ভূমিকা
ইসলামি দাওয়াতি প্রচার প্রচারণায় নবী মুহাম্মদের বহুবিবাহ, শিশুবিবাহ, নারীদের হেবা করার বিধান, নারীসঙ্গ এবং দাসীদের সঙ্গে যৌন সম্পর্কের প্রসঙ্গ উঠলেই একটি পরিচিত প্রতিরক্ষামূলক দাবি সামনে আনা হয়: মুহাম্মদ নাকি নারীর প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট ছিলেন না, ব্যক্তিগত কামনা বা নারীপ্রাপ্তির ইচ্ছা থেকে তিনি এসব সম্পর্কে জড়াননি; বরং সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা ধর্মীয় প্রয়োজনেই তাকে একের পর এক বিবাহ করতে হয়েছিল। আল্লাহ নাকি নিয়মিত নবী মুহাম্মদকে বিভিন্ন নারীদের বিবাহ করার জন্য চাপ দিয়ে ওহী নাজিল করতেন, নিতান্তই অনিচ্ছা স্বত্বেও নবী মুহাম্মদ তাই সেইসব বিবাহ করতে বাধ্য হতেন। কিন্তু এই দাবি ইসলামি মূল উৎসগুলোর বক্তব্যের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। কোরআন ও সহিহ হাদিসে মুহাম্মদের জন্য নারীদের ক্ষেত্রে যে বিশেষ সুবিধা, ব্যতিক্রম, পছন্দ, আকর্ষণ এবং যৌন বাসনার বিবরণ বর্ণিত আছে, সেগুলো পর্যালোচনা করলে “নারীর প্রতি তার কোনো বিশেষ আগ্রহই ছিল না” ধরনের দাবি টেকে না।
কোরআনের সূরা আহজাবে মুহাম্মদের বৈবাহিক ও যৌন অধিকারের জন্য সাধারণ মুসলিম পুরুষদের তুলনায় পৃথক বিধান দেওয়া হয়েছে। সেখানে তার স্ত্রীদের পাশাপাশি যুদ্ধলব্ধ মালিকানাধীন নারী, নির্দিষ্ট আত্মীয়গোষ্ঠীর নারী এবং এমন মুমিন নারী পর্যন্ত তার জন্য বৈধ করা হয়েছে, যে নিজেকে সরাসরি নবীর কাছে সমর্পণ করবে এবং নবী তাকে গ্রহণ করতে চাইবেন। কোরআন নিজেই স্পষ্ট করে বলছে, এই বিশেষ অনুমতি অন্য মুমিনদের জন্য নয়, বিশেষভাবে মুহাম্মদের জন্য, “যাতে তোমার কোনো অসুবিধা না হয়”। একই সূরায় আবার অন্য নারীর সৌন্দর্য মুহাম্মদকে মুগ্ধ করতে পারে, এমন অবস্থাও সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে: “যদিও তাদের সৌন্দর্য তোমাকে মুগ্ধ করে”। ফলে “নারীর সৌন্দর্য বা নারীসঙ্গের প্রতি মুহাম্মদের কোনো আকর্ষণ ছিল না” দাবি কোরআনের নিজের ভাষার সঙ্গেই মেলে না।
এই বিশেষ সুবিধাগুলো মুহাম্মদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ পারিবারিক পরিমণ্ডলেও নজর এড়ায়নি। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে আয়িশার বিখ্যাত বক্তব্য বর্ণিত আছে। যেসব নারী নিজেদের মুহাম্মদের কাছে বিবাহের জন্য সমর্পণ করতেন, তাদের বিষয়ে আয়িশা বিরক্তি প্রকাশ করতেন। পরে সূরা আহজাবের সেই আয়াত নাজিল হলো, যেখানে মুহাম্মদকে তার স্ত্রীদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা কাছে রাখা, যাকে ইচ্ছা দূরে রাখা এবং আবার যাকে ইচ্ছা গ্রহণ করার স্বাধীনতা দেওয়া হয়। তখন আয়িশা মন্তব্য করেন, “আমি দেখছি যে, আপনার রব আপনি যা ইচ্ছা করেন, তা-ই পূরণ করেন”। এটি কোনো আধুনিক ইসলাম সমালোচকের মন্তব্য নয়; মুহাম্মদের নিজের স্ত্রী তার জীবদ্দশাতেই তার ইচ্ছা এবং তার জন্য নাজিল হওয়া বিশেষ বিধানের সম্পর্ক নিয়ে এই মন্তব্য করেছিলেন।
সহিহ হাদিসের অন্য বর্ণনাগুলো বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে। মুহাম্মদের কাছে নারীকে দুনিয়ার প্রিয় বস্তুর মধ্যে গণ্য করার বর্ণনা পাওয়া যায়। আবার সহিহ মুসলিমে বর্ণিত আছে, তিনি একজন নারীকে দেখার পর নিজের স্ত্রী যায়নাবের কাছে যান এবং তার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। এরপর সাহাবিদের উদ্দেশ্যে বলেন, কোনো নারীকে দেখে যৌন কামনা জাগলে নিজের স্ত্রী কিংবা দাসীর কাছে গিয়ে সেই কামনা মিটিয়ে নিতে। এই বর্ণনা এমন কোনো ব্যক্তির প্রতিকৃতি দেয় না যার জীবনে নারী ও যৌন আকর্ষণ ছিল কেবল অনিচ্ছাকৃত ধর্মীয় দায়িত্ব। ইসলামি উৎসগুলোর নিজের ভাষ্যেই এমন একজন ব্যক্তির চিত্র পাওয়া যায়, যিনি নারীর সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হতেন, নারীকে নিজের প্রিয় বিষয়ের মধ্যে গণ্য করতেন, নারী দেখে যৌন উত্তেজনা অনুভব করতেন এবং যার জন্য সাধারণ মুসলিম পুরুষদের তুলনায় বৈবাহিক ও যৌন ক্ষেত্রে বিশেষ বিধান প্রণীত হয়েছিল।
এই প্রবন্ধে তাই পরবর্তী যুগের ধর্মীয় বক্তাদের চরিত্ররক্ষাকারী বক্তব্যকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা হবে না। বিচার করা হবে কোরআন, সহিহ হাদিস, প্রাচীন তাফসির, হাদিসের শারহ এবং স্বীকৃত ইসলামি ফিকহি উৎসের বক্তব্যের ভিত্তিতে। ইসলামি মূল উৎসগুলো মুহাম্মদের নারীসংক্রান্ত আকর্ষণ, যৌন বাসনা এবং বিশেষ বৈবাহিক ও যৌন সুবিধা সম্পর্কে আসলে কী বলে? যদি সেই উৎসগুলো পরবর্তী ইসলামিক দাবির বিপরীত তথ্য দেয়, তাহলে সমস্যাটি উৎসে নয়, ইসলামের এই দাবিটিতেই।
মুহাম্মদের জন্য বিশেষ বৈবাহিক ও যৌন সুবিধা
নারীদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে মুহাম্মদের জন্য কোরআনে এমন কিছু বিশেষ সুবিধা ঘোষণা করা হয়েছে, যেগুলো সাধারণ মুসলিম পুরুষদের জন্য প্রযোজ্য ছিল না। সূরা আহজাবের ৫০ নম্বর আয়াতে তার জন্য একাধিক শ্রেণির নারীকে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে: যেসব স্ত্রীকে তিনি মোহর দিয়েছেন, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে তার মালিকানায় আসা দাসী, তার চাচাতো, ফুফাতো, মামাতো ও খালাতো বোনদের মধ্যে যারা তার সঙ্গে হিজরত করেছে এবং এমন কোনো মুমিন নারী, যে নিজেই মুহাম্মদের কাছে নিজেকে সমর্পণ করবে এবং মুহাম্মদ তাকে বিয়ে করতে চাইবেন। এরপর কোরআন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি কথা বলেছে। প্রথমত, এই শেষ সুবিধাটি “বিশেষভাবে তোমার জন্য, অন্য মুমিনদের জন্য নয়”। দ্বিতীয়ত, এসব বিশেষ অনুমতির উদ্দেশ্য বলা হয়েছে, “যাতে তোমার কোনো অসুবিধা না হয়” [1] –
হে নবী (সা.)! আমি তোমার জন্য বৈধ করেছি তোমার স্ত্রীগণকে যাদের মোহরানা তুমি প্রদান করেছ; আর বৈধ করেছি আল্লাহ ফায় হিসেবে তোমাকে যা দান করেছেন তার মধ্য হতে যারা তোমার মালিকানাধীন হয়েছে তাদেরকে, আর তোমার চাচার কন্যা ও ফুফুর কন্যাকে, তোমার মামার কন্যা ও তোমার খালার কন্যাকে যারা তোমার সঙ্গে হিজরাত করেছে। আর কোন মু’মিন নারী যদি নবীর নিকট নিজেকে নিবেদন করে আর নবী যদি তাকে বিয়ে করতে চায় সেও বৈধ, এটা মু’মিনদের বাদ দিয়ে বিশেষভাবে তোমার জন্য যাতে তোমার কোন অসুবিধে না হয়। মু’মিনগণের জন্য তাদের স্ত্রী ও দাসীদের ব্যাপারে যা নির্ধারিত করেছি আমার তা জানা আছে। আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
— Taisirul Quran
আয়াতটির ভাষা লক্ষ্য করলে একটি বিষয় পরিষ্কার। এখানে মুহাম্মদকে কোনো নির্দিষ্ট নারীকে অনিচ্ছায় বিয়ে করার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে না। বরং তার জন্য বৈবাহিক ও যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রকে সাধারণ মুসলিমদের তুলনায় সম্প্রসারিত করা হচ্ছে। সাধারণ মুসলিমদের ওপর যেসব সীমাবদ্ধতা কার্যকর ছিল, মুহাম্মদের ক্ষেত্রে তার কিছু তুলে দেওয়া হয়েছে। এমনকি কোনো মুমিন নারী নিজেকে মুহাম্মদের কাছে সমর্পণ করলে এবং মুহাম্মদ তাকে গ্রহণ করতে চাইলে, সেই নারীর সঙ্গে বিবাহের জন্য আলাদা বিশেষ অনুমতি ঘোষণা করা হয়েছে। “নবী যদি তাকে বিয়ে করতে চায়” কথাটিও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করছে মুহাম্মদের নিজের ইচ্ছার ওপর। নারী নিজেকে সমর্পণ করলেই তাকে গ্রহণ করতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই; মুহাম্মদ চাইলে গ্রহণ করবেন, না চাইলে করবেন না।
প্রাচীনতম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোরআন ব্যাখ্যাকারীদের একজন তাবারি এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আরও পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, কোনো মুমিন নারী নিজেকে মুহাম্মদের কাছে হেবা করলে তাকে মোহর ছাড়াই বিয়ে করার অনুমতি মুহাম্মদকে দেওয়া হয়েছিল। তাবারি এরপর সরাসরি বলেন, এই সুবিধা মুহাম্মদের জন্য বিশেষ; তার উম্মতের অন্য কারও জন্য কোনো নারী এভাবে নিজেকে হেবা করলে তা বৈধ হবে না [2] –
وأحللنا له امرأة مؤمنة إن وهبت نفسها للنبي بغير صداق … إن أراد أن ينكحها فحلال له أن ينكحها وإذا وهبت نفسها له بغير مهر … لا يحل لأحد من أمتك أن يقرب امرأة وهبت نفسها له، وإنما ذلك لك يا محمد خالصة أخلصت لك من دون سائر أمتك.
