জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

অমুসলিমদের রক্তদান জায়েজ নেই

প্রকাশিত: জানুয়ারি 17, 2025 · লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন · 4 মিনিট পড়া

ভূমিকা

ইসলামিক শরীয়াহর বহু বিধান ও ফতোয়া থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়—এই ধর্মব্যবস্থার নৈতিক কেন্দ্রবিন্দু “মানব” বা “মানব কল্যাণ” নয়, বরং এই ব্যবস্থার কেন্দ্রে থাকে শুধুমাত্র “মুসলমান”। অমুসলিমের প্রতি মানবিকতা, সহমর্মিতা কিংবা সমঅধিকার—এসব বিষয় ইসলামি কাঠামোর বাইরে পড়ে যায়। বিশেষত যখন ফতোয়ায় বলা হয়, “অমুসলিমদের যদি ইসলামে আসার সম্ভাবনা থাকে তবেই তাদের জীবন রক্ষা করার জন্য রক্ত দেয়া হালাল, অন্যথায় নয়”, তখন এই ধর্মীয় চিন্তার অন্তর্নিহিত নৈতিক দেউলিয়াত্ব প্রকট হয়ে ওঠে।

এই বিধান মূলত ঘোষণা করে যে একজন মানুষের জীবনের মূল্য নির্ভর করবে তার ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর, তার মানবিক অস্তিত্বের ওপর নয়। এটি মানবসমতার ধারণাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়—যে নীতি আধুনিক সভ্যতার ভিত্তি। এ ধরনের ফতোয়া কেবল ধর্মীয় নয়, বরং সমাজবিনাশী ঘৃণার তাত্ত্বিক কাঠামো। এর মাধ্যমে ‘অবিশ্বাসী’ বা ‘কাফের’কে এক প্রকার “নৈতিকভাবে হত্যা-যোগ্য সত্তা” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

এই মতবাদের বিপজ্জনক দিক হলো—এটি বিশ্বাসকে রক্তের মূল্য নির্ধারণের একমাত্র মাপকাঠি বানায়। অর্থাৎ, একজন মানুষ যদি ইসলামে প্রবেশ করতে রাজি থাকে, তবে তার রক্ত মূল্যবান; কিন্তু যদি সে নিজের বিশ্বাসে অটল থাকে, তবে তার রক্ত হালাল। এমন ধারণা কেবল ঘৃণাই নয়, এটি নৈতিক গণহত্যার তত্ত্ব—যেখানে সহিষ্ণুতার কোনো স্থান নেই, মানবিক বিবেকের কোনো অধিকার নেই।

এই ফতোয়াগুলোর ভেতরে যে চিন্তা লুকিয়ে আছে, তা হচ্ছে ধর্মীয় একচেটিয়া আধিপত্য—যেখানে অন্য ধর্ম বা মতের অস্তিত্বই এক ধরনের “অপবিত্রতা” হিসেবে বিবেচিত। এর ফলে ইসলাম মানবজাতিকে দুই ভাগে ভাগ করে—“আল্লাহর দল” এবং “অমুসলিম বা কাফের বা শয়তানের দল”। এই বিভাজন রাজনীতি ও সমাজে এমন এক শত্রুতার মানসিকতা সৃষ্টি করে যা অবশেষে সন্ত্রাস, হত্যাযজ্ঞ এবং বৈষম্যের ভিত রচনা করে।

নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি এক গভীর পতন। কোনো সভ্য সমাজে জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত ধর্মবিশ্বাসের ওপর নির্ভর করতে পারে না। যে চিন্তা অন্য বিশ্বাসীর জীবনের মূল্য অস্বীকার করে, সেটি মানবিক বিবর্তনের বিপরীতে অবস্থান করে। এই কারণেই ইসলামের এই বিধান কেবল অমানবিক নয়—এটি বিবেক, ন্যায়, ও সভ্যতার বিরুদ্ধে এক প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্বেষের দলিল।


অমুসলিমদের রক্তদান সম্পর্কিত বিধান

ইসলামের শরীয়তের বিধান হচ্ছে, খ্রিস্টানদের যদি ইসলামে আসার সম্ভাবনা থাকে, শুধুমাত্র তখন তাদের রক্ত দিয়ে জীবন রক্ষা করা হালাল। অন্যথায় হালাল নয়। আর মুশরিক অর্থাৎ হিন্দু বৌদ্ধদের রক্ত তো মুসলিমানদের জন্য একদমই হালাল! আসুন শুরুতেই শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ইসলামিক আলেম আল্লামা আলবানীর ফতোয়া পড়ে নিই [1]

প্রশ্ন ৪৭০: কোনো খ্রিস্টানকে কি রক্তদান করা যাবে?
জবাব: যদি আপনার মাঝে ও তার মাঝে ভালো সম্পর্ক থাকে এবং তাকে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করার নিয়তে দান করেন, তাহলে জায়েয। অন্যথা জায়েয নয়।

রক্ত

এবারে আসুন ইত্তেফাক পত্রিকার একটি পাতা দেখে নেয়া যাক, যেখানে অত্যন্ত সাম্প্রদায়িক এবং অমানবিক একটি ফতোয়া ছাপা হয়েছিল,

