জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

ইসলাম অনুসারে “ইমান” কাকে বলে?

প্রকাশিত: মে 3, 2024লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন23 মিনিট পড়া

ভূমিকা

ঈমান শব্দের আভিধানিক অর্থ বিশ্বাস, আস্থা বা সত্য বলে স্বীকার করা। ইসলামে ঈমানের নির্দিষ্ট বিষয় আছে। আল্লাহ, ফেরেশতা, কিতাব, রাসুল, পরকাল ও তাকদিরকে সত্য বলে গ্রহণ করতে হয়। এর মধ্যে এমন দাবিও আছে, যেগুলোর পক্ষে বিশ্বাসীর কাছে মূল অবলম্বন নবীর দেওয়া সংবাদ। যেমন, কবরে মৃত ব্যক্তিকে ফেরেশতারা জিজ্ঞাসাবাদ করেন বলে বিশ্বাস করা এবং কোনো পরিচিত মানুষের মুখে তাঁর দেখা একটি ঘটনার খবর শোনা এক ধরনের সাক্ষ্য নয়। প্রথম ক্ষেত্রে সংবাদদাতার কাছে খবরটি কীভাবে পৌঁছাল, সেই পথটির সত্যতাই প্রতিষ্ঠা করা দরকার। সেই প্রশ্নের উত্তর আগেই বিশ্বাস করে নিলে গোটা দাবিটি বৃত্তাকার হয়ে যায়।

কোনো দাবির পক্ষে যতটা প্রমাণ পাওয়া যায়, ততটাই আস্থা রাখা যুক্তিসঙ্গত। নতুন তথ্য এলে সেই আস্থা বাড়তে পারে, কমতেও পারে। ঈমানের সঙ্গে এই পদ্ধতির সংঘাত শুরু হয় তখন, যখন আগের সিদ্ধান্তে অটল থাকাই ধার্মিকতার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়। তখন একই সন্দেহের দুটি অর্থ হয়। প্রমাণ বিচারের দিক থেকে তা আরও অনুসন্ধানের কারণ। ধর্মীয় আনুগত্যের দিক থেকে তা এমন একটি অবস্থা, যা কাটিয়ে ওঠার প্রত্যাশা করা হয়। এই দুই প্রত্যাশা মুখোমুখি হলে বিশ্বাসীর পক্ষে সৎভাবে বলা কঠিন হয়ে পড়ে যে তিনি এখনও নিশ্চিত হওয়ার মতো কারণ পাননি।


জিবরিলের হাদিসে ঈমানের ছয় ভিত্তি

জিবরিলের হাদিসে মুহাম্মদকে পৃথকভাবে ইসলাম ও ঈমান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়। ইসলামের উত্তরে তিনি সাক্ষ্য, নামাজ, জাকাত, রোজা ও হজের কথা বলেন। ঈমানের উত্তরে তিনি ছয়টি বিশ্বাসের কথা বলেন। এর মধ্যে পরকালের অন্তর্ভুক্ত পুনরুত্থানকে নিচে আলাদা করে দেখানো হয়েছে, কারণ মৃত মানুষকে আবার জীবিত করার দাবি পরকালের ধারণার একটি নির্দিষ্ট অংশ। একই বর্ণনার শুরুতে ইবন উমর তাকদির অস্বীকারকারীদের থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করেন এবং তাকদিরে বিশ্বাসের আগে তাদের দানও আল্লাহ গ্রহণ করবেন না বলে জানান। ভালো-মন্দ তাকদিরে বিশ্বাস এখানে ঈমানের শর্ত। ইবন উমরের প্রতিক্রিয়া দেখায়, মতভেদের পরিণতি ছিল ধর্মীয় স্বীকৃতি হারানো পর্যন্ত। [1]

قَالَ فَأَخْبِرْنِي عَنِ الإِيمَانِ. قَالَ «أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ وَمَلاَئِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ وَتُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ». قَالَ صَدَقْتَ.

বাংলা অনুবাদ: তিনি বললেন, আমাকে ঈমান সম্পর্কে জানান। মুহাম্মদ বললেন, তুমি আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা, তাঁর কিতাব, তাঁর রাসুল ও শেষ দিবসে বিশ্বাস করবে এবং তাকদিরের ভালো ও মন্দে বিশ্বাস করবে। তিনি বললেন, আপনি সত্য বলেছেন।

ঈমানের ছয় ভিত্তি ও পুনরুত্থানের দাবি
ধর্মীয় সংবাদ এবং তার স্বাধীন প্রমাণের প্রশ্ন
দাবি ১
অদৃশ্য স্রষ্টা (আল্লাহ)
জগতের একজন স্রষ্টা থাকতে পারেন বলে যুক্তি দিলেই তিনি কোরআনের আল্লাহ, আরশের ওপর সমাসীন কিংবা মুহাম্মদকে রাসুল করেছেন—এসব নির্দিষ্ট দাবি প্রতিষ্ঠিত হয় না।
দাবি ২
ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস
ওহি পৌঁছানো ও গায়েবি জগতের বিভিন্ন কাজ করার জন্য অদৃশ্য সত্তা আছে বলে বিশ্বাস। ফেরেশতার পরিচয় ও কাজের প্রমাণ হিসেবে মূলত ধর্মীয় বর্ণনাই হাজির করা হয়।
দাবি ৩
আসমানি কিতাব
কোনো গ্রন্থ বহু পুরোনো কিংবা তার পাঠ সংরক্ষিত, তা পাণ্ডুলিপি থেকে যাচাই করা যায়। স্রষ্টা সেই বাণী পাঠিয়েছেন—এ দাবি প্রতিষ্ঠা করতে ভিন্ন প্রমাণ দরকার।
দাবি ৪
নবী ও রাসুল
কারও ঐতিহাসিক অস্তিত্ব বা তাঁর বক্তব্যের প্রচার প্রমাণ করা যায়। তাঁকে আল্লাহ নিয়োগ করেছেন কি না, সেটি তাঁর জীবনী ও প্রচারের অস্তিত্বের বাইরে আরেকটি দাবি।
দাবি ৫
তাকদির
ভালো ও মন্দ উভয়ই আল্লাহর নির্ধারণের অন্তর্ভুক্ত। কাজটি যদি এমনভাবে নির্ধারিত হয় যে মানুষ ভিন্নভাবে কাজ করতে পারত না, তাহলে সেই কাজের জন্য তাকে শাস্তি দেওয়ার ন্যায্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
দাবি ৬
আখিরাত বা পরকাল
শেষ দিবস, বিচার ও মৃত্যুর পর মানুষের পরিণতির ওপর বিশ্বাস। ভবিষ্যতে বিচার হবে বলে ঘোষণা সেই বিচারের স্বাধীন প্রমাণ জোগায় না।
পরকালের অংশ
পুনরুত্থান (পরকালের অন্তর্ভুক্ত)
মৃত মানুষকে আবার জীবিত করা হবে বলে বিশ্বাস। ক্ষয় হয়ে যাওয়া দেহ ফিরিয়ে আনার দাবি এবং সেই দেহে একই ব্যক্তির চেতনা ফিরে আসার দাবি দুটিই ধর্মীয় ঘোষণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

গায়েবে বিশ্বাস ও তাফসিরে জালালাইন

সুরা বাকারার শুরুতে গায়েবে বিশ্বাসকে মুত্তাকিদের বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছে। আয়াতে সেই বিশ্বাসের পাশে নামাজ ও রিজিক থেকে ব্যয় করার কথা এসেছে। ফলে গায়েবে বিশ্বাস এখানে কোনো বিচ্ছিন্ন দার্শনিক অনুমান হিসেবে হাজির হয়নি। এটি কোরআনের চোখে ধার্মিক মানুষের পরিচয়ের একটি অংশ। [2]

কোরআন ২:৩
الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ

বাংলা অনুবাদ: যারা গায়েবে বিশ্বাস করে, নামাজ কায়েম করে এবং আমি তাদের যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে।

