রাকৃত ঘটনার কোনো একটিরও স্বাধীন প্রমাণ নয়।
বিশেষভাবে শয়তানের বন্দিত্বের ক্ষেত্রে সিলসিলা ও তাসফিদ জাতীয় আরবি শব্দগুলো শিকল ও বন্ধনের ধারণা প্রকাশ করে। কিন্তু হাদিসে শিকলের উপাদান, অবস্থান, দৈর্ঘ্য, বন্দিত্বের স্থান কিংবা শয়তানদের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া বর্ণিত হয়নি। বাস্তব শিকলবন্দিত্বের ধারণা গ্রহণ করলে শয়তানের ওপর কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ কার্যকর হয়েছে, সেটি সম্পর্কে প্রশ্ন ওঠে। অন্যদিকে বন্দিত্বকে শুধু মানুষের ওপর শয়তানের প্রভাব কমে যাওয়ার অর্থে গ্রহণ করলে সেই প্রভাব কীভাবে পরিমাপ করা যায়, তার ব্যাখ্যা প্রয়োজন। কোনো ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে এমন একটি অর্থ গ্রহণ করা, যার বাস্তব ফলাফল শনাক্ত করা যায় না, দাবিটির স্বাধীন সত্যতা প্রতিষ্ঠা করে না। বন্দিত্বের ফলে শয়তান মানুষের কাছে আসতে পারে কি না, মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দিতে পারে কি না, কোনো ক্ষতি করতে পারে কি না অথবা তার পূর্ববর্তী কার্যক্ষমতা কতটুকু বহাল থাকে—এসব প্রশ্নের উত্তর না থাকলে বন্দিত্বের কার্যকর তাৎপর্যও অনির্দিষ্ট থেকে যায়।
সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম ও সুনান নাসাঈর বর্ণনাগুলো প্রতিষ্ঠা করে যে রমজানে শয়তানদের বন্দী হওয়ার বিশ্বাসটি ইসলামি হাদিসসাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু একই বর্ণনাগুলো শয়তানদের বাস্তব অস্তিত্ব, তাদের বন্দিত্বের ঘটনা কিংবা সেই বন্দিত্বের কার্যকারিতার স্বাধীন প্রমাণ প্রদান করে না। এগুলো মুহাম্মদের সংবাদ হিসেবে সংরক্ষিত ধর্মীয় দাবি। বর্ণনাগুলোর ভাষায় পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও মূল বক্তব্য একটি অতিপ্রাকৃত কার্যক্রমের ঘোষণা। সেই কার্যক্রম বাস্তবেই ঘটে কি না, ঘটলে কীভাবে ঘটে এবং মানুষের আচরণের ওপর তার নির্দিষ্ট প্রভাব কী—এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। বিশেষত একই ইসলামি উৎসে রমজানসংক্রান্ত শয়তানের অন্যান্য কার্যকলাপের বিবরণ উপস্থিত থাকায় বন্দিত্বের দাবিটির অর্থ ও পরিসর নির্ধারণ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
রমজানের জাকাত পাহারার সময় আবু হুরায়রার কাছে শয়তানের আগমন
সহিহ বুখারির ২৩১১ নম্বর হাদিসে আবু হুরায়রা বলেছেন, মুহাম্মদ তাঁকে রমজানের জাকাতের খাদ্যসামগ্রী পাহারার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এক ব্যক্তি এসে খাদ্য নিতে শুরু করলে আবু হুরায়রা তাকে ধরে ফেলেন। লোকটি নিজের দারিদ্র্য ও পরিবারের অভাবের কথা বলে মুক্তি পায়। পরদিন মুহাম্মদ জানান, লোকটি মিথ্যা বলেছে এবং আবার আসবে। দ্বিতীয় রাতেও একই ঘটনা ঘটে; মুহাম্মদ আবার তার ফিরে আসার কথা বলেন। তৃতীয় রাতে লোকটি আবার খাদ্য নিতে এসে ধরা পড়ে। এবার সে আবু হুরায়রাকে আয়াতুল কুরসি পাঠের পরামর্শ দেয় এবং বলে, এটি পাঠ করলে সকাল পর্যন্ত কোনো শয়তান তাঁর কাছে আসতে পারবে না। পরদিন মুহাম্মদ জানান, ওই লোকটি মিথ্যাবাদী হলেও এ কথাটি সত্য বলেছে এবং তিন রাত ধরে আবু হুরায়রার সঙ্গে কথা বলা ব্যক্তিটি ছিল শয়তান। সহিহ বুখারির ৩২৭৫ নম্বর হাদিসেও একই ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ রয়েছে। দুটি হাদিস নম্বর একই ঘটনার বর্ণনা; এগুলো দুটি পৃথক ঘটনার সাক্ষ্য নয়। [12] [13]
وَكَّلَنِي رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بِحِفْظِ زَكَاةِ رَمَضَانَ
বাংলা অনুবাদ (ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ): আবু হুরায়রা বলেন, মুহাম্মদ আমাকে রমজানের জাকাতের খাদ্যসামগ্রী পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এক ব্যক্তি এসে সেখান থেকে খাদ্যসামগ্রী নিতে শুরু করল। আমি তাকে ধরে বললাম, আল্লাহর শপথ, তোমাকে মুহাম্মদের কাছে নিয়ে যাব। লোকটি বলল, আমি অভাবগ্রস্ত, আমার ওপর পরিবারের দায়িত্ব রয়েছে এবং আমার খুব প্রয়োজন। তার কথা শুনে আমার দয়া হলো এবং তাকে ছেড়ে দিলাম। পরদিন সকালে মুহাম্মদ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, গত রাতে তোমার বন্দী কী করেছে? আমি ঘটনাটি জানালে তিনি বললেন, সে তোমাকে মিথ্যা বলেছে এবং আবার ফিরে আসবে।আবু হুরায়রা বলেন, এরপর আমি তার অপেক্ষায় রইলাম। সে আবার এসে খাদ্যসামগ্রী নিতে শুরু করল। আমি তাকে ধরে মুহাম্মদের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বললাম। লোকটি আবার নিজের অভাব ও পরিবারের কথা বলে প্রতিশ্রুতি দিল, সে আর ফিরে আসবে না। আমি তাকে ছেড়ে দিলাম। পরদিন মুহাম্মদ আবার জানতে চাইলেন, আমার বন্দী কী করেছে। ঘটনাটি শুনে তিনি বললেন, সে মিথ্যা বলেছে এবং আবার ফিরে আসবে। তৃতীয় রাতেও লোকটি এসে খাদ্যসামগ্রী নিতে শুরু করল। এবার আমি তাকে ধরে বললাম, তুমি বারবার ফিরে না আসার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছ, অথচ আবার ফিরে আসছ। এবার অবশ্যই তোমাকে মুহাম্মদের কাছে নিয়ে যাব।
লোকটি তখন বলল, আমাকে ছেড়ে দাও, আমি তোমাকে এমন কিছু কথা শেখাব, যার মাধ্যমে আল্লাহ তোমার উপকার করবেন। আবু হুরায়রা জানতে চাইলেন, কী সেই কথা? লোকটি বলল, ঘুমাতে যাওয়ার সময় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আয়াতুল কুরসি পাঠ করবে। তাহলে আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রক্ষক তোমাকে পাহারা দেবে এবং সকাল পর্যন্ত কোনো শয়তান তোমার কাছে আসতে পারবে না। আবু হুরায়রা তাকে ছেড়ে দিলেন। পরদিন মুহাম্মদ জানতে চাইলে তিনি লোকটির শেখানো কথাগুলো জানালেন। মুহাম্মদ বললেন, সে অত্যন্ত মিথ্যাবাদী হলেও এবার সত্য বলেছে। এরপর তিনি জানতে চাইলেন, আবু হুরায়রা কি জানেন গত তিন রাত ধরে কার সঙ্গে কথা বলছিলেন? আবু হুরায়রা না বললে মুহাম্মদ জানান, «ذَاكَ شَيْطَانٌ» — সে ছিল শয়তান।
এখানে শয়তানকে মানুষের কাছে উপস্থিত হতে, খাদ্যসামগ্রী নিতে, ধরা পড়তে, কথা বলতে এবং বারবার ফিরে আসতে দেখা যাচ্ছে—এমনই হাদিসটির বিবরণ। আবু হুরায়রা প্রথমে লোকটিকে সাধারণ মানুষ হিসেবে ধরেছিলেন; মুহাম্মদের ঘোষণার মাধ্যমেই তার পরিচয় শয়তান হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে। হাদিসে ঘটনাটিকে রমজানের জাকাত পাহারার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে; তিন রাতের নির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ করা হয়নি। এই বর্ণনা শয়তানকে কার্যক্ষমতাসম্পন্ন ও মানুষের সঙ্গে যোগাযোগে সক্ষম সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করে। অন্যদিকে রমজানে শয়তানদের বন্দিত্বের ঘোষণায় সেই কার্যক্ষমতা কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়, তার কোনো বিবরণ নেই। শয়তানের পরিচয় এবং বন্দিত্ব—দুটিই এখানে মুহাম্মদের বক্তব্যের ওপর নির্ভরশীল; কোনোটি স্বাধীনভাবে প্রমাণিত নয়।
রমজানের শেষ দশকেও শয়তানের কুমন্ত্রণার আশঙ্কা করেছিলেন মুহাম্মদ
সহিহ বুখারির ২০৩৫ নম্বর হাদিসে ঘটনার সময় স্পষ্ট: রমজানের শেষ দশকে মুহাম্মদ মসজিদে ইতিকাফ করছিলেন। তাঁর স্ত্রী সফিয়া বিনতে হুয়াই দেখা করতে এসে কিছুক্ষণ কথা বলেন। সফিয়া ফিরে যাওয়ার সময় মুহাম্মদ তাঁকে মসজিদের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিচ্ছিলেন। তখন দুই আনসারি ব্যক্তি তাঁদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। মুহাম্মদ তাঁদের থামিয়ে জানান, তাঁর সঙ্গে থাকা নারী সফিয়া, তাঁর স্ত্রী। দুই ব্যক্তি বিস্মিত হলে মুহাম্মদ বলেন, শয়তান মানুষের মধ্যে রক্তের মতো প্রবাহিত হয় এবং তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, শয়তান তাঁদের মনে কোনো মন্দ ধারণা প্রবেশ করাতে পারে। সহিহ মুসলিমের ২১৭৫ নম্বর হাদিসেও এই ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। রমজানের শেষ দশকের এই নির্দিষ্ট ঘটনায় মুহাম্মদ নিজেই শয়তানের কুমন্ত্রণা দেওয়ার আশঙ্কাকে বাস্তব সম্ভাবনা হিসেবে প্রকাশ করেছেন। [14] [15]
إِنَّ الشَّيْطَانَ يَبْلُغُ مِنَ الإِنْسَانِ مَبْلَغَ الدَّمِ، وَإِنِّي خَشِيتُ أَنْ يَقْذِفَ فِي قُلُوبِكُمَا شَيْئًا
বাংলা অনুবাদ: শয়তান মানুষের মধ্যে রক্ত পৌঁছানোর মতো পৌঁছে যায়। আমি আশঙ্কা করেছি, সে তোমাদের দুজনের অন্তরে কোনো ধারণা প্রবেশ করাতে পারে।
