
Table of Contents
ভূমিকা
প্রাচীন সভ্যতা থেকে শুরু করে মধ্যযুগীয় ধর্মীয় শাস্ত্রসমূহ পর্যন্ত—মানবজাতির আকাশ পর্যবেক্ষণের ইতিহাসে ‘সপ্ত আসমান’ বা সাতটি স্বর্গীয় স্তরের ধারণাটি একটি কেন্দ্রীয় স্থান দখল করে আছে। তবে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান, বায়ুমণ্ডলীয় পদার্থবিদ্যা এবং মহাকাশ গবেষণার অগ্রগতির ফলে এই ধারণাটি এখন কেবল একটি তাত্ত্বিক প্রত্নবস্তু বা পৌরাণিক রূপকথায় পর্যবসিত হয়েছে। এই প্রবন্ধে আমরা বিজ্ঞান ও যুক্তির নিরিখে আকাশ সংক্রান্ত ধর্মীয় ধারণা এবং ইসলামের ঐতিহাসিক উৎসগুলোর বিশ্লেষণ করব।
আকাশের বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা ও দৃষ্টিবিভ্রম
বিজ্ঞান আকাশকে কোনো কঠিন আবরণ বা সীমাবদ্ধ বস্তু হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে না। আমরা যাকে ‘আকাশ’ বলি, তা মূলত পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল এবং এর বাইরের অসীম মহাশূন্যের একটি দৃশ্যমান রূপ মাত্র। দিনের বেলা আকাশের নীল রঙের নেপথ্যে রয়েছে লর্ড র্যালের (Lord Rayleigh) আবিষ্কৃত ‘র্যালে বিক্ষেপণ’ (Rayleigh Scattering) তত্ত্ব।
সূর্য থেকে আগত সাদা আলো যখন বায়ুমণ্ডলের গ্যাসীয় অণু ও ক্ষুদ্র কণা দ্বারা বাধাগ্রস্ত হয়, তখন তা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই বিক্ষেপণের মাত্রা আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের চতুর্থ ঘাতের ব্যস্তানুপাতিক:
যেহেতু নীল ও বেগুনি আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য কম, তাই এই আলোগুলো বেশি বিক্ষিপ্ত হয়। আমাদের চোখ নীল আলোর প্রতি বেশি সংবেদনশীল হওয়ায় আমরা আকাশকে নীল দেখি। মহাকাশচারীরা যখন বায়ুমণ্ডল অতিক্রম করেন, তখন তারা দেখেন আকাশ আসলে নিকষ কালো, কারণ সেখানে আলো বিক্ষেপ করার মতো কোনো বায়ুমণ্ডলীয় মাধ্যম নেই। সুতরাং, আকাশ কোনো ‘ছাদ’ বা ‘আবরণ’ নয়, বরং এটি একটি অপটিক্যাল ইলিউশন বা দৃষ্টিবিভ্রম।
ইসলামিক সৃষ্টিতত্ত্বঃ সাত আসমান ও সাত যমীনের ধারণা
ইসলামিক ধর্মগ্রন্থ, নবী মুহাম্মদ ও তার সাহাবীগণের বিশ্বাস ও তাফসীর গ্রন্থসমূহের বিবরণ অনুসারে, মহাবিশ্ব সাতটি স্তরীভূত আসমান এবং অনুরূপ সাতটি যমীন দ্বারা গঠিত। আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে এই ধারণার কয়েকটি মৌলিক অসঙ্গতি লক্ষণীয়:
- সপ্ত যমীন: ‘সাতটি পৃথিবী’ বা যমীনের অস্তিত্বের কোনো ভৌগোলিক বা ভূতাত্ত্বিক প্রমাণ নেই। পৃথিবীর অভ্যন্তরভাগ ম্যান্টল এবং কোর (কেন্দ্রীয় মণ্ডল) দ্বারা গঠিত, যা কোনোভাবেই সাতটি পৃথক ‘বসবাসযোগ্য পৃথিবীর’ কাঠামোর সাথে মেলে না। মুফতি ইব্রাহীমের মতো ধর্মীয় বক্তারা যখন দাবি করেন মাটির নিচে মানুষ বা অন্য জগত আছে, তা ভূতত্ত্বের (Geology) মৌলিক নিয়মের পরিপন্থী।
- আসমানের কঠিন পদার্থ: তাফসীরে জালালাইন এবং আল্লামা বাগাবীর বর্ণনা অনুযায়ী, প্রথম আসমান মেঘমালার ঢেউয়ের জমাট আস্তরণ, দ্বিতীয়টি সাদা জমরদ, তৃতীয়টি লোহা, চতুর্থটি পিতল, পঞ্চমটি রূপা, ষষ্ঠটি সোনা এবং সপ্তমটি ইয়াকুত পাথর দ্বারা নির্মিত [1]।
আসুন দলিলগুলো দেখে নেয়া যাক। ইসলামের সৃষ্টিতত্ত্ব অনুসারে আল্লাহ সাতটি আসমান এবং সাতটি পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন [2] –
আল্লাহই সাত আসমান বানিয়েছেন আর ওগুলোর মত পৃথিবীও, সবগুলোর মাঝে (অর্থাৎ সকল আসমানে আর সকল যমীনে) নেমে আসে আল্লাহর নির্দেশ যাতে তোমরা জানতে পার যে, আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান আর আল্লাহ (স্বীয়) জ্ঞানে সব কিছুকে ঘিরে রেখেছেন।
— Taisirul Quran
আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন সপ্ত আকাশ এবং পৃথিবীও সেই পরিমাণ। ওগুলির মধ্যে নেমে আসে তাঁর নির্দেশ; ফলে তোমরা বুঝতে পার যে, আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান এবং জ্ঞানে আল্লাহ সব কিছুকে পরিবেষ্টন করে রয়েছেন।
— Sheikh Mujibur Rahman
তিনি আল্লাহ, যিনি সাত আসমান এবং অনুরূপ যমীন সৃষ্টি করেছেন; এগুলির মাঝে তাঁর নির্দেশ অবতীর্ণ হয় যেন তোমরা জানতে পার যে, আল্লাহ সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান এবং আল্লাহর জ্ঞানতো সব কিছুকে বেষ্টন করে আছে।
— Rawai Al-bayan
তিনি আল্লাহ্, যিনি সৃষ্টি করেছেন সাত আসমান এবং অনুরূপ যমীন, তাদের মধ্যে নেমে আসে তাঁর নির্দেশ; যাতে তোমরা জানতে পার যে, আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান এবং জ্ঞানে আল্লাহ্ সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছেন।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
এসব কারণেই অনেক ইসলামিক আলেম প্রায়শই দাবী করেন যে, মাটির নিচে আরো পৃথিবী রয়েছে, সেখানেও মানুষ আছে। বিশেষ করে এই বিষয়ে মুফতি ইব্রাহীমের অনেকগুলো ভিডিও রয়েছে। এখানে উদাহরণ হিসেবে একটি ভিডিও দেয়া হচ্ছে –
অনেক মুসলিমই এই সাত আসমানকে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের সাতটি স্তরের সাথে মিলিয়ে ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করে থাকেন কোরআনকে বিজ্ঞানসম্মত করার ইচ্ছে নিয়ে। তবে তাদের এই চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায় কোরআনেরই আয়াত দ্বারা, যেখানে বর্ণিত আছে, আল্লাহ নিকটবর্তী আসমানকে তারকারাজির দ্বারা সুশোভিত করেছেন। আসমানগুলোকে বায়ুমণ্ডলের স্তর হিসেবে ব্যাখ্যা দিলে এটিও মেনে নিতে হবে যে, সূর্য নামক নক্ষত্রটি বায়ুমণ্ডলের প্রথম স্তরে অবস্থিত। যেটি হবে আরো হাস্যকর ব্যাখ্যা। আসুন কোরআনের সেই আয়াত দুইটি পড়ে নিই [3] [4] –
নিশ্চয় আমি নিকটবর্তী আকাশকে তারকারাজির দ্বারা সুশোভিত করেছি। এবং তাকে সংরক্ষিত করেছি প্রত্যেক অবাধ্য শয়তান থেকে। ওরা উর্ধ্ব জগতের কোন কিছু শ্রবণ করতে পারে না এবং চার দিক থেকে তাদের প্রতি উল্কা নিক্ষেপ করা হয়। ওদেরকে বিতাড়নের উদ্দেশে। ওদের জন্যে রয়েছে বিরামহীন শাস্তি। তবে কেউ ছোঁ মেরে কিছু শুনে ফেললে জ্বলন্ত উল্কাপিন্ড তার পশ্চাদ্ধাবন করে।
আমি সর্বনিম্ন আকাশকে প্রদীপমালা দ্বারা সুসজ্জত করেছি; সেগুলোকে শয়তানদের জন্যে ক্ষেপণাস্ত্রবৎ করেছি এবং প্রস্তুত করে রেখেছি তাদের জন্যে জলন্ত অগ্নির শাস্তি।
শুধু এইটুকুই নয়। ইসলামি বিশ্বাস অনুসারে মহাবিশ্ব তৈরি সাতটি শক্ত পদার্থে তৈরি আসমান দ্বারা, যেগুলোর প্রত্যেকটিতেই দরজা রয়েছে। সেই সাতটি আসমানে আবার মৃত নবীরা বসবাস করেন, যা সহিহ হাদিস থেকে পরিষ্কারভাবে জানা যায়। মুহাম্মদ মিরাজের রাতে নিজে নাকি সেই সাতটি আসমান ঘুরে এসেছেন। একইসাথে, সেখানে তিনি একটি বিরাট বরই গাছও দেখেছেন। যেটার নাম নাকি সিদরাতুল মুনতাহা। আসুন হাদিসগুলোর একটি হাদিস পড়ে দেখি [5] –
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১। ঈমান [বিশ্বাস]
পরিচ্ছেদঃ ৭৪.রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর মি’রাজ এবং সালাত ফরয হওয়া।
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৩০০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৬২
