ভূমিকা
কোনো মানুষ গালি দিলে আমরা সেটি পছন্দ নাও করতে পারি। কারো ভাষা রুচিহীন, অশালীন, আক্রমণাত্মক বা ঘৃণ্য মনে হতে পারে। কিন্তু সভ্য নৈতিকতার মৌলিক নীতি হচ্ছে, কথার জবাব কথা, সমালোচনার জবাব সমালোচনা, অপমানের জবাব সামাজিক নিন্দা বা প্রয়োজনে আইনি প্রক্রিয়া; কিন্তু ছুরি, তলোয়ার, চাপাতি, গুলি বা হত্যাকাণ্ড নয়। কোনো ব্যক্তি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে গালি দিতে পারে, জাতিসংঘকে গালি দিতে পারে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে গালি দিতে পারে, আমেরিকার ধ্বংস কামনা করতে পারে, এমনকি আমাকেও গালি দিতে পারে। এসব কিছুই নৈতিকভাবে সবসময় সভ্য সুন্দর নয়, কিন্তু এগুলোর জন্য কাউকে খুঁজে বের করে হত্যা করা সভ্য সমাজে অপরাধ, বর্বরতা এবং ভয়ঙ্কর অন্যায়। কারণ একটি মানুষের প্রাণ তার কথা বা উচ্চারিত শব্দের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।
ঠিক এখানেই ধর্মীয় কর্তৃত্ববাদী নৈতিকতার ভয়াবহতা প্রকাশ পায়। যখন কোনো ধর্মীয় মতবাদ বলে যে নবী, ধর্ম, ঈশ্বর বা পবিত্র ব্যক্তিত্বকে গালি দিলে মানুষ হত্যা বৈধ হতে পারে, তখন সেটি আর শুধু “ধর্মীয় অনুভূতি রক্ষা” থাকে না; সেটি সরাসরি হত্যার নৈতিক অনুমোদনে পরিণত হয়। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, এই হত্যাকাণ্ড যদি আদালত, বিচার, সাক্ষ্যপ্রমাণ, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, নিরপেক্ষ বিচারক এবং আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়া ঘটে, তাহলে সেটি স্পষ্টতই বিচারবহির্ভূত হত্যা। এখানে অভিযোগকারী নিজেই বিচারক, নিজেই প্রসিকিউটর, নিজেই জল্লাদ। কোনো মানুষ সত্যিই গালি দিয়েছিল কি না, কোন প্রেক্ষাপটে বলেছিল, তার মানসিক অবস্থা কী ছিল, বক্তব্যের অর্থ কী ছিল, অভিযুক্তের আত্মপক্ষ কী—এসবের কিছুই আর গুরুত্বপূর্ণ থাকে না। ধর্মীয় উন্মাদনা তখন আইনের জায়গা দখল করে, আর হত্যাকারী নিজেকে নৈতিক যোদ্ধা ভাবার লাইসেন্স পেয়ে যায়।
এই প্রবন্ধে আলোচিত হাদিসগুলো ঠিক এই বিপজ্জনক নৈতিক কাঠামোকেই সামনে আনে। এখানে নবীকে গালি দেওয়ার অভিযোগকে এমন এক অপরাধে পরিণত করা হয়েছে, যার শাস্তি হিসেবে একজন মানুষকে আদালতের সামনে না নিয়েই হত্যা করা যায়। অর্থাৎ ইসলামি বর্ণনার এই ধারায় শুধু মৃত্যুদণ্ডের ধারণাই নেই; তার চেয়েও ভয়াবহভাবে আছে ব্যক্তিগত উদ্যোগে হত্যাকে বৈধতা দেওয়ার ধারণা। আধুনিক মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ন্যায্য বিচারব্যবস্থার আলোকে এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়; এটি ধর্মীয় মর্যাদার নামে হত্যাকে পবিত্র করার চেষ্টা। আর যে মতবাদ সমালোচনার জবাবে যুক্তি নয়, হত্যা চায়—সেই মতবাদকে সভ্যতার ভাষায় নৈতিক বলা যায় না; তাকে বলতে হয় ভয়, দমন, সন্ত্রাস এবং কর্তৃত্বের মতবাদ।
কটূক্তি, সমালোচনা এবং ক্ষতির প্রশ্ন
প্রথমেই একটি মৌলিক নৈতিক প্রশ্ন স্পষ্ট করতে হবে: কাউকে গালি দিলে, কটূক্তি করলে বা কঠোর ভাষায় সমালোচনা করলে ঠিক কী ধরনের বাস্তব ক্ষতি ঘটে? কারো শরীরে ব্যথা লাগে না, সম্পদ নষ্ট হয় না, ঘর পুড়ে যায় না, জীবন বিপন্ন হয় না। মানুষ অপমানিত বোধ করতে পারে, রাগ করতে পারে, কষ্ট পেতে পারে—কিন্তু অনুভূতিগত অস্বস্তিকে শারীরিক ক্ষতি বা প্রাণঘাতী অপরাধের সমতুল্য করা একটি বিপজ্জনক নৈতিক প্রতারণা। “আমার অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে”—এই বাক্য কোনো মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার লাইসেন্স হতে পারে না। অনুভূতি ব্যক্তিগত, পরিবর্তনশীল এবং পরিমাপযোগ্য নয়; আর অপরাধবিজ্ঞান ও ন্যায়বিচারের মূল ভিত্তি হলো পরিমাপযোগ্য ক্ষতি, প্রমাণযোগ্য অপরাধ এবং আনুপাতিক শাস্তি।