এটি রমজানে শয়তানদের শিকলবন্দী করার বক্তব্যের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত তৈরি করে। বন্দিত্বের ঘোষণায় রমজান মাসের জন্য শয়তানদের ওপর বিশেষ নিয়ন্ত্রণ আরোপের কথা বলা হয়েছে। অথচ সেই মাসের শেষ দশকেই মুহাম্মদ শয়তানের মানুষের অন্তরে প্রবেশের ক্ষমতাকে সক্রিয় বিপদ হিসেবে দেখছেন। হাদিসে শয়তান সত্যিই ওই দুই ব্যক্তিকে কুমন্ত্রণা দিয়েছিল বলে বলা হয়নি; মুহাম্মদ আশঙ্কা করেছিলেন যে সে তা করতে পারে। কিন্তু এই আশঙ্কাই গুরুত্বপূর্ণ: বন্দিত্বের মধ্যেও শয়তানের কুমন্ত্রণা দেওয়ার ক্ষমতা কার্যকর থাকতে পারে বলে মুহাম্মদ মনে করেছেন। বন্দিত্বকে মানুষের ওপর শয়তানের প্রভাব বন্ধ হয়ে যাওয়া বলে ব্যাখ্যা করলে মুহাম্মদের নিজের এই বক্তব্য তার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। আর বন্দিত্বের পরেও কুমন্ত্রণার ক্ষমতা বহাল থাকলে ওই বন্দিত্বের বাস্তব কার্যকারিতা কী, তার কোনো প্রমাণ নেই। ‘কেবল বিদ্রোহী শয়তান বন্দী’ ব্যাখ্যাটিও এই ঘটনার সমাধান দেয় না; হাদিসে কুমন্ত্রণা দেওয়ার আশঙ্কা যার সম্পর্কে প্রকাশ করা হয়েছে, তাকে বন্দিত্বের বাইরে থাকা কোনো বিশেষ শ্রেণির শয়তান হিসেবে শনাক্ত করা হয়নি।
সময়ের আপেক্ষিকতা ও পৃথিবীর আবর্তন
রমজান মাসে শয়তানদের শিকলবন্দী করার দাবির একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো, এই বন্দিত্ব কখন শুরু হয় এবং পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে কীভাবে কার্যকর হয়। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় মুহাম্মদ বলেছেন, রমজান মাস শুরু হলে শয়তানদের শিকলবন্দী করা হয়। বক্তব্যটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের সঙ্গে একটি অতিপ্রাকৃত ঘটনাকে সরাসরি যুক্ত করেছে। কিন্তু পৃথিবীর সর্বত্র রমজান একই মুহূর্তে শুরু হয় না। এর কারণ শুধু পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের স্থানীয় সময়ের পার্থক্য নয়; ইসলামি চান্দ্র মাস নির্ধারণের পদ্ধতি, নতুন চাঁদের দৃশ্যমানতা এবং চাঁদ দেখার সাক্ষ্য গ্রহণের বিধানও এর সঙ্গে জড়িত। ফলে একই বাস্তব মুহূর্তে পৃথিবীর একটি অঞ্চলে রমজান মাস শুরু হয়ে যেতে পারে, অন্য অঞ্চলে তখনও শাবান মাস চলতে পারে। মানুষের রোজা ও অন্যান্য ধর্মীয় আচারের ক্ষেত্রে এই ভিন্নতা বাস্তব এবং ইসলামি ফিকহে স্বীকৃত। তাহলে শয়তানদের বন্দিত্ব কোন অঞ্চলের রমজান শুরুর সঙ্গে কার্যকর হয়? সৌদি আরবে রমজান শুরু হলেও অন্য অঞ্চলে শাবান চলতে পারে। একই মুহূর্তে শয়তানদের বন্দিত্ব ও মুক্ত অবস্থার সীমানা কোথায়? সমস্যাটি ধর্মীয় ক্যালেন্ডার দিয়ে সময় গণনার নয়; একটি সর্বজনীন অতিপ্রাকৃত ঘটনাকে ভৌগোলিকভাবে পৃথক সময়সূচির সঙ্গে যুক্ত করার দাবির কার্যকর অর্থ নির্ধারণের।
পৃথিবী নিজের অক্ষের চারদিকে প্রায় ২৩ ঘণ্টা ৫৬ মিনিটে দূরবর্তী নক্ষত্রের তুলনায় একটি পূর্ণ আবর্তন সম্পন্ন করে। অন্যদিকে সূর্যের অবস্থানের ভিত্তিতে গড় সৌরদিনের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪ ঘণ্টা। পৃথিবীর নিজ অক্ষে আবর্তন এবং সূর্যের চারদিকে প্রদক্ষিণের কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত, মধ্যাহ্ন ও রাতের সময় এক হয় না। পৃথিবীর সময় অঞ্চলগুলো এই ভিন্নতার সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও UTC থেকে নির্ধারিত সরকারি সময়ের ব্যবধান একটি মানবনির্মিত সময়ব্যবস্থা। সময় অঞ্চলের সীমানা অনেক ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে নির্ধারিত। ফলে কোনো দেশে ঘড়িতে রাত বারোটা বাজা কিংবা সরকারি তারিখ পরিবর্তিত হওয়া কোনো স্বতন্ত্র মহাজাগতিক ঘটনা নয়। একই বাস্তব মুহূর্তকে ভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন স্থানীয় সময় দিয়ে প্রকাশ করা যায়। কিন্তু রমজান শুরু হওয়ার পার্থক্যকে শুধু সময় অঞ্চলের পার্থক্য বলে ব্যাখ্যা করাও ভুল। কারণ ইসলামি চান্দ্র মাস নির্ধারণে চাঁদ দেখার সাক্ষ্য, তার গ্রহণযোগ্যতা এবং স্থানীয় কিংবা আন্তর্জাতিক চাঁদ দেখার সিদ্ধান্তের ওপরও নির্ভর করা হয়। পৃথিবীর আবর্তন ও চান্দ্র মাসের এই দুটি পৃথক বাস্তবতা একত্রে রমজান শুরুর সময়কে অঞ্চলভেদে ভিন্ন করে তুলতে পারে। [16]
ইসলামি বিধান অনুসারে রমজানের শুরু নির্ধারণে নতুন চাঁদ দেখার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সহিহ বুখারির ১৯০৯ নম্বর হাদিসে মুহাম্মদ নতুন চাঁদ দেখে রোজা শুরু করতে এবং পরবর্তী মাসের চাঁদ দেখে রোজা শেষ করতে বলেছেন। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকার কারণে চাঁদ দেখা না গেলে শাবান মাসের ত্রিশ দিন পূর্ণ করার নির্দেশও দিয়েছেন। ফলে রমজানের শুরু কেবল একটি পূর্বনির্ধারিত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক মুহূর্তের সঙ্গে যুক্ত নয়; চাঁদ দেখার বাস্তব ঘটনা এবং সেই ঘটনার ধর্মীয় স্বীকৃতির সঙ্গেও যুক্ত। চাঁদের একই পর্যায় পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে একই মুহূর্তে উপস্থিত থাকলেও নতুন চাঁদ দৃশ্যমান হওয়ার পরিস্থিতি সর্বত্র অভিন্ন নয়। দিগন্তের ওপর চাঁদের অবস্থান, সূর্যাস্তের সময়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক, আকাশের স্বচ্ছতা এবং পর্যবেক্ষণের অবস্থান চাঁদ দেখার সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করে। এর সঙ্গে ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ কোন অঞ্চলের চাঁদ দেখার সাক্ষ্য গ্রহণ করবেন, সেই সিদ্ধান্ত যুক্ত হলে রমজান শুরুর তারিখেও পার্থক্য তৈরি হয়। [17]
صُومُوا لِرُؤْيَتِهِ، وَأَفْطِرُوا لِرُؤْيَتِهِ، فَإِنْ غُبِّيَ عَلَيْكُمْ فَأَكْمِلُوا عِدَّةَ شَعْبَانَ ثَلاَثِينَ
বাংলা অনুবাদ: চাঁদ দেখে রোজা শুরু করো এবং চাঁদ দেখে রোজা শেষ করো। আর আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে শাবান মাসের ত্রিশ দিন পূর্ণ করো।
রমজান শুরুর আঞ্চলিক পার্থক্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি প্রমাণগুলোর একটি সহিহ মুসলিমের ১০৮৭ নম্বর হাদিস। সেখানে কুরাইবের একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। উম্মুল ফজল তাঁকে সিরিয়ায় মুয়াবিয়ার কাছে পাঠিয়েছিলেন। সিরিয়ায় অবস্থানকালে তিনি শুক্রবার রাতে রমজানের নতুন চাঁদ দেখতে পান। সিরিয়ার অন্যান্য মানুষও চাঁদ দেখেন এবং মুয়াবিয়াসহ সেখানে রোজা শুরু হয়। পরে কুরাইব মদিনায় ফিরে এলে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস তাঁর কাছে রমজানের চাঁদ দেখার সময় জানতে চান। কুরাইব জানান, সিরিয়ায় তাঁরা শুক্রবার রাতে চাঁদ দেখেছিলেন। ইবনে আব্বাস বলেন, মদিনায় তাঁরা চাঁদ দেখেছিলেন শনিবার রাতে। কুরাইব তখন জানতে চান, মুয়াবিয়ার চাঁদ দেখা এবং রোজা শুরু করা কি তাঁদের জন্য যথেষ্ট নয়? ইবনে আব্বাস সরাসরি না বলেন এবং জানান, মুহাম্মদ তাঁদের এভাবেই নির্দেশ দিয়েছেন। অর্থাৎ একই রমজান মাসের চাঁদ দেখা এবং রোজা শুরু করার বিষয়ে সিরিয়া ও মদিনার মধ্যে এক দিনের পার্থক্য ছিল। ঘটনাটি ইসলামি উৎসেই সংরক্ষিত এবং এর ভিত্তিতে পৃথক অঞ্চলের চাঁদ দেখার বিধান নিয়ে ফিকহি আলোচনা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। [18]
فَقَالَ لَكِنَّا رَأَيْنَاهُ لَيْلَةَ السَّبْتِ فَلاَ نَزَالُ نَصُومُ حَتَّى نُكْمِلَ ثَلاَثِينَ أَوْ نَرَاهُ
বাংলা অনুবাদ: তখন ইবনে আব্বাস বললেন, কিন্তু আমরা শনিবার রাতে চাঁদ দেখেছি। তাই আমরা ত্রিশ দিন পূর্ণ করা পর্যন্ত অথবা নতুন চাঁদ দেখা পর্যন্ত রোজা পালন করতে থাকব।
কুরাইবের এই ঘটনা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা প্রতিষ্ঠিত হয়: ইসলামি ধর্মীয় সময়ের গণনায় একই মুহূর্তে পৃথিবীর পৃথক অঞ্চলে ভিন্ন চান্দ্র তারিখ কার্যকর হতে পারে। সিরিয়ায় শুক্রবার রাতে রমজানের চাঁদ দেখা হয়েছে বলে মদিনায় সেই একই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়নি। এখানে পার্থক্যটি ঘড়ির কাঁটার সময় নিয়ে নয়; কোন পর্যবেক্ষণ ও কোন অঞ্চলের ধর্মীয় সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে একটি মাস শুরু হয়েছে বলে গণ্য করা হবে, তা নিয়ে। ফলে রমজানের সূচনা একটি সর্বজনীন মহাজাগতিক ঘটনার একক সময়ের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত নয়। একই পৃথিবীতে একটি সম্প্রদায়ের জন্য রমজান শুরু হয়ে যেতে পারে, অন্য সম্প্রদায় তখনও শাবান মাসের শেষ দিন পালন করতে পারে। শয়তানদের বন্দিত্বের ঘোষণাটি যদি রমজান শুরুর সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে এই ধর্মীয় সময়ের ভিন্নতা তার কার্যকারিতা নির্ধারণে কী ভূমিকা পালন করে, সেই প্রশ্ন অনিবার্য। কারণ রোজা পালনের সিদ্ধান্ত মানুষের ধর্মীয় আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে; কিন্তু শয়তানদের ওপর বাস্তব বন্দিত্ব আরোপিত হওয়ার দাবি একটি পৃথক অতিপ্রাকৃত কার্যক্রমের অস্তিত্ব ঘোষণা করে।
