Maryam

মারইয়াম: 71

19:71
টেক্সট কপি
19 মারইয়াম Maryam · 98 আয়াত مريم

মূল আরবি

وَإِن مِّنكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا ۚ كَانَ عَلَىٰ رَبِّكَ حَتْمًا مَّقْضِيًّا

English Translations

Sahih International

And there is none of you except he will come to it. This is upon your Lord an inevitability decreed.

Muhsin Khan

There is not one of you but will pass over it (Hell); this is with your Lord; a Decree which must be accomplished.

Taqi Usmani

There is none among you who does not have to arrive at it. This is undertaken by your Lord as an absolute decree, bound to be enforced.

Abul Ala Maududi

There is not one of you but shall pass by Hell. This is a decree which your Lord will fulfil.

Pickthall

There is not one of you but shall approach it. That is a fixed ordinance of thy Lord.

Yusuf Ali

Not one of you but will pass over it: this is, with thy Lord, a Decree which must be accomplished.

বাংলা অনুবাদ

তাইসিরুল কুরআন

তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যাকে জাহান্নাম অতিক্রম করতে হবে না, এটা তোমার প্রতিপালকের অনিবার্য ফয়সালা।

রাওয়াই আল-বায়ান

আর তোমাদের প্রত্যেককেই তা অতিক্রম করতে হবে, এটি তোমার রবের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।

শাইখ মুজিবুর রহমান

এবং তোমাদের প্রত্যেকেই ওটা অতিক্রম করবে; ওটা তোমার রবের অনিবার্য সিদ্ধান্ত।

ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

আর তোমাদের প্রত্যেকেই তার (জাহান্নামের) উপর দিয়েই অতিক্রম করবে, এটা আপনার রবের অনিবার্য সিদ্ধান্ত।

ফাতহুল মাজীদ

এবং তোমাদের প্রত্যেকেই তা (পুলসিরাত) অতিক্রম করবে; এটা তোমার প্রতিপালকের অনিবার্য সিদ্ধান্ত‎।

মুখতাসার

৭১. হে মানুষ! তোমাদের প্রত্যেককে অচিরেই জাহান্নামের পিঠের উপর লাগানো পুলের উপর দিয়ে পথ অতিক্রম করতে হবে। এ পথ অতিক্রম করা কিন্তু আল্লাহর চূড়ান্ত ফায়সালাকৃত বিষয়। তাঁর ফায়সালা প্রত্যাখ্যান করার কেউ নেই।

তাফসীর

তাফসীর ইবনে কাসীর

৭১-৭২ নং আয়াতের তাফসীর: আবু সামিয়্যা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “এই আয়াতে যে (আরবী) বা অতিক্রমকরণ সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে এ ব্যাপারে আমাদের মধ্যে মতানৈক্য হয়েছে। কেউ কেউ বলতেন যে, মুমিন তাতে প্রবেশ করবে। আবার অন্য কেউ বলতেন যে, মু'মিন তাতে প্রবেশ করবে বটে, কিন্তু তাদের তাকওয়ার কারণে তারা তার থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে। আমি হযরত জাবিরের (রাঃ) সাথে সাক্ষাৎ করে তাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “অতিক্রম তো সবাই করবে।” অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, তিনি বলেনঃ “ভাল লোক ও মন্দলোক সবাই ওটা অতিক্রম করবে, কিন্তু মু'মিনদের উপর ঐ আগুন ঠাণ্ডা ও শান্তিদায়ক হয়ে যাবে।

যেমন হযরত ইবরাহীমের (আঃ) উপর হয়েছিল। এমন কি স্বয়ং ঐ আগুন ঠাণ্ডার অভিযোগ করবে। তারপর মুত্তাকীদের সেখান থেকে পরিত্রাণ দেয়া হবে।” (এটা ইমাম আহমাদ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসটি গারীব বা দুর্বল।)খালেদ ইবনু মা’দান (রঃ) বলেন যে, জান্নাতীরা জান্নাতে পৌঁছে যাওয়ার পর বলবেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি তো ওয়াদা করেছিলেন যে, প্রত্যেককেই জাহান্নাম অতিক্রম করতে হবে। কিন্তু আমরা তো তা অতিক্রম করলাম না।" উত্তরে তাদেরকে বলা হবেঃ “তোমরা ওটা অতিক্রম করেই এসেছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা ঐ সময় আগুনকে ঠাণ্ডা করে দিয়েছিলেন।হযরত কায়েস ইবনু আবি হাযিম (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, একদা হযরত আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রাঃ) তার স্ত্রীর জানুর উপর মাথ রেখে শুয়েছিলেন এবং ঐ অবস্থায় তিনি কঁদতে শুরু করেন।

তাকে কাঁদতে দেখে তাঁর স্ত্রীও কেঁদে ফেলেন। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) স্ত্রীকে কঁাদার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “আপনাকে কাঁদতে দেখেই আমার কান্না এসে গেছে।” তিনি তখন বলেনঃ “মহামহিমান্বিত আল্লাহর (আরবী) এই উক্তিটি আমার স্মরণ হয়েছে এবং একারণেই আমি কেঁদেছি। কারণ আমি জানি না যে, তার থেকে আমি মুক্তি পাবো কি না। ঐ সময় তিনি রুগ্ন ছিলেন। (এটা আবদুর রাযযাক (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু ইসহাক (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু মায়সারা (রঃ) রাত্রে যখন বিছানায় শয়ন করতে যেতেন, তখন তিনি কঁদতে শুরু করতেন এবং হঠাৎ করে তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে যেতোঃ হায়!