জালালাইনের আরবি ব্যাখ্যায় গায়েবের উদাহরণ হিসেবে এসেছে পুনরুত্থান, জান্নাত ও জাহান্নাম। এই ব্যাখ্যা থেকে নির্দিষ্টভাবে বোঝা যায় ইসলাম কী বিশ্বাস করতে বলছে। ওই ঘটনাগুলো সত্যিই ঘটবে কি না, তার স্বাধীন প্রমাণ হিসেবে আয়াত ও তাফসিরকে ব্যবহার করতে গেলে প্রথমেই দেখাতে হবে যে এসব খবরের উৎস সত্যিই মানুষের সাধারণ জ্ঞানের বাইরে কিছু জানার ক্ষমতা রাখে। [3]

তাফসিরে জালালাইন
﴿الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ﴾ يُصَدِّقُونَ ﴿بِالْغَيْبِ﴾ بِمَا غَابَ عَنْهُمْ مِنْ الْبَعْث وَالْجَنَّة وَالنَّار ﴿وَيُقِيمُونَ الصَّلَاة﴾ أَيْ يَأْتُونَ بِهَا بِحُقُوقِهَا ﴿وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ﴾ أَعْطَيْنَاهُمْ ﴿يُنْفِقُونَ﴾ فِي طَاعَة اللَّه

বাংলা অনুবাদ: “যারা বিশ্বাস করে” অর্থ যারা সত্য বলে মেনে নেয়। “গায়েবে” অর্থ পুনরুত্থান, জান্নাত ও জাহান্নামের মতো যা তাদের অগোচরে। “নামাজ কায়েম করে” অর্থ তারা নামাজের প্রাপ্য বিধানগুলোসহ তা আদায় করে। “আমি তাদের যা রিজিক দিয়েছি” অর্থ যা আমি তাদের দিয়েছি। “তা থেকে ব্যয় করে” অর্থ আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় করে।

ইসলামিয়া কুতুবখানার বাংলা সংস্করণের ব্যাখ্যায় একটি সাদা ও একটি কালো কাপড়ের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। কাপড়ের রং নিজের চোখেই ধরা পড়ে। রাসুলের দেওয়া গায়েবি সংবাদ গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁর প্রতি আস্থাই নির্ধারক। নিচের ব্যাখ্যাটি বাংলা সংস্করণের বিস্তৃত আলোচনা। [4]

নবী করীম যা নিয়ে এসেছেন, তা তাঁর প্রতি আস্থা রেখে বিশ্বাস করা।
অনুভূতিগ্রাহ্য ও দৃশ্যমান কোনো বস্তুতে কারো কথায় বিশ্বাস করার নাম ঈমান নয়ঃ মুমিনের পরিচয় দিতে গিয়ে আয়াতে দুটি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। ঈমান ও গায়েব। এ থেকে বোঝা গেল, অনুভূতিগ্রাহ্য ও দৃশ্যমান কোনো বস্তুতে কারো কথায় বিশ্বাস করার নাম ঈমান নয়। উদাহরণস্বরূপ বলা হয় যে, কোনো ব্যক্তি যদি এক টুকরো সাদা কাপড়কে সাদা এবং এক টুকরো কালো কাপড়কে কালো বলে এবং এক ব্যক্তি তার কথা সত্য বলে মেনে নেয়, তাহলে একে ঈমান বলা যায় না। এতে বক্তার কোনো প্রভাব বা দখল নেই। অপরদিকে রাসূল এর কোনো সংবাদ কেবলমাত্র রাসূল এর উপর বিশ্বাসবশত মেনে নেওয়াকেই শরিয়তের পরিভাষায় ঈমান বলে।

ইমান

একই বাংলা সংস্করণের পরের পৃষ্ঠাগুলোতে ইবন কাসির, জালালাইনের হাশিয়া, নিবরাস ও তাফসিরে মাদারেক থেকে গায়েবের সংজ্ঞা আলোচনা করা হয়েছে। ব্যাখ্যার শেষ অংশে ওহিকে গায়েব জানার দলিল হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, কবরের জিজ্ঞাসাবাদ প্রথমে অজানা ছিল, পরে রাসুলের সংবাদে তা জানা গেছে। একই সঙ্গে এই মুহূর্তে কার কবরে কী ঘটছে, তা এখনও গায়েব বলা হয়েছে। অর্থাৎ এখানে “জানা” বলতে কবরের ভেতরের ঘটনা স্বাধীনভাবে পর্যবেক্ষণ করার কথা বলা হচ্ছে না। আল্লাহ খবর দিয়েছেন বলে যে বক্তব্য বিশ্বাস করা হয়েছে, তার ভিত্তিতেই ঘটনাটি জ্ঞাত বলে ধরা হয়েছে। [5]

গায়েবের সংজ্ঞা ও পরিচিতি: ‘গায়েব’-এর আভিধানিক অর্থ অজ্ঞাত, অদৃশ্য ও গোপন। কুরআনে এ শব্দ দ্বারা সে সমস্ত বিষয়কেই বুঝানো হয়েছে, যেগুলোর সংবাদ রাসূল দিয়েছেন এবং মানুষ যে সমস্ত বিষয়ে স্বীয় বুদ্ধিবলে ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জ্ঞান লাভে সম্পূর্ণ অক্ষম।
নিম্নে এ মর্মে ওলামায়ে কেরাম প্রদত্ত কতিপয় সংজ্ঞা উল্লেখ করা হলো।
তাফসীরে ইবনে কাছীরে উল্লেখ রয়েছে—
أَمَّا الْغَيْبُ : فَمَا غَيْبَ عَنِ الْعِبَادِ مِنْ أَمْرِ الْجَنَّةِ وَأَمْرِ النَّارِ وَمَا ذَكَرَ فِي الْقُرْآنِ
অর্থাৎ গায়েব বলা হয় ঐ জিনিসকে, যা বান্দা থেকে গোপন রয়েছে। যেমন—জান্নাত-জাহান্নামের অবস্থাসমূহ এবং কুরআনে কারীমে বর্ণিত বিষয়াবলি।
হাশিয়ায়ে জালালাইনে উল্লেখ রয়েছে—
أَي مَا غَابَ عَنِ الْحِسَ وَالْعَقْلِ غَيْبَةً كَامِلَةً بِحَيْثُ لَا يُدْرَكَ بِوَاحِدٍ مِنْهُمَا ابْتِدَاء الْبَدَاهَةِ
الْمُرَادُ بِهِ أَي الْغَيْبِ الْخَفِيُّ الَّذِي لَا يُدْرِكُهُ الْحِسُ وَلَا يَقْتَضِيهِ بَدَاهَةُ الْعَقْلِ
অর্থাৎ মানুষের পঞ্চ ইন্দ্রিয় শক্তি এবং মেধা শক্তি দ্বারা যা কিছু জানার উপায় নেই, তাকে গায়েব বলে। [বায়জাবী, পৃ. ১৮]
সুবিখ্যাত গ্রন্থ শরহে আকাঈদ নাসাফীর ভাষ্যগ্রন্থ নেবরাসে উল্লেখ রয়েছে—
وَالتَّحْقِيق أَنَّ الْغَيْبَ مَا غَابَ عَنِ الْحَوَاسِ وَالْعِلْمِ الضَّرُورِي وَالْعِلْمِ الْإِسْتِدْلَالِي وَأَمَّا مَا عُلِمَ بِحَاسَةٍ أَوْ ضَرُورَةِ أَوْ دَلِيلٍ فَلَيْسَ بِغَيْبِ
অর্থাৎ যা পঞ্চ ইন্দ্রিয় বা অন্য কোনো দলিল ব্যতীত সাধারণতভাবে জানা যায় না, তাকে গায়েব বলা হয়। আর যা কোনো ইন্দ্রিয় বা দলিল দ্বারা জানা যায়, তা গায়েব নয়। [নিবরাস, পৃ. ৫৭৫]
হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ তাফসীরগ্রন্থ তাফসীরে মাদারেকে বলা হয়েছে—
الْغَيْبُ هُوَ مَا لَمْ يَقُمْ عَلَيْهِ دَلِيلٌ وَلَا اطَّلَعَ عَلَيْهِ مَخْلُوقٌ
অর্থাৎ ঐ জিনিসকে গায়েব বলা হয়, যার উপর কোনো দলিল বিদ্যমান নেই এবং কোনো মাখলুক সে বিষয়ে অবগত নয়। মোটকথা, কোনো দলিল প্রমাণ ও মাধ্যম ছাড়া যা জানা যায়, তাকেই গায়েব বলা হয়। কোনো সূত্রে বা দলিল প্রমাণ ও নিদর্শনের মাধ্যমে জানা গেলে তা আর গায়েব থাকে না। কারণ আল্লাহ তা’আলা নিজ ওহীর মাধ্যমে হুজুর-কে গায়েবের খবর জানিয়েছেন। ওহী হলো জানার একটি দলিল। আর দলিল দ্বারা যা জানা যায় তা গায়েব নয়। যেমন কবরের অবস্থা আমাদের জন্য গায়েব ছিল। আল্লাহ তা’আলা হুজুর কে কবর সম্পর্কে জানিয়ে দিয়েছেন। হুজুর বলেছেন, কবরে মুনকার নাকীর নামে দু’জন ফেরেশতা এসে মৃত ব্যক্তিকে জিন্দা করার পর জিজ্ঞেস করবে—তোমার রব কে? তুমি কোন ধর্মের অনুসারী ছিলে? এবং হুজুরকে দেখিয়ে বলবে ইনি কে? একথাগুলো একদিন গায়েব ছিল। দুনিয়ার মুসলমানরা জেনে যাওয়ার পর আর তা গায়েব থাকেনি। তবে প্রত্যেকের কবরে প্রতি মুহূর্তে কি হচ্ছে এটা এখনো গায়েব হিসেবেই রয়েছে।