গালি বা কটূক্তি পছন্দনীয় না হতে পারে; কিন্তু সেটি এমন অপরাধ নয় যার জবাবে মৃত্যু, রক্তপাত বা শারীরিক সহিংসতা বৈধ হতে পারে। কেউ যদি বলে, “অমুক আমাকে অপমান করেছে, তাই আমি তাকে হত্যা করেছি”—সভ্য আইনের ভাষায় সেটি আত্মরক্ষা নয়, ন্যায়বিচার নয়, বরং খুন। কারণ অপমান প্রাণঘাতী আক্রমণ নয়। অপমানের জবাব হত্যা হলে সমাজে আর বিচারব্যবস্থা থাকে না; থাকে কেবল আহত অহংকারের নামে ব্যক্তিগত প্রতিশোধ। এই প্রতিশোধকে ধর্মীয় ভাষা দিলে সেটি আরও বিপজ্জনক হয়, কারণ তখন হত্যাকারী নিজেকে অপরাধী নয়, পবিত্র দায়িত্বপালনকারী হিসেবে কল্পনা করতে শুরু করে। এখান থেকেই জন্ম নেয় ব্লাসফেমির নামে চাপাতি-সংস্কৃতি, মব লিঞ্চিং, ফতোয়া-হত্যা এবং বিচারবহির্ভূত সন্ত্রাস।
আর যদি আলোচ্য ব্যক্তি হন একজন পাবলিক ফিগার—রাষ্ট্রনায়ক, ধর্মপ্রচারক, নবী, আইনপ্রণেতা, বিচারক, সামরিক নেতা বা এমন কেউ যার নামে সমাজের আইন, নৈতিকতা, যুদ্ধ, কর, বিবাহ, নারী-পুরুষের অধিকার, দাসপ্রথা, শাস্তি ও নাগরিক জীবনের বিধান নির্ধারিত হয়—তাহলে তার সমালোচনা শুধু অনুমোদিত হওয়া উচিত নয়, বরং সেটি জনগণের মৌলিক অধিকার হওয়া উচিত। কারণ পাবলিক ফিগারের সিদ্ধান্ত, শিক্ষা ও মতাদর্শ ব্যক্তিগত ঘরের বিষয় নয়; তা জনগণের জীবন, স্বাধীনতা, আইন, সম্পদ, শরীর, যৌনতা, চিন্তা এবং ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করে। যে ব্যক্তি সমাজের ওপর বিধান চাপাতে আসে, তাকে সমাজের কঠোর প্রশ্ন, কঠোর সমালোচনা, তীব্র নিন্দা এবং প্রয়োজনে নির্মম ব্যঙ্গ সহ্য করতেই হবে। ক্ষমতা চাইবে, কিন্তু সমালোচনা সহ্য করবে না—এটি নৈতিকতা নয়; এটি কর্তৃত্ববাদ।
তাই নবী মুহাম্মদকে কেউ গালি দিয়েছে কি না, এটি নৈতিক বিচারে আসল প্রশ্ন নয়। আসল প্রশ্ন হলো, একজন পাবলিক ধর্মীয়-রাজনৈতিক নেতাকে সমালোচনা বা কটূক্তি করার অভিযোগে কোনো মানুষকে হত্যা করা যায় কি না। এর উত্তর পরিষ্কার: না, যায় না। কোনো আদালত নেই, নিরপেক্ষ তদন্ত নেই, সাক্ষ্য যাচাই নেই, অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নেই, শুধু একজন অনুসারীর দাবি, “সে নবীকে গালি দিয়েছে”, আর তার পরিণতি মৃত্যু। এটি ন্যায়বিচার নয়; এটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। আর যে ধর্মীয় নৈতিকতা এমন হত্যাকে বৈধতা দেয়, সেটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে শুধু অসহিষ্ণু নয়; সেটি সরাসরি প্রাণঘাতী।
এই নৈতিক কাঠামোর সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, এখানে মানুষের প্রাণের চেয়ে একটি ব্যক্তিত্বের মর্যাদা, একটি মতবাদের অহংকার এবং অনুসারীদের আহত অনুভূতিকে বেশি মূল্য দেওয়া হয়। একটি সভ্য সমাজে কোনো নেতা, নবী বা ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এত পবিত্র হতে পারে না যে তার নামে মানুষ হত্যা বৈধ হয়ে যায়। কোনো মতবাদ যদি বলে, “আমাকে সমালোচনা করলে তোমার মৃত্যু ন্যায্য”—তাহলে সেটি সত্যের আত্মবিশ্বাসী মতবাদ নয়; সেটি ভীত, প্রতিশোধপরায়ণ এবং সহিংস ক্ষমতার মতবাদ। সত্য যুক্তি দিয়ে দাঁড়ায়; সমালোচনাকে তা ভয় পায় না। আর অন্যদিকে মিথ্যা ও কর্তৃত্ব দাঁড়ায় ভয় দেখিয়ে, দমন করে। ইসলামও এভাবেই মানুষের চিন্তাকে দমন করে, শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে।
নবীকে গালি দেয়ার শাস্তি
নিচের হাদিসটি ইসলামের নৈতিক কাঠামোর এক নির্মম ও কুৎসিত দিককে নগ্নভাবে প্রকাশ করে। এখানে অভিযোগটি কী? একজন দাসী নবী মুহাম্মদকে গালি দিত, তাঁর সম্পর্কে কটু কথা বলত। অর্থাৎ অভিযোগটি কোনো হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, ডাকাতি, সশস্ত্র বিদ্রোহ বা বাস্তব শারীরিক ক্ষতির নয়; অভিযোগটি কথার। আর সেই কথার জবাবে কী করা হলো? একজন অন্ধ ব্যক্তি নিজের অধীনস্থ উম্মু ওয়ালাদ দাসীকে, যার গর্ভে তার সন্তান জন্মেছে, রাতের অন্ধকারে ধারালো অস্ত্র দিয়ে পেটে আঘাত করে হত্যা করল। কোনো আদালত নেই, কোনো বিচার নেই, কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাই নেই, অভিযুক্ত নারীর আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নেই। আছে শুধু এক অনুসারীর দাবি সে নবীকে গালি দিয়েছে, এবং তার সরাসরি ফলাফল মৃত্যু।
