Maryam

মারইয়াম: 16

19:16
টেক্সট কপি
19 মারইয়াম Maryam · 98 আয়াত مريم

মূল আরবি

وَٱذْكُرْ فِى ٱلْكِتَـٰبِ مَرْيَمَ إِذِ ٱنتَبَذَتْ مِنْ أَهْلِهَا مَكَانًا شَرْقِيًّا

English Translations

Sahih International

And mention, [O Muḥammad], in the Book [the story of] Mary, when she withdrew from her family to a place toward the east.

Muhsin Khan

And mention in the Book (the Quran, O Muhammad SAW, the story of) Maryam (Mary), when she withdrew in seclusion from her family to a place facing east.

Taqi Usmani

And mention in the Book (the story of) Maryam, when she secluded herself from her people to a place towards East,

Abul Ala Maududi

(O Muhammad), recite in the Book the account of Mary, when she withdrew from her people to a place towards the east;

Pickthall

And make mention of Mary in the Scripture, when she had withdrawn from her people to a chamber looking East,

Yusuf Ali

Relate in the Book (the story of) Mary, when she withdrew from her family to a place in the East.

বাংলা অনুবাদ

তাইসিরুল কুরআন

এ কিতাবে (উল্লেখিত) মারইয়ামের কাহিনী বর্ণনা কর- যখন সে তার পরিবারবর্গ হতে আলাদা হয়ে পূর্ব দিকে এক জায়গায় আশ্রয় নিয়েছিল।

রাওয়াই আল-বায়ান

আর স্মরণ কর এই কিতাবে মারইয়ামকে যখন সে তার পরিবারবর্গ থেকে পৃথক হয়ে পূর্ব দিকের কোন এক স্থানে চলে গেল।

শাইখ মুজিবুর রহমান

বর্ণনা কর এই কিতাবে উল্লেখিত মারইয়ামের কথা, যখন সে তার পরিবারবর্গ হতে পৃথক হয়ে নিরালায় পূর্ব দিকে এক স্থানে আশ্রয় নিল।

ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

আর স্মরণ করুন এ কিতাবে মারইয়ামকে, যখন সে তার পরিবারবর্গ থেকে পৃথক হয়ে নিরালায় পূর্ব দিকে এক স্থানে আশ্রয় নিল,

ফাতহুল মাজীদ

বর্ণনা কর‎ এ কিতাবে মারইয়ামের কথা, যখন সে তার পরিবারবর্গ হতে পৃথক হয়ে নিরালায় পূর্ব দিকে এক স্থানে আশ্রয় নিল,

মুখতাসার

১৬. হে রাসূল! আপনি নিজের উপর নাযিলকৃত কুর‘আনে মারইয়াম (আলাইহাস-সালাম) এর বৃত্তান্ত উল্লেখ করুন। একদা তিনি নিজ পরিবার থেকে দূরে সরে গিয়ে পূর্ব দিকের এক জায়গায় একাকী অবস্থান করলেন।

তাফসীর

তাফসীর ইবনে কাসীর

১৬-২১ নং আয়াতের তাফসীর: পূর্বে হযরত যাকারিয়ার (আঃ) ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছিল এবং এই বর্ণনা দেয়া হয়েছিল যে, হযরত যাকারিয়া (আঃ) পূর্ণ বার্ধক্যে উপনীত হওয়া পর্যন্ত সন্তানহীন ছিলেন। তার স্ত্রীর মধ্যে সন্তান লাভের কোন সম্ভাবনাই ছিল না। এই অবস্থায় আল্লাহ তাআলা নিজের ক্ষমতাবলে তাদেরকে সন্তান দান করেন। হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) জন্মগ্রহণ করেন, যিনি ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও খোদাভীরু। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ তাঁর এর চেয়েও বড় ক্ষমতার নিদর্শন পেশ করছেন। এখানে তিনি হযরত মারইয়ামের (আঃ) ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি ছিলেন চির কুমারী। কোন পুরুষ তাকে কখনো স্পর্শ করে নাই।