ইসলামি ফিকহেও চাঁদ দেখার আঞ্চলিক পার্থক্য নিয়ে একাধিক অবস্থান রয়েছে। কিছু আইনজ্ঞের মতে একটি অঞ্চলে চাঁদ দেখা প্রমাণিত হলে তা অন্য অঞ্চলের মুসলমানদের জন্যও কার্যকর হতে পারে। অন্য অবস্থানে পৃথক অঞ্চলের চাঁদ দেখার পার্থক্যকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ইসলামওয়েবের ৪০১৭৬ নম্বর ফতোয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, চাঁদ ওঠা ও দৃশ্যমান হওয়ার ক্ষেত্রে অঞ্চলভেদে পার্থক্য বাস্তব এবং স্বীকৃত; কিন্তু রমজানের শুরু ও শেষ নির্ধারণে এই পার্থক্য অনুসরণ করা হবে কি না, তা নিয়ে আইনজ্ঞদের মতভেদ রয়েছে। এই মতভেদের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, একই জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার ভিত্তিতে ভিন্ন ফিকহি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব। ফলে রমজানের শুরু নির্ধারণে কেবল প্রকৃতির নিয়ম নয়, মানুষের ব্যাখ্যা ও ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তও কার্যকর ভূমিকা পালন করে। কিন্তু শয়তানদের বন্দিত্বের সময় কোন অঞ্চলের চাঁদ দেখার সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে, তার কোনো বিধান নেই। [19]
فقد اتفق أهل العلم على أن مطالع الأهلة مختلفة، وأن ذلك مما علم بالضرورة حساً وعقلاً، إلا أنهم اختلفوا في اعتبار ذلك في بداية صوم رمضان ونهايته
বাংলা অনুবাদ: আলেমরা একমত হয়েছেন যে নতুন চাঁদের উদয়স্থলে পার্থক্য রয়েছে এবং এটি ইন্দ্রিয় ও যুক্তির মাধ্যমে জানা বিষয়। কিন্তু রমজানের রোজার শুরু ও শেষ নির্ধারণে এই পার্থক্য বিবেচনা করা হবে কি না, সে বিষয়ে তাঁদের মতভেদ রয়েছে।
এই সমস্যার একটি বাস্তব ও যাচাইকৃত উদাহরণ পাওয়া যায় ২০২৬ সালের রমজান শুরুর ঘটনায়। সৌদি আরবের সর্বোচ্চ আদালত ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন চাঁদ দেখার সাক্ষ্য গ্রহণ করে ১৮ ফেব্রুয়ারি বুধবারকে প্রথম রমজান ঘোষণা করে। বিপরীতে বাংলাদেশে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি ১৮ ফেব্রুয়ারি চাঁদ দেখার তথ্যের ভিত্তিতে ১৯ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার থেকে রমজান শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়। তুরস্কের ধর্মবিষয়ক কর্তৃপক্ষ দিয়ানেতও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাব ও নিজস্ব চাঁদ দেখার মানদণ্ড অনুসারে ১৯ ফেব্রুয়ারিকে প্রথম রমজান নির্ধারণ করে। ইন্দোনেশিয়ার সরকারও ১৯ ফেব্রুয়ারিকে রমজানের প্রথম দিন হিসেবে ঘোষণা করে। ফলে একই বছর একই চান্দ্র মাসের সূচনা সৌদি আরবে এক দিন আগে এবং অন্য কয়েকটি দেশে এক দিন পরে নির্ধারিত হয়েছিল। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, সৌদি আরব ও তুরস্ক উভয় দেশই UTC+3 সরকারি সময় ব্যবহার করলেও তাদের রমজান শুরুর তারিখ ভিন্ন ছিল। অর্থাৎ এই পার্থক্যকে শুধু সময় অঞ্চলের পার্থক্য বলে ব্যাখ্যা করা যায় না; চাঁদ দেখার সাক্ষ্য এবং মাস নির্ধারণের পৃথক নীতিও এর সঙ্গে যুক্ত ছিল। [20] [21] [22] [23]
فإن الدائرة تقرر، أن يوم غدٍ الأربعاء 1/ 9/ 1447هـ -حسب تقويم أم القرى– الموافق 18/ 2/ 2026م، هو غرة شهر رمضان المبارك لهذا العام 1447هـ.
বাংলা অনুবাদ: আদালতের সংশ্লিষ্ট বিভাগ সিদ্ধান্ত দিয়েছে, আগামীকাল বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪৪৭ হিজরি সালের রমজান মাসের প্রথম দিন হবে।
| দেশ | ২০২৬ সালে প্রথম রমজান | UTC সময় অঞ্চল | সরকারি সিদ্ধান্তের ভিত্তি |
|---|---|---|---|
| সৌদি আরব | ১৮ ফেব্রুয়ারি | UTC+3 | সর্বোচ্চ আদালতের গৃহীত চাঁদ দেখার সাক্ষ্য |
| বাংলাদেশ | ১৯ ফেব্রুয়ারি | UTC+6 | জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত |
| তুরস্ক | ১৯ ফেব্রুয়ারি | UTC+3 | দিয়ানেতের জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ও ধর্মীয় মানদণ্ড |
| ইন্দোনেশিয়া | ১৯ ফেব্রুয়ারি | UTC+7 থেকে UTC+9 | সরকারের চাঁদ দেখার ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন |
এই বাস্তব উদাহরণ থেকে শয়তান বন্দিত্বের দাবির একটি নির্দিষ্ট সমস্যা তৈরি হয়। ১৮ ফেব্রুয়ারি সৌদি আরবে রমজান শুরু হয়ে গেলেও বাংলাদেশ ও তুরস্কের ধর্মীয় ক্যালেন্ডার অনুসারে তখনও শাবান মাস চলছিল। এখন যদি রমজান শুরু হওয়ার মুহূর্ত থেকেই শয়তানদের শিকলবন্দী করা হয়, তাহলে কোন অঞ্চলের রমজান শুরুর সঙ্গে সেই বন্দিত্ব কার্যকর হয়েছিল? সৌদি আরবের সিদ্ধান্ত অনুসারে শয়তানদের বন্দিত্ব ১৭ ফেব্রুয়ারি সূর্যাস্তের পরবর্তী ধর্মীয় রাত থেকে কার্যকর হওয়ার কথা হলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তখনও শাবান মাস চলছিল। আবার বাংলাদেশের রমজান শুরু হওয়ার সিদ্ধান্তকে ভিত্তি ধরলে সৌদি আরবে ইতিমধ্যে শুরু হয়ে যাওয়া রমজানের প্রথম অংশে বন্দিত্বের অবস্থা কী ছিল, সেই প্রশ্ন থেকে যায়। হাদিসে সর্বজনীন বন্দিত্বের একক সময় কিংবা অঞ্চলভিত্তিক বন্দিত্বের কোনো পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়নি।
পৃথক অঞ্চলে বন্দিত্ব কার্যকর হওয়ার ধারণা গ্রহণ করলে সমস্যাটি আরও জটিল হয়। শয়তানকে যদি মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সত্তা হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তাহলে তার কার্যক্রম ভৌগোলিক সীমানার ভিত্তিতে নিয়ন্ত্রিত হয় কি না, তা নির্ধারণ করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, সৌদি আরবে রমজান শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশের কোনো ব্যক্তির মনে কুমন্ত্রণা দেওয়া শয়তানের অবস্থান কী হবে? সে কি তখনও মুক্ত, কারণ বাংলাদেশে রমজান শুরু হয়নি? নাকি সৌদি আরবে রমজান শুরু হওয়ার কারণেই সেই শয়তান বন্দী হয়ে গেছে? শয়তানদের ভৌগোলিক সীমানা, চলাচল ও বন্দিত্বের পরিসর সম্পর্কে কোনো প্রমাণ নেই। অথচ রমজান শুরুর আঞ্চলিক পার্থক্য একটি প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা।
সৌদি আরব ও তুরস্ক একই UTC+3 সময় ব্যবহার করলেও ২০২৬ সালে ভিন্ন দিনে রমজান শুরু করেছে। কারণ রমজানের সূচনা সময় অঞ্চলের পরিবর্তে চাঁদ দেখার সাক্ষ্য ও ধর্মীয় সিদ্ধান্তের ওপরও নির্ভর করে। শয়তানদের বন্দিত্ব কোন সিদ্ধান্ত অনুসারে কার্যকর হয়, তার কোনো নির্দিষ্ট ভিত্তি নেই।
আরও একটি মৌলিক পার্থক্য হলো, রমজান একটি চান্দ্র মাস হলেও তার প্রথম দিন নির্ধারণের সামাজিক ও ধর্মীয় সিদ্ধান্ত প্রকৃতির একটি নির্দিষ্ট ঘটনার সঙ্গে সম্পূর্ণ অভিন্ন নয়। নতুন চাঁদের জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক অবস্থান ও দৃশ্যমানতার সম্ভাবনা গণনা করা যায়। কিন্তু কোনো অঞ্চলে চাঁদ দেখা হয়েছে বলে যে সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়, তার সত্যতা এবং সেই সাক্ষ্যের ভিত্তিতে ধর্মীয় মাস শুরু করার সিদ্ধান্ত পৃথক বিষয়। এ কারণেই একই বছরের রমজানের প্রথম দিন নিয়ে রাষ্ট্র ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পার্থক্য হতে পারে। মানুষ রোজা শুরু করবে কোন দিন থেকে, সেটি ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করতে পারেন। মানুষের রোজা শুরুর সিদ্ধান্ত পর্যবেক্ষণযোগ্য; সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে শয়তানদের বন্দিত্বের কোনো পর্যবেক্ষণযোগ্য সম্পর্ক নেই।
একই মুহূর্তে পৃথিবীর এক অঞ্চলে রমজান এবং অন্য অঞ্চলে শাবান চলতে পারে—এটি ইসলামি উৎস ও বাস্তব ধর্মীয় অনুশীলন উভয় দিয়েই প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু শয়তানদের বন্দিত্ব এই ভিন্ন সময়সীমার সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত, তার কোনো স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য ব্যাখ্যা নেই। এমনকি বন্দিত্বের শুরু, শেষ ও ভৌগোলিক পরিসরও নির্ধারিত নয়। শয়তান সত্যিই বন্দী হলে সেই বন্দিত্বের শুরু, শেষ, ভৌগোলিক পরিসর এবং কার্যকারিতা সম্পর্কে নির্দিষ্ট বাস্তব তথ্য থাকার কথা। অথচ এসবের বদলে পাওয়া যায় বিভিন্ন অঞ্চলের রমজান শুরুর পৃথক সিদ্ধান্ত এবং একটি অতিপ্রাকৃত ঘোষণা, যার সত্যতা ও কার্যপদ্ধতি স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
শয়তানের অস্তিত্ব ও ভৌত উপস্থিতি অপ্রমাণিত