অর্থাৎ, “কোনো মুমিন নারী যদি নিজেকে নবীর কাছে হেবা করে, তবে তাকে মোহর ছাড়াই তার জন্য বৈধ করা হয়েছে … তিনি যদি তাকে বিয়ে করতে চান, তবে মোহর ছাড়াই তাকে বিয়ে করা তার জন্য বৈধ … তোমার উম্মতের অন্য কারও জন্য কোনো নারী নিজেকে হেবা করলে তাকে গ্রহণ করা বৈধ নয়; হে মুহাম্মদ, এটি শুধু তোমার জন্য বিশেষভাবে নির্ধারিত।”
তাবারির ব্যাখ্যায় এখানে কোনো অস্পষ্টতা নেই। সাধারণ মুসলিম পুরুষের জন্য যে নিয়ম প্রযোজ্য, মুহাম্মদের জন্য সেই একই নিয়ম রাখা হয়নি। কোনো নারী স্বেচ্ছায় নিজেকে তার কাছে সমর্পণ করলে এবং মুহাম্মদ তাকে পছন্দ করে বিয়ে করতে চাইলে, মোহর ছাড়াই তাকে গ্রহণ করার বিশেষ অনুমতি ছিল। এই বিধানকে পরবর্তীকালে কেবল “সামাজিক দায়িত্ব” বা “রাজনৈতিক প্রয়োজন” বলে ব্যাখ্যা করা মূল উৎসের ভাষাকে বিকৃত করা। আয়াতের শর্তই হচ্ছে, মুহাম্মদ তাকে বিয়ে করতে চাইবেন। অর্থাৎ তার ব্যক্তিগত ইচ্ছা বিধানটির কেন্দ্রীয় শর্ত।
ইবন কাসিরও একই আয়াতের ব্যাখ্যায় একই বিষয় স্পষ্ট করেছেন। তার ভাষায়, কোনো মুমিন নারী নিজেকে মুহাম্মদের কাছে হেবা করলে মুহাম্মদ চাইলে তাকে মোহর ছাড়াই বিয়ে করতে পারতেন। ইবন কাসির আরও উল্লেখ করেছেন, নিজেদের মুহাম্মদের কাছে হেবা করা নারীর সংখ্যা একাধিক ছিল [3] –
ويحل لك – يا أيها النبي – المرأة المؤمنة إذا وهبت نفسها لك أن تتزوجها بغير مهر إن شئت ذلك.
অর্থাৎ, “হে নবী, কোনো মুমিন নারী যদি নিজেকে আপনার কাছে হেবা করে, তাহলে আপনি চাইলে তাকে মোহর ছাড়াই বিয়ে করা আপনার জন্য বৈধ।”
এখানে “আপনি চাইলে” কথাটি আবারও গুরুত্বপূর্ণ। এটি এমন কোনো বিধান নয় যেখানে মুহাম্মদকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও নারী গ্রহণ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। বরং কোনো নারী নিজেকে তার কাছে সমর্পণ করলে তাকে গ্রহণ করবেন কি করবেন না, সেই সিদ্ধান্ত মুহাম্মদের নিজের হাতে। নারী নিজেকে সমর্পণ করছে, মুহাম্মদ পছন্দ করলে গ্রহণ করছেন, এবং সাধারণ মুসলিমের ক্ষেত্রে আবশ্যক মোহরের বিধানও তার জন্য তুলে দেওয়া হয়েছে। এটিকে নারীর প্রতি অনাগ্রহের প্রমাণ বানানো যুক্তিগতভাবে অসম্ভব।
আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায় আল-ওয়াহিদির আত-তাফসীর আল-ওয়াসীত-এ। সেখানে এই বিশেষ ব্যবস্থাকে সরাসরি মুহাম্মদের বিবাহসংক্রান্ত বিশেষাধিকার বলা হয়েছে। আল-ওয়াহিদি লিখেছেন, হেবা শব্দের মাধ্যমেই মুহাম্মদের বিবাহ সম্পন্ন হতে পারত এবং এর জন্য অভিভাবক বা সাক্ষীরও প্রয়োজন ছিল না। একই সঙ্গে তিনি সাধারণ মুসলিমদের জন্য চার স্ত্রীর সীমা, মোহর, অভিভাবক ও সাক্ষীর বিধানের কথা উল্লেখ করেছেন [4] –
وهذا من خصائصه في النكاح، وكان ينعقد النكاح له بلفظ الهبة من غير ولي ولا شهود … قد علمنا ما فرضنا عليهم في أزواجهم، يقول: ما أوجبنا عليهم أن لا يتزوجوا أكثر من أربع بمهر وولي وشهود … لكيلا يكون عليك حرج، ضيق في أمر النكاح، ومنع من شيء تريده.
অর্থাৎ, “এটি বিবাহের ক্ষেত্রে তার বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অন্তর্ভুক্ত। হেবা শব্দের মাধ্যমেই তার বিবাহ সম্পন্ন হতে পারত, কোনো অভিভাবক ও সাক্ষী ছাড়াই … মুমিনদের স্ত্রীদের ব্যাপারে আমরা যে বিধান দিয়েছি তা হলো, তারা চারজনের বেশি নারীকে বিয়ে করবে না এবং মোহর, অভিভাবক ও সাক্ষী থাকবে … ‘যাতে তোমার কোনো অসুবিধা না হয়’, অর্থাৎ বিবাহের বিষয়ে তোমার ওপর যেন সংকীর্ণতা না থাকে এবং তুমি যা চাও তা থেকে যেন তোমাকে বাধা দেওয়া না হয়।”
আল-ওয়াহিদির শেষ ব্যাখ্যাটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কোরআনের “যাতে তোমার কোনো অসুবিধা না হয়” বাক্যটির ব্যাখ্যায় তিনি বলেছেন, এর অর্থ হচ্ছে বিবাহের ব্যাপারে মুহাম্মদের ওপর যেন সংকীর্ণতা সৃষ্টি না হয় এবং তিনি যা চান তা থেকে যেন তাকে বাধা দেওয়া না হয়। কাজেই মুহাম্মদের একের পর এক বিবাহ ও নারীসংক্রান্ত বিশেষ সুবিধাগুলোকে তার অনিচ্ছার ফল হিসেবে উপস্থাপন করা শুধু প্রমাণহীন নয়, প্রাচীন ইসলামি তাফসিরের বক্তব্যেরও বিপরীত। এখানে বিধানের উদ্দেশ্যই হচ্ছে তার জন্য বিধিনিষেধ শিথিল করা।
এই আয়াত আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈষম্য প্রকাশ করে। কোরআন নিজেই প্রথমে স্বীকার করছে যে সাধারণ মুমিনদের স্ত্রী ও মালিকানাধীন দাসীদের বিষয়ে নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ রয়েছে, তারপর একই বাক্যে মুহাম্মদের জন্য আলাদা সুবিধা ঘোষণা করছে। অর্থাৎ এটি সাধারণ কোনো বৈবাহিক বিধান নয়, ব্যক্তিবিশেষের জন্য ঘোষিত ব্যতিক্রম। সাধারণ মুসলিমের জন্য চার স্ত্রীর সীমা, নির্দিষ্ট বিবাহ-পদ্ধতি ও অন্যান্য শর্ত কার্যকর থাকবে, কিন্তু মুহাম্মদের ক্ষেত্রে একাধিক শর্ত শিথিল করা হবে, কারণ কোরআনের ভাষায় উদ্দেশ্য হচ্ছে তার ওপর যেন “অসুবিধা” না থাকে। একজন ধর্মপ্রচারকের বৈবাহিক ও যৌন ইচ্ছাকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় বিধানের এমন ব্যক্তিগত ব্যতিক্রম তৈরি হওয়া নিজেই গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়। আর সেই উৎসগুলো সামনে থাকার পরও মুহাম্মদ নারীসংক্রান্ত বিষয়ে কোনো বিশেষ সুবিধা পাননি কিংবা নারীদের প্রতি তার কোনো ব্যক্তিগত আগ্রহ ছিল না বলা সরাসরি মিথ্যা।
নারীর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হওয়া: কোরআনের সরাসরি ভাষা
মুহাম্মদের নারীর সৌন্দর্যের প্রতি কোনো বিশেষ আকর্ষণ ছিল না, তার বিবাহগুলোতে ব্যক্তিগত পছন্দ বা নারীসৌন্দর্যের কোনো ভূমিকা ছিল না, এমন দাবি কোরআনের ভাষার সঙ্গেই সাংঘর্ষিক। সূরা আহজাবের ৫২ নম্বর আয়াতে মুহাম্মদকে আরও নারী বিবাহ করা এবং বর্তমান স্ত্রীদের বদলে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করা থেকে বিরত করার সময় কোরআন সরাসরি এমন একটি অবস্থার কথা বলেছে, যেখানে অন্য নারীদের সৌন্দর্য তার কাছে আকর্ষণীয় বা মুগ্ধকর হতে পারে। বলা হয়েছে, “যদিও তাদের সৌন্দর্য তোমাকে মুগ্ধ করে”। একই আয়াতের শেষে আবার মালিকানাধীন দাসীদের এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা হয়েছে [5] –
অতঃপর আর কোন নারী তোমার জন্য বৈধ নয়। আর তাদের পরিবর্তে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করাও হালাল নয়, যদিও তাদের সৌন্দর্য তোমাকে চমৎকৃত করে। তবে তোমার অধিকারভুক্ত দাসীদের ব্যাপারে এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। আল্লাহ সব বিষয়ের উপর দৃষ্টি রাখেন।
— Taisirul Quran
আয়াতটির ভাষা একদমই কোনো রাখঢাক ছাড়া পরিষ্কার। এখানে নারীসৌন্দর্যকে মুহাম্মদের কাছে এমন একটি সম্ভাব্য আকর্ষণ হিসেবে ধরা হয়েছে, যা তাকে অন্য নারী গ্রহণে আগ্রহী করতে পারে, কিন্তু নতুন বিধান সেই আগ্রহের ওপর সীমা আরোপ করছে। “যদিও তাদের সৌন্দর্য তোমাকে মুগ্ধ করে” বাক্যের কোনো প্রয়োজনই থাকত না, যদি নারীসৌন্দর্যে মুহাম্মদের আকৃষ্ট হওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক হতো। কোরআন এখানে বিমূর্তভাবে মানুষের সাধারণ যৌন প্রবৃত্তি নিয়ে আলোচনা করছে না; বাক্যটি সরাসরি দ্বিতীয় পুরুষে মুহাম্মদকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে।
তাফসীরে তাবারিতেও আয়াতটির এই অংশকে সরাসরি নারীসৌন্দর্যের আকর্ষণের প্রসঙ্গেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তাবারি বিভিন্ন প্রাচীন ব্যাখ্যা উদ্ধৃত করে দেখিয়েছেন যে, মুহাম্মদকে তার বর্তমান স্ত্রীদের পরিবর্তে অন্য নারী গ্রহণ করতে নিষেধ করা হচ্ছে, এমনকি অন্য নারীদের সৌন্দর্য তার কাছে আকর্ষণীয় হলেও। মুজাহিদের ব্যাখ্যাও তিনি উল্লেখ করেছেন, যেখানে মুসলিম স্ত্রীদের বদলে অন্য নারী গ্রহণ এবং সেই নারীদের সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হওয়ার প্রসঙ্গ এসেছে [6] –
ولا أن تبدل بالمسلمات غيرهن من النصارى واليهود والمشركين ولو أعجبك حسنهن
অর্থাৎ, মুসলিম স্ত্রীদের পরিবর্তে খ্রিস্টান, ইহুদি বা মুশরিক নারীদের গ্রহণ করবে না, যদিও তাদের সৌন্দর্য তোমাকে মুগ্ধ করে।
এখানে যে ব্যাখ্যাই গ্রহণ করা হোক, মূল বিষয় বদলায় না। “সৌন্দর্য তোমাকে মুগ্ধ করে” কথাটি নারী নির্বাচন ও বিবাহের আকর্ষণের প্রসঙ্গেই ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে মুহাম্মদের নারীসংক্রান্ত সম্পর্কগুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করা যে নারীর সৌন্দর্য তার কাছে কোনো গুরুত্বই রাখত না, তা কোরআনের এই বাক্যের সঙ্গে অসঙ্গত। আয়াতটি বরং উল্টো তথ্য দেয়: কোনো নারীর সৌন্দর্য তার কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে এবং সেই আকর্ষণ সত্ত্বেও একটি নির্দিষ্ট সীমার পর তাকে নতুন বিবাহ থেকে বিরত থাকতে বলা হচ্ছে।