৩০০-(২৫৯/১৬২) শাইবান ইবনু ফার্রূখ (রহঃ) ….. আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমার জন্য বুরাক পাঠানো হল[1]। বুরাক গাধা থেকে বড় এবং খচ্চর থেকে ছোট একটি সাদা রঙের জন্তু। যতদূর দৃষ্টি যায় এক পদক্ষেপে সে ততদূর চলে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমি এতে আরোহণ করলাম এবং বাইতুল মাকদাস পর্যন্ত এসে পৌছলাম। তারপর অন্যান্য আম্বিবায়ে কিরাম তাদের বাহনগুলো যে খুঁটির সাথে বাঁধতেন, আমি সে খুঁটির সাথে আমার বাহনটিও বাঁধলাম। তারপর মসজিদে প্রবেশ করলাম ও দু’ রাকাআত সালাত আদায় করে বের হলাম। জিবরীল (আঃ) একটি শরাবের পাত্র এবং একটি দুধের পাত্র নিয়ে আমার কাছে এলেন। আমি দুধ গ্রহণ করলাম। জিবরীল (আঃ) আমাকে বললেন, আপনি ফিতরাহকেই গ্রহণ করলেন।
তারপর জিবরীল (আঃ) আমাকে নিয়ে ঊর্ধ্বলোকে গেলেন এবং আসমান পর্যন্ত পৌছে দ্বার খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞেস কলা হলো, আপনার সাথে কে? বললেন, মুহাম্মাদ। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনাকে কি তাকে আনতে পাঠানো হয়েছিল? বললেন, হ্যাঁ! পাঠানো হয়েছিল। অতঃপর আমাদের জন্য দরজা খুলে দেয়া হল। সেখানে আমি আদম (আঃ) এর দেখা পাই তিনি আমাকে মুবারাকবাদ জানালেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দু’আ করলেন।
তারপর জিবরীল (আঃ)আমাকে উর্ধ্বলোক নিয়ে চললেন। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। জিজ্ঞেস করা হলো, তাকে কি আনতে পাঠানো হয়েছিল? বললেন, হ্যাঁ! পাঠানো হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেয়া হল। সেখানে আমি ঈসা ইবনু মারইয়াম ও ইয়াহইয়া ইবনু যাকারিয়া (আঃ) দুই খালাত ভাইয়ের দেখা পেলাম। তারা আমাকে মারহাবা বললেন, আমার জন্য কল্যাণের দু’আ করলেন।
তারপরজিবরীল (আঃ) আমাকে নিয়ে ঊর্ধ্বলোকে চললেন এবং তৃতীয় আসমানের দ্বারপ্রান্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হলো, কে? তিনি বললেন, জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনাকে কি তাকে আনতে পাঠানো হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ! পাঠানো হয়েছিল। তারপরআমাদের জন্য দ্বার খুলে দেয়া হল। সেখানে ইউসুফ (আঃ) এর দেখা পেলাম। সমুদয় সৌন্দর্যের অর্ধেক দেয়া হয়েছিল তাকে। তিনি আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দু’আ করলেন।
তারপর জিবরীল (আঃ)আমাকে নিয়ে চতুর্থ আসমানের দ্বারপ্রান্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হলো, কে? তিনি বললেন, জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনাকে কি তাকে আনতে পাঠানো হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ! পাঠানো হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেয়া হল। সেখানে ইদরীস (আঃ) এর দেখা পেলাম। তিনি আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দু’আ করলেন। আল্লাহ তা’আল তার সম্পর্কে ইরশাদ করেছেনঃ “এবং আমি তাকে উন্নীত করেছি উচ্চ মর্যাদায়” (সূরাহ আল হাদীদ ৫৭ঃ ১৯)।
তারপর জিবরীল (আঃ)আমাকে নিয়ে পঞ্চম আসমানের দ্বারপ্রান্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি কে?”[2] তিনি বললেন, জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনাকে কি তাকে আনতে পাঠানো হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ! পাঠানো হয়েছিল। অতঃপর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেয়া হল। সেখানে হারূন (আঃ) এর দেখা পেলাম। তিনি আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দু’আ করলেন।
তারপর জিবরীল (আঃ)আমাকে নিয়ে ষষ্ঠ আসমানের দ্বারপ্রান্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হলো, কে? তিনি বললেন, জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন মুহাম্মাদ। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনাকে কি তাকে আনতে পাঠানো হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ! পাঠানো হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেয়া হল। সেখানে মূসা (আঃ) এর দেখা পেলাম। তিনি আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দু’আ করলেন।