আমার যদি জন্মই না হতো (তবে কতই না ভাল হতো।" তাকে একবার এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ (আরবী) আল্লাহ পাকের এই উক্তিটিই আমার ক্রন্দনের কারণ। এটাতো প্রমাণিত হচ্ছে যে, সেখানে যেতে হবে। আর সেখানে গিয়ে (জাহান্নামের আগুন হতে) পরিত্রাণ পাবো কি না তা আমার জানা নেই (তাই, আমার কান্না এসে যায়)।” (এটা ইমাম ইবন জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত হাসান বসরী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক তার ভাইকে বলেনঃ “আমাদেরকে জাহান্নাম অতিক্রম করতে হবে এটা আপনার জানা আছে কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “হুঁ, অবশ্যই এটা আমার জানা আছে। আবার তিনি প্রশ্ন করেনঃ “ওটা আপনি পার হয়ে যাবেন এটাও কি আপনার জানা আছে?” জবাবে তিনি বলেনঃ “না, এটা আমি বলতে পারি না।” তখন তিনি বলেনঃ “তাহলে আমাদের এই হাসি খুশী কেমন?" একথা শোনার পর মৃত্যু পর্যন্ত তার মুখে আর কখনো হাসি দেখা যায় নাই।বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনু আব্বাসের (রাঃ) মতে এখানে (আরবী) অতিক্রম দ্বারা (আরবী) বা প্রবেশ বুঝানো হয়েছে।

কিন্তু নাফে আযরাক তার এই মতের বিরোধী ছিল। একবার হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) তাঁর এই মতের স্বপক্ষে দলীল দেখাতে গিয়ে না’ফেকে বলেনঃ “দেখো, কুরআন কারীমে রয়েছেঃ (আরবী) (২১:৯৮) এখানে (আরবী) দ্বারা (আরবী) উদ্দেশ্য নয় কি? তিনি আর একটি আয়াত তিলাওয়াত করেনঃ (আরবী) (১১:৯৮)এটা পাঠ করে তিনি নাফেকে জিজ্ঞেস করেনঃ আচ্ছা বলতো, ফিরাউন তার কওমকে জাহান্নামে নিয়ে যাবে কি না? সুতরাং তুমি চিন্তা করে দেখো যে, আমরা জাহান্নামে অবশ্যই প্রবেশ করবো। তবে আমরা তার থেকে বের হবে কি না এটাই প্রশ্ন। কিন্তু তোমার ব্যাপারে নিশ্চিত করে বলা যায় যে, আল্লাহ তাআলা তোমাকে জাহান্নাম হতে বের করবেন না।

কেননা, তুমি এটা অস্বীকারকারী।” তাঁর একথা শুনে নাফে' হেসে ওঠে। এই নাফে একজন খারেজী ছিল। (এটা আবদুর রাযযাক (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন) তার কুনিয়াত (পিতৃ পদবীযুক্ত নাম) ছিল আবু রাশেদ।অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) তাকে বুঝাতে গিয়ে (আরবী) এই আয়াতটিও পাঠ করেছিলেন এবং একথাও বলেছিলেন যে, পূর্ব যুগীয় বুযুর্গ ব্যক্তিগণ তাদের প্রার্থনায় বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমাকে নিরাপদে জাহান্নাম হতে বের করুন এবং খুশী ও আনন্দের সাথে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দিন।” আবু দাউদ তায়ালেসী (রঃ) হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে এটাও বর্ণনা করেছেন যে, এর দ্বারা কাফিরদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে।

হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, এরা হচ্ছে যালিম লোক। তিনি বলেনঃ “আমরা এভাবেই এই আয়াত পাঠ করতাম।” হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ভাল ও মন্দ সবলোকই জাহান্নাম অতিক্রম করবে। তিনি বলেনঃ দেখো, ফিরাউন, তার কওম এবং গুনাহগারদের জন্যেও (আরবী) শব্দটি (আরবী) এর অর্থে স্বয়ং কুরআন কারীমের দুটি আয়াতে এসেছে। জামে তিরমিযী প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অতিক্রম তো সবাই করবে, কিন্তু তাদের ঐ অতিক্রম তাদের আমল অনুযায়ী হবে।হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, সবকেই পুলসিরাত অতিক্রম করতে হবে। এটাই হচ্ছে আগুনের পার্শ্বে দাড়ানো।

কিছু লোক বিদ্যুৎগতিতে পার হয়ে যাবে, কেউ পার হবে বায়ুর গতিতে, কেউ পাখীর গতিতে, কেউ দ্রুতগামী ঘোড়ার গতিতে, কেউ দ্রুতগামী উটের গতিতে এবং কেউ দ্রুতগামী মানুষের চলার গতিতে পার হয়ে যাবে। সর্বশেষে যে মুসলমান ওটা অতিক্রম করবে সে হবে ঐ ব্যক্তি যার শুধু পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলির উপর নূর (আলো) থাকবে। সে পড়ে উঠে পার হয়ে যাবে। পুলসিরাত হলো পিচ্ছিল জিনিস, যার উপর বাবলা গাছের কাটার মত কাটা রয়েছে। ওর দুধারে ফেরেশতাদের সারি থাকবে, যাদের হাতে জাহান্নামের অংকুশ থাকবে। ওটা দিয়ে ধরে ধরে তারা লোকদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন যে, ঐ পুলসিরাত তরবারীর ধার অপেক্ষা তীক্ষ্ণতর হবে।