তাফসীরে কুরতুবি এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করেছেন। কুরতুবি “যদিও তাদের সৌন্দর্য তোমাকে মুগ্ধ করে” বাক্যটিকে শুধু ভাষাগত অলংকার হিসেবে নেননি; বরং তিনি এখান থেকে বিবাহের উদ্দেশ্যে নারীর দিকে তাকানোর বৈধতার প্রমাণও গ্রহণ করেছেন। তার যুক্তি হচ্ছে, একজন পুরুষ কোনো নারীকে দেখে তার মধ্যে এমন সৌন্দর্য দেখতে পারে যা তাকে সেই নারীকে বিবাহ করতে আগ্রহী করে। অর্থাৎ কুরতুবির ব্যাখ্যায়ও আয়াতটির “সৌন্দর্যে মুগ্ধ হওয়া” বিবাহের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত [7] –
وفي هذه الآية دليل على جواز أن ينظر الرجل إلى من يريد زواجها
অর্থাৎ, “এই আয়াতে প্রমাণ রয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি যে নারীকে বিবাহ করতে চায় তার দিকে তাকানো বৈধ।”
কুরতুবির এই ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখায় যে প্রাচীন ইসলামি ব্যাখ্যাকারীরা “তাদের সৌন্দর্য তোমাকে মুগ্ধ করে” কথাটিকে বাস্তব নারীসৌন্দর্য, দেখা এবং বিবাহে আগ্রহী হওয়ার প্রসঙ্গ হিসেবেই বুঝেছেন। এটি পরবর্তী যুগের কোনো ইসলামবিরোধী ব্যাখ্যা নয়। কুরতুবি নিজেই এই আয়াতকে একজন নারীর সৌন্দর্য দেখে তাকে বিবাহের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হওয়ার ফিকহি আলোচনায় প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
কুরতুবি একই জায়গায় ইবন আব্বাসের নামে একটি বর্ণনাও উল্লেখ করেছেন, যেখানে বলা হয়েছে, জাফর ইবন আবি তালিবের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইসের সৌন্দর্য মুহাম্মদের ভালো লেগেছিল এবং তিনি তাকে বিবাহ করতে চেয়েছিলেন। তবে কুরতুবি সেখানেই উল্লেখ করেছেন যে ইবনুল আরাবি এই নির্দিষ্ট বর্ণনাটিকে দুর্বল বলেছেন। তারপরেও আয়াতের সরাসরি ভাষা এবং প্রাচীন তাফসিরে তার ব্যাখ্যাই মূল দাবির জন্য যথেষ্ট [7] –
কুরতুবি ইবন আব্বাসের নামে আসমা বিনতে উমাইসের সৌন্দর্যে মুহাম্মদের মুগ্ধ হওয়ার বর্ণনা উল্লেখ করার পর লিখেছেন, “وهذا حديث ضعيف قاله ابن العربي”। অর্থাৎ, ইবনুল আরাবির মতে এই নির্দিষ্ট বর্ণনাটি দুর্বল।
এই পার্থক্যটি জরুরি। মুহাম্মদ আসমা বিনতে উমাইসের সৌন্দর্যে নিশ্চিতভাবে মুগ্ধ হয়েছিলেন, এই নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক দাবি ইসলামের সনদের বিচারে দুর্বল বর্ণনা। কিন্তু সেখান থেকে “মুহাম্মদ নারীসৌন্দর্যে আকৃষ্ট হতেন না” সিদ্ধান্তে যাওয়া আরও বড় ভুল। কারণ আসমার ঘটনাটি বাদ দিলেও কোরআনের বাক্যটি থেকেই যায়: “যদিও তাদের সৌন্দর্য তোমাকে মুগ্ধ করে”। অর্থাৎ মূল যুক্তি কোনো দুর্বল কাহিনির ওপর নির্ভর করছে না; কোরআনের নিজের ভাষার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
তাফসীরে নাসাফিতেও একই বাক্যের ব্যাখ্যায় নারীর সৌন্দর্যে মুহাম্মদের মুগ্ধ হওয়ার ধারণাটিই সরাসরি এসেছে। নাসাফি ব্যাকরণগতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, “ولو أعجبك” বাক্যটির অর্থ এমন একটি অবস্থা ধরে নেওয়া যেখানে নারীরা মুহাম্মদের কাছে আকর্ষণীয় হয়েছেন। তিনি আসমা বিনতে উমাইসের বর্ণনাটিও উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন, তাকে সেই নারীদের একজন বলা হয়েছে যাদের সৌন্দর্য মুহাম্মদের ভালো লেগেছিল [8] –
وتقديره: مفروضا إعجابك بهن
অর্থাৎ, বাক্যটির অর্থ এমন অবস্থা ধরে নিয়ে বলা হয়েছে, যেখানে মুহাম্মদ সেই নারীদের প্রতি মুগ্ধ হয়েছেন।
ইসলামওয়েবের একটি কোরআন ব্যাখ্যার পাঠেও এই কথাটি আরও সরাসরি ভাষায় বলা হয়েছে। সেখানে “যদিও তাদের সৌন্দর্য তোমাকে মুগ্ধ করে” অংশের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, মুহাম্মদের সামনে কোনো নারী এলে তার সৌন্দর্য তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে; কিন্তু এই আয়াতের পর তাকে নতুন করে সেই নারীকে বিবাহ না করতে বলা হয়েছে [9] –
قد يرى النبي عليه الصلاة والسلام امرأة … فيلفت جمالها نظره
অর্থাৎ, নবী কোনো নারীকে দেখতে পারেন এবং তার সৌন্দর্য নবীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে।
আরও লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, নতুন স্ত্রী গ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেও কোরআন একই আয়াতে মুহাম্মদের মালিকানাধীন দাসীদের স্পষ্টভাবে ব্যতিক্রম রেখেছে: “তবে তোমার অধিকারভুক্ত দাসীদের ব্যাপার ভিন্ন”। অর্থাৎ স্ত্রী গ্রহণের দরজা সীমিত করা হলেও দাসীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কের সুযোগ বন্ধ করা হয়নি। তাবারির তাফসিরে এই ব্যতিক্রম নিয়েও বিভিন্ন প্রাচীন ব্যাখ্যা সংরক্ষিত আছে [6] –
إِلَّا مَا مَلَكَتْ يَمِينُكَ
অর্থাৎ, নিষেধাজ্ঞার বাইরে ছিল “তোমার ডান হাত যার মালিক”, অর্থাৎ মালিকানাধীন দাসী।
ফলে সূরা আহজাবের এই ধারাবাহিক বিধানকে “নারীর প্রতি অনাগ্রহী একজন নবীকে আল্লাহর হুকুমে কিংবা সামাজিক-রাজনৈতিক কারণে অনিচ্ছায় বিবাহ করতে বাধ্য করা হয়েছিল” ধরনের গল্পে রূপান্তর করা যায় না। আগের আয়াতে তার জন্য সাধারণ মুসলিমদের বাইরে বিশেষভাবে নারী হেবা গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে; বলা হয়েছে, তিনি চাইলে সেই নারীকে গ্রহণ করতে পারবেন এবং উদ্দেশ্য হচ্ছে তার যেন কোনো অসুবিধা না হয়। পরের আয়াতে স্ত্রীদের মধ্যে কাকে কাছে রাখবেন, কাকে দূরে রাখবেন সেই বিষয়ে বিশেষ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। এরপর ৫২ নম্বর আয়াতে নতুন স্ত্রী গ্রহণের সীমা টানার সময়ও বলা হচ্ছে, অন্য নারীদের সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করতে পারে; আবার মালিকানাধীন দাসীদের সেই সীমার বাইরে রাখা হচ্ছে। পুরো ধারাবাহিকতার কেন্দ্রেই রয়েছে মুহাম্মদের নারী নির্বাচন, ব্যক্তিগত ইচ্ছা, আকর্ষণ এবং তার জন্য ঘোষিত বিশেষ সুবিধা।
অতএব, “মুহাম্মদের নারীর সৌন্দর্যের প্রতি কোনো আকর্ষণ ছিল না” দাবি কেবল প্রমাণহীন নয়; কোরআনের ভাষার বিপরীত। কোরআন নিজেই নারীসৌন্দর্যকে মুহাম্মদের কাছে মুগ্ধকর হওয়ার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে, এবং প্রাচীন মুসলিম ব্যাখ্যাকারীরা এই বাক্যকে ঠিক সেই অর্থেই বুঝেছেন। পরবর্তী যুগের ধর্মীয় প্রচারকেরা যদি এর বিপরীতে এমন একজন যৌনভাবে প্রায় নিরাসক্ত মুহাম্মদের প্রতিকৃতি নির্মাণ করেন, তাহলে সেটি ইসলামি মূল উৎস থেকে পাওয়া মুহাম্মদ নয়; সেটি পরবর্তী যুগে নির্মিত চরিত্ররক্ষাকারী প্রতিকৃতি।
নবীর কী এমন অসুবিধা, যা আল্লাহ দূর করতে চান?
সূরা আহজাবের ৫০ নম্বর আয়াতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাক্যগুলোর একটি হচ্ছে, “যাতে তোমার কোনো অসুবিধা না হয়”। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, মুহাম্মদের কী এমন অসুবিধা হচ্ছিল, যার সমাধানের জন্য আল্লাহকে তার জন্য সাধারণ মুসলিমদের বৈবাহিক বিধান শিথিল করতে হলো? কেন তার জন্য চার স্ত্রীর সীমা কার্যকর থাকল না, কেন নিজেকে হেবা করা নারীকে মোহর ছাড়াই গ্রহণ করার সুযোগ দেওয়া হলো, কেন তার মালিকানাধীন দাসীদের বৈধ ঘোষণা করা হলো, এবং কেন এসব সুবিধাকে আলাদা করে তার জন্য বিশেষ বিধান হিসেবে ঘোষণা করতে হলো? প্রাচীন তাফসিরগুলো এই প্রশ্নের উত্তর অস্পষ্ট রাখেনি। সেখানে “অসুবিধা” বলতে সরাসরি বিবাহ ও নারী গ্রহণের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ, সংকীর্ণতা এবং মুহাম্মদ যা চান তা থেকে তাকে বাধা দেওয়াকে বোঝানো হয়েছে।
আল-ওয়াহিদি আত-তাফসীর আল-ওয়াসীত-এ “যাতে তোমার কোনো অসুবিধা না হয়” বাক্যটির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এমন ভাষা ব্যবহার করেছেন, যার পরে এই “অসুবিধা”র প্রকৃতি নিয়ে অনুমানের সুযোগ খুব কমই থাকে। তিনি লিখেছেন, এর অর্থ হচ্ছে বিবাহের ব্যাপারে মুহাম্মদের ওপর যেন সংকীর্ণতা না থাকে এবং তিনি যে জিনিস চান, তা থেকে যেন তাকে বাধা দেওয়া না হয় [10] –
لِكَيْلَا يَكُونَ عَلَيْكَ حَرَجٌ ضِيقٌ فِي أَمْرِ النِّكَاحِ، وَمَنْعٌ مِنْ شَيْءٍ تُرِيدُهُ … أَحْلَلْنَا لَكَ مَا ذَكَرْنَا لِيَرْتَفِعَ عَنْكَ الْحَرَجُ.