ইমান 1

সুরা জিনের ভাষায় আল্লাহ গায়েব জানেন এবং মনোনীত রাসুল ছাড়া কাউকে তা জানান না। দাবিটির কাঠামো তাই স্পষ্ট। প্রথমে মানতে হয় যে একজন ব্যক্তি আল্লাহর মনোনীত রাসুল, তারপর তাঁর খবরকে গায়েব জানার পথ হিসেবে গ্রহণ করতে হয়। তিনি আল্লাহর মনোনীত রাসুল—এই দাবিটিও যদি শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের আনা বাণীর ওপর দাঁড়ায়, তাহলে বাণী ও নবুয়ত পরস্পরকে সত্য ধরে নিচ্ছে। এর মধ্যে কোনো স্বাধীন যাচাই যোগ হচ্ছে না। [6]

عَالِمُ الْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَىٰ غَيْبِهِ أَحَدًا ۝ إِلَّا مَنِ ارْتَضَىٰ مِنْ رَسُولٍ فَإِنَّهُ يَسْلُكُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ رَصَدًا

বাংলা অনুবাদ: তিনি গায়েবের জ্ঞানী। তিনি তাঁর গায়েব কাউকে জানান না, কোনো মনোনীত রাসুল ছাড়া। তখন তিনি তার সামনে ও পেছনে প্রহরী নিযুক্ত করেন।

কোনো কিছু চোখে দেখা যায় না বলেই তার অস্তিত্ব অস্বীকার করতে হয় না। রোগের জীবাণু খালি চোখে দেখা না গেলেও নমুনা, অণুবীক্ষণযন্ত্র ও পরীক্ষার ফল দিয়ে তার উপস্থিতি যাচাই করা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানও প্রমাণ হতে পারে, বিশেষ করে যখন স্বতন্ত্র সাক্ষ্য বা ঘটনার চিহ্ন তার সঙ্গে মেলে। গায়েবি দাবিতে দুর্বলতাটি অদৃশ্য হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দুর্বলতা হলো, কোনো নির্দিষ্ট অতিপ্রাকৃত ব্যাখ্যাকে সত্য বলে গ্রহণ করতে বলা হচ্ছে এমন এক সংবাদপথের ওপর দাঁড়িয়ে, যার নির্ভরযোগ্যতাই প্রমাণের অপেক্ষায়।


কবরের জিজ্ঞাসাবাদ ও সাক্ষ্যের সীমা

কবরের জিজ্ঞাসাবাদের দাবিটি কেবল পরকালের একটি অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি নয়। আনাসের বর্ণনায় মুহাম্মদ বলেছেন, দাফনের পর লোকেরা চলে গেলে মৃত ব্যক্তি তাদের জুতার শব্দ শুনতে পান। দুই ফেরেশতা এসে তাঁকে বসিয়ে মুহাম্মদ সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। যে তাঁর নবুয়ত স্বীকার করে, তাকে জান্নাতের আসন দেখানো হয়। অবিশ্বাসী বা মুনাফিক জবাব দেয়, সে জানে না, লোকের মুখে যা শুনেছে তাই বলত। তাকে লোহার হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা হয়। শেষ বাক্যটি দাবিটির প্রমাণের ধরন বুঝতে জরুরি। আঘাতের পর আর্তনাদ হলেও মানুষ ও জিনকে শ্রোতাদের বাইরে রাখা হয়েছে। [7]

ثُمَّ يُضْرَبُ بِمِطْرَقَةٍ مِنْ حَدِيدٍ ضَرْبَةً بَيْنَ أُذُنَيْهِ، فَيَصِيحُ صَيْحَةً يَسْمَعُهَا مَنْ يَلِيهِ إِلاَّ الثَّقَلَيْنِ

বাংলা অনুবাদ: এরপর তার দুই কানের মাঝখানে লোহার হাতুড়ি দিয়ে এক আঘাত করা হবে। তখন সে এমন চিৎকার করবে, যা মানুষ ও জিন ছাড়া তার আশপাশের সবাই শুনবে।

বর্ণনাটি কার বক্তব্য, কার মাধ্যমে তা প্রচারিত হয়েছে এবং মুসলমানরা কখন থেকে তা বিশ্বাস করেছেন—এসব ঐতিহাসিক প্রশ্ন। কবরের ভেতরে ঘটনাটি সত্যিই ঘটেছে কি না, সেটি আরেকটি প্রশ্ন। প্রথম প্রশ্নের উত্তর যত নির্ভুলই হোক, দ্বিতীয় প্রশ্নের প্রমাণ হিসেবে তাকে ব্যবহার করতে হলে সংবাদদাতা ঘটনাটি কীভাবে জানলেন, তা প্রতিষ্ঠা করতে হয়। কবরের কাছে দাঁড়িয়ে কেউ আর্তনাদ শুনতে না পেলে হাদিসের ভাষাতেই তার একটি ব্যাখ্যা আছে। ফলে নীরবতাকে এখানে দাবির বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা যায় না। একই কারণে নীরবতা দাবির পক্ষেও কোনো সাক্ষ্য দেয় না। শেষ পর্যন্ত যে ধর্মীয় কর্তৃত্বের ভিত্তিতে খবরটি গ্রহণ করা হয়, সেই কর্তৃত্বের সত্যতাই বিচারাধীন।


হাদিসে “স্বচ্ছ ঈমান” ও সংশয় থামানোর নির্দেশ

আবু হুরায়রার বর্ণনায় কয়েকজন সাহাবি মুহাম্মদের কাছে এসে জানান, তাঁদের মনে এমন চিন্তা আসে যা মুখে উচ্চারণ করতেও তাঁরা ভয় পান। মুহাম্মদ তাঁদের প্রতিক্রিয়াকে “স্বচ্ছ ঈমান” বলেন। নববী এর ব্যাখ্যায় বলেন, সেই কথা উচ্চারণ করাকে গুরুতর মনে করা এবং তা বিশ্বাস করে ফেলার ভয়ই এখানে ঈমানের লক্ষণ। হাদিসটির বিষয় অনাহূত চিন্তার প্রতি সাহাবিদের প্রতিক্রিয়া। কোনো ধর্মীয় দাবির সত্যতা যুক্তি দিয়ে যাচাই করার নিয়ম এটি নির্ধারণ করে না। [8] [9] [10]

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ جَاءَ نَاسٌ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَسَأَلُوهُ إِنَّا نَجِدُ فِي أَنْفُسِنَا مَا يَتَعَاظَمُ أَحَدُنَا أَنْ يَتَكَلَّمَ بِهِ. قَالَ «وَقَدْ وَجَدْتُمُوهُ؟» قَالُوا نَعَمْ. قَالَ «ذَاكَ صَرِيحُ الإِيمَانِ».

