ভূমিকা
ইসলামি ধর্মতত্ত্বে ‘ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা’কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক নীতি হিসেবে প্রচার করা হয়। প্রচলিত ইসলামি দাবি হলো, ইসলামে খ্রিস্টধর্মের ‘জন্মগত পাপ’ বা Original Sin-এর মতো কোনো ধারণা নেই; পরকালে প্রত্যেক ব্যক্তি কেবল নিজের কর্মের জন্যই জবাবদিহি করবে। কোরআনের একাধিক আয়াতে এই দাবিকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করা হয়েছে—কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না। কিন্তু সমস্যা হলো, একই কোরআন, সহিহ হাদিস, তাকদির-তত্ত্ব এবং ইসলামি ফিকহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই নীতিটি সর্বজনীন নৈতিক সত্য হিসেবে টেকে না। কখনো পথভ্রষ্টকারীর ওপর অন্যের পাপের বোঝা চাপানো হয়, কখনো মৃত ব্যক্তি আত্মীয়দের বিলাপের কারণে শাস্তি পায়, কখনো মুসলিমের গুনাহ ইয়াহুদি-খ্রিস্টানদের ওপর চাপানো হয়, কখনো শিশুকে ভবিষ্যৎ অপরাধের আগেই হত্যা করা হয়, আবার কখনো অপরাধীর আত্মীয়দের ওপর আর্থিক দায় চাপানো হয়। ফলে “কেউ অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না”—এটি ইসলামের ভেতরে একটি স্থির নৈতিক নীতি নয়; বরং প্রয়োজনমতো ব্যবহৃত একটি নির্বাচিত দাবি। এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হলো সেই স্ববিরোধিতাকে কোরআন, হাদিস ও ফিকহি বিধানের আলোকে সরাসরি বিশ্লেষণ করা।
কোরআনে ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার দাবি
কোরআনের অন্তত পাঁচটি স্থানে অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা হয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির পাপের দায়ভার গ্রহণ করবে না। এই আয়াতগুলো নিচে সারণিবদ্ধ করা হলো:
| দাবি | বিপরীত দলিল | সমস্যা |
|---|---|---|
| কেউ অন্যের বোঝা বহন করবে না | কোরআন ১৬:২৫, ২৯:১৩ | পথভ্রষ্টকারীর ওপর অন্যের বোঝার অংশ চাপানো হচ্ছে |
| বিচার নিজের আমলের ভিত্তিতে | মৃতের জন্য সন্তানের দোয়া | মৃতের পরিণতি অন্যের কাজের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে |
| শিশু নিরপরাধ | নাবালেগ শিশু বাপ-দাদার অনুসারী | বাস্তব কর্ম নয়, পারিবারিক ধর্মীয় পরিচয় বিবেচ্য হচ্ছে |
| অপরাধের আগে শাস্তি নয় | খিজিরের বালক হত্যা | ভবিষ্যৎ অপরাধের জন্য বর্তমান শিশুকে হত্যা |
| দায় ব্যক্তিগত | আকিলা ব্যবস্থা | অপরাধীর আত্মীয়গোষ্ঠীর ওপর আর্থিক দায় |
| আল্লাহ ন্যায়বিচারক | আল্লাহ সবাইকে শাস্তি দিলেও যালিম নন | ন্যায়বিচারকে যাচাইযোগ্য নৈতিক ধারণা থেকে ক্ষমতার ঘোষণায় নামিয়ে আনা |
ন্যায়বিচারের ন্যূনতম মানদণ্ড
ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার নীতি বিচার করতে হলে আগে ন্যায়বিচারের ন্যূনতম মানদণ্ড পরিষ্কার করা দরকার। ন্যায়বিচার মানে শুধু শাস্তি দেওয়া নয়; বরং যার অপরাধ, দায় তার ওপরই বর্তাবে—এই মৌলিক নীতি বজায় রাখা। বিচারিক প্রক্রিয়ায় যদি একজনের কাজের জন্য আরেকজন শাস্তি পায়, একজনের পারিবারিক পরিচয়ের কারণে অন্যায় সুবিধা বা অসুবিধা পায়, অথবা অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই কাউকে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ অপরাধের জন্য দণ্ড দেওয়া হয়, তাহলে সেটি ইনসাফ নয়। সেটি ন্যায়বিচারের ভাষায় বৈষম্য, দায় স্থানান্তর এবং নৈতিক স্বেচ্ছাচার।
এই কারণেই “কেউ অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না”—এই দাবিটি শুধু ধর্মীয় বাক্য নয়; এটি একটি নৈতিক দাবি। এই দাবি সত্য হতে হলে ইসলামের কোরআন, হাদিস, তাকদিরতত্ত্ব এবং ফিকহে সর্বত্র একই নীতি কার্যকর থাকতে হবে। কিন্তু যদি দেখা যায়, কোথাও সন্তান পিতামাতার ধর্মীয় অবস্থানের কারণে বিবেচিত হচ্ছে, কোথাও মৃত ব্যক্তি আত্মীয়ের কান্নার কারণে শাস্তি পাচ্ছে, কোথাও এক সম্প্রদায়ের পাপ অন্য সম্প্রদায়ের ওপর চাপানো হচ্ছে, তাহলে ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার দাবি আর পূর্ণ সত্য থাকে না।
“বোঝা” বলতে কী বোঝানো হচ্ছে?
এখানে একটি মৌলিক নৈতিক পার্থক্য পরিষ্কার করা জরুরি। ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার দাবি যদি সত্য হয়, তাহলে অন্তত তিনটি ক্ষেত্রে তা বজায় থাকতে হবে: এক, একজনের পাপ অন্যের ওপর চাপানো যাবে না; দুই, একজনের কাজের কারণে নিরপরাধ অন্য ব্যক্তি শাস্তি পেতে পারে না; তিন, একজনের পরকালীন ফলাফল অন্যের আমল বা পরিচয়ের কারণে বদলে যেতে পারে না। এপোলোজিস্টরা সাধারণত এই সমস্যাকে ভাষার খেলা বানিয়ে ফেলে—“এখানে বোঝা মানে পাপ, শাস্তি নয়”, “এখানে শাস্তি মানে কষ্ট, দণ্ড নয়”, “এখানে পাপ স্থানান্তর নয়, প্রতীকী বর্ণনা”—ইত্যাদি। কিন্তু এগুলো মূল সমস্যাকে সমাধান করে না। কারণ নৈতিক প্রশ্নটি শব্দতাত্ত্বিক নয়; প্রশ্নটি হলো, একজনের কর্মের নেতিবাচক বা ইতিবাচক ফল অন্যের ওপর চাপানো হচ্ছে কিনা। যদি চাপানো হয়, তাহলে ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার দাবিটি ভেঙে যায়।
অতএব, এই প্রবন্ধে “বোঝা” বলতে শুধু আক্ষরিক গুনাহের হিসাব বোঝানো হচ্ছে না; বরং পাপের দায়, শাস্তির ফল, পরকালীন পরিণতি, আর্থিক দায় এবং জীবনহানির মতো সব ধরনের নৈতিক ফলাফলকে বিবেচনা করা হচ্ছে। কারণ একটি নৈতিক ব্যবস্থা যদি বলে “কেউ অন্যের বোঝা বহন করবে না”, অথচ বাস্তবে অন্যের কাজের কারণে কেউ শাস্তি, ক্ষতি, মৃত্যু, আর্থিক দায় বা জাহান্নামের পরিণতি ভোগ করে, তাহলে সেটি আর ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা থাকে না; সেটি হয়ে দাঁড়ায় নির্বাচিত ও সুবিধাবাদী দায়বণ্টন।
পথভ্রষ্ট করার দায়ে অন্যের বোঝা বহন
উপরোক্ত আয়াতগুলোতে ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার একটি সাধারণ নিয়ম ঘোষণা করা হলেও, কোরআনের অন্য কিছু আয়াত এই নিয়মের সরাসরি লঙ্ঘন করে। সূরা আন-নাহল এবং সূরা আল-আনকাবুতে বলা হয়েছে যে, যারা অন্যদের পথভ্রষ্ট করে, তারা নিজেদের পাপের পাশাপাশি যাদের পথভ্রষ্ট করেছে তাদের পাপের বোঝাও বহন করবে।
“যাতে কিয়ামতের দিন তারা পূর্ণমাত্রায় বহন করে তাদের পাপভার এবং তাদেরও পাপভার যাদেরকে তারা জ্ঞানহীনভাবে পথভ্রষ্ট করে। দেখ, তারা যা বহন করে তা কতই না নিকৃষ্ট!” [1]।
যার ফলে ক্বিয়ামাত দিবসে তারা বহন করবে নিজেদের পাপের বোঝা পূর্ণ মাত্রায়, আর (আংশিক) তাদেরও পাপের বোঝা যাদেরকে তারা গুমরাহ করেছে নিজেদের অজ্ঞতার কারণে। হায়, তারা যা বহন করবে তা কতই না নিকৃষ্ট!
