জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

ফেরেশতারা মেঘের মধ্যে আলোচনা করে

প্রকাশিত: এপ্রিল 24, 2024 · লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন · 3 মিনিট পড়া

ভূমিকা

ধর্মীয় বিশ্বাসের বিবর্তন ও প্রাকৃতিক জগতের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার মধ্যে যে দ্বন্দ্ব, তা প্রায়ই প্রাচীন ধর্মীয় গ্রন্থগুলোতে প্রতিফলিত হয়। প্রাচীনকালে মানুষ যখন বায়ুমণ্ডলীয় ঘটনা বা মহাকাশ সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল, তখন তারা প্রাকৃতিক উপাদানগুলোকে অলৌকিক সত্তার আবাসস্থল বা কার্যাবলীর কেন্দ্র হিসেবে কল্পনা করত। সহীহ বুখারির ৩২৮৮ নম্বর হাদিসটি এমনই একটি বিশ্বাসের প্রতিফলন, যেখানে মেঘ এবং আকাশকে তথ্যের আদান-প্রদান ও অতিপ্রাকৃত সংঘাতের একটি ভৌত ক্ষেত্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। যুক্তি ও বিজ্ঞানের আলোকে এই বর্ণনাটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এটি আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান, আবহাওয়াবিজ্ঞান এবং তথ্যতত্ত্বের মৌলিক নীতিগুলোর সাথে সাংঘর্ষিক।


হাদিসের বিবরণ

হাদিসটিতে বর্ণিত হয়েছে যে, ফেরেশতারা মেঘের মধ্যে অবস্থান করে ভবিষ্যতে পৃথিবীতে যা ঘটবে তা নিয়ে আলোচনা করেন। সেই আলোচনা থেকে শয়তানরা কিছু তথ্য আড়ি পেতে শোনে এবং তা পৃথিবীতে থাকা জ্যোতিষীদের কাছে পৌঁছে দেয়। এই বর্ণনায় জ্যোতিষীদের বলা তথ্যের একটি অংশকে সত্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যদিও বলা হয়েছে যে তারা তার সাথে অনেক মিথ্যা মিশিয়ে দেয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি—অর্থাৎ মেঘের ভেতর সভা করা, আড়ি পাতা এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে জ্যোতিষচর্চা—একটি সুনির্দিষ্ট মিথলজিক্যাল কাঠামো তৈরি করে, যা পর্যবেক্ষণমূলক বিজ্ঞানের যুগে অপ্রাসঙ্গিক ও অযৌক্তিক বলে গণ্য হয়। [1]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৫৯/ সৃষ্টির সূচনা
পরিচ্ছেদঃ ৫৯/১১. ইবলীস ও তার বাহিনীর বর্ণনা।
৩২৮৮. ‘আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘ফেরেশতামন্ডলী মেঘের মাঝে এমন সব বিষয় আলোচনা করেন, যা পৃথিবীতে ঘটবে। তখন শয়তানেরা দু’ একটি কথা শুনে ফেলে এবং তা জ্যোতিষদের কানে এমনভাবে ঢেলে দেয় যেমন বোতলে পানি ঢালা হয়। তখন তারা এ সত্য কথার সঙ্গে শত রকমের মিথ্যা বাড়িয়ে বলে।’ (৩২১০) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩০৪৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩০৫৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)


মেঘের গাঠনিক উপাদান ও আবহাওয়াবিজ্ঞান

বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে মেঘের গঠন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মেঘ কোনো গোপন আলোচনার জন্য উপযুক্ত বদ্ধ বা নিভৃত স্থান নয়। মেঘ হলো মূলত বায়ুমণ্ডলের নির্দিষ্ট উচ্চতায় ঘনীভূত জলীয় বাষ্প বা বরফ কণার সমষ্টি। আধুনিক আবহাওয়াবিজ্ঞানে রাডার, স্যাটেলাইট এবং ডপলার প্রযুক্তি ব্যবহার করে মেঘের প্রতিটি স্তরের গঠন ও চলাচল পর্যবেক্ষণ করা হয়। সেখানে বুদ্ধিমান কোনো সত্তার উপস্থিতি বা কোনো অজানা শক্তির মাধ্যমে তথ্যের আদান-প্রদানের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যদি ফেরেশতারা মেঘের মধ্যে শব্দ তরঙ্গের মাধ্যমে কথা বলেন, তবে তা আধুনিক সেন্সরে ধরা পড়ার কথা। আর যদি তাদের যোগাযোগ অবস্তুগত বা আধ্যাত্মিক হয়, তবে তার জন্য নির্দিষ্টভাবে ‘মেঘ’ বা ‘আকাশের’ মতো ভৌত মাধ্যমের কোনো প্রয়োজন থাকার কথা নয়। এটি মূলত প্রাক-বৈজ্ঞানিক যুগের একটি ধারণা, যেখানে মনে করা হতো আকাশ বা মেঘ হলো স্বর্গীয় শক্তির নিকটতম স্তর।

যৌক্তিক সমালোচনার আরেকটি বড় জায়গা হলো জ্যোতিষশাস্ত্রের সত্যতা। হাদিসটিতে দাবি করা হয়েছে যে, শয়তানদের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যের কারণে জ্যোতিষীদের কিছু কথা সত্য হয়। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জ্যোতিষশাস্ত্র বা গণকগিরি একটি সম্পূর্ণ অপবিজ্ঞান (Pseudoscience)। শত শত বছর ধরে পরিচালিত বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, জ্যোতিষীদের ভবিষ্যৎবাণীগুলো মূলত ‘বার্নাম ইফেক্ট’ বা দ্ব্যর্থবোধক বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা যেকোনো সাধারণ ঘটনার ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায়। যদি আসলেই মহাজাগতিক কোনো উৎস থেকে নিখুঁত তথ্য চুরি করে জ্যোতিষীদের দেওয়া হতো, তবে তাদের ভবিষ্যৎবাণীগুলো বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতো। তথাকথিত এই “একভাগ সত্য” তথ্যের কোনো বাস্তব বা পরিসংখ্যানগত প্রমাণ আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।


উপসংহার

সবশেষে, এই বর্ণনায় শয়তানদের “আড়ি পেতে শোনা” এবং “বোতলে পানি ঢালার মতো” তথ্যের প্রবাহের যে উপমা ব্যবহার করা হয়েছে, তা অত্যন্ত নৃতাত্ত্বিক (Anthropomorphic)। এটি অলৌকিক সত্তাকে মানুষের সীমাবদ্ধতার আদলে কল্পনা করার একটি প্রবণতা। মহাবিশ্বের সুবিশালতা এবং তথ্যের ডিজিটাল ও কোয়ান্টাম প্রবাহের আধুনিক ধারণার কাছে মেঘের আড়ালে লুকিয়ে কথা শোনার এই ধারণাটি রূপকথা বা আদিম লোকগাথার সমতুল্য। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান অনুযায়ী, ভবিষ্যতের কোনো তথ্য যদি মহাবিশ্বের কোথাও সংরক্ষিত থাকে, তবে তা মেঘের মতো অস্থায়ী ও পরিবর্তনশীল প্রাকৃতিক উপাদানের ওপর নির্ভর করে না। সুতরাং, এই হাদিসের বর্ণনাটি কোনো বাস্তব সত্যের পরিবর্তে তৎকালীন সময়ের মানুষের আকাশ ও অতিপ্রাকৃত জগত সম্পর্কে প্রচলিত ধারণারই প্রতিফলন ঘটায়।


তথ্যসূত্রঃ
  1. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৩২৮৮ ↩︎

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

Leave a comment

Your email will not be published.