রমজান মাসে শয়তানদের শিকলবন্দী করার দাবির সবচেয়ে মৌলিক সমস্যা হলো, যে সত্তাদের বন্দী করার কথা বলা হচ্ছে, তাদের বাস্তব অস্তিত্বই প্রমাণিত নয়। ইসলামি ধর্মতত্ত্বে শয়তানকে মানুষের কল্পনা, আবেগ কিংবা মন্দ প্রবৃত্তির প্রতীক হিসেবে নয়, বরং নিজস্ব অস্তিত্ব, ইচ্ছা, উদ্দেশ্য ও কার্যক্ষমতাসম্পন্ন একটি অতিপ্রাকৃত সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কোরআনে শয়তান মানুষের সঙ্গে কথা বলে, মানুষকে প্ররোচিত করে, তাদের মনে কুমন্ত্রণা দেয়, প্রতারণা করে এবং মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার পরিকল্পনা করে। সে একা নয়; তার অনুসারী ও সহযোগী শয়তানদের কথাও কোরআনে রয়েছে। অর্থাৎ ইসলামি বিশ্বাসে মানুষের আচরণের পেছনে এমন কিছু অদৃশ্য সত্তার কার্যক্রম রয়েছে, যাদের অস্তিত্ব মানুষ সাধারণভাবে প্রত্যক্ষ করতে পারে না। এই ধারণার ওপর আরও একটি দাবি যুক্ত হয়েছে: বছরের একটি নির্দিষ্ট চান্দ্র মাসে ওই সত্তাদের ওপর শিকল আরোপ করা হয়। ফলে রমজানে শয়তান বন্দী হওয়ার দাবি গ্রহণ করার আগে শয়তানের অস্তিত্ব, মানুষের ওপর তার কার্যক্ষমতা এবং সেই কার্যক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের অতিপ্রাকৃত ব্যবস্থার সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হতে হয়। অথচ এই তিনটি ক্ষেত্রেই স্বাধীন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ অনুপস্থিত।
কোরআনের সূরা আল-আরাফের ২৭ নম্বর আয়াতে শয়তানের অদৃশ্য উপস্থিতি সম্পর্কে সরাসরি বলা হয়েছে যে, শয়তান ও তার দলবল মানুষকে এমন স্থান থেকে দেখতে পায়, যেখান থেকে মানুষ তাদের দেখতে পায় না। আয়াতটির বক্তব্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে শয়তানকে কেবল মন্দের একটি বিমূর্ত ধারণা হিসেবে বর্ণনা করা হয়নি। তাকে এমন একটি সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যে মানুষের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করতে পারে এবং মানুষের অজ্ঞাতেই তার ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালায়। একজন মানুষ কোনো বিপদের উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে সাধারণত পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে সেই উৎসকে শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু কোরআনের এই বর্ণনায় শয়তানকে এমন একটি বিশেষ অবস্থান দেওয়া হয়েছে, যেখানে সে মানুষকে দেখতে পারে অথচ মানুষ তাকে দেখতে পারে না। এভাবে শয়তানের অদৃশ্যতাকে ধর্মীয় দাবির মধ্যেই তার বৈশিষ্ট্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কিন্তু কোনো সত্তাকে অদৃশ্য বলে ঘোষণা করা তার অস্তিত্বের প্রমাণ নয়। অদৃশ্য সত্তার ধারণা তৈরি করা এবং সেই সত্তা বাস্তবে রয়েছে বলে প্রমাণ করা দুটি সম্পূর্ণ পৃথক বিষয়। [24]
يَٰبَنِيٓ ءَادَمَ لَا يَفْتِنَنَّكُمُ ٱلشَّيْطَٰنُ كَمَآ أَخْرَجَ أَبَوَيْكُم مِّنَ ٱلْجَنَّةِ يَنزِعُ عَنْهُمَا لِبَاسَهُمَا لِيُرِيَهُمَا سَوْءَٰتِهِمَآ ۗ إِنَّهُۥ يَرَىٰكُمْ هُوَ وَقَبِيلُهُۥ مِنْ حَيْثُ لَا تَرَوْنَهُمْ ۗ إِنَّا جَعَلْنَا ٱلشَّيَٰطِينَ أَوْلِيَآءَ لِلَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ
বাংলা অনুবাদ: হে আদমসন্তান! শয়তান যেন তোমাদের বিভ্রান্ত না করে, যেভাবে সে তোমাদের পিতা-মাতাকে জান্নাত থেকে বের করেছিল, তাদের লজ্জাস্থান প্রকাশ করার জন্য তাদের পোশাক খুলে দিয়েছিল। নিশ্চয়ই সে এবং তার দলবল তোমাদের এমন স্থান থেকে দেখতে পায়, যেখান থেকে তোমরা তাদের দেখতে পাও না। নিশ্চয়ই আমি শয়তানদের অবিশ্বাসীদের সহযোগী করেছি।
শয়তানের কার্যক্ষমতা সম্পর্কে কোরআনের সূরা আন-নাস আরও নির্দিষ্ট একটি দাবি করেছে। সেখানে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেওয়া এমন এক প্ররোচনাকারীর কথা বলা হয়েছে, যে জিন ও মানুষের মধ্য থেকে হতে পারে। এখানে মানুষের চিন্তা ও মানসিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে অদৃশ্য অতিপ্রাকৃত সত্তার কার্যক্রম সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে। মানুষের মনে কোনো চিন্তা উদয় হওয়া একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা। মানুষ ভয় পায়, রাগ করে, অন্যকে ঈর্ষা করে, লোভ অনুভব করে, অপরাধের পরিকল্পনা করে কিংবা এমন কোনো কাজ করার আকাঙ্ক্ষা অনুভব করে, যা তার নিজের নৈতিক আদর্শের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। কিন্তু কোনো মানসিক অভিজ্ঞতা বাস্তব হলেই সেই অভিজ্ঞতার পেছনে অদৃশ্য কোনো সত্তার উপস্থিতি প্রতিষ্ঠিত হয় না। কোরআন মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেওয়ার জন্য শয়তানকে দায়ী করেছে; অথচ কোন চিন্তাটি মানুষের নিজস্ব মানসিক প্রক্রিয়ার ফল এবং কোনটি শয়তানের প্ররোচনা, তা নির্ধারণের কোনো পরীক্ষাযোগ্য পদ্ধতি প্রদান করেনি। এই পার্থক্য নির্ধারণ করতে না পারলে শয়তানের কথিত প্রভাব শনাক্ত করাও সম্ভব হয় না। [25]
قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ مَلِكِ النَّاسِ إِلَٰهِ النَّاسِ مِن شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ
বাংলা অনুবাদ: বলো, আমি আশ্রয় চাই মানুষের প্রতিপালকের কাছে, মানুষের অধিপতির কাছে, মানুষের উপাস্যের কাছে, আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট থেকে, যে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়, জিন ও মানুষের মধ্য থেকে।
মানুষের মানসিক জীবনের সঙ্গে শয়তানের সম্পর্ক সম্পর্কে সহিহ মুসলিমের ২৮১৪ নম্বর হাদিসে আরও বিস্তৃত একটি বক্তব্য রয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত এই হাদিসে মুহাম্মদ বলেছেন, প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে জিনদের মধ্য থেকে একজন সঙ্গী নিযুক্ত থাকে। সাহাবিরা জানতে চান, মুহাম্মদের সঙ্গেও কি এমন সঙ্গী রয়েছে? মুহাম্মদ জানান, তাঁর সঙ্গেও রয়েছে, কিন্তু আল্লাহ তাঁকে সেই সঙ্গীর ওপর সাহায্য করেছেন এবং সে তাঁকে ভালো ছাড়া অন্য কোনো কাজের নির্দেশ দেয় না। এই বর্ণনা অনুসারে শয়তানি প্রভাব কেবল কোনো বিশেষ ব্যক্তি, স্থান বা পরিস্থিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের প্রত্যেকের সঙ্গে একটি অদৃশ্য সঙ্গী থাকার ধারণা ইসলামি বিশ্বাসের অংশ। এ ধরনের সত্তা মানুষের সঙ্গে সর্বদা যুক্ত থাকলেও তার উপস্থিতি কীভাবে শনাক্ত করা যাবে, তা হাদিসে ব্যাখ্যা করা হয়নি। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, মানুষের সঙ্গে এই অদৃশ্য সঙ্গী থাকার দাবি সত্য হলে তার অস্তিত্ব ও কার্যক্ষমতা সম্পর্কে স্বতন্ত্র অনুসন্ধানের প্রয়োজন হয়। কিন্তু এখানে সঙ্গীর উপস্থিতির একমাত্র ভিত্তি মুহাম্মদের ঘোষণা। [26]
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم «مَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا وَقَدْ وُكِّلَ بِهِ قَرِينُهُ مِنَ الْجِنِّ» قَالُوا وَإِيَّاكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ «وَإِيَّايَ إِلَّا أَنَّ اللَّهَ أَعَانَنِي عَلَيْهِ فَأَسْلَمَ فَلَا يَأْمُرُنِي إِلَّا بِخَيْرٍ»
বাংলা অনুবাদ: আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত, মুহাম্মদ বলেছেন, তোমাদের প্রত্যেকের সঙ্গে জিনদের মধ্য থেকে একজন সঙ্গী নিযুক্ত রয়েছে। সাহাবিরা বললেন, আপনার সঙ্গেও, হে আল্লাহর রাসুল? তিনি বললেন, আমার সঙ্গেও। কিন্তু আল্লাহ আমাকে তার ওপর সাহায্য করেছেন, ফলে সে আমার অনুগত হয়েছে এবং আমাকে ভালো ছাড়া অন্য কিছুর নির্দেশ দেয় না।
এই হাদিসের সঙ্গে রমজানে শয়তানদের শিকলবন্দী করার বক্তব্য একত্রে বিবেচনা করলে বন্দিত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা দেখা যায়। প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে একটি জিন সঙ্গী নিযুক্ত থাকলে রমজান মাসে তার অবস্থান কী হয়? রমজান শুরু হওয়ার পর সে কি মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, নাকি মানুষের সঙ্গে থেকেই শিকলবন্দী অবস্থায় থাকে? বন্দিত্বের কারণে তার কুমন্ত্রণা দেওয়ার ক্ষমতা বন্ধ হয়, নাকি কেবল সীমিত হয়? মানুষের সঙ্গে সর্বদা যুক্ত একটি অদৃশ্য সত্তার ওপর বিশেষ বন্দিত্ব কার্যকর হলে সেই পরিবর্তন মানুষের চিন্তা ও আচরণে কীভাবে প্রকাশ পায়? রমজানে শয়তান বন্দী হওয়ার দাবি এবং প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে জিন সঙ্গীর উপস্থিতির দাবি একই ইসলামি ধর্মতত্ত্বের অংশ। ফলে এদের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণের জন্য শয়তানের অবস্থান, বন্দিত্ব ও কার্যক্ষমতা সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য প্রয়োজন। অথচ এই বিষয়গুলোতে ধর্মীয় ঘোষণা ছাড়া স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো প্রমাণ নেই।
শয়তানকে শিকলবন্দী করার ধারণাটি ভৌত জগতের ভাষা ব্যবহার করে একটি অতিপ্রাকৃত ঘটনাকে বর্ণনা করে। মানুষের পরিচিত অভিজ্ঞতায় শিকলবন্দিত্ব বলতে কোনো সত্তা বা বস্তুর চলাচল ও কার্যক্ষমতাকে বন্ধন বা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ করা বোঝায়। কিন্তু ইসলামি বিবরণে শয়তানের দৈহিক গঠন, অবস্থান এবং তার ওপর শিকলের কার্যপদ্ধতি নির্ধারিত হয়নি। শিকলটি কী দিয়ে তৈরি, কীভাবে শয়তানের ওপর কার্যকর হয়, বন্দিত্বের স্থান কোথায় এবং শিকলবন্দিত্বের ফলে কোন ক্ষমতাগুলো বন্ধ হয়—এসব বিষয়ে কোনো পরীক্ষাযোগ্য তথ্য নেই। যে সত্তার অস্তিত্বই শনাক্ত করা যায়নি, তার ওপর একটি বিশেষ বন্দিত্ব কার্যকর হয়েছে বলে ঘোষণা করা সেই বন্দিত্বের প্রমাণ হতে পারে না। ধর্মীয় বর্ণনায় শিকলের উপস্থিতি বাস্তব জগতে শিকলের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করে না, যেমন কোনো প্রাচীন কাহিনিতে অদৃশ্য প্রাণীর ডানা, অস্ত্র কিংবা চলাচলের বিবরণ থাকলেই সংশ্লিষ্ট সত্তাগুলোর বাস্তব অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না।