— Taisirul Quran
ফলে কিয়ামাত দিবসে তারা বহন করবে তাদের পাপভার পূর্ণমাত্রায় এবং পাপভার তাদেরও যাদেরকে তারা অজ্ঞতা বশতঃ বিভ্রান্ত করেছে; হায়! তারা যা বহন করবে তা কতই না নিকৃষ্ট!
— Sheikh Mujibur Rahman
এতে করে তারা কিয়ামতের দিনে নিজদের পাপের বোঝা পুরোটাই বহন করবে এবং তাদের পাপের বোঝাও যাদেরকে তারা অজ্ঞতা হেতু পথভ্রষ্ট করে। তারা যা বহন করবে, তা কতই না নিকৃষ্ট!
— Rawai Al-bayan
ফলে কিয়ামতের দিন তারা বহন করবে তাদের পাপের বোঝা পূর্ণ মাত্রায় এবং তাদেরও পাপের বোঝা যাদেরকে তারা অজ্ঞতাবশত বিভ্রান্ত করেছে [১]। দেখুন, তারা যা বহন করবে তা কত নিকৃষ্ট !
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
এছাড়া বলা হয়েছে, “তারা অবশ্যই বহন করবে নিজেদের বোঝা এবং নিজেদের বোঝার সাথে আরও অনেক বোঝা” [2]।
তারা অবশ্য অবশ্যই তাদের নিজেদের পাপের বোঝা বহন করবে, নিজেদের বোঝার সাথে আরো বোঝা, আর তারা যে সব মিথ্যে উদ্ভাবন করত সে সম্পর্কে ক্বিয়ামত দিবসে তারা অবশ্য অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে।
— Taisirul Quran
এবং তারা নিজেদের বোঝা বহন করবে এবং নিজেদের বোঝার সাথে আরও বোঝা; এবং তারা যে মিথ্যা উদ্ভাবন করে সেই সম্পর্কে কিয়ামাত দিবসে অবশ্যই তাদেরকে প্রশ্ন করা হবে।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর অবশ্যই তারা বহন করবে তাদের বোঝা এবং তাদের বোঝার সাথে আরো কিছু বোঝা। আর তারা কিয়ামতের দিন অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে সে সম্পর্কে, যা তারা মিথ্যা বানাত।
— Rawai Al-bayan
তারা তো বহন করবে নিজেদের ভার এবং নিজেদের বোঝার সাথে আরো কিছু বোঝা [১]; আর তারা যে মিথ্যা রটনা করত সে সম্পর্কে কিয়ামতের দিন অবশ্যই তাদেরকে প্রশ্ন করা হবে।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
এখানে স্ববিরোধিতাটি খুব সরল। যদি নীতি হয়—“কেউ অন্যের বোঝা বহন করবে না”, তাহলে পথভ্রষ্ট ব্যক্তি নিজের ভুল সিদ্ধান্তের দায় নিজেই বহন করার কথা। আবার পথভ্রষ্টকারী নিজের প্রতারণা, প্রচার বা প্ররোচনার দায় নিজে বহন করবে—এটাও যুক্তিযুক্ত। কিন্তু কোরআনের ভাষা এখানেই থামে না; বরং বলে, তারা নিজেদের বোঝার সঙ্গে যাদের পথভ্রষ্ট করেছে তাদের বোঝাও বহন করবে। অর্থাৎ একই নৈতিক ব্যবস্থায় একদিকে বলা হচ্ছে দায় সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত, অন্যদিকে বলা হচ্ছে দায় সংক্রমিত হতে পারে। এপোলোজিস্টরা এখানে “কারণ সে অন্যকে প্রভাবিত করেছে” বলে পালানোর চেষ্টা করতে পারে, কিন্তু সেটি সমস্যার সমাধান নয়। প্রভাবিত করা নিজের অপরাধ; প্রভাবিত ব্যক্তির পাপ আবার আলাদা অপরাধ। এই দুইটি এক করে দিলে ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা আর ব্যক্তিগত থাকে না, বরং তা হয়ে যায় সামাজিক-ধর্মীয় দায় স্থানান্তরের ব্যবস্থা।
গণশাস্তি ও নিরপরাধের বিনাশ
কোরআনের বিভিন্ন স্থানে পূর্ববর্তী জাতিদের—আদ, সামুদ, লুত জাতি, নূহের জনগোষ্ঠী—সমষ্টিগত ধ্বংসের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। সমস্যা হলো, “জাতি” বা “জনপদ” কখনো একক নৈতিক ব্যক্তি নয়। একটি জনপদে অপরাধী, নিরপরাধ, শিশু, বৃদ্ধ, গর্ভস্থ সন্তান, পশুপাখি—সবাই থাকে। কোনো সমাজের প্রাপ্তবয়স্ক ধর্মীয় অবাধ্যতার কারণে পুরো জনপদ ধ্বংস করলে সেটি আর ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা থাকে না; সেটি সরাসরি গণশাস্তি। লুত জাতির ওপর পাথর বর্ষণ, নূহের প্লাবন, সামুদের ধ্বংস—এসব বর্ণনায় যদি শিশুদের মৃত্যু ঘটে, তাহলে প্রশ্নটি এড়ানো যায় না: শিশুদের অপরাধ কী ছিল? তারা কি নবীর বিরোধিতা করেছিল? তারা কি ধর্মীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছিল? তারা কি চুক্তি ভেঙেছিল? না। তবু তারা নিহত হয়েছে সেই সমাজের প্রাপ্তবয়স্কদের ধর্মীয় অপরাধের সামষ্টিক পরিণতিতে।
এপোলোজিস্টরা সাধারণত এখানে বলে—“আল্লাহ জানতেন তারা বড় হয়ে কী হতো” অথবা “তারা পরকালে পুরস্কার পাবে।” কিন্তু এই দুইটি উত্তরই মূল সমস্যাকে এড়িয়ে যায়। ভবিষ্যতে কী হতে পারত তার ভিত্তিতে বর্তমান নিরপরাধকে হত্যা করা ন্যায়বিচার নয়; আর পরকালে ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি বর্তমান অন্যায়কে ন্যায় বানায় না। কোনো আদালত যদি বলে, “আমরা শিশুটিকে হত্যা করেছি, পরে তাকে ক্ষতিপূরণ দেব”—তাহলে সেটি বিচার নয়, বর্বরতা। সুতরাং গণশাস্তির বর্ণনাগুলো কোরআনের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার দাবির সঙ্গে মৌলিকভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। [3]
হাদিস ও সুন্নাহর আলোকে বৈপরীত্য
মৃতের আমল বন্ধ, তবু অন্যের দোয়ায় ফল পরিবর্তন
সহিহ মুসলিমের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিসে বলা হয়েছে, মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়—তিনটি ব্যতিক্রম ছাড়া: সদকা জারিয়াহ, উপকারী জ্ঞান, এবং পুণ্যবান সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে। এখানে সমস্যাটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুতর। যদি মৃত্যু-পরবর্তী বিচার ব্যক্তির নিজের আমলের ভিত্তিতেই হয়, তাহলে মৃত্যুর পরে অন্যের দোয়া মৃত ব্যক্তির পরকালীন অবস্থায় কীভাবে প্রভাব ফেলে? মৃত ব্যক্তি তখন আর নতুন কোনো কাজ করছে না; কাজটি করছে অন্য একজন। তবু তার ফল মৃতের হিসাবে যুক্ত হচ্ছে। এটি পাপের বোঝা চাপানো না হলেও, ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার বিপরীত দিকের একই সমস্যা—অন্যের কাজের ফলে নিজের পরকালীন ফলাফল বদলে যাওয়া।