এখানেই ঘটনাটি শুধু ব্যক্তিগত খুন থাকে না; এটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে পরিণত হয়। কারণ হত্যাকারী নিজেই অভিযোগকারী, নিজেই বিচারক, নিজেই জল্লাদ। সে নির্ধারণ করেছে কোন কথা “গালি”, সে নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে এর শাস্তি মৃত্যু, এবং সে নিজেই সেই শাস্তি কার্যকর করেছে। কোনো সভ্য বিচারব্যবস্থায় এটিকে ন্যায়বিচার বলা যায় না। এটি সরাসরি ভিজিল্যান্টে কিলিং—ব্যক্তিগত ধর্মীয় অনুভূতি ও নবী-ভক্তির নামে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে মানুষ হত্যা।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নবী মুহাম্মদ পরবর্তীতে এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করেননি। তিনি হত্যাকারীকে শাস্তি দেননি। তিনি বলেননি যে, গালি দিলেও বিচার ছাড়া হত্যা করা যাবে না। তিনি বলেননি যে, একজন দাসীও মানুষ, তারও বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। বরং বর্ণনা অনুসারে তিনি এই হত্যাকে “রক্তমূল্যহীন” ঘোষণা করেন। অর্থাৎ নিহত নারীর রক্তের কোনো মূল্য নেই, তার হত্যার জন্য কোনো ক্ষতিপূরণ নেই, হত্যাকারীর কোনো অপরাধ নেই। এই ঘোষণাটি কেবল একটি হত্যাকে ক্ষমা করা নয়; এটি ভবিষ্যতের জন্য এক ভয়ংকর নৈতিক বার্তা—নবীকে গালি দিলে বিচার ছাড়াই হত্যা বৈধ হতে পারে।
এই জায়গাতেই ইসলামি নৈতিকতার ভয়াবহ সমস্যা স্পষ্ট হয়। এখানে একটি কথিত অপমানের মর্যাদা একজন মানুষের জীবনের চেয়েও বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে। নবীর সম্মান রক্ষার নামে একজন নারীকে হত্যা করা হয়েছে, এবং সেই হত্যাকে ধর্মীয় কর্তৃত্ব বৈধতা দিয়েছে। এই বৈধতা কোনো ছোট বিষয় নয়। এর সামাজিক ফল হচ্ছে ব্লাসফেমির নামে হত্যার সংস্কৃতি, মব লিঞ্চিং, ফতোয়া-সন্ত্রাস, চাপাতি-হামলা এবং বিচারবহির্ভূত খুনের নৈতিক অনুমোদন। যখন ধর্ম বলে, “আমার নবীকে গালি দিলে তোমার রক্ত মূল্যহীন”, তখন সেটি শুধু মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করছে না; সেটি হত্যাকে পবিত্র দায়িত্বে পরিণত করছে। [1] [2] [3] [4] [5] –
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
পাবলিশারঃ আল্লামা আলবানী একাডেমী
অধ্যায়ঃ ৩৩/ অপরাধ ও তার শাস্তি
পরিচ্ছদঃ ২. যে নবী (ﷺ)-কে গালি দেয় তার সম্পর্কিত বিধান
৪৩৬১। ইবনু আব্বাস (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। জনৈক অন্ধ লোকের একটি উম্মু ওয়ালাদ’ ক্রীতদাসী ছিলো। সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে গালি দিতো এবং তাঁর সম্পর্কে মন্দ কথা বলতো। অন্ধ লোকটি তাকে নিষেধ করা সত্ত্বেও সে বিরত হতো না। সে তাকে ভৎর্সনা করতো; কিন্তু তাতেও সে বিরত হতো না। এক রাতে সে যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে গালি দিতে শুরু করলো এবং তাঁর সম্পর্কে মন্দ কথা বলতে লাগলো, সে একটি একটি ধারালো ছোরা নিয়ে তার পেটে ঢুকিয়ে তাতে চাপ দিয়ে তাকে হত্যা করলো। তার দু’ পায়ের মাঝখানে একটি শিশু পতিত হয়ে রক্তে রঞ্জিত হলো। ভোরবেলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘটনাটি অবহিত হয়ে লোকজনকে সমবেত করে বলেনঃ আমি আল্লাহর কসম করে বলছিঃ যে ব্যক্তি একাজ করেছে, সে যদি না দাঁড়ায় তবে তার উপর আমার অধিকার আছে।
একথা শুনে অন্ধ লোকটি মানুষের ভিড় ঠেলে কাঁপতে কাঁপতে সামনে অগ্রসর হয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে এসে বসে বললো, হে আল্লাহর রাসূল! আমি সেই নিহত দাসীর মনিব। সে আপনাকে গালাগালি করতো এবং আপনার সম্পর্কে অপমানজনক কথা বলতো। আমি নিষেধ করতাম; কিন্তু সে বিরত হতো না। আমি তাকে ধমক দিতাম; কিন্তু সে তাতেও বিরত হতো না। তার গর্ভজাত মুক্তার মতো আমার দু’টি ছেলে আছে, আর সে আমার খুব প্রিয়পাত্রী ছিলো। গত রাতে সে আপনাকে গালাগালি শুরু করে এবং আপনার সম্পর্কে অপমানজনক কথা বললে, আমি তখন একটি ধারালো ছুরি নিয়ে তার পেটে স্থাপন করে তাতে চাপ দিয়ে তাকে হত্যা করে ফেলি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমরা সাক্ষী থাকো, তার রক্ত বৃথা গেলো।(1)