অর্থাৎ, “যাতে বিবাহের ব্যাপারে তোমার ওপর সংকীর্ণতা না থাকে এবং তুমি যা চাও তা থেকে তোমাকে বাধা দেওয়া না হয়” … “আমরা তোমার জন্য উল্লিখিত বিষয়গুলো বৈধ করেছি, যাতে তোমার ওপর থেকে সেই অসুবিধা দূর হয়।”
এখানে “অসুবিধা”র অর্থ কোনো যুদ্ধ পরিচালনার অসুবিধা নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার সমস্যা নয়, ধর্মপ্রচার করতে না পারার সংকটও নয়। আল-ওয়াহিদির ভাষায় সমস্যাটি হচ্ছে “বিবাহের ব্যাপারে সংকীর্ণতা” এবং “তিনি যা চান তা থেকে তাকে বাধা দেওয়া”। আর সেই সংকীর্ণতা দূর করার ব্যবস্থাই হচ্ছে সাধারণ মুসলিমদের তুলনায় মুহাম্মদের জন্য বৈবাহিক নিয়ম শিথিল করা। অর্থাৎ সমস্যাটি ছিল নারী গ্রহণের পথে বিধিনিষেধ, আর সমাধান ছিল সেই বিধিনিষেধ সরিয়ে দেওয়া।
তাফসীরে বাগাভিতেও একই বিষয় আরও সরাসরি এসেছে। বাগাভি প্রথমে সাধারণ মুসলিমদের জন্য নির্ধারিত নিয়মগুলো উল্লেখ করেছেন: চারজনের বেশি স্ত্রী নয়, বিবাহে অভিভাবক, সাক্ষী ও মোহর প্রয়োজন। এরপর তিনি বলেন, মুহাম্মদের জন্য তার স্ত্রী, মালিকানাধীন দাসী এবং নিজেকে হেবা করা নারীকে বৈধ করা হয়েছে, যাতে তার ওপর কোনো সংকীর্ণতা না থাকে [11] –
أَوْجَبْنَا عَلَى الْمُؤْمِنِينَ فِي أَزْوَاجِهِمْ مِنَ الْأَحْكَامِ أَنْ لَا يَتَزَوَّجُوا أَكْثَرَ مِنْ أَرْبَعٍ وَلَا يَتَزَوَّجُوا إِلَّا بِوَلِيٍّ وَشُهُودٍ وَمَهْرٍ … أَحْلَلْنَا لَكَ أَزْوَاجَكَ وَمَا مَلَكَتْ يَمِينُكَ وَالْمَوْهُوبَةَ لَكَ لِكَيْ لَا يَكُونَ عَلَيْكَ حَرَجٌ وَضِيقٌ.
অর্থাৎ, “মুমিনদের স্ত্রীদের ব্যাপারে আমরা বিধান দিয়েছি যে, তারা চারজনের বেশি স্ত্রী গ্রহণ করবে না এবং অভিভাবক, সাক্ষী ও মোহর ছাড়া বিবাহ করবে না … কিন্তু তোমার জন্য তোমার স্ত্রীদের, তোমার মালিকানাধীন নারীদের এবং তোমাকে হেবা করা নারীকে বৈধ করেছি, যাতে তোমার ওপর কোনো অসুবিধা ও সংকীর্ণতা না থাকে।”
বাগাভির ব্যাখ্যায় কোরআনের বৈষম্যটি একেবারেই স্পষ্ট। যে বিধিনিষেধ সাধারণ মুসলিম পুরুষের ওপর চাপানো হয়েছে, সেগুলোর কয়েকটি মুহাম্মদের ক্ষেত্রে তুলে দেওয়া হয়েছে। চারজনের সীমা সাধারণ মুসলিমের জন্য, মুহাম্মদের জন্য নয়। অভিভাবক, সাক্ষী ও মোহরের সাধারণ নিয়ম অন্যদের জন্য, কিন্তু নিজেকে হেবা করা নারীর ক্ষেত্রে মুহাম্মদ বিশেষ ছাড় পাচ্ছেন। এই ছাড়গুলোর কারণ হিসেবেই বলা হচ্ছে, যাতে তার ওপর “অসুবিধা ও সংকীর্ণতা” না থাকে।
ইসলামওয়েবের সূরা আহজাব ৪৯-৫১-এর ব্যাখ্যাতেও একই বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে লেখা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সাধারণ মুমিনদের চারজনের বেশি স্ত্রী গ্রহণ করা নিষিদ্ধ, বিবাহে মোহর, সাক্ষী এবং অভিভাবকের বিধান রয়েছে; কিন্তু মুহাম্মদের ক্ষেত্রে এসবের কয়েকটি বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে। ইসলামওয়েব সরাসরি বলছে, আল্লাহ মুহাম্মদের ওপর এসব বিধান আরোপ করেননি “যাতে তার কোনো অসুবিধা না হয়” [12] –
فَفَرَضْنَا عَلَيْهِمْ أَلَّا يَتَزَوَّجُوا إِلَّا بِمَهْرٍ وَبَيِّنَةٍ – شَاهِدَيْنِ – وَوَلِيٍّ، وَأَلَّا يَجْمَعُوا بَيْنَ أَكْثَرَ مِنْ أَرْبَعِ نِسْوَةٍ، وَقَدْ رَخَّصْنَا لَكَ فِي ذَلِكَ، فَلَمْ نُوجِبْ عَلَيْكَ شَيْئًا مِنْ هَذَا لِكَيْلَا يَكُونَ عَلَيْكَ حَرَجٌ.
অর্থাৎ, “আমরা তাদের ওপর বিধান দিয়েছি যে তারা মোহর, দুই সাক্ষী ও অভিভাবক ছাড়া বিবাহ করবে না এবং চারজনের বেশি স্ত্রী একত্র করবে না। কিন্তু তোমাকে এ বিষয়ে ছাড় দিয়েছি এবং এসবের কোনোটি তোমার ওপর বাধ্যতামূলক করিনি, যাতে তোমার কোনো অসুবিধা না হয়।”
এই বক্তব্যটি “অসুবিধা” শব্দটির অর্থকে আরও নির্দিষ্ট করে দেয়। সাধারণ মুসলিম পুরুষ যদি চারজন স্ত্রী থাকার পর পঞ্চম নারীকে বিবাহ করতে চান, ধর্মীয় বিধান তাকে বাধা দেয়। মুহাম্মদের ক্ষেত্রে সেই বাধা তুলে দেওয়া হয়েছে। সাধারণ মুসলিমের বিবাহে যেসব আনুষ্ঠানিক ও আর্থিক শর্ত কার্যকর, মুহাম্মদের বিশেষ বিবাহের ক্ষেত্রে সেগুলোরও ছাড় দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ যে “অসুবিধা” দূর করছেন, তার বাস্তব রূপ হচ্ছে আরও নারী গ্রহণের পথে ধর্মীয় বিধিনিষেধ।
ইসলামওয়েবের আবু বকর আল-জাযায়েরির তাফসিরে এই বিশেষ ছাড়গুলো আরও খোলামেলাভাবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। সেখানে মুহাম্মদের জন্য চারজনের বেশি স্ত্রী গ্রহণ এবং নিজেকে হেবা করা নারীকে মোহর ও অভিভাবক ছাড়াই বিবাহের অনুমতিকে সরাসরি তার ওপর বিধান হালকা করার উদাহরণ বলা হয়েছে [13] –
فأباح له أكثر من أربع، وقصر المؤمنين على أربع، وأباح له الواهبة نفسها أن يتزوجها بغير مهر ولا ولي، ولم يبح ذلك للمؤمنين.
অর্থাৎ, “আল্লাহ তার জন্য চারজনের বেশি স্ত্রী বৈধ করেছেন, মুমিনদের চারজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছেন এবং যে নারী নিজেকে তার কাছে হেবা করে তাকে মোহর ও অভিভাবক ছাড়াই বিবাহ করার অনুমতি দিয়েছেন; মুমিনদের জন্য এটি বৈধ করেননি।”
কোরআনের পরের আয়াতেই এই বিশেষ সুবিধা আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়। সূরা আহজাব ৩৩ঃ৫১-তে মুহাম্মদকে স্ত্রীদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা দূরে রাখা, যাকে ইচ্ছা কাছে রাখা এবং যাকে আগে দূরে রেখেছেন তাকে আবার চাইলে গ্রহণ করার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ শুধু কতজন নারী গ্রহণ করবেন সেই ক্ষেত্রেই নয়, বিদ্যমান স্ত্রীদের মধ্যে পালা ও সহবাস বণ্টনের ক্ষেত্রেও তার জন্য সাধারণ নিয়ম শিথিল করা হয়েছিল [14] –
তুমি তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তোমার নিকট হতে দূরে রাখতে পার এবং যাকে ইচ্ছা তোমার কাছে স্থান দিতে পার এবং যাকে তুমি দূরে রেখেছ তাকে পুনরায় কামনা করলে তাতে তোমার কোনো অপরাধ হবে না।
তাফসীরে বাগাভিতে এই আয়াতের সবচেয়ে প্রচলিত ব্যাখ্যা হিসেবে বলা হয়েছে, স্ত্রীদের মধ্যে সমানভাবে পালা বণ্টন মুহাম্মদের ওপর আর বাধ্যতামূলক থাকল না; কাকে পালা দেবেন, কাকে দেবেন না, কাকে বেশি দেবেন, এমনকি ব্যয় ও পালার ক্ষেত্রে কাকে অগ্রাধিকার দেবেন, সেই সিদ্ধান্তও তার হাতে দেওয়া হলো [15] –
فَلَمَّا نَزَلَتْ هَذِهِ الْآيَةُ سَقَطَ عَنْهُ وَصَارَ الِاخْتِيَارُ إِلَيْهِ فِيهِنَّ … فَيَرْضَيْنَ بِهِ قَسَمَ لَهُنَّ أَوْ لَمْ يَقْسِمْ، أَوْ قَسَمَ لِبَعْضِهِنَّ دُونَ بَعْضٍ، أَوْ فَضَّلَ بَعْضَهُنَّ فِي النَّفَقَةِ وَالْقِسْمَةِ، فَيَكُونُ الْأَمْرُ فِي ذَلِكَ إِلَيْهِ يَفْعَلُ كَيْفَ يَشَاءُ.
অর্থাৎ, “এই আয়াত নাজিল হওয়ার পর সেই বাধ্যবাধকতা তার ওপর থেকে উঠে গেল এবং স্ত্রীদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত তার হাতে চলে গেল … তিনি চাইলে তাদের পালা দেবেন, চাইলে দেবেন না; কাউকে পালা দেবেন, কাউকে দেবেন না; ব্যয় ও পালার ক্ষেত্রে কাউকে অন্যের ওপর প্রাধান্য দেবেন; এই সমস্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত তার হাতে, তিনি যেভাবে চান সেভাবেই করবেন।”
তাবারির ব্যাখ্যা আরও স্পষ্ট। তিনি লিখেছেন, মুহাম্মদ চাইলে কোনো স্ত্রী বা নিজেকে হেবা করা নারীকে কাছে নেবেন, চাইলে দূরে রাখবেন, চাইলে সহবাস করবেন, চাইলে করবেন না; এর জন্য সমান পালা বণ্টনের বাধ্যবাধকতাও তার ওপর ছিল না [16] –
فتقبلها أو تنكحها … فتجامعها إذا شئت وتتركها إذا شئت بغير قسم.
অর্থাৎ, “তুমি চাইলে তাকে গ্রহণ করবে বা বিবাহ করবে … চাইলে তার সঙ্গে সহবাস করবে এবং চাইলে তাকে ছেড়ে রাখবে, কোনো পালা বণ্টনের বাধ্যবাধকতা ছাড়াই।”
ফখরুদ্দিন আল-রাজিও একই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, মুহাম্মদের জন্য স্ত্রীদের সঙ্গে সম্পর্কের ধরন এমনভাবে বৈধ করা হয়েছিল যাতে তিনি নিজের ইচ্ছামতো তাদের সঙ্গে মিলিত হতে পারেন এবং তাদের মধ্যে সমান পালা রাখা তার জন্য আবশ্যক না হয় [17] –
أَحَلَّ لَهُ وُجُوهَ الْمُعَاشَرَةِ بِهِنَّ حَتَّى يَجْتَمِعَ كَيْفَ يَشَاءُ وَلَا يَجِبُ عَلَيْهِ الْقَسْمُ.