অর্থাৎ ইসলামি ব্যবস্থায় দায় ও ফলাফল পুরোপুরি ব্যক্তিগত নয়। কখনো অন্যের কাজের কারণে মৃত ব্যক্তি উপকৃত হয়, কখনো আত্মীয়ের বিলাপের কারণে শাস্তি পায়, কখনো অন্য ধর্মাবলম্বীর ওপর মুসলিমের গুনাহ চাপানো হয়। তাই “শুধু নিজের আমল”—এই দাবি বাস্তবে টেকে না; ইসলামের ভেতরেই পরকালীন ফলাফলকে পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
২৬। ওয়াসিয়্যাত
পরিচ্ছেদঃ ৩. মানুষের মৃত্যুর পর যে সকল জিনিসের সাওয়াব তার কাছে পৌছে
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৪১১৫ , আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৬৩১
৪১১৫-(১৪/১৬৩১) ইয়াহইয়া ইবনু আইয়্যুব ও কুতাইবাহ্ (রহঃ) ….. আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন মানুষ মৃত্যুবরণ করে তখন তার সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে যায় তিন প্রকার আমল ছাড়া। ১. সাদাকা জারিয়াহ্ অথবা ২. এমন ইলম যার দ্বারা উপকার হয় অথবা ৩. পুণ্যবান সন্তান যে তার জন্যে দু’আ করতে থাকে। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪০৭৭, ইসলামিক সেন্টার ৪০৭৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
নাবালেগ শিশুর পরিণতি পিতামাতার ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত
এই সমস্যাকে আরও স্পষ্ট করে মিশকাতের একটি তাকদির-সম্পর্কিত বর্ণনা। সেখানে আয়েশা নবীকে জিজ্ঞেস করেন, মুমিনদের নাবালেগ বাচ্চাদের পরিণতি কী হবে। উত্তরে বলা হয়, তারা বাপ-দাদার অনুসারী হবে। আয়েশা প্রশ্ন করেন—কোন নেক আমল ছাড়াই? উত্তরে বলা হয়, আল্লাহ জানেন তারা জীবিত থাকলে কী আমল করত। এরপর মুশরিকদের নাবালেগ বাচ্চাদের ব্যাপারেও একই প্রশ্ন করা হলে বলা হয়, তারাও তাদের বাপ-দাদার অনুসারী হবে। আবার প্রশ্ন ওঠে—কোন বদ আমল ছাড়াই? উত্তরে একই যুক্তি: আল্লাহ জানেন তারা বেঁচে থাকলে কী করত। [4] –
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১ঃ ঈমান (বিশ্বাস)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় ‘অনুচ্ছেদ – তাকদীরের প্রতি ঈমান
১১১-(৩৩) ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রসূল! মু’মিনদের (নাবালেগ) বাচ্চাদের (জান্নাত-জাহান্নাম সংক্রান্ত ব্যাপারে) কী হুকুম? তিনি উত্তরে বললেন, তারা বাপ-দাদার অনুসারী হবে। আমি বললাম, কোন (নেক) ‘আমল ছাড়াই? তিনি বললেন, আল্লাহ অনেক ভালো জানেন, তারা জীবিত থাকলে কী ‘আমল করতো। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা মুশরিকদের (নাবালেগ) বাচ্চাদের কী হুকুম? তিনি বললেন, তারাও তাদের বাপ-দাদার অনুসারী হবে। (অবাক দৃষ্টিতে) আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোন (বদ) ‘আমল ছাড়াই? উত্তরে তিনি বললেন, সে বাচ্চাগুলো বেঁচে থাকলে কী ‘আমল করত, আল্লাহ খুব ভালো জানেন। (আবূ দাঊদ)(1)
(1) সহীহ : আবূ দাঊদ ৪০৮৯। শায়খ আলবানী (রহঃ) বলেন : হাদীসটি দু’টি সানাদে বর্ণিত যার একটি সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এখানে ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার ধারণা সরাসরি ভেঙে পড়ে। নাবালেগ শিশু নিজের ধর্মীয় মতবাদ নির্বাচন করেনি, ঈমান-কুফরের সচেতন সিদ্ধান্ত নেয়নি, কোনো পরিণত নৈতিক কাজও করেনি। তবু তার পরিণতি পিতামাতার ধর্মীয় পরিচয় এবং ভবিষ্যতে সে কী করতে পারত—এই অনুমিত জ্ঞানের ওপর নির্ভর করছে। অর্থাৎ বিচার হচ্ছে না বাস্তব কর্মের ভিত্তিতে; বিচার হচ্ছে পারিবারিক ধর্মীয় পরিচয় এবং সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ আচরণের ভিত্তিতে। এটি ব্যক্তিগত দায় নয়; এটি জন্মসূত্র, পরিবেশসূত্র এবং অনুমিত ভবিষ্যৎ-অপরাধের ওপর দাঁড়ানো ধর্মীয় দায়বণ্টন।
এপোলোজিস্টরা এখানে বলবে, “আল্লাহ জানেন তারা বড় হয়ে কী করত।” কিন্তু এই উত্তর ন্যায়বিচার নয়; এটি বিচারকে বাস্তব কর্ম থেকে সরিয়ে অদৃশ্য পূর্বজ্ঞান ও পূর্বনির্ধারণের ওপর বসায়। কোনো মানুষ যে কাজ করেনি, যে বিশ্বাস সচেতনভাবে গ্রহণ করেনি, যে অপরাধ বাস্তবে সংঘটিত করেনি—তার জন্য তাকে পিতামাতার পরিচয়ের অনুসারী বানানো ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার নীতিকে ধ্বংস করে দেয়।
জীবন্ত প্রোথিত শিশুকেও জাহান্নামের বর্ণনায় টেনে আনা
আরও একটি বিতর্কিত হাদিসে বলা হয়েছে, জীবন্ত প্রোথিত কন্যা এবং তার মা—উভয়ই জাহান্নামী। এখানে সবচেয়ে ভয়াবহ নৈতিক সমস্যা হলো, যে শিশু নিজেই হত্যার শিকার, তাকে জাহান্নামের বর্ণনায় টেনে আনা হয়েছে। এপোলোজিস্টরা পরে নানা ব্যাখ্যা দিয়ে বলতে পারে, এখানে “প্রোথিত কন্যা” বলতে প্রকৃত শিশু নয়, বরং যার জন্য শিশুটিকে প্রোথিত করা হয়েছে তাকে বোঝানো হয়েছে। কিন্তু এই ব্যাখ্যাই প্রমাণ করে, সরল পাঠটি নৈতিকভাবে এতটাই অস্বস্তিকর যে তাকে বাঁচাতে ভাষাতাত্ত্বিক পুনর্ব্যাখ্যার আশ্রয় নিতে হয়। পরবর্তী যুগের হাদিসবেত্তাগণ নানাভাবে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে হাদিসটিকে উল্টো করে ব্যাখ্যার বহু চেষ্টা করেছেন, যা আসলে হাদিসটির মূল বক্তব্যের বিরুদ্ধেই যায়। যদি সরল পাঠ গ্রহণ করা হয়, তাহলে নিরপরাধ ভিকটিমকেই অপরাধীর সঙ্গে একই জাহান্নামী পরিণতিতে রাখা হচ্ছে; আর যদি পুনর্ব্যাখ্যা গ্রহণ করা হয়, তাহলে স্বীকার করতে হয় যে হাদিসের প্রকাশ্য ভাষা নিজেই বিভ্রান্তিকর ও নৈতিকভাবে বিপজ্জনক। দুই অবস্থাতেই ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার দাবিটি গুরুতর আঘাতের মুখে পড়ে। [5]
সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৫/ সুন্নাহ
পরিচ্ছেদঃ ১৮.মুশরিকদের সন্তান-সন্ততি সম্পর্কে।
৪৬৪২. ইব্রাহীম ইবন মূসা (রহঃ) ….. আমির (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জীবন্ত প্রথিত কন্যা এবং তার মা- উভয়ই জাহান্নামী।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ শা‘বী (রহঃ)