প্রথম দল বিদ্যুৎ গতিতে মুহূর্তের মধ্যে পার হয়ে যাবে। দ্বিতীয় দল বায়ুর গতিতে যাবে। তৃতীয় দল যাবে দ্রুত গামী ঘোড়ার গতিতে। চতুর্থ দল দ্রুতগামী জন্তুর গতিতে যাবে। ফেরেশতামণ্ডলী সব দিক থেকে প্রার্থনা করতে থাকবেন। তারা বলবেনঃ “হে আল্লাহ! এদেরকে বাচিয়ে নিন।” সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের বহু মারফু হাদীসেও এই বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে। হযরত কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জাহান্নাম স্বীয় পৃষ্ঠের উপর সমস্ত মানুষকে একত্রিত করবে। যখন সমস্ত পুণ্যবান ও পাপী লোক একত্রিত হবে তখন আল্লাহ তাআলা ওকে নির্দেশ দিবেনঃ “তুমি তোমার নিজের লোকদেরকে পাকড়াও করো এবং জান্নাতীদেরকে ছেড়ে দাও।" তখন জাহান্নাম সমস্ত খারাপ লোককে গ্রাস করে ফেলবে।

জাহান্নাম খারাপ লোকদেরকে এমনই চিনতে পারবে যেমন মানুষ নিজেদের সন্তানদেরকে চিনে থাকে বা তার চেয়েও বেশী চিনবে।জাহান্নামের দারোগাদের দেহ হবে এক শ' বছরের পথের সমান। তাদের প্রত্যেকের হাতে লৌহ নির্মিত গদা থাকবে। ঐ গদার একটি মাত্র আঘাতে সাতলক্ষ মানুষ চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাবে।মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার প্রতিপালকের পবিত্র সত্তার কাছে আমি এই আশা রাখি যে, বদর ও হুদাইবিয়ার যুদ্ধে যে সব মুমিন শরীক ছিল তাদের একজনও জাহান্নামে যাবে না।” তাঁর একথা শুনে হযরত হাফসা (রাঃ) বলেনঃ “এটা কি রূপে সম্ব? কুরআন কারীমে তো ঘোষিত হয়েছেঃ “তোমাদের ওটা (জাহান্নাম) অতিক্রম করতে হবে?” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর পরবর্তী আয়াতটি পাঠ করেনঃ “মুত্তাকীরা তার থেকে পরিত্রাণ পেয়ে যাবে এবং যালিমরা ওরই মধ্যে রয়ে যাবে।” সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘যার তিনটি সন্তান মারা গেছে তাকে আগুন স্পর্শ করবে না, কিন্তু শুধু কসম পুরো করা হিসেবে (আগুন স্পর্শ করবে)।”এর দ্বারা এই আয়াতই উদ্দেশ্য।বর্ণিত আছে যে, একজন সাহাবী রোগাক্রান্ত হন।

তাকে দেখবার জন্যে সাহাবীগণ সমভিব্যাহারে রাসূলুল্লাহ (সঃ) গমন করেন। তিনি বলেন যে, আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ “এই জ্বরও একপ্রকার আগুন। এর মধ্যে আমি আমার মুমিন বান্দাদেরকে এজন্যেই জড়িয়ে ফেলি যে, যাতে এটা জাহান্নামের আগুনের বদলা হয়ে যায়।" (এ হাদীসটি ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা গারীব বা দুর্বল হাদীস) হযরত মুজাহিদও (রঃ) এটাই বর্ণনা করে এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেন।হযরত আনাস আল জুহানী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি সূরায়ে (আরবী) দশবার পড়ে নেয় তার জন্যে জান্নাতে একটি ঘর নির্মিত হয়।” একথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “তা হলে তো আমরা বহু ঘর নির্মাণ করিয়ে নিবো।” জবাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তাআলার কাছে কোন কিছুরই ঘাটতি নেই।

তিনি উত্তম হতে উত্তমতম এবং বহু হতে আরো বহু প্রদানকারী। যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে এক হাজার আয়াত পাঠ করে নেয়, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তার নামটি নবী, সিদ্দীক ও শহীদদের তালিকায় লিপিবদ্ধ করবেন এবং তাঁরা হলেন সর্বোত্তম সঙ্গী। আর যে ব্যক্তি বেতন ভোগী হিসেবে নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে মুসলিম সেনাবাহিনীকে হিফাজত করার জন্যে পিছন থেকে পাহারা দেয়, সে তার চোখে জাহান্নামের। আগুন দেখবেও না, শুধু কসম পুরো করার জন্যেই তাকে দেখতে হবে। কেননা, আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ “তোমাদের সকলকেই ওটা (জাহান্নাম) অতিক্রম করতে হবে। আল্লাহর পথে তার যিক্র করা তাঁর পথে খরচ করা।

হতেও সাতশগুণ বেশী মর্যাদা রাখে। কাতাদা (রাঃ) বলেন যে, এই আয়াত দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে পার হওয়া বা অতিক্রম করা। আবদুর রহমান (রঃ) বলেন যে, মুসলমান পুলসিরাত পার হয়ে যাবে, আর মুশরিক জাহান্নামে পড়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, ঐ দিন বহু পুরুষ ও নারী পুলসিরাতের উপর থেকে পিছলিয়ে পড়ে যাবে। ওর দুপার্শ্বে ফেরেশতাদের সারি থাকবে যারা নিরাপত্তার প্রার্থনা জানাতে থাকবেন। এটা তো আল্লাহর কসম যা পুরো হবেই। এর ফায়সালা হয়ে গেছে এবং আল্লাহ তাআলা ওটা নিজের দায়িত্বে নিয়ে নিয়েছেন। পুলসিরাতের উপর যাওয়ার পর খোদাভীরু লোকেরা পার হয়ে যাবে।