বাংলা অনুবাদ: আবু হুরায়রা বলেন, নবীর কয়েকজন সাহাবি এসে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমাদের মনে এমন কথা আসে, যা মুখে উচ্চারণ করতেও আমাদের কেউ গুরুতর মনে করে। তিনি বললেন, তোমরা সত্যিই তা অনুভব করেছ? তাঁরা বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, এটাই স্বচ্ছ ঈমান।

“তোমার রবকে কে সৃষ্টি করেছে?” প্রশ্নটির ব্যাপারে মুহাম্মদের নির্দেশ আরও সরাসরি। সহিহ বুখারিতে প্রশ্নটির উৎস হিসেবে শয়তানকে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রশ্নটি মনে এলে আল্লাহর আশ্রয় চাইতে এবং সেখানেই থেমে যেতে বলা হয়েছে। আল্লাহকে কেন সৃষ্ট বলে ধরা হবে না, তার কোনো যুক্তি এই উত্তরে হাজির করা হয়নি। বরং অনুসন্ধানটি যেখানে বিশ্বাসের ভিত্তিকে স্পর্শ করে, সেখানেই তা বন্ধ করার নির্দেশ এসেছে। [11]

يَأْتِي الشَّيْطَانُ أَحَدَكُمْ فَيَقُولُ مَنْ خَلَقَ كَذَا مَنْ خَلَقَ كَذَا حَتَّى يَقُولَ مَنْ خَلَقَ رَبَّكَ فَإِذَا بَلَغَهُ فَلْيَسْتَعِذْ بِاللَّهِ، وَلْيَنْتَهِ

বাংলা অনুবাদ: শয়তান তোমাদের কারও কাছে এসে বলে, অমুক জিনিস কে সৃষ্টি করেছে, অমুক জিনিস কে সৃষ্টি করেছে? শেষ পর্যন্ত বলে, তোমার রবকে কে সৃষ্টি করেছে? সে এ পর্যন্ত পৌঁছালে আল্লাহর আশ্রয় চাইবে এবং থেমে যাবে।

সহিহ মুসলিমে আবু হুরায়রার আরেক বর্ণনায় একই প্রশ্নের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ঈমানের ঘোষণা দিতে বলা হয়েছে। বুখারির বর্ণনায় অনুসন্ধান থামানো এবং মুসলিমের এই বর্ণনায় পূর্ববিশ্বাস পুনরুচ্চারণ করা—দুটি প্রতিক্রিয়ার কোনোটিই প্রশ্নটির যুক্তিগত উত্তর দেয় না। সৃষ্টির জন্য কারণ দরকার বলে যুক্তি দিলে আল্লাহকে কেন সেই নিয়মের আওতায় ফেলা হচ্ছে না, তার জন্য একটি পৃথক যুক্তি দরকার। ঈমানের ঘোষণা সেই যুক্তির কাজ করতে পারে না। [12]

لاَ يَزَالُ النَّاسُ يَتَسَاءَلُونَ حَتَّى يُقَالَ هَذَا خَلَقَ اللَّهُ الْخَلْقَ فَمَنْ خَلَقَ اللَّهَ فَمَنْ وَجَدَ مِنْ ذَلِكَ شَيْئًا فَلْيَقُلْ آمَنْتُ بِاللَّهِ

বাংলা অনুবাদ: মানুষ প্রশ্ন করতেই থাকবে, শেষ পর্যন্ত বলা হবে, আল্লাহ সৃষ্টিজগৎ সৃষ্টি করেছেন, তাহলে আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছে? কারও মনে এমন প্রশ্ন এলে সে যেন বলে, আমি আল্লাহতে ঈমান এনেছি।


কোরআনে সংশয়হীনতা ও নবীর রায়ের কাছে আত্মসমর্পণ

সুরা হুজুরাতের ১৫ নম্বর আয়াতে সত্যনিষ্ঠ মুমিনের পরিচয়ে তিনটি বিষয় একত্রে এসেছে। আল্লাহ ও রাসুলে বিশ্বাস, তারপর সংশয় না করা, এবং আল্লাহর পথে সম্পদ ও জীবন দিয়ে সংগ্রাম। “তারপর সংশয় করেনি” কথাটি দেখায় যে বিশ্বাস গ্রহণের পর তার স্থায়িত্বকেও ধর্মীয় গুণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কোনো দাবিকে সত্য বলে ধরে রাখার ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা সেই দাবির পক্ষে নতুন প্রমাণ জোগায় না। [13]

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا وَجَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أُولَٰئِكَ هُمُ الصَّادِقُونَ

বাংলা অনুবাদ: মুমিন তো তারাই, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলে বিশ্বাস করেছে, তারপর সংশয় করেনি এবং নিজেদের সম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে সংগ্রাম করেছে। তারাই সত্যনিষ্ঠ।

সুরা নিসা ৪:৬৫-তে বিরোধের মীমাংসায় মুহাম্মদকে বিচারক করা, তাঁর রায় নিয়ে মনে কোনো সংকোচ না রাখা এবং সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করা ঈমানের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। রায় মেনে চলা এবং রায়কে ন্যায়সংগত মনে করা দুটি আলাদা ব্যাপার। কেউ আদালতের রায় পালন করেও তার যুক্তি বা ন্যায্যতা নিয়ে আপত্তি রাখতে পারে। আয়াতটি বাহ্যিক আনুগত্যের পাশাপাশি সেই অন্তর্গত আপত্তির জায়গাটিও বন্ধ করে। [14]

فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

বাংলা অনুবাদ: তোমার রবের শপথ, তারা মুমিন হবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে যে বিরোধ বাধে, তাতে তারা তোমাকে বিচারক করে। তারপর তোমার দেওয়া রায় নিয়ে নিজেদের মনে কোনো সংকোচ পায় না এবং পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করে।

সুরা আহজাবে একই কর্তৃত্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। আল্লাহ ও রাসুল কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিলে মুমিন নারী বা পুরুষের নিজের ব্যাপারে আর পছন্দের অধিকার থাকে না। ফলে একটি বিধান ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ থেকে এসেছে বলে মেনে নেওয়ার পর, তার ন্যায্যতা বিচার করে সেটি প্রত্যাখ্যান করার স্বাধীনতা এই আয়াত স্বীকার করে না। [15]

وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُبِينًا

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিলে কোনো মুমিন পুরুষ বা নারীর সেই বিষয়ে নিজের পছন্দের অধিকার থাকে না। যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অবাধ্য হয়, সে স্পষ্টভাবে পথভ্রষ্ট হয়।

বিরোধের সময় একটি রায় কার্যকর করার জন্য পক্ষগুলোর আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। রায়টির ন্যায্যতা সম্পর্কে তাঁদের মনে কী ধারণা জন্মাবে, তা একইভাবে আদেশ দিয়ে স্থির করা যায় না। কেউ আপত্তি প্রকাশ বন্ধ করতে পারেন, কিন্তু যে সাক্ষ্য বা যুক্তির কারণে তাঁর আপত্তি তৈরি হয়েছে, তা আদেশের ফলে বদলায় না। সুরা নিসার শর্তটি এখানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ আচরণে আনুগত্য দেখানোর পরেও মনে রায়টি নিয়ে সংকোচ রাখতে পারে, অথচ আয়াতের ভাষায় সেই সংকোচের অবসানও ঈমানের সঙ্গে যুক্ত। রায়ের ভুল শনাক্ত করার জন্য যে স্বাধীন বিচারবুদ্ধি দরকার, মনের আপত্তিকে আনুগত্যের ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে সেই বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করাই কঠিন হয়ে পড়ে।


দলিল বদলালে ঈমান বদলাবে কি?