আধুনিক বিজ্ঞানে মানুষের চোখে অদৃশ্য বহু সত্তা ও প্রক্রিয়ার অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, পরমাণু, তড়িৎচৌম্বকীয় বিকিরণ এবং অসংখ্য অণুবীক্ষণিক ঘটনা সাধারণ মানুষের খালি চোখে দেখা যায় না। কিন্তু এগুলোর অস্তিত্ব শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণ, পরিমাপ এবং তাদের কার্যকারণের নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্যের মাধ্যমে। কোনো বস্তুকে খালি চোখে দেখা না যাওয়ার অর্থ সেটি চিরকাল পরীক্ষার বাইরে থাকবে, এমন নয়। বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে অদৃশ্য কোনো সত্তার অস্তিত্ব গ্রহণের ভিত্তি হলো তার শনাক্তযোগ্য বৈশিষ্ট্য ও প্রমাণ। শয়তানের ক্ষেত্রে এমন কোনো প্রতিষ্ঠিত শনাক্তকরণপদ্ধতি নেই। মানুষের আচরণে পরিবর্তন, অপরাধ সংঘটন, ভয়, মানসিক অস্থিরতা কিংবা অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতাকে শয়তানের উপস্থিতির প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও সেগুলোর সঙ্গে শয়তান নামের কোনো স্বতন্ত্র সত্তার কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এ কারণে শয়তানের অস্তিত্বকে জীবাণু, পরমাণু কিংবা অন্য কোনো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত অদৃশ্য সত্তার অস্তিত্বের সমতুল্য গণ্য করা ভুল।
শয়তান মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দেয় এবং তার আচরণকে প্রভাবিত করে—এটি একটি কার্যকারণ সম্পর্কের দাবি। অথচ মানুষের চিন্তা বা আচরণের কোনো নির্দিষ্ট পরিবর্তনের পেছনে শয়তানের উপস্থিতি শনাক্ত করার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নেই। শয়তানের কার্যক্ষমতা, মানুষের ওপর তার প্রভাব এবং রমজানে সেই কার্যক্ষমতা বন্ধ হওয়ার ঘটনা—কোনোটিরই স্বাধীন প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে মানুষের আচরণের ব্যাখ্যায় শয়তানকে একটি বাস্তব কারণ হিসেবে উপস্থাপন করা প্রমাণহীন।
মানুষের মস্তিষ্ক ও আচরণ সম্পর্কে স্নায়ুবিজ্ঞান ইতিমধ্যে বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রতিষ্ঠা করেছে। ভয়, আবেগ, স্মৃতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আত্মসংযম এবং আচরণের সঙ্গে মস্তিষ্কের বিভিন্ন স্নায়বিক ব্যবস্থার সম্পর্ক রয়েছে। অ্যামিগডালা আবেগগত গুরুত্ব ও বিপদের সংকেত প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে সম্পর্কিত; প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স পরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আচরণ নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ কাজে যুক্ত। এই কার্যক্রম কোনো একটি মস্তিষ্ক অঞ্চলের একক কাজ নয়; বিভিন্ন স্নায়বিক নেটওয়ার্কের পারস্পরিক কার্যকলাপের ফল। একজন মানুষের চিন্তা ও আচরণের পরিবর্তন তার মস্তিষ্কের অবস্থা, শারীরিক স্বাস্থ্য, ঘুম, মানসিক চাপ, অভিজ্ঞতা, সামাজিক পরিবেশ এবং শেখার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই জটিল কার্যকারণ ব্যবস্থায় শয়তানের মতো কোনো অদৃশ্য সত্তার হস্তক্ষেপ বৈজ্ঞানিকভাবে শনাক্ত হয়নি। মানুষের নিজের মানসিক প্রক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করতে একটি অপ্রমাণিত অতিপ্রাকৃত কারণ সংযোজন জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি করে না; বরং ব্যাখ্যার মধ্যে এমন একটি সত্তাকে যুক্ত করে, যার অস্তিত্ব ও কার্যপ্রণালি সম্পর্কে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই।
রমজানে শয়তানদের বন্দিত্বের দাবিটি যাচাই করার জন্য শয়তানের কথিত কার্যক্ষমতাকে নির্দিষ্ট করতে হয়। কোরআনে শয়তান মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়, মানুষকে প্রতারণা করে এবং অন্যায়ের দিকে প্ররোচিত করে। ফলে বন্দিত্বের বাস্তব প্রভাব থাকলে সেই প্রভাব শয়তানের কথিত কার্যকলাপের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ার কথা। কিন্তু কোনো মানুষের মনে একটি চিন্তা উদয় হলে সেটি শয়তান সৃষ্টি করেছে কি না, তা নির্ধারণের পদ্ধতি নেই। একইভাবে রমজানে কারও মন্দ চিন্তা কমে গেলে সেটি শয়তানের বন্দিত্বের ফল, নাকি রোজা, ধর্মীয় অনুশীলন, সামাজিক পরিবেশ কিংবা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ফল—তা আলাদা করার কোনো প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা নেই। শয়তানের অস্তিত্ব যেমন অপ্রমাণিত, তেমনি রমজানে তার বন্দিত্ব এবং সেই বন্দিত্বের ফলে মানুষের আচরণে অতিপ্রাকৃত পরিবর্তন ঘটার দাবিও প্রমাণহীন। এই বিশ্বাসের একমাত্র ভিত্তি ধর্মীয় কর্তৃত্ব। অথচ বাস্তব জগতের কোনো ঘটনার সত্যতা নির্ধারণে কর্তৃত্বের ঘোষণা স্বাধীন প্রমাণের বিকল্প নয়।
মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক উপাত্ত
রমজান মাসে শয়তানদের শিকলবন্দী করার দাবির বাস্তব কার্যকারিতা বিচার করতে হলে মানুষের চিন্তা, আচরণ ও অপরাধপ্রবণতার সঙ্গে শয়তানের কথিত সম্পর্ক পরীক্ষা করতে হয়। ইসলামি ধর্মতত্ত্বে শয়তান মানুষের মন্দ চিন্তা ও আচরণের অন্যতম প্ররোচক। কোরআনে তাকে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণাদানকারী, প্রতারণাকারী এবং অন্যায়ের দিকে আহ্বানকারী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আবার সহিহ হাদিসে বলা হয়েছে, রমজান মাস শুরু হলে শয়তানদের বন্দী করা হয়। এই দুটি বক্তব্যের মধ্যে একটি কার্যকারণ সম্পর্কের দাবি রয়েছে: সাধারণ সময়ে মানুষের ওপর যে অতিপ্রাকৃত প্ররোচনা কার্যকর থাকে, রমজানে সেই প্ররোচনাকারী সত্তাদের ওপর বিশেষ নিয়ন্ত্রণ আরোপিত হয়। এই নিয়ন্ত্রণ মানুষের আচরণে কী পরিবর্তন ঘটায়, সেটিই মূল প্রশ্ন। শয়তান মানুষের মন্দ আচরণের একটি বাস্তব কারণ হলে তার কার্যক্ষমতায় পরিবর্তনেরও বাস্তব ফল থাকার কথা। অথচ অপরাধ, সহিংসতা, প্রতারণা কিংবা মানুষের মানসিক অভিজ্ঞতার কোন অংশটি শয়তানের প্রভাবে সৃষ্টি হচ্ছে, সেই অংশটি শনাক্ত করার কোনো নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মানুষের আচরণে পরিবর্তনের ব্যাখ্যা হিসেবে ধর্মীয় অনুশাসন, সামাজিক চাপ, আত্মসংযম কিংবা অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব পরীক্ষা করা যায়; শয়তানের বন্দিত্বের কথিত প্রভাবকে একইভাবে শনাক্ত করা যায় না।
ইসলামি উৎসেই মানুষের মন্দ প্রবণতার জন্য কেবল শয়তানকে দায়ী করা হয়নি। সূরা ইউসুফের ৫৩ নম্বর আয়াতে মানুষের নিজের প্রবৃত্তিকে মন্দ কাজের নির্দেশদাতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ ইসলামি ধর্মতত্ত্বের মধ্যেই মানুষের নিজের আকাঙ্ক্ষা ও প্রবৃত্তিকে অন্যায়ের একটি কারণ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। মানুষের নিজের প্রবৃত্তিকে মন্দ কাজের উৎস হিসেবে স্বীকার করা হলেও রমজানে শয়তানদের বন্দিত্বের ঘটনা কিংবা মানুষের আচরণের ওপর সেই বন্দিত্বের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয় না। বরং মানুষের মন্দ আচরণের জন্য নিজের প্রবৃত্তি এবং শয়তান—দুটি পৃথক কারণ স্বীকার করা হলে তাদের প্রত্যেকটির প্রভাব কীভাবে শনাক্ত করা যায়, সেই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নিজের প্রবৃত্তির প্রভাব মানুষের আচরণ, মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা ও স্নায়ুবিক কার্যকলাপের মাধ্যমে অনুসন্ধান করা সম্ভব। শয়তানের কথিত প্রভাবের ক্ষেত্রে সেই সমতুল্য প্রমাণ অনুপস্থিত। [27]
وَمَا أُبَرِّئُ نَفْسِي ۚ إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ إِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّي ۚ إِنَّ رَبِّي غَفُورٌ رَحِيمٌ
বাংলা অনুবাদ: আমি নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করি না। নিশ্চয়ই মানুষের প্রবৃত্তি মন্দ কাজের নির্দেশ দিয়ে থাকে, আমার প্রতিপালক যার প্রতি দয়া করেন সে ছাড়া। নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