সহীহ।
(1). নাসায়ী।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৩/ শাস্তির বিধান
পরিচ্ছেদঃ ২. নবী (ﷺ) এর মর্যাদাহানিকারী ব্যক্তির শাস্তি সম্পর্কে।
৪৩১০. আব্বাদ ইব্ন মূসা (রহঃ) …. ইব্ন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ কোন এক অন্ধ ব্যক্তির একটি দাসী ছিল। সে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শানে বেয়াদবিসূচক কথাবার্তা বলতো। সে অন্ধ ব্যক্তি তাকে এরূপ করতে নিষেধ করতো, কিন্তু সে তা মানতো না। সে ব্যক্তি তাকে ধমকাতো, তবু সে তা থেকে বিরত হতো না। এমতাবস্থায় এক রাতে যখন সে দাসী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শানে অমর্যাদাকর কথাবার্তা বলতে থাকে, তখন ঐ অন্ধ ব্যক্তি একটি ছোরা নিয়ে তার পেটে প্রচন্ড আঘাত করে, যার ফলে সে দাসী মারা যায়। এ সময় তার এক ছেলে তার পায়ের উপর এসে পড়ে, আর সে যেখানে বসে ছিল, সে স্থানটি রক্তাপ্লুত হয়ে যায়।
পরদিন সকালে এ ব্যাপারে যখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আলোচনা হয়, তখন তিনি সকলকে একত্রিত করে বলেনঃ আমি আল্লাহ্র নামে শপথ করে এ ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে জানতে চাই এবং ইহা তার জন্য আমার হক স্বরূপ। তাই, যে ব্যক্তি তাকে হত্যা করেছে, সে যেন দাঁড়িয়ে যায়। সে সময় অন্ধ লোকটি লোকদের সারি ভেদ করে প্রকম্পিত অবস্থায় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে গিয়ে বসে পড়ে এবং বলেঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি তার হন্তা।
সে আপনার সম্পর্কে কটুক্তি ও গালি-গালাজ করতো। আমি তাকে এরূপ করতে নিষেধ করতাম ও ধমকাতাম। কিন্তু সে তার প্রতি কর্ণপাত করতো না। ঐ দাসী থেকে আমার দু’টি সন্তান আছে, যারা মনি-মুক্তা সদৃশ এবং সেও আমার প্রিয় ছিল। কিন্তু গত রাতে সে যখন পুনরায় আপনার সম্পর্কে কটুক্তি গাল-মন্দ করতে থাকে, তখন আমি আমার উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি এবং ছোরা দিয়ে তার পেটে প্রচন্ড আঘাত করে তাকে হত্যা করি। তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমরা সাক্ষী থাক যে, ঐ দাসীর রক্ত ক্ষতিপূরণের অযোগ্য বা মূল্যহীন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)
বুলুগুল মারাম
পর্ব – ৯ঃ অপরাধ প্রসঙ্গ
পরিচ্ছেদঃ ৪. সম্পদ রক্ষার্থে নিহত হওয়া ব্যক্তি প্রসঙ্গে – নাবী (ﷺ) এর নিন্দাকারীদেরকে হত্যা করা আবশ্যক
১২০৪। ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত;কোন এক অন্ধ সাহাবীর একটা সন্তানের মাতা দাসী ছিল, সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে গালি দিত এবং তাঁর প্রসঙ্গে অশোভনীয় মন্তব্য করত। সাহাবী তাকে নিষেধ করতেন কিন্তু সে বিরত হত না। এক রাত্রে অন্ধ সাহাবী (তার এরূপ দুব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে) কুড়ালি জাতীয় এক অস্ত্র দিয়ে ঐ দাসীর পেটে বাসিয়ে দেন ও তার উপর বসে যান ও তাকে হত্যা করে ফেললেন। এ সংবাদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকটে পৌছালে তিনি বলেন: তোমরা সাক্ষী থাক, এ খুন বাতিল এ জন্য কোন খেসারত দিতে হবে না।[1]
[1] আবূ দাউদ ৪৩৬১, নাসায়ী ৪০৭০।
ইকরিমাহ (রহঃ) হতে। তিনি বলেন, ‘আলী (রাঃ)-এর কাছে একদল ফিন্দীককে (নাস্তিক ও ধর্মত্যাগীকে) আনা হল। তিনি তাদেরকে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিলেন। এ ঘটনা ইবনু আব্বাস (রাঃ)-এর কাছে পৌছলে তিনি বললেন, আমি কিন্তু তাদেরকে পুড়িয়ে ফেলতাম না। কেননা, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিষেধাজ্ঞা আছে যে, তোমরা আল্লাহর শাস্তি দ্বারা শাস্তি দিও না। বরং আমি তাদেরকে হত্যা করতাম। কারণ, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশ আছে ……………. অতঃপর উপরোক্ত হাদীসটি বর্ণনা করলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)