শরহে মুসলিমের একটি বাংলা ব্যাখ্যাসহ সংস্করণে “ঈমানের ভিত্তি দলীলের উপর নহে” শিরোনামে আলোচনাটি এসেছে। অংশটির শুরুতেই রুহুল মাআনীর গ্রন্থকারের সূত্রে কয়েকজন আলেমের মত আনা হয়েছে। সেখানে মুতাজিলা ও কয়েকজন ধর্মতাত্ত্বিকের দলিলনির্ভর ঈমানের দাবির বিরোধিতা করা হয়েছে। যুক্তি হলো, মুহাম্মদের যুগে বহু মানুষ ইসলাম গ্রহণ করলেও তাঁদের জগতের ধ্বংসশীলতা নিয়ে আনুষ্ঠানিক যুক্তির ধাপ শেখানো হয়নি। সাধারণ মানুষের ঈমানের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি বাংলা ব্যাখ্যাটি আরও এক ধাপ এগিয়েছে। দলিলের ফল বিপরীত দিকে গেলে ঈমানও বদলাতে পারে, আর সেই সম্ভাবনাকেই ঈমানের দুর্বলতা হিসেবে ধরা হয়েছে। [16]

ঈমানের ভিত্তি দলীলের উপর নহে
রুহুল মাআনী গ্রন্থকার কতক মুহাক্কেকগণের অভিমত বর্ণনা করিয়াছেন যে, ঈমান বস্তুতঃ ঐ পূর্ব নির্ধারিত সত্যকে দৃঢ় বিশ্বাস করিবার নাম যাহা সৌভাগ্যবানদের অন্তরে এমনভাবে প্রবেশ করিয়া থাকে যাহাকে সে যদি নিজেও বাহির করিয়া দেওয়ার চেষ্টা করে তবেও বাহির করিতে পারে না।
কোন কোন বাতিল ফিরকা যেমন-মুতাযিলা ও কতক মুতাকাল্লেমীন বলেন যে, দলীল প্রমাণের আলোকে তাওহীদ, রেসালতে ঈমান লাভ করা ওয়াজিব। কারণ সন্দেহ সংশয়মুক্ত ঈমান দলীল প্রমাণের জ্ঞান ব্যতীত লাভকরা যায় না। তাহাদের এই অভিমতের উপর আশ্চর্য হইতে হয়। কেননা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুবারক যুগে কাফিরদের বিরাট বিরাট জামাআত ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন। তাহাদিগকে কি ইসলামের ফরয ও ওয়াজিবসমূহের অন্তর্দৃষ্টি ও দলীল প্রমাণ শিক্ষা করিবার দাওয়াত দেওয়া হইয়াছিল? তাহাদিগকে নামায ও যাকাত ইত্যাদির আহকাম শিক্ষা দেওয়া হইয়াছে বটে কিন্তু তাহাদিগকে কি কখনও বিশ্বজগত ধ্বংসশীল হওয়ার দলীলের সাধ্য আশ্রয় বাক্য ও পক্ষ আশ্রয় বাক্য সাজাইয়া সিদ্ধান্ত নির্ণয়ের শর্তসমূহ শিক্ষা দেওয়া হইয়াছে? তবে ইহাতে সন্দেহ নাই যে, মুতাকাল্লেমগণের দলীল প্রমাণাদিও ঈমান দৃঢ় হইবার একটি কারণ হিসাবে গণ্য হইতে পারে। কিন্তু ঈমান শুধু দলীল প্রমাণের উপর নির্ভরশীল হওয়া কোন ক্রমেই সহীহ হইতে পারে না। যদি তাহাই হইত তবে সাধারণ লোকদের ঈমান সহীহ বলিয়া বিবেচিত হইত না। কেননা তাহাদের ঈমান মুতাকাল্লেমীনের প্রমাণাদির ভিত্তিতে লাত হয় নাই। পক্ষান্তরে এমন অনেক উদাহরণ বিদ্যমান রহিয়াছে যে, যাহাদের সামনে ইসলাম হক ও সত্য হইবার দলীল ও প্রমাণাদি দিবালোকের ন্যায় উজ্জল ছিল অথচ তাহারা ঈমানী দৌলত হইতে বঞ্চিত ছিল। বস্তুতঃ ঈমান ও ইয়াকীন অর্জন দলীলের উপর নির্ভরশীল নহে। কারণ ঈমান এমন একটি নূর, যাহাকে পরম করুণাময় আল্লাহ তা’আলা যথার্থতা ও সম্পূর্ণভাবে স্বীয় ফযল ও রহমতে বান্দার অন্তরে ঢালিয়া দেন। বাহ্যতঃ কারণ যাহা কিছুই হইতে পারে।
বলাবাহুল্য ঈমান যদি দলীল প্রমাণের উপর নির্ভরশীল বলা হয় তাহা হইলে উহার মধ্যে একটি সম্ভাবনা বর্তমান থাকিবে যে, দলীল বিপরীত দিকে ধাবিত হইলে ঈমানও বিপরীত দিকে প্রত্যাবর্তন করিবে। ঈমানের বিপরীত কুফর ছাড়া আর কি? অধিকন্তু দলীল সন্দেহ সংশয় সৃষ্টির স্থান। অতএব, দলীল প্রমাণের উপর নির্ভরশীল ঈমান সূদৃঢ় হয় না বরং উহার দ্বারা দুর্বল ঈমানই অর্জিত হয়। আল্লাহ তা’আলাই জানেন অল্প জ্ঞানের অধিকারী মানুষের দলীলের মোড় কখন কোন দিকে ধাবিত হয়।
ইয়াকীন তথা বিশ্বাসের ঐ উচ্চ অবস্থা যাহা একজন মূর্খ বৃদ্ধ ব্যক্তির অর্জিত হয়, অনেক ক্ষেত্রে বড় বড় আলেম, ফাযিল এবং জ্ঞানে বিজ্ঞানে পারদর্শী ব্যক্তিও উক্ত অবস্থার সহিত অপরিচিত ও নিঃসম্পর্ক থাকে।

ইমান 3

আনুষ্ঠানিক যুক্তিবিদ্যা না পড়েও মানুষ ভালো সাক্ষ্য ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের ওপর ভরসা করতে পারে। ফলে প্রথম যুগের মুসলমানদের যুক্তিশাস্ত্র শেখানো হয়নি বলে প্রমাণনির্ভর বিশ্বাসের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় না। আরও মৌলিক সমস্যা হলো, বিপরীত দলিল এলে মত বদলানোকে দুর্বলতা বলা। একটি ওষুধ কাজ করে বলে বিশ্বাসের বিপক্ষে ভালো পরীক্ষা পাওয়া গেলে সেই বিশ্বাস সংশোধন করাই বুদ্ধিবৃত্তিক সততা। ধর্মীয় দাবির জন্য উল্টো নিয়ম চালু করলে অনুসন্ধানের ফল কী হবে তা আগেই স্থির হয়ে যায়। তখন দলিল দিয়ে বিশ্বাসকে জোরদার করা চলে, কিন্তু দলিল দিয়েই বিশ্বাস ভুল প্রমাণ করার পথ বন্ধ থাকে।


প্রমাণ চাওয়ার অধিকার কার?