আর পাপীরা তাদের আমল অনুযায়ী জাহান্নামে গড়ে গড়ে পড়তে থাকবে। মু'মিনরাও নিজ নিজ আমল অনুযায়ী মুক্তি পাবে। যে পরিমাণ আমল হবে সেই পরিমাণ সেখানে বিলম্ব হবে। তারপর যারা মুক্তি পাবে তারা তাদের মুসলমান ভাইদের জন্যে সুপারিশ করবে। ফেরেশতামণ্ডলী ও রাসূলগণও শাফাআত করবেন। অতঃপর কতকগুলি লোক এমন অবস্থায় জাহান্নাম হতে বের হবে যে, আগুন তাদেরকে খেয়ে ফেলবে। শুধু চেহারায় সিজদার জায়গাটুকু বাকী থাকবে। তারপর নিজনিজ বাকী ঈমানের পরিমাণ হিসেবে জাহান্নাম থেকে বেরিয়ে আসবে। যাদের অন্তরে দীনার (স্বর্ণ মুদ্রা) পরিমাণ ঈমান থাকবে তারা প্রথমে বের হবে।

তারপর বের হবে তাদের চেয়ে কম ঈমানের অধিকারী লোকেরা। এরপর বের হবে ঐ লোকেরা যাদের ঈমান এদের চেয়ে কম হবে। তারপর যাদের ঈমনি হবে সরিষার দানার পরিমাণ তারা বের হবে, এরপরে এরচেয়ে কম ঈমানের অধিকারীদেরকে বের করা। হবে। তারপর ঐ ব্যক্তিকে বের করা হবে যে সারা জীবনে একবার লাইলাহা ইল্লাল্লাহ বলেছে। যদিও তার অন্য কোন পুণ্য নাও থাকে। এরপর জাহান্নামে শুধু তারাই থাকবে যাদের ভাগ্যে জাহান্নামে চিরস্থায়ী অবস্থান লিখিত আছে। এসবগুলি হচ্ছে ঐ হাদীসসমূহের সারমর্ম যেগুলি সঠিকতার সাথে এসেছে। অতএব, বুঝা গেল যে, পুলসিরাতের উপর যাওয়ার পর পুণ্যবান লোকেরা ওটা পার হয়ে যাবে এবং পাপী লোকেরা কেটে কেটে জাহান্নামে পড়ে যাবে।

তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া

আর তোমাদের প্রত্যেকেই তার (জাহান্নামের) উপর দিয়েই অতিক্রম করবে [১], এটা আপনার রব এর অনিবার্য সিদ্ধান্ত।

[১] এ আয়াতটি দ্বারা পুলসিরাত সংক্রান্ত আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আক্কীদা প্রমাণিত হয়। মূলত: সিরাত শব্দের আভিধানিক অর্থঃ স্পষ্ট রাস্তা। আর শরীআতের পরিভাষায় সিরাত বলতে বুঝায়ঃ এমন এক পুল, যা জাহান্নামের পৃষ্ঠদেশের উপর প্ৰলম্বিত, যার উপর দিয়ে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সবাই পার হতে হবে, যা হাশরের মাঠের লোকদের জন্য জান্নাতে প্রবেশের রাস্তা। সিরাতের বাস্তবতার স্বপক্ষে কুরআনের এ আয়াতে আল্লাহ বলেনঃ “আর তোমাদের প্রত্যেকেই তার (জাহান্নামের) উপর দিয়ে অতিক্রম করবে, এটা আপনার প্রতিপালকের অনিবাৰ্য সিদ্ধান্ত। পরে আমরা মুক্তাকীদেরকে উদ্ধার করব এবং যালিমদেরকে সেখানে নতজানু অবস্থায় রেখে দেব”।

[সূরা মারইয়ামঃ ৭১-৭২] অধিকাংশ মুফাসসিরদের মতে এখানে 'জাহান্নামের উপর দিয়ে অতিক্রম’ দ্বারা তার উপরস্থিত সিরাতের উপর দিয়ে পার হওয়াই উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। আর এটাই ইবনে আব্বাস, ইবনে মাসউদ এবং ক’ব আল-আহবার প্রমূখ মুফাসসিরদের থেকে বর্ণিত। আবু সাঈদ আল-খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু বৰ্ণিত দীর্ঘ এক হাদীস যাতে আল্লাহর দীদার তথা আল্লাহকে দেখা এবং শাফা আতের কথা আলোচিত হয়েছে, তাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “.. ‘তারপর পুল নিয়ে আসা হবে, এবং তা জাহান্নামের উপর স্থাপন করা হবে', আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসূলঃ ‘পুল’ কি?