এভাবে বিনা পুরুষেই আল্লাহ তাআলা স্বীয় পূর্ণ ক্ষমতাবলে তাঁকে সন্তান দান করেন। তার গর্ভে হযরত ঈসার (আঃ) জন্ম হয়, যিনি আল্লাহর মনোনীত নবী এবং তার রূহ ও কালেমা ছিলেন। এই দু'টি ঘটনায় পূর্ণভাবে পারস্পরিক সম্বন্ধ রয়েছে বলে এখানে এবং সূরায়ে আল ইমরান ও সূরায়ে আম্বিয়াতেও এ দুটি ঘটনাকে মিলিতভাবে বর্ণনা করেছেন, যাতে বান্দা আল্লাহ তাআলার অতুলনীয় ক্ষমতা এবং ব্যাপক প্রতিপত্তি পর্যবেক্ষণ করে।হযরত মারইয়াম (আঃ) হযরত ইমরানের কন্যা ছিলেন। তিনি ছিলেন হযরত দাউদের (আঃ) বংশধর। এই পরিবারটি বানী ইসরাঈলের মধ্যে পবিত্র পরিবার হিসেবে সুনাম অর্জন করেছিলেন।

সুরায়ে আল-ইমরানে তার জন্মের বিস্তারিত বিবরণ গত হয়েছে। ঐ যুগের প্রথা অনুযায়ী হযরত মারইয়ামের (আঃ) মাতা তাঁকে বায়তুল মুকাদ্দাসের মসজিদে কুদৃসের খিদমতের জন্যে পার্থিব কাজ কর্ম হতে আযাদ করে দিয়েছিলেন। মহান আল্লাহ তাঁর এই নর কবুল করেছিলেন। 'উত্তমরূপে তিনিহযরত মারইয়ামকে (আঃ) বড় করে তুলেছিলেন। তিনি আল্লাহর ইবাদত বন্দেগী, দুনিয়ার প্রতি ঔদাসীন্য এবং সংযমী শীলতায় নিমগ্ন হয়ে পড়েন। তার ইবাদত, আধ্যাত্মিক সাধনা ও তাকওয়ার কথা সর্বসাধারণের মুখে আলোচিত হতে থাকে। তাঁর লালন পালনের দায়িত্বভার তাঁর খালু হযরত যাকারিয়া (আঃ) গ্রহণ করেছিলেন।

ঐ সময় তিনি ছিলেন বাণী ইসরাঈলের নবী। সমস্ত বাণী ইসরাঈল তাদের ধর্মীয় কাজে তাঁরই অনুসারী ছিল। হযরত যাকারিয়ার (আঃ) কাছে হযরত মারইয়ামের (আঃ) বহু অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ পেয়ে ছিল। বিশেষ করে যখনই তিনি হযরত মারইয়ামের (আঃ) ইবাদত খানায় প্রবেশ করতেন, তখন তিনি তার কাছে নতুন ধরণের অমওসূমী ফল দেখতে পেতেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করতেনঃ “হে মারইয়াম! এই ফল কোথা হতে আসলো?" উত্তরে তিনি বলতেনঃ “এগুলি আল্লাহ তাআলার নিকট হতে এসেছে। তিনি এমন ক্ষমতাবান যে, যাকে ইচ্ছা করেন বে হিসেবে রিক দান করে থাকেন।অতঃপর আল্লাহ তাআ'লা হযরত মারইয়ামের (আঃ) গর্ভে হযরত ঈসাকে (আঃ) সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেন, যিনি পঁচিজন স্থির প্রতিজ্ঞ নবীদের একজন ছিলেন।

হযরত মারইয়াম (আঃ) মসজিদে কুদসের পূর্ব দিকে গমন করেন। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, হায়েয বা মাসিক ঋতুর কারণেই তিনি ঐ দিকে গিয়েছিলেন। অন্যদের মতে তিনি অন্য কোন কারণে গিয়েছিলেন। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আহলে কিতাবের উপর বায়তুল্লাহ মুখী হওয়া ও হজ্ব করা ফরয করা হয়েছিল। কিন্তু হযরত মারইয়াম (আঃ) বায়তুল মুকাদ্দাস হতে পুর্ব দিকে গমন করেছিলেন বলে তারা পূর্ব মুখী হয়েই নামায পড়তে শুরু করে দেয়। হযরত ঈসার (আঃ) জন্মস্থানকে তারা নিজেরাই কিবলা বানিয়ে নেয়। বর্ণিত আছে যে, হযরত মারইয়াম (আঃ) যে জায়গায় গিয়েছিলেন সেটা ছিল ঐ জনদপ হতে দূরে এক নির্জন স্থান।