সুনান আন-নাসায়ী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৮/ হত্যা অবৈধ হওয়া
পরিচ্ছেদঃ ১৬. রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে মন্দ বলার শাস্তি
৪০৭১. উসমান ইবন আবদুল্লাহ (রহঃ) … উসমান শাহহাম (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এক অন্ধ লোকের চালক ছিলাম। একদা তাকে নিয়ে ইকরিমার কাছে গেলাম। তিনি আমাদের কাছে বর্ণনা করলেন যে, ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সময় এক অন্ধ লোক ছিল। তার এক দাসী ছিল, যার গর্ভে তার দুই ছেলে জন্মে। সে দাসী সর্বদাই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা উল্লেখ করে তাঁকে মন্দ বলতো। অন্ধ ব্যক্তিটি তাকে এজন্য তিরস্কার করতো, কিন্তু সে তাতে কর্ণপাত করত না। তাকে নিষেধ করত, কিন্তু তবুও বিরত হত না। অন্ধ লোকটি বলেন, একরাত্রে আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা উল্লেখ করলে সে তার নিন্দা করতে শুরু করল। আমার তা সহ্য না হওয়ায় আমি একটি হাতিয়ার নিয়ে তার পেটে বিদ্ধ করলাম। তাতে সে মারা গেল।
ভোরে লোক তাকে মৃতাবস্থায় দেখে ব্যাপারটি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খিদমতে জানাল। তিনি সকল লোককে একত্র করে বললেনঃ আমি আল্লাহর কসম দিয়ে ঐ ব্যক্তিকে বলছি, যে এমন কাজ করেছে সে আসুক। একথা শুনে ঐ অন্ধ ব্যক্তি ভয়ে উঠে এসে হাযির হলেন এবং বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি এই কাজ করেছি। সে আমার বাদী ছিল, আমার অত্যন্ত স্নেহশীলা ছিল, সঙ্গিণী ছিল। তার গর্ভের আমার দুটি ছেলে রয়েছে, যারা মুক্তাসদৃশ। কিন্তু সে প্রায় আপনাকে মন্দ বলতো, গালি দিত। আমি নিষেধ করলেও সে কর্ণপাত করতো না। তিরস্কার করলেও সে নিবৃত্ত হতো না। অবশেষে গত রাতে আমি আপনার উল্লেখ করলে সে আপনাকে মন্দ বলতে আরম্ভ করল। আমি একটি অস্ত্র উঠিয়ে তার পেটে রেখে চেপে ধরি, তাতে সে মারা যায়। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা সাক্ষী থাক, ঐ দাসীর রক্তের কোন বিনিময় নেই।
তাহক্বীকঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উসমান শাহহাম (রহঃ)
এই হাদিসগুলো তাই শুধু একটি ঐতিহাসিক বর্ণনা নয়; এটি একটি নৈতিক দলিল, যেখানে দেখা যায় ইসলাম নবী-সমালোচনা বা নবী-নিন্দার ক্ষেত্রে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে অন্তত এই বর্ণনার কাঠামোর মধ্যে নৈতিকভাবে সমর্থন দিয়েছে। এখানে মানবজীবন নয়, মতাদর্শের সম্মান মুখ্য। এখানে ন্যায়বিচার নয়, আনুগত্য মুখ্য। এখানে যুক্তি নয়, ভয় মুখ্য। যে ব্যবস্থায় একজন পাবলিক ধর্মীয়-রাজনৈতিক নেতার সমালোচনা বা কটূক্তির জবাবে একজন অধীনস্থ নারীকে হত্যা করা যায় এবং সেই হত্যাকে রক্তমূল্যহীন বলা হয়, সেই ব্যবস্থাকে নৈতিক বলা যায় না; তাকে বলা উচিত ধর্মীয় কর্তৃত্বের নামে বৈধতা পাওয়া নির্মম বর্বরতা।
শায়খ মতিউর রহমান মাদানি
শায়খ আহমদুল্লাহ
হাদিসের বিবরণের সমস্যাবলী
এই হাদিসের নৈতিক সমস্যা শুধু এই নয় যে একজন নারীকে হত্যা করা হয়েছে। সমস্যা আরও গভীর। এখানে একটি কথিত “গালি” বা “নবী-নিন্দা”কে এমন অপরাধে পরিণত করা হয়েছে, যার শাস্তি হিসেবে একজন মানুষকে আদালত, বিচার, সাক্ষ্যপ্রমাণ, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং আনুপাতিক দণ্ডের ন্যূনতম নীতিও না মেনে হত্যা করা যায়। অর্থাৎ এই বর্ণনায় ইসলামি নৈতিকতা শুধু ব্লাসফেমির জন্য মৃত্যুদণ্ডের ধারণাই বহন করছে না; বরং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকেও নৈতিক বৈধতা দিচ্ছে। এটিই এই হাদিসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক।