তিনি বললেনঃ “তা পদস্খলনকারী, পিচ্ছিল, যাতে লোহার হুক ও বর্শি এবং চওড়া ও বাঁকা কাটা থাকবে, যা নাজদের সা'দান গাছের কাটার মত। মুমিনগণ তার উপর দিয়ে কেউ চোখের পলকে, কেউ বিদ্যুৎগতিতে, কেউ বাতাসের গতিতে, কেউ দ্রুতগামী ঘোড়া ও অন্যান্য বাহনের গতিতে অতিক্রম করবে। কেউ সহীহ সালামতে বেঁচে যাবে, আবার কেউ এমনভাবে পার হয়ে আসবে যে, তার দেহ জাহান্নামের আগুনে জ্বলসে যাবে। এমন কি সর্বশেষ ব্যক্তি টেনে-হেঁচড়ে, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কোনরকম অতিক্রম করবে”। [বুখারী: ৭৪৩৯] এ ছাড়া আরও বহু হাদীসে সিরাতের গুণাগুণ বর্ণিত হয়েছে। সংক্ষেপে তার মূল কথা হলোঃ সিরাত চুলের চেয়েও সরু, তরবারীর চেয়েও ধারাল, পিচ্ছিল, পদস্খলনকারী, আল্লাহ যাকে প্রতিষ্ঠিত রাখতে চান সে ব্যতীত কারো পা তাতে স্থায়ী হবে না।

অন্ধকারে তা স্থাপন করা হবে, মানুষকে তাদের ঈমানের পরিমাণ আলো দেয়া হবে, তাদের ঈমান অনুপাতে তারা এর উপর দিয়ে পার হবে। যেমনটি পূর্বে বর্ণিত হাদীসে এসেছে। আয়াত ও হাদীস থেকে বুঝা যায় যে, মুমিনগণ জাহান্নাম অতিক্রম করবে। মুমিনরা তাতে প্রবেশ করবে। এমন কথা বলা হয়নি। তাছাড়া কুরআনের উল্লেখিত মূল শব্দ ورود এর আভিধানিক অর্থও প্রবেশ করা নয়। কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছেঃ

وَلَمَّاوَرَدَمَآءَمَدْيَنَ

“আর যখন মূসা মাদইয়ানের কাপের নিকট দিয়ে অতিক্রম করল।” [সূরা আল-কাসাস: ২৩] এখানেও ورود অর্থ প্রবেশ করা নয়। বরং অতিক্রম করা। তাই এটিই এর সঠিক অর্থ যে, সবাইকেই জাহান্নাম অতিক্রম করতে হবে। যেমন পরবর্তী আয়াতে বলা হয়েছে, মুত্তাকীদেরকে তা থেকে বাঁচিয়ে নেয়া হবে এবং জালেমদেরকে তার মধ্যে ফেলে দেয়া হবে। তদুপরি একথাটি কুরআন মজীদ এবং বিপুল সংখ্যক সহীহ হাদীসেরও বিরোধী, যেগুলোতে সৎকর্মশীল মুমিনদের জাহান্নামে প্রবেশ না করার কথা চূড়ান্তভাবে বলে দেয়া হয়েছে এবং বলে দেয়া হয়েছে যে, তারা জাহান্নামের পরশও পাবে না। যেমন, [সূরা আল-আম্বিয়াঃ ১০১-১০২] অবশ্য কোন কোন বর্ণনায় ورود শব্দ দ্বারা প্ৰবেশ অর্থ বর্ণনা করা হয়েছে।

[যেমন, মুসনাদে আহমাদঃ ৩/৩২৮, মুসনাদে হারেস: ১১২৭ এ আবু সুমাইয়া এবং মুস্তাদরাকে হাকেমঃ ৪/৬৩০ এ মুসসাহ আল-আযদিয়্যাহ কর্তৃক বর্ণিত হাদীস] সে সমস্ত বর্ণনার কোনটিই সনদের দিক থেকে খুব শক্তিশালী নয়। আর যদি وُرُوْدٌ অর্থ প্রবেশ করাই হয়। তবে তা মুমিনদের জন্য ঠাণ্ডা ও শাস্তিদায়ক বিবেচিত হবে যেমনটি উক্ত হাদীসের ভাষ্যেই জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত হয়েছে।

তাফসীর আল-কুরতুবী

[সূরা মারইয়াম (১৯): আয়াত ৬৬ থেকে ৭২] পূর্ণ পৃষ্ঠা

[সূরা মারইয়াম (১৯): আয়াত ৬৬ থেকে ৭২]আর মানুষ বলে, "আমি যখন মারা যাব, তখন কি আমাকে জীবন্ত অবস্থায় পুনরুত্থিত করা হবে?" (৬৬) মানুষ কি স্মরণ করে না যে, আমি তাকে ইতিপূর্বে সৃষ্টি করেছি যখন সে কিছুই ছিল না? (৬৭) সুতরাং আপনার প্রতিপালকের শপথ! আমি অবশ্যই তাদেরকে এবং শয়তানদেরকে একত্র করব, অতঃপর আমি অবশ্যই তাদেরকে জাহান্নামের চারপাশে নতজানু অবস্থায় উপস্থিত করব। (৬৮) অতঃপর আমি প্রত্যেক দল থেকে তাদের মধ্য হতে পরম করুণাময়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে যে সবচেয়ে বেশি কঠোর ছিল তাকে টেনে বের করব। (৬৯) তারপর আমিই ভালো জানি তাদের মধ্যে কে জাহান্নামে দগ্ধ হওয়ার অধিক যোগ্য।