কথিত আছে যে, সেখানে তার শস্যক্ষেত্র ছিল এবং তাতে তিনি পানি দিতে গিয়েছিলেন। একথাও বলা হয়েছে যে, সেখানে তিনি একটি কক্ষ বানিয়ে নিয়েছিলেন। সেখানে তিনি জনগণ হতে পৃথক হয়ে নির্জনে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকতেন। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। যখন হযরত মারইয়াম (আঃ) জনগণ হতে পৃথক হয়ে দূরে চলে যান এবং তাদের মধ্যে ও তার মধ্যে আড়াল হয়ে যায় তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর কাছে ফেরেশতা হযরত জিবরাঈলকে (আঃ) প্রেরণ করেন। তিনি পূর্ণ মানবাকৃতিতে তার সামনে প্রকাশিত হন। এখানে ‘রূহ দ্বারা এই মর্যাদা সম্পন্ন ফেরেশতাকেই বুঝানো হয়েছে।

যেমন কুরআন কারীমের (আরবী) এই আয়াতে রয়েছে। হযরত উবাই ইবনু কা'ব (রাঃ) বলেন যে, রোযে আযলে যখন হযরত আদমের (আঃ) সমস্ত সন্তানের রূহসমূহের নিকট হতে তার প্রতিপালক হওয়ার স্বীকারোক্তি নিয়েছিলেন ঐ রূহগুলির মধ্যে হযরত ঈসার (আঃ) রহও ছিল। ঐ রূহকেই মানবাকৃতিতে আল্লাহর পক্ষ থেকে হযরত মারইয়ামের (আঃ) নিকট পাঠানো হয়। ঐ রূহই তার সাথে কথা বলেন এবং তার দেহের মধ্যে প্রবেশ করেন। (কিন্তু এই উক্তিটি অস্বাভাবিক হওয়া ছাড়াও সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার্য। খুব সম্ভব এটা বাণী ইসরাঈলেরই উক্তি হবে)হযরত মারইয়াম (আঃ) ঐ জনশূন্য স্থানে একজন অপরিচিত লোক দেখে মনে করেন যে, হয়তো কোন দুষ্ট প্রকৃতির লোক হবে।

তাকে তিনি আল্লাহর ভয় দেখিয়ে বলেনঃ “আপনি খোদাভীরু লোক হলে তাকে ভয় করুন। আমি তারই কাছে আশ্রয় চাচ্ছি।” তার চেহারার ঔজ্জ্বল্য দেখেই হযরত মারইয়াম (আঃ) বুঝে ফেলেছিলেন যে, তিনি ভাল লোকই হবেন এবং তিনি জানতেন যে, ভাল লোকের জন্যে আল্লাহর ভয়ই যথেষ্ট। ফেরেশতা হযরত মারইয়ামের (আঃ) ভয় ভীতি দূর করে দেয়ার জন্যে পরিষ্কার ভাবে বলেনঃ “আপনি অন্য কোন ধারণা করবেন না, আমি আল্লাহ তাআলার প্রেরিত ফেরেশতা।” বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তাআলার নাম শুনেই হযরত জিবরাঈল (আঃ) কেঁপে উঠেন এবং নিজের প্রকৃতরূপ ধারণ করেন। আর বলে দেনঃ “ আমি আল্লাহর একজন দূত রূপে প্রেরিত হয়েছি।