একজন মানুষ কারো সম্পর্কে কটু কথা বলেছে—এই অভিযোগ নিজেই একটি ভাষাগত, ব্যাখ্যাগত এবং প্রমাণগত বিষয়। কোন বাক্যটি গালি? কোন বাক্যটি সমালোচনা? কোন বাক্যটি ব্যঙ্গ? কোন বাক্যটি রাজনৈতিক নিন্দা? কোন বাক্যটি ধর্মীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ? এগুলো বিচার করতে হলে নিরপেক্ষ অনুসন্ধান দরকার। অভিযুক্তের বক্তব্য শুনতে হয়। প্রেক্ষাপট জানতে হয়। সাক্ষ্য যাচাই করতে হয়। কিন্তু এই হাদিসের ঘটনায় এসব কিছুই নেই। হত্যাকারীর বক্তব্যই প্রমাণ, হত্যাকারীর ক্ষোভই বিচার, হত্যাকারীর অস্ত্রই রায়। এই কাঠামো ন্যায়বিচার নয়; এটি ধর্মীয় অনুভূতির নামে ব্যক্তিগত প্রতিশোধকে বৈধতা দেওয়া।
আরও গুরুতর বিষয় হলো, ভিকটিম একজন স্বাধীন ক্ষমতাসম্পন্ন নাগরিক নন; তিনি একজন দাসী, একজন অধীনস্থ নারী, যার শরীর ও জীবন আগেই মালিকানার কাঠামোর মধ্যে বন্দী। এই অবস্থায় তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আরও সন্দেহজনক, কারণ সে মৃত; তার নিজের বক্তব্য নেই, নিজের আত্মপক্ষ নেই, নিজের কোনো সাক্ষ্য নেই। যে পুরুষ তাকে হত্যা করেছে, সেই পুরুষই তার বিরুদ্ধে অভিযোগের একমাত্র কার্যকর বর্ণনাকারী। অর্থাৎ ক্ষমতাবান পুরুষের দাবি গ্রহণ করা হয়েছে, কিন্তু নিহত নারীর মানবিক অস্তিত্ব কার্যত মুছে ফেলা হয়েছে। এটি কেবল নারী-বিদ্বেষী ক্ষমতার চর্চা নয়; এটি দাসপ্রথা, পিতৃতন্ত্র এবং ধর্মীয় কর্তৃত্বের সম্মিলিত নৃশংসতা।
হাদিসের বিবরণে হত্যার ধরনও বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তাকে গ্রেফতার করা হয়নি, আদালতে নেওয়া হয়নি, কোনো বিচারকের সামনে দাঁড় করানো হয়নি; বরং রাতের অন্ধকারে ধারালো অস্ত্র দিয়ে পেটে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। এটি কোনো আইনি দণ্ড কার্যকর করার ঘটনা নয়; এটি সরাসরি ব্যক্তিগত হত্যাকাণ্ড। কিন্তু নবী মুহাম্মদ এই হত্যাকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে দেখাননি। তিনি হত্যাকারীকে দণ্ড দেননি। বরং নিহত নারীর রক্তকে মূল্যহীন ঘোষণা করেছেন। এই ঘোষণার নৈতিক অর্থ অত্যন্ত স্পষ্ট: নবীকে গালি দেওয়ার অভিযোগ উঠলে হত্যাকারীর অপরাধ মুছে যেতে পারে, নিহত মানুষের রক্তের মূল্য বাতিল হয়ে যেতে পারে।
এই ঘটনার আরেকটি গুরুতর সমস্যা হলো শাস্তির পূর্বঘোষণার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি। হাদিসের কোথাও বলা হয়নি যে, এই হত্যাকাণ্ডের আগে মুহাম্মদ ঘোষণা করেছিলেন—তাঁকে গালি দিলে শাস্তি মৃত্যু, কিংবা যে কেউ ব্যক্তিগত উদ্যোগে সেই শাস্তি কার্যকর করতে পারবে। অন্ধ ব্যক্তি নারীটিকে বারবার নিষেধ ও ভর্ৎসনা করেছে বলে দাবি করেছে, কিন্তু তাকে কখনো বলেনি যে তার কথার জন্য কোনো ঘোষিত আইনে মৃত্যুদণ্ড রয়েছে। হত্যার পরে মুহাম্মদ যখন অপরাধীকে সামনে আসতে বলেন, তখন লোকটি “কাঁপতে কাঁপতে” তাঁর সামনে উপস্থিত হয়; অর্থাৎ বর্ণনার মধ্যেই এমন কোনো নিশ্চয়তার লক্ষণ নেই যে সে একটি পূর্বঘোষিত ও অনুমোদিত শরয়ি দণ্ড কার্যকর করেছে এবং নিজের শাস্তিমুক্তি সম্পর্কে নিশ্চিত ছিল। বরং ঘটনাক্রমটি উল্টো: প্রথমে ব্যক্তিগত ক্রোধে একজন নারীকে হত্যা করা হলো, তারপর হত্যাকারীর একতরফা বক্তব্য শোনার পরে মুহাম্মদ ঘোষণা করলেন যে নিহত নারীর রক্ত মূল্যহীন। ফলে এই বর্ণনাকে যদি “নবীকে গালি দেওয়ার আইনি শাস্তি” প্রতিষ্ঠার দলিল ধরা হয়, তাহলে স্বীকার করতে হয় যে প্রথম শাস্তিটি কার্যকর হয়েছে আইনটি স্পষ্টভাবে ঘোষিত ও অভিযুক্তকে অবহিত করার আগেই। নারীটি জানত না তার কথার জন্য মৃত্যুদণ্ড নির্ধারিত, জানার সুযোগও তাকে দেওয়া হয়নি; অথচ অঘোষিত একটি বিধানকে হত্যার পরে প্রয়োগ করে তার জীবন কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আধুনিক বিচারনীতির ভাষায় এটি আইন প্রণয়নের আগেই শাস্তি দেওয়া—অর্থাৎ “পূর্বঘোষিত আইন ছাড়া শাস্তি নয়” এবং আইনের অপ্রত্যাবর্তনশীলতার মৌলিক নীতির সরাসরি লঙ্ঘন।