কোরআনে প্রমাণ চাওয়ার ভাষা আছে। সুরা বাকারায় ইহুদি বা খ্রিষ্টান ছাড়া কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না—এই দাবির জবাবে দলিল হাজির করতে বলা হয়েছে। এখানে দাবিদারের ওপর প্রমাণের দায় চাপানো হয়েছে, যা যৌক্তিক। একই মাপকাঠি ইসলামের নিজস্ব পরকালসংক্রান্ত দাবিতেও প্রযোজ্য। অন্য ধর্মের জান্নাতের দাবি তার অনুসারীদের প্রত্যয় দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় না। মুসলমানের প্রত্যয়ও ইসলামি পরকালের দাবিকে একইভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। [17]

وَقَالُوا لَنْ يَدْخُلَ الْجَنَّةَ إِلَّا مَنْ كَانَ هُودًا أَوْ نَصَارَىٰ تِلْكَ أَمَانِيُّهُمْ قُلْ هَاتُوا بُرْهَانَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ

বাংলা অনুবাদ: তারা বলে, ইহুদি বা খ্রিষ্টান ছাড়া কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এগুলো তাদের মনোবাসনা। বলো, তোমরা সত্যবাদী হলে তোমাদের প্রমাণ হাজির করো।

একই সুরায় ইব্রাহিমের কাহিনিতে দেখার মাধ্যমে নিশ্চয়তা পাওয়ার মূল্যও স্বীকৃত। ইব্রাহিম জানতে চান, আল্লাহ কীভাবে মৃতকে জীবিত করেন। তিনি নিজের বিশ্বাসের কথা স্বীকার করেও বলেন, তাঁর অন্তর নিশ্চিন্ত করার জন্য তিনি তা দেখতে চান। কাহিনিতে তাঁর অনুরোধের জবাব একটি প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়ে দেওয়া হয়। ফলে ঈমানের সঙ্গে যেকোনো প্রমাণ চাওয়া সাংঘর্ষিক—এমন দাবি কোরআনের এই বিবরণের সঙ্গে মেলে না। পাঠক আয়াতে একটি প্রদর্শনের বর্ণনা পান। বর্ণনাটি নিজে পাঠকের সামনে সেই ঘটনার প্রদর্শন ঘটায় না। [18]

وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ أَرِنِي كَيْفَ تُحْيِي الْمَوْتَىٰ قَالَ أَوَلَمْ تُؤْمِنْ قَالَ بَلَىٰ وَلَٰكِنْ لِيَطْمَئِنَّ قَلْبِي قَالَ فَخُذْ أَرْبَعَةً مِنَ الطَّيْرِ فَصُرْهُنَّ إِلَيْكَ ثُمَّ اجْعَلْ عَلَىٰ كُلِّ جَبَلٍ مِنْهُنَّ جُزْءًا ثُمَّ ادْعُهُنَّ يَأْتِينَكَ سَعْيًا وَاعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ

বাংলা অনুবাদ: ইব্রাহিম যখন বললেন, হে আমার রব, তুমি কীভাবে মৃতদের জীবিত করো, আমাকে দেখাও। তিনি বললেন, তুমি কি বিশ্বাস করোনি? ইব্রাহিম বললেন, অবশ্যই করেছি, তবে চাই আমার অন্তর নিশ্চিন্ত হোক। তিনি বললেন, চারটি পাখি নাও এবং সেগুলোকে নিজের কাছে আনো। তারপর প্রতিটি পাহাড়ে সেগুলোর একেকটি অংশ রাখো। এরপর তাদের ডাকো, তারা দ্রুত তোমার কাছে আসবে। জেনে রাখো, আল্লাহ পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাবান।


পূর্বপুরুষের বিশ্বাস ও একই প্রমাণের মানদণ্ড

সুরা বাকারায় পূর্বপুরুষের পথ অনুসরণকে সত্যের ভিত্তি হিসেবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। মানুষকে আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তা অনুসরণ করতে বলা হলে তারা পিতৃপুরুষের পথের কথা বলে। আয়াতটি তাদের জবাবের দুর্বল জায়গাতেই আঘাত করে। পূর্বপুরুষেরা কোনো বিষয় বোঝেননি বা সঠিক পথ পাননি, এমন সম্ভাবনা থাকলে তাঁদের অনুসরণ করে সত্যে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা কোথায়? উত্তরাধিকার বিশ্বাসের উৎস ব্যাখ্যা করে। একই বিশ্বাসের সত্যতা প্রমাণ করতে হলে আলাদা কারণ দেখাতে হয়। [19]

وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنْزَلَ اللَّهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا أَلْفَيْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا أَوَلَوْ كَانَ آبَاؤُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ شَيْئًا وَلَا يَهْتَدُونَ

বাংলা অনুবাদ: যখন তাদের বলা হয়, আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তা অনুসরণ করো, তারা বলে, আমরা বরং সেই পথ অনুসরণ করব, যে পথে আমাদের পিতৃপুরুষদের পেয়েছি। তাদের পিতৃপুরুষেরা কিছুই না বুঝলেও এবং সঠিক পথ না পেলেও কি?

একই যুক্তি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ইসলামি বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। একটি পরিবার যদি শিশুকে শেখায় যে কোরআন আল্লাহর বাণী, আর অন্য পরিবার তাকে শেখায় যে আরেকটি ধর্মগ্রন্থই ঈশ্বরের চূড়ান্ত বাণী, উভয় শিক্ষার আন্তরিকতা দিয়েই পরস্পরবিরোধী দাবি সত্য হয়ে যায় না। সুরা ইসরায় যে বিষয়ে জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। এই নীতিকে নিজের বিশ্বাসেও প্রয়োগ করলে পরিবারের দেওয়া উত্তরটিকে একটি দাবি হিসেবে পরীক্ষা করতে হয়। পরীক্ষার আগেই ধরে নিলে যে নিজের বেলায় পরিবারের বিশ্বাস সত্য এবং অন্যের বেলায় তা অন্ধ অনুকরণ, পার্থক্যটি তৈরি হচ্ছে পরিচয় দিয়ে। দুই দাবির প্রমাণ দিয়ে সেই পার্থক্য দেখানো হয়নি। [20]

وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَٰئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا

বাংলা অনুবাদ: যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই শ্রবণ, দৃষ্টি ও অন্তর, এগুলোর প্রত্যেকটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।

এখানে একই পরীক্ষা প্রয়োগ করার অর্থ সব ধর্মীয় দাবির পক্ষে সমান প্রমাণ আছে ধরে নেওয়া নয়। দাবি দুটির প্রমাণ যাচাই করলেই বোঝা যাবে একটির ভিত্তি আরেকটির চেয়ে শক্ত কি না। জন্মের পরিচয় দিয়ে সত্য নির্ধারণের সমস্যা এবং এই মানদণ্ড ধর্মীয় কর্তৃত্বকে যাচাই করতে গিয়ে কোথায় আটকে যায়, তার বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে সংশয়ের ইসলাম কি যাচাই করার সুযোগ দেয় প্রবন্ধে।


সংশয় বেড়ে গেলে প্রমাণের বিচার কীভাবে বদলায়

কেউ ছোটবেলা থেকে বিশ্বাস করে এসেছেন যে সংশয় তাঁর ঈমানের দুর্বলতা। নতুন তথ্য যখন তাঁর পরিচিত বিশ্বাসের বিপক্ষে যায়, তখন তাঁকে শুধু তথ্যটির নির্ভরযোগ্যতা বিচার করতে হয় না। তথ্যটি সত্য হলে নিজের ধর্মীয় পরিচয় ও নৈতিক আত্মধারণায় কী বদল আসবে, সেই চাপও তাঁকে সামলাতে হয়। মনোবিজ্ঞানী জিভা কুন্ডার গবেষণা-পর্যালোচনায় নির্ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর উদ্দেশ্য ও কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আকাঙ্ক্ষার প্রভাব আলাদা করা হয়েছে। পছন্দের সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাইলে মানুষ এমন তথ্য, স্মৃতি ও ব্যাখ্যা বেছে নিতে পারে, যেগুলো ওই সিদ্ধান্তকে যুক্তিসঙ্গত বলে দেখাতে সাহায্য করে। যুক্তি হাজির করার ক্ষমতা এবং সেই যুক্তির মাধ্যমে সত্যে পৌঁছানোর চেষ্টা তাই আলাদা করে বিচার করতে হয়। [21]