তারপর জিবরীল (আঃ) সপ্তম আসমানের দ্বারপ্রান্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হলো, কে? তিনি বললেন, জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনাকে কি তাকে আনতে পাঠানো হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ! পাঠানো হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেয়া হল। সেখানে ইবরাহীম (আঃ)-এর দেখা পেলাম। তিনি বাইতুল মামুরে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছেন[3]। বাইতুল মামুরে প্রত্যেহ সত্তর হাজার ফেরেশতা তাওয়াফের উদ্দেশে প্রবেশ করেন যারা আর সেখানে পুনরায় ফিরে আসার সুযোগ পান না।তারপর জিবরীল (আঃ) আমাকে সিদরাতুল মুনতাহায়[4] নিয়ে গেলেন। সে বৃক্ষের পাতাগুলো হাতির কানের ন্যায় আর ফলগুলো বড় বড় মটকার মত।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সে বৃক্ষটিকে যখন আল্লাহর নির্দেশে যা আবূত করে তখন তা পরিবর্তিত হয়ে যায়। সে সৌন্দর্যের বর্ণনা আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে কারোর পক্ষে সম্ভব নয়। এরপর আল্লাহ তা’আলা আমার উপর যে ওয়াহী করার তা ওয়াহী করলেন। আমার উপর দিনরাত মোট পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করলেন, এরপর আমি মূসা (আঃ) এর কাছে ফিরে আসলাম। তিনি আমাকে বললেন, আপনার প্রতিপালক আপনার উপর কি ফরয করেছেন। আমি বললাম, পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত। তিনি বললেন, আপনার প্রতিপালকের নিকট ফিরে যান এবং একে আরো সহজ করার আবেদন করুন। কেননা আপনার উম্মত এ নির্দেশ পালনে সক্ষম হবে না। আমি বনী ইসরাঈলকে পরীক্ষা করেছি এবং তাদের বিষয়ে আমি অভিজ্ঞতা লাভ করেছি।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তখন আমি আবার প্রতিপালকের কাছে ফিরে গেলাম এবং বললাম, হে আমার রব! আমার উম্মতের জন্য এ হুকুম সহজ করে দিন। পাঁচ ওয়াক্ত কমিয়ে দেয়া হল। তারপর মূসা (আঃ)-এর নিকট ফিরে এসে বললাম, আমার থেকে পাঁচ ওয়াক্ত কমানো হয়েছে। তিনি বললেন, আপনার উম্মত এও পারবে না। আপনি ফিরে যান এবং আরো সহজ করার আবেদন করুন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এভাবে আমি একবার মূসা (আঃ) ও একবার আল্লাহর মাঝে আসা-যাওয়া করতে থাকলাম। শেষে আল্লাহ তা’আলা বললেনঃ হে মুহাম্মাদ! যাও দিন ও রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত নির্ধারণ করা হল। প্রতি ওয়াক্ত সালাতে দশ ওয়াক্ত সালাতের সমান সাওয়াব রয়েছে। এভাবে (পাঁচ ওয়াক্ত হল) পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাতের সমান। যে ব্যক্তি কোন নেক কাজের নিয়্যাত করল এবং তা কাজে রূপায়িত করতে পারল না, আমি তার জন্য একটি সাওয়াব লিখব; আর তা কাজে রূপায়িত করলে তার জন্য লিখব দশটি সাওয়াব। পক্ষান্তরে যে কোন মন্দ কাজের নিয়্যাত করল অথচ তা কাজে পরিণত করল না তার জন্য কোন গুনাহ লিখা হয় না। আর তা কাজে পরিণত করলে তার উপর লিখা হয় একটি মাত্র গুনাহ।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তারপর আমি মূসা (আঃ) এর নিকট নেমে এলাম এবং তাকে এ বিষয়ে অবহিত করলাম। তিনি তখন বললেন, প্রতিপালকের কাছে ফিরে যান এবং আরো সহজ করার প্রার্থনা করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এ বিষয়টি নিয়ে বারবার আমি আমার প্রতিপালকের নিকট আসা-যাওয়া করেছি, এখন আবার যেতে লজ্জা হচ্ছে। (ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩০৮, ইসলামিক সেন্টারঃ ৩১৯)