রমজানে রোজা রেখেও মানুষের মিথ্যাচার ও অন্যায় আচরণের বিষয়ে মুহাম্মদের নিজের বক্তব্য সহিহ বুখারিতে সংরক্ষিত আছে। বুখারির ১৯০৩ নম্বর হাদিসে তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মন্দ কাজ পরিত্যাগ করে না, তার খাদ্য ও পানীয় পরিত্যাগ করার কোনো প্রয়োজন আল্লাহর নেই। এই বক্তব্যে রোজা পালনের সঙ্গে নৈতিক আচরণের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং রোজাদারের পক্ষেও মিথ্যাচার ও অন্যায় কাজ চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা স্বীকার করা হয়েছে। ফলে রমজানের ধর্মীয় পরিবেশ এবং রোজা পালন নিজে মানুষের নৈতিক আচরণ নিশ্চিত করে না। এই হাদিসের তাৎপর্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয় যখন এর সঙ্গে রমজানে শয়তানদের বন্দিত্বের ঘোষণা যুক্ত করা হয়। একই ধর্মীয় ব্যবস্থায় রমজানে শয়তানদের বন্দী করার কথা বলা হচ্ছে, আবার রোজাদারের মিথ্যাচার ও মন্দ কাজ থেকে বিরত না থাকার বিষয়েও কঠোর সতর্কবাণী রয়েছে। এতে মানুষের নিজস্ব সিদ্ধান্ত ও আচরণের গুরুত্ব স্পষ্ট হলেও শয়তান বন্দিত্বের কার্যকর প্রভাব সম্পর্কে কোনো পরিমাপযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না। [28]
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم «مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّورِ وَالْعَمَلَ بِهِ فَلَيْسَ لِلَّهِ حَاجَةٌ فِي أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ»
বাংলা অনুবাদ: আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, মুহাম্মদ বলেছেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা এবং সেই অনুযায়ী মন্দ কাজ পরিত্যাগ করে না, তার খাদ্য ও পানীয় পরিত্যাগ করার কোনো প্রয়োজন আল্লাহর নেই।
আধুনিক মনোবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞান মানুষের আচরণকে বহু পরস্পরসম্পর্কিত কারণের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করে। মানুষের মধ্যে ভয়, ক্রোধ, লোভ, যৌন আকাঙ্ক্ষা, প্রতিযোগিতা, সহানুভূতি, আত্মসংযম এবং সামাজিক সহযোগিতার প্রবণতা রয়েছে। এই প্রবণতাগুলো মস্তিষ্কের বিভিন্ন স্নায়বিক প্রক্রিয়া, শারীরিক অবস্থা, পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা, শিক্ষা এবং সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত। মানুষের আচরণ কোনো একটি নির্দিষ্ট মস্তিষ্ক অঞ্চলের একক নির্দেশে পরিচালিত হয় না। যেমন, অ্যামিগডালা আবেগগত গুরুত্ব ও সম্ভাব্য বিপদের সংকেত প্রক্রিয়াকরণে ভূমিকা রাখে, প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স পরিকল্পনা ও আচরণ নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে যুক্ত, আর স্মৃতি ও পুরস্কার-প্রক্রিয়াকরণের বিভিন্ন স্নায়বিক ব্যবস্থা মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। এসব ব্যবস্থা পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে কাজ করে। ঘুমের অভাব, মানসিক চাপ, মাদকাসক্তি, শৈশবের অভিজ্ঞতা, সামাজিক প্রত্যাশা এবং ব্যক্তির শেখা আচরণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে মানুষের মন্দ চিন্তা বা অপরাধপ্রবণতা ব্যাখ্যা করার জন্য শয়তান নামের একটি অদৃশ্য সত্তাকে কারণ হিসেবে গ্রহণ করার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। শয়তানের অস্তিত্বের দাবি যুক্ত করা হলে ব্যাখ্যায় এমন একটি অতিরিক্ত সত্তা প্রবেশ করে, যার কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও সহিংসতা ও অপরাধকে একক কোনো অতিপ্রাকৃত কারণের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহিংসতা প্রতিরোধসংক্রান্ত গবেষণায় ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সম্পর্কগত, সামাজিক পরিবেশগত এবং বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক—এই চারটি স্তরে সহিংসতার ঝুঁকির কারণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ব্যক্তিগত স্তরে পূর্ববর্তী সহিংসতার অভিজ্ঞতা, মাদকাসক্তি, আচরণগত সমস্যা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। পারিবারিক ও সম্পর্কগত স্তরে পারিবারিক সহিংসতা, সংঘাত, নির্যাতন এবং অপরাধপ্রবণ সহযোগীদের প্রভাব কাজ করতে পারে। সামাজিক পরিবেশে বেকারত্ব, দারিদ্র্য, অপরাধপ্রবণ এলাকা এবং দুর্বল সামাজিক নিয়ন্ত্রণের ভূমিকা রয়েছে। বৃহত্তর সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য, সহিংসতাকে সমর্থনকারী সামাজিক রীতি, দুর্বল আইন প্রয়োগ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা অপরাধের ঝুঁকি বৃদ্ধি করতে পারে। এই বিশ্লেষণে অপরাধ মানুষের বাস্তব জীবনপরিস্থিতি এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। অপরাধের উৎস শনাক্ত করা এবং তা প্রতিরোধের পদ্ধতি নির্ধারণের জন্য এসব বাস্তব কারণের গুরুত্ব অপরিসীম। [29]
ধর্মীয় অনুশীলন মানুষের আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ ধর্মীয় আচারের সঙ্গে সামাজিক প্রত্যাশা, ব্যক্তিগত প্রতিশ্রুতি, নিয়মিত জীবনযাপন এবং নিজের আচরণের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা যুক্ত থাকে। রমজানে বহু মানুষ খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করেন, নির্দিষ্ট সময়ে রোজা পালন করেন, নামাজ ও অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বেশি সময় দেন এবং নিজের আচরণের প্রতি বিশেষ মনোযোগী হন। এই পরিবর্তনগুলো বাস্তব এবং সেগুলোর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব অনুসন্ধান করা সম্ভব। কিন্তু কোনো রোজাদার রমজানে নিজের আচরণ পরিবর্তন করলেই সেই পরিবর্তনের কারণ শয়তানের বন্দিত্ব বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। ধর্মীয় অনুশীলনের কারণে মানুষ নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে—এটি একটি পর্যবেক্ষণযোগ্য ঘটনা। অন্যদিকে সেই একই সময়ে অদৃশ্য শয়তানদের শিকলবন্দী করা হয়েছে—এটি সম্পূর্ণ পৃথক দাবি। মানুষের আত্মসংযমকে শয়তান বন্দিত্বের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করলে দুটি পৃথক কার্যকারণ সম্পর্ককে এক করে ফেলা হয়।
রমজান মাসে অপরাধের বাস্তব চিত্র এই অতিপ্রাকৃত দাবির কার্যকারিতা পরীক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে বাংলাদেশে রমজান শুরু হয়েছিল ২ মার্চ এবং শেষ হয়েছিল ৩০ মার্চ। বাংলাদেশ পুলিশের প্রকাশিত অপরাধ পরিসংখ্যান অনুসারে, ওই বছরের মার্চ মাসে সারা দেশে মোট ১৬,২৪০টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছিল। এর মধ্যে হত্যা মামলা ছিল ৩১৬টি, ডাকাতি ৬০টি, দস্যুতা ১৭১টি, চুরি ৮৬৬টি, অপহরণ ৮৩টি এবং নারী ও শিশু নির্যাতনসংক্রান্ত মামলা ২,০৫৪টি। একই বছরের ফেব্রুয়ারিতে মোট মামলার সংখ্যা ছিল ১৩,০০২। ফেব্রুয়ারিতে হত্যা মামলা ছিল ৩০০টি, ডাকাতি ৭৪টি, দস্যুতা ১৫৩টি এবং চুরি ৬৭৩টি। অর্থাৎ মার্চ মাসে হত্যার মামলাসংখ্যা, দস্যুতা, চুরি এবং মোট নথিভুক্ত মামলার সংখ্যা ফেব্রুয়ারির তুলনায় বেশি ছিল। মার্চ ২০২৫-এর এই পরিসংখ্যান রমজানের সঙ্গে প্রায় সম্পূর্ণ মিলে যাওয়া মাসটিতে বিপুলসংখ্যক অপরাধসংক্রান্ত মামলা নথিভুক্ত হওয়ার তথ্য প্রকাশ করে। তবে এগুলো রমজানের নির্দিষ্ট দিনগুলোতে সংঘটিত অপরাধের পৃথক হিসাব নয়। [30] [31] [32]
| অপরাধের ধরন | ফেব্রুয়ারি ২০২৫ | মার্চ ২০২৫ |
|---|---|---|
| হত্যা মামলা | ৩০০ | ৩১৬ |
| ডাকাতি | ৭৪ | ৬০ |
| দস্যুতা | ১৫৩ | ১৭১ |
| চুরি | ৬৭৩ | ৮৬৬ |
| অপহরণ | ৭৮ | ৮৩ |
| নারী ও শিশু নির্যাতনসংক্রান্ত মামলা | ১,৪৩০ | ২,০৫৪ |
| মোট নথিভুক্ত মামলা | ১৩,০০২ | ১৬,২৪০ |
এই পরিসংখ্যানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। মার্চের নথিভুক্ত মামলাগুলো সবই মার্চ মাসে সংঘটিত অপরাধের মামলা নয়; পূর্ববর্তী সময়ে সংঘটিত ঘটনার মামলা পরে নথিভুক্ত হওয়ার তথ্যও পুলিশি পরিসংখ্যানে রয়েছে। ফেব্রুয়ারি ২৮ দিনের এবং মার্চ ৩১ দিনের মাস হওয়ায় কেবল মোট সংখ্যা তুলনা করেও দৈনিক অপরাধের হার নির্ধারণ করা যায় না। ফেব্রুয়ারি ও মার্চের মোট মামলাসংখ্যা দিয়ে রমজানের স্বতন্ত্র অপরাধপ্রবণতা নির্ধারণ করা যায় না। নথিভুক্ত মামলাগুলোর মধ্যে হত্যা, চুরি, দস্যুতা, অপহরণ এবং নারী ও শিশুর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। শয়তানের বন্দিত্ব অপরাধ প্রতিরোধের একটি বাস্তব অতিপ্রাকৃত ব্যবস্থা হলে তার প্রভাব নির্ধারণের জন্য রমজানের দিনভিত্তিক অপরাধের তথ্য, পূর্ববর্তী ও পরবর্তী তুলনাযোগ্য সময় এবং অপরাধের অন্যান্য সামাজিক কারণকে বিশ্লেষণ করতে হবে। শুধু ধর্মীয় ঘোষণা দিয়ে সেই প্রভাব প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