(৭০)আর তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে সেখানে পৌঁছাবে না; এটি তোমার প্রতিপালকের এক অনিবার্য ফয়সালা। (৭১) এরপর আমি মুত্তাকীদেরকে নাজাত দেব এবং যালিমদেরকে সেখানে নতজানু অবস্থায় ছেড়ে দেব। (৭২)মহান আল্লাহর বাণী: (আর মানুষ বলে: আমি যখন মারা যাব, তখন কি আমাকে জীবন্ত অবস্থায় বের করা হবে?) এখানে 'মানুষ' বলতে উবাই ইবনে খালাফকে বোঝানো হয়েছে; সে কিছু জরাজীর্ণ হাড় খুঁজে পায় এবং তা নিজের হাত দিয়ে চূর্ণবিচূর্ণ করে বলে: "মুহাম্মাদ দাবি করে যে মৃত্যুর পর আমাদের পুনরুত্থিত করা হবে।" কালবী এটি বলেছেন এবং ওয়াহিদী, সা'লাবী ও কুশায়রী এটি উল্লেখ করেছেন।

মাহদাবী বলেছেন: এটি ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরা এবং তার সঙ্গীদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে এবং এটি ইবনে আব্বাসের মত। "অবশ্যই আমাকে জীবন্ত বের করা হবে" বাক্যে 'লাম' বর্ণটি দৃঢ়তা প্রদানের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। বিষয়টি এমন যেন তাকে বলা হয়েছিল: "যখন তুমি মারা যাবে তখন অবশ্যই তোমাকে জীবন্ত পুনরুত্থিত করা হবে", তখন সে এর উত্তরে অস্বীকার করে বলেছিল, "আমি যখন মারা যাব তখন কি অবশ্যই আমাকে জীবন্ত বের করা হবে?!" সে এটি অস্বীকারকারী হিসেবে বলেছিল, তাই উত্তরে 'লাম' এসেছে যেমনটি পূর্বের দাবিতে ছিল। যদি সে নতুন করে কথা শুরু করত তবে 'লাম' আসত না, কারণ এটি দৃঢ়তা ও ইতিবাচকতার জন্য ব্যবহৃত হয়, অথচ সে পুনরুত্থান অস্বীকারকারী।

ইবনে যাকওয়ান "যখন আমি মারা যাব" বাক্যটি সংবাদবাচক হিসেবে পাঠ করেছেন এবং অবশিষ্ট কারীগণ তাদের স্ব-স্ব নিয়ম অনুযায়ী প্রশ্নবোধক হিসেবে হামযাহ যোগে পাঠ করেছেন। হাসান এবং আবু হাইওয়াহ "অবশ্যই আমাকে জীবন্ত বের করা হবে" বাক্যটি উপহাসচ্ছলে পাঠ করেছেন, কারণ তারা পুনরুত্থানে বিশ্বাস করত না। আর এখানে 'মানুষ' বলতে কাফিরকে বোঝানো হয়েছে। মহান আল্লাহর বাণী: (মানুষ কি স্মরণ করে না) অর্থাৎ এই উক্তিটি যে ব্যক্তি বলছে সে কি স্মরণ করে না (যে আমি তাকে এর আগে সৃষ্টি করেছি) অর্থাৎ তার এই প্রশ্ন ও উক্তির আগে (এবং সে কিছুই ছিল না)। সুতরাং পুনসৃষ্টি তো প্রথমবার সৃষ্টির মতোই, তবে কেন সে তাতে বিরোধিতা করে?

আসিম ব্যতীত কুফাবাসীগণ, মক্কাবাসীগণ, আবু আমর এবং আবু জাফর "আওয়া লা ইয়াযযাক্কারু" (দ্বিত্বসহ) পাঠ করেছেন। শায়বাহ, নাফে' এবং আসিম "আওয়া লা ইয়াযকুরু" (হালকাভাবে) পাঠ করেছেন। পছন্দনীয় হলো তাশদীদ বা দ্বিত্বসহ পাঠ করা, যার মূল হলো "ইয়াতাযাক্কারু"; মহান আল্লাহর বাণী "কেবলমাত্র বিবেকবানরাই উপদেশ গ্রহণ করে" এবং এর সমজাতীয় অন্যান্য আয়াতের কারণে। উবাই-এর কিরাআতে এটি "আওয়া লা ইয়াতাযাক্কারু" বর্ণিত আছে, যা মূলত ব্যাখ্যামূলক কিরাআত, কারণ এটি মুসহাফের লিখনশৈলীর পরিপন্থী। নাহহাস বলেন: "ইয়াতাযাক্কারু" অর্থ হলো চিন্তা-ভাবনা করা এবং "ইয়াযকুরু" অর্থ হলো সচেতন হওয়া ও জানা।(১).

দেখুন খণ্ড ১৫, পৃষ্ঠা ৩৪০।

তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর

পূর্ণ পৃষ্ঠা পূর্ণ পৃষ্ঠা পূর্ণ পৃষ্ঠা

আবদুর রাজ্জাক, ইবনে জারীর এবং আবুশ শায়খ কাতাদাহ (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, মহান আল্লাহর বাণী সে কিয়ামতের দিন তার সম্প্রদায়ের আগে আগে থাকবে এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন: ফিরআউন তার সম্প্রদায়ের অগ্রভাগে পথ চলবে, এমনকি সে তাদের নিয়ে জাহান্নামে গিয়ে পড়বে।আবদুর রাজ্জাক, ইবনে জারীর, ইবনুল মুনযির এবং ইবনে আবি হাতিম ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, মহান আল্লাহর বাণী অতঃপর সে তাদের জাহান্নামে নিয়ে পৌঁছাবে এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন: ‘উরুূদ’ অর্থ হলো প্রবেশ করা।ইবনে জারীর এবং ইবনে আবি হাতিম ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: কুরআনে ‘উরুূদ’ শব্দটি চারটি স্থানে (প্রবেশ করা অর্থে) এসেছে—সূরা হুদে আর সেটি কতই না মন্দ গন্তব্য যেখানে তারা পৌঁছাবে; সূরা মারইয়ামে তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যাকে তা অতিক্রম করতে হবে না (সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৭১); এবং সেই সূরায় আরও রয়েছে আর আমি অপরাধীদের পিপাসার্ত অবস্থায় জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাব (সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৮৬); এবং সূরা আল-আম্বিয়ায় তোমরা জাহান্নামের ইন্ধন, তোমরাই তাতে প্রবেশ করবে (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৯৮)