1. কায়ী ইয়ায (রহঃ) বলেন যে, মি’রাজ স্বশরীরে হয়েছিল না স্বপ্নযোগে হয়েছিল এটা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, স্বপ্নযোগে হয়েছিল। এটা অত্যন্ত দুর্বল কথা। অধিকাংশ পূর্ব ও পরের উলামা, ফুকাহা ও মুহাদ্বিসীনের অভিমত হল প্রিয়নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জাগ্রত অবস্থায় স্বশরীরে মি’রাজ সংঘটিত হয়েছিল। হাদীসসমূহে প্রকাশ্যভাবে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। এর বিপরীত হাদীসের অন্য ব্যাখ্যার কোন কারণ বা সুযোগ নেই যে, অন্য তা’বীল করা যাবে। (সংক্ষিপ্ত নাবাবী)
খাদীজাহ (রাযিঃ)-এর মৃত্যু মিরাজের পূর্বেই হয়েছিল। তাঁর মৃত্যু নুবুওয়াতের দশম বর্ষের রমযান মাসে হয়েছিল বলে জানা যায়। কাজেই মিরাজের ঘটনা এর পরেই ঘটেছে, আগে নয়। (আর রাহীকুল মাখতুম, অনুবাদ- খাদীজাহ আক্তার রেজায়ী ১৬৬ খৃঃ)
2.ইমান নাবাবী (রহঃ) বলেন, এ হাদীস থেকে কয়েকটি কথা জানা যায়। (১) বাড়ীর মধ্যে হতে কোন আগন্তুককে যদি বলা হয় কে? তার উত্তরে বলবে নাঃ “আমি”; বরং নাম বলতে হবে। (২) আকাশের দরজা আছে। (৩) দরজার নিকটে পাহারাদার আছে। (৪) মেহমানের সম্মানে মারহাবা বলে অভিবাদন জানানো যাবে। এটাই নাবীদের আদর্শ।
3. “বাইতুল মামুর” নামে বাইতুল্লাহর সামনে আকাশের উপরে একটি ঘর আছে। বাইতুল মামুর এজন্য বলা হয় যে, সব সময় এ ঘরটি সমৃদ্ধ থাকে অর্থাৎ প্রত্যেকদিন নতুনভাবে সত্তর হাজার ফেরেশতা ইবাদাতের জন্য আসে। যে একবার আসে সে কোনদিন পুনরায় আসার সুযোগ পাবে না। এ থেকে বুঝা যায় যে, আল্লাহর ফেরেশতা কত আছে। বাইতুল মামূর সপ্তম আকাশে আছে। ইবরাহীম (আঃ) বাইতুল মামুর এর দিকে পিঠ ফিরে বসে ছিলেন। এ হাদীস হতে এটাও প্রমাণ হয় যে, বাইতুল্লাহর দিকে পিঠ করে বসা যাবে।
4. “সিদরাতুল মুনতাহা” সপ্তম আকাশের উপরের একটি বরই গাছ এবং ফেরেশতাদের বিচরণের শেষ সীমা। অথবা গমনের শেষ সীমা। অর্থাৎ সিদরাতুল মুনতাহার উপর কি আছে আল্লাহ ছাড়া কারও জ্ঞান নেই। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) বলেন, যে সিদরাতুল মুনতাহা এজন্য বলা হয় যে, ফেরেশতাদের জ্ঞান বিচরণ ওখান পর্যন্ত শেষ হয়েছিল। তার আগে তারা যেতে পারেনি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত। আর যারা উপরে আছে তারা এখানে এসে থেমে যায়। নিচে আসতে পারে না এবং যারা নিচে আছে তারা এখানে এসে থেমে যায়। উপরে যেতে পারে না। এটা আল্লাহর নির্দেশ।
এ হাদীস হতে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ আরশের উপর সমাসীন আছেন এবং প্রিয় নাবীর সাথে সরাসরি কথা বলেছেন। যার কোন অপব্যাখ্যার সুযোগ নেই। এ কথোপকথনের মধ্যে পঞ্চাশ ওয়াক্ত হতে কমিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয করে নিয়েছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)
তাফসীরে জালালাইনে আবার এই আসমানগুলো কী পদার্থে তৈরি তার পরিষ্কারভাবেই বলা আছে [6]। মহাকাশে লোহা, সোনা বা রূপার কোনো অখণ্ড কঠিন আবরণ থাকলে কোনো কৃত্রিম উপগ্রহ বা মহাকাশযান তা অতিক্রম করতে পারত না। জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ বা হাবল টেলিস্কোপ কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের গ্যালাক্সি দেখতে পায়, যা প্রমাণ করে যে মহাকাশে এরকম কোনো ধাতব বা পাথুরে ‘সিলিং’ নেই।
قُوْلُهُ تَعَالَى الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمَوَاتٍ طِبَاقًا : অর্থাৎ আল্লাহ তিনিই, যিনি সাতটি আসমানকে পরস্পর উপর-নিচ করে তৈরি করেছেন এবং একটি অপরটি হতে বহুদূরে রেখেছেন। যথা হাদীস শরীফে রাসূলে করীম বলেছেন, একটি আসমানের পর অপরটি আসমান পর্যন্ত বহু দূর-দূরান্তের দূরত্ব বিরাজমান রয়েছে। অতঃপর আরেকটি আসমান এভাবে ৭টি আসমান বিদ্যমান রয়েছে। মাদারেক গ্রন্থাকার বলেন – দু’টি আসমানের মাঝে শূন্যস্থান বিদ্যমান থাকা সম্পর্কে নবী করীম-এর মি’রাজ গমনের ঘটনাটিও প্রমাণস্বরূপ পেশ করার যোগ্য, অর্থাৎ তিনি একটি আসমান হতে অপর আসমানের দিকে পরিভ্রমণ করেছেন।