চার্লস লর্ড, লি রস ও মার্ক লেপারের একটি পরীক্ষায় মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে ও বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া অংশগ্রহণকারীদের একই গবেষণাসামগ্রী দেওয়া হয়েছিল। দুপক্ষই যে ফলটি নিজেদের আগের মতের সঙ্গে মিলেছে, সেটিকে তুলনায় বেশি বিশ্বাসযোগ্য বলে বিচার করেছে। পরীক্ষাটির বিষয় ছিল মৃত্যুদণ্ড অপরাধ ঠেকায় কি না। ঈমানের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক মিলটি হলো, আগের সিদ্ধান্ত অক্ষুণ্ণ রাখতে চাইলে মানুষ অনুকূল প্রমাণকে সহজে গ্রহণ করতে পারে এবং একই ধরনের প্রতিকূল প্রমাণের বেলায় কঠিন মানদণ্ড আরোপ করতে পারে। ধর্মীয় পরিবেশে প্রকাশ্যে মত বদলানোর সঙ্গে পরিচয় হারানোর ভয় যুক্ত হলে এই অসম মানদণ্ড বজায় রাখার বাড়তি কারণ তৈরি হয়। [22]

একটি বিশ্বাস প্রমাণের কাছে কতটা উন্মুক্ত, তা বোঝার জন্য জিজ্ঞাসা করা যায়, ঠিক কী তথ্য পেলে বিশ্বাসী তাঁর আস্থা কমাবেন? প্রশ্নটি ধর্মত্যাগের দাবি করে না। একটি নির্দিষ্ট বিশ্বাস সম্পর্কে একই প্রমাণ উভয় দিকে কাজ করতে পারে কি না, সেটুকু জানতে চায়। ধর্মগ্রন্থের কোনো ঐতিহাসিক দাবি পাণ্ডুলিপির সঙ্গে মিললে সেটিকে ধর্মগ্রন্থের পক্ষে দলিল হিসেবে দেখানো হয়। তখন একই পদ্ধতিতে বিপরীত ফল এলে সেটিরও কিছু ওজন থাকতে হবে। অনুকূল ফল এলে প্রমাণ আর প্রতিকূল ফল এলে পরীক্ষা—এই দুই মানদণ্ড একসঙ্গে চালু থাকলে প্রমাণের সাহায্যে বিশ্বাসের সত্যতা নির্ধারণ করা যায় না।


ঈমান আর বিশ্বাসের পার্থক্য নিয়ে যাকারিয়া

আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়ার বক্তব্যের বিষয় সাধারণ বিশ্বাসের সঙ্গে ঈমানের পার্থক্য। দৈনন্দিন ভাষায় বিশ্বাস বলতে সম্ভাব্য, সাময়িক বা ভুল প্রমাণিত হতে পারে এমন ধারণাও বোঝায়। ধর্মীয় অর্থে ঈমানের বিষয়গুলো নির্দিষ্ট, এবং সেগুলো মেনে নেওয়ার সঙ্গে মুমিন পরিচয়ের সম্পর্ক আছে।


ইসলামি জ্ঞানতত্ত্ব নিয়ে আবু ত্বোহা আদনান

আবু ত্বোহা আদনানের বক্তব্যের বিষয় ইসলামি ও পশ্চিমা জ্ঞানতত্ত্বের পার্থক্য। কোনো সংবাদকে জ্ঞান হিসেবে গ্রহণ করার মানদণ্ড নির্ধারণে মূল প্রশ্ন হলো, সংবাদদাতার দাবি ভুল হলে তা কীভাবে ধরা যাবে। এই প্রশ্নের উত্তর কোনো জ্ঞানপদ্ধতির ভৌগোলিক পরিচয় দিয়ে পাওয়া যায় না।


কোরআন-হাদিসের কর্তৃত্ব ও যুক্তির সীমা

এই বক্তব্যের বিষয় ধর্মীয় বিধান মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তির ভূমিকা। একটি বিধানের অর্থ বের করতে যুক্তি ব্যবহার করা যায়, আবার বিধানটির দাবি বা নৈতিক ভিত্তি পরীক্ষা করতেও যুক্তি ব্যবহার করা যায়। প্রথম কাজের অনুমতি থাকলেই দ্বিতীয় কাজের ফল গ্রহণ করার স্বাধীনতা পাওয়া যায় না।


মুমিনকে নাকে দড়ি বাঁধা উটের সঙ্গে তুলনা

মুফতি ইব্রাহিম আনুগত্য বোঝাতে নাকে দড়ি বাঁধা উটের উপমা ব্যবহার করেছেন। উপমাটির তাৎপর্য হলো, যাকে টেনে নেওয়া হচ্ছে, পথ বেছে নেওয়ার ক্ষমতা তার হাতে নেই। একজন মানুষ কোনো বিধানের উদ্দেশ্য বুঝে, তার ফল বিবেচনা করে এবং সংশোধনের সুযোগ রেখে তা মেনে চলতে পারেন। দড়ির উপমায় এই বিচারগুলো করার দরকার পড়ে না। যে টানছে, তার নির্দেশ অনুসরণ করাই আনুগত্যের মাপকাঠি। ফলে বিধানটি কার উপকার করছে বা কার ওপর অন্যায় চাপাচ্ছে, এই প্রশ্নগুলোর জায়গায় এসে দাঁড়ায় একটিই প্রশ্ন—নির্দেশ পালন করা হয়েছে কি না।


কোরআন-হাদিস শোনামাত্র মেনে নেয়া

কোরআন ও হাদিসের নির্দেশ শোনার পর মুমিনের করণীয় নিয়ে আহমদুল্লাহর বক্তব্য। শোনামাত্র মেনে নেওয়ার মধ্যে অন্তত তিনটি বিচার এক হয়ে যায়। কথাটি আসলেই উদ্ধৃত উৎসে আছে কি না, কথাটির অর্থ কী, এবং নির্দেশটি অনুসরণ করার যথেষ্ট কারণ আছে কি না। প্রথম দুটি যাচাইয়ে ভুল ধরতে পারলেও তৃতীয় প্রশ্নটি যদি করার সুযোগ না থাকে, তাহলে উৎস যাচাইয়ের স্বাধীনতা আর বিধানের সমালোচনা করার স্বাধীনতা এক হয়ে যায় না। ধর্মীয় কর্তৃত্বের সীমা বোঝা যায় শেষ প্রশ্নটির উত্তর দেওয়ার অধিকার কার হাতে থাকে তা দেখে।


আকিদার বিপক্ষে প্রমাণ চাওয়াকে কুফরি বলা

আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়ার নিচের বক্তব্যে নিষেধটি আকিদার বিপক্ষে উত্থাপিত দাবির প্রমাণ চাওয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। কোনো বক্তব্যের প্রমাণ চাওয়ার অর্থ সেই বক্তব্য মেনে নেওয়া নয়। প্রমাণ চাইলে দাবিদারকে তার বক্তব্যের পক্ষে কারণ দেখাতে হয়, আর শ্রোতার পক্ষে নির্ধারণ করা সম্ভব হয় কারণটি টেকে কি না। আল্লাহর অস্তিত্ব, কোরআনের ঐশী উৎস কিংবা মুহাম্মদের নবুয়তের বিপক্ষে কোনো যুক্তির দলিল চাইতেই যদি বাধা দেওয়া হয়, তাহলে যুক্তিটি দুর্বল হলেও তা দেখানোর পথ রুদ্ধ হয়। একই নিষেধ শক্তিশালী পাল্টা প্রমাণের ক্ষেত্রেও কাজ করে। এই নিয়মে একটি আকিদা সমালোচনার মুখে কতটা টিকল, সেটি জানার সুযোগই থাকে না।