তিনি বলেন: এই সবগুলোর অর্থই হলো প্রবেশ করা।ইবনে জারীর এবং ইবনে আবি হাতিম মুজাহিদ থেকে বর্ণনা করেছেন— আর এ দুনিয়ায় তাদের পেছনে লানত লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং কিয়ামতের দিনও (তা অব্যাহত থাকবে); এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন: তাদের এক লানতের সাথে আরও এক লানত যুক্ত করা হয়েছে, ফলে তা হলো দ্বিগুণ লানত। কতই না মন্দ সেই পুরস্কার যা তাদের দেওয়া হয়েছে; অর্থাৎ লানতের পিঠে লানত।ইবনে জারীর, ইবনুল মুনযির এবং ইবনে আবি হাতিম ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, মহান আল্লাহর বাণী কতই না মন্দ সেই পুরস্কার যা তাদের দেওয়া হয়েছে প্রসঙ্গে তিনি বলেন: এটি হলো দুনিয়া ও আখিরাতের লানত।ইবনে আবি হাতিম সুদ্দী (রা.) থেকে আলোচ্য আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: ফিরআউনের পরে এমন কোনো নবী প্রেরিত হননি যিনি তার জবানিতে ফিরআউনকে অভিশাপ দেননি এবং কিয়ামতের দিন জাহান্নামে তার জন্য আরও একটি লানত বৃদ্ধি করা হবে।ইবনুল আনবারী ‘আল-ওয়াকফ ওয়াল ইবতিদা’ গ্রন্থে এবং তুসতি ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন—নাফি ইবনুল আযরাক তাকে বললেন: মহান আল্লাহর বাণী কতই না মন্দ সেই পুরস্কার যা তাদের দেওয়া হয়েছে সম্পর্কে আমাকে অবহিত করুন।

তিনি বললেন: এর অর্থ হলো অভিশাপের পর নিকৃষ্ট অভিশাপ।তিনি জিজ্ঞেস করলেন: আরবরা কি এই অর্থ সম্পর্কে অবগত? তিনি বললেন: হ্যাঁ, তুমি কি বনু যুবইয়ানের নাবিগাহর উক্তিটি শোননি যেখানে সে বলেছে: ‘এমন এক শক্তির মোকাবিলা করো না যার কোনো তুলনা নেই, কারণ শত্রুরা তো সাহায্যের (রিফদ) মাধ্যমেই পর্যুদস্ত হয়।’আয়াত ১০০

এই বিবাদ প্রসঙ্গে; যখন সিফফিনের যুদ্ধ সংঘটিত হলো এবং আমরা একে অপরের ওপর তলোয়ার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম, তখন আমরা বললাম: হ্যাঁ, এটাই সেই বিষয়।ইমাম আহমদ একটি হাসান সনদে আবু হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন, "কিয়ামতের দিন প্রতিটি সৃষ্টি বিবাদে লিপ্ত হবে, এমনকি দুটি ছাগলও—যারা একে অপরকে গুঁতো দিয়েছিল।"তাবারানি ও ইবনে মারদুওয়াই একটি নির্ভরযোগ্য সনদে আবু আইয়ুব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন যে,রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন: "কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যে দুজন বিবাদে লিপ্ত হবে, তারা হলো স্বামী ও তার স্ত্রী।আল্লাহর কসম!

তখন স্ত্রীর জিহ্বা কথা বলবে না, বরং তার হাত ও পা তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে যে সে তার স্বামীর সাথে কী আচরণ করেছিল; আর স্বামীর হাত ও পা সাক্ষ্য দেবে সে তার স্ত্রীর সাথে কীরূপ আচরণ করেছিল।এরপর কোনো ব্যক্তি ও তার সেবককে একইভাবে ডাকা হবে। তারপর বাজারের লোকদের ডাকা হবে। তখন কোনো দানিক বা কিরাত (মুদ্রার অংশ) থাকবে না; বরং এই ব্যক্তির (অত্যাচারীর) নেকি সেই ব্যক্তিকে (মজলুমকে) দিয়ে দেওয়া হবে যার প্রতি সে জুলুম করেছিল, আর মজলুমের গুনাহসমূহ অত্যাচারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। অতঃপর প্রতাপশালী স্বৈরশাসকদের লোহার হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করতে করতে উপস্থিত করা হবে এবং বলা হবে: 'এদের জাহান্নামে নিয়ে যাও।'আল্লাহর কসম!