অপরাপর হাদীসসমূহ দ্বারা এও জানা যায় যে, দু’টি আসমানের মধ্যকার শূন্যস্থানটুকু ৫০০ (পাঁচশত) বছরের রাস্তা। কোনো কোনো তাফসীরকারকের মতে, দু’টি আসমানের মধ্যকার প্রভেদ নেই; বরং সকল আসমানই সংলগ্ন অবস্থায় রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ৩৬ অর্থ একটি স্তরের পর আরেকটি স্তরবিশিষ্ট ৭টি আসমান।
قَالَ الْبَقَاعِيُّ بِحَيْثُ يَكُونُ كُلُّ جُزْءٍ مِنْهَا مُطَابِقًا لِلْجُزْءِ مِنَ الْأُخْرَى وَلَا يَكُونُ جُزْءٌ مِنْهَا خَارِجًا عَنْ ذَلِكَ قَالَ وَهِيَ لَا تَكُونُ كَذَلِكَ إِلَّا أَن تَكُونَ كَرَّةٌ وَالسَّمَاءُ الدُّنْيَا مُحِيطَةٌ بِهَا إِحَاطَةَ قَشْرِ الْبَيْضَةِ مِنْ جَمِيعِ الْجَوَانِبِ وَالثَّانِيَةُ مُحِيطَةٌ بِالدُّنْيَا وَهُكَذَا إلى أنْ يَكُونَ الْعَرْشِ مُحِيطًا بِالْكُلِّ وَالْكُرْسِيُّ الَّذِي هُوَ أَقرَّ بِهَا بِالنِّسْبَةِ إِلَيْهِ كَحَلْقَةٍ مُلْقَاةٍ فِي فَلَاةٍ فَمَا ظَنَّكَ بِمَا تَحْتَهُ وَكُلُّ سَمَاءٍ فِي الَّتِي فَوْقَهَا بِهَذِهِ النَّسْبَةِ ، وَقَدْ قَرْرَ أَهْلُ الْهَيْئَةِ أَنَّهَا كَذَلِكَ وَلَيْسَ فِي الشَّرْعِ مَا يُخَالِفُهُ بَلْ ظَوَاهِرُهُ تُوَافِقُهُ . (جـ)
কি বস্তু দ্বারা সাত আসমান তৈরি হয়েছে: আল্লামা বাগাবী (র.) কা’বে আহবার (র.)-এর কথার উক্তির বরাতে বলেছেন যে, পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমান মেঘমালার ঢেউয়ের জমাট আস্তরণে নির্মিত। দ্বিতীয় আসমান হলো সাদা জমরদ পাথরের, তৃতীয় আসমান হলো লৌহনির্মিত, চতুর্থ আসমান পিতলের নির্মিত, পঞ্চম আসমান রৌপ্যনির্মিত, ষষ্ঠ আসমান স্বর্ণনির্মিত, আর সপ্তম আসমান লালবর্ণের ইয়াকৃত পাথরে নির্মিত। [নূরুল কোরআন]

মিরাজ বর্ণনার বৈজ্ঞানিক ব্যবচ্ছেদ: বাস্তবতা বনাম উপকথা
মেরাজের ঘটনা এবং হাদিসগুলো বিস্তারিতভাবে পড়তে ইচ্ছুক হলে এই লেখাটি [7] পড়বেন। আপাতত এই প্রবন্ধে আমরা মেরাজের হাদিসের কিছুটা অংশ আলোচনাতে রাখছি,
মুহাম্মদ সশরীরে বুরাকে চড়ে ঊর্ধ্বাকাশে গমনের যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তা জীববিজ্ঞানের নূন্যতম সূত্রের সাথেও মেলে না। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মাত্র ১০ কিমি উপরে অক্সিজেনের অভাব এবং ১০০ কিমি উপরে বায়ুমণ্ডল প্রায় শূন্য। কোনো স্পেস-স্যুট বা অক্সিজেন ছাড়া মহাশূন্যের শূন্যচাপে (Vacuum) মানুষের রক্ত ও তরল ফুটতে শুরু করবে (Ebullism), যা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মৃত্যু নিশ্চিত করার কথা।
বুরাক “যতদূর দৃষ্টি যায় এক পদক্ষেপে ততদূর চলে” বলে হাদিসে বর্ণিত। কিন্তু আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান অনুযায়ী মহাবিশ্বের গতির সর্বোচ্চ সীমা হলো আলোর গতি। পৃথিবী থেকে নিকটতম নক্ষত্র ৪.২৪ আলোকবর্ষ দূরে। এক রাতে সাত আসমান পাড়ি দিয়ে ফিরে আসা মানে আলোর চেয়ে কয়েক বিলিয়ন গুণ বেশি গতিতে চলা, যা আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটির পরিপন্থী।
হাদিসে জিবরাঈল কর্তৃক আসমানের দরজায় কড়া নাড়া এবং পাহারাদারদের সাথে কথা বলার বর্ণনা আছে। বৈজ্ঞানিকভাবে মহাশূন্য একটি ভ্যাকুয়াম বা মাধ্যমহীন স্থান, যেখানে শব্দ তরঙ্গ সঞ্চালিত হতে পারে না। এছাড়া মহাকাশে কোনো কঠিন ধাতব ‘দরজা’ বা ‘দেওয়াল’ থাকলে তা গ্র্যাভিটেশনাল টানের কারণে ভেঙে পড়ত এবং দূরবর্তী গ্যালাক্সির আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতে বাধা দিত।