আত্মীয়দের বিলাপের জন্য আজাব
একটি বহুল আলোচিত হাদিসে বলা হয়েছে, মৃত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যরা তার জন্য উচ্চস্বরে বিলাপ করলে মৃত ব্যক্তিকে কবরে শাস্তি দেওয়া হয়। হাদিসটির ভাষা সরাসরি: মৃতকে তার পরিবারের বিলাপের কারণে আযাব দেওয়া হয়। এই বর্ণনাটি এতটাই সমস্যাজনক যে আয়েশা নিজেই কোরআনের “কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না” আয়াত উদ্ধৃত করে এর সরল অর্থ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। অর্থাৎ এই আপত্তি আধুনিক নাস্তিক বা সমালোচকের বানানো নয়; ইসলামের প্রথম যুগের ভেতরেই এই নৈতিক অসঙ্গতি ধরা পড়েছিল।
পরে এপোলোজিস্টরা ব্যাখ্যা দেয়—মৃত ব্যক্তি নিজে যদি জীবদ্দশায় বিলাপের সংস্কৃতি চালু রাখে, অথবা পরিবারকে তা থেকে নিষেধ না করে, তাহলে সে শাস্তি পাবে। কিন্তু এই ব্যাখ্যা মূল বর্ণনার সরল সমস্যাকে ঢেকে রাখে। কারণ হাদিসের ভাষা পরিবারের বিলাপকে মৃতের আযাবের কারণ হিসেবে উপস্থাপন করে। যদি মৃত ব্যক্তি নিজে নির্দেশ না দিয়ে থাকে, তাহলে অন্যের কাজের জন্য তার শাস্তি অন্যায়; আর যদি বলা হয় সে আগে থেকে অনুমোদন দিয়েছিল, তাহলে হাদিসে সেটি স্পষ্টভাবে বলা উচিত ছিল। অস্পষ্ট ভাষা দিয়ে ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার মতো মৌলিক নীতিকে ঝুলিয়ে রাখা কোনো শক্তিশালী নৈতিক দর্শনের লক্ষণ নয়। [6]
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-৫: জানাযা
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ – মৃত ব্যক্তির জন্য কাঁদা
১৭২৪-[৩] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সা’দ ইবনু ’উবাদাহ্ খুব অসুস্থ হয়ে পড়লে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে দেখতে গেলেন। তাঁর সাথে ছিলেন ’আবদুর রহমান ইবনু ’আওফ, সা’দ ইবনু আবূ ওয়াক্বক্বাস ও ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ। তিনি ওখানে প্রবেশ করে সা’দ ইবনু ’উবাদাহকে বেহুঁশ অবস্থায় পেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, সে কি মারা গেছে? সাহাবী জবাব দিলেন, জ্বী না, হে আল্লাহর রসূল! তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাঁদতে লাগলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কাঁদতে দেখে সাহাবীগণও কাঁদতে লাগলেন। এ সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ সাবধান তোমরা শুনে রাখো অশ্রু বিসর্জন ও মনের শোকের কারণে আল্লাহ তা’আলা কাউকে শাস্তি দেবেন না। তিনি তার মুখের দিকে ইশারা করে বললেন, অবশ্য আল্লাহ এজন্য ’আযাবও দেন আবার রহমতও করেন। আর মৃতকে তার পরিবার-পরিজনের বিলাপের কারণে ’আযাব দেয়া হয়। (বুখারী, মুসলিম)[1]
[1] সহীহ : বুখারী ১৩০৪, মুসলিম ৯২৪, শারহুস্ সুন্নাহ্ ১৫২৯, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৭১৫২, সহীহ আল জামি‘ আস্ সগীর ২৬৪৭।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
একের পাপে অন্যের দণ্ডঃ বোঝা চাপিয়ে দেয়া
কোরআনের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার দাবির বিপরীতে সবচেয়ে বড় আঘাত আসে সহীহ মুসলিমের একটি বর্ণনা থেকে। সেখানে বলা হয়েছে, কিয়ামতের দিন কিছু মুসলিম পাহাড়সম গুনাহ নিয়ে উপস্থিত হবে; আল্লাহ তাদের গুনাহ ক্ষমা করবেন এবং তা ইয়াহুদি ও খ্রিস্টানদের ওপর চাপিয়ে দেবেন। এটি শুধু সামান্য ভাষাগত অস্পষ্টতা নয়; এটি সরাসরি দায় স্থানান্তরের ভাষা। এক ব্যক্তির গুনাহ মাফ করে অন্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর তা স্থাপন করা হলে “কেউ অন্যের বোঝা বহন করবে না” দাবিটি অর্থহীন হয়ে যায়। [7]
এখানে এপোলোজিস্টদের পরিচিত উদ্ধারকৌশল হলো—“আসলে মুসলিমদের পাপ তাদের ওপর চাপানো হবে না; বরং ইয়াহুদি-খ্রিস্টানদের নিজেদের কুফরি ও পাপের সমপরিমাণ শাস্তি দেওয়া হবে।” কিন্তু এই ব্যাখ্যা হাদিসের প্রকাশ্য ভাষাকে বদলে দেয়। হাদিস যদি শুধু বলতে চাইত যে প্রত্যেকে নিজের পাপের জন্য শাস্তি পাবে, তাহলে “মুসলিমদের গুনাহ ক্ষমা করে তা ইয়াহুদি-খ্রিস্টানদের ওপর চাপানো হবে” ধরনের ভাষার প্রয়োজন ছিল না। এই ভাষা নৈতিকভাবে scapegoating বা বলির পাঁঠা বানানোর ধারণার সঙ্গে মিলে যায়: এক গোষ্ঠী মুক্তি পাবে, আর অন্য গোষ্ঠী তার বদলি দণ্ডের বাহক হবে। এটি ব্যক্তিগত দায় নয়; এটি ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক দণ্ডবণ্টন।
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫১/ তাওবা
পরিচ্ছেদঃ ৮. হত্যাকারীর তাওবা আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য; যদিও সে বহু হত্যা করে থাকে
৬৭৫৮। মুহাম্মদ ইবনু আমর ইবনু আব্বাদ ইবনু জাবালা ইবনু আবূ রাওয়াদ (রহঃ) … আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিছুসংখ্যক মুসলিম পাহাড় সমান গুনাহ নিয়ে কিয়ামতের ময়দানে আসবে এবং আল্লাহ তাআলা তাদের গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন। আর তা ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের উপর চড়িয়ে দিবেন। আমার মনে হয় এ রূপই বর্ণনাকারী হাদীসের শেষোক্ত কথাটি সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। রাবী আবূ রাওহ (রহঃ) বলেন, কার পক্ষ থেকে সন্দেহের উদ্রেক হয়েছে, তা আমার জানা নেই। আবূ বুরদা (রহঃ) বলেন, এ হাদীসটি আমি উমার ইবনু আবদুল আযীয (রহঃ) এর নিকট বর্ণনা করার পর তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার পিতা এ হাদীসটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সরাসরি (শুনে) তোমার নিকট বর্ননা করেছে কি? আমি বললাম, হ্যাঁ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ মূসা আল- আশ’আরী (রাঃ)
যৌন নির্যাতনের শিকার পশুর কী অপরাধ?