এই জায়গায় ইসলামি বর্ণনার নৈতিকতা সম্পূর্ণ উল্টো হয়ে যায়। সাধারণ নৈতিকতার চোখে হত্যাই সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ; কিন্তু এই বর্ণনার চোখে গালি বেশি গুরুতর, আর খুন হয়ে যায় গ্রহণযোগ্য প্রতিক্রিয়া। সাধারণ ন্যায়বিচারে মানুষ হত্যা করলে হত্যাকারী অভিযুক্ত হয়; এখানে নিহত নারীই কার্যত অপরাধী, আর হত্যাকারী নবী-সম্মান রক্ষাকারী। সাধারণ বিচারব্যবস্থায় আদালত অপরিহার্য; এখানে ব্যক্তিগত ক্রোধই বিচারব্যবস্থার বিকল্প। এই নৈতিক উল্টো-দুনিয়াকে “পবিত্র আইন” বলে চালানো আসলে বর্বরতাকে ধর্মীয় মর্যাদা দেওয়া ছাড়া আর কিছু নয়।
এর সামাজিক পরিণতি অত্যন্ত বিপজ্জনক। যখন একটি ধর্মীয় বর্ণনা শেখায় যে নবীকে গালি দেওয়া হলে হত্যাকারীর রক্তদায় নেই, তখন তা বাস্তব সমাজে ব্লাসফেমি-হত্যা, মব লিঞ্চিং, চাপাতি হামলা, ফতোয়া-সন্ত্রাস এবং ব্যক্তিগত প্রতিশোধকে নৈতিক শক্তি দেয়। তখন যে কেউ বলতে পারে—“সে নবীকে অপমান করেছে”—এবং সেই অভিযোগই সহিংসতার অজুহাতে পরিণত হতে পারে। এমন একটি মতবাদে প্রমাণের চেয়ে আবেগ শক্তিশালী, আদালতের চেয়ে জনতার উন্মাদনা শক্তিশালী, আর মানুষের জীবনের চেয়ে ধর্মীয় অহংকার বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে।
এই হাদিস তাই কোনো বিচ্ছিন্ন গল্প নয়; এটি এক ধরনের নৈতিক মানচিত্র। সেই মানচিত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কোনো মর্যাদা নেই, অভিযুক্তের ন্যায্য বিচারের অধিকার নেই, দাসী নারীর মানবিক মর্যাদা নেই, এবং কথিত ধর্মীয় অপমানের তুলনায় মানুষের জীবন তুচ্ছ। এই কাঠামোতে নবীর সম্মান রক্ষার নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে শুধু সহ্য করা হয় না; সেটিকে বৈধতা দেওয়া হয়। এই বৈধতাই আধুনিক সভ্যতার চোখে সবচেয়ে নিন্দনীয়, কারণ যে মতবাদ কথার জবাবে আদালত নয়, যুক্তি নয়, পাল্টা বক্তব্য নয়, বরং রক্ত চায়—সেটি নৈতিকতার নয়, সন্ত্রাসের ভাষায় কথা বলে।
- এটি মতপ্রকাশের অপরাধকে প্রাণদণ্ডে রূপান্তর করে: গালি, কটূক্তি বা সমালোচনার মতো অশারীরিক, অপারিমেয় এবং ব্যাখ্যাযোগ্য বিষয়কে এমন অপরাধ বানানো হয়েছে যার জবাব মৃত্যু। এটি আনুপাতিক ন্যায়বিচারের সম্পূর্ণ বিপরীত।
- এটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধতা দেয়: হত্যাকারী আদালতে প্রমাণ পেশ করেনি, অভিযুক্তের বক্তব্য শোনা হয়নি, কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া ছিল না। তবু হত্যাকে রক্তমূল্যহীন বলা হয়েছে।
- এটি ক্ষমতাহীন নারীর বিরুদ্ধে ক্ষমতাবান পুরুষের সহিংসতাকে অনুমোদন করে: নিহত ব্যক্তি একজন দাসী নারী; তার কোনো স্বাধীন সামাজিক অবস্থান নেই। তার জীবনের মূল্য মালিকের ধর্মীয় আনুগত্যের নিচে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে।
- এটি পাবলিক ফিগারের সমালোচনাকে অপরাধ বানায়: নবী মুহাম্মদ শুধু ব্যক্তিগত ধর্মীয় চরিত্র নন; তিনি আইনদাতা, শাসক, সামরিক নেতা এবং সমাজ-সংগঠক। এমন ব্যক্তিকে কঠোরভাবে সমালোচনা করা জনগণের অধিকার হওয়া উচিত, অপরাধ নয়।
- এটি ভবিষ্যৎ সহিংসতার নৈতিক বীজ বপন করে: “নবীকে গালি দিয়েছে” অভিযোগটি যখন হত্যার বৈধ কারণ হয়ে যায়, তখন ধর্মীয় উন্মাদরা আইন ও বিচারকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে। এর ফলই ব্লাসফেমির নামে খুন, লিঞ্চিং ও সন্ত্রাস।
সুতরাং এই হাদিসকে নিরীহ ধর্মীয় বর্ণনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এমন এক নৈতিক আদর্শের দলিল, যেখানে একজন পাবলিক ধর্মীয়-রাজনৈতিক নেতার মর্যাদা রক্ষার নামে একজন অধীনস্থ নারীকে হত্যা করা যায়, এবং সেই হত্যাকে রক্তমূল্যহীন ঘোষণা করা যায়। আধুনিক মানবিক ন্যায়বিচারের ভাষায় এর নাম ন্যায় নয়, ধর্মীয় বৈধতাপ্রাপ্ত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। আর যে মতবাদ এ ধরনের হত্যাকে নৈতিকতা হিসেবে পেশ করে, তাকে বিন্দুমাত্র কোমল ভাষায় “ভিন্ন সংস্কৃতির আইন” বলা যায় না; তাকে স্পষ্ট ভাষায় বলতে হয়—এটি বর্বর, অমানবিক এবং সভ্য বিচারনীতির শত্রু।