সপ্তম আসমানে বিশাল বরই গাছের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। সালোকসংশ্লেষণ, কার্বন-ডাই-অক্সাইড এবং মাটি ছাড়া মহাশূন্যের পরম শূন্য তাপমাত্রায় (Absolute Zero) কোনো জৈবিক উদ্ভিদ টিকে থাকা অসম্ভব। এটি স্পষ্টতই মরুভূমির পরিচিত পরিবেশকে আকাশমণ্ডলে রূপকভাবে বসানোর চেষ্টা।
| বিষয় | ধর্মীয় বর্ণনা | বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা |
|---|---|---|
| শূন্যস্থান | সশরীরে উড্ডয়ন | বায়ুশূন্য স্থানে মানুষের শরীর বিস্ফোরিত হবে। |
| যোগাযোগ | আসমানের দরজায় শব্দ | মহাশূন্যে শব্দ চলাচলের কোনো মাধ্যম নেই। |
| সময়কাল | এক রাতেই মহাবিশ্ব পাড়ি | দূরত্ব অনুযায়ী কয়েক বিলিয়ন বছর লাগার কথা। |
| উদ্ভিদ | আসমানের বরই গাছ | আলো ও বায়ু ছাড়া উদ্ভিদের বেঁচে থাকা অসম্ভব। |
সপ্ত আসমান ধারণার ঐতিহাসিক বিবর্তন ও পৌরাণিক প্রেক্ষাপট
আকাশ বা আসমানকে সাতটি স্তরে বিন্যস্ত করার ধারণাটি কোনো একক ধর্মের উদ্ভাবন নয়, বরং এটি প্রাচীন মেসোপটেমীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং ভূ-কেন্দ্রিক (Geocentric) মহাবিশ্বতত্ত্বের একটি বিবর্তিত রূপ। প্রাচীনকালে যখন মানুষ খালি চোখে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ করত, তখন তারা সাতটি প্রধান ‘বিচরণকারী’ জ্যোতিষ্ক (সূর্য, চন্দ্র, বুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি ও শনি) দেখতে পেত। এই সাতটি দৃশ্যমান বস্তুর ওপর ভিত্তি করেই প্রাচীন সভ্যতাগুলোতে মহাবিশ্বকে সাতটি স্তরে কল্পনা করার রেওয়াজ শুরু হয়।
মেসোপটেমীয় উৎস: আদিম ভিত্তি
সপ্ত আসমানের ধারণাটি প্রথম বিকশিত হয় প্রাচীন মেসোপটেমীয় সভ্যতায় [8]। সুমেরীয় ভাষায় আকাশকে ‘আন’ (An) এবং পৃথিবীকে ‘কি’ (Ki) বলা হতো। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের সুমেরীয় জাদুমন্ত্রে “আন-ইমিনবি কি-ইমিনবি” বা “সাতটি আকাশ ও সাতটি পৃথিবী”র কথা স্পষ্ট উল্লেখ আছে [9]। তবে মেসোপটেমীয় সংস্কৃতিতে আকাশ মানুষের বসবাসের জন্য ছিল না; এটি ছিল কেবলমাত্র দেবতাদের আবাসস্থল। ‘গিলগামেশ’ মহাকাব্যে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, আকাশ কেবল সূর্যদেব শামাশ এবং দেবতাদের জন্য সংরক্ষিত।
হিন্দু সৃষ্টিতত্ত্ব: চৌদ্দ ভুবন ও সপ্তলোক
হিন্দু পুরাণে মহাবিশ্বকে ‘চৌদ্দ ভুবন’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যার মধ্যে সাতটি ঊর্ধ্বলোক (স্বর্গ) এবং সাতটি অধোলোক (পাতাল)। অথর্ববেদে এই স্তরীভূত মহাবিশ্বের উল্লেখ পাওয়া যায়। ঊর্ধ্বের সাতটি লোক হলো: ভূলোক, ভুবর্লোক, স্বর্লোক, মহর্লোক, জনলোক, তপোলোক এবং সত্যলোক [10]। এখানে ইন্দ্রের রাজধানী অমরাবতী এবং স্বর্গীয় ঐরাবতের বর্ণনা রয়েছে, যা মূলত অতিপ্রাকৃতিক সত্তাদের আবাস হিসেবে চিহ্নিত।
ইহুদি ঐতিহ্য: তালমুদ ও মেরকাবাহ সাহিত্য
ইহুদি ধর্মে আকাশের হিব্রু প্রতিশব্দ হলো ‘শামাইম’ (שָׁמַיִם), যার সাথে আরবি ‘সামাওয়াত’ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত মিল রয়েছে। তালমুদীয় বর্ণনা অনুযায়ী আকাশ সাতটি স্তরে বিভক্ত [11]। এই স্তরগুলোর নাম হলো: বিলোন, রাকিয়া, শেহাকিম, যেবুল, মা’ওন, মাখোন এবং আরাবথ। সপ্তম আসমান বা ‘আরাবথ’-এ ঈশ্বরের সিংহাসন এবং উচ্চপদস্থ স্বর্গদূতদের (সেরাফিম ও ওফানিম) অবস্থান বলে বিশ্বাস করা হয় [12]। ইহুদিদের রহস্যবাদী ‘মেরকাবাহ’ এবং হনোকের পুস্তকেও এই সাত আসমানের ভ্রমণের বিস্তারিত রূপক পাওয়া যায়।
খ্রিস্টীয় বিবর্তন ও তৃতীয় স্বর্গ