অর্থাৎ, “তাদের সঙ্গে সম্পর্কের পদ্ধতিগুলো তার জন্য বৈধ করা হয়েছে, যাতে তিনি যেভাবে চান সেভাবে মিলিত হতে পারেন এবং তাদের মধ্যে পালা বণ্টন তার ওপর আবশ্যক না থাকে।”
এখন “নবীর কী এমন অসুবিধা ছিল?” প্রশ্নটির উত্তর ইসলামি উৎস থেকেই পাওয়া যায়। অসুবিধা ছিল সাধারণ মুসলিমদের মতো চার স্ত্রীর সীমায় আবদ্ধ থাকা; অসুবিধা ছিল বিবাহের সাধারণ শর্ত মেনে চলা; অসুবিধা ছিল নিজেকে সমর্পণ করা নারীকে মোহর ছাড়া গ্রহণ করতে না পারা; অসুবিধা ছিল স্ত্রীদের মধ্যে পালা ও সহবাসের ক্ষেত্রে সমতার বাধ্যবাধকতা; এবং আল-ওয়াহিদির ভাষায়, অসুবিধা ছিল “তিনি যা চান তা থেকে তাকে বাধা দেওয়া”। কোরআনের সমাধান ছিল এসব বাধার একের পর এক অপসারণ।
এই ধারাবাহিকতার অর্থ পরিষ্কার। প্রথমে মুহাম্মদের জন্য সাধারণ মুসলিমের তুলনায় বেশি নারী গ্রহণের সুযোগ; এরপর নিজেকে হেবা করা নারীকে বিশেষভাবে গ্রহণের অধিকার; বিবাহের সাধারণ শর্তে ছাড়; স্ত্রীদের মধ্যে কাকে কাছে রাখবেন, কাকে দূরে রাখবেন এবং কার সঙ্গে কখন সহবাস করবেন সেই বিষয়ে স্বাধীনতা; তারপর আবার বলা হচ্ছে অন্য নারীদের সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করলেও নতুন স্ত্রী নয়, কিন্তু মালিকানাধীন দাসীরা সেই নিষেধের বাইরে। এসব বিধানের কেন্দ্রবিন্দুতে কোনো অনিচ্ছুক ব্যক্তিকে জোর করে বিবাহ করানোর চিত্র নেই। বরং কোরআন বারবার মুহাম্মদের ইচ্ছা, পছন্দ এবং নারী গ্রহণের ক্ষেত্রে তার সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ বিধান তৈরি করছে।
সুতরাং “আল্লাহ মুহাম্মদকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও একের পর এক নারী বিবাহ করতে বাধ্য করেছিলেন” ধরনের প্রচারণা কোরআন ও প্রাচীন তাফসিরের বিপরীত। উৎসগুলো যে চিত্র দেয় তা উল্টো: সাধারণ মুসলিমদের জন্য যে বৈবাহিক বাধা ছিল, তার কয়েকটি মুহাম্মদের জন্য তুলে দেওয়া হয়েছিল, এবং সেই ছাড়ের ঘোষিত কারণই ছিল, “যাতে তোমার কোনো অসুবিধা না হয়”। অর্থাৎ অসুবিধা দূর করার অর্থ ছিল নারী ও বিবাহের ক্ষেত্রে তার ইচ্ছার পথে ধর্মীয় বিধিনিষেধ কমিয়ে দেওয়া।
বিভিন্ন তাফসির পাশাপাশি রাখলে “যাতে তোমার কোনো অসুবিধা না হয়” কথাটির অর্থ নিয়ে ধোঁয়াশার কোনো সুযোগ থাকে না। তাফসিরকারেরা কেউ এটিকে যুদ্ধ, রাষ্ট্র পরিচালনা, দাওয়াতের কাজ কিংবা কোনো জনকল্যাণমূলক সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করেননি। তারা বারবার ব্যাখ্যা করেছেন বিবাহ, স্ত্রীসংখ্যা, হেবা করা নারী, মোহর এবং নারী গ্রহণের ক্ষেত্রে মুহাম্মদের ওপর যেন সংকীর্ণতা না থাকে। নিচের সারণিতে বিষয়টি একসঙ্গে দেখা যায়।
| তাফসির | “অসুবিধা” সম্পর্কে বক্তব্য | সরাসরি অর্থ |
|---|---|---|
| আল-ওয়াহিদি, আত-তাফসীর আল-ওয়াসীত [18] | ضيق في أمر النكاح، ومنع من شيء تريده “বিবাহের ব্যাপারে সংকীর্ণতা এবং তুমি যা চাও তা থেকে তোমাকে বাধা দেওয়া।” | এখানে অসুবিধা হচ্ছে বিবাহের ক্ষেত্রে মুহাম্মদের ইচ্ছার ওপর বাধা। আল্লাহ সেই বাধা সরিয়ে দিচ্ছেন, যাতে তিনি যা চান তা থেকে বঞ্চিত না হন। |
| তাফসীরে বাগাভি [19] | সাধারণ মুমিনদের জন্য চার স্ত্রীর সীমা, অভিভাবক, সাক্ষী ও মোহরের বিধান উল্লেখ করার পর বলেন, মুহাম্মদের স্ত্রী, দাসী ও হেবা করা নারীকে তার জন্য বৈধ করা হয়েছে لكي لا يكون عليك حرج وضيق, অর্থাৎ “যাতে তোমার ওপর অসুবিধা ও সংকীর্ণতা না থাকে।” | সাধারণ মুসলিমের বৈবাহিক সীমাবদ্ধতার বিপরীতে মুহাম্মদের জন্য বেশি এবং উন্মুক্ত যৌন বা বৈবাহিক সুযোগ তৈরি করাই এখানে অসুবিধা দূর করা। |
| তাফসীরে তাবারি [1] | তাবারি বলেন, এসব শ্রেণির নারীকে মুহাম্মদের জন্য বৈধ করা হয়েছে لكيلا يكون عليك إثم وضيق في نكاح من نكحت من هؤلاء الأصناف, অর্থাৎ “যাতে এসব শ্রেণির নারীকে বিবাহ করার ক্ষেত্রে তোমার ওপর পাপ বা সংকীর্ণতা না থাকে।” | অসুবিধা হচ্ছে উল্লিখিত নারীদের বিবাহ বা গ্রহণে ধর্মীয় বাধা। আয়াত সেই বাধাকে বৈধতার মাধ্যমে সরিয়ে দেয়। |
| তাফসীরে কুরতুবি [1] | কুরতুবি “অসুবিধা”র ব্যাখ্যা করেছেন, ضيق في أمر أنت فيه محتاج إلى السعة, অর্থাৎ “এমন একটি বিষয়ে সংকীর্ণতা, যেখানে তোমার প্রশস্ততার প্রয়োজন।” | কুরতুবির ভাষায় মুহাম্মদের প্রয়োজন ছিল বৈবাহিক বিধানে আরও প্রশস্ততার। কোরআনের বিশেষ ছাড় সেই প্রয়োজন পূরণ করছে। |
| ইবনুল জাওযি, যাদুল মাসীর [19] | ইবনুল জাওযি প্রথমে সাধারণ মুমিনদের ক্ষেত্রে চার স্ত্রীর সীমা এবং অভিভাবক, সাক্ষী ও মোহরের বিধান উল্লেখ করে বলেন, “যাতে তোমার কোনো অসুবিধা না হয়” কথাটি মুহাম্মদের জন্য পূর্বে উল্লেখিত বিশেষ বৈধতাগুলোর সঙ্গেই যুক্ত। | সাধারণ মুসলিমদের ওপর যে বৈবাহিক নিয়ম চাপানো হয়েছে, সেই একই সংকীর্ণতার মধ্যে মুহাম্মদকে না রাখাই ছিল বিশেষ ছাড়ের উদ্দেশ্য। |
| তাফসীরে নাসাফি [20] | নাসাফি “حرج” শব্দের অর্থ করেছেন সরাসরি ضيق, অর্থাৎ “সংকীর্ণতা”; এবং এটিকে “শুধু তোমার জন্য, অন্য মুমিনদের জন্য নয়” এই বিশেষ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। একই আলোচনায় তিনি হেবা করা নারীকে মোহর ছাড়া গ্রহণের বিশেষ সুবিধার কথাও বলেছেন। | অসুবিধা দূর করা মানে মুহাম্মদের জন্য সাধারণ মুসলিমদের তুলনায় বিশেষ ও শিথিল বিবাহবিধান নিশ্চিত করা। |
| ইবন আশুর, আত-তাহরীর ওয়াত তানওয়ীর [19] | ইবন আশুর একেবারে নির্দিষ্ট করে বলেন, “অসুবিধা না হওয়া” হচ্ছে মুহাম্মদের জন্য বিধানের التوسعة بالازدياد من عدد الأزواج وتزوج الواهبات أنفسهن دون مهر ، وجعل قبول هبتها موكولا لإرادته। অর্থাৎ স্ত্রীসংখ্যা বৃদ্ধির সুযোগ, নিজেকে হেবা করা নারীকে মোহর ছাড়া বিবাহ এবং সেই হেবা গ্রহণ করা হবে কি না তা মুহাম্মদের নিজের ইচ্ছার ওপর রাখা। | এখানে আর কোনো অস্পষ্টতা নেই। “অসুবিধা” দূর করার অর্থ হচ্ছে আরও স্ত্রী নেওয়ার সুযোগ, মোহর ছাড়া হেবা করা নারী গ্রহণ এবং সেই নারীকে গ্রহণের সিদ্ধান্ত মুহাম্মদের ব্যক্তিগত ইচ্ছার হাতে দেওয়া। |
সারণিটি যে চিত্র দেয় তা নির্মমভাবে পরিষ্কার। “নবীর অসুবিধা” বলতে তাফসিরকারেরা কোথাও মানুষের কল্যাণ, ইসলামের প্রসার, যুদ্ধের প্রয়োজন কিংবা বিধবাদের পুনর্বাসনের কথা বলেননি। তারা বলেছেন বিবাহে সংকীর্ণতা, চার স্ত্রীর সীমা, মোহর ও অন্যান্য বিবাহের শর্ত, হেবা করা নারী গ্রহণ, আরও স্ত্রী গ্রহণের সুযোগ এবং সবচেয়ে নগ্ন ভাষায়, “তুমি যা চাও তা থেকে তোমাকে বাধা দেওয়া”। অর্থাৎ কোরআনে যে “অসুবিধা” দূর করা হয়েছে, সেটি মূলত মুহাম্মদের নারী গ্রহণের পথে ধর্মীয় বিধিনিষেধ। সাধারণ বিশ্বাসীর জন্য যে নিয়ম আল্লাহর আইন, মুহাম্মদের ব্যক্তিগত চাহিদার সামনে সেই একই নিয়ম শিথিল হয়ে বিশেষ সুবিধায় পরিণত হয়েছে।
আয়িশার চোখে ওহি: “আপনার রব আপনার ইচ্ছা পূরণে দ্রুত”
মুহাম্মদের নারীসংক্রান্ত বিশেষ সুবিধাগুলো নিয়ে সবচেয়ে তীক্ষ্ণ মন্তব্যটি কোনো আধুনিক ইসলাম সমালোচক করেননি। মন্তব্যটি করেছিলেন তার স্ত্রী আয়িশা। মুহাম্মদের কাছে নারীরা নিজেদের বিবাহের জন্য হেবা করতেন, অর্থাৎ কোনো মোহর দাবি না করে নিজেদের সরাসরি তার কাছে সমর্পণ করতেন। আয়িশা এই ব্যবস্থার প্রতি নিজের বিরক্তি ও ঈর্ষা গোপন করেননি। সহিহ মুসলিমে তার বক্তব্য হচ্ছে, তিনি এসব নারীর প্রতি ঈর্ষান্বিত হতেন এবং বিস্ময়ের সঙ্গে প্রশ্ন করতেন, “নারী কি নিজেকে এভাবে সমর্পণ করে?” এরপর যখন সূরা আহজাবের ৫১ নম্বর আয়াত নাজিল হলো এবং মুহাম্মদকে নারীদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা দূরে রাখা, যাকে ইচ্ছা কাছে রাখা এবং দূরে রাখার পর আবার যাকে ইচ্ছা গ্রহণ করার স্বাধীনতা দেওয়া হলো, তখন আয়িশার প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত তীক্ষ্ণ [21] –
আয়িশাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে নারীরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রী হওয়ার জন্য আত্মনিবেদিতা হত, আমি তাদের প্রতি ঈর্ষান্বিত হতাম এবং বলতাম, কোনো নারী কি নিজেকে এভাবে নিবেদন করতে পারে? পরে যখন আল্লাহ তা’আলা এ আয়াত নাযিল করলেন, “তুমি তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তোমার নিকট হতে দূরে রাখতে পার এবং যাকে ইচ্ছা তোমার কাছে স্থান দিতে পার এবং যাকে তুমি দূরে রেখেছ তাকে পুনরায় কামনা করলে তাতে তোমার কোনো অপরাধ হবে না”, তখন আয়িশাহ বলেন, “আল্লাহর কসম! আমি তো দেখছি আপনার প্রতিপালক আপনার মনোবাঞ্ছা পূরণে দ্রুতই সাড়া দিয়ে থাকেন।”