তিনি আমাকে এজন্যেই প্রেরণ করেছেন যে, তিনি আপনাকে একটি পবিত্র পুত্র সন্তান দান করবেন।”(আরবী) এর দ্বিতীয় পঠন (আরবী) রয়েছে। প্রসিদ্ধ ও সুপরিচিত কারী আবু উমার ইবনু আলার কিরআত এটাই। দুটো কিরআতেরই মতলব পরিষ্কার। হযরত জিবরাঈলের (আঃ) এ কথা শুনে হযরত মারইয়াম (আঃ) আরো বেশী বিস্ময় প্রকাশ করে বলেনঃ “সুবহানাল্লাহ! আমরি সন্তান হওয়া কি করে সম্ব? আমার তো বিয়েই হয় নাই এবং কখনো কোন খারাপ খেয়াল আমার মনে জাগে নাই। আমার দেহ কখনো কোন পুরুষ লোক স্পর্শ করে নাই এবং আমি ব্যভিচারিণীও নই। সুতরাং আমার সন্তান হওয়া কেমন কথা।"(আরবী) শব্দ দ্বারা ব্যভিচারিণীকে বুঝানো হয়েছে।

হাদীসেও এই শব্দটি এই অর্থেই এসেছে। যেমন বলা হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ব্যভিচারিণীর খরচা হারাম।হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর এই বিস্ময় দূর করার জন্যে বলেনঃ “এটা সত্য বটে, তবে স্বামী ছাড়া বা অন্য কোন উপকরণ ও উপাদান ছাড়াও আল্লাহ তাআলা সন্তান দানে সক্ষম। তিনি যা চান তাই হয়। তিনি এই সন্তান ও এই ঘটনাকে মানুষের জন্যে একটা নিদর্শন বানাতে চান। এটা আল্লাহর ক্ষমতার নিদর্শন হবে যে, তিনি সর্ব প্রকারের সষ্টির উপরই সক্ষম। হযরত আদমকে (আঃ) তিনি পুরুষ ও নারীর মাধ্যম ছাড়াই সৃষ্টি করেছেন। হাওয়াকে (আঃ) তিনি সৃষ্টি করেছেন নারী ছাড়াই-শুধু পুরুষের মাধ্যমে।

বাকী সমস্ত মানুষকে তিনি পুরুষ ও নারীর মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন। শুধু হযরত ঈসা (আঃ) এই নিয়মের ব্যতিক্রম। তিনি পুরুষ ছাড়াই শুধু নারীর মাধ্যমে সৃষ্ট হয়েছেন। সুতরাং মানব সৃষ্টির এই চারটি নিয়ম হতে পারে এবং সবটাই মহান আল্লাহ পুরো করে দেখিয়েছেন। এভাবে তিনি নিজের ব্যাপক ও পূর্ণক্ষমতা ও বিরাটত্বের দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। এটা বাস্তব কথা যে, তিনি ছাড়া অন্য কোন মা'বুদ নেই এবং কোন প্রতিপালকও নেই। এই শিশু আল্লাহর রহমতরূপে পরিগণিত হবেন। তিনি তাঁর নবী হবেন। তিনি মানুষকে আল্লাহর ইবাদতের প্রতি আহবান করবেন।" অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “যখন ফেরেশতাগণ বললোঃ হে মারইয়াম (আঃ)!

নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে সুসংবাদ দিচ্ছেন একটি কালেমার যা আল্লাহর পক্ষ হতে হবে; তার নাম হবে মাসীহ্ ঈসা ইবনু মারইয়াম; সম্মানিত হবে ইহলোকে এবং পরলোকে, আর সান্নিধ্য প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। মানুষের সাথে কথা বলবে দোলনার মধ্যে এবং প্রাপ্ত বয়সে এবং সসভ্য লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে। অর্থাৎ তিনি বাল্যাবস্থায় ও বৃদ্ধ বয়সে মানুষকে আল্লাহর দ্বীনের প্রতি আহবান করবেন।হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত মারইয়াম (আঃ) বলেনঃ “ঈসা (আঃ) আমার পেটে থাকা অবস্থায় যখন আমি নির্জনে থাকতাম তখন সে আমার সাথে কথা বলতো। আর যখন আমি লোকদের সাথে থাকতাম তখন সে তাসবীহ ও তাকবীর পাঠ করতো।" (এটা ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ঘোষিত হচ্ছেঃ এটাতো এক স্থিরকৃত ব্যাপার।