আসুন আরও একটি বর্ণনা দেখি। আবু দাউদের একটি হাদিসে বলা হয়েছে, কেউ পশুর সঙ্গে যৌনকর্ম করলে অপরাধীকে হত্যা করা হবে এবং সেই পশুকেও হত্যা করা হবে। এখানে নৈতিক প্রশ্নটি অত্যন্ত সরল: পশুটির অপরাধ কী? পশু নৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, সম্মতি দিতে পারে না, ধর্মীয় আইন বুঝতে পারে না। সে ভিকটিম; অপরাধী নয়। তবু বর্ণনায় অপরাধীর সঙ্গে পশুটিকেও মৃত্যুদণ্ডের আওতায় আনা হয়েছে।
এই হাদিসের মান নিয়ে আলেমদের মধ্যে আলোচনা ও আপত্তি থাকলেও, সমস্যাটি এখানে শুধু একক বর্ণনার ওপর দাঁড়িয়ে নেই; এটি বৃহত্তর প্যাটার্নের অংশ। ইসলামের বিভিন্ন বর্ণনা ও বিধানে বারবার দেখা যায়—অপরাধী এক ব্যক্তি, কিন্তু ক্ষতি বা দণ্ড ভোগ করে অন্য কেউ: মৃত ব্যক্তি, শিশু, পশু, আত্মীয়স্বজন, কিংবা অন্য ধর্মীয় গোষ্ঠী। তাই পশুর ক্ষেত্রে প্রশ্নটি শুধু “এই হাদিস সহিহ কি না” নয়; বরং প্রশ্নটি হলো, ইসলামি বর্ণনায় নিরপরাধ সত্তাকে অপরাধীর সঙ্গে শাস্তির কাঠামোতে টেনে আনার প্রবণতা কেন বারবার দেখা যায়? [8]
সূনান আবু দাউদ (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৩/ শাস্তির বিধান
পরিচ্ছদঃ ২৮. পশুর সাথে সংগম করলে তার শাস্তি সস্পর্কে।
৪৪০৫. আবদুল্লাহ ইবন মুহাম্মদ (রহঃ) ………. ইবন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যদি কেউ কোন পশুর সাথে সঙ্গম করে, তবে তাকে হত্যা করবে এবং সে পশুকেও তার সাথে হত্যা করবে। রাবী বলেন, আমি ইবন আব্বাস (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করিঃ পশুর অপরাধ কি? তিনি বলেনঃ আমার মনে হয়, তিনি সে পশুর গোশত খাওয়া ভাল মনে করেননি, যার সাথে কেউ এরূপ কুকর্ম করে।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
ভবিষ্যৎ অপরাধের আগেই শাস্তি: খিজিরের বালক হত্যা
কোরআনের সূরা কাহফের খিজির-বালক হত্যার কাহিনি ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার ধারণাকে আরও গভীরভাবে আঘাত করে। সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় বলা হয়েছে, খিজির যে বালককে হত্যা করেছিলেন, তাকে কাফের স্বভাব দিয়েই সৃষ্টি করা হয়েছিল; সে বেঁচে থাকলে তার পিতামাতাকে অবাধ্যতা ও কুফরির দিকে ঠেলে দিত। এখানে সমস্যা একাধিক স্তরে। প্রথমত, বালক তখনও সেই ভবিষ্যৎ অপরাধ করেনি। দ্বিতীয়ত, তাকে হত্যা করা হচ্ছে তার নিজের বর্তমান অপরাধের জন্য নয়, বরং ভবিষ্যতে সে কী করতে পারে তার জন্য। তৃতীয়ত, তাকে হত্যা করা হচ্ছে তার পিতামাতাকে সম্ভাব্য কুফরি থেকে বাঁচানোর জন্য—অর্থাৎ পিতামাতার ধর্মীয় নিরাপত্তার জন্য সন্তানের জীবন কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।
এটি ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার সম্পূর্ণ বিপরীত। কোনো ন্যায়বিচারব্যবস্থা অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই কাউকে শাস্তি দেয় না। “ঈশ্বর আগেই জানতেন”—এটি বিচার নয়; এটি পূর্বনির্ধারিত দণ্ডের অজুহাত। যদি আল্লাহ নিজেই কাউকে কাফের স্বভাব দিয়ে সৃষ্টি করেন, তারপর সেই সম্ভাব্য কুফরির কারণে তাকে হত্যা করান, তাহলে দোষটি বালকের নয়; বরং সৃষ্টির নকশাতেই সমস্যা। এখানে মানুষ নিজের পাপের বোঝা বহন করছে না; বরং তাকে এমন এক ভবিষ্যৎ চরিত্রের দায়ে হত্যা করা হচ্ছে, যা সে এখনও বাস্তবে অর্জনই করেনি।
এই ছেলেটির পরকালীন পরিণতি কী হবে—এই প্রশ্নটিই এখানে নৈতিকভাবে বিস্ফোরক। সে তো বাস্তবে কোনো অপরাধ করেনি। অথচ তাকে “কাফের স্বভাব দিয়ে সৃষ্টি” করা হয়েছে বলে বর্ণনা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে সে পিতামাতাকে কুফরির দিকে নিয়ে যাবে বলে তাকে আগেই হত্যা করা হচ্ছে। অর্থাৎ এখানে বিচার বাস্তব কর্মের ভিত্তিতে নয়; জন্মগত চরিত্র, পূর্বনির্ধারণ এবং অনুমিত ভবিষ্যৎ আচরণের ভিত্তিতে। এ কেমন ইনসাফ? আল্লাহ যদি কাউকে কাফের স্বভাব দিয়েই সৃষ্টি করেন, তারপর সেই সম্ভাব্য কুফরির কারণে তাকে হত্যা করান, তাহলে নৈতিক দায় শিশুর নয়; সমস্যাটি সৃষ্টির নকশাতেই। আসুন হাদিসগুলো পড়িঃ [9] [10]
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৪৭। তাকদীর
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রত্যেক শিশু ইসলামী স্বভাবের উপর জন্মানোর মর্মার্থ এবং কাফির ও মুসলিমদের মৃত শিশুর বিধান
৬৬৫৯-(২৯/২৬৬১) আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামাহ্ ইবনু কা’নাব (রহঃ) ….. উবাই ইবনু কা’ব (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয়ই যে ছেলেটিকে খাযির (আঃ) (আল্লাহর আদেশে) হত্যা করেছিলেন তাকে কফিরের স্বভাব দিয়েই সৃষ্টি করা হয়েছিল। যদি সে জীবিত থাকত তাহলে সে তার পিতামাতাকে অবাধ্যতা ও কুফুরী করতে বাধ্য করত। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৫২৫, ইসলামিক সেন্টার ৬৫৭৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ)
কোরআন ও হাদিসের প্রধান বৈপরীত্য এক নজরে
| কোন মানুষ অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না | মানুষ অন্যের পাপের বোঝাও বহন করবে |
|---|---|