সহিহ বুখারিতেও একই বক্তব্য সংরক্ষিত আছে। সেখানে আয়িশার ভাষা আরও সংক্ষিপ্ত কিন্তু একই অর্থ বহন করে: নিজেকে মুহাম্মদের কাছে হেবা করা নারীদের তিনি অপছন্দ করতেন; তারপর মুহাম্মদের জন্য ৩৩ঃ৫১-এর বিশেষ স্বাধীনতা নাজিল হলে তিনি সরাসরি বলেন, “আমি দেখছি যে, আপনার রব আপনি যা ইচ্ছা করেন, তা-ই পূরণ করেন।” [22] –
আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যেসব মহিলা নিজকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে হেবাস্বরূপ ন্যস্ত করে দেন, তাদের আমি ঘৃণা করতাম। আমি বলতাম, মহিলারা কি নিজেকে অর্পণ করতে পারে? এরপর যখন আল্লাহ্ তা’আলা এ আয়াত নাযিল করেন, “আপনি তাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা আপনার কাছ থেকে দূরে রাখতে পারেন এবং যাকে ইচ্ছা আপনার নিকট স্থান দিতে পারেন। আর আপনি যাকে দূরে রেখেছেন, তাকে কামনা করলে আপনার কোনো অপরাধ নেই।” তখন আমি বললাম, আমি দেখছি যে, আপনার রব আপনি যা ইচ্ছা করেন, তা-ই পূরণ করেন।
এই বক্তব্যকে কোনো আধুনিক সমালোচকের কটাক্ষ বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এটি মুহাম্মদের ঘরের ভেতরের একজন প্রত্যক্ষ ব্যক্তির বক্তব্য, এবং ইসলামি হাদিসশাস্ত্রের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ দুই গ্রন্থ বুখারি ও মুসলিম উভয়েই এটি সহিহ হিসেবে সংরক্ষণ করেছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ঘটনাক্রম। প্রথমে নারীদের মুহাম্মদের কাছে নিজেদের হেবা করার বিশেষ ব্যবস্থা; আয়িশার তা নিয়ে বিরক্তি; তারপর মুহাম্মদকে তাদের মধ্যে কাকে কাছে রাখবেন, কাকে দূরে রাখবেন, আবার কাকে ফিরিয়ে নেবেন সেই সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা দিয়ে আয়াত; এবং আয়াত নাজিল হওয়ার পর আয়িশার মন্তব্য, “আপনার রব আপনার মনোবাঞ্ছা পূরণে দ্রুত।” অর্থাৎ আয়িশা নিজেই মুহাম্মদের ইচ্ছা এবং তার পক্ষে নাজিল হওয়া বিশেষ বিধানের মধ্যে সম্পর্ক দেখতে পেয়েছিলেন।
ইসলামওয়েবে সংরক্ষিত সহিহ মুসলিমের আরবি পাঠ আরও স্পষ্ট। সেখানে আয়িশার মূল শব্দ হচ্ছে هَوَاكَ, “তোমার হাওয়া”, অর্থাৎ তোমার ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা বা পছন্দ [23] –
وَاللَّهِ مَا أَرَى رَبَّكَ إِلَّا يُسَارِعُ لَكَ فِي هَوَاكَ
অর্থাৎ, “আল্লাহর কসম, আমি দেখছি আপনার রব আপনার ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষার ব্যাপারে আপনার জন্য দ্রুত সাড়া দেন।”
বেশ কয়েকটি বিবরণ দেখা যাক, [24] [25] [22] [26]
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১৮। দুধপান
পরিচ্ছেদঃ ১৪. সতীনকে নিজের পালা হিবা করা বৈধ
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৩৫২৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৪৬৪
৩৫২৩-(৪৯/১৪৬৪) আবূ কুরায়ব মুহাম্মাদ ইবনুল আলী (রহঃ) ….. আয়িশাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে নারীরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর (স্ত্রী হওয়ার জন্য) আত্মনিবেদিতা হত আমি তাদের নির্লজ্জতায় বিস্ময় প্রকাশ করতাম এবং বলতাম, কোন নারী কি (এভাবে নির্লজ্জ হয়ে) আত্মনিবেদন করতে পারে? পরে যখন আল্লাহ তা’আলা এ আয়াত নাযিল করলেন- “তুমি তাদের (স্ত্রীগণের মধ্যে) যাকে ইচ্ছা তোমার নিকট হতে দূরে সরিয়ে রাখতে পার এবং যাকে ইচ্ছা তোমার কাছে স্থান দিতে পার এবং যাকে তুমি দূরে রেখেছো তাকে (পুনরায়) কামনা করলে তাতে তোমার কোন অপরাধ হবে না”- (সূরা আল আহযাব ৩৩ঃ ৫১)। আয়িশাহ (রাযিঃ) বলেন, আমি তখন বললামঃ আল্লাহর কসম! আমি তো দেখছি আপনার প্রতিপালক আপনার মনোবাঞ্ছা পূরণে দ্রুতই সাড়া দিয়ে থাকেন। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩৪৯৬, ইসলামীক সেন্টার ৩৪৯৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
অধ্যায়ঃ ৫২/ তাফসীর
পরিচ্ছেদঃ আল্লাহ্ তা’আলার বাণীঃ ترجئ من تشاء منهن وتؤوي إليك من تشاء ومن ابتغيت ممن عزلت فلا جناح عليك “তুমি তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তোমার কাছ থেকে দূরে রাখতে পার এবং যাকে ইচ্ছা তোমার কাছে স্থান দিতে পার। আর তুমি যাকে দূরে রেখেছ, তাকে কামনা করলে তোমার কোন অপরাধ নেই। ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেন ترجئ দূরে রাখতে পার। أرجئه তাকে দূরে সরিয়ে দাও, অবকাশ দাও।
৪৪২৫। যাকারিয়া ইবনু ইয়াহ্ইয়া (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যেসব মহিলা নিজকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে হেবাস্বরূপ ন্যাস্ত করে দেন, তাদের আমি ঘৃণা করতাম। আমি (মনে মনে) বলতাম, মহিলারা কি নিজেকে অর্পণ করতে পারে? এরপর যখন আল্লাহ্ তা’আলা এ আয়াত নাযিল করেনঃ “আপনি তাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা আপনার কাছ থেকে দূরে রাখতে পারেন এবং যাকে ইচ্ছা আপনার নিকট স্থান দিতে পারেন। আর আপনি যাকে দূরে রেখেছেন, তাকে কামনা করলে আপনার কোন অপরাধ নেই।” তখন আমি বললাম, আমি দেখছি যে, আপনার রব আপনি যা ইচ্ছা করেন, তা-ই পূরণ করেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)

এবং কাছাকাছি বিবরণ পাওয়া যায় তাফসীরে মাযহারীতে [27] –
বাগবী লিখেছেন, যাঁরা স্বতঃপ্রণোদিতা হয়ে রসুল স. এর জীবনসঙ্গিনী হবার অভিলাষ ব্যক্ত করেছিলেন, তাঁদের একজন ছিলেন হজরত খাওলা বিনতে হাকীম। তাঁর সম্পর্কে জননী আয়েশা বলেছেন, তার কথা শুনে আমি অবাক হয়ে গেলাম। ভাবলাম একজন নারী কীভাবে এরকম সম্ভ্রমবিবর্জিতা হয়? কিন্তু যখন অবতীর্ণ হলো ‘তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তোমার নিকট থেকে দূরে রাখতে পারো এবং যাকে ইচ্ছা তোমার নিকট স্থান দিতে পারো’ তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রসুল! আল্লাহ্ তো দেখছি আপনার কোনো বাসনাই অপূর্ণ রাখেন না।

এখানে আরও তাৎপর্যপূর্ণ হচ্ছে, ইবন হাজর আসকালানি ফাতহুল বারি-তে আয়িশার এই বক্তব্যের অর্থ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এমন ভাষা ব্যবহার করেছেন যা বিষয়টিকে আরও খোলাসা করে। তিনি “আপনার রব আপনার হাওয়ার ব্যাপারে দ্রুত” কথাটির অর্থ করেছেন, আল্লাহ মুহাম্মদ যা চান তা বিলম্ব ছাড়াই ঘটিয়ে দিচ্ছেন এবং তিনি যা ভালোবাসেন ও বেছে নেন তা নাজিল করছেন [28] –
مُوجِدًا لِمَا تُرِيدُ بِلَا تَأْخِيرٍ، مُنْزِلًا لِمَا تُحِبُّ وَتَخْتَارُ
অর্থাৎ, “তুমি যা চাও তা বিলম্ব ছাড়াই ঘটিয়ে দেওয়া এবং তুমি যা ভালোবাসো ও বেছে নাও তা নাজিল করা।”
এর চেয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে না। আয়িশার বক্তব্যকে যদি শুধু “স্ত্রীর ঈর্ষাজনিত কথাবার্তা” বলে পাশ কাটানোর চেষ্টা করা হয়, তাতেও মূল তথ্য বদলায় না। ইবন হাজরের নিজের ব্যাখ্যাতেই বাক্যটির অর্থ দাঁড়াচ্ছে, মুহাম্মদ যা চান তা দ্রুত ঘটানো এবং তিনি যা ভালোবাসেন ও নির্বাচন করেন সে অনুযায়ী বিধান নাজিল হওয়া। অর্থাৎ আয়িশার ব্যবহৃত ভাষাকে যতই নরম করার চেষ্টা করা হোক, বাক্যটির কার্যকর অর্থ শেষ পর্যন্ত মুহাম্মদের ইচ্ছা, পছন্দ এবং সেই ইচ্ছার অনুকূলে দ্রুত নাজিল হওয়া বিধানের দিকেই ফিরে যায়।
ইবন হাজরের ফাতহুল বারি-র অন্য স্থানে এই হাদিসের একটি বর্ণনায় আরও একটি তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, খাওলা বিনতে হাকিম ছিলেন সেই নারীদের একজন যারা নিজেদের মুহাম্মদের কাছে হেবা করেছিলেন। আয়িশা এই ধরনের নারীদের নিয়ে বলতেন, “নারী কি লজ্জা করে না যে নিজেকে একজন পুরুষের কাছে হেবা করে?” আর মুহাম্মদের জন্য ৩৩ঃ৫১ নাজিল হওয়ার পরই তিনি সেই বিখ্যাত মন্তব্য করেন [29] –
أَمَا تَسْتَحِي الْمَرْأَةُ أَنْ تَهَبَ نَفْسَهَا لِلرَّجُلِ … مَا أَرَى رَبَّكَ إِلَّا يُسَارِعُ فِي هَوَاكَ