খুব সম্ভব যে, এটাও হযরত জিবরাঈলেরই (আঃ) উক্তি। আবার এও হতে পারে যে, আল্লাহ তাআলার এই ফরমান রাসূলুল্লাহর (সঃ) মাধ্যমে ঘোষিত হয়েছে। আর এর দ্বারা রূহ ফুকে দেয়াই উদ্দেশ্য। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “ইমরানের কন্যা মারইয়াম (আঃ), যে তার গুপ্তাঙ্গকে পবিত্র রেখেছিল এবং আমি তার মধ্যে আমার রূহ ফুকে ছিলাম।” সুতরাং এই বাক্যের ভাবার্থ হচ্ছেঃ এটা তো হয়েই যাবে। আল্লাহ তাআলা এর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া

আর স্মরণ করুন এ কিতাবে মারইয়ামকে , যখন সে তার পরিবারবর্গ থেকে পৃথক হয়ে নিরালায় পূর্ব দিকে এক স্থানে আশ্রয় নিল [১] ,

দ্বিতীয় রুকু’

[১] অর্থাৎ পূর্বদিকের কোন নির্জন স্থানে চলে গেলেন। নির্জন স্থানে যাওয়ার কি কারণ ছিল, সে সম্পর্কে সম্ভাবনা ও উক্তি বিভিন্নরূপ বৰ্ণিত আছে। কেউ বলেনঃ গোসল করার জন্য পানি আনতে গিয়েছিলেন। কেউ বলেনঃ অভ্যাস অনুযায়ী ইবাদতে মশগুল হওয়ার জন্যে কক্ষের পূর্বদিকস্থ কোন নির্জন স্থানে গমন করেছিলেন। কেউ কেউ বলেনঃ এ কারণেই নাসারারা পূর্বদিককে তাদের কেবলা করেছে এবং তারা পূর্বদিকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে থাকে। [ইবন কাসীর]

তাফসীর আল-কুরতুবী

[সূরা মারইয়াম (১৯): আয়াত ১৬ থেকে ২৬] পূর্ণ পৃষ্ঠা

আমি বলছি: এটি একটি উত্তম কথা। আমরা সূরা 'সুবহান' (আল-ইসরা: ১)-এ ইয়াহইয়া (আলাইহিস সালাম)-এর হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে সুফিয়ান ইবনে উইয়াইনাহ থেকে এর অর্থ উল্লেখ করেছি। তাবারী হাসান (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ঈসা এবং ইয়াহইয়া (আলাইহিমাস সালাম)—যাঁরা ছিলেন খালাতো ভাই—পরস্পরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। তখন ইয়াহইয়া ঈসাকে বললেন: "আপনি আমার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, কারণ আপনি আমার চেয়ে উত্তম।" ঈসা তাঁকে বললেন: "বরং আপনিই আমার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, কারণ আপনি আমার চেয়ে উত্তম; আল্লাহ আপনার ওপর শান্তি বর্ষণ করেছেন (সালাম দিয়েছেন), আর আমি নিজের ওপর শান্তি বর্ষণ করেছি।" কতিপয় আলিম এই আয়াত থেকে সালামের ক্ষেত্রে ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর শ্রেষ্ঠত্ব গ্রহণ করেছেন এই বলে যে, তাঁর নিজের ওপর সালাম পেশ করা এবং আল্লাহর নিকট তাঁর এমন উচ্চ মর্যাদা যা এর দাবি রাখে—যেটি আল্লাহ সুষ্পষ্ট ওহীতে বর্ণনা ও সাব্যস্ত করেছেন—তা অন্যের পক্ষ থেকে তাঁর ওপর সালাম পেশ করার চেয়ে মর্যাদাগতভাবে অধিক গুরুত্ববহ।

ইবন আতিয়্যাহ বলেন: প্রত্যেকটি মতেরই যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে। ‌‌[সূরা মারইয়াম (১৯): আয়াত ১৬ থেকে ২৬]এবং এই কিতাবে মারইয়ামের কথা স্মরণ করুন, যখন সে তার পরিবারবর্গ থেকে পৃথক হয়ে পূর্বদিকের এক স্থানে আশ্রয় নিল (১৬)। অতঃপর সে তাদের থেকে নিজেকে আড়াল করার জন্য পর্দা গ্রহণ করল; তখন আমি তার কাছে আমার রূহ (জিবরাঈল)-কে পাঠালাম, সে তার সামনে একজন সুঠামদেহী মানুষের বেশে উপস্থিত হলো (১৭)। মারইয়াম বলল, "আমি তোমার থেকে পরম দয়াময় আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি, যদি তুমি আল্লাহভীরু হও" (১৮)। সে বলল, "আমি তো কেবল তোমার রবের প্রেরিত দূত, তোমাকে এক পবিত্র পুত্র দান করার জন্য" (১৯)।