উপসংহার
এই হাদিস ও তার ওপর নির্মিত ধর্মীয় ব্যাখ্যাগুলো আমাদের সামনে এক ভয়ঙ্কর নৈতিক বাস্তবতা উন্মোচন করে: এখানে মানুষের প্রাণের চেয়ে নবীর মর্যাদাকে বেশি মূল্য দেওয়া হয়েছে, ন্যায়বিচারের চেয়ে ধর্মীয় আনুগত্যকে বড় করা হয়েছে, আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতার চেয়ে আহত ধর্মীয় অনুভূতিকে হত্যার বৈধ কারণ বানানো হয়েছে। একজন মানুষ কটু কথা বলেছে—এই অভিযোগে তাকে আদালতে নেওয়া হলো না, তার বক্তব্য শোনা হলো না, সাক্ষ্যপ্রমাণ যাচাই হলো না, অপরাধের মাত্রা বিচার করা হলো না; বরং ব্যক্তিগত উদ্যোগে তাকে হত্যা করা হলো। এরপর সেই হত্যাকে “রক্তমূল্যহীন” বলা হলো। এটি ন্যায়বিচার নয়; এটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ধর্মীয় অনুমোদন।
সভ্য ন্যায়নীতির মূল কথা হলো—অপরাধ প্রমাণের আগে কেউ অপরাধী নয়, অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার আছে, শাস্তি হতে হবে অপরাধের সঙ্গে আনুপাতিক, এবং কোনো ব্যক্তিকে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার দেওয়া যায় না। কিন্তু এই হাদিসে সেই সব নীতিকে পদদলিত করা হয়েছে। এখানে অভিযোগকারীই বিচারক, ক্ষুব্ধ অনুসারীই জল্লাদ, আর ধর্মীয় কর্তৃত্ব হত্যাকারীর রক্তদায় মুছে দেয়। এই কাঠামো কোনোভাবেই নৈতিক বিচারব্যবস্থা নয়; এটি আইনের বদলে আনুগত্য, যুক্তির বদলে ভয়, এবং মানবমর্যাদার বদলে মতাদর্শের অহংকার প্রতিষ্ঠা করে।
যে সমাজে “নবীকে গালি দিয়েছে” অভিযোগটি হত্যার নৈতিক অজুহাত হয়ে যায়, সেখানে কেউ নিরাপদ থাকে না। কারণ গালি, কটূক্তি, ব্যঙ্গ, সমালোচনা—এসব ভাষাগত ও ব্যাখ্যাযোগ্য বিষয়। একজনের কাছে যা প্রশ্ন, অন্যজনের কাছে তা অপমান; একজনের কাছে যা ঐতিহাসিক সমালোচনা, অন্যজনের কাছে তা অবমাননা; একজনের কাছে যা রাজনৈতিক নিন্দা, অন্যজনের কাছে তা ধর্মদ্রোহ। এমন অস্পষ্ট অভিযোগকে যদি হত্যার কারণ বানানো হয়, তাহলে আইনের প্রয়োজন থাকে না; থাকে শুধু উন্মত্ত জনতা, ধর্মীয় নেতা, ফতোয়া এবং সহিংস অনুসারী। এই কারণেই ব্লাসফেমি-সংস্কৃতি শেষ পর্যন্ত যুক্তি নয়, বরং রক্তের রাজনীতি তৈরি করে।
পাবলিক ফিগারদের সমালোচনা করা মানুষের অধিকার। নবী মুহাম্মদ যদি শুধু ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক চরিত্র হতেন, তবুও তাঁকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখা যেত না। কিন্তু তিনি ইসলামি বর্ণনায় আইনদাতা, বিচারক, সামরিক নেতা, রাষ্ট্রনায়ক, ধর্মপ্রচারক এবং সামাজিক বিধানের উৎস। তাঁর নামে আজও নারী, শিশু, অমুসলিম, নাস্তিক, সমকামী, ধর্মত্যাগী, সমালোচক এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের জীবন প্রভাবিত হয়। অতএব তাঁকে কঠোরভাবে বিশ্লেষণ, সমালোচনা, নিন্দা, ব্যঙ্গ এবং প্রত্যাখ্যান করার অধিকার মানুষের থাকা আবশ্যক। যে মতবাদ এই অধিকারকে হত্যা দিয়ে দমন করতে চায়, সেটি সত্যের পক্ষে নয়; সেটি ক্ষমতার পক্ষে।
এই প্রবন্ধে আলোচিত বর্ণনার মূল নৈতিক বার্তা তাই অস্পষ্ট নয়: নবীর সম্মান রক্ষার নামে একজন মানুষকে বিচার ছাড়াই হত্যা করা হয়েছে, এবং সেই হত্যাকে ধর্মীয় কর্তৃত্ব বৈধতা দিয়েছে। এটিকে কোমল ভাষায় “ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট”, “ধর্মীয় সংবেদনশীলতা” বা “শাস্তির বিধান” বলা সত্যকে আড়াল করা। সোজা ভাষায় বলতে হবে—এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে সহিংসতা, মানবমর্যাদার বিরুদ্ধে অপরাধ, বিচারনীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, এবং ধর্মীয় কর্তৃত্বের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যার নৈতিক বৈধতা। যে মতবাদ কথার জবাবে যুক্তি নয়, আদালত নয়, প্রমাণ নয়, বরং হত্যা চায়—তাকে সভ্যতার মাপকাঠিতে নৈতিক বলা যায় না। সেটি বর্বরতা, এবং বর্বরতাকে পবিত্র বললেই তা ন্যায়ে পরিণত হয় না।