অর্থাৎ, “নারী কি লজ্জা করে না যে নিজেকে একজন পুরুষের কাছে হেবা করে?” … “আমি দেখছি আপনার রব আপনার ইচ্ছার ব্যাপারে দ্রুত সাড়া দেন।”
কুরতুবিও সূরা আহজাব ৩৩ঃ৫১-এর ব্যাখ্যায় আয়িশার এই সহিহ বর্ণনাকেই গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তার মতে আয়াতটির সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যাখ্যা হচ্ছে, মুহাম্মদের জন্য স্ত্রীদের মধ্যে সমান পালা রক্ষার বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়ে তাকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। কুরতুবি আয়িশার হাদিসটি উদ্ধৃত করার পর ইবনুল আরাবির বক্তব্যও উল্লেখ করেছেন যে, সহিহ হাদিসে যে ব্যাখ্যাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেটির ওপরই নির্ভর করা উচিত [30] –
التَّوْسِعَةُ عَلَى النَّبِيِّ … فَكَانَ لَا يَجِبُ عَلَيْهِ الْقَسْمُ بَيْنَ زَوْجَاتِهِ
অর্থাৎ, “নবীর জন্য প্রশস্ততা দেওয়া হয়েছিল … তার স্ত্রীদের মধ্যে সমান পালা বণ্টন তার ওপর বাধ্যতামূলক ছিল না।”
ইবনুল আরাবি বলেন, هَذَا الَّذِي ثَبَتَ فِي الصَّحِيحِ هُوَ الَّذِي يَنْبَغِي أَنْ يُعَوَّلَ عَلَيْهِ
অর্থাৎ, “সহিহ বর্ণনায় যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেটির ওপরই নির্ভর করা উচিত।”
আয়িশার আরেকটি সহিহ বর্ণনা এই বিশেষ সুবিধার বাস্তব অর্থ আরও পরিষ্কার করে। তিনি বলেন, সূরা আহজাবের ৫১ নম্বর আয়াত নাজিল হওয়ার পর মুহাম্মদ কোনো স্ত্রীর নির্ধারিত দিনে অন্যত্র যেতে চাইলে সেই স্ত্রীর অনুমতি চাইতেন। মুয়াযা আয়িশাকে জিজ্ঞেস করেন, মুহাম্মদ তার অনুমতি চাইলে তিনি কী বলতেন। আয়িশার উত্তর ছিল, “বিষয়টি যদি আমার হাতে থাকে, তাহলে আমি নিজের ওপর অন্য কাউকে অগ্রাধিকার দেব না।” বর্ণনাটি সহিহ মুসলিম ও সুনানে আবু দাউদ উভয় গ্রন্থেই আছে [31] [32] –
আয়িশা বলেন, ৩৩ঃ৫১ নাজিল হওয়ার পর রাসূল আমাদের কারও নির্ধারিত দিনে অনুমতি চাইতেন। মুয়াযা জিজ্ঞেস করেন, “তুমি তখন কী বলতে?” আয়িশা বলেন, “যদি সিদ্ধান্ত আমার হাতে থাকে, আমি নিজের ওপর কাউকে অগ্রাধিকার দেব না।”
এই হাদিসটির গুরুত্ব হচ্ছে, এটি দেখিয়ে দেয় ৩৩ঃ৫১-এর পর পরিস্থিতি আইনগতভাবে কীভাবে বদলেছিল। মুহাম্মদ অনুমতি চাইতেন, কিন্তু আয়াত তাকে সেই অনুমতির ওপর নির্ভরশীল রাখেনি। ইসলামওয়েবে আবদুল মুহসিন আল-আব্বাদের আবু দাউদের ব্যাখ্যায় সরাসরি বলা হয়েছে, এই আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় যে স্ত্রীদের মধ্যে সমান পালা রাখা মুহাম্মদের ওপর বাধ্যতামূলক ছিল না; আল্লাহ ইচ্ছা ও নির্বাচন তার হাতে দিয়ে দিয়েছিলেন [33] –
لَمْ يَكُنِ الْقَسْمُ وَاجِبًا عَلَى رَسُولِ اللَّهِ … لِأَنَّهُ جَعَلَ الْمَشِيئَةَ وَالِاخْتِيَارَ إِلَيْهِ
অর্থাৎ, “রাসূলের ওপর স্ত্রীদের মধ্যে পালা বণ্টন বাধ্যতামূলক ছিল না … কারণ ইচ্ছা ও নির্বাচন তার হাতে দেওয়া হয়েছিল।”
অর্থাৎ ঘটনাটি শুধু কয়েকজন নারী নিজেদের মুহাম্মদের কাছে হেবা করেছিলেন, এতটুকুতে সীমাবদ্ধ নয়। একদিকে নারী নিজেকে তার কাছে মোহর ছাড়া সমর্পণ করতে পারে; তাকে গ্রহণ করবেন কি না তা মুহাম্মদের ইচ্ছা; অন্যদিকে স্ত্রীদের মধ্যে কাকে কাছে রাখবেন, কাকে অপেক্ষায় রাখবেন, কাকে আবার চাইবেন, তার সিদ্ধান্তও তার হাতে; সমান পালার সাধারণ বাধ্যবাধকতাও তার ক্ষেত্রে তুলে নেওয়া হলো। এই ধারাবাহিকতার মাঝখানেই মুহাম্মদের নিজের স্ত্রী আয়িশা মন্তব্য করছেন, “আমি দেখছি আপনার রব আপনার ইচ্ছার ব্যাপারে দ্রুত সাড়া দেন।”
আয়িশার মন্তব্যের তীক্ষ্ণতা এখানেই। ধর্মীয় প্রচারণায় আজ বলা হয়, মুহাম্মদের নারীসংক্রান্ত জীবনে ব্যক্তিগত ইচ্ছা, পছন্দ বা আকাঙ্ক্ষার কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল না; আল্লাহ যেন তাকে অনিচ্ছুক অবস্থায় বারবার নারীদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করতেন। অথচ মুহাম্মদের নিজের ঘরের বর্ণনা সম্পূর্ণ বিপরীত দৃশ্য দেখায়। আয়িশা দেখছেন নারীরা নিজেদের তার স্বামীর কাছে হেবা করছে; তিনি তাতে আপত্তি করছেন; তারপর এমন একটি আয়াত নাজিল হচ্ছে যা মুহাম্মদকে সেই নারীদের এবং নিজের স্ত্রীদের ব্যাপারে আরও বিস্তৃত স্বাধীনতা দিচ্ছে; এবং সেই মুহূর্তে আয়িশার নিজের সিদ্ধান্ত হচ্ছে, আল্লাহ মুহাম্মদের ইচ্ছা পূরণে দ্রুত সাড়া দিচ্ছেন।
এই বক্তব্যকে পরবর্তী যুগের ব্যাখ্যা দিয়ে যতই সাজানো হোক, সহিহ বর্ণনার ঘটনাক্রম পাল্টায় না। বরং ইবন হাজরের ব্যাখ্যাই আয়িশার বক্তব্যের মূল অর্থকে আরও পরিষ্কার করে দেয়: “তুমি যা চাও তা বিলম্ব ছাড়াই ঘটিয়ে দেওয়া, এবং তুমি যা ভালোবাসো ও বেছে নাও তা নাজিল করা।” ফলে মুহাম্মদের নারীসংক্রান্ত বিশেষ ওহিগুলোকে তার ব্যক্তিগত ইচ্ছা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে যে পবিত্র চরিত্র নির্মাণ করা হয়, সেটি সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম এবং প্রাচীন ইসলামি ব্যাখ্যার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না
আয়িশার এই মন্তব্যকে মুহাম্মদের জীবনের একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ধরে নেওয়ারও সুযোগ নেই। ইসলামি বর্ণনাগুলো পাশাপাশি রাখলে নারী ও যৌনতার প্রশ্নে একই ধরনের আচরণ বারবার দেখা যায়। একজন নারীকে দেখে মুহাম্মদের যৌন উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়া, তারপর নিজের স্ত্রী যায়নাবের কাছে গিয়ে সেই উত্তেজনা প্রশমন করা এবং সাহাবিদেরও একই পদ্ধতি অনুসরণের নির্দেশ দেওয়ার সহিহ বর্ণনা রয়েছে। এই ঘটনাটি এবং সংশ্লিষ্ট হাদিস ও ব্যাখ্যা আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে রাস্তায় নারী দেখে নবীর নিয়ন্ত্রণহীন উত্তেজনা ও তা প্রশমন প্রবন্ধে। এই একটি সহিহ বর্ণনাই “নারীর প্রতি তার বিশেষ আকর্ষণ ছিল না” দাবিকে গুরুতরভাবে দুর্বল করে দেয়, কারণ এখানে নারী দেখা, যৌন উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়া এবং তাৎক্ষণিকভাবে সেই উত্তেজনা প্রশমনের সম্পূর্ণ ধারাবাহিকতাই বর্ণিত হয়েছে।
একইভাবে সহিহ হাদিসে মুহাম্মদের একই দিন বা রাতে একাধিক স্ত্রীর কাছে পর্যায়ক্রমে যাওয়ার বর্ণনাও পাওয়া যায়। বর্ণনাগুলোতে সাহাবিরা এমনকি তার বিশেষ যৌনশক্তির কথাও আলোচনা করেছেন। এই হাদিসগুলো এবং তাদের বিভিন্ন পাঠ নবীর সারারাত সেক্স ম্যারাথন প্রবন্ধে বিস্তারিতভাবে দেখানো হয়েছে। যে ব্যক্তিকে পরবর্তী ধর্মীয় প্রচারণায় নারী ও যৌনতার ব্যাপারে প্রায় অনাসক্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়, সহিহ হাদিসে তার যৌনজীবনের বর্ণনা সেই নির্মিত প্রতিকৃতির সঙ্গে মেলে না।
আয়িশা কিংবা মারিয়া কিবতিয়াকে ঘিরেও একই ধরনের একটি বহুল আলোচিত ঘটনা ইসলামি উৎসে এসেছে। বর্ণনা অনুযায়ী, হাফসার ঘর ও বিছানায় মারিয়া কিবতিয়ার সঙ্গে যৌনসম্পর্কের সময় হাফসা মুহাম্মদকে ধরে ফেলেন; এরপর মুহাম্মদ মারিয়াকে নিজের জন্য হারাম করার প্রতিশ্রুতি দেন এবং পরবর্তীতে সেই প্রতিশ্রুতি ভাঙার সুযোগ দিয়ে কোরআনের আয়াত নাজিল হওয়ার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এই ঘটনার উৎস, বিভিন্ন বর্ণনা এবং সূরা তাহরিমের সঙ্গে তার সম্পর্ক আলাদাভাবে বিশ্লেষিত হয়েছে। এখানে সেই আলোচনা পুনরাবৃত্তি করার প্রয়োজন নেই; গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, মুহাম্মদের নারী ও যৌনজীবন নিয়ে স্ত্রীদের বিরক্তি, ঈর্ষা ও সংঘাত কোনো একক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।
এমনকি মুহাম্মদের নববিবাহিতা স্ত্রী যায়নাব বিনতে জাহাশের সঙ্গে (পালিত পুত্রের সাবেক স্ত্রী) একান্তে সময় কাটানো বিলম্বিত হওয়ায় সাহাবিদের দ্রুত ঘর ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে কোরআনের আয়াত নাজিল হওয়ার ঘটনাও রয়েছে। সেটিও পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে নববিবাহিতা স্ত্রীর সাথে নবীর সঙ্গমে দেরী হওয়ায় সাহাবীদের উদ্দেশ্যে আল্লাহর ধমকের আয়াতের বিশ্লেষণ প্রবন্ধে। অন্যদিকে আয়িশার আরেক বর্ণনায় মুহাম্মদের মৃত্যুর আগে তার জন্য পুনরায় নারীদের বৈধ করে দেওয়ার কথাও এসেছে; সেই বিষয়টি আলোচনা করা হয়েছে মরার আগে ইচ্ছেমত নারীভোগ করেছেন নবী প্রবন্ধে।