সে বলল, "কেমন করে আমার পুত্র হবে যখন কোনো মানুষ আমাকে স্পর্শ করেনি এবং আমি ব্যভিচারিণীও নই?" (২০)সে বলল, "এভাবেই হবে। তোমার রব বলেছেন, 'এটা আমার জন্য সহজসাধ্য এবং আমি তাকে মানুষের জন্য এক নিদর্শন ও আমার পক্ষ থেকে রহমত স্বরূপ করতে চাই। আর এটা এক স্থিরীকৃত বিষয়'" (২১)। অতঃপর সে তাকে গর্ভে ধারণ করল এবং তাকে নিয়ে এক দূরবর্তী স্থানে চলে গেল (২২)। প্রসব বেদনা তাকে এক খেজুর বৃক্ষের কাণ্ডের নিচে আশ্রয় নিতে বাধ্য করল। সে বলল, "হায়! আমি যদি এর আগেই মারা যেতাম এবং সম্পূর্ণরূপে বিস্মৃত হয়ে যেতাম!" (২৩)। তখন তার পাদদেশ থেকে একজন তাকে ডেকে বলল, "তুমি শোক করো না, তোমার রব তোমার নিচেই একটি পানির ঝরনা সৃষ্টি করেছেন (২৪)।

আর তুমি খেজুর গাছের কাণ্ডটি ধরে নিজের দিকে নাড়া দাও, তা তোমার ওপর তাজা ও পরিপক্ব খেজুর ফেলবে (২৫)।সুতরাং আহার করো, পান করো এবং চক্ষু জুড়াও। আর যদি মানুষের মধ্যে কাউকে দেখ তবে বলো, 'আমি পরম দয়াময় আল্লাহর উদ্দেশ্যে মৌনব্রত মানত করেছি, সুতরাং আজ আমি কোনো মানুষের সাথে কথা বলব না'" (২৬)।(১). দ্রষ্টব্য খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ২২০।

তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর

পূর্ণ পৃষ্ঠা

আল্লাহর বাণী আর যখন আমি পাহাড়কে তাদের উপরে এমনভাবে উত্তোলিত করলাম যেন তা একটি চাঁদোয়া, তখন তোমরা তোমাদের ললাটের ওপর লুটিয়ে পড়লে এবং সেটির দিকে তাকাতে লাগলে। আর তিনি খ্রিস্টানদের উদ্দেশ্যে বললেন: তোমরা পূর্ব দিকে সিজদা করো আল্লাহর এই বাণীর কারণে যখন সে তার পরিবারবর্গ থেকে পৃথক হয়ে নির্জনে পূর্বদিকের এক স্থানে আশ্রয় নিল (সূরা মারইয়াম, আয়াত ১৬)।ইবনে আবি হাতিম আতা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: নিশ্চয়ই এই পাহাড়টি হলো তূর পাহাড়, যা বনী ইসরায়েলের ওপর উত্তোলন করা হয়েছিল।ইবনে জারির, ইবনে মুনজির, ইবনে আবি হাতিম এবং আবুশ শায়খ মুজাহিদ থেকে আল্লাহর এই বাণী আর যখন আমি পাহাড়কে উত্তোলিত করলাম প্রসঙ্গে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: যেভাবে মাখন বের করা হয়, সেভাবে আমরা পাহাড়কে বের করে (তাদের উপরে) এনেছিলাম।ইবনে আবি হাতিম এবং আবুশ শায়খ সাবিত ইবনুল হাজ্জাজ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: তাওরাত তাদের কাছে একযোগে অবতীর্ণ হয়েছিল, ফলে তা পালন করা তাদের কাছে অত্যন্ত কঠিন মনে হলো।