রমজানে মানুষের আচরণের ওপর সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। মাসটিতে খাদ্যপণ্য, পরিবহন, বাজার, কেনাকাটা এবং দাতব্য কার্যক্রমের ধরন পরিবর্তিত হয়। ঈদ সামনে রেখে বিপুল মানুষের চলাচল, নগদ অর্থের লেনদেন এবং পণ্য কেনাবেচা বৃদ্ধি পায়। এসব পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ এবং অপরাধ সংঘটনের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। চুরি, প্রতারণা, খাদ্যে ভেজাল, মজুতদারি এবং চাঁদাবাজির মতো অপরাধের সঙ্গে অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনের উদ্দেশ্য যুক্ত থাকে। একইভাবে পারিবারিক সহিংসতা, ব্যক্তিগত সংঘাত কিংবা সংঘবদ্ধ অপরাধের ক্ষেত্রে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং সামাজিক পরিস্থিতির ভূমিকা রয়েছে। অপরাধের এসব বাস্তব কারণ শনাক্ত করার জন্য শয়তানের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি সম্পর্কে কোনো অনুমান প্রয়োজন হয় না। ফলে রমজানে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে সামাজিক ও অর্থনৈতিক তথ্য ব্যবহার করা যায়, কিন্তু সেই ঘটনাগুলো থেকে শয়তানের অতিপ্রাকৃত কার্যক্রমের অস্তিত্ব শনাক্ত করা যায় না।
এই পরিসংখ্যান শয়তানের কথিত প্রভাবের কোনো নির্দিষ্ট পরীক্ষাযোগ্য সূচক দেখায় না। রমজানে কোনো অঞ্চলে অপরাধ কমলে সেই পরিবর্তন শয়তানের বন্দিত্বের কারণে ঘটেছে বলে ঘোষণা করা যায় না। কারণ অপরাধ কমার পেছনে পুলিশের কার্যক্রম, সামাজিক পরিস্থিতি, মানুষের চলাচল, অর্থনৈতিক পরিবর্তন কিংবা অন্য বাস্তব কারণ কাজ করতে পারে। আবার অপরাধ বৃদ্ধি পেলে সেটিকে মানুষের নিজের প্রবৃত্তি বা অপরাধপ্রবণ অন্যান্য কারণের ফল বলা সম্ভব। এভাবে শয়তানের বন্দিত্বের দাবিকে অপরাধ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও বহাল রাখা যায়, অপরাধ হ্রাসের ক্ষেত্রেও বহাল রাখা যায়। কিন্তু যে দাবির সত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য কোনো স্বতন্ত্র প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি, সেই দাবিকে যেকোনো ফলাফলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে ব্যাখ্যা করা তার বাস্তব সত্যতা প্রতিষ্ঠা করে না। শয়তানের বন্দিত্বকে বাস্তব ঘটনা হিসেবে গ্রহণের জন্য অপরাধের সংখ্যা নয়, প্রথমেই শয়তানের অস্তিত্ব এবং তার কার্যক্ষমতা পরিবর্তনের স্বাধীন প্রমাণ প্রয়োজন।
মানুষের আচরণে ধর্মীয় অনুশীলনের প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা যায়; শয়তানের বন্দিত্ব পর্যবেক্ষণ করা যায় না। রমজানে একজন ব্যক্তি বেশি দান করতে পারেন, নিজের খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, সামাজিক সহযোগিতায় অংশ নিতে পারেন এবং অপরাধ থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এগুলো মানুষের বাস্তব আচরণ, যা পর্যবেক্ষণ করা যায়। আবার একই মাসে অন্য কেউ মিথ্যাচার, প্রতারণা, চুরি কিংবা সহিংসতায় জড়িয়ে পড়তে পারেন। এসব আচরণও বাস্তব এবং অনুসন্ধানযোগ্য। মানুষের এই পৃথক আচরণগুলোর সঙ্গে তার বিশ্বাস, পরিবার, শিক্ষা, সামাজিক পরিবেশ ও ব্যক্তিগত পরিস্থিতির সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা যায়। কিন্তু কোন সিদ্ধান্তটি শয়তানের কুমন্ত্রণার ফলে সৃষ্টি হয়েছে এবং কোন সিদ্ধান্তটি শয়তানের বন্দিত্বের কারণে পরিবর্তিত হয়েছে, সেই পার্থক্য নির্ধারণের কোনো প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। ফলে শয়তানের ধারণাটি মানুষের আচরণের ব্যাখ্যায় একটি অতিরিক্ত অপ্রমাণিত কারণ হিসেবে থেকে যায়।
ইসলামি উৎসের বক্তব্য অনুযায়ী মানুষের মধ্যে মন্দ প্রবৃত্তি রয়েছে, শয়তান মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয় এবং রমজানে শয়তানদের বন্দী করা হয়। এই তিনটি বক্তব্য একত্রে গ্রহণ করলে মানুষের আচরণে নিজস্ব প্রবৃত্তি ও অতিপ্রাকৃত প্ররোচনার পৃথক ভূমিকা নির্ধারণের প্রশ্ন তৈরি হয়। কিন্তু মানুষের আচরণের যে কারণগুলো বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেগুলো পর্যবেক্ষণযোগ্য জৈবিক, মানসিক ও সামাজিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। শয়তানের কথিত উপস্থিতি ও বন্দিত্বের পক্ষে সমতুল্য কোনো প্রমাণ নেই। বাংলাদেশের অপরাধ পরিসংখ্যানসহ বাস্তব তথ্য মানুষের অপরাধপ্রবণতা ও সামাজিক পরিস্থিতি সম্পর্কে গবেষণার উপকরণ প্রদান করে; এগুলো শয়তানের অস্তিত্ব বা বন্দিত্বের সাক্ষ্য নয়। রমজানে শয়তানদের শিকলবন্দী করার বিশ্বাসের মৌলিক দুর্বলতা হলো, মানুষের আচরণে যে পরিবর্তনই ঘটুক না কেন, সেই পরিবর্তনের সঙ্গে শয়তানের কথিত বন্দিত্বের কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অথচ বন্দিত্বের ঘটনাটিকেই একটি বাস্তব অতিপ্রাকৃত সত্য হিসেবে প্রচার করা হয়। মানুষের মন্দ আচরণের বৈজ্ঞানিক ও সামাজিক ব্যাখ্যা অনুসন্ধানযোগ্য; শয়তানের শিকলবন্দিত্ব ধর্মীয় ঘোষণার ওপর নির্ভরশীল একটি অপ্রমাণিত বিশ্বাস।
রমজানকেন্দ্রিক অপরাধ ও ধর্মীয় বলপ্রয়োগ
রমজান মাসকে আত্মসংযম, নৈতিক শুদ্ধি ও পাপ থেকে বিরত থাকার বিশেষ সময় হিসেবে প্রচার করা হয়। অথচ বাস্তব সমাজে এই মাসেও হত্যা, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, প্রতারণা, খাদ্যে ভেজাল এবং সহিংসতা সংঘটিত হয়। রমজানে খাদ্যপণ্যের চাহিদা, ঈদের কেনাকাটা, মানুষের চলাচল ও আর্থিক লেনদেন বৃদ্ধির কারণে অপরাধীরা নতুন সুযোগও পায়। বাংলাদেশে ২০২৫ সালের রমজান চলাকালে র্যাবের মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান প্রকাশ্যে জানান, রমজানের শুরুতে বাজারে বেচাকেনা ও অর্থের লেনদেন বৃদ্ধির সঙ্গে ডাকাতি ও চাঁদাবাজি বেড়েছিল। ৩০ মার্চ তাঁর দেওয়া বক্তব্য বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা প্রকাশ করে। একই মাসে খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ এবং পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণের জন্য বিএসটিআই দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান পরিচালনার ঘোষণা দেয়। এসব ঘটনা অপরাধের পেছনে মানুষের অর্থনৈতিক স্বার্থ, সুযোগসন্ধানী আচরণ এবং আইন প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে আনে। শয়তান বন্দী থাকার ধর্মীয় ঘোষণা এই বাস্তব কারণগুলোর কোনো বিকল্প ব্যাখ্যা প্রদান করে না। [33] [34]
রমজানকেন্দ্রিক ধর্মীয় বলপ্রয়োগের ঘটনাগুলো আরও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশে রমজানের সময় দিনের বেলায় খাবারের দোকান খোলা রাখা কিংবা প্রকাশ্যে খাদ্য গ্রহণের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠী ভয়ভীতি প্রদর্শন, দোকান বন্ধের দাবি এবং হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে। ২০২৪ সালের ১৫ মার্চ সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে তিনভাই রেস্টুরেন্টে হামলার ঘটনায় মালিক রাজীব কুমার দে রাজু আহত হন। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, হাসপাতালের হিন্দু রোগী ও তাঁদের স্বজনদের খাবারের প্রয়োজন বিবেচনা করে তিনি দিনের বেলাতেও রেস্টুরেন্ট খোলা রেখেছিলেন। রোজাদারদের কথা বিবেচনা করে পর্দা দিয়েও রেখেছিলেন। এরপরও তাঁকে হুমকি দেওয়া হয় এবং পরে রেস্টুরেন্টে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। এই ঘটনাটি দেখায়, নিজের ধর্মীয় আচারের পবিত্রতা রক্ষার নামে অন্য মানুষের খাদ্য গ্রহণ ও ব্যবসা পরিচালনার স্বাধীনতা আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। [35]
রাজু জানান, হাসপাতালে আসা হিন্দু রোগী ও তাদের স্বজনদের কথা বিবেচনা করে রমজান মাসে দিনের বেলাও রেস্টুরেন্টটি খোলা রাখেন তিনি।
২০২৫ সালের ৫ মার্চ মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র রমজানে দেশের বিভিন্ন স্থানে খাবারের দোকান জোরপূর্বক বন্ধ করার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। সংগঠনটির বিবৃতিতে বলা হয়, রমজানের পবিত্রতা রক্ষার অজুহাতে কিছু গোষ্ঠী দিনের বেলায় দোকান বন্ধ রাখার দাবি জানাচ্ছিল এবং নিরাপত্তার আশঙ্কায় দোকানমালিকেরা সেই চাপ মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছিলেন। সংগঠনটি নারী, শিশু, প্রবীণ, শ্রমজীবী এবং অন্যান্য মানুষের খাদ্যপ্রাপ্তি ও মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরে। এখানে সমস্যাটি কেবল ব্যক্তির রোজা রাখা কিংবা না রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি ধর্মীয় বিশ্বাসকে অন্য মানুষের ওপর বাধ্যতামূলক আচরণবিধি হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নিজে রোজা রাখা ব্যক্তিগত ধর্মীয় স্বাধীনতার অন্তর্ভুক্ত; অন্য মানুষকে ভয় দেখিয়ে খাবার বিক্রি বা খাদ্য গ্রহণ থেকে বিরত রাখা সেই স্বাধীনতার চর্চা নয়, বরং অন্যের অধিকারের ওপর আক্রমণ। [36]
According to media reports, certain groups have been imposing unwarranted restrictions on food shops, demanding their closure during daylight hours.