অতএব এখানে যে চিত্রটি তৈরি হয়, সেটি কোনো একক আয়াত বা একটি বিতর্কিত কাহিনির ওপর দাঁড়িয়ে নেই। নারীর সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হওয়া, নারী দেখে যৌন উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়া, একাধিক স্ত্রীর সঙ্গে অল্প সময়ের মধ্যে ধারাবাহিক যৌনসম্পর্ক, স্ত্রীদের মধ্যে নারীসংক্রান্ত ঈর্ষা ও সংঘাত, নিজের জন্য বিশেষ বৈবাহিক ছাড় এবং সেই ছাড়ের পক্ষে ওহি নাজিল হওয়া, এসব ঘটনা ইসলামি উৎসে ছড়িয়ে আছে। এগুলো একসঙ্গে পড়লে “মুহাম্মদের নারীর প্রতি কোনো বিশেষ আকর্ষণ ছিল না” দাবি আর ব্যাখ্যার ভুল থাকে না; এটি উৎসবিরোধী প্রচারণায় পরিণত হয়।
উপসংহার
নবী মুহাম্মদের নারীর প্রতি কোনো বিশেষ আকর্ষণ ছিল না, তিনি নিতান্তই অনিচ্ছায় আল্লাহর নির্দেশে একের পর এক বিবাহ করেছেন এবং তার নারীসংক্রান্ত জীবন মূলত সামাজিক বা রাজনৈতিক দায়িত্বের ফল, এই প্রচারণা ইসলামি মূল উৎসের সঙ্গে মেলে না। কোরআন, সহিহ হাদিস এবং প্রাচীন তাফসির একসঙ্গে পড়লে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। সেখানে দেখা যায়, মুহাম্মদের জন্য সাধারণ মুসলিম পুরুষদের তুলনায় একের পর এক বিশেষ বৈবাহিক ও যৌন সুবিধা ঘোষণা করা হয়েছে; তিনি চার স্ত্রীর সাধারণ সীমার বাইরে ছিলেন; নিজেকে তার কাছে হেবা করা নারীকে মোহর ছাড়াই গ্রহণ করতে পারতেন; স্ত্রীদের মধ্যে সমান পালা রক্ষার বাধ্যবাধকতাও তার ওপর থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল; কাকে কাছে রাখবেন, কাকে দূরে রাখবেন, আবার কাকে গ্রহণ করবেন, সেই সিদ্ধান্তও তার হাতে দেওয়া হয়েছিল। এসব ছাড়ের ঘোষিত কারণও কোরআন নিজেই বলেছে: “যাতে তোমার কোনো অসুবিধা না হয়।”
প্রাচীন তাফসিরকারেরা এই “অসুবিধা”র অর্থও গোপন করেননি। আল-ওয়াহিদির ভাষায়, এটি ছিল “বিবাহের ব্যাপারে সংকীর্ণতা এবং তুমি যা চাও তা থেকে তোমাকে বাধা দেওয়া”। ইবন আশুর একে ব্যাখ্যা করেছেন স্ত্রীসংখ্যা বৃদ্ধির সুযোগ, নিজেকে হেবা করা নারীকে মোহর ছাড়া বিবাহ এবং সেই নারীকে গ্রহণ করবেন কি না সেই সিদ্ধান্ত মুহাম্মদের নিজের ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে। অর্থাৎ সাধারণ মুসলিমের জন্য যে বিধিনিষেধ ছিল ধর্মীয় আইন, মুহাম্মদের ক্ষেত্রে সেই একই বিধিনিষেধই “অসুবিধা” হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং তা দূর করতে বিশেষ ছাড় নাজিল হয়েছে।
কোরআনের ভাষা আরও সরাসরি। অন্য নারীদের সৌন্দর্য মুহাম্মদকে মুগ্ধ করতে পারে, এই কথাটি কোরআন নিজেই বলেছে। নতুন স্ত্রী গ্রহণে সীমা আরোপ করার সময়ও বলা হয়েছে, “যদিও তাদের সৌন্দর্য তোমাকে মুগ্ধ করে”; আবার একই আয়াতে মালিকানাধীন দাসীদের সেই নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সহিহ হাদিসের বর্ণনা: নারীকে দুনিয়ার প্রিয় বিষয়ের মধ্যে গণ্য করা, কোনো নারীকে দেখে যৌন উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়া, সেই উত্তেজনা প্রশমনের জন্য নিজের স্ত্রীর কাছে যাওয়া, একই দিন বা রাতে একাধিক স্ত্রীর কাছে যাওয়া, এবং নিজের স্ত্রীদের মধ্যে নারীসংক্রান্ত ঈর্ষা ও সংঘাত। এগুলো কোনো পরবর্তী যুগের ইসলামবিরোধী কল্পনা নয়; এগুলো ইসলামি উৎসেই সংরক্ষিত বর্ণনা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য এসেছে আয়িশার কাছ থেকে। তিনি নিজেকে মুহাম্মদের কাছে হেবা করা নারীদের দেখে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন; পরে যখন মুহাম্মদের জন্য স্ত্রীদের মধ্যে কাকে কাছে রাখবেন, কাকে দূরে রাখবেন এবং কাকে আবার গ্রহণ করবেন সেই স্বাধীনতা দিয়ে আয়াত নাজিল হলো, তখন তার মন্তব্য ছিল, “আমি দেখছি আপনার রব আপনার ইচ্ছার ব্যাপারে দ্রুত সাড়া দেন।” ইবন হাজর এই বক্তব্যের অর্থ ব্যাখ্যা করেছেন, “তুমি যা চাও তা বিলম্ব ছাড়াই ঘটিয়ে দেওয়া এবং তুমি যা ভালোবাসো ও বেছে নাও তা নাজিল করা।” এর পরেও মুহাম্মদের নারীসংক্রান্ত জীবনে ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষার কোনো ভূমিকা ছিল না বলা ইসলামি উৎসকে অস্বীকার করা ছাড়া আর কিছু নয়।
অতএব, “মুহাম্মদের নারীর প্রতি কোনো লোভ ছিল না” দাবি ঐতিহাসিক বা ধর্মীয় উৎসনির্ভর সিদ্ধান্ত নয়; এটি পরবর্তী যুগে নির্মিত চরিত্ররক্ষাকারী প্রচারণা। ইসলামি উৎসের নিজস্ব সাক্ষ্য বলছে, মুহাম্মদ নারীর সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হতেন, নারী দেখে যৌন উত্তেজনা অনুভব করতেন, একাধিক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতেন এবং সাধারণ বিশ্বাসীদের তুলনায় তার জন্য বিশেষ বৈবাহিক ও যৌন ছাড় ঘোষণা করা হয়েছিল। এমনকি সেই ছাড়ের পক্ষে ওহিও নাজিল হয়েছে। ফলে “তিনি কিছুই চাইতেন না, আল্লাহ তাকে বাধ্য করতেন” ধরনের বক্তব্য শুধু প্রমাণহীন নয়, কোরআন, সহিহ হাদিস এবং প্রাচীন তাফসিরের বিপরীত।
একজন ধর্মপ্রচারক যদি নিজের জন্য এমন বিশেষ বৈবাহিক ও যৌন সুবিধা ঘোষণা করেন, নিজের পছন্দ ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিধানকে ঐশী আদেশ হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং তার নিজের স্ত্রীও সেই সম্পর্ক লক্ষ্য করে বলেন যে তার প্রভু তার ইচ্ছা পূরণে দ্রুত সাড়া দেন, তাহলে সেই ব্যবস্থাকে নিরপেক্ষভাবে বিচার করলে ব্যক্তিগত সুবিধা ও ধর্মীয় কর্তৃত্বের মিশ্রণ ছাড়া অন্য কিছু দেখা কঠিন। মুহাম্মদের নারীসংক্রান্ত জীবনকে পবিত্রতার আবরণে ঢাকতে যত গল্পই তৈরি করা হোক, মূল উৎসগুলো সেই গল্পকে সমর্থন করে না।
তথ্যসূত্রঃ
- সূরা আহজাব ৩৩ঃ৫০ 1 2 3
- তাফসীরে তাবারি, সূরা আহজাব ৩৩ঃ৫০, ইসলামওয়েব ↩︎
- তাফসীরে ইবন কাসির, সূরা আহজাব ৩৩ঃ৫০, ইসলামওয়েব ↩︎
- আল-ওয়াহিদি, আত-তাফসীর আল-ওয়াসীত, সূরা আহজাব ৩৩ঃ৫০-৫২, ইসলামওয়েব ↩︎
- সূরা আহজাব ৩৩ঃ৫২ ↩︎
- তাফসীরে তাবারি, সূরা আহজাব ৩৩ঃ৫২, ইসলামওয়েব 1 2
- তাফসীরে কুরতুবি, সূরা আহজাব ৩৩ঃ৫২ 1 2
- তাফসীরে নাসাফি, সূরা আহজাব ৩৩ঃ৫২, ইসলামওয়েব ↩︎
- তাফসির সূরা আহজাব ৫১-৫২, ইসলামওয়েব ↩︎
- আল-ওয়াহিদি, আত-তাফসীর আল-ওয়াসীত, সূরা আহজাব ৩৩ঃ৫০-৫২, ইসলামওয়েব ↩︎
- তাফসীরে বাগাভি, সূরা আহজাব ৩৩ঃ৫০, ইসলামওয়েব ↩︎
- ইসলামওয়েব, তাফসির সূরা আহজাব ৪৯-৫১, ফতোয়া ১৪০৭৫ ↩︎
- আবু বকর আল-জাযায়েরি, তাফসির সূরা আহজাব, আয়াত ৫০, ইসলামওয়েব ↩︎
- সূরা আহজাব ৩৩ঃ৫১ ↩︎
- তাফসীরে বাগাভি, সূরা আহজাব ৩৩ঃ৫১, ইসলামওয়েব ↩︎
- তাফসীরে তাবারি, সূরা আহজাব ৩৩ঃ৫১, ইসলামওয়েব ↩︎
- তাফসীরে রাজি, সূরা আহজাব ৩৩ঃ৫১, ইসলামওয়েব ↩︎
- সূরা আহজাব ৩৩ঃ৫০-৫২, ইসলামওয়েব ↩︎
- সূরা আহজাব ৩৩ঃ৫০, ইসলামওয়েব 1 2 3
- মাদারিকুত তানযীল, সূরা আহজাব ৩৩ঃ৫০-৫১ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদিস একাডেমী, হাদিসঃ ৩৫২৩, আন্তর্জাতিক নম্বরঃ ১৪৬৪ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৪২৫ 1 2
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৪৬৪, ইসলামওয়েব ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৩৫২৩ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, আহলে হাদিস লাইব্রেরি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪৫৯ ↩︎
- সহীহুল বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩১ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৩৮ ↩︎
- ইবন হাজর আসকালানি, ফাতহুল বারি, সূরা আহজাব ৩৩ঃ৫১-এর ব্যাখ্যা, ইসলামওয়েব ↩︎
- ইবন হাজর আসকালানি, ফাতহুল বারি, “নারী কি নিজেকে হেবা করতে পারে” অধ্যায়, ইসলামওয়েব ↩︎
- তাফসীরে কুরতুবি, সূরা আহজাব ৩৩ঃ৫১, ইসলামওয়েব ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৪৭৬, ইসলামওয়েব ↩︎
- সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২১৩৬, ইসলামওয়েব ↩︎
- শরহ সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২১৩৬, ইসলামওয়েব ↩︎