তারা তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করল, যতক্ষণ না আল্লাহ পাহাড়কে তাদের ওপর ছায়ার মতো স্থাপন করলেন; তখন তারা তা গ্রহণ করল।আবদ ইবনে হুমাইদ, ইবনে আবি হাতিম এবং আবুশ শায়খ কাতাদাহ থেকে আর যখন আমি পাহাড়কে উত্তোলিত করলাম প্রসঙ্গে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আল্লাহ পাহাড়টিকে তার মূল থেকে উৎপাটন করলেন, অতঃপর তাদের মাথার ওপর স্থাপন করলেন। তারপর বললেন: হয় তোমরা আমার নির্দেশ গ্রহণ করো, অন্যথায় আমি তোমাদের ওপর এটি নিক্ষেপ করব।যুবাইর ইবনে বাক্কার 'আল-মুওয়াফফাকিয়াত' গ্রন্থে কালবি থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: রোম সম্রাট হেরাক্লিয়াস মুয়াবিয়া (রা.)-এর কাছে চিঠি লিখে কিছু বিষয় জানতে চাইলেন।

যেমন—'বস্তু' কী এবং 'অবস্তু' কী? এমন দীন কোনটি যা ছাড়া আল্লাহ অন্য কিছু গ্রহণ করেন না? নামাজের চাবি কী? জান্নাতের চারাগাছ কী? প্রতিটি জিনিসের প্রার্থনা বা তাসবিহ কী? এমন চার জন কারা যাদের মধ্যে প্রাণ আছে অথচ তারা পুরুষের পৃষ্ঠদেশ বা নারীর জরায়ুতে লালিত হননি? এমন এক ব্যক্তি কে যার কোনো পিতা নেই? এমন এক ব্যক্তি কে যার কোনো গোত্র নেই? এমন এক কবর কোনটি যা তার অধিবাসীসহ বিচরণ করেছিল? রংধনু কী? এমন এক ভূখণ্ড কোনটি যেখানে মাত্র একবার সূর্যরশ্মি পড়েছিল, যার আগে বা পরে কখনও পড়েনি? এমন এক যাত্রী কে যে মাত্র একবারই ভ্রমণ করেছে, যার আগে বা পরে কখনও করেনি?

এমন এক বৃক্ষ কোনটি যা পানি ছাড়াই উৎপন্ন হয়েছে? এমন কোন বস্তু যা শ্বাস নেয় অথচ তার কোনো প্রাণ নেই? আজ, গতকাল, আগামীকাল এবং আগামীকালের পরের দিন—কথাবার্তায় এদের উপযোগিতা কী? বজ্র ও বিদ্যুৎ এবং এর শব্দ কী? আকাশগঙ্গা কী? চাঁদের মাঝে যে কালো দাগ দেখা যায় তা কী? তখন মুয়াবিয়াকে বলা হলো: আপনি এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার উপযুক্ত ব্যক্তি নন; আপনি যদি চিঠিতে কোনো ভুল উত্তর লেখেন, তবে তিনি আপনাকে হেয় করবেন। তাই আপনি ইবনে আব্বাসের কাছে এই বিষয়ে লিখুন।অতঃপর তিনি তাঁর কাছে চিঠি লিখলেন এবং ইবনে আব্বাস জবাব দিলেন: 'বস্তু' হলো পানি; কেননা আল্লাহ বলেছেন, এবং আমি প্রাণবান সবকিছু পানি থেকে সৃষ্টি করেছি

আর 'অবস্তু' হলো এই দুনিয়া, যা একদিন বিলুপ্ত ও ধ্বংস হয়ে যাবে। আর সেই দীন যা ছাড়া আল্লাহ অন্য কিছু গ্রহণ করেন না, তা হলো: 'আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই' (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ)। আর নামাজের চাবি হলো: 'আল্লাহু আকবার' (আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ)। আর জান্নাতের চারাগাছ হলো—'আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো সামর্থ্য ও শক্তি নেই' (লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ)। আর প্রতিটি জিনিসের প্রার্থনা হলো: 'আল্লাহর পবিত্রতা ও প্রশংসা ঘোষণা করছি' (সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি)। আর সেই চার জন যাদের মধ্যে প্রাণ আছে অথচ তারা পুরুষের পৃষ্ঠদেশ বা নারীর জরায়ুতে লালিত হননি—