বাংলা অনুবাদ: সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, কিছু গোষ্ঠী খাবারের দোকানের ওপর অন্যায্য বিধিনিষেধ আরোপ করছে এবং দিনের বেলায় সেগুলো বন্ধ রাখার দাবি জানাচ্ছে।
ধর্মীয় বলপ্রয়োগের এই ঘটনাগুলোর সঙ্গে রমজানে শয়তান বন্দিত্বের বিশ্বাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। মানুষের মনে মন্দ চিন্তা ও অন্যায়ের প্ররোচনার জন্য শয়তানকে দায়ী করা হয়, অথচ একই ধর্মীয় মাসে কিছু মানুষ ধর্ম পালনের নামেই অন্য মানুষের ওপর সহিংসতা ও জবরদস্তি চালায়। তাদের কর্মকাণ্ডের উৎস অনুসন্ধান করলে পাওয়া যায় ধর্মীয় কর্তৃত্বের ধারণা, সামাজিক চাপ, অসহিষ্ণুতা এবং অন্যের আচরণ নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা। এসবের জন্য কোনো অদৃশ্য সত্তাকে দায়ী করার প্রয়োজন নেই। বরং ধর্মীয় বিশ্বাসকে প্রশ্নাতীত কর্তৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলে কীভাবে ব্যক্তির স্বাধীনতার ওপর আক্রমণকে নৈতিক কর্তব্য বলে মনে করা হতে পারে, এসব ঘটনা তার বাস্তব উদাহরণ। ধর্মীয় পবিত্রতা কোনো মানুষকে অন্যের খাদ্য গ্রহণ, জীবিকা কিংবা ব্যক্তিস্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের অধিকার দেয় না। বাংলাদেশে ঘটা একটি বাস্তব ঘটনার ভিডিও এখানে দেয়া হলো,
রমজানে অপরাধের উপস্থিতি এবং ধর্মীয় বলপ্রয়োগের ঘটনাগুলো মানুষের আচরণ সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য প্রতিষ্ঠা করে: মানুষের নৈতিকতা কোনো ধর্মীয় মাসের পবিত্রতা কিংবা অদৃশ্য শয়তানের বন্দিত্ব দ্বারা নিশ্চিত হয় না। মানুষের আচরণ নির্ধারণে তার নিজের সিদ্ধান্ত, শিক্ষা, সামাজিক পরিবেশ, স্বার্থ, ক্ষমতা এবং জবাবদিহির বাস্তব ভূমিকা রয়েছে। রমজানে শয়তান বন্দী হওয়ার বিশ্বাসটি এসব বাস্তব কারণের কার্যকারিতা ব্যাখ্যা করে না। অন্যায় প্রতিরোধ করতে প্রয়োজন কার্যকর আইন, জবাবদিহি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অন্যের অধিকারকে সম্মান করার নীতি। শয়তান বন্দী রয়েছে—এমন একটি অপ্রমাণিত ঘোষণার ওপর মানুষের নৈতিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয় না।
উপসংহার
রমজান মাসে শয়তানদের শিকলবন্দী করার বিশ্বাসটি ইসলামি হাদিসসাহিত্যের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত অতিপ্রাকৃত দাবি। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে মুহাম্মদ রমজান শুরু হলে শয়তানদের বন্দী করার ঘোষণা দিয়েছেন। অথচ একই হাদিসসাহিত্যে রমজানের জাকাতের খাদ্যসামগ্রী নিতে আসা শয়তানের বিবরণ এবং রমজানের শেষ দশকে মানুষের মনে শয়তানের কুমন্ত্রণা প্রবেশ করার আশঙ্কায় মুহাম্মদের বক্তব্য সংরক্ষিত রয়েছে। বিভিন্ন বর্ণনায় সাধারণভাবে শয়তানদের বন্দিত্ব এবং বিশেষভাবে দুর্ধর্ষ শয়তানদের বন্দিত্বের কথাও পাওয়া যায়। এসব বিবরণে বন্দিত্বের প্রকৃতি, পরিসর ও কার্যকারিতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট একটি অভিন্ন চিত্র পাওয়া যায় না। ইসলামি ব্যাখ্যাকারদের কেউ বাস্তব বন্দিত্ব, কেউ সীমিত বন্দিত্ব, কেউ প্রভাবহ্রাস এবং কেউ রূপক অর্থ গ্রহণ করেছেন। এই ব্যাখ্যাগত পার্থক্যগুলোর কোনোটি শয়তান নামের সত্তার বাস্তব অস্তিত্ব কিংবা তার বন্দিত্বের স্বাধীন প্রমাণ প্রদান করে না।
পৃথিবীর ভৌগোলিক বাস্তবতাও এই ধর্মীয় দাবির অনির্ধারিত দিকগুলো প্রকাশ করে। রমজান পৃথিবীর সব অঞ্চলে একই সময়ে শুরু হয় না। ইসলামি উৎসেই পৃথক অঞ্চলে ভিন্ন দিনে চাঁদ দেখার এবং রোজা শুরু করার বিবরণ রয়েছে। আবার মেরু অঞ্চলে দীর্ঘ দিনরাত্রির কারণে রোজার সময় নির্ধারণে বিশেষ গণনাপদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়। মানুষের ধর্মীয় আচারের জন্য এসব সময়সূচি নির্ধারণ করা সম্ভব হলেও শয়তানদের বন্দিত্ব কোন মুহূর্ত থেকে, কোন অঞ্চলে এবং কীভাবে কার্যকর হয়, তার কোনো স্বতন্ত্র বাস্তব ভিত্তি পাওয়া যায় না। একইভাবে আধুনিক মনোবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান মানুষের আচরণের সঙ্গে মস্তিষ্ক, শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, অর্থনৈতিক অবস্থা এবং সামাজিক পরিবেশের সম্পর্ক শনাক্ত করেছে। কিন্তু মানুষের কোনো নির্দিষ্ট চিন্তা বা আচরণের পেছনে শয়তানের অতিপ্রাকৃত প্রভাব কিংবা রমজানে সেই প্রভাব বন্ধ হওয়ার ঘটনা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
রমজানে সংঘটিত হত্যা, চুরি, ডাকাতি, প্রতারণা, খাদ্যে ভেজাল এবং ধর্মীয় বলপ্রয়োগের ঘটনাগুলোও মানুষের আচরণে বাস্তব সামাজিক ও ব্যক্তিগত কারণের গুরুত্ব প্রকাশ করে। অপরাধের কারণ মানুষের সিদ্ধান্ত, স্বার্থ, সামাজিক সম্পর্ক এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার মধ্যেই অনুসন্ধানযোগ্য। একইভাবে রমজানে কোনো ব্যক্তি আত্মসংযম পালন করলে তার পেছনে ধর্মীয় অনুশীলন ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ভূমিকা অনুসন্ধান করা যায়। শয়তানের বন্দিত্বকে এই পরিবর্তনগুলোর কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মতো কোনো স্বাধীন প্রমাণ নেই। ফলে মানুষের আচরণে যেকোনো ধরনের পরিবর্তন ঘটলেও শয়তান বন্দিত্বের দাবিটি ধর্মীয় বিশ্বাসের বাইরে পরীক্ষিত সত্যে পরিণত হয় না।
রমজানে শয়তানদের শিকলবন্দী করার দাবির মৌলিক সমস্যা হলো, শয়তানের অস্তিত্ব অপ্রমাণিত, তার বন্দিত্ব অপ্রমাণিত এবং সেই বন্দিত্বের বাস্তব প্রভাবও অপ্রমাণিত। অথচ এই তিনটি অপ্রমাণিত বিষয়কে মুহাম্মদের ধর্মীয় কর্তৃত্বের ভিত্তিতে সত্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়। কোনো ব্যক্তির বক্তব্যকে ঐশী সংবাদ হিসেবে বিশ্বাস করা সেই বক্তব্যের অতিপ্রাকৃত বিষয়বস্তুর সত্যতা প্রতিষ্ঠা করে না। ধর্মগ্রন্থের ঘোষণা এবং বাস্তব ঘটনার প্রমাণ এক নয়। শয়তান বন্দী হওয়ার দাবিটি তাই প্রমাণনির্ভর জ্ঞানের অংশ নয়; এটি ধর্মীয় কর্তৃত্বের ওপর নির্ভরশীল একটি অন্ধবিশ্বাস। মানুষের নৈতিকতা, অপরাধপ্রবণতা ও সামাজিক আচরণ বোঝার ক্ষেত্রে অদৃশ্য শয়তানের কল্পিত কার্যকলাপের পরিবর্তে বাস্তব কারণ, পর্যবেক্ষণযোগ্য তথ্য এবং যুক্তিনির্ভর অনুসন্ধানই কার্যকর ভিত্তি।
তথ্যসূত্রঃ
- সূরা আন-নাজম, আয়াত ৩–৪ ↩︎
- সূরা আন-নিসা, আয়াত ৬৫ ↩︎
- সূরা আল-আহযাব, আয়াত ৩৬ ↩︎
- সুনান আবু দাউদ, কিতাবুল ইলম, জ্ঞান লিপিবদ্ধ করার অধ্যায়, হাদিস ৩৬৪৬; ইসলামিক ফাউন্ডেশন সংস্করণে ৩৬০৭ ↩︎
- সহিহ বুখারি, কিতাবুস সাওম, রমজান মাস সম্পর্কিত অধ্যায়, হাদিস ১৮৯৯ ↩︎
- সহিহ মুসলিম, কিতাবুস সিয়াম, রমজান মাসের ফজিলত, হাদিস ১০৭৯ক ↩︎
- সহিহ মুসলিম, কিতাবুস সিয়াম, হাদিস ১০৭৯খ ↩︎
- সুনান নাসাঈ, কিতাবুস সিয়াম, হাদিস ২১০৬ ↩︎
- সূরা আস-সাফফাত, আয়াত ৭ ↩︎
- সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত ৩ ↩︎
- ইসলামQA, প্রশ্ন ২৫৬৮৬৮: রমজানে কেবল বিদ্রোহী শয়তানদের বন্দিত্বের ব্যাখ্যা ও তার দলিল পর্যালোচনা ↩︎
- সহিহ বুখারি, হাদিস ২৩১১: রমজানের জাকাত পাহারার তিন রাতের ঘটনা ↩︎
- সহিহ বুখারি, হাদিস ৩২৭৫: আবু হুরায়রার কাছে আগত ব্যক্তি শয়তান ছিল ↩︎
- সহিহ বুখারি, হাদিস ২০৩৫: রমজানের শেষ দশকে সফিয়ার ঘটনা ↩︎
- সহিহ মুসলিম, হাদিস ২১৭৫ক: শয়তানের মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেওয়ার আশঙ্কা ↩︎
- NASA, Facts About Earth: পৃথিবীর আবর্তন, প্রদক্ষিণ ও অক্ষীয় হেলন ↩︎
- সহিহ বুখারি, কিতাবুস সাওম, চাঁদ দেখে রোজা শুরু ও শেষ করার অধ্যায়, হাদিস ১৯০৯ ↩︎
- সহিহ মুসলিম, কিতাবুস সিয়াম, প্রত্যেক অঞ্চলের পৃথক চাঁদ দেখার বিধান, হাদিস ১০৮৭ ↩︎
- ইসলামওয়েব, ফতোয়া ৪০১৭৬: চাঁদ দেখার আঞ্চলিক পার্থক্য গ্রহণ ও অগ্রাহ্য করার বিষয়ে মতভেদ ↩︎
- সৌদি আরবের সরকারি উম্মুল কুরা পত্রিকা: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে রমজান শুরুর ঘোষণা ↩︎
- দ্য ডেইলি স্টার: বাংলাদেশে ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে রমজান ↩︎
- তুরস্কের দিয়ানেত: ২০২৬ সালের রমজান শুরুর সরকারি ঘোষণা ↩︎
- ইন্দোনেশিয়া সরকারের সরকারি ঘোষণা: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ↩︎
- আল কোরআন, সূরা আল-আরাফ, আয়াত ২৭: শয়তান ও তার দলবলের অদৃশ্য উপস্থিতি ↩︎
- আল কোরআন, সূরা আন-নাস, আয়াত ১–৬: মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণাদানকারী সত্তার বিবরণ ↩︎
- সহিহ মুসলিম, কিয়ামত, জান্নাত ও জাহান্নামের বৈশিষ্ট্য অধ্যায়, হাদিস ২৮১৪ক: প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে জিন সঙ্গীর উপস্থিতি ↩︎
- আল কোরআন, সূরা ইউসুফ, আয়াত ৫৩: মানুষের প্রবৃত্তির মন্দের প্রতি প্ররোচনা ↩︎
- সহিহ বুখারি, কিতাবুস সাওম, রোজা রেখেও মিথ্যাচার ও মন্দ কাজ না ছাড়ার বিষয়ে অধ্যায়, হাদিস ১৯০৩ ↩︎
- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা: নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও কাঠামোগত ঝুঁকির কারণ ↩︎
- বাংলাদেশ পুলিশ: ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এর সরকারি অপরাধ পরিসংখ্যান ↩︎
- বাংলাদেশ পুলিশ: মার্চ ২০২৫-এর সরকারি অপরাধ পরিসংখ্যান ↩︎
- বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা: ২ মার্চ ২০২৫ রমজান শুরুর সরকারি ঘোষণা ↩︎
- বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা, ৩০ মার্চ ২০২৫: রমজানে ডাকাতি ও চাঁদাবাজি নিয়ে র্যাব মহাপরিচালকের বক্তব্য ↩︎
- বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫: রমজানে খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে বিএসটিআইয়ের বিশেষ অভিযান ↩︎
- সিলেট টুডে, ১৫ মার্চ ২০২৪: সিলেটে দিনে রেস্টুরেন্ট খোলা রাখায় হামলা, আহত ১ ↩︎
- দ্য ডেইলি স্টার, ৫ মার্চ ২০২৫: ASK concerned over forced closures of food shops during Ramadan ↩︎