অমুসলিমদের রক্ত দেওয়া বা নেওয়া : অমুসলিম থেকে রক্ত নেওয়া ঠিক নয়। তবে রক্ত নিয়ে নিলে এতে করে মুসলমান রোগী কাফের হয়ে যাবে না। তার সন্তানাদিও কাফের হয়ে জন্ম নেবে না। তবে এ কথা স্পষ্ট যে, কাফের, পাপিষ্ঠ ব্যক্তিদের রক্তে যে খারাপ প্রভাব থাকে এর প্রভাব খোদাভীরু মুসলমানের রক্তে পড়ার শক্তিশালী সম্ভাবনা বিদ্যমান। এজন্য যথাসম্ভব এদের রক্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকাই উচিত। হ্যাঁ, তাদের রক্ত দিতে কোনো সমস্যা নেই। (ফাতাওয়া মাহমুদিয়া : ১৮/৩৩৩; জাওয়াহিরুল ফিকহ : ২/৪০ )

রক্ত 1

এবারে আসুন বাংলাদেশের একটি টিভি চ্যানেলে একটি ইসলামিক প্রশ্নোত্তর শুনে নেয়া যাক,


মুশরিকদের রক্ত হালাল?

এবারে আমরা একটি বিখ্যাত আকিদা গ্রন্থ থেকে দেখে নিবো, অমুসলিমদের বিশেষ করে মুশরিকদের রক্ত সম্পর্কে ইসলামের হুকুমত এবং বিধান আসলে কী [2]

রক্ত 3
রক্ত 5
রক্ত 7
রক্ত 9

উপরের আলোচনা থেকে বোঝা যাচ্ছে, কাফেরদের রক্ত মুসলিমদের জন্য সাধারণভাবে হালাল, এর অর্থ কি তা পাঠকদের হাতেই ছেড়ে দিচ্ছি। এত ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক এবং ঘৃনাত্মক বই সরাসরি সৌদি সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ছাপাখানা থেকেই প্রকাশিত হচ্ছে। এবারে প্রখ্যাত বাংলাদেশের আলেম এবং ইসলামী ফিকাহ শাস্ত্রের অন্যতম পণ্ডিত ড. আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়ার সম্পাদনায় প্রকাশিত মো আব্দুল কাদেরের বই বাংলাদেশে প্রচলিত শির্ক বিদ‘আত ও কুসংস্কার পর্যালোচনা গ্রন্থ থেকে পড়ি। সেখানে পরিষ্কারভাবেই বলা আছে যে, শিরক হচ্ছে হত্যাযোগ্য অপরাধ। যারা শিরক করে, তাদের রক্ত মুসলিমদের জন্য হালাল [3]

রক্ত 11

উপসংহার

সার্বিকভাবে এই নিবন্ধটি সেইসব প্রমাণ উপস্থাপন করছে যে, ইসলামিক ফতোয়া ও বিধান অনুযায়ী রক্তদান বা জীবন রক্ষার মতো নিছক মানবিক বিষয়টিও ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। যখন কোনো মুমূর্ষু মানুষের জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে তার ধর্মবিশ্বাস বা ইসলাম গ্রহণের সম্ভাবনাকে শর্ত হিসেবে জুড়ে দেওয়া হয়, তখন তা আধুনিক সভ্যতার মূল ভিত্তি—‘মানবিক সমতা’ ও ‘সর্বজনীন মানবাধিকারকে’ চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। অমুসলিমদের রক্ত বা জীবনকে ধর্মীয় নিক্তিতে পরিমাপ করা কেবল সাম্প্রদায়িক দূরত্বই বাড়ায় না, বরং তা মানবজাতিকে ‘বিশ্বাসী’ ও ‘অবিশ্বাসী’—এই দুই বিপজ্জনক ভাগে বিভক্ত করে দেয়। পরিশেষে বলা যায়, একটি যুক্তিভিত্তিক ও মানবিক সমাজ বিনির্মাণের জন্য মানুষের জীবনের মূল্য তার বিশ্বাসের ওপর নয়, বরং তার মানুষ পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হওয়া উচিত। একটি সভ্য সমাজে জীবন রক্ষার মাপকাঠি হওয়া উচিত কেবলই ‘মানবতা’।


তথ্যসূত্রঃ
  1. ফাতাওয়ায়ে আলবানী, আল্লামা মুহাম্মদ নাসীরুদ্দীন আলবানী (রহঃ) , মুহাম্মাদ শহীদুল্লাহ খান মাদানী (অনুবাদক) , শাইখ আব্দুল্লাহ মাহমুদ (অনুবাদক) , শাইখ ড. আব্দুল্লাহ ফারুক সালাফী (অনুবাদক), পৃষ্ঠা ৩৫৫ ↩︎
  2. আল-ইতকান ফি তাওহীদ আর-রহমান, শাইখ আব্দল্লাহ আল মুনির, পৃষ্ঠা ১৪-১৭, ২৫-২৭ ↩︎
  3.  বাংলাদেশে প্রচলিত শির্ক বিদ‘আত ও কুসংস্কার পর্যালোচনা ২. শির্কের পরিণতি ↩︎

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

Leave a comment

Your email will not be published.