| আমি কি আল্লাহকে ছেড়ে অন্য প্রতিপালক তালাশ করব? (অথচ প্রকৃতপক্ষে) তিনিই সব কিছুর প্রতিপালক। প্রত্যেক ব্যক্তি যা অর্জন করে তার জন্য সে নিজেই দায়ী হবে। কোন ভারবহনকারীই অন্যের গুনাহের ভার বহন করবে না। অবশেষে তোমাদের প্রত্যাবর্তন স্থল তোমাদের প্রতিপালকের নিকটেই, তখন তিনি তোমাদেরকে জানিয়ে দেবেন যে সকল বিষয়ে তোমরা মতভেদে লিপ্ত ছিলে (সে সব বিষয়ে প্রকৃত সত্য কোনটি)। — Taisirul Quran তুমি জিজ্ঞেস করঃ আমি কি আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য রবের সন্ধান করব? অথচ তিনিই হচ্ছেন প্রতিটি বস্তুর রাব্ব! প্রত্যেক ব্যক্তিই স্বীয় কৃতকর্মের জন্য দায়ী হবে, কেহ কারও কোন বোঝা বহন করবেনা, পরিশেষে তোমাদের রবের নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন করতে হবে, অতঃপর তিনি তোমরা যে বিষয়ে মতবিরোধ করেছিলে সে বিষয়ের মূল তত্ত্ব তোমাদেরকে অবহিত করবেন। — Sheikh Mujibur Rahman বল, ‘আমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন রব অনুসন্ধান করব’ অথচ তিনি সব কিছুর রব’? আর প্রতিটি ব্যক্তি যা অর্জন করে, তা শুধু তারই উপর বর্তায় আর কোন ভারবহনকারী অন্যের ভার বহন করবে না। অতঃপর তোমাদের রবের নিকটই তোমাদের প্রত্যাবর্তনস্থল। সুতরাং তিনি তোমাদেরকে সেই সংবাদ দেবেন, যাতে তোমরা মতবিরোধ করতে। — Rawai Al-bayan বলুন, ‘আমি কি আল্লাহকে ছেড়ে অন্যকে রব খুঁজব? অথচ তিনিই সব কিছুর রব। ’প্রত্যেকে নিজ নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়ী এবং কেউ অন্য কারো ভার গ্রহণ করবে না। তারপর তোমাদের প্রত্যাবর্তন তোমাদের রবের দিকেই , অতঃপর যে বিষয়ে তোমারা মতভেদ করতে, তা তিনি তোমাদেরকে অবহিত করবেন। — Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria [11] | তারা অবশ্য অবশ্যই তাদের নিজেদের পাপের বোঝা বহন করবে, নিজেদের বোঝার সাথে আরো বোঝা, আর তারা যে সব মিথ্যে উদ্ভাবন করত সে সম্পর্কে ক্বিয়ামত দিবসে তারা অবশ্য অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে। — Taisirul Quran এবং তারা নিজেদের বোঝা বহন করবে এবং নিজেদের বোঝার সাথে আরও বোঝা; এবং তারা যে মিথ্যা উদ্ভাবন করে সেই সম্পর্কে কিয়ামাত দিবসে অবশ্যই তাদেরকে প্রশ্ন করা হবে। — Sheikh Mujibur Rahman আর অবশ্যই তারা বহন করবে তাদের বোঝা এবং তাদের বোঝার সাথে আরো কিছু বোঝা। আর তারা কিয়ামতের দিন অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে সে সম্পর্কে, যা তারা মিথ্যা বানাত। — Rawai Al-bayan তারা তো বহন করবে নিজেদের ভার এবং নিজেদের বোঝার সাথে আরো কিছু বোঝা [১]; আর তারা যে মিথ্যা রটনা করত সে সম্পর্কে কিয়ামতের দিন অবশ্যই তাদেরকে প্রশ্ন করা হবে। — Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria [12] |
| কোন বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না। আমি ‘আযাব দেই না যতক্ষণ একজন রসূল না পাঠাই। — Taisirul Quran এবং কেহ অন্য কারও ভার বহন করবেনা; আমি রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত কেহকেও শাস্তি দিইনা। — Sheikh Mujibur Rahman আর কোন বহনকারী অপরের (পাপের) বোঝা বহন করবে না। আর রাসূল প্রেরণ না করা পর্যন্ত আমি আযাবদাতা নই। — Rawai Al-bayan আর কোনো বহনকারী অন্য কারো ভার বহন করবে না [২]। আর আমরা রাসুল না পাঠানো পর্যন্ত শাস্তি প্রদানকারী নই [৩]। — Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria [13] | যার ফলে ক্বিয়ামাত দিবসে তারা বহন করবে নিজেদের পাপের বোঝা পূর্ণ মাত্রায়, আর (আংশিক) তাদেরও পাপের বোঝা যাদেরকে তারা গুমরাহ করেছে নিজেদের অজ্ঞতার কারণে। হায়, তারা যা বহন করবে তা কতই না নিকৃষ্ট! — Taisirul Quran ফলে কিয়ামাত দিবসে তারা বহন করবে তাদের পাপভার পূর্ণমাত্রায় এবং পাপভার তাদেরও যাদেরকে তারা অজ্ঞতা বশতঃ বিভ্রান্ত করেছে; হায়! তারা যা বহন করবে তা কতই না নিকৃষ্ট! — Sheikh Mujibur Rahman এতে করে তারা কিয়ামতের দিনে নিজদের পাপের বোঝা পুরোটাই বহন করবে এবং তাদের পাপের বোঝাও যাদেরকে তারা অজ্ঞতা হেতু পথভ্রষ্ট করে। তারা যা বহন করবে, তা কতই না নিকৃষ্ট! — Rawai Al-bayan ফলে কিয়ামতের দিন তারা বহন করবে তাদের পাপের বোঝা পূর্ণ মাত্রায় এবং তাদেরও পাপের বোঝা যাদেরকে তারা অজ্ঞতাবশত বিভ্রান্ত করেছে [১]। দেখুন, তারা যা বহন করবে তা কত নিকৃষ্ট ! — Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria [14] |
| সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ৫১/ তাওবা পরিচ্ছেদঃ ৮. হত্যাকারীর তাওবা আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য; যদিও সে বহু হত্যা করে থাকে ৬৭৫৮। মুহাম্মদ ইবনু আমর ইবনু আব্বাদ ইবনু জাবালা ইবনু আবূ রাওয়াদ (রহঃ) … আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিছুসংখ্যক মুসলিম পাহাড় সমান গুনাহ নিয়ে কিয়ামতের ময়দানে আসবে এবং আল্লাহ তাআলা তাদের গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন। আর তা ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের উপর চড়িয়ে দিবেন। আমার মনে হয় এ রূপই বর্ণনাকারী হাদীসের শেষোক্ত কথাটি সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। রাবী আবূ রাওহ (রহঃ) বলেন, কার পক্ষ থেকে সন্দেহের উদ্রেক হয়েছে, তা আমার জানা নেই। আবূ বুরদা (রহঃ) বলেন, এ হাদীসটি আমি উমার ইবনু আবদুল আযীয (রহঃ) এর নিকট বর্ণনা করার পর তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার পিতা এ হাদীসটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সরাসরি (শুনে) তোমার নিকট বর্ননা করেছে কি? আমি বললাম, হ্যাঁ। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih) বর্ণনাকারীঃ আবূ মূসা আল- আশ’আরী (রাঃ) [7] | |
| সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ৩৫/ সুন্নাহ পরিচ্ছেদঃ ১৮. মুশরিকদের সন্তান-সন্ততি সম্পর্কে। ৪৬৪২. ইব্রাহীম ইবন মূসা (রহঃ) ….. আমির (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জীবন্ত প্রথিত কন্যা এবং তার মা- উভয়ই জাহান্নামী। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih) বর্ণনাকারীঃ শা‘বী (রহঃ) [5] | |
| মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) পর্ব-৫: জানাযা পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ – মৃত ব্যক্তির জন্য কাঁদা ১৭২৪-[৩] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সা’দ ইবনু ’উবাদাহ্ খুব অসুস্থ হয়ে পড়লে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে দেখতে গেলেন। তাঁর সাথে ছিলেন ’আবদুর রহমান ইবনু ’আওফ, সা’দ ইবনু আবূ ওয়াক্বক্বাস ও ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ। তিনি ওখানে প্রবেশ করে সা’দ ইবনু ’উবাদাহকে বেহুঁশ অবস্থায় পেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, সে কি মারা গেছে? সাহাবী জবাব দিলেন, জ্বী না, হে আল্লাহর রসূল! তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাঁদতে লাগলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কাঁদতে দেখে সাহাবীগণও কাঁদতে লাগলেন। এ সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ সাবধান তোমরা শুনে রাখো অশ্রু বিসর্জন ও মনের শোকের কারণে আল্লাহ তা’আলা কাউকে শাস্তি দেবেন না। তিনি তার মুখের দিকে ইশারা করে বললেন, অবশ্য আল্লাহ এজন্য ’আযাবও দেন আবার রহমতও করেন। আর মৃতকে তার পরিবার-পরিজনের বিলাপের কারণে ’আযাব দেয়া হয়। (বুখারী, মুসলিম)[1] [1] সহীহ : বুখারী ১৩০৪, মুসলিম ৯২৪, শারহুস্ সুন্নাহ্ ১৫২৯, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৭১৫২, সহীহ আল জামি‘ আস্ সগীর ২৬৪৭। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih) |
কোরআন বলছে কেউ কারো বোঝা বইবে না, অথচ সহীহ হাদিস বলছে মুসলিমদের পাহাড় সমান গুনাহ ক্ষমা করে তা ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের ওপর চড়িয়ে দেওয়া হবে। এটি ঐশ্বরিক ন্যায়বিচারের সংজ্ঞার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।[15]
ব্যক্তির কর্মের চেয়ে এখানে ব্যক্তির ‘ধর্মীয় পরিচয়’ বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যের পাপের বোঝা ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ওপর চাপানো নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয় এবং এটি কোরআনের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার (৬:১৬৪) মূল ভিত্তিকে ধূলিসাৎ করে দেয়।[16]
ইসলাম খ্রিস্টধর্মের ‘Substitutionary Atonement’ বা অন্যের পাপে অন্যের মুক্তির ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করলেও, এই হাদিসটি একই কাজ করছে। এখানে অন্যের পাপের দণ্ড অন্যকে দেওয়ার মাধ্যমে একটি Scapegoat বা বলির পাঁঠা তৈরি করা হয়েছে।[17]
ইসলামি আইনে সমষ্টিগত দায় (আকিলা ব্যবস্থা)
কোরআনের নীতি অনুযায়ী ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা থাকার কথা থাকলেও ইসলামি ফিকহে ‘আকিলা’ (Aqila) নামক একটি ব্যবস্থা রয়েছে। ভুলবশত হত্যার ক্ষেত্রে দিয়ত বা রক্তপণের অর্থ কেবল হত্যাকারীকে দিতে হয় না; তার পিতৃকুলীয় পুরুষ আত্মীয়রাও এই আর্থিক দায় বহন করে। অর্থাৎ কাজ করেছে একজন, কিন্তু আর্থিক দায় ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে তার আত্মীয়গোষ্ঠীর ওপর। এটি সরাসরি ফৌজদারি অপরাধের পারিবারিকীকরণ।
এপোলোজিস্টরা বলতে পারে, এটি শাস্তি নয়, বরং সামাজিক ক্ষতিপূরণব্যবস্থা। কিন্তু নাম পাল্টালেই নৈতিক সমস্যা পাল্টায় না। যার হাতে হত্যা ঘটেনি, যার সিদ্ধান্তে হত্যা ঘটেনি, যার অবহেলায় হত্যা ঘটেনি—সে কেন অর্থ দেবে? যদি বলা হয়, গোত্রীয় সমাজে পরিবার অপরাধীর পক্ষে দায় বহন করবে, তাহলে সেটি ব্যক্তিগত দায় নয়; সেটি গোত্রভিত্তিক দায়। আর যদি ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা সত্যিই মৌলিক নীতি হয়, তাহলে আকিলা ব্যবস্থা সেই নীতির ফিকহি ব্যতিক্রম নয়; বরং সরাসরি ভাঙন।
মুবাহালা ও বংশপরম্পরায় অভিশাপ
কোরআনের সূরা আলে-ইমরানে ‘মুবাহালা’র উল্লেখ আছে, যেখানে সত্য-মিথ্যার ধর্মীয় বিতর্কে নিজেদের সন্তান ও নারীদেরও নিয়ে এসে মিথ্যাবাদীদের ওপর আল্লাহর লানত কামনা করার কথা বলা হয়েছে [18]। এটি সরাসরি পাপ স্থানান্তরের উদাহরণ নয়, কিন্তু ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার আলোচনায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক অস্বস্তি তৈরি করে। কারণ বিতর্কটি মূলত প্রাপ্তবয়স্ক ধর্মীয় দাবিদারদের মধ্যে; সেখানে স্ত্রী-সন্তানকে অভিশাপের নাটকীয় কাঠামোর মধ্যে আনা ধর্মীয় দায়কে পারিবারিক ও বংশগত ঝুঁকিতে রূপান্তর করে। যদি সত্য-মিথ্যা নির্ধারণই উদ্দেশ্য হয়, তাহলে নিরপরাধ সন্তানদের উপস্থিতি কেন প্রয়োজন—এই প্রশ্নের সন্তোষজনক নৈতিক উত্তর নেই।
আল্লাহর কাজকে ন্যায়বিচারের ঊর্ধ্বে বসানোর সমস্যা
ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার প্রশ্নে আরও গভীর সমস্যা তৈরি হয় তাকদির-সম্পর্কিত কিছু হাদিসে। সেখানে বলা হয়েছে, আল্লাহ যদি সমস্ত আকাশবাসী ও দুনিয়াবাসীকে শাস্তি দিতে চান, তবুও তিনি যালিম বলে সাব্যস্ত হবেন না। এই বক্তব্য ন্যায়বিচারের ধারণাকে কার্যত অর্থহীন করে দেয়। কারণ যদি কোনো শাস্তি, কোনো দণ্ড, কোনো গণবিনাশ, কোনো নিরপরাধের মৃত্যু—কিছুই আল্লাহর ক্ষেত্রে অন্যায় বলে গণ্য না হয়, তাহলে “ইনসাফ” শব্দটি আর নৈতিক ধারণা থাকে না; এটি কেবল ক্ষমতার ভাষা হয়ে দাঁড়ায়। [19] –
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১ঃ ঈমান (বিশ্বাস)
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় ‘অনুচ্ছেদ – তাকদীরের প্রতি ঈমান
১১৫-(৩৭) ইবনু আদ্ দায়লামী (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ)-এর নিকট পৌঁছে আমি তাকে বললাম, তাক্বদীর সম্পর্কে আমার মনে একটি সন্দেহ তৈরি হচ্ছে। তাই আপনি আমাকে কিছু হাদীস শুনান যাতে আল্লাহর মেহেরবানীতে আমার মন থেকে (তাক্বদীর সম্পর্কে) এসব সন্দেহ-সংশয় দূরীভূত হয়। তিনি বললেন, আল্লাহ তা‘আলা যদি সমস্ত আকাশবাসী ও দুনিয়াবাসীকে শাস্তি দিতে ইচ্ছা করেন, তবে তা দিতে পারেন। এতে আল্লাহ যালিম বলে সাব্যস্ত হবেন না। পক্ষান্তরে তিনি যদি তাঁর সৃষ্টজীবের সকলের প্রতিই রহমত করেন, তবে তাঁর এ রহমত তাদের জন্য সকল ‘আমল হতে উত্তম হবে। সুতরাং তুমি যদি উহুদ পাহাড়সম স্বর্ণও আল্লাহর পথে দান কর, তোমার থেকে তিনি তা গ্রহণ করবেন না, যে পর্যন্ত তুমি তাক্বদীরে বিশ্বাস না করবে এবং যা তোমার ভাগ্যে ঘটেছে তা তোমার কাছ থেকে কক্ষনো দূরে চলে যাবে না- এ কথাও তুমি বিশ্বাস না করবে, আর যা এড়িয়ে গেছে তা কক্ষনো তোমার নিকট আর আসবে না- এ বিশ্বাস স্থাপন করা ব্যতীত যদি তোমার মৃত্যু হয় তবে অবশ্যই তুমি জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
ইবনু আদ্ দায়লামী বলেন, উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ)-এর এ বর্ণনা শুনে আমি সাহাবী ‘আবদুল্লাহ ইবন মাস্‘ঊদ (রাঃ)-এর নিকট গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। তিনিও আমাকে এ কথাই প্রত্যুত্তর করলেন। তিনি বলেন, তারপর হুযায়ফাহ্ ইবনু ইয়ামান (রাঃ)-এর নিকট যেয়েও জিজ্ঞেস করলাম। তিনিও আমাকে একই প্রত্যুত্তর করলেন। এরপর যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ)-এর কাছে আসলাম। তিনি স্বয়ং নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাম করেই আমাকে একই ধরনের কথা বললেন। (আহমাদ, আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ্)(1)
(1) সহীহ : আহমাদ ২১১৪৪, আবূ দাঊদ ৪৬৯৯, ইবনু মাজাহ্ ৭৭।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এখানে নৈতিক সমস্যাটি সরাসরি। মানুষের ক্ষেত্রে আমরা বলি, অপরাধ ছাড়া শাস্তি অন্যায়। কিন্তু আল্লাহর ক্ষেত্রে যদি বলা হয়, তিনি সবাইকে শাস্তি দিলেও অন্যায় হবে না, তাহলে একই সঙ্গে “আল্লাহ ন্যায়বিচার করেন” এবং “আল্লাহ যা করেন তাই ন্যায়”—এই দুইটি ভিন্ন দাবিকে গুলিয়ে ফেলা হয়। প্রথমটি যাচাইযোগ্য নৈতিক দাবি; দ্বিতীয়টি অন্ধ ক্ষমতাবাদ। যদি যেকোনো কাজকেই আগে থেকে ন্যায় বলে ধরে নেওয়া হয়, তাহলে আর বিচার করার কিছু থাকে না। তখন ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার দাবি একটি বাস্তব নৈতিক নীতি নয়; বরং ঈশ্বরীয় ক্ষমতাকে প্রশ্নাতীত রাখার একটি ধর্মীয় কৌশল মাত্র।
উপসংহার
উপরের দলিলগুলো একসাথে রাখলে সিদ্ধান্তটি স্পষ্ট: “কেউ অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না”—এই দাবিটি ইসলামের ভেতরে সর্বজনীন নৈতিক নীতি হিসেবে কার্যকর নয়। এটি একটি নির্বাচিত ধর্মীয় স্লোগান, যা কিছু আয়াতে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, কিন্তু একই ধর্মীয় কাঠামোর অন্যত্র বারবার ভেঙে ফেলা হয়েছে। কোরআন নিজেই পথভ্রষ্টকারীর ওপর অন্যের বোঝার অংশ চাপায়; হাদিসে মৃত ব্যক্তি আত্মীয়দের বিলাপের কারণে শাস্তির মুখে পড়ে; কিছু মুসলিমের গুনাহ ইয়াহুদি-খ্রিস্টানদের ওপর চাপানোর ভাষা পাওয়া যায়; খিজিরের বালককে ভবিষ্যৎ অপরাধের আগেই হত্যা করা হয়; আকিলা ব্যবস্থায় অপরাধীর আত্মীয়দের আর্থিক দায় বহন করতে হয়। এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এগুলো একই নৈতিক সমস্যার বিভিন্ন রূপ।
তাই ইসলামি ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার দাবিকে পূর্ণাঙ্গ নৈতিক সত্য বলা যায় না। বরং এটি ধর্মীয় ভাষ্যে সুবিধামতো ব্যবহৃত হয়: যেখানে ইসলামের নৈতিক উচ্চতা দেখাতে হবে, সেখানে বলা হয় কেউ অন্যের বোঝা বহন করবে না; আর যেখানে ধর্মীয় কর্তৃত্ব, গোত্রীয় দায়, পরকালীন দণ্ড বা সামষ্টিক শাস্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে, সেখানে অন্যের বোঝা অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। যুক্তির বিচারে এটি নৈতিক সামঞ্জস্য নয়; এটি সরাসরি স্ববিরোধিতা।
তথ্যসূত্রঃ
- কোরআন ১৬:২৫ ↩︎
- কোরআন ২৯:১৩ ↩︎
- নূহ নবীর অভিশাপ এবং বর্বর সাম্প্রদায়িকতা ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিস নম্বর- ১১১ ↩︎
- সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৬৪২ 1 2
- সহিহ বুখারি ১২৮৬, সহিহ মুসলিম ৯২৭ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৬৭৫৮ 1 2
- সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৪০৫ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৬৬৫৯ ↩︎
- ইসলাম অনুসারে কিছু মানুষ জন্মগতভাবে কাফের ↩︎
- সূরা ৬, আয়াত ১৬৪ ↩︎
- সূরা ২৯, আয়াত ১৩ ↩︎
- সূরা ১৭, আয়াত ১৫ ↩︎
- সূরা ১৬, আয়াত ২৫ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদিসঃ ৬৭৫৮ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ↩︎
- সহীহ মুসলিম, তাওবা অধ্যায় ↩︎
- কোরআন ৩:৬১ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ১১৫ ↩︎