প্রাথমিক খ্রিস্টধর্ম মূলত ইহুদি সৃষ্টিতত্ত্বকেই অনুসরণ করেছিল। বাইবেলের নূতন নিয়মে সেন্ট পল (পাউল) তার একটি আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতায় ‘তৃতীয় স্বর্গ’-এ আরোহণের কথা উল্লেখ করেছেন [13]। তিনি সশরীরে না অশরীরে সেখানে গিয়েছিলেন, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করলেও, ‘স্বর্গোদ্যান’ বা প্যারাডাইস যে ঊর্ধ্বলোকের অংশ, তা স্পষ্ট করেছেন। মধ্যযুগে খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্ববিদরা আসমানের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি করলেও, প্রাচীন খ্রিস্টীয় বিশ্বাসে ‘সাত আসমান’ই ছিল মহাজাগতিক মানদণ্ড।
সপ্ত আসমান ধারণার তুলনামূলক সারণি
| সভ্যতা/ধর্ম | মূল ধারণা | আকাশের সংখ্যা | প্রধান বৈশিষ্ট্য/আবাসস্থল |
|---|---|---|---|
| মেসোপটেমীয় | আন-ইমিনবি | ৭ আসমান, ৭ যমীন | দেবতাদের জন্য সংরক্ষিত, অতিপ্রাকৃতিক আবাস। |
| হিন্দু ধর্ম | সপ্তলোক | ৭ স্বর্গ, ৭ পাতাল | ভূলোক থেকে সত্যলোক; ইন্দ্রের অমরাবতী ও ব্রহ্মলোক। |
| ইহুদি ধর্ম | শামাইম | ৭টি স্তর | আরাবথ-এ ঈশ্বরের আরশ বা সিংহাসন অবস্থিত। |
| খ্রিস্টধর্ম | প্যারাডাইস | ৭ (পরবর্তীতে ১০) | সেন্ট পল কর্তৃক ‘তৃতীয় স্বর্গ’ পরিদর্শনের উল্লেখ। |
| ইসলাম ধর্ম | সামাওয়াত | ৭ আসমান, ৭ যমীন | মিরাজের রাতে মুহাম্মদের ৭টি স্তর পরিভ্রমণ ও নবীদের অবস্থান। |
উপরের বিশ্লেষণ ও সারণি থেকে এটি প্রতীয়মান হয় যে, বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থে বর্ণিত সাত আসমানের ধারণাটি মূলত প্রাক-বিজ্ঞান যুগের একটি সাধারণ পৌরাণিক কাঠামো। প্রাচীন মানুষ মহাকাশের বিশালতা সম্পর্কে অবগত ছিল না বলে তারা ইহজাগতিক ক্ষমতার আদলে (যেমন রাজপ্রাসাদের স্তর বা গেট) মহাবিশ্বকে কল্পনা করেছিল। বর্তমান জ্যোতির্বিজ্ঞানের অসীম মহাবিশ্বের ধারণার সাথে এই স্তরীভূত সীমাবদ্ধ আসমানের কোনো বাস্তব মিল খুঁজে পাওয়া অসম্ভব।
উপসংহারঃ বিজ্ঞান ও বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব
বিজ্ঞান প্রমাণ করে যে আকাশ কোনো বস্তু নয়, বরং এটি শূন্যস্থান এবং আলোর খেলা। অন্যদিকে, ধর্মীয় ব্যাখ্যা আকাশকে একটি কঠিন, ধাতব এবং ভৌগোলিক সীমানাবদ্ধ বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করে যেখানে দরজা, পাহারাদার এবং এমনকি বিশাল ‘বরই গাছ’ (সিদরাতুল মুনতাহা) বিদ্যমান। এই বৈপরীত্য এটাই প্রমাণ করে যে, ‘সপ্ত আসমান’-এর ধারণাটি মূলত প্রাক-বিজ্ঞান যুগের একটি আদিম মহাজাগতিক কল্পনা, যা প্রাচীন জ্যোতিষশাস্ত্রের (Astrology) সাতটি দৃশ্যমান গ্রহের (সূর্য, চাঁদ, বুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি) ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল।
যৌক্তিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যখন কোনো ধর্মীয় দাবি পর্যবেক্ষণলব্ধ তথ্যের (Empirical data) সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক হয়, তখন সেই দাবিটি রূপক বা মিথলজি হিসেবেই গণ্য হওয়া উচিত, বাস্তব সত্য হিসেবে নয়।
তথ্যসূত্রঃ
- তাফসীরে জালালাইন, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫ ↩︎
- কোরআন, সূরা তালাক, আয়াত ১২ ↩︎
- কোরআন ৩৭ঃ ৬-১০ ↩︎
- কোরআন ৬৭ঃ৫ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৩০০ ↩︎
- তাফসীরে জালালাইন, ইসলামিয়া কুতুবখানা প্রকাশনী, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫ ↩︎
- উম্মে হানী- মুহাম্মদের গোপন প্রণয় ↩︎
- Barnard, Jody A. (2012). The Mysticism of Hebrews. Mohr Siebeck. p. 62 ↩︎
- Horowitz, Wayne (1998). Mesopotamian Cosmic Geography. Eisenbrauns. p. 208 ↩︎
- শিব পুরাণ, বি. কে. চতুর্বেদী (২০০৪), পৃষ্ঠা ১২৪ ↩︎
- “Angelology”. Jewish Encyclopedia ↩︎
- Hagigah 12b ↩︎
- ২য় করিন্থীয় ১২:২-৪ ↩︎