যাকারিয়ার বক্তব্যে প্রমাণ চাওয়াকেই আকিদা অস্বীকারের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যে ব্যক্তি কোনো দাবির বিপরীতে কী প্রমাণ আছে জানতে চায়, সে এখনও বিচার করছে। তাকে আগেই অবিশ্বাসী গণ্য করলে ধর্মীয় পরিচয় বজায় রাখার শর্ত হয়ে দাঁড়ায় অনুসন্ধানের একটি নির্দিষ্ট ফল আগাম মেনে নেওয়া।

কারও কাছে প্রমাণ চাইলে তিনটি ফলই সম্ভব। প্রমাণ যথেষ্ট হলে দাবিটি গ্রহণ করা যায়, দুর্বল হলে প্রত্যাখ্যান করা যায়, আর সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য না থাকলে বিচার স্থগিত রাখা যায়। শেষ অবস্থাটি বিশেষভাবে জরুরি। মানুষ অনেক বিষয়ে সৎভাবে বলতে পারে যে সে এখনও জানে না। এই বাক্যটিকেও যদি ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য বিপজ্জনক করে তোলা হয়, মানুষ প্রকাশ্যে নিশ্চয়তার ভাষা ব্যবহার করতে শিখতে পারে, যদিও ব্যক্তিগতভাবে তার অনিশ্চয়তা কাটেনি। তখন প্রকাশ্য ঐকমত্য দেখে বোঝার উপায় থাকে না, মানুষ একই প্রমাণে সন্তুষ্ট হয়েছে, নাকি সংশয় প্রকাশের মূল্য বেশি হওয়ায় চুপ রয়েছে।


উপসংহার

ঈমানের ছয়টি ভিত্তির কয়েকটি মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বাইরে। সেগুলোর সত্যতা প্রতিষ্ঠা করতে গেলে নবীর খবর কীভাবে নির্ভরযোগ্য বলে জানা গেল, সেই প্রশ্নের স্বাধীন উত্তর দিতে হয়। ধর্মগ্রন্থের ঐশী উৎস প্রমাণে নবীর কর্তৃত্ব এবং নবীর কর্তৃত্ব প্রমাণে সেই ধর্মগ্রন্থ ব্যবহার করলে যুক্তি একই জায়গায় ফিরে আসে। কোনো বিশ্বাস যত পুরোনো, প্রচলিত বা আন্তরিকই হোক, এই বৃত্ত থেকে তাকে বের করতে নতুন প্রমাণ লাগে।

কোরআন অন্যের পরকালসংক্রান্ত দাবির পক্ষে প্রমাণ চেয়েছে। একই সঙ্গে সত্যনিষ্ঠ মুমিনের পরিচয়ে সংশয়হীনতাকে রেখেছে এবং নবীর রায়ের বিরুদ্ধে মনের আপত্তিও ত্যাগ করতে বলেছে। বুখারির হাদিসে স্রষ্টা নিয়ে একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নের অনুসন্ধান বন্ধ করার নির্দেশ আরও স্পষ্ট। এর সঙ্গে দলিল উল্টো দিকে গেলে ঈমান বদলানোকে দুর্বলতা বলার যুক্তিটি মেলালে সমস্যাটি ধরা পড়ে। প্রমাণের কাজ হলো কোনো বিশ্বাসকে সমর্থন করার পাশাপাশি ভুল হলে তা সংশোধনের সুযোগ দেওয়া। সেই দ্বিতীয় কাজটি বন্ধ করে দিলে যে নিশ্চয়তা অবশিষ্ট থাকে, তা দিয়ে দাবির সত্যতা মাপা যায় না।

এই ব্যবস্থার বুদ্ধিবৃত্তিক মূল্য সবচেয়ে স্পষ্ট হয় একজন সৎ সংশয়ীর অবস্থায়। তিনি নিশ্চিত হওয়ার মতো প্রমাণ পাননি, অথচ তাঁর কাছে নিশ্চয়তা প্রত্যাশা করা হচ্ছে। মুখে সেই নিশ্চয়তা ঘোষণা করা তাঁর পক্ষে সম্ভব। কিন্তু ঘোষণাটি যে জ্ঞানের দাবি করছে, তার জন্য এখনও যথেষ্ট কারণ দরকার। সংশয় জানানোর স্বাধীনতা থাকলে বোঝা যায় কোথায় প্রমাণের ঘাটতি আছে, কোথায় যুক্তির ফাঁক আছে, আর কোথায় সত্যিই যথেষ্ট কারণ পাওয়া গেছে। যে সমাজে এই পার্থক্য প্রকাশ করা যায়, সেখানে ভুল স্বীকার করাও জ্ঞান বাড়ার একটি পথ।



তথ্যসূত্রঃ
  1. সহিহ মুসলিম, ঈমান অধ্যায়, ইসলাম, ঈমান, ইহসান ও তাকদিরের ব্যাখ্যা, হাদিস ৮ক ↩︎
  2. কোরআন, সুরা বাকারা ২:৩ ↩︎
  3. তাফসিরে জালালাইন, সুরা বাকারা ২:৩-এর ব্যাখ্যা ↩︎
  4. তাফসিরে জালালাইন, ইসলামিয়া কুতুবখানা, প্রথম খণ্ড, পৃ. ৭৭ ↩︎
  5. তাফসিরে জালালাইন, ইসলামিয়া কুতুবখানা, প্রথম খণ্ড, পৃ. ৭৮–৭৯ ↩︎
  6. কোরআন, সুরা জিন ৭২:২৬–২৭ ↩︎
  7. সহিহ বুখারি, জানাজা অধ্যায়, মৃত ব্যক্তি জুতার শব্দ শোনেন, হাদিস ১৩৩৮ ↩︎
  8. মিশকাতুল মাসাবিহ, ঈমান পর্ব, সন্দেহ-সংশয় ও কুমন্ত্রণা, হাদিস ৬৪ ↩︎
  9. সহিহ মুসলিম ১৩২ক ↩︎
  10. নববীর শরহ থেকে উদ্ধৃত ব্যাখ্যা ↩︎
  11. সহিহ বুখারি, সৃষ্টির সূচনা অধ্যায়, ইবলিস ও তার অনুসারীদের বৈশিষ্ট্য, হাদিস ৩২৭৬ ↩︎
  12. সহিহ মুসলিম, ঈমান অধ্যায়, ঈমানে কুমন্ত্রণা ও তার প্রতিক্রিয়া, হাদিস ১৩৪ক ↩︎
  13. কোরআন, সুরা হুজুরাত ৪৯:১৫ ↩︎
  14. কোরআন, সুরা নিসা ৪:৬৫ ↩︎
  15. কোরআন, সুরা আহজাব ৩৩:৩৬ ↩︎
  16. শরহে মুসলিম, প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যাসহ বঙ্গানুবাদ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ. ৪৮ ↩︎
  17. কোরআন, সুরা বাকারা ২:১১১ ↩︎
  18. কোরআন, সুরা বাকারা ২:২৬০ ↩︎
  19. কোরআন, সুরা বাকারা ২:১৭০ ↩︎
  20. কোরআন, সুরা ইসরা ১৭:৩৬ ↩︎
  21. Ziva Kunda, The Case for Motivated Reasoning, Psychological Bulletin, ১০৮(৩), ১৯৯০, পৃ. ৪৮০–৪৯৮ ↩︎
  22. Charles G. Lord, Lee Ross ও Mark R. Lepper, Biased Assimilation and Attitude Polarization, Journal of Personality and Social Psychology, ৩৭(১১), ১৯৭৯, পৃ. ২০৯৮–২১০৯ ↩︎

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

Leave a comment

Your email will not be published.