আমি জানি না তারা কি সরাসরি তাতে প্রবেশ করবে নাকি বিষয়টি সেরকম হবে যেমনটি আল্লাহ বলেছেন: 'তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে সেখানে (জাহান্নামে) পৌঁছাবে না' (সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৭১)।ইমাম আহমদ ও তাবারানি হাসান সনদে উকবা বিন আমের (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন, "কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম বিবাদকারী দুই পক্ষ হবে দুই প্রতিবেশী।"ইমাম বাজ্জার আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন, "অত্যাচারী শাসককে আনা হবে এবং প্রজারা তার বিরুদ্ধে বিবাদে লিপ্ত হবে।"ইবনে মান্দাহ ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: কিয়ামতের দিন মানুষ বিবাদে লিপ্ত হবে, এমনকি আত্মা ও শরীরও একে অপরের বিরুদ্ধে বিবাদ করবে।আত্মা শরীরকে বলবে, 'তুমি এসব কর্ম করেছ।' আর শরীর আত্মাকে বলবে, 'তুমিই তো আদেশ দিয়েছিলে এবং কুমন্ত্রণা দিয়েছিলে।'তখন আল্লাহ তাআলা একজন ফেরেশতা পাঠাবেন যিনি তাদের মধ্যে ফয়সালা করবেন।

তিনি তাদের বলবেন: 'তোমাদের উভয়ের উদাহরণ হলো একজন পঙ্গু দৃষ্টিমান ব্যক্তি এবং একজন অন্ধ ব্যক্তির মতো, যারা একটি বাগানে প্রবেশ করল। তখন পঙ্গু ব্যক্তিটি অন্ধ ব্যক্তিকে বলল: আমি এখানে ফল দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু আমি সেখানে পৌঁছাতে পারছি না।'তখন অন্ধ ব্যক্তিটি তাকে বলল: 'তুমি আমার কাঁধে চড়ো এবং ফলগুলো সংগ্রহ করো।' অতঃপর পঙ্গুটি তার ওপর আরোহণ করল এবং ফলগুলো পেড়ে নিল। এখন বল তো, তাদের মধ্যে অপরাধী কে? তারা উভয়ে বলবে, 'উভয়েই অপরাধী।' তখন ফেরেশতা তাদের বলবেন, 'তোমরা তো তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধেই ফয়সালা দিলে।'অর্থাৎ, শরীরের জন্য আত্মা হলো আরোহীর মতো এবং শরীর হলো তার বাহন।ইবনে জারীর ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে আল্লাহর বাণী—'অতঃপর কিয়ামতের দিন তোমরা তোমাদের রবের নিকট বিবাদে লিপ্ত হবে'—এর ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন: তখন সত্যবাদী বিবাদ করবে মিথ্যাবাদীর সাথে, মজলুম বিবাদ করবে জালেমের সাথে, হেদায়েতপ্রাপ্ত ব্যক্তি বিবাদ করবে পথভ্রষ্টের সাথে এবং দুর্বল ব্যক্তি বিবাদ করবে দাম্ভিক অহংকারীর সাথে।

আবদ ইবনে হুমাইদ আসিম থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি ‘এবং উন্মুক্ত করা হবে’ শব্দটি লঘু বা তাশদিদহীনভাবে পাঠ করেছেন।ইবনুল মুনযির আবুল জাওযা থেকে আল্লাহর বাণী: ‘নিশ্চয়ই জাহান্নাম ওত পেতে আছে’—এর ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: এটি (শাস্তির স্থান হিসেবে) নির্ধারিত হয়েছে।আবদ ইবনে হুমাইদ, ইবনে জারির এবং ইবনুল মুনযির হাসান থেকে আল্লাহর বাণী: ‘নিশ্চয়ই জাহান্নাম ওত পেতে আছে’—এর ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: জাহান্নাম অতিক্রম না করা পর্যন্ত কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।ইবনে জারির সুফিয়ান থেকে ‘নিশ্চয়ই জাহান্নাম ওত পেতে আছে’—এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: তাদের উপর তিনটি সেতু থাকবে; জাহান্নাম অতিক্রম না করা পর্যন্ত কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।আবদুর রাজ্জাক, আবদ ইবনে হুমাইদ, ইবনে জারির এবং ইবনুল মুনযির কাতাদাহ থেকে ‘নিশ্চয়ই জাহান্নাম ওত পেতে আছে’—এর ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: তোমরা জেনে রেখো যে, অগ্নি অতিক্রম করা ব্যতীত জান্নাতে যাওয়ার কোনো পথ নেই।

তিনি অন্য একটি আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন: (আর তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যাকে তা অতিক্রম করতে হবে না - সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৭১)। ‘সীমালঙ্ঘনকারীদের প্রত্যাবর্তনস্থল’—এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন: এটি তাদের আশ্রয় ও ঠিকানা। ‘তারা সেখানে যুগের পর যুগ অবস্থান করবে’—এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন: ‘আহকাব’ বা যুগের পর যুগ এমন সময়কাল যার কোনো সমাপ্তি নেই; যখনই এক যুগ অতিবাহিত হবে, তখনই অন্য একটি যুগের সূচনা হবে। তিনি আরও বলেন, আমাদের কাছে বর্ণিত হয়েছে যে, কিয়ামতের দিনের বছরগুলোর হিসেবে এক ‘হুকুব’ বা যুগ হলো আশি বছর।ইবনে আবি হাতিম ইবনে আব্বাস থেকে ‘তারা সেখানে যুগের পর যুগ অবস্থান করবে’—এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: এর অর্থ হলো বহু বছর।আবদ ইবনে হুমাইদ হাসান থেকে ‘তারা সেখানে যুগের পর যুগ অবস্থান করবে’—এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: এর কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই; যখনই এক যুগ অতিক্রান্ত হবে, তখনই তারা পরবর্তী যুগে প্রবেশ করবে।আবদ ইবনে হুমাইদ ও ইবনে জারির হাসান থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: এক হুকুব হলো সত্তর বছর এবং এর প্রতিটি দিন হলো এক হাজার বছরের